kalerkantho


খেলতে খেলতে শেখা

প্রি-স্কুলের কল্যাণে ছোট্টমণিদের কাছে স্কুল এখন ভয়ের জায়গা নয়। বরং হাসি-আনন্দ আর উচ্ছলতার আরেক নাম। গতানুগতিক বই-পুস্তক নয়, এখানে তারা খেলার ছলে শিখছে প্রথমপাঠ। লিখেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



খেলতে খেলতে শেখা

ছবি : তারেক আজিজ নিশক, কৃতজ্ঞতা : বাংলাদেশ শিশু একাডেমি

প্রি-স্কুল
খেলার ছলে সোনামণিদের শিক্ষাদানের জন্যই গড়ে উঠেছে প্রি-স্কুল। অনেকের কাছে এটা প্লে-স্কুল নামেও পরিচিত।

এসব স্কুলের শিক্ষার্থীদের বয়সও একেবারে কম। মোটামুটি তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে। শিশুর জন্য প্রি-স্কুল বাড়তি একটা সাপোর্ট সিস্টেমের মতো; যেখানে গিয়ে বাচ্চা সমবয়সীদের সঙ্গে মেশার ও খেলাধুলার সুযোগ পায়। নিজের বাড়ির সীমিত গণ্ডি পেরিয়ে নতুন কিছু দেখা, জানা ও শেখায় সাহায্য করে এই স্কুল। এখানে সব কিছু শেখানো হয় খেলার ছলে, যাতে বাচ্চারা যা শিখছে তা যেন উপভোগ করতে পারে।

বাংলাদেশ শিশু একাডেমির প্রগ্রাম অফিসার রায়হান জান্নাত জানালেন, ‘ঢাকাসহ সারা দেশে শিশু একাডেমি কর্তৃক পরিচালিত মোট ৭১টি প্রি-স্কুল রয়েছে। এখানে দুটি পর্যায়ে শিশুদের পাঠদান করা হয়। প্রথম ধাপ শিশু বিকাশ। যেখানে তিন থেকে অনূর্ধ্ব চার বছরের বাচ্চাদের ভর্তি করানো হয়।

পরের ধাপ প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়। চার থেকে অনূর্ধ্ব পাঁচ বছরের বাচ্চাদের জন্য এই ধাপ। শিশু একাডেমি থেকে পরিচালিত স্কুলে বেতন দিতে হয় না শিক্ষার্থীদের। উপরন্তু লাল-সবুজ রঙের পোশাক, জুতা, বইসহ নানা উপকরণ পায় সোনামণিরা।

বাচ্চাদের মনে কল্পনা ও স্বপ্ন বুনে দিতে পারলে ওরা সহজে শেখে

কেন প্রি-স্কুল
শহুরে বেশির ভাগ পরিবারেই দেখা যায়, স্বামী-স্ত্রী দুজনই চাকরি করছেন। মা-বাবার বেশির ভাগ সময়ই কাটছে বাড়ির বাইরে। তা ছাড়া যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার বাড়ছে। এসব পরিবারে এক ছাদের নিচে দাদু-নানি, চাচার সঙ্গে হেসেখেলে বেড়ে ওঠার সুযোগ হয়ে উঠছে না শিশুদের। ফলে যথাযথভাবে সামাজিকীকরণটা হয় না। ছোট পরিবারে মা-বাবা সন্তানকে সময়ও দিতে পারেন কম। তাই হাতের ওপর হাত রেখে চক বা পেনসিল ঘুরিয়ে শিশুদের বর্ণমালা শেখাতে মা-বাবারা ছুটছেন প্রি-স্কুলগুলোতে। বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন তানিয়া শারমিন। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে আরিয়ান সবে তিনে পা দিয়েছে। ওকে প্রি-স্কুলে দিয়ে দিয়েছি। বাসায় যেহেতু বেশি সময় দিতে পারি না, তাই সমবয়সীদের সঙ্গে মেশা কিংবা শিষ্টাচারের বিষয়টা ও এখান থেকেই শিখতে পারবে। অনেক বাচ্চার সঙ্গে মিশলে ওর মানসিক উন্নতি দ্রুত হবে। ’ শিক্ষকরা এখানে মা-বাবার মতোই বাচ্চাদের যত্ন নেন, তাদের সুবিধা-অসুবিধার প্রতি নজর রাখেন। এর ফলে বাচ্চারা নিজে থেকেই বড় স্কুলের জন্য তৈরি হয়ে যায়। নতুন পরিবেশের সঙ্গে সহজেই মানিয়ে নিতে পারে।

ভর্তি প্রক্রিয়া
তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সী বাচ্চারাই শিশু একাডেমি পরিচালিত স্কুলে ভর্তির সুযোগ পায়। প্রতিবছর জানুয়ারিতে চলে ভর্তি কার্যক্রম। ভর্তির জন্য কোনো ফি লাগে না। শুধু শিশুর পাসপোর্ট সাইজের দুই কপি ছবি আর জন্মনিবন্ধন সনদের কপি দেওয়া লাগে। বরিশালের জেলা শিশুবিষয়ক কর্মকর্তা পঙ্কজ রায় চৌধুরী বলেন, ‘শুরুতে শুধু সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ভর্তি করানো হতো। এখন প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষই সন্তানদের নিয়ে আসছেন। ’ তবে বেসরকারি স্কুলে তিন থেকে ছয় বছর বয়সী যে কেউ ভর্তি হতে পারে। এসব স্কুলে বাচ্চাকে পড়াতে হলে ভর্তির সময় প্রতিষ্ঠানভেদে চার থেকে ১০ হাজার টাকা আর মাসে মাসে এক থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয়।

কী শেখানো হয়, কিভাবে
প্রি-স্কুলের বই আর বর্ণিল উপকরণগুলো বলে দেয়, এই পড়ার পুরোটাই আনন্দের মাধ্যমে হয়। রাজশাহীর জেলা শিশুবিষয়ক কর্মকর্তা উমা রানী দাস জানালেন, ‘প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের মাধ্যমে সোনামণিদের খেলাচ্ছলে শেখানো হয়। শেখানোর কাজে ব্লক, কালার চার্ট, কাঠি, আলফা বেটিক ফর্মসহ বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করা হয়। শ্রেণিকক্ষের চেহারাও বর্ণিল। দেয়ালজোড়া ফুল, পাখি, লতা-পাতা আর কার্টুন ওদের দারুণ আকৃষ্ট করে। খোলামেলা পরিবেশও বাচ্চাদের সহজ হতে সাহায্য করে। ’

খেলাধুলার সময় শিশুদের ছোট ছোট দলে ভাগ করে দেয়া হয়

কত রকমের খেলনা, দেয়ালজোড়া কার্টুন, ছবি আর অবশ্যই নতুন বন্ধু—সব মিলিয়ে বেশ মজার অভিজ্ঞতা। বাড়ির বাইরে একটা ছোট্ট নিজস্ব জগত্, যেখানে মা-বাবা নেই ঠিকই, কিন্তু আছে উষ্ণতার ছোঁয়া। শুধু কিছু বর্ণমালা আর রং চিনিয়ে দিয়েই প্রি-স্কুলের দায়িত্ব শেষ নয়। বরং ছোট শিশুদের সামাজিকীকরণের কাজটা করে থাকে প্রি-স্কুলগুলো। মিরপুরের বাসিন্দা জামাল হোসেন। তিনি বললেন, ‘শিশুর বিকাশ পর্বের গোড়ায় কাজ করে প্রি-স্কুলগুলো। নিজে নিজে খাওয়া, জুতা পরা, ব্যাগ গুছিয়ে রাখা, মানুষের সঙ্গে কথা বলা, কাকে কী সম্বোধন করতে হবে, সেই শিক্ষাটা পর্যন্ত দেওয়া হয় এখানে। প্রি-স্কুলে সন্তান পাঠিয়ে অনেকটাই নিশ্চিন্ত থাকি। ’

কয়েক বছর ধরে শিশু একাডেমি পরিচালিত স্কুলে পড়াচ্ছেন কানিজ শামীম আরা চিশতী। তিনি বললেন, ‘পড়াতে গিয়ে দেখেছি, বাচ্চাদের মনে কল্পনা ও স্বপ্ন বুনে দিতে পারলে ওদের শেখানোটা সহজ হয়। শেখানোর মাধ্যম হিসেবে কবিতা, গল্প, ছড়া ও নানা ধরনের উপকরণ ব্যবহার করি। শিশু বিকাশ পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক কোনো পড়াশোনা নেই। নেই কোনো বই। শুধু গল্প, ছড়া, কবিতা, গান ইত্যাদির মাধ্যমে তাদের বস্তুর আকার ও রং চেনানো হয়। প্রাক্-প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলা ও গণিত—এ দুটি বই পড়ানো হয়। এই পর্যায়ে তাদের হাতে-কলমে শেখানোর চেষ্টা চলে। শেখানো হয় পুরোপুরি খেলার মাধ্যমে। যেমন—ওদের এক থেকে পাঁচ পর্যন্ত গণনা শেখানো হবে। এ ক্ষেত্রে প্রথমে কাঠি, পেনসিল ইত্যাদি বাস্তব উপকরণ হাতে ধরিয়ে এক থেকে পাঁচ পর্যন্ত গণনা শেখানো হয়। এরপর বোর্ডে পাঁচ রকমের পাঁচটি ছবি এঁকে দেখানো হয়। সর্বশেষ বোর্ডে কয়েকটি ছবি এঁকে সেখান থেকে একই ধরনের পাঁচটি ছবি বাছাই করতে বলা হয়। ’

চট্টগ্রামের জেলা শিশুবিষয়ক কর্মকর্তা নার্গিস সুলতানা জানালেন, ‘প্রতি মাসে কী পড়ানো হবে তার একটা পরিকল্পনা থাকে। ছড়া, গল্প, সংখ্যা গণনা (১ থেকে ২০), কাগজ কেটে বিভিন্ন আকৃতি বানানো, কাগজ আঠা দিয়ে লাগানো, নিজেদের নাম মিলিয়ে খেলা, ইচ্ছামতো আঁকাআঁকি, শোনা কথা বলা, যা করি তা-ই করো, কী ভাবছ, ছোট দলে ভাগ হয়ে বিচি, পাথর ইত্যাদি ব্যবহার করে বিভিন্ন আকৃতি বানানো—এ সবই থাকে সেই পরিকল্পনায়। ’

পড়ানোর ফাকে ফাকে খেলাধুলা চলে

‘আনন্দদায়ক পরিবেশ পায় বলে স্কুলে আসার জন্য উদগ্রীব থাকে শিশুরা। একঘেয়েমি কাটানোর জন্য পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে ব্যায়াম ও খেলাধুলা চলে’—বললেন মৌলভীবাজারের জেলা শিশুবিষয়ক কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দীন। তিনি আরো বলেন, ‘খেলাধুলার সময় ওদের ছোট ছোট দলে ভাগ করে দেওয়া হয়। প্রতি দলে একজন করে দলনেতা থাকে। এতে করে ওদের মধ্যে নেতৃত্বের দক্ষতা এবং দলগত বন্ধন তৈরি হয়। খেলাগুলোও দারুণ মজার। যেমন—‘মালা গো মালা’ বলে একটা খেলা আছে। সে খেলায় মালা নামে এক দুঃখী মেয়ে বসে কাঁদে। শিশুরা তখন বলে—‘মালা, তুমি কান্না কোরো না। আমাদের সঙ্গে আসো। ’ এভাবে পরে আরেকজন মালা হয়। এই খেলার মাধ্যমে বাচ্চারা অন্যের দুঃখে সহমর্মী হতে শেখে। আরেকটা খেলার নাম ‘ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা’। যেখানে একে অন্যকে প্রশ্ন ও পাল্টা প্রশ্ন করে—‘তুমি কি আজকে নখ কেটে এসেছ? তুমি গোসল করেছ? খাওয়ার আগে হাত ধুয়েছে? ইত্যাদি। ’

টিফিনের ধরনটাও মজার। ঢাকা জেলার জেলা শিশুবিষয়ক কর্মকর্তা রাশিদা আক্তার বলেন, ‘সবাইকে একই রকম খাবার দেওয়া হয়। বিস্কুট, কেক, কলা, শিঙাড়া, সমুচা, পাউরুটি, মৌসুমি ফলমূল—এ সবই থাকে টিফিনে। খাওয়াদাওয়ার পাশাপাশি ম্যানারও শেখানো হয়। কিভাবে বোতল থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে খেতে হয়, কিভাবে চামচ ব্যবহার করতে হয়, কিভাবে টয়লেট ব্যবহার করতে হয়—সবই শেখান শিক্ষকরা। ’ মায়ের হাত ধরে নিয়মিত শিশু একাডেমির স্কুলে আসে চার বছরের সুমন। সে বলল, ‘স্কুলে ভালো লাগে। অনেক মজা করি আমরা। মিস সুন্দর সুন্দর গল্প বলেন। ’

বেসরকারি উদ্যোগও আছে

ছবিটি ইউরো কিডস স্কুলের ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া

সরকারি স্কুলের পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোগেও ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য প্রি-স্কুল। বনশ্রীর চাইল্ড চির প্রি-স্কুলের অধ্যক্ষ ফাহমিদা রশিদ বললেন, ‘জাতীয় শিক্ষা কার্যক্রমে ছয় বছর বয়স থেকে পড়াশোনা শুরু হলেও এর আগের সময়টিতে শিশুকে গড়ে তোলে প্রি-স্কুলগুলো। এখান থেকেই একজন শিক্ষার্থী তৈরি হয় নামিদামি স্কুলগুলোতে ভর্তির জন্য। উত্তরার টুইংকেল টটস স্কুলে সন্তানকে ভর্তি করিয়েছেন ফারজানা জামান। তিনি বললেন, ‘কোচিং সেন্টারগুলোতে কোমলমতি শিশুদের ওপর খুব বেশি চাপ দেওয়া হয়। কিন্তু এখানে যত্ন নিয়ে খেলার মাধ্যমে পড়ানো হয়ে থাকে। তাই এখানেই ভর্তি করিয়েছি ছেলেকে। ’ উত্তরার পরশমণি ল্যাবরেটরি স্কুলের ভাইস প্রিন্সিপাল নুরউদ্দিন সোহাগ বললেন, ‘সময় বদলেছে। পড়াশোনার ধরনও বদলেছে। জাতীয় শিক্ষা কার্যক্রমের নির্ধারিত বয়স ছয় বছর হলেও এখন ক্লাস ওয়ানে যে পাঠ্য বই দেওয়া হয়, তা বুঝতে অনেক শিশুরই বেগ পেতে হয়। তাই বাচ্চাকে আগে থেকে তৈরি করতে হয়। ’ মোহাম্মদপুরের রেড সান ডে কেয়ার অ্যান্ড প্রি-স্কুলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হালিদা পারভীন বলেন, ‘নববর্ষ, স্বাধীনতা দিবস কিংবা বিজয় দিবসের মতো অনুষ্ঠানগুলো ওদের নিয়েই উদ্যাপন করি। অনেক সময় এক বাচ্চা অন্য বাচ্চার টিফিনে ভালো বা মুখরোচক কিছু দেখলে নিজেরটা আর খেতে চায় না। তাই আমরা মায়েদের বলি, টিফিনে যেন খাবারের পরিমাণটা বেশি দেন। তাহলে অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করে খেতে পারবে। এতে করে বাচ্চাদের মধ্যে সহযোগিতার বন্ধন তৈরি হয়। ’


মন্তব্য