kalerkantho


অন্য কোনোখানে

হাওর-বাঁওড়ের দেশে

শামস শামীম

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



হাওর-বাঁওড়ের দেশে

মতিছিলা

যাচ্ছি হাওরে। সঙ্গী হতে ঢাকা থেকে এসে যোগ দিয়েছেন তরুণ নির্মাতা তাসমিয়াহ আফরিন মৌ ও ক্যামেরাপারসন সাজিব উদ্দিন রাজন ভাই।

খানিক বিশ্রামের পর রওনা হলাম সুনামগঞ্জ জেলার হাওরবেষ্টিত দিরাই ও শাল্লা উপজেলার উদ্দেশে।

সুনামগঞ্জ থেকে দিরাই পর্যন্ত সরাসরি সড়কপথে যাওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও এই বর্ষায় শাল্লায় যেতে হলে নৌকাই ভরসা। দিরাই থানার ভেতরে আমাদের মাইক্রোবাস রেখে থানা ঘাট থেকেই গস্তি নাওয়ে শুরু করি যাত্রা। এই জলযান হাওরের শৌখিন গেরস্তরা নিজেদের যাতায়াতের জন্য ব্যবহার করে থাকেন। শুধু তা-ই নয়, হাওর জনপদে নাইওরের গুরুত্বপূর্ণ এক অনুষঙ্গ এই নৌযান। শ্বশুরবাড়ি থেকে মেয়ে কিংবা আত্মীয়দের নাইওর আনতে পাঠানো হয়ে থাকে এই গস্তি।

আমাদের বহনকারী আনহার মিয়ার গস্তি নাও কালনী নদী থেকে কিছুক্ষণ পরই ভরাম হাওরে পড়ে। সূর্যরশ্মি হঠাত্ আগুন হয়ে ওঠে। ছাতা ছাড়া নাওয়ের ওপরে বসা দায়।

টলটলে পানি বেয়ে নৌকা এগিয়ে চলেছে। গেল মার্চ মাসে যখন শাহ আবদুল করিমের বাড়িতে গাড়ি নিয়ে এসেছিলাম, তখন সবুজের হাতছানি ছিল হাওরজুড়ে। কচি ধানগাছে ছিল দখিনে হাওয়ার শনশন গান। এবার আগাম তলিয়ে যাওয়ায় হাওরে থইথই পানি। হাওরের পানি যেন ফসলহারা কৃষকের অনিঃশেষ কান্নার কথা মনে করিয়ে দেয়।

সংগীতে একুশে পদকপ্রাপ্ত লোকসংগীতের মহাজন শাহ আবদুল করিম, ওস্তাদ রামকানাই দাস ও সুষমা দাসের এলাকা দিরাই। ওই এলাকার হাটে-ঘাটে, জলে-স্থলে যেন সুর ওড়ে। শাহ আবদুল করিমের বাড়ির ঘাটে যখন আমাদের গস্তি নাও ভেড়ে, তখন আমাদের কানে এসে বাজে অপার্থিব সুর। কী মায়ার টান! কণ্ঠ উজার করে গাইছেন বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের শিষ্য রুহি ঠাকুর ও তাঁর ভাগ্নে বাউল শাহ আবদুল তোয়াহেদ। বাউল করিম ও তাঁর স্ত্রী সরলার কবরের পাশের উঠোনে বসে মনের দুঃখে বাউল সম্রাটেরই গান কণ্ঠে তুলে নিয়েছেন তাঁঁরা। ফসলহারা কৃষকের আকুতি ঝরে পড়ছে তাতে। প্রকৃতির পরিবর্তন আর ফসলহানির কারণ পঞ্চাশের দশকেই আঁচ করতে পেরেছিলেন যুগসচেতন এই বাউল—‘হাওর এলাকায় থাকি আমরা কৃষাণ/হাড়ভাঙা পরিশ্রম করি ফলাই বোরো ধান/এসে বন্যার জল অকালে ডুবাইয়া নিল/হাওরের ফসল মানুষ হয়েছে পাগল/গরিবের নাই সহায়-সম্বল বড়ই নিদান। ’

চলার পথে খানিক বিরতি দিয়ে সাদা মেঘও যেন বাউলের গান শোনে। কিছুক্ষণ বাউল সম্রাটের বসতঘর, স্বামী-স্ত্রীর কবর দেখে আর শিষ্যদের সঙ্গে কথা বলে এবার শাল্লার উদ্দেশে নাও ছাড়লাম।

কালনী নদী পেরিয়ে আবার টাংনির হাওরে আমাদের গস্তি নৌকার ছুটে চলা শুরু হয়। টপাটপ ছবি তুলছেন রাজন ভাই। মৌ আপাও তাঁর অ্যানড্রয়েড মোবাইলে নীলজলের কুচি কুচি ঢেউ কখনো হিজল-কড়চের ছবি তুলছেন। শাহ করিমের বাড়ি থেকে রওনা হওয়ার পর সূর্যের তেজ কিছুটা কমতে শুরু করেছে। দিগন্ত বিস্তৃত হাওরে নীল জলের খেলা। মাঝেমধ্যে হাওরের কান্দায় (পাড় বা তীর) হিজল-কড়চের সারি মন কেড়ে নেয়। ডানাকাটা পরি হয়ে সৌন্দর্য বিলাচ্ছে ওগুলো।

হিন্দু অধ্যুষিত এই দুই উপজেলার প্রতিটি গ্রামেই রয়েছে শতবর্ষী মতিছিলা। এগুলো হচ্ছে মৃতদের স্মরণে আকাশচুম্বী ফলক। আকাশ ছোঁয়ার প্রত্যয় নিয়ে হাওরের পানিতে ডুবে থাকা মতিছিলা যেন মেঘের সঙ্গেও লুকোচুরি খেলছিল। গ্রামের কান্দা মাঠে দেবতারূপী প্রবীণ অনেক বৃক্ষও ডুবে আছে পানিতে। তার বেষ্টনীতে আছড়ে পড়ছে হাওরের আফাল (বড় বড় টেউ)। গ্রামের বাড়িগুলো হাওরের ঢেউয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। উত্তাল ঢেউ থেকে বাঁচতে বাঁশগাছ দিয়ে ভিটা টেকানোর চেষ্টা লক্ষ করার মতো।

নৌকা যখন বাহারা গ্রামের পাশে আসে তখন কাছের সোমেশ্বরী মন্দিরটি যেন মনে হচ্ছিল আকাশের সাদা মেঘ ভেদ করে নীলজলে স্নান করছে। বিকেলের কোমল আলোয় অদ্ভুত সুন্দর দেখাচ্ছিল এই গোলাকার মন্দিরটিকে। প্রতিবছর এখানের মাঠে সোমেশ্বরী দেবীর নামে মেলা বসে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসে হাজারো মানুষ। এই এলাকার নারীরা উত্সব করে সিঁদুর কেনেন মেলা থেকে। কিন্তু এখন থইথই পানি দেখে  বোঝার উপায় নেই এখানে চৈত্রে হাজারো মানুষ জমায়েত হয়।

কিছুক্ষণ পরই দাঁড়াইন নদীপাড়ের প্রায় ৪০০ বছর বয়সী দেবতারূপী ‘কড়চ’ বৃক্ষ দেখে থমকে যাই। চারদিকে ডালপালা বিছানো। বয়সের কারণে যেন চামড়া খসে পড়ছে। তবে চারদিকে জল থাকায় অনন্য লাগছে এই দেবতাবৃক্ষটিকে। বৃক্ষের পাতা পানিতে নাচছে যেন। ইস, এই নাচনে যদি শরিক হওয়া যেত! এলাকার মানুষ ‘ব্যাটা ঠাকুর শায়র’ নামের এই বৃক্ষটিকে সাধন-ভজন করে। পূজা-অর্চনা দেয়। জীবন ও সম্পদের জন্য প্রার্থনা করে তারা। বৃক্ষতলে দেবী কালী ও দুর্গার কয়েকটি প্রতিমার দেখা মিলল। আচারাদি পালনের নানা উপকরণও দেখা গেল বৃক্ষের গায়ে। মোমবাতি, শাঁখা-সিঁদুরের কৌটা পড়ে আছে বৃক্ষতলে। ওখান থেকে ১০ মিনিটের রাস্তা আমাদের গন্তব্যস্থল ঘঙ্গিয়ারগাঁও শাল্লা উপজেলা সদর। ততক্ষণে হাওরের গরম জল শান্ত হয়ে উঠছে। নীলচে ঢেউ চুপি চুপি হাসি দিয়ে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। হঠাত্ বিকট শব্দে নাওয়ের ইঞ্জিন গেল বিকল হয়ে। আনহার মিয়া ছুটে এসে এটা-সেটা নেড়ে-চেড়েও ইঞ্জিন সচল করতে পারল না। তেলের লাইন ব্লক হয়ে যাওয়ায় ইঞ্জিনের রোগ ধরতে পারছিল না আনহার। পরে অবশ্য তেলের লাইনের বাতাস বের করে স্টার্ট দেওয়ার পরই চলতে শুরু করল গস্তিখানা। এই ১৫-২০ মিনিট সময় ইঞ্জিনের ঘটঘট শব্দ ছাড়া চারদিকে জলের নাচন দেখলাম। দেখলাম মেঘ আর আকাশের মিতালি। প্রবীণ হিজল-কড়চ বৃক্ষগুলোর সৌন্দর্যও চোখ এড়ালো না।

দূর থেকে শাল্লা ডিগ্রি কলেজের ছাদের ওপর বেসরকারি মোবাইল ফোন কম্পানির টাওয়ারগুলো আমাদের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। অতি প্রাকৃতিক স্থানে নাগরিক পরিবেশের এই চিত্র দেখে মন খানিকটা খারাপই হয়ে গেল। কলেজের গিঞ্জি সড়ক পেরিয়ে সন্ধ্যার কিছুক্ষণ আগেই ডাকবাংলোয় এসে বসতে না বসতেই আকাশ ভেঙে অঝোরে বৃষ্টি নামে। বৃষ্টি থামলে পরেশ দাসের হোটেলে হাঁসের মাংস দিয়ে ডিনার সেরে রুমে ফিরি। কিছুক্ষণ পর হাসপাতালসংলগ্ন শাহিদ আলী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠটিতে পাকা বেঞ্চে এসে বসি। সামনে দিগন্ত বিস্তৃত হাওর। ঢেউ আছড়ে পড়ছে পাকা ঘাটে। মেঘঘন নিঝুম রাতে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে রুমে ফিরি। এরই মধ্যে এই গ্রামীণ শহর ঘুমিয়ে পড়েছে। শুরু হয় ঝিঁ ঝিঁ ডাক। কুপি বাতি নিয়ে হাওরে দাপিয়ে বেড়ানো জেলে নৌকাগুলো ধীরে ধীরে লোকালয়ে মিলিয়ে যায়। আমরাও হারিয়ে যাই ঘুমের রাজ্যে।

 বাউলরা আসছেন শাহ আবদুল করিমের বাড়িতে
কিভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে সরাসরি দিরাই শহরে আসা যায় মামুন ও শ্যামলী পরিবহনে। ভাড়া ৫৫০ টাকা। এ ছাড়া কিশোরগঞ্জ ও ইটনা থেকেও নৌকায় যাওয়া যাবে। শাল্লা কলেজ ও হাসপাতাল ঘাটে অনেক নৌকা থাকে। এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকায় হাওরে পুরো দিন ঘুরে বেড়ানো যাবে।

ছবি : লেখক


মন্তব্য