kalerkantho


অন্য কোনোখানে

গালেঙ্গার পথে

তামজীদ রহমান লিও   

১৪ মে, ২০১৮ ০০:০০



গালেঙ্গার পথে

গন্তব্যস্থল চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট বাসস্ট্যান্ড। এখানেই দলের অন্য সদস্যরা মিলিত হবে। ট্রেনে চড়ে আধো ঘুম আধো জাগরণ অবস্থায় যখন চট্টগ্রাম পৌঁছলাম, ততক্ষণে ভোরের আলোয় চারপাশটা বেশ পরিষ্কার। ব্যস্ত স্টেশন থেকে বেরিয়ে এসে সিএনজি চেপে রওনা দিলাম বহদ্দারহাট বাসস্ট্যান্ডের দিকে। পথে সঙ্গী হলো আগের এক ভ্রমণের টিমমেট চট্টগ্রামের সুমাইয়া। বাসস্ট্যান্ডে দেখা হয়ে গেল অপু ভাই, আক্তার ভাই, হেলাল ভাই ও রিয়াদ ভাইয়ের সঙ্গে। ছোট্ট করে পরিচয়পর্ব সেরে সবাই উঠে পড়লাম বান্দরবানগামী বাসে।

অনেক খোঁজাখুঁজির পর জানতে পারলাম আমরা যাচ্ছি বান্দরবানের রুমা উপজেলার গালেঙ্গা ইউনিয়নের এক গ্রামে। সাঙ্গু নদীর ভাঁজে লুকিয়ে থাকা এই গ্রামে খুব কম মানুষই গেছে, তখন উত্তেজনা যেন আরো কয়েক গুণ বেড়ে গেল।

বান্দরবান শহরে পৌঁছে সবাই পেট পুরে গরম চায়ের সঙ্গে নাশতা সেরে নিলাম। কেননা দুপুরের খাবার খেতে নাকি বিকেল গড়িয়ে যাবে। এখানে আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন মিলন ভাই, সজল ভাই আর দিয়া আপু। এরপর উঠে গেলাম আরেকটা বাসে। এটা আমাদের নামিয়ে দেবে গালেঙ্গার পাহাড়ের গায়ে।

বাস চলতে শুরু করল পাহাড়ি রাস্তা ধরে। অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝ দিয়ে এগোতে লাগল আমাদের বাস। দূরে পাহাড়ের চূড়ায় বেড়ে ওঠা ফুলে সজ্জিত কৃষ্ণচূড়ার গাছ মন ভরিয়ে দিল। পাহাড়গুলোর গায়ে জ্যামিতিক নকশায় লাগানো আনারস ও তামাকের সারি চোখে পড়ে। হু হু বাতাসে রাস্তার দুই ধারের গাছগুলো মৃদু দুলছিল। দেখতে দেখতে বাস চলে এলো গন্তব্যস্থলে। বাস থেকে নেমে আবিষ্কার করলাম পাকা সড়কের পাশ দিয়ে মাটি কেটে বানানো একটি রাস্তা। সেটা পাহাড় থেকে সোজা নিচে নেমে গেছে। অপু ভাই জানালেন, এটাই নাকি আমাদের পরবর্তী চলার পথ। মাথার ওপরে থাকা সূর্যটা বেশ তেতে আছে। এমন ভয়াবহ গরমে হাঁটা ধরলাম পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে। গোটা পঞ্চাশেক কদম যেতে না যেতেই পাশের ঝোপ থেকে অজানা অসংখ্য পোকামাকড়ের ডাক স্পষ্ট হলো। খানিকটা হাঁটার পর সবাই গরমে বেশ কাহিল হয়ে পড়লাম। পরক্ষণেই পাহাড়ের গায়ে দূরে এক জুমঘর চোখে পড়ল। সবাই মিলে ছুটলাম সেদিকে হালকা বিশ্রামের আশায়। জুমঘরে উঠেই কেউ মাচায় গা এলিয়ে দিল, আবার কেউবা পা ঝুলিয়ে বসে পড়ল। সঙ্গে থাকা পানি গরম হয়ে গেছে। গরম পানি খেয়ে কি আর তৃপ্তি মেটে। জুমঘরের নিচেই মাঝারি আকৃতির আনারসের বাগান। দুটি আনারস তুলে এনে খাওয়া শুরু করে দিলাম। যদিও কাঁচা, তবে রসাল। খাওয়াদাওয়া ও বিশ্রাম শেষে আবার হাঁটার পথ ধরে এগোতে লাগলাম। সুয্যি মামার মেজাজ ততক্ষণে আরো কড়া হয়ে উঠেছে। আর তাতেই সবাই পানি আর স্যালাইন ভাগাভাগি করে খেয়ে শেষ করে ফেললাম। হাঁটছি বুনো পথ ধরে আর দেখছি কত রংবেরঙের পাহাড়ি ফুল আর প্রজাপতির মেলা। আড়াই ঘণ্টা হাঁটার পর সবার পা দুটি বিদ্রোহ করে বসল। তবে কপাল আমাদের ভালোই বলতে হবে, কেননা তখন চোখে পড়ল ‘রিগ্রেখং’ নদী (মারমারা সাঙ্গুকে এই নামেই ডাকে)। এর মানে হচ্ছে একেবারে কাছেই আমাদের গন্তব্যস্থল। কোনোমতে বাগানপাড়ায় পৌঁছে এক মারমা দিদির কাছে পানি চেয়ে নিলাম। আর তাতেই যেন প্রাণ ফিরে পেলাম। পাশের এক মুদি দোকানে বসে টাটকা পাহাড়ি কলা দিয়ে প্রাথমিক ক্ষুধা মেটালাম। আরেকটু হেঁটে সামনে যেতেই স্থানীয় সবুর ভাই এসে আমাদের থাকার জায়গায় নিয়ে গেলেন।

জায়গাটার নাম হচ্ছে ‘ক্লাউড ইকো রিসোর্ট’। সবুর ভাইয়ের রান্না করা ডাল, ডিম, ভাত ও আলুভর্তা দিয়ে উদরপূর্তি করলাম। হেলাল ভাই ও সজল ভাই মিলে শখের তাঁবু টানিয়ে ফেললেন। ততক্ষণে বিকেল শেষের দিকে। সারা দিনের ক্লান্তি দূর করার জন্য সন্ধ্যায় পাঁচ-ছয়জন চলে গেলাম রিগ্রেখং নদীতে গোসল করতে। পাথর বিছানো রিগ্রেখং নদীর কোমর পানিতে নিজেকে ডুবিয়ে রাখতে বেশ লাগছিল। ততক্ষণে আকাশে চাঁদ আলো ছড়িয়ে নিজের অবস্থান জানান দিচ্ছে। রাতে সবাই মিলে গোল হয়ে বসলাম পাশের বিজিবির হেলিপ্যাডে। সে রাতে আকাশে ছিল ত্রয়োদশী চাঁদ। চারপাশ চাঁদের আলোয় রুপালি বর্ণ ধারণ করেছে। দূরে কোনো এক দুঃখী তক্ষক তার সঙ্গীকে ডেকেই চলেছে। সুনসান রাতে সেই তক্ষকের ডাক নির্লজ্জের মতো রাতের নীরবতাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিচ্ছিল। সেসব তুচ্ছ করে চলছিল আমাদের গল্প-আড্ডা।

রাত বাড়তেই সবাই শণের তৈরি ঘরে ফিরে খাওয়াদাওয়া সেরে নিলাম। কেউ কেউ আবার পাহাড়ের আরো ওপরের এক মাচাঘরে চলে গেল রাত জেগে পাহাড়ি পূর্ণিমা ও ভোরের সূর্যোদয় উপভোগ করতে। আক্তার ভাই অবস্থান নিলেন তাঁবুতে আর বাকি সব শুয়ে পড়লাম শণের ঘরটায়। সারা রাত মরার মতো ঘুমিয়ে পরদিন সকালে ঘুম ভাঙে। সকালের নাশতার পর অপু ভাইকে নিয়ে বের হলাম প্রকৃতিকে ক্যামেরাবন্দি করতে। দেখতে দেখতে ফেরার সময় হয়ে এলো। সবুর ভাই জানান দিলেন ঘাটে মাঝি চলে এসেছে। সবাই ব্যাগ গুছিয়ে নৌকায় উঠে পড়লাম। নৌকা চলতে শুরু করল রিগ্রেখংয়ের সরু পানিপথ ধরে। সবাই মুগ্ধ হয়ে দুই পাশের পাহাড়ি গ্রাম আর শ্বাসরুদ্ধকর প্রকৃতি দেখতে দেখতে অনেকটা পথ পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম বলিপাড়ায়। সেখানে হালকা নাশতা করে জিপে চেপে রওনা দিলাম সোজা বান্দরবান শহরের উদ্দেশে। এর মধ্যে হুট করে আকাশ কালো হয়ে এলো। শুরু হলো প্রবল বাতাস। কালো মেঘাচ্ছন্ন আকাশের সঙ্গে বিশাল পাহাড়টা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে উপভোগ করলাম সেই অদ্ভুত সৌন্দর্য। সন্ধ্যায় বান্দরবান শহরে যখন পৌঁছলাম তখন বৃষ্টি পড়ছে গুঁড়ি গুঁড়ি।

ছবি : লেখক

 

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে বান্দরবান যাওয়ার অনেক পরিবহন আছে। বাস ছাড়ে কলাবাগান, ফকিরাপুল থেকে বিভিন্ন সময়ে। বান্দরবান নামার পর যেতে হবে থানচির বাসস্ট্যান্ডে। থানচিগামী বাসে চড়ে নামতে হবে বলিবাজারে। ভাড়া জনপ্রতি ১৬০ টাকা। তারপর নৌকাযোগে গালেঙ্গা।


মন্তব্য