kalerkantho


অন্য কোনোখানে

আর্টেমিসের মন্দিরে

ডা. মো. মিজানুর রহমান   

৯ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



আর্টেমিসের মন্দিরে

সেলসাসের লাইব্রেরি

তুরস্কের মেয়েরা দেখতে অনেক সুন্দর। আর ইজমিরের মেয়েরা নাকি দেখতে আরো বেশি সুন্দর? তুরস্কের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েদের আবাসস্থল সেই ইজমিরে দুপুরের একটু আগে পৌঁছলাম। এখানে এসেছি ‘দেবী আর্টেমিস মন্দির’ দেখতে। ইজমির আসলে এক বন্দরনগরী। ইস্তান্বুল ও আংকারার পর তুরস্কের তৃতীয় বৃহত্তম শহর। এজিয়ান সাগরপারের এই শহরের জন্ম আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে। আর এখানে মানুষের বসতি শুরু হয়েছিল তারও অনেক আগে, সেই ব্রোঞ্জ যুগে।

হোটেল আগেই ঠিক করা ছিল। তিনতারকা হোটেল। পরিবেশটাও ছিমছাম। সারা রাত ভ্রমণ শেষে হোটেলে সবাই যখন ফ্রেশ হয়ে বিশ্রাম নিতে ব্যস্ত, আমি তখন ব্যাগ রেখে ছুটলাম এজিয়ান সাগর দেখতে। তুরস্কে সব কিছুর মধ্যেই একটা পরিকল্পনা ও সৌন্দর্যের ছাপ আছে। এই সাগরপাড়ও ব্যতিক্রম নয়। সুন্দর করে বাঁধানো। সারিবদ্ধভাবে লাগানো ফুলের গাছগুলোতে নানা রঙের বাহারি ফুল ফুটে আছে। দেখলেই মনটা ভালো হতে বাধ্য। ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ খেয়াল করলাম, দূরে ছোট ছোট জাহাজ চলাচল করছে। কোনো কিছু না ভেবেই সাত লিরা দিয়ে টিকিট কেটে একটি জাহাজে উঠে পড়লাম। সমুদ্রের নীল জলরাশি কেটে জাহাজ চলছে। আর সাদা গাংচিলের দল যেন আমাদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। প্রকৃতির এই সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি কিছু ছবিও উঠালাম। বিপদে পড়লাম ঘাটে জাহাজ ভিড়ানোর পর। কারণ এখানে অনেক ঘাট। কোন ঘাট থেকে উঠেছি, সেটি তো খেয়াল করে রাখিনি। তুরস্কে বড় একটা সমস্যা—এখানে বেশির ভাগ মানুষ ইংরেজির ‘ই’ও জানে না। অনেক কষ্ট করেও কাউকে কিছু বোঝাতে না পেরে ভুল জায়গায় নেমে পড়লাম। তবে মজার ব্যাপার হলো, ভুল জায়গায় নেমে ক্ষতি না হয়ে বরং লাভই হলো। কারণ এখানেই ইজমিরের বিখ্যাত ক্লক টাওয়ার। ১৯০১ সালে তৈরি এই টাওয়ার অসংখ্য কবুতরের আবাস। তুরস্কে কেউ এই কবুতর তো খায়ই না, উল্টো সবাই এসে কবুতরকে খাওয়ায়। নৌকা ভ্রমণ ও ক্লক টাওয়ার দর্শন সেরে গেলাম দুপুরের খাবার খেতে। তুরস্কের খাবারের নাম জগেজাড়া। কিন্তু আমার মতো ভেতো বাঙালির কাছে তা প্রায় অখাদ্য। এখানে মানুষ ভাতের পরিবর্তে খায় পাউরুটি। আর মাথাহীন মাছ খায় অর্ধসিদ্ধ। তুরস্কের খাবারগুলো দেখতে যেমন চোখ জুড়ানো, তেমনি সুন্দর তাদের পরিবেশনা। তবে এখানকার কাবাব সত্যিই অসাধারণ।

বিকেলবেলা এজিয়ান সাগরে সূর্যাস্ত দেখতে গিয়ে অবাক হলাম আরেকবার। সাগরপাড়ে শত শত মানুষ ছিপ নিয়ে বসে গেছে মাছ ধরতে। কেউ একা এসেছে। কেউ বা এসেছে পরিবারসহ। মাছও উঠছে পটাপট। ইজমির দর্শন সেরে পরদিন সকালে রওনা দিলাম এফেসিসের উদ্দেশে। এখানেই আছে প্রাচীন যুগের এক সপ্তাশ্চর্য ‘দেবী আর্টেমিস মন্দির’। পথে পড়ল পাহাড়ি গ্রাম সিরিঞ্চি। সিরিঞ্চি যাওয়ার আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথটি অতুলনীয়। দুদিকে সারি সারি পাহাড়। আর সেসব পাহাড়ে আঙুর ও কমলার বাগানগুলো দেখার মতো। এই গ্রামে বসতি খুবই কম। মূলত এখানে আঙুর থেকে বিভিন্ন ধরনের ওয়াইন তৈরি করা হয়। আর এখানকার ওয়াইন তুরস্কের মধ্যে বিখ্যাত। এখানে এলে মনেই হয় না তুরস্ক প্রায় শতভাগ মুসলমানের দেশ। এখানে হালকা নাশতা সেরে এফেসিসে যখন পৌঁছলাম, তখন সকাল গড়িয়ে প্রায় দুপুর। মিউজিয়াম কার্ড ব্যবহার করে সবাই মিলে এফেসিসে ঢুকেই ছবি তোলা শুরু করে দিলাম। তুরস্কে আছে দুটি সপ্তাশ্চর্য। তার একটি এফেসিস। অন্যটি ইস্তান্বুলের ‘হাজি সোফিয়া’। এটি মধ্যযুগের সপ্তাশ্চর্য। প্রাচীন যুগের সপ্তাশ্চর্য এফেসিস হচ্ছে এক প্রাচীন গ্রিক-রোমান শহর। বর্তমানে এটি তুরস্কের ইজমির প্রদেশের সেলকুক জেলাশহর থেকে দুই কিলোমিটার দূরে। প্রায় আট হাজার বছর আগেও এখানে মানব বসতি ছিল। আর এখানেই আছে দেবী আর্টেমিসের মন্দির, সেলসিয়াসের লাইব্রেরি, অ্যাসপেন্ডসের থিয়েটার, পাহাড়ের ওপর ঈসা বে মসজিদ, অটোম্যান এস্টেট, গ্র্যান্ড দুর্গ, ভার্জিন মেরির ভবনসহ অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা। এগুলোর মধ্যে প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে ৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রিকদের বানানো ৩৭৭ বাই ১৫৫ ফুট মাপের সম্পূর্ণ মার্বেল পাথরের তৈরি আর্টেমিসের মন্দির। এ মন্দির তৈরি করতে সময় লেগেছিল ১২০ বছর। আর্টেমিস ছিলেন গ্রিকদের শিকারের দেবী। বিভিন্ন সময় এই মন্দির ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রতিবারই তা মেরামত বা পুনর্নির্মাণ করা হয়। তবে মজার ব্যাপার হলো, হেরোস্ট্রাটাস নামে এক ব্যক্তি বিখ্যাত হওয়ার উদ্দেশ্যে ৩৫৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মন্দিরটিতে আগুন লাগিয়ে দেয়। কিন্তু বিখ্যাত হতে গিয়ে উল্টো নিজেই বেঘোরে প্রাণ হারায়। তার নাম উচ্চারণ করলেও মৃত্যুদণ্ড ছিল অবধারিত। এ জন্য একটি কথা প্রচলিত আছে—‘হেরোস্ট্রাটিক ফেম বা খ্যাতি’। এই মন্দিরের এখন কিছু নেই দেখার মতো। বিচ্ছিন্নভাবে মন্দিরের দু-একটি পিলার এখন দাঁড়িয়ে আছে।  

আর্টেমিস মন্দিরের পর এফেসিসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হলো সেলসাসের লাইব্রেরি। প্রাচীন যুগের তৃতীয় বৃহত্তম এই লাইব্রেরি ১১৪-১১৭ সালে রোমানদের শাসনামলে তৈরি হয়। এখানে ১২ হাজার প্রাচীন পুঁথি সংরক্ষণ করা হতো। এ ছাড়া ২০ হাজারের বেশি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন অ্যাসপেন্ডসের থিয়েটার রোমান সাম্রাজের আরেকটি উল্লেখযোগ্য কীর্তি। বিভিন্ন সময় সংস্কার করায় এটি আজও অক্ষত অবস্থায় আছে।

আমার দলের সবাই মিলে হৈ-হুল্লোড় করতে করতে একে একে সব কিছুই দেখতে লাগলাম। আর বিস্মিত হতে থাকলাম এগুলোর নির্মাণশৈলী দেখে। এত দিন গ্রিক পৌরাণিক কাহিনি এবং রোমান ও অটোমান সাম্রাজ্যের বীরত্বের ইতিহাস শুধু বই-পুস্তকে পড়েছি। আর এখন তা স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য হলো।

ছবি : লেখক ও ইন্টারনেট

এখানেই ছিল আর্টেমিসের মন্দির

ইজমিরের এজিয়েন সাগরের তীরে লেখক

 



মন্তব্য