kalerkantho


মেধাতালিকায় আমাদের দুই

জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে যুক্তরাজ্যে আয়োজিত বায়োলজি অলিম্পিয়াডের ২৭তম আসরে অংশ নিয়েছিল বাংলাদেশ। আগে ভালো করতে না পারলেও এবার মেধাতালিকার প্রথম তিনজনের দুজনই বাংলাদেশের। জানাচ্ছেন মীর হুযাইফা আল মামদুহ

৯ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



মেধাতালিকায় আমাদের দুই

মাইশা মুনাওয়ারা ও নাজমুস সাদাত, মাঝে অধ্যাপক রাখহরি সরকার

এক বছর পরিদর্শক হিসেবে থাকতে হয়েছে। দেখতে হয়েছে কার্যক্রম।

তারপর অংশগ্রহণ। প্রথমবারের আয়োজনে অতটা ভালো করতে পারেনি বাংলাদেশ দল। এবার মেধাতালিকার শুরুতেই আছেন মাইশা মুনাওয়ার, তৃতীয়  নাজমুস সাদাত। গোল্ড, সিলভার আর ব্রোঞ্জ পদকের পর যাঁরা এগিয়ে থাকেন, তাঁদের নিয়েই এ তালিকা।
গেল বছর অক্টোবরের দিকে পুরো বাংলাদেশে আঞ্চলিক পর্যায়ে আয়োজিত হয় বায়োলজি অলিম্পিয়াড। এতে অংশ নিয়েছিল প্রায় ১০ হাজার প্রতিযোগী। ৩টি ক্যাটাগরিতে হয় আঞ্চলিক অলিম্পিয়াড। অষ্টম শ্রেণি, দশম শ্রেণি আর উচ্চমাধ্যমিক। এতে বরাবরই ভালো করে শুধু উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা।
এবার আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা থেকে বাছাই করে এক হাজারজনকে ঢাকায় জাতীয় পর্যায়ে আবার প্রতিযোগিতা করতে হয়েছিল। জাতীয় পর্যায় থেকে সেরা ২০ জনকে নিয়ে আয়োজিত হয়েছিল বায়ো ক্যাম্প। ৫ দিনেরও এই ক্যাম্পে ২০ জনকে দেওয়া হয়েছিল নিবিড় প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষণ শেষে পরীক্ষা। তাতেই মূল অলিম্পিয়াডের জন্যে নির্বাচন করা হয় ৪ জনকে। তারপর আবার মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ।
এই চারজনকেই মূল পর্বের জন্য নিবন্ধন করতে হয়। এদের সঙ্গে জুরি হিসেবে থাকেন দুজন, যাঁরা এঁদের আরো ভালো করে প্রস্তুত করবেন। আর মূল অলিম্পিয়াডের প্রশ্নপত্র যাচাই করবেন।
কিন্তু দুর্ভাগ্য, বাংলাদেশ থেকে এবার যে চারজন নির্বাচিত হয়েছিল, তাঁদের দুজন ভিসাসংক্রান্ত জটিলতার কারণে যুক্তরাজ্যে যেতেই পারেননি। তারা হলেন টার্কিশ হোপ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের মোহাম্মদ বায়েজিদ মিয়া ও এসএফএক্স গ্রিন হেরাল্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের নাফিজ ইশমান আহমেদ। অলিম্পিয়াডে যেতে পেরেছিলেন অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের মাঈশা মুনাওয়ারা এবং ম্যানগ্রোভ স্কুলের নাজমুস সাদাত। জুরি হিসেবে ছিলেন শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিকস অ্যান্ড প্লান্ট ব্রিডিং বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর হারুনুর রশীদ ভুঁইয়া ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানি বিভাগের অধ্যাপক রাখহরি সরকার। জুরিদের কাজ মূলত অলিম্পিয়াডের সংগঠনের সঙ্গে প্রতিযোগীদের যোগাযোগ স্থাপন ও প্রশ্নপত্র দেখে দেওয়া। তাঁরা পরীক্ষায় পরিদর্শক হিসেবেও কাজ করেছেন।
পরীক্ষা হয়েছে দুই ভাগে—তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক। থিওরিতে সবাই মোটামুটি ভালোই করে। গোল বাধে প্রাকটিক্যালে। যে শিক্ষার্থীরা ব্যবহারিকে দক্ষ, তারাই ফল ভালো করে। বাংলাদেশ এদিকটায় পিছিয়ে। বায়োলজি অলিম্পিয়াডের জন্য আলাদা কোনো ল্যাব না থাকাই এর কারণ। তবে ওই চারজন মূল অলিম্পিয়াডের আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানি বিভাগের ল্যাবে মাসখানেক প্রশিক্ষণ নিয়েছিল। তবে ওটা যথেষ্ট ছিল না।
পরীক্ষা হয়েছে তিন বিষয়ে—উদ্ভিদবিজ্ঞান, প্রাণ রসায়ন ও ডেভেলপমেন্টাল ফিজিওলজি। বাংলাদেশের প্রতিযোগীরা বোটানি ও বায়োকেমিস্ট্রিতে ভালো করলেও পরের বিষয়টির জন্য প্রস্তুত ছিল না মোটেও। মূলত প্রাণীর জীবনপ্রবাহ নিয়ে ওই বিষয়। এর প্রাক্টিক্যালে এনিম্যাল ডাইসেকশন অর্থাত্ প্রাণীদেহ কাটা-ছেঁড়া করতে হয়।
তার পরও মোটের ওপর আশাপ্রদ ফল করেছে বাংলাদেশ। সেরা তিন থেকে দশমিক ৫ নম্বর কম পেয়ে মাইশা অর্জন করেন মেধাতালিকায় প্রথম স্থান।
অধ্যাপক রাখহরি সরকার বললেন, ‘এই শতক বায়োলজির শতক। যে রাষ্ট্র এতে উন্নয়ন ঘটাতে পারবে, তারা এগিয়ে থাকবে। দুঃখজনক হলো, বাংলাদেশ এখানে ব্যাপক পিছিয়ে। আমাদের কোনো রাষ্ট্রীয় কিংবা অন্য কোনো স্পন্সর ছিল না। নিজেদের খরচে অলিম্পিয়াডে অংশ নিয়েছি। বাংলাদেশের ভালো ল্যাব ফ্যাসিলিটিও নেই। এদের জন্য আমার বিভাগের ল্যাব ছেড়ে দিয়েছিলাম। তবু এরা ভালো করেছে। আরেকটু যত্ন নিয়ে কাজ করতে পারলে আর রাষ্ট্রীয় সহায়তা পেলে আমরা সেরা হয়ে ফিরতে পারব। ’
ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরাই কেন যেতে পারছে? এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানালেন, ‘এ দেশের বায়োলজি শিক্ষার মান আন্তর্জাতিক মানের নয়। বাংলা মাধ্যমের সিলেবাসটা অনেক পিছিয়ে। তাই সিলেবাস বদলাতে হবে। তখন তারাও যেতে পারবে। ’
মাইশা মুনাওয়ারা প্রমি অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুল থেকে সদ্য এ-লেভেল শেষ করেছেন। ক্লাস এইট থেকেই বিভিন্ন অলিম্পিয়াডের সঙ্গে তিনি জড়িত। প্রথমবারের বায়োলজি অলিম্পিয়াডেও অংশ নিয়েছিলেন। ভালো করতে পারেননি বলে আবার শুরু করেছিলেন পড়াশোনা। এবার মিলল সাফল্য। এ ছাড়াও তিনি গণিত ও রসায়ন অলিম্পিয়াডে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করেছেন। ল্যাব সুবিধার ঘাটতিকে দুষলেন তিনিও। এর মাঝে সুখবরটা হলো যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত এমআইটিতে বায়োলজিতে চান্স পেয়েছেন তিনি। সেখানে পড়তে যাবেন শিগগিরই।
নাজমুস সাদাত ম্যানগ্রোভ স্কুল থেকে এ-লেভেল করেছেন। ছেলেবেলায় বিতর্ক করতেন। কিন্তু যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যাপার এলো, দেখলেন, সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চান্স পাওয়া সহজ করে দেয় এসব অলিম্পিয়াড। তারপর থেকেই নিতে থাকেন প্রস্তুতি। ফিজিকস অলিম্পিয়াডে অংশ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করেছেন। আর বায়োলজিতে তো মূল মঞ্চেই লড়েছেন দেশের হয়ে। পরিশ্রমের ফলও মিলেছে। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ডে চান্স পেয়েছেন সাদাত


মন্তব্য