kalerkantho


চৌকস

এই নাহলে যমজ বোন!

দেখতে যেমন এক, তেমনি কাজে-কর্মেও! কেউ কারোর চেয়ে কম যায় না একচুলও। জাসিয়া ও তানিসার গল্প শোনা যাক জুবায়ের ইবনে কামালের কাছ থেকে

৯ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



এই নাহলে যমজ বোন!

দুই বোন জাসিয়া জাফরিন ও তানিসা তাসনিম। পড়ছে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণিতে।

সব কিছুতেই যেন তারা এক। দুজনেরই মাথায় সবার আগে আসে একটা চিন্তা—যা-ই করি না কেন, মানুষের জন্য যেন কিছু করতে পারি। তাই যে আইডিয়াই মাথায় আসুক না কেন, একসঙ্গে সেটা করা চাই।
শুরুতেই ধরা যাক স্কাউটিংয়ের কথা। ছোট থাকতেই শখ ছিল স্কাউটিং নিয়ে। জাসিয়া এমনটাই জানাল। ‘ছোট থাকতে দেখতাম স্কুলের আপুরা প্রতি বৃহস্পতিবার স্কুল ইউনিফর্ম না পরে অন্য ড্রেসে আসত। সঙ্গে কত জিনিসপাতি! কী সব কাজ যেন করত। এসব দেখেই কৌতূহল জাগে। পরে ক্লাস সিক্সে উঠেই স্কাউটে যোগ দিই। আমাদের স্কাউটে যাওয়ার আরেকটি কারণ আছে। আমরা মানুষের উপকার করতে পছন্দ করি। আর স্কাউটের মূলমন্ত্রই হলো প্রতিদিন কারো না কারো উপকার করা। ’ তানিসার অবশ্য অন্য একটা কারণ আছে স্কাউটে ঢোকার। ‘মুক্তিযোদ্ধাদের মতো আমারও ইচ্ছা দেশের জন্য বড় কিছু করার। সেই সময় ভাবতাম আমি তো অনেক ছোট। দেশের জন্য কিভাবে কী করব? স্কাউটে সেই সুযোগ পেতেও পারি ভেবে আগ্রহ জন্মায়। যখন শুনলাম আমার বোন যোগ দিচ্ছে, তখন তো আর সুযোগ হাতছাড়া করার প্রশ্নই আসে না। ’
স্কাউটিংয়ের পথ অতটা সুগম ছিল না দুই বোনের। অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে তাদের। তবে পিছু হটেনি। লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে সনদ নেওয়া, যা কিনা প্রত্যেক স্কাউটেরই স্বপ্ন। কিন্তু এর জন্য পাড়ি দিতে হয় কঠিন সব ধাপ। অনেক দূর এগিয়েছিল জাসিয়া-তানিসা। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার পর সাঁতার পরীক্ষা। ছোট থাকতে পানি দেখে ভয় পাওয়া দুই বোন অদম্য আত্মবিশ্বাস নিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে সাঁতার উতরে যায় ঠিকই, কিন্তু পরের ধাপে মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি জাসিয়া। ‘মানসিকভাবে একটু দুর্বল ছিলাম বটে। তাই ভাইভা খারাপ হয়েছিল। ’ এদিকে নিজের বোনকে রেখে উত্তীর্ণ হয়েও পরের ধাপে যায়নি তানিসা, যা হওয়ার একসঙ্গেই হবে নাকি! এখন আত্মবিশ্বাসী যমজ জুটি নতুন করে আবার শুরু করেছে স্কাউট যাত্রা।
সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও গলায় গলায় মিল দুজনের। নাচের কথাই ধরা যাক। জাসিয়া-তানিসার নাচ শুরু ক্লাস ওয়ান থেকে। মাঝে কিছুদিন থেমে থাকলেও তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নেয়। স্কুলে এখন নাচে রীতিমতো নাম করে ফেলেছে দুই বোন। অন্যরা একক বা দলগত নাচ করলেও জাসিয়া-তানিসা জুটিকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি কেউ। তারা একসঙ্গেই নাচে। স্কুলের অনুষ্ঠানে নৃত্যশিল্পীদের তালিকায় দুই বোনের নামই থাকে সবার ওপরে। শুধু স্কুলের অনুষ্ঠানে নয়, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিসহ জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও তাদের দুজনকে একসঙ্গে নাচতে দেখা যায়।
এখন আবার গান শিখছে দুজনই। সঙ্গে টুকটাক গিটারও বাজাচ্ছে। অভিনয়েও পাকা দুজন। সেই দ্বিতীয় শ্রেণিতে থাকতেই সিসিমপুরে অংশ নিয়েছিল তারা। এ ছাড়া বেসরকারি একটি টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠানেও অংশ নিয়েছিল। অবশ্য পড়ালেখার চাপে অভিনয় নিয়ে আর এগোয়নি।
যমজ দুই বোনের আছে আরেক গুণ। দুজনই ভাস্কর্য বানায়! স্কুলের ক্লাব একাত্তর অবিনাশী সত্তার আয়োজনে ভাস্কর্য বানিয়ে পুরস্কারও জিতেছে জাসিয়া। এবার অবশ্য তাকে ছাড়িয়ে গেছে তানিসা। পরপর তিন বছর একটানা ভাস্কর্য তৈরিতে পুরস্কার পেয়েছে তানিসা।
এদিকে যমজ হওয়ার বিড়ম্বনাও আছে নাকি। তবে সেটা মজার। ‘স্কাউটে ভাইভা পরীক্ষার সময় জাসিয়ার কিছুক্ষণ পরেই আমার ডাক পড়ল। পরীক্ষক আমাকে দেখেই রেগে গেলেন; বললেন, তুমি না একটু আগে এসেছ? আবার পরীক্ষা দেওয়ার শখ হয়েছে! প্রথম প্রথম তো স্কুলের শিক্ষকরাও ঠিকমতো চিনতেন না। একজনের দোষে আরেকজন বকুনি কত খেয়েছি, তা নাই বা বললাম। ’
তবে যত যা-ই করুক, আপাতত সবার ওপরে পড়ালেখাই সত্য। দুজনের অনেক মিল থাকলেও স্বপ্নে রয়েছে খানিকটা ভিন্নতা। তানিসা স্বপ্ন দেখে সে অনেক বড় লেখক হবে। আর জাসিয়ার ইচ্ছা, সে যা-ই হোক না কেন, যেন সমাজটাকে বদলে দেওয়ার মতো যোগ্য হয়।


মন্তব্য