kalerkantho


ভিজিট এক টাকা

দুই বছরের ‘কিউরিস’ অনেক কাজ করেছে। মেডিক্যালের চিকিত্সক ও ছাত্র-ছাত্রীদের এই সংগঠন এক টাকায় রোগী দেখে, দুর্যোগে ত্রাণ দেয়, মেয়েদের বয়ঃসন্ধিকালীন সমস্যার সমাধান করে। তাঁদের নিয়ে লিখেছেন আয়েশা আলম প্রান্তি

৯ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



ভিজিট এক টাকা

বর্ষার এক বিকেল। ফুটপাতে হাঁটছিলেন ডা. তানভীর ইসলাম।

হঠাত্ এসে হাত পাতল সাত-আট বছরের একটি ছেলে। চোখে তার জল, শীর্ণ শরীরের হাড়গুলো বেরিয়ে আছে। প্রচণ্ড শ্বাসকষ্টে ভুগছে টোকাই ছেলেটি। ওকে কয়েকটি টাকা দিয়ে বাড়ির পথ ধরলেন তিনি। সেই রাতেই এই ছেলেটি বদলে দিল ডেল্টা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের ফার্মাকোলজির এই প্রভাষকের জগত্—‘সাহায্য নয়, ওদের মতো মানুষের চিকিত্সা প্রয়োজন। ’ ২০১৫ সালের জুনে তাঁর মেডিক্যালের কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রীকে নিয়ে গড়ে তুললেন কিউরিস (কিউরেটিভ রিহ্যাভিলিটেটিভ ইনিশিয়েটিভ ফর সোসাইটি)। লাতিন শব্দ কিউরিসের ইংরেজি মানে ‘হেলথ কেয়ার’, বাংলায় ‘স্বাস্থ্যযত্ন’।

শুরুতে ডেল্টা মেডিক্যালে ডা. তানভীরের অফিসরুমই ছিল তাদের মিটিংরুম। পরে শ্যামলীর জহুরী মহল্লায় খোলা মাঠের পাশে অফিস নেওয়া হলো।

২০১৫ সালের ডিসেম্বরে ঢাকার আগারগাঁও বস্তিতে প্রথম হেলথ ক্যাম্প পরিচালনা করল ‘কিউরিস’। সুবিধাবঞ্চিত ও ছিন্নমূল শিশুদের জন্য একে একে কমলাপুর বস্তি, শাহবাগ, সদরঘাট, তেজগাঁও, সাভারসহ ঢাকা ও ঢাকার আশপাশে ৫০টি হেলথ ক্যাম্প করেছে তারা। প্রতিটি ক্যাম্পে দুজন পাস করা চিকিত্সক ও পাঁচ-ছয়জন মেডিক্যালের ছাত্র-ছাত্রী চিকিত্সাসেবা দেন। ক্যাম্পগুলোতে অসুস্থ শিশুদের বিনা মূল্যে রোগের দাওয়াই দেওয়া হয়, সুস্থ শিশুদের চেকআপ করা হয়। কী ধরনের রোগী আসে—এই প্রশ্নের জবাবে স্বেচ্ছাসেবী সোনিয়া ঘোষ বললেন, ‘খোসপাঁচড়া, চুলকানি, দাঁতের ক্ষয়রোগে আক্রান্ত রোগীই বেশি থাকে। ’ আরেক স্বেচ্ছাসেবী ফাতেমা খাতুন বললেন, ‘সিফিলিস, গনোরিয়া রোগে আক্রান্ত কিশোরও পেয়েছি। ’ মুমতাহিনা মৌ জানালেন, ‘অপরিষ্কার জীবন, অস্বাস্থ্যকর খাবার ও না ফুটিয়ে পানি পানের ফলে ওরা ডায়রিয়া, আমাশয়, জন্ডিস ও টাইফয়েডে বেশি ভোগে। ’ ফারহানা সরকার ও আবদুর রাজ্জাক বললেন, ‘এসব ক্যাম্পের মাধ্যমে আমরা সাধারণ মানুষের কষ্টগুলো অনুভব করতে পেরেছি। ’        
রোগ নিরাময়ের পাশাপাশি এসব ছিন্নমূল রোগীর মধ্যে সচেতনতা তৈরির জন্য কিউরিসের অনেক কর্মসূচি আছে। মনিরা জানালেন, ‘তেজগাঁও বস্তিতে হেপাটাইটিস বি ক্যাম্পেইনসহ নানা কার্যক্রমে আমরা দেখেছি, রোগী এমনকি তার মা-বাবাও  রোগের ব্যাপারে উদাসীন। ’ ঢাকা জজ কোর্টের শিক্ষানবিশ আইনজীবী হাফিজুর রহমানও বললেন, ‘আমাদের অনেক পথশিশু মাদকাসক্ত। আমরা তাদের এসবের কুফল বোঝাই, নানা রোগের চিকিত্সা দিই। ’
কিউরিসের ‘দাঁতের সুরক্ষা কর্মসূচি’র শুরু হয়েছিল সাভারে। স্বেচ্ছাসেবক নিয়াজ আহমেদ জানালেন, ‘ক্যাম্পগুলোতে কয় বেলা ও কিভাবে দাঁত ব্রাশ করতে হবে শেখাই, আমরা দাঁতের ক্ষয় রোধের কারণ জানাই। ’ দেশ টিভির অনুষ্ঠান উপস্থাপিকা ও দন্ত বিশেষজ্ঞ সিফাত রহমান, সাফেনা উইমেন্স ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতালের ছাত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস ও নাঈমা আলী, বুশরা ইসরাতসহ আরো অনেকে এই কর্মসূচিতে যুক্ত আছেন।
কিউরিসের অনন্য কার্যক্রম ‘বয়ঃসন্ধির সন্ধিবিচ্ছেদ’। যার শুরুর গল্পটি কোনো দিনও ডেল্টা মেডিক্যালের ছাত্রী সামান্থা সাবেদ ভুলতে পারবেন না। তিনি বললেন, ‘গত বছর আমরা কমলাপুর বস্তিতে ক্যাম্প করছিলাম। হঠাত্ ১২-১৩ বছরের একটি মেয়ে লাজুক মুখে আমাকে কিছু বলতে চাইল। এক দূরে নির্জনে নিয়ে বলল, তার ক্যান্সার হয়েছে। কিভাবে বুঝলে? বলল, রক্ত ঝরছে। ’ সেদিনই ডা. তানভীরকে ঘটনাটি বললেন তিনি। সেই থেকে গ্রাম ও মফস্বলের স্কুলছাত্রীদের বয়ঃসন্ধিকালীন সমস্যা ও সমাধান জানানোর জন্য চালু হলো ‘বয়ঃসন্ধির সন্ধিবিচ্ছেদ’। প্রথম ক্যাম্পটি হয়েছিল ২০১৬ সালের অক্টোবরে সিলেটের হরিপুরের হরিপুর সরকারি প্রাথমিক বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখানে শ্রাবণী আহমেদ, জেনি ইসলামসহ পাঁচজনের একটি দল গিয়েছিল। তাঁদের একজন সামান্থা বললেন, ‘ওদের মধ্যে অনেক কুসংস্কার আছে। পিরিয়ডের পর স্কুলের এক ছাত্রী রিন্টিকে খারাপ বাতাস লাগবে বলে স্কুলে যেতে দেওয়া হতো না। এমনকি গোসলও করতে দেওয়া হতো না। ’ আরেক স্বেচ্ছাসেবী রিশা রানী বিশ্বাস বললেন, ‘পিরিয়ড যে একটি সাধারণ বিষয়, অনেক মেয়েই তা জানে না। এ নিয়ে কথা বলতেও তারা লজ্জা পায়। এই সময়ে তাদের কী ধরনের খাবার বেশি খেতে হবে, কিভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে, পেট ব্যথার চিকিত্সা, ন্যাপকিন কোথায় ফেলতে হবে—আমরা জানিয়েছি। ’ মীম ফেরদৌস বললেন, ‘অস্বাস্থ্যকর কাপড়, তুলা ব্যবহার করলে জরায়ুমুখের ক্যান্সার হতে পারে, সেসবও বলেছি। কর্মশালার পর ওরা অনেক প্রশ্নের জবাব জানতে এসেছিল। ’ ঢাকা, বরিশাল, কুষ্টিয়ার স্কুলেও কর্মসূচিটি চলেছে। তবে অনুদানের অভাবে এখন এটি বন্ধ আছে।
‘কিউরিস’ বিভিন্ন দুর্যোগেও মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। সর্বশেষ তারা হাওরে বন্যায় আক্রান্তদের ত্রাণ, ওষুধ, চিকিত্সাসেবা দিয়েছে। স্বেচ্ছাসেবী আনিকা সাত্তার বললেন, ‘আমরাই প্রথম হাওরে ত্রাণ নিয়ে গিয়েছি। ’ রিফাত বিন নাঈম ও ফাহিম ফয়সাল জানালেন, “ ‘আলোর পথে যাত্রা’র মাধ্যমে ৩শ পরিবারে দুই দফায় ত্রাণ ও ওষুধ বিলিয়েছি। ”
মানবতার সেবা করতে গিয়ে অনেক ঘটনা জমেছে কিউরিসের সদস্যদের ঝুলিতে। ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পানি বিক্রেতা এতিম সাকিবের সঙ্গে হেলথ ক্যাম্পে পরিচয় হয়েছিল অপু সাহাদের। এরপর হঠাত্ জানলেন, হাসি-খুশি এই কিশোর দুর্ঘটনায় পড়েছে। তিনি ও ফাইয়াজ আহমেদ মিলে ওকে ডেল্টা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে এলেন। হাঁটতে পারছিল না সে, ব্যান্ডেজ বাঁধা, দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। ডা. পরশমণি রোগী দেখে বললেন, ওর ইনফেকশন হয়েছে। অপারেশন না হলে পা কেটে ফেলতে হতে পারে। ফলে সাকিবের অপারেশন করা হলো। প্রতিদিন এই ছেলেটিকে যত্ন করে খাওয়াতেন ডা. তামান্না আশরাফী। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ফিরে গেলে চিকিত্সা হবে না বলে হাসপাতাল থেকে রিলিজ করে দেওয়ার পর তাকে ডা. ফারহানা আক্তার ও তাঁর স্বামী শুভ্র নীল তাদের বাসায় নিয়ে গেলেন। তিনি মেডিক্যাল কলেজে পড়তে গেলে তাঁর শাশুড়ি ওর দেখাশোনা করতেন। সন্ধ্যায় সবাইকে গান শোনাত ছেলেটি। লুডু খেলতে খুব ভালোবাসত। ভিডিও গেমস কিনে দেওয়ার পর খুশিতে কেঁদে ফেলেছিল। সুস্থ হয়ে সে ফিরে গেছে।
এসব কাজ করে পুরস্কারও পেয়েছে কিউরিস। এ বছর স্পার্ক বাংলাদেশ তাদের ‘পিয়ার রিভিউ’ ও ‘অডিয়েন্স চয়েজ’ অ্যাওয়ার্ড দিয়েছে। তবে এখনো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছেন তাঁরা। তাঁদের ওয়েবসাইটও বন্ধ করে দিয়েছেন। স্বেচ্ছাসেবক রিনি রেজা বললেন, ‘প্রচারণার টাকাগুলো মানুষের কাজে ব্যবহার করলে অনেকে উপকার পাবে বলে আমাদের ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ’ তবে ফেসবুকে https://www.facebook.com/ curisfoundation লিখে সার্চ দিলে তাঁদের কার্যক্রম জানা যাবে। সাহায্য করতে চাইলে ফোন করতে পারেন ০১৭৪২০৯৪৬৭৯ নম্বরে। কিউরিসের প্রেসিডেন্ট ডা. তানভীর ইসলাম বললেন, ‘আমাদের ৭০ জন স্বেচ্ছাসেবী আছেন। তাঁরা মেডিক্যাল কলেজগুলোতে পড়েন। তাঁরা জনপ্রতি মাসে ১০০ টাকা চাঁদা দেন। এ ছাড়া হূদয়বান মানুষের সাহায্যেও কিউরিস চলে। তবে এত অল্প টাকায় সব কাজ করা সম্ভব নয়। আগ্রহীরা মানবতার সেবায় আমাদের সাহায্যে এগিয়ে এলে ভালো হয়। ’ তিনি আরো বললেন, “ঢাকার ১২ শেখেরটেক, আদাবর—এই ঠিকানায় আমরা ‘ডাক্তারবাড়ি’ নামে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার চালু করতে যাচ্ছি। সেখানে অল্প খরচে রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। শ্যামলীতে আমাদের ‘এক টাকার ডাক্তার’ নামে একটি চেম্বারে রোগীদের এক টাকায় চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে। এটির ঠিকানা হলো—৩৭/২৪ বি, ব্লক-এফ, জহুরী মহল্লা, শ্যামলী। ” তিনি স্বপ্ন দেখেন—ধীরে ধীরে দানের টাকায় বস্ত্রহীনদের জন্য বস্ত্রব্যাংক, নারীদের জন্য স্বাবলম্বী হওয়ার কর্মসূচি, বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা ও শিক্ষাবৃত্তি চালু করবেন।


মন্তব্য