kalerkantho


প্রথম ডিএনএ বারকোডিং ল্যাব

লেখা : আদীব মুমিন আরিফ

৯ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



প্রতিটি প্রাণীরই কোষের ক্রোমোজমের ডিএনএতে নির্দিষ্ট ও আলাদা ডিএনএ কোড নম্বর বা জিন সিকোয়েনসিং থাকে। যে উপায়ে সেই প্রাণীর জীবের কোড নম্বর জানা হয়, তাকে ‘ডিএনএ বারকোডিং’ বলে।

বারকোডিংয়ের মাধ্যমে প্রাণীর নামকরণ ও শ্রেণিবিন্যাস করা হয়। বিশ্বে যত প্রাণী আছে, তাঁর ৮০ ভাগই কীটপতঙ্গ। অথচ এই বিরাট কীটজগতের অর্ধেক সম্পর্কেই মানুষ এখনো জানে না। কারণ সেগুলোর বারকোডিং করা হয়নি। আমাদের দেশে তো নয়ই। অথচ কোন পোকা ফসলের জন্য ভালো, কোনটি কোন জীবাণু ছড়ায়, কোনটি থেকে ভালো ওষুধ আবিষ্কার করা যাবে, সেসব কীটের ডিএনএ বারকোডিংয়ের মাধ্যমে জানা যাবে। ফলে উপকারী ও অপকারী পোকা-মাকড় চিহ্নিত করা এবং সেগুলো সম্পর্কে জানার জন্য তাদের বারকোডিং খুব গুরুত্বপূর্ণ। দেশের প্রথম পোকা-মাকড়ের ডিএনএ বারকোডিং গবেষণাগারটি কিছুদিন আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপন করা হয়েছে। এটির পুরো নাম—“অ্যানহান্সমেন্ট অব অ্যানটোমোলজিক্যাল রিসার্চ ক্যাপাবিলিটি ইউজিং ডিএনএ বারকোডিং’। আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণা কারখানায়। গবেষণাগারের পরিচালক প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. আবদুল জব্বার হাওলাদার। তিনি প্রকল্পের সাব-প্রজেক্ট ম্যানেজার। ডেপুটি সাব-প্রজেক্ট ম্যানেজার একই বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মনোয়ার হোসেন। প্রাণিবিদ্যার অধ্যাপক ড. আবু ফয়েজ মো. আসলাম ও অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশারও গবেষণাগারের দায়িত্বে আছেন। দেশের প্রথম এই কীটপতঙ্গের ডিএনএ বারকোডিং ল্যাবটি বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় ইউজিসির তত্ত্বাবধানে তৈরি হয়েছে। গবেষণাগারটি নিয়ে বলতে গিয়ে ড. মনোয়ার হোসেন বললেন, ‘এখানে গবেষণার মাধ্যমে আমরা অপরিচিত পোকা-মাকড় চিহ্নিত করব। উপকারী পোকা-মাকড়ের বংশবৃদ্ধি ঘটানো হবে। অপকারী পোকা-মাকড়গুলো দমনের উপায় চিহ্নিত করে সেগুলো রোধের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পোকা-মাকড়ের বিবর্তন নিয়েও গবেষণা করা হবে। সুন্দরবন অঞ্চলের পোকা-মাকড়, প্রজাপতি, ফড়িং, মথ, মৌমাছিসহ অন্যান্য কীটপতঙ্গ নিয়ে এই গবেষণাগারে বিস্তারিত গবেষণা করা হবে। যা এত দিন করা সম্ভব হয়নি। ’ পোকা-মাকড় গবেষণার জন্য এখানে আছে আধুনিক উপকরণ—ইলেকট্রিক মাইক্রোসকোপ, কোনো পদার্থের ঘনত্ব অনুসারে সেটি আলাদা করার জন্য সেন্ট্রিফিউজার, কোষ ছোট ছোট করে কেটে নমুনা সংগ্রহের জন্য মাইক্রোটম মেশিন, কোনো যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্ত করার জন্য স্টেবিলাইজার, ডিএনএ-এর মান নির্ণয়ের জন্য ন্যানো ড্রপ, আসল ডিএনএ-এর নমুনার প্রতিরূপ বানানোর জন্য থার্মাল সাইক্লার বা পিসিআর, নমুনা সংরক্ষণের জন্য ইনকিউবেটর, অতি সূক্ষ্ম ডিএনএ-এর চিত্র দেখার জন্য ফ্লুরোসেন্স মাইক্রোসকোপ। ব্যাকটেরিয়া-ভাইরাসকে নিজস্ব পরিবেশে লালন-পালনের জন্য শেইকার ইনকিউবেটর, প্রতিরূপের মান ঠিক বা কেমন আছে জানার জন্য জেল ডকুমেন্টেশন সিস্টেম, অতিবিশুদ্ধ পানি ব্যবস্থাপনার জন্য আল্ট্রা পিওর ওয়াটার সিস্টেম আছে। গবেষণাগারে প্রথমে যে পোকা-মাকড়ের বারকোডিং করা হবে, সেটির নমুনা সংগ্রহের জন্য সেই পোকার শরীরের সামান্য রক্ত বা কোনো কোষের অংশ সংগ্রহ করে ডিএন আলাদা করা হবে। ন্যানো ড্রপের মাধ্যমে ডিএনএ-এর গুণমান নির্ণয় করা হবে। কাঙ্ক্ষিত মান পাওয়া গেলে থার্মাল সাইক্লারের মাধ্যমে তার বহু প্রতিরূপ তৈরি করা হবে। এরপর জেল ডকুমেন্টেশনে মান যাচাই করে সিকোয়েনসিং করা হবে ও তথ্যগুলো জাপানের ডিএনএ ডাটা ব্যাংক অব জাপান (ডিডিবিজে) বা যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন জিনব্যাংকে (এনসিবিআই) রাখা তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে। সেগুলোর সঙ্গে যদি প্রাণীটির তথ্যগত মিল না পাওয়া যায়, তাহলে সেটি নতুন প্রাণী হিসেবে গণ্য হবে। কোনো কীটপতঙ্গের বায়ো ইনফরমেটিক অ্যানালিসিস বা জিনগত তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে সেটি সম্পর্কেও অনেককিছু জানা যাবে। ডিএনএ বারকোডিং ল্যাবে অনার্স, মাস্টার্স, এমফিল ও পিএইচডি পর্যায়ে ১০ জন গবেষণা করছেন। ল্যাবের তত্ত্বাবধানে বারকোডিং কর্মশালাও হচ্ছে। ল্যাবটি নিয়ে বলতে গিয়ে সেটির প্রধান ড. আবদুল জব্বার হাওলাদার জানালেন, ‘শুধু প্রাণিবিদ্যাই নয়, জীববিজ্ঞানসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো বিভাগের শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রীরা এখানে কাজ করতে পারবেন। এই গবেষণাগারে দেশের কৃষি ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পোকা-মাকড়ের ডিএনএ-এর বারকোডিং করা হবে। প্রতিবছর দুবার ডিএনএ বারকোডিং সম্মেলনের আয়োজন করবে এই গবেষণাগার। ’


মন্তব্য