kalerkantho


চন্দ্রনাথ ঘুরে খৈইয়াছড়া

মীর মাইনুল ইসলাম   

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



চন্দ্রনাথ ঘুরে খৈইয়াছড়া

বাঁশবাড়িয়া সৈকতের লোহার ব্রিজ

একসঙ্গে সাগর, পাহাড় ও ঝরনা দেখব বলে সিদ্ধান্ত হলো—যাব চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে। সেখানে যাওয়ার আরেক উদ্দেশ্য—বৃহস্পতিবার রাতে রওনা দিয়ে শুক্রবার থেকে শনিবার রাতের ট্রেনে চড়ব।

ফলে রবিবার সকালে যে যার ক্যাম্পাসে পৌঁছে যাব, ক্লাসেরও ক্ষতি হবে না। ফলে ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে রাত সাড়ে ১০টার চট্টগ্রামের লোকাল ট্রেন থামার সঙ্গে দৌড়ে উঠে গেলাম। নামব ফেনী, ভাড়া জনপ্রতি ৯০ টাকা।

রাতভর থেমে থেমে বৃষ্টি হলো। গল্প ও আড্ডায় মশগুল আমরা। ভোর ৬টায় বৃষ্টি মাথায় নিয়ে স্টেশনে নামলাম। খাবারের হোটেল খুঁজে পেটপূজা সেরে নিশ্চিন্তে ডেমু ট্রেনে চড়লাম। ছোট আকারের এই রেলগাড়িগুলো খুব দ্রুত ছোটে। ফলে বাঁয়ের সবুজ পাহাড়গুলো মুহূর্তেই পিছিয়ে যাচ্ছে।

তুমুল বৃষ্টিতে ঝরনাগুলো থেকে প্রবল বেগে পানি নামছে। দূরের এই মায়াময় দৃশ্যগুলো মুগ্ধ করে দিল। সকাল ৮টায় চলে এলাম স্টেশনে। শহরে হোটেল ঠিক করে ব্যাগ রাখলাম। সীতাকুণ্ডে থাকার মতো হোটেল খুব কম।

এই দলে আছি ৯ জন। আমি, খালিদ হাসান সোহাগ ও নিয়ামুল কবীর উৎস মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। আমি ব্যবসায় প্রশাসন, উৎস ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি, সোহাগ পরিসংখ্যান; দেবরাজ দেব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ, আশিক মাহমুদ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা, শামস তাবরিজ ও নিলয় সাহা করটিয়া সা’দত কলেজে ফিন্যান্স ও হিসাববিজ্ঞান; সাব্বির আহমেদ শিহাব সরকারি তিতুমীর কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগে পড়ে। সঞ্জীবন চক্রবর্তী ভারতের  বেঙ্গালুরুর জৈন বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র। এবার যাচ্ছি চন্দ্রনাথ মন্দির। অটোভাড়া জনপ্রতি ১৫ টাকা। চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়ায় এ মন্দির। এখানে সতী দেবীর দক্ষিণহস্ত (ডান হাত) পতিত হয়েছিল বলে বিশ্বাস করেন সনাতন ধর্মের লোকজন। তাঁরা একে বলেন, ‘সীতার কুণ্ড মন্দির’। পাহাড়ের নিচ থেকে এক হাজার ৮০০ সিঁড়ি বেয়ে মন্দিরে পৌঁছতে হয়। আস্তে আস্তে সিঁড়িগুলো ওপরের দিকে উঠছে, দুই পাশের গাছগুলো পেরিয়ে যাচ্ছি। বৃষ্টি-বাদলার দিন বলে সিঁড়িগুলো খুব পিছল। চূড়ায় উঠে সব কষ্ট নিমেষেই উড়ে গেল। দুই পাশের সাদা মেঘের মাঝে মন্দির, চারদিকে সবুজ পাহাড়ের সারি। পাখির মতো যেন আকাশে ভেসে আছি। পুলিশ ফাঁড়ির পাশের টং দোকানে চা খেলাম। ছোট্ট মন্দিরটিতে নিয়মিত পূজা হয়। শিবরাত্রি উপলক্ষে অনেকে তীর্থ করতে আসেন। মেঘমালার কাছাকাছি বলে সারা বছরই মন্দিরের দেয়াল, চত্বর ও ভেতরটি ভেজা থাকে। সে জন্যও এটি পূর্ণময়। মন্দির ঘুরে সাবধানে খাড়া সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলাম। আশপাশের জোঁক থেকেও সাবধান থাকতে হলো।

দুপুরের খাওয়া সেরে বাঁশবাড়িয়া সৈকতে যেতে সিএনজিতে চড়লাম। সৈকতটি বাঁশবাড়িয়া বাজার থেকে সামান্য সামনে। চার-পাঁচ কিলোমিটার লম্বা সৈকতের পাশে বিরাট ঝাউবন। কয়েক কিলোমিটার দূরে অনেকগুলো জাহাজ নোঙর ফেলে আছে। একটু দূরে লোহার ব্রিজ। তাতে উঠে সাগরের ঠাণ্ডা পানিতে পা ভেজালাম। ঝাউবনে আড্ডা দিতে দিতে সূর্যাস্ত দেখা হলো। রাতে হোটেলে ফিরে ঘুম দিয়ে সকালে নাশতা সেরে  খৈইয়াছড়ার ১২টি ঝরনা জয় করতে বেরোলাম। ২৫ টাকা করে লেগুনাভাড়া দিয়ে বড়তাকিয়া, এরপর পাঁচ কিলোমিটার কাদামাখা পাহাড়ি পথে যাত্রা শুরু হলো। পাশ দিয়ে ঝিরি বয়ে যাচ্ছে। ঘণ্টাখানেক চলার পর খৈইয়াছড়ার প্রথম ঝরনায় এলাম। আকারে এটি বেশ বড়, বিরাট পাহাড় বেয়ে ঝরনার পানি নামছে। বনের মধ্যে প্রবল ঠাণ্ডা পানিতে মনের সুখে ভিজলাম। মিনিট দশেক পর পাহাড়ের পাথরে পা রেখে, দড়ি বেয়ে বেয়ে পরে ঝরনায় গেলাম। এটিও অগভীর, তবে অনেক ছোট। আশপাশের পাথর খুব পিচ্ছিল। তৃতীয় ও চতুর্থ ঝরনাও প্রায় এক রকম, ধাপে ধাপে ওপরে উঠছে। পঞ্চম ঝরনাটিও খুব ছোট। সেটির পাশে দাঁড়িয়ে নিচের ঝরনাগুলো দেখলাম। ষষ্ঠ ও সপ্তম ঝরনা কাছাকাছি। অষ্টম থেকে দশম ঝরনাও কাছাকাছি। তবে দশম ঝরনাটি সবচেয়ে খাড়া, পানির গতিও বেশি। ১২তম ঝরনার পাশে দাঁড়িয়ে পুরো খৈইয়াছড়া বনাঞ্চল  দেখলাম। দূরের পাহাড়ও চোখে পড়ল। ভারি বর্ষণ বলে এতে পানির গতি খুব বেশি। ঘণ্টা তিনেকের অভিযান শেষে গোসল সেরে ফেরার পথ ধরতে হলো। বনে  জোঁক অনেক বলে সাবধানে নামছি। এরপর সীতাকুণ্ড শহর বেড়ালাম। ছোট্ট শহরটির যেকোনো দিকে তাকালেই পাহাড় দেখা হয়, চারদিকে সবুজের সমারোহ। মানুষগুলো অমায়িক। খাবারের দাম বেশ কম। রাতে ফিরতি পথে বাসে রওনা হলাম।


মন্তব্য