kalerkantho


রক্তযোদ্ধা

৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



রক্তযোদ্ধা

দিনাজপুরে একটি সিএনজি দুর্ঘটনা ঘটল। মধ্যবয়সী এক নারীর কোমর থেকে পা পর্যন্ত রক্ত ঝরতে লাগল। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে দ্রুত ঢাকার একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। রোগী দেখে চিকিৎসকরা বললেন, তাঁর উন্নত চিকিৎসার জন্য ২০ ব্যাগ এবি পজিটিভ রক্ত প্রয়োজন। শুনেই ঘাবড়ে গেলেন রোগীর আত্মীয়স্বজন। এত রক্ত তাঁরা কোথায় পাবেন? ফেসবুকের মাধ্যমে donatebloodbd.com-এর সাহায্য নিলেন। সুব্রত ও তাঁর বন্ধুদের উদ্যোগে প্রয়োজনীয় রক্ত জোগাড় হলো। বেঁচে গেলেন তিনি।

আলোচিত এই ব্লাড ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা সুব্রত দেব। কিভাবে এর শুরু? সুব্রত সেই গল্প বলতে গিয়ে নিজেও আবেগে আপ্লুত হয়ে গেলেন, ‘২০০৪-২০০৫ সালের কথা। তখন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে প্রথম সেমিস্টারে পড়ি। ক্যাম্পাসে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। রক্ত দেব বলে এগিয়ে গেলাম। তবে স্বেচ্ছাসেবকরা পরীক্ষার পর ওজন কম জানিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দিলেন না। সেদিনই প্রতিজ্ঞা করলাম, নিজে রক্ত দিতে না পারলেও সাধারণ মানুষকে রক্তদান ও গ্রহণে সাহায্য করব। সিদ্ধান্ত নিলাম, রক্তদাতাদের খুঁজে বের করতে ওয়েবসাইট বানাব। কিছুদিন পরে ওয়েব ডেভেলপমেন্ট কোর্স করলাম।’ আরো অনেক কিছু করার পর, নানা মানুষের সঙ্গে আলাপ করে ২০১৩ সালের ২৪ জানুয়ারি জন্ম নিল ‘www.donatebloodbd.com’। প্রথম সপ্তাহে পরিচিতদের অনুরোধ করে ছয়জন রক্তদাতা জোগাড় করে ফেললেন তিনি। তবে বারবার ফেসবুকে পোস্ট করেও তেমন সাড়া পেলেন না। সেই দুঃখ এখনো ভুলতে পারেন না, ‘ঘুরে বেড়ানোর ছবি দেন, রেস্টুরেন্টে  খাওয়ার ছবি দেন, আড্ডার ছবিও অনেকে পোস্ট করেন। সেগুলোয় অনেক লাইকও পড়ে। কিন্তু রক্তদানে কারো উৎসাহ নেই। তাতে আমি দমে যাইনি। নিজের কাজ করতে লাগলাম। ধীরে ধীরে সাইটে স্বেচ্ছায় রক্তদাতার সংখ্যা বাড়তে লাগল।’

রক্তদাতা ও গ্রহীতার এই অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এখন তিন হাজার ৬৬২ জন স্বেচ্ছায় রক্তদাতা আছেন। গত সাড়ে চার বছরে দেড় কোটিবার সাইটে ভিজিট হয়েছে, প্রতিদিন ভিজিট হয়েছে পাঁচ হাজারবার! ভিজিট করে বিভিন্ন গ্রুপের রক্তদাতার সন্ধান নিয়েছেন সবাই। আগ্রহী রক্তদাতারা রক্তের গ্রুপ লিখে এখানে নাম তালিকাভুক্ত করতে পারেন।

ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার পাশাপাশি তাঁরা আরো অনেক কাজ করেন। ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ও ক্যাম্পাসে রক্তদানের জন্য সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করেন, লিফলেট বিতরণ করেন। সুব্রত বললেন, ‘রক্ত দিলে অসুস্থ হয়ে যাবেন, শারীরিক দুর্বলতা বা রক্তশূন্যতা তৈরি হবে—কর্মসূচিগুলোতে মানুষের এমন অমূলক ভয়গুলো দূর করি; রক্তদানের উপকারী দিক সম্পর্কে তাঁদের উৎসাহিত করি। তাঁদের বলি—নিয়মিত বিরতিতে রক্ত দিলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে, হৃদরোগ ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমে, রক্তদান দেহে মাত্রাতিরিক্ত আয়রন সঞ্চয় প্রতিরোধ করে। নিয়মিত রক্তদানের মাধ্যমে বিনা খরচে শরীরে কোনো অসুবিধা আছে কি না সেই পরীক্ষাও হয়।’ তাঁদের এসব কাজের ফলে এখন অনেকেই রক্ত দিচ্ছেন। তাঁদেরই একজন জাহিদ হাসান। তিনি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএর ছাত্র। তিনি এ পর্যন্ত ১০ বার রক্ত দিয়েছেন, দুবার প্লাটিলেট দান করেছেন।

রক্তদাতারা তাঁদের রোগীদের খুঁজে পাওয়ার জন্য ২০১৫ সালের ৯ ডিসেম্বর ‘রক্তদানের অপেক্ষায় বাংলাদেশ’ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপও চালু করেছেন সুব্রত। এখন তাতে এক লাখ ৫২ হাজার ৩৫৮ জন সদস্য আছেন। রক্তদাতা ও গ্রহীতাকে তাৎক্ষণিক সাহায্য দেওয়ার জন্য ২০১৬ সালের ১৪ এপ্রিল তিনি দেশের প্রথম রক্তদানের কল সেন্টার চালু করেছেন। ‘donatebloodbd.com’ নামের এই কলসেন্টারে প্রতিদিন দুজন কর্মী সকাল ৮টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত রক্তদাতা ও গ্রহীতাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করেন। কলসেন্টারের মাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ জন রোগীকে রক্ত সংগ্রহ করে দেওয়া হয়। এ পর্যন্ত দুই হাজার ৩৭৯ জন রোগীকে কলসেন্টারটি থেকে সহযোগিতা করা হয়েছে। দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে যে কেউ রক্তের প্রয়োজনে ০১৭৫৬৯৬৩৩০৮, ০১৭৪৮৩০৬০২৭ নম্বরে ফোন করতে পারেন। এটি ১৫ জন শুভাকাঙ্ক্ষীর আর্থিক সহযোগিতায় পরিচালিত হয়। সুব্রত বললেন, ‘১৬ কোটি মানুষের এই দেশে বছরে ৯ লাখ ব্যাগ রক্ত দরকার। এত ব্যাগ রক্ত জোগাড় করা কোনো কঠিন কাজ নয়, শুধু আমাদের রক্তদানের মানসিকতা প্রয়োজন।’



মন্তব্য