kalerkantho


এ এক মজার ভুবন

শিশুদের মধ্যে সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটাতে নানা কোর্স করায় ‘কিডস টাইম’। তাদের আছে ২০০ ছাত্র-ছাত্রী। তাদের পড়ান বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪ জন শিক্ষক। অন্য রকম এই স্কুলটি ঘুরে এসে লিখেছেন শাওন আবদুল্লাহ

১১ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



এ এক মজার ভুবন

ঢাকার গুলশান-১-এ আছে ‘সিঙ্গাপুর স্কুল কিন্ডারল্যান্ড’। স্কুলটির নিচতলার রুমটিতে তিনটি ফ্লোরম্যাট পাতা। প্রতিটিতে তিনটি শিশু ও একজন করে শিক্ষক বসে আছেন। ওদের আশপাশে ছড়ানো রং, তুলিসহ আঁকার অনেক উপকরণ। তারা মজার মজার ছবি আঁকছে। যেমন একটি শিশু টোকাইয়ের ছবি এঁকে দিয়াশলাইয়ের কাঠি দিয়ে ওর খাড়া চুল বানিয়েছে। আরেকজনের সজারুর রংটি লাল। পিঠের খাড়া কাঁটাগুলো দিয়াশলাইয়ের কাঠি দিয়ে তৈরি। পায়ের মোজায় কাগজ সেঁটে শুঁয়োপোকা বানিয়েছে অন্যজন। আইসক্রিমের কাঠি দিয়ে বিমান বানিয়েছে একটি শিশু।

একজন নিজে গল্প লিখেছে, সেটির চরিত্র অনুসারে পাপেট বানিয়েছে। একটু পর পাপেটের অভিনয় করে সে অন্যদের তাক লাগিয়ে দিল। তাদের এই স্কুলের নাম ‘কিডস টাইম’। শিশুরা সবাই চার থেকে ১০ বছরের। শুক্র-শনিবার ক্লাস হয়। দুই ব্যাচে সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা, বিকাল সাড়ে তিনটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত ক্লাস চলে।

নুবারের এক হাতে সবুজ কাগজ, অন্য হাতে আঠা মাখানো। দ্বিতীয় শ্রেণির এই ছাত্রটি খুব ব্যস্ত। সে বলল, ‘কাগজ কেটে সূর্য মামা বানিয়েছি; চোখ, নাক, মুখ, কান—সবই দিয়েছি।’ সূর্য তৈরির কৌশলও সে শিখিয়ে দিল, ‘ভাইয়া বলেছে, প্রথমে গোল করে কাগজ কেটে সূর্য মামা বানাতে হবে। ত্রিভুজের মতো কাগজ কেটে নাক, খুব ছোট গোল করে কাগজ কেটে চোখ দিতে হবে।’ রাফিন কেজি টুতে পড়ে। আধো আধো বুলিতে বলল, ‘নানা রঙের কাগজ কেটে জোড়া লাগিয়ে  কাগজের হারিকেন বানিয়েছি। কাগজ জোড়া দিয়ে হ্যান্ডেল বানিয়েছি।’

তাদের জন্য আছে এক বছরের কোর্স। সেটি পার হলে ছয় মাসের অ্যাডভান্স কোর্স। এরপর তাদের নিয়ে একটি মজার অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েশন বা স্নাতক ডিগ্রিধারীদের মতো করে তারা নিজেরা হ্যাট তৈরি করে পরে আসে। তাদের জন্য খুব সুন্দর সার্টিফিকেট তৈরি করা হয়। তাদের কাজগুলো অভিভাবক, শিক্ষক ও অন্য বন্ধুদের সামনে তুলে ধরা হয়। সবার সামনে তাদের কাজের প্রশংসা করা হয়। যাতে পরেও তারা এই ধরনের কাজ করতে থাকে।

এসব ছেলে-মেয়েদের শিক্ষকরা সবাই সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। মাশকাওয়াত হাসান আলভী নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে বিবিএ তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। কিভাবে শিক্ষক হলেন? উত্তরে তিনি বললেন, ‘তিন মাসের প্রশিক্ষণ নিয়েছি। তাতে আলাদা ভাবনা নিয়ে বেড়ে ওঠা শিশুদের সঙ্গে কিভাবে ব্যবহার করতে হবে, মিশতে হবে, ওদের বুঝতে হবে, বোঝাতে হবে—সবই প্রশিক্ষণ পেয়েছি। আসলে শিশুদের মতো করে তাদের সঙ্গে মিশতে হয়, গল্প করতে হয়—এটিই আমাদের মূল শিক্ষা ছিল।’  তিনি জানালেন, ‘চার থেকে ১০ বছরের এই শিশুদের সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধান ও নীতিবোধ গড়ে তোলার জন্য কিডস টাইমে বেশ কয়েকটি কোর্স আছে। সেগুলোর মধ্যে ক্রিয়েটিভ ডিজাইন অ্যান্ড আর্ট কোর্সে তারা আঁকতে শেখে, স্টোরি টেলিংয়ের মাধ্যমে গল্প বলতে শেখে, ক্রাফটিংয়ে নানা ধরনের হস্তশিল্প তৈরি করতে শেখে, রোবটিকসের মাধ্যমে রোবট বানায়, ‘পাপেট অ্যান্ড রোল প্লে’র মাধ্যমে পাপেট তৈরি করে অভিনয় করতে শেখে।’ ছয় মাস ধরে তিনি কিডস টাইমে শিক্ষকতা করছেন। নিজেও অনেক কিছু শিখেছেন, নিত্যনতুন আইডিয়া পেয়েছেন। তিনি বললেন, ‘প্রতিটি শিশু অন্য রকমভাবে ভাবে, খুব সরল ওরা, তাদের সঙ্গে মিশে আমার ধৈর্য অনেক বেড়েছে।’ নাবিলা ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ (আইইউবি)-এর ইইইতে (ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং) পড়েন। শিশুদের সঙ্গ ভালো লাগে বলে তিনি শিক্ষকতা করছেন। তিনি বললেন, ‘তাদের ওপর আমরা কোনো কিছু চাপিয়ে দিই না, ভুলগুলো শুধরে দিই মাত্র। কারো গল্পে বানান, কারো বাক্য ভুল লেখা, কারো ছবিতে রং মাখানো ভুল হলে ঠিক করে দিই। তারা যেন সব সময় মনের মতো করে কাজ করতে পারে, সে উৎসাহ দিই।’

‘লাইট অব হোপ’ নামের স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার অন্যতম প্রতিষ্ঠান এই ‘কিডস টাইম’। লাইট অব হোপের প্রধান নির্বাহী ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা ওয়ালিউল্লাহ ভূঁইয়া জানালেন, ঢাকার ধানমণ্ডি, গুলশান-১, উত্তরা, বনানী, মিরপুর ডিওএইচএস ও চট্টগ্রাম শাখায় তাঁদের প্রায় ২০০ ছাত্র-ছাত্রী ও ১৪ জন শিক্ষক আছেন। তাঁরা সবাই ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কলেজের অনার্সের ছাত্র-ছাত্রী। তা ছাড়া নর্থ সাউথ, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ (এআইইউবি), ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড টেকনোলজি (আইইউবিএটি), ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভের (ইউডা) ছেলে-মেয়েরাও এখানে শিক্ষকতা করেন।’ তিনি জানালেন, প্রত্যেক শিক্ষককেই মাস শেষে তাঁরা সম্মানী প্রদান করেন।

কিভাবে লাইট অব হোপের শুরু? ওয়ালিউল্লাহ ভূঁইয়া বললেন, “ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (আইইউটি) থেকে ইইই বিভাগ থেকে অনার্স পাস করে জার্মানিতে এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্টে ‘ডিএএডি’ বৃত্তি নিয়ে মাস্টার্স করতে গিয়েছিলাম। সেখানেই বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এলাকার বেশির ভাগ স্কুলে দিনের আলো পৌঁছে না বলে তাদের জন্য সৌরশক্তিচালিত শ্রেণিকক্ষ বানানোর পরিকল্পনা করলাম। প্রকল্প অনুসারে, বিদ্যুিবহীন ৩০ হাজার স্কুলে সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে মাত্র ৬০ ওয়াটের বাতি জ্বলবে। সৌরশক্তিতে ল্যাপটপ চালানো যাবে, প্রজেক্টরের মাধ্যমে ক্লাস নেওয়া হবে। শিশুদের জন্য আলোকিত, আনন্দময় এই শিক্ষা প্রকল্প ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত কম্পিউটার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘ডেল’র ‘ডেল এডুকেশন চ্যালেঞ্জ’-এ সারা বিশ্বের ৮১৬টি প্রজেক্টের মধ্যে তৃতীয় হয়। আমরা দুই হাজার ৫০০ ডলার পুরস্কার পাই। সেই টাকা দিয়েই ২০১৪ সালের মে মাসে ‘লাইট অব হোপ’ যাত্রা শুরু করে। এরপর স্কুল শেষে শিশুদের আনন্দময় ও সৃজনশীল উপায়ে শিক্ষাদান করতে ২০১৭ সালের মে মাসে ‘কিডস টাইম’ চালু হয়।”

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের স্কুলের কোর্সগুলো করে শিশুরা নিজেরাই বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় গল্প লিখছে। আমরা বাংলা ভাষায় গল্প লেখার জন্য তাদের উৎসাহিত করছি। পরে সেগুলো বই আকারে প্রকাশিত হচ্ছে। বইগুলোর ছবিও তাদের আঁকা। বইগুলো আমরা কিডস টাইমের ওয়েবসাইটে ই-বুক আকারে দিচ্ছি। সেখান থেকে যে কেউ বইগুলো বিনা মূল্যে ডাউনলোড করে পড়তে পারেন। আমরা সেটির নাম দিয়েছি—‘শিশুদের লেখা গল্প’—kids Time। ওয়েবসাইটের ঠিকানা—(http://kidstimebd.com/stories-by-kids/)। সেখানে সেই শিশুর ছবি, পরিচিতি, গল্পটি আছে। তাদের সৌজন্য সংখ্যাও দেওয়া হয়। শিশুরা এ পর্যন্ত ৬০টি বই তৈরি করেছে।’ তিনি জানালেন, এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে তাদের সৃজনশীলতা তৈরি হয়, খেলতে খেলতে শেখে, আত্মবিশ্বাসী হয়ে সমস্যা সমাধানে দক্ষ হয়ে ওঠে।’ ওয়ালিউল্লাহ ভূঁইয়া বললেন, ‘ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে স্কুলের লেখাপড়ার খুব বেশি গুরুত্ব থাকবে না। বরং সৃজনশীলতা, সমস্যার সমাধান ও মানবীয় বুদ্ধিমত্তার বিকাশই সবচেয়ে গুরুত্ব পাবে। প্রচলিত স্কুলগুলোতে এই বিষয়গুলোতে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না বলে আমরা এই কার্যক্রম শুরু করেছি। এই কোর্সগুলোর মাধ্যমে অভিভাবকরা তাঁদের ছেলে-মেয়েদের সৃজনশীল দক্ষতা বাড়াতে পারেন।’


মন্তব্য