kalerkantho


ক্যাম্পাস তারকা

রাজিয়ার গল্পটি অন্য রকম

প্রবেশপত্র হারিয়ে গেল বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে পারলেন না। তার পরও বিবিএ, এমবিএতে সবার সেরা হয়েছেন রাজিয়া আফরিন। স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের চ্যান্সেলর গোল্ড মেডেল জেতা মেয়েটির কথা বলছেন সাইফুল ইসলাম

১১ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



রাজিয়ার গল্পটি অন্য রকম

ছোটবেলা থেকেই রাজিয়া আফরিন ভালো ছাত্রী। বাবা পুলিশে চাকরি করতেন বলে পড়েছেন ঢাকার রাজারবাগের পুলিশ লাইন হাই স্কুলে। ২০০৬ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় তিনি গোল্ডেন জিপিএ পেয়েছেন। মেয়ের এত ভালো ফল ও লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ দেখে মা-বাবার আশা ছিল, রাজিয়া চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করুক। কিন্তু স্বভাবে নরম রাজিয়া রক্ত দেখলেই ভয় পান, কোথাও কোনো পশু কাটাছেঁড়া করলে ভয়ে কাঁদতে শুরু করেন। ফলে চিকিৎসক হওয়ার দিকে এগোলেন না তিনি। ব্যবসায় বিভাগে ভর্তি হলেন। মিরপুরের গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউট থেকে ২০০৮ সালে এসএসসি পাস করেছেন। সেখানেও গোল্ডেন জিপিএ ৫ পেয়ে মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। এবার তিনি ব্যাংকার হওয়ার স্বপ্ন দেখতে লাগলেন। মা-বাবাও ভালো পেশা বলে মেয়েকে উৎসাহ দিতে লাগলেন। মেধাবী মেয়েটি শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই ভর্তি হবেন বলে মনস্থির করলেন। সে অনুযায়ী লেখাপড়াও করলেন। অন্য কোথাও ভর্তির ফরম না কিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির ফরম কিনলেন। কিন্তু পরীক্ষার আগের দিন দুর্ভাগ্যবশত তাঁর পরীক্ষার প্রবেশপত্র হারিয়ে গেল। অনেক খুঁজেও সেই প্রবেশপত্র পেলেন না। ফলে আর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়া হলো না তাঁর। কোথায় ভর্তি হবেন—এই চিন্তায় আকুল হয়ে গেলেন তিনি। মেধার লড়াইয়ে যে নিজেকে প্রমাণ করবেন, সেই উপায়ও তো নেই।

মধ্যবিত্ত, সৎ পুলিশ অফিসারের মেয়েটি এরপর তুলনামূলকভাবে কম খরচে পড়ালেখা করবেন বলে ২০০৮ সালে দারুল ইহসান ইউনিভার্সিটিতে বিবিএ বিভাগে ভর্তি হলেন। প্রথম সেমিস্টার থেকেই তিনি সবচেয়ে ভালো ফল করেছেন। কিন্তু বিবিএ শেষ করার মাত্র এক বছর বাকি, এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়টির আরো অনেক ছাত্র-ছাত্রীর মতো তাঁরও মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের মধ্যে নানা সমস্যা দেখা দিল। কিছুদিন ক্লাস বন্ধ রইল। তার পরও ২০১৩ সালে তিনি বিবিএ পাস করলেন। সেখানেও সিজিপিএ চারের মধ্যে ‘চার’ই পেয়েছেন। তবে এমবিএ আর সেখানে করতে সাহস পেলেন না। মা-বাবার পরামর্শে ভর্তি হলেন স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশে। তিনি এমবিএর ৫২ ব্যাচের ছাত্রী। তবে ক্লাস করতে গিয়ে নানা সমস্যার মোকাবেলা করতে হলো তাঁকে। অন্য ছাত্র-ছাত্রীরা এমনকি শিক্ষকরাও কিভাবে এত সিজিপিএ পেয়েছ—সারাক্ষণ তাঁকে এই প্রশ্ন করতে লাগলেন। তাঁর অতীতের ভালো ফলকে তাঁরা মোটেও গুরুত্ব দিলেন না। দারুল ইহসান কোনো বিশ্ববিদ্যালয় হলো? আসতে-যেতে তাঁকে এসব বলে খোঁচাতেন। তখন রাজিয়ার খুব খারাপ লাগত। কাঁদতেনও। ফলে পুরনো সেই জেদ তাঁর মনে জেগে উঠল। ফল দিয়েই তাঁদের জবাব দেবেন বলে পণ করলেন। আর ব্যবহার দিয়ে স্যারদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলতে চাইলেন। তিনি সেই দিনগুলোর কথা আজও ভুলতে পারেন না—‘এমবিএর তিন সেমিস্টারের প্রথমটিতেই স্যারদের মন জয় করেছি। আগের নিয়মে প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিন শেষ করেছি। কোনো কিছু না বুঝলে স্যারদের সহযোগিতা নিয়ে সেটি বুঝে তারপর বাসায় গিয়েছি।’ প্রথম ইনকোর্স থেকে তাঁর অসাধারণ ফল অন্যদের জানিয়ে দিল—রাজিয়া তুমুল মেধাবী এক ছাত্রী। ফলে লেখাপড়া নিয়ে সহযোগিতা চাইতে তাঁর কাছে ক্লাস ও বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীরা ভিড় জমাতে লাগলেন। তিনিও প্রয়োজনে তাঁদের পড়া বুঝিয়ে দিয়েছেন। এভাবেই পরিবেশটি বদলে গেল। এমবিএতেও তিনি সিজিপিএ ‘চার’ পেয়েছেন। ফলে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের তৃতীয় সমাবর্তনে তিনি ‘চ্যান্সেলর গোল্ড মেডেল’ পেয়েছেন।


মন্তব্য