kalerkantho


কুইজ উৎসবের সেরা দুজন

৫-৭ এপ্রিল গবর্নমেন্ট ল্যাবরেটরিতে হয়ে গেল তিন দিনব্যাপী কুইজ উৎসব। সর্বোচ্চ পাঁচটি বিভাগে পুরস্কার পাওয়া দুই বিজয়ীর গল্প শোনাচ্ছে আফরা নাওমী

১১ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



কুইজ উৎসবের সেরা দুজন

রেদওয়ান উজ জামান রেহাম ও সাজিদ করিম অনিন্দ্য

রেদওয়ান উজ জামান রেহাম

গত পাঁচ বছরে রেহাম ঘরে তুলছে কম করে হলেও ৫০টি পুরস্কার শুধু কুইজ করেই। পড়ছে ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের একাদশ শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে। ল্যাবরেটরিয়ানদের এই কুইজ প্রতিযোগিতায় ছয়টি সেগমেন্টে অংশ নিয়ে জিতে নিয়েছে পাঁচটি পুরস্কার। তার টিম ডিআরএমসি ইগনাইট দ্বিতীয় হয়েছে কলেজ কুইজে। দলের অন্য দুই সদস্য ফারহান ইশরাক ও সাজিদ রায়হান। এ ছাড়া রেহাম এককভাবে অংশ নিয়ে জিতেছে বাকি চারটি পুরস্কার। ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ও টেকনোলজি কুইজে প্রথম স্থান ছিল রেহামেরই। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কুইজে হয়েছে তৃতীয় এবং পঞ্চম স্থান অর্জন করেছে পপুলার কালচার কুইজে। ‘ল্যাবরেটরিয়ান ফেস্টে ৫টা পুরস্কর আশা করিনি ঠিকই, তবে ২-৩টি প্রাইজ পাব সেটা নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিলাম’ বলল রেহাম। রেহামের কুইজের যাত্রাটা শুরু হঠাৎ করেই। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে একটি সাধারণ জ্ঞানের কুইজ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। এর পেছনের কাহিনিটি বেশ মজার। যেদিন প্রতিযোগিতাটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেদিন  রেহামের বাবা বাসে বসে পত্রিকা পড়ছিলেন। হঠাৎ বিজ্ঞাপনে প্রতিযোগিতার খবরটি দেখতে পান। তখনই বাসায় ফোন করে রেহামকে অংশ নিতে বলেন। তারপর তো প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তার দল চ্যাম্পিয়নই হয়ে যায়। এর দুই বছর পর ২০১৩ সালে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় হঠাৎ একদিন তার এক বন্ধু প্রস্তাব দিল, চল, নটর ডেম কলেজের কুইজ ফেস্টে অংশ নিই। রেহামও রাজি। আর প্রথমবার অংশগ্রহণ করেই জিতে নিয়েছিল চতুর্থ পুরস্কার। ২০১৪ সালে জেএসসির কারণে শুধু তার নিজের স্কুলের কম্পিটিশনে অংশ নেয় এবং একটি বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে। ২০১৫ সালে বেশ কয়েকটি প্রতিযোগিতায় পুরস্কার জেতে।

২০১৬ সালে গবর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল, আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং নটর ডেম কলেজে চ্যাম্পিয়ন হয় তার দল। দশম শ্রেণিতে আরো অংশ নেয় বাংলাদেশ শিশু একাডেমি ও কুইজারস বাংলাদেশের যৌথ আয়োজনের ‘জাতীয় শিশু কিশোর কুইজ উৎসবে’। সেখানে তার দল ঢাকা বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়। এসএসসি পাস করে ঢাকা  রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজে ভর্তি হয় ২০১৭ সালে। ওই বছর বেশ কয়েকটি প্রতিযোগিতায় পুরস্কার জিতলেও ওয়াইডাব্লিউসিএর কুইজ সেগমেন্টে অংশ নিয়ে এককভাবে মেডলে কুইজ, ডিটেকটিভ কুইজ ও পুরো বাংলাদেশ কুইজে প্রথম হয়। এটি তার জীবনের বড় একটি অর্জন। এ বছর এখন পর্যন্ত ঘরে তুলেছে সাতটি পুরস্কার।

ছয় বছর আবৃত্তি শিখেছে কচিকাঁচার মেলায়। ২০১০, ২০১১, ২০১২ সালে টানা তিনবার আবৃত্তিতে ‘দাদাভাই পুরস্কার’ পায়। রেহাম অনেক গল্পের বই পড়ে। ইন্টারনেটেও প্রচুর ব্রাউজিং করে। তবে ইন্টারনেটের যেসব ভালো ব্যবহার ও উপকারিতা রয়েছে, তা-ই সে কাজে লাগায়। স্বপ্ন দেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএতে পড়ার।

 

সাজিদ করিম অনিন্দ্য

বন্ধুরা আগেই বলেছিল, ‘তুই অংশ নিস না, তাহলে সব পুরস্কার তুইই নিয়ে যাবি।’ বন্ধুদের কথাই ফলে গেল। সাজিদ করিম অনিন্দ্য পাঁচটি সেগমেন্টে প্রাইজ পেয়েছে ল্যাবরেটরিয়ানদের ইভেন্টে। অনিন্দ্য মাত্রই এসএসসি দিল গবর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল থেকে। কুইজ ক্লাব অব ল্যাবরেটরিয়ানসের অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট সে। ইভেন্টের আয়োজন নিয়ে খুব বেশি ব্যস্ত থাকায়, এতে অংশ নেওয়ার কথাই ছিল না তার। হুট করে সিদ্ধান্ত নিয়ে অংশ নিয়েছে প্রতিযোগিতায়। তাতেই বাজিমাত। স্কুল কুইজে সে ও তার টিম কিউসিএল-গ্রানাইট চ্যাম্পিয়ন হয়।  টিমের অন্যান্য সদস্য ছিল জীম-মীম সিদ্দিকী সৌধ ও আসিফ ইকবাল। এরপর একক অংশগ্রহণে পপুলার কালচার কুইজে প্রথম, ইন্টারনেট কালচার কুইজে দ্বিতীয় এবং টেকনিকাল কুইজ ও ফিউচার চ্যালেঞ্জ কুইজে তৃতীয় হয়। এতগুলো প্রাইজ পেয়ে গেল সে, অথচ তার নাকি অংশগ্রহণ করার কথাই ছিল না!

বড় ভাইদের ডাকে সাড়া দিয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় দলগত এক কুইজ প্রতিযোগিতায় প্রথম অংশ নেয়, আর রানার্স আপ হয় সেবার। এটাই তার জীবনকে বেশ খানিকটা পাল্টে দেয়। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় তাদের স্কুল আয়োজিত সায়েন্স ফেস্টে কুইজে তার দল চ্যাম্পিয়ন হয়। এদিকে এককভাবে সায়েন্স কুইজে ও আইকিউ টেস্টে প্রথম ও দ্বিতীয় হয় অনিন্দ্য। অষ্টম শ্রেণিতে জেএসসি পরীক্ষা থাকলেও তাদের স্কুলের  এনভায়রনমেন্ট ফেস্টে চ্যাম্পিয়ন হয়। আরো বেশ কয়েকটি উৎসবে দ্বিতীয়, তৃতীয় হয়। পরের বছরও থলি ভরিয়েছে পুরস্কারে। দশম শ্রেণিতে নিজ স্কুলের কুইজ ফেস্টে হয় চতুর্থ। ভিকারুননিসা নূনের তিনটি কুইজ ইভেন্টে অংশ নিয়ে একটায় চ্যাম্পিয়ন ও দুটিতে দ্বিতীয় হয়েছে। এ বছর এসএসসি দিয়ে যতটুকু সুযোগ পেয়েছে, দুটো কুইজ প্রতিযোগিতায় হয়েছে চ্যাম্পিয়ন। অনিন্দ্য একজন ফ্রিল্যান্স গ্রাফিক ডিজাইনার। নিজে নিজেই আয়ত্ত করেছে গ্রাফিক ডিজাইনের কৌশলগুলো। সঙ্গী ছিল ইউটিউব। গত সাত-আট মাসে প্রায় তিরিশ হাজার টাকা উপার্জন করেছে গ্রাফিক ডিজাইনিং করে। যেকোনো কিছুই নিজ উদ্যোগে শুরু করতে ভালোবাসে অনিন্দ্য। গিটারও শিখে ফেলেছে ইন্টারনেট আর ইউটিউবের মাধ্যমে। এসএসসির রেজাল্টের পর ইলেক্ট্রনিক গিটার কেনার ইচ্ছা তার। আর পছন্দ হুমায়ূন আহমেদ ও মুহম্মদ জাফর ইকবালের গল্পের বই।

 

ল্যাবরেটরিয়ানদের ১১তম কুইজ উৎসব

বাংলাদেশে প্রথম যে সরকারি স্কুলে কুইজ ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেটি গবর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল। ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত কুইজ ক্লাব অব ল্যাবরেটরিয়ানস এবার ১১তমবারের মতো আয়োজন করেছে ইন্টার-স্কুল কলেজ কুইজ কম্পিটিশন, ‘ওয়েভ প্রেজেন্টস ১১তম ল্যাবরেটরিয়ানস ফেস্টিভাল ২০১৮’। পুরো প্রগ্রামটি পরিচালনা করেছে ক্লাবের ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে এবার এসএসসি দেওয়া শিক্ষার্থীরা।

উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয় স্কুলের অডিটরিয়ামে। উদ্বোধন করেন গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল খালেক, কুইজ ক্লাব মডারেটর (দিবা শিফট) মো. রফিকুল ইসলাম ও মডারেটর (দুপুর শিফট) অশ্রুজিৎ রায়সহ শিক্ষকরা। তিন দিন ধরে চলে ইভেন্টটি। অনলাইন ও স্পট নিবন্ধন করে অংশ নিয়েছে পঞ্চাশটির বেশি স্কুল। উপস্থিত ছিল অন্তত দুই-আড়াই হাজার শিক্ষার্থী। আয়োজক স্কুলসহ ছিল ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ, সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল, ঢাকা কলেজ, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, ওয়াইডাব্লিউসিএ, ঢাকা সিটি কলেজ, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ আরো অনেক স্কুল ও কলেজ। বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও নর্থ সাউথের শিক্ষার্থীরাও অংশ নিয়েছে কয়েকটি সেগমেন্টে। কিছু ইভেন্ট ছিল দলগত, কিছু একক। স্কুল কুইজ ক্যাটাগরিতে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি ও কলেজ কুইজ ক্যাটাগরিতে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়। পপুলার কালচার কুইজ, টেকনোলজি কুইজ, ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ কুইজ, ইন্টারনেট কালচার কুইজ, লিবারেশন ওয়ার কুইজ, ম্যাথ অলিম্পিয়াড, আইকিউ টেস্ট, সুডোকু ও রুবিকস কিউবে সবার অংশগ্রহণ উন্মুক্ত ছিল। কুইজের একটি বড় আকর্ষণ ছিল দ্য মেগা কুইজ শো। এখানে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় নিয়ে, ১০টি রাউন্ডে, ৮০টি কুইজের উত্তর দিয়ে ফাইনালে পৌঁছতে হয়। প্রথমবারের মতো এবার নতুন যে কুইজের বিভাগটি ছিল, সেটি ফিউচার চ্যালেঞ্জ কুইজ। এখানে ভবিষ্যতে কোনো সমস্যার সম্মুখীন হলে কিভাবে তা থেকে উদ্ধার পাওয়া যাবে—এমন সব প্রশ্নের সমাধান দিতে হয়েছে। যদিও কুইজভিত্তিক ফেস্টিভাল, তার পরও দেয়ালপত্রিকায় ৩০টি দল অংশ নেয়। অনুষ্ঠানটিতে অডিটরিয়ামে একজন কুইজ মাস্টার প্রোজেক্টরে কুইজ সম্পর্কে কিছু দেখান, বলেন ও ক্লু দেন, আর শিক্ষার্থীরা তা বুঝে বুঝে উত্তর দেয়। কুইজ শেষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন ল্যাবরেটরি স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল খালেক।



মন্তব্য