kalerkantho


সাইকেলে চড়ে পরি!

সাইকেল শুধু তাঁর সময় আর খরচ বাঁচায়নি; বিভাগ, বিশ্ববিদ্যালয়ে খুব পরিচিতও করেছে। ফারজানা আক্তার তৃষাকে দেখে এখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জনাপঞ্চাশেক মেয়ে সাইকেল চালান। আরো গুণ আছে তাঁর। জানিয়েছেন রবিউল হোসাইন। ছবি তুলেছেন সাদমান বিজয়

১৬ মে, ২০১৮ ০০:০০



সাইকেলে চড়ে পরি!

চার বছর আগের কথা, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগে প্রথম বর্ষে পড়েন ফারজানা আক্তার তৃষা। থাকেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলে। এক বিকেলে হলের সামনে আড্ডা দিচ্ছেন। হঠাৎ খেয়াল করলেন, নুসরাত নিপা সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের এই বান্ধবীর সাইকেলের দিকে তিনি পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেন। ‘তোমার সাইকেল?’ ‘হ্যাঁ। টিউশনি করি তো, সাইকেল নিয়েই যেতে হয়।’ তৃষার মনে পড়ল, কুমিল্লা শহরে সেই চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় সাইকেল চালানো শিখেছিলেন। বাবা শাহ মোহাম্মদ খায়রুল আলম মডার্ন হাই স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় সাইকেল কিনে দিয়েছেন। তাঁরা শহরের চকবাজারে থাকতেন, কিন্তু পাড়া-প্রতিবেশীরা সাইকেল নিয়ে বেরোতে দেখলেই তৃষাকে টিপ্পনি কাটত। তাই ইচ্ছা থাকলেও কোনো দিন সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যেতে পারেননি। বাড়ির চৌহদ্দিতেই ঘুরতে হয়েছে। এতকাল পর বান্ধবীর হাতে সাইকেল দেখে তাঁর মনটি উসখুস করতে লাগল। বললেনও, ‘একটু চালাই?’ নিপা সানন্দে রাজি। সে সন্ধ্যায় তৃষা শামসুন্নাহার হল থেকে সাইকেল চালিয়ে শহীদ মিনারে চলে এলেন। সেখানে তখন ছাত্র-ছাত্রীদের আড্ডা জমেছে। অবাক হয়ে তাঁরা এক তরুণীর কয়েকটি পাক দেওয়া দেখলেন। কয়েকজন মেয়ের মুখে অভিনন্দনের হাসিও ফুটল। সেদিনই বুঝলেন, এই উঁচু-নিচু পাহাড়ঘেরা ক্যাম্পাসে তিনি সাইকেল নিয়ে চলতে-ফিরতে পারবেন। তবে বাবাকে বলতেই তিনি ভয় পেয়ে গেলেন, পাছে লোকে কিছু বলে? ‘ক্যাম্পাসে আরো অনেক মেয়ে তো সাইকেল চালায়’—এই মিথ্যাটি বলে তাঁকে রাজি করালেন। ঈদের আগের বন্ধে বাড়ি গিয়ে বড় বোন ফাহমিদা আক্তার অনামিকা, দুলাভাই আশিকুর রহমান ও জ্যাঠাতো ভাই রায়হান আলমকে নিয়ে বাসার সামনের দোকান থেকে কিনলেন আরএফএলের ‘দুরন্ত’, ২১ গিয়ারের একটি সাইকেল। এনিমেটেড ছবি ফ্রোজেনের প্রিয় চরিত্রের নামে তৃষা সাইকেলের নাম দিলেন ‘ইয়োনা’।

ঈদের পর বাসের ছাদে চড়ে আসিফ, আকিব, আশফাক ও তৃষার সঙ্গে ইয়োনা গাছগাছালিতে ছাওয়া ক্যাম্পাসে এলো। সে বিকেলেই ইয়োনাকে নিয়ে একপাক বেড়ালেন তৃষা। নিজেকে তাঁর পাখির মতো লাগছিল, এতটুকু ক্লান্তি লাগেনি। সেদিনই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার মজা টের পেলেন। কোনো বাজে মন্তব্য কানে এলো না, কেউ আড় চোখে তাকাল না। বরং সাইকেল থামিয়ে কয়েকজন ছাত্রী ‘কবে থেকে চালাচ্ছ?’ ‘কেমন লাগছে?’ ইত্যাদি নানা তথ্য জেনে নিলেন। তাঁরাও কিনবেন জানালেন। শামসুন্নাহার হলের করিডরে লকার দিয়ে সাইকেল বেঁধে তৃষা ৪০১/ক নম্বর রুমে ফিরলেন। আস্তে আস্তে তাঁর সাইকেল চালানোটা হলে চাউর হয়ে গেল। হাউস টিউটর সংস্কৃতের সহকারী অধ্যাপক অনিন্দিতা শুভ্র উৎসাহ দিলেন। বিভাগের অধ্যাপক বিশ্বজিৎ নাথ তখন প্রায় ১৫ মিনিট সাইকেল চালিয়ে দক্ষিণ ক্যাম্পাসের শিক্ষকদের আবাসিক কোয়ার্টার থেকে জীববিজ্ঞান অনুষদে আসা-যাওয়া করেন। শিক্ষকের মতো ছাত্রীও সাইকেল চালিয়ে শামসুন্নাহার হল থেকে লেডিস হলের ঝুপড়ি, শহীদ মিনার চত্বর, প্রশাসনিক ভবন, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, কলা অনুষদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ ভবন, বিজ্ঞান অনুষদের মসজিদ, বিজ্ঞান অনুষদ পেরিয়ে জীববিজ্ঞান অনুষদে যাতায়াত শুরু করলেন। প্রথম দিকে সকালে হল থেকে বেরোলেই রিকশা চত্বরের রিকশাওলারা (তাঁরা তাঁদের দাদু ডাকেন) অবাক হয়ে তাঁকে দেখতেন। এখন তো তাঁরা সবাই তাঁকে চেনেন। পরীক্ষার টেনশন বা বেখেয়ালে স্ট্যান্ড তুলতে ভুলে গেলে তাঁরা তাঁকে ডেকে বলেনও, ‘দাদু, সাইকেলের স্ট্যান্ড তোলেন।’ পাম্প কমে গেলে বিনা পয়সায় পাম্প দিয়ে দেন। উল্টো দিকের ‘দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া হল’-এর মেয়েরা ঘুম ঘুম চোখে খুব সকালে তাঁর দুরন্তপনা দেখেন। পথটি শামসুন্নাহার ও খালেদা জিয়া দুই হলের মেয়েরাই ব্যবহার করেন বলে সব সময় বেশ ভিড় থাকে। তখন পুরো নারীজাতিকে বেল বাজিয়ে সতর্ক করে এগিয়ে যান তিনি। প্রায় সকাল-দুপুরে বন্ধু কি সিনিয়র আপু ডেকে বলেন, ‘বিবিএ ফ্যাকাল্টি, সমাজবিজ্ঞান অনুষদে যাব, প্লিজ, একটু লিফট দাও।’ তিনি তাঁদের হাসিমুখে পৌঁছে দেন। মাঝেমধ্যে চকোলেট, আইসক্রিম বা হাতে বানানো নাশতা উপহার পান। এভাবে তিনি ও তাঁর ইয়োনা পুরো ক্যাম্পাসে বিখ্যাত হয়েছেন। বিভাগের শিক্ষকরাও নিয়মিত উৎসাহ দেন। প্রথম বর্ষের ফাইনালের ভাইভায় তো তাঁকে সাইকেলবিষয়ক প্রশ্নও করা হয়েছে। ‘কড়া ম্যাডাম’ হিসেবে পরিচিত সহকারী অধ্যাপক তাজ সুলতানাকে হাসতে প্রায় দেখা যায় না; সেই তিনিই বহিঃপরীক্ষকের কাছে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, ‘আমাদের সাইক্লিস্ট তৃষা খুব ভালো মেয়ে।’ ম্যাডামের মুখে তখন মিষ্টি হাসি! ফলে তৃষার আরো সাহস বাড়ল। সে বছরের নভেম্বরে ভর্তি পরীক্ষার সময় বাবার এক বন্ধুর মেয়েকে সাইকেলের ক্যারিয়ারে বসিয়ে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজে দিয়ে এলেন। তখন অভিভাবকরা একে অন্যকে ডেকে সেই দৃশ্য দেখিয়ে হাসলেন। দ্বিতীয় বর্ষের মৌখিকের সময় তো ভাইভারুমে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে অধ্যাপক ড. অলক পাল বলে বসলেন, ‘আমাদের নেত্রী এসেছেন!’ এমনকি জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান পর্যন্ত একদিন ডেকে বলেছেন, ‘তোমাকে আলাদা করে চেনা যায় বলে তুমি সাইকেল চালানো বন্ধ করবে না। অন্য মেয়েদেরও সাইকেল চালাতে বলবে। তাহলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় নারীবান্ধব ও নিরাপদ হবে।’ সেটিই হয়েছে। তাঁকে দেখে সবার আগে খালেদা জিয়া হলের অর্থনীতি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী হীরামণি সাইকেল কিনেছেন। মাসখানেকের মধ্যে সে হলের ইতিহাসের মাস্টার্সের রুমানা খানম সাথিও সাইকেল কিনেছেন। তাঁদের হলে এখন ৩০ জনের বেশি ছাত্রী সাইকেল চালান। আর পুরো ক্যাম্পাসে সংখ্যাটি ৫০ জনেরও বেশি।

ইয়োনায় তাঁর দুর্ঘটনাও আছে। দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় তাড়াহুড়া করে একদিন ব্যাবহারিকের পেনসিল বক্স নিয়ে হল থেকে বিভাগে ফেরার পথে খুব দ্রুত সাইকেল চালাচ্ছিলেন। ফলে অগ্রণী ব্যাংকের কাছে, শহীদ মিনারের সামনে এক মোটরসাইকেলের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হলো। তিনি দ্রুত ব্রেক কষায় হ্যান্ডেলটি ভেঙে গেল। সেটি মেরামত করতে হয়েছে। দ্বিতীয় বর্ষ ফাইনাল পরীক্ষা দেবেন বলে খুব তাড়াতাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। মুক্তমঞ্চের সামনে এক পথচারীর গায়ের ওপর সাইকেলটি তুলে দিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, লোকটি বোধ হয় রাস্তা পেরিয়ে যাবেন; কিন্তু তিনি না এগিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। ফলে কেউ কোনো আঘাত পাননি। তবে কথা শুনতে হয়েছে, ‘দেখে চালাতে পারেন না?’

তার পরও ইয়োনা-তৃষা ভালো আছেন। প্রায় বিকেলেই ইয়োনায় চড়ে তিনি ক্যাম্পাসে ঘোরেন। কেন্দ্রীয় খেলার মাঠের দিকটায় খুব উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথ আছে। তাতে ওঠার সময় দম ফুরিয়ে যায় বলে কখনো হেঁটে ওঠেন, কখনো গিয়ার বাড়ান। আবার ঢালু পথে নামার সময় দুই হাত ছেড়ে হেডফোনে গান শুনতে শুনতে আনন্দে ভাসেন। জাতীয় দিবসগুলোতে তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয় আলোকসজ্জায় সাজে। শহীদ মিনার চত্বর, স্মৃতিসৌধ, কলাভবনের অপরূপ সাজ দেখতে তিনি বেরিয়ে পড়েন। একসময় প্রীতিলতা হলের নৃবিজ্ঞানের বড় আপু মুনতাহা মুহির সঙ্গে সাইকেলে পুরো ক্যাম্পাসে চক্কর দিতেন। ভোর ৬টায় বেরিয়ে জিরো পয়েন্ট থেকে এক নম্বর গেট পর্যন্ত চলে যেতেন। প্রশস্ত সেই রাজপথের দুধারে মেহগনির সারি, ঢালু পথে সাইকেল চালাতে চালাতে দুজনের কত গল্প হতো!

সাইকেল তরুণী তৃষার আরো অনেক গুণ আছে। প্রথম বর্ষে পড়ার সময় থেকে তিনি খেলাধুলায় পদক জয় করে চলেছেন। সে বছর আন্ত হল বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় একক ও দ্বৈত ব্যাডমিন্টন, ক্যারমে রানার-আপ এবং উপস্থিত বক্তৃতায় তৃতীয় হয়েছেন। এ বছরের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ২০০, ৪০০ মিটার স্প্রিন্টে তৃতীয়, ৪০০ মিটার রিলেতে দলগতভাবে রানার্স-আপ হয়েছেন। তৃষা বললেন, ‘ছোটবেলা থেকে খেলাধুলা করি। তাই সাফল্য পাই।’ অবসরে তিনি গিটার বাজান। এখন তিনি চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী। ভাষা শেখার অ্যাপস,  বই, সিনেমা, ইউটিউবে দেখে কোরিয়ান ভাষাটি অনেকটা রপ্ত করেছেন। তাঁর স্বপ্ন, দক্ষিণ কোরিয়ায় গিয়ে উচ্চতর লেখাপড়া করবেন।


মন্তব্য