kalerkantho


বোনের কারণে কৃতী

ফাহিমা খাতুন বাংলাদেশ মহিলা ক্রিকেট দলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। তাঁর খেলোয়াড় জীবনের গল্প ক্রিকেটের মতো রোমাঞ্চকর। সেটিই লিখেছেন হুসাইন মিঠু। ছবি তুলেছেন তারেক আজিজ নিশক

১১ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



বোনের কারণে কৃতী

ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা নেই, জার্মানিও বাদ। ফুটবল তার সৌরভ হারিয়ে এখন হিসাব-নিকাশের দোলায় দুলছে। তার পরও সারা বিশ্বের সব মানুষের একটিই ট্রফি বলে, বিশ্বকাপের আমেজ ম্লান হলেও আমরা খেলা দেখতে বসছি। নতুন দেশগুলোও যে ভালো খেলতে পারে, তাদেরও আছে পরাশক্তির মতো শক্তি-সামর্থ্য সেটি প্রমাণ হচ্ছে। আমাদের দেশের মেয়েদেরও তাই। আগল ভেঙে তাঁরা নানা খেলায় ভালো করছেন। দেশ, বিশ্ববিদ্যালয় ও দশের মুখ উজ্জ্বল করছেন। তেমন তিনের গল্প নিয়ে এবারের বিশেষ আয়োজন

 

বাবা ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। তাঁকে নিরাপত্তা বাহিনীর পোশাকে দেখে দেখে ছোট্ট মেয়েরও ইচ্ছা হলো, বাবার মতো হবে, দেশের ও মানুষের জন্য কাজ করবে। তবে চোখের আলো কম তার। সে জন্য চশমা পরতে হয়। ফলে বাবাকে জিজ্ঞেস করত, ‘বাবা, আমি আর্মি অফিসার হতে পারব তো? আর্মি অফিসার হতে হলে নাকি চোখে ভালো দেখতে হয়? ও বাবা, আমাকে বাদ দিয়ে দেবে না তো?’ বাবার মতো মানুষের সেবা করার সুযোগ না পেলেও আরেকটি গুণ ঠিকই পেয়েছে সে। পুলিশ কর্মকর্তা হওয়ার সুবাদে বাবাকে শীতের সময় নিয়মিত ব্যাডমিন্টন খেলে শরীরটাকে ফিট রাখতে হতো। তিনি মাঠে খেলছেন—এটি নিয়মিত ও প্রিয় দৃশ্য ছিল ফাহিমা খাতুনের। এভাবে ব্যাডমিন্টনের প্রতি ভালোবাসার শুরু তাঁর। বাবার খেলাই তাঁকে এই ক্রীড়ার নানা কিছু শিখিয়ে দিল।

মাগুরার সদরের মেয়ে তিনি। বাসা স্টেডিয়ামের এত কাছে যে মানুষ তাঁদের পাড়াটিকে স্টেডিয়ামপাড়া হিসেবেই চেনে। ফলে স্টেডিয়ামে খেলা দেখে তিনি বড় হয়েছেন, আশপাশে খেলার গল্প শুনেছেন। সব খেলারই মোটামুটি সাম্প্রতিক তথ্য পেয়েছেন। তবে আর দশটি বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের মানসিকতা যা থাকে, সেটিই ছিল তাঁদের। বাড়ির পুরুষ সদস্যরা চাননি, ঘরের মেয়ে খেলোয়াড় হোক। বড় ভাই স্পষ্ট করে বলে দিয়েছিলেন, ‘লেখাপড়া কর, তোর খেলাধুলা করার কোনো দরকার নেই। আমরা তোকে খেলোয়াড় হতে দিতে চাই না।’ তবে বোন আবার বোনের আগ্রহ হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার ছাত্রী আসমা আঁখি অন্যদের চোখ এড়িয়ে, তাদের নানা কিছু বলে ছোট বোনকে খেলতে পাঠাতেন। এভাবেই খেলার চর্চা শুরু হয়েছিল ফাহিমার। স্কুলে ভালো খেলতেন। ফলে মাগুরা গার্লস হাই স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রীটিকে তাই তেমন কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি না থাকলেও আন্ত স্কুল ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য নির্বাচিত করা হলো। ফাহিমা খাতুন যশোরে খেলতে গেলেন। খুব ভালো খেললেন তিনি। ফলে যশোর মহিলা দলের কোচ ফাহিমাকে নিয়ে আসা স্কুলের শিক্ষককে বলেও ফেললেন, ‘স্যার ফাহিমার মধ্যে ভালো খেলার তাড়না আছে। সে নিয়মিত খেললে অনেক ভালো করবে। আমাকে এই মেয়েটিকে দিয়ে দিন। আমি তাঁকে বাংলাদেশের অন্যতম সেরা ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় হিসেবে তৈরি করে দেব।’ তবে মা-বাবার অনুমতি ছাড়া কোনো কিছু করা সম্ভব নয় বলে কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারলেন না শিক্ষক। এভাবেই ব্যাডমিন্টন খেলার ইতি ঘটল বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ের। তাহলে ক্রিকেটের কিভাবে শুরু হলো?

সেটিরও নেপথ্যের নায়িকা বড় বোন আঁখি। সেটি আজ থেকে ৯ বছর আগের ঘটনা, ২০০৯ সাল। তখন মাগুরা মহিলা কলেজে পড়েন ফাহিমা। খেলার প্রতি ছোট বোনের তুমুল আগ্রহ দেখে তিনি তাঁকে ব্যাট কিনে দিলেন। তবে অন্যরা কিন্তু ঠিকই আগের মতো বেঁকে বসলেন, ‘মেয়ে হয়ে আর কিছু পেলি না, ক্রিকেট খেলতে নামলি?’ তবে মুখে মুখে তর্ক করা তাঁর স্বভাব নয়, আবার বড়রা না বুঝলে যুক্তি দিতেও পারতেন না। ফলে বাবা অফিসে, ভাই বাইরে গেলে এবং মা দুপুরে ঘুমালে ব্যাট হাতে চুপিসারে বেরিয়ে পড়তেন তিনি। চুরি করেই অন্য মেয়েদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলার শুরু হলো তাঁর। তবে সময়মতো বাড়িতে ফিরে আসতেন আর লেখাপড়াও ঠিকভাবে করতেন বলে কেউ তেমন কিছু বলতেন না। জীবনের এসব সংকটের সময়ে ফাহিমার ছায়া হয়ে থেকেছেন বড় বোন আঁখি। এখনো তিনিই তাঁর পরম সহায়। সারা জীবন সংকটে, দুর্যোগে তিনি আদরের বোনকে বলেছেন ‘ভয় পেয়ো না, ভেঙে পোড়ো না। মানুষ পারে না এই দুনিয়ায় এমন কিছুই নেই। তুমিও পারবে ফাহিমা।’

বোনের উত্সাহে, বাড়িতে না জানিয়েই ক্রিকেটের পেশাদার জীবনের শুরু হয় ফাহিমার। সেটি ছিল ‘মাগুরা আন্ত কলেজ ক্রিকেট লিগ’। স্বশিক্ষিত, খেলায় অন্তঃপ্রাণ মেয়েটি প্রথম অংশগ্রহণেই সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলেন। তবে এইচএসসি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার কঠিন সময় বলে ব্যাট ফেলে বই হাতে নিয়ে পড়ে থাকতে হলো তাঁকে। তখনো তাঁর কাছে লেখাপড়ার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন বড় বোন, ‘ইউনিভার্সিটিতে না পড়লে কোনো দিনও বুঝবে না জীবনটি কত বিশাল।’

ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য পুরো একটি মাস হলে বোনের রুমে থেকেছেন তিনি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছেন। ফলে তখনই লেখাপড়ার প্রতি সত্যিকারের আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর। ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেলেন। পড়ার বিষয়টিও খুব ভালো ‘আইন বিভাগ’। বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরু থেকেই হলে আছেন, এখানে খেলাধুলার অবারিত পরিবেশ পেলেন। ফাহিমা খাতুনের নিয়মিত ক্রিকেট খেলা শুরু হলো। তৈরি হয়ে গেলেন তিনি। ২০১২ সালেই বিভাগীয় ক্রিকেট লিগ খেলা শুরু করলেন।

তিনি বরিশাল বিভাগে খেলেছেন। পারফরম্যান্সই তাঁকে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা দলের কোচের নজরে নিয়ে এলো। পরের বছরই তিনি জাতীয় দলে ডাক পেলেন। এখন তিনি আমাদের দলের অন্যতম সেরা অপরিহার্য খেলোয়াড়। বাঁ-হাতি লেগ ব্রেক বোলার ও মিডল অর্ডারে ডান হাতি ব্যাটসম্যান। দলের হয়ে প্রথম ২০১৪ সালে ভারতে খেলতে গিয়েছেন। এরপর তো দেশের হয়ে বিদেশে খেলেছেনই।

২০১৬ সালে বাংলাদেশেই মহিলা বিশ্বকাপ ক্রিকেটের আসর বসেছিল। সেখানেও দেশের হয়ে খেলেছেন তিনি। অনেক স্মরণীয় খেলা আছে। কোনটির কথা আলাদা করে বলবেন? ফাহিমা হেসে বললেন, ‘২০১৪ সালে যেবার ভারতে গিয়েছিলাম, তখন ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের সঙ্গে আমাদের একটি খেলা হয়েছিল। সেই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে আমাকে দিয়েই বোলিংয়ের শুরু করা হলো। প্রথম বলেই চার খেলাম। তার পরও দমে যাইনি। পরের ওভারেও অধিনায়ক আস্থা রাখলেন। সেই ওভারে চার রান দিলাম এবং একটি উইকেট পেলাম। তখন দর্শকরা গ্যালারি থেকে আমার নাম ধরে যেভাবে চিত্কার করছিলেন, সেটি এখনো ভুলতে পারি না।’

বাংলাদেশ জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়েও তিনি তাঁর জীবনে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদানের কথা সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করলেন। তিনি বললেন, ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের জুনিয়র ও সিনিয়র ছাত্র-ছাত্রীরা, এমনকি শিক্ষকরাও আমাকে খুব সম্মান করেছেন। তাঁরা আমাকে খেলার জন্য ছাড় দিয়েছেন, আমার প্রতি খেয়াল রেখেছেন। আমিও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে উঠেছি। বন্ধুদের কথা আলাদা করে বলতেই হয়। খেলার জন্য আমি ঢাকা, দেশের নানা অঞ্চল বা বিদেশে গেলেও নোট, লেকচার দিয়ে ওরা সাহায্য করে। এখন মা-বাবা, ভাইও আমাকে আরো ভালো খেলার জন্য উত্সাহ দেন।’



মন্তব্য