kalerkantho


মুনা মন সঁপেছেন খেলায়

১১ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



মুনা মন সঁপেছেন খেলায়

সাদিয়া ইসলাম মুনা খেলতে ভালোবাসেন। স্কুলে চ্যাম্পিয়ন, কলেজেও তাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই মেয়েটি এবার হল চ্যাম্পিয়ন, আন্ত হল অ্যাথলেটিকস প্রতিযোগিতায় ‘ব্যক্তিগত রানার-আপ’ ও পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা নারী সাঁতারু হয়েছেন। এই ক্রীড়াবিদের গল্প শোনাচ্ছেন মীর হুযাইফা আল মামদূহ। ছবি তুলেছেন সিজান আহমেদ জিম

 

হঠাৎই খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ জন্মেছে সাদিয়া ইসলাম মুনার। তখন তিনি ঢাকার নবাবগঞ্জের আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। গণিতে ভালো ছিলেন বলে গণিত শিক্ষক নীলকণ্ঠ বিশ্বাস তাঁকে এতই পছন্দ করতেন যে ‘আমার মেয়ে’ বলেই ডাকতেন। স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার সময় তিনি ডেকে বললেন, ‘কী গো, তুমি কোনো খেলায় নাম দিচ্ছ না? তুমি তো অনেক লম্বা। নাম দাও, ভালো করবে।’ পা জোড়া লম্বা, লাফ দিতে ভালো লাগে, শরীরেও শক্তি রাখেন, বিস্কুট দৌড়ে পুরস্কার জিতেছেন। তাই লংজাম্প, ডিসকাস থ্রো ও শর্টপুট থ্রোতে নাম দিলেন মুনা। তখন তো আর এই খেলাগুলোর বৈশ্বিক নামগুলো জানতেন না, তাই ‘উচ্চলম্ফ’, ‘চাকতি’ ও ‘গোলক নিক্ষেপ’ বলতেন। অনুশীলনের সুযোগ মেলেনি, আসলে দেখিয়ে দেওয়ার তো কেউ ছিল না। ওপরের ক্লাসের হাফিজা আক্তার খুব ভালো খেলতেন। তিনি যখন আলাদাভাবে স্কুলের মাঠে ঘুরে ঘুরে অনুশীলন করতেন, ক্লাস ফাঁকি দিয়ে হলেও জানালার গ্রিল ধরে মুনা দেখতেন। মনে মনে আফসোস করলেন, ‘আহা আমিও যদি হাফিজা আপার মতো ভালো খেলোয়াড় হতে পারতাম। তাহলে আমাকেও তো সবাই চিনত।’ এভাবেই আগ্রহের সূচনা হলো। তবে সেইবার বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ফলাফল তেমন ভালো হলো না; কিন্তু তাঁর খেলাগুলোর প্রতি ভালোবাসা জন্মাল। এর পর থেকে নিজে নিজেই পাথর কুড়িয়ে ডিসকাস থ্রো ও শটপুট থ্রো ও জ্যাভলিন থ্রো অনুশীলন করতেন। এই ধারাবাহিক অনুশীলনের ফলেই নবম শ্রেণিতে ডিসকাস ও শটপুট থ্রোতে পুরস্কার পেলেন। দশম শ্রেণিতে কিশোরী মেয়েটি আরো শক্ত-সামর্থ্য হলো। আগের চেয়ে অনুশীলনেও আরো দক্ষ হলেন। ফলে এই বিভাগগুলোতে চ্যাম্পিয়ন হয়েই স্কুল ছাড়লেন। আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে কৃতী ক্রীড়াবিদ হিসেবে এখনো ‘মুনা’ নামটি উচ্চারিত হয়। শিক্ষকরা তাঁর খোঁজ রাখেন। অন্য মেয়েদের তাঁর গল্প বলে উদ্দীপ্ত করেন।

তিনি ঢাকা সেনানিবাসের অধীনে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট গার্লস পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়েছেন। ভর্তি হওয়ার পর কয়েক মাস যেতে না যেতেই শীত এসে গেল। কলেজে খেলার ধুম লাগল। পাড়াগ্রাম থেকে আসা লাজুক মেয়েটি তখন মাত্রই গুছিয়ে বসেছেন, সাবলেট থাকেন। নিজেকেই সব কাজ করতে হয়। কোনো কোনো দিন সংসার সামলে মা এসে মেয়ের কাজ করে দেন। তার পরও সব কাজ নিজেকে করতে হয়—রান্না করে হাত পুড়িয়ে ফেলেন। পড়ালেখায় সময় দিতে হয়। এত কষ্টের ভিড়ে যখন খেলার জন্য আগ্রহীদের নোটিশ ও নাম জমাদানের জন্য ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট গার্লস পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের ক্লাসে জানানো হলো, তখন আর থাকতে পারেননি মুনা। নামটি দিয়ে দিলেন। প্রথমবারের মতো শারীরিক শিক্ষক পেলেন। ক্লাস শেষে অনুশীলন করেন। ফলে সারা দিনের ক্লান্তি নিয়ে বাসায় ফিরে এলেও ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখতেন—তিনি ‘কলেজ চ্যাম্পিয়ন’ হয়েছেন। সে স্বপ্নটি পূরণের জন্যই তাড়াতাড়ি সব কাজ সেরে সকালে কলেজে ছুটতেন। ক্লাস শেষে বিপুল বিক্রমে অনুশীলনে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। তখন মায়ের কথা মনে পড়ত। মা নূরনাহার বেগম প্রায়ই বলতেন, ‘জানি, তুই খেলতে ভালোবাসিস, কিন্তু পাড়া-প্রতিবেশী, চেনাজানা লোকেরা তো মন্দ কথা বলে।’ এই বলে আঁচলে চোখ মুছতেন। পরে আবার বলতেন, ‘ভালো করে খেলিস, আমাদের মানসম্মান উজ্জ্বল করিস, নিজের দিকে খেয়াল রাখিস।’ সকালেই অনুশীলনের পোশাক পরে আসতে হতো বলে অনেকে আঁড়চোখে তাকাতেন, কিন্তু মুনা সেসবের পরোয়া করেননি, মনপ্রাণ দিয়ে খেলেছেন—ভালো যে তাঁকে করতেই হবে। সে পরিশ্রমের ফলে বাঘা খেলোয়াড়দের হারিয়ে প্রথম বর্ষের এই ছাত্রীটি ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের ডিসকাস থ্রো, শটপুট থ্রো ও জ্যাভলিন থ্রো—এই তিনটি ইভেন্টে প্রথম হলেন। ফলে ঢাকা বিভাগে খেলার জন্য কলেজ থেকে তাঁর নাম প্রস্তাব করা হলো। ঢাকা মহানগরী আন্ত জোন-২০১৪ প্রতিযোগিতায় হাইজাম্পে তিনি ব্যক্তিগত চ্যাম্পিয়ন হলেন, কলেজকে চ্যাম্পিয়ন করলেন। অথচ কলেজে তাঁদের অনুশীলনের বারই ছিল না! দ্বিতীয় বর্ষেও যথারীতি কলেজে ডিসকাস থ্রো, শটপুট থ্রো ও জ্যাভলিন থ্রোতে প্রথম হলেন। কলেজ থেকেও সেরা খেলোয়াড়ের উপাধি নিয়েই পাস করেছেন তিনি।

মুনা ২০১৫-১৬ সেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন। তাঁর পড়ার বিষয় ‘দর্শন’। শুরুতে শামসুন্নাহার হলের গণরুমে ঠাঁই হলো। তবে দিন কয়েকের মধ্যে জানলেন, ভালো খেলোয়াড়দের প্রথম বর্ষেই সিট বরাদ্দ দেওয়া হয়। আমি তো ভালো খেলি—শীত আসুক, আর তো মোটে কয়েক মাস বাকি; খেলতে গেলে তো আমাকে সিট না দিয়ে ম্যাডামদের উপায় থাকবে না—এই ভেবে কবে খেলা হয় সেই খোঁজে থাকলেন, কিন্তু কোনো নোটিশ নেই; হল অফিসের মামারা জানান, অন্ত হল বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পরই তো তাঁদের ভর্তি করা হয়েছে। আন্ত হল ক্রীড়া প্রতিযোগিতাও শেষ। হলের সেরা খেলোয়াড়দের বেছে নিয়ে সেই দল গঠিত হয়। মুনার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। তাহলে গণরুমেই আরো অনেক দিন কাটাতে হবে? তাঁর ভাগ্য ভালো যে তখনো ভলিবলের বাকি ছিল। উপায় না পেয়ে সেই দলের অনুশীলনেই নাম দিলেন। পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি লম্বা হওয়ায় বাড়তি সুবিধা পান, কিভাবে খেলায় মনঃসংযোগ করতে হয়, সহ-খেলোয়াড়দের উদ্দীপ্ত করতে হয়—তা তাঁর জানা। ফলে হল দলে জায়গা হয়ে গেল। পারফরম্যান্সও ভালো করলেন। এবার আর তাঁর সিট আটকাতে পারল না কেউ। বিকেলে নিশ্চিন্ত মনে প্রিয় ইভেন্টগুলোর চর্চা করলেন। কোনো দিন ভালো লাগলে সকালেও খেলেন। ফলে ২০১৭ সালে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময়ই শটপুট থ্রো ও হাইজাম্পে হলে প্রথম হলেন, ডিসকাস থ্রোতে দ্বিতীয়! আন্ত হল ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি হলের নারী ক্রীড়াবিদদের মধ্যে হাইজাম্পে প্রথম ও শটপুট থ্রোতে দ্বিতীয় হয়ে মুনা জানিয়ে দিলেন, ‘আমি এসেছি।’ হলের সিনিয়র-জুনিয়রদের সঙ্গে টেবিল টেনিসও বেশ খেলেছেন। ফলে সেইবারের আন্ত হল ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় টেবিল টেনিস ডাবলসে রানার্স-আপ হয়েছেন। আর এ বছরের অন্ত হল বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ডিসকাস থ্রো, শটপুট থ্রো ও হাইজাম্পে প্রথম হয়েছেন। সঙ্গে ৪০০–১০০ মিটার রিলে রেসে দলগতভাবে প্রথম হয়েছেন। আর ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আন্ত হল বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ২০১৮-তে’ হাইজাম্প, জ্যাভলিন থ্রোতে প্রথম; ডিসকাস থ্রো ও শটপুট থ্রোতে তিনি দ্বিতীয় হয়েছেন। মোট ১৬ পয়েন্ট পেয়ে মুনা ‘ব্যক্তিগত রানার-আপ’ হয়েছেন।

তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময়ই রানার-আপ! তা ছাড়াও মেয়েদের সাঁতার প্রতিযোগিতায় বাটারফ্লাই, ফ্রি স্টাইল ও ব্রেস্ট স্ট্রোক ইভেন্টেও প্রথম হয়েছেন। মেয়েদের মধ্যে তিনিই এবারের সেরা সাঁতারু। এই সাফল্যের রহস্য? তিনি হেসে বললেন, ‘আমার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মিসেস মন্দিরা চৌধুরী খুব কড়া ম্যাডাম। তবে তিনি খেলার সময় একেবারে বদলে যান। অনুশীলনে আসেন। এমনকি আমাকে নাম ধরে ডেকে ভালো খেলতে উত্সাহ দেন। আর বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রেবেকা সুলতানা দেখা হলেই উত্সাহ দেন, ক্লাসেও আমার খেলার সাফল্যের গল্প করেন। আমাদের প্রভাষক অরিনা খাতুন জিনিয়া ফোন করে অভিনন্দন জানান। নানা সময় খোঁজ নেন। হল প্রভোস্ট পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক ড. সুপ্রিয়া সাহা যখন যে সহযোগিতার প্রয়োজন করেন, তিনি না থাকলে অবশ্যই এ সাফল্য পেতাম না। বিভাগের বন্ধুরাও খেলার সময় মাঠে যায়।’ লেখাপড়া শেষে তিনি অবশ্য সরকারি চাকরি করবেন। কারণ সেটি স্থায়ী চাকরি। যত দিন পারেন খেলা চালিয়ে যাবেন।



মন্তব্য