kalerkantho


প্রাপ্তির বিনোদন খেলা

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) এবারের অন্তঃ বিশ্ববিদ্যালয় ব্যাডমিন্টনে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন আনিকা তাসনিম প্রাপ্তি। তিনি তাঁর গল্প বলেছেন শাওন আবদুল্লাহকে

১১ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



প্রাপ্তির বিনোদন খেলা

যত দূর স্মৃতিতে আবছা মনে পড়ে, কোনো এক পাতাঝরা বিকেলে আমার খেলার শুরু। ঢাকার কাকরাইলের সার্কিট হাউস কলোনির মাঠে থাকতাম আমরা। কলোনির মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে দৌড়ে বেড়াতাম; গোল্লাছুট, বৌছি, সাতচারা আর এক্কাদোক্কা খেলতাম সবাই মিলে। সেই থেকে খেলার প্রতি আমার ভালোবাসা। ভর্তি হয়েছিলাম ঢাকার নামি ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে। প্রথম শ্রেণি থেকেই স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় নাম দিতাম। আকারে ছোটখাটো বলে লম্বা-চওড়া মেয়েদের হারিয়ে কপালে পুরস্কার জুটত না। তবে খারাপ লেগেছে—জিততে পারবে না বা হেরে যাওয়ার ভয়ে আমার ক্লাসের বা সিনিয়রদের অনেকেই খেলায় নাম দিতেন না। তবে খেলা বিনোদন বলে কখনো পুরস্কারের আশা করতাম না। চতুর্থ শ্রেণিতে উঠে প্রথম পুরস্কার জিতলাম। তা-ও আবার দড়ি লাফে সেরা! চমকেই গিয়েছিলাম। মজার ব্যাপার হলো, কোনো এক খেলাপাগল বন্ধু সেটি সরিয়ে ফেলেছিল। বাসায় এসে আমার সে কী কান্না! মা তখন সাহস দিয়ে বলেছিলেন, ‘বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পুরস্কার চুরি হয়েছে আর তোমার হয়েছে জীবনের প্রথম ক্রেস্ট চুরি; তাঁর মতো তোমার পুরস্কারের মূল্য কম নয়।’ আর স্কুলে এত মেয়ের ভিড়ে পুরস্কার জিতে যতটা না বিখ্যাত হয়েছি, সেটি হারিয়ে তার চেয়েও বিখ্যাত হয়ে গেলাম। শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক বীণা আপা প্রতিদিন পিটি ক্লাসে পুরস্কারটি কেউ পেয়ে থাকলে ফেরত দেওয়ার অনুরোধ করতেন। এভাবে স্কুলের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পুরস্কার হারানোর ঘটনায় আমার নাম ছড়িয়ে পড়ল। ছাত্রীদের বলে বলে সপ্তাহ দুয়েক পরে বীণা আপা আমার ক্রেস্ট উদ্ধার করে দিলেন। হারানো পুরস্কার ফিরে পেয়ে খেলার প্রতি আমার আগ্রহ বেড়ে গেল। সেই থেকে প্রতিবছর বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় হাইজাম্প, লংজাম্প বা ডিসকাস থ্রোতে প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় হয়েছি। তবে বলে রাখি, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় আমি ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছি। ফলে ছাত্রী হিসেবেও ছোটবেলা থেকেই ভালো ছিলাম। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় ক্লাসে নোটিশ এলো—ক্রিকেটের দল গড়া হবে। শুনেই আমি মাঠে হাজির! তখন দেখলাম, দিবা শাখার পিটি আপা দুই মেয়েকে ব্যাডমিন্টন প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। তাঁরা আন্ত স্কুল প্রতিযোগিতায় অংশ নেবেন। আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আপা খেলতে আসতে বললেন। ভালোই খেলছি দেখে কোচ বললেন, ‘ওকেও দলে নিয়ে নিন। ডাবলসে ভালো করবে।’, কিন্তু আপা তেমন গা করলেন না, আসলে দল গড়ার ব্যস্ততায় তিনি তো আমার খেলা দেখার সুযোগ পাননি। ফলে সেইবার নাম জমা দেওয়া হলো না; কিন্তু পরদিন আমার খেলা দেখে তিনি আফসোস করলেন—‘তোমাকে পাঠালে তো দলটি শক্তিশালী হতো।’ ব্যাডমিন্টনে নাম জমা দেওয়া তো শেষ! তবে তিনি আশাবাদী হয়ে বললেন, ‘পরের বছর অবশ্যই তোমাকে দলে নেওয়া হবে। অনুশীলন করতে থাকো।’ পরের বছর তিনিই আমাকে ফোন করে দলে যোগ দিতে বলেছেন। আমিও খেলতে আগ্রহী, কিন্তু এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে হবে বলে মা-বাবা ঢাকার বাইরে যেতে দিলেন না। খেলতে পারব না বলে খুব কান্না এলো। এসএসসি পরীক্ষা দিলাম। সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি পেলাম। আন্ত স্কুল ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতায় খেলতে না পারার দুঃখ ভুলে গেলাম।

আমি আমার কলেজের ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের কলেজ শাখায় পড়েছি। ২০১৬ সালের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় সিঙ্গলসে রানার-আপ ও ডাবলসে চ্যাম্পিয়ন হলাম। ফলে আমি যে খুব ভালো ব্যাডমিন্টন খেলি, সবাই জেনে গেলেন। আসলে আমার মা-বাবাও ভালো ব্যাডমিন্টন খেলেন। মা তছমিনা বেগম চৌধুরী ঢাকার ইডেন মহিলা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আর বাবা মো. ফজলুর রহমান ভূঁইয়া বাংলাদেশ সরকারের একজন যুগ্ম সচিব। দুজনেই খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী। বাবা ছোটবেলা থেকেই ফুটবল, দাবা ও ভলিবলে ভালো ছিলেন। মা আন্ত স্কুল প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন। শিক্ষকতা জীবনেও খেলেছেন। অনেক প্রতিযোগিতায় তাঁরা জুটি হিসেবে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। ব্যাডমিন্টনে তাঁরাই আমার কোচ। খেলার প্রতি আমার ভালোবাসার শুরুও তাঁদের মাধ্যমেই। সারা বছর কলোনির মাঠ তো ছেলেদের দখলেই থাকে; আমরাও কিছু বলি না। শীত এলে আমরা ব্যাডমিন্টন খেলতে নেমে যেতাম। তাদের সঙ্গে মাঠ দখল নিয়ে সামান্য কথা-কাটাকাটি করতে হতো। তার পরও অনেকের ভিড়ে কোনো এক কোণায় আমাদের মেয়েদের খেলতে হতো। সেভাবেই অনুশীলন করেছি। বাসায় এসে মা-বাবার কাছ থেকে টিপস নিয়েছি। মা আমার খেলার সময় মাঠেও থেকেছেন। খেলা দেখে ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড আয়োজিত আন্ত কলেজ ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতার জন্য কলেজ থেকে আমাকে নির্বাচিত করা হলো। ঢাকা মহানগরী বিভাগে ডাবলসে চ্যাম্পিয়ন হলাম। গ্যালারি ভরা ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকদের সামনে আমার মুকুট জয় হলো। সেই দৃশ্য কোনো দিন ভুলব না। পরের বছর কলেজের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ব্যাডমিন্টন সিঙ্গলসে চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। সে বছরও বোর্ড আয়োজিত আন্ত কলেজ ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতায় ডাবলসে ঢাকা মহানগরে চ্যাম্পিয়ন হয়েছি।

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে (বিইউপি) ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে ভর্তি হওয়ার পরপরই জানুয়ারিতে ‘স্পোর্টস উইক’ হলো। বিভাগের হয়ে নাম দিলাম।

সিঙ্গলসে প্রথমবার অংশ নিয়েই পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা হলাম। ফলে বিভাগের শিক্ষক, চেয়ারম্যান ও অনুষদের ডিন স্যারও খুব খুশি হলেন। তবে মা-বাবা এখন পড়ালেখায়ই বেশি উত্সাহ দেন। প্রতিযোগিতায় ভালো করলে খুশি হন, মা খেলা দেখতেও যান। আরো ভালো খেলার টিপস দেন। এখন আমরা ঢাকার পরীবাগে থাকি। ছেলেদের দখল থেকে মাঠে মেয়েদের খেলার সুযোগ করে নিতে এখনো যুদ্ধ করতে হয়।

মেয়েদের আরো খেলায় উত্সাহ দেওয়া প্রয়োজন, তাদের খেলা নিয়ে কোনো বাজে মন্তব্য করলে তারা তো আর খেলতে যেতে আগ্রহী হবে না। ফলে খেলার চর্চা থেকেই মেয়েরা সরে যাবে।



মন্তব্য