kalerkantho


যেভাবে চাকরি পেলাম

সাফল্য-ব্যর্থতার হিসাব করা হয়ে ওঠে না

জুতসই একটি চাকরি বগলদাবা করা সহজ কর্ম নয়। তামান্না তাবাসসুমকে চাকরি পাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়েছেন অগ্রণী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল অফিসার আব্দুল মোহাইমেন

৯ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



সাফল্য-ব্যর্থতার হিসাব করা হয়ে ওঠে না

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগ ছাত্র-ছাত্রীর মতো আমারও লক্ষ্য ছিল বিসিএস।

৩১ ও ৩৪তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষায় টিকেছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর স্বপ্ন পূরণ হয়নি। থিতু হয়েছি ব্যাংকিং সেক্টরে। তবে আমার চাকরিজীবনের শুরু অনেক আগেই। আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান, কবে চাকরি পাব এ চাপটা ছিল, তাই মাস্টার্সের থিসিস পেপার জমা দেওয়ার পরের সপ্তাহেই কাজে ঢুকে পড়ি। অগ্রণী ব্যাংকে কাজ করার আগে দুটি প্রাইভেট ফার্মে কাজ করেছি। আবুল খায়ের গ্রুপে মানবসম্পদ ও অ্যাডমিন অফিসার হিসেবে এবং সিপি বাংলাদেশ লিমিটেডে মানবসম্পদ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করি বেশ কিছুদিন।
বিসিএস স্বপ্ন ভাঙার পরে ব্যাংকে চাকরি করব —এমনটাই লক্ষ্য ছিল। এক বড় ভাই আইবিএর এমবিএ ভর্তি পরীক্ষার কোচিং করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। পড়াশোনা-অফিস একসঙ্গে সামলানো বেশ কষ্টকর ছিল, দুই মাস পরে কোচিং ছেড়ে দিই। সত্যি বলতে এই দুই মাসের কোচিংটাই আমাকে অনেক সাহায্য করেছে। ব্যাংকগুলোর ভর্তি পরীক্ষায় ভালো করার মূলমন্ত্র হচ্ছে ইংরেজি আর অঙ্কে দক্ষতা আর সময়জ্ঞান। আইবিএর এমবিএ ভর্তি কোচিংটা সেই দিক দিয়ে আমাকে অনেক সাহায্য করেছে।
বিসিএস ছাড়া যে কয়টি চাকরির পরীক্ষা দিয়েছি তার মধ্যে চারটিই ছিল ব্যাংকের। অগ্রণী ব্যাংক ছাড়াও সোনালী, কৃষি ও বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরির জন্য পরীক্ষা দিই। বাংলাদেশ ব্যাংক ছাড়া বাকিগুলোর লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণও হয়েছি। আমার একাডেমিক রেজাল্ট ভালো ছিল, ইংরেজি ভোকাবুলারি মোটামুটি ভালো ছিল, তাই লিখিত পরীক্ষায় আত্মবিশ্বাসী ছিলাম। যাঁরা ব্যাংকে চাকরি করতে চান, তাঁদের ইংরেজি শব্দ ভাণ্ডার সমৃদ্ধ রাখার পরামর্শ দেব, সেই সঙ্গে বিভিন্ন বছরের ব্যাংকের লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র, আইবিএর এমবিএ ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সমাধান করলে লিখিত পরীক্ষায় ভালো করা সহজ হয়।
ভাইভা বোর্ডের ব্যাপারে আমি খানিকটা নার্ভাস। কারণ আমার বিসিএস ব্যর্থতা এই ভাইভা বোর্ডে গিয়েই। তবে নিজেকে নিজেই প্রবোধ দিতাম এই বলে যে ‘এই চাকরিটা না পেলে জীবন শেষ হয়ে যাবে না, সামনে আরো সুযোগ আসবে। ’ এ চিন্তাটা আমাকে স্বাভাবিক থাকতে সাহায্য করেছে। প্রায় সব ভাইভা বোর্ডেই নিজের পরিচিতি জানতে চায়। এটা অনেকটা ফার্স্ট ইম্প্র্রেশনের মতো। তাই বাংলা ও ইংরেজিতে নিজের পরিচয় এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো মিলিয়ে একটা স্পিচ আগেই তৈরি করে রেখেছিলাম। প্রাইভেট ফার্মগুলোর ভাইভা বোর্ডে দেখেছি সাধারণত বেশির ভাগ প্রশ্ন ইংরেজিতে করে।
অগ্রণী ব্যাংকের ভাইভায় আমাকে ভাইভা বোর্ডের একজন সদস্য জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘এখানে আপনার কাজটাই আর্থিক লেনদেনের। অনেকেই অসত্ পন্থা অবলম্বন করেন, এ ক্ষেত্রে আপনার কি মনে হয় সবার প্রথমে কার কাছে দায়বদ্ধ থাকা উচিত?’ আমি উত্তরে বলেছিলাম, ‘প্রথম দায়বদ্ধতা অবশ্যই নিজের বিবেকের কাছে। ’ তাঁরা আমার এই উত্তরের অনেক প্রশংসা করেছিলেন।
স্কুলজীবন থেকে ডিবেট করতাম, তাই আমার কমিউনিকেশন স্কিল ভালো। ডিবেটিং আমার আত্মবিশ্বাস অনেকখানি বাড়িয়ে দিয়েছে। শুধু ভাইভা বোর্ড না, জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে আমি মানুষের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে অনুভব করেছি ডিবেটিং আমার ভাষা, শব্দ, উচ্চারণ সব কিছুতেই কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। যারা এখনো ছাত্র, তাদের আমি বলব পারফর্মিং আর্টস বা কোনো সৃষ্টিশীল কাজে নিজেদের জড়িত করতে। যত বেশি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়বে তত বেশি আত্মবিশ্বাস বাড়বে।
এবার আমার বর্তমান চাকরির গল্পটা বলি। ব্যাংকে প্রথম যেদিন জয়েন করলাম অনেক বেশি উত্তেজিত ছিলাম। কিন্তু জয়েন করার পর কাজের চাপ দেখে সব উত্সাহে যেন ভাটা পড়ে গেল। কিভাবে কী করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আমার সহকর্মীরা আমাকে অনেক বেশি সাহায্য করেছেন। এখনো আমি অনেক কিছু তাঁদের কাছে শিখি। গ্রাহকসেবা দেওয়াটা অনেক ধৈর্য আর শ্রমের কাজ। বিভিন্ন ধরনের মানুষের সঙ্গে সারা দিন কাজ করতে হয়। গ্রাহকদের কাছ থেকে অনেক সময় খারাপ ব্যবহারও পেয়ে থাকি। প্রথম প্রথম মন খারাপ হতো। এখন নিজেকে বোঝাতে পেরেছি কেউ আমার দিন খারাপ করলেও আমি আমার গ্রাহকদের দিন খারাপ করতে পারি না, তাঁদের হাসিমুখে সেবা দেওয়াটাই আমার কাজ। প্রতিদিন নানা ধরনের গ্রাহকের সঙ্গে ডিল করতে হয়। এই তো সেদিন একজন গ্রাহক এসে বললেন, ‘আমার অনেক তাড়া আছে। চুলায় তরকারি বসিয়ে এসেছি, লাইনে দাঁড়াতে পারব না। ’ এমন অনেক মজার অভিজ্ঞতা হয় প্রতিদিন। সারা দিনের কর্মব্যস্ততা শেষে ঘরে ফিরে এতটাই ক্লান্ত লাগে যে ঘুমিয়ে পড়ি। সাফল্য-ব্যর্থতার হিসাব আর করা হয়ে ওঠে না।


মন্তব্য