kalerkantho


কী হচ্ছে কাতালোনিয়ায়

তামান্না মিনহাজ   

৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



কী হচ্ছে কাতালোনিয়ায়

স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল কাতালোনিয়ার স্বাধীনতাপন্থী সরকার বিলুপ্ত করে গত ২১ ডিসেম্বর আগাম নির্বাচন দেয় কেন্দ্রীয় সরকার। তাতে ফের স্বাধীনতাপন্থীদেরই জয় হয়েছে। গত অক্টোবরে এই অঞ্চলের স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোটের আয়োজন করা হয়। পক্ষের শক্তি জয়ী হলেও তা মনঃপূত হয়নি স্প্যানিশ সরকারের। স্বাধীনতার গলা টিপে ধরতে নানা রকম চেষ্টা চালালেও শেষ পর্যন্ত জনমত আবারও তাদের বিরুদ্ধে গেল।

 

অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

গণভোটের প্রক্রিয়া শুরু হয় গত সেপ্টেম্বর থেকে। স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোট হয় অক্টোবরে। ফলাফল যায় স্বাধীনতার পক্ষে। সে সময় ৪৩ শতাংশ লোক ভোটে অংশ নেয়। অভিযোগ রয়েছে, ভোট বানচাল করার সব চেষ্টা চালায় স্পেন সরকার। স্বাধীনতাপন্থীদের দাবি, সেবার পক্ষে ভোট পড়েছিল ৯০ শতাংশ। এর কয়েক দিনের মাথায় স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে বসে কাতালান পার্লামেন্ট। এই সময়টিতে পৌঁছেই কঠোর অবস্থান নেয় স্পেন। তারা কাতালোনিয়ার পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে সরকারকে বরখাস্ত করে। স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলটি সরকারের প্রত্যক্ষ শাসনের আওতায় আনা হয়। বরখাস্ত হওয়া কাতালোনিয়ার প্রেসিডেন্ট কার্লোস পুজদেমন তাঁর মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্যসহ আশ্রয় নেন বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে। মন্ত্রিসভার বাকি যেসব সদস্য দেশে ছিলেন, তাঁদের বিচারের সম্মুখীন করা হয়। পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার পর ২১ ডিসেম্বর আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী মারিয়ানো রাহয়। এরই প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি ভোট হলে তাতে ব্রাসেলস থেকেই অংশ নেয় পুজদেমনের স্বাধীনতাকামী দল টুগেদার ফর কাতালোনিয়া (জেএক্সসিএটি)। তারা পায় ৩৪টি আসন, রিপাবলিকান লেফট অব কাতালোনিয়া (ইআরসি) ৩২ এবং পপুলার ইউনিটি চারটি আসন পায়। কাতালোনিয়ার পার্লামেন্টে মোট আসনসংখ্যা ১৩৫টি। স্বাধীনতাকামী এই তিনটি দলের জোট মিলে মোট আসন পেয়েছে ৭০টি। অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে তাদের। যদিও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি তারা। বিধি অনুসারে নতুন কাতালান পার্লামেন্ট বসবে ২৩ জানুয়ারি। তাদের আঞ্চলিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করতে হবে ৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই। জয়ী জোটের নেতা দেশে ফেরেননি। কবে ফিরবেন, তার কোনো ইঙ্গিতও নেই। বরং বাতাসে গুজব, গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি ব্রাসেলস থেকেই সরকার পরিচালনা করবেন!

 

পরিকল্পনাহীনতা

বাস্তবতা হচ্ছে, অনিশ্চয়তার ঘেরাটোপ থেকে বের হতে পারেনি কাতালোনিয়া। স্বাধীনতার পক্ষে জনসমর্থন থাকলেও আন্তর্জাতিক সমর্থন বা গ্রহণযোগ্য কোনো রূপরেখা প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি স্বাধীনতাকামী নেতারা। যে কারণে হোঁচট খেতে হচ্ছে প্রতি পদে। গত অক্টোবর থেকে দুবার নির্বাচনে জেতার পরও নেতাদের সুস্পষ্ট অবস্থান নেই। বরং সরকার গঠন নিয়েই তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন শুরু থেকেই বলে আসছে, তারা কোনোভাবেই কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা মেনে নেবে না। ব্রিটেনের ইইউ ছেড়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এরপর স্পেন ভেঙে গেলে আবারও নতুন এক সংকটের মুখে পড়বে ইইউ। এখনই এ ধরনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তারা যেতে চাইছে না। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানিসহ বিশ্বের শক্তিশালী কোনো দেশ কাতালোনিয়ার পক্ষে নেই। ফলে কূটনৈতিকভাবেও পিছিয়ে আছে তারা।

 

এখন কী হবে?

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কাতালোনিয়ার ভবিষ্যৎ কী দাঁড়াবে, তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু এটি যে সংশ্লিষ্ট অঞ্চল ও সামগ্রিকভাবে স্পেনকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, সেটি নির্দ্বিধায় বলা যায়। এতে ইউরোভুক্ত অঞ্চলে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে।

স্পেনসহ ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র কাতালোনিয়ার বিরুদ্ধে গেলে স্থানীয়রা প্রথম যে সংকটের মুখোমুখি হবেন, তা হচ্ছে অর্থনীতি। বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধের সম্মুখীন হতে পারে কাতালোনিয়া সরকার।

কাতালোনিয়ার শক্তিশালী অর্থনীতি দুর্বল করার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ নিতে স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। স্বাধীনতার প্রশ্নে সৃষ্ট অস্থিতিশীল অবস্থায় কাতালোনিয়ার অর্থনীতিতে যে বাজে প্রভাব পড়বে।

স্পেনের মোট অর্থনীতির এক-চতুর্থাংশ আসে কাতালোনিয়া থেকে। তবে অস্থির পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এরই মধ্যে প্রায় এক হাজার ৭০০ প্রতিষ্ঠান তাদের প্রধান কার্যালয় কাতালোনিয়ার বাইরে নিয়ে গেছে। গণভোটের পর স্পেনের শেয়ারবাজারেও ধস নেমেছে। বিশেষ করে কাতালোনিয়ার ব্যাংকগুলোর শেয়ারে এর প্রভাব স্পষ্ট। তা ছাড়া স্পেনের মধ্যে কাতালোনিয়ায়ই সবচেয়ে বেশি বিদেশি পর্যটক যান। যা তাদের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু গণভোটের পর তাতেও ভাটা পড়েছে। ফলে আবেগের দিক থেকে স্বাধীনতার প্রশ্নে কাতালানবাসী নিজেদের বিজয়ী মনে করলেও বাস্তবতা বলছে, হিতে বিপরীত হবে। ফলে কাতালোনিয়া স্বাধীনতার দাবি থেকে সরে আসতে পারেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।


মন্তব্য