kalerkantho


ধারাবাহিক গল্প
তিন গোয়েন্দা

আকাশদস্যু



আকাশদস্যু

কাহিনি রচনা : কাজী শাহনূর হোসেন, তিন গোয়েন্দায় রূপান্তও : শামসুদ্দীন নওয়াব, আঁকা : মানব

গত সংখ্যার পর

 

‘আরি!’ বলে উঠল কিশোর, ইঞ্জিন বন্ধ করল।

‘আরি?’ পুনরাবৃত্তি করল হার্ডি।

হিমবাহর তলদেশে এখন ওরা, মাটির সমান্তরালে। গিরিগুহাটা দুই কি তিনতলা উঁচু। দেয়ালগুলো আর ছাদটা বরফের, কিন্তু মেঝেটা পাথুরে।

 

খরস্রোতা এক জলপ্রবাহ এক পাশ দিয়ে বয়ে চলে বেরিয়ে গেছে অপর পাশ দিয়ে।

গিরিগুহার মাঝখানে, গাছের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি ইয়া বড় এক মাচানের সঙ্গে বল্টু দিয়ে এঁটে রাখা হয়েছে বিমানের তিনটি গর্জনরত ইঞ্জিন। এগুলো সব ডিসি-৩ উড়োজাহাজের রেডিয়াল পিস্টন ইঞ্জিন।

ওগুলোর ঘূর্ণমান প্রপেলার অবিরাম টেনে আনছে বাইরের অস্থির বাতাস এবং বরফশীতল খাঁড়িটার ওপাশে অন্তহীনভাবে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে, আর একই সঙ্গে হিমবাহর চূড়ার বরফের ফাটলগুলো দিয়ে বের করে দিচ্ছে।

‘এটা বেরিয়ে আসছে—অনেকটা কুয়াশার মতো!’ বলল কিশোর।

‘কী?’ হার্ডির প্রশ্ন।

‘বললাম, এই যে আপনার হুংকার ছাড়া ‘মহান ইয়েতি!’ আর এটা হচ্ছে তথাকথিত জাদুকরের মেঘযন্ত্র!’

‘ঠিক!’ চিল্লানো সরাসের মতো চিৎকার করে বলল হার্ডি। ‘গরম বাতাস ঠাণ্ডা পানি থেকে আর্দ্রতা টেনে নেয়। এটা রেডিমেড মেঘের এক নিয়মিত উৎস।’

‘লোকে যে বোকা বনে, তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই।’ চেঁচাল কিশোর। ‘এখন বুঝলাম, কেন ও প্লেন হাইজ্যাক করে। সেই সঙ্গে তেল আর স্পেয়ার পার্টস।’

‘এগুলো সম্ভবত বহুদিন টেকে।’ চিৎকার করে বলল হার্ডি। বেশির ভাগ বয়স্ক মানুষের মত—এমনকি তরুণদের মতও—জ্ঞান দিতে ভালোবাসে সে, তাই আরো যোগ করল—‘স্টার্ট আপের পরই, গরম হওয়ার আগেই যেকোনো ইঞ্জিনের যা ক্ষয় হওয়ার, তার বেশির ভাগটুকু হয়ে যায়। কোনো ইঞ্জিন অপারেটিং টেম্পারাচারে পৌঁছলে ক্ষয় খুব কমে আসে। বিশেষ করে ওটা যখন অবিরাম গতিতে চালু থাকে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে, ভণ্ড ফেলিক্স ৫০ বছর ধরে দিনে ২৪ ঘণ্টা করে এই ইঞ্জিনগুলো চালানোর মতো এত বিপুল পরিমাণ গ্যাসোলিন পায় কোথায়?’

‘পায় না।’ চেঁচাল কিশোর। পাথরখণ্ডগুলোর কাছ থেকে বরফের নিচে চলে গেছে এমন এক প্লাস্টিকের নমনীয় লাইন দেখাল আঙুলের ইশারায়। ওটা অনুসরণ করে চলে এলো একটি মিটার বক্সের কাছে, ওটা যেখানে শাখা বিস্তার করেছে, ইঞ্জিন তিনটির কার্বুরেটরে।

‘প্রাকৃতিক গ্যাস।’ চেঁচাল কিশোর। ‘ও এক পাতাল কুয়ায় ট্যাপ করেছে।’

‘ওকে শুধু কার্বুরেটরগুলো খানিকটা পরিবর্তন করে নিতে হয়েছে।’ চেঁচিয়ে বলল হার্ডি। ‘চায়না বিল সব সময় বড়াই করতেন, তাঁর নিখোঁজ পার্টনার খুব চালু মেকানিক ছিল। তো এটাই তাঁর জাদু—গোপন বিজ্ঞান!’

‘জাদুর পেছনে সব সময় সম্ভবত বিজ্ঞানেরই হাত থাকে।’ চেঁচাল কিশোর। ‘তবে আমিও অল্পস্বল্প জাদু জানি।’ দু-আঙুলে লাইনটা চেপে ধরল ও। ইঞ্জিনগুলো যেন বিষম খেয়ে খক খক করে কেশে উঠল—প্রথমে একটা, তারপর দ্বিতীয়টা, এবার তিনটাই।

তিনটা ইঞ্জিনই একটু পরে থেমে গেল।

অটুট নিস্তব্ধতা নেমে এসে কানে যেন তালা লাগিয়ে দিল।

 

‘ওঠো!’ বলল মুসা।

‘জ্বালিয়ো না তো!’ আরিসা গজগজ করে পাশ ফিরল। ও স্বপ্ন দেখছিল, ওর মা বেঁচে আছে এবং ওকে আবার খুঁজে পেয়েছে। এটা ওর প্রিয় স্বপ্ন। এ মুহূর্তে ঘুম ভেঙে জেগে ওঠে কারাগারের নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে চায় না মেয়েটি।

‘ওঠো!’ জোরে ফিসফিসিয়ে বলে, ওকে ঝাঁকাল মুসা।

‘ভালো খবর আছে!’ যোগ করল রবিন।

‘ভালো খবর?’ আরিসা উঠে বসল। ‘কী খবর?’

‘মুক্তি।’ মৃদু হেসে ফিসফিসাল রবিন।

‘তোমাদের বন্ধুরা এসেছে?’ হাঁচড়ে-পাঁচড়ে সটান সিধে হলো আরিসা।

‘একজন।’ বলল মুসা। সরু জানালাটার কাছে হেঁটে গেল।

‘যার চেয়ে ভালো বন্ধু আর হয় না।’ বলল, রবিন, ও আর আরিসা অনুসরণ করল মুসাকে।

জানালা দিয়ে চাইতেই দুটি খুদে খুদে কালো চোখ আর একটা ছোট কালো নাক দেখল আরিসা।

‘এটা তো একটা কুকুর!’ বলল ও।

‘হুফ, হুফ।’ ডাকল বাঘা।

‘শশশ।’ ফিসফিস করে বলল রবিন। গরাদের ফাঁক দিয়ে সেলে তুলে নিয়ে এলো বাঘাকে। ‘ওর নাম বাঘা। ওর সঙ্গে সাবধানে কথা বোলো।’

‘হ্যাঁ।’ বলল মুসা। ‘ও যে খুব আবেগপ্রবণ তা নয়, তবে তোমার কথায় মাইন্ড করতে পারে।’

‘তোমাদের মাথায় গোলমাল আছে!’ বলল আরিসা।

‘তাই বুঝি?’ দাঁত বের করে হাসল মুসা। ‘দেখো, ও আমাদের জন্য কী নিয়ে এসেছে।’

বাঘার মুখ থেকে খসানো ছোট কাঠের বাক্সটা খুলল ও। তালা খোলার চকচকে সব যন্ত্রপাতিতে ঠাসা ওটা।

‘যাদের ওপর বিশ্বাস রাখা যায়, সেসব ছেলে-মেয়েকে জাগাও।’ বলল রবিন। ‘ভোর হয়ে এসেছে প্রায়। দিনের আলো ফোটার আগেই পালানোর চেষ্টা করতে হবে আমাদের।’

আরিসা এরই মধ্যে সেলজুড়ে হেঁটে বেড়াতে শুরু করেছে, ঘুমন্ত দেহগুলোকে আলতো লাথি মারছে।

‘উঠে পড়ো, ওমারি! ওঠো, সিসনা! ওঠো, ড্রিনা! গোইজু, ওঠো! ওঠো!’

‘আস্তে আস্তে!’ ফিসফিস করে বলল রবিন। ‘সবাইকে নয়, আমি বলেছি যাদের বিশ্বাস করা যায়!’

আহত দেখাল আরিসাকে।

‘আমরা এখানে সবাই একজনের জন্য এবং একজন সবার জন্য।’ বলল ও। ‘আমরা একে অন্যকে বিশ্বাস করি।’

‘খুব ভালো।’ বলল মুসা। সেলের তালা খুলতে ঝুঁকে পড়েছে ও। ‘এখন দেখা যাক, তালা খোলার এই যন্ত্রপাতিগুলো কেমন কাজের!’

 

সতেরো

বিশাল দুর্গের অনেক নিচে, আলগোছে বেরিয়ে এসে জনগণের সঙ্গে মিলিত হতে খুদে লামা যে গোপন সুড়ঙ্গটি বহু বছর আগে বানিয়েছিলেন, সেটি ধরে জি লিং ও তাঁর অহিংস কমান্ডোরা পা টিপে টিপে বন্ধ লোহার ফটকটির দিকে এগিয়ে চলেছে—দুর্গের বেসমেন্টে যাওয়া যায় যেটি দিয়ে।

জি লিং ছাড়াও দলে আরো ১১ জন কমান্ডো রয়েছে। দুজন খালি হাত। অন্য ৯ জন কালো ইনস্ট্রুমেন্ট কেস বইছে। ওরা ১২ জন।

দুজন নৈশপ্রহরী ফটকটার পাহারায়, দুজনের কাছেই সাবমেশিনগান।

এবং দুজনই ঘুমোচ্ছে।

‘ভালো।’ নাক ডাকার শব্দ শুনে ফিসফিস করে বললেন জি লিং। ‘ওদের অস্ত্র আর চাবি হাতাতে হবে, ওদের না জাগিয়ে। তারপর দুর্গে ঢুকে, অন্য গার্ডদের নিরস্ত্র করব আমাদের গোপন অস্ত্র ব্যবহার করে, ওদিকে আকাশপথে আক্রমণ তো আসবেই।’

তাঁর কমান্ডোরা মাথা ঝাঁকিয়ে অনুসরণ করল।

জাদুকর ওয়াল্টারের ধোঁকাবাজি দেখেছে এবং বুঝেছে দেশের এমন কয়জন প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়ে গড়া হয়েছে জি লিংয়ের বাহিনী। তারা সবাই খুদে লামার একান্ত অনুগত, অন্ধভক্ত এবং তাঁর গোপন অস্ত্র ব্যবহারে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। প্রত্যেকে অহিংস নীতিতে অটল বিশ্বাসী।

এবং এরা সবাই-ই বাজনদার।

বিশেষ এই অপারেশনের জন্য নিজের প্রিয় দুজনকে বেছে নিয়েছেন জি লিং। একজন ৩০০ পাউন্ড ওজনের সাবেক কুস্তিগির হার্ক, এক কুচকাওয়াজ ব্যান্ডে হারমোনিকা বাজাত সে। আরেকজন র‌্যাচেল নামে ৯০ পাউন্ড ওজনের এক ট্যারট টিচার, একই ব্যান্ডে হারমোনিকা বাজাত সে-ও।

জি লিং উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছেন, হার্ক আর র‌্যাচেল ঘুমন্ত প্রহরীদের কয়েক ফুটের মধ্যে পৌঁছে গেল।

হারমোনিকা বের করে বাজাতে লাগল তারা, প্রথমে মৃদু স্বরে, তারপর জোরে জোরে। ভূতুড়ে বাজনার শব্দে ভরে উঠল গোটা সুড়ঙ্গ।

প্রহরী দুজন চোখ মেলল—এবং স্মিত হেসে অস্ত্র নামিয়ে রাখল। ঘুমের ঘোরে যেন এপাশ-ওপাশ দুলতে লাগল তারা।

জি লিং আগে বাড়লেন, গরাদের ভেতর দিয়ে হাত ঢুকিয়ে অস্ত্র দুটি তুলে নিলেন।

‘চাবি কোথায়?’ প্রশ্ন করলেন।

হাসিমুখে তাঁর হাতে চাবি তুলে দিল প্রহরীরা।

‘কাজ হচ্ছে!’ তিনি কমান্ডোদের উদ্দেশে জোরালো ফিসফিসে স্বরে বলতেই, তারা মৃদু হর্ষধ্বনি করল।

খুদে লামার গোপন অস্ত্র হচ্ছে একটি গান, আমস্টার্ডামে বসবাসের সময় তিনি যেটি লিখেছিলেন। কোনো একসময় ধ্যানমগ্ন অবস্থায় সুরটা ঐশ্বরিকভাবে পেয়ে যান। এটি শুনলে যে কেউই শান্ত হয়ে যাবে—অন্তত যতক্ষণ বাজানো হবে আরকি।

পরিকল্পনা ছিল, দোতলায় অর্কেস্ট্রা বসিয়ে দুর্গজুড়ে বাজনা ছড়িয়ে দেওয়া হবে।

জি লিং ফটকটা খুলতেই কমান্ডোরা সুড়ুৎ করে ভেতরে ঢুকে পড়ল একে একে।

‘দাঁড়ান, দাঁড়ান।’ বললেন তিনি।

জানালার কাছে গিয়ে শিকের ফাঁকে একটা রকেট গুঁজলেন, ওটা যাতে মেঘলা আকাশের দিকে নিশানা করে থাকে।

‘খুদে লামাকে জানাতে হবে, আমরা ভেতরে ঢুকতে পেরেছি।’ বললেন ফিসফিস করে। ‘কারো কাছে ম্যাচ আছে?’

    (চলবে)


মন্তব্য