kalerkantho


ফোকাস

প্রাণের হাওয়া বারান্দায়

সোহানের পরীক্ষা শেষ। ‘এখন করবটা কী!’ ফারিয়া বলল, ‘কী ভালো লাগে সেটা আগে ভেবে দেখো!’ কী ভালো লাগে সোহানের? হঠাৎ চোখ বড় বড় হয়ে গেল। ‘গাছ! গাছ ভালো লাগে আমার।’ অনেক ইচ্ছা নিজেই একটা বাগান করার।’ কিন্তু কিছুই তো জানি না। কিভাবে কী করবে? জানাচ্ছেন সাদিয়া ইসলাম বৃষ্টি

২০ মে, ২০১৮ ০০:০০



প্রাণের হাওয়া বারান্দায়

সোহানের মতো তোমরা যারা বারান্দায় বাগান করবে ভাবছ, তারা আগেই জেনে নাও বাগান করা কিন্তু যেমন মজার, তেমন পরিশ্রমেরও। মাটিভর্তি টব ওঠানো, গোছানো, আগাছা পরিষ্কার, নিয়মিত পানি দেওয়া, নিজে নিজে জৈব সার তৈরি করা—কাজের কিন্তু শেষ নেই। আবার মাস শেষে যখন বারান্দাটা ঝলমল করে উঠবে ফুল আর পাতায়, তখন কিন্তু আনন্দের সীমাও থাকবে না।

 

কেমন গাছ চাই?

টবে লাগানোর ক্ষেত্রে গাছ দুই রকম। একটির জন্য যথেষ্ট সূর্যের আলো ও বাতাস লাগবে, অন্যটায় অতটা লাগবে না। বিশেষ করে ফুলগাছের জন্য সূর্যের আলো লাগবেই। ইনডোর প্লান্ট, যেমন—পাতাবাহার, মানিপ্ল্যান্ট—এসব গাছ অল্প আলোতেই টিকে থাকতে পারবে।

ইনডোর প্লান্ট বারান্দায় লাগিয়েছে হেনা। জানাল, ‘বাঁশগাছ ও মানিপ্লান্ট—এ দুটিকে বারান্দার এমন স্থানে রেখেছি, যেখানে খুব একটা যত্ন না পেলেও বেশ থাকবে গাছগুলো। এ জন্য ভালো শিকড়সহ কিছু ডাল কেটে পানিতে ডুবিয়ে রাখতে হয়েছে শুধু। আর মাসে একবার পানি বদলে দিলেই গাছগুলো ভালো থাকে।’ লতানো গাছও রাখতে পারো বারান্দার বাগানে। এ ক্ষেত্রে অনেকের পছন্দ নীল অপরাজিতা। কারণ এ গাছের যত্ন তেমন লাগে না বললেই চলে। প্রতিদিন পানিও দিতে হয় না। মাটি আর্দ্র থাকলেই হলো। তবে এর লতা তোমার পুরো গ্রিল ঢেকে দিতে পারে। তখন আবার গ্রিলের এ পাশে থাকা অন্য গাছগুলো সূর্যের আলো থেকে বঞ্চিত হতে পারে। সেই সঙ্গে বাহারি বারোমাসি মরিচের গাছও থাকুক কিছু। গাছ থেকে ছিঁড়ে রংবেরঙের তাজা মরিচ খাওয়ার মজাই আলাদা। পাশাপাশি ওষধিগাছ তুলসী-পুদিনাও রাখতে পারো। বাগানের তাজা পাতা ছিঁড়ে যখন-তখন খেতে পারবে হারবাল চা।

কম আলোতে সুন্দর বাগানের জন্য নিতে পারো সাকুলেন্ট ঘরানার গাছ। বড় নার্সারিতে মিলবে এগুলো। দাম খানিকটা বেশি হলেও এসব সাকুলেন্ট কম যত্নেই বেঁচে থাকে অনেক দিন।

 

কেমন টব চাই?

বারান্দার দেয়ালে, সিলিংয়ে ঝুলিয়ে এমনকি বারান্দার গ্রিলেও ঝুলিয়ে রাখতে পারো টব। এতে গাছগাছালির জন্য জায়গা পাবে প্রচুর। চেষ্টা করবে যেন টব কিংবা গাছের রং দেয়ালের রঙের সঙ্গে মিশে যায়। দেখতে যেন একেবারে বেখাপ্পা মনে না হয় পুরো বিষয়টি।

গাছ রোপণের ক্ষেত্রে মাটির পাত্রই সেরা। কারণ এগুলো অতিরিক্ত পানি শোষণ করতে পারে, আবার প্রয়োজনে সেই পানিটা শিকড়েরও কাজে লাগে। তবে প্লাস্টিক, সিরামিক কিংবা অন্যান্য পাত্র ব্যবহার করতে পারো। ক্লাস এইটপড়ুয়া নীলিমা বাড়ির বারান্দায় বাগান করতে গিয়ে প্রথমে বাড়ির ফেলে রাখা বড় পানির বোতলগুলোই ব্যবহার করেছে। তবে টব যেমনই হোক, তার নিচে কয়েকটা ছিদ্র ও একেবারে তলানিতে কিছু টুকরো পাথর রাখা চাই। এতে পানি জমবে না। পানি জমলে গাছের শিকড় নষ্ট হবেই।

পাখিদের আমন্ত্রণ

বাগান থাকবে আর সেখানে পাখি থাকবে না? খাঁচাবন্দি পাখি নয়। বলছি মুক্ত আকাশে উড়ে চলা পাখিদের কথা। কিন্তু ওরা তোমার বারান্দায় আসবে কেন? আসবে! ওদের দাওয়াত দিতে চাই ঝলমলে বারান্দা। গ্রিলের সঙ্গে বেঁধে দিতে পারো পানির পাত্র। পাখির দোকানে গেলেই পাবে ওটা। আর সম্ভব হলে আরেকটা পাত্রে পাখিদের জন্য কিছু খাবার (সিড মিক্স)। এমনও হতে পারে, বারান্দায় বড় কোনো পাতাবাহারের ঝোপে ওরা বাসাও বানিয়ে ফেলল!

 

বাগানের আসবাব

বাগান মানে যে পুরোপুরি জঙ্গল তা নয়। বাগানে রেখে দাও একটা কাঠ বা স্টিলের চেয়ার কিংবা টেবিল। টেবিলের ওপরও রাখো কিছু টব। কিছু লতানো গাছ টেবিল বা চেয়ারের পায়ার সঙ্গে রেখে দিতে পারো। কিছুদিন পর চেয়ারটাও হয়ে যাবে বাগানের অংশ। সেই চেয়ারে বসে একটা জমজমাট থ্রিলার গল্প পড়তে কেমন লাগবে, ভাবো একবার!

এদিকে বাগান কী শুধু দিনের জন্য। সুন্দর দেখানো চাই রাতেও। দরকার হবে লাইটিং। এ ক্ষেত্রে কোমল আলোর এলইডি লাইটের লতাগুলো পাবে বেশ কম দামে। আজকাল প্রায় সব বাতির দোকানেই পাওয়া যায় বাহারি এলইডি। আলো দেখে যদি আবার পোকারা ভিড় জমায়, তবে নেট লাগাতে হবে।

 

টিপস

❏ বারান্দার মাপটা বের করে, কাগজে স্কেচ করে প্ল্যান করলে অনেক সময় বাঁচবে। আজকাল গুগল সার্চ করেও পেতে পারো ব্যালকনির বাগানের হরেক নকশা।

 

❏ প্রথমেই অনেক বেশি গাছ লাগাতে যেয়ো না। হতে পারে কিছুদিন পরে সময় দিতে পারছ না। তখন গাছগুলো পড়বে বিপদে। শুরুতে এমন সব গাছ দিয়ে বারান্দা সাজাও, যেগুলোর যত্ন কম নিলেও চলে।

 

❏ বারান্দায় সূর্যের আলো ঠিক কতটা ও কত সময় পাচ্ছ—সেটা আগে বের করে নাও। একবারেই আলো না পড়লে ছাদেই গাছ লাগাও। আর না হয় কম আলোতে টিকে থাকে এমন ইনডোর প্লান্ট বেছে নিতে পারো। এ ক্ষেত্রে নয়নতারা ফুল কিন্তু দারুণ।

 

❏ বাগান যেহেতু তোমার, তাই এর খরচটাও সামাল দিতে হবে। জমানো টাকাই তো ভরসা! তাই আগে বাগানের জন্য গাছের দামদর জেনে নাও। বাসার কাছে সরকারি হর্টিকালচার সেন্টার থাকলে সেখানে ঢু মারো। কম দামে ভালো চারা সেখানেই পাবে। তবে এ ক্ষেত্রে বীজ থেকে যদি চারা গজানোর টেকনিক শিখে যাও, তাহলে সেটাই ভালো। খরচটা হবে শুধু মাটি আর টবে। 

 

❏ পানির কথা মাথায় রেখো। সব গাছে এক রকম পানি দেওয়ার দরকার পড়ে না। এখন যেহেতু গরমের সময়, তাই বারান্দায় সরাসরি সূর্যের কড়া আলো পড়লে ভোর ও বিকেলে দুবেলা পানি দিতে হবে। আর শীতের সময় প্রয়োজন বুঝে দিনে একবার দিলেই হবে। ছোট গাছে বা চারায় বৃষ্টির পানি সরাসরি না পড়লেই ভালো।

 

❏ তুমি বাড়িতে না থাকলে বা লম্বা ছুটিতে গেলে বাগানের যত্ন কে নেবে—সেটা আগেই ঠিক করে নাও। তা না হলে এক ছুটিতেই বারান্দার বাগান হয়ে যাবে সাহারা মরু।

 

❏ বাড়তি করে গাছে সার দেওয়ার ক্ষেত্রে জৈব সারই ভালো। ইউটিউবে ‘হাউ টু মেক অর্গানিক ফার্টিলাইজার অ্যাট হোম’ লিখলে অনেক অনেক টিউটরিয়াল আসবে।


মন্তব্য