kalerkantho


গল্প

তিন গোয়েন্দা : আকাশদস্যু

কাহিনি রচনা - কাজী শাহনূর হোসেন
তিন গোয়েন্দায় রূপান্তও - শামসুদ্দীন নওয়াব
আঁকা - মানব

৩ জুন, ২০১৮ ০০:০০



তিন গোয়েন্দা : আকাশদস্যু

‘আমাকে ফলো করুন!’ আদেশ করে বিশাল দুর্গের বেসমেন্টের প্রশস্ত পাথুরে সিঁড়ির ধাপগুলো ভেঙে দৌড়ে উঠতে লাগলেন জি লিং। ইনস্ট্রুমেন্ট কেসগুলো শক্ত করে আঁকড়ে ধরে অনুসরণ করল কমান্ডোরা।

সিঁড়ির মাথায় কাঠের ভারী এক দরজা। জি লিং সুড়ঙ্গ প্রহরীদের কাছ থেকে নেওয়া সাবমেশিনগানের গুলিতে উড়িয়ে দিলেন তালা এবং কমান্ডোদের পেছনে নিয়ে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়লেন দুর্গের মূল লবিতে।

 

দুর্গ প্রহরীরা গুলির শব্দ পেয়েছে; হলে আশ্রয় নিয়েছে তারা। জি লিং তাদের বিভ্রান্ত, আতঙ্কিত কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেন।

‘অস্ত্র নিয়ে হামলা চালাল কারা? দুর্গে ঢুকল কিভাবে?’

‘সব কিছুই এখন অবধি ভালোয় ভালোয় চলছে।’ বললেন জি লিং। ‘এখন শিগগিরই সেট-আপ করে ফেলি, আসুন।’

‘হাতিয়ার নামিয়ে রাখুন, নয়তো গুলি করব!’ প্রাসাদের প্রহরীরা চেঁচাল হলওয়ে থেকে।

‘ওরা যদি গুলি করতে করতে বেরিয়ে আসে?’ র‌্যাচেলের প্রশ্ন।

‘তাহলে আমরা শেষ।’ বললেন জি লিং। অস্ত্র তুললেন। ওদের দু-একজনকে সঙ্গে নিয়ে মরতে পারলে কোনো আফসোস থাকবে না আমার। বললেন মনে মনে। তাঁর মেয়েকে অপহরণ ও হত্যার জন্য ওদের মনে-প্রাণে ঘৃণা করেন তিনি।

কিন্তু শয়তান জাদুকর ও তার পাহারাদারদের প্রতি তাঁর চরম ঘৃণায় ভারসাম্য এনেছে খুদে লামার প্রতি তাঁর অগাধ শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা।

‘এখন টিউন আপের সময় নেই।’ বাজনদার কমান্ডোদের উদ্দেশে বললেন জি লিং। তারা এ মুহূর্তে কেস থেকে বেহালা, সেলো আর বাঁশি বের করছে। “সিক্রেট ওয়েপন সুইট’ বাজাতে শুরু করুন। এটাই খুদে লামার শিক্ষা। এক। দুই। তিন—”

এতে কাজ হলেই হয়! ভাবলেন তিনি।

 ‘কী করছেন আপনি?’ চেঁচালেন বব আর্থার। ‘এক জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছেন কেন?’

‘ধ্যান করছি।’ জানালেন খুদে লামা। বিশাল দুর্গ থেকে এখনো কয়েক শ গজ দূরে তাঁরা; কিন্তু খুদে লামা অবিরত একই জায়গায় পাক খেয়ে চলেছেন।

‘নষ্ট করার মতো সময় নেই!’ বললেন বব আর্থার। ‘পাগলা জাদুকর ফিতা কেটে আমার বন্ধুদের নিচে ফেলে দেওয়ার আগেই ওই ব্যালকনিটায় পৌঁছতে হবে আমাদের।’

কিন্তু খুদে লামা শুনলেন না কিংবা মনে হলো, শুনতে চাইলেন না।

‘এলএলের মতো করেই কাজটা করতে হবে আমাদের।’ বলল সিং। ‘উনি হয়তো মেঘ সরে গিয়ে রোদ ওঠার জন্য প্রার্থনা করছেন।’

‘হুম, আমরা যদি আরো উচ্চতা হারাই, তাহলে টপ ব্যালকনিতে হিট করতে পারব না।’ বললেন বব। ‘এবং আরো সময় নষ্ট হলে হিরন পাশা আর চায়না বিলকে বাঁচানো যাবে না।’

‘প্রার্থনায় নিশ্চয়ই কাজ হচ্ছে।’ বলল সিং। ‘মেঘের বুকে একটা গর্ত দেখতে পাচ্ছি!’

হিমবাহর উদ্দেশে চোখ তুলে চাইলেন বব আর্থার। পরের মুহূর্তে এক চিলতে নীল আকাশ দেখে চমকে গেলেন।

‘হলো।’ বললেন তিনি। ‘কিন্তু এখন প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হওয়ার সময় নয়।’

ঠিক এমন সময় খুদে লামা, হাসিমুখে দড়িতে টান দিয়ে, তাঁর প্যারাসেইলটা নিয়ে ঝাঁপালেন, বিশাল দুর্গ লক্ষ্য করে।

‘জেরোনিমো!’

 

‘দারুণ মজা না?’

চায়না বিল আর হিরু চাচা না-সূচক মাথা নাড়ল।

‘আশ্চর্য! আপনারা এমন কেন? একটু মজা নিতেও জানেন না!’ বলল, জাদুকর ওয়াল্টার কিংবা ভণ্ড ফেলিক্স।

ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ওয়াল্টার আকাশ কারাগারটি চেয়ে চেয়ে দেখছে, কাছের এক নিচু দেয়াল থেকে এক কাঁচা চামড়ার ফিতায় ঝুলছে ওটা।

ব্যালকনিতে তার পাশে দাঁড়িয়ে, নিচে প্রতিফলন পুকুর ঘিরে সমবেত জনতার উদ্দেশে হাত নাড়ছে নকল খুদে লামা—হলোগ্রাফিক ইমেজ। ছবিটা হাত নাড়ছে এবং নিচে জড়ো হওয়া লোকজন হর্ষধ্বনি করে পাল্টা হাত দোলাচ্ছে।

জনতা যতই জোরে চেঁচাচ্ছে, খুদে লামা ততই উজ্জ্বলতর হচ্ছে।

‘গাধার দল!’ বিড়বিড়িয়ে বললেন চায়না বিল।

‘হলোগ্রাফটাকে শক্তি জোগাচ্ছে কিসে?’ হিরু চাচা জানতে চাইল।

ফেলিক্স ওরফে ওয়াল্টার সগর্বে এক ডিশ অ্যান্টেনা উঁচিয়ে ধরল।

‘আনন্দধ্বনি।’ বলল সে। ‘জনতার বিশ্বাস, একটা অডিও ওয়েভ সেট-আপ করছে, আমি যেটাকে ধরে এমন এক ইমেজে ডিজিটাইজ করছি, ওরা যেটা বেশি করে দেখতে চায়।’ ব্যাখ্যা করল লোকটা। ‘খুদে লামার উৎস হচ্ছে, একজন খুদে লামার জন্য ওদের নিজেদের একান্ত কামনা। এভাবেই আমি ওদের আকাঙ্ক্ষাকে ব্যবহার করে ওদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করছি। দারুণ বুদ্ধিমানের কাজ, কী বলেন?’

‘নারকীয়, স্রেফ শয়তানি।’ বলল হিরু চাচা। ‘আপনার এই প্রতিভা ভালো কাজে লাগান না কেন?’

‘কেন লাগাব?’ পাল্টা প্রশ্ন জাদুকরের। ‘সব মজাই তো খারাপ কাজে।’

‘তুমি চাইলে আমাদের মেরে ফেলতে পারো।’ বললেন চায়না বিল। ‘কিন্তু আগে হোক আর পরে, মানুষ তোমার এই প্রদর্শনী যে ভুয়া তা ধরে ফেলবে। তুমি ঠিক ওজের জাদুকরের মতো।’

‘ধন্যবাদ!’ ভণ্ড ফেলিক্সকে সন্তুষ্ট দেখাল। ‘সে খুব খারাপ করেনি। যাক গে, আমাকে ক্ষমা করো, দেরি হয়ে যাচ্ছে। আরো কথা বলতে পারলে ভালো লাগত; কিন্তু জানোই তো এখন না-ঝোলানো শুরুর সময় হলো।’

দুই বাহু মেলে জনতার উদ্দেশে দরাজ গলায় কথা বলল সে।

‘অভিবাদন, শারমা-লার সুনাগরিকরা! আপনাদের মহান জাদুকর সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছে। আপনাদের সবার প্রিয় খুদে লামার প্রতিনিধি এবং অভিভাবক হিসেবে, তাঁর উদ্দেশে আপনাদের আরাধনার জন্য আমি ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’

খুদে লামার ছবি একটা হাত তুলল এবং জনতা উল্লাসে ফেটে পড়ল।

ছবিটা আরো উদ্ভাসিত আর নিরেট হলো।

‘আমার জাদুর কল্যাণে আপনাদের খুদে লামার বয়স গত ৫০ বছরে এক দিনও বাড়েনি, আপনারা তা জানেন। তাঁর প্রতি আপনাদের বিশ্বস্ততা আর আনুগত্যের ফলেই তিনি চিরকচি বালক রয়ে গেছেন। সে জন্য তিনি আপনাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছেন।’

(‘এবং আপনাদের অন্ধবিশ্বাস!’ শয়তান জাদুকর হিরু চাচা আর চায়না বিলের উদ্দেশে বিদ্রূপমাখা কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে বলল)।

‘খুদে লামার অনন্ত যৌবনকে সুরক্ষা দিচ্ছে চিরস্থায়ী মেঘের ছাদ, এটি গর্জনশীল হিমবাহর এক অনন্য উপহার, বাইরের জগতের নোংরা প্রভাব থেকে আমাদের প্রিয় শারমা-লাকে যা রক্ষা করছে।’

মহানন্দে হৈহৈ করে উঠল প্রতিফলন পুকুরের আশপাশে জড়ো হওয়া মানুষজন। খুদে লামার ছবি আরো দীপ্তিমান হলো, হর্ষধ্বনিকে পিক-আপ করে ডিশ অ্যান্টেনাটা যখন জনতার সম্মিলিত গর্জনকে হলোগ্রাফিক ইমেজে পাল্টে দিল।

‘বাইরের দুনিয়ার প্রভাব সব সময়ই ক্ষতিকর। আর তাই আজকে আমরা দুই ভিনদেশির না-ঝোলানো কার্যকর করতে যাচ্ছি, যারা আমাদের শান্তিময় শারমা-লায় অবৈধ অনুপ্রবেশ করেছে। এর প্রায়শ্চিত্ত তারা জীবন দিয়ে করবে।’

পাঁচিল থেকে ঝুলন্ত বাঁশের খাঁচাটির দিকে এক হাত নির্দেশ করল জাদুকর।

অপর হাতে আঙরাখার পকেট থেকে বের করল প্রকাণ্ড এক ইঁদুর। লেজ ধরে ঝুলিয়ে রাখল ওটাকে।

‘সে জন্যই।’ বলল সে—‘আমি আমার সহজাদুকর রডরিক দ্য রডেন্টকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি—’

‘ওটা তো সত্যিকারের ইঁদুর। হলোগ্রাম নয়!’ বলে উঠলেন চায়না বিল।

‘লোকটা উন্মাদ!’ বলল হিরু চাচা। ‘ওকে যুক্তি দিয়ে বোঝানো অসম্ভব।’

জাদুকর উঁচিয়ে ধরল ইঁদুরটাকে এবং তারপর আঙরাখার ঢিলে হাতার মধ্যে ছেড়ে দিল।

জনতা চেঁচাল, ‘আআআহহহ!’

জাদুকর অন্য হাতটা বাড়িয়ে দিল বাঁশের কারাগারকে ধরে রাখা ফিতাটার দিকে।

প্রসারিত হাতটি বেয়ে বেরিয়ে এলো ইঁদুরটার ঝাঁটা গোঁফ।

‘ওওওহহহ!’ চিৎকার ছাড়ল দর্শকরা।

এবার উদয় হলো ইঁদুরটার কালো নাক আর খুদে কালো চোখ জোড়া।

‘যা।’ বলল জাদুকর।

ইঁদুরটা কাঁচা চামড়ার দড়িটার ওপর লাফিয়ে পড়ল—এবং ক্ষুধার্তের মতো চিবোতে লাগল ওটা।

‘প্লিজ, আপনারা ওর আচরণে কিছু মনে করবেন না।’ ওয়াল্টার বলল হিরু চাচা আর চায়না বিলের উদ্দেশে। ‘ও কয়েক দিন ধরে না খেয়ে আছে কি না।’

উত্তেজিত দর্শকরা কীর্তন ধরল।

হলোগ্রাফিক খুদে লামা না-ঝোলানো অনুষ্ঠানটিকে শূন্যে দুহাত তুলে যেন আশীর্বাদ করছে।

কিন্তু হর্ষধ্বনির মধ্য থেকে এক নতুন, চড়া সুরে মন্ত্রোচ্চারণের মতো শব্দ উঠল, ক্রমেই জোরালো হচ্ছে সেটি :

‘ভণ্ড, ভণ্ড, ভণ্ড!’

            (চলবে)


মন্তব্য