kalerkantho


তায়েব সালেহর

সিজন অব মাইগ্রেইশন টু দ্য নর্থ

স্বকৃত নোমান

১৪ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০



সিজন অব মাইগ্রেইশন টু দ্য নর্থ

বাংলাদেশের পাঠকদের কাছে সুদানি ঔপন্যাসিক তায়েব সালেহ খানিকটা অপরিচিত। কারণ তাঁর উপন্যাস বাংলা ভাষায় বেশি অনূদিত হয়নি।

কিন্তু আরব বিশ্বের পাঠকদের কাছে তায়েব সালেহ নামটি ব্যাপক আলোচিত। তাঁর ‘সিজন অব মাইগ্রেইশান টু দ্য নর্থ’ উপন্যাসটিকে বিশ শতকের সেরা আরবি উপন্যাস বলা হয়ে থাকে। তিনি আধুনিক সুদানি উপন্যাসের পথিকৃৎও বটে। আরব বিশ্বে বর্তমানে যেসব তরুণ কথাসাহিত্যিক প্রচলিত ট্যাবু ভেঙে উপন্যাস লিখছেন, তাঁদের কাছে তায়েব সালেহ নমস্য একজন ঔপন্যাসিক।

তায়েব সালেহর জন্ম ১৯২৯ সালে, উত্তর সুদানের দাবাবা গ্রামে। কৃষক পরিবারের সন্তান। শিক্ষাজীবন শুরু হয় গ্রামের মক্তবে। ১০ বছর বয়সে নিজ গ্রাম দাবাবা ছেড়ে ওমদুরমানের ওয়াদি সাইয়িদিনা স্কুলে ভর্তি হন। খার্তুম বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষিশাস্ত্রে লেখাপড়া করে গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন।

শিক্ষকতা ছেড়ে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের জন্য চলে যান ইংল্যান্ডে। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি ও রাজনীতি বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ শেষে নিজ দেশে ফিরে বিবিসি ও সুদান বেতারে কর্মজীবন শুরু করেন। কাতার তথ্যকেন্দ্রের মহাপরিচালক হিসেবেও কিছু দিন কাজ করেন। লেখালেখি শুরু করেন কর্মজীবনের শেষ দিকে। ছোটগল্প দিয়ে সাহিত্য জীবনের শুরু। তাঁর গল্প-উপন্যাসের সংখ্যা খুব বেশি নয়। প্রথম উপন্যাস A Handful of Dates, প্রকাশিত হয় ১৯৬৪ সালে। তাঁর সেরা উপন্যাস Season of Migration to the North প্রকাশিত হয় ১৯৬৬ সালে। Weding of Zein প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ সালে এবং সর্বশেষ উপন্যাস Bandarshah লেখেন সত্তরের দশকে।

তায়েব সালেহ আরব বিশ্বে ও আরব বিশ্বের বাইরে বিখ্যাত মূলত তাঁর ‘Season of Migration to the North’ উপন্যাসটির জন্য। একটি অসাধারণ উপন্যাস। এটিকে বিশ শতকের সেরা আরবি উপন্যাস বলা হয়ে থাকে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিদগ্ধজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি এ উপন্যাসটির মধ্য দিয়েই। উপন্যাসটি বাংলায়ও অনুবাদ হয়েছে। কলকাতার ঈষিকা গুহ অনুবাদ করেছিলেন। খুবই প্রাঞ্জল অনুবাদ। ছোট উপন্যাস, মাত্র দেড় শ পাতার। উনিশ ও বিশ শতকের ঘটে যাওয়া সুদানের রাজনৈতিক ইতিহাসের ঘটনাবলি এই উপন্যাসের কাহিনি বিন্যাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

উপন্যাসটি মূলত দুটি কারণে পাঠক হিসেবে আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। এক. যৌনতা, দুই. রাজনীতি। উপন্যাসটিতে যৌনতার যে খোলাখুলি বর্ণনা দিয়েছেন তায়েব সালেহ, সুদানি সমাজের প্রেক্ষাপটে আরব উপন্যাসে তা খুঁজে পাওয়া সত্যিই কঠিন। যেমন, ‘কী আর বলব, তার ওই জিনিসটা একটা জিনিস ছিল বটে, ইয়া লম্বা আর মোটা, একটা আস্ত গোজের মতো, যখন ভেতরে ঢুকিয়ে দিত, তখন নিজেকে সামলাতে পারতাম না। আমার দুই উরুর মাঝে বসে আমার স্বামী যখন সঙ্গম শুরু করত তখন যৌন আনন্দে এত জোরে চিৎকার দিতাম যে, সে চিৎকারের শব্দ শুনে মাঠে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা পশুরাও ভয় পেয়ে যেত। ’

শুধু তাই নয়, উপন্যাসের প্রধান চরিত্র মুস্তাফা সাঈদের ইংরেজ প্রেমিকাদের সঙ্গে সঙ্গমের যে খোলাখুলি বর্ণনা দিয়েছেন লেখক, সুদানের কোনো লেখক এর আগে সম্ভবত সাহস করেননি। শুধু সুদানের কেন, আরবি ভাষার অন্য কোনো ঔপন্যাসিকও সাহস করেননি। এই কারণে, অর্থাৎ উপন্যাসটিতে যৌন সম্পর্কের অনেক খোলামেলা বর্ণনা থাকার কারণে ১৯৯০-এর দশকে ইসলামী শাসনামলে উপন্যাসটি সুদানে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। উপন্যাসটির বিরুদ্ধে ইসলামী শাসকদের অভিযোগের কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল, উপন্যাসের প্রধান চরিত্র মুস্তাফা সাঈদের ইংরেজ প্রেমিকা জ্যঁ মরিসের সঙ্গে যৌন সম্ভোগের যেসব দৃশ্য উপস্থাপন করা হয়েছে, সেগুলো ইসলামী সংস্কৃতিতে শোভন নয়।

অর্থাৎ তায়েব সালেহ আরব বিশ্বের প্রচলিত ট্যাবুকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন। আরব বিশ্বের তিন ট্যাবু হচ্ছে :  যৌনতা, ধর্ম ও রাজনীতি। তায়েব সালেহ এই তিন সামাজিক সংস্কারের দুটিকে, যৌনতা ও রাজনীতি তাঁর উপন্যাসের উপজীব্য করেছেন। প্রধানত এই কারণেই আমার মনে হয়, তাঁর এই উপন্যাসটিকে বিশ শতকের সেরা আরবি উপন্যাস বলা হয়ে থাকে। নইলে যে ধারায় তিনি উপন্যাসটি লিখেছেন সেই ধারা বিশ্ব সাহিত্যের প্রেক্ষাপটে নতুন কিছু নয়। নতুন আরব বিশ্বের উপন্যাসের জন্য এবং এই কারণেই তাঁর উপন্যাসটি এত আলোচিত এবং শ্রেষ্ঠত্বের দাবি রাখে। সুদানি সমাজের প্রেক্ষাপটে এই উপন্যাস নিঃসন্দেহে একটি দুঃসাহসিক শিল্পকর্ম।

সুদানি সমাজের প্রেক্ষাপটে নারীদের কোনো মূল্য নেই। নারীদের সেখানে বর্বর কায়দায় খতনা করানো হয়। পুরুষরাই, সে পুরুষ অন্ধ, বোবা, পঙ্গু যা-ই হোক না কেন, নারীদের ওপর কর্তৃত্ব করে। নারীদের আলাদা কোনো সত্তা নেই, তারা পুরুষের ব্যবহার্য সামগ্রী মাত্র। ব্যবহার করো, আর ছুড়ে ফেলে দাও। তায়েব সালেহ তাঁর এই উপন্যাসে দেখিয়েছেন নারীরও যে আলাদা সত্তা আছে, তারাও যে স্বাধীনভাবে স্বামী নির্বাচনের অধিকার রাখে। জোর করে বিয়ে দেওয়ার ১৫ দিনের মাথায় প্রতিবাদস্বরূপ বৃদ্ধ স্বামী ওয়াদ রাইয়েছকে হত্যা করে নিজেও আত্মহত্যা করে মুস্তাফা সাঈদের বিধবা স্ত্রী হোসনা বিনত মাহমুদ। হোসনার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যে লোকটি তার স্বামী হিসেবে আবির্ভূত হয় তাকে হত্যা এবং নিজের আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে সুদানের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রতি ধিক্কার জানিয়েছে হোসনা। এটি তার বিদ্রোহ। হোসনা চরিত্রের মধ্য দিয়ে পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে নারীর এই বিদ্রোহের উল্লেখ করে আরব উপন্যাসের ধারায় তায়েব সালেহ নিজেকে বিশিষ্ট করে তুলেছেন। এই ক্ষেত্রে তাঁকে একজন নারীবাদী লেখকও বলা যায়।

উপন্যাসের প্রধান চরিত্র মুস্তাফা সাঈদের চরিত্র চিত্রণের মধ্য দিয়ে যা বোঝাতে চেয়েছেন ঔপন্যাসিক (কেউ কেউ বলে থাকেন, আমি আদৌ নিশ্চিত নই লেখক তা বোঝাতে চেয়েছেন কি না) তা পাঠক হিসেবে আমার কাছে খুবই স্থূল মনে হয়েছে। হ্যাঁ, প্রাচ্যকে নারীর মতোই যে বলাৎকার করেছে পাশ্চাত্য, তা অস্বীকার করছি না। সেই বলাৎকারের প্রতিশোধ নিতে চেয়েছেন মুস্তাফা সাঈদ লন্ডনে গিয়ে একাধিক নারীকে পটিয়ে বিছানায় নিয়ে, হত্যা করে, আত্মহত্যায় বাধ্য করে।

প্রতিশোধের এই মাধ্যকেই স্থূল বা হাস্যকর বলতে চাচ্ছি আমি। কেননা প্রাচ্যকে বলাৎকার করেছে প্রাশ্চাত্য মগজ দিয়ে, শিশ্ন দিয়ে নয়। শিশ্ন দিয়ে যদি প্রাচ্যবাসী প্রাচ্যকে স্বাধীন করতে চায়, ঔপনিবেশিকদের হটাতে চায়, প্রতিশোধ নিতে চায়, এটি হাস্যকর নয় তো কী? এতে প্রাচ্যের বর্বরতারই প্রকাশ পায়। তায়েব সালেহ যদি প্রাচ্যের, অর্থাৎ আরব বিশ্বের, এই বর্বরতা দেখানোর জন্য মুস্তাফা সাঈদ চরিত্রটি নির্মাণ করে থাকেন, তাহলে ঠিক আছে। কেননা আরব বিশ্বের তেলের মহাজন শেখরা এখনো ‘শিশ্নাচার’ থেকে বেরোতে পারেননি। কিন্তু তিনি যদি রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মুস্তাফা সাঈদের মাধ্যমে পাশ্চাত্যকে বলাৎকারের জন্য চরিত্রটি নির্মাণ করে থাকেন, তাহলে একটু ঔদ্ধত্য হলেও বলব, তায়েব সালেহ নিজেই ‘শিশ্নাচার’ থেকে বেরিয়ে ‘মগজাচারে’ আসতে পারেননি। মনে হয়েছে, তিনি একটি বিকারগ্রস্ত চরিত্র অঙ্কন করতে চেয়েছেন, যে চরিত্রের নাম মুস্তাফা সাঈদ, যে নিজ দেশকে ভুলে, নিজের সংস্কৃতিকে ভুলে ইউরোপে গিয়ে ভোগ-বিলাসে গা ভাসাতে চেয়েছে, নিজের প্রজাত্ব ঘোচাতে চেয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারেনি। শিশ্ন দিয়ে আফ্রিকা স্বাধীন করার স্বপ্নটি ছিল তার বিকার। এই বিকার থেকে শেষ পর্যন্ত সে ফিরে এসেছে। নিজের ভুল বুঝতে পেরে ফিরে এসেছে নিজ ভূমিতে। বিয়ে করে সংসারি হয়েছে এবং শেষে রহস্যজনকভাবে তার অন্তর্ধান ঘটেছে। এই বিষয়টি বাদ দিলে সামগ্রিকভাবে তাইয়েব সালেহর এই উপন্যাসটি বহুমাত্রিকতাস্পর্শী।

তায়েব সালেহ তাঁর সমাজের পরিপ্রেক্ষিতে নিঃসন্দেহে প্রথাবিরোধী ঔপন্যাসিক। তাঁর ‘Season of Migration to the North’ উপন্যাসটি সেই সাক্ষ্যই দিচ্ছে। এই উপন্যাস রীতি ও ভাষায় প্রচলিত ধারার। প্রচলিত রীতির মধ্য দিয়েই তাইয়েব সালেহ এই উপন্যাসে প্রবিষ্ট করেছেন সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি, ইতিহাসসহ নানা বিষয়। ঔপন্যাসিক হিসেবে তিনি শক্তিমান। আধুনিক। তিনি সাধারণ আরবদের মতো ছিলেন না, একেবারেই আলাদা রুচির মানুষ ছিলেন। গভীর জীবনবোধ থেকেই তিনি সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন। তাঁর আলোচিত উপন্যাসটির মধ্য দিয়ে যে প্রকারান্তরে তিনি তাঁর জীবনকেই তুলে ধরেননি, তা আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি না। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র মুস্তাফা সাঈদ কিংবা অনামা গল্পকথকের মধ্যে হয়তো লেখক নিজেই মিশে আছেন।


মন্তব্য