kalerkantho


ডেভিড গ্রসমানের ম্যান বুকার জয়

দুলাল আল মনসুর

১৪ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০



ডেভিড গ্রসমানের ম্যান বুকার জয়

এ বছর ম্যান বুকার ইন্টারন্যাশনাল পুরস্কার পেয়েছে ইসরায়েলি লেখক ডেভিড গ্রসমানের উপন্যাস ‘এ হর্স ওয়াকস ইন টু আ  বার’। প্রথম ইসরায়েলি লেখক হিসেবে গ্রসমান পেলেন এ পুরস্কার।

মূল হিব্রুতে লেখা এ উপন্যাসটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন জেসিকা কোহেন। কোহেনের জন্ম ইংল্যান্ডে, বড় হয়েছেন ইসরায়েলে এবং বসবাস করেন ডেনভারে। তিনি গ্রসমানসহ আরো কয়েকজন ইসরায়েলি লেখক-কবির সাহিত্য অনুবাদ করেছেন। ম্যান বুকার ইন্টারন্যাশনাল পুরস্কারের নিয়মানুযায়ী পুরস্কারের অর্ধেক সম্মানী পাবেন মূল লেখক ডেভিড গ্রসমান ও অর্ধেক পাবেন অনুবাদক জেসিকা কোহেন।

গ্রসমানের এ উপন্যাসটিতে ডোভালেহ গ্রিনস্টাইন নামের একজন কমেডিয়ান একটি স্ট্যান্ড-আপ কমেডি শোতে দর্শকদের বিনোদন দেওয়ার ছলে বছরের পর বছর বয়ে বেড়ানো বেদনার কথা প্রকাশ করে ফেলে। ‘এ হর্স ওয়াকস ইনটু আ বার’ উপন্যাসের কাহিনি বয়ানকারী অভিশাই লাজার একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক ও ডোভালেহ গ্রিনস্টাইনের ছোটবেলার বন্ধু। ডোভালেহ তার অনুষ্ঠানে ডেকে আনে লাজারকে। তার আসার ইচ্ছা না থাকলেও অনিচ্ছায় সে আসে। গ্রিনস্টাইন তাকে বলে, ‘আমি চাই তুমি আমাকে দেখো; তারপর বলো।

’ লাজার জিজ্ঞেস করে, ‘কী বলব?’ এর উত্তরে গিনস্টাইন শুধু বলতে পারে, ‘যা দেখলে তাই। ’

লাজারের সন্দেহ হয়, গ্রিনস্টাইন তাকে এখানে ডেকেছে যাতে জনসমক্ষে সে তাদের দুজনের একসঙ্গে কাটানো ছেলেবেলার মুখোমুখি হতে পারে; তারা হাই স্কুলে পড়ার সময় একসঙ্গে সেনাবাহিনীতে কাজ করেছে। লাজারের মনে আছে, সে সময় গ্রিনস্টাইন বেকুব ধরনের একটা ছেলে ছিল। অন্যরা যখন-তখন তাকে নাজেহাল করত। কিন্তু মুখ বুজে সহ্য করা ছাড়া আর কিছু বলত না সে।  

‘এ হর্স ওয়াকস ইনটু আ বার’ অনন্য শৈলীর অসাধারণ সুন্দর উপন্যাস। মোটের ওপর উপন্যাসটি যতটা বাস্তবের সাক্ষী ততটা আসলে কমেডি সম্পর্কিত নয়। গ্রিনস্টাইনের দরকার কাউকে না কাউকে তার কঠিন জীবনের বেদনার কথা জানানোর। যে জীবন তাকে বারবার লাথি মেরেছে, সে জীবনের কাছে সে পরাজয় মানেনি—সেটাই জানানো দরকার। উপন্যাসের শেষের দিকে লাজার যেমন মন্তব্য করে, ‘আমার বিশ্বাস তার অনুরোধের কথা আমাকে মনে করিয়ে দিতে চাচ্ছে : কারো কারো ভেতর থেকে কোনো কোনো বিষয় বেরিয়ে আসে তার নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই। সে চেয়েছে, আমি যেন তাকে এ কথাটিই বলি। এ কথাটি মুখ ফুটে বলা যায় না। আমি বঝতে পারি, এটাই আসল কথা। ’ যেকোনো বেদনার কথাই মুখে বলে প্রকাশ করা কঠিন। তবে সে কঠিন কাজটি গ্রসমান সুন্দর করে বলেছেন।

সেন্ট্রাল লন্ডনের পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে পুরস্কার গ্রহণকালে ডেভিড গ্রসমান উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ দিয়ে বলেন, ‘এই পুরস্কার আর আজকের এই সন্ধ্যার কথা অনেক দিন মনে থাকবে। নিষ্ঠার সঙ্গে যে চমৎকার অনুবাদ করেছেন তার জন্য আমি ধন্যবাদ জানাচ্ছি অনুবাদক জেসিকা কোহেনকে। ’

ডেভিড গ্রসমানের আবেগী এবং শৈলীগত ঝুঁকি গ্রহণের ইচ্ছাশক্তির কাছে বিচারকরা বিমূঢ় বোধ করেছেন বলে জানান বিচারক নিক বার্লি। তিনি বলেন, ‘গ্রসমান উপন্যাস রচনার এক উচ্চাভিলাষী দক্ষতার প্রমাণ রেখেছেন ও উপন্যাসটি চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন। লেখকের উঁচু পর্যায়ের দক্ষতার উদাহরণ এ উপন্যাস। এ উপন্যাসের প্রতিটি বাক্যের তাৎপর্য আছে, প্রতিটি শব্দের গুরুত্ব আছে। ’

ডেভিড গ্রসমানের জন্মস্থান, সেখানকার রাজনীতি ও ইতিহাস তাঁর লেখক মানস তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। তা ছাড়া তাঁর লেখার পটভূমি তৈরি হয়েছে তাঁর নিজের পরিবার ও সমাজের কঠিন বাস্তবতার ওপরে। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে তাঁর জন্মস্থানের কথা তাঁর লেখার পরিচয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।

ডেভিড গ্রসমানের জন্ম ১৯৫৪ সালে জেরুজালেমে। তাঁর বই ৩০টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বের কথা তুলে ধরেছেন তাঁর ২০০৮ সালের ‘টু দি অ্যান্ড অব দ্য ল্যান্ড’ উপন্যাসে। এ উপন্যাসটি লিখেছেন তাঁর ছেলে ইউরির মৃত্যুর পর। যুদ্ধের ভয়াবহ ফলাফলের কথাসহ এখানে ইসরায়েলের সমসাময়িক জীবনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ২০১৪ সালের উপন্যাস ‘ফলিং আউট অব টাইম’ লিখেছেন সন্তানহারা মা-বাবার শোক-দুঃখ নিয়ে। সে বছরই লেখেন ‘এ হর্স ওয়াকস ইনটু আ বার’, যে উপন্যাসটির জন্য তিনি এ বছর ম্যান বুকার ইন্টারন্যাশনাল পুরস্কার পেয়েছেন।

গ্রসমানের মা মিশেলার জন্ম ম্যানডেটরি ফিলিস্তিনে। তাঁর বাবা আইজাক ৯ বছর বয়সে বিধবা মায়ের সঙ্গে পোল্যান্ড থেকে ফিলিস্তিনে আসেন। গ্রসমানের দাদি নিজের জন্মস্থান ছেড়ে কোথাও যাননি। তবে পোল্যান্ডের পুলিশের হাতে নিগৃহীত হয়ে ফিলিস্তিনে চলে আসেন। গ্রসমানের বাবা একসময় বাসড্রাইভার ছিলেন। পরে লাইব্রেরিয়ানের কাজ করেন। ছেলের লেখকসত্তা তৈরিতে বাবার বিশেষ ভূমিকা ছিল। পড়াশোনার অভ্যাস গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ভেতর সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ জন্মে। নিজের লেখক সত্তার বিকাশ সম্পর্কে গ্রসমান বলেন, ‘বাবা আমাকে অনেক কিছু দিয়েছেন, তবে সবচেয়ে বেশি দিয়েছেন শোলেম আলেইশেম। ’ শোলেম আলেইশেমের জন্ম ইউক্রেনে। তিনি ইডিশ ভাষার লেখক ও নাট্যকার ছিলেন।

যুদ্ধের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করে গ্রসমান বলেন, ‘কেউ কেউ আমাকে তথাকথিত গত্বাঁধা ধরনের ব্যক্তি মনে করে থাকতে পারেন। তারা মনে করতে পারেন, আমার মতো অর্বাচীন বামপন্থী নিজের সন্তানদের কখনোই সামরিক বাহিনীতে পাঠাব না। জীবনের উপাদান যে কী কী হতে পারে সে সম্পর্কে তাদের ধারণা নেই। আর মনে হয়, এদের বোঝানোই যাবে না যে ইসরায়েলের কোনো কাজের সমালোচনা করলেও আমি তো ইসরায়েলেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমি নিজেও তো একসময় ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীতে কাজ করেছি। ’


মন্তব্য