kalerkantho

বঞ্চিতা

মাহবুবা হোসাইন

১৪ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০



বঞ্চিতা

অঙ্কন : মানব

আট বছরের বিশু। দোতলার জানালা দিয়ে দেখতে পেল এই সাতসকালেই রতন বল নিয়ে পুকুরপাড়ে খেলছে।

উঁকি দিয়ে দেখল, মা রান্নাঘরে। এই ফাঁকে নিজের বলটা নিয়ে নেমে পড়ল। খেলতে খেলতে বলটা হঠাৎ দিলুদের রান্নাঘরের পেছনে ঢোলকলমিতে ঢাকা যে জায়গাটা, সেখানে গিয়ে পড়ল। বল কুড়িয়ে পেছন ফিরে দৌড়োতে গিয়ে দিলুদের রান্নাঘরের বেড়ার ফাঁকে হঠাৎ ওর চোখ আটকে গেল। ছোট্ট একটি ঘর, পাটখড়ির বেড়া। মাঝে মাঝে দু-একটি পাটকাঠি ভেঙে গেছে। তারই ফাঁক দিয়ে ঘরের ভেতরটা স্পষ্ট দেখা যায়। সেই ফাঁকেই বিশুর চোখ আটকে গেছে। দৃশ্যটির বীভৎসতায় তার চোখে আতঙ্ক। বীভৎসতায় চোখ বড় বড় হয়ে গেছে, গা থরথর করে কাঁপছে। সারা গা ঘামে ভিজে গেছে। মনে হচ্ছে পা দুটি কেউ পেরেক দিয়ে শক্ত করে মাটির সঙ্গে গেঁথে দিয়েছে। দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার শক্তিও নেই। এটুকু জীবনে অনেক ভয়ংকর দৃশ্য সে দেখেছে। সেই সেদিনও কাপালি জ্যাঠার গোয়ালঘরটার পেছনে ডোবার মতো যে জায়গাটা আছে, তার পাড়ে একটি সাপ ইয়া বড় একটা ব্যাঙ গপ করে ধরে আস্তে আস্তে গিলতে লাগল। সাপটির চোখগুলো কেমন বড় হয়ে জ্বলছিল, যেন ভারি কষ্ট হচ্ছে অত বড় ব্যাঙটা গিলতে। ভারি বিচ্ছিরি দেখাচ্ছিল সাপটা। বিশুর কেমন গা গুলোচ্ছিল। মিনুদিদিদের গাবনা গাভিটার যখন বাচ্চা হলো, তা-ও একটা দেখার মতো জিনিস। বাচ্চাটা অর্ধেকে এসে থেমে আছে। মাথা আর পা দুটি দেখা যায় কেবল। রক্ত আর বিটুলি সার দিয়ে পড়ছে। গাবনাটা এন্তার চিৎকার করছে। কাউকে কাছে ঘেঁষতে দিচ্ছে না। শ্যামল কাকাকে শেষে ডাক্তার ডাকতে হলো। ডাক্তার দূর থেকে ইনেজকশন দিয়ে গাবনাকে অজ্ঞান করে বাচ্চা টেনে বের করল। রাস্তার কুকুরও সে কয়েকবার সঙ্গম করতে দেখেছে, সেটাও এমন কোনো ভালো নয় দেখতে। কিন্তু আজকের মতো আর কখনো দেখেনি। এত ভয়ও সে পায়নি কোনো দিন। মিনুদিদি একটি শতচ্ছিন্ন মাদুরের মধ্যে অচেতন হয়ে পড়ে আছে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে। চারদিকে রক্ত আর রক্ত, যেন রক্তের বন্যা। পাশে একটা ত্যানা পেঁচানো মৃত শিশু। রক্তের মধ্যেই পড়ে আছে। দিলুর মা আসমা ধাইয়ের সঙ্গে ফিস ফিস করে কথা বলছে। দুজনই ভীষণ উদ্বিগ্ন, চিন্তিত। বিশু ঘটনার মাথা-মুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারল না, কিন্তু দৃশ্যের আকস্মিকতায় এবং ভয়ংকর কিছু ঘটার সম্ভাবনায় একেবারে স্থানুবৎ হয়ে গেল।  

বেশ কিছুদিন আগের ঘটনা। বিশু একদিন সকালে খেলতে নেমে বন্ধুদের কাছে শুনল, দিলু বিয়ে করেছে। ঘরে নতুন বউ নিয়ে এসেছে। দিলু ওর বন্ধু বদির বড় ভাই। কাছেই এক ছাপরা ঘরে থাকে ওরা। দুটি মাত্র ঘর। বদির বাবা রহিম শেখ ঘর লাগোয়া রাস্তার ওপর ছোট একটি মুদি দোকান চালায়। সাধারণ মনোহরী দোকান। বেশ কিছু চিপস দোকানে ঝোলানো। চকোলেট ও বিস্কুট বয়ামে ভরা। গ্রাম্য দোকান, কত আর বেচাকেনা, বদিরা তাই খুব গরিব। দিলু যখন একটু বড় হলো, সবে গলা ভাঙতে শুরু করেছে, ওর বাবা একটা মোবাইল মেকানিকের দোকানে কাজে ঢুকিয়ে দিল। পড়ালেখায় তার আগ্রহ নেই তেমন। তবে সে খুব চটপটে। ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতি দিয়ে এটা-ওটা বানাতে ওস্তাদ। ওর ঘরটা দেখার মতো জিনিস যেন একটা কারখানা। হাতুড়ি, বাটালি, ছোট করাত, ইলেকট্রিক তার, আইসি, পুরান স্টেবিলাইজার—কী  নেই ওর ঘরে। বিশুদের কাছে ওর ঘরটা একটা বিস্ময় এবং আকর্ষণও। একবার তো হাতের তালুতে রাখা যায় এমন একটি রেডিও বানিয়ে বিশুদের চমকে দিয়েছিল। সেই রেডিও মানিকের কাছে এক হাজার টাকায় বিক্রি করেছিল শেষে। সে খুব শৌখিন। ঘর থেকে বের হলে কে বলবে এই ঘর থেকে বের হলো। দামি কাপড় কেনার সামর্থ্য যদিও ওদের নেই, কিন্তু সব সময় ধোপদুরস্ত। পাট করে চুল আঁচড়ানো, হাতে একটা মোবাইল। এয়ারফোন দিয়ে গান শুনতে শুনতে দুই বেলা দোকানে যায় দিলু।

বউ দেখতে গিয়ে বিশু তো অবাক। এ তো মিনুদি। শ্যামল কাকার মেয়ে। অপূর্ব সুন্দরী মিনুদি যখন সাদা স্কুল ড্রেস পরে, দুই বেণি ঝুলিয়ে স্কুলে যায়, পাড়ার ছেলেরা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। বিশু দেখেছে। শ্যামল কাকার বড় বাজারে কাপড়ের ব্যবসা। বেশ বড় দোকান। কয়েকজন কর্মচারী খাটে। বাড়িতে কয়েকটি বড় আটচালা ঘর। মাঝখানে বড় উঠোন। উঠোনের  মাঝ বরাবর তুলসীতলা। পেছনে ঘাটওয়ালা পুকুর। পশ্চিম ঘরের পেছনে বিরাট গোয়ালঘর। তাতে তিন-চারটি গরু সব সময় জাবনা কাটে। সব ঝকঝকে, তকতকে। তা হবে না কেন, মানুষই তো খাটে কয়েকজন। তারপর মাসিমার শ্যেন দৃষ্টি। এতটুকু বেচাল হওয়ার জো নেই। বকাঝকা নেই কোনো। সোজা ধরে বলবেন, ‘মাকু বেড়াটা যে বাঁধলি বাবা সোজা হয়েছে কি না দেখদিকি। খুলে আবার একটু বাঁধ না সোনা। তুই মুগডাল দিয়ে ভাত খেতে ভালোবাসিস, আমি বিনিকে তাই চড়াতে বলেছি। কাজ শেষে সোজা ভাত খেতে বসবি। তার আগে ডাঁই করা গোবরগুলো ভাগাড়ে একটু ফেলে দিস বাবা। ’  মাসিমার শ্যেন দৃষ্টির কারণেই হোক আর ভালোবাসার কারণেই হোক, কেউ ফাঁকি দেয় না। সবার প্রতি মাসিমার সমান দৃষ্টি। পোকা-মাকড়, পশু-পাখি সব প্রাণীর প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসা তাঁর। একটা পিঁপড়াও কখনো মারতে দেখেনি কেউ। পিঁপড়ার অত্যাচার হলে মাসিমা চিনি ফেলে লাইন করে ওদের বেড় করে দেন। হরুকে দিয়ে গাছে গাছে কলস বেঁধে দেন যেন পাখপাখালি সময়-অসময়ে জল খেতে পারে। সেবার যখন খলিল চাচার পানাপুকুরের পানিতে একটি  বিড়ালছানা পড়ে গেল, খবর পেয়ে মাসিমা বললেন—‘যা না রে হারু, ছানাটাকে একটু তুলে নিয়ে আয়। আহা রে! বেচারা কত কষ্ট পাচ্ছে। ’ বড় মায়ের এসব ছেলেমানুষিতে ওরা বেশ মজা পায়। মানুষটা যে একটু অন্য রকম, ওরাও তা বোঝে। শ্যামল কাকাও বোঝেন। মিষ্টি হেসে বলেন, ‘তোমার যত সৃষ্টি ছাড়া কাণ্ড। ’ হারু তুলে আনলে ছানাটাকে একটা পুরনো গামছা দিয়ে পেঁচিয়ে চুলার কাছে রেখে দিলেন কিছুক্ষণ। তারপর দুধ খাওয়ালেন। একটা ধামায় বিড়া পাকিয়ে নিজের খাটের নিচে শুয়ে রাখলেন, আর বারবার বলতে লাগলেন—‘আহা রে, কত কষ্ট হলো বেচারার!’ তার পর থেকে বিড়ালটা মাসিমার পায়ে পায়ে ঘুরতে লাগল। এই তো সেদিন সবুজ রঙের ঘাসফড়িংটা ধরে মিনুদিকে দেখাতে আসতেই মাসিমা ধেয়ে এসে বললেন, ‘ছাড় ছাড়, সোনা, ছেড়ে দে! ভগবানের জীব, তিনি সবটাতে বাস করেন রে বিশু। এমন করে কষ্ট দিসনি, এতে ভগবান নিজে কষ্ট পান। বিশ্বাসটা ওপর ওপর নয় মাসিমার, অন্তরের অন্তস্তলে প্রোথিত। যেকোনো প্রাণীর কষ্টে তিনি নিজেও কষ্ট পান। বিশুরাই কি মাসিমার কাছে কম ভালোবাসা পেয়েছে? কাকিমা শাঁখ বাজিয়ে সকাল-সন্ধ্যা পূজা দেন। কত দিন ওরা দাঁড়িয়ে থেকেছে প্রসাদ পাওয়ার অশায়। কাকিমা পূজা শেষে মৃদু হেসে বলতেন, ‘আয়, কাছে আয়। আমাকে ছুঁবি না কিন্তু। ’ ঘরে বানানো নাড়ু বা সন্দেশ হাতে দিয়ে মিষ্টি করে বলতেন, ‘ভক্তি করে খাবি। ’ মিনুদিও তো কত দিন ভেতর উঠোনে ওদের সঙ্গে দড়ি লাফান খেলেছে। ভারি সুন্দর দেখতে মিনুদি। ধবধবে ফরসা রং। বড় বড় গভীর চোখ। চুলগুলো তার ভারি সুন্দর। প্রায়ই ছেড়ে রাখতেন। তখন তাঁকে দেবী প্রতিমার মতো লাগত। কী প্রাণবন্ত, কী চঞ্চল। কখনো গান গাচ্ছেন, কখনো এঘর থেকে ওঘরে দৌড়ে বিড়ালটার পিছে লাগছেন, কখনো মাসিমার গলা জড়িয়ে ধরে আদর নিচ্ছেন। একটা হালকা পালকের মতো জীবন। নিশ্চিন্ত। কাকা-কাকিমার এই একমাত্র সন্তান। ভগবানকে অনেক ডাকাডাকির পর মিনুকে পেয়েছেন। অনেক আদর করে নাম রেখেছেন মৃণালিনী। তখন কি জানতেন মৃণালের সঙ্গে শুধু সৌন্দর্যই নয়, কাঁটাও থাকে। জানলে এই নাম রাখতেন না কখনো। বিশুর বাবার সঙ্গে কাকার দেখা হলে বলতেন, ‘দাদা, বড় সাধ্য সাধনায় মেয়েটিকে পেয়েছি। আশীর্বাদ করবেন, যেন মানুষের মতো মানুষ হয়। ওর ভাগ্যে যেন দেবতার মতো বর জোটে। ’ বাবা বলতেন, ‘অবশ্যই। এমন দেবী-প্রতিমার মতো মেয়ে আপনার। অনেক আশীর্বাদ করি শ্যামল বাবু। ও অনেক বড় হোক। কার্তিকের মতো স্বামী পাক। ’

বড়বাজারে যাওয়ার পথটা মিনুদের বাড়ির একদম কোল ঘেঁষে গেছে। ছোট বহরা থেকে বড়বাজারে যেতে হলে পশ্চিম দিকের রাস্তা ধরে মিনুদের সাতকড়ি ঘরের ঠিক পেছন থেকে উত্তর দিকে মোড় নিতে হয়। গোড়াপত্তনের সময় ঘরের মেঝেয় সাতটি কড়ি পুঁতে দেওয়া হয়েছিল, তাতে নাকি ঘরের পয় হয়, তাই এই কাম। এই ঘরেই মিনু থাকে। ঘরটি মিনুর ভারি পছন্দের। এর জানালাগুলো বড় বড়। রাস্তা পেরিয়েই দিগন্তজোড়া শস্যের ক্ষেত। একেক মৌসুমে একেক রকমের রং হয় সেই ক্ষেতের। কখনো গভীর সবুজ, কখনো হলুদ, কখনো সোনালি, কখনো বা হলুদ-সবুজে মিশেল। শস্যের রঙে ক্ষেতের রং হয়ে যায়। শুধু কি ক্ষেত, আকাশও যে কত রং ধরে একেক সময়। জানালায় দাঁড়িয়ে মিনু রঙের খেলা দেখে। ভারি ভালো লাগে তাঁর।  

আজকাল প্রায়ই মিনুকে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। কিছুটা উদাসীন, কিছুটা বিভ্রান্তও যেন। ঠিক এমনি সময় রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে দিলুর হাতের চাবিটা প্রায়ই মিনুদের বাড়ির কাছে এসে পড়ে যায়। কোনো দিন বা গান গাইতে গাইতে এই পথ দিয়ে চলে যায় সে। মিনুদের ঘরের কাছে এসে ওর গলা সপ্তমে চড়ে। অনেকেই তা দেখেছে, কিন্তু কিছু মনে করেনি। একটা চাবি পড়ে যাওয়া না-যাওয়া অথবা একটা চেংড়া ছেলের সপ্তমে গান গাওয়ার সঙ্গে যে বিরাট একটা অঘটনের সম্পর্ক থাকতে পারে, তা কারো চোখেই পড়েনি তখন। এর কিছুদিন পর মিনুকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না। সঙ্গে দিলুও নিখোঁজ।

এ ঘটনার পর প্রায় মাসখানেক চলে গেছে, রাত প্রায় ২টা। রহিম শেখের ভাঙা দরজায় মৃদু খটখট শব্দ। একবার, দুবার, তিনবার। ছেলেটা নিখোঁজ হওয়ার পর রহিম শেখের চোখে ঘুম নেই। ওর বউও কেঁদে কেঁদে হয়রান। আজও অনেক রাত পর্যন্ত ঘুম আসছিল না। শ্যামল বাবু গোপনে চাপ দিচ্ছেন মেয়েটাকে বের করে দেওয়ার জন্য। টাকা-পয়সারও প্রলোভন দেখাচ্ছেন অনবরত। লজ্জায়-অপমানে জনসমক্ষে মেয়েকে খুঁজতেও পারছেন না বেচারা শ্যামল বাবু। দিলু ও মিনু একই দিন নিখোঁজ। কী বলবেন মানুষকে। এটা আন্দাজ করেই গায়ের রক্ত হিম হয়ে আসে। বুঝতে পারছিলেন, একটা বিরাট সর্বনাশ ঘটে গেছে। কিন্তু কী করে তা সম্ভব হলো কিছুতেই ভেবে পাচ্ছিলেন না। মেয়েটার কথা চিন্তা করলেই লজ্জায়, অপমানে মাটির সঙ্গে মিশে যেতে ইচ্ছা করে। ভয়ে হাত-পা পেটের ভেতর ঢুকে যেতে চায়। ওঁর স্ত্রী মানাক্ষী মানুষের মধ্যেই নেই। ঘটনার পর সেই যে ঠাকুরঘরে ঢুকেছে, সেখানেই হত্তে দিয়ে পড়ে আছে। নাওয়া নেই, খাওয়া নেই। একবারও ঘর থেকে বের করা যাচ্ছে না। থেকে থেকে শুধুই চিৎকার করে কাঁদছেন আর বলছেন, ‘ঠাকুর, আমার মেয়েকে ফিরিয়ে দাও ঠাকুর। জানা মতে কোনো দিন অনিয়ম করিনি। তুমি আমাকে এত বড় শাস্তি দেবে, তা বিশ্বাস করি না ঠাকুর। তুমি যা চাও তা-ই দেব, শুধু আমার মেয়েকে ফিরিয়ে দাও। ’

সেদিন সবে সন্ধ্যা নেমেছে। আজান শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ। রহিম শেখ অজু করে দাওয়ায় এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র। চিন্তার রেখা তার কপালের ভাঁজে ভাঁজে। কালো রহিম শেখকে সন্ধ্যার অন্ধকারে আরো কালো দেখাচ্ছে। এমন সময় গৌড় বর্ণ সুঠাম দেহের শ্যামল বাবুকে অন্ধকার ঠেলে এগিয়ে আসতে দেখা গেল। তিনি হঠাৎ রহিম শেখের হাত চেপে ধরলেন। তাঁর দুই চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। বললেন, ‘শেখ রে, তুই যে করে হোক আমার মেয়েটাকে বের করে দে। যত টাকা লাগে আমি দেব। আমাকে তুই বাঁচা। আমি কেমন করে মানুষের কাছে মুখ দেখাব। ’ রহিম শেখরে খুবই অসহায় লাগছিল। শ্যামল বাবুর কষ্টের চেয়ে তার কষ্ট কোনো অংশে কম নয়। এই ঘটনার পরিণতি যে কী ভয়ংকর, ভাবলেই গায়ে কাঁটা দেয়। সে নিজেই কি জানে, শয়তান দুটি কোথায় আছে? কোথায় না সে খুঁজেছে। কিন্তু কোনো কূলকিনারা করতে পারছে না। বেচারা শ্যামল বাবুর মুখের দিকে তাকানো যায় না। সবাই জানে, মিনুকে কলকাতায় পাঠিয়েছেন শ্যামল বাবু। দিন কয়েক বেড়িয়ে আসুক। মামা-মাসিরাও ওকে দেখার জন্য পাগল। কিন্তু আসল ঘটনা কত দিন আর চাপা দিয়ে রাখতে পারবেন। তবু সান্ত্বনা দিয়ে শ্যামল বাবুকে বলল, ‘আপনি এত ভেঙে পড়বেন না দাদা। আমি যে করেই হোক ওই দুটিকে খুঁজে বের করব। ’ কথাটা বলল ঠিকই, কিন্তু চোখ তুলে শ্যামল বাবুর দিকে তাকাতে পারল না। লজ্জা ও অপমানে মাটির সঙ্গে মিশে যেতে ইচ্ছা হলো। এসব ভাবতে ভাবতে রহিম শেখের চোখে ঘুম আসছিল না। এপাশ-ওপাশ করতে করতে মাত্র একটু চোখ লেগেছে। আবার দরজায় খুটখুট শব্দ। রহিম শেখ ঘুম ভেঙে দরজা খুলে দেখে শ্রীমান দাঁড়িয়ে। পেছনে ঘোমটা দিয়ে আরেকজন। রহিম শেখ কয়েক মিনিট নিল মাত্র। তারপর পায়ের স্যান্ডেল খুলে হঠাৎ দিলুর গালে প্রচণ্ড জোরে বসিয়ে দিল। নারীকণ্ঠে অস্ফুট একটা শব্দ শুধু শোনা গেল।

নতুন বউ, ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা। নিখোঁঁজ হওয়ার পর মাত্র এক মাস কেটেছে। এই লজ্জা লুকাবে কোথায়। রহিম শেখ মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। দিলু আজ সারা দিন লাপাত্তা। দিলুর মা সেই সকালে গেছে বিরামপুর। এখান থেকে প্রায় ছয়-সাত মাইলের পথ। সে গেছে তার বড় খালার বাড়ি, সলাপরামর্শের জন্য। খালা খুবই বুদ্ধিমান, সংসার-অভিজ্ঞ মহিলা। সেই ভোরে বেরিয়েছে। এখন প্রায় সন্ধ্যা ছুঁইছুঁই। এখনো  ফেরার নাম নেই। ঠিক যখন সূর্যটা সুন্ধিবাড়ির বড় আমগাছটার আড়ালে ডুবে গেল। ধোঁয়া ধোঁয়া অন্ধকার নেমে এলো তল্লাটজুড়ে। ঠিক এই সময় আসমাকে নিয়ে দিলুর মা ফিরল। দুশ্চিন্তায়, হতাশায় অর্ধেক হয়ে গেছে। কত দিন ঠিকমতো নাওয়া-খাওয়া নেই। চুল উসকোখুসকো, মুখে খড়ি ওঠা। চোখের নিচে দুশ্চিন্তার ঘন কালো কালি।   বউকে সে শুধু একটা কথাই বলেছিল, ‘তোমার লজ্জা করল না? আমি হলে গলায় দড়ি দিতাম। ’ বউ কোনো প্রত্যুত্তর করল না। শুধু চুপ করে বসে হাতের নখ খুঁটতে লাগল। মাস যাপনের শেষের দিকেই সে বিষয়টি আন্দাজ করে নিয়েছিল। পালিয়ে যাওয়ার পর দিলু তাকে নিয়ে উঠাল নারায়ণগঞ্জের এক বস্তিতে। বন্ধুর এক খালার ঘরে। ছোট্ট একটা অন্ধকার ঘর। চারপাশে বিশাল বিশাল দালান, মাঝখানে কয়েকটি বস্তিঘর। দালানের পেছন দিকের ড্রেনের পানি সব ঘর পর্যন্ত চলে আসে, দুর্গন্ধে টেকা যায় না। জায়গাটি মাঝের প্লট। কোনো রাস্তা না থাকায় প্লটের মালিক বাড়ি করার আশা ছেড়ে দিয়েছেন কবেই। হাতের পাঁচ এই বস্তির ঘর কয়টি তুলে দিয়ে ভাড়া তুলে লোকসান কিছু পুষিয়ে নিতে চেষ্টা করছেন। দিলুর প্রেমটা যদি একনিষ্ঠ হতো, তবে প্রেমের সেই তুমুল মুহূর্তে মিনুর এত কিছু নজরে আসত না। প্রেমের চূড়ান্ত আবেগটা কেটে যাওয়ার পর দিলুর উড়ো উড়ো ভাবটা নজরে আসে মিনুর। দিলুর ঘরে আসার বিরতিটা দীর্ঘ হতে থাকে।

বাড়িটায়ও কেমন থমথমে ভাব। যেন এই বাড়িতে কেউ কখনো কথা বলতে শেখেনি। বাচ্চারাও কেমন স্তব্ধ হয়ে গেছে। নিঃশব্দে যে যার কাজ সেরে নিচ্ছে। এমনকি ধাইও ইশারা-ইঙ্গিতে কথা বলছে। গভীর রাতে মিনুকে ধাইয়ের বানানো ওষুধ খাইয়ে দেওয়া হলো। সারা রাত সবাই নিশ্চুপে অপেক্ষা করল। তখনো পর্যন্ত দিলুর খবর নেই। শেষরাতের দিকে মিনুর ব্লিডিং শুরু হলো। সে যে কিরকম ব্লিডিং। স্রোতের পর স্রোত। আসছে আর আসছে। ধাই আপ্রাণ চেষ্টা করছে রক্ত বন্ধ করতে, কিন্তু কিছুতেই রক্ত বন্ধ হচ্ছে না। একসময় মিনু ফ্যাকাসে হতে হতে নিস্তেজ হয়ে গেল। ধাই তার পাওনার অপেক্ষা না করেই কেটে পড়ল। ঘটনাটি যখন শ্যামল বাবুর কানে পৌঁছল, তিনি জোড় হাতে ঊর্ধ্বনেত্রে বললেন, ‘শান্তি শান্তি। নিশ্চয়ই ভগবান একজন আছেন’। তাঁর দুই গাল বেয়ে অঝোর ধারায় অশ্রু ঝরতে লাগল।

আট বছরের বিশু তার ভারী পা দুটি তুলে উদ্ভ্রান্তের মতো দৌড় লাগাল। পরবর্তী জীবনে বিশু ব্লাড ফোবিয়ায় ভুগতে লাগল। রক্ত সহ্যই করতে পারত না। প্রায়ই স্বপ্ন দেখত, ও যেন এক সাগর রক্তে ভাসছে। যেন কোনো কূলকিনারা নাই।


মন্তব্য