kalerkantho


বই আলোচনা

মাসুদ আহমেদের ‘রৌদ্রবেলা ও ঝরা ফুল’

বেগম সুলতানা কামাল

১৪ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০



মাসুদ আহমেদের ‘রৌদ্রবেলা ও ঝরা ফুল’

রৌদ্রবেলা ও ঝরা ফুল : মাসুদ আহমেদ। প্রকাশক : অন্যপ্রকাশ। মূল্য : ২৫০ টাকা

১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের গত্বাঁধা সাহিত্যের বাইরে গিয়ে মাসুদ আহমেদের এই উপন্যাসটি একটি চমৎকার নামকরণ দিয়ে আরম্ভ করে কাহিনির শেষ পর্যন্ত পাঠককে টেনে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। নানা দিক থেকে এই কাহিনি ও পরিবেশনা অনন্যসাধারণ।

নিষ্ঠুর, অসভ্য পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বাঙালি নারী নির্যাতনের ফল কোনো যুদ্ধশিশু নিয়ে এমন মর্মস্পর্শী এবং বিশ্বাসযোগ্য উপন্যাসের কথা অন্তত আমার জানা নেই। যশোর অঞ্চলে লেখকের কল্পনায় দেলজুয়ারা নামে যে নারীটি নির্যাতিত হয়ে অবাঞ্ছিত সন্তান প্রসব করে সামাজিক লজ্জা ও নিন্দার ভয়ে পরিত্যাগ করে, তা একাত্তর সালের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মানানসই। শিশু পেনরোজকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেন পাকিস্তানে কর্মরত সুইডিশ দম্পতি এলেনা ও র্স্ট্রাউস্ ওডারম্যান। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তাঁরা পেনরোজের কাছে তার পরিচয় প্রকাশ করেন। অপ্রত্যাশিত এই সংকটে ছেলেটির পাশে দাঁড়ায় তার প্রেমিকা। দেলজুয়ারা বেগমও পরিণত বয়সে বুঝতে পারে যে এই নাড়িছেঁড়া ধনকে পরিত্যাগ করার কাজটি তার জীবনের সবচেয়ে বড় মর্মবেদনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে ছেলে তার মায়ের সন্ধানে বাংলাদেশে যাত্রা করে। অন্যদিকে মাও পুত্রকে দেখার জন্য আকুল হয়ে ওঠে। কিন্তু তার পরও সমাজ নির্মিত এবং দীর্ঘদিন ধরে লালিত তথাকথিত শুচিবাই মাকে তার এই একান্ত মৌলিক অধিকার থেকে দূরে রাখতেই কাজ করে। লেখক একাত্তরের ভয়ংকর গণহত্যা, জ্বালাও-পোড়াও, সম্পদহানি ও বিশ্বাস হননের মহাযজ্ঞের মধ্যেও মানবতার শিশিরবিন্দু খুঁজে ফিরেছেন। তাই তাঁর কাছে বাংলাদেশের সম্ভ্রমহানির সঙ্গে একাকার হয়ে উঠেছে একজন মায়ের লাঞ্ছিত হওয়ার দুঃখ। মাতৃভূমি ও মা যে মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বের ও মর্যাদার, এখানে এক মানবিক উপজীব্যের শিল্পরূপ দিতে গিয়ে লেখক তা-ই প্রমাণ করেছেন। এমন ঘটনার জন্য যে গর্ভধারিণী এবং জন্ম লাভ করা শিশু কোনোভাবেই দায়ী নয়, বরং দায়ী লম্পট ও খুনি পুরুষ, মাসুদ তা সাহসের সঙ্গে বিধৃত করেছেন। মানবাধিকারের বিষয়গুলোর মধ্যে ইচ্ছার বিরুদ্ধে গর্ভধারণ একটি অপরাধ, যার জন্য পুরুষ দায়ী। এ ক্ষেত্রে অপরাধী মালিক তাসিকন উদ্দিন খান পাকিস্তানের পক্ষে বীরাঙ্গনাদের কাছে ঘুরে ঘুরে ক্ষমা চাইলে তারা যে কিছুটা হলেও মানুষের পদবাচ্যে ফিরে আসতে পারবে এবং বীরাঙ্গনাদের সংক্ষুব্ধ মন একটু হলেও শান্ত হবে—লেখক এই বইয়ে এমন প্রত্যাশা শৈল্পিকভাবে আঁকতে পেরেছেন। আমরা বৃহৎ পরিসরের অনেক সাহিত্যগ্রন্থের সংস্পর্শে এসে থাকি, যেখানে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠায় কাহিনি একই বৃত্তে ঘুরতে থাকে। মাসুদ আহমেদের এ বই মাত্র এক শ সাতাশ পৃষ্ঠার; কিন্তু প্রাসঙ্গিক কাহিনির বুনন, পরিবেশ ও চরিত্র বর্ণনার মধ্য দিয়ে লেখক এমনভাবে বইটির গ্রন্থনা করেছেন যে পাঠকের মনে একেকটি পৃষ্ঠার শেষে এলেই ঔত্সুক্য জাগবে যে এ ঘটনার পরবর্তী স্তর কী এবং শেষ কোথায়? এই পরিসরে সুইডেন, পাকিস্তান ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান এবং পরবর্তী বাংলাদেশ—এই তিনটি সংস্কৃতি মলাটবদ্ধ করা উল্লেখযোগ্য কঠিন কাজ, যা লেখক সুসম্পন্ন করেছেন। যুদ্ধ বিশেষ করে নারীর ওপর যে ভয়াবহ যন্ত্রণা নিয়ে আসে, লেখক সেই বিষয়টির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। এই বইটি পরম মানবতাবাদী ও যুদ্ধবিরোধী। এই বইয়ের শ্রেষ্ঠ অংশ হচ্ছে পুত্রের কাছে মায়ের লেখা দীর্ঘ পত্রখানি। মায়ের আত্মনিমগ্নতা,  পুত্রের প্রতি প্রবল আকর্ষণ; কিন্তু আবার সমাজের বিরূপতাজনিত দোদুল্যমানতা, ইন্দ্রিয়ের দমন, পরম সংযম ইত্যাদি মিলিয়ে দেলজুয়ারা বেগম একাত্তরের এক জাতীয় স্মারকস্তম্ভ। সময়ের যে শ্রেণির নারীকে লেখক তাঁর কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে এঁকেছেন, তার নামকরণটি সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং শিক্ষাগত বাস্তবতা বিবেচনায় খুব উপযোগী হয়েছে। ইউরোপীয় ওডারম্যান দম্পতির অন্তরমুখী মহানুভবতা, পেনরোজের এশীয় ও ইউরোপীয় মননের মিশ্রণ এবং চন্দ্রিমা মৈত্রের বিশুদ্ধতা চরিত্র চিত্রণে লেখকের বাস্তববোধ ও নিষ্ঠার পরিচায়ক। দেশি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন হওয়ার পাশাপাশি বাঙালি নারী, জননী এবং স্বদেশভূমির পরম লাঞ্ছনার জন্য দায়ী পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা যে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যুক্তিযুক্ত, তার প্রাণোজ্জ্বল প্রকাশের জন্য এই লেখক প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। বাংলাদেশের যশোর, সুইডেনের স্টকহোম এবং পাকিস্তানের পাঞ্জাবের নিসর্গ বর্ণনায় লেখকের দক্ষতা নিপুণ। পুরুষের দুর্যোগে তার পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে  প্রসারপিনার যে ভূমিকা লেখক বর্ণনা করেছেন, তা সর্বজনীনভাবে নারীর মর্যাদা উন্নীত করেছে। অনুতাপহীন পাকিস্তানি সৈন্যের চরিত্র বর্ণনার পাশাপাশি ওই সমাজে অব্যাহত নষ্টামি, ভ্রষ্টামি ও অমানবিকতার যে চিত্রকল্প লেখক এঁকেছেন, তা দেশটির জন্য এখনো সত্য। বইটির প্রচ্ছদ ও ছাপা চমৎকার। অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের ভূমিকাটি এই বই সম্পর্কে পাঠককে জানান দিয়েছে। লেখকের সব মতের সঙ্গে একমত হতে হবে এমন কথা নেই, তবে মুক্তিযুদ্ধ ও মানবাধিকারের পক্ষের সব মানুষের জন্য বইটি পড়া হবে এ বই ও লেখকের প্রতি পরম কর্তব্য পালন।


মন্তব্য