kalerkantho


লেখার ইশকুল

এলিয়টের ওপর তাঁদের ছায়া

১৪ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০



এলিয়টের ওপর তাঁদের ছায়া

১৯৪৮ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান টি এস এলিয়ট। তাঁর জন্ম ১৮৮৮ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর আমেরিকায়।

তিনি ১৯১৪ সালে ইংল্যান্ডে চলে আসেন। স্থায়ী বসবাস, কর্মজীবন এবং বিয়ে করেন ইংল্যান্ডেই। এরপর ১৯২৭ সালে আমেরিকার নাগরিকত্ব ছেড়ে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। নাট্যকার এবং সাহিত্য ও সমাজ সমালোচক হিসেবে রয়েছে তাঁর নিজস্ব স্থান। আর কবি হিসেবে তিনি ২০ শতকের বিশ্বসাহিত্যের প্রধানদের অন্যতম। পরবর্তী প্রজন্মের ওপর ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছেন এলিয়ট। তাঁর ওপর ব্যক্তিপর্যায়ের প্রভাব ফেলেছেন অনেকেই। দান্তে, শেকসপিয়ার, ডান, ড্রাইডেন, জনসন, লাফর্গ, বোদলেয়ার, মিডলটন, টেনিসন, ব্রাউনিংসহ আরো অনেক লেখক ও কবি তাঁর অনুপ্রেরণা হয়ে এসেছেন। ১৯১১ থেকে ১৯১৪ সাল পর্যন্ত তিনি হার্ভার্ডে ভারতীয় দর্শন ও সংস্কৃত ভাষা পাঠ করেন। কখনো কখনো কোনো বিশেষ জায়গাও তাঁর ভালো লেগেছে। যেমন লন্ডন শহর। এ শহর এলিয়টের ওপর জীবন বদলে দেওয়ার মতো প্রভাব ফেলেছে। তাঁর ওপর প্রভাব বিস্তারকারী ব্যক্তি হিসেবে প্রথমেই আসে তাঁর প্রথম স্ত্রী ভিভিয়েন এলিয়টের নাম। ইংল্যান্ডে স্থায়ীভাবে থাকার জন্যই ভিভিয়েনকে বিয়ে করেন এলিয়ট। পরে অবশ্য ভিভিয়েন শারীরিকভাবে অনেক অসুস্থতায় ভোগেন। ১৯৪৭ সালে তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর এলিয়ট বলেন, ‘আমাদের বিয়ে ভিভিয়েনকে সুখ দিতে পারেনি। আমাকে দিয়েছে এমন এক মানসিক অবস্থা, যার ভেতর থেকে বের হয়েছে ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’। এলিয়টের ওপর আরেক প্রভাব বিস্তারকারী ব্যক্তি হলেন এজরা পাউন্ড। তাঁর কবি প্রতিভা দেখে পাউন্ড মুগ্ধ হন। বিভিন্ন পত্রিকায় এলিয়টের কবিতা প্রকাশে সহযোগিতা করেন পাউন্ড। এলিয়টের কবিতা ‘দ্য লাভ সং অব জে আলফ্রেড প্রুফ্রক’ সম্পর্কে পাউন্ড মন্তব্য করেন, ‘আমার দেখা কোনো আমেরিকানের লেখা মহত্তম কবিতা। ’ কয়েক বছর পর লয়েড ব্যাংকে চাকরি করার সময় এলিয়ট তিন মাসের ছুটি পান। ছুটি কাটাতে তিনি সুইজারল্যান্ড যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সে সময় তাঁর হাতে ছিল সম্প্রতি শেষ হওয়া একটি দীর্ঘ কবিতা। এজরা পাউন্ড তখন প্যারিসে ছিলেন। সুইজারল্যান্ডে যাত্রা করার আগে তিনি পাউন্ডের সঙ্গে দেখা করলেন। হাতের সে কবিতাটির নাম ছিল তখন ‘হি ডু দ্য পুলিশ ইন ডিফেরন্ট ভয়েসেস’। কবিতাটি দেখার জন্য অনুরোধ করে পাউন্ডের কাছেই রেখে তিনি চলে গেলেন সুইজারল্যান্ড। ছুটি শেষে ফিরে এসে পাউন্ডের সঙ্গে দেখা করলেন। তত দিনে পাউন্ড কবিতাটির ওপর নির্মম হাতে কাঁচি চালিয়েছেন। দীর্ঘ কবিতাটি কাটছাঁট করে ৪৩৩ লাইনে নামিয়ে এনেছেন। কবিতাটির শিরোনাম বদলে দিয়েছেন : নতুন নাম ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’। বিশ শতকের সবচেয়ে প্রভাবশালী কবিতার অন্যতম এটি। অনেক দিক থেকেই এলিয়টের ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’ টেনিসনের ‘ইন মেমোরিয়াম’-এর আত্মিক পুনর্লিখন। এলিয়টের প্রথম দিকের কবিতায় টেনিসনের প্রভাব আছে। পরে তাঁর প্রবন্ধে টেনিসন সম্পর্কে বিরূপ মনোভাব দেখা গেলেও পরিণত এলিয়টের কাছে টেনিসনের ওস্তাদি স্বীকৃতি পায়। ১৯৩৬ সালে তিনি লেখেন, ‘টেনিসন মহান কবি। যেসব কারণে তিনি মহান, সেগুলোও যথেষ্ট স্পষ্ট। সর্বকালের সেরা কবিদের ছাড়া সাধারণত একই কবির মধ্যে দেখা যায় না এমন গোটা তিনেক গুণের দেখা পাওয়া যায় তাঁর মধ্যে; প্রাচুর্য, বৈচিত্র্য এবং সার্বিক সামর্থ্য। ’ তাঁর প্রথম দিকের লেখা সম্পর্কে এলিয়ট বলেন, ‘১৯০৮ কিংবা ১৯০৯ সালের দিকে আমি যে আঙ্গিকে লেখা শুরু করি, তা আমার ভেতর এসেছে সরাসরি আমার লাফর্গ পাঠ থেকে এবং এলিজাবেথীয় যুগের নাটক পাঠ থেকে। আর কেউ এ রকম একটি জায়গা থেকে লেখা শুরু করেছেন কি না আমার জানা নেই। ’ অন্য আরেক জায়গায় তিনি বলেন, ‘আমার ভেতরে নিজস্ব কণ্ঠস্বর তৈরি করার জন্য যে ধরনের কবিতা আমার পড়ার দরকার ছিল, সে রকম কবিতা ইংরেজিতে ছিল না মোটেও, ছিল ফরাসি ভাষায়। এ ছাড়া অন্য সিম্বোলিস্টদের দ্বারাও প্রভাবিত হয়েছিলেন এলিয়ট। অন্যদিকে মেটাফিজিক্যাল কবিদের কবিতা ছিল এলিয়টের বিশেষ পছন্দের। শেকসপিয়ারের সঙ্গে নৈতিক ও ধর্মবিষয়ক বিবেক চেতনায় মিল ছিল এলিয়টের। আর স্যামুয়েল জনসনকে তিনি অন্য যেকোনো ইংরেজ কবি-সাহিত্যিকের ওপর সম্মান দিতেন। জনসনের মতোই এলিয়টের মধ্যে ছিল একই পর্যায়ের ঈশ্বর বিশ্বাস ও মৃত্যুভয়। এ ছাড়া আরো অনেক ব্যক্তিত্ব ও উৎস থেকে ঋদ্ধ হয়েছেন এলিয়ট।  

 

আল মনসুর


মন্তব্য