kalerkantho


প্র ব ন্ধ
অখণ্ড বঙ্গভাষিক জাতিরাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখা

একজন সাহিত্যিক রাজনীতিক

আহমদ রফিক

২৫ জুন, ২০১৭ ০০:০০



একজন সাহিত্যিক রাজনীতিক

অঙ্কন : বিপ্লব চক্রবর্ত্তী

প্রবল রাজনৈতিক টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে ১৯৪৭ সালের আগস্টে ভারত বিভাগ, সেই সঙ্গে বিভক্ত বঙ্গদেশও। অখণ্ড বঙ্গের পূর্ব-উত্তরাঞ্চল নিয়ে গঠিত ‘পূর্ববঙ্গ’ তথা পূর্ব পাকিস্তান আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে একাত্তরে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে পরিণত হয় বাঙালির স্বাধীন ভাষিক জাতিরাষ্ট্রে, নাম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ।

চল্লিশের দশকে বাঙালির জন্য এমন এক ভাষিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন সুস্থ রাজনৈতিক চেতনালব্ধ সাহিত্যিক এস ওয়াজেদ আলি। সমাজ, রাজনীতি ও সাহিত্যবিষয়ক তাঁর প্রবন্ধাদিতে তা স্পষ্ট।

বাঙালির জাতিসত্তা তথা জাতীয়তার উদ্ভব ও তার রাষ্ট্রিক অস্তিত্বের রাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ কম নয়। তা যেমন বর্তমান নিয়ে, তেমনি দূর ও ঐতিহাসিক অতীতে বাঙালি জনগোষ্ঠীর জাতীয়তা ও তার রাষ্ট্রিক পরিচয় নিয়ে। তবু সত্য যে খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে সম্ভবত বঙ্গ সমতট পুণ্ড্র ও রাঢ়র অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত বাঙালি জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্র গঙ্গারিডির অস্তিত্ব চন্দ্রকেতুগড়সহ একাধিক পুরাতাত্ত্বিক আবিষ্কারের নিদর্শনে স্পষ্ট। কিন্তু মৌর্য ও গুপ্ত সাম্রাজ্যের আগ্রাসী দাপটে গঙ্গারিডির স্বাধীনতা লুপ্ত হয়।

দীর্ঘ সময় পর পাল রাজবংশের শাসনামলে গৌড়বঙ্গীয় রাষ্ট্রের পরিচয় নিয়ে বাঙালি জনগোষ্ঠীর ভূ-রাজনৈতিক যাত্রা শুরু। চর্যাপদর ভাষা যদি আদি বাংলা হিসেবে ধরা যায়, তাহলে এই রাষ্ট্রের ভাষিক চরিত্রও মেনে নিতে হয়। পাল শাসনের সময়কাল ছিল দীর্ঘ (৪০০ বছর) এবং তা চরিত্রে সহিষ্ণু ও উদার—সেক্যুলার শব্দটি যদি ব্যবহার না-ও করি।

কোনো কোনো ইতিহাসবিদের ভিন্নমত সত্ত্বেও এ সত্য অস্বীকার করা চলে না যে সুলতানি আমলের বাংলা বাঙালি জনগোষ্ঠীর স্বাধীন শাসনতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচয়ের যোগ্যতা রাখে। বঙ্গীয় সুলতানদের (ইলিয়াস শাহি আমল থেকে) পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের যে সমন্বয়বাদী (হিন্দু-মুসলমানের সাহিত্য রচনায়) ধারার বিকাশ, তা নিঃসন্দেহে এক বহুধর্মীয় বাঙালি জনগোষ্ঠী তথা জাতির সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বহন করে। সুলতানি আমলের স্বাধীন বাংলার সেক্যুলার চরিত্র নিয়েও সন্দেহের অবকাশ নেই, ইতিহাসে তার যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। ভাষা ও সাহিত্য যে জাতীয়তার ভিত তৈরিতে বিশেষ অবদান রাখে, তা রাষ্ট্রবিজ্ঞানসম্মত সত্য। এমনকি উনিশ শতকের বঙ্গেও তেমনটি লক্ষ করা যায়, যা বিশ শতকের প্রথম কয়েক দশকের রাজনীতিতে পরস্ফুিট। সুলতানি আমলের বাংলার স্বাধীন অস্তিত্বের অবসান ঘটে পাঠান ও মোগল আক্রমণে এবং পরবর্তী নবাবি বাংলার স্বাধীনতা শেষ হয় ইংরেজ বণিকের হাতে।

ষড়যন্ত্র এবং কূটনীতি ও ভেদনীতির চাতুর্যে ইংরেজ বণিকের বঙ্গ বিজয় শেষ পর্যন্ত ভারতবর্ষ জয়ের মধ্য দিয়ে উপমহাদেশে বিদেশি শাসনের পত্তন ঘটায়। সাম্রাজ্য শাসনের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে ইংরেজ শাসকের বিভেদনীতি শুরু থেকেই গোটা ভারতে তো বটেই, বঙ্গীয় জনসমাজের দুই প্রধান ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে যে আর্থ-সামাজিক বৈষম্য তৈরি করে, তা ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হয়। সেই সঙ্গে দুই সম্প্রদায়ের রক্ষণশীল তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক নেতাদের কল্যাণে বৈষম্য থেকে বিভেদ-বিরূপতার অবাধ বিস্তার।

সম্প্রদায়গত অসম বিকাশ ও আর্থ-সামাজিক বৈষম্যের পথ ধরে বঙ্গীয় হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে মানসিক বিভেদের বিস্তার, যা শেষ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে রূপ নিয়েছে। বিশ শতকে এর পূর্ণরূপ, বিশেষ করে চল্লিশের দশকে এর সুস্পষ্ট রাজনৈতিক প্রকাশ অখণ্ড স্বাধীন অসাম্প্রদায়িক বঙ্গের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তোলে। একদিকে হিন্দু রাজনীতির রক্ষণশীলতা, অন্যদিকে মুসলিম লীগ রাজনীতির দ্বিজাতিতত্ত্ব দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে হানাহানির স্থায়ী পরিবেশ তৈরি করে। দুই সম্প্রদায়ের অল্পসংখ্যক সেক্যুলার রাজনীতিকের শুভবুদ্ধি ও মানবিক চেতনা সম্প্রদায়গত বিদ্বেষের অবসান ঘটাতে পারেনি।

অবিভক্ত পরাধীন বঙ্গে দুই প্রধান সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরাজমান উল্লিখিত বৈষম্য ও বিদ্বেষের পটভূমিতে যে কয়েকজন বিচক্ষণ বাঙালি লেখক ও রাজনৈতিক চিন্তাবিদ বৈষম্যহীন সম্প্রদায়গত সহমর্মিতাকে বাঙালি জাতির জন্য সুস্থ ভবিষ্যৎ তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করেছেন, এস ওয়াজেদ আলি (১৮৯০-১৯৫১) তাঁদের অন্যতম। এঁদের বেশির ভাগই তাঁদের লেখা ও বক্তব্যের মধ্য দিয়ে জাতীয় সংহতির পক্ষে অবদান রেখেছেন। আবার কেউ কেউ সেই সঙ্গে সরাসরি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সমন্বয়ী চেতনা গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। এস ওয়াজেদ আলি উল্লিখিত দুই দিকেই শুভেচ্ছার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।

তাঁর সমকালে বাঙালি মুসলমান শিক্ষিত শ্রেণির, বিশেষ করে লেখক ও রাজনীতিকদের একটি অংশ যেমন মুক্তবুদ্ধির চর্চায় মনোনিবেশ করে ধর্মীয় উদারতা ও সহিষ্ণু চেতনার পরিচয় রেখেছে, তেমনি তাঁদের কেউ কেউ রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক চেতনায় ভর করে সমন্বয়বাদী মানসিকতার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। রাজনীতিক্ষেত্রে ‘জাতীয়বাদী মুসলমান’ হিসেবে একটি ভিন্ন রাজনৈতিক ধারার বিকাশ ঘটাতে চেয়েছেন। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন তৎকালীন বঙ্গদেশে তাঁরা রাজনৈতিক সাফল্যে পৌঁছতে পারেননি। এঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ্য কাজী নজরুল ইসলাম, হুমায়ুন কবির, রেজাউল করিম, কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল হুসেন, আবদুল হালিম গজনভি, আবদুর রসুল, সৈয়দ নওশের আলী প্রমুখ। এ কে ফজলুল হকও এই পথে আসা-যাওয়া করেছেন।

 

 

দুই.

 

বাঙালি জাতিসত্তাভিত্তিক সেক্যুলার বাঙালিয়ানার স্বাদেশিকতায় বিশ্বাসী এস ওয়াজেদ আলি জীবিকাসূত্রে আইনজীবী (ব্যারিস্টার) হলেও তাঁর প্রধান পরিচয় একজন রাজনীতিসচেতন প্রগতিশীল সাহিত্যিক হিসেবে। তাঁর রচনার প্রধান বিষয় স্বদেশ, সমাজ ও রাজনীতি, সেই সঙ্গে শিক্ষা ও নারী সমস্যা; লিখেছেন গল্প ও ভ্রমণ কাহিনি। সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চায় নিবিষ্ট এস ওয়াজেদ আলির প্রতিষ্ঠিত ‘গুলিস্তাঁ’ পত্রিকাকে (১৩৩৯) কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার আসর। অনেকটা তাঁর বন্ধু প্রমথ চৌধুরীর সবুজপত্রের স্টাইলে। পত্রিকার প্রচ্ছদে লেখা ‘গুলিস্তাঁ। হিন্দু-মুসলমানের মিলনের অগ্রদূত’। বুঝতে কষ্ট হয় না, ‘সেক্যুলারিজম’ তথা অসাম্প্রদায়িক মানবিক বোধ কতটা গভীর ছিল তাঁর রক্তে। এদিক থেকে কাজী নজরুল ইসলাম স্মর্তব্য এবং আরেক কাজী আবদুল ওদুদ।

শুধু ‘প্রগতিশীল সাহিত্যিক’—এই অভিধায় এস ওয়াজেদ আলির সম্পূর্ণ পরিচয় মিলবে না। তাঁর বিশ্বাসে রয়েছে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার গভীর অবস্থান। তিনি দেখতে চান গোটা ভারতীয় প্রেক্ষাপটে স্বাধীন কিংবা অন্তত স্বায়ত্তশাসিত বঙ্গদেশ, যেখানে রয়েছে একাধিক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। তাদের মধ্যে থাকবে মানবিক বোধের উষ্ণতা, যা নিয়ে ঐক্যবদ্ধ চেষ্টায় ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে বাঙালি তার সুস্থ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবে। সমস্যাজর্জর পরিবেশ সত্ত্বেও এমনটাই ভেবেছেন রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এস ওয়াজেদ আলি। এমনকি তাঁর মতো করে সমস্যা সমাধানের উপায়ও বাতলে দিয়েছেন এই লেখক। ১৯৪১ সালে প্রকাশিত ‘জীবনের শিল্প’ গ্রন্থের কয়েকটি রচনায় এবং ১৯৪৩ সালে প্রকাশিত ‘ভবিষ্যতের বাঙালী’ গ্রন্থে উল্লিখিত বক্তব্যের বিশদ যুক্তিগ্রাহ্য প্রকাশ রয়েছে।

 

তিন.

 

‘ভবিষ্যতের বাঙালী’ বইটি আকারে ছোট হলেও রচনার গুণমানে বিশিষ্ট। সাতটি প্রবন্ধের সংকলন এস ওয়াজেদ আলির এ বইয়ে রয়েছে বাংলা, বাঙালির রাজনৈতিক, সামাজিক ও সম্প্রদায়গত সমস্যার বাস্তবধর্মী বিশ্লেষণ এবং সমস্যা সমাধানের সম্ভাব্য উপায়। লেখক গভীর আন্তরিকতার সঙ্গে অনেকটা শল্যচিকিৎসকের দক্ষতা নিয়ে জাতীয় জীবনের সমস্যা-সংকটের মোকাবেলা করেছেন; এবং তা যুক্তিগ্রাহ্য দূরদর্শিতা নিয়ে। আবেগ সেখানে প্রধান হয়ে ওঠেনি। বাংলা ও বাঙালি নিয়ে লেখক যে তাঁর আবেগ যুক্তির শাসনে রাখতে পেরেছেন, তাতে তাঁর কৃতিত্ব প্রকাশ পেয়েছে। তিনি সর্বাংশে যুক্তিবাদী।

এ বই নিয়ে আলোচনায় আমার বাড়তি আগ্রহের বিশেষ একটা কারণ রয়েছে। চল্লিশের দশকের শেষ দিককার প্রবেশিকা (ম্যাট্রিক) পাঠ্যসূচিতে ‘ভবিষ্যতের বাঙালী’ বইটি অন্তর্ভুক্ত ছিল। তখন থেকেই আমি এ বইয়ের মুগ্ধ পাঠক এবং বাঙালি জাতীয়তার চেতনা নিয়ে হৃদয়ে উদ্দীপনার জোয়ার, অবশ্য সেটি মুসলিম লীগ রাজনীতির বিপরীত স্রোতে। সুধীসমাজে এ বইটির তাত্ক্ষণিক পাঠপ্রিয়তার প্রমাণ প্রকাশের তিন বছরের মধ্যে এর চতুর্থ মুদ্রণ।

তখনকার ‘সওগাত’ পত্রিকার (১৩৫১) ‘পুস্তক পরিচয়’ বিভাগে ‘ভবিষ্যতের বাঙালী’ সম্পর্কে আলোচনায় বলা হয় : “ওয়াজেদ আলি সাহেবের ‘ভবিষ্যতের বাঙালী’ ১১২ পৃষ্ঠার প্রবন্ধের বই। এই পুস্তকটার লেখক চাতুর্য অদ্ভুত দরদে ও মনুষ্যধর্ম্মের সৌকুমার্য্যে সার্থক উত্তীর্ণ হইয়াছে। তাহার স্বপ্ন সাহিত্যিক উল্লাসে অবাস্তবমুখী হয় নাই; স্বাধীন রাষ্ট্রে মানুষের মর্যাদা—রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্বন্ধ-সংযোগ—জাতীয় জাগরণে মানুষের ধর্ম্ম, তদুপরি হিন্দু ও মুসলমানের অচ্ছেদ্য ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল আলোকে রূপায়িত হইয়াছে,—যাহা চরম সত্য, জীবনে ও সমষ্টিগত মানুষের কৃষ্টিগত প্রাণস্রোতে যাহা যথার্থই সম্ভাবিত সত্য, তাহাকে তিনি এড়ান নাই, নিজের চিন্তাধারাকেও   দ্বিধাবিভক্ত হইতে দেন নাই। ”

‘সওগাত’ পত্রিকার ইতিবাচক মন্তব্য সত্ত্বেও অস্বীকারের উপায় নেই যে চল্লিশের দশকে দেশের সামাজিক-রাজনৈতিক জীবন সাম্প্রদায়িকতার বিদ্বেষে এতটা আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল যে সেখানে উদার মানবিক বোধ জায়গা করে নিতে পারেনি। ‘ভবিষ্যতের বাঙালী’ স্বাধীন অখণ্ড বাংলা ও বাঙালি জাতীয়তার যুক্তিতথ্য সত্ত্বেও সাম্প্রদায়িক বিভাজন ঠেকাতে পারেনি। রাজনৈতিক সংকীর্ণতা এর বড় কারণ। আর সে জন্যই বইটির রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভাবনার মূল্য একটুও কমে যায় না। বরং কয়েক দশক পর খণ্ডিত বঙ্গে তাঁর ভাবনা ও স্বপ্ন সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। তবে তা বিভাজিতরূপে প্রকাশ পাওয়ার কারণ যে চল্লিশের দশকের রাজনৈতিক কূটচতুরতা, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

 

চার.

 

সাহিত্যিক হিসেবেই শুধু নয়, ব্যক্তিক বিশ্বাসের ক্ষেত্রেও এস ওয়াজেদ আলি যেমন মুক্তচিন্তার যুক্তিবাদী মানুষ, তেমনি সমাজসচেতন প্রগতিশীল ভাবনার হয়েও সেক্যুলার বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। বলা যায়, গভীরভাবে বিশ্বাসী, যে বিশ্বাস ‘ভবিষ্যতের বাঙালী’ গ্রন্থে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। একই সঙ্গে তিনি উদার মানবধর্মে তথা মানবিকতার তত্ত্বে বিশ্বাসী, বলা যায় রবীন্দ্রনাথের মতোই। তাঁর সাহিত্যাদর্শে মেলে বস্তুবাদী চেতনার প্রকাশ, যা একেবারেই ভাববাদিতার বিপরীতে।

তাঁর এই সাহিত্যবোধ ও মতাদর্শগত বিশ্বাস তাঁর বিভিন্ন রচনায় প্রকাশ পেয়েছে, যেমন—‘ভবিষ্যতের বাঙালী’, তেমনি ‘জীবনের শিল্প’ গ্রন্থের একাধিক প্রবন্ধে, তেমনি অন্যত্র। তাঁর মতে, ‘শিল্প হচ্ছে মানুষের জন্য। ... সাহিত্য হচ্ছে মানুষের জন্য। ...মানুষের মঙ্গলই হবে সাহিত্যের লক্ষ্য, আর সেই লক্ষ্য সাধনের জন্য সাহিত্যিককে শ্রেষ্ঠতম উপকরণ নির্বাচন করতে হবে, আর যথাসম্ভব তারই ব্যবহার করতে হবে। ’ (‘সাহিত্য’— জীবনের শিল্প)।

‘শিল্পের জন্য শিল্প’ (‘আর্ট ফর আর্টস সেক’)—এই নান্দনিক তত্ত্ব নিয়ে শিল্পবাদী তথা ভাববাদী ও বস্তুবাদীদের তর্কবিতর্ক দীর্ঘ সময় ধরে চলেছে, যেমন বিদেশে তেমনি আমাদের স্বদেশি সাহিত্যের অঙ্গনে। সন্দেহ নেই, শিল্পবাদী তত্ত্বের প্রবক্তা থিয়োফিল গোঁতিয়ে ও স্টিফেন মালার্মর প্রভাব তাঁদের অনুসারীদের মাধ্যমে উনিশ শতক পেরিয়ে বিশ শতকের বিশ্বসাহিত্য অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়েছিল। তেমনি জীবনবাদী সাহিত্যতত্ত্বও তলস্তয় ও গোর্কিসহ বামপন্থী সাহিত্যকর্মীদের হাত ধরে বিপরীত ধারা তৈরি করে। রবীন্দ্রনাথের অবস্থান এ দুই মেরুর মধ্যবর্তী নিরক্ষরেখায়।

বাংলা সাহিত্যে তিরিশের দশক যদি শিল্পবাদী তত্ত্বের (সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ভাষায় ‘কলাকৈবল্যবাদ’) প্রাধান্য সৃষ্টি করে থাকে, চল্লিশের দশক কবিতা ও সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় বিপরীত স্রোতের জোয়ার সৃষ্টি করেছিল। এবং তা মূলত জীবনবাদী ও বস্তুবাদী সাহিত্যচেতনার মাধ্যমে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল উদার মানবতাবাদ। সম্ভবত এ জন্যই শেষোক্ত তত্ত্বের প্রভাবে সৃষ্ট সাহিত্য চল্লিশের দশককে অসামান্য জীবনবাদী সাহিত্য দশকে পরিণত করেছিল। যদিও রাজনীতির ক্ষেত্রে অবস্থাটা ছিল এর ঠিক বিপরীত।

শিল্প-সাহিত্যতত্ত্ব বিষয়ক মতাদর্শগত দ্বন্দ্বে এস ওয়াজেদ আলি সাহিত্য সৃষ্টির শিল্পমূল্যে আস্থা রেখেই ভাববাদিতার বিপরীতে বস্তুবাদী। সেই ভাবনা প্রকাশ পেয়েছে তাঁর প্রবন্ধে, বিশেষ করে ‘জীবনের শিল্প’ ও ‘ভবিষ্যতের বাঙালী’ গ্রন্থের প্রবন্ধাবলিতে। ‘জীবনের শিল্প’ শব্দ দুটিতেই তো শিল্পের জীবনবাদী পরিচয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাঁর ভাষায়, ‘উচ্চতম আদর্শ ও শ্রেষ্ঠতম উপকরণের সাহায্যে বিমল আনন্দ পরিবেশন—এই হ’ল সাহিত্যিকের কাজ। ’ অন্যভাবে, ‘মানুষের মঙ্গল আর বিমল আনন্দের পরিবেশন—এই হ’ল সাহিত্যের কাজ। ’ (‘সাহিত্য’—‘জীবনের শিল্প’)। বুঝতে পারা যায়, শিল্পতত্ত্বের বিচারে তিনি সমন্বয়বাদী, তবে মূল ঝোঁকটা জীবনবাদিতার দিকে।

সংশ্লিষ্ট প্রবন্ধগুলোতে এস ওয়াজেদ আলির সাহিত্যাদর্শ ও জীবনাদর্শ দুই-ই সমানভাবে প্রকাশ পেয়েছে। জীবনাদর্শের প্রকাশ বিশেষভাবে স্বদেশ, সমাজ, সম্প্রদায় ও জীবনাচরণকে ঘিরে, সাহিত্যাদর্শ সেসব ক্ষেত্রে সৃষ্টির নেপথ্য প্রেরণা। জীবনবাদিতার পাশাপাশি তিনি যে মানবতাবাদী, তাঁর লেখায় তেমন প্রমাণ মেলে। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা নিজেদের মুসলমান বলে মনে করি, নিজেদের ভারতবাসী বলে মনে করি, নিজেদের বাঙালী বলে মনে করি, আর সর্ব্বোপরি নিজেদের মানুষ বলে মনে করি; আমাদের সাহিত্যে আমাদের এইসব বিশেষত্বকেই সম্যক রূপে ফুটিয়ে তুলতে হবে,...। ’

মানুষ হিসেবে মনুষ্যত্ববোধকে লেখক ওয়াজেদ আলি তাঁর জীবনে এবং তাঁর রচনায় প্রাধান্য দিতে পেরেছেন বলে সম্প্রদায়বাদিতা যেমন তাঁর রচনায়, তেমনি তাঁর জীবনাচরণে প্রভাব ফেলতে পারেনি। মানবধর্মে বিশ্বাসী এই সাহিত্যিক বাংলা, বাঙালিত্ব নিয়ে সোচ্চার হয়েও এবং গভীরভাবে জাতীয়তাবাদী হয়েও আন্তর্জাতিকতাবাদী; বাঙালি (ভারতবাসী) হয়েও বিশ্বনাগরিক। এদিক থেকে রবীন্দ্র-ভাবনার সঙ্গে আশ্চর্য মিল লক্ষ করার মতো।

 

পাঁচ.

 

চৈতন্যের উদারতা ও পরমতসহিষ্ণুতাকে জীবনাদর্শে প্রধান করে তুলতে পারার কারণে ‘ভবিষ্যতের বাঙালী’ প্রবন্ধে বাঙালির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গেও বৈশ্বিক চেতনা উঠে এসেছে। অনায়াসে বলতে পেরেছেন, ‘সর্ব্বদেশের সর্ব্বমানব মিলে পরস্পরের প্রেম আর ভালবাসার ভিত্তিতে যদি এই পৃথিবীতে এক অখণ্ড রাষ্ট্র স্থাপন করতে পারে, তা হ’লে সেই হ’ত আমাদের আদর্শ রাজনীতিক প্রতিষ্ঠান। ’

এখানেও রবীন্দ্র-ভাবনা খুঁজে পাওয়া যেতে পারে এবং রবীন্দ্র-ভাষা ধার করে বলা যায়, এ হচ্ছে এক অসম্ভবের পায়ে মাথা কুটে মরা। বিশ্বপরিসরের তুলনায় অতি ছোট্ট ভূখণ্ড বঙ্গদেশেই যেখানে সব সম্প্রদায়ের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হতে পারে না, পারে না বৃহত্তর ভারতবর্ষে, সেখানে নানা জাতি, বর্ণ ও ধর্মের বিশ্বমানব একাত্ম হবে তা কল্পনার বাইরে। ক্ষমতা, স্বার্থপরতা, ধর্মীয় রক্ষণশীলতার মতো নানা বাধা ঐক্যের বিপক্ষে।

বিদেশে শিক্ষিত এস ওয়াজেদ আলিও হয়তো এ সত্যটা জানতেন। তাই বলেছেন, ‘মানুষ অন্ধকার থেকে আলোয় আসবার চেষ্টা করছে বটে, কিন্তু এখনও সে অন্ধকারেই আছে। সঙ্কীর্ণতার বাঁধ অতিক্রম করার চেষ্টা সে করছে বটে, কিন্তু এখনও সঙ্কীর্ণতা তার অন্তরকে দৃঢ়ভাবে ঘিরে আছে। ’ আর সে কারণেই বিশ্বমানব ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, জাতিসত্তা ইত্যাদি ছকে বিভক্ত হয়ে নানা-দেশরাষ্ট্রে স্বাতন্ত্র্যবাদী অবস্থান নির্দিষ্ট করে নিয়েছে। এ প্রবণতা তুলনামূলক বিচারে এশিয়া ভূখণ্ডে অপেক্ষাকৃত বেশি। নানা মাত্রায়, বিশেষত ধর্মীয় বিশ্বাসে তা ভারতীয় উপমহাদেশে আরো বেশি।

সম্ভবত সেক্যুলার গণতান্ত্রিকতায় গভীরভাবে বিশ্বাসী বলেই লেখক বাঙালির সর্বমাত্রিক উন্নতি ও বাংলা রাষ্ট্র বিনির্মাণের প্রসঙ্গে তৎকালীন বাস্তবতার নিরিখে সম্মিলিত ভারতীয় রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠান গঠনের বিজ্ঞানসম্মত প্রস্তাব রেখেছেন। কারণ আরো অনেকের মতোই তাঁর ধারণা, ভারতবর্ষ বহুভাষিক জাতিসত্তার বহুভূখণ্ড ভিত্তির দেশ, সেখানে প্রতিটি জাতির নিজস্ব ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি রয়েছে, যা পরস্পর থেকে পৃথক।

লেখকের ভাষায়, ‘এই সব ভূখণ্ডের প্রত্যেকেরই নিজস্ব ভাষা, নিজস্ব কৃষ্টি, নিজস্ব ইতিহাস, নিজস্ব নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, নিজস্ব অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সমস্যা আছে। এই ভূখণ্ডগুলির নিজ নিজ বিশেষত্বের দিকে লক্ষ্য করলে, এদের প্রদেশ না ব’লে এক একটি রাষ্ট্র বা উপরাষ্ট্র বললেই সঙ্গত হয়। ভারতের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রতন্ত্রে এই বিভিন্ন উপরাষ্ট্রগুলির বিশেষত্বের দিকে লক্ষ্য রেখে তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণশীল এক একটি রাজ্যের (Dominion) অধিকার দেওয়া দরকার—অবশ্য তাদের আভ্যন্তরীণ বিষয় সম্পর্কে। ’ লেখকের বিচারে এই সব স্বতন্ত্র ভূখণ্ড হচ্ছে বঙ্গদেশ, পাঞ্জাব, সিন্ধু, সীমান্ত প্রদেশ, বেলুচিস্তান, মহারাষ্ট্র ইত্যাদি।

 

স্বায়ত্তশাসিত এসব ভূখণ্ড নিয়ে লেখকের মতে, ‘ভারতবর্ষে এক সম্মিলিত রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠান গঠন করার দরকার। ’ এবং প্রতিটি ভূখণ্ড তাদের ভাষিক, সাংস্কৃতিক ও জনমানসিক ঐক্যের প্রতি লক্ষ করে গঠিত হবে। লেখক মনে করেন, এভাবে বিভিন্ন খণ্ডরাষ্ট্র নিয়ে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র গঠিত হলে ভারতীয় জীবনের উপযোগী রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রবর্তন সম্ভব। সম্ভব ভারতীয় রাজনীতির সমস্যা, সংকট ও জটিলতা থেকে উত্তরণ।

ভারতের বিভিন্ন ভাষিক জাতিসত্তাগুলো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র গঠনের রাজনৈতিক সম্ভাবনার কথা আর কেউ যে ভাবেননি এমন নয়। রবীন্দ্রনাথের ‘স্বদেশী সমাজ’ভিত্তিক রাষ্ট্রিক ভাবনায় কিছুটা হলেও এমন আভাস মেলে। আর চল্লিশের দশকে যত দূর মনে পড়ে, কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষে ভাষিক জাতি ও ভূখণ্ডভিত্তিক ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রস্তাব নেওয়া হয়, যদিও তা নিয়ে পরে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ওটা প্রস্তাবেই থেকে গেছে। ভাষিক জাতিসত্তাভিত্তিক ভূখণ্ড নিয়ে ভারতীয় ফেডারেশন গঠনের কোনো প্রস্তাব কমিউনিস্ট পার্টির তরফ থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্থাপিত হয়নি।

সেই চল্লিশের দশকের একাধিক লেখায় এস ওয়াজেদ আলি উল্লিখিত পথে বাংলা ও বাঙালির রাষ্ট্রিক সমস্যার সমাধান খুঁজেছেন। সে পথ ছিল সমাজতন্ত্রের বিজ্ঞানসম্মত রাজনৈতিক পথ—যেকোনো ভাষিক জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বীকৃত পন্থা। তা হলো, ধর্ম-বর্ণ ও জাতিগত নিরপেক্ষ জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ উন্নয়নের পথ। বাংলা ও বাঙালির সুস্থ সমৃদ্ধির জন্য এমন এক ব্যবস্থার রূপরেখা তুলে ধরেছেন এস ওয়াজেদ আলি তাঁর রচনায়। সে রূপরেখায় ধর্মীয় সংকীর্ণতা ও সামাজিক ভেদাভেদের কোনো স্থান নেই।

ভারতবর্ষীয় পটভূমিতে বাংলা ও বাঙালির ভূখণ্ড ও জাতিগত বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করতে গিয়ে এস ওয়াজেদ আলি লিখেছেন : ‘প্রাকৃতিক কারণে ভারতবর্ষ যে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট খণ্ডে বিভক্ত হয়ে গেছে, তার মধ্যে আমাদের বাংলাদেশ অন্যতম। প্রথম যে বৈশিষ্ট্য...সেটি হ’চ্ছে ভাষাগত ঐক্য। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন ধর্মের লোকের মধ্যে কুলগত ঐক্য (নিয়ে) সুনির্দ্দিষ্ট এক জাতির উদ্ভব হয়েছে, যাকে আধুনিক বাঙালী জাতি বলা যেতে পারে। ’ এরপর বাঙালি জাতির সুনির্দিষ্ট আরো কিছু বৈশিষ্ট্য ও সমন্বিত সংস্কৃতির উল্লেখ করে বলেছেন, ‘ভারতের রাজনীতি ক্ষেত্রে বাঙালীই গণতান্ত্রিক এবং জাতীয়তাবাদের প্রধান এবং বিশ্বস্ত সমর্থক। ’

এসব নৃতাত্ত্বিক সাংস্কৃতিক সাদৃশ্য সত্ত্বেও বাঙালির মধ্যে সম্প্রদায়গত যে বিভেদ ও আর্থ-সামাজিক বৈষম্য রয়েছে, তার ঊর্ধ্বে দাঁড়িয়ে লেখক স্বপ্ন দেখেন : ‘নব্য তুর্কীর মত প্রকৃতির লীলানিকেতন সম্পদশালিনী বাংলাদেশে,...বাঙালীর জীবনেই বা অখণ্ড এক আদর্শ জাতীয়তা সম্ভব হবে না কেন?’ আর সেই ‘স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত ও চিন্তাকে রূপায়িত করতে হলে’ লেখকের যুক্তিসংগত বক্তব্যে তিনটি প্রয়োজন প্রাধান্য পেয়েছে। যেমন ‘হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য, বাংলার রাষ্ট্রীয় জীবনের স্বাতন্ত্র্য; আর শুভবুদ্ধি ও জ্ঞানের উদ্বোধন এবং সম্প্রসারণ। ’ লেখকের বিচারে শেষোক্ত প্রয়োজনটি পূরণের ওপরই অপর দুটির সাফল্য নির্ভর করছে।

সন্দেহ নেই, মানবিক শুভবুদ্ধির উদ্ভাস এবং সুস্থ জ্ঞানচর্চা একটি জাতির জীবনে অনেক সমস্যা-সংকট থেকে মুক্তির পথ দেখাতে পারে। বাঙালি জাতির ক্ষেত্রেও কথাটা সত্য বলে মনে করেন লেখক। এটা উভয় সম্প্রদায়ের বাঙালির পক্ষেই সত্য। শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চায় পিছিয়ে পড়া বাঙালি মুসলমানের মধ্যশ্রেণিকে একইভাবে উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন ‘শিখা’ গোষ্ঠীর সদস্যগণ। বাস্তবিক মুক্তচিন্তার মননশীলতাই দুই সম্প্রদায়ের শিক্ষিত শ্রেণিকে পরস্পরের কাছে আসতে সাহায্য করতে পারে। পারে সমাজকে অন্ধ সংস্কার ও রক্ষণশীলতা থেকে মুক্তির পথ দেখাতে।

 

ছয়.

 

অখণ্ড বাঙালি জাতীয়তার ভাষিক-সাংস্কৃতিক ভিত্তিতে বিশ্বাসী লেখক এস ওয়াজেদ আলি অখণ্ড জাতীয়তার অন্তরায় হিসেবে যে কয়টি বাধা চিহ্নিত করেছেন, তা খুবই যুক্তিসংগত। তার মধ্যে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিন্দু-মুসলমানের মানসিক অমিলও উভয়ের মধ্যে বিরাজমান আর্থ-সামাজিক বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িক চেতনা। আশ্চর্য নয় যে রবীন্দ্রনাথসহ আরো কয়েকজন রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব একই রকম মতামত ব্যক্ত করেছেন, সমাধানের পথনির্দেশও করেছেন।

তাঁরা সবাই নানা উপায়ে ঐক্যের যে পথ বাতলেছেন, আমাদের আলোচ্য লেখকের ব্যাখ্যাবিচারে ও আলোচনায় তেমনটাই দেখতে পাই। তবে এক পা বাড়িয়ে অন্যতম মূল সমস্যার দিকে সাহসী ইঙ্গিত রেখেছেন এস ওয়াজেদ আলি। ধর্মের মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে তাঁর মন্তব্য আমি খুবই যুক্তিনিষ্ঠ মনে করি। হয়তো সুফিবাদের ভাবাদর্শে বিশ্বাসী বলেই তাঁর পক্ষে চাঁছাছোলা বিচার ও কঠিন সত্যকে স্বীকার সম্ভব হয়েছিল।

তিনি লিখেছেন : ‘আনুষ্ঠানিক ধর্ম্মের সবচেয়ে বড় দুর্ব্বলতা হচ্ছে এই যে, তার প্রকৃতি হ’ল মানুষের মধ্যে বিভেদের সৃষ্টি করা, মানুষকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গণ্ডিতে বিভক্ত করা এবং সেই গণ্ডিগুলিকে ধর্ম্মের আকার দিয়ে চিরস্থায়ী ক’রে তোলা। পৃথিবীর প্রত্যেক ধর্ম্মই এই পথে গিয়েছে। ফলে সর্ব্বত্র এমন এক আবহাওয়ার সৃষ্টি হয়েছে যে মানুষের পক্ষে ব্যাপকভাবে একত্রে কোন কাজ করা অসম্ভব হ’য়ে দাঁড়িয়েছে; মিলনের সর্ব্বজনমান্য কোন আদর্শ কায়েম করতে আনুষ্ঠানিক ধর্ম্মে কোথাও সমর্থ হয়নি। ’

মিলনের বদলে ধর্ম যে মানবজাতিকে সাদা-কালো ছকে বিভক্ত করে রেখেছে, সেই অপ্রিয় সত্য রবীন্দ্রনাথও বুঝতে ভুল করেননি। তাই লিখতে পেরেছেন, ‘ধর্মমোহের চেয়ে নাস্তিকতা অনেক ভালো। ’ তিনি ঠিকই লক্ষ করেছিলেন যে ইউরোপের মতো কামাল পাশাও নব্য তুরস্কে ধর্মীয় রাষ্ট্রের বদলে সেক্যুলার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ধর্ম ও রাষ্ট্রের পারস্পরিক সম্পর্ক বিবেচনা করে এস ওয়াজেদ আলিও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। চেয়েছেন ‘ইউরোপ ভূখণ্ডে ধর্মরাষ্ট্রের অবসান ঘটার’ পথ ধরে যাতে ‘প্রাচ্যের স্বাধীন রাষ্ট্রগুলিও দ্রুত সেই একই পথে অগ্রসর’ হয়। তাঁর মতে, ‘বাঙালীর পক্ষেও এ যুগধর্মের অনুসরণ করা ছাড়া উন্নতি ও সার্থকতার অন্য কোন পথ নাই। ’ আর ‘জাতীয়তার ভিত্তির উপরেই রাষ্ট্রীয় জীবন গড়তে হবে। ’

কিন্তু অখণ্ড জাতীয়তার প্রাথমিক শর্ত যে হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য তথা মিলন, সেই বাস্তবতার ওপর জোর দিয়েছেন ভবিষ্যৎ বাঙালির স্বপ্নদ্রষ্টা লেখক। এই মিলনের কথা রবীন্দ্রনাথ তাঁর লেখায় বহুবার উল্লেখ করেছেন। আর জনাব আলির মতে, এ পথ ধরে গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে না, যতক্ষণ ‘উভয় সম্প্রদায়ের লোক নিজেদের প্রথমত বাঙালী আর তারপর হিন্দু কিম্বা মুসলমান হিসাবে ভাবতে না শিখবে। ’

বলা বাহুল্য, দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য তৈরিতে দরকার মিলনের অন্তরায়গুলো দূর করা। আর লেখক সঠিকভাবেই ওই বাধাগুলো চিহ্নিত করেছেন। তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ‘ঐতিহাসিক শিক্ষার বর্তমান প্রণালী ধর্মগুরুদের অবাঞ্ছনীয় প্রভাব, চাকুরীজীবী মধ্যবিত্তশ্রেণীর অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, অতীতের সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রকে আনবার দুরাশা এবং দুঃস্বপ্ন’ ইত্যাদি। এ ক্ষেত্রে তিনি যুক্তিসংগতভাবেই সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে উল্লেখ করেছেন।

বহু আলোচিত রাজপুত, মারাবির বীরত্বের বিপরীতে পাঠান ও মোগলদের কালো রঙে আঁকার অনৈতিহাসিক ইতিহাসের রাজনৈতিক কুপ্রভাব নিয়ে সংগত কারণে প্রশ্ন তুলেছেন এস ওয়াজেদ আলি। স্বাধীন বঙ্গের শেষ নবাবও এ আলোচনায় এসেছে। লিখেছেন ‘সব অর্দ্ধ-ঐতিহাসিক, অর্দ্ধ-কাল্পনিক বিষয় এমনভাবে লিখিত হয়েছে, এমনভাবে এসবের শিক্ষা দেওয়া হয় যে, হিন্দু ছেলেদের মনে মোসলেম-বিদ্বেষ আপনা থেকেই জেগে ওঠে। আর বাল্যজীবনের শিক্ষা এমন গভীরভাবে ছাত্রের অন্তরে প্রবেশ করে যে, পরে তার বিষময় প্রভাব থেকে তার মনকে শত চেষ্টা সত্ত্বেও মুক্ত করা যায় না। ’ এ বিষয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন নয়।

 

সাম্প্রদায়িকতার কারণ সম্পর্কে কথাগুলো বড় নির্মম সত্য এবং মুসলমান সমাজে এর প্রতিক্রিয়াও ছিল অনুরূপ। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ ও অনুরূপ উপন্যাসের প্রতিক্রিয়া তার প্রমাণ। আর এসবের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া তৎকালীন রাজনীতিকে দূষিত করতে যথেষ্ট প্রভাব রেখেছিল। বিষয়টি নিয়ে এর আগেও আলোচনা কম হয়নি, হয়েছে পরেও।

‘ভবিষ্যতের বাঙালী’ ও সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রবন্ধে এস ওয়াজেদ আলি হিন্দু-মুসলমান অনৈক্য নিয়ে এবং ঐক্যের উপায় নিয়ে আবেগ দিয়ে নয়, যুক্তি দিয়েই বিশদ আলোচনা করেছেন। যেখানে পারিবারিক শিক্ষা, মানবিক বোধের শিক্ষা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, আচার-অনাচার প্রসঙ্গ সংগত গুরুত্ব নিয়ে প্রকাশ পেয়েছে।

স্বভাবতই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলো সে আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে। ‘অর্থনৈতিক গণস্বার্থই রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রথম ও প্রধান বিষয়’ হিসেবে গণ্য করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। গুরুত্ব দিয়েছেন পিছিয়ে পড়া মুসলমানসমাজের শিক্ষার প্রতি। শিক্ষিত হিন্দুসমাজকে এ বিষয়ে সহযোগিতার জন্যও আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে মিলনের সেতু তৈরি হয়। রাজনীতির ক্ষেত্রে উল্লেখ করেছেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের ইতিবাচক ভূমিকার কথা।

যেমন রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, একইভাবে এস ওয়াজেদ আলিও বলেছেন নানা উপলক্ষে দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের গুরুত্বের কথা, মনের মিলের প্রয়োজনীয়তার কথা। বিশেষ উপলক্ষে বা উৎসব অনুষ্ঠানে একত্রিত হওয়ার কথা। যেমন—‘বাংলাদেশে হিন্দু-মুসলমান-নির্বিশেষে ১লা বৈশাখে সকলেরই মহাসমারোহের সহিত জাতীয় পর্ব্বরূপে নববর্ষের উৎসব সম্পন্ন করা উচিত। ’ এ কালে ঢাকায় বৈশাখী উৎসব তাঁর স্বপ্ন সফল করলেও সামাজিক ক্ষেত্রে মিলনের স্বপ্ন অধরা থেকে গেছে।

এ প্রসঙ্গে আরো বলেছেন, ‘ভিতরের মিল মনের মিল ছাড়া হতে পারে না। হিন্দু-মুসলমান যখন পরস্পরকে চিনতে শিখবে, পরস্পরকে ভালবাসতে শিখবে, পরস্পরের ধর্ম্ম এবং সভ্যতাকে সম্মান করতে শিখবে, পরস্পরের সঙ্গে খাওয়া-বসা, মেলামেশা, আনন্দ-উৎসব করতে শিখবে, মনের মিল তখন আপনা থেকেই আসবে, বিরোধ আপনা থেকেই চলে যাবে। ’ এ বিষয়টার ওপর রবীন্দ্রনাথও তাঁর একাধিক রচনায় সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

যেমন করেছেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে উভয় সম্প্রদায়ের সাহিত্যিকদের সমানভাবে সংশ্লিষ্ট হওয়া নিয়ে। এস ওয়াজেদ আলিও লিখেছেন : ‘এই অন্তরের মিলনের ভিত্তিই হ’চ্ছে ভাষা এবং সাহিত্য। ’ প্রসংগত উল্লেখ করেছেন ‘মানব প্রেমমণ্ডিত (Humanistic Literature) সাহিত্যের’ গুরুত্বের কথা। বলেছেন ‘বাঙালী জাতির ভবিষ্যৎ হ’চ্ছে তরুণেরা, কবি এবং সাহিত্যিকেরা,...। ’ তাঁর এ বিবেচনায় এতটুকু ভুল নেই। তিনি চেয়েছেন হিন্দু-মুসলমান যেমন রাজনীতিতে, তেমনি ‘বাংলা ভাষার সাহায্যে এক অখণ্ড জাতি গঠন’ করতে এগিয়ে আসুক। একাত্তরে বাংলাদেশ সেই স্বপ্ন ভূখণ্ড ভিত্তিতে পূরণ করেছে, তাত্ত্বিকভাবে করেছে, বাস্তবে পুরোটা নয়।

রাজনীতি প্রসঙ্গে যে কথা একাধিকবার লিখেছেন, সেটা তৎকালীন পরিবেশে আরো স্পষ্ট করে বলেছেন ‘হিন্দু-মুসলমানের মিলন’ উপশিরোনামে। রাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ সেই কথা হচ্ছে, ‘ভারতীয় জাতীয়তাকে প্রাদেশিক জাতীয়তার ভিত্তির ওপরই গড়তে হবে। প্রত্যেক প্রদেশের ভাষাকে অবলম্বন করে সেই প্রদেশের হিন্দু ও মুসলমানকে একতার সুনিবিড় সূত্রে গ্রথিত করতে হবে। প্রত্যেক প্রদেশের হিন্দু-মুসলমান যথাসময়ে তাহলে একটি জাতিতে (Nation) পরিণত হবে। সেই বিভিন্ন জাতিসমষ্টির পারস্পরিক মিলনে গড়ে উঠবে ভবিষ্যৎ ভারতের রাষ্ট্রসংঘ (Federation of States)|... ভাষার ভিত্তিতে প্রদেশের ভৌগোলিক সীমার নির্দেশই বাঞ্ছনীয় এবং স্বাভাবিক। ’

ভাষিক রাষ্ট্রের পরিকল্পনায় গঠিত ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র সত্যই হতে পারত রাজনৈতিক সমস্যা থেকে পরিত্রাণের পথ। হতে পারত সাম্প্রদায়িক সমস্যা দূর করার সহায়ক উপায়। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানসম্মত সেই যুক্তিবাদী পথ ছেড়ে সম্প্রদায়বাদী পথই রাজনীতিকদের কাছে শ্রেয় মনে হয়েছিল। পরিণামে সাধারণ মানুষের রক্তমাখা পথে দেশ বিভাগ এবং তা ধর্মীয় জাতীয়তা ও দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে। সমাজবিজ্ঞানভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আদর্শের পরাজয়ই ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক নিয়তি এবং তা অখণ্ড বঙ্গদেশেরও। তবে শেষ পর্যন্ত খণ্ডিত বঙ্গে অর্থাৎ পূর্ব বঙ্গে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভাষিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলেও তার চরিত্রধর্ম নিয়ে সংশয়ের অবকাশ রয়েছে।

চল্লিশের দশকের দূষিত রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যেও এস ওয়াজেদ আলি ভারতীয় উপমহাদেশে বিভিন্ন জাতিসত্তার অভ্যন্তরীণ স্বাধীনতার ভিত্তিতে সেক্যুলার বহুজাতিক ভারতীয় ফেডারেশন-রাষ্ট্রের পক্ষে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। পাশ্চাত্যের দিকে অঙুল তুলে বলেছিলেন—‘ধর্ম্মমূলক আদর্শ জাতীয়তার আদর্শের কাছে হার মেনেছে বলেই পৃথিবীর সর্বত্র এখন ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠিত হ’চ্ছে; ধর্ম্মাদর্শের প্রধান দুর্ব্বলতা এই যে, তার স্বাভাবিক গতি হ’চ্ছে বিভক্তির দিকে, বিচ্ছেদের দিকে। ’

তাই অখণ্ড বঙ্গদেশকে লেখক ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক এক গণতান্ত্রিক ভাষিক রাষ্ট্ররূপে দেখতে চেয়েছেন, যা বাস্তবায়িত হতে পারবে হিন্দু, মুসলমান ও বৌদ্ধ, খ্রিস্টান—বাঙালির সম্মিলিত সাধনায়। ‘ভবিষ্যতের বাঙালী’র প্রবন্ধাবলি ও সংশ্লিষ্ট দু-একটি রচনায় বাঙালির ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন এস ওয়াজেদ আলি। ‘ভবিষ্যতের বাঙালী’র পক্ষে তাঁর শেষ কথায় তাই অনুরূপ বক্তব্যের প্রতিধ্বনি। ‘বাংলা ভাষায় যাঁরা প্রথম বর্ণোচ্চারণ করে ও মনের ভাব প্রকাশ করে—জাতি-বর্ণ-নির্ব্বিশেষে তাদের ঠাঁই বাঙালীর নব্য জাতীয়তার প্রশস্ত আঙিনায় অসঙ্কুলান হবে না। বাঙালী হিন্দু, বাঙালী মুসলমান, বাংলার সব ভাই-বোনের সম্মিলিত চিত্তে এই অখণ্ড জাতীয়তার অভিনব শুভ প্রেরণা মূর্ত্ত হয়ে উঠুকু, এই প্রার্থনা। ’ এ যেন অনেকটা রাবীন্দ্রিক কবিতা ‘বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন,/বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন/এক হউক এক হউক’-এর মতো উচ্চারণ।


মন্তব্য