kalerkantho


প্র ব ন্ধ

মাতৃভাষা, পিতৃতান্ত্রিকতা ও মায়ের মুখ

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

২৫ জুন, ২০১৭ ০০:০০



মাতৃভাষা, পিতৃতান্ত্রিকতা ও মায়ের মুখ

অঙ্কন : বিপ্লব চক্রবর্ত্তী

মাতৃভাষা মাতৃভূমির চেয়েও অধিক সত্য, এবং জরুরি। কেননা মাতৃভাষা সব সময় ব্যক্তির সঙ্গে থাকে, মাতৃভূমি যা থাকে না।

ওই সঙ্গে থাকাটা মানিব্যাগ, পাসপোর্ট বা মোবাইল ফোনের মতো নয়, বরং নিজের চেহারার মতো; বদলালেও মৌলিকভাবে বদলায় না। মাতৃভাষাকে বলব কি অনুভূতির ব্যাপার? হ্যাঁ, বলা যাবে। কিন্তু সেই সঙ্গে যোগ করতে হবে এই কথাটাও যে মাতৃভাষা আমাদের ঠিকানা, আশ্রয়, আত্মপরিচয় এবং গৌরব। ওই ভাষাতে গচ্ছিত রয়েছে ইতিহাস ও ঐতিহ্য। এ ভাষা একই সঙ্গে ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত; এখানে এসে ব্যক্তি মিলিত হয় অপরের সঙ্গে, পূর্বসূরি ও উত্তরসূরি এককাতারে এসে যায়, হাত ধরাধরি করে দাঁড়ায়। মাতৃভাষা থেকে যারা বঞ্চিত তারা সত্যি দুর্ভাগা, কেননা তারা মাতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত।

আমাদের মাতৃভাষা আমাদের জাতীয় ইতিহাসের মতোই কোণঠাসা। সেখানে প্রতিফলন ঘটেছে মায়ের মুখচ্ছবির। মলিন এবং বিষণ্ন।

এই দুর্দশার প্রধান কারণ পরাধীনতা। দীর্ঘস্থায়ী পরাধীনতা একটি জাতিকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে তার নিদর্শন বাঙালি জাতির ইতিহাসে বেশ উজ্জ্বলরূপেই প্রকাশিত। বিদেশি শাসকরা এসেছে, এসে দেশকে শোষণ করেছে। সেই শোষণের কুফল দেখা গেছে বৈষয়িক ও আদর্শিক উভয় ক্ষেত্রে। বৈষয়িকভাবে দেশের অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে পড়েছে। এখন আমরা স্বাধীন হয়েছি বটে, কিন্তু সেই যে অভাব তৈরি হয়েছিল, তা থেকে মুক্তি পাইনি। আদর্শিক পীড়নটাও কম ছিল না। মেরুদণ্ড দুর্বল হয়েছে এবং একদিকে পরমুখাপেক্ষিতা, অন্যদিকে হীনম্মন্যতা দেখা দিয়েছে। এই যে অর্থনৈতিক ও আদর্শিক কারণে নত হয়ে পড়া, সেটাই ঐতিহাসিক কারণ আমাদের মলিনতা ও দুর্দশার। আমাদের মাতৃভাষার কোণঠাসা দশা কোনো আকস্মিত দুর্ঘটনা নয়, একটা ধারাবাহিক ব্যাপার বটে।

বিদেশি শোষকরা খালি হাতে আসেনি, সঙ্গে করে নিজেদের মাতৃভাষা নিয়ে এসেছিল। এবং যেমনটা করার কথা তা-ই তারা করেছে। নিজেদের ভাষাকে রাজভাষা করেছে। দখলদারির সেটাও একটা পদ্ধতি বটে। এই কাজে বিশেষ দক্ষতা দেখিয়েছে সর্বশেষ যে শাসক ছিল, সেই ইংরেজরা। তারা বিস্তর অভিজ্ঞতা ও প্রচুর বুদ্ধি নিয়ে এসেছিল। দখলদারি চিরস্থায়ী করার পরিকল্পনায় তারা আইন-আদালত, সেনাবাহিনী ও পুলিশ, ব্যবসা-বাণিজ্য, আমলাতান্ত্রিক প্রশাসন—এ সব কিছু চাপিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে আপাতনিরীহ কিন্তু ভেতরে ভয়ংকর যে আধিপত্যটি প্রতিষ্ঠা করেছিল, সেটা ভাষার। ভাষার সাহায্যে মনমানসিকতায় উপনিবেশ স্থাপন করেছে, যে ঔপনিবেশিকতা তাদের প্রকাশ্য প্রস্থানের পরও কায়েম রয়েছে।

তাদের গড়া রাষ্ট্র ভাঙল, নতুন রাষ্ট্রকেও অর্থাৎ পাকিস্তানকেও ভাঙতে হলো, তার পরে সম্পূর্ণ ভিন্ন সম্ভাবনা নিয়ে আমরা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করেছি; এসব পতন-উত্থানে শাসক বদলেছে অবশ্যই, কিন্তু রাষ্ট্রের মূল চরিত্রে পরিবর্তন ঘটেছে বলা যাবে না। আইন-কানুন, আমলাতন্ত্র, বিভিন্ন বাহিনীর কার্যকলাপ—সব কিছুই চলছে ইংরেজের প্রতিষ্ঠিত সেই জনবিচ্ছিন্ন ও পীড়নমূলক ধারায়। রাষ্ট্রভাষা বদলেছে, এটা একটা বড় অর্জন। কিন্তু রাষ্ট্রভাষা বাংলা হলেও রাষ্ট্রের ভাষা বাংলা হয়নি। সমাজেও সেই পুরনো ইংরেজি ভাষার যতটা মর্যাদা, বাংলার ততটা নয়। অন্য প্রমাণ দরকার হয় না, রাজধানীতে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের সঙ্গে মফস্বলের বাংলা মাধ্যমিক স্কুলের তুলনা করলেই হাঁড়ির খবর জানা হয়ে যায়।

ভাষা তো কোনো যন্ত্র নয়, মন্ত্রও নয়; ভাষা হচ্ছে সংস্কৃতির জীবন্ত উপাদান। ভাষার ভেতর চিন্তা-চেতনা, ইতিহাস-ঐতিহ্য দৃষ্টিভঙ্গি—সব কিছুই সংগোপনে সংরক্ষিত থাকে। ইংরেজ শাসনে বাঙালি ইংরেজি শেখার বাধ্যবাধকতায় দ্বিভাষী হয়েছিল। ঘরে সে মাতৃভাষা ব্যবহার করেছে, বাইরে ইংরেজি এবং ইংরেজিকে সে যে বাইরে রেখে আসতে পেরেছে তা নয়, সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে, ঘরের ভেতরে। আনতে হয়। অর্জিত ভাষা জীর্ণ হয় অনভ্যাসে, কিন্তু যদি তার চর্চা থাকে তাহলে সে সজীব থাকে, যেকোনো প্রাণীর মতো। শিক্ষিত বাঙালি এখনো দ্বিভাষিকই রয়েছে। তবে একটা তফাত আছে— তখনকার দ্বিভাষিকতা ছিল বাধ্যবাধকতামূলক, এখনকার দ্বিভাষিকতা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত। অস্বীকার করার কোনো উপায় আছে কি স্বেচ্ছাকৃত পরাধীনতা অনেক বেশি ভয়ংকর, কেননা তাকে ধরে নেওয়া হয় স্বাধীনতা বলে। ভাষা ক্ষমতা রাখে মাথা ঘুলিয়ে দেওয়ার; আমাদের ক্ষেত্রে দিয়েছেও, দেখতে পাচ্ছি।

রাষ্ট্র যে ধরনের প্রতিষ্ঠান, তাতে তাকে পিতাই বলতে হয়। পুরোপুরি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ব্যাপারটা ভিন্ন, কিন্তু তেমন রাষ্ট্র বাস্তবে পাওয়া খুবই কঠিন। সমাজতান্ত্রিক বিশ্বেই যথার্থ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলা যায়, কেননা গণতন্ত্রের যে মূল ভিত্তি মানুষে-মানুষে অধিকার ও সুযোগের সাম্য, তা সেখানে স্বীকৃতি পেয়েছিল এবং নাগরিকদের মৌলিক মানবাধিকারও অর্জিত হয়েছিল; কিন্তু ওই বিশ্বেও আমলাতন্ত্র ছিল, যে আমলাতন্ত্রই মূল কারণ সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের। রাষ্ট্রকে পিতা ভাবলে সমাজকে মাতা ভাবা যায়। সমাজ নাগরিকদের আশ্রয় ও প্রশ্রয় দেয়। কিন্তু সমাজ তো স্বাধীন নয়। সে তো রাষ্ট্রের অধীনে থাকে। শাসিত অর্থাৎ শোষিত হয়। এবং রাষ্ট্র ও তার কর্তাদের যে আদর্শ, তা চাপিয়ে দেওয়া হয় সমাজের ওপর। বাংলাদেশের সামাজিক ইতিহাস এর প্রমাণে আকীর্ণ।

সমাজের ভাষা ছিল বাংলা, রাষ্ট্রের ভাষা অন্য কিছু। ব্যবস্থাটা এ রকমের ছিল। সমাজের অভ্যন্তরে যে অসংখ্য পরিবার বিদ্যমান, সেই পরিবারগুলোও একেকটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র বটে। সেখানেও পিতার একাধিপত্য, স্বৈরাচার। সেখানেও পিতার ভাষার সঙ্গে মাতার ভাষার একটা পার্থক্য আছে। পিতা কথা বলেন কর্তার মতো, মাতার কথাবার্তা পালকের। পিতা ধমক দেন, মা আদর করেন। পিতা বাইরে থেকে অপমানিত হয়ে এসে শোধ তোলেন ঘরে। পিতা বড় জগেক জানেন, ভান করতে পারেন আন্তর্জাতিকতার, জ্ঞান রাখেন নানা বিষয়ে, কিন্তু মাতা থাকেন পাশের ঘরে, বড়জোর উঠানে, তাঁর জগত্টা ক্ষুদ্র, বিচ্ছিন্ন, সংকীর্ণ। মাতা পিতার কর্তৃত্বকে মেনে নেন, কেননা পিতা হচ্ছেন কর্তা, তিনি উপার্জন করেন, তাঁর টাকায় সংসার চলে। মাতাও গোপনে চান পিতার মতো হবেন, কিন্তু সাহস রাখেন না ইচ্ছাটাকে স্পষ্ট করার। সন্তানদের পিতার মতো করে তুলতে চান; যে পিতা আসলে পুরোপুরি পিতা নন, কেননা তিনি পরাজিত বিদেশিদের হাতে, অধীন তিনি রাষ্ট্রের এবং রাষ্ট্র অতীতে ছিল সরাসরি বিদেশিদের হাতের মুঠোয় এবং এখন স্বাধীন হয়েও স্বাধীন হয়নি, নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বিশ্বপুঁজিবাদী ব্যবস্থার।

পিতার মতো নয় শুধু, মাতা নিজের মতো করে গড়ে তুলতে চান সন্তানকে, বিশেষ করে পুত্রকে। পুত্রের মধ্যে মায়ের কাছ থেকে পাওয়া ভয় সন্দেহ বিচ্ছিন্নতা সংকীর্ণ সব কিছু আনুপ্রবিষ্ট নয় শুধু, নির্মমভাবে বিকশিতও হয়। মাতার নিরীহতায় পিতাও কিছু পরিমাণে নেমে আসেন, অংশভাগী হন মাতার রক্ষণশীলতার। কন্যারা মায়ের মতো হয়। পিতার হাতে লাঞ্ছনার বদলা নিতে গিয়ে মা হাতের কাছে তাঁর পুত্রবধূকে খুঁজে পান, এবং তার ওপরই সঞ্চিত লাঞ্ছনার কারণে তৈরি হয়েছে যত ঝাল, পারলে তার সবটাই ঝেড়ে ফেলতে চেষ্টা করেন। ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে অন্তঃপুরচারিণী প্রতিহিংসা চরিতার্থকরণের এই প্রক্রিয়া; মাতার হাতে আবদ্ধ হয় সন্তান, অল্প করে হলেও আবদ্ধ হন পিতা। বন্দি পরিণত হয় কারারক্ষীতে।

দুই.

ব্যর্থতা আসলে পিতৃত্বেরই। বাইরে থেকে শাসক এলো, পিতা তাকে ঠেকাতে পারলেন না, ক্ষেত্রবিশেষে বরং মনে হলো আগ বাড়িয়ে নিয়ে এসেছেন। প্রতিরোধে পিতাও ব্যর্থ হয়ে গেলেন, সেই ব্যর্থতার স্মারকচিহ্ন হচ্ছে মাতৃভাষার দুর্বল অবস্থান ও অবস্থাটা। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি এখন শুধু ইংরেজি নয়, হিন্দিরও অধীনে বটে। বিদেশে যে বাঙালিরা রয়েছে, তারা বাঙালি পরিচয় নিয়ে গর্ব করবে এমন উপাদান বাংলাদেশে পাচ্ছে না, আর পশ্চিমবঙ্গ তো স্বাধীনই নয়, সে তো একটা প্রদেশ মাত্র। এদিকে বাংলাদেশে বাংলা যে ইংরেজির চাপে পিছু ক্রমশ হটবে—এমন আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইংরেজি ভাষা বাঙালিরা আগে শিখেছে, সেই ব্রিটিশ আমলে খুব করে শিখতে চেয়েছে, কিন্তু তখন একটা সত্য সে জানত যে সে পরাধীন, এখন সে নিজেকে স্বাধীন বলে মনে করে, ব্যাপারটাতে তার জন্য তাই কোনো গ্লানি নেই, বরং গৌরব রয়েছে।

পুঁজিবাদ এখন বিশ্বায়নের মূর্তি ধারণ করছে। এই বিশ্বায়ন সমগ্র বিশ্বকে এক করে দেবে। অর্থাৎ কোনো বৈচিত্র্য রাখবে না। পুঁজিবাদ প্রাণিজগৎ থেকে জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংস করে দিতে চায়, মনুষ্যসমাজ থেকে সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত বৈচিত্র্য দূর করে পৃথিবীকে একটি বৃহৎ বাজারে পরিণত করার ইচ্ছা রাখে। ওই বাজারে সব কিছুই এক রকম হয়ে যাবে; থাকবে প্রমোদ ও ভোগবাদিতা, রইবে ব্যক্তির আত্মকেন্দ্রিকতার আদর্শবাদ। এখানে পিতার ভাষা চলবে, মাতার ভাষা সংকুচিত হবে—যেমন সম্পদে, তেমনি ব্যবহারে। ইউনেসকোর হিসাব বলছে, একসময় বিশ্বে পাঁচ হাজার ভাষা চালু ছিল, কমে এখন হয়েছে অর্ধেক, এবং যেভাবে বিলুপ্ত হচ্ছে, সে ধারা অব্যাহত থাকলে এই শতাব্দীতে এই অর্ধেকের শতকরা নব্বই ভাগ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।

মাতৃভাষার উপযোগিতার কথা কেউ অস্বীকার করে না। যোগাযোগ, ঐক্য, শিক্ষা—সব ক্ষেত্রেই মাতৃভাষা সর্বোত্তম। মাতার স্নেহ এই ভাষাতেই পাওয়া সম্ভব। অন্য কোনো যোগাযোগই মাতৃভাষার মাধ্যমে যে যোগাযোগ তার সঙ্গে তুলনীয় নয়। মাতৃভাষা চলে যায় অনেক গভীরে, কথা বলে বহুমাত্রায়। মাতৃভাষার সাহায্যে পারস্পরিক আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে যে ঐক্য গড়ে তোলা সম্ভব, সেটা কর্তৃত্বকামী বহিরাগত ভাষার ভেতর দিয়ে কখনো সম্ভব নয়। আর সে শিক্ষা তো অবশ্যই খণ্ডিত শিক্ষা, যা মাতৃভাষাকে ব্যবহার করে না। সেই ১৯৪৭ সালে সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ প্রবন্ধে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘পৃথিবীর কোন শিক্ষিত সভ্য দেশ মাতৃভাষা ছাড়া অন্য মাধ্যমে শিক্ষা নিচ্ছে? ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, চীন, জাপান, রাশিয়া, মিসর, ইরাক, তুরস্ক, ইরান—এমন কোনো দেশ আছে, যেখানকার লোক মাতৃভাষাকে অবমাননা করে আপন দেশ থেকে বিতাড়িত করেছে?’ মাতৃভাষা হচ্ছে প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক। সব সন্তানকে সে সমান মনে করে, ধর্ম ও বর্ণ মানে না, ডিঙিয়ে যেতে চায় শ্রেণিকে।

বাংলা ভাষা ওই কাজগুলো করতে পারল না। না পারার দায়িত্ব মাতার নয়, পিতারই। পিতা স্বাধীনতা রক্ষা করতে পারেননি। কিন্তু ওদিকে আবার পিতৃত্বের অহমিকাটা ছাড়েননি। পিতার সেই ব্যর্থতায় মায়ের এবং মাতৃভাষার—উভয়েরই দুর্দশা বেড়েছে। মায়ের দুর্ভোগের তো কোনো অবধি নেই। এ দেশে বারবার মন্বন্তর দেখা দিয়েছে; আর সেসব ভয়ংকর ঘটনায় পুরুষের তুলনায় নারী কম করে হলেও দ্বিগুণ কষ্ট সহ্য করেছে। পুরুষ পালিয়ে গেছে অন্যত্র, মেয়েরা যেতে পারেনি, মারা পড়েছে ভিটাবাড়িতে; সাহস করে যারা পথে বের হয়েছে, তারা বাঘ-ভালুকের চেয়েও ভয়ংকর সব পুরুষের হাতে পড়ে যারপরনাই নিগৃহীত হয়েছে। ধর্ষণ, পণ্য হিসেবে বিক্রি—সব কিছু ঘটেছে। ১৯৪৩-এর মন্বন্তর অনেক দূরের ঘটনা নয়, কিন্তু সেখানেও ঘটনা ওই একই। ১৯৪৭-এর দাঙ্গায় ও দেশত্যাগে কত মেয়ে হারিয়ে গেছে তার হিসাব নেই। ১৯৭১-এ হানাদারদের হাতে গণহত্যায় মেয়েরা যেভাবে লাঞ্ছিত হয়েছে, তাতেই ওই দুর্বৃত্তদের ভয়াবহ মুখচ্ছবি সবচেয়ে স্পষ্টরূপে ধরা পড়েছিল। স্বাধীনতার পরও মেয়েরা নিরাপত্তা পায়নি। ধর্ষণের সংখ্যা ও ধরন বৃদ্ধি পেয়েছে। নারী পাচার হচ্ছে। বিক্রি হচ্ছে নানা দেশে। দেশের ভেতরও তার চলাফেরা নিষ্ঠুরভাবে সীমিত।

মাতৃভাষার অমর্যাদা করে যে অগ্রসর হওয়া যায় না, সৈয়দ মুজতবা আলীর প্রবন্ধটিতে তার সুন্দর দৃষ্টান্ত আছে। যেমন—‘সাত শত বছর ফার্সির সাধনা করে ভারতবর্ষের সাহিত্যিকেরা এমন একখানা বই লিখতে পারেননি, যে বই ইরানে সম্মান লাভ করেছে। যে গালিব আপন ফার্সির দম্ভ করতেন তাঁর ফার্সি কবিতা ইরানে অনাদৃত, অপাঙেক্তয়, অথচ মাতৃভাষায় লেখা তাঁর উর্দু কবিতা অজর অমর হয়ে থাকবে। ’ মাইকেল মধুসূদনের দৃষ্টান্তও তিনি দিয়েছেন। বলেছেন, “আরো কাছে, একদম ঘরের ভেতর চলে আসি। লালন ফকীরও বলেছেন, ‘ঘরের কাছে পাইনে খবর, খুঁজতে গেলাম দিল্লি শহর। ’ পূর্ব পাকিস্তানের আপন ঘরের মৌলবী-মৌলানারা যে শত শত বছর ধরে আরবি, ফার্সি এবং উর্দুচর্চা করলেন, এসব সাহিত্যে তাঁদের অবদান কি?”

মায়ের অমর্যাদা মাতৃভাষার দৈন্যের মধ্যেও প্রতিফলিত। বাংলাদেশে এখনো অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষের সংখ্যা প্রচুর। যারা অক্ষর চেনে তারা বই পড়ে না। যারা উচ্চশিক্ষিত তারা বাংলা ভাষার চর্চায় আগ্রহী নয়। ওদিকে পিতৃতান্ত্রিকতার দরুন বাংলা ভাষার নিজের মধ্যেও কতগুলো বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়েছে, যেগুলো মোটেই গৌরবজনক নয়। যেমন—ঐতিহাসিকভাবে সংস্কৃতবাহুল্য। এটি ভাষাকে জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করার ব্যাপারে ওই সংস্কৃতবাহুল্যের যে ভূমিকা ছিল তা বাংলা ভাষার প্রবহমানতাকে খর্ব করার ক্ষেত্রেও কার্যকর ছিল। অন্যপক্ষের পিতৃতান্ত্রিকরা আরবি-ফারসি শব্দ ঢুকিয়ে শোধ নিতে চেয়েছে; কেউ কেউ বলে বসেছে বাংলা তাদের ভাষাই নয়। প্রকৃত সত্য হলো, বাংলা হচ্ছে জনগণের ভাষা, মায়ের ভাষা; দুই পক্ষের আক্রমণের মাঝখানে পড়ে সে বিব্রত হয়েছে। মুখের ভাষার কাছাকাছি যে থাকবে, সেটাও তার জন্য সহজ হয়নি। বিদ্যমান সংস্কৃতিতে যেহেতু সৃষ্টিশীলতার অভাব, তাই এ ভাষায় আড়ম্বর বেশি, অর্থের তুলনায়। পিতারা যে শ্রেণিবিভাজন সৃষ্টি করেছেন তার প্রতিক্রিয়ায় সর্বনামে আপনি তুমি তুই এসেছে, সর্বনামের সঙ্গে ক্রিয়ায়ও পরিবর্তন ঘটানো বাধ্যতামূলক হয়েছে। বাংলা ব্যাকরণে স্ত্রী-পুরুষের যে ভেদহীনতা তাকে সাম্যবাদিতার নিদর্শন মনে হতে পারে, কিন্তু সে ধারণা ভ্রান্ত, কেননা এটা আসলে পুরুষের একাধিপত্যের প্রমাণ। মেয়েদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব স্বীকারই করা হচ্ছে না; সামাজিক ব্যাকরণে মেয়েদের মর্যাদা না থাকলে ভাষার ব্যাকরণে তা আসবে কোথা থেকে। দেখা যাবে বাংলা অভিধানে ‘পতি’র ছড়াছড়ি—সভাপতি, দলপতি, বিচারপতি, নৃপতি, সেনাপতি, সমাজপতি। এসব নাম থেকে বোঝা যায়, ওই সব পদে মেয়েদের প্রবেশাধিকার ছিল না। ‘ছেলেমানুষি’ শব্দটি শুনলে মনে হবে শিশু-কিশোরদের মধ্যে বোধ করি মেয়েরা ছিল না; এবং ছেলেমানুষিকে ‘মেয়েমানুষি’ করতে গেলে বোঝা যায়, এ ক্ষেত্রে মেয়েদের স্থানসংকুলান কত কঠিন। ‘পৌরুষ’ জিনিসটা প্রশংসনীয় বটে, কিন্তু মেয়েদের কি ওই গুণ থাকতে নেই? থাকে যদি তবে তার নাম কী হবে?

অবস্থা ও ব্যবস্থার নির্মম চাপে মেয়েরা একটা সংকীর্ণ জগতে বসবাস করতে বাধ্য হয়েছে, যে সংকীর্ণতার ছাপ মাতৃভাষায় পড়ার কথা এবং তা পড়েছেও। বাংলায় ক্রিয়াপদ হলো দুর্বল, তার কারণ বাঙালির জীবনে ক্রীয়াশীলতারও অপ্রাচুর্য; জনসংখ্যার অর্ধেক হচ্ছে নারী, কর্মক্ষেত্রে যাদের প্রবেশাধিকার সীমিত। এ ভাষায় প্রত্যাখ্যান দৃঢ় নয়; ‘না’ অব্যয়টি আসে বাক্যের একেবারে শেষ অংশে, যেন না পারতে আসা। বাঙালি যে চিন্তার বহু ক্ষেত্রে গেছে, বহু বিষয়ে ভেবেছে তার লক্ষণ বাংলা ভাষায় নেই, কেননা ওই ব্যাপারটা বাস্তবে ঘটেনি। আধুনিকতার কথা বলা হয়। আধুনিকতার অপরিহার্য উপাদান দুটি—একটি বৈজ্ঞানিকতা, অপরটি আন্তর্জাতিকতা। এরা যে বাংলার মননে উজ্জ্বলভাবে উপস্থিত, তা বলা যাবে না; বরং রক্ষণশীলতাই মুখ্য হয়ে রয়েছে।

মায়েরা রক্ষণশীল হতে বাধ্য। মেয়েদের ওপর ফতোয়াবাজি চলে। ওই নিষ্পেষণ সমাজে আছে, গৃহেও রয়েছে। কন্যাসন্তানদের জন্য যত নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকে, ছেলেদের ব্যাপারে তা চালু করতে গেলে বাবারা বিপদে পড়বে। কন্যাদের বেলায় মাতারাও ফতোয়াবাজ হয়ে দাঁড়ান, যেন তাঁরা মাতা নন, মাতার বেশে পিতাই করছেন এ কাজ। ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা বেশি ধার্মিক হয়, যদিও ছেলেদের ধর্মকর্মটাই বেশি চোখে পড়ে। ধর্ম সর্বদাই রক্ষণশীল, সে ধারণ করে রাখে। ইউরোপে একদা খুব বড় একটি ধর্মসংস্কার আন্দোলন হয়েছিল, যার নাম প্রটেস্ট্যান্ট বিদ্রোহ। সে বিদ্রোহটা অবশ্যই প্রগতিশীল ছিল। কিন্তু ওই বিদ্রোহের নেতা মার্টিন লুথার জার্মানিতে তাঁর সময়ে যে কৃষক বিদ্রোহ হয়, সেটাকে সমর্থন করেননি এবং কোপার্নিকাসের জ্যোতির্বিজ্ঞানকে তিনি ব্যঙ্গ করেছেন, ওই বিজ্ঞান বাইবেল-প্রচারিত সত্যকে উল্টে দিতে চায়—এই অভিযোগে। বাঙালির জীবনে রক্ষণশীলতার একাধিক ব্যাখ্যা রয়েছে, মাতৃভূমিটাকেও হিসাবের মধ্যে রাখা আবশ্যক।

তিন.

পিতা ব্যর্থ হয়েছেন, মাতা হননি—এটা বলা যাবে। কৃষিনির্ভর সমাজে মাতার প্রধান কর্তব্য সন্তান উৎপাদন ও প্রতিপালন। সে কাজ বাঙালি মাতা নিষ্ঠার সঙ্গে করেছেন। এ দায়িত্ব পালনকে পিতার জুলুম হিসেবেও দেখা যেতে পারে; দেখাটা মোটেই অন্যায় নয়। মাতৃত্বের ব্যাপারে মায়ের কর্তব্যপরায়ণতা জনসংখ্যা বৃদ্ধি করেছে, এবং দেখা গেছে, বাঙালি সংখ্যায় যত বাড়ছে, গুণে তত বাড়ছে না; পরিমাণ যে উত্কর্ষে পরিণত হবে তা-ও সম্ভব হচ্ছে না। মাতার এও এক প্রতিশোধ গ্রহণ বটে, পিতার ওপর।

ভবিষ্যতে কী ঘটতে যাচ্ছে? বড় প্রশ্ন সেটাই। আশার জায়গাটা পিতা নয়, আশার জায়গাটা হচ্ছে সন্তানরা। পিতারা যা করার করে ফেলেছেন, যা দেওয়ার তা দিয়ে দিয়েছেন। বাকি কাজটা সন্তানদেরই করতে হবে। পিতার ব্যর্থতার দায়ভার এবং ক্ষতিপূরণের দায়িত্ব সন্তানকেই গ্রহণ করতে হয়; নিয়ম সেটাই। সেই সন্তানদের মধ্যে ছেলেরা আছে, মেয়েরাও রয়েছে, যেমন তারা উভয়েই ছিল আমাদের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে। বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের। সে আন্দোলন ছিল পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং কর্তৃত্বকামী নেতৃত্ব—উভয়ের বিরুদ্ধে। ভাষার মধ্যে যে সমাজতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ও সম্ভাবনা বিদ্যমান, তাকেই বিকশিত করতে চেয়েছিল ওই আন্দোলন। পারেনি নিশ্চয়ই, থেমে গেছে এক জায়গায় এসে, যার পরিচয় দেখি আমরা যেমন নারীর অবরুদ্ধ দশায় এবং অর্থনীতির বন্ধ্যত্বে, তেমনি দেখি বাংলা ভাষার কোণঠাসা অবস্থায়।

মূল সংগ্রামটা পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে। এই সংগ্রাম পৃথিবীর সব দেশে চলেছে। সিয়াটলে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সম্মেলনকালে যে বিক্ষোভ ঘটেছে, তেমন বিক্ষোভ এখন সব দেশেই ঘটবে, মানুষের বিক্ষোভ সে কথাই বলে। গণতন্ত্রের সংগ্রাম শুধু ভোটের জন্য নয়, ভাষার জন্যও। একুশে ফেব্রুয়ারি যে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে, তার পেছনে পৃথিবীবাসীর বাংলাভাষাপ্রীতি নেই অবশ্যই, কিন্তু মাতৃভাষাপ্রীতি যে রয়েছে তাতে তো কোনো সন্দেহ নেই। ওই প্রীতি সংকীর্ণতার ছবি নয়, আন্তর্জাতিকতার ছবি বটে। বলা বাহুল্য, আন্তর্জাতিকতা ও বিশ্বায়ন এক নয়, আসলে পরস্পরবিরুদ্ধ; বিশ্বায়নকে প্রত্যাখ্যান না করলে আন্তর্জাতিকতা গড়ে উঠবে না। মনে নয়, অর্থনীতিতেও নয়।


মন্তব্য