kalerkantho


প্র ব ন্ধ
আবদুর রাজ্জাক লিখিত সুসমাচার

বাংলাদেশের ‘মধ্যবিত্ত’ শ্রেণির বৃত্তান্ত

সলিমুল্লাহ খান

২৫ জুন, ২০১৭ ০০:০০



বাংলাদেশের ‘মধ্যবিত্ত’ শ্রেণির বৃত্তান্ত

অঙ্কন : বিপ্লব চক্রবর্ত্তী

‘যে ছবিতে দেখা যাইতেছে মানুষ সিংহকে কুপোকাত করিয়াছে সে ছবিটা—না বলিলেও চলিবে—মানুষই আঁকিয়াছে। ’—আবদুর রাজ্জাক (১৯৮০ : ১৫)

‘The painting that depicts the overthrow of the lion by the man is of course a painting by man.’ (1980 : 15)

ইংরেজি ১৯৮০ সালের গোড়ার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া একটি লিখিত বক্তৃতায় সেকালের জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক লিখিয়াছিলেন, ‘যে ছবিতে দেখা যাইতেছে মানুষ সিংহকে হারাইয়া দিয়াছে; সে ছবিটি কিন্তু মানুষই আঁকিয়াছে—এ কথা না বলিলেও চলিবে।

’ অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের কথা মানিয়া বলিব, যাঁহারা কথায় কথায় ‘মধ্যবিত্ত’ ‘মধ্যবিত্ত’ বলিয়া শোরগোল করেন তাঁহারাও মধ্যবিত্ত শ্রেণিরই লোক—এ কথাটা না বলিলেও চলিবে।

‘মধ্যবিত্ত’ কথাটি আমি উদ্ধৃতিচিহ্নের মধ্যে লিখিয়াছি। কারণ কথাটা যতখানি অর্থ প্রকাশ করে তাহার চেয়ে বেশি অর্থ গোপনও করে। কথাটা কে পহেলা চালু করিয়াছেন সে গবেষণা করার সুযোগ আমার হয় নাই। ১৯৪৭ সালের পর পর পূর্ব বাংলায় যাঁহারা এই ‘মধ্যবিত্ত’ বাক্যটি এস্তেমাল করিয়াছিলেন—যথা বিচারকর্তা আবদুল মওদুদ কিংবা রাষ্ট্রদূত কামরুদ্দিন আহমেদ—তাঁহারা খানিক ইংরেজি ‘মিডল ক্লাস’ কথাটির দ্বারাই শিক্ষিত হইয়াছিলেন। কিন্তু আমার ধারণা, অনেকে ইহা চালু করিয়াছিলেন বাঙালি হিন্দুসমাজে প্রচলিত ‘ভদ্রলোক’ শব্দটির বিকল্পস্বরূপ। যত দূর মনে পড়ে শ্রীযুক্ত বিনয় ঘোষ প্রভৃতি ভদ্রলোকের চিন্তা এই ধারায় বহিয়াছিল।

যাহা হউক, ১৯৭১ সালের পর শব্দটির ব্যবহার বাড়িয়াই গিয়াছে—এ কথা স্বীকার না করিয়া উপায় নাই। ১৯৪৭ সালের আগে—এবং এমনকি এই এখনো—ভারতের অধীন পশ্চিমবাংলায় লোকে ‘ভদ্রলোক’ বলিতে বুঝাইত ব্রাহ্মণ, বৈদ্য, কায়স্থ প্রভৃতি বর্ণহিন্দু জাতির লোক।

তাঁহারা জমিদার, পত্তনিদার বা জোতদার হইবেন আর পেশায় হইবেন উকিল, ডাক্তার কিংবা কমপক্ষে শিক্ষক বা সাংবাদিক। মুসলমানদের মধ্যে কেহ যদি পেশায় উকিল, ডাক্তার বা শিক্ষক হইয়াও থাকেন—তিনি তো ‘বর্ণ’ লাভ করিবেন না। অতএব ‘মধ্যবিত্ত’ শব্দটাই জুতসই। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটা এখন যাঁহারা দয়া করিয়া শাসন করিতেছেন তাঁহারা কোন শ্রেণির লোক? প্রশ্নটা তুলিলেই তাঁহারা খেপিয়া যাইবেন—এই কথা জানি। নেহাত চাপাচাপি করিবেন তো অনুগ্রহ করিয়া উঁহারা মানিবেন—তাঁহারাও ‘মধ্যবিত্ত’। তাই ‘ভদ্রলোক’ শব্দটির মতন ব্যবহার্য শব্দতালিকা হইতে ইহাও এত দিনে পরিত্যাজ্য হইয়া উঠিতেছে। হয়তো। কে জানে!

এক.

তবু পত্রিকা প্রকাশকের আদেশ হইয়াছে ‘মধ্যবিত্ত’ সম্বন্ধে দুই কথা লিখিতে হইবে—তাই আজ্ঞা পালন করিতেছি। ১৯৭১ সালের আগে এই দেশে যাঁহারা ‘মধ্যবিত্ত’ ছিলেন তাঁহারা—তাঁহাদের অনেকেই—এখন উপরের শ্রেণিতে উঠিয়াছেন। তাঁহারা নিজেদের উপাধি নিজেরাই লইয়াছেন—‘উচ্চমধ্যবিত্ত’। হইতে পারে ‘মধ্যবিত্তের’ জন্য এখনো তাঁহাদের প্রাণ কাঁদে। ১৯৭১ সালের আগ পর্যন্ত এই ‘মধ্যবিত্ত’ শ্রেণিই আওয়াজ তুলিয়াছিল : ‘বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার হিন্দু, বাংলার খ্রিস্টান, বাংলার মুসলমান—আমরা সবাই বাঙালি। ’ এই আওয়াজ ষোলআনা নিষ্ফল হয় নাই—বেশ ফলপ্রসূই হইয়াছিল।

১৯৪৭ সালের পর পুরনো বাংলাদেশের যে যে অংশ নবগঠিত ‘পাকিস্তান’ নামক দেশের একাংশ হইল তাহাতে ‘বাঙালি’—মানে বাংলায় কথা বলেন এমন জনসংখ্যা—সংখ্যায় গরিষ্ঠ হইল। অথচ ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জিতিয়াও এই বাঙালি ক্ষমতায় যাইতে পারিল না। ১৯৭০ সালের নির্বাচনেও সে জিতিয়াছিল কিন্তু ফলাফল তথৈবচ—একই থাকিয়া গেল। তাই ‘বাংলাদেশ’ নামে নতুন দেশ স্থাবর হইয়াছে। ‘পূর্ববাংলা’ ‘বাংলাদেশ’ হইয়াছে যে বিপদে পড়িয়া সেই একই বিপদের বশেই ‘মধ্যবিত্ত’ হইয়াছে ‘বাঙালি’। না—একটা কথা ভুলিয়া গিয়াছিলাম—‘মুসলমান’ হইয়াছে ‘বাঙালি’। এখন সে অবশ্য আপনকার মুসলমান পরিচয় গোপনে ব্যস্ত। অথচ ১৯৪৭ সালের আগেকার পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ অন্য রকম। এখনকার ‘বাঙালি’ ১৯৪৭ সালের আগের কথা একপ্রকার ভুলিয়াই গিয়াছে। কথাটা কিন্তু তাহাকে মোটেও ভোলে নাই। তাই সে মাঝেমধ্যে বলে আমরা ‘বাংলাদেশি’। ইহারও বৃত্তান্ত আছে। এই বৃত্তান্ত এস্তেমাল না করেন তো ‘মধ্যবিত্ত’ কী পদার্থ বুঝিতে পারিবেন না। তাহার জন্ম মুসলমান পরিচয়ের উদরে। উপরে অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের যে বক্তৃতার দোহাই দিলাম তাহার এক জায়গায় তিনি লিখিয়াছিলেন, ‘আমার জন্ম হইয়াছিল ব্রিটিশ জাতির অধীন প্রজা পরিচয় মাথায় ধারণ করিয়া; অনেক দুঃখকষ্ট মাথায় করিয়া আমি পাকিস্তান রাষ্ট্রের দুই নম্বরি নাগরিক হইলাম আর এত দিনে মনে হয় বাংলাদেশের সমানাধিকারভোগী সভ্য হইতে পারিয়াছি। ’ (রাজ্জাক ১৯৮০: ১৯)

অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক বেশি কথা বলিতেন না। কিন্তু তাঁহার অল্প কথারও অধিক দাম। খুটাইয়া দেখিলে দেখিবেন, তিনি নিজেও ‘মধ্যবিত্ত’ শ্রেণিরই লোক। ইহার পরও তাঁহার কথাটা ফেলনা নহে। দুই কারণে। প্রথম কারণ—তিনি বলিতেছেন—বাংলাদেশের ‘মধ্যবিত্ত’ শুদ্ধ পাকিস্তান আমলে জন্মায় নাই। তাঁহারা জন্মাইয়াছেন ব্রিটিশ রাজত্বের ছায়াতলে। এখানে আমি অধ্যাপক মহাত্মার জীবনবৃত্তান্তটিই বড় বা জাতীয় রূপক আকারে লইতেছি—এ কথা না বলিলেও চলিবে। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের জন্ম—ধরিয়া লইতেছি—১৯১৪ সালের দিকে। কোষ্ঠী অনুসারে তাঁহার জন্মতারিখ পয়লা জানুয়ারি। সকলেই জানেন তিনি দেহরক্ষা করিয়াছেন ১৯৯৯ সালের শেষাশেষি। তিনি মধ্যবিত্তের সমান বয়সী বটেন।

দুই.

বাংলাদেশের ‘মধ্যবিত্ত’ কী পদার্থ বুঝিতে হইলে ঢাকার পুরানা রেসকোর্স ময়দান তথা হাল আমলের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দক্ষিণ-পশ্চিম কোনায় হাঁটিয়া যাইতে হইবে। সেখানে ‘জাতীয়’ তিন নেতার কবর। খাজা নাজিমুদ্দিনও সেখানে শুইয়া আছেন আর দুই নেতার সহিত। ইহা কী করিয়া হইল? ‘বাংলাদেশ’ নামে দেশটি স্থাপিত হইয়াছে ‘বাংলা ভাষা’ নামক একপ্রস্ত লৌকিক আদর্শ ধারণ করিয়া। তো খাজা নাজিমুদ্দিন সেখানে জাতীয় তিন নেতার এক নেতা হইলেন কী উপায়ে? তিনি তো বাংলা রাষ্ট্রভাষা চাহেন নাই। তো ঢাকার নবাব খাজা সলিমুল্লাহর ছায়া হিসেবে হয়তো তিনি সেখানে আসিয়াছেন। বাংলাদেশের উপরের শ্রেণি নিজেকে যতই ‘মধ্যবিত্ত’ ‘মধ্যবিত্ত’ বলুন না কেন তাঁহারা জানেন তাঁহারা উপরেই আছেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ‘প্রজা’ থাকিবার সময় তাঁহাদের জন্ম হইয়াছে। আমি বলিতেছি না যে ব্রিটিশের ঔরসে তাঁহারা জন্মাইয়াছেন। বলিতেছি ব্রিটিশ রানীমা তাঁহাদের ধাত্রীমাতার কাজ করিয়াছেন।

১৯০৬ সালে পূর্ববাংলার রাজধানী ঢাকা শহরে মুসলিম লীগ নামক দলের প্রতিষ্ঠাসভা বসিল। তখন মেজবান হইলেন ঢাকার ইংরেজভক্ত নবাব খাজা সলিমুল্লাহ।   যাঁহারা সেই সভায় তশরিফ আনিয়াছিলেন তাঁহাদের বেশির ভাগই ভারতের নানা জায়গার—বিশেষ উত্তর প্রদেশের—উপরের শ্রেণির মুসলমান। মুসলিম লীগ দলের অন্যতম দাবি ছিল ব্রিটিশ শাসক বা লেফটেন্যান্ট গভর্নরের আইনসভায় মুসলমান প্রতিনিধির কিছু আসন নিশ্চিত করা। তাঁহারা সফল হইয়াছিলেন। ১৯০৯ সালে ইংরেজ সরকার পশ্চিমবাংলা প্রদেশে ছাব্বিশজন আইন পরিষদ সদস্যের মধ্যে মুসলমান সদস্য চারজন আর পূর্ববাংলা প্রদেশেও আঠারো সদস্যের মধ্যে চারজনের আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা বিহিত করে। অথচ ১৮৭২ সালের আদমশুমারিতেই দেখা গিয়াছিল অখিল বাংলাদেশে মুসলমানই সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়।

১৯১৬ সালে লখনউ শহরে লিখিত হিন্দু-মুসলমান চুক্তিতে কিন্তু মুসলমানদের জন্য বাংলাদেশে শতকরা ৪০ আসন বরাদ্দ হয়। আর ১৯২৩ সালে চিত্তরঞ্জন দাশের নেতৃত্বে লিখিত চুক্তিতে সংখ্যানুপাতে মুসলমানদের আসন শতে ৫৫ ভাগ নির্ধারিত হয়। আর শেষমেশ ১৯৩২ সালের সাম্প্রদায়িক বাটোয়ারা অনুসারে ২৫০ আসনের আইনসভায় মুসলমান আসন ঠিক হয় ১১৯। অথচ জনসংখ্যার অনুপাতে ভাগ হইলে হওয়া উচিত ছিল ১৩৫।

আমি অতি দ্রুত চিত্রটি তুলিয়া ধরিয়াছি মাত্র একটি কথা বুঝাইবার জন্য। জনসংখ্যা অনুযায়ী নির্বাচনের অধিকার বণ্টন হইলে মুসলমানদের আসন সংরক্ষণ করিবার দাবি তুলিতে হইবে কেন? হইবে মুসলমান সমাজে ‘মধ্যবিত্ত’ তখনো শক্তিশালী হয় নাই বলিয়া। ‘যুক্ত নির্বাচন’ না ‘স্বতন্ত্র নির্বাচন’—এই প্রশ্নে মুসলমান সমাজেও একসময় বিতর্ক শুরু হইল। কোনো কোনো মুসলমান নেতা স্বতন্ত্র নির্বাচন চাহিতেন না—এ কথাও সত্যি। কিন্তু শুদ্ধ সিলেটের নির্দল মৌলভি আবদুল করিমই নহেন (ইনি ছিলেন অবিভক্ত বাংলা প্রদেশের স্কুলসমূহের ডেপুটি ইন্সপেক্টর) কলিকাতার উর্দুভাষী মওলানা আবুল কালাম আজাদের মতন কংগ্রেস নেতাও ১৯২৩ সালের বিখ্যাত হিন্দু-মুসলমান চুক্তির অন্যতম রূপকার ছিলেন—এ কথা ভুলিবেন না। বাংলাদেশ ‘মুসলমান-প্রধান’ দেশ আর সে দেশেই কি না মুসলমানকে তখন সংখ্যালঘু বলা হইত! ইহাতেই বুঝা যাইতেছে মধ্যবিত্ত তখনো প্রবল হয় নাই। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক বলিয়াছেন, ‘পাকিস্তানের দুই নম্বরি নাগরিক হইবার জন্যও আমাকে জীবন-মরণ সংগ্রামে ঝাঁপাইয়া পড়িতে হইয়াছিল। আমার দেহে সেই সংগ্রামের দাগ রহিয়া গিয়াছে। আমি যত দিন বাঁচিয়া আছি তত দিন সেই দাগ লইয়াই বাঁচিব। ’ (রাজ্জাক ১৯৮০ : ১৯)

এই কথাটিকে কেবল জনৈক আবদুর রাজ্জাকের জবানবন্দি ধরিলে চলিবে না। ইহাই বাংলাদেশের বাংলাভাষী বা বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তের ইতিহাসচিত্র। ঢাকার নবাবদের অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক খুব পছন্দ করিতেন এমন কথা জোর গলায় বলা যাইবে না। ঢাকার নবাবরা নবাব হইয়াছেন ইংরেজদের দয়ায়। তাঁহারা সিপাহিদের সংগ্রামের সময় ইংরেজের তাঁবেদারি করিয়াছিলেন। সেই বংশেরই প্রসিদ্ধ সন্তান ইংরেজি শিক্ষিত নবাব খাজা সলিমুল্লাহ। তবে তাঁহার ছত্রচ্ছায়াতেই বরিশালের তরুণ উকিল আবুল কাসেম ফজলুল হকের প্রতিষ্ঠা—এ কথা মনে রাখিলেও আখেরে সুফল পাইবেন। ফজলুল হক ১৯১২ সালে আইনসভার সদস্য হইলেন নবাব খাজা সলিমুল্লাহর হাত ধরিয়া।

শেরেবাংলা আবুল কাসেম ফজলুল হকের জীবনবৃত্তান্ত পাঠ করিলে এক অর্থে বাংলাদেশের মুসলমান ‘মধ্যবিত্ত’ শ্রেণির বৃত্তান্ত পাঠ সাঙ্গ হয়। আজিকার বাংলাদেশে  যাঁহারা উপরের শ্রেণিতে উঠিয়াছেন তাঁহারা যে শেরেবাংলা ফজলুল হককে উপযুক্ত ইজ্জত দিতেছেন না তাহা গাছে উঠিয়া মই ফেলিয়া দেওয়ারই শামিল। শেরেবাংলা ফজলুল হক একদা ১৯১৮ সালে বলিয়াছিলেন, ‘বাংলাদেশের হিন্দু ও মুসলমান পরস্পরের স্বাভাবিক শত্রু—কথাটা মোটেও সত্য নয়। ’ এই জন্য তিনি কিছুদিন নিন্দিতও হইয়াছিলেন। ১৯২৯ সালে তিনি গড়িয়াছিলেন কৃষক-প্রজা দল। ১৯৩৭ সাল হইতে ১৯৪৩ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী থাকিয়াও শেষ পর্যন্ত এই চাকরি হইতে হটিয়া যাইতে বাধ্য হইয়াছিলেন। ইহার কারণ বাংলাদেশের বর্ণহিন্দু বা ভদ্রলোক শ্রেণির রাজনীতি আলোচনা না করিলে বুঝা যাইবে না। এই রাজনীতি এত দিনে বিশুদ্ধ সম্প্রদায়কেন্দ্রিক রাজনীতি হইয়া গিয়াছে। ১৯২৫ সালে চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুর পর হইতে হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণির রাজনীতিতে যে অসহায় ভাব ফুটিয়া উঠিল তাহার ইতিহাস ছাড়া ফজলুল হকের পরাজয় কেন হইল বুঝা যাইবে না। একটি সত্য বিশেষ করিয়া চাখিয়া দেখিতে হইবে। পাকিস্তান তৈরি হইয়াছে শুদ্ধ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর প্রতিভায় নহে, হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণির রাজনীতির কারণেও।

তিন.

১৯০৫ সালে ইংরেজ সরকার যে নতুন প্রদেশ তৈয়ার করিয়াছিলেন তাহা পূর্ববাংলায় ‘মধ্যবিত্ত’ শ্রেণির বিকাশের ইতিহাসে মনে রাখিবার মতন বড়দিন বৈকি। কেহ কেহ বলিতেন, না, না, ১৯০৬ সালই হইল গিয়া বড়দিন। কেননা ওই বৎসর ঢাকায় মুসলিম লীগ তৈয়ার হয়। ১৯১২ সালে আবার বাংলাদেশ এক দেশ হইল। কিন্তু তাহাতে তো দেশে শাস্তি আসিল না। কেন আসিল না? এই প্রশ্ন আরো জিজ্ঞাসিতে হইবে।

১৯১২ সালে যাহারা দেশকে এক করিলেন তাঁহারা ছিলেন ‘সংখ্যালঘু’ ভদ্রলোক শ্রেণি বা হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোক। আর ৩৫ বৎসর পর এই তাঁহারাই জোর করিয়া ‘বাংলাদেশ’ ভাগ করিতে বাধ্য হইলেন। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের ভাষায় তাঁহারা সহি বড় ভারতীয় সাম্রাজ্যের বংশীধ্বনিতে মোহিত হইলেন। মহাভারতের মহাপরিচয়সমুদ্রে তাঁহারা অবলীলায় ডুবিয়া গেলেন। ইতিহাসে এমন অবিমৃষ্যকারী জাতি—এমন হিংসুটে সামাজিক শ্রেণি—বড় একটা দেখা যায় না।

যাঁহারা বাকি রহিলেন তাঁহারাই বাংলাদেশের মুসলমান ‘মধ্যবিত্ত’। তাঁহারা দেশভাগ করিতে চাহেন নাই। কারণ স্পষ্ট। তত দিনে তাঁহারা সংখ্যাগরিষ্ঠতার স্বাদ পাইতে শুরু করিয়াছেন। কিন্তু নিখিল ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ তাঁহারা হইবেন কী করিয়া? তাঁহারা জোট গঠিলেন উত্তর প্রদেশের আর পাঞ্জাবের মুসলমানদের সহিত। ভাবিলেন, তাহাতে প্রাণরক্ষা হইবে। প্রথমে তাঁহারা—বাংলাদেশের মুসলমান ‘মধ্যবিত্ত’ শ্রেণি—পাকিস্তান ও ভারত কোনো দেশেই যোগ না হইয়া আলাদা দেশ গঠিবার প্রস্তাবে মোটেও অমত করেন নাই। বাংলাদেশ ভাগ হইবে কি না—এই প্রস্তাবে মোটেও মুসলমান মধ্যবিত্তের সায় ছিল না। শেষ পর্যন্ত যখন দেশভাগের সিদ্ধান্ত হইল তখন তাঁহারা অগত্যা পাকিস্তানের অংশ বনিলেন। তবে কিছু শর্তসাপেক্ষে। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের কথায়—তাঁহারা যোগ হইলেন পাকিস্তানে। তবে ‘একেবারে দাবিদাওয়া ভুলিয়া’ যোগ হয়েন নাই। এই দাবিদাওয়ারই অপর নাম হইয়া দাঁড়াইল পূর্ববাংলার ভাষা আন্দোলন। ১৯১২ হইতে ১৯৪৭ মোট এই পঁয়ত্রিশ বৎসরের মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলমান যদি ইংরেজ জাতির পালিত শিশু হইয়া থাকে, ১৯৪৭ হইতে ১৯৭১ পর্যন্ত তেইশ বৎসরে সে হইয়াছে পাকিস্তান মাতার সতিনের সন্তান।

১৯৭১ সালের পর বাঙালি মুসলমান ‘মধ্যবিত্ত’ স্বাধীন হইল। এখন তাঁহার শত্রু আর দেশে নাই। থাকিলেও আছে বিদেশে। এখন তাঁহাকে বাধা দেওয়ার কেহ নাই। অতএব নিজের সঙ্গেই নিজের লড়াই শুরু করিল সে। পাকিস্তান রাষ্ট্র স্বাধীন হইবার দশ-বারো বৎসরের মধ্যে সে দেশের ‘মধ্যবিত্ত’ শ্রেণির সশস্ত্র সদস্যরা দেশের ক্ষমতা হাতে লইয়াছিলেন। বাংলাদেশের তাঁহারা গোটা চার বৎসরের মেয়াদ পুরিবার আগেই সেই কৃতিত্ব সম্পন্ন করিলেন।

বাংলাদেশে এখনো রাষ্ট্রক্ষমতা কার হাতে থাকিবে—‘মধ্যবিত্ত’ শ্রেণির সশস্ত্র সদস্যদের না নিরস্ত্র বা ‘বুদ্ধিজীবী’ সদস্যদের—ইহা লইয়া আলোচনা চলিতেছে। এই আলোচনাকেই সাধারণত ‘গণতন্ত্র’ বলিবার রীতি চালু আছে। ‘মধ্যবিত্ত’ শ্রেণির গণতন্ত্র বলিতে বুঝায় এই পালাবদলের রাজনীতিকেই। কিন্তু একটু চোখ বুজিয়া চিন্তা করিলেই বুঝিবেন ‘রাজনৈতিক দল’ বলিতে যাহা বুঝায় তাহা এখনো এই দেশে গঠিয়া উঠে নাই। এখনো একই পরিবারের এক সন্তান সরকারি চাকুরির নিরস্ত্র শাখায়—আরেক সন্তান সশস্ত্র শাখায়। একজন বড় ব্যবসায়ী পুঁজিপতি—আরজন বড় রাজনীতিক। এইভাবে চলিতেছে।

চার.

বাংলাদেশ স্বাধীন হইবার দশ বৎসরের মাথায় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক যে বক্তৃতা লিখিয়াছিলেন, তাহা দিয়া শুরু করিয়াছিলাম। তাহাতেই শেষ করিব। তিনি বলিয়াছিলেন, ক্যাডেট কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রভৃতি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রপিছু কত টাকা খরচ করা হয় তাহার সহিত দেশের আর সমস্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়, বৃত্তিশিক্ষা বিদ্যালয় ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বেলায় মাথাপিছু কত টাকা আয়ব্যয় হয় তুলনা করিয়া দেখুন। অবস্থা পরিষ্কার হইবে। এই দেশে দশের টাকাটি একের জন্য খরচ হয়। দেশে বড়জোর এক লাখ পরিবার ইহার উপকার ভোগ করে।

মধ্যবিত্ত শ্রেণির নীতি হইতেছে সাফ সাফ এক দেশকে দুই ভাগে ভাগ করার নীতি। যাঁহাদের আছে তাঁহাদের দাও, আরো দাও, আরো আরো দাও। ইহার ফল দাঁড়াইবে কী? এক জাতির মধ্যে দুই জাতি। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক ১৯৮০ সালে সতর্ক করিয়া দিয়াছিলেন—ফল বড় একটা ভালো হইবে না। দেশটা দ্রুত দুই ভাগে ভাগ হইয়া যাইবে। ‘বুদ্ধিজীবী’ বা ‘বুদ্ধি-ব্যবসায়ী’ শ্রেণি—এককথায় যাঁহাদের গলা আছে তাঁহারা—দেশ নামক পিরামিডের চূড়ায় বসিয়া আছেন। ইচ্ছা করিলে তাঁহারা ক্ষীরের ভাগটা আরো কিছু লোককে দিতে পারেন। না দিলে সমূহ বিপদ। চূড়ায় বসিয়া বেশি দিন বাঁশি বাজান যাইবে না।

১৯১২ হইতে ১৯৪৭ কিংবা ১৯৪৭ হইতে ১৯৭১ পর্যন্ত যে দুই কাল গিয়াছে তাহা বেশ দীর্ঘ দীর্ঘ কাল। এ সত্যে সন্দেহ নাই। মেঘে মেঘে অনেক বেলা হইয়াছে। ১৯৭১ হইতে ২০১৭ আরো দীর্ঘকাল যাইতেছে। কিন্তু বাংলাদেশের সকল নাগরিক সমান অধিকারভোগী নাগরিক হইয়াছেন—এ কথা বলা যাইতেছে না। ‘পাকিস্তান’ রাষ্ট্র গঠনের পর অকুপেন্সি রায়ত বা দখলিস্বত্বাধিকারী জমির রায়তেরা ‘মালিক’ উপাধি পাইয়াছিলেন। কিন্তু জমি-জিরাতের হাতবদল বিশেষ হয় নাই। রাষ্ট্র অন্য চাষিদের—যেমন বর্গাচাষি বা খেতমজুর কিংবা অবাঙালি জাতির—খবর রাখে নাই। বাংলাদেশ হওয়ার পরও এই বিষয়ে—এই বিষয়সম্পত্তি বিষয়ে—নতুন কোনো বিপ্লব হয় নাই। এই দিক হইতে দেখিলে ১৯৭১ সালকে যতখানি বিপ্লবের দিন মনে করিতেছি ততখানি উপবিপ্লবের রাতও মনে করা যায়।

বাংলাদেশ ‘মধ্যবিত্ত’ শ্রেণির স্বর্গরাজ্য হইয়াছে। কিন্তু ইতিহাসে বহু স্বর্গরাজ্য এই রকম নিছক অবিমৃষ্যকারিতার পাপে বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে। বাংলাদেশে অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের পর এমন কোনো মনীষী দেখিতেছি না যিনি তাঁহার আপন শ্রেণিকে এই কথাটি মনে করাইয়া দিবেন।

দোহাই

1. Abdur Razzaq, Bangladesh : State of the Nation (Dacca : University of Dacca, 1980).


মন্তব্য