kalerkantho


স্মৃ তি ক থা

ওরহান পামুকের শৈশব

অনুবাদ : আন্দালিব রাশদী

২৫ জুন, ২০১৭ ০০:০০



ওরহান পামুকের শৈশব

[‘ইরেজার, নোটখাতা আর কলম : এগুলো সব মুরগিকে খাইয়ে দাও। ’ ‘আমি স্কুলে যাচ্ছি না’—এটি ওরহান পামুকের স্মৃতিচারণা কিংবা শৈশব জীবনীর অংশ নয়।

কিন্তু ছোট্ট এ লেখা বেশ মজার—ওরহানসহ আমাদের প্রায় সবারই আত্মজীবনীর শুরুটা এমন হতে পারে।   ওরহান পামুকের ‘ইস্তাম্বুল : মেমোয়ার্স অব অ্যা সিটি’ এবং ‘দি আদার কালার্স’ গ্রন্থের নির্বাচিত অংশের অনুবাদ একত্র করে সংকলিত হয়েছে তাঁর শৈশব। ওরহান পামুক তুর্কি, ২০০৬-এর নোবেল সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী। ]

আমি স্কুলে যাচ্ছি না

আমি স্কুলে যাচ্ছি না। কারণ আমার ঘুম পাচ্ছে। আমার ঠাণ্ডা লাগছে। স্কুলে কেউ আমাকে পছন্দ করে না।

আমি স্কুলে যাচ্ছি না। কারণ সেখানে দুটি বাচ্চা আছে।

তারা আমার চেয়ে বড়। তারা আমার চেয়ে শক্তিশালী। আমি যখন তাদের পাশ দিয়ে যাই, তারা তাদের হাত বাড়িয়ে আমার রাস্তা বন্ধ করে দেয়। আমি ভয় পাই।

আমি ভয় পাচ্ছি। আমি স্কুলে যাচ্ছি না। স্কুলে সময় থমকে থাকে। সব কিছুই বাইরে পড়ে থাকে। স্কুলের দরজার বাইরে।

যেমন আমার রুমটা ক্লাসের বাইরে। আমার মা, বাবা, আমার খেলনা, বারান্দায় আমার পাখি। আমি যখন স্কুলে থাকি, তাদের কথা মনে হয়। আমি কাঁদতে চাই। আমি জানালার বাইরে তাকাই। বাইরের আকাশে মেঘ জমেছে।

আমি স্কুলে যাচ্ছি না, কারণ আমি সেখানে কিছুই পছন্দ করি না। অন্য একদিন আমি একটা গাছের ছবি এঁকেছিলাম। টিচার বললেন, ‘এটা সত্যি সত্যিই একটা গাছ হয়েছে। চমৎকার। ’

আমি আরেকটা গাছ আঁকলাম, এটারও কোনো পাতা ছিল না।

তারপর বাচ্চাদের একজন আমার কাছে এগিয়ে এসে আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করল।

আমি স্কুলে যাচ্ছি না। আমি যখন রাতের বেলায় বিছানায় যাই এবং পরদিন স্কুলে যাওয়ার কথা মনে করি, আমি ভীষণ ভয় পাই।

আমি বলি, ‘আমি স্কুলে যাচ্ছি না। ’

ওরা বলে, ‘তুমি এ কথা কেমন করে বললে? সবাই তো স্কুলে যায়। ’

সবাই? বেশ, তাহলে সবাই যাক। তারপর? আমি যদি বাড়িতে থেকে যাই, তাহলে কী হবে?

আমি গতকাল স্কুলে গিয়েছি, যাইনি? আমি যদি কাল না যাই তাহলে কী আসবে-যাবে? যদি পরশু দিন যাই? আমি যদি বাড়িতে আমার বিছানায় শুয়ে থাকি? কিংবা আমার রুমে থেকে যাই? স্কুল ছাড়া অন্য যেকোনো জায়গায় যদি আমি যেতে চাই?

আমি স্কুলে যাচ্ছি না, আমি অসুস্থ। দেখতে পাচ্ছ না? কেউ না কেউ তো বলেই স্কুল বললে আমার বমি আসে। আমার পেটে ব্যথা হয়। আমি এমনকি ওই দুধটুকুও খেতে পারব না।

আমি ওই দুধটা খাব না। আমি কিছুই খাব না, আর এমনকি আমি স্কুলেও যাচ্ছি না।

আমার ভীষণ মন খারাপ। আমাকে কেউ পছন্দ করে না। ওই যে দুজন বাচ্চা আছে। ওরা ওদের হাত বাড়িয়ে আমার পথ আটকে দেয়।

আমি টিচারের কাছে গেলাম।

টিচার বললেন, ‘তুমি আমাকে অনুসরণ করছ কেন?’

আপনি যদি প্রতিজ্ঞা করেন যে আমার কথা শুনে মাথা খারাপ করবেন না। তাহলে আপনাকে কিছু কথা বলব।

আমি সব সময়ই টিচারকে অনুসরণ করি আর টিচার সব সময় বলেন, ‘আমাকে অনুসরণ কোরো না!’

আমি আর কখনো স্কুলে যাব না। কেন? কারণ আমি স্কুলে যেতে চাই না। সে কারণেই!

যখন টিফিন বিরতি, আমি বাইরেও যেতে চাই না। যখন সবাই আমাকে ভুলে যাবে, তখন এটাকে বিরতি বলব। তখন সব কিছু ওলটপালট হয়ে যায়। সবাই দৌড়াতে থাকে। টিচার নোংরা চোখে আমার দিকে তাকান। আর তিনি দেখতে এমন কোনো সুন্দরী নন যে তার সঙ্গে স্কুল শুরু করা যায়।

একটি মাত্র শিশু আমাকে পছন্দ করে। একমাত্র সে-ই আমার দিকে সুন্দর করে তাকায়। কাউকে আবার এটা বলতে যাবেন না—আমি সেই শিশুটিকেও পছন্দ করি না।

আমি বসে পড়ি এবং সেখানেই থেকে যাই। আমি নিঃসঙ্গ বোধ করি।

আমার গাল বেয়ে কান্না নেমে আসে। আমি স্কুল মোটেও পছন্দ করি না।

আমি বলি, আমি স্কুলে যেতে চাই না।

কিন্তু সকাল হলে ওরা আমাকে স্কুলে নিয়ে যায়। আমি হাসতেও পারি না। আমি সরাসরি সামনের দিকে তাকাই, আমি কাঁদতে চাই।

আমি পিঠে ব্যাগ নিয়ে পাহাড়ে উঠি, ব্যাগটা সৈনিকদের ব্যাগের মতো বড়। আমার ছোট পা দুটো যখন পাহাড়ে উঠে আমার চোখ ছোট পায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে।

সব কিছুই খুব ভারী। আমার পিঠের ব্যাগ, আমার পেটের গরম দুধ। আমার কান্না আসে।

আমি হেঁটে হেঁটে স্কুলে ঢুকি। পেছনে কালো রঙের ধাতব গেট বন্ধ হয়ে যায়।

আমি চিৎকার করে কাঁদি, ‘মা, তুমি আমাকে ভেতরে রেখে চলে যাচ্ছ। ’

তারপর আমি আমার ক্লাসরুমে যাই, বসে পড়ি। আমি বাইরের কোনো একটি মেঘ হতে চাই।

ইরেজার, নোটখাতা আর কলম :

এগুলো সব মুরগিকে খাইয়ে দাও।

দুই.

আমি

আমার বয়স যখন চার, আমার ভাইয়ের ছয়, আর তখন সে স্কুলে যেতে শুরু করল। পরের দুই বছর আমাদের মধ্যে গড়ে ওঠা তীব্র বিপরীতধর্মী সঙ্গ-সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, তা মিলিয়ে যেতে শুরু করে। আমাদের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে এবং বেশি শক্তিজনিত অত্যাচার থেকে মুক্ত হই। যেহেতু এখন পামুক অ্যাপার্টমেন্ট আমার এবং সারা দিনই মায়ের অখণ্ড মনোযোগ পাচ্ছি, নির্জনতার আনন্দ আবিষ্কার করতে করতে সুখী হয়ে উঠছিলাম।

আমার ভাই যখন স্কুলে, আমি তার অ্যাডভেঞ্চার কমিকগুলো বের করে আনতাম এবং এসব কমিক থেকে সে আমাকে যা পড়ে শুনিয়েছে, সেই স্মৃতি মাথায় রেখে আমি নিজে আবার ‘পড়তাম’।

এক উষ্ণ ও আরামদায়ক অপরাহ্নে আমাকে যখন নিত্যকার নিদ্রার জন্য বিছানায় শুয়ে দেওয়া হলো, আমি ‘টম মিক্স’-এর একটি সংখ্যার পাতা উল্টাচ্ছিলাম, আমার মা আমার শরীরের যে জিনিসটাকে ‘বিবি’ বলত, তা শক্ত হয়ে উঠছে। আমি অর্ধনগ্ন রেডস্কিম-ইন্ডিয়ান-আমেরিকান পুরুষের ছবি দেখছিলাম তার কোমর ঘিরে সবচেয়ে পাতলা সুতো জড়ানো আর দুই নিতম্বের সন্ধিস্থল মাঝখানে বৃত্ত আঁকা এক চিলতে সাদা কাপড়ে ঢাকা। অন্য এক অপরাহ্নে আমি যখন পাজামা পরা অবস্থায় চাদরের নিচে আমার নিজের খেলনা ভালুকটির সঙ্গে কথা বলছিলাম, আমি অনুভব করলাম, ওটা একইভাবে শক্ত হয়ে উঠেছে। কৌতূহলের ব্যাপার—এই অদ্ভুত ও জাদুকরী ব্যাপারটি যদিও আনন্দদায়ক। এটা লুকিয়ে রাখার বাধ্যবাধকতা অনুভব করছিলাম—আর ব্যাপারটা ঘটল আমি যখন ভালুককে বললাম, ‘আমি তোকে খাব। ’ তবে ভালুকের প্রতি এমন কোনো অনুরাগ থেকে এটা হয়নি। আমি ইচ্ছা করলেই এই হুমকির পুনরাবৃত্তি করে ব্যাপারটা ঘটাতে পারতাম। মা আমাকে যেসব গল্প বলত, তার মধ্যে ‘আমি তোকে খেয়ে ফেলব’ কথাগুলোই বেশি রেখাপাত করেছে—আর আমি জানি, এর মানে কেবল খেয়ে ফেলা নয়। একেবারে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা। পরে আমাকে আবিষ্কার করতে হয়েছে, ধ্রুপদ গার্মি সাহিত্যের ‘দেও’—সেই ভয়ংকর লেজওয়ালা দানব, যারা শয়তান ও জিনের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং মিনিয়েচারিস্ট শিল্পীরা প্রায়ই তাদের ছবি আঁকতেন—ইস্তাম্বুলের তুর্কি গল্পে এসব হয়ে ওঠে অতিকায় দানব। তুর্কি মহাকাব্য ‘দেদে করকুত’-এর সংক্ষিপ্ত সংস্করণের প্রচ্ছদ থেকে দানব সম্পর্কে আমার চিত্রকল্পটি গড়ে ওঠে। রেড স্কিমদের মতো এ ধরনের দানবও অর্ধনগ্ন, আর তাকে দেখে আমার মনে হতো, বিশ্বটা সে-ই শাসন করছে।

কাছাকাছি সময়ে আমার চাচা একটি ছোট ফিল্ম প্রজেক্টর কিনলেন, ছুটির দিনে স্থানীয় ফটোগ্রাফির দোকান থেকে শর্ট ফিল্ম ভাড়ায় আনতেন। চার্লি চ্যাপলিন, ওয়াল্ট ডিজনি, লরেল অ্যান্ড হার্ডি।

বেশ আনুষ্ঠানিকতার সঙ্গে আমার দাদা ও দাদির পোর্ট্রেট সরিয়ে ফায়ারপ্লেসের ওপরের সাদা দেয়ালকে পর্দা বানিয়ে তিনি আমাদের সিনেমাগুলো দেখাতেন। আমার চাচার স্থায়ী সংগ্রহে থাকা একটি ডিজনি ফিল্ম তিনি মাত্র দুইবার দেখিয়েছেন—কম দেখানোর কারণটা আমি। এই সিনেমাটিতে একটি অতিকায় আদিম, ভীষণ ভারী এবং অ্যাপার্টমেন্টের সমান একটি প্রতিবন্ধী দৈত্য আছে। যখন সে মিকি মাউসকে তাড়া করে, মিকি একটি কুয়ার গভীরে চলে যায়। দৈত্য কুয়াটাকে একটি হ্যাচকা টানে মাটি থেকে তুলে পানিটা মুখে ঢেলে দেয়, যেন কাপ থেকে ঢালছে। মিকি যেই না দৈত্যের মুখের ভেতর পড়ে যায়, আমি সর্বশক্তি দিয়ে কাঁদতে থাকি।

প্রাদোর জাদুঘরে গয়ার একটি পেইন্টিং আছে, নাম ‘শয়তান নিজের একজন সন্তানকে গিলে খাচ্ছে’—এতে একটি দৈত্য মানুষাকৃতির একজনের হাত চেপে ধরে তাতে কামড় বসিয়ে দিচ্ছে। এটি এখনো আমাকে আতঙ্কিত করে।

এক বিকেলে আমি সাধারণত যেমনটা করে থাকি, তেমনিভাবে হুমকি দিচ্ছিলাম, একই সঙ্গে অদ্ভুত সহানুভূতির সঙ্গে তাকে খাওয়াচ্ছিলাম, হঠাৎ দরজা খুলে গেল। বাবা আমাকে আন্ডারপ্যান্ট নামানো এবং ‘বিবি’ শক্ত অবস্থায় ধরে ফেললেন। যেমন করে তিনি দরজাটা খুলেছিলেন, তার চেয়ে কোমলভাবে এবং (আমি চলতে পারি) সমীহের সঙ্গে দরজা বন্ধ করলেন। এর আগে পর্যন্ত বাবা যখন লাঞ্চ করতে ও খানিকটা বিশ্রাম নিতে বাড়ি আসতেন, আবার কাজে যাওয়ার আগে অভ্যাসবশত আমাকে চুমো খেতেন। আমার দুশ্চিন্তা, আমি খারাপ কিছু করে ফেলেছি, এমনকি আমি যা ভাবছি তার চেয়ে খারাপ—আমি যা করেছি আনন্দের জন্য, এই আনন্দের ধারণাটাই মনে হলো বিষাক্ত।

আমার মা-বাবার বেশ দীর্ঘ এক ঝগড়ার পর এই সন্দেহটা নিশ্চিত হলো, যখন দেখলাম মা বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে আর যে আয়া আমাদের দেখাশোনা করতে এসেছে, আমাকে গোসল করিয়ে সহানুভূতিহীন কণ্ঠে ‘কুকুরের মতো’ করার জন্য আমাকে বকাঝকা করল।

আমি আমার শরীরের সাড়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না, আমি যখন ছয়-সাত বছর পর কেবল ছেলেদের জুনিয়র স্কুলে ভর্তি হলাম, জানলাম, আমি যা করেছি তা অনবদ্য কোনো বিষয় নয়।

আমার গোপন সব ফ্যান্টাসি সম্পর্কে একজন মানুষই অবহিত ছিলেন বলে মনে হয়, তিনি আমার বাবা।

আমি আমার ভালুকটার কথা ভাবি। এক মুহূর্তের ক্রুদ্ধতার উত্তেজনায় আমি এর একমাত্র চোখটি ছিঁড়ে বের করে নিয়ে আসি; এর বুকের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে এটাকে ফুলিয়ে রাখার জন্য যা কিছু ঢুকিয়ে রাখা হয়েছিল তা আমি যখন একটু একটু করে বের করতে থাকি, ভালুকটা ততই চিকন থেকে আরো চিকন হতে শুরু করল। আমি আঙুল সমান ফুটবল খেলোয়াড়ের কথা মনে করি, যাদের মাথার ওপরের বোতামে টিপ দিলেই লাথি মারে—এটা আমার তিন নম্বর ফুটবল খেলোয়াড়। কারণ প্রথম দুটোকে আমি উত্তেজনার মুহূর্তে ভেঙে ফেলেছি, আর এখন আমি এটাকেও ভাঙছি। আমি ভাবি, এই আহত খেলনাটি কোনো গোপন জায়গায় লুকিয়ে থেকে কে জানে মরতে বসেছে কি না!

আমার মা, আমার বাবা ও গায়েব হয়ে যাওয়া

আমার বাবা প্রায়ই দূরে কোথাও চলে যেতেন। মাসের পর মাস আমরা তাঁর দেখা পেতাম না। অবাক ব্যাপার, বাবা যে নেই, অনেক দিন না পেরোলে আমরা টেরই পেতাম না। তত দিনে বাবার অনুপস্থিতির ব্যাপারটায় আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠতাম। বাবার ব্যাপারটা এ রকমই—কদাচিৎ ব্যবহার করা একটা বাইসাইকেল হারিয়ে গেলে বা চুরি হলে কিংবা একজন ক্লাসমেট কিছুদিন স্কুলে এসে তারপর আসা বন্ধ করে দিয়েছে—এসব বুঝতে অনেক সময় লেগে যায়।

বাবা কেন বাড়িতে নেই—এই ব্যাখ্যা কেউ আমাদের কখনো দেয়নি কিংবা আমরা কখন তার ফিরে আসা প্রত্যাশা করতে পারি তা-ও কেউ কখনো বলেনি।

বাবার খবরটা নেওয়ার জন্য একটু চাপাচাপি করি—এমনটা কখনো আমাদেরও মনে হতো না। কারণ আমরা একটি বড় ও জনাকীর্ণ অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ে বাস করতাম, আমাদের ঘিরে রাখত চাচা-ফুফু, দাদিমা, পাচক, কাজের মেয়ে—অনেকেই; কোনো প্রশ্নট্রশ্ন না করে বাবার অনুপস্থিতির ব্যাপারটা হালকাভাবে নিলেই হতো, আর এটা ধরে নেওয়া যে বাবা সেখানে ছিলই না, মানে বাবাকে ভুলে যাওয়া এক রকম সোজা ব্যাপার। কখনো কখনো পরিস্থিতির যাতনা যে কিছুটা অনুভব পরতাম না, তা আমাদের বুয়া এসমা হানুমের বাড়াবাড়ি রকম আলিঙ্গনের উষ্ণতা, দাদিমার পাচক বেকিরের আমাদের কথাবার্তার মধ্যে অন্য কিছুর অনুসন্ধান, আমার চাচা আইদিনের রবিবার সকালের বাড়তি বাহাদুরি এবং ১৯৫২ মডেলের ডজ গাড়িতে বসফরাসের পাশ দিয়ে চক্কর খাওয়া—এসব পুরোপুরি ভুলিয়া দিতে পারেনি।  

কোনো কোনো দিন সকালে আমার মা ফোনে আমার চাচি-ফুফুদের সঙ্গে, তার বন্ধুদের সঙ্গে, তার নিজের মায়ের সঙ্গে এমন অনিঃশেষ কথা বলে যেত যে আমি বুঝতে পারতাম একটা কিছু সমস্যা হয়েছে। আমার মায়ের পরনে ঘিয়ে রঙের ঢিলেঢালা জামা, তাতে লাল সুগন্ধি ফুল গোঁজা; মা যখন এক পায়ের ওপর আরেক পা দিয়ে বসত, জামাটা মেঝেতে ভাঁজ ভাঁজ করা জলপ্রপাতের মতো নেমে আসত। আমি দেখে বিভ্রান্ত বোধ করতাম—এর ভেতরে আমি মায়ের রাত-পোশাকটা দেখতে পেতাম, সঙ্গে তার সুন্দর ত্বক; সুন্দর ঘাড়টা চোখে পড়ত; আমি তার কোলে চড়তে চাইতাম, তার চুল, ঘাড় আর বুকের মধ্যবর্তী ত্রিভুজের আরো কাছে এসে মাথা গুঁজতে চেষ্টা করতাম। শেষের দিকে মা-ই আমাকে বলেছে, বাবার সঙ্গে খাবারের সময় মায়ের তুমুল এক ঝগড়ার পর আমাদের পরিবার ও বাড়ির ওপর যে দুর্যোগ নেমে আসত আমি তা খুব উপভোগ করতাম।

আমার ওপর মায়ের দৃষ্টি পড়ার জন্য আমি তার ড্রেসিং টেবিলে বসে তার পারফিউমের বোতল, লিপস্টিক, নখপালিশ, কোলোন, গোলাপজল, আখরোটের তেল নিয়ে খেলতে খেলতে ড্রয়ারের সব ওলটপালট করতাম; চিমটা, কাঁচি, নখ ঘষার কাঠি, আইব্রাউ পেনসিল, চুলের ব্রাশ, চিরুনি এবং বিভিন্ন রকম চোখা ও ধারালো জিনিসপত্র নিয়ে খেলতাম। টেবিলে কাচের নিচে আমার ও আমার ভাইয়ের যে শিশু-ছবি মা ঢুকিয়ে রেখেছে, তার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। আমিও মায়ের মতো একটা উঁচু চেয়ারে বসা। মা সেই ঢিলে জামা পরনে, আমাকে খাওয়াচ্ছে চামচভর্তি ‘মা মা’; আর আমাদের দুজনের মুখেই হাসি, কেবল বিজ্ঞাপনেই এ ধরনের হাসি দেখা যায়। আমি যখন এ ছবির দিকে তাকাই এখন ভাবি ব্যাপারটা কেমন লজ্জার—এখন আর কেউ শুনতে পাবে না আমার চেঁচানোটা ছিল কত খুশির।

যখন বিরক্তি ধরত, নিজেকে আনন্দ দেওয়ার জন্য আমি একটা খেলা খেলতাম। পরে এ ধরনের খেলা আমার উপন্যাসে খেলেছি। আমি বোতল ও ব্রাশগুলো ড্রেসিং টেবিলের মাঝখানে ঠেলে দিতাম, সঙ্গে ফুলের ছবি আঁকা একটি রুপার বাক্সও—এটা কখনো আমার মাকে খুলতে দেখিনি; তারপর আমার নিজের মাথা নিচে নামিয়ে এনে আয়নার ত্রিপটের মাঝখানের প্যানেলের দিকে তাকাতাম। আমি আয়নার দুটি পাখা সামনে-পেছনে, ভেতরে-বাইরের দিকে নিয়ে এমন একটি জায়গায় স্থাপন করতাম, যাতে একটি অন্যটিকে প্রতিবিম্বিত করতে পারে। আমি তখন দেখতাম, হাজার হাজার ওরহান গভীর শীতল ও কাচরঙা অসীম পরিসরে ঝিকমিক করছে।

আমি যখন সবচেয়ে কাছের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাই, আমার মাথার পেছন দিকের অদ্ভুত আকৃতি আমাকে বিস্মিত করে, যেমন সবার আগে করেছে আমার কান—পেছনের দিকে এসে গোল হয়ে আছে, একটা অন্যটার চেয়ে বেশি বেরিয়ে আছে, আমার বাবার কানের মতো। আরো বেশি মজার হচ্ছে আমার ঘাড়ের পেছন দিকটা—এটা আমার মধ্যে এমন একটা অনুভূতি জাগিয়ে তুলত যেন আমি অন্য কোনো আগন্তুকের শরীর বহন করে চলেছি। এটা ভয় ধরিয়ে দেওয়া একটা চিন্তা। তিনটি আয়নার মধ্যে বন্দি প্রতিবিম্বে শত শত ওরহান, আমি যখনই আয়নার প্যানেলের অবস্থান একটুখানিও বদলাই, অমনি ওরহান নিজের আকৃতি বদলাতে শুরু করে। যদি প্রতিটি নতুন অদলবদলে আমি গর্বভরে দেখতাম, এই সংযোজন সূত্রে কেমন করে আয়নার ভেতরে মানুষ আমার প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি নকল করছে। আমি সব ধরনের অঙ্গভঙ্গি করে নিশ্চিত হতে চাইলাম, ভেতরের সব ওরহান আমার যথার্থ ক্রীতদাস কখনো আমি আয়নার দূরতম সবুজ অনন্তের ওরহানকে খুঁজতাম। কখনো মনে হতো, আমার বিশ্বস্ত অনুকরণকারীদের কেউ কেউ তাদের হাত কিংবা মাথা আমার সঙ্গে সঙ্গে ঠিক সেই মুহূর্তেই নাড়ছে না, নাড়ছে একটু পরে। সবচেয়ে ভীতিকর ছিল আমার ভেংচি কাটার মুহূর্ত। গাল ফুলিয়ে চোখের ভ্রু উঁচিয়ে জিহ্বা বের করে, আর শত শত মুখ ভেংচানো ওরহানের মধ্যে এক কোণে আটটিকে আলাদাভাবে শনাক্ত করে তাদের ভেংচি কাটতাম (তখন যে আমি হাত নাড়ছি, এটা লক্ষ না করে) আর দেখতাম, একদল ক্ষুদ্র ওরহান আর দূরের বিদ্রোহী অপর একটি দল পরস্পরের মধ্যে         ভেংচি-কাটাকাটি করছে।

নিজের প্রতিবিম্বের ভেতর আমাকে হারিয়ে ফেলাটাকে আমি ‘অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার খেলায়’ পরিণত করেছিলাম, আর এই খেলাটার মধ্য দিয়ে আমি নিজেকে ভয়ংকর একটা কিছুর জন্য প্রস্তুত করছিলাম। যদিও আমি জানি না, মা ফোনে কী বলেছে কিংবা আবার বাবা কোথায় আর কখন ফিরবেন, আমি নিশ্চিত ছিলাম একদিন মাও নিরুদিষ্ট হয়ে যাবে।

কখনো কখনো  মা তা-ই করত। কিন্তু মা যখন গায়েব হয়ে গেল, আমাকে একটা কারণ বলা হলো, যা অনেকটা এ রকম—‘তোমার মা অসুস্থ এবং নেরিমান আন্টির বাড়িতে বিশ্রাম নিচ্ছে। ’

আয়নায় আমার প্রতিবিম্ব দেখে আমি যা করি, তাদের এই ব্যাখ্যাটা নিয়েও আমি তা-ই করলাম। যদিও আমি জানি এর সবই বিভ্রম, তবু আমি তা গ্রহণ করলাম এবং নিজেকে বোকা সাজতে দিলাম। আমাদের পাচক বেকির কিংবা কেয়ারটেকার ইসমাইলের কাছে আমাদের দুই ভাইকে সমর্পণ করার আগে কয়েক দিন কেটে যায়। বাসে বা নৌকায় চড়ে আমরা ইস্তাম্বুলের ওপর ঘুরে বেড়াব—শহরের এশিয়া মহাদেশীয় অঞ্চলে এরেনকয়তে অথবা বসফরাসের ইস্তিন শহরে অন্যান্য আত্মীয়ের বাড়িতে আমার মাকে দেখতে। এগুলো কোনো বিষাদাক্রান্ত ভ্রমণ ছিল না, অভিযানের মতো মনে হতো। যেহেতু আমার বড় ভাই আমার সঙ্গে ছিল, যেকোনো বিপদের মোকাবেলায় আমি তার ওপর ভরসা করতে পারব। আমরা যেসব বাড়ি এবং বসফরাসের দিকের বিশেষ আবাস ইয়ালিতে যেতাম, সেখানে সবাই আমার মায়ের কাছের-দূরের আত্মীয়স্বজন। আমাদের করুণাময়ী আন্টি আর ভীতিকর চুলের আঙুলের চুমো আর গাল-টেপা পর্ব শেষ হতেই তাদের ঘরে অদ্ভুত যা-ই আছে, যা আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে, তা দেখানোর জন্য উদগ্রীব থাকতেন। এসব অদ্ভুত জিনিসের মধ্যে ছিল একটা জার্মান ব্যারোমিটার, যা আমি ভাবতাম পশ্চিমের সব বাড়িতেই থাকে (বাভারিয়ান পোশাকের একজন পুরুষ ও তার স্ত্রী ব্যারোমিটারে আবহাওয়া দেখে ঘর থেকে বেরোতেন এবং ঘরে ঢুকতেন) অথবা ঘড়ির কাঁটায় বসানো একটি কোকিল, যা কক্ষপথে ঘুরত আর প্রতি আধাঘণ্টা পর পর খাঁচায় ঢুকে সময় ঘোষণা করত। অথবা একটি সত্যিকারের ক্যানারি পাখি, যা তার যান্ত্রিক কাজিনের ডাকের জবাবে পাঁপা স্বরে ডেকে উঠত। আমরা মায়ের রুমের দিকে এগোতাম।

জানালাপথে দেখা বিশাল সমুদ্র আর আলোর সৌন্দর্য আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে দিত। সম্ভবত এ কারণেই আমি মাতিসের দক্ষিণমুখী জানালা থেকে দেখা দৃশ্য পছন্দ করতাম। আর দুঃখের সঙ্গে স্মরণ করতাম, এই অদ্ভুত ও সুন্দর জায়গাটির জন্য মা আমাদের ছেড়ে চলে এসেছে। তবে তার ড্রেসিং টেবিলে দেখা কিছু জিনিস আমাদের আশ্বস্ত করে—সেই একই চিমটা সুগন্ধির বোতল, সেই একই চুলের ব্রাশ, যার পেছন দিকের অর্ধেক চালতা ওঠা, বাতাসে ঘুরপাক খাচ্ছে তার অতুলনীয় মিষ্টি গন্ধ।

আমার সব কিছু পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মনে রেখেছি, কেমন করে আমাদের দুজনকে পালাক্রমে কোলে তুলে নিল, উষ্ণ আলিঙ্গন করল, আমার বড় ভাইকে বিস্তারিত নির্দেশনা দিল—তাকে কী বলতে হবে, আচরণ কেমন হতে হবে, আমরা আবার যখন আসব তার জন্য সঙ্গে যা নিয়ে আসতে হবে, তা বাড়িতে কোথায় পাব—আমার মা সব সময়ই নির্দেশ দিতে পছন্দ করত।

মা যখন এসব বলছে, তার কথার কোনো রকম পাত্তা না দিয়ে আমি জানালার দিকে তাকিয়ে থাকি, যতক্ষণ না আমার কোলে বসার পালা আসে।

আমার মায়ের এমন এক নিরুদ্দেশকালে আমার বাবা একদিন এক আয়াকে নিয়ে বাড়ি এলেন। মহিলাটি খাটো, গোলগাল, রং ফ্যাকাসে, মোটেও সুন্দর বলা যাবে না, তবে মুখে হাসি লেগেই আছে। তিনি যখন আমাদের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন, গর্বের সঙ্গে তিনি বিজ্ঞজনোচিত একটি ভাব লালন করেন, সেখান থেকেই তিনি হুকুম দিলেন, তিনি যেমন ব্যবহার করবেন, আমাদেরও ঠিক তা-ই করতে হবে; অন্য যেসব আয়া আমরা বাড়িতে দেখেছি, তিনি মোটেও তাদের মতো নন। তিনি টার্কিশ। এটা আমাদের হতাশ করল। আমরা কখনো তাঁর সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক স্থাপন করতে পারিনি। আমরা যাদের আয়া হিসেবে পেয়েছি, তাদের প্রায় সবাই জার্মান এবং মনে-প্রাণে প্রটেস্ট্যান্ট। এই আয়াটি আমাদের ওপর কোনো ধরনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। আমরা দুই ভাই যখন ঝগড়া করতাম, তিনি বলতেন, ‘ভদ্র হও, শান্ত হও, দয়া করে ভদ্র হও, শান্ত হও। ’ আর আমরা যখন বাবার সামনে তাঁকে নকল করে এভাবে কথা বলতাম, বাবা হাসতেন। অল্প দিনের মধ্যেই এই আয়াও বিদায় নিলেন।

কয়েক বছর পর আমার বাবা যখন আবার নিরুদ্দিষ্ট হলেন, আমরা দুই ভাই যখন মরণপণ লড়াই শুরু করলাম, সত্যি সত্যি মায়ের মেজাজ বিগড়ে গেল। মা তখন যখন কিছু বলে—‘আমি সবাইকে ছেড়ে চলে যাচ্ছি’ কিংবা ‘আমি জানালা দিয়ে নিচে লাফিয়ে পড়ব। (একদিন মা তার একটি সুন্দর পা জানালার বাইরে ঠেলে দিয়েছিল) এতে কোনো লাভ হয়নি।

কিন্তু মা যখন বলত, ‘তখন তোদের বাবা আর একটা মহিলাকে বিয়ে করে নিয়ে আসবে! নতুন মায়ের পদপ্রার্থী হিসেবে আমি যাকে কল্পনা করেছি, মা রাগের মাথায় বিভিন্ন সময় যাদের নাম বলত তাদের কেউ নয়, বরং ফ্যাকাসে, গোলগাল সৎ উদ্দেশ্যপ্রবণ বিভ্রান্ত একজন আয়া। ’ যেহেতু এই নাটকগুলো একই ছোট্ট মঞ্চে অভিনীত হতো এবং যেহেতু (পরে আমি ভেবেছি, বাস্তবে সব পরিবারেই এমন ঘটে থাকে) আমরা সব সময় একই ধরনের কথা বলে থাকি, একই খাবার খাই এবং আমাদের তর্কগুলোও ভীষণ একঘেয়ে (রুটিনই সব সুখের উৎস, এতেই নিশ্চয়তা ও মৃত্যু), তাই আমি এ ধরনের আকস্মিক নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়াকে স্বাগত জানাতে থাকি—কারণ এতে ভয়ংকর একঘেয়েমির হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। আমার মায়ের আয়নার মতো এসব বেশ মজার, অবাক করে দেওয়া বিষাক্ত ফুলের মতো, যা আমার পথে খুলে দেয় আরেকটি বিশ্ব। কারণ এরা আমাকে একটি অন্ধকার জায়গায় নিয়ে যায়, যা আমাকে আমার নিজেকে স্মরণ করিয়ে দেয় এবং যে নির্জনতা আমি ভুলতে চেয়েছি, তা পুনরুদ্ধার করে এসব নিয়ে অকারণেই আমার কিছু অশ্রুর অপচয় হলো।

অধিকাংশ ঝগড়া শুরু হতো খাবার টেবিলে। পরের বছরগুলোতে ঝগড়ার জন্য সুবিধাজনক হয়ে উঠল আমার বাবার ১৯৫৯ মডেলের ওপেল গাড়িটি। কারণ লড়াকুদের দ্রুতগামী গাড়ি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেওয়া কঠিন ব্যাপার ছিল। যেটা তারা সহজে খাবার টেবিলে করতে পারত। কখনো কখনো আমরা যখন গাড়িতে কয়েক দিনের ড্রাইভেই হোক কি বসফরাসে ছোট্ট একটা চক্কর মারার জন্য উঠতাম, বাড়ি থেকে বের হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঝগড়াটা শুরু হয়ে যেত। আমি এবং আমার ভাই তখন বাজি ধরতাম, প্রথম ব্রিজটা পেরোনোর পর না প্রথম পেট্রল স্টেশনের পর বাবা হঠাৎ গাড়ির ব্রেক কষবেন, ইউ টার্ন নেবেন এবং (বদমেজাজি ক্যাপ্টেন যেমন কার্গো উেস ফিরিয়ে দিয়ে আসে) আমাদের বাড়িতে নামিয়ে দেবেন এবং গাড়ি নিয়ে একাই অন্য কোথাও চলে যাবেন।

আমাদের ছোটবেলার আরেকটি ঝগড়ার বেশ গভীর প্রভাব আমাদের ওপর পড়েছিল সম্ভবত এর কাব্যিক জাঁকজমকের কারণে। হাইকেলিদায় আমাদের গ্রীষ্মকালীন বাড়িতে এক গ্রীষ্মের সান্ধ্যখাবারের সময় আমার মা ও বাবা দুজনই টেবিল ছেড়ে উঠে গেলেন। (আমি এটি পছন্দ করেছি, কারণ আমি যেভাবে খেতে চাই এখন খেতে পারব, মা যেভাবে চায় সেভাবে নয়। )

কয়েক মুহূর্তের জন্য আমার ভাই এবং আমি চেয়ারে বসে প্লেটের দিকে তাকিয়ে থেকে শুনলাম, ওপরতলায় মা ও বাবা পরস্পরের প্রতি চিৎকার করছেন, আমরা স্বয়ংক্রিয় ইন্দ্রিয় তাড়নায় ওপরে গিয়ে তাদের সঙ্গে যোগ দিলাম। (একই রকম ইন্দ্রিয়গতভাবেই আমি বন্ধনীর ভেতর বললাম, ঘটনাটি স্মরণ করার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। )

মা যখন দেখল আমরা ঝগড়ায় যোগ দিতে চেষ্টা করছি, জোর করে আমাদের ঠেলে পাশের রুমে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। রুমটা ছিল অন্ধকার, কিন্তু ঘোলাটে কাচের দুটি শিল্পিত বড় ফরাসি দরজার ভেতর দিয়ে উজ্জ্বল আলো সরাসরি রুমে ঢুকল। আমরা আলোকিত কাচের দরজার ভেতর দিয়ে দেখছিলাম, বাবা ও মায়ের ছায়া পরস্পরের কাছাকাছি আসছে আবার সরে যাচ্ছে, আবার নিজেদের দিকে এগিয়ে আসছে। তাদের চিৎকারের মধ্যে দুজনের ছায়া মিলে একটি ছায়া হয়ে যায়। কখনো কখনো এই ছায়ার খেলা এত সহিংস হয়ে উঠেছে যে পর্দা (অস্বচ্ছ কাচ) কেঁপে উঠত—কারাগোজ শ্যাডো থিয়েটারে আমরা যেমন ছায়া নাটক দেখেছি, ঠিক তেমন সব কিছু কালো ও সাদা।

স্কুলের আনন্দ ও একঘেয়েমি

স্কুলে আমি প্রথম শিখলাম, কিছু মানুষ আহাম্মক।

দ্বিতীয় যা শিখলাম তা হচ্ছে, কিছু মানুষ তার চেয়েও খারাপ। আমি তখনো এত ছোট যে বুঝতেই পারতাম না বড় জাতের মানুষদের এই মৌলিক তফাতটা না জানার ভান করতে হয়। ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, শ্রেণি, আর্থিক ও (পার্শ্বপ্রবেশ হিসেবে) সাংস্কৃতিক বৈষম্যগুলোর ক্ষেত্রে একই সৌজন্য প্রয়োগ করা হয়ে থাকে।

কাজেই আমার শিক্ষক ক্লাসে যখনই প্রশ্ন করতেন, প্রতিবারই আমি আমার নিষ্পাপ বোধ থেকে হাত উঠাতাম একটা ব্যাপার স্পষ্ট করার জন্য যে আমি উত্তরটা জানি।

এ রকম কয়েক মাস চলার পর আমার টিচার ও আমার ক্লাসমেটদের অবশ্যই একটি অস্পষ্ট ধারণা হলো যে আমি নিশ্চয়ই একজন ভালো ছাত্র। তার পরও আমি ভেতর থেকে একটি তাগিদ বোধ করতাম যে আমাকে হাত তুলতে হবে। অন্যদের সুযোগ দেওয়ার জন্যই হয়তো টিচার কদাচিৎ আমাকে ডাকেন। আর আমি উত্তর জানি বা না জানি, আমি ইচ্ছা না করলেও আমার হাত ওপরে উঠে যায়। এমনকি সাধারণ পোশাকের কেউ ঝলমলে কোনো অলংকার পরলে যেমন করে, এমন খানিকটা দেমাগ আমারও ছিল। তবে এটা সত্য, আমি আমার টিচারকে ভক্তি করতাম এবং তাঁকে সহযোগিতা করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠতাম।

স্কুলে আরেকটা জিনিস আবিষ্কার করতে পেরে আমি খুশি হয়েছিলাম—টিচারদের ‘কর্তৃত্ব’। বাড়িতে, জনাকীর্ণ ও বিশৃঙ্খল পামুক অ্যাপার্টমেন্টে কোনো কিছু এত স্পষ্ট ছিল না। বহু লোকের টেবিলে সবাই একসঙ্গে কথা বলত।

আমাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম, আমাদের পরস্পরের জন্য ভালোবাসা, আমাদের কথোপকথন, খাবারদাবার, রেডিও শোনার সময়—এসব নিয়ে কখনো আলাপ-আলোচনা হতো না, এসব এমনিতেই হয়ে যেত। বাড়িতে স্পষ্টতই বাবার খুব সামান্য কর্তৃত্ব ছিল, আর বাবা তো হামেশাই অনুপস্থিত থাকতেন। তিনি কখনো আমার ভাই কিংবা আমাকে বকাঝকা করেননি, এমনকি কখনো অননুমোদনের ভ্রুকুটিও তাঁর চেহারায় দেখা যায়নি। শেষের দিকে বাবা তাঁর বন্ধুদের কাছে আমাকে এভাবে পরিচয় করিয়ে দিতেন—‘আমার দুই ছোট ভাই’। আমরা অনুভব করতাম, এভাবে বলার অধিকার তিনি অর্জন করেছেন। বাড়িতে মাকেই আমার মনে হয়েছে একমাত্র কর্তৃত্বসম্পন্ন। মাকে কখনোই দূরের কিংবা ভিনগ্রহের স্বৈরাচার মনে হয়নি। আমি যে তার ভালোবাসা চাই, এই  প্রত্যাশাই তার শাস্তির জোগান দিয়েছে। আর আমার অবাক লেগেছে পঁচিশজন ছাত্র-ছাত্রীর ওপর আমার টিচারের ক্ষমতার প্রয়োগ দেখে।

আমি সম্ভবত আমার টিচারকে আমার মায়ের সমকক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলাম, কারণ তার অনুমোদন লাভের জন্য আমার ছিল এক অতৃপ্ত তৃষ্ণা।

তিনি বলতেন, ‘তোমাদের দুই বাহু এভাবে একত্র করে চুপচাপ বসে পড়ো। ’ আর আমি আমার হাত বুকে ঠেকিয়ে ধৈর্য ধরে ক্লাসের পড়া শুনতাম। কিন্তু ধীরে ধীরে এই নতুনত্ব আর থাকল না। এখন সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, সবার আগে পাটিগণিতের সমস্যাটির সমাধান করা কিংবা ক্লাসে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ার উত্তেজনা মিইয়ে গেল। সময় বইতে লাগল যন্ত্রণাদায়ক শ্লথগতিতে অথবা সময়ের প্রবাহ একেবারেই থেমে গেল।

মোটাসোটা স্বল্পবুদ্ধির যে মেয়েটা ব্ল্যাকবোর্ডে লিখছিল, যে স্কুলের সব টিচার, কেয়ারটেকার আর ক্লাসমেটকে দেখে একই রকম নিষ্প্রাণ ও বিশ্বস্ত হাসি দিত, তার ওপর থেকে আমার চোখ সরে জানালাপথে অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের মাঝখান দিয়ে বেড়ে ওঠা চেস্টনাট গাছের ওপরের দিককার শাখা-প্রশাখার ওপর ভেসে বেড়াত।   ডালের ওপর এসে একটি কাক বসত। আমি যেহেতু নিচের দিক থেকে দেখতাম, আমার চোখে পড়ত এর পেছনে ছোট ছোট মেঘ ভেসে যাচ্ছে—আমি দেখতে পাচ্ছি মেঘ নড়ছে, আর মেঘের আকারও বদলে যাচ্ছে, প্রথমে শিয়ালের নাক, তারপর মাথা, তারপর একটা কুকুর। আমি চাইনি মেঘের কুকুরাকৃতির পরিবর্তন ঘটুক। কিন্তু যেহেতু মেঘের চলা অব্যাহত থাকল, ধীরে ধীরে এটা রুপার চারপেয়ে চিনির বোলে পরিণত হলো। এ রকম পাত্র সব সময়ই আমার দাদিমার তালাবদ্ধ আলমারিতে প্রদর্শিত হতে থাকে। আমার তখন বাড়ি যেতে ইচ্ছা করত।

একবার আমি ভেল্কিবাজির মতো আমাদের বাড়ির ছায়ায় আশ্বস্ত করা নীরবতা নামিয়ে আনি। এর ভেতর থেকে বেরিয়ে আসেন আমার বাবা যেন স্বপ্নের ভেতর থেকে, তারপর পরিবারের সবাই বসফরাসে বেড়াতে চলে যাই। তখনই উল্টো দিকের একটি অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের জানালা খুলে যাবে, কাজের মেয়েটি তার হাতের ডাস্টার ঝেড়ে অন্যমনস্কভাবে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকবে। কিন্তু আমি যেখানে বসে আছি, সেখান থেকে তাকে দেখা যাবে না।

নিচে রাস্তায় কী হচ্ছে আমি ভাবি। আমি ঘোড়ার গাড়ির শব্দ শুনতে পাই, খোয়া পাথরের ওপর দিয়ে যাচ্ছে এবং ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে কেউ চেঁচায় এস্কিসিইইই—আছে ভাঙা লোহালক্কড়। কাজের মেয়েটি ওপর থেকে নিচের রাস্তায় ভাঙ্গারিওয়ালার চলা দেখে মাথা ফিরিয়ে ভেতরে নিয়ে পেছনের জানালা বন্ধ করে মেঘের দ্রুতগতিতে বিপরীতে ছুটে পাশের জানালায় চলে আসে—আমি সেখানে আরেকটা মেঘ দেখতে পাচ্ছি। ততক্ষণে আমার দৃষ্টি ক্লাসরুমে ফিরে আসে। দেখি সবাই হাত উঠিয়েছে, আমিও সাগ্রহে হাত উঠাই। আর কাজটা করি টিচার কী প্রশ্ন করেছেন আমার ক্লাসমেটদের কাছ থেকে তা জেনে নেওয়ার আগেই—আমার একটা ঝাপসা আস্থা আছে যে উত্তরটা নিশ্চয়ই আমার জানা।

আলাদাভাবে আমার ক্লাসমেটদের চেনা। তারা আমার চেয়ে কতটা ভিন্ন তা জানা বেশ উত্তেজনার একটা ব্যাপার, আবার কখনো যন্ত্রণারও।

বিষণ্ন ধাঁচের একটা ছেলে ছিল, যখনই টার্কিশ ক্লাসে তাকে যখন কোনো কিছু জোরে পড়ে শোনাতে বলা হতো, সে প্রতি দ্বিতীয় লাইন বাদ দিয়ে পড়ত। বেচারার ভুলটা যেমন অনৈচ্ছিক, তেমনি তার পড়া শুনে ক্লাসের সবাই যে হেসে উঠত, এটাও ছিল অনৈচ্ছিক। আমরা যখন ফার্স্ট গ্রেডে পড়ি, একটি মেয়ে তার চুল অশ্বপুচ্ছের মতো করে বাঁধত আর কিছুটা সময় সে আমার পাশে বসত। তার ব্যাগটা অগোছালো ও নোংরা, অর্ধেক খাওয়া আপেল, গোলাকার রুটির রিং, রুটি থেকে ছিটকে পড়া তিলের বীজ, পেনসিল চুলের ব্যান্ড—বেগুনি রঙের সুগন্ধি, শুকনো ফুলের গন্ধ বেরোত ব্যাগ থেকে, গন্ধটা আমাকে আকৃষ্ট করত; আরো একটি কারণে সে আমাকে আকর্ষণ করত—দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাটো সংস্কারগুলো নিয়ে সে এমন অবলীলায় কথা বলত, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে তার সঙ্গে দেখা হতো না বলে তাকে মিস করতাম, যদিও ছোটখাটো এবং কোমল একটা মেয়ে ছিল, আমি তার প্রতিও সম্পূর্ণ মুগ্ধ ছিলাম। আর যে ছেলেটা জানে কেউ তাকে বিশ্বাস করে না, তবু সে কেন মিথ্যা কথা বলে যায়? আর মেয়েটার বিবেচনাশক্তিই বা কেমন, সে তার ঘরের সব গোপন কথা বলে দেয়? আতাতুর্কে নিয়ে যখন কবিতা পড়ছে, সেই অন্য মেয়েটার চোখ থেকে কি অশ্রু ঝরতে শুরু করবে?

আমার যেমন অভ্যাস গাড়ির সামনের দিকটা দেখা, মানুষের নাক দেখা, সেভাবে কি আমি আমার ক্লাসমেটদের নিরীক্ষা করছি—তাদের কাকে কোন জন্তুর মতো দেখায়?

খাড়া নাকের ছেলেটি শেয়াল আর তার পাশের বড় নাকওয়ালা ছেলেটাকে সবাই বলে ভালুক আর ঘন চুলওয়ালাটা সজারু...আর একটা ইহুদি মেয়ে, নাম মারি, আমাদের পাসওভার (মিসরীয়দের দাসত্বশৃঙ্খল থেকে ইহুদিদের মুক্তির ধর্মীয় উৎসব) নিয়ে কথা বলত, সেদিন তার দিদিমার বাড়িতে কাউকে আলো জ্বালাতে সুইচে হাত লাগাতে দেওয়া হতো না। আরেকটি মেয়ে বলল, এক সন্ধ্যায় সে তার রুমে এত দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল যে তার চোখে পড়ল এক পরির ছায়া, গল্পটা ছিল ভয়ের এবং এই গল্পটা আমার সঙ্গে রয়েই গেল। খুব লম্বা পায়ের একটা মেয়ে ছিল, খুব লম্বা মোজা পরত, দেখলে মনে হতো, যেন এখনই কেঁদে ফেলবে। তার বাবা ছিলেন সরকারের মন্ত্রী, তিনি সেই উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় নিহত হন, যে দুর্ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী মেন্দেরেস ক্রাচ ছাড়াই ধ্বংসযজ্ঞ থেকে উঠে দাঁড়ান। (১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৯ উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হলে ১৬ জন যাত্রী, আটজন ক্রুর কয়েকজন মন্ত্রীসহ ৯ জন পদস্থ যাত্রী এবং পাঁচজন ক্রু ঘটনাস্থলে নিহত হন। অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসেন প্রধানমন্ত্রী আদনান মেন্দেরেস), সেই মেয়েকে দেখলে মনে হতো এখনই কেঁদে ফেলবে। আমি তখন নিশ্চিত ছিলাম যে মেয়েটি কাঁদত, কারণ সে জানত সামনে কী ঘটতে যাচ্ছে।

অনেক বাচ্চার দাঁত নিয়ে সমস্যা থাকে, তাদের সামান্য কয়েকজন ব্রাশ লাগায়।

যে ভবনটির ওপরতলায় ডর্মিটরি ও স্পোর্টস হল, ঠিক পাশেরটাই হাসপাতাল। গুজব ছিল, সেখানে একজন ডেন্টিস্ট আছেন আর আমাদের টিচাররা যখন রেগে যেতেন দুষ্ট বাচ্চাদের হুমকি দিতেন যে ডেন্টিস্টের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। ছোট মাপের দুষ্টুমির জন্য দরজা ও ব্ল্যাকবোর্ডের মাঝখানের একটি কোনায় ক্লাসের দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো, কখনো আবার এক পায়ে। আর এই শাস্তি হলে আমরা কৌতূহলী হয়ে তাকিয়ে থাকতাম—দেখি কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। এতে সবারই পড়াশোনার ব্যাঘাত ঘটত, এ জন্য এ শাস্তিটা  কদাচিৎ দেওয়া হতো।

আহমেত রাসিম (১৮৬৫-১৯৩২) তাঁর স্মৃতিকথা  ‘ফালাকা’ ও ‘নাইটস’-এ লিখেছেন—তাঁর স্কুলজীবনে অটোমান স্কুলের টিচাররা তাঁদের হাতে এত লম্বা রড রাখতেন যেন তিনি তাঁর চেয়ারে বসে ছাত্রদের পেটাতে পারেন।

আমাদের টিচাররা এই বইগুলো পড়ার জন্য আমাদের খুব উৎসাহিত করতেন; কারণ তাঁরা সম্ভবত আমাদের দেখাতে চাইতেন প্রজাতন্ত্র যুগের আগে, আতাতুর্ক যুগের আগে জন্মগ্রহণ করা থেকে বেঁচে যাওয়ায় আমরা কত ভাগ্যবান—বেত-যুগ আমাদের পায়নি। এমনকি ধনীদের এলাকা নিসানতাসির নামিদামি ইসিক লিসিতে অটোমান যুগের অবশিষ্ট যে কয়জন টিচার ছিলেন, তাঁরা আধুনিক প্রযুক্তির মধ্যেই দুর্বল ও প্রতিরক্ষায় অসমর্থ ছাত্রদের অত্যাচার করার হাতিয়ার উদ্ভাবন করে ফেললেন; ফ্রান্সে তৈরি আমাদের রুলার বিশেষ করে পাতলাগুলোর দুই পাশে কঠিন সিলিকেট, তারা হাতের ওপর এই রুলার চালাতেন আর তা ছিল ফালাক (বেত) বা রডের মতোই কার্যকরী।

আমি শাস্তি পাওয়া সত্ত্বেও যখন আলসে, অসভ্য আহাম্মক ও অবাধ্য ধরনের ছাত্র-ছাত্রীরা শাস্তি পেত, আমি রীতিমতো আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠতাম। ড্রাইভারচালিত গাড়িতে স্কুলে আসা, একজন টিচারের বিশেষ আদুরে মেয়েটির ওপর যখন শাস্তি প্রয়োগ করা হতো, আমি খুব খুশি হতাম। মেয়েটি সব সময় আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে হেঁড়ে গলায় ইংরেজিতে ‘জিঙ্গেল বেল’ গাইত—এতে যেনতেনভাবে হোমওয়ার্ক করার অপরাধের শাস্তির মার্জনা হয়নি। সব সময়ই দু-একজন থাকত, যারা হোমওয়ার্ক করত না, কিন্তু এমন ভান করত যেন কাজটা করেছে, নোট বইতে কোথায় কাজটা করা আছে কিন্তু খুঁজে পাচ্ছে না।

তারা চেঁচিয়ে বলত। ‘টিচার, আমি এটা এখন খুঁজে পাচ্ছি না। ’ এতে যা ঘটার তা কেবল কয়েক মুহূর্ত পিছিয়ে যেত, এতে বরং টিচারের মার কিংবা কান ধরে টানার সহিংসতা বেড়ে যেত।

আমাদের স্কুলজীবনের প্রথম দিককার মিষ্টি ও মাতৃসুলভ টিচারের কাছ থেকে বেরিয়ে আমরা যখন রাগী, বুড়ো ও তিনকুটে টিচারদের হাতে পড়ি, যাঁরা আমাদের ধর্ম ও সংগীত পড়াতেন এবং জিমন্যাস্টিকস করাতেন, আমাদের অপদস্থ করার এই প্রথাগত আচার আরো বিস্তৃত রূপ নেয়, তখন কোনো কোনো সময় পড়াটা হয়ে ওঠে ভয়ংকর একঘেয়েমির কাজ; তখন তাঁরা শাস্তির নামে যা করতেন, আমি সেই কয়েক মিনিটের বিনোদন উপভোগ করতাম।

একটি মেয়ে ছিল, দূর থেকে আমি তার অনুরাগী হয়ে উঠেছিলাম, কারণটা সম্ভবত এই যে মেয়েটি পরিচ্ছন্ন ও আকর্ষণীয় অথবা সম্ভবত এমনই সাদাসিধে, যখন তাকে শাস্তি দেওয়া হতো আমি দেখতাম তার চোখে অশ্রু জমেছে, তার চেহারা উজ্জ্বল লাল হয়ে উঠেছে; আমার ইচ্ছা হতো, তাকে উদ্ধার করতে ছুটে যাই।

মোটাসোটা সোনালির যে ছেলেটা টিফিনের সময় সবার ওপর নির্যাতন চালাত, যখন কথা বলার জন্য ধরা পড়ত আর ধরা পড়ার কারণে পিটুনি খেত, আমি শীতল রক্তের আনন্দ নিয়ে এটা উপভোগ করতাম।

একটা ছেলেকে আমি মাথামোটা অপদার্থ ভাবতাম, যত কঠিন শাস্তিই তাকে দেওয়া হোক না কেন, সে তা প্রতিরোধ করতে চেষ্টা করত। কিছু কিছু টিচার ছেলে-মেয়েদের ব্ল্যাকবোর্ডে যাওয়ার জন্য ডাকতেন আর তা তাদের জ্ঞান পরীক্ষার জন্য করতেন না, করতেন অজ্ঞতার পরীক্ষা। কয়েকজন মূর্খ ছাত্র আবার নিজেদের এই অপদস্থ হওয়াটা উপভোগও করত।

কারো নোট খাতার প্রচ্ছদের রং সঠিক না হলে কোনো কোনো টিচার উন্মত্ত হয়ে উঠতেন। কেউ কেউ অকারণেই অপরাধ ধরে বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলতেন, ফিসফিস করার জন্য শিশুকে মারতেন, কেউ কেউ সঠিক উত্তর দেওয়ার পরও গাড়ির হেডলাইটের সামনে পড়া হতভম্ব খরগোশের মতো তাকিয়ে থাকত। আমি সবচেয়ে বেশি উপভোগ করতাম উত্তর জানে না, কিন্তু টিচারকে সন্তুষ্ট করার জন্য যা জানে তারই কিছু একটা হুট করে বলে দিত আর আহাম্মকের মতো আশা করত—এটা তাদের বাঁচিয়ে দেবে।

আমি এসব দৃশ্য দেখতাম—প্রথমে বকাঝকা, তারপর বইপত্র ও খাতা ছুড়ে মারা, তখন বাকি ক্লাস নিশ্চুপ বরফ জমাট হয়ে থাকত। আমি কৃতজ্ঞ যে অপদস্থ হওয়ার মতো এই অসহায় ছাত্রদের একজন আমি ছিলাম না।

ক্লাসের এমন এক-তৃতীয়াংশ ভাগ্যবান ছাত্র-ছাত্রীর আমি একজন। আমাদেরটা যদি সব ধরনের প্রেক্ষাপট থেকে ছেলে-মেয়েদের স্কুল হতো, তাহলে ভাগ্যবানদের বিভাজনটা স্পষ্ট হয়ে দেখা দিত; কিন্তু এটা তো প্রাইভেট স্কুল এবং সবাই ধনী পরিবারের সন্তান।

টিফিন ব্রেকে খেলার মাঠে আমরা আমাদের শিশুসুলভ সখ্য উপভোগ করতাম, তখন সেই বিভাজনরেখাটি মিলিয়ে যেত। কিন্তু যখনই আমি এই মারপিট আর অপদস্থ হওয়া দেখতাম, আমি টিচারের ডেস্কে বসা ভয়াল মানুষটির মতো হয়ে নিজেকে জিজ্ঞেস করতাম—কেন ব্যাপারটা এমন যে কিছু শিশু এত আলসে, সম্মানহীন, দুর্বলচিত্ত, অনুভূতি ও বুদ্ধিহীন হয়ে থাকে?

যে কমিক বই আমি পড়তে শুরু করেছি, তাতে আমার এই নৈতিক জিজ্ঞাসার কোনো জবাব নেই; কমিকে শয়তান চরিত্রগুলোকে আঁকা হয়েছে জটিল মুখাবয়বে—কিন্তু কোনো কিছু না পেয়ে আমার নিজের শিশুসুলভ অন্তরের ঝাপসা গভীরতায় আমি প্রশ্নটিকে মিলিয়ে যেতে দিই।

আমি বুঝতে পারি, যে জায়গাটিকে তারা স্কুল বলে, জীবনের সবচেয়ে গভীর প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে এর কোনো ভূমিকা নেই। বরং এর প্রধান কাজ হচ্ছে, রাজনৈতিক নির্মমতার মধ্যে আমাদের ‘প্রকৃত জীবন’-এর জন্য প্রস্তুত করা।

তাই মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পৌঁছা পর্যন্ত, আমি হাত তোলাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছি এবং নিরাপদে সেই রেখার সঠিক দিকেই অবস্থান করেছি।

এটাই বলছি, স্কুলে আসল যে জিনিসটি শিখেছি তা হচ্ছে, প্রশ্ন ছাড়া জীবনের কোনো সত্য গ্রহণ করা যথেষ্ট নয়—এর সৌন্দর্যেও কাউকে ঝলসে উঠতে হবে। স্কুলের প্রথম দিকের বছরগুলোতে যেকোনো অজুহাতে টিচাররা ক্লাস থামিয়ে আমাদের একটা গান শেখাতেন। এসব ফ্রেঞ্চ ও ইংরেজি গানে গলা মেলাতাম; কিন্তু আমি কিছু বুঝতাম না, পছন্দও করতাম না। তবে ক্লাসমেটরা গাইছে—এটা দেখতে পছন্দ করতাম। (আমরা টার্কিশ ভাষায় গাইতাম। গানের শব্দগুলো অনেকটা এ রকম—ফাদার ওয়াচম্যান, ফাদার ওয়াচম্যান, আজ ছুটির দিন, তাই তোমার বাঁশি বাজাও। ) একটি খাটো, গোলগাল বালক, নোট খাতা আবারও বাসায় ফেলে এসেছে বলে আধাঘণ্টা আগেও যে কেঁদেকেটে সারা। মুখ যতটা সম্ভব বিস্তৃত করে এখন গান গাইবে।

যে মেয়েটি তার লম্বা চুল তার কানের পেছন দিকে ঠেলে দিচ্ছিল, গানের মাঝখানে সে উদ্বেগের সঙ্গে এটা করতে থাকে। এমনকি নির্দয় মটু যে আমাকে খেলার সময় মেরেছে, তার ধূর্ত ও শয়তান গুরুটা তার পাশে বসেছে—সে অবশ্য এই গোপন রেখাটার কথা জানত এবং নিজেকে সঠিক দিকে রাখতে চেষ্টা করত, এমনকি তারা দেবদূতের মতো হাস্যচঞ্চল, সংগীতের মাঝে নিজেদের হারিয়ে ফেলত।

গানের মাঝখানে পরিপাটি মেয়েটি খোঁজ করে দেখে নিল তার পেনসিল বক্স ও নোট বই সুশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে কি না। চালাক ও কঠিন পরিশ্রমী মেয়েটা টিফিনের পর দুজন দুজন করে ক্লাসে ঢোকার সময় আমি যাকে আমার সঙ্গী হতে বলতাম, নীরবে সে তার হাত আমার দিকে বাড়িয়ে দিত, এমনকি সেও হৃদয় ঢেলে গাইছে। আর সেই মোটা কিপটে ছেলেটা, যে তার বাহু দিয়ে হাতের কাগজ ঘিরে রাখে। যেন ছোট্ট শিশুকে কোলে নিয়ে আছে বা কারো চোখে না পড়ুক, সেই ছেলেও দুই হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।

এমনকি অপদার্থ স্বল্প বুদ্ধির যে ছেলেটার একটি দিনও মার না খেয়ে কাটেনি, সেও নিজের ইচ্ছাতে কোরাসে যোগ দিয়েছে। আমি যখন দেখলাম, লাল চুলের অশ্বপুচ্ছ বেণি করা মেয়েটিও তা দেখেছে, গান গাইতে গাইতে আমরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে হাসতাম। গানটা কি আমার জানা নেই, কিন্তু যখন গানের লা-লা-লা অংশটি এসে যেত আমি যোগ দিতাম, সর্বোচ্চ স্বরে গাইতাম। আর যখন জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতাম আমি ভেলকিবাজির মতো ভবিষ্যতের দেখা পেতাম; আর অল্পক্ষণ—অল্পক্ষণ পরই ঘণ্টা বাজত আর গোটা ক্লাস যেন বিস্ফোরিত হতো। আমি ব্যাগ নিয়ে বাইরে যেতাম—দেখি আমাদের কেয়ারটেকার এসেছে কি না। আমি তার বড় হাত ধরতাম। আমাদের দুই ভাইকে হাঁটিয়ে তিনি বাড়ি নিয়ে যেতেন, আমি ভাবতাম যখন তার সঙ্গে বাড়ি পৌঁছাব, এত ক্লান্ত হয়ে পড়ব যে ক্লাসের আর কারো কথাই মনে পড়বে না, তার পরও আমি জোর কদমে হাঁটতে থাকি, যখন আমার মনে পড়ল যে কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি আমার মাকে দেখতে পাব।

বিদেশের স্কুলে একজন বিদেশি

আমি প্রিপারেটরি স্কুলে ইংরেজি শেখার জন্য যে একটি বছর কাটিয়েছি, তা ধরা হলে বরার্ট একাডেমিতে আমার চার বছর কেটেছে। এই সময়ই আমার শৈশবের সমাপ্তি ঘটে। আর আমি আবিষ্কার করি পৃথিবীটা অনেক বেশি বিভ্রান্তিপূর্ণ, প্রবেশাধিকারহীন আর আমি যেমন সন্দেহ করেছি, তার চেয়ে অনেক বেশি পীড়াদায়কভাবে সীমাহীন।

আমার পুরো শিশুকাল কেটেছে নিকট বন্ধনে আবদ্ধ একটি পরিবারের ভেতর একটি বাড়িতে, একটি রাস্তায়, একটি পাড়ায়; আর আমি যা কিছু জানি, আমার জন্য এটাই ছিল পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল।

আমি যখন মাধ্যমিক স্কুলে যেতে শুরু করলাম, আমার পড়াশোনা আমার এই ধারণা ভাঙতে কিছুই করেনি, যাতে আমি ভেবে রেখেছিলাম, আমার ব্যক্তিগত ও ভৌগোলিক বিশ্বই বাকি পৃথিবীর মান নির্ধারণ করে রেখেছে। স্কুলে এসে আমি আবিষ্কার করলাম যে আমি আসলে পৃথিবীর কেন্দ্রস্থলে বাস করি না, আরো বেদনাদায়ক হচ্ছে আমার সেই জায়গাটি পৃথিবীর আলোর পথ দেখায় না।

পৃথিবীতে আমার অবস্থানের স্থানটির ভঙ্গুরতা এবং একই সঙ্গে বিশ্বের বিশালতা আঁচ করতে পেরে, আমি নিজেকে নিঃসঙ্গ অনুভব করতে শুরু করি এবং আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দুর্বলও। একটা বিষয় বলতে হয়, আমার ভাই কিন্তু তখন আর সেখানে নেই। আমার বয়স যখন ষোলো, ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য আমার ভাই আমেরিকায় চলে যায়। আমরা অবিরাম ঝগড়া করে থাকতে পারি, কিন্তু আমরা ছিলাম আত্মায় সম্পর্কিত—আমাদের চারপাশের পৃথিবী নিয়ে তার সঙ্গে আলাপ করেছি, শ্রেণিবিন্যাস করেছি, বিচার-বাছাই করেছি, রায় দিয়েছি—তার সঙ্গে আমার যে বন্ধন, তা মা ও বাবার সঙ্গে বন্ধনের চেয়ে বেশি দৃঢ়।

অনিঃশেষ প্রতিযোগিতা টিটকারি ও পিটুনি যদিও আমার কল্পনাকে প্রজ্বলিত করত এবং আলসেমিকে বাড়িয়ে দিত, এসব থেকে মুক্ত হয়ে গেলাম। আমার অভিযোগ করার আর তেমন কোনো কারণ রইল না। কিন্তু বিশেষ করে যখন বিষণ্নতা নেমে আসত, আমি যে তার সঙ্গ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি—এটা খুব অনুভব করতাম। মনে হলো, আমার ভেতরের একটা কিছু টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। কিন্তু ভেতরের কেন্দ্রটা যে কোথায়, তা মাথা খাটিয়ে বের করতে পারিনি। হতে পারে, কারণটা এই যে আমি ক্লাসের পড়ায়, বাড়ির কাজে কিংবা অন্য কিছুতে নিজেকে পুরোপুরি কাজে লাগাইনি। কখনো এটা ভেবে মন খারাপ হয়ে যেত যে বিশেষ উদ্যোগ না নিলে আমি ক্লাসে সবার ওপর থাকতে পারব না; কিন্তু আসলে আমি যেন খুব ভেঙে পড়ার কিংবা খুব সন্তুষ্ট হওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি। আমার শৈশবে আমি যখন নিজেকে সুখী ভাবতাম, জীবনটা তখন ছিল মখমলের মতো, তা রূপকথার গল্পের দিকে মোড় নিত। যখন আমি তেরো-চৌদ্দ বছরের হয়ে যাই, এই গল্পটার ভাঙচুর হতে থাকে। কখনো কখনো আমি এসব টুকরোর কোনো একটিকে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতাম। আর নিজেকে সম্পূর্ণভাবে এতেই নিবেদিত রাখার সিদ্ধান্ত নিই।

জেনেভার এই স্কুলেও ক্লাসে না যাওয়ার অজুহাত খুঁজতেন ওরহান।

হাজার এক রাত্রি

আমার পড়া প্রথম গল্পগুলো হাজার এক রাত্রির, তখন আমার বয়স সাত বছর। তখন মাত্র প্রাইমারি স্কুল পেরিয়ে এসেছি আর গ্রীষ্মটা কাটাতে আমি আর আমার ভাই গিয়েছি সুইজারল্যান্ডের জেনেভায়; সেখানে একটি চাকরি পাওয়ার পর আমার মা-বাবা তখন জেনেভায় বসবাস করছেন। ইস্তাম্বুল থেকে যাওয়ার সময় গ্রীষ্মের ছুটিতে আমাদের পাঠের উন্নতি ঘটাতে আমাদের আন্টি যেসব বই সঙ্গে দিয়েছেন, তার মধ্যে একটি ছিল হাজার এক রাত্রির গল্পের নির্বাচিত কাহিনির সংকলন। উঁচুমানের কাগজে সুন্দর করে বাঁধাই একটি বই—আমার মনে আছে, গ্রীষ্মে আমি বইটির চার থেকে পাঁচ খতম দিয়েছিলাম। খুব গরমের সময় দুপুরের খাবারের পর আমার রুমে গিয়ে বিছানায় শরীর টানা দিতাম আর একই গল্প বারবার পড়তাম। লেইক জেনেভার তীর থেকে একটা রাস্তা পরে আমাদের অ্যাপার্টমেন্ট, খোলা জানালা দিয়ে হালকা বাতাসের ঝাপটা ভেতরে ঢুকত, আমাদের বাড়ির পেছনে বাজানো ভিখারির অ্যাকোর্ডিয়ান শূন্য থেকে সুর ছড়িয়ে দিত, আর আমি নিজেকে ছেড়ে দিতাম আলাদিনের চেরাগ আর আলীবাবা ও চল্লিশ চোরের দেশে।

আমার ভ্রমণ করা প্রথম দেশটির নাম কী? আমার প্রথম অভিযান থেকে বুঝতে পারি, এটা অনেক দূরের দেশ, অ্যালিয়েন, আমাদের পৃথিবীর চেয়েও অনেক আদিম, তবে তা জাদুকরী রাজত্বের অংশ।

আপনি ইস্তাম্বুলের যেকোনো রাস্তা দিয়ে হাঁটুন না কেন, এমন অনেকের সঙ্গে আপনার দেখা হবে বিখ্যাত বীরদের নামে যাদের নাম আর সে জন্য আমি তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বোধ করতাম। কিন্তু আমার পৃথিবীর কিছু তাদের গল্পে পেতাম না। হয়তো আনাতোলিয়ার দূরের কোনো গ্রামের জীবনটা তাদের গল্পে, কোনোভাবেই তা আধুনিক ইস্তাম্বুলের নয়।

কাজেই আমি যখন প্রথম হাজার এক রাত্রি পড়ি, পাশ্চাত্যের এক শিশু হিসেবে প্রাচ্যের বিস্ময়কর কাহিনি আমাকে হতবাক করে দিয়েছে। এটা আমার জানার কথা নয় যে অনেক আগেই ভারত ও ইরান থেকে এসব গল্প পরিশ্রুত হয়ে আমাদের সংস্কৃতিতে প্রবেশ করেছে; আর আমার জন্মশহর ইস্তাম্বুল অনেকভাবেই যেসব উৎস থেকে, যেসব প্রথা থেকে এই গল্পগুলো উঠে এসেছে তার জীবন্ত দলিল; সেই মিথ্যে, সেই চালাকি, প্রতারণা, সেই প্রেমিক ও বিশ্বাসঘাতক, সেই ছদ্মবেশ, সেই প্যাঁচ, সেই বিস্ময়—সবই আমার নিজের শহরের জটপাকানো বিস্ময়কর আত্মায় বোনা হয়ে আছে। আরো অনেক পরে বইপত্র ঘেঁটে আমি আবিষ্কার করি, হাজার এক রাত্রির ফরাসি অনুবাদক ও সংকলক আন্তোইন গ্যালাদ এই বইয়ের প্রাচীন পাণ্ডুলিপি সিরিয়ায় পেয়েছেন বলে যে দাবি করেছেন, আমার প্রথম পড়া সেই গল্পগুলোর বেলায় দাবিটি যথার্থ নয়। আলীবাবা চল্লিশ চোর কিংবা আলাদিনের জাদুর চেরাগ তিনি কোনো বই বা পাণ্ডুলিপি থেকে অনুবাদ করেননি। হান্না দিয়াক নামের একজন আরবীয় খ্রিস্টানের কাছে গল্পগুলো শুনেছেন এবং অনেক পরে তা লিখে একটি সংকলনে প্রকাশ করেছেন।

এটা আমাকে আসল বিষয়ের কাছে নিয়ে আসে : হাজার এক রাত্রি প্রাচ্য সাহিত্যের একটি বিস্ময়। কিন্তু আমরা যেহেতু এমন একটি সংস্কৃতিতে বাস করি যে নিজের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে, ভারত ও ইরানের কাছে কী ঋণ তা ভুলে গেছে, আমরা আত্মসমর্পণ করেছি পাশ্চাত্য সাহিত্যের কম্পনের কাছে, প্রাচ্যের সাহিত্য ইউরোপ হয়ে আমাদের কাছে এসেছে। যদিও বহু ইউরোপীয় ভাষায় হাজার এক রাত্রি অনূদিত হয়েছে, কখনো সে যুগের, সে ভাষার শ্রেষ্ঠ লেখকদের হাতে, কখনো অদ্ভুত চরম বিকৃত মস্তিষ্ক এবং মহাপণ্ডিতভাবাপন্ন মানুষের হাতে সবচেয়ে বেশি আদৃত হয়েছে আন্তোইন গ্যালাদের কাজটি। ১৭০৪ থেকে তিনি তার প্রকাশনা শুরু করার পর হাজার এক রাত্রি হয়ে ওঠে পৃথিবী সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী, সবচেয়ে পঠিত এবং সবচেয়ে টেকসই একটি গ্রন্থ। এভাবে বলা যায়—তখনই প্রথম একটা থেকে আরেকটা গল্পের অন্তহীন এক শিকল একটি সীমিত সত্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, আর এই সংস্করণই গল্পগুলোর বিশ্বজোড়া খ্যাতি প্রতিষ্ঠার কারণ। শতাব্দীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সময় ধরে এই গ্রন্থ ইউরোপীয় লেখালেখির জগতে সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ হয়।

স্তাদাল, কোলরিজ, ডি কুয়িন্সি ও এডগার অ্যালেন পোর রচনায় হাজার এক রাত্রির বাতাসের মর্মর ধ্বনি শোনা যায়। কিন্তু আমরা যদি আদ্যোপান্ত বইটি পড়ি, তাহলে বুঝতে পারি এর প্রভাব কিভাবে সীমাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে—এটাকে শুরু থেকেই ‘অতীন্দ্রিয় প্রাচ্য’জাতীয় একটি ধারণায় বন্দি করে রাখা হয়েছে—গল্পগুলো অলৌকিক ঘটনায় ঠাসা অদ্ভুত, অতিপ্রাকৃতিক ও সন্ত্রস্ত করার মতো বিষয় এতে নিহিত; কিন্তু হাজার এক রাত্রিতে এর চেয়ে অনেক বেশি কিছু রয়েছে।


মন্তব্য