kalerkantho


নি স র্গ

কুয়ালালামপুরের ফুল ও পাখি উদ্যান

মোকারম হোসেন

২৫ জুন, ২০১৭ ০০:০০



কুয়ালালামপুরের ফুল ও পাখি উদ্যান

সুদৃশ্য ঝরনায় পাখিদের অবগাহন

এয়ারপোর্ট থেকে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর যাওয়ার সময় খুব সহজেই দেশটিকে চেনা যায়। দুপাশে অসংখ্য সয়াপামের বীথি।

শহর পর্যন্ত যেতে যেতে উন্নয়নটা ভালোই চোখে পড়ে। সুসজ্জিত আধুনিক মালয়েশিয়া। ট্যাক্সি থেকে নেমে বন্ধুর দেওয়া ঠিকানামতো হোটেলের দিকে এগিয়ে গেলাম। কিন্তু  রিসিপশন থেকে জানানো হলো কোনো রুম খালি নেই। মহা ঝামেলায় পড়া গেল। ভুলটা অবশ্য আগেই হয়েছে। সময় হেরফেরের কারণে তাত্ক্ষণিকভাবে কোনো রুম কনফার্ম করা যায়নি। অগত্যা ব্যাগ-ব্যাগেজ নিয়ে রাস্তায় নামি। ওদিকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। পরে জেনেছি এ মৌসুমে কুয়ালালামপুরে মধ্যপ্রাচ্যের পর্যটকরা প্রচুর পরিমাণে ভিড় করে। এ কারণেই হোটেলগুলোর ব্যবসা বেশ রমরমা। অনেক খোঁজাখুঁজির পর শেষমেশ বুকেট বিনতাং-এ পাওয়া গেল হোটেল। এটিও কুয়ালালামপুরের ব্যস্ততম এলাকাগুলোর অন্যতম। ব্যাগপত্র রেখে আবার রাস্তায় নামলাম। হোটেল খুঁজতে খুঁজতে যে বিষয়টি আমাকে অতি উৎসাহী করে তুলেছে তা হলো ওদের পর্যটন সেবা। পর্যটকদের সেবা প্রদানের বিশেষ ব্যবস্থা হিসেবে পথের ধারেই বসানো হয়েছে অনেক পর্যটন বুথ। ভাবনাটা বেশ জুতসই এবং সময় উপযোগী। কাউকে আর পর্যটন অফিস খুঁজে বের করতে হবে না। সহজেই পাওয়া যাবে অনেক তথ্য। গেলাম ওদের কাছে। সেখানে মিলল অনেক দর্শনীয় স্থানের তথ্য ও নির্দেশিকা। কোথায় কিভাবে যেতে হবে তাও বাতলে দিলেন পর্যটনকর্মীরা। হোটেলে ফিরে বাছাই করে কয়েকটি প্রয়োজনীয় বুকলেট ও ম্যাপ আলাদা করে রাখলাম। এর মধ্যে দুটো জায়গা ঘুরে দেখার ইচ্ছা প্রবল হয়ে উঠল। একটি কেএল বার্ড পার্ক, অন্যটি অর্কিড গার্ডেন।


পার্কের ভেতর সুদৃশ্য সেতু


পরের দিন বেশ সকাল সকাল হোটেল থেকে বের হলাম। বাইরে ব্যস্ততম কুয়ালালামপুর শহর। রাজপথে ধাবমান মানুষগুলোর চেহারা প্রায় একই হলেও এই শহরে অসংখ্য ভাষাভাষী মানুষের বসবাস। সবচেয়ে বেশি চায়নিজ। মালয়েশিয়ার কারখানাগুলোতে তাদের আধিপত্য চোখে পড়ার মতো। এত বিচিত্র ভাষাভাষীর ভিড়ে মালয়েশিয়ানদের খুঁজে পাওয়া যায় না। একসময় আমাদের দেশের অনেকেরই ধারণা ছিল, মালয়েশিয়া মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে অসংখ্য মসজিদ দেখা যাবে সেখানে। কিন্তু মনে-প্রাণে আধুনিক ও ধর্মসহাবস্থানশীল মালয়েশিয়া এসব সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করেছে অনেক আগেই। মূলত এই উদারতাই মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক মুক্তির পথ অনেকটা সুগম করেছে।

হোটেল থেকে স্থান দুটির অবস্থান কাছাকাছি দূরত্বে। মালয়েশিয়ায় ‘জালান’ অর্থ সড়ক। বার্ড পার্কটি ৯২০ নাম্বার সড়কের চন্দেরাউইশে। স্থানের নাম তামান তাসিক পার্ডানা। এটুকু পথ পাড়ি দিতেও ট্যাক্সিই একমাত্র ভরসা। এখানে তো আর রিকশার কারবার নেই। ঠিকানা দেখাতেই বিনা বাক্যে রাজি হয়ে গেল ট্যাক্সিঅলা, যা আমাদের দেশে একেবারেই ভাবা যায় না। ঢাকায় হয়তো ঘণ্টাখানেক ছোটাছুটি করলে বড়জোর একটা স্কুটার পাওয়া যেত। ট্যাক্সিঅলা একেবারে বার্ড পার্কের সামনে নামিয়ে দিল। আকাশে সূর্য নেই অনেকক্ষণ, কেমন যেন মেঘলা মেঘলা মন খারাপ করা দিন। আকাশের যে কিছুই করার নেই, কারণ তখন একেবারে পাকাপোক্ত বর্ষাকাল।


পোষা পাখির প্রতি শিশুদের আগ্রহ বেশি


কর্তৃপক্ষের দাবি কেএল বার্ড পার্ক বিশ্বের বৃহত্তম মুক্ত-উড্ডয়ন পক্ষীশালা। এই দাবির সত্যাসত্য যাচাই করতে হলে পৃথিবীর তাবৎ পক্ষীশালার খবরাখবর হাতে নিয়ে বসতে হবে। এসব অবশ্য পরের বিষয়, টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। একেবারে মোক্ষম সময়ে গিয়ে হাজির হলাম ময়ূরের খাঁচার সামনে। আপন মনে পেখম তুলেছে ওরা। চারপাশে ভালোভাবে তাকিয়ে মনে হলো যেন বান্দরবানের মেঘলা পর্যটন কেন্দ্রে এসেছি। চারদিকে লম্বালম্বিভাবে ঘোরানো হাঁটাপথ। নিচের দিকে সরু লেক। হাতের কাছেই একটি স্টর্কের মূর্তি। মনের ভুলে জীবন্তও মনে হতে পারে! সারা পৃথিবীতেই এরা বিপন্ন।

আরেকটু এগোতেই চোখে পড়ল কয়েকটি রঙিলা বক। তারপর একটি কৃত্রিম লেকের পাড়ে বেশ কিছু সাদা ফ্লেমিংগো। পালক পরিচর্যায় ব্যস্ত তারা। সাদা রঙের বলেই কী এত পালক সচেতন। পথের ধারে একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছে আরেকটি রঙিলা বক। বলে রাখা ভালো, এই পক্ষীশালায় সব কিছুই পাখিদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী তৈরি। অর্থাৎ যার যেমন থাকতে পছন্দ। পাখিদের প্রিয় বুনো পরিবেশটাই সর্বত্র প্রাধান্য পেয়েছে। কোনো কোনোটি ভালোই পোষ মেনেছে। কয়েকটি পাখির ভিড়ে নজর কাড়ে কমলা রঙের কাস্তেচরা। অমন রঙের জন্য ওর নামটাও রঙিলা কাস্তেচরা হওয়া উচিত ছিল। খাবারের সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছিল ওরা। একটি কবুতর দেখে থমকে দাঁড়াতে হলো। বড্ড আক্রমণাত্মক ভঙ্গি। মাথার চারপাশের পালকগুলো খাড়া হয়ে আছে। পাশেই একটা বড়সড় হাঁড়ির ভেতর খাবার আছে। সেখানে মাথা ঢুকিয়েছে মথুরা। তার পাশে প্রাকৃতিক খাবার খুঁজছে সাদা কাস্তেচরা ও ঘুঘু। ঘুরতে ঘুরতে এসে দাঁড়িয়েছি একটি ছাতার পাশে, মাথাটা খোলা। দেখতে অনেকটা উডল্যাম্পের মতো। এটা পাখিদের বিশ্রামের স্থান। ভেতরে আবার খাবারদাবারও আছে। সেখানে পাওয়া গেল আরেকটি কাস্তেচরা, পাশেই ঘুঘু। ঘুঘু আর কাস্তেচরাদের মধ্যে ভাবটা একটু বেশি বলেই মনে হলো!


পার্কে পেখম তুলেছে ময়ূর


পরের দৃশ্যটা ভারি চমৎকার। একচিলতে খোলা জায়গা। পাশে ছোট্ট একটি বাঁশঝাড়। তার পাশে তিনটি মরা ডাল পুঁতে তাতে একটি কঞ্চি বসানো। ডালের মধ্যে বাটিমতো কয়েকটি পাত্রে ছড়ানো খাবার। সেখানে রঙিলা বক আর ঘুঘুদের আধিপত্য বেশি। আরেকটু আগাতেই চোখে পড়ল পেলিক্যান। একটি বড় পাথরের পাশে ধ্যানমগ্ন। এই প্রথম এত কাছ থেকে পেলিক্যান দেখার সুযোগ হলো। আমাদের দেশে পেলিক্যান না থাকলেও তাদের কয়েকটি আত্মীয় আছে; তবে একেবারেই বিপদাপন্ন অবস্থায়। ইদানীং মাত্র দু-একটি প্রজাতি দেখা যায়। বাকিগুলো বিলুপ্ত। মদনটাক শুধু সুন্দরবনে আছে, হাড়গিলা নেই, সাদা মানিকজোড় উত্তরের হাওরে দু-একটি আসে, মানিকজোড় নেই, রামশালিক (লোহারজঙ্গ) নেই, শামুকভাঙা এখনো কিছু কিছু দেখা যায়।

মদনটাক একসময় সুন্দরবন ও সংলগ্ন জেলাগুলোতে মোটামুটি সহজলভ্য ছিল। বর্তমানে সুন্দরবনেই সীমিত হয়ে পড়েছে। তাও স্বল্পসংখ্যক। আকারের দিক থেকে দেশে স্টর্ক (বক) পরিবারের মধ্যে এরা দ্বিতীয় বৃহত্তম। সবচেয়ে বড় হচ্ছে হাড়গিলা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাগেরহাটের ভ্যাটকার বিল থেকে ১৯৪৭ সালের দিকে একটি হাড়গিলা শিকার করা হয়। মানিকজোড় আমাদের আবাসিক পাখি হওয়া সত্ত্বেও অনেক আগেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তবে এখনো কদাচ দু-একটি সাদা মানিকজোড় দেখা যায় দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলাগুলোয়। রামশালিক বা লোহারজঙ্গেরও প্রায় একই অবস্থা। গত ৪০ বছরে দেশের কোথাও একটি পাখিও দেখা যায়নি। সেই তুলনায় শামুকভাঙা এখনো একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায়নি।


পার্কের ভেতর খাবার খেতে জড়ো হয়েছে পাখিরা


আরো কিছুটা হাঁটলেই বন্দি পাখিদের খাঁচা। বেচারা কাকাতুয়া চুপচাপ বসে আছে। আরেক খাঁচায় দুটি রাজধনেশ গভীর ধ্যানে মগ্ন যেন। সুদূর মালয়েশিয়ার বার্ড পার্কে শঙ্খচিল দেখে জীবনানন্দের কথাই মনে পড়ল। ওরা বসে ছিল খুব কাছাকাছি। বড্ড বিমর্ষ। এখানে তো আর রূপসী বাংলা নেই যে নিশ্চিন্তে ডানা মেলবে আকাশে। সম্মুখে কিছুটা খালি জায়গা। বুনো কচু আর লিলির ঝোপ। প্যাঁচা দেখে ফিরে গেলাম ছেলেবেলায়। তখন গ্রামে ঘনায়মান সন্ধ্যায় যেসব প্যাঁচা দেখেছিলাম স্মৃতি হাতড়ে তাদের সঙ্গে মিলিয়ে নিলাম ওদের। দুপায়ে ভর করে তীক্ষ দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছে। কিছুটা ভয় ধরানো অবয়ব। তবু আমাদের লক্ষ্মীপ্যাঁচা। আরেক খাঁচায় একদিকে পিঠ দিয়ে বসে ছিল বদরী আর টিয়া। মনে হয় তুমুল ঝগড়া হয়েছিল কিছুক্ষণ আগে। তাই মুখ দেখাদেখি বন্ধ!

সম্মুখে খানিকটা ফাঁকা জায়গা। বিক্ষিপ্ত ঘাসের গালিচায় বনকচু আর লিলির ঝাড়। সেখানেই নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াচ্ছে কালো তিতির। ক্যামেরা নিয়ে খুব কাছে গেলাম, একটুও ভয় পেল না। ওপরের দিকে শব্দ হতেই তাকিয়ে দেখি গাছের ডালে দুটি বানর। এখানে এরাও বেশ আপন মনে আছে। এবার সামনে পড়ল ছবিঘর। দুটি ঘরজুড়ে বেশ কয়েকটি সুন্দর পাখি। পাখির সঙ্গে যেভাবে ইচ্ছা ছবি তোলা যাবে। পাখিগুলো এতটাই পোষমানা যে হাতের তালু, কাঁধ কিংবা মাথা যেখানেই ইচ্ছা বসিয়ে ছবি তোলা যায়। ওদের বিরক্তি নেই একটুও। তারপর এক টুকরো জাদুঘর। এক কক্ষেই অনেক আয়োজন, পাখির ডিম, বাসা, ফসিল ও ছবিসমৃদ্ধ নানা আকৃতির পোস্টার।

কেএল বার্ড পার্কের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এখানকার পাখিরা দীর্ঘতম মুক্ত উড্ডয়ন ক্ষেত্রের স্বাদটুকু পাচ্ছে। তাতে কয়েকটি অঞ্চলে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রায় ৬০ প্রজাতির পাখি স্বাধীনভাবে উড়ে বেড়াতে পারে। এই পার্ককে কতগুলো ভাগে ভাগ করা হয়েছে। বিনোদনের জন্য আছে শিশুতোষ প্লেগ্রাউন্ড, হর্নবিল স্যুভেনির শপ ও ক্যাফে, ফটোবুথ ও জাদুঘর। আরো আছে সেমিনার কক্ষ, স্টর্কজাতীয় পাখিদের অভয়ারণ্য, পানির ঝরনা, পক্ষী হাসপাতাল, ডাঙ্গার পাখি, বিপন্ন পাখিদের স্থান, তোতাপাখির রাজ্য, হর্নবিল উদ্যান, ফ্লেমিংগো পুকুর, ফ্লেমিংগোদের ঘরবাড়ি। পাখিদের খাবার দেওয়ার জন্যও কতগুলো নির্দিষ্ট স্পট রয়েছে। গোটা এলাকাকে আবার চারটি অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়েছে। পার্কের সর্বমোট আয়তন প্রায় ২১ একর। আছে ২০০ প্রজাতির প্রায় দুই হাজার পাখি। মাত্র ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই বার্ড পার্কটি স্বল্প সময়ের ব্যবধানে পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।


চোখ-ধাঁধানো বিচিত্র অর্কিডের সমাহার


 

কেএল অর্কিড গার্ডেন

বার্ড পার্ক দেখে ছুটলাম অর্কিড গার্ডেনের দিকে। ভাগ্য ভালো যে কুয়ালালামপুরে গরমটা তখনো অসহনীয় হয়ে ওঠেনি। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃষ্টি নামল। প্রথমে হালকা, পরে বজ্রবৃষ্টি। গার্ডেন লাগোয়া একটি দীর্ঘ ছাউনিতে আশ্রয় নিলাম। আমার মতো আরো অনেক পর্যটক বৃষ্টি থামার অপেক্ষায়। বাচ্চাকাচ্চাসহ মধ্যপ্রাচ্যের একটি পরিবারও আছে। হঠাৎ বাজ পড়ার শব্দে ছোট ছেলেটি ভয়ে চিৎকার করে উঠল। মা-বাবা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করছে এটা আসলে ভয় পাওয়ার মতো কিছু নয়। একান্তই প্রাকৃতিক ব্যাপার। বৃষ্টি একটু হালকা হতেই অর্কিড গার্ডেনের পথে পা বাড়ালাম।

উদ্যানটি উঁচু টিলার ওপর। দর্শনার্থীর সংখ্যাও একেবারে মন্দ না। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে আসার পর একটি বড় শেড চোখে পড়ল। একটি খুঁটির চারপাশে ফুলসমেত সুসজ্জিত টব। চারপাশে শুধু অর্কিড আর অর্কিড। বৃষ্টির জলে ধুয়ে-মুছে জৌলুস যেন আরো বেড়েছে। কোথাও কোথাও বিন্দু বিন্দু জল জমেছে পাপড়ির গায়ে। এই বাগানটিতে সর্বতোভাবে রঙের বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করা হয়েছে। মাটিতে বসানো টবগুলোতে নজরকাড়া রঙের বৈপরীত্য আছে। ফাঁকে ফাঁকে লাগানো একক অর্কিডের জৌলুস মূলত আধুনিক বিশ্বের উদ্যান ভাবনার অভিনব উপস্থাপন। এ ধরনের কনসেপ্ট উদ্যান বর্তমান দুনিয়ায় বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কারণ স্বল্প পরিসরে যথাযথভাবে অনেক কিছুই তুলে ধরা সম্ভব।

মালয়েশিয়ার এই অঞ্চলটি মূলত লেক গার্ডেন নামে পরিচিত। আর এই অর্কিড গার্ডেনটি তামান অর্কিড গার্ডেন নামেও পরিচিত। চারপাশেই বেশ কিছু উঁচু-নিচু টিলা। অর্কিড গার্ডেনের মুখোমুখি অবস্থানেই আছে কেএল বার্ড পার্ক। এসবের মধ্যে সুসামঞ্জস্য বজায় রেখেই তৈরি করা হয়েছে বাগান। অর্কিড বাগানটি নিরেট অর্কিড বাগান নয়, এখানে স্থান পেয়েছে দুই হাজার রকমের জবাজাতীয় গাছ, ৪০ ধরনের হ্যালিকুনিয়া ও বেশ কিছু জলজ ফুল। চারপাশে অর্কিডের এত বিপুল সমারোহের মধ্যেই যেন নামের সার্থকতা নিহিত। কাঠের খুঁটি থেকে শুরু করে জীবন্ত গাছপালা সর্বত্রই বিচিত্র রঙের অর্কিড ঝুলে আছে। সেই সঙ্গে ঝুলছে নানা ধরনের ফার্নও। কোথাও কোথাও আছে ভূমিজ অর্কিড। অতিরিক্ত তাপমাত্রা থেকে গাছগুলোকে বাঁচাতে কোথাও কোথাও শেড তৈরি করা হয়েছে। মাঝে মাঝে আছে সবুজ ঘাসের চত্বর। গাছগুলো জুতসই মতো ঝোলানোর জন্য বেশ কিছু মৃত গাছও বসানো হয়েছে। বাগানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চারপাশে চোখ রাখলে মনে হবে কোনো আলোকোজ্জ্বল রঙিন মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছি। অর্কিডের রঙ এমনই নজরকাড়া। অবশ্য রঙের বৈপরীত্য সৃষ্টির সর্বাত্মক প্রচেষ্টা এখানে লক্ষ্য করা যায়। ফাঁকে ফাঁকে স্থান পেয়েছে কিছু সাইকাস, ড্রাসিনা, রয়াল পাম, অ্যারিকা পাম ইত্যাদি। প্রায় ৮০০ প্রজাতির অর্কিড এ বাগানকে অলংকৃত করে রেখেছে। বাগানের উল্লেখযোগ্য অর্কিডগুলো হচ্ছে ব্লু-বার্ড, পালায়েনপসিস, নেটরাসি ডল, অক্সিডিয়াম টাকা, ডেনড্রোবিয়াম, ভেন্ডা (কয়েক রং), রিংকোস্টাইলিস রেসুটা, ম্যাজিক লণ্ঠন, ট্রাইডাকলি (আফ্রিকা), ইপিডেনড্রাম, গোল্ডেন ডেজ, অখিডিয়াম, সিমনস গোল্ড, ক্রাউন ফক্স ইত্যাদি।

শুধু প্রদর্শনীই নয়, এখান থেকে চারা ও ফুলও বিক্রি হয়। বাগানে প্রধানত দুই ধরনের অর্কিড পাওয়া যায়; বুনো ও সংকর জাতের। শেষোক্তটি উন্নত ফলনশীল হিসেবেই পরিচিত। আকর্ষণীয় বর্ণের হওয়ায় সারা বিশ্বের অর্কিড প্রেমিকরা এসব বাগানের নিয়মিত খোঁজখবর রাখে। অসংখ্য ভ্যারাইটির জবা ফুল উষ্ণমণ্ডলীয় বাগানগুলোর রানিস্বরূপ। এই ফুলই মালয়েশিয়ার জাতীয় ফুল। সেখানে এর স্থানীয় নাম ‘বাংগা রায়া’। মালয়েশিয়ায় সবচেয়ে বেশি অর্কিড দেখা যায় সেখানকার পাহাড় ও মিশ্র বনভূমিতে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে নেগারা ও ক্যামেরন হাইল্যান্ড। তা ছাড়া মাউন্ট কিনাবালুর সাবাহতেও অসংখ্য অর্কিড দেখা যায়। তবে সবচেয়ে বেশি অর্কিড দেখা যায় বৃষ্টিবহুল মিশ্র বনভূমিগুলোতে।

এ বাগানে প্রায় ৪০ প্রজাতির হ্যালিকুনিয়া পাওয়া যায়। এরা হ্যাংগিং লবস্টারক্লো বা প্যারট ফ্লাওয়ার নামেও পরিচিত। বর্ণবৈচিত্র্যও বেশ আকর্ষণীয়। আছে অনেক রং—কমলা, পার্পল, লাল, হলুদ, গোলাপি, সবুজ ইত্যাদি। কোনো কোনো ফুল বাকলের ভেতর অদৃশ্য থাকে। আমাদের দেশে এ ফুলগুলোকে ভুলবশত বার্ড অব প্যারাডাইস মনে করা হয়। আসলে বার্ড অব প্যারাডাইস আর হ্যালিকুনিয়ার মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। বার্ড অব প্যারাডাইস শীতের দেশগুলোতেই সহজলভ্য।

এক হেক্টর আয়তনবিশিষ্ট এই অর্কিড গার্ডেনটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৬ সালে। প্রদর্শনী এবং গবেষণা দুটিই এ বাগানের প্রধান উদ্দেশ্য। সারা বিশ্বে অর্কিডের ৫০ হাজার রকমফের দেখা গেলেও উষ্ণমণ্ডলীয় দেশগুলোতে মাত্র তিন হাজার প্রজাতির সন্ধান পাওয়া যায়। এই বাগানের একাংশে দৃষ্টিনন্দন সব জবা ফুল নিয়ে সাজানো হয়েছে হিবিস্কাস গার্ডেন, যার আয়তন ০.৯ হেক্টর। জবা ফুলের প্রায় পাঁচ হাজার প্রজাতিসমৃদ্ধ এই বাগান গড়ে ওঠে ১৯৮৯ সালের দিকে।

অর্কিড গার্ডেন থেকে হোটেলে ফিরে একটু ফ্রেশ হয়ে বিকেলে নিচে নেমে দেখি চারপাশে অসংখ্য মানুষ গিজগিজ করছে। এটি বাঙালিদের প্রিয় স্থান বুকেট বিন তাং। ফুটপাতে অনেক দোকান। এর মধ্যে খাবারের দোকানই বেশি। ফুটপাতের চা আমার বরাবরই পছন্দ। কিন্তু এখানে চা খাওয়ার কোনো পূর্বাভিজ্ঞতা নেই। তবু চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে। চায়ের সঙ্গে হালকা কিছু হলে আরো জম্পেশ হয়। সন্ধ্যা হতে আর খুব বেশি বাকি নেই। গাছতলার একটি দোকানে গিয়ে বসলাম। চায়ের অর্ডার দিয়ে চারপাশে তাকাতেই চোখে পড়ল কয়েকজন বাঙালি আমার পাশের টেবিলে বসে গল্প করছেন। পরিচয় হতে বেশি সময় লাগল না। একজন আমাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন ‘আপনি কি বাংলাদেশ থেকে এসেছেন?’ ব্যস, তারপর শুরু হলো।

গল্প আর শেষ হয় না। এই কথা, সেই কথা। দেশের অবস্থা কী, সরকার কী ভাবছে, মানুষ কী ভাবছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই জমে গেল তুমুল আড্ডা। একটু পরপরই চা আসছে, কাবাবও এলো এক ফাঁকে। প্রবাসে যাঁরা থাকেন তাঁদের ভেতর এক ধরনের স্বপ্ন থাকে। তাঁরা যে দেশে থাকেন সে দেশের উন্নয়ন ও আধুনিকতার সঙ্গে নিজের দেশকে মেলাতে চেষ্টা করেন। কিন্তু স্বপ্ন যখন বাস্তবতাকে অতিক্রম করতে পারে না তখন এক ধরনের হতাশায় আচ্ছন্ন হয় মন। বলেন, আমরা এখানে এত কষ্ট করি শুধু দেশের জন্য। কিন্তু দেশ কি আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারবে কখনো?


মন্তব্য