kalerkantho


প্র ব ন্ধ

চর্যাপদ : কালে কালোত্তরে

রাজু আলাউদ্দিন

২৫ জুন, ২০১৭ ০০:০০



চর্যাপদ : কালে কালোত্তরে

বাংলা কবিতার প্রাচীন নিদর্শন চর্যাপদর কালপর্ব, ভাষিক উৎস এবং এর ব্যাকরণিক সম্পর্ক নির্ণয়ে ঐতিহাসিক নিশ্চয়তামূলক যে পরিমাণ তথ্যের অধিকারী আমরা হতে পেরেছি, সেই তুলনায় এর সাহিত্যিক ও শিল্পমূল্যের উচ্চতা সম্পর্কে আলোচনা খুবই অকিঞ্চিত্কর। আরো আশ্চর্যের ব্যাপার, এই চর্যাপদ নিয়ে বিদ্যায়তনিক বৃত্তে এর শারীরতাত্ত্বিক আলোচনার প্রাচুর্য থাকলেও বাংলা ভাষার প্রথম সারির কবি ও কথাসাহিত্যিক, এমনকি প্রাবন্ধিকদের লেখায়ও চর্যাপদ নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা দেখা যায় না।

চর্যাপদর যা কিছু ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ আমরা দেখতে পাই, তা প্রায় পুরোটাই গবেষকদের সৌজন্যে। কিন্তু তাঁদের এসব গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ বহু তথ্য-উপাত্ত, পর্যবেক্ষণ ও টীকা-টিপ্পনী থাকলেও বিশ্বসাহিত্য ও ভাবুকতার বিশ্বদরবারে তার ঔজ্জ্বল্য কতটুকু কিংবা চর্যাপদর নান্দনিক গুরুত্ব আমাদের কাছে কেন আজও ঊর্ধ্বতন, এ নিয়ে আলোচনা তেমনটা চোখে পড়ে না। অথচ চর্যাপদ, শুধু প্রাচীনতম নিদর্শন বলেই নয়, এর আলংকারিক, ভাষিক, কাব্যিক ও দার্শনিক প্রবণতায় রয়েছে কালোত্তর সেই সব লক্ষণ, যা বিভাষী ও বিজাতি হৃদয়কেও অভিভূত করে।

অন্য এক লেখায় আমি বাংলা ভাষার এই আশ্চর্য ভাণ্ডারের প্রতি মেহিকান লেখক অক্তাবিও পাসের পক্ষপাতের কথা উল্লেখ করলেও চর্যাপদর তান্ত্রিক প্রেক্ষাপটের প্রতি তাঁর পর্যবেক্ষণ ও মন্তব্য তাতে অনুক্ত ছিল। অনুক্ত থাকার কারণ এ নিয়ে স্বতন্ত্র এক প্রবন্ধ লেখার অভিপ্রায়। আর পাসের পক্ষপাতের উল্লেখ করছি এই জন্য যে বাংলা কবিতা তিনি অনুবাদের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিলেন। তাঁর এই আকাঙ্ক্ষার কথা ‘Versiones y Diversiones’ গ্রন্থের ভূমিকায় যেমন পাওয়া যাবে, তেমনি সেই অভিপ্রায়ের প্রতিধ্বনি শুনতে পাব কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তর সঙ্গে সাক্ষাতের অভিজ্ঞতায়ও : ‘কয়েক লহমায় যখন পাস-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল, তিনি এই মর্মে অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলেন, দ্বিভাষিক (বাংলা-স্পেনীয়) কবিতা পাঠের মাধ্যমে আরেকবার তিনি ভারতপথিক হবেন, শ্রোতাদের কাছে তাঁর প্রতিমা স্পষ্ট করে তুলবেন আরও। ’ (অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, ‘রিখিয়া থেকে অনেক দূরে’, অলকানন্দা পাবলিশার্স, ২০১২, পৃ. ৮৪)। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনুবাদ না করলেও বাংলা কবিতার আদি নিদর্শন সম্পর্কে তিনি নীরব ছিলেন না।

চর্যাপদ প্রসঙ্গে অক্তাবিও পাসের মন্তব্য, পর্যবেক্ষণ ও ব্যাখ্যায় প্রবেশের আগে ইউরোপীয় প্রধান ভাষার কবিতার আদি নমুনাগুলোর সঙ্গে চর্যাপদর ভিন্ন স্বভাবকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখে নেওয়াটা জরুরি। কারণ পাস চর্যাপদর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আমাদের সেই বৃহত্তর পরিসরে মূল্যায়নের দিকে ভার্জিলের মতো পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবেন।

আমরা সবাই জানি, যেকোনো ভাষার আদি নিদর্শন কবিতা। তবে বেশির ভাগ ভাষায়ই প্রারম্ভে কবিতা হলেও তা মূলত আখ্যান বা গাথানির্ভর ছিল। জার্মান ভাষার ‘হিল্ডেব্রান্ডসলিড’ (Hildebrandslied) বা ফরাসি ভাষার ‘কর্মগাথা’ (Chansons de geste) কিংবা ‘রোলাঁ গাথা’ (Chansons de Roland) আমাদের সেই সাক্ষ্যই দেয়। ফরাসি ভাষায় ত্রুবাদুরদের হাতেই প্রথম লিরিকের জন্ম হলো। অন্যদিকে স্প্যানিশ ভাষায় কবিতার আদি নিদর্শন ‘মোসারাবিব গীতি’ বা ‘হার্চা’র জন্ম হয়েছিল ফরাসি ত্রুবাদুরদেরও আগে, দ্বাদশ শতকে। ইউরোপীয় জীবিত ভাষাগুলোর মধ্যে একমাত্র স্প্যানিশই লিরিকের আদি জন্মদাতা হিসেবে গৌরবের দাবিদার।

এদিকে গোটা ভারতীয় উপমহাদেশে লিরিকের প্রথম জন্মদাত্রী হচ্ছে বাংলা ভাষা এবং চর্যাপদ এই ভাষার প্রথম কাব্যসন্তান। প্রাচীনতার বিচারে চর্যাপদ ইউরোপের জীবিত ভাষাগুলোর আদিতম লিরিকগুলোর পূর্বসূরি। অন্যদিকে ভারতের সেই সময়ে উপেক্ষিত ও নিম্নবর্গীয় এই ভাষায় রচিত লিরিকের প্রভাবেই জন্ম হয়েছিল the late Vaishnavite sanskrit and vernacular songs in one hand, and the Persian ghazals on the other. (Buddhist mystic songs, Dr. Muhammad Shahidullah, Bengali Academy, Revised and Enlarged Edition 1966)

প্রভাবসঞ্চারী এসব ঐতিহাসিক ভূমিকা ছাড়াও চর্যাপদর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য এর বহুস্তরী অর্থের ব্যঞ্জনা, যা স্প্যানিশ হার্চার মধ্যে নেই। হার্চায় নেই সুগভীর, এমনকি অগভীর কাব্যবোধও, এগুলো স্প্যানিশ ভাষার প্রধান কবি পেদ্রো সালিনাসের ভাষায়, very  simple little songs, এতে নেই চর্যাপদর মতো উপমা ও রূপকের আলংকারিক প্রাচুর্য। হার্চার মূল সৌন্দর্য এর সারল্য ও গীতলতা। অন্যদিকে চর্যাপদর মূল সৌন্দর্য বাচ্যার্থের প্রচ্ছন্নতায়, দার্শনিকতা ও তান্ত্রিক সাধনাকে উপমা ও রূপকের আশ্রয়ে প্রকাশের জটিলতায়। আর এর আত্মা সতত স্পন্দিত কাব্যের সৌন্দর্যবোধ দ্বারা। গোটা ইউরোপের কোনো ভাষায়ই উষালগ্নের লিরিক কবিতায় এর সমতুল্য নজির নেই। ইউরোপের অন্যান্য ভাষায় রচিত প্রাচীন কাব্য নিদর্শনের সঙ্গে চর্যাপদর আরো একটি বড় পার্থক্য এই যে ইউরোপীয় প্রাচীন কবিতাগুলো যেখানে যুদ্ধ, অভিযান কিংবা প্রেমাশ্রয়ী; চর্যাপদ সেখানে প্রেম নয়, বরং শরীরী অভিব্যক্তিকে আশ্রয় করেছে তান্ত্রিক সাধনার উপায় হিসেবে। অক্তাবিও পাসের ভাষায় : ‘আমরা যাকে প্রেম বলি তন্ত্রবাদ সে সম্পর্কে পুরোপুরি অজ্ঞ, তার যৌনকামনা হচ্ছে এক ধরনের ধর্মীয় আচার। ’ (Octavio Paz, Conjunciones y disyunciones, Editorial Joaquin Mortiz, Mexico, Febrero 1986, P 80)। অর্থাৎ প্রেম ও আখ্যাননির্ভরতা যে সময় প্রায় সব ভাষার ক্ষেত্রেই ছিল ধ্রুবাচার,  চর্যাপদ সেই পথ এড়িয়ে প্রবেশ করেছিল দেহের জটিল অরণ্যে, কায়া যেখানে ‘তরুবর পঞ্চবি ডাল’। (চর্যা-১), যেখানে পরস্পর আলিঙ্গনে প্রস্ফুটিত (তিঅড়া চাপী জোইনি দে অঙ্কবালী, চর্যা-৪), যেখানে একে অপরকে চুম্বন করে কমলরস পানে (তো মুহ চুম্বী কমলরস পীবমি, চর্যা-৪) তৃপ্ত হয়। চর্যাপদগুলোতে দেহ ফিরে এসেছে বারবার কামজ বাসনা নিয়ে আর প্রতিবারই তা অর্থের নতুন ব্যঞ্জনায় উদ্ভাসিত :

ভনই গুণ্ডরী আমহে কুন্দুরে বীরা

নরঅ নারী মাঝে উভিল চীরা (চর্যা-৪)

দেহ নারী বিহরই একারে (চর্যা-১১)

পাঞ্চ তথাগত কিঅ কেডুয়াল।

বাহহ কাঅ কাহ্নিল মাআজাল। (চর্যা-১৩)

কাহ্নে গাই তু কাম চণ্ডালী।

ডোম্বি তো আগলি নাহি ছিনালী (চর্যা-১৮)

ডোম্বী-এর সঙ্গে জো জোই রত্ত।

খণহ ন ছাড়ই সহজ উন্মত্ত। (চর্যা-১৯)

বতিস জোইনী তসু অঙ্গ উল্লসিউ (চর্যা-২৭)

সবরো ভূঅঙ্গ নইরামনি দারী পেম্ম রাতি পোহাইলী (চর্যা-২৮)

মহাসুহে বিলসন্তি সবরো লইয়া সুণ মেহেলী    (চর্যা-৫০)

সন্দেহ নেই যে দৈহিক সম্ভোগের বিষয়টি চর্যাগীতিতে এসেছে তান্ত্রিক ঐতিহ্যের সূত্রে, কিন্তু বাংলা কবিতার এই আদিম দেবতারা শরীরী সম্ভোগকে সংস্কারের ঊর্ধ্বে তুলে ধরে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। অর্থাৎ এসব কবিতা সরাসরি প্রবেশ করেছে শরীর ও কামের উষ্ণ পরিমণ্ডলে। পৃথিবীর অন্য কোনো প্রাচীন লিরিকে শরীরী সংরাগ উন্মোচনের এমন নজির দুর্লভ।

চর্যাপদ শুধু আধেয়-বৈভবেই নয়, এর আলংকারিক নৈপুণ্য ও বাচনিক কুশলতা বাস্তব ও বিভ্রমকে অভিন্ন কররেখায় নাগরিকত্বদানের দার্শনিক প্রতীতি বয়ানেও কালোত্তর হয়ে উঠেছে। ‘উদক চান্দ জিম সাচ না মিচ্ছা’ (জলের চাঁদ যেমন না সত্য না মিছা। (চর্যা-২৯)

জ্ঞানতাত্ত্বিক ইতি ও নেতির এই পরস্পরবিরোধী বিশ্বাসকে বন্ধনের মাধ্যমে চর্যাপদ বাস্তবের অদৃশ্য স্তরকে আবিষ্কারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। আলংকারিক সৌন্দর্যে মোড়ানো ভাবুকতার বিরল দীপ্তি নক্ষত্রের মতো বিকিরিত হতে দেখি চর্যাপদর শরীর থেকে। চর্যাপদর প্রবাদপ্রতিম একটি পঙিক্ত হচ্ছে, ‘অপনা মাংসে হরিণা বৈরী’, আরেকটি প্রবাদপ্রতিম নয় কিন্তু আলংকারিক বিবেচনায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ : ‘জোইনি জালে রঅনি পোহাই’।   প্রথম উদ্ধৃতিটিতে ব্যক্তির সৌন্দর্য ও দৌলত যে নিজেরই বিনাশের বীজ হয়ে ওঠে তা এই চিত্রকল্পটি অসামান্য সহজতায় তুলে ধরা হয়েছে। দ্বিতীয় উদ্ধৃতিটিতে আমরা এমন একটি রূপকের মুখোমুখি হচ্ছি, যার কাব্যিক সুষমা আমাদের অভিভূত না করে পারে না। আধুনিক বাংলায় এই বাক্যের আদল আমাদের কাছে এ রকম : যোগিনীর জালে (কিংবা জোনাকিজালে) রজনী পোহায়। ‘জোনাকিজালে রজনী পোহায়’—এই রূপকটি আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় বোর্হেস কর্তৃক প্রশংসিত নর্স (Norse) কবিতায় ব্যবহৃত এক রূপক :

The web of men।   যুদ্ধের প্রতিনিধিত্বকারী এই রূপক সম্পর্কে বোর্হেসের রূপতাত্ত্বিক ভাষ্যটি হাজির করলে আমাদের কাছে জোনাকির জালের রূপকটির সৌন্দর্য আরো বেশি উন্মোচিত হবে :

“‘জাল’ শব্দটি এখানে আসলেই চমৎকার, কারণ জাল ধারণাটির মধ্যে আমরা পাচ্ছি মধ্যযুগীয় যুদ্ধের কাঠামো। আমাদের আছে তরবারি, আছে ঢাল, আছে পরস্পরাভিমুখী যুদ্ধাস্ত্র। জীবন্ত প্রাণসত্তা দিয়ে তৈরি হওয়ার কারণে জালের একটা দুঃস্বপ্নময় স্পর্শও আছে এতে। ‘মানুষের জাল’ : মানুষের জাল হচ্ছে তারাই, যারা মরছে এবং একে অন্যকে হত্যা করছে। ”

 (Jorge Luis Borges, This craft of verse, Harvard university press, 2000, P-38)

জোনাকির বিন্দু বিন্দু আলোয় রচিত এক জালের কল্পনার মাধ্যমে কবির সৌন্দর্যচেতনা রাতকে শুধু অন্ধকার থেকে মুক্তই করেনি, একই সঙ্গে তা   অলংকৃতও করেছে।

চর্যাপদই হচ্ছে বিশ্বের একমাত্র প্রাচীন কবিতা, যা সরাসরি তান্ত্রিক দর্শনকে আশ্রয় করে গড়ে উঠেছিল। তান্ত্রিক নিয়মাবলি আড়ালে রেখে দর্শনপ্রবণ হয়ে ওঠার মধ্যে মুক্তি খুঁজেছিল চর্যাপদ। যে নিহিলিজম (Nihilism) পশ্চিমে ঊনবিংশ শতকে চিন্তাজগতে আলোড়ন তুলেছিল, তা এই ভূখণ্ডে নাগার্জুন, মােসন্দ্রনাথ প্রমুখর শূন্যতাবাদের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। এমনকি তা আবিষ্ট করেছিল চর্যাপদর কোনো কোনো কবিকেও, বিশেষ করে সরহ ও কনহকে।

Both the two kanha and Saraha are, in fact, Nihilists. As for the ‘madhyamika’ Philosophers, nothing is existing, neither bhava the existance ‘nor nirvana’  annihilation’,      neither bhava the being ‘nor abhava’ ‘the non-being.’

The verity is innate (sahaja), i.e. the      ‘nothingness.’ The Vedas, the Puranas, the      traditions, the didactic treatises, in fact, in all the sciences are useless for teaching of the truth. The teacher can only indicate it, but nothing can explain it, because it is beyond the pathway of words. (M. Shahidullah, The mystic songs of Kanha and Saraha the Doha Kosa, translated by Pranabesh sinha Roy published by the Asiatic society 2007, P 16-17)

শুধু কনহ ও সরহই নন, চর্যাপদর আরেক কবি কৃষ্ণাচার্যপাদানাম নিহিলিজমকে আরো ব্যাপক ও প্রগাঢ় করে তুলেছেন যখন বলেন, ‘স্বপণে মই দেখিল তিহুবণ সুণ,/ঘোরিঅ অবণাগবণ বিহুণ (স্বপ্নে মুই দেখিলাম ত্রিভুবন শূন্য,/ঘুরিয়া আনাগোনা বিহীন। ’ চর্যা-৩৬) চর্যাপদ দার্শনিক দৌলতে যতটা ঐশ্বর্যময়, ঠিক ততটাই ঋদ্ধ ভাষা সম্পর্কিত দার্শনিক ভাবুকতায়। সন্দেহ নেই, এই ভাবুকতার বীজ সে নিয়ে এসেছে বুদ্ধের দর্শন থেকে। ভাষাকে আমরা সব কিছু প্রকাশের মাধ্যম ভাবলেও এমন কিছু বিষয় আছে, যা প্রকাশ করতে গিয়ে আরো দুর্বোধ্য, জটিল ও অর্থহীনতার প্রান্তে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে। শহীদুল্লাহ চর্যার কবিদের তান্ত্রিক সাধনা ও জীবনাচরণের ভাষিক প্রকাশের সীমা ও সীমাবদ্ধতার হদিসটি জানাতে ভোলেননি তাঁর গবেষণাকর্মে :

noting can explain it, because it is beyond the pathway of words. লক্ষ করব কিছু প্রশ্নের জবাবে, যেমনটা আমরা বুদ্ধ সম্পর্কিত কাহিনিগুলো থেকে জানি, বুদ্ধ ছিলেন নীরব। কেন নীরব ছিলেন তার এক গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে অক্তাবিও পাস বলেছিলেন :

‘বুদ্ধ এর জবাব দেননি কারণ কিছু বিষয় আছে যেগুলো সম্পর্কে কথা বলা সম্ভব নয় বরং নীরব থাকাই শ্রেয়। শব্দরা দ্বান্দ্বিক : একটাকে ইতিবাচক করতে গেলে অন্যটি হয়ে পড়ে নেতিবাচক। এমন এক মুহূর্ত আছে যখন কোনো কিছুকে ইতিবাচক বা নেতিবাচক করা সম্ভব নয় কিংবা আরো ভালোভাবে বললে দাঁড়ায় যখন ইতিবাচক ও নেতিবাচক, অর্থ ও অর্থহীনতা পরস্পর সহাবস্থান করে বা পরস্পরকে নিরপেক্ষ করে তোলে। এটাই হতে পারে বুদ্ধের নীরবতার অর্থ।

‘আমি মনে করি অর্থ ও অর্থহীনতা এসব হচ্ছে ভাষিক ফাঁদসমূহ এবং নীরবতা ভুয়া এই বিয়োজককে দ্রবীভূত করে দেয়। কিন্তু শব্দের পরেই রয়েছে নীরবতা। বা বলা যায়, জানার পর যা রয়েছে এটা তাই। ’

 (Elena Poniatowska, Octavio Paz : las palabras del arbol, plaza Janez 1998, P 109-110) অক্তাবিও পাস এই নীরবতার কারণকে সংক্ষিপ্ত রূপে প্রকাশ করেছেন ‘জেনে না-জানা’ (un no saber sabiendo) রূপে।

ব্লায়েস পাস্কাল সন্ত্রস্ত ছিলেন বিপুল শূন্যতা ও নীরবতায়। এই সূত্রে আমাদের মনে পড়বে তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তি :

 The eternal silence of these infinite space frightens me.

বুঝতে অসুবিধা হয় না যে পাস্কালের এই নীরবতার উৎস বহির্জগতের অসীমতা। কিন্তু মানুষের অন্তর্জগতেরও রয়েছে অনুরূপ অসীমতা, যেটা সম্পর্কে ভাষিক প্রকাশ যথাযথতার পরিবর্তে বরং আরো জটিল ও দুরূহ, আরো বেশি দূরবর্তী ও গোলকধাঁধাময় হয়ে ওঠার আশঙ্কায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। আমাদের অন্তর্জগতের নির্জন এক প্রকোষ্ঠের বাসিন্দা প্রজ্ঞার এমন কিছু উপলব্ধি আছে, যা unsayable, অকহতব্য। কবিতা তার অতিসংবেদনশীলতার কারণে ভাষার এই অক্ষমতাকে যতটা বুঝতে পারে, জ্ঞানের অন্য কোনো মাধ্যম ততটা অনুভব করে না। প্রজ্ঞার এক বিশেষ উপলব্ধিকে যে ভাষা খুব বেশি দূর এগিয়ে নিতে পারে না চর্যাপদর কবি কাহ্নপাদানাম হাজার বছর আগে ঠিক এই উপলব্ধিটা করেছিলেন :

আঁলে গুরু উএসই সীস

বাক পথাতীত কহিব কীস

জেতই বোলী তেতবি টাল

গুরু বোব সে সীসা কাল (চর্যা-৪০)

 

শহীদুল্লাহ চর্যার এই অশংটুকু ইংরেজি অনুবাদ করেছেন এভাবে :

 How can he speak of the which is beyond the reach of the way of speech? The more it was said, the more it was subterfuge. The guru is dumb, the disciple is deaf. কাহ্নপার এই উপলব্ধির সূত্রে আমাদের মনে পড়বে অস্ট্রীয় জার্মানভাষী দার্শনিক লুডভিগ ভিটেগন্সটাইনের ভাষা সম্পর্কিত সেই উদ্বেগের কথা, যার মূলে রয়েছে কখনো কখনো অর্থের বিমুখতা কিংবা অর্থ নীরবতায় গিয়ে মুখ লুকিয়ে ফেলতে চায়।

ভিটেগন্সটাইন জীবদ্দশায় প্রকাশিত Tractatus Logico-Philosophicus গ্রন্থে দর্শনের এমন কতগুলো কেন্দ্রীয় সমস্যার মোকাবেলা করেছেন, যার মূলে রয়েছে জগৎ, ভাবনা ও ভাষা। সাতটি মৌল প্রস্তাবনার মাধ্যমে তিনি সমস্যাগুলোর মোকাবেলা করেন। যেহেতু এ আলোচনায় প্রাসঙ্গিক নয়, তাই সবগুলোর উল্লেখ না করে এখানে শুধু আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক প্রস্তাবনাটা উল্লেখ করছি, যা কাহ্নপার চর্যাটির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। ভিটেগন্সটাইনের প্রবাদতুল্য উক্তিটি ছিল এ রকম :

‘what we can not speak about we must pass over in silence.’ (Ludwig Wittgenstein, Tractatus Logico-Philosophicus, Routledge 1974. (P-89)

এটি যদিও মূল সাতটি প্রস্তাবনার অন্তিম, কিন্তু এই শেষ প্রস্তাবনাটিই তাঁর দর্শনের অন্যান্য প্রস্তাবনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এবং দর্শনের যে একটা প্রধান সমস্যা ভাষা ও অভিপ্রকাশ তা ভিটেগন্সটাইনের  আগে পশ্চিমে এমন করে ভাবা হয়নি। ভিটেগন্সটাইনের দর্শনে এটি প্রায় এক কেন্দ্রীয় বিবৃতি হয়ে আছে। Tractatus-এর ৪ নম্বর প্রস্তাবনা ও তার অনুচ্ছেদগুলোর দিকে তাকালেই আমরা বুঝতে পারব কেন তা কেন্দ্রীয় :

4.   A thought is a proposition with a sense.

4. 001 The totality of propositions is         language.

এর পরের অনুচ্ছেদেই ভিটেগন্সটাইন বলছেন যে It is not humanly possible to gather immediately from it what the logic of language is. কেন সম্ভব নয়, তার কারণ হিসেবে তিনি জানাচ্ছেন যে language disguises thought. So much so that the outward form of the clothing it is impossible to infer the form of the thought beneath it, because the   outward form of the clothing is not designed to reveal the form of the body, but for entirely   different purpose.

তাহলে প্রশ্ন উঠবে স্বাভাবিকভাবেই, এত দিন যে ভাষাকে আশ্রয় করে দার্শনিকদের ভাবুকতার প্রকাশ ঘটেছে তা কি অর্থহীন? তার সবটাই কি ব্যর্থ তাহলে? আশ্চর্য হলেও সত্য যে ভিটেগন্সটাইন ঠিক এই সন্দেহটাই উসকে দিয়েছেন। পরের অনুচ্ছেদেই তিনি খোলাখুলি জানিয়ে দিলেন সন্দেহজাত সেই অনর্থের কথাও :

most of the propositions and questions to be found in philosophical works are not false but nonsensical. Consequently we cannot give any answer to questions of this kind, but can only point out that they are nonsensical. (Ludwig Wittgenstein, Tractatus Logico-Philosophicus Translated by D. F. Pears and B. F. McGuinness, Routledge, Revised edition 1974,  p 22-23)

কাহ্নপাও ভাবনার এমন এক দশার ইঙ্গিত দিয়েছেন তাঁর কবিতায়, যা অকহতব্য (unsayable), কেননা তা ‘বাক পথাতীত’। দার্শনিকদের মতো যদি এই অকহতব্যকে বলতে যাওয়া হয় তাহলে তা অনর্থবোধক (Nonsensical) হতে বাধ্য। ‘কারণ জেতই বোলী তেতবি টাল’ হবে, অর্থাৎ ভাষার চাতুরী (টাল) হয়ে উঠবে। আর ভাষার চাতুরী আর যা-ই হোক, তা শেষ পর্যন্ত কোনো অর্থকেই প্রকাশ করতে পারছে না, যেহেতু ভাষাটা হচ্ছে এ ক্ষেত্রে ভিটেগন্সটাইনের বয়ানে ‘দেহ’ রূপী নিহিত ‘ভাবনা’র পোশাক মাত্র, আর এই পোশাকটি এমনভাবে ‘তৈরি’ (designed) করা হয়নি, যা পোশাকের আড়ালে থাকা ‘দেহ’টিকে প্রকাশ করতে পারে। আর ভিটেগন্সটাইনের মতে বেশির ভাগ দার্শনিক সেই ‘দেহ’টি উন্মোচন করতে গিয়ে জন্ম দিয়েছেন অনর্থের (Ninsensical)। সুতরাং যে সম্পর্কে বলা যায় না, সে সম্পর্কে নীরব থাকাই উচিত (what we can not speak about we must pass over in silence)।

চর্যার কবি কাহ্নপা ভিটেগন্সটাইনের বহু আগেই ভাষা ও ভাবনার মধ্যকার এই অসমঝোতাকে উপলব্ধি করেছিলেন খুবই গুরুত্বের সঙ্গে। দার্শনিকের মতো অনর্থের বিস্তার ঘটানোর পরিবর্তে কাহ্নপা আমাদের সতর্ক করে দিলেন এই বলে যে এ বিষয়ে নীরব থাকাই বরং শ্রেয়, কারণ তা না হলে ভাষার মায়াবী ফাঁদে পড়ে হয়ে উঠতে হয় অনর্থের স্রষ্টা। কবি ও দার্শনিক এক অভিন্নকে উপলব্ধি করলেও দার্শনিক বলার মধ্য দিয়ে না-বলার অন্ধকারকে পুঞ্জীভূত করে তোলেন, অন্যদিকে কবি ‘ঘন যামিনীর মাঝে’ এক ‘না-বলা বাণী’কে বাঙ্ময় করে তোলেন।

আমরা একটু উত্কর্ণ হলেই লক্ষ করব স্বদেশি ও বিদেশি ভাষায় আধুনিক মনীষার সেই সব হিরণ্ময় উচ্চারণ ও উপলব্ধি, যা চর্যাপদর সমধর্মিতায় স্থিত। চর্যাপদ বাগৈশ্বর্যের গুণে আমাদের আধুনিক মনীষার কোনো কোনো শিল্পিত স্বভাবের যে অজ্ঞাত পূর্বসূরি হয়ে আছে তার একটা নমুনা দেখা যাবে ডেন্ডনপায়। ডেন্ডনপা যখন তাঁর এক কবিতায় চিরচেনা বাস্তবকে উল্টো করে হাজির করেন তখন তা আমাদের কীটদষ্ট সময়েরই ভাষ্য হয়ে ওঠে :

জো সো বুধী সোহি নিবুধী।

জো সো চোর সোহি সাধী (চর্যা-৩৩)

হাজার বছরের ব্যবধানে ডিলান টমাস কিংবা জীবনানন্দ দাশও কি একই রকম সমান্তরাল ভাষ্য নিয়ে হাজির হন না ইতি ও নেতির পারস্পরিক অর্থের বিনিময় ঘটিয়ে, অনেকটা কূটাভাসের আশ্রয়ে? :

So the blind man sees best

অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ

যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা

যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই, প্রীতি নেই করুণার আলোড়ন নেই

পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।

কিংবা ধরা যাক ইয়েটসের The second coming কবিতাটি, যার পরতে পরতে উপরোক্ত চর্যারই দীর্ঘশ্বাস ঘনীভূত হয়ে আছে ঈষৎ ভিন্ন বর্ণ ও প্রকরণে :

Mere anarchy is loosed upon the world,

The blood-dimmed tide is loosed, and   everywhere

The ceremony of innocence is drowned;

The best lack all conviction, while the worst

Are full of passionate intensity.

কুটিল বাস্তবতা ও সভ্যতার ক্ষতগুলো উন্মোচনের মাধ্যমে চর্যাপদর কবিকুল ও আধুনিককালের ডিলান টমাস, জীবনানন্দ, ইয়েটস প্রমুখ মিলিত হন উপলব্ধির অভিন্ন এক উপত্যকায়। এমনকি শেকসপিয়ারও কখনো কখনো হয়ে ওঠেন তাঁদের সমধর্মী যখন ভাদেপাদানাম বলেন :

পেখমি দহদিহ সব্বহি সুন।

চিএ বিহুন্নে পাপ না পুন। । (চর্যা-৩৫)

শহীদুল্লাহকৃত এর ইংরেজি তর্জমায় নিকটবর্তী আদলটি হবে এ রকম :

I see that all the ten directions are void.

Without the mind there is neither sin nor virtue.

পাঁচ শ বছরের ব্যবধানে শেকসপিয়ারকে একই প্রতিধ্বনি করে বলতে শুনব :

for there is nothing either good or bad, but thinking makes it so.

কালের উজান ঠেলে চর্যাপদর কবিরা কালোত্তর স্বভাবগুণে সমকালীন হয়ে আছে আজও। আর সম্ভবত এ কারণেই মেহিকোর অসামান্য কবি ও প্রাবন্ধিক অক্তাবিও পাসকে আকৃষ্ট করেছিল চর্যাপদ।


মন্তব্য