kalerkantho


গল্প

জাদুকরের অন্নদায়

হাসান আজিজুল হক

২৫ জুন, ২০১৭ ০০:০০



জাদুকরের অন্নদায়

অঙ্কন : শামীম আহমেদ

লোকটা স্কুল বোর্ডিংয়ের উত্তর-দক্ষিণ লম্বা বারান্দার এক কোণে চুপ করে বসে ছিল। গাঁয়ের লোক তো নয়ই, আশপাশের কোনো গাঁয়ের বলেও মনে হয় না।

মাঝেমধ্যে অদ্ভুত কিছু কিছু মেয়ে পুরুষ বাচ্চার দঙ্গল গ্রামে আসে বটে, কিন্তু গ্রামে ঢোকে না। তারা গ্রামের বাইরে কোনো সমতল জমিতে ছেঁড়াখোঁড়া তাঁবুঘরের মতো বানিয়ে নিয়ে বসবাস করতে শুরু করে। আমরা তাদের বেদের দল বলেই মনে করতাম; কিন্তু তারা সাপ নিয়ে মোটেই আসত না। প্রায়ই দেখতাম, তাঁবুর মুখে বসে এক প্রৌঢ়া আর এক বৃদ্ধার চুলের উকুন বাছছে কিংবা যুবতী মেয়ে মানুষ বুক উদোম করে নিঃসংকোচে তার সন্তানকে দুধ খাওয়াচ্ছে। বুঝতে পারি, পুরুষদের ভূমিকা এদের সমাজে নেই বললেই চলে। যা করার মেয়েরাই করে। এরা কিন্তু সাপ খেলাত না, এদের কাছে সাপও থাকত না। সাপুড়েরা বিষাক্ত সাপ কালকেউটে, গোখরা, চন্দ্রবোড়া—এই সব সাপ নিয়ে খেলা দেখাতে বাড়িতে বাড়িতে যেত। যেমন পোষা বাঁদর নিয়ে কেউ কেউ আসত বাঁদরের খেলা দেখাতে। ভল্লুকও দেখেছি। তাদের পাঁচ মিনিট পর পর কম্প দিয়ে জ্বর আসত। আর আসত পাখমারাদের দল। এরা যেমন পাখি শিকারে দক্ষ, তেমনি নিষ্ঠুর। খুব উঁচু গাছের মাথায় বসে আছে একটা সাদা বক। সেই গাছতলাটায় গিয়ে দু-তিনজন পাখমারা কিছু নল হাতে নিয়ে দাঁড়াত। একটা নলের মাথায় খুব ধারালো ফলা বসানো আছে। সেটার তলার খাঁজে আরেকটা নল মুহূর্তে লাগিয়ে দেওয়া হলো। তার তলায় আরেকটা, তারপর একটার পর একটা নল লাগানো হচ্ছে আর গাছের মাথা বরাবর লম্বা হচ্ছে। পাখিটা কিন্তু কিছু বুঝতে পারছে না। দরকারমতো শেষ নলটা লাগিয়ে একজন ফলায় বিঁধে ফেলল পাখিটাকে। মুহূর্তে নামিয়ে আনল তাকে। এই সবটা কাজ করতে সময় লাগল এক বা দুই মিনিট। এদের দলটাকেই পাখমারা বলা হতো। আরো আসত বাজিকরের দল আর স্কুলে স্কুলে একজন জাদুকর প্রফেসর।

বাজিকরদের একটা খেলা আমি দেখেছিলাম, সেটি আজও বিশ্বাস করতে পারি না। স্কুলের সামনের মাঠে একটি বাঁশ পুঁতে দেওয়া হলো। তারপর একটি দশ বা এগারো বছরের মেয়েকে তার ওপর উপুড় করে শুইয়ে দেওয়া হলো। এইবার মেয়েটির ওপর একটি সাদা কাপড় ঢাকনার মতো করে দেওয়া হলো। তারপর দু-তিনজন মিলে বাঁশটি যত দূর পারে মেয়েসুদ্ধ উঁচু করে ধরা হলো। এর পরই দেখা গেল, বাঁশটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। মেয়েটি শূন্যে দুই হাত ছড়িয়ে ভাসছে। কাপড়টা তার মাথার ওপর সাদা মেঘের মতো থমকে আছে। আমি খুব ভালো করে দেখেছিলাম, সে সত্যিই শূন্যে ভাসছে। সে যে শূন্যেই ভাসছে, তা বোঝানোর জন্য বাজিকররা দর্শকদের ডাকছিল এবং পরীক্ষা করতে বলছিল। দু-একজন এগিয়েও গেল। নাহ, শূন্যে ঝাঁকড়া চুলওয়ালা কিশোরীটি বাতাসে ভাসছে। সবার চক্ষুকর্ণের বিবাদ ভঞ্জনের পর বাঁশটি আবার তার পেটে লাগিয়ে তাকে নামিয়ে আনা হলো। শত চেষ্টা করেও কেউ কারচুপি বের করতে পারেনি। সত্যি এটা ঘটেছিল।

যে লোকটি একা চুপ করে বসে ছিল, সে কুচকুচে কালো, হালকাপাতলা গড়ন, মাথাভর্তি ঝাঁকড়া চুল, বয়স হয়তো পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ হবে। দেখলাম, কিছুক্ষণ পর একটি অতিশয় নোংরা শাড়ি পরা একজন মহিলা আর তার সঙ্গে একটি সাত-আট বছরের মেয়ে। মেয়েটি অকথ্য ভাষায় তার স্বামীকে গাল দিচ্ছে, আর তার সঙ্গে তার মেয়েটি ক্ষুধা বোঝানোর জন্য লোকটির হাত টেনে তার পেটে রাখছে। সঙ্গে সঙ্গেই লোকটি হাত ছাড়িয়ে নিচ্ছে। কী যে বলছে, সে-ই জানে! কিছুক্ষণ পর দেখলাম, ছোট মেয়েটিকে নিয়ে মেয়ে মানুষটি সেখান থেকে চলে গেল। তারা চলে গেলে আমি তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, সে কোথা থেকে এসেছে আর কেনই বা এসেছে। আমি তখন স্কুলে ক্লাস টেনে পড়ি। লোকটি বলল, তার নাম ব্রজেন সোরেন—কিছু চাল জোগাড় হয় কি না সেই চেষ্টায় সে এখানে এসেছে। তবে সে ভিক্ষা করে না। দু-একটা খেলা সে জানে। পাঁচ-ছয় সের চাল পেলে সে গ্রামের লোকদের কিছু খেলা দেখাত। আমি কি কোনোভাবে গাঁয়ের লোকদের এসব কথা বলে এখানে আনতে পারি? তার নিজের পেটেও এখন ভয়ানক খিদে। তবু সে আগে চাল বা পয়সা নেবে না। খেলা দেখানোর পর সের পাঁচেক চাল আর দু-একটা টাকা পেলে সে বেঁচে যেত। এসব কথা শুনে আমি দৌড়ে গাঁয়ের ভেতর ঢুকলাম। প্রথমে মুসলমানপাড়ায় গেলাম। তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বললাম, একবার দেখো এসে মজার খেলা। যাওয়ার সময় হাতে এক-আধ সের চাল আর দু-চারটা পয়সা নাও। কিছুক্ষণের মধ্যে গাঁয়ের হুজুগে লোকজন ও ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে সব এসে হাজির। লোকটিকে দেখে তাদের বোধ হয় তেমন ভালো লাগেনি। রোগা-প্যাকাটে চেহারা যদিও নয়, গায়ে তেমন জোর আছে বলেও মনে হয় না। দেখা গেল, সবার চাল একসঙ্গে করলে সের পাঁচেক হয়। আমি তখন তাকে বললাম, এই তো চালটাল সব এসে গেছে, এখন খেলা দেখাও।

সে বলল, একটা জ্যান্ত মুরগিও আনতে হবে। গাঁয়ের মুসলমানপাড়ায় তো মুরগি পোষা হয়। তখনই একজন নিয়ে এলো দড়িবাঁধা একটি মুরগি। বাজিকর বলল, দুজন লোক লাগিয়ে দাও কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়তে। ঠিক একটি কবরের মতো খুঁড়তে হবে। এ আবার কী খেলা দেখাবে রে বাবা। তখন দুজন জোয়ান মরদ হেতো কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়তে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই মাটি খোঁড়া হয়ে গেল। বাজিকর লোকটি তখন বলল, এই কবরের মধ্যে আমি হাঁটুতে মাথা দিয়ে বসে পড়ব। আমার ঠিকঠাক বসা হয়ে গেলেই ওই খোঁড়া মাটিগুলো দিয়ে পুরো গর্তটি একদম বুজিয়ে দেবে। দেওয়া হয়ে গেলে ওই বাবুর হাতে ঘড়ি রয়েছে, ঠিক দশ মিনিট হয়ে গেলে তোমরা কিন্তু মাটি সরিয়ে আমাকে তুলে আনবে। তারপর উঠে আমি খানিকটা জল খাব গুড় দিয়ে। এর মধ্যে তোমরা মোটা মোটা রসা এনে এখানে রেখে দাও। আমি তোমাদের আরেকটি খেলা দেখাব।

সব করা হলো। সে জল খাওয়ার খানিক পরে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, তোমরা এদিকে তিনজন এই রসা দিয়ে আমাকে বাঁধো। তারপর আমাকে শুধু একবার হেঁট হয়ে বসতে দিয়ো। এরপর মাটি থেকে ধুলা নিয়ে আমার এই মাথার চুলে ঘষতে থাকব। দেখবে আমার চুলগুলো কেমন ফুলে উঠেছে। মুরগিটি কাছে এনে রাখো। চুলে ধুলা মাখিয়ে উঠে দাঁড়ালে আমি তোমাদের বাঁধন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চেষ্টা করব। খবরদার, আমাকে ছাড়বে না, খেলা শেষ হয়ে গেলে আমি যখন একদম নেতিয়ে পড়ব, তখন বাঁধন খুলে দিয়ো।

বাজিকর যা যা বলল, সঙ্গে সঙ্গে সব করা হলো।    দড়িবাঁধা মুরগি গর্তের কাছাকাছি এনে রেখে দেওয়া হলো। বাজিকর ঠিক জায়গামতো হাঁটুতে মাথা দিয়ে বসে পড়ল আর ঝপাঝপ মাটিচাপা দিয়ে গর্তটি ভরে ফেলা হলো। একেবারে কবর হয়ে গেল লোকটার। ঘড়ি ধরে দশ মিনিট অপেক্ষা করা হচ্ছে। আমি ভাবছি, লোকটি নিশ্চয়ই এই দশ মিনিটের মধ্যে মারা যাবে। ওই দশ মিনিট যে আমার কিভাবে কেটেছিল, তা আজও মনে আছে। বুক ঢিপঢিপ করছে, সারা শরীর ঘামছে। দশ মিনিট মনে হতে লাগল অনন্তকাল। কী করে এই সব সরলসিধা মানুষগুলো একটি জ্যান্ত মানুষকে কবরে পুঁতে দিতে পারে! যা-ই হোক, অনন্তকাল মনে হলেও দশ মিনিট পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাটি সরিয়ে লোকটিকে তোলা হলো। তখন লোকটির দিকে আমি আর তাকাতে পারছি না। প্রথমে সে জল খেল গুড় দিয়ে। তারপর সে যেভাবে বলেছিল, সেখানে মোটা রশি দিয়ে বেঁধে এদিকে তিনজন আর ওদিকে তিনজন জোয়ান মানুষ তাকে ধরে রইল। সে বারবার মাটি থেকে ধুলা তুলে নিয়ে ঝাঁকড়া চুলগুলোতে ঘষে চুলগুলো ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তুলল। উঠে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে কী যেন বলল। আমি তখন দেখি, তার চোখজোড়া আগুনের ভাটার মতো জ্বলছে। একটু দেরি করে সে এমন একটা টান দিল যে ওই দুই দিকের ছয়জন জোয়ান তাকে ছেড়ে দেয় আর কি! এরপর সে বারবার বাঁধ ছেঁড়ার জন্য টান দিচ্ছে। অতি কষ্টে ছয়জন মিলে তাকে আটকে রাখছে। এই রকম একটি পাতলা রোগা মানুষের দেহে অত বল কোথা থেকে এলো। তারপর সে হ্যাঁচকা টান দিয়ে উবু হয়ে মুরগিটি তুলে নিল। মুহূর্তের মধ্যে মুরগিটির দুই পা ঠেলে সেটিকে দুই ভাগ করে ফেলল। এর পরেই সে ওটির মাথাসুদ্ধ খেতে শুরু করল। পালকটালক কিচ্ছু বাদ গেল না। মুরগিটির এক অংশ মাথা থেকে চিবোতে চিবোতে ডানা-পাখনা কিছুই বাদ না দিয়ে পায়ের নখগুলোসুদ্ধ খেয়ে ফেলল সে। তারপর বাকি ভাগটাও ওইভাবে খেয়ে নিল। এই অসুরের মতো শক্তি আর ওই রাক্ষুসে খিদের মুখে কাঁচা একটা আস্ত মুরগি ডানা, পালক, নখ—সবসুদ্ধ তার খাওয়া হয়ে গেল। আমি দেখলাম, যারা খেলা দেখতে এসেছিল, তারা কেউ কেউ টাকা দিয়েছে। কেউ কেউ ওখান থেকে সরে পড়েছে। আর একজন তো অজ্ঞান হয়ে চিত হয়ে শুয়ে পড়েছে। বালতি বালতি জল তার মাথায় ঢালা হচ্ছে। ওদিকে বাজিকর লোকটি তখন তার সমস্ত শক্তি হারিয়ে মাথা নিচু করে বসে আছে। তারপর উঠে গিয়ে পুকুরপাড়ে ঝুঁকে সবটা মুরগি বমি করে ফেলল। মাথার চুলগুলো ঝেড়ে নিল। মুখে একটু জল দিল, তারপর সে প্রথমে এসে যেখানে বসেছিল, সেখানে আবার গিয়ে বসল। আর খুব দুর্বল গলায় বলল, এই যে সের পাঁচেক চাল এনেছ তোমরা, সেটি ফিরিয়ে নিয়ে যাবে না তো? আমি এই চালটা পেলাম তো?


মন্তব্য