kalerkantho

গ ল্প

কল্পনার গল্প

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

২৫ জুন, ২০১৭ ০০:০০



কল্পনার গল্প

অঙ্কন : মাহবুবুল হক

কল্পনা আকতারকে যেদিন তিন যুবক অপহরণ করল, তার চার দিন আগে মুগদাপাড়ার মফিজ পাটোয়ারির সঙ্গে তার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। লোকে বলে পাড়ার একটি যুবকের সঙ্গে কল্পনার প্রেম ছিল, ওর হাত ধরেই পালিয়েছে।

অপহরণটা, যাকে বলে, সাজানো নাটক। হতেই পারে। দক্ষিণ গোড়ানের ঠাস বুনোট বাড়িঘরের কথা কে না জানে, যাদের যেকোনো দুটির মধ্যে দূরত্ব হয়তো চার ফুট এবং একটির বসার ঘর থেকে অন্যটির শোবার ঘর একেবারে বিছানা-বালিশ এবং সেগুলোর ব্যবহারকারীদের শুদ্ধ পরিষ্কার দেখা যায় সামান্য নেত্রপাতেই। কল্পনাকে হয়তো এ রকম অবধারিত এক নেত্রপাতে বিছানায় দেখেছে যুবকটি, যার শুধু একটি নামই আমরা জানি—ঠাণ্ডু। ঠাণ্ডু এক চ্যানেল টিভির পরিচালক। তার দৃষ্টি অপরিষ্কার।   সেই অপরিষ্কার দৃষ্টি দিয়ে সে কল্পনাকে দেখেছে। কল্পনা বিছানায় শুয়ে ছিল, শাড়িটা হাঁটুর ওপর। যাই হোক। চার + ছয় = দশ ফুট দূরত্বে সে অবস্থায় কল্পনাকে দেখে কেমন লেগেছিল ঠাণ্ডুর, তা নিশ্চয় আন্দাজ করতে পারেন।

কল্পনা প্রথমে বিয়েতে রাজি হয়নি। পরে মফিজ পাটোয়ারির ছবি দেখে মত বদলেছে। সুন্দর চেহারা। বাংলাদেশ বিমানে চাকরি করে। পরিবারটা শিক্ষিত, নিজেও। কিন্তু ঠাণ্ডু এ বিষয়টি জেনে খুব উত্তেজিত হয়েছে। সে বলেছে তার বন্ধু জুয়েল ও রাসেলকে, ‘এই বিয়া হইতে দিমু না। ’ পুলিশের কাছ থেকে এই তথ্য আমরা জোগাড় করেছি। কিন্তু পুলিশ যা জানেনি তা হলো, কল্পনার সঙ্গে ঠাণ্ডুর প্রচণ্ড বাগিবতণ্ডা। সেটি ঘটেছে আশুলিয়ার পূর্ণিমা চটপটি ঘরের কাছে, অপহরণের দিন বিকেলে। পুলিশের জ্ঞানের বাইরেই ছিল ব্যাপারটা, আগাগোড়া।

কেন, সে কথা পরে হবে।

কল্পনা অপহৃত হওয়ার পর তিনটি ঘটনা ঘটল। পরিবারে এক বিরাট শোকের মাতম শুরু হলো, বিপর্যস্ত পরিবারটি থানায় ঘটনাটি জানায় এবং পাটোয়ারির সঙ্গে কল্পনার বিয়ে ভেঙে গেল। বিয়ে ভেঙে যাওয়াটা স্বাভাবিক। মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে বউ হিসেবে এমন কোনো মেয়েকে কল্পনাই করতে পারে না, পরপুরুষের সান্নিধ্যে যে একবার মাত্রও গিয়েছে। মফিজ একটু মন খারাপ করল, কিন্তু ‘ঠিক আছে, যা হয়েছে, হয়েছে’—এ রকম একটা ভাব নিয়ে দুই হাত ঝেড়ে মঞ্চ থেকে বিদায় নিয়েছে। চরিত্র হিসেবে তার অনেক সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু কী আর করা। আপাতত তাকে বিদায় জানাতে হয়।   তার মতো ক্ষণজীবী চরিত্র কয়টা আছে গল্প-উপন্যাসে, কে জানে।

বিদায় মফিজ।

শোকের মাতমটা আরো স্বাভাবিক। কল্পনার নিরাপত্তা ও ইজ্জত নিয়ে কান্নাকাটি চলল। অপহৃত যখন হয়েছে, বিশেষ তিন যুবকের হাতে, তাতে তার ইজ্জত যে রক্ষা সম্ভব নয়, সে ব্যাপারে পরিবারটির কোনো সন্দেহ না থাকলেও অন্তত প্রাণে বেঁচে যাতে সে ফিরে আসে, সে আশায় কান্নাকাটির সঙ্গে দোয়া-দরুদ পড়া শুরু হলো। কল্পনার একটি ছোট বোন আছে, বিবাহযোগ্য। কল্পনার মতো সুশ্রী নয়। তারও একটা বিয়ের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু এখন, কল্পনার মতো, সে সম্ভাবনাও যে সুদূরপরাহত, তা বুঝতে কারো বাকি রইল না। এমনকি কল্পনা ফিরে না এলেও, অপহরণকারীদের হাতে মৃত্যুবরণ করলেও। ছোট বোনটির কান্নাকাটির প্রধান ওজনটা পড়ল এই অপসৃয়মাণ বিবাহ সম্ভাবনার ওপর। তার কান্নায় পরের বিষয়বস্তু কল্পনার ইজ্জত এবং তারও পরে কল্পনার প্রাণ।

থানায় একটি কেস দিতে চেয়েছিলেন কল্পনার বাবা আতিউর রহমান। কিন্তু থানা নিতে রাজি হলো না। আতিউর রহমান জানতে পারলেন, ঠাণ্ডু ছেলেটি স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী। সরকারি দলের এক নেতার আস্থাভাজন। তার বন্ধু, রাসেল, সম্পর্কে দারোগার ভাগ্নে। থানা শুধু একটা জিডি নিল। কিন্তু বাবার মন! আতিউর রহমান তাই মেয়েকে উদ্ধারের জন্য শরণাপন্ন হলেন প্রাইভেট গোয়েন্দা হায়দার আলীর। হায়দার আলী চৌকস গোয়েন্দা ছিলেন পুলিশের। কিন্তু খাগড়াছড়িতে থাকাকালীন ভয়ানক পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হলে স্বাস্থ্যগত কারণে চাকরিতে ইস্তফা দেন। এক সরকারদলীয় এমপির স্ত্রী হত্যাজনিত মামলায় সাফল্য লাভ করার মুহূর্তে তিনি খাগড়াছড়িতে বদলি হয়েছিলেন। থাক সে কথা। বছরতিনেক ভুগে, কিছুটা ভালো হয়ে, জীবন বাঁচানোর জন্য হায়দার আলী প্রাইভেট গোয়েন্দা হন। ইতিমধ্যে বেশ নামডাকও হয়েছে। তিনি বিশ হাজার টাকার বিনিময়ে কল্পনাকে খুঁজে বের করার জন্য রাজি হলেন। আতিউর রহমানকে বললেন হায়দার আলী, ‘স্যার, বাড়ি যান। থানা-পুলিশ করে লাভ নেই। আমি পুলিশে ছিলাম, আমি জানি। আপনার মেয়ের খবর আমি নিয়ে আসছি। দুটা দিন সময় দেন। ’

কিন্তু তার আগেই কল্পনা এসে হাজির। এসে এমন একটা ভাব দেখাতে থাকল, যেন কিছুই হয়নি। আশ্চর্য! ‘তোকে না ঠাণ্ডু আর তার বন্ধুরা অপহরণ করে নিয়ে গেল?’ কল্পনা হেসে বলল, ‘পাগল হয়েছ? ঠাণ্ডু ভাই?’ ‘কেন? পাড়ার লোকজন যে দেখল, তোকে একটা মাইক্রোবাসে তুলে নিল রাসেল ও অন্যরা?’ কল্পনা আবারও বলল, ‘পাগল হয়েছ? আমি উঠব কোনো মাইক্রোবাসে? নিশ্চয় অন্য কোনো মেয়ে। আমি গিয়েছিলাম ভালুকার পীর সাহেবের কাছে। ’ ‘আশ্চর্য, আমাদের বলে যাবি না? তা ছাড়া, কেন যাবি? বিয়ের চার দিন আগে?’ ‘স্বপ্নে দেখেছিলাম, বিয়েটা একটা অভিশাপ হয়ে আসছে আমাদের জন্য—গোটা পরিবারের জন্য। স্বপ্নটা কেন দেখলাম, এর কোনো সত্যতা আছে কি না, জানতে গিয়েছিলাম পীর সাহেবের কাছে। তিনি বললেন, বিয়েটা না হলেই ভালো। ’ কল্পনা হেসে হেসে, যেন বিরাট একটা ফাড়া থেকে মুক্তি পেয়েছে, সে রকম কথা বলতে লাগল। তাতে পরিবারের লোকজন হঠাৎ খুব আনন্দ পেতে থাকল। কল্পনার ছোট বোনের মনে হলো, আপুর তাহলে ইজ্জত যায়নি। আমার তাহলে বিবাহ হবে। সে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, ‘আপু, ঠাণ্ডু ভাই ইজ্জত নেয়নি তো?’

কল্পনা রেগে একটা থাপ্পড় কষাল বোনের গালে। ‘তোকে বলছি না, ঠাণ্ডু ভাইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্কই ছিল না এ কয়দিন? দেখাও হয়নি? আমি গিয়েছিলাম পীর সাহেবের কাছে? কথা কানে যায় না?’

থাপ্পড় খেয়ে মন খারাপ তো দূরের কথা, হেসেই বাঁচে না ছোট বোনটি। ইজ্জত লুট হয়নি আপার। কী আনন্দ। আমার বিবাহটা শেষ পর্যন্ত হবে—কী আনন্দ।

আতিউর রহমান লোক পাঠালেন ভালুকার পীর সাহেবের বাড়ি। হ্যাঁ, কল্পনা আকতার এসেছিল। হ্যাঁ তার স্বপ্নের বিবরণ শুনে তিনি বলেছেন, বিয়েটা মুলতবি করতে।

তাই বলে চার দিন পীর সাহেবের বাড়ি?

‘না, তা কেন হবে। দ্বিতীয় দিন ছিলাম হোসনা লাইজুর বাড়ি। গতকালও। মাঝখানের দুই দিন পীর সাহেবের পদতলে। ’

হোসনা লাইজুদের বাড়ি, অবশ্যই, ভালুকায়। লোক গেল সে বাড়ি। লাইজুর বাবা জানালেন, আতিউর রহমান সাহেব যেন পাটোয়ারির সঙ্গে কল্পনার বিয়ে না দেন। অভিশাপ বলে কথা। তিনি নিজেও কল্পনার সঙ্গে একমত।

হায়দার আলীকে ডেকে মনের আনন্দে পাঁচ হাজার টাকার একটা চেক ধরিয়ে দিয়ে বললেন আতিউর রহমান, ‘আপনার আর প্রয়োজন হবে না, হায়দার ভাই। এই টাকাটা রাখুন কৃতজ্ঞতার নিদর্শনস্বরূপ। ’

হায়দার আলী সবিনয়ে চেক ফেরত দিয়ে বললেন, ‘আমাকে কিছুই করতে হয়নি। কেন টাকা নেব। ’

তিনি চলেই আসতেন, কিন্তু জানালা দিয়ে নজর পড়ল ভেতরের বারান্দায়। সেখানে ঝুলছে একটা শাড়ি। শাড়িটার একটা জায়গায় বাদামি দাগ। তরকারির ঝোল হয়তো, অথবা ছলকে পড়া চা, অথবা, হ্যাঁ, শুকিয়ে যাওয়া রক্ত। হায়দার আলীর নাক বলল, শুকিয়ে যাওয়া রক্তই বটে, তবে প্রচুর ধোয়া হয়েছে। সাবান-জেট এসব দিয়ে। তার পরও তা রক্ত। হায়দার আলী জিনিসটা মাথায় রাখলেন।

দুই.

থানার দারোগা একদিন এলেন। সাত-আট দিন পর। ভাগ্নে রাসেলের কোনো খোঁজ নেই। খোঁজ নেই ঠাণ্ডু এবং জুয়েলেরও। প্রথমে সবাই ধরে নিয়েছিল তারা হয়তো কক্সবাজার গেছে। কেননা সেখানে সরকারি দলের যুব সংগঠনের ওয়ার্কশপ হচ্ছে। হাই ভোলটেজ ওয়ার্কশপ। মন্ত্রী-সাংসদ সবাই তটস্থ। কিন্তু ওয়ার্কশপ শেষ। সবাই ফিরেছে। ফিরেছে যে সে ব্যাপারটা থানাগুলো ভালোই বুঝেছে, তাদের প্রেসার আবার বেড়ে গেছে। দারোগা এরপর ভেবেছিলেন তারা হয়তো কলকাতা বেড়াতে গেছে। সেখানে রাসেল মাসে-দুমাসে একবার যায়। তার বস টপ সন্ত্রাসী বাইট্টা শামসু সেখানে আত্মগোপন করে আছে। রাসেল তাকে টাকা-পয়সা দিয়ে আসে। বাইট্টা শামসুর নামে চাঁদা আদায় করে রাসেল আর জুয়েল। দারোগা তাতে একটা ভাগ পান। তিনি কলকাতা ফোন করলেন। শামসু উদ্বিগ্ন হয়ে জানাল, না বস, রাসেল আসে নাই। তবে সে এও জানাল, কারওয়ান বাজারের সুজন হয়তো বলতে পারবে। তার সঙ্গে একসময় বন্ধুত্ব ছিল রাসেলের, তারপর শত্রুতা।

না, সুজনও জানে না। হলফ করে বলল সে, মৃত পিতার নামে।

ঘন ঘন কল্পনার বাড়িতে গিয়ে, কল্পনার সঙ্গে কথা বলেও কোনো লাভ হলো না। কল্পনার একই কথা, ঠাণ্ডু ভাই তাকে পছন্দ করত, কেন সে তাকে অপহরণ করবে? যে মেয়েকে মাইক্রোবাসে তোলা হয়েছে বলে বলা হচ্ছে, সে কল্পনা নয়। সে ইংরেজিতে বলল দারোগাকে ‘ফাইন্ড আউট দ্য গার্ল। ফাইন্ড আউট দ্য মাইক্রোবাসের ড্রাইভার। সব খবর জানা হয়ে যাবে। ’

সমস্যাটা ওইখানেই।

দারোগা যতই জিজ্ঞেস করেন রাস্তার পাশের দোকানদার আর ওই দিনের প্রত্যক্ষদর্শীদের, তারা বলে একটা মাইক্রোবাসে একটা মাইয়া উঠেছিল। কিন্তু সেই মাইয়া এই আফা কি না তারা বলতে পারে না। মাইক্রোবাসে কারা ছিল, তাও তাদের মনে নাই।

গোড়ান এখনো ‘সন্ত্রাসের জনপদ’ টাইটেল পায়নি। কিন্তু তাতে কি, মানুষগুলো তো আর হদ্দ বোকা না। ঠাণ্ডুর কথা আর রাসেলের কথা পুলিশকে জানালে কী বিপদ হয়, কে জানে। বোবার তো বরং শত্রু নেই।

দারোগার অনুসন্ধানের পথে এবার পাহাড় নামল। ওয়ার্ড কমিশনার মোটা মোতালেব খুন হলো, প্রকাশ্যে, বাজারের পাশে মসজিদের গলিতে। এই মামলা কেড়ে নিল তার সকল সময়। তিনি তাঁর শেষ ভরসা পাড়ার যুবনেতাদের এবং ঠাণ্ডু যে চ্যানেলে কাজ করত তার সাংবাদিকদের ডেকে বললেন, ওই কল্পনাই জানে, রহস্যটা কী, এইটা আমার বিশ্বাস। এই বলে তিনি মোতালেব হত্যা তদন্তে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।

এত দিন দারোগা দৃশ্যে ছিলেন, যুবনেতারা নিষ্ক্রিয় ছিল। এবার তারা সক্রিয় হলো। কিন্তু কল্পনা তাদের সঙ্গে মিষ্টি ব্যবহার করে, ভেজা চোখ মেলে, খুব প্রাণময় কথা বলে, এই সত্যটা প্রতিষ্ঠা করল যে ঠাণ্ডু ভাইয়ের জন্য বিয়েটা সে ভেঙেছে, তার প্রতীক্ষায় এখনো সে বসে আছে, বসে থাকবে সারা জীবন। নেতারা কী করবে! এক পাতি নেতা বলল, অন্য নেতাকে ‘নেন বস, মাইয়াটারে ধইরা লইয়া যাই চলেন, একটু বানাইলেই পেট থাইক্যা কথা বাইরাইব। ’

নেতা কিছুক্ষণ ভেবে বলল, ‘যাহ্, তোর মাথাটা খারাপ হইছে, ঠাণ্ডুর অন্য প্রবলেম ছিল। কল্পনা তার গার্ল ফ্রেন্ড, এর বাইরে কিছু না। ঠাণ্ডুরে সাইজ করছে মনা। ’

হতে পারে, শান্তিনগরের মনার সঙ্গে ঠাণ্ডুর দলের একটা মনোমালিন্য ছিল। সেটি গোলাগুলিতে রূপ নিয়েছিল। মাসখানেক আগের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু মনাকে ধরা দূরের কথা, প্রশ্ন করারও সাধ্য নেই দারোগার। সে আছে টপ অবস্থানে।

আর চ্যানেলের সাংবাদিক এসে কল্পনার ভেজা চোখ দেখে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন, ঠাণ্ডুর অন্তর্ধান আন্ডারওয়ার্ল্ডের অভ্যন্তরীণ বিরোধের ফল। তিনি তাই বললেন দারোগাকে।

প্রতিটি ঘটনায়, আপনারা নিশ্চয় লক্ষ করেছেন, কল্পনার ভেজা চোখ, তার মিষ্টি কথা, একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বটেই। কারণ কল্পনা পাকা অভিনেত্রী। থিয়েটার স্কুলে সে ৯ মাস পড়েছে, সেখানেই আমি তাকে প্রথম দেখি। আমার ক্লাসে তার উপস্থিতি ছিল ১০০%। তারপর ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’তে তার অভিনয় দেখে অবাক হই। রামেন্দুদাকে বলি, মেয়েটি অনেক দূর যাবে।

কিন্তু গোড়ান বলে কথা। চার ফুট, তিন ফুট, ফুটহীন দূরত্বের বাড়িগুলো যে প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে থাকে!

তিন.

হায়দার আলী ওই যে শুকনো রক্তের গন্ধ পেয়েছিলেন, তিনি পুরোদিন তাই শুঁকলেন। কিন্তু তাতে তাঁর সন্দেহ প্রবল হলেও যুক্তিযুক্ত কোনো সমাধান পেলেন না অনেক প্রশ্নের। কার রক্ত? কেন রক্ত? কত রক্ত? কখন রক্ত? তিনি জানেন, শাড়িটা আবার ধোবে কল্পনা, তারপর লন্ড্রিতে পাঠাবে ইস্ত্রি করতে। তিনি লন্ড্রিতে বলে রাখলেন। কিন্তু শাড়িটা এলো না। তিনি নিশ্চিত হলেন, শাড়িটা ফেলে দিয়েছে কল্পনা, কে আলামত রাখে ঘরে? তিনি কল্পনার বাড়ি গেলেন। আতিউর রহমান ছিলেন না। কাজেই কল্পনাকে দরজা খুলে দিতে হলো।

হায়দার আলী নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলেন না। কল্পনার পরনে সেই শাড়ি। তিনি ভণিতা না করে বললেন, ‘আহ্, আপনার শাড়িতে একসময় কিছু রক্ত লেগেছিল, ধুয়ে পরিষ্কার করেছেন। ’

কল্পনা ভেজা চোখের পাতা একবার না ফেলে বলল, ‘জি, আমার একটা পিরিয়ডের সময় কেয়ারফুল ছিলাম না। ’

হায়দার আলী স্প্রিং দেওয়া পুতুলের মতো চেয়ার ছেড়ে উঠে লাফ দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। বেচারা! বয়স পঞ্চান্ন, কিন্তু কনফার্মড ব্যাচেলর। তাঁর কানে কল্পনার কথাগুলো একটা লজ্জা-বোমার মতো আঘাত করল।

চার.

কিন্তু কল্পনার ভেজা চোখে, ওই ঠাণ্ডা মাথার উত্তরটা দেওয়ার আগে, একটু কাঁপন কি ছিল? ছিল। আলী বললেন নিজেকে, এই কাঁপনটা খুবই এলিমেন্টারি, মাই ডিয়ার ওয়াটসন। শি ইজ হাইডিং এ প্রফাউন্ড ট্রুথ।

কি সেই ট্রুথ? হায়দার আলী তার সন্ধানেই নামলেন। তিনি যেদিন থানায় গেলেন, সেদিন থানায় আমিও ছিলাম। আমার এক নিরীহ ছাত্রকে পুলিশ ধরেছে। সে রাত বারোটায় টিউশনি শেষে ফিরছিল, সঙ্গে ছিল এক বোতল হামদর্দের কাশির ওষুধ সার্দা। দুই পুলিশ তাকে ধরে ব্যাগ তল্লাশি করে ফেনসিডিল আবিষ্কার করে থানায় নিয়ে এসেছে। ছেলেটির প্রকৃত অপরাধ তার পকেটে এক শটা টাকাও না থাকা। থাকলে সে ওই রাতে বাড়িতে ঘুমাত। আমি খবর পেয়েছি সকালে, থানায় গিয়েছি দশটায়। ছেলেটিকে ছাড়াতে লেগেছে মিনিট কুড়ি। দারোগা ভালো মানুষ, শিক্ষকদের সম্মান করেন। ছেলেটিকে নিয়ে বেরোনোর মুখে হায়দার আলীর সঙ্গে দেখা। আলীর সঙ্গে আমার পরিচয় বছরচারেক আগে। বাসে চাটগাঁ যাওয়ার সময়। পাশাপাশি বসেছিলাম। আমি গোয়েন্দা গল্পের ওপর লেখালেখি করি, সে কথা শুনে তিনি উদ্বেলিত হয়েছিলেন। আমি তাঁকে গোয়েন্দা গল্প কিভাবে ইতিহাসকে ব্যক্তির নজরের বাইরে নিয়ে যায়, কিভাবে তা উপন্যাসের কাঠামোর বিপরীতে নিজে একটি কাঠামো দাঁড় করায় এবং কাঠামোবাদী সাহিত্যতত্ত্বে আলেকজান্ডার পপোভ প্রদত্ত রূপকথার কাঠামো-ছকের সঙ্গে গোয়েন্দা-কাহিনির কাঠামো-ছকের তুলনা করে একটা কাঠামোতত্ত্ব হাজির করে সেসব বিষয়ে গভীর জ্ঞান দিয়েছি। আর হায়দার আলী তাঁর তিন-চারবার চমত্কৃত হওয়ার মতো কেস বর্ণনা করেছেন।

থানায় দেখা হলে আলী আন্তরিকভাবে আমার হাত জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, ইন্টারেস্টিং কেস আছে স্যার। বসুন।

আমি ছেলেটিকে ছেড়ে দিয়ে বসলাম। অচিরেই কল্পনা আকতারের নাম ও তার পরিচয় জানার পর আমার আগ্রহ বাড়ল।

আলী আমাকে কল্পনা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কল্পনার সচ্চরিত্রের সার্টিফিকেট দিলাম। কল্পনা অবশ্য নাটক ছেড়ে দিয়েছে, তবে আলীর বর্ণনা শুনে মনে হলো, নাটক তাকে ছাড়েনি।

পাঁচ.

 

হায়দার আলী খুঁজে পেতে মাইক্রোবাসের নাম্বার বের করলেন। ড্রাইভারের সন্ধান পেলেন। ড্রাইভার বলল, অনেক ভোগান্তি হয়েছে মাইক্রোবাসটা খুঁজে বের করতে। পার্টসও চুরি গেছে।

কোথা থেকে খুঁজে পেলেন? আলী জিজ্ঞেস করলেন।

ধোলাইখাল থেকে, আবার কোথা থেকে? পাল্টা জিজ্ঞেস করল ড্রাইভার। ড্রাইভারের কথা অনুযায়ী, তাকে মুক্তাঙ্গন থেকে ডেকে এনেছিল জুয়েল নামের একজন। গাড়ি নিয়ে সে দাঁড়িয়েছিল দক্ষিণ গোড়ানে একটা আন্ডার কনস্ট্রাকশন বাড়ির সামনে। জুয়েল পাশে। জুয়েলের হাতে নিশ্চয়ই অস্ত্র ছিল, কিন্তু তাকে বলা হয়েছিল চোখ সোজা রাস্তায় রাখতে, কোনো দিকে না তাকাতে। কাজেই যে মেয়েকে গাড়িতে তোলা হয়, তাকে সে দেখেনি। গাড়িতে কেউ কথা বলেনি, তা ছাড়া শান্তিবাগের মোড়ে তাকে নামিয়ে দিয়েছে জুয়েল, তারপর সে-ই গাড়ি চালিয়েছে।

হায়দার আলী কখনো একটা সূত্র থেকে এক শতাংশের বেশি তথ্য আশা করেন না। এটি ভালো গোয়েন্দার লক্ষণ, তিনি বলেন। ড্রাইভার তাকে দুই শতাংশ দিয়েছে। তিনি গেলেন ধোলাইখাল। সেখানে উকিল মিয়ার মধ্যস্থতায় তিনি সন্ধান পেলেন মমিন আর বিশুর, যাদের দেখে গভীর আস্থা হলো আলীর মনে। দুটো পাঁচ শ টাকার নোট বের করলেন তিনি। তা ছাড়া উকিল মিয়ার বন্ধু, আস্থা অর্জনে সমস্যা হলো না। তারা জানাল, দুই মাসে মাত্র চারটি মাইক্রো এসেছে ধোলাইখালে—মাইক্রোর ওপর পুলিশের নজর বেশি। এগুলো রিকুইজিশন হয়। সে জন্য চুরি কম। হ্যাঁ, একটা নীল মাইক্রো এসেছিল সেই সাভার থেকে। তবে এটি তারা আনেনি।

উকিল মিয়ার মধ্যস্থতায় হায়দার আলী এরপর জানলেন, সাভারে গাড়িটা এনে আগেই ফেলে রাখা হয়েছিল। তবে আয়না-টায়না ছাড়া আসল পার্টস সরানোর সুযোগ জোটেনি যারা এনেছিল তাদের। পুলিশে খবর পৌঁছেছিল। অবশ্য পুলিশ আসার আগেই মাইক্রোটা সরানো হয়েছে এবং পরে সেটা পৌঁছেছে ধোলাইখালে।

এরপর হায়দার আলীকে সাভার যেতে হলো। সে এক বিরক্তিকর ব্যাপার। কিন্তু আশুলিয়ায় যে ঝগড়া হয়েছিল কল্পনা ও ঠাণ্ডুর সে খবর কিভাবে জানলেন হায়দার আলী? হ্যাঁ, এটা একটা প্রশ্ন বটে এবং এর উত্তরের সঙ্গে সঙ্গে তার তথ্য সংগ্রহ পঞ্চাশ শতাংশে উন্নীত হয়ে যায়। আলী জানান, পূর্ণিমা চটপটি ঘরের সামনে মোটরসাইকেল থামিয়ে সাভারের স্যানিটারি ফিটিংস ব্যবসায়ী বাবর আলী চটপটি খাচ্ছিল। সে ঝগড়াটা শুনেছিল এবং ভুলেও গিয়েছিল। কিন্তু পরদিন দুপুরে বাসায় ভাত খেতে আসার পথে সেই নীল মাইক্রোটা পড়ে থাকতে দেখে তার কৌতূহল হয়। মাইক্রো সাধারণত সাদাই হয়। নীলটা ব্যতিক্রম। তা ছাড়া এ মাইক্রোর পেছনের কাচে স্টিকার লাগানো ছিল—‘আই লাভ নিউ ইয়র্ক’।

কজন মাইক্রো মালিক/চালকই বা এ দেশে নিউ ইয়র্ক শহরের প্রেমে পড়েছে? বাবর আলী কল্পনার বর্ণনা দিল। তবে কোন শাড়ি পরেছিল, তা তার মনে নেই। এখন কল্পনাকে দেখলে কি সে চিনতে পারবে? হয়তো পারবে, হয়তো না। বাবরকে বাবা শিখিয়েছিলেন, মেয়েদের দিকে তাকাতে নেই। তা ছাড়া সে বিবাহিত।

এবার হায়দার আলী নিশ্চিত হলেন, বাবর কল্পনার চেহারা মুখস্থ নামতার মতো বলে দিতে পারবে। কল্পনা   যে সুন্দরী।

 

ছয়.

 

তথ্যপ্রবাহ ৭০%-এ পৌঁছাল। আর বাকি ৩০%, অর্থাৎ আশুলিয়া থেকে মাইক্রোটা কোথায় গিয়েছিল।

আশ্চর্য, সেই সন্ধানটা তাকে দিল—না বাবর নয়, পুলিশ নয়; দিল, ঠিকই ধরেছেন, পূর্ণিমা চটপটি ঘরের মালিক মো. সোনা মিয়া। হ্যাঁ, তারা গেছে কালিয়াকৈরের থানাবাড়িতে। সেখানে ঠাণ্ডুর প্রাইভেট টিভি চ্যানেলের মালিকের একটি বাগানবাড়ি আছে।

বাগানবাড়িটা হচ্ছে সেই ‘অকুস্থল’।

বাগানবাড়ির সন্ধান পেয়ে হায়দার আলীর মনে হলো, তথ্যপ্রবাহটি এবার শতাংশ ছুঁয়েছে। তিনি বাগানবাড়ি ঘুরে দেখলেন। কিন্তু সন্দেহজনক কিছুই তাঁর চোখে পড়ল না। ছোট তিন রুমের বাংলো। সাদা দেয়াল। কোথাও কোনো রক্তের একটা ছিটাও নেই। বাইরে সেপটিক ট্যাংকের ঢাকনার গোড়ায় শেওলা। এক বছর সেখানে মানুষের হাত, অথবা পা পড়েনি।

হায়দার আলী উদ্বিগ্ন হলেন। তারপর গেলেন আশপাশটা দেখতে। বাগানবাড়ির উল্টোদিকে একটা ট্যানারি। ট্যানারির সামনে একটি ছোট ঘর, হয়তো ম্যানেজার সেখানে বিশ্রাম নেয় মাঝেমধ্যে। বিশ্রাম নেয়? চমকে উঠে দৌড় দিলেন তিনি সেই ঘরের দিকে। পেছনে দৌড়াল দারোয়ান। স্যার স্যার।

না টিভি চ্যানেলের মালিকের দারোয়ান, না এই ট্যানারির দারোয়ান স্বীকার করল তারা কিছু জানে। সপ্তাহতিনেক আগে এখানে কেউ এসেছিল, বিশেষ করে হায়দার আলীর বর্ণনা মতো, এ রকম কথা একেবারেই উড়িয়ে দিল টিভি চ্যানেলের দারোয়ান। ‘কতই তো আসে, কয়টার কথা মনে রাখমু,’ জানাল চ্যানেলের দারোয়ান।

সত্যিই তো!

তবে হায়দার আলী জানেন, পুলিশের রিমান্ডে একবার আনতে পারলে কথা বের করে আনা কোনো ব্যাপারই না।

অবশ্য ট্যানারির দারোয়ান জানাল, সে নতুন এসেছে। কেন, আগের দারোয়ান কোথায় গেল? তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। সে হাওয়া হয়ে গেছে। হয়তো টাকা-পয়সা মেরেছে।

হায়দার আলীর চোখে সন্দেহ ঘন হয়। হাওয়া হয়ে গেছে? কবে? জানি না স্যার। আমি আসার আগে। আমি এসেছি দুই সপ্তাহ হলো মাত্র।

কিন্তু এবার থানায় গিয়ে হায়দার আলী বিরাট ধাক্কা খেলেন। দারোগা তাঁকে বললেন, এত দিন হায়দার আলী যা করার করেছেন, করেছেন; এবার যেন তফাৎ যান। তা ছাড়া গাড়ি চুরি হয়েছে সাভার থানায়, ওই থানার ব্যাপারে তার কিছুই করার নেই।

গোল্ডেন হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়িয়ে দারোগা বললেন, ‘আলী সাহেব, লাভ হবে না। ওপরের নিষেধ। বোঝেন না, আমার ভাগ্নাটাও ছিল। তার পরও চাকরি বলে কথা। ছেলে-মেয়ে জীবন-জীবিকা বলে কথা। ’

হায়দার আলী বুঝলেন, ওপরের একটি মহল ঠাণ্ডু অন্তর্ধানের রহস্য উন্মোচন হতে দিতে চায় না। তিনি নিজেকে বললেন, তামাম শোধ। তবে অভিনন্দন জানাতে ভুললেন না নিজেকে, এ ওয়ার্ক ওয়েল ডান, মাই বয়।

একটু বাত আছে দুই কনুইতে, নইলে নিজের পিঠে নিজেই একটা চাপড় দিতেন।

 

আট.

 

কল্পনাদের বাসার পাশ দিয়ে ফিরতে ফিরতে তাঁর মনে হলো, ওপরের মহলের কারণগুলো নিশ্চয় আন্দাজ করা যায়—তার প্রথমটা সেই থলের বিড়ালের গল্প। দ্বিতীয় তৃতীয় নিশ্চয় অন্য কিছু। কিন্তু চতুর্থ একটি কারণ কি কল্পনা নিজে? তার কি কোনো সম্পর্ক আছে ওপর মহলের সেই কেউ/কারোর সঙ্গে?

তিনি অধ্যাপকের দেওয়া সচ্চরিত্র সার্টিফিকেটের কথা ভেবে একটু লজ্জিত হলেন। কিন্তু গোয়েন্দার মন! লজ্জিত হলেও সক্রিয়তা কমে না। হায়দার আলী মনে এবার একটি চিত্র দাঁড় করালেন : কল্পনাকে ওই বাগানবাড়ি বা ট্যানারির বহির্ঘরে নিয়ে ঠাণ্ডুরা নির্যাতন করেছে। তারপর তারা হয়তো মদ খেয়েছে, তাস খেলেছে। তারপর দৃশ্যপটে আবির্ভাব ঘটেছে প্রতি-খলনায়কদের। নেতৃত্বে হয়তো ওপর মহলের সেই কেউ। তারপর যা হওয়ার তাই হয়েছে। কল্পনা এক ফাঁকে কেটে পড়েছে। তারপর ভালুকা গেছে। আহা, নির্যাতিতা মেয়ে।

হায়দার আলীর সহানুভূতি জাগল। তিনি কল্পনার বাড়ির কড়া নাড়লেন। কল্পনাই খুলল। সে অনেক সাহসী হয়েছে এখন, যেহেতু ঠাণ্ডু নেই। ঘন ঘন পুলিশ এসেছে বাড়িতে, লোকজন একটু তটস্থ।

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই, যেন খুব তাড়া তার, আলী তার পূর্বাপর বর্ণনাটি পেশ করলেন কল্পনা সমীপে। কল্পনা আবেগহীন শুনল, তারপর ভেজা চোখ মেলে বলল, আংকেল, আপনার মতো বুদ্ধিমান মানুষ আমি পৃথিবীতে দুটো দেখিনি। বলে সে হাত ধরে হায়দার আলীকে ঘরে টেনে নিল।

আতিউর রহমান সাহেব অফিসে। বোনটি কলেজে। ভাইটি স্কুলে। মা রান্নাঘরে। দিনটি সকাল ও দুপুরের মাঝখানে। ঘর অন্ধকার। তাঁকে বসিয়ে কল্পনা ভেতরে গেল। হায়দার আলীর ভ্রম হলো যে সে চা আনতে গেছে। কিন্তু কল্পনা গেছে মাকে বলতে, তার এক বন্ধু এসেছে, যেন এদিকে আগামী আধঘণ্টা তিনি পা না দেন।

মার হাতে একাধিক রান্না। রান্নাঘর থেকে নড়ার সময় তার কোথায়? ভাগ্য ভালো মেয়ে চায়ের কথা বলেনি।

হায়দার আলীকে হাত ধরে বিছানায় বসাল কল্পনা, নিজে বসল সামনে, মুখোমুখি, একটি চেয়ারে। হায়দার আলীর বুক ঢিপ ঢিপ করতে লাগল। কল্পনা তাঁকে জিজ্ঞেস করল, ট্যানারির বাইরের দুই কামরার ঘরটা তিনি ভালোভাবে দেখেছেন কি না।

তিনি বললেন হ্যাঁ।

বেশ, বলল কল্পনা, ওই ঘরে রাতে আলো ছিল খুব স্তিমিত। সেই আলোতে তারা সবাই ভাত খেয়েছে। তারপর তাকে বিছানা পাড়তে বলেছে ঠাণ্ডু। ‘আমি বিছানায় চাদর বিছিয়ে শুয়েছি’ বলে হায়দার আলীকে ঠেলে বিছানায় উঠে পড়ল কল্পনা। তারপর ‘এ রকম শাড়ি খুলেছি,’ বলতে বলতে পরনের শাড়ি খুলে ফেলল।

হায়দার আলী দুচোখ ঢেকে উঠে পড়ে বললেন ‘দোহাই কল্পনা, ঠাণ্ডুর কী হলো তাই বলো। ’

ব্লাউজের একটা হুকে হাত রেখে কল্পনা বলল, ‘আমাকে কাপড় খুলতে আদেশ দিয়ে ঠাণ্ডু কেন জানি এলিয়ে পড়ল। তার দুই বন্ধুও। বুঝতে পারলাম তাদের খাবারে বিষ দেওয়া হয়েছিল। তারপর তাদের তুলে বাইরের ঘরের পাশে সেপটিক ট্যাংকে ফেলে দিল। ’ ‘কারা?’ ‘আমি কি জানি? আমি তো বিছানায় শুয়ে কাপড় খুলছি মাত্র। ’

হায়দার আলী ছুটে বেরিয়ে গেলেন। পেছনে কল্পনার একটা প্রাণময় হাসি বাজতে থাকল। বাইরে বেরোনোর দরজা পর্যন্ত আসতে আসতে আলীর মনে পড়ল, সেপটিক ট্যাংকটি যে আসলে ট্যানারির কেমিক্যাল বর্জ্য বেরোনোর একটা পথও! সেখানে একটা একটা করে তিনটি মনুষ্য শরীর ফেলা একটি মেয়ের জন্য কঠিন কিছুই না, বিশেষ করে কেউ হাত লাগালে। চতুর্থ একটি শরীরও, যা সেই নিরুদ্দেশ দারোয়ানের, যে এই মেয়েটিকে নির্ঘাত কোনো কিছুর বিনিময়ে প্রাগুক্ত শরীরগুলো ফেলতে সাহায্য করেছে। ওই বর্জ্যপূর্ণ ট্যাংকে একটি মনুষ্য দেহ পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে হাড়গোড়সহ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার কথা।

কল্পনা উঠে এসেছে। কী হলো আংকেল? সে জিজ্ঞেস করছে। তার ডাক ভেজা। হায়দার আলী দরোজা খুলে এক লাফে বারান্দায় বেরিয়ে এলেন। আসতে আসতে কেন জানি তাঁর চোখে ট্যানারির সেই সেপটিক ট্যাংক-কাম-বর্জ্য নিষ্কাশন নালার ভেতরটা ভাসতে থাকল। তিনি দেখলেন ঠাণ্ডুর শরীর থেকে মাংস খসছে, চর্বি খসছে, কান-ভ্রু-চোখ সব খসছে। তারপর থাকল তার কঙ্কালটুকু। সেটি একসময় ভাসতে থাকল। তারপর কঙ্কালের ভেতরে শুরু হলো ক্ষয়। তারপর কঙ্কালের আর কিছুই প্রায় অবশিষ্ট রইল না।

‘মাগো’ বলে তিনি রাস্তায় বেরিয়ে এলেন।


মন্তব্য