kalerkantho


ভ্র ম ণ

ব্লুরিজ পাহাড়ের পাদদেশে বিচিত্র দম্পতির সাক্ষাৎ

মঈনুস সুলতান

২৫ জুন, ২০১৭ ০০:০০



ব্লুরিজ পাহাড়ের পাদদেশে বিচিত্র দম্পতির সাক্ষাৎ

শ্যানানডোয়া নদীর বহমান জলের কিনার ঘেঁষে কাঠের বাঁধানো ডেক। তার নির্জন বেঞ্চে উইন্ডব্রেকার পরে আমি পেনসিল ও নোট বুক নিয়ে বসি।

স্যান্ডউইচের ব্যাগ খুলে অনিটার দেওয়া লাল, নীল ও হলুদ বর্ণের ক্রেয়নগুলো দেখি। দিনকয়েক আগে ঝড়-তুফানের ভেতর আমি একটি হাইকিং শেল্টারে আশ্রয় নিই। সেখানে দেখা হয় অনিটার সঙ্গে। সে কি এখনো ব্লুরিজ মাউন্টেনের পাহাড়ি পথে হাঁটছে? তার জ্বর কমেছে কি? সুরুজ কেবল উঠছে। অরুণিমার মৃদু ছোঁয়া লাগা কুয়াশার নিচে পানি বয়ে যাওয়ার শব্দ। একটি-দুটি মাছের ঘাইয়ে ছন্দপতন ঘটে। তাতে ভোরবেলার নির্জনতা ছলকে ওঠে। আমি শেষ পাওয়ারবারের র‌্যাপার খুলে ভেঙে অর্ধেকটা মুখে দিই। বাকি অর্ধেক সাবধানে গুছিয়ে রাখি দুপুরে লাঞ্চ হিসেবে ব্যবহারের জন্য। বোধ করি সপ্তাহখানেক হয়ে গেল এই পাওয়ারবার আমি কালেক্ট করি শরীরে রঙিন সব উল্কি আঁকা বিয়াত্রিসের কাছ থেকে। তার সঙ্গেও আমার দেখা হয়েছে আমেরিকার ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের ব্লুরিজ মাউন্টেনের পাদদেশে বনানী ভেতরমহলের একটি হাইকিং ট্রেইলে। সমুদ্রতীরে ছোট্ট একটি কটেজের বাঁশ-বেত-কাঠে তৈরি ব্যালকনিওয়ালা মডেল আমি তাকে বার্টারের বিনিময় হিসেবে দিই।


শান্ত শ্যানানডোয়া নদী


বিয়াত্রিস এখন কোথায়? সে কি লনজারে পরে কটেজের মডেলের দিকে তাকিয়ে বসে আছে কাউচে? আর ভোরের অরুণিমায় তার ঊরুযুগলে আঁকা উল্কিতে সিন্ধুঘোটক, শঙ্খ ও জলপরিদের চিত্র বাঙ্ময় হয়ে উঠছে? পাওয়ারবার খাওয়ায় শরীরে এক ধরনের উজ্জীবন আসে। অনেক দিন হচ্ছে পথ চলতে চলতে বনানীতে পাথর আর গাছের কাণ্ড কিংবা গুঁড়িতে বসছি, আজ নদীতীরে কাঠের ডেকে নিরালায় বেঞ্চে বসতে পেরে ভালোই লাগে। বেশ কিছু দিন পর নোট বুকে জার্নাল লিখছি। মঞ্চে দাঁড়ালে দক্ষ অভিনেতার মনে যে রকম অনায়াসে চলে আসে সংলাপ, সে রকম ধারাবাহিকভাবে আমার নোট বুকে লেখা হয়ে যেতে থাকে গেল দিনকয়েকের হাইকিংয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ।

আমি এই মুহূর্তে যেখানে নোট বুক ও পেনসিল হাতে বসে আছি, তা থেকে মাত্র মাইল কয়েক দূরে ব্লুরিজ মাউন্টেনের ঢেউ-খেলানো বিস্তার। এখান থেকে পরিষ্কারভাবে তার পাথুরে রক-ওয়ালের ভিউ পাওয়া যায়। তার নিচের ভ্যালিতে উড়ছে নীল কুয়াশা। এ উপত্যকায় আমি বিশ-বাইশ দিন ধরে ব্যাকপ্যাক নিয়ে হাইক করছি এবং সুবিধামতো স্থানে তাঁবু খাটিয়ে ক্যাম্পিং করছি।


নদীতীরে কাঠের ডেক


ভোরের কোমল দীপ্তি বেশ খানিকটা ফুটেছে। নদীর ওপরের কুয়াশায় ছড়াচ্ছে লোহিতে বেগুনি রঙের অ্যাকসেন্ট দেওয়া আলো। কিনারে রিড বলে বেতজাতীয় দীর্ঘ ঘাস হাওয়ায় কচি বাঁশের পত্রবহুল ডগার মতো দুলছে। কাঠের এই ডেকটি ডেব্রা ও নাথানিয়েল দম্পতির। তাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে গতকাল বিকেলে। তাঁবু খাটিয়ে রাত কাটানোর মতো ফরেস্টে উপযুক্ত স্থান খুঁজে পাচ্ছিলাম না। ঘণ্টা চারেক হাইক করে আমি বেজায় ক্লান্ত। অপরাহ্ন ভাটির দিকে হলেও আকাশে ছিল পর্যাপ্ত আলো। ব্যাকপ্যাকের ভারী বোঝা ক্যারি করে পায়ে ব্যথা হচ্ছে, তাই আর বেশি দূর যেতে চাইছিলাম না। হালকা বনানীর ভেতর দেখতে পাই, গাছে দড়ি দিয়ে বেঁধে ঝোলানো হয়েছে এক সারি তিব্বতীয় প্রার্থনা পতাকা। আমি অবাক হয়ে পাশ কাটিয়ে বনের আরো গভীরে যাওয়ার উদ্যোগ নিলে কে যেন বলে ওঠে—কাম অন ম্যান, আই নো ইউ, ডোন্ট ইগনোর মি। কাম অ্যান্ড সে হ্যালো। উই আর ইন আফ্রিকা। উই নিড টু হেল্প ইচ আদার। আমি কণ্ঠস্বর লক্ষ করে একটু এগোলেই দেখি, খোলামেলা জায়গায় দাঁড়িয়ে টাইডাই করে সূর্যের সাতরং আঁকা মস্ত এক টুকরো কাপড় হাতে মাঝবয়সী এক শ্বেতাঙ্গ। তার রংচটা চেহারা অনেকটা বিটলস যুগের মফস্বলের পপগায়কদের মতো। হীনস্বাস্থ্য এই জেন্টলম্যান বোধ করি তাঁর দেহের ওপর অনাহারের সঙ্গে নেশাফেশা মিলিয়ে খুব অনাচার করে থাকেন। তাঁর মাথার সামনের দিকের চুলগুলো সম্পূর্ণ পড়ে গেলেও পেছন দিকের পনিটেইলে দীর্ঘ কিছু খুচরা চুল রাবার ব্যান্ড দিয়ে বাঁধা। তিনি টাইডাই করা কাপড়খানা পালের মতো করে ওড়াতে ওড়াতে বলেন—ডোন্ট স্ট্যান্ড স্টিল, কাম অ্যান্ড হেল্প মি। সামনে এসে একটু হালটা ধরো। ততক্ষণে আমি পাল খাটিয়ে নিই। বুঝতে পারি, আমরা শ্যানানডোয়া নদীর খুব কাছেই চলে এসেছি। তবে এই খটখটে ডাঙায় নৌকা দূরে থাক, কোথাও কিন্তু জলের লিমলেশও দেখি না। ঠিক বুঝতে পারি না, হালই বা ধরব কোথায়? দাঁড়িয়ে পড়লে তিনি আমার হাতে তাঁর সাতরঙা কাল্পনিক পালখানা দিয়ে বলেন—ম্যান, দিস ইজ ফিশ রিভার। আমরা আফ্রিকার নামিবিয়ায় আছি, তবে এখানে ক্রোকোডাইল তেমন নেই। খালি খালি ভয় পাচ্ছ কেন? একটু অপেক্ষা করো, আমি টেন্ট থেকে কম্পাস নিয়ে এখনই ফিরে আসছি।


হর্স ট্রেইলার, ডেব্রা ও ঘোড়া


হাঁটতে গিয়ে তাঁর শরীর কাঁপে, খানিকটা মাতালের মতো টলমলে। তিনি চলে যাচ্ছেন দেখে, যদি না আবার কোনো গাছফাছে হোঁচট খান, আমিও তাঁর পেছন পেছন চলি। শুকনা খটখটে উঠানে হর্স ট্রেইলারের পাশে দাঁড়িয়ে লালে সাদা রঙের চিত্রাপাকরা একটি সুদর্শন ঘোড়া। ট্রেইলারের পেছনের দুয়ার খোলা, তার পাশে খড়কুটা নিড়ানি দিয়ে পয়পরিষ্কার করে প্লাস্টিকের বালতিতে ফেলছেন এক মহিলা। তিনি ঘাড় বাঁকিয়ে কৌতূহলী দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকালে একটু আগে পাল ওড়ানো টলমলে মানুষটি আমাকে দেখিয়ে বলেন—ডেব্রা, লুক, বনানীতে আমি কাকে খুঁজে পেয়েছি। হি ইজ দ্য     নামিবিয়ান ব্ল্যাক ম্যাজিকম্যান। আমাকে না চেনার ভান করে হেঁটে যাচ্ছিল, কিন্তু আমি ঠিকই চিনতে পেরেছি। হি ইজ আ ভেরি গুড গাই, টক উইথ হিম। আমি টেন্ট থেকে কম্পাস নিয়ে ফিরে আসছি। জেন্টলম্যান টলমলিয়ে তাঁবুর দিকে চলে গেলে ডেব্রা লাজুক হেসে বলেন—স্যরি অ্যাবাউট দিস। দিস ইজ নাথানিয়েল। প্লিজ, ডোন্ট বি কনফিউজড। তোমাকে কী বলব বলো, তার মাথায় ব্রেন টিউমার হয়েছে। বার তিনেক সার্জারিতেও কিছু হলো না। শ্যানানডোয়া নদীর তীরের এই বনানী তার খুব প্রিয়। আমরা এখানে দিনকয়েক হলো ক্যাম্প করে আছি। ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড, হি ইজ ডাইয়িং স্লোলি। মাই ওনলি হোপ ইজ দ্যাট হি ডাইজ হিয়ার পিসফুলি।

ডেব্রা মিষ্টি করে হাসেন। তাঁর হাসিকে ঝিরিঝিরি বৃষ্টির হালকা ছাটের ভেতর মেঘ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা রোদের মতো দেখায়। তিনি চোখ মুছতে মুছতে বলেন—কুড ইউ হেল্প হিম এ বিট? ৯ দিন হয় আমরা এখানে আছি। আমি ছাড়া সে তো আর কারো মুখ দেখতে পাচ্ছে না। মানুষের সঙ্গ সে খুবই ভালোবাসে। সো, প্লিজ হেল্প দিজ ডাইয়িং ম্যান। আনচু? বলে তিনি আমার দিকে কন্যাদায়গ্রস্ত জননীর মতো তাকালে আমি বিভ্রান্ত হয়ে জানতে চাই—বাট হাউ, হাউ মে আই হেল্প হিম? ডেব্রা হাত বাড়িয়ে আমার ব্যাকপ্যাক নামাতে  সাহায্য করতে করতে বলেন—মানুষের সঙ্গ পাওয়ার জন্য সে মরিয়া হয়ে আছে। তার আত্মীয়স্বজন কোনো খোঁজখবর করছে না। তার দুটি গ্রোন-আপ মেয়ে আছে, তাদের সঙ্গে বাপের সেই কত বছর আগে কী কারণে যেন কনফ্লিক্ট হয়েছিল, তারা তো একটা ‘গেটওয়েল সুন’ কার্ডও পাঠালে পারত? ঘোড়া, কুকুর ও পোষা ম্যাকাওয়ের যত্ন নেওয়া, তাকে ওষুধ খাওয়ানো—আমি একা কত দিক সামলাব। একটি তিনপেয়ে কানঝোলা কুকুর এসে লেজ নাড়তে শুরু করলে ডেব্রা তার লোমে হাত বুলিয়ে বলেন—তোমাকে কিচ্ছু করতে হবে না। শুধু তার সঙ্গে যদি একটু কথাবার্তা বলো, কী যে খুশি হবে সে! আমি প্রতিক্রিয়ায় বলি—লুক ডেব্রা, আই উড বি হ্যাপি টু টক উইথ হিম। বাট, ব্যাককান্ট্রি ক্যাম্পিং করছি আমি, আমাকে যে সন্ধ্যা হওয়ার আগে তাঁবু খাটানোর জায়গা খুঁজে বের করতে হবে। আমি না হয় কাল সকালে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে এখানে ফিরে আসব। লাল ঘোড়াটি এগিয়ে এসে মাটিতে নাল ঠুকলে ডেব্রা তার কেশরে হাত রেখে বলেন—ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, এই ছয় একরের সমস্ত প্লট, নদীর তীরে কাঠের ডেক—সব আমাদেরই। তুমি আজ রাতের মতো এখানেই তাঁবু খাটাও। হর্স ট্রেইলারের ঠিক পেছনে খোলামেলা জায়গায় তিন-তিনটি ছোট-বড় তাঁবুতে ডেব্রা ও নাথানিয়েলের পোষা পশু-পাখি নিয়ে সংসার। আমি তাঁদের পাশে তাঁবু খাটাতে গেলে তিন পায়ের কুকুরটি লেজ নাড়িয়ে আমার ব্যাকপ্যাকের চারপাশে ঘুরপাক খায়।


হর্স ট্রেইলার, ডেব্রা ও ঘোড়দাঁড়ে রংচঙে ম্যাকাও পাখি


তাঁবু খাটানো হলে তার বাইরে দাঁড়িয়ে এই দম্পতির কথা ভাবছিলাম। ডেব্রা এসে বলেন—স্যরি, তোমাকে কনফিউজড করে দেওয়ার জন্য দুঃখিত। অ্যাজ এ মেটার অব ফ্যাক্ট, উই আর নিউলি ম্যারিড। মাসখানেক আগে আমরা বিয়ে করেছি। অবশ্য অনেক বছর ধরে আমরা লিভ টুগেদার করছিলাম, আবার আমাদের ছাড়াছাড়িও হয়েছে বার তিনেক। ব্রেনে তার লাস্ট সার্জারিটি আনসাকসেসফুল হওয়ার পর নাথানিয়েল আমাকে বিয়ে করতে চাইল। বলা যায় এটা আমাদের হানিমুন। এই প্লটটা নাথানিয়েলের এত প্রিয় যে সাত বছর আগে সে তা কিনে নেয়। তার পর থেকে আমরা প্রতি অটামে এখানে মাসখানেকের জন্য ক্যাম্প করি। উই বোথ লাভ ওয়াচিং হামিংবার্ড মাইগ্রেশন। প্রতিবছরই তাদের পরিযায়ী হওয়া আমরা এখান থেকে পর্যবেক্ষণ করি। দিনতিনেক হলো গালফ অব মেক্সিকো থেকে উড়ে আসা হামিংবার্ডগুলো চার-ছটা পাখির গ্রুপে এই প্লটের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। স্টে হিয়ার ফর ওয়ান ও দু নাইটস। তুমি ইন্টারেস্টেড হলে কাল আমি যখন হামিংবার্ডদের খাবার দেব, তখন তা খুব ক্লোজ রেঞ্জ থেকে অবজার্ভ করতে পারবে। হামিংবার্ড বা ছোট্ট সুচালো ঠোঁটের মৌটুসি পাখির    পরিযায়ী হওয়ার বিষয়টি চাক্ষুষ করতে পারব, এ সম্ভাবনায় আমি এক্সাইটেড হয়ে বলি—ওসাম, হোয়াট আ ট্রু প্লেজার! তোমাদের সঙ্গে এক রাত এখানে থেকে কাল যদি ছোট্ট মৌটুসিদের উড়ে যাওয়া দেখতে পাই, কী যে আনন্দ হবে, বলে হাই ফাইভ দেওয়ার ভঙ্গিতে তাঁর করতলে পাঁচ আঙুল প্রসারিত করে আমার ডান হাতের তালু স্পর্শ করি। ডেব্রা আমার কবজি খুব আন্তরিকভাবে মুচড়ে দিলে তাঁর অভিব্যক্তির দিকে তাকিয়ে আমার ভীষণ অস্বস্তি হয়। মনে হয়, এক মাকড়সা যেন তার ঊর্ণনাভের প্রান্তে আটকে পড়া পতঙ্গের দিকে তাকিয়ে আছে।

ডেব্রা অতঃপর পিকনিক টেবিলে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার জন্য ডিনারে আমন্ত্রণ করে জানতে চান—তোমার কাছে সাপারের খাবার কিছু আছে কি? আমি সালাদের উল্লেখ করলে তিনি বলেন—সালাদ নিয়ে দশ-পনেরো মিনিটের মধ্যে চলে আসো। আমরা একসঙ্গে খাবার শেয়ার করব। স্যরি, আমাদের স্টকে এক্সট্রা খাবার নেই যে তোমাকে অফার করব। বনানীতে ক্যাম্প করে আছি তো, খাবারদাবারের সীমিত সাপ্লাই, খুব কেয়ারফুলি ইউজ করতে হচ্ছে। নাথানিয়েলকে এ অবস্থায় এখানে রেখে যে শহরে গিয়ে খাবার কিনে নিয়ে আসব, সে উপায়ও নেই। সো, কাম অ্যান্ড জয়েন আস উইথ ইওর স্যালাদ। ডেব্রা ফিরে যাওয়ার সময় আমি পেছন থেকে তাকিয়ে দেখি, তিনি জিনস পাল্টে বাটিকের একটি র‌্যাপার কোমরে জড়িয়েছেন। তাতে তাঁকে অনেক ফেমিনিন দেখাচ্ছে। আমি তাঁর অভিব্যক্তির কথা ভাবতেই তিনি গ্রীবা বাঁকিয়ে ফিরে তাকান। আমি তাঁর টেপা ঠোঁটে রহস্যময় হাসি দেখি। মনে হয়, ডেব্রা নিঃশব্দ উচ্চারণে বলছেন—তুমি যা ভাবছ, বিষয় কিন্তু তা নয়।

পিকনিক টেবিলে জ্বলছে ধূপকাঠি। পাশে হাবাচি গ্রিলের গনগনে অঙ্গারের ওপর রাখা দুটি সয়াবিনের টেম্পো বার্গার। ডেব্রা বেঞ্চে পদ্মাসনে বসে চোখ মেলে তাকিয়ে আছেন সূর্যাস্তের দিকে। এখন তাঁর গলায় জড়ানো সিল্কের ক্রিম কালার স্কার্ফ। আলো পড়ে তার আভায় তাঁকে স্নিগ্ধ দেখায়। নাথানিয়েলের সামনে তিবেতিয়ান সিংগিং বউল বলে পরিচিত একটি পিতলের বাটি। তাতে তিনি খুব ধীরে কাঠি দিয়ে আঘাত করলে তা থেকে ছড়ায় ধ্বনি। আমি সালাদের প্যাকেট হাতে নীরবে এই পরিবেশ অ্যাবজর্ভ করার চেষ্টা করি। তিনি চোখ মুদে কাঠি দিয়ে আবার শব্দ করলে মনে হয়, ভাইব্রেশনের একটি তরঙ্গ উড়ে যাচ্ছে গোধূলিময় আকাশের দিকে। ভাটির টানে সৈকত থেকে নেমে যাওয়া জলের মতো ক্রমে সরে যাচ্ছে বিকেলের আলো। খানিকটা আঁধার হতেই ডেব্রা ও নাথানিয়েল চোখ খুলে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে জোড়হাতে অদৃশ্য কাকে যেন প্রণাম করেন। ঠিক তখনই হর্স ট্রেইলার থেকে উড়ে টেবিলের পাশে মাটিতে পোঁতা গাছের ডাল দিয়ে তৈরি দাঁড়ে এসে ল্যান্ড করে রংচঙে একটি ম্যাকাও পাখি। নাথানিয়েল কৌটা খুলে তার রুপালি বাটিতে রাখেন কিছু দানা। ডেব্রা এবার খুব মিষ্টি করে হেসে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলেন—লেটস সি হোয়াট কাইন্ড অব স্যালাদ ডু ইউ হ্যাভ? তিনি সালাদের প্যাকেটটি খুললে দেখা যায়, তাতে প্রচুর সবজি ও ছোট্ট ছোট্ট চেরি টমেটো। লেটুসপাতার মোড়ক থেকে বেরিয়ে আসে দুটি সিদ্ধ ডিম। ডেব্রা সবজি নেড়েচেড়ে দেখে ‘দিস ইজ সামথিং ভেরি ফ্রেশ অ্যান্ড ক্লোজ টু আর্থ, থ্যাংক য়ু থ্যাংক য়ু’ বলে আমাকে জোড়হাতে নমস্কার করে তাঁবুর দিকে যান লেমন-হানি-মাস্টার্ডের সালাদ ড্রেসিং আনতে। আমি এই ফাঁকে নাথানিয়েলকে ‘হ্যালো দেয়ার’ বলে গ্রিট করলে তিনি ‘হ্যাং অন, ওয়েট এ মিনিট, নাউ ইজ দ্য টাইম টু ফিড দ্য লিজার্ড’ বলে নামাবলি আঁকা কাপড়ে ঢাকা ছোট্ট খাঁচার খিল দেওয়া জানালা খোলেন। তা থেকে টেবিলে বেরিয়ে আসে সবুজ রঙের হৃষ্টপুষ্ট একটি গিরগিটি। তিনি হানি-জার থেকে চামচে খানিকটা মধু নিয়ে তার সামনে রাখলে গিরগিটিটি জিব বের করে তা চাটে।

দুটি ঢাউস মোমবাতি জ্বেলে আমরা গ্রিল করা টেম্পো বার্গারের সঙ্গে সালাদ খাই। এসব খাবারে নাথানিয়েলের রুচি হয় না একেবারে। তিনি এক বাটি নরম পরিজ খান। ম্যাকাও পাখিটি দাঁড়ে বসে চোখ মুদে ঝিমাচ্ছিল। তিনি খানিকটা পরিজ খেয়ে বাটিতে চামচ রেখে দিতে সে পাখা ঝটপটিয়ে টেবিলে ল্যান্ড করে। চপচপ করে অর্ধভুক্ত পরিজ চেটেপুটে খেয়ে সে লাফ দিয়ে উঠে বসে তার ঘাড়ে। নাথানিয়েল এখন চোখ বুজে ঝিমাতে ঝিমাতে তার লেজের দীর্ঘ রঙিন সব পালকে আঙুল বোলাচ্ছেন। টেবিলে নিঃসাড় হয়ে পড়ে থাকা সবুজ গিরগিটির চোখে মোমের আলো পড়ে পুঁতির মতো ঝিকমিক করে। নাথানিয়েল কিছুই বলছেন না। তবে আমি ও ডেব্রা মৃদু স্বরে টুকটাক কথা বলি। সাংস্কৃতিক দিক থেকে এই দম্পতিকে হিপি বলা চলে। ভারতীয় সভ্যতার প্রতি আছে দুজনের অগাধ কৌতূহল। অন্য হিপিদের সঙ্গে মিলেঝুলে তাঁরা ভ্রমণ করেছেন একাধিকবার বুধগয়া, বারানসি, লছমনঝোলা, গোয়া, কাঠমাণ্ডু ও কাশ্মীর। একবার গ্রিসের এথেন্স থেকে ড্রাইভ করে বসফরাস পাড়ি দিয়ে তাঁরা ঢুকে পড়েন ইস্তাম্বুলে। তারপর ইরান হয়ে হিরাতের সীমান্ত পেরিয়ে আফগানিস্তানের অন্যান্য শহরে ঢুঁ মেরে অবশেষে কান্দাহার অতিক্রম করে প্রবেশ করেন বেলুচিস্তানে। পরে অমৃতসরে তাঁদের গাড়ি হাইজ্যাকড হলে চণ্ডীগড় থেকে ট্রেনে চেপে আগ্রা-দিল্লি হয়ে হায়দরাবাদ পর্যন্ত যান। ভ্রমণ ছাড়া পেশাগতভাবে নাথানিয়েল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ওয়ার্ল্ড রিলিজিয়ন কারিকুলামে বৌদ্ধ ধর্মের কোর্সগুলো পড়াতেন। ডেব্রাকেও একাডেমিক বলা চলে। তাঁর একসপার্টিজ জৈন ও বৌদ্ধ যুগের স্থাপত্যকলা নিয়ে।

নাথানিয়েলের সারা শরীর কেঁপে কেঁপে হিক্কা উঠতে থাকে। তাতে বিরক্ত হয়ে ম্যাকাও পাখিটি উড়ে চলে যায় হর্স ট্রেইলারের দিকে। শরীর একটু শান্ত হয়ে আসতেই নাথানিয়েল চোখ মেলে ডেব্রার দিকে তাকিয়ে ‘হানি, মে আই’ বলে কিসের যেন অনুমতি চান। ডেব্রা সস্নেহে ‘গো অ্যাহেড সুইট হার্ট’ বলে পারমিশন দিতেই তিনি উঠে ঠিরঠিরিয়ে তাঁবুর দিকে যান। ডেব্রার সঙ্গে আমার চোখাচুখি হয়। তাঁকে অস্থির দেখায়। মনে হয়, তাঁর যেন সংসারের অনেক কাজ বাকি আছে, বাস্তবায়ন হয়নি অনেক স্বপ্নের, কিন্তু কী কারণে যেন তিনি কিছু গুছিয়ে উঠতে পারছেন না। আমি এবার তাঁর সঙ্গে আরেকটু কানেক্ট করার জন্য জিজ্ঞেস করি—হাউ আর ইউ ডুয়িং নাউ, ডেব্রা? তিনি হাসিতে রহস্য ঝরিয়ে বলেন—মনে হচ্ছে আমি এক থিয়েটার হলে খুব অপরিচিত একজনের সঙ্গে বসে আছি। কিন্তু আমার সামনের মঞ্চে কোনো অভিনেতা বা কুশীলব নেই। বসে থাকতে কিন্তু আমার খারাপ লাগছে না। তাঁর এই রূপক বক্তব্যে আমি বিভ্রান্ত বোধ করি।

নাথানিয়েল ফিরে আসেন কাচের বিচিত্রভাবে বাঁকাচোরা বর্ণাঢ্য একটি পাইপ নিয়ে। তিনি মাদার অব পার্ল বা ঝিনুকের কৌটা থেকে রাংতায় মোড়া হাশিশ বের করলে আমি তা শুঁকে জানতে চাই জিনিসটি চিত্রলের কি না। আমার অনুমানে খুশি হয়ে নাথানিয়েল বলেন—ইউ আর ভেরি ক্লোজ। কোথাকার সঠিকভাবে বলতে পারলে ইউ মে স্মোক অ্যাজ মাচ অ্যাজ ইউ ওয়ান্ট। জবাবে আমি এবার বলি—দিস হ্যাশ ইজ ফ্রম হিরাত। তিনি দুষ্টুমি করে বলেন—তুমি হিরাত থেকে উজবেকিস্তানের দিকে রওনা হওয়া কাফেলায় সওয়ার হলে কিন্তু পৌঁছে যাবে মোক্ষম মোকামে। আমি পিকনিক টেবিলে চাটি মেরে বলি—দিস হ্যাশ মাস্ট বি ফ্রম মাজার শরিফ। আমার অনুমানকে সমর্থন করে তিনি বলে ওঠেন—ইয়েস, ইউ আর হানড্রেড পার্সেন্ট রাইট। আমি স্মোক করার জন্য এবার ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে উঠি। কিন্তু ডেব্রা আস্তে-ধীরে ফায়ার রিংয়ের ভেতর লাকড়ি গুঁজে ক্যাম্পফায়ারের আগুন জ্বালান। তাতে চায়ের কেটলি চড়ালে আমরা ক্যানভাসের চেয়ার পেতে রিলাক্স করে পা ছড়িয়ে বসি।

তিনপেয়ে কুকুরটি এসে নাথানিয়েলের দুই হাঁটুর মাঝখানে জায়গা করে নেয়। ডেব্রা এবার পাইপে আগুন দিতে দিতে যেন জবাবদিহি করছেন, এ রকম ভঙ্গিতে বলেন—ওর নজিয়া বা বিবমিষা হলে আমরা একটু-আধটু হ্যাশ স্মোক করি। নাথানিয়েল তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বলেন—আই মাস্ট টেল ইউ অ্যাবাউট দিস ওয়ান্ডারফুল ডগ। মেক্সিকোতে পেশাদারভাবে অন্য কুকুরের সঙ্গে সে ফাইট করত। লোকজন ডগ ফাইটের আসরে এসে তার ওপর বাজি ধরত। ফাইটে আহত হলে তার হ্যান্ডলার তাকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়। আমি জানতে পেরে তার জীবন ভিক্ষা করি। ডেব্রার স্মোক করা হয়ে গেছে। তিনি নাথানিয়েলের দিকে পাইপ বাড়িয়ে দিতে দিতে বলেন—আমরা মাত্র দেড় শ ডলার দিয়ে তাকে কিনে নিই। সার্জারিতে কুকুরটির শুধু একটি পা কেটে বাদ দিতে হয়। নাথানিয়েল আমার দিকে পাইপ বাড়িয়ে দিয়ে বলেন—ফাইটিং ডগ হিসেবে তার যে অ্যাগ্রেসিভ স্বভাব ছিল, আমাদের সঙ্গে থেকে সব বদলে গেছে। নাও হি বিকেইম আ রিয়েল বুড্ডিস্ট পিস লাভিং ডগ। আমি পাইপে টান দিলে তার স্ফটিকের বিবিধ কোণে আগুনের প্রতিবিম্ব ঝিকমিক করে।

ডেব্রা পেয়ালায় চীনা জিনসেং টি ঢেলে দেন। চায়ে চুমুক দিতে দিতে নিশাচরদের সরব সিম্ফনির ভেতর দিয়ে নাথানিয়েলের কথাবার্তা যেন অনেক দূর থেকে ভেসে আসে। আমি চোখ খুলে তাঁর দিকে তাকাই। তিনি বৌদ্ধ শ্রমণদের মতো নির্লিপ্ত হেসে বলেন—ইউ নো, দ্য বেস্ট ডে ইন মাই লাইফ ওয়াজ...তোমার সঙ্গে যেদিন নামিবিয়ায় দেখা হলো। আমরা দাঁড় বেয়ে ফিশ রিভার ক্যানিয়নের এক ঘাটে নাও ঠেকিয়েছি। ডাঙায় শুধু পাথর আর খয়েরি রঙের কঙ্করময় মাটি। তাতে ঝিকমিক করছে রুপালি মাইকা। দূরে নদীজলে শুঁড় ডুবিয়ে ফোয়ারার মতো জল ছুড়ছে অনেকগুলো কাচ্চাবাচ্চাসহ দাঁতাল হাতি। ইউ ওয়ার ভেরি কাইন্ড, ডেকে নিয়ে আমাদের মরচে রঙের পাথরের স্তরের ওপর বসালে। কোথাও কোনো গাছপালা ঘাসলতা শ্যামল সবুজ কিছুই নেই। আমি তোমার মুখোশের দুটি ছিদ্র দিয়ে স্থির দুই চোখের দিকে তাকিয়ে আছি। তুমি ভোজবাজির মতো বের করলে হাতির মাথার খটখটে একটি শুকনা খুলি। তাতে স্পষ্ট বুলেটের একটি ছিদ্র। ওখানে ফুঁ দিয়ে দিয়ে তুমি বিচিত্র এক শব্দ সৃষ্টি করলে। আমরা তাকিয়ে তাকিয়ে যেন সেই শব্দের ভাইব্রেশনকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম। দেখতে দেখতে সেই শব্দ রূপান্তরিত হলো ছোট ছোট মরুজীবী গাছবিরিক্ষে। তাতে খুব ধীরে ধীরে ফুটল বেগুনি সব ফুল। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম, তাদের পুষ্পিত কোরকে উড়ে এসে ঠোঁটের সুচ ফোটাচ্ছে ছোট্ট ছোট্ট সানবার্ড।

ডেব্রা তাঁকে চেয়ার থেকে টেনে তুলে বলেন—হানি, এনাফ অব টকিং। এখন তোমার ঘুমানোর সময়। লেটস গো টু বেড। নাথানিয়েল ঘুরে আমার কাঁধে হাত দিয়ে বলেন—লিসেন দ্য ম্যাজিকম্যান, স্লিপিং ইজ আ হিউজ প্রবলেম ফর মি। সারা রাত আমি বিছানায় ছটফট করি, ঘুমাতে পারি না একেবারে। তারপর হাঁটু গেড়ে আমার পায়ের কাছে বসে প্রথমে তিনি পেয়ালা উপুড় করে মাটিতে ঢালেন জিনসেং টির তলানি। তারপর হু হু কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলেন—প্লিজ, ডু সামথিং ফর মি। তাঁকে টেনে তুলতে তুলতে আমি বলি—ইয়েস, আই অ্যাম গোয়িং টু হেল্প ইউ রাইট নাউ। তবে আমাকে টেন্ট থেকে একটা জিনিস নিয়ে আসতে হবে। তিনি হাত তুলে আমাকে বাধা দিয়ে বলেন—বাট, আই ডোন্ট ওয়ান্ট দ্য এলিফ্যান্ট স্কাল, নো...নো, বলে তিনি ককিয়ে উঠলে আমি বলি— না না, হাতির খুলি আমি আনব কেন, অন্য জিনিস নিয়ে আসছি। অ্যান্ড আই গ্যারান্টি...ইউ আর গোয়িং টু স্লিপ পিসফুলি টু নাইট।

তাঁবুতে ফিরে ব্যাকপ্যাকে বার্টার করার জন্য যে উইন্ড চাইম নিয়ে আমি জঙ্গলে ঘুরছি, তা নিয়ে আসি। বালি দ্বীপে প্রস্তুত বাঁশের টাব দিয়ে তৈরি এই উইন্ড চাইমটি আমি এক ডলার দিয়ে ট্যাগ সেল থেকে কিনি। এসে দেখি, ততক্ষণে ডেব্রা তাঁকে তাঁবুর ভেতরে শুইয়ে দিয়েছেন। তিনপেয়ে কুকুরটিও তাঁর কম্বলের ভেতর ঢুকে পড়েছে। আমি উইন্ড চাইম ঝোলানোর জন্য আংটাফাংটা কিছু খুঁজি। তাঁদের তাঁবুর ওপর শামিয়ানার মতো খাটানো ত্রিপলের টার্পের কিনারায় প্লাস্টিকের ফ্রেমে তা ঝুলিয়ে দিলে তাতে হাওয়ায় দোল লেগে মৃদুমন্দ ধ্বনি ওঠে। ডেব্রা উঠে দাঁড়িয়ে জিপার সরিয়ে টেন্টের ট্রান্সপারেন্ট জানালা খুলে দেন। তাঁর হাতে ব্যাটারিওয়ালা নাইট ল্যাম্প। মুখে তার সবুজাভ আলো পড়ে ডেব্রাকে কেমন যেন অপার্থিব দেখায়।

আমি তাঁবুর কিনার থেকে ফিরে এসে পিকনিক বেঞ্চে বসি। পেয়ালায় এখনো আছে খানিকটা ঠাণ্ডা জিনসেং টি। আমি তাতে চুমুক দিয়ে উইন্ড চাইমের ড্রাপ ড্রাপ ধ্বনি শুনি। এই শব্দ থেকে থেকে আমার চেতনায় ছড়িয়ে দিচ্ছে খুব সুদিং এক আওয়াজ। অনেক রাত পর্যন্ত বসে ছিলাম। সরসর করে ঝোড়ো হাওয়া বইছে। ফ্লাশফ্লাডের বিষয়টি বুঝতে পারি জুতাসহ আমার পা ভিজে উঠলেই। নিশ্চয়ই ব্লুরিজ মাউন্টেনের উজানে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। না হলে শ্যানানডোয়ায় বন্যা হওয়ার তো কথা নয়। নদীর তীরে ব্যাককান্ট্রি ক্যাম্পিংয়ের তাঁবু খাটিয়ে কী যে বোকামি করেছি! কিন্তু এখন তা শোধরানোর উপায় নেই। পিকনিক বেঞ্চের ওপর পা তুলে বসার চেষ্টা করি। পানির বিপুল তোড়ে টেবিল উল্টে যেতে যেতে...কোনো গাছে ওঠা যায় কি না...না, পানির প্লাবন যেন একেবারে ভাসিয়ে নেয়। ডেব্রা অসুস্থ মানুষটাকে নিয়ে, আর তাঁদের কুকুর, ম্যাকাও পাখি, ঘোড়া...কিভাবে যে সব ম্যানেজ করছেন? ভাসতে ভাসতে ভাবি—ভোর হলে নিশ্চয়ই রেসকিউ হেলিকপ্টার আসবে। কোনোক্রমে গাছফাছ জাপটে ধরে মাত্র ঘণ্টা কয়েক, সকাল হলেই হেল্প পাওয়া যাবে।

বৃষ্টি পড়ছে না, তবে আকাশে বিজলি চমকাচ্ছে। বজ্রবিদ্যুতে আকাশ ঝলসে উঠলে আমি চকিতে দেখতে পাই শ্যানানডোয়ার সম্পূর্ণ জলের শরীর। চাঁদ ডুবে গেছে, তাই সিল্কের ধনেখালীতে সোনালি বুটির মতো তার রুপালি জলের জমিনে ঝলমল করছে তাবৎ ছায়াপথ। আমার শিরায় শিরায়, পাকস্থলীর সর্বত্র ঢুকে পড়েছে জল। রক্তের সঙ্গে এখন যেন ধমনিতে বইছে শ্যানানডোয়া। বিদ্যুৎ চমকালে আমি প্লাবনে ভেসে যাওয়া নদীকে আবার পূর্ণাঙ্গভাবে দেখতে পাই। তার পাড়ের দৃশ্যপট এবার সম্পূর্ণ বদলে গেছে। না, আমি হানড্র্রেড পার্সেন্ট শিওর, এটা ব্লুরিজ মাউন্টেন না। পরিচিত পাহাড়ের তলায় বয়ে যাওয়া জাফলংয়ের নদীটিকে পরিষ্কারভাবে চিনতে পারি। হাউ স্ট্রেঞ্জ! টোটালি মাইন্ড বাগলিং! ওয়াও! কিন্তু ফ্লাশফ্লাড সাত সমুদ্র অতিক্রম করে তো এত দূর ভেসে আসার কথা নয়। হোয়াট দ্য হেল ইজ গোয়িং অন? নদী ঊর্মিমালার ইঙ্গিতে কথা বলে! সে যেন জলের ভাষায় বলতে চাইছে—তোমরা যাকে নদী বলো, মূলত তা তো কিছু জল, বালুকায় ছড়ানো পাথর, আর স্রোতের সমাহার। শ্যানানডোয়ার সঙ্গে জাফলং রিভারের তফাতই বা কোথায়? আমরা সাত সমুদ্র তেরো নদীর ভেতর দিয়ে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত না? দিস ইজ ভেরি কনফিউজিং, ড্যাম ড্যাম ডিসওরিয়েন্টিং!

আমার দীর্ঘ চুল ভেসে যাওয়া গাছের ডালেফালে আটকে গেল নাকি? কী মুশকিল? কিছু যেন আমার মাথায় নিড়ানি দিয়ে আঁচড়াচ্ছে। খুব কষ্টে চোখের দুপাতা খুলি। বিলি কেটে আমার কেশ এবার মুঠো করে ধরে আছেন ডেব্রা। তিনি মুঠি আলগা করে পাশে বসতে বসতে বলেন—সো, ইউ ডিড আ রিয়াল ম্যাজিক, ম্যান। দ্য সাউন্ড অব ইওর উইন্ড চাইম ইজ সো গুড। হি ইজ টোটালি ইন স্লিপ। গেল ৯ দিনের মধ্যে এই প্রথম সে শান্ত হয়ে ঘুমাচ্ছে। উহ্, হোয়াট এ রিলিফ! আমি প্রশংসিত হওয়ার লোভে তাঁর দিকে হাত বাড়িয়ে দিই। তিনি যেন স্কার্টে লেগে থাকা ঝরাপাতা ঝাড়ছেন, এমনভাবে আমার হাত সরিয়ে দিয়ে বলেন—ইউ আর ভেরি স্ট্রেঞ্জ, ইনডিড আ ভেরি ভেরি স্ট্রেঞ্জ গাই। আমি মনঃক্ষুণ্ন হয়ে উঠে দাঁড়ালে তিনি পেছন থেকে বলেন—ডু ইউ নো দিস? স্ট্রেঞ্জনেস মেইড ইউ সাম হোয়াট অ্যাট্রাক্টিভ। আমি কোনো জবাব না দিয়ে নীরবে আমার তাঁবুর দিকে হাঁটি।

আজ জার্নালে বেশ খানিকটা লেখা হলো। আমি পর পর পৃষ্ঠা উল্টিয়ে পাহাড়ি ট্রেইলে দিনযাপনের বিস্তারিত খতিয়ান মনোযোগ দিয়ে পড়ি। আমার লেখায় চলার পথের বর্ণনা কিছু আছে বটে, তার চেয়েও বেশি প্রাধান্য পেয়েছে যাঁদের সঙ্গে দেখা হয়েছে তাঁদের জীবনের দ্বন্দ্ব, স্মৃতি, বিষণ্নতা এবং আরো এগিয়ে যাওয়ার উদ্যম। না, লিখে আমি সন্তুষ্ট হতে পারি না। যে শব্দস্কেপ আমি তৈরি করেছি, তার হরফগুলোর ফাঁকফোকরে ছড়িয়ে দিতে চাই যাপিত প্রতিটি দিনের অনুভূতি, প্রকৃতির সংবেদনশীলতা ও আমার সহজিয়া মেজাজ। আমার ভাবনা শব্দের প্রকরণ অতিক্রম করে নৈঃশব্দ্যের বিমূর্ততায় প্রকাশ খোঁজে। অনিটার দেওয়া রঙিন ক্রেয়ন দিয়ে আমি পৃষ্ঠাগুলোর মার্জিনে আঁকতে শুরু করি প্রতিদিনের অনুভূতি ও তার বিশেষ বিশেষ মুড।

নদীজলে ভেসে আসে কালচে সবুজ পালকের চোখের কাছে সাদা কোণ আঁকা একটি বড়সড় ম্যুরাল। মাথায় লোহিত মখমলের ঝুঁটিতে তার পুরুষ পরিচয় স্পষ্ট। সে দুটি প্রসারিত ডানায় কুয়াশা ছত্রখান করে দিয়ে পা দিয়ে আলতো নাচের ভঙ্গিতে ঘুরে যায়। থেকে থেকে গ্রীবা হ্রস-দীর্ঘ করে অদৃশ্য কোনো নারী ম্যুরালের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায় সে। আমি রেলিং ধরে যাযাবর এই হাঁসের কোর্টিং রিচ্যুয়াল প্রত্যক্ষ করি। স্পষ্টতই সে এক নারী হাঁসকে ইমপ্রেস করতে চাইছে। তার পালকের বর্ণ, ঝুঁটিতে লোহিত মখমলের ফুল, গ্রীবার মোহন ভঙ্গি—সব কিছুর লক্ষ্য, দি ওনলি এইম, কিন্তু বিপরীত লিঙ্গের অদৃশ্য আরেকটি মরাল। না, অন্য কোনো মেয়েহাঁস তার পালক ও গ্রীবার বর্ণাঢ্য ডিসপ্লেতে মুগ্ধ হয়ে এগিয়ে আসে না। তাতে সে হাল ছেড়ে না দিয়ে পানি ছুঁয়ে ছুঁয়ে সুইটেবল সুইট হার্টের সন্ধানে কুয়াশা কেটে কেটে উড়ে যেতে থাকে উজানে। মরালের উড্ডীন রেখা কুয়াশায় মৃদু হতে হতে হারিয়ে গেলে আমি আবার নোট বুকে আমার নিজস্ব লেখায় ফিরে আসি। পাখির চকচকে পালকের মতো সব ঝলমলে শব্দ, দুটি বাক্যের মধ্যকার অব্যক্ত শুভ্রতা, মখমলের ফুলের মতো বর্ণাঢ্য উপমা, সমস্ত কিছু ঘিরে অনুভবের উড্ডয়ন রেখা আর কল্পনার কিছু রঙিন নকশা...হোয়াই অ্যাম আই রাইটিং অল দিজ? লিখে মার্জিনে রং ছড়াচ্ছি কেন? হু অ্যাম আই ট্রাইং টু ইমপ্রেস, হু অ্যাম আই ট্রায়িং টু কোর্ট? এই লেখা প্রকাশিত হলে কেউ পড়বে কি? ভবিষ্যৎ আমার কাছে নদীর ওপরে ভেসে থাকা কুয়াশার মতো আবছা দেখায়। মনে হয়, কোনো এক দিন মনোযোগ দিয়ে কোনো এক হাইকারের রোজনামচা পড়বে যে মানুষ, তার হয়তো এখনো জন্ম হয়নি। মনে হয়, তার সন্ধানে এগিয়ে যেতে হবে কুয়াশায় মরালের উড্ডয়ন রেখার মতো বয়সের আরো উজানে।

‘হিয়ার ইউ আর সিটিং অন দ্য ডেক’ বলে স্কার্ফে কুয়াশা জড়িয়ে ডেব্রা এসে দাঁড়ান সামনে। তাঁর হাতে কফির মগ এবং পিরিচে কিছু একটা পেপার টাওয়েল দিয়ে ঢাকা। আমি গুড মর্নিং বলে তাঁর দিকে তাকালে তিনি আর্কিওলজিস্ট যে রকম পুরাতাত্ত্বিক সাইটে পাওয়া তৈজসপত্র খুঁটিয়ে দেখে, এমন ভঙ্গিতে আমাকে মাপজোখ করতে করতে মৃদু হেসে বলেন—তোমার এক্সপ্রেশনের দিকে তাকালে মনে হয় তুমি যেন টেপ চালিয়ে তোমার নিজের গাওয়া গান মুগ্ধ হয়ে শুনছ। দিস ইজ পিওর নার্সিসিজম ম্যান। আই হেট ইট। আমি বাতাসে ছড়ানো গুয়াতেমালান কফির তীব্র অ্যারোমা শুঁকতে শুঁকতে তাঁর দিকে নজর করে তাকাই। তাঁর ছাই ছাই খানিকটা ম্রিয়মাণ সোনালি বর্ণের চুলকে বোধ করি অ্যাশব্লন্ড বলে থাকে। ডেব্রা আজ তা টেনে ক্লিপ দিয়ে পেছন দিকে পনিটেইল করে বেঁধেছেন। সামনের দিকে কিছু চুল প্রথম বন্ধনীর মতো বাঁকা হয়ে নেমে এসেছে ভুরুর কাছে। হেয়ারডুর এক বাঁকানো ভঙ্গি, যা ব্যাং বলে পরিচিত, তিনি গ্রীবা হেলাতেই তা এসে চোখের ওপর পড়ার উপক্রম হয়, তাতে নিমেষে যেন তাঁর বয়স কমে যায় বছর দশেক। তাঁর মন্তব্যে আমি মনঃক্ষুণ্ন হয়েছি, গেল রাতেও আমাকে ঠুকে দেওয়া একটি মন্তব্য শুনেছি। এই আচরণের পেছনে উদ্দেশ্য কী তা আমি বোঝার চেষ্টা করতেই তিনি হাত দিয়ে কপাল থেকে বাঁকা হয়ে নেমে আসা চুল সরান। আমি তাঁর তর্জনীর নখে লাগানো পার্পল নেইলপলিশের দিকে তাকিয়ে বলি—আই অ্যাম থিংকিং টু লিভ নাউ। ভাবছি তাঁবু গুটিয়ে হাঁটতে শুরু করব। তাঁর চোখে-মুখে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখি না। ডেব্রা নির্লিপ্তভাবে বলেন—মে আই অফার ইউ সাম কফি অ্যান্ড এ পিস অব প্যানকেক? রেসপন্সে আমি নো থ্যাংকস বলে যোগ করি—আপনাদের তো যথেষ্ট ফুড সাপ্লাই নেই। আমি এই খাবারে ভাগ বসাতে চাই না। তিনি এবার আমার দিকে গাঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেন—লিসেন, আমি ইন্ডিয়ান পুরুষদের সঙ্গে ডেট করেছি। আই আন্ডারস্ট্যান্ড দেম। গতকাল আমাদের সাপ্লাই কম বলে মন্তব্য করায় তুমি সেন্টিমেন্টাল হয়েছ। একটু আগে প্যানকেক বানাতে বানাতে আমি ভেবে দেখলাম, আমার কালকের অ্যাসেসমেন্ট সঠিক ছিল না। নাথানিয়েল তো এসব খাবার বিবমিষার জন্য খেতে পারছে না। সুতরাং তোমার সঙ্গে কিছু খাবার শেয়ার করলেও আমার স্টকে যে সাপ্লাই আছে তা দিয়ে বেশ কয়েক দিন চালিয়ে দেওয়া যাবে। ইউ আর ওয়েলকাম টু স্টে হিয়ার ফর এ ফিউ মোর ডেইজ।

আমি কিন্তু তাঁবু গোটানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি—বললে ডেব্রা দপ করে ডেকের বেঞ্চে বসে পড়েন। একটু পর কপাল থেকে বাঁকানো চুল সরিয়ে খুব ধীরে ধীরে বলেন—আমার ভেতর একসঙ্গে বাস করছে সম্পূর্ণ দুটি সত্তা। তুমি কখনো নদীর মোহনা দেখেছ? দুটি ভিন্ন ভিন্ন নদীর জলধারা পরস্পরের সঙ্গে মিশে গিয়েও তাদের স্বতন্ত্র স্রোত, জলের ভিন্ন বর্ণ বেশ কিছু দূর পর্যন্ত বজায় রাখে। আমি প্রাচ্যদেশীয় বৌদ্ধ ধর্ম অ্যাডাপ্ট করেছি, আবার আমার মধ্যে আছে আমার নিজস্ব আমেরিকাননেস। নিত্যদিন আমি এই দুটি সত্তার টানাপড়েন তীব্রভাবে ফিল করি। আমার আমেরিকান সত্তা বলছে সংকট আসন্ন, খাবার সাবধানে ব্যবহার করা উচিত। এ বিষয়টি অতিথিকে ডিরেক্টলি বলা দোষের কিছু নয়। আবার আমার ভেতরে প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধ সত্তা নিয়ত জানিয়ে দিচ্ছে, আমি বেঁচে আছি কেবল বর্তমান মুহূর্তে। এই মুহূর্তে আমার স্টকে কিছু খাবার আছে, এখানে বৌদ্ধ ধর্মজাত মূল্যবোধ হচ্ছে নিজে আহার গ্রহণের আগে অতিথিকে তা অর্পণ করা। ভবিষ্যেক নিয়ন্ত্রণ করার ভাবনা থেকে আসে স্ট্রেস বা উদ্বেগ। আজ সকালে বিপাসনার ধ্যান করতে গিয়ে মনে হলো, ভবিষ্যতের সংকটের কথা না ভেবে বর্তমান মুহূর্তকে এনজয় করা উচিত। ডেব্রা কিছুক্ষণ নীরব থেকে কাঠের ডেকে হাঁটু গেড়ে বসে আমার দিকে জোড়হাত করে বলেন—উড ইউ কাইন্ডলি অ্যাকসেপ্ট মাই অফারিং? আমি তাঁর চোখে বানভাসিতে ভাসমান গাছের দিকে সাঁতরে যাওয়া মানুষের অভিব্যক্তি দেখতে পেলে দ্রুত কফির কাপ হাতে তুলে নিয়ে তাতে চুমুক দিই। তিনি এবার হাসিমুখে উঠে বেঞ্চে বসলে আমি তাঁর দিকে পেয়ালা এগিয়ে দিই; তিনি একই কাপে ঠোঁট ছোঁয়ান।

আমরা অল্প একটু ম্যাপল সিরাপ দেওয়া প্যানকেক ভাগ করে খেতে গেলে ডেব্রার কোমরের বেল্টে ক্লিপ দিয়ে আটকানো ওয়াকিটকিতে লাল বাতি দপদপ করে জ্বলে ওঠে। তিনি সুইচ অন করতেই নাথানিয়েলের গলা পাওয়া যায়। তিনি ভোরবেলার অমিতাভ মন্ত্র জপ করছেন। ওয়াকিটকি থেকে স্পষ্ট ভেসে আসে—ওম অমিদেভা বৃহ, নমো অমিতাভো তথাগত...। ডেব্রা অস্থির হয়ে উঠে পড়ে বলেন—আই হ্যাভ টু গো ব্যাক। একটু পর পিকনিক টেবিলে চলে এসো। একসঙ্গে হামিংবার্ডের মাইগ্রেশন দেখব। আমি নির্বাক থাকলে তিনি মৃদু হেসে বলেন—ইউ আর নট গোয়িং অ্যানিহয়ার, আর ইউ? আমি মাথা হেলিয়ে তাঁকে নিশ্চিত করে বলি—না, আমি কোথাও যাচ্ছি না। একটু পর এসে আপনাদের সঙ্গে হামিংবার্ড দেখব। আই নো দ্যাট—বলে ডেব্রা রহস্যময় হেসে তাঁবুর দিকে হেঁটে গেলে মাকড়সার জালে আটকে পড়া প্রজাপতির প্রতীকটি আবার মনে ভাসে।


মন্তব্য