kalerkantho


অগ্নিকন্যার দ্বিতীয় অধ্যায়

মোস্তফা কামাল

২৫ জুন, ২০১৭ ০০:০০



অগ্নিকন্যার দ্বিতীয় অধ্যায়

শেখ মুজিব ঢাকা বিমানবন্দরে পা রেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লেন।

করাচি থেকে ফ্লাইট ছাড়ার আগমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি অস্বস্তি বোধ করছিলেন।

অবশ্য ছয় দফা ঘোষণা করার পর তাঁকে বেশ উত্ফুল্ল দেখাচ্ছিল। হঠাৎ কেউ একজন বলল, করাচি পুলিশ তাঁকে ঢাকায় ফিরতে দেবে না। এর পর থেকেই তাঁর মন খুব খারাপ হয়ে যায়। কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ে।

শেখ মুজিব মনে মনে বলেন, আমি তো কোনো দিন পুলিশের গ্রেপ্তারের ভয় করিনি। আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতি করলে না হয় কথা ছিল। জেল-জুলুম-অত্যাচার সহ্য করেই তো এত দূর এসেছি! আজ এমন লাগছে কেন!

রাতে হোটেলে খাওয়ার টেবিলে শেখ মুজিব তাজউদ্দীন আহমদকে বললেন, আমার মনটা খুব খারাপ। কথা বলতেও ভালো লাগছে না। তুমি যাও, ঘুমিয়ে পড়ো।

সকালে একসঙ্গে নাশতা করব।  

তাজউদ্দীন আহমদ কথা না বাড়িয়ে ঘুমাতে চলে যান। শেখ মুজিবের মন খারাপের ব্যাপারটা তাজউদ্দীন নিজেও লক্ষ করেছেন। কিন্তু তিনি কিছু বলবেন কি বলবেন না, এই করে করেই সময় পার করেছেন। বলা আর হয়নি। কেন বলেননি তা ঠিক বোঝা গেল না। তাজউদ্দীন ভেবেছিলেন, সকালে নাশতার টেবিলে কিংবা ফ্লাইটে উঠে শেখ মুজিবই মন খারাপের কারণ জানাবেন। সে জন্য তিনি অপেক্ষাও করেছেন। শেষ পর্যন্ত শেখ মুজিবের নির্লিপ্ত ভাব দেখে তাজউদ্দীন এ প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান।

ঢাকায় নিজের মাটিতে পা রেখে শেখ মুজিব শান্তি অনুভব করেন। এখন গ্রেপ্তার করলেও যেন কোনো আপত্তি নেই—এমন একটা ভাব তাঁর। তিনি তাজউদ্দীন আহমদের কাঁধে হাত রেখে হাঁটতে শুরু করলেন। হাঁটতে হাঁটতে বললেন, বুঝলা তাজউদ্দীন, দেশে এসে গেছি! এখন আর চিন্তা নাই! করাচিতে কেন জানি অস্বস্তি লাগছিল। এ রকম আমার কোনো দিন হয়নি।  

জি, মুজিব ভাই। আপনার চেহারা দেখেই আমি বুঝতে পারছিলাম। ছয় দফা ঘোষণার পর আপনি খুব হাসিখুশি ছিলেন। চমৎকারভাবে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। কী যে ভালো লাগছিল আমার! সংবাদ সম্মেলন শেষ হওয়ার পর হঠাৎ দেখলাম, আপনার মুখখানা মলিন। কী নিয়ে যেন ভাবছেন। আমি তো রীতিমতো দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। মনে মনে খুব ভয়ও পাচ্ছিলাম। আপনি যে ঝুঁকি নিয়েছেন! এত বড় ঝুঁকি খুব কম নেতাই নিতে পারেন। আমি ধারণা করেছিলাম, আপনি অন্য কিছু বলবেন। ছয় দফা ঘোষণা পরে করবেন! সম্মেলনে ঘোষণা করতে না পেরে মনে মনে ভাবলাম, সাংবাদিকদের ডেকে ছয় দফা ঘোষণা করলে বেশি কার্যকরী হবে। তাই সুযোগটা আর হাতছাড়া করলাম না।

আপনি ঘোষণা দেওয়ার পর মনের মধ্যে এক ধরনের দুশ্চিন্তা হচ্ছিল। কেন জানি মনে হচ্ছিল, ইমিগ্রেশন পুলিশ আপনাকে আটক করবে।

তুমি ঠিক ধরেছ তাজউদ্দীন। গ্রেপ্তার করতেই পারত! হয়তো ইমিগ্রেশনের কাছে তখনো খবর আসে নাই।

জি, আমারও তাই ধারণা। তবে আইয়ুব খান মনে হয় জ্বলেপুড়ে মরছেন।

শেখ মুজিব হাসলেন। তারপর বললেন, এর চেয়ে তো বড় ধাক্কা সে আর কখনো খায়নি। আর সে হয়তো ভাবতেও পারে নাই, আমি ছয় দফা ঘোষণা করে দেব।  

জি, ঠিক বলেছেন। তা ভাবে নাই।

তোমার কি মনে হয়, ছয় দফা ইস্যুতে জনগণের সমর্থন পাব?

অবশ্যই মুজিব ভাই। এক শ ভাগ সমর্থন পাবেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আপনি যে দাবিনামা উত্থাপন করলেন তা সাড়ে ছয় কোটি বাঙালির প্রাণের দাবি।

ধন্যবাদ তাজউদ্দীন। শোনো, দেশের স্বার্থে ঝুঁকি তো নিতেই হবে। তা ছাড়া তুমি তো জানো, আমি নিজের জীবন নিয়ে ভাবি না। দেশের জন্য যদি কিছু না-ই করতে পারলাম তাহলে এই জীবন দিয়া কী হইব!

ঠিক কথা মুজিব ভাই।

চলো, এবার বের হই।

জি, চলেন।

বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন পার হয়ে লাগেজ নিয়ে শেখ মুজিব সামনের দিকে কয়েক ধাপ এগিয়ে যান। হঠাৎ ‘মুজিব ভাই’ বলে কেউ একজন ডাকলেন। কণ্ঠ শুনেই মুজিব বুঝতে পারলেন, এই কণ্ঠ সৈয়দ নজরুলের ছাড়া আর কারো নয়। তিনি দাঁড়িয়ে এদিক-সেদিক তাকান। তাঁর ধারণাই সত্যি হলো। প্রথমেই তাঁর সৈয়দ নজরুল ইসলামকে চোখে পড়ল। তার সঙ্গে ড. কামালসহ আরো অনেককে দেখলেন। তিনি এ-ও দেখলেন, অপেক্ষমাণ নেতাদের চোখেমুখে সীমাহীন আনন্দ! সেই আনন্দের ঢেউ শেখ মুজিবকেও আন্দোলিত করল।

শেখ মুজিব প্রথমে সৈয়দ নজরুল এবং পরে ড. কামালের সঙ্গে হাত মেলান। তারপর তিনি সৈয়দ নজরুলকে উদ্দেশ করে বললেন, এদিকের খবর কী নজরুল? সব ঠিক আছে?

জি, মুজিব ভাই। সব ঠিক আছে। সাধারণ মানুষ খুব ভালোভাবেই নিয়েছে বলে মনে হয়। ইত্তেফাক, সংবাদ, আজাদসহ সব পত্রিকা খুব বড় কাভারেজও দিয়েছে। তবে আমরা আপনাকে নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় ছিলাম। আপনি যে দুঃসাহস দেখিয়েছেন! আইয়ুব সরকারের মনোভাব তো এমনিতেই ভালো না। যদি করাচিতে থাকা অবস্থায় গ্রেপ্তার করত!

দুশ্চিন্তার কথা বাদ দাও। তোমরা খুশি হইছ কি না সেইটা বলো?

শুধু আমরা! সারা দেশের মানুষ খুশি হইছে।

সরকারের মনোভাব কিছু বুঝতে পারলা?

শুনলাম, গভর্নর মোনেম খাঁ আপনার ব্যাপারে নেগেটিভ কথাবার্তা বলা শুরু করছে।

কী বলছে?

বলছে, আপনি নাকি বেশি বাড়াবাড়ি করছেন!

বাড়াবাড়ি মোনেম খাঁ করছে না! তার গুরু আইয়ুব খাঁ করছে না! পান থেকে চুন খসলেই মুজিব ভাইকে গ্রেপ্তার! এর চাইতে বাড়াবাড়ি আর কী হইতে পারে? কামাল হোসেন বললেন।

সৈয়দ নজরুল বললেন, দেশটারে তো দোজখখানা বানাইয়া ফেলছে। মুজিব ভাই কিছু বললেই দোষ! কী পাইছে আইয়ুব খাঁ! দেশের মানুষের জীবন নিয়া ছিনিমিনি!

আসলে আইয়ুব সরকার আমাকে খুব ভয় পায়। বুঝতে পারছ? ছয় দফা ঘোষণার পর নিশ্চয়ই ওদের মাথা খারাপ অবস্থা! শেখ মুজিব বললেন।

তাজউদ্দীন ইতিবাচক মাথা নেড়ে বললেন, জি, একদম ঠিক বলছেন। আর মোনেম খাঁ তো একটা পুতুল। আইয়ুব খাঁ যা বলে সে তাই করে। তার নিজের কিছু করার আছে?

তাজউদ্দীন আহমদের কথার সঙ্গে সুর মিলিয়ে কামাল হোসেন বললেন, মোনেম খাঁ আইয়ুব খাঁর একেবারে পারফেক্ট গোলাম। ইঙ্গিত পাওয়া মাত্র সে মুজিব ভাইরে গ্রেপ্তার করবে। এক মুহূর্তও দেরি করবে না।  

হুম। আমি জানি, আমাকে আবার গ্রেপ্তার করা হবে। সে জন্য আমি মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। যে কয়েক দিন বাইরে আছি, ছয় দফার পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে হবে। কী বলো?

তাজউদ্দীন বললেন, জি, মুজিব ভাই! আমার তো মনে হয় মোনেম খাঁ এখন নির্দেশের অপেক্ষায় আছে।

শেখ মুজিব এক পা দুই পা করে সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। হাঁটতে হাঁটতে তিনি বললেন, শোনো, শেরেবাংলার লাহোর প্রস্তাবের কথা তোমাদের মনে আছে তো!

সবাই একসঙ্গে বললেন, জি, মনে আছে।

সেই লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতেই কিন্তু দেশভাগ হইছে। কী, হইছে না?

তাজউদ্দীন বললেন, জি, হইছে।        

শেখ মুজিব এদিক-সেদিক তাকিয়ে তিন নেতাকে কাছে ডাকলেন। তাঁরা তিনজনই শেখ মুজিবের কাছাকাছি গিয়ে গোল হয়ে দাঁড়ালেন। শেখ মুজিব গলার স্বর নিচু করে বললেন, তোমাদের কাছে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে রাখি। এইবার আমার ছয় দফার ভিত্তিতে পাকিস্তান দুই ভাগ হইব। কথাটা মনে রাইখ্যো।

তিনজনই বললেন, জি, মুজিব ভাই।

আমাদের এখন কাজ হবে ছয় দফাকে জনপ্রিয় করে তোলা। সাধারণ মানুষের কাছে ছয় দফা নিয়ে হাজির হওয়া। আপাতত আমাদের স্বায়ত্তশাসন ছাড়া গতি নাই। এইটা সাধারণ মানুষও বুঝে গেছে।

তাজউদ্দীন তাঁর কথায় সায় দিলেন। তারপর বললেন, আপনি দু-এক দিন রেস্ট নিবেন না? ভাবিও আপনাকে নিয়া দুশ্চিন্তায় আছেন। পরিবারকে কিছু সময় দেন।

হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলছ। কিন্তু এখন যে অবস্থা, তাতে রেস্ট নেওয়া কিংবা পরিবারকে সময় দেওয়ার মতো সময় কই?

কিছুদিন পর বাচ্চারাও তো আপনার চেহারা ভুলে যাবে!

ভুলে যাবে কী—ভুলে তো গেছেই! আমি রেণুকে বলেছি, আমার তো জেলে জেলেই কাটাতে হয়, তুমি বাচ্চাদের সামলাও। তুমি ওদের মা, তুমিই ওদের বাবা!

ঠিকই বলছেন। ভাবি না হলে কী যে হতো!

বাদ দাও ওসব কথা। ছয় দফা যখন ঘোষণা করে দিয়েছি, এখন আর ঘরে বসে থাকা যাবে না। কাল থেকেই শুরু করো। জেলায় জেলায় সমাবেশ ডাকো। নজরুল, তুমি কী বলো?

জি, মুজিব ভাই। আপনি যা চাইবেন।

লোকজন পাবা তো?

অবশ্যই পাব। আপনার ব্যক্তিগত ইমেজের কারণেই সমাবেশে লোক আসবে।

তাহলে আর চিন্তা কী? চলো, এবার বাসায় যাই।

তারপর শেখ মুজিব সবাইকে নিয়ে বাসার উদ্দেশে রওনা হলেন।  

ফজিলাতুননেসা রেণুর কোলে শিশু রাসেল। সে অনেকক্ষণ ধরে আব্বা আব্বা বলে ডাকছে। ছোট্ট ছেলের ডাক শুনে রেণু ভাবেন, নিশ্চয়ই মুজিব আজ বাসায় আসবে। তা না হলে রাসেল এভাবে ডাকবে কেন?

কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর ভাবনা সত্য হলো। শেখ মুজিব তখনই বাসায় এসে পৌঁছলেন। তাঁর কলিং বেলের শব্দ পেয়ে ফজিলাতুননেসা রেণু দরজা খোলার জন্য এগিয়ে এলেন। শেখ মুজিব বাসায় ঢুকেই রাসেলের ডাক শুনলেন। শিশুর মুখে আব্বা ডাকটা শেখ মুজিবের বুকের মধ্যে গিয়ে লাগছে। তিনি হাতের লাগেজ পাশে রেখে কিছুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে রাসেলের ডাক শুনলেন। তারপর তাকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করতে করতে বললেন, আব্বা, আমার আব্বা! আমার লক্ষ্মী আব্বা! 

রাসেল থামেনি। সে ডেকেই যাচ্ছে, আব্বা আব্বা, আব্বা আব্বা! আব্বা আব্বা!

শেখ মুজিব তাঁর স্ত্রীকে বললেন, রেণু, তোমার ছেলে তো বিরামহীনভাবে আব্বা আব্বা করছে।

ফজিলাতুননেসা রেণু বললেন, ও সকাল থেকেই আব্বা আব্বা করে ডাকছে। ও হয়তো তোমার আসার খবর আগে আগেই পেয়ে গেছে।

শেখ মুজিব হাসি হাসি মুখ করে বললেন, তাই! সকাল থেকে ডাকাডাকি করছে?

এ সময় অন্য রুম থেকে হাসিনা এসে বললেন, আব্বা! তুমি কখন এসেছ?

এই তো, এখনই। দেখছিস, তোর ছোট ভাই কিভাবে আব্বা আব্বা করছে?

হ্যাঁ আব্বা, রাসেল আজ সারা দিনই তোমাকে ডেকেছে। তোমার বাসায় আসার খবরটা ওর কাছে হয়তো আগে আসে।

তাই! আমার লক্ষ্মী আব্বাটা! এই হাসু! কামাল, জামাল, রেহানা ওরা কই রে?

ঘরেই আছে। আমি ডেকে আনছি।

এর মধ্যেই তারা সবাই রুমে এসে ঢুকতে শুরু করল। ঢুকতে ঢুকতে কামাল বলল, ডাকতে হবে না হাসু আপু। আমরা চলে এসেছি।

শেখ মুজিব বললেন, তোমরা কেমন আছ আব্বা?

আমরা ভালো আছি আব্বা। রেহানা বলল।

রাসেলকে কোলে করে শেখ মুজিব খাটের ওপর বসলেন। তাঁকে ঘিরে কামাল, জামাল ও রেহানা বসল। হাসিনাও এক পাশে গিয়ে বসলেন। তারপর বললেন, মা, আব্বার জন্য আজ কী রান্না করবা? অনেক দিন আব্বার সঙ্গে খাই না। আজ সবাই মিলে একসঙ্গে খাব!

অবশ্যই। দেখি কী রান্না করা যায়। বাসায় কী আছে তাও তো জানি না। এই হাসু! তুই আমার সঙ্গে আয় না। আগে সবাইকে চা-নাশতা দেই। তারপর রান্না কী করা যায় তা নিয়ে চিন্তা করব।

ঠিক আছে মা। চলো যাই।

ফজিলাতুননেসা রেণু রান্নাঘরে গিয়ে চা-নাশতা রেডি করেন। তাঁকে সহায়তা করেন হাসিনা। তারপর তিনি ট্রেতে করে নাশতা নিয়ে এসে প্রথমে তাঁর আব্বার হাতে দিয়ে বলেন, আব্বা, রাসেলকে আমার কোলে দাও। তুমি খেয়ে নাও।

ও আমার কোলেই থাক না! আমি এক হাত দিয়ে খেতে পারব।

হাসিনা আর কথা না বাড়িয়ে কামাল, জামাল ও রেহানার হাতে নাশতার পিরিচ তুলে দেন। হাসিনা তাঁর মায়ের জন্য একটা পিরিচে নাশতা নিয়ে নিজেও খাওয়া শুরু করেন। খাওয়ার ফাঁকে এক এক করে সবার হাতে চায়ের কাপ তুলে দেন। ফজিলাতুননেসা রেণুও তাদের সঙ্গে যুক্ত হন। চা খেতে খেতে শেখ মুজিব পরিবারের সবার খোঁজখবর নেন। কে কোথায় পড়ে, কী পড়ে, কে কিভাবে স্কুলে যায়; এসব কথাবার্তা আর পারিবারিক আলোচনায় মশগুল হয়ে যায় সবাই।

হঠাৎ কলিং বেলের শব্দ পেয়ে হাসিনা সামনের দরজার দিকে এগিয়ে যান। দরজা খুলে দেখেন আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী এসে হাজির। তারা নেতাকে একনজর দেখার জন্য এসেছে। তাদের সামনের ঘরে বসিয়ে হাসিনা ভেতরের ঘরে যান। তিনি তাঁর আব্বাকে খবর দেন। আব্বা, আওয়ামী লীগের লোকজন এসেছে তোমার সঙ্গে দেখা করার জন্য।

শেখ মুজিব রাসেলকে কোলে নিয়েই সামনের ঘরে গেলেন।

 

 

দুই.

 

আইয়ুব খান সকাল সকাল অফিসে এসেছেন। তাঁর মনমেজাজ ভালো নেই। তিনি খুব চিন্তিত। অফিসে এসেই তিনি স্টাফদের বলে দিয়েছেন, এখন রুমে কেউ ঢুকবে না।

আইয়ুব খান রুমের মধ্যে পায়চারি করছেন আর ভাবছেন, মুজিব ছয় দফা ঘোষণা করে দিল! আগে থেকে কিছুই জানতে পারলাম না! সে কী কথা! গোয়েন্দারা কী করেছে! না না, এ ধরনের অযোগ্য অথর্ব গোয়েন্দা দিয়ে চলবে না! মুজিব সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে এভাবে আমাকে ঘোল খাইয়ে দিল! আমি কাদের নিয়ে চলি! আমি নিজে যেমন, আমার চারপাশের লোকরাও তেমন! যত্তসব গাধার দল!

আইয়ুব খান টেলিফোন তুলে সেনাপ্রধান জেনারেল মুহাম্মদ মুসা খান ও লে. জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে ডাকলেন। ফোনে ইয়াহিয়া কিছু একটা বলতে চাচ্ছিলেন। আর অমনি তার ওপর তেড়ে উঠলেন। আমি বলছি এই মুহূর্তে চলে আসতে! আমি পাঁচ মিনিট সময় দিলাম! এর মধ্যে আমার অফিসে না পৌঁছতে পারলে আসার দরকার নেই।

ইয়াহিয়া বুঝতে পারলেন প্রেসিডেন্ট সাহেবের মেজাজ ঠিক নেই। তিনি দ্রুত প্রেসিডেন্ট সাহেবের অফিসের উদ্দেশে রওনা হলেন। গাড়িতে উঠে তিনি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবেন, প্রেসিডেন্ট সাহেব পাঁচ মিনিট সময় দিয়েছেন। এর মধ্যে পৌঁছতে পারব তো! না পৌঁছালে ওনার মেজাজ আরো বিগড়ে যাবে। তখন আমার সেনাপ্রধান হওয়ার স্বপ্ন খান খান হয়ে যেতে পারে! হে আল্লাহ, তুমি প্রেসিডেন্ট সাহেবের মাথাটা ঠাণ্ডা রেখো!

টানা পাঁচ-সাতটা সিগারেট শেষ করেছেন আইয়ুব খান। নেশা করে মাথাটাকে এলোমেলো করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হচ্ছে না। ছয় দফা বারবার তাঁর মাথায় ঘুরপাক খায়। কখনো কখনো গজালের মতো খোঁচাতে থাকে। কী চায় মুজিব? স্বায়ত্তশাসন! নাকি পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্র করছে সে? আমি বুঝতে পারছি, সোজা আঙুলে ঘি উঠবে না। আঙুল বাঁকা করতে হবে। মুজিবকে যেকোনো মূল্যে, প্রয়োজনে অস্ত্রের মাধ্যমে দমন করতে হবে। মুসা খান তো কোনো কাজের লোক বলে মনে হচ্ছে না। কেন তাকে আমি সেনাপ্রধান বানালাম! কোথায় সে উদ্যোগী হয়ে মুজিবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলবে! তা না। তাকে আমার ডেকে পাঠাতে হলো।

প্রেসিডেন্ট সাহেব সিগারেটে সুখটান দিলেন। তারপর মুখ থেকে কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া বের করলেন। আর মনে মনে মুজিবকে শায়েস্তা করার কুবুদ্ধি আঁটলেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই মুসা খান এসে হাজির হলেন তাঁর দপ্তরে। তাঁকে দেখে বিরক্তির সুরে বললেন, কী ব্যাপার খান সাব? এত দেরি!

স্যরি স্যার। রাওয়ালপিন্ডি থেকে এসেছি।

হুম। তা তো জানি। আচ্ছা, ছয় দফার বিষয়ে কিছু জানেন?

শুনেছি স্যার। শেখ মুজিব নাকি ছয় দফা ঘোষণা করেছেন।

নাকি কেন? এর মধ্যে কোনো সন্দেহ আছে?

জি না স্যার। পত্রিকায় দেখলাম।

ছয় দফায় কী আছে তা কি জানেন?

ছয় দফার মোদ্দা কথা স্বায়ত্তশাসন।

নাকি অন্য কিছু?

অন্য কিছু কী স্যার?

আপনিই বলেন না! আপনার কী ধারণা?

স্যার, ছয় দফা পড়ে যা বুঝলাম, তাতে স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টা স্পষ্ট।

আচ্ছা। আর কিছু মনে হয় না?

না স্যার। কিছু মনে করবেন না স্যার, আপনার কাছে কি অন্য কিছু মনে হয়?

আমার তো মনে হয়, মুজিব পাকিস্তান ভাঙতে চায়!

না স্যার। এটা বোধ হয় ঠিক না।

আপনি আসলে কোনো বিষয় নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবেন না। ভূত-ভবিষ্যৎ চিন্তা করেন না। এটাই হচ্ছে আপনার সমস্যা। সব কিছু সরলভাবে নিলে চলে না মুসা সাহেব। ইয়াহিয়া সাহেব আসেনি?

তাকে তো দেখলাম না। তাকেও ডাকছেন নাকি?

হুম।

আইয়ুব খান কলিং বেল চাপলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর একান্ত সহকারী এলেন। আইয়ুব খান প্রশ্ন করার আগেই তিনি বললেন, স্যার, ইয়াহিয়া খান এসেছেন।

ডাকো।

একান্ত সহকারী দ্রুত রুম থেকে বের হয়ে গেস্টরুমে গিয়ে ইয়াহিয়া খানকে বলেন, স্যার, আসেন।

ইয়াহিয়া খান লম্বা লম্বা পা ফেলে দরজার সামনে গেলেন। দরজায় টোকা দিয়ে রুমে ঢুকে টান টান হয়ে দাঁড়িয়ে স্যালুট দিলেন।

আইয়ুব খান স্যালুটের জবাব দিয়ে ইয়াহিয়া খানকে কাছে ডাকলেন। বসার অনুমতি দিলেন। তারপর বললেন, ছয় দফা নিয়ে আপনি কী জানেন?

স্যার, মুজিবুর, শেখ মুজিবুর ছয় দফা দিছে। লোকটার কত বড় সাহস, চিন্তা করছেন স্যার! একটা ব্যাপার স্যার বুঝে পাই না। আমাদের গোয়েন্দা বিভাগ কী করে? আমার মনে হয় কি স্যার, তারা কোনো খোঁজখবর রাখে না। স্যার, বেয়াদবি নেবেন না, গোয়েন্দা বিভাগ আপনাকে কি আগে কোনো খবর দিয়েছে?

না, দেয়নি।

তাইলে স্যার তারা কী করে? আপনাকে তো আগে খবরটা দিবে! স্যার, একটা কথা তো ঠিক, মুজিবুর আমাদের এক নম্বর শত্রু! সে যা করছে তা দেশবিরুদ্ধ কাজ! এইটা স্যার মানা যায় না। স্যার, আপনি ছয় দফা পড়েছেন তো!

হুম পড়েছি।

তাইলে বলেন স্যার, ওর মধ্যে কী নাই? সে স্বায়ত্তশাসন দাবি করতেছে। আপনি চিন্তা করেন স্যার, তার কলিজাটা কত বড়! আপনার মতো দোর্দণ্ড প্রতাপশালী প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় থাকতে মুজিবুর কী করে এই সাহস পায়! না, না স্যার! এইটা মানা যায় না। ইমিডিয়েটলি মুজিবুরকে গ্রেপ্তার করা উচিত। আর দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার দায়ে তার বিচার করা উচিত। স্যার, দেশের সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখতে হইলে কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত আপনাকে নিতে হবে। তা না হইলে আপনি দেশ টেকাতে পারবেন না! আপনি স্যার শক্ত মানুষ। আপনি থাকতে মুজিবুরের মতো লোক উল্টাপাল্টা করব, তা কী করে হয় স্যার!

ইয়াহিয়া খানের বক্তব্যে খুব খুশি হলেন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব। তাঁর চেহারা দেখেই তা বোঝা যাচ্ছে। সেনাপ্রধান মুসা খান আড়চোখে তাকাচ্ছেন আর তাঁর চোখেমুখে খুশির ঝিলিক দেখতে পাচ্ছেন। তিনি মনে মনে বলেন, এ কারণেই ইয়াহিয়া তরতর করে ওপরে উঠে যাচ্ছেন। আমার পক্ষে এমনভাবে বলা অবশ্য সম্ভব হবে না। তাই হয়তো যেকোনো দিন প্রেসিডেন্ট সাহেব বলবেন, মিস্টার জেনারেল! আপনি এবার চাট্টিবাট্টি গোল করেন!

ঠিক তখনই প্রেসিডেন্ট আইয়ুব সেনাপ্রধানকে উদ্দেশ করে বললেন, জেনারেল! কী ভাবছেন?

থতমত খেয়ে মুসা খান বললেন, স্যার, তেমন কিছু না স্যার।

ইয়াহিয়া খানের কথা শুনে কী বুঝলেন?

না মানে, সে ঠিকই বলেছে স্যার।

আপনি কি ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না?

গুরুত্ব দিচ্ছি না, তা না।

তাহলে বলেন, আমাদের করণীয় কী? ইয়াহিয়া যা বলেছেন সেটা ঠিক তো?

জি, ঠিক।

আমরা কি হার্ডলাইনে যাব?

এখনই হার্ডলাইনে না গিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। কেন ছয় দফা দেওয়া হলো? এর যৌক্তিকতা কী? পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ এই দাবির পক্ষে আছে কি না সেটাও বোঝা উচিত।

ইয়াহিয়া বললেন, স্যার, মুজিবুর রাজনীতি করে। কিছু লোক তো তার পক্ষে থাকতেই পারে। তাই বলে আমরা তার ছয় দফা মেনে নেব? 

প্রশ্নই আসে না ইয়াহিয়া। আমি অতটা নরম লোক না। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব বললেন।   

জেনারেল মুসা খান বললেন, স্যার, কিছু মনে করবেন না। আলোচনা করার মানে কিন্তু নরম হওয়া না। আপনি প্রেসিডেন্ট! আপনি দেশের অভিভাবক। আপনি হুট করে হার্ডলাইনে গেলে দেশের মানুষ খেপে যেতে পারে।

খেপে যাবে! এত বড় সাহস! তাইলে একেবারে তামা বানিয়ে ছাড়ব না!

আপনার দেশ, আপনি তামাও বানাইতে পারেন, সোনাও বানাইতে পারেন। যা খুশি তা করতে পারেন স্যার।   সেনাপ্রধানের কথা প্রেসিডেন্ট সাহেবের মোটেই ভালো লাগেনি। তিনি কিছুটা বিরক্তির সুরেই বললেন, ঠিক আছে জেনারেল মুসা, আপনি এখন যান। পরে আবার আপনার সঙ্গে কথা বলব।

মুসা খান প্রেসিডেন্ট সাহেবকে স্যালুট দিয়ে বের হয়ে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে ইয়াহিয়া খান বললেন, স্যার, বেয়াদবি মাফ করবেন। একটা কথা বলব?

অবশ্যই।

স্যার, এই রকম কাপুরুষ আপনার প্রধান সেনাপতি, এটা হতে পারে না।   

মুসার ব্যাপারটা আমি বুঝলাম না। সে তো এ রকম ছিল না। কেমন যেন বদলে গেছে বলে মনে হলো।

জি স্যার। তবে স্যার, উনি সে রকম সাহসী নন স্যার। কোনো সাহসী পদক্ষেপও কখনো নেন নাই।

আচ্ছা শোনেন, জেনারেল মুসা যেহেতু আলোচনার কথা বললেন, আমরা চেষ্ট করে দেখব নাকি?

দেখতে পারেন স্যার! তবে কোনো কাজ হবে বলে মনে হয় না।

আপনার কাছে বিশেষ কোনো খবর আছি নাকি? কাজ হবে না, কী করে বুঝলেন?

স্যার, আমি মুজিবুরের ব্যাপারে কিছু খোঁজখবর নিয়েছি। তাতে বুঝলাম, আপনি নরম হলে সে আরো শক্ত হবে। এখনকার জামানায় স্যার মানুষ শক্তের ভক্ত নরমের যম।

আমাকে কি কখনো আপনার নরম মনে হইছে?

না স্যার। তা মনে হয়নি।

শেখ মুজিবের ছয় দফার ঘোষণা যে আমি সহজভাবে নিয়েছি তা কিন্তু না! আমি খুবই বিরক্ত। মেজাজ একদম তিরিক্ষি হয়ে আছে। তার পরও ভাবছি, আলোচনা করে যদি সমাধান করা যায় তাহলে কোনো অপারেশনে যাব না।

তাইলে ভুট্টো সাহেবকে পাঠাইতে পারেন। উনি পলিটিক্যাল লোক। মুজিবুরের সঙ্গে আলোচনা করে যদি কোনো সমাধান খুঁজে পান!

আমিও ভুট্টোর কথাই ভাবছি। এই জন্যই আপনাকে আমার পছন্দ।

থ্যাংক ইউ স্যার! ইউ আর দি গ্রেট প্রেসিডেন্ট স্যার।

শেখ মুজিব তো আমারে পাত্তাই দিচ্ছে না। কেমনে গ্রেট প্রেসিডেন্ট হইলাম।

মুজিবুরের কথা রাখেন স্যার। সে পাত্তা দিলেই কী; আর না দিলেই কী!

না না! আপনার জাজমেন্ট ঠিক নাই। শেখ মুজিবের ব্যাপারে আপনার আরো স্টাডি করা দরকার। আমার মনে হয়, সে অনেক বেশি দূরদর্শী নেতা।

আপনার সঙ্গে আমি একমত স্যার। সে আমার গলার কাঁটা। কাঁটা সরাতে যা করা দরকার তা করতে হবে। প্রয়োজনে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে স্যার।

ইয়াহিয়া খানের ইঙ্গিত বুঝতে পারলেন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব। তিনি আর কথা না বাড়িয়ে বললেন, আপনি তাহলে এখন যান। পরে আবার কথা হবে।

জি স্যার। তবে স্যার, আমাদের চিফের ব্যাপারে আরেকটু ভাবার দরকার আছে স্যার।

আপনি চোখ-কান খোলা রাখেন। আপনাকে নিয়ে আমি চিন্তাভাবনা করছি। দেখা যাক কী করা যায়।

প্রেসিডেন্ট সাহেবের ইঙ্গিতও বুঝতে পারলেন ইয়াহিয়া। তিনি দাঁড়িয়ে বেশ উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বললেন, থ্যাংক ইউ স্যার, থ্যাংক ইউ!

ইয়াহিয়া খান স্যালুট দিয়ে প্রেসিডেন্ট সাহেবের রুম থেকে বের হলেন। প্রেসিডেন্ট সাহেব আবার সিগারেট ধরালেন। তিনি পুরো পরিস্থিতি নিয়ে ভাবতে শুরু করলেন।

প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের ফোন পেয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন মোনেম খাঁ। তিনি স্যার স্যার বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেললেন। একপর্যায়ে প্রেসিডেন্ট সাহেব বলতে বাধ্য হলেন, এত স্যার স্যার বলার দরকার নেই। আপনি আমার প্রশ্নের জবাব দেন। পূর্ব পাকিস্তানের খবর কী?

স্যার, খবর ভালো। কোনো সমস্যা নেই স্যার!

কোনো সমস্যা নেই মানে! শেখ মুজিব ছয় দফা ঘোষণা করে দিল। আর আপনি বলছেন কোনো সমস্যা নেই!

স্যার, স্যরি স্যার। এটা তো আমরা জানতাম না স্যার।

তাহলে কেন বললেন সমস্যা নেই?

স্যরি স্যার। কিন্তু এসব ঘোষণা দিয়ে কি কিছু করতে পারবে স্যার! বেশি বাড়াবাড়ি করলে সাইজ করে দিব স্যার।

সেটা তো পরের ব্যাপার। আপনার তো সব খোঁজখবর রাখতে হবে! তাই না? তা না হলে দেশ চালাবেন কিভাবে? আপনাকে তো আমি কাজের লোক মনে করছি।

স্যার, আমি কাজের লোকই স্যার। আপনি কাজ দিয়ে দেখেন স্যার। আমি ব্যর্থ হলে বাদ দিয়া দিয়েন স্যার।

শোনেন, ছয় দফা নিয়া যেন আন্দোলন করতে না পারে সে ব্যবস্থা করেন।

জি স্যার। কিছু নেতাকর্মীকে ধরপাকড় করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।

সত্যি তো?

জি স্যার, সত্যি।

তাহলে বসে আছেন কেন?

আমি তো স্যার আপনার অনুমতি ছাড়া কিছু করি না স্যার।

ধন্যবাদ। ছয় দফা ইস্যুতে কোনো ছাড় নেই। প্রয়োজনে মুজিবকে আগে গ্রেপ্তার করতে হবে।

জি স্যার। কী করতে হবে আমি বুঝে গেছি।

কেউ যাতে রাস্তায় নামতে না পারে! কাকপক্ষীও না। কথা ক্লিয়ার?

জি স্যার।

আর টাইম টু টাইম ঢাকার পরিস্থিতি আমাকে জানাবেন। আমি নিজে মনিটর করব।

জি স্যার।

টেলিফোন রেখেই আপনি আইজি সাহেবকে ডাকবেন। কখন কী করতে হবে সে বিষয়ে আপনি তাকে নির্দেশ এবং পরামর্শ দেবেন। আপনার নির্দেশ ছাড়া সে কিছু করবে না। সে যদি আপনার নির্দেশ অমান্য করে সেটাও জানাবেন। আর শোনেন, আমার ঢাকায় আসার প্রয়োজন আছে কি না বলেন।

আপনি এলে তো কোনো কথাই নেই স্যার। জনসভা করে আপনি ছয় দফার বিরুদ্ধে কথা বললে মুজিবের পাত্তা থাকবে না। আপনার জনপ্রিয়তার কাছে শেখ মুজিব ডাল-ভাত স্যার!  

ঠিক আছে। আমার ভিজিটের ব্যাপারটাও আইজিকে জানিয়ে রাখেন। সে যেন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে জানায়।  

জি স্যার।

মোনেম খাঁর সঙ্গে কথা বলে প্রেসিডেন্ট সাহেব কিছুটা স্বস্তি পেলেন। মনে মনে তিনি ঢাকা সফরের বিষয়টি পাকা করলেন। ক্যালেন্ডার দেখে একটা তারিখের ওপর লাল কলম দিয়ে গোল চিহ্ন দিয়ে রাখলেন।

তিন.

তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সকালে অফিসের উদ্দেশে রওনা হচ্ছিলেন। এ সময় টেলিফোন বাজার শব্দ পেয়ে তিনি ফোন ধরার জন্য এগিয়ে গেলেন। রিসিভার তুলে হ্যালো বলতেই টেলিফোনের অপর প্রান্ত থেকে পিআইও সাহেব নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, স্লামুআলাইকুম মানিক ভাই।

এত সকালে আপনার ফোন! কোনো বিশেষ বার্তা আছে নাকি?

স্যরি মানিক ভাই। আপনাকে সকালবেলা বিরক্ত করছি।

না না। বলেন, কী বলবেন।

কথা বলা যাবে তো?

হ্যাঁ হ্যাঁ।

গভর্নর সাহেবের পক্ষ থেকে আপনাকে একটা বার্তা দিতে চাই।

কী বার্তা বলেন তো!

মনে কিছু করবেন না মানিক ভাই। আমরা ছোট চাকরি করি। হুকুমের গোলাম। কাজেই বুঝতেই তো পারছেন।

আমি অফিসের উদ্দেশে রওনা হয়েছি। একটু তাড়াও আছে। ভণিতা না করে যা বলার তাড়াতাড়ি বলেন।

মানিক ভাই, ছয় দফা নিয়ে সরকারের কিছু বিধিনিষেধ আছে।

যেমন?

এসংক্রান্ত রিপোর্ট প্রকাশ এবং লেখালেখি না করার ব্যাপারে কিছু পরামর্শ আছে। আপনার (ছদ্মনাম নাম মুসাফির) কলাম তো খুবই জনপ্রিয়! আপনি ছয় দফার সমর্থনে যদি কিছু না লেখেন তাহলে খুব ভালো হয়।

দাঁড়ান দাঁড়ান! আমার কলাম খুব জনপ্রিয়! সেটা কেন জনপ্রিয়?

রাজনৈতিক বিষয়ে আপনার বিশ্লেষণ খুব চমৎকার।

শুধু কি এই কারণেই জনপ্রিয়?

নিশ্চয়ই আপনি পাঠকের নার্ভ ধরতে পারেন!

শোনেন, আমি সত্য কথা অকপটে বলি। ছয় দফা গণমানুষের দাবি। এ বিষয়ে না লিখলে মানুষ আমার কলাম পড়বে? মানুষ আমাকে গালমন্দ করবে।

সে কারণেই তো আপনাকে আগেভাগেই বলে রাখছি। জানেনই তো ব্যাপারটা স্পর্শকাতর!

কোনটা স্পর্শকাতর? ছয় দফা?

জি।

কেন? ছয় দফা কেন স্পর্শকাতর বলেন তো!

পিআইও সাহেব কী বলবেন বুঝতে পারছেন না। তিনি নিজেও জানেন, ছয় দফা বাঙালির প্রাণের দাবি। তিনি নিজেও এই দাবির একজন সমর্থক। কিন্তু সরকারের গোলামি করেন বলে ন্যায্য দাবিকেও বলতে হয় স্পর্শকাতর বিষয়!

পিআইও সাহেবকে চুপ থাকতে দেখে মানিক মিয়া বললেন, পিআইও সাহেব, আপনি টেলিফোনে আছেন তো?

জি, মানিক ভাই।

আপনি কিছু বলছেন না যে!

মানিক ভাই, আপনি সাংবাদিক। আপনি স্বাধীন। আমরা সরকারি চাকরি করি। আমরা পরাধীন।

আমি স্বাধীন! কোথায় স্বাধীন? আপনারা স্বাধীন থাকতে দিচ্ছেন? আচ্ছা যা হোক, আপনি আসলে কী বলতে চাচ্ছেন, সরাসরি বলে ফেলুন।

বলছিলাম, ছয় দফা নিয়ে আপনি না লিখলে খুব ভালো হয়। আর রিপোর্ট করার ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা আছে আর কি!

ঠিক আছে। আপনি আপনার দায়িত্ব পালন করেছেন; আমি আমার দায়িত্ব পালন করব।

তা তো ঠিকই। কিন্তু মানিক ভাই, আমি আপনার একজন ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষী। আপনি কোনো সমস্যায় পড়লে আমার সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগবে।

আপনি যা যা বললেন তা কি আমি লিখতে পারব?

সেটা আপনার বিবেচনা। তবে সরকার যে রাজনৈতিক প্রতিবেদন প্রকাশের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে তা পত্রিকায় প্রকাশ না করাই ভালো।

তার মানে আমাকে সেলফ সেন্সরশিপ করতে হবে?

জি, ব্যাপারটা তো তাই দাঁড়ায়।  

বাহ্! কী চমৎকার আপনাদের আইডিয়া! ঠিক আছে। দেখি কী করা যায়। এখন রাখি। খোদা হাফেজ।

মানিক মিয়া ফোনের রিসিভার রেখে হনহন করে বাসা থেকে বের হলেন। সোজা ইত্তেফাক অফিসের উদ্দেশে যাত্রা করলেন। অফিসে পৌঁছেই তিনি বার্তা সম্পাদক সিরাজুদ্দীন হোসেন, সহকারী বার্তা সম্পাদক আসাফ উদ দৌলা রেজা, নূরুল ইসলাম পাটোয়ারিসহ সিনিয়র সাংবাদিকদের ডাকলেন। তাঁদের নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসলেন। বৈঠকে তিনি পিআইওর সঙ্গে তাঁর যেসব কথাবার্তা হয়েছে তা উল্লেখ করলেন। এ পরিস্থিতিতে করণীয় কী সে বিষয়ে তিনি সবার পরামর্শ চাইলেন।

সিরাজুদ্দীন হোসেন বললেন, সরকারের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হচ্ছে, সরকার হার্ডলাইনে যাবে। তাই আগে থেকেই পত্রিকার কণ্ঠ রোধ করবে। ইত্তেফাকের জন্মই হয়েছে রাজনৈতিক নেতার হাত ধরে। আপনার কলাম ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ জনপ্রিয় হওয়ার একমাত্র কারণ রাজনৈতিক বিষয়ে আপনার তীক্ষ পর্যবেক্ষণ ও ক্ষুরধার লেখনী। সেই কলামও নিশ্চয়ই বন্ধ হয়ে যাবে। তাহলে আর পত্রিকা বের করে লাভ কী?

সিরাজুদ্দীন হোসেন মানিক মিয়ার মনের কথাটাই বললেন। আর তাই মানিক মিয়া তাঁর সঙ্গে সুর মিলিয়ে বললেন, ঠিক বলেছেন। আমরা ইত্তেফাকের চরিত্র বদলাতে পারব না। ইত্তেফাক গণমানুষের কাগজ। গণমানুষের অধিকার আদায়ে এই পত্রিকা সব সময়ই সোচ্চার ছিল এবং থাকবে। এর বাইরে যাওয়া যাবে না। এতে যদি পত্রিকার প্রকাশনা বাজেয়াপ্ত করে কিংবা আমার ওপর জেল-জুলুম করে; তাহলে তা সহ্য করতে রাজি আছি।

বৈঠকে উপস্থিত সবাই হাততালি দিয়ে মানিক মিয়াকে অভিনন্দন জানালেন। সিরাজুদ্দীন হোসেন বললেন, আপনার প্রতি আমাদের আস্থা আরো বেড়ে গেল মানিক ভাই। আমরা জানি, পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেলে আমরাই বিপদে পড়ব। আমাদের পরিবার বিপদে পড়বে। তার পরও দেশের স্বার্থে আমরা প্রকৃত সাংবাদিকতাই করতে চাই।

মানিক মিয়া সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বৈঠক শেষ করলেন। তারপর তিনি সংবাদ সম্পাদক জহুর হোসেন চৌধুরীকে ফোন করলেন। জহুর সাহেব মানিক মিয়ার কণ্ঠস্বর চিনতে পারলেন। মানিক মিয়া কিছু বলার আগেই জহুর সাহেব বললেন, স্লামুআলাইকুম মানিক ভাই! আপনি কেমন আছেন?

ভালো আর থাকতে পারলাম কই? সরকার যা বাড়াবাড়ি শুরু করছে! আপনাদের কী অবস্থা? পিআইও সাহেব আপনাকে ফোন করেছিল নাকি?

জি, ফোন করেছিল। আপনাকেও করেছে বোধ হয়!

হ্যাঁ। নানা রকম নির্দেশনা দিল; তাই না!

জি। বলল, বিরোধী রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড নিয়ে কোনো রিপোর্ট ছাপা যাবে না। আবার এসংক্রান্তে সরকারের যে নির্দেশনা আছে সে বিষয়টিও বলা যাবে না। আপনাকেও এই সব বলেছে নাকি?

হ্যাঁ, বলেছে।

বলেন কী! আপনাকেও বলেছে! পিআইও সাহেবের সাহস তো কম না!

তাঁর তো কোনো দোষ না। মোনেম খাঁ যে নির্দেশ দিয়েছেন, উনি তাই আমাদের বলেছেন।

তা অবশ্য ঠিক বলেছেন।

আপনারা কী সিদ্ধান্ত নিলেন?

সবাই তো ভীষণ খেপেছে।

তাই! কবির ভাই কী বলেন?

সহজভাবে নেননি। উনি বলেছেন, আপনারা নিজেরা কথা বলে সিদ্ধান্ত নেন। মানিক ভাই, আপনি নিশ্চয়ই এসব নির্দেশনা মানবেন না!

আমার পক্ষে আপস করা সম্ভব না। আপস কেন করব, বলেন!

তা তো ঠিকই। আমরাও অবশ্য সিদ্ধান্ত নিয়েছি ওই সব নির্দেশনা মানব না। আপনার মতো হয়তো পত্রিকাটা করতে পারব না। তবে যতটা সম্ভব ততটাই করব।

আমার মনে হয়, আজাদও পুরোপুরি মানবে না।

আপনার কি কথা হয়েছে ওদের সঙ্গে?

কথা হয়নি। ওই পত্রিকাটা দেখে মনে হলো। কিছু কিছু রিপোর্ট ওরা করছে।

তার পরও আপনি কথা বলে দেখতে পারেন। আমাদের মধ্যে একটা ইউনিটি থাকা দরকার।

তাহলে তো ভালোই হয়। তবে আমি কথা বলতে গেলে হয়তো ভাবতে পারে, আমি পত্রিকাগুলোর মধ্যে ঐক্য করার কাজ করছি।

জি, তা বলতে পারে। আর সেটা যদি বলেও, অসুবিধা কী? আমাদের ঐক্য হলে সরকারের চাপ মোকাবেলা করা সহজ না?

তা তো বটেই। কিন্তু সবার পক্ষে কি সরকারের নির্দেশের বাইরে কাজ করা সম্ভব?

তা তো সম্ভবই না।

আমার লড়াই চলবে। আপনারাও দেখেন, কতটা কী করতে পারেন!

জি, ঠিক আছে। স্লামুআলাইকুম।

ওয়ালাইকুম আসসালাম।

টেলিফোনের রিসিভার রেখে মানিক মিয়া কতক্ষণ চুপচাপ বসে রইলেন। তারপর তিনি নিজের রুম থেকে সিরাজুদ্দীন হোসেনের টেবিলের কাছে এগিয়ে গেলেন। শোনো, কোনো রকম নতি স্বীকার করব না। তুমি কাজ চালিয়ে যাও। আমি আমার কলামটা লিখি!

সিরাজুদ্দীন হোসেন ইতিবাচক মাথা নেড়ে বললেন, জি, ঠিক আছে।  

মানিক মিয়া আবার নিজের রুমে গেলেন। তারপর তিনি কাগজ-কলম নিয়ে লিখতে বসলেন।  

পরদিন ইত্তেফাক যথারীতি রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডের ওপর বেশ কিছু প্রতিবেদন প্রকাশ করল। মানিক মিয়ার ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ও প্রকাশিত হলো। সেখানে তিনি অত্যন্ত তীক্ষ ভাষায় সরকারের অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী নীতির সমালোচনা করলেন।  

সকালে পত্রিকা দেখে মোনেম খাঁর মাথা খারাপ অবস্থা। তিনি একাই কতক্ষণ চিৎকার-চেঁচামেচি করলেন। তারপর তিনি তথ্যসচিবকে ফোন করেন। তাঁকে না পেয়ে ঝাল মেটালেন পিআইওর ওপর। পিআইওকে ফোন করে জাতে-অজাতে গালাগাল তো করলেনই, সেই সঙ্গে চাকরি খাওয়ারও হুমকি দিলেন। তিনি বললেন, এতবার সতর্ক করার পরও কিভাবে পত্রিকায় এ রকম নিউজ হলো? তোমরা দায়িত্ব পালন করতে না পারলে চাকরি ছাড়ো। আমি অন্য লোক নিই। সামনে অনেক কঠিন সময় আসছে। পত্রিকাওয়ালাদের কন্ট্রোল করতে না পারলে সামলানো যাবে না। আমার কথা কিছু বুঝতে পারছ? যত্তসব অকর্মা লোকজন পদ আগলে বসে আছে!

পিআইও সাহেব কোনো কথা বলারই সুযোগ পেলেন না। তিনি নীরবে বকা সহ্য করলেন। দু-একবার কথা বলার চেষ্টা করেও গভর্নর সাহেবের কঠিন ধমকে চুপ হয়ে যান। গভর্নর সাহেব কথা বলা শেষ করে ধপাস করে ফোন রাখেন। সেই শব্দে আঁতকে ওঠেন পিআইও সাহেব। তিনিও ফোনের রিসিভার রেখে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকেন। গভর্নর সাহেবের কথাগুলো পিআইও সাহেবের অপমানে লাগে। অপমানে তাঁর চোখে পানি আসে। রুমাল দিয়ে চোখের পানি মোছেন তিনি। আর মনে মনে বলেন, কেন যে গোলামির চাকরি নিলাম! এর চেয়ে দোকানদারির ব্যবসাও ভালো ছিল। নিজের স্বাধীনমতো চলা যেত। ছয় দফা নিয়ে বেশি চাপাচাপিও তো করতে পারি না। কিভাবে করি! আমিও তো এই দেশের নাগরিক। আমিও তো স্বায়ত্তশাসন চাই। চাকরি করি বলে সরকারের নানা অন্যায় নির্দেশও তামিল করতে হয়। এসব আর ভালো লাগে না।

পিআইও সাহেব ফোনের  রিসিভার তুললেন। মানিক মিয়ার বাসার নাম্বারে ডায়াল ঘোরালেন। রিং বাজছে কিন্তু কেউ ফোন ধরছে না। এরপর তিনি তাঁর অফিসের নাম্বারে ডায়াল করলেন। অনেকক্ষণ রিং বাজার পর একজন ফোন ধরল। সে জানাল, মানিক মিয়া অফিসে আসেননি। পরে তিনি জহুর হোসেন চৌধুরীর বাসায় ফোন করলেন। ফোনের রিসিভার তোলামাত্র পিআইও সাহেব বললেন, হ্যালো, জহুর ভাই বলছেন?

জহুর হোসেন চৌধুরী ভারী কণ্ঠে বললেন, জি বলছি।

জহুর ভাই, আমি পিআইও। জহুর ভাই, সর্বনাশ হয়ে গেছে!

কী সর্বনাশ হয়ে গেছে, পিআইও সাহেব?

ছয় দফা নিয়ে আপনারা এমন সব রিপোর্ট করেছেন! এসব দেখে গভর্নর সাহেব ব্যাপকভাবে খেপেছেন।

তাই নাকি! কী রকম?

না মানে, আমি তো আপনাকে সরকারের কিছু নির্দেশনার কথা জানিয়েছিলাম।

হুম। কিন্তু আপনার সব নির্দেশনা যে আমাদের মানতে হবে, তাও তো আশা করা ঠিক না!

জহুর ভাই, প্লিজ, বোঝার চেষ্টা করেন। নির্দেশনাটা তো আমার ব্যক্তিগত ছিল না। সরকারের পক্ষ থেকে আমাকে বলতে বলা হয়েছে। মানে, গভর্নর সাহেবের পক্ষে আমি আপনাকে বলেছি। এটা তো গভর্নর সাহেবের সিদ্ধান্ত ছিল। আমার মনগড়া কিছু না।

সেটা বোঝার ক্ষমতা আমার আছে, পিআইও সাহেব! 

সেটা আমি জানি, জহুর ভাই। কিন্তু আমার যে সর্বনাশ হয়ে গেছে।

কী সর্বনাশ হয়েছে! চাকরি গেছে?

এখনো যায়নি। তবে আর থাকবে বলে মনে হয় না। যেকোনো মুহূর্তে চলে যাবে।

না না! আপনার চাকরি যাবে কেন? সমস্যা যা হওয়ার আমাদের হবে। এখন রাখি। আমাদের জন্য দোয়া করবেন। খোদা হাফেজ।

পিআইও সাহেব কিছু একটা বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার আগেই ফোন রেখে জহুর হোসেন চৌধুরী অফিসের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। পিআইও সাহেব ফোনের রিসিভার রেখে স্থির হয়ে বসে আছেন। তিনি কী করবেন ঠিক বুঝতে পারছেন না।

 

জহুর হোসেন চৌধুরী অফিসে এসেই শহীদুল্লা কায়সার, বজলুর রহমান ও সন্তোষ গুপ্তকে ডাকলেন। এর মধ্যেই তাঁর কাছে অজ্ঞাত স্থান থেকে একটি ফোন এলো। ফোনের অপর প্রান্তের লোকটি নিজের পরিচয় না দিয়ে বললেন, জহুর সাহেব, আপনারা যা করছেন তাতে পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। পত্রিকা টিকিয়ে রাখতে হলে এসব বন্ধ করতে হবে।

জহুর সাহেব লোকটির পরিচয় জানতে চাইলেন। কিন্তু তিনি পরিচয় দিতে রাজি হলেন না। তিনি বারবারই জহুর সাহেবকে সতর্ক করলেন। তাঁর কথার মধ্যে কিছুটা হুমকিও ছিল।

জহুর সাহেব কিছুটা হতভম্ব। বিব্রতও। নাম-পরিচয়হীন একটা লোক টেলিফোন করে হুমকি দিল! অথচ তিনি কিছু বলতে পারলেন না। টেলিফোনের   রিসিভার রাখার সঙ্গে সঙ্গে শহীদুল্লা কায়সার বললেন, কী হয়েছে জহুর ভাই?

সরকার তো দেখছি খুব বাড়াবাড়ি শুরু করেছে।

কী? কী ধরনের বাড়াবাড়ি? রাজনৈতিক সংবাদ পরিবেশন করার ওপর নিষেধাজ্ঞা! আমার কাছেও কয়েকটা ফোন এসেছে। পরিচয় না দিয়ে রাজনৈতিক রিপোর্ট ছাপানোর ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে। আমি ধারণা করছি, গোয়েন্দা বিভাগ থেকে এসব ফোন আসছে।

বজলুর রহমান বললেন, তার চেয়ে পত্রিকা বন্ধ করে দিলেই পারে!

সেটাই তো ওরা চাচ্ছে! জহুর সাহেব বললেন।

আমার মনে হয়, আমাদের স্লো যাওয়া উচিত। পত্রিকাও তো টিকিয়ে রাখতে হবে। তা না হলে তো সবাই বেকার হয়ে যাব!

সন্তোষ, কথাটা মন্দ বলোনি। ধৈর্যের সঙ্গে আমাদের পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে। কী বলো কায়সার?

আপনার কথা ঠিক আছে। কিন্তু রাজনৈতিক সংবাদ ছাড়া পত্রিকা বের করে লাভ কী জহুর ভাই?

বজলুর রহমানও শহীদুল্লা কায়সারের সঙ্গে সুর মেলালেন। এতে জহুর সাহেব কিছুটা দ্বিধায় পড়ে গেলেন। তিনি বললেন, আমি বরং কবির ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলি। কী বলো?

শহীদুল্লা কায়সার বললেন, সেটাই ভালো।

তোমরা তাহলে যাও। আমি কথা বলে তোমাদের জানাচ্ছি।

শহীদুল্লা কায়সার, বজলুর রহমান ও সন্তোষ গুপ্ত চলে গেলেন। জহুর সাহেব টেলিফোনের রিসিভার তুলে আহমদুল কবিরের বাসার নাম্বারে ডায়াল করলেন।

চার.

মহিউদ্দিন আহমেদ গরমে অস্থির। তাঁর কপালে ছোপ ছোপ ঘাম। মাথা থেকে ঘাম বেয়ে নাকের ডগা দিয়ে টপটপ করে মাটিতে পড়ছে। গায়ের জামা ভিজে একাকার হয়ে গেছে। মহিউদ্দিন আহমেদ কিছুক্ষণ পর পর কপালের ঘাম হাত দিয়ে টেনে ছিটকা মারেন। কিছুক্ষণ পর ঘাম মোছার জন্য প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে রুমাল খুঁজলেন। না পেয়ে নিজের ওপর রাগ ঝাড়েন। তারপর এক পা দুই পা করে চালের দোকানের দিকে এগিয়ে যান।

মহিউদ্দিন আহমেদ মনে মনে ভাবেন, মার্চ মাস সবে এলো! এখনই এত গরম! সামনে তো গরম আরো বাড়বে। তখন কী হবে আল্লাহই জানেন!

চালের দোকানে গিয়ে মহিউদ্দিন আহমেদ জানতে চান, এই মিয়া রহিম বক্স, তোমার চালের দর কত?

পঞ্চাশ টাকা মণ স্যার।

কী! কী বললা! পঞ্চাশ টাকা মণ! কেন, এত কেন?

হঠাৎ চালের দর বাইড়া গেছে স্যার।

তাই বলে এত! মানুষ খাবে কী? বাঁচব কেমনে?

কী করমু স্যার? পাইকারি বাজারেই দর বেশি।

স্যার, আপনার জইন্য কিছু কম রাখমু হানে। এক বোস্তা লইয়া যান! নাকি বাসায় দিয়া আসুম?

কত হলে পারবা, সেইডা কও। তারপর চিন্তা করি।

স্যার, দর বেশি হইলেও ভাত তো আর না খাইয়া থাহন যাইব না!

তা যাবে না। কিন্তু শুধু চাল কিনলে তো হবে না। অন্য বাজারও তো করতে হবে।  

হ, তা তো করতে হইব। আপনে টাহার চিন্তা কইরেন না স্যার। পরে দিয়েন। অসুবিধা নাই। আগামী শুক্কুরবারের আগে মোকামে যামু না। মোকামে যাওয়ার আগের দিন দিলেই হইব।

পকেটে টাকাও তো থাকা লাগবে। তাই না?

স্যার, কী যে কন স্যার! আপনে কত বড় চাকরি করেন! আপনের টাহা নাই, এই কতা হুনলে তো মানুষ হাসব!

শোনো শোনো, তুমি তো এই কথা বললা। আমি পারলে চাকরিটাকরি ছেড়ে তোমার মতো ব্যবসা করতাম। আর ভালো লাগে না। বুঝলা?

আর আমরা কই, একটা চাকরি যদি পাইতাম!

মহিউদ্দিন আহমেদ অন্য দোকানের দিকে পা বাড়ালেন। এ সময় চাল বিক্রেতা রহিম বক্স বললেন, স্যার, কিছু তো কইয়া গেলেন না! কী করমু? চাউল কি দিয়া আসুম?

আচ্ছা দিয়ো। টাকা কিন্তু দুই-চার দিন পর দিমু।

জে স্যার, ঠিক আছে।

মহিউদ্দিন আহমেদ মাছের বাজারে গেলেন। মাছ কিনতে গিয়ে তাঁর মেজাজ চড়ে গেল। তিনি বিরক্তির সঙ্গে বললেন, এত দাম কী জন্য? চালের দাম বেশি! মাছের দাম বেশি! খাব কী, কও দেখি?

মাছ বিক্রেতা বিস্ময়ের সঙ্গে মহিউদ্দিন আহমেদের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে মনে মনে বলে, তাঁর মতন লোকও যদি এই কতা কয়, গরিব মানুষ তাইলে কী কইবো? তাঁর মতন কয়টা লোক আছে? হায় হায় আল্লাহ! মাছ বেচতে পারুম তো!

মহিউদ্দিন আহমেদ মাছ বিক্রেতার দিকে তাকিয়ে বলেন, কী ব্যাপার! অমন কইরা চাইয়া আছ কেন?

স্যার, আপনে যদি এই কতা কন তাইলে মাছ বেচুম কার কাছে? লইয়া যান স্যার। আরেকটু কমাইয়া দিয়েন।

চরম বিরক্তি নিয়ে মহিউদ্দিন আহমেদ মাছ কেনেন। তারপর মুরগির বাজারে যান। সেখানেও দর ঊর্ধ্বমুখী দেখে বিরক্ত হন। তার পরও মুরগি কেনেন। তরিতরকারি কেনেন। সেগুলো নিয়ে রিকশায় চেপে বাসায় ফেরেন। তখনো তাঁর কপালে বিরক্তির ভাঁজ। তাঁকে দেখে নূরজাহান বেগম বললেন, কী ব্যাপার! তোমার আবার কী হলো?

কী আর হবে? কিছু হয় নাই।

আমার তো মনে হয় তুমি খুব বিরক্ত।

বাজারের অবস্থা খুব খারাপ। হঠাৎ চালের দাম বেড়ে গেছে। মানুষ কী খেয়ে বাঁচবে, তাই চিন্তা করছি।

চিন্তা করার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। দোয়া করো যেন মানুষ দুই বেলা খেতে পারে।

হুম। কিন্তু সব কিছু কি আর দোয়া দিয়ে কাজ হয়? দাওয়াইও লাগে। জিনিসপত্রের দাম যে হারে বাড়ছে! টেনশন তো এমনিতেই চলে আসে। কত লোক যে না খেয়ে মরে কে জানে!

ওসব কথা মুখে এনো না তো! নেগেটিভ কথা শুনতে ভালো লাগে না।

নেগেটিভ কথা না বললে কি পরিস্থিতির উন্নতি হবে?

তা হবে না! তার পরও...।

আমি যে আর্লি রিটায়ারমেন্টের কথা ভাবছিলাম, সেটা কি বাদ দেব?

তুমি না বললা, মান-সম্মান নিয়ে চাকরি করতে পারছ না? সম্মান থাকতে থাকতেই বের হয়ে যাওয়া ভালো না!

হুম। কিন্তু দেশের যে অবস্থা!

ওই চিন্তা করে লাভ আছে? আমরা দুইটা মানুষ। চলে যাবে একরকম।

তুমি চিন্তা করো, আমাকে কথায় কথায় মতিয়ার কথা বলে। আপনি পুলিশে চাকরি করেন, আর আপনার মেয়ে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে! মেয়েটা বিয়ে করে স্বামীর সংসারে গেছে, তার পরও আমাকে কথা শোনাচ্ছে! যখন-তখন আইজি সাহেব ডেকে পাঠান। অপমান করে কথা বলেন।

দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়েন নূরজাহান বেগম। প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য তিনি বলেন, যাও, হাত-মুখ ধুয়ে আসো। তোমাকে নাশতা দিচ্ছি।

অলস ভঙ্গিতে বাথরুমের দিকে হেঁটে যান মহিউদ্দিন আহমেদ।

মহিউদ্দিন আহমেদকে আইজি সাহেব ডেকে পাঠিয়েছেন। হঠাৎ তাঁকে ডেকে পাঠানোর কারণ কী তা তিনি বুঝতে পারছেন না। তাঁর ভীষণ টেনশন হচ্ছে। এবার আবার কী বলেন তা নিয়ে গভীর ভাবনায় ডুবে যান তিনি। আইজি সাহেবের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের সময় বিকেল ৩টা। অথচ সকাল থেকে তিনি কোনো কাজ করতে পারছেন না। ঘুরেফিরে এক ভাবনা, কেন ডেকেছেন আইজি সাহেব? আবারও কি তিনি পদত্যাগের ইঙ্গিত দেবেন? সে রকম কোনো ইঙ্গিত পেলে তিনি আর্লি রিটায়ারমেন্টের আবেদন করবেন।

মহিউদ্দিন মনে মনে এও ভাবেন, রিটায়ারমেন্টে গেলে একসঙ্গে কিছু টাকা পাওয়া যাবে। সেটা ব্যাংকে গচ্ছিত রাখলে সংসারের খরচ চলবে তো? না চললে কী করা যাবে? তা দিয়েই চলতে হবে। আর একান্তই না চলতে পারলে গ্রামে চলে যাব। মেয়েকে তো আর দেখতে হবে না!

মহিউদ্দিন সাহেব কিছুক্ষণ পর পর ঘড়ি দেখেন। তাঁর টেনশন দেখে অন্যরা কানাঘুষা করছিল। কেউ কেউ তাঁর কী হয়েছে তা জানতেও চেয়েছিল। কিন্তু মহিউদ্দিন সাহেব বলেননি। বললে দেখা যাবে, তারাও নানা রকম প্রশ্ন করা শুরু করবে। তার সামনে বেশ কিছু ফাইল জমেছে। তিনি দু-একটি ফাইল উল্টেপাল্টে দেখে আবার জায়গামতো রেখে দেন। পড়তে ভালো লাগছে না। এক লাইন পড়ার পর পরের লাইন পড়তে গিয়ে বিরক্তি লাগছে। পত্রিকা পড়ার চেষ্টা করলেন। প্রথম পাতার কয়েকটা হেডলাইন পড়লেনও। কিন্তু মনে রাখতে পারছেন না। তিনি চেয়ার ছেড়ে হাঁটাহাঁটি শুরু করলেন। তাঁর মাথায় এক চিন্তা ঘুরপাক খায়, আইজি সাহেব যদি পদত্যাগ করতে বলেন! তখন তিনি তাঁকে কী বলবেন?

এ সময় টেলিফোনের রিং বেজে উঠল। মহিউদ্দিন সাহেব টেলিফোন ধরার জন্য এগিয়ে গেলেন। খুব নিচু গলায় তিনি হ্যালো বললেন।

নূরজাহান বেগম বললেন, কী ব্যাপার? তোমার কী হয়েছে? কোনো সমস্যা?

মহিউদ্দিন সাহেব আমতা আমতা করে বললেন, না মানে, সমস্যা কিছু না।

লাঞ্চ করেছ?

না।

তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে তোমার মন খারাপ। কী হয়েছে, আমাকে খুলে বলো তো!

আইজি সাহেব ডেকে পাঠিয়েছেন।

কেন?

জানি না।

তাই তুমি টেনশন করছ?

হুম।

অজানা কারণে টেনশন করা ঠিক না। তুমি টেনশন কোরো না তো! মন ভালো করো। লাঞ্চ করো।

হুম করব।

এখনই করো।

আচ্ছা নূরজাহান, স্যার যদি আমাকে পদত্যাগ করতে বলেন!

কেন শুধু শুধু তোমাকে পদত্যাগ করতে বলবেন?

তোমাকে বললাম না! মতিয়ার রাজনীতি তাঁরা সহ্যই করতে পারছেন না।

এখনো এ নিয়ে ঝামেলা করবে? এ নিয়ে তো যথেষ্ট হয়েছে! না না! আমার মনে হয় না। অন্য কোনো কারণে উনি ডেকেছেন। তুমি চিন্তা কোরো না তো! লাঞ্চ করো। তারপর কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে আইজি সাহেবের কাছে যাও।

আচ্ছা।

মহিউদ্দিন সাহেব টেলিফোনের রিসিভার রেখে কলিং বেল চাপলেন। সঙ্গে সঙ্গে পিওন এসে তাঁর সামনে দাঁড়াল। তিনি তাকে খাবার রেডি করতে বলে বাথরুমে গেলেন। বাথরুমে বসেই তিনি টেলিফোনের রিং বাজার শব্দ পেলেন। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় দেখলেন। ঘড়ির কাঁটা তখন দেড়টার ঘরে। কিছুটা তড়িঘড়ি করেই তিনি বাথরুম থেকে বের হলেন। এ সময় আবার টেলিফোন এলো। তিনি দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলেন। ফোন ধরে হালকা গলায় বললেন, হ্যালো!

টেলিফোনের ওপাশে আইজি সাহেবের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা। সে বলল, স্যার, আপনার সঙ্গে আইজি সাহেবের সাক্ষাতের কথা ছিল। ওটা আজ হবে না স্যার। গভর্নর হাউস থেকে স্যারের ডাক পড়েছে। উনি ওখানে চলে গেছেন। আপনাকে উনি পরে ডাকবেন।

মহিউদ্দিন আহমেদ যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে বললেন, ঠিক আছে।

পাঁচ.

ছয় দফার মোদ্দা কথা, ‘কত নিছো? কবে দেবা? কবে যাবা?’

শেখ মুজিব বাঙালিকে সহজভাবে বোঝানোর জন্য এই উক্তি ব্যবহার করেন। এর পর থেকে বাঙালির মুখে মুখে শোনা যায় শেখ মুজিবের সেই উক্তি, ‘কত নিছো, কবে দেবা, কবে যাবা?’

ছয় দফার পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে আওয়ামী লীগ বিভিন্ন জেলায় সভা-সমাবেশ করছে। শেখ মুজিব ছয় দফা দাবির বিষয়টি জনগণের কাছে সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করছেন। মানুষ তাঁর বক্তব্যে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। আওয়ামী লীগের তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম ছাড়াও অন্য নেতারা ছয় দফার বিষয়ে বক্তৃতা করছেন। সমাবেশে লোকসমাগম দিন দিনই বাড়ছে। ছয় দফার পক্ষে ব্যাপক জনমত তৈরি হতে শুরু করে। একই সঙ্গে শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তাও বাড়তে থাকে।

সংবাদপত্রের মাধ্যমে এ সম্পর্কে জানতে পারছেন আইয়ুব খান। এ নিয়ে তিনি ভীষণ চিন্তিত। তিনি বুঝতে পারছেন, ছয় দফার বিপক্ষে তাঁর সরকারের লোকেরা নানা কথাবার্তা বললেও শক্ত অবস্থান নিতে পারছেন না। তিনি বেশ টেনশনে আছেন। ছয় দফা নামক টেনশনটা তিনি কিছুতেই মাথা থেকে নামাতে পারছেন না। তিনি অনেক চিন্তাভাবনা করে ঠিক করলেন, ঢাকায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোকে পাঠাবেন। ভুট্টোর চিন্তাটা মাথায় আসার সঙ্গে সঙ্গে তিনি তাঁকে নিজের দপ্তরে ডেকে পাঠালেন।

ভুট্টো সাহেব সব কাজ ফেলে রেখে প্রেসিডেন্ট সাহেবের দপ্তরের দিকে রওনা হলেন। তিনি যাচ্ছেন আর মনে মনে ভাবছেন, হঠাৎ প্রেসিডেন্ট সাহেব কেন ডাকলেন? কী কী ইস্যু নিয়ে কথা বলতে পারেন? কিছুই তো মাথায় আসছে না। সোভিয়েত রাশিয়ার মধ্যস্থতায় তাসখন্দে ভারতের প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করার পর প্রেসিডেন্ট সাহেব বেশ ফুরফুরা মেজাজে ছিলেন। অবশ্য ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে দুই প্রধানমন্ত্রীর তাসখন্দ চুক্তি নিয়ে তাঁর দুঃখবোধও আছে। তাসখন্দে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে লালবাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় মন খারাপ হয় তাঁর। তাঁকে বেশ কয়েকবার বলতে শুনেছি, আমরা ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটা উদ্যোগ নিলাম এবং চুক্তি সই করলাম! অথচ পরক্ষণেই ঘটল অঘটন! আমার কাউন্টার পার্ট মারা গেলেন! এটা কি মানা যায়? 

ভুট্টো আবার ভাবেন, ইদানীংকালে কি বিশেষ কোনো ঘটনা ঘটেছে! ওহ্ ইয়েস! মনে পড়েছে! ছয় দফা! শেখ মুজিবের ছয় দফা প্রেসিডেন্ট সাহেবের টেনশন বাড়িয়েছে। এ ছাড়া আর কিছু নয়। আচ্ছা, মুজিবের মতলবটা কী? সে কী চায়? আমার মনে হয়, প্রেসিডেন্ট সাহেব এই বিষয়ে আমার মনোভাব জানতে চাইবেন। ছয় দফাকে ভালোভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই!

প্রেসিডেন্ট ভবনে পৌঁছামাত্র ভুট্টোর ডাক পড়ল। প্রেসিডেন্ট সাহেবের পিএস ভুট্টো সাহেবকে উদ্দেশ করে বললেন, স্যার আপনার জন্যই অপেক্ষা করছেন। তাড়াতাড়ি ঢোকেন।

ভুট্টো সাহেব কথা না বাড়িয়ে প্রেসিডেন্ট সাহেবের দপ্তরে ঢুকে পড়লেন। লম্বা করে একটা সালাম দিয়ে বললেন, কেমন আছেন স্যার?

প্রেসিডেন্ট সাহেব তখন পায়চারি করছিলেন। ভুট্টোকে দেখেই তিনি বললেন, ও ভুট্টো! এসো এসো। হাউ আর ইউ?

আই অ্যাম নট ফাইন স্যার।

ইজ ইট! বাট হোয়াই? 

স্যার, মুজিব ছয় দফা নিয়ে বাড়াবাড়ি করছে। এইটা কোনো কথা হলো স্যার!

ধন্যবাদ। তুমি তো বেশ বুদ্ধিমান!

থ্যাংক ইউ স্যার। আপনার সঙ্গে কাজ করি। কিছু বুদ্ধি না থাকলে কি চলে?

ভুট্টো, তোমার কী মনে হয়? হঠাৎ সে ছয় দফা দিল কেন?

ভুট্টো বললেন, আমার মনে হয় কি স্যার...?

কী মনে হয়?

মুজিবের কোনো মতলব আছে।

তাই! কী মতলব?

আমার মনে হয়, সে কোনো ষড়যন্ত্র করছে।  

পাকিস্তান ভাঙতে চায় না তো?

ছয় দফায় সে রকম ইঙ্গিত আছে স্যার! শুরুতেই এটাকে মূলসুদ্ধ উপড়ে ফেলতে হবে। একে বাড়তে দেওয়া যাবে না স্যার।

হুম। আচ্ছা শোনো, তুমি একটা কাজ করো।

জি, বলেন স্যার।          

তুমি আজই ঢাকায় যাও। ছয় দফা নিয়ে বাহাস করতে হবে। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে বোঝাতে হবে, ছয় দফা মুজিবের একটা ষড়যন্ত্র! জনগণ যেন তার ফাঁদে পা না দেয়। বুঝতে পারছ। তুমি নিশ্চয়ই পারবে।

ভুট্টো বললেন, জি, ঠিক বলেছেন। আপনার কথা এক শ ভাগ ঠিক। কিন্তু স্যার, বিষয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যেতে বলছেন। আমি অবশ্যই আপনার হুকুম মানব। মানতে বাধ্য। আমার মনে হয়, আপনি গেলে বেশি ভালো হয় স্যার।

এই! দায়িত্ব এড়াতে চাও, তাই না?

একদম না স্যার। আপনি তো জানেন স্যার, আমি আপনার একজন অনুরাগী। আপনার কথা না শুনলে কার কথা শুনব? আমি বলি কি, ঢাকায় আমাদের পার্টির কাউন্সিল আছে। সম্ভবত ২০ মার্চ এর সমাপনী। আপনি সেখানে গেলে খুব ভালো হয়। রথ দেখা আর কলা বেচা একসঙ্গেই হবে।  

তাহলে তুমি আমাকে যেতে বলছ?

আপনি গেলেই বেশি ভালো হয় স্যার। আপনার বলা আর আমাদের বলা কি এক? মুজিব যা-ই ষড়যন্ত্র করুন আপনার এক বক্তৃতায় সব তুলার মতো উড়ে যাবে। যারা মুজিবের কথায় বিভ্রান্ত হয়েছে তারাও সঠিক পথে চলে আসবে।  

আচ্ছা, ঠিক আছে। তাহলে ব্যবস্থা করো। শোনো, গভর্নর সাহেবকে ফোনে জানিয়ে দাও, আমি কাউন্সিলের সমাপনীতে থাকব।   

জি স্যার। আমি জানিয়ে দেব।

তাহলে তুমি এখন যাও। পরে আবার কথা হবে। শোনো, চোখ-কান খোলা রেখো!

অবশ্যই স্যার।

শুনলাম, তুমি ইন্ডিয়াকে রাম ধোলাই দিয়েছ।

জি স্যার। ওই নামটা শুনলেই আমার গা জ্বালা ধরে। মালাউনগো দেশ! এ জন্যই আমি বলি স্যার, মালাউন সাইজে রাখতে হলে চীনকে হাতে রাখতে হবে। চীন ছাড়া আমাদের গতি নেই।

ঠিক বলেছ ইয়াংম্যান! আজ তাহলে যাও। পরে আবার কথা হবে।   

জি স্যার। স্লামুআলাইকুম স্যার।

ভুট্টো সাহেব চলে যাওয়ার পর প্রেসিডেন্ট সাহেব কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলেন। কী করা যায় তা নিয়ে  ভাবেন। তারপর টেলিফোনের রিসিভার তুলে ঢাকায় গভর্নর মোনেম খাঁকে ফোন করলেন। আইয়ুব খাঁর কণ্ঠস্বর শুনেই মোনেম খাঁ দাঁড়িয়ে গেলেন। তারপর স্যার স্যার শুরু করলেন। আইয়ুব খান বললেন, এত স্যার স্যার না করে আমার কথাটা মন দিয়ে শোনেন।

জি স্যার, জি স্যার!

শেখ মুজিবকে সাইজ করতে পারেন না; ঢাকায় বসে কী করেন?

স্যার, আপনি নির্দেশ দিলে যা করা লাগে সবই করব স্যার।

ঢাকায় আমাদের দলের কাউন্সিল কবে?

১৮ মার্চ স্যার। ২০ তারিখ সমাপনী।

আমি সমাপনীতে থাকব।

জি! আপনি থাকবেন স্যার! মাশাল্লাহ! মাশাল্লাহ! খুব ভালো হবে স্যার; খুব ভালো হবে।

আমি ব্যাপক লোকসমাগম দেখতে চাই।

জি স্যার! জি স্যার! অবশ্যই দেখবেন স্যার! আপনার যেই জনপ্রিয়তা! শুধু একবার রেডিওতে প্রচার করতে পারলেই হাজার হাজার লোক হাজির হয়ে যাবে স্যার। আপনি কোনো চিন্তা করবেন না স্যার। লোক জড়ো করার দায়িত্ব আমার।

শেখ মুজিব বেশি বাড়াবাড়ি করছে নাকি? তাইলে কিন্তু জেলে ঢুকিয়ে দিব।

বিভিন্ন জায়গায় সভা-সমাবেশ করছে স্যার। তাতে কোনো অসুবিধা নেই স্যার। তার পক্ষে তেমন কোনো লোক নেই। তা ছাড়া শেখ মুজিব এবং তার কয়েকজন সাঙ্গোপাঙ্গকে জেলে ঢোকালেই আন্দোলন লাটে উঠবে স্যার।

সেটাই তো চাই।

আইয়ুব খান হঠাৎ করেই টেলিফোন রেখে দিলেন। মোনেম খাঁ থতমত খেয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েই থাকলেন। মনে মনে ভাবলেন, স্যার হঠাৎ টেলিফোনটা রেখে দিলেন কেন! কোনো কারণে রাগ করেননি তো! তারপর নিজেকেই নিজে বললেন, এখনো দাঁড়িয়ে আছ কেন মোনেম খাঁ! বসো বসো! প্রেসিডেন্ট সাহেব ফোন করেছেন বলে দাঁড়িয়ে যেতে হবে! না না! এটা তুমি ঠিক করোনি। তুমি একজন গভর্নর। গভর্নরের মেরুদণ্ড বাঁকা থাকলে পূর্ব পাকিস্তান তো কখনোই সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না! একি! পূর্ব পাকিস্তান নিয়ে আমি কেন মাথা ঘামাচ্ছি! আমার চাকরি আগে ঠিক রাখি। তারপর পূর্ব পাকিস্তান নিয়ে চিন্তা।  

এতক্ষণ টেলিফোনের রিসিভারটা মোনেম খাঁর হাতেই ধরা ছিল। তিনি রিসিভার রেখে কলিং বেল চাপলেন। পিএস সাহেব দৌড়ে গভর্নর সাহেবের সামনে এসে দাঁড়ালেন। মোনেম খাঁর মেজাজ গরম। তিনি পিএস সাহেবকে দেখেই খেপে গেলেন। রাগান্বিত স্বরে বললেন, এই মিয়া পিএস! ওখানে বসে বসে কী করো হে! কতক্ষণ ধরে কলিং বেল চাপছি। শুনতে পাও না?

স্যরি স্যার। আমি তো একবারই কলিং বেলের আওয়াজ শুনলাম স্যার।

এই চুপ! মুখে মুখে কথা বলবে না। আইজি সাহেব কই?

তাকে কি আসতে বলছেন স্যার?

এই! আবার বেয়াদবি! তুমি কোন সাহসে আমাকে প্রশ্ন করছ? আমি তোমাকে প্রশ্ন করেছি; তুমি জবাব দেবে।

স্যরি স্যার। উনি তো আসেননি।

ডাকো, ডাকো ওনাকে। দ্রুত। একদম দেরি করবে না।

জি স্যার। এখনই ডাকছি স্যার।

পিএস সাহেব রুম থেকে দৌড়ে বের হলেন। মোনেম খাঁ টান টান হয়ে বসে চোখ বন্ধ করলেন। তারপর মনে মনে ভাবেন, কী ব্যাপার! আমি এত রেগে যাচ্ছি কেন? কী হয়েছে আমার? রেগে যাওয়ার মতো কিছু তো ঘটেনি! অথচ আমি চেষ্টা করেও রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না।

আইজি এ এম এ কবীর মোনেম খাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ান। নরম গলায় তাঁকে সালাম দেন। কিন্তু তিনি সালাম নেননি। উদাস দৃষ্টিতে আইজি সাহেবের দিকে তাকিয়ে আছেন। কবীর সাহেব এবার কিছুটা উচ্চ স্বরে বললেন, স্যার, আমাকে চিনতে পারছেন না? আমি কবীর, আইজি কবীর স্যার।

আপনি কবীর, মানে আইজি কবীর! আপনাকে আমি ডেকেছিলাম?

জি স্যার।

আচ্ছা তাইলে বসেন।

স্যার, আমাকে কি কোনো বিশেষ দরকারে ডেকেছেন?

নিশ্চয়ই। দরকার ছাড়া আপনাকে কেন ডাকব? কী জানি বলব ভাবছিলাম! বসেন বসেন! মনে করি। ও হ্যাঁ, মনে পড়ছে। প্রেসিডেন্ট স্যার ঢাকায় আসবেন ২০ মার্চ। আমি সবাইকে নিয়ে বৈঠক করব। আপনাকে আগেভাগেই জানালাম। নিরাপত্তার দিকটা যেহেতু আপনি দেখবেন, তাই আপনাকে আগেই জানালাম। কোনো রকম ত্রুটি যেন না হয়! বুঝতে পারছেন? এখন সব গোয়েন্দা বিভাগ নিয়ে মিটিং করেন।

স্যার, প্রেসিডেন্ট আসবেন আর আমি তাঁর নিরাপত্তায় ত্রুটি রাখব! স্যার, আপনি শুধু দেখেন আমি কী করি!

সেটা আমি জানি মিস্টার কবীর! সে জন্যই তো আপনাকে ডাকছি। তা না হলে তো হোম মিনিস্টারকে ডাকতাম! আপনার প্রতি আমার পূর্ণ আস্থা আছে।

ধন্যবাদ স্যার, এই আস্থাটুকু থাকলেই আমি খুশি স্যার। আমি তাহলে আসি স্যার?

আসুন। আপনাকে পরে আবার আইন-শৃঙ্খলা বৈঠকে ডাকব।

জি স্যার। দোয়া করবেন স্যার।

অবশ্যই দোয়া থাকবে।

আইজি সাহেব গভর্নর সাহেবের রুম থেকে বের হলেন। তাঁকে হাসিখুশি দেখে গভর্নর সাহেবের স্টাফদের মধ্যেও এক ধরনের উত্ফুল্ল ভাব লক্ষ করা গেল।  

ছয়. 

শেখ মুজিব আগে থেকে কিছু না জানিয়ে ইত্তেফাক অফিসে গিয়ে হাজির হলেন। তাঁকে দেখে বিস্মিত হন মানিক মিয়া। তিনি বিস্ময়ের সঙ্গেই বলেন, আরে মুজিব, তুমি! একেবারে বিনা নোটিশে আমার অফিসে!

জি মানিক ভাই। আপনার অফিসের সামনে দিয়েই যাচ্ছিলাম। ভাবলাম আপনার সঙ্গে দেখা করে যাই। আপনি কেমন আছেন? জানি, আপনি খুব চাপের মধ্যে আছেন।

তা অবশ্য ঠিকই বলেছ। কী খাবে বলো?

চা খাওয়ান।

শুধু চা?

কেন, আর কিছু খাওয়াতে চান?

শিঙাড়া খেতে পারো।

আচ্ছা আনান।

মানিক মিয়া চা-শিঙ্গাড়া আনার জন্য পিওনকে ইশারা করে বললেন, সারাক্ষণ গোয়েন্দা বিভাগ থেকে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। আর নানা রকম সবক; এটা লেখা যাবে না, ওটা লেখা যাবে না! এসব বলছে!

তার মধ্যেও আপনি যা করছেন! সত্যিই মানিক ভাই, ধন্যবাদ দিয়ে আপনাকে ছোট করব না। ছয় দফার প্রতি আপনার অকুণ্ঠ সমর্থন আমাদের বিরাট কাজে দিচ্ছে।

আপনার লেখনী জনমত গঠনে বড় ভূমিকা রাখছে।

এটা তো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। ছয় দফা এখন আর তোমার দাবি না। বাঙালি জাতির প্রাণের দাবি।

মানিক ভাই, এই উনিশ-বিশ বছরে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে যে বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে তা নিয়ে যদি একটা অনুসন্ধানী রিপোর্ট করাতেন তাহলে খুব ভালো হয়।

আচ্ছা করাব।

আরেকটা বিষয়...।

কী?

ছয় দফা নিয়ে আপনি যদি একটা কলাম লেখেন!

ঠিক আছে, লিখব।

এর মধ্যেই পিওন এসে চা-শিঙাড়া টেবিলে রেখে যায়। গরম শিঙাড়া আর চায়ের ঘ্রাণ নাকে যেতেই কেমন যেন একটা আকর্ষণ টের পান মুজিব। শিঙাড়া হাতে নিতে নিতে তিনি বলেন, মানিক ভাই, আমি নিলাম।

অবশ্যই।

শেখ মুজিব মজা করে গরম শিঙাড়া খাচ্ছেন। মানিক মিয়াও গরম শিঙাড়া মুখে নিয়ে জিহ্বা দিয়ে এদিক-ওদিক করেন। তারপর বলেন, আসলেই মজা লাগছে।

অনেক দিন পর শিঙাড়া খাচ্ছি। মানিক ভাই, পত্রিকা ঠিকঠাক চলছে তো! আগের মতো অর্থনৈতিক সংকট নেই তো!

তা নেই। কিন্তু সরকার যেভাবে চাপাচাপি শুরু করেছে, তাতে কত দিন চালাতে পারি কে জানে!

সব দিক ঠিক রেখে যা করার করেন। পত্রিকাও তো ঠিক রাখতে হবে।

তা ঠিক আছে। কিন্তু তাই বলে অন্যায়ের কাছে তো মাথা নত করা যাবে না।

ধন্যবাদ মানিক ভাই। আমি জানি, আপনি তা কখনোই করবেন না।

শেখ মুজিব চায়ে চুমুক দেন। মানিক মিয়াও চুমুক দিয়ে কাপটা টেবিলের ওপর রাখেন। তারপর বলতে শুরু করেন। আওয়ামী লীগ আর ইত্তেফাক হচ্ছে পরস্পরের পরিপূরক। আওয়ামী লীগ যা করে তা যদি ইত্তেফাকে না থাকে তাহলে মানুষ এটা পড়বে? আওয়ামী লীগকে যারা ভালোবাসে তারাই এই পত্রিকাটা পড়ে।

তার পরও আপনি দেখবেন, আমরা যদি কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিই, আপনি তা বলবেন। আপনার পরামর্শ আমার জন্য এবং আওয়ামী লীগের জন্য খুব কাজে লাগবে।

ভুল কিছু করলে অবশ্যই আমি বলব মুজিব। তুমি ভেবো না, আমি তখন তোমাকে ছেড়ে কথা বলব। হা হা হা!

শেখ মুজিবও হাসলেন। তারপর চেয়ার থেকে উঠতে উঠতে বললেন, মানিক ভাই, আমি এখন যাই।

আরে কোথায় যাবে? বসো না আর কিছুক্ষণ! শোনো, সাবধানে থেকো। সরকারের মনোভাব ভালো মনে হচ্ছে না।

সেটা আমি জানি মানিক ভাই। পারলে তো আমাকে এখনই গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের জন্য হয়তো পথ খুঁজছে। আপনার ওপরও কিন্তু ওদের নজরদারি আছে। সব কিছু খেয়াল রাইখেন।

ঠিক আছে মুজিব। তুমি চিন্তা কোরো না।

যাই। ভালো থাকবেন।

শেখ মুজিব বের হয়ে বাসার উদ্দেশে রওনা হলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বাসায় পৌঁছলেন। তিনি বাসায় যাওয়ার পর ফজিলাতুননেসা রেণু তাঁকে জানালেন, গভর্নর সাহেব তোমাকে হন্যে হয়ে খুঁজছেন। উনি বললেন, তোমাকে নাকি খুব দরকার।

তাই নাকি? ফোন করেছিল?

হ্যাঁ, বেশ কয়েকবার।

আচ্ছা, আমি ফোন করে দেখি।

শেখ মুজিব টেলিফোনের কাছে এগিয়ে গেলেন। এর মধ্যে আবার টেলিফোনের রিং বাজল। তিনি ফোন ধরার সঙ্গে সঙ্গে গভর্নর সাহেব বললেন, আমি মোনেম, আবদুল মোনেম খাঁ। শেখ সাহেব, ভালো আছেন?

জি, ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?  

আমিও ভালো আছি। আমি আপনার বাসায় বেশ কয়েকবার ফোন করেছিলাম।

জি, আমি শুনেছি। গভর্নর সাহেব হঠাৎ আমাকে খুঁজছেন! নিশ্চয়ই জরুরি কোনো বিষয় আছে?

জি, জরুরি বিষয়। বিষয়টা আপনাকে না বললেই নয়।

কী বিষয়, বলেন তো!

শেখ সাহেব, ছয় দফা নিয়ে তো আপনি বেশ মিটিংটিটিং চালিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের ওপর চাপ থাকা সত্ত্বেও বাধাটাধা খুব একটা দিচ্ছি না। কিন্তু আমি আপনার একটা সহযোগিতা চাই।

আমি আপনাকে কিভাবে সহযোগিতা করতে পারি, বলেন তো!

প্রেসিডেন্ট সাহেব ফোন দিয়েছিলেন। উনি ১৯ মার্চ ঢাকায় আসবেন। ২০ তারিখে আমাদের কাউন্সিলের সমাপনীতে ভাষণ দেবেন। প্রেসিডেন্ট সাহেব ঢাকায় থাকা অবস্থায় আপনি এবং আপনার দল যদি কোনো কর্মসূচি না রাখত তাহলে আমি কৃতজ্ঞ থাকতাম।

গভর্নর সাহেব, এ জন্য আপনি নিজে ফোন করেছেন বলে ধন্যবাদ। আমাদেরও তো কাউন্সিল আছে। আমরা কাউন্সিল তো আর বন্ধ রাখতে পারি না!

যদি পারেন তাহলে খুব ভালো হয়। না পারলে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত থাকলেও হবে। আমি বলতে পারব, আপনি প্রেসিডেন্ট সাহেবের সম্মানে রাজনৈতিক বক্তৃতা-বিবৃতি দেননি।

আমি রাজনীতি করি। আমি যা বলব তাই তো রাজনৈতিক বক্তৃতা; তাই না?

হ্যাঁ, তাই তো!

তাহলে আপনি কি আমার মুখ বন্ধ রাখতে বলেন?

মাত্র দেড় দিন; কিছু না বললে কি বড় ক্ষতি হয়ে যাবে!

তার মানে আমি প্রেসিডেন্ট সাহেবের ভয়ে কিছু বলব না!

ভয়ে কেন হবে শেখ সাহেব? আপনাকে তো আমি অনুরোধ করছি। আমি পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর! এই অনুরোধ তো আমি আপনাকে করতেই পারি। পারি না?

নিশ্চয়ই পারেন। কিন্তু আমি তো এমন কিছু করছি না যার জন্য আপনার প্রেসিডেন্ট সাহেব বিব্রত হতে পারেন।

আসলে প্রেসিডেন্ট সাহেব ছয় দফা নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন। সে কারণে পত্রিকায় যদি খুব বেশি রিপোর্ট-টিপোর্ট আসে তাহলে উনি আরো বেশি টেনশনে পড়বেন।

ওনার এত টেনশন করার দরকার কী? আমাদের দাবিদাওয়া মেনে নিলেই তো হয়!

সেটা প্রেসিডেন্ট সাহেবের ব্যাপার। আমি আপনাকে অনুরোধ করলাম। রাখা না রাখা আপনার বিবেচনা। রাখি আমি। খোদা হাফেজ।

জি, ভালো থাকবেন।

মোনেম খাঁ যে কিছুটা চটেছেন তা শেখ মুজিব বুঝতে পারলেন। তিনি সোফায় বসে কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন। ছয় দফা নিয়ে প্রেসিডেন্ট সাহেব যে অস্বস্তিতে আছেন তা আর বোঝার বাকি নেই। তিনি চোখ বন্ধ করে সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছেন। তার জন্য চা-নাশতা নিয়ে আসেন ফজিলাতুননেসা রেণু। তিনি নরম গলায় ডাকেন। তারপর বলেন, কী ব্যাপার? কোনো সমস্যা?

শেখ মুজিব মাথা তুলে বললেন, না, তেমন কিছু না।

গভর্নর সাহেব কী বললেন?

প্রেসিডেন্ট সাহেব নাকি ঢাকায় আসবেন। তাই ছয় দফা নিয়ে বেশি কথাবার্তা না বলার অনুরোধ করলেন।

ও আচ্ছা। তুমি কী বলেছ?

বললাম, আমাদের দাবি মেনে নিলেই তো হয়! তাহলে তো আর কথাবার্তা বলতে হয় না।

উনি আর কিছু বললেন?

না। টেলিফোন রেখে দিলেন।

আমি দু-তিনবার টেলিফোন ধরলাম তো! তাঁকে খুব উদ্বিগ্ন মনে হলো।

তাঁর অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে চাপে আছেন। আচ্ছা, তাঁর কথা বাদ দাও। হাসু, কামাল ওরা কই?

ওরা তো ঘরেই আছে।

রাসেল, রাসেল কই?

ও ঘুমাচ্ছে।

এ সময় কলিং বেলের শব্দ পেয়ে ফজিলাতুননেসা রেণু দরজা খোলার জন্য এগিয়ে যান। দরজার সিটকিনি খুলে সামনের দিকে তাকাতেই তাজউদ্দীন ও সৈয়দ নজরুল একসঙ্গে সালাম দিলেন। তাজউদ্দীন বললেন, কেমন আছেন ভাবি?

জি, ভালো আছি। আপনারা কেমন আছেন?

আমরা ভালো আছি। মুজিব ভাই আছেন তো? তাজউদ্দীন বললেন।

হ্যাঁ, আছেন। কিছুক্ষণ আগেই এসেছেন।  

শেখ মুজিব দরজার সামনে এগিয়ে গিয়ে তাজউদ্দীন ও সৈয়দ নজরুলকে দেখে বললেন, ও, তোমরা আসছ?

জি, মুজিব ভাই। কাউন্সিলের সব আয়োজন চূড়ান্ত। সব জেলায় দাওয়াতপত্র পৌঁছানো হয়েছে।

বসো না! বসে কথা বলো। রেণু, চা দাও তো সবাইকে! শেখ মুজিব বললেন।

তাজউদ্দীন আহমদ ও সৈয়দ নজরুল ইসলাম সোফায় পাশাপাশি বসলেন। ফজিলাতুননেসা রেণু চা বানানোর জন্য ভেতরের ঘরে চলে গেলেন। আবার কথা শুরু করলেন তাজউদ্দীন। তিনি বললেন, মুজিব ভাই, ছয় দফা বুকলেট আকারে ছাপতে দিয়েছি। কাউন্সিলে বুকলেটটি বিলি করা হবে। আমাদের কাউন্সিলরদের মাধ্যমে বুকলেট সারা দেশে পৌঁছে যাবে।

খুব ভালো করেছ।  

সৈয়দ নজরুল বললেন, শুনলাম আইয়ুব খান নাকি ঢাকায় আসবেন?

ঠিকই শুনেছ। গভর্নর সাহেব ফোন করেছিলেন।

উনি কী বলেন?

ছয় দফার ব্যাপারে আমি যেন এখন আর কিছু না বলি।

কী বলেন! বিস্ময়ের সঙ্গে তাজউদ্দীন বললেন।

সৈয়দ নজরুল বললেন, কেন, উনি জানেন না আমাদের কাউন্সিল আছে!

নিশ্চয়ই জানেন। সে জন্যই হয়তো অনুরোধটা করেছেন। আচ্ছা শোনো, কাউন্সিলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানাইও।

তাজউদ্দীন বললেন, জি মুজিব ভাই।

চা নাও।

জি নিচ্ছি।

আর শোনো, তোমরা রাতে খেয়ে যেয়ো। আমি আসছি।

তাজউদ্দীন ও সৈয়দ নজরুল শেষ পর্যন্ত রাতের খাবার খেয়েই শেখ মুজিবের বাসা থেকে বের হলেন।

সকালে পত্রিকা হাতে নিয়ে বাসায় গিয়ে বসলেন শেখ মুজিব। তিনি প্রথমেই ইত্তেফাকের দিকে চোখ বোলান। হঠাৎ এক জায়গায় তাঁর চোখ আটকে যায়। ইত্তেফাকে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, ভারতে পাট রপ্তানি নিষিদ্ধ করে দেওয়ায় পূর্ব পাকিস্তানের পাট চাষিরা যে চরম দুর্দশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে তার একটি চিত্র ফুটে ওঠে ফরিদপুরের গ্রাম্য কবি রেয়হান বয়াতির লেখা একটি গানের কলিতে।

চালের কথা বলব কি ভাই

পাটের কথাই কই

এই পাটের রশি গলায় দিয়া

গাছে ঝুইল্যা রই।

কথাগুলো শেখ মুজিবের বেশ মনে ধরেছে। তিনি বারবার গানের লাইনগুলো মুখে আওড়ান। আর মনে মনে ভাবেন, এর আগে পত্রিকায় দেখলাম, ভারত থেকে পাতা আমদানি নিষিদ্ধ করায় সাত লাখ বিড়ি শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে। পাট রপ্তানি নিষিদ্ধ করায় পাট চাষিরা বিপদে পড়েছে। তার মানে দেশের মানুষ বড়ই কষ্টে আছে। তাদের ঘরে খাবার নাই। পকেটে পয়সা নাই। মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এভাবে চলতে পারে না। এর একটা বিহিত করতেই হবে।

সাত.

প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান বিশেষ বিমানে ঢাকায় আসেন। তাঁর জন্য বিমানবন্দরে বিপুল সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। তাঁকে খুশি করতে সকাল থেকে রাস্তার দুই পাশে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের রোদের মধ্যে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। শিক্ষার্থীরা প্ল্যাকার্ড নাড়িয়ে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’, ‘আইয়ুব খান জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিয়ে প্রেসিডেন্ট সাহেবকে স্বাগত জানায়।

আইয়ুব খানের ঢাকা আগমন উপলক্ষে এমন পরিবেশ তৈরি করা হয় যে প্রেসিডেন্ট এবং ক্ষমতাসীন কনভেনশন মুসলিম লীগ ছাড়া দেশে আর কিছু নেই। গভর্নর মোনেম খাঁর আয়োজন দেখে খুশিতে আটখানা প্রেসিডেন্ট সাহেব তাঁর ঘাড়ে হাত রেখে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। আর তাতে মোনেম খাঁর তেলমর্দনের পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। তিনি একটি কথাই বারবার তাঁকে মনে করিয়ে দিলেন। স্যার, ছয় দফা নিয়ে টেনশনের কিছু নেই। আপনার জনপ্রিয়তা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে মুজিব যতই ফাল পারুক আপনার টিকিটিও ছুঁতে পারবে না। বরং তার  পা-ই মচকে যাবে।

প্রেসিডেন্ট সাহেব অবশ্য রসিকতা করে বললেন, গভর্নর সাহেব, মুজিবের পা মচকালে হবে না। পা ভেঙে ফেলতে হবে। এ জন্য যদি মল্লযুদ্ধও করতে হয় তা করতে হবে। আপনি কি আমার কথা বুঝতে পেরেছেন?

মোনেম খাঁ মাথা নেড়ে বললেন, জি স্যার, বুঝেছি।

আরেকটা কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন।

জি স্যার।

সমাপনী অনুষ্ঠানে অনেক লোকের সমাগম দেখতে চাই।

অবশ্যই দেখতে পাবেন স্যার। আমি সব ব্যবস্থা করে রেখেছি। সারা দেশ থেকে দলে দলে লোক আসবে। আপনার আগমনের কথা শুনে দেশের মানুষের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা দিয়েছে স্যার। আপনি সমাপনী অনুষ্ঠানে গিয়েই তা টের পাবেন স্যার।

আমার থাকার ব্যবস্থা কোথায় করেছেন?

হোটেলে স্যার। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। ওখানেই নিরাপদ।

আচ্ছা।

শুনলাম মুজিবের দলের কাউন্সিলও নাকি একই সময়ে?

জি স্যার। ঠিকই শুনেছেন।

কাউন্সিলের উদ্দেশ্য কী?

অনেক আগে থেকেই ওরা কাউন্সিল করার উদ্যোগ নিয়েছিল। আপনার আসার তারিখ তো অনেক পরে ঠিক হয়েছে। আপনি চিন্তা করবেন না স্যার। তারা কাউন্সিলের বাইরে কিছু করবে না।

আপনি কি কথা বলেছিলেন?

জি স্যার। শেখ মুজিবের সঙ্গেই কথা বলেছি।

কী বলল?

বলল, কাউন্সিলের বাইরে কিছু করবে না।

আমি কি কড়া বক্তৃতা করব, নাকি স্বাভাবিক?

স্যার, কড়া বক্তৃতাই করেন। আপনার হুমকিতে সব ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।

তাই? ঠিক আছে।

এর মধ্যেই হোটেলে এসে গাড়ি থামল। প্রেসিডেন্ট সাহেব গাড়ি থেকে নামলেন। চারদিকে তাকিয়ে দেখলেন, নিরাপত্তাব্যবস্থা বেশ জোরদার। প্রেসিডেন্ট সাহেব আবারও গভর্নর সাহেবের পিঠ চাপড়ে বাহবা দিয়ে হোটেলের ভেতরে ঢুকলেন। তিনি এমন ভাব করলেন যেন পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি তিনি। তাঁর চারপাশে যারা আছে তারা সবাই ভৃত্য শ্রেণির।

মোনেম খাঁ প্রেসিডেন্ট সাহেবকে হোটেলে তুলে দিয়ে গভর্নর হাউসে গেলেন। কনভেনশন মুসলিম লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের ডাকলেন। নেতারা যথাসময়ে গভর্নর হাউসে উপস্থিত হলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই গভর্নর হাউসের হলঘর পূর্ণ হয়ে গেল। গভর্নর সাহেবকে খবর দেওয়া হলো। তিনি হলঘরে উপস্থিত হলে সবাই দাঁড়িয়ে তাঁকে সম্মান প্রদর্শন করল।

গভর্নর সাহেব সবার উদ্দেশে বললেন, আপনারা সবাই জানেন, আমাদের মহামান্য প্রেসিডেন্ট ঢাকায় এসেছেন। তিনি কাল সকালে আমাদের পার্টির সমাপনী অধিবেশনে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেবেন। প্রেসিডেন্ট সাহেব চান, ডেলিগেটদের বাইরেও আমাদের কর্মী-সমর্থকদের হাজির করতে হবে। এ জন্য আপনাদের সবাইকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। এমনভাবে লোক জড়ো করতে হবে যাতে তাঁর মনোবল কয়েক গুণ বেড়ে যায়। প্রেসিডেন্ট সাহেবের অসীম ক্ষমতা। যারা ছয় দফা নিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি করছে তাদের এক নিমেষেই তিনি খতম করে দিতে পারেন। কিন্তু তিনি বিশাল হৃদয়ের মানুষ। তাই তিনি ক্ষমার দৃষ্টিতে তাদের দেখেন। তবে বেশি বাড়াবাড়ি করলে কোনো ক্ষমা নাই। এটাও পরিষ্কার কথা। আপনারা এখন যান। সমাপনী অনুষ্ঠানের জন্য যত ভালোভাবে প্রস্তুতি নেওয়া লাগে নেন।

হলঘরে উপস্থিত কেউ কেউ গভর্নর সাহেবকে তোয়াজ করে, ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে কিছু কথা বলার চেষ্টা করলেও তিনি কানে তোলেননি। কাউকে কথা বলারও সুযোগ দেননি।

নেতাদের কেউ কেউ হতাশ হয়ে খেদের সঙ্গে বলেন, কোনো লাভ নাই। মানুষ শেখ মুজিবের দিকে ঝুঁইকা পড়তেছে!     

 

কনভেনশন মুসলিম লীগের সমাপনী অধিবেশনে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। সর্বত্র মানুষ আর মানুষ। তারা পাকিস্তানের ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানকে দেখতে এসেছে। তারা একনজর দেখে মনের সান্ত্বনা মেটাবে।

ঘড়িতে কাঁটায় কাঁটায় দশটা। ঠিক তখনই প্রেসিডেন্ট সাহেব অনুষ্ঠানস্থলে এসে পৌঁছলেন। তাঁর সঙ্গে গভর্নর সাহেবও আছেন। প্রেসিডেন্ট সাহেবকে দেখে অনুষ্ঠানে আসা লোকজন মুহুর্মুহু করতালি আর স্লোগান দিয়ে স্বাগত জানায়। কনভেনশন মুসলিম লীগের কর্মীরা টানা প্রায় ১০ মিনিট ধরে ‘আইয়ুব খান জিন্দাবাদ’ ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিয়ে মুখরিত করে তুলল অনুষ্ঠানস্থল।

মানুষের তুমুল আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখে প্রেসিডেন্ট সাহেবও উদ্বেলিত হয়ে গেলেন। তিনি মনে মনে বললেন, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ আমাকে কত ভালোবাসে! আর মুজিব সেই মানুষদের ভুল বুঝিয়ে তাদের নিয়ে কী সব ষড়যন্ত্র পাকাচ্ছে! হায় খোদা! তুমি তাকে হেদায়েত করো!

গভর্নর সাহেব প্রেসিডেন্ট সাহেবকে নিয়ে সভামঞ্চে বসলেন। এ সময় এক নেতা প্রেসিডেন্ট সাহেবের গুণকীর্তন গেয়ে মাইক ফাটিয়ে ফেলছেন। প্রেসিডেন্ট সাহেব যতই তাঁকে থামতে বলছেন, ততই তাঁর স্তুতির পরিমাণ বেড়ে যায়। একপর্যায়ে গভর্নর সাহেব দাঁড়িয়ে গেলেন। লোকটিকে ধমকের সুরে বললেন, প্রেসিডেন্ট সাহেব তোমার স্তুতি শোনার জন্য এখানে আসেন নাই। তিনি দেশ ও জাতির উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতা করবেন। তাঁর দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ আমাদের ভবিষ্যৎ চলার পথকে সুগম করবে। ভাইসব, আপনারা অধীর আগ্রহে যাঁর বক্তৃতা শোনার জন্য অপেক্ষা করছেন তিনি আমাদের পথপ্রদর্শক, মহামান্য প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান। এখন তিনি বক্তৃতা করবেন।

প্রেসিডেন্ট সাহেব দাঁড়ানো মাত্র আবার শুরু হলো করতালি। করতালির তালে তালে স্লোগানও চলতে থাকল। প্রেসিডেন্ট সাহেব বক্তৃতা শুরু করতে গিয়েও বারবার হোঁচট খাচ্ছিলেন। প্রেসিডেন্ট সাহেব দুই হাত নেড়ে স্লোগান থামানোর অনুরোধ করলেন। পরে তিনি বক্তৃতা শুরু করলেন। ভাইয়েরা আমার, আপনাদের জন্য আমি কত কী করছি! দেশটাকে গড়ে তুলতে রাত-দিন খাটাখাটুনি করছি। কিন্তু একটা পক্ষ আপনাদের ভালো চায় না। তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায়। তাদের কর্মকাণ্ডে আমি সত্যিই উদ্বিগ্ন; আবার বিরক্তও। আমি অনেক ধৈর্য ধরেছি। আর না। দেশের অখণ্ডতার বিরুদ্ধে যেকোনো কর্মকাণ্ড কঠোর হাতে দমন করা হবে। প্রয়োজনে অস্ত্রের মুখে জবাব দেওয়া হবে।

সঙ্গে সঙ্গে গভর্নর সাহেব দাঁড়িয়ে স্লোগান শুরু করলেন। প্রেসিডেন্ট সাহেব জিন্দাবাদ! আইয়ুব খান জিন্দাবাদ! তাঁর সঙ্গে নেতাকর্মীরাও স্লোগান দিতে লাগল। প্রেসিডেন্ট সাহেব বক্তৃতা শেষ করলেন। তারপর সভামঞ্চ ত্যাগ করে সরাসরি বিমানবন্দরে চলে গেলেন।

পূর্ব পাকিস্তানের বাতাসে উত্তাপ ছড়িয়ে ঢাকা ত্যাগ করলেন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব।

আট.

আওয়ামী লীগের কাউন্সিল চলার সময়ই আইয়ুব খানের উত্তপ্ত বক্তব্য কানে পৌঁছে নেতাকর্মীদের। তাঁর বক্তব্য তাদের উদ্বিগ্ন করে তোলে। একজন আরেকজনের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফাস করে আইয়ুব খানের বক্তব্য তুলে ধরে। এভাবেই এক কান দুই কান করে সবার কানে চলে যায়। শেখ মুজিব, তাজউদ্দীনও প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের বক্তব্য সম্পর্কে অবহিত হন। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই কাউন্সিলের সমাপনী অধিবেশনে অন্য রকম পরিবেশ সৃষ্টি হয়। কাউন্সিলররা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে শেখ মুজিব এবং সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীনকে বেছে নেওয়াটা শ্রেয় মনে করেন।

অধিবেশনের শেষ পর্যায়ে শেখ মুজিব তাজউদ্দীনের কানে কানে বলেন, আজই পল্টন ময়দানে সমাবেশ করতে হবে। আইয়ুবের বক্তব্যের জবাব দিতে হবে। তা না হলে আমাদের কর্মী-সমর্থকদের মনোবল ভেঙে যাবে। দেশের মানুষও মনে করতে পারে, তাদের আমি ভুল বুঝাইতেছি। কথাটা যে ঠিক না, সেটা এখনই বলা দরকার। কথায় আছে না, দুঃসংবাদ বাতাসের আগে ছড়ায়। আইয়ুব খানের বক্তব্যও বাতাসের আগে সারা দেশে ছড়িয়ে যাবে।

তাজউদ্দীন আর দেরি না করে ওখানে বসেই পল্টন ময়দানে জনসভার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ভাইসব, আপনারা ইতিমধ্যেই হয়তো শুনেছেন, আইয়ুব খান সাহেব আমাদের হুমকি দিয়েছেন। তা তিনি দিতেই পারেন। কিন্তু তাঁর হুমকি যৌক্তিক কি না সে বিষয়ে আমাদের কথা বলা প্রয়োজন। আমরা আজই পল্টন ময়দানে সমাবেশ করব। আপনারা সবাই উপস্থিত থাকবেন। আর এখানে যাঁরা আছেন তাঁরা পল্টন ময়দানে চলে গেলে আমরা খুশি হব।

উপস্থিত সবাই হাত উঁচিয়ে সম্মতি জানায়। কেউ কেউ স্লোগান ধরে, মুজিব তুমি এগিয়ে চলো, আমরা আছি তোমার সাথে। ছয় দফা ছয় দফা, মানতে হবে মেনে নাও। মুজিব তোমার ভয় নাই, আমরা আছি লাখো ভাই।

কাউন্সিলে যোগদানকারীরা সবাই পল্টনের দিকে রওনা হয়েছে। ঢাকা ও ঢাকার আশপাশ থেকেও লোকজন এসেছে। অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে পল্টন ময়দান কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেছে। বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা ছয় দফার পক্ষে বক্তৃতা করছেন। মাঠের ভেতর থেকে চিৎকার দিয়ে কেউ কেউ বলছে, আমরা মুজিব ভাইয়ের বক্তৃতা শুনতে চাই। মুজিব ভাইকে বক্তৃতা দিতে দেন।

নেতারা বুঝতে পারলেন, লম্বা বক্তৃতা আর চলবে না। জনগণ এখন শেখ মুজিবের কথা শুনতে চায়। তারা আসলে শেখ মুজিবের কথা শোনার জন্যই এসেছে। কাজেই আর সময়ক্ষেপণ করা যাবে না।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদ দ্রুত তাঁদের বক্তৃতা শেষ করলেন। তাঁরা উভয়েই ছয় দফার পক্ষে নানা যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করলেন। ছয় দফা নিয়ে তাঁদের বক্তব্য শুনে সবাই অবশ্য একটু অবাকই হলো। তাঁরা এত চমৎকার বক্তৃতা দেবেন তা অনেকের ধারণার মধ্যে ছিল না। তারা করতালি দিয়ে উভয় নেতাকে স্বাগত জানায়। কেউ কেউ মন্তব্য করল, যোগ্য নেতার যোগ্য উত্তরসূরি।

এরপর শেখ মুজিবের পালা। তিনি যখন বক্তৃতা দিতে দাঁড়ালেন তখন শুরু হলো হাততালি। হাজার হাজার মানুষের হাততালির শব্দে পল্টন ময়দান মুখরিত হয়ে উঠল। তারপর শুরু হলো স্লোগান, মুজিব তুমি এগিয়ে চলো, আমরা আছি তোমার সাথে। মুজিব তোমার ভয় নাই, আমরা আছি লাখো ভাই।  

শেখ মুজিব শুরু করলেন। ভাইয়েরা আমার, আজ আমি এমন একটা সময়ে আপনাদের সামনে বক্তৃতা দিতে দাঁড়িয়েছি, যখন দেশের পরিস্থিতি খুব ঘোলাটে হয়ে পড়েছে। আপনারা জানেন কি না; নিশ্চয়ই জানেন, প্রেসিডেন্ট সাহেব হঠাৎ ঢাকায় এলেন। তিনি কেন এলেন? তাঁর কনভেনশন মুসলিম লীগের কাউন্সিলের সমাপনী। সেখানে তিনি বক্তৃতা করলেন। তাঁর বক্তৃতার মূল কথাই ছিল, তিনি বিরোধী দলের কার্যকলাপে উদ্বিগ্ন। দেশের অখণ্ডতাবিরোধী কোনো প্রচেষ্টা তিনি সহ্য করবেন না। প্রয়োজন হলে অস্ত্রের মুখে মোকাবেলা করবেন। আমরাও বলে দিবার চাই, কোনো হুমকিই জনসাধারণকে ছয় দফার দাবি থেকে নিবৃত্ত করতে পারবে না।

পল্টনের জনসভায় অংশগ্রহণকারীরা চিৎকার দিয়ে শেখ মুজিবের প্রতি সমর্থন জানায়। মাঠের বিভিন্ন কর্নার থেকে শেখ মুজিবকে উদ্দেশ করে স্লোগান ওঠে। মুজিব কিছুক্ষণ থেমে আবার বলেন, কেবল শক্তিশালী কেন্দ্র নয়, উভয় অংশকে শক্তিশালী করতে হবে। পাক-ভারত যুদ্ধের সময় দেখা গেছে, শক্তিশালী কেন্দ্র থাকা সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তান সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন ও অসহায় হয়ে পড়েছিল। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন তাহলে পূর্ব পাকিস্তানকে জাতীয় সংকটের সময় সাহায্য করা যায়নি। কেন তাহলে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাতীয় পরিষদে এই উক্তি করেছিলেন যে চীনের জন্য পূর্ব পাকিস্তান রক্ষা পেয়েছে। কেন্দ্রকে শক্তিশালী করার কথা তাহলে খাটে কী করে? পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা কখনো পশ্চিম পাকিস্তান বা বিদেশের ওপর নির্ভর করতে পারে না।

শেখ মুজিব সমাবেশে ঘোষণা দেন, তিনি ছয় দফার পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে ইতিমধ্যেই অনেক জেলা সফর করেছেন। বাকি জেলাগুলোতে যাবেন।

শেখ মুজিবের বক্তৃতা শেষ হওয়ার পর সবাই দলে দলে মিছিল নিয়ে যার যার এলাকায় চলে যায়। মিছিল থেকে একটা স্লোগানই বারবার শোনা যাচ্ছিল, ছয় দফা ছয় দফা, মানতে হবে মেনে নাও। এই স্লোগান ধীরে ধীরে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ল।     

নয়.

মতিয়ার মন-মেজাজ ভালো নেই। সংবাদ পত্রিকায় আইয়ুব খানের বক্তৃতা পড়ার পরই তাঁর মেজাজ বিগড়ে যায়। তিনি ঘরের মধ্যে পায়চারি করেন আর মনে মনে বলেন, এটা কোনো কথা হলো! উনি দেশের প্রেসিডেন্ট। উনি এভাবে বলতে পারেন! অস্ত্রের মুখে জবাব দেবেন! অস্ত্রের মুখে উনি দেশের জনগণকে জব্দ করবেন? নাকি উনি সংঘাত ডেকে আনতে চান? অবশ্য ওনার সঙ্গে জনগণের কোনো সংস্রব নেই। জনগণের দুঃখকষ্ট উনি বুঝবেনও না। কিন্তু আমাদের তো চুপ করে থাকলে চলবে না। এর প্রতিবাদ করতে হবে। উনি নিজেই যদি সংঘাত ডেকে আনেন, তাহলে আমাদের কী করার আছে? আমরা এর প্রতিবাদ করব।

মতিয়া তখনই কয়েকজন ছাত্রনেতার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বললেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রসমাবেশ ডাকার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। বিষয়টা যাতে সাধারণ ছাত্ররা জানতে পারে সে জন্য পত্রিকায় প্রেস রিলিজ পাঠানোরও পরামর্শ দেন তিনি।

পরে মতিয়া সংবাদ অফিসে বজলুর রহমানের কাছে ফোন করেন। তাঁকে তিনি বলেন, হ্যালো বজলু!

হ্যা, বলো কী খবর?

আইয়ুব খানের বক্তৃতা শুনছ?

শুনলাম তো!

শোনো, কাল ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকে একটা প্রতিবাদ সমাবেশ করবে। ওরা আমাকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। সেই সঙ্গে আমার সহযোগিতা চেয়েছে। সেটা করা তুমি ছাড়া সম্ভব না।

কী ধরনের সহযোগিতা?

তুমি করবে কি না সেটা বলো।

অবশ্যই। আমার সাধ্যের মধ্যে থাকলে অবশ্যই করব।

ওরা চায় ছাত্রসমাবেশ করতে। যাতে সেখানে সাধারণ ছাত্ররাও উপস্থিত থাকে। এ জন্য তুমি কী সহযোগিতা করতে পারো?

আমি একটা রিপোর্ট করে দিতে পারি।

গুড আইডিয়া। এটাই আমি চাচ্ছিলাম। তুমি তাই করো। একটা রিপোর্ট করে দাও। শোনো, রিপোর্টটা তো কাল বের হবে! তুমি হেডিং দিবা, আজ ক্যাম্পাসে ছাত্রসমাবেশ।

আচ্ছা, ঠিক আছে।  

আমি তাহলে রাখছি। আমি এখন পার্টি অফিসে যাচ্ছি। পরে তোমার সঙ্গে কথা হবে।

শোনো, সাবধানে থেকো। একা কোথাও যেয়ো না। যে দেশের প্রেসিডেন্ট অস্ত্রের ভয় দেখায় সে দেশে যা খুশি তা হতে পারে।

তা ঠিক। তবে তুমি চিন্তা কোরো না। আমার ক্ষতি কেউ করতে পারবে না।

তার পরও সাবধানে চলাফেরা কোরো।

ঠিক আছে। তুমি চিন্তা কোরো না। আর শোনো, তুমি বাসায় কখন যাবে?

সন্ধ্যার পর।

আমাকে পার্টি অফিস থেকে নিয়ে যেয়ো।

আচ্ছা।

মনে থাকবে, না আমার মনে করাতে হবে?

আমি এতটা ভুলোমনা মানুষ নিশ্চয়ই নই!

ধন্যবাদ। রাখি তাহলে!

টেলিফোন রেখে বজলুর রহমান পত্রিকার পাতায় চোখ রাখেন। তাঁর মাথায় আইয়ুব খানের বক্তব্যটাই ঘুরপাক খায়। প্রেসিডেন্ট সাহেবের হুমকির বিষয়টি নিয়ে একটা মন্তব্য প্রতিবেদন লিখবেন বলে মনস্থির করেন। তবে এ বিষয়ে লেখার ব্যাপারে কোনো নিষেধাজ্ঞা আছে কি না তা শহীদুল্লা কায়সার ভালো জানবেন।

বজলুর রহমান শহীদুল্লা কায়সারের সামনে গিয়ে বসলেন। তাঁর কাছে জানতে চাইলেন, কায়সার ভাই, নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আছে নাকি?

কোন ব্যাপারে?  

সরকারের সমালোচনা আমরা কতটুকু করতে পারব? নাকি পারবই না?

গভর্নর মোনেম খাঁ নতুন যে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন তা পুরোপুরি মানলে পত্রিকা করা কঠিন।

কী রকম?

এই দেখেন না!

নিষেধাজ্ঞা জারির পত্রটি বজলুর রহমানের কাছে এগিয়ে দিলেন শহীদুল্লা কায়সার। বজলুর রহমান হাতে নিয়ে মনোযোগ দিয়ে পড়ছেন। তাতে বলা আছে, নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর ওপর কোনো সংবাদ, মন্তব্য, বিবৃতি, অভিযোগ বা মতামত প্রকাশ করতে পারবেন না।

এগুলো হচ্ছে পাকিস্তানের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে হানিকর কোনো প্রসঙ্গ; দেশের এক অংশের বা শ্রেণিবিশেষের অপর অংশকে শোষণের ও উভয় অংশের মধ্যে বৈষম্যের অভিযোগ; ছাত্রধর্মঘট, ছাত্রবিক্ষোভ, ছাত্র-অসন্তোষ, ছাত্রসভা ও ছাত্রদের বিভিন্নমুখী অভিযোগ ও সে-সংক্রান্ত সরকারি ব্যবস্থা।

এমনকি এই নিষেধাজ্ঞার সরকারি আদেশটির খবরও কোনো সংবাদপত্রে প্রকাশ নিষিদ্ধ করা হলো।

বজলুর রহমান পড়া শেষ করে বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, ও মাই গড! এসব শর্ত জুড়ে দিয়েছে! কায়সার ভাই, পত্রিকা কেমনে করবেন?

আর পত্রিকা করতে হবে না! পত্রিকা বন্ধ করে দিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হবে।

এর আগেও তো উদ্ভট একটা আদেশ দিয়েছিল। দেশরক্ষা আইনে সংবাদপত্রের ডিক্লারেশন বাতিল করে দিতে পারবে!

হ্যাঁ।

নাহ্! মনটাই খারাপ হয়ে গেল!

মন খারাপ করে আর কী করবেন! এটাই আমাদের নিয়তি। আসলে এসব করে কোনো লাভ হয় না। আমার মনে হয়, আইয়ুব সরকারের দিন শেষ হয়ে আসছে!

কোনো লক্ষণ তো দেখি না।  

দেখবেন, দেখবেন! নিশ্চয়ই দেখবেন।

যাই কাওসার ভাই। আমার ভালো লাগছে না।

কই যাবেন?

বাসায় যাই। মতিয়া পার্টি অফিসে। ওকে নিয়ে যেতে হবে।

আচ্ছা যান। কাল সকালে দেখা হবে।

বজলুর রহমান অফিস থেকে রিকশা নিয়ে মতিয়ার পার্টি অফিসের দিকে রওনা হলেন। তাঁর ভাবনাজুড়ে দেশের চলমান পরিস্থিতি। কী হবে, কোথায় যাবে এই দেশ! তিনি এ-ও ভাবেন, শেখ মুজিব এবং তাঁর দলের কয়েকজন নেতাকে জেলে আটকালেই সব আন্দোলন মাঠে মারা যাবে! মওলানা ভাসানী সাহেবই বা এসব কী বললেন! তিনি প্রকাশ্যে বললেন, ছয় দফা তিনি সমর্থন করেন না। কারণ তাতে অর্থনৈতিক মুক্তির কথা নেই। লোকটার কী হলো, বুঝতেই পারলাম না।

হঠাৎ মতিয়ার ডাকে ঘোর কাটে বজলুর রহমানের। তিনি চেয়ে দেখেন, রিকশাটা তাঁর বাসার সামনে। কখন মতিয়া রিকশায় উঠলেন তা তিনি মনে করতে পারছেন না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় তিল ধারণের ঠাঁই নেই। হাজার হাজার ছাত্র সমাবেশে যোগ দিয়েছে। মাঠের চারপাশেই গোয়েন্দা বিভাগের লোকজনও আছে। আছে সরকারি পুলিশ বাহিনী। তার মধ্যেই ছাত্রনেতারা সরকারবিরোধী বক্তৃতা করছেন। স্লোগান দিচ্ছেন। তবে তাঁরা মতিয়ার বক্তৃতা শোনার জন্যই অপেক্ষা করছেন। ছাত্রনেতাদের বক্তব্যের মাঝখানে ঘোষক দু-একবার ঘোষণাও করেছেন, ভাইসব, আপনারা জানেন, দেশ আজ ভয়াবহ সংকটে। স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের দুঃশাসনে আমরা অতিষ্ঠ। দেশে আজ খাদ্য সংকট চলছে। সাধারণ মানুষ অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে। চালের দাম অতিমাত্রায় বেড়ে গেছে। নিত্যপণ্যের দাম আকাশছোঁয়া। এসবের দিকে আইয়ুব সরকার কিংবা তাঁর চামচা গভর্নর মোনেম খাঁর নজর নেই। তাঁরা উভয়েই গদি টেকাতে ব্যস্ত।

হঠাৎ প্রেসিডেন্ট ঢাকায় এসে বললেন, প্রয়োজনে তিনি অস্ত্রের মাধ্যমে মোকাবেলা করবেন। আমরাও বলছি, প্রয়োজন হলে অস্ত্রের মুখে দাঁড়াব। আমাদের দাবি থেকে আমরা সরব না। আপনারা সবাই রাজি আছেন?

উপস্থিত শিক্ষার্থী সবাই হাত ওপরে তুলে চিৎকার দিয়ে বলল, রাজি আছি!

মতিয়া আবার বললেন, গভর্নর মোনেম সরকার সংবাদপত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। আমাদের প্রতিবাদ সমাবেশের খবর নাকি পত্রিকায় ছাপা যাবে না। এরপর বলবে, আমরা সমাবেশও করতে পারব না। রাস্তা দিয়ে একসঙ্গে চলতে পারব না। কথায় কথায় ছাত্রদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন চালাবে। এসব কি আপনারা মানবেন?

সবাই গলা উঁচু করে বলল, না, না! মানব না!

মতিয়া বললেন, তাহলে আজ থেকে আসুন, আমরা শপথ নিই; আমাদের ওপর জেল-জুলুম-অত্যাচার যা-ই হোক, আমরা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করব। যত বাধা আসুক আমরা রাস্তা ছাড়ব না।

ছাত্রসমাবেশের সমাপ্তি ঘোষণা করে মতিয়া মঞ্চ থেকে বিদায় নেন। তারপর চুপে চুপে তিনি রাস্তার সামনে আসেন। সেখান থেকে রিকশা নিয়ে সোজা বাসার উদ্দেশে রওনা হন। হঠাৎ তিনি দেখেন, তাঁকে একটি পুলিশের গাড়ি ফলো করছে। বিষয়টা তাঁর ভালো লাগেনি। তিনি তত্ক্ষণাৎ রিকশার হুড তুলে চিপাগলির মধ্য দিয়ে বাসার দিকে যান। পেছন দিকে তাকিয়ে গাড়িটি না দেখে তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়েন।     

দশ.

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো পূর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবের উদ্দেশে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছেন, তিনি ছয় দফা নিয়ে তাঁর সঙ্গে বাহাস করতে চান।

পত্রিকার মাধ্যমে ভুট্টো সাহেবের চ্যালেঞ্জের বিষয়টি সাধারণ মানুষ জানতে পারে। শেখ মুজিবও পত্রিকার মাধ্যমেই ভুট্টো সাহেবকে জানিয়ে দেন, তিনি তাঁর চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে রাজি আছেন। কখন কোথায় তিনি বাহাস করবেন তা জানানোর অনুরোধ জানান।

পরের দিন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সব পত্রিকায় শেখ মুজিবের বক্তব্য প্রকাশিত হয়। পত্রিকার খবর দেখে ভুট্টো সাহেব গভর্নর মোনেম খাঁকে ফোন করেন। তিনি তাঁকে জানান, ঢাকায় শেখ মুজিবের সঙ্গে তিনি বৈঠকে বসতে চান। শেখ মুজিবের সঙ্গে কথা বলে দিনক্ষণ ঠিক করার জন্য গভর্নর সাহেবকে দায়িত্ব দেন। তিনি এ-ও বলেন, আপনি আগে শেখ মুজিবের সঙ্গে বসেন। ছয় দফা নিয়ে তাঁর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শোনেন। তাঁদের দাবির যৌক্তিকতা আছে কি না তা বোঝার চেষ্টা করেন। তারপর আমাকে জানান।

গভর্নর সাহেব মনে মনে ভাবেন, দায়িত্বটি গুরুত্বপূর্ণ। নিশ্চয়ই প্রেসিডেন্ট সাহেব ভুট্টো সাহেবকে নির্দেশ দিয়েছেন। তা না হলে উনি উপযাজক হয়ে শেখ মুজিবের সঙ্গে বৈঠকে বসতে চাইতেন না। তিনিও তো আসলে আমার মতো প্রেসিডেন্ট সাহেবের গোলামি করছেন। দেখি, মুজিবকে পাওয়া যায় কি না।

গভর্নর সাহেব তখনই শেখ মুজিবকে টেলিফোন করেন। তাঁকে ফোনে তিনি বলেন, আপনার সঙ্গে ভুট্টো সাহেব বৈঠক করতে চান। আপনি যদি সময় দেন তাহলে খুব ভালো হয়।

অবশ্যই সময় দেব। কখন কোথায়, সেটা বলেন।

সেটা নিয়েই কথা বলব। আজ বিকেলে কি আমরা একটু বসতে পারি?

অবশ্যই। কোথায় বসতে চান?

আপনি বলেন।

তৃতীয় কোনো জায়গায়।

ঠিক আছে। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে।

আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি আসব।

ধন্যবাদ শেখ সাহেব।  

যথাসময়ে শেখ মুজিব তাঁর তিন রাজনৈতিক সহকর্মী তাজউদ্দীন, সৈয়দ নজরুল, ড. কামালকে নিয়ে হোটেলে পৌঁছেন। গভর্নর সাহেব আগে থেকেই হোটেলের একটি ভিআইপি কেবিনে অপেক্ষা করছিলেন। হোটেলের রিসেপশন থেকে গভর্নর সাহেব নিজেই শেখ মুজিব ও তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে হোটেল রুমে যান।  

শুরুতেই শেখ মুজিব সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। মোনেম খাঁ হাসতে হাসতে বলেন, আমি সবাইকেই খুব ভালো করে চিনি।

তার পরও এঁদের পরিচয় করায়ে দেওয়া আমার দায়িত্ব। তাহলে আলোচনা করতে সুবিধা হবে। কী বলেন?

জি। ঠিক বলেছেন শেখ সাহেব।

শেখ মুজিব বললেন, আপনার প্রেসিডেন্ট হয়তো ছয় দফা নিয়েই বেশি চিন্তিত।

তিনি আপনারও প্রেসিডেন্ট।

জি জি। ছয় দফা দাবিনামা কেন পেশ করেছি, সেটা তো জানেন?

আপনার যুক্তিগুলো শুনি।

আচ্ছা বলছি। আমি যদি আপনাকে প্রশ্ন করি, আমাদের পাট বিক্রির টাকা ইসলামাবাদ যায় কোন যুক্তিতে? পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে শিল্প-কারখানা হয় কোন যুক্তিতে? গত প্রায় দুই দশকে পূর্ব পাকিস্তানে কয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয়েছে? আর পশ্চিম পাকিস্তানে কয়টি হয়েছে? এসবের জবাব আগে দিন। তারপর ছয় দফার যৌক্তিকতা বুঝিয়ে বলব।

তাজউদ্দীন বললেন, খান সাহেব, আপনি তো গভর্নর! আপনার সবই জানার কথা। গত প্রায় দুই দশকে আমরা কী বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছি আর আপনারা কী করেছেন? হিসাব দেখলেই তো হয়! সে তুলনায় আমাদের এখানে কী উন্নয়ন হয়েছে? না হয়ে থাকলে কেন হয়নি? আপনার সরকার শুধু নেবে, কিছুই দেবে না, তা তো হয় না!

গভর্নর সাহেব একদম চুপ। তিনি কী বলবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না। কোনো প্রশ্নের জবাব নেই তাঁর কাছে। তিনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, নেন, চা নেন।

শেখ মুজিব চায়ে চুমুক দিয়ে কাপটা টি-টেবিলের ওপর রাখলেন। তারপর বললেন, পত্রিকায় দেখলাম ভুট্টো সাহেব আমার সঙ্গে বাহাস করতে চান। কবে? আমাকে আগে জানালে ভালো হয়। কারণ কাল থেকে ঢাকার বাইরে আমার কয়েকটি জেলা সফরে যেতে হবে। আর কোথায় বাহাস করবেন সেটাও বলেন।

১৭ এপ্রিল আপনি ঢাকায় থাকবেন?

ওই দিন তো ঢাকার বাইরে থাকার কথা!

তার পরও, যদি সম্ভব হয়...

আচ্ছা, আপনারা কোথায় সমাবেশ করতে চান?

আপনি যেখানে বলবেন। ভুট্টো সাহেব আমাদের অতিথি। ওনাকে যেখানে বলব, সেখানেই উনি যেতে পারবেন।

আমার প্রস্তাব পল্টন ময়দানে। আপনারা ডাকলে লোক আসবে কি না জানি না। আমি ডাকলে মুহূর্তের মধ্যে পল্টন ময়দান ভরে যাবে। বাহাসটা জমবে। শুধু পল্টন ময়দানে নয়, লাহোর, করাচি যেকোনো স্থানেই আমি বাহাস করতে রাজি আছি। আমি ছয় দফা নিয়ে বক্তৃতা করব। আপনারা তার পাল্টা বক্তৃতা দেবেন।   দেখি কার কথা পাবলিক শোনে!

গভর্নর সাহেব বসা থেকে উঠতে উঠতে বললেন, ঠিক আছে। তাহলে এই কথাই রইল। শেখ মুজিবও উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর সঙ্গে তাজউদ্দীন, সৈয়দ নজরুল ও ড. কামালও দাঁড়ালেন। তারপর গভর্নরের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হোটেল ত্যাগ করলেন।

মোনেম খাঁ সাহেব হোটেল থেকেই জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ফোন করেন। ভুট্টো সাহেব ফোন ধরেন। গভর্নর সাহেব নিজের পরিচয় দিয়ে বলেন, আমি মোনেম খাঁ।

জুলফিকার আলী ভুট্টো যেন মোনেম খাঁ সাহেবের ফোনের অপেক্ষায়ই ছিলেন। তাঁর ফোন পাওয়া মাত্র তিনি বললেন, বলেন খাঁ সাহেব! মুজিব রাজি হলো?

উনি তো এক পায়ে খাড়া! যদিও তাঁর ঢাকার বাইরে কর্মসূচি আছে। তার পরও উনি আপনার সঙ্গে বাহাস করতে প্রস্তুত আছেন।

তাই নাকি!

জি। আমার তো মনে হলো, শেখ মুজিব এবং তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গ বেশ হোমওয়ার্ক করেছেন। তাঁরা কেন ছয় দফা দিয়েছেন সে ব্যাপারে তাঁদের ব্যাখ্যা শুনলাম। তাঁদের ব্যাখ্যা শোনার পর আমাদের কোনো কথাই পাবলিক খাবে না।

কী বলেন!

আপনি বাহাস করতে গেলে ধরা খেতে পারেন।

তাহলে বাদ দেন।

যদি মুজিব আপনার কথা জানতে চায়?

তাহলে বলবেন, আমি হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। এ মুহূর্তে আসতে পারছি না।

ঠিক আছে। এ ছাড়া অবশ্য আর কোনো উপায়ও নেই।   

গভর্নর সাহেব ফোনের রিসিভার রেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লেন। বাঁচা গেল! এসব বাহাসটাহাস করে কী হবে! এদের কঠোরভাবে দমন করতে হবে। শেখ মুজিব আর তাঁর কিছু চেলাকে জেলে ঢোকালেই আন্দোলন চাঙ্গে উঠবে। প্রেসিডেন্ট সাহেবই ঠিক আছেন। অস্ত্রের মুখেই এদের মোকাবেলা করতে হবে।

মোনেম খাঁ হোটেল থেকে বের হয়ে গভর্নর হাউসের দিকে রওনা হলেন।

মোনেম খাঁ গভর্নর হাউসে পৌঁছতে না পৌঁছতেই পিএস সাহেব দৌড়ে এসে বললেন, স্যার, শিগগির আসেন। প্রেসিডেন্ট সাহেব আপনার সঙ্গে কথা বলবেন। প্রেসিডেন্ট সাহেবের পিএস আপনাকে হন্যে হয়ে খুঁজছেন।

মোনেম খাঁ ঝেড়ে দৌড় শুরু করলেন। দৌড়াতে দৌড়াতে তিনি তাঁর রুমে টেলিফোন সেটের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। ফোনের রিং বাজার সঙ্গে সঙ্গে তিনি ছোঁ মেরে রিসিভারটা তুলে নিলেন। বড় বড় নিঃশ্বাস নিতে নিতে তিনি বললেন, হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো!

গভর্নর স্যার বলছেন?

জি বলছি।

প্রেসিডেন্ট স্যার কথা বলবেন।

জি জি।

প্রেসিডেন্ট সাহেব রিসিভার তোলার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কানে লম্বা সালাম ভেসে এলো। তিনি সালামের জবাব দিয়ে বললেন, গভর্নর সাহেব!

স্যার।

শেখ মুজিব চটাং চটাং কথা বলছে আর আপনি সেগুলো সহ্য করছেন?

না স্যার। আমি সহ্য করার পাত্র না। আপনি শুধু হুকুম দেন।

আপনার পরামর্শ কী? আলোচনায় কোনো সমাধান হবে?

না স্যার। কোনো সম্ভাবনা দেখছি না। আর আমি তো শুনলাম, তাদের যুক্তিতর্কের কাছে আমরা টিকব না।

হুম। পাবলিক কি মুজিবের কথা খুব গিলছে?

মনে হচ্ছে স্যার।

আমার বক্তব্য শুনছেন?

শুনছি স্যার।

কী বলেছি আমি?

আপনি বলছেন, একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি তুলছে।

আমার বক্তব্য ঠিক কি না?

একদম ঠিক স্যার।

আমার বক্তব্য হালে পানি পায়নি; এই তো!

স্যার। আমার মনে হয় কি স্যার, মুজিবসহ কিছু রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেপ্তার করলে আর ইত্তেফাক বন্ধ করে দিতে পারলে সব ঠিক হয়ে যাবে।

ঠিক তো?

জি স্যার। আন্দোলন তো করছেন শেখ মুজিব এবং তাঁর কয়েকজন সাঙ্গোপাঙ্গ। এদের সমর্থন দিচ্ছেন মানিক মিয়া এবং তাঁর সম্পাদিত দৈনিক ইত্তেফাক।

ভাসানী সাহেবের খবর কী?

উনি ঠিক আছেন স্যার। উনি আমাদের সঙ্গেই আছেন। উনি প্রকাশ্যেই ছয় দফার বিরোধিতা করেছেন। ৭ এপ্রিল সমাবেশ ডেকে ভাসানী সাহেব বললেন, ছয় দফায় অর্থনৈতিক মুক্তির কথা নেই। তাই ছয় দফা সমর্থন করি না।

হুম। পত্রিকায় দেখলাম। এ রকম আর কিছু লোক জোগাড় করতে পারলেন না?

স্যার, মুজিবের সঙ্গে এখন যারা আছে ওদের ভাগানো খুব কঠিন স্যার। তার চেয়ে আপনি যদি ওদের জেলে ঢোকান তাহলে খুব ভালো হয়। কেউ আর রাস্তায় নামতে সাহস পাবে না।    

তাহলে তাই করেন। আগে মুজিবকে গ্রেপ্তার করেন। তারপর এক এক করে সবাইকে। ইত্তেফাকও খুব  বাড়াবাড়ি করছে। তাই না?

জি স্যার। ওইটাকে পরে ধরছি।

প্রেসিডেন্ট সাহেব আর কোনো কথা না বাড়িয়ে টেলিফোন রেখে দিলেন। মোনেম খাঁ কিছুক্ষণ রিসিভারটা হাতে ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন। ছয় দফা নিয়ে শেখ মুজিবের কথাগুলো মনে করার চেষ্টা করলেন। তারপর কী অজুহাতে তাঁকে গ্রেপ্তার করবেন তা নিয়ে ভাবেন।    

এগারো.

মানিক মিয়া অফিসে বসে নিজের লেখাটি লিখছিলেন। লেখার একপর্যায়ে তিনি আনমনা হয়ে যান। শেখ মুজিবের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের কথা, পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতি, ছয় দফা আন্দোলন, সংবাদপত্র বিশেষ করে ইত্তেফাকের সামনের দিনগুলো কিভাবে মোকাবেলা করবেন তা নিয়ে ভাবেন তিনি। এ সময় তাঁর টেলিফোনের রিং বাজে। তিনি ফোন ধরে হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে জহুর হোসেন চৌধুরী বললেন, মানিক ভাই, আমি জহুর।

আপনার কণ্ঠস্বর শুনেই বুঝতে পারছি। তারপর আছেন কেমন?

মানিক ভাই, যে অবস্থা চলছে তাতে তো পত্রিকা চালানো যাবে না!

আবার নতুন করে কী হলো!

নিষেধাজ্ঞা জারি করার পর পিআইও তো অব্যাহতভাবে চাপ তৈরি করে আসছিলেন। এটা ছাপা যাবে না, ওটা ছাপা যাবে না—এমন নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। এখন গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে ফোন করা হচ্ছে। এরা দেখছি হুমকি-ধমকিও দিচ্ছে।

আমি ওসব এখন আর গায়ে মাখি না। যা হওয়ার হবে। যদি পত্রিকা বন্ধ করে দেয় দেবে! গ্রেপ্তার করলে করবে! আমি আপস করতে রাজি না। আমাকে গোয়েন্দা বিভাগের একজন টেলিফোন করে বলল, স্যার, আপনার লেখাটা তো সবাই পড়ে। আমি বললাম, কোন লেখা?

গোয়েন্দা বিভাগের লোকটা বলল, রাজনৈতিক মঞ্চ।

আমি বললাম, ওটা তো মুসাফির লেখে।

গোয়েন্দা বিভাগের লোকটা হো হো করে হেসে দিয়ে বলল, ওটা যে আপনার ছদ্মনাম, তা সবাই জানে স্যার। তো, বলছিলাম যে ওই কলামে যদি ছয় দফা নিয়ে কিছু না লেখেন তাহলে খুব ভালো হয়।

কেন ভালো হয়? আমি জানতে চাইলাম।

গোয়েন্দা বিভাগের লোকটা বলল, সাধারণ মানুষ ছয় দফা সাপোর্ট করবে। আমরা সেটা চাই না। প্রেসিডেন্ট সাহেবের সাফ কথা, ছয় দফা নিয়ে বাড়াবাড়ি চলবে না। তাইলে স্যার সবাইরে জেলে ঢোকাবে!

আমি খুব শান্তভাবেই বললাম, জেলে ঢোকালে ঢোকাবে। জেলের ভয়ে তো আর আমার কলম বন্ধ করতে পারি না!

জহুর হোসেন চৌধুরী বললেন, হুম, বুঝলাম। তাইলে বাড়াবাড়ি আমরা করছি? আইয়ুব খান না?

তাই তো দেখছি। মানিক মিয়া বললেন।

আচ্ছা রাখি। পত্রিকা বাঁচিয়ে যতটা সম্ভব চালিয়ে যান।

আমি তো মার্কা মারা। লিখলেও দোষ হবে, না লিখলেও দোষ হবে। তাই কলম বন্ধ করাটা সমীচীন  মনে করছি না।

ধন্যবাদ মানিক ভাই। ভালো থাকবেন।

আপনিও ভালো থাকবেন।

টেলিফোন রেখে মানিক মিয়া নিজের লেখায় মনোযোগ দিলেন। তিনি লেখাটি শুরু করলেন এভাবে, ‘ভুট্টো সাহেব ভালোই করিয়াছেন। দুষ্ট লোকেরা যাহাই বলুক, শেষ পর্যন্ত তিনি বুদ্ধিমানের কাজ করিয়াছেন। অবশ্যই দুষ্ট লোকেরা বলিবে যে, এবার তিনি যখন ঢাকায় আসিয়া শেখ মুজিবের সহিত ছয় দফার উপর কনফ্রন্টেশনের প্রস্তাব দিয়াছিলেন, বিশেষ করিয়া শেখ সাহেব কর্তৃক গত ১৩ এপ্রিল তাঁর প্রস্তাব গ্রহণের পর তিনি ২৪শে’র স্থলে ১৭ এপ্রিল মোকাবিলা সভা অনুষ্ঠানের প্রস্তাব দিয়াছিলেন, তখন ইহা সকলেই অনুমান করিয়াছিল যে, তিনি সময়ের সংক্ষিপ্ততা এবং আইন-শৃঙ্খলা প্রভৃতি প্রশ্নে নিজ দলীয় সংশ্লিষ্ট লোকজনের সহিত আলাপ-আলোচনা করিয়াই এই প্রস্তাব দিয়াছিলেন। পক্ষান্তরে শেখ মুজিবই বরং মি. ভুট্টো নির্ধারিত ১৭ তারিখ সম্পর্কে সংগত ওজর দেখাইতে পারিতেন। কেননা, বহু পূর্বে তাঁর মফস্বল প্রোগ্রাম নির্ধারণ করা হইয়াছিল। তথাপি ভুট্টো সাহেবের সুবিধার জন্যই তিনি ১৫/১৬ই তারিখে মফস্বল প্রোগ্রাম পালন করত ১৭ই তারিখে খুলনার প্রোগ্রাম বাতিল করিয়া হইলেও ঢাকায় জনাব ভুট্টোর সহিত মোকাবিলা সভায় উপস্থিত থাকিতে সম্মত হন। সুতরাং মোকাবিলা সভার প্রশ্ন নিয়া এত দূর অগ্রসর হইবার পরে গতকল্য সাড়ে ১২টায় যে অজুহাতে তিনি প্রস্তাবিত মোকাবিলা সভা অনুষ্ঠানে অক্ষমতা প্রকাশ করিয়াছেন তাহা অনেকের নিকটই যুক্তিপূর্ণ বলিয়া মনে হইবে না। অবশ্য এই জন্য আমরা মি. ভুট্টোকে দোষারোপ করিতে চাই না। তিনি হয়তো ছয় দফা প্রোগ্রাম রাজনৈতিক সমস্যা বিধায় সদিচ্ছা প্রণোদিত হইয়া উহাকে রাজনৈতিক পর্যায়ে মোকাবিলা করিবার উদ্দেশ্যে উক্ত প্রস্তাব দিয়াছিলেন। কিন্তু তাঁর ফ্যাসাদ হইল যে, তিনি এই অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশেষত ছয় দফা তথা আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন সম্পর্কে আদৌ ওয়াকিফহাল নন। এই প্রদেশে তাঁর সহযোগীরা ছয় দফাকে যেভাবে ফুৎকারে উড়াইয়া দেন তাহা হইতেই হয়তো তার ধারণা জন্মিয়াছে যে, ছয় দফার বিপক্ষেই জনমত প্রবল এবং একজন নামকরা বাগ্মী হিসেবে তিনি মোকাবিলা সভায় শেখ মুজিবকে পরাজিত করিয়া এক অশেষ কৃতিত্বের অধিকারী হইবেন। মি. ভুট্টো একজন ভালো বক্তা, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তিনি ভাবালুতার দ্বারা পরিচালিত হন। তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং কনভেনশন মুসলিম লীগের মনোনীত প্রাক্তন সেক্রেটারি জেনারেল হইলেও রাজনীতিতে তিনি নূতন। তিনি যদি এ দেশের রাজনীতির খবর রাখিতেন তাহা হইলে এই অঞ্চলে তাহার সহকর্মীরা জনমত সম্পর্কে যাহাই বলুন না কেন, তিনি নিজে স্মরণ রাখিতেন যে, পাকিস্তান আন্দোলনে বাংলার অধিবাসীরাই কার্যকরীভাবে রাজনৈতিক সচেতনতার প্রমাণ দিয়াছিলেন। তিনি স্মরণ রাখিতেন যে, এই অঞ্চলের জনগণ ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় বিচার না করিয়া ক্ষমতাসীনদের অন্ধ স্তাবকতা করে না।

তবে ভুট্টো সাহেব জ্ঞানীগুণী লোক এবং গণতন্ত্রের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা আছে বলিয়াও তিনি প্রকাশ করেন। ইহা যদি সত্যি হয়, তবে তিনি তাঁর দলীয় কর্তাব্যক্তিদের বুঝাইবেন যে, একটি দেশের জনমত তথা ছয় দফার মোকাবিলা করিবার পক্ষপাতী সেই সর্বজনস্বীকৃত রাজনৈতিক পথে আমরাও ছয় দফাসহ দেশের সকল সমস্যা সমাধানে প্রস্তুত। ’

১৬ এপ্রিল ইত্তেফাকে রাজনৈতিক মঞ্চ প্রকাশিত হওয়ার পর ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। শেখ মুজিব নিজেও টেলিফোনে মানিক মিয়াকে ধন্যবাদ জানান। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইত্তেফাকের সাধারণ পাঠকরাও টেলিফোনে মানিক মিয়াকে ধন্যবাদ জানাতে ভুল করেনি।

শহীদুল্লা কায়সার নিজের টেবিলে বসে বিবিসি ও এএফপির কিছু প্রতিবেদন বাছাই করছিলেন। কী দেবেন কী দেবেন না, তা ঠিকঠাক করছিলেন। কিছু প্রতিবেদন আলাদা করে রাখছিলেন। এ সময় তাঁর টেলিফোনের রিং বাজল। তিনি বিলম্ব না করে ফোনের রিসিভার তুললেন। তিনি কিছু বলার আগেই গোয়েন্দা বিভাগের পরিচয় দিয়ে একজন বললেন, শেখ মুজিবের সিলেটের জনসভার বক্তৃতা ছাপা যাবে না। এক অক্ষর ছাপা হলেও পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যাবে। কথাটা যেন মনে থাকে।

শহীদুল্লা কায়সারকে কোনো কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে লোকটা ফোন রেখে দিলেন। তারপর তিনি জহুর হোসেন চৌধুরীর কাছে গেলেন। তাঁকে অজ্ঞাত স্থান থেকে জনৈক ব্যক্তির টেলিফোনের কথা জানালেন। সব কথা শুনে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, মুজিব ভাই কী বলেছেন সিলেটে?

উনি বলেছেন, যেকোনো মূল্যে ছয় দফা দাবি আদায় করে ছাড়বেন। আর বলেছেন, কোনো হুমকি-ধমকি বা চোখরাঙানির কাছে নতি স্বীকার করবেন না।

খারাপ কী বললেন?

কিছুই তো বুঝতে পারছি না।

তুমি কি আমাদের প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলেছ?

জি, বলেছি।

সে কী বলল?

সে-ই তো এ কথা জানাল।

হুম! এটাই তো হওয়ার কথা! ছয় দফা বানচাল করার জন্য ওরা সব ধরনের পদক্ষেপ নেবে। ওরা যতই চাপ দিক, নিউজ তো আমাদের ছাপতে হবে। এ ক্ষেত্রে কী কৌশল নেওয়া যায় তা দেখেন।

আমি মনে করি, মুজিব ভাইয়ের বক্তব্য পুরোটাই ছেপে দেওয়া উচিত। এটা তো আমাদের মনগড়া কিছু না। মুজিব ভাইয়ের বক্তৃতা। উনি তো আর দেশের বিরুদ্ধে কিছু বলেননি। সরকারের বিরুদ্ধে বলেছেন। আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে বলেছেন। আসলে মুজিব ভাইকে প্রেসিডেন্ট সাহেব সহ্যই করতে পারেন না।

ঠিক বলেছ। তোমাকে যে ফোন করেছে সে তো আর নাম বলেনি!

না।

সংস্থার নামও বলেনি।

না।

তুমি বরং মুজিব ভাইয়ের বক্তব্য ছেপে দাও। আমরা জবাবদিহি করতে হলে কাল করব।

জি।

মানিক ভাইয়ের সঙ্গে কথা হলো। ওনার কাছে এসব অজ্ঞাত স্থানের টেলিফোনের কথা বললাম। ওনার কথায় মনে হলো, এগুলো উনি পাত্তা দিচ্ছেন না।

শহীদুল্লা কায়সার বললেন, ওনার ভূমিকাকে আমাদের স্যালুট করা উচিত।

তা তো বটেই।

আমরা কেন পারছি না?

আমরা পারছি না কোথায়? আমরাও তো আমাদের সাধ্যমতো করছি; তাই না? আমাদের সাংবাদিকদের কথাও তো ভাবতে হবে। পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেলে তাদের কী হবে!

তা তো বুঝতে পারছি। কিন্তু কিছুই যদি না লিখতে পারি তাহলে তো মানুষ দালাল বলবে।

দালাল যাতে না বলতে পারে সেই ব্যবস্থা তো করতে হবে! একটু কৌশলী হতে হবে। বুঝতে পারছেন?

এবার যান। কী কৌশলে পত্রিকাটা করবেন তা ভাবেন। আমি কবির ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলি। উনি কী বলেন দেখি।

শহীদুল্লা কায়সার নিউজ রুমের দিকে রওনা হলেন। আহমদুল কবিরের সঙ্গে কথা বলার জন্য জহুর হোসেন চৌধুরী টেলিফোনের রিসিভার তুললেন।       

বারো.

শেখ মুজিব জেলা সফর করছেন। চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, রাজশাহী, বরিশালসহ বিভিন্ন জেলা চষে বেড়াচ্ছেন তিনি। সর্বত্রই তিনি ছয় দফা নিয়ে কথা বলছেন। আর পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যে     বৈষম্যমূলক আচরণ করছে তার ফিরিস্তি তুলে ধরছেন তিনি। জনসভায় ইত্তেফাক তুলে ধরে বলেন, ভাইসব, আপনাদের প্রিয় পত্রিকা ইত্তেফাকে লিখেছে, পররাষ্ট্র দপ্তরে এখন যে কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন তাঁদের বেশির ভাগই পশ্চিম পাকিস্তানি। সেখানে রাষ্ট্রদূতসহ প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের মধ্যে ১৭৯ জন পশ্চিম পাকিস্তানি। আর মাত্র ৫৮ জন পূর্ব পাকিস্তানের। দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা পশ্চিম পাকিস্তানের ১৯৬ জন। আর পূর্ব পাকিস্তানের মাত্র ৪৮ জন। তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী পশ্চিম পাকিস্তানি ৫৮ জন। আর পূর্ব পাকিস্তানের মাত্র ১৭ জন। তবে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর সংখ্যা পূর্ব পাকিস্তানের বেশি। ৮৯ জন। আর পশ্চিম পাকিস্তানের আটজন। এই হলো বৈষম্যের চিত্র। পূর্ব পাকিস্তানিরা কেবল পিওন চাপরাশিতে নিয়োগ পায়। আর অফিসার পদে নিয়োগ পায় পশ্চিম পাকিস্তানিরা। এবার আপনারাই বিচার করুন। বৈষম্য হচ্ছে কি হচ্ছে না?

জনসভার সবাই চিৎকার দিয়ে বলে ওঠে, হচ্ছে হচ্ছে!

এই বৈষম্যের প্রতিবাদ করা উচিত কি উচিত না?

সবাই বলল, অবশ্যই করা উচিত।

শেখ মুজিব পকেট থেকে একটি কাগজ বের করে বললেন, এবার আমি আমাদের এক গ্রাম্য কবিয়াল কুব্বত আলী বয়াতির একটি কবিতা পড়ে শোনাচ্ছি। এই কবিতার মধ্যেই দেশের বর্তমান পরিস্থিতি এবং আইয়ুব শাহীর স্বরূপ ফুটিয়ে তুলেছেন। আমি কবিতাটি পড়ছি।

ছাত্র-শিক্ষক মজুর আরো মিলের কুলি।

ন্যায্য দাবি করতে গেলে তাদের মারেন গুলি।

স্বৈরতন্ত্রের গুণ্ডাবাজি জানেন সর্বজন।

বেআইনকে আইন করে সে যখন-তখন।

আইয়ুব শাহীর শাসনতন্ত্র কুটিল মন্ত্র ভাই।

স্বাধীনভাবে কইব কথা এমন সাধ্য নাই।

সংবাদপত্র পায় না দিতে সত্য সমাচার।

কণ্ঠ তাদের বন্ধ করে লীগ-শাহী সরকার।

এ দীন কবি আরজ করি হিন্দু মুসলমান।

মিথ্যা লোভে ভুইলা ভাইরে বেইচো না ইমান।

কবিতা পাঠ করা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জনসভায় উপস্থিত সবাই বিপুল করতালি দিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করল। পরে শেখ মুজিব আইয়ুব খানকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘হিম্মত থাকলে একটি গণভোট অনুষ্ঠান করে দেখুন যে পূর্ব পাকিস্তানিরা স্বায়ত্তশাসন চান কি না!’ তিনি কসম খেয়ে বলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের শতকরা ত্রিশজন লোকও যদি প্রদেশের স্বায়ত্তশাসনের বিরোধিতা করে তবে তিনি চিরদিনের জন্য রাজনীতি ছেড়ে দেবেন। ’

জনসভার মধ্য থেকে কেউ কেউ স্লোগান তুলল, ‘মুজিব তুমি এগিয়ে চলো, আমরা আছি তোমার সাথে’, ‘মুজিব তোমার ভয় নাই, আমরা আছি লাখো ভাই’, ‘আইয়ুব শাহীর গদিতে আগুন জ্বালো একসাথে। ’ 

শেখ মুজিবের এই বক্তব্যই রাওয়ালপিণ্ডিতে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে তুলে ধরেন পররাষ্ট্র দপ্তরের পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি আবদুল আউয়াল ভূইয়া। তাঁর এই বক্তব্যের বিপরীতে সরকারের পক্ষ থেকে কেউ কোনো জবাব দিতে পারেনি। এসব কারণে সরকার বেশ চাপের মুখে পড়ে।

জেলায় জেলায় শেখ মুজিবের জনসংযোগের কারণে ছয় দফার পক্ষে এক ধরনের গণজোয়ার তৈরি হয়। শেখ মুজিব যেখানেই যাচ্ছেন সেখানেই ব্যাপক লোকসমাগম হয়। তাঁর কথা শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে। যতই দিন যাচ্ছে ততই শেখ মুজিবকে ঘিরে পূর্ব পাকিস্তানে উন্মাদনা তৈরি হয়। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন আইয়ুব খান। তিনি শেখ মুজিবের আন্দোলন স্তব্ধ করে দিতে নানা কূটকৌশলের আশ্রয় নেন।

২১ এপ্রিল। ভোর থেকে শেখ মুজিবের বাসার চারদিকে পুলিশ ঘিরে আছে। গেটের সামনে কয়েকজন অফিসার ওয়াকিটকিতে কথা বলছেন। ওয়াকিটকিতে যে কথা শোনা যাচ্ছে তা ভাঙা ভাঙা। সে কথাগুলো জোড়া লাগালে যা হয় তা এ রকম, দেরি কোরো না। শেখ সাহেবের কাছে খবর পাঠাও। তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য ওপর থেকে নির্দেশ আছে। উনি পালানোর মানুষ না। তোমরা খবর পাঠালেই উনি বেরিয়ে আসবেন।

গভর্নর হাউস থেকে বারবার ফোন আসছে। মুজিবকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না তা জানতে চাওয়া হচ্ছে। গ্রেপ্তার না হওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করে বলা হচ্ছে, দ্রুত করো। দেরি কোরো না।

পুলিশ বিভাগের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা করতে চাইলেন। মুজিব দেখা করার অনুমতি দিলেন। পুলিশ কর্মকর্তা শেখ মুজিবের সামনে গিয়ে সালাম দিলেন। তারপর বিনয়ের সঙ্গে বললেন, স্যার, ওপরের নির্দেশে আমরা আসছি স্যার। আপনাকে নিয়ে যেতে এসেছি স্যার।

ওহ্! গ্রেপ্তারের নির্দেশ! আমিও বুঝতে পারছিলাম। ঠিক আছে, যাও। আমি রেডি হয়ে আসছি।

জি স্যার।

শেখ মুজিব রেডি হয়ে বাসা থেকে বের হলেন। তাঁর স্যুটকেস গুছিয়ে দিলেন ফজিলাতুননেসা রেণু। তিনি তাঁকে বাসার দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এলেন। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মুজিব রেণুর মাথায় হাত দিয়ে শুধু বললেন, চিন্তা কোরো না। খোদাতায়ালা একটা ব্যবস্থা করবেনই। আমি জানি, তোমার খুব কষ্ট হবে। তার পরও নিজের বুদ্ধিতে যা মনে হয় কোরো। রাসেলের জন্য খারাপ লাগছে। সে সারাক্ষণ বাবা বাবা করে ডাকে। ওর এই ডাক আমি আবার কবে শুনতে পাব বিধাতাই জানেন!

ফজিলাতুননেসা রেণু কোনো কথা বললেন না। তিনি আবেগের দৃষ্টিতে শেখ মুজিবের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁর চোখের কোটরে জমাট পানি ততক্ষণে পড়তে শুরু করে।

শেখ মুজিব গাড়ির উদ্দেশে রওনা হলেন। তাঁর হাতের স্যুটকেসটা একজন কনস্টেবল হাতে নিয়ে বলল, স্যার, আপনি গাড়িতে ওঠেন। এটা আমি রাখছি।  

শেখ মুজিব গাড়িতে উঠে বসলেন। একজন কনস্টেবল তাঁর স্যুটকেস নিয়ে পেছনের আসনে বসল। তারপর গাড়ি ছুটে চলল কেন্দ্রীয় কারাগারের দিকে।

তেরো.

অনেকক্ষণ ধরে টেলিফোনের রিং বাজছে। কিন্তু কেউ ফোন ধরছে না। ফোনের আওয়াজটা মতিয়ার কানে সুড়সুড়ির মতো লাগে। মতিয়া কয়েকবার মোড়ামুড়ি দিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়েন। তিনি রাত করে ঘুমিয়েছেন। ঘুমানোর সময় বজলুর রহমানকে বলে রেখেছিলেন, তিনি দেরি করে ঘুম থেকে উঠবেন। দুপুরে খেয়েদেয়ে একবারে বের হবেন। বিকেলে দুটি রাজনৈতিক কর্মসূচি আছে। সেগুলো শেষ করে বজলুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে বাসায় ফিরবেন।

বজলুর রহমান সকাল সকাল অফিসে চলে যান। অফিসে যাওয়ার পর তিনি বাসায় মতিয়াকে ফোন করেন। কিন্তু মতিয়া ফোন ধরছেন না। তিনি মনে মনে ভাবেন, হয়তো এখনো ঘুমাচ্ছে।

নূরজাহান বেগম ফোন করে করে রীতিমতো অস্থির। তিনি মতিয়াকে না পেয়ে বজলুর রহমানের অফিসের নাম্বারে ফোন করলেন। তাঁর কাছে জানতে চাইলেন, বজলু, মতিয়া কই? ওকে তো পাচ্ছি না!

ও তো বাসায়ই আছে আম্মা। ঘুমাচ্ছে হয়তো। রাতে দেরি করে ঘুমিয়েছে তো! বজলুর রহমান বললেন।

তাই বলে ফোন ধরবে না!

আরেকবার ফোন করে দেখেন। এখন হয়তো উঠে গেছে।

আচ্ছা দেখি।

নূরজাহান বেগম আবার ফোন করলেন। বেশ কয়েকবার রিং বাজার পর মতিয়া ঘুম ঘুম চোখেই ফোন ধরলেন। আড়ষ্ট কণ্ঠে বললেন, হ্যালো।

নূরজাহান বেগম উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, কিরে মতিয়া! কোনো সমস্যা?

না মা। কেন?

তুই এখনো ঘুম থেকে উঠলি না! তোর শরীর খারাপ হয়েছে নাকি?

না মা, অনেক রাত করে ঘুমিয়েছি তো! কী ব্যাপার, তুমি হন্যে হয়ে খুঁজছ?

না মানে, তোকে ফোনে পাচ্ছিলাম না তো! তাই চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম। আচ্ছা শোন, খবর শুনছিস তো?

কী খবর মা?

শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করছে!

বলো কী! কখন?

গত রাতে।

মুজিব ভাইরে গ্রেপ্তার করছে! কিন্তু বজলু যে কিছু বলল না!

ও হয়তো খবর পায়নি।

তাও হতে পারে।  

শোন, খবর বেশি ভালো মনে হচ্ছে না। সাবধানে থাকিস। কখন কী হয়! আর আইয়ুব খানের ব্যাপারে এখন কিছু বলিসটলিস না!

মতিয়া হাসলেন।

নূরজাহান বেগম বললেন, হাসিস না, হাসিস না। অবস্থা কিন্তু ভালো না। এর মধ্যে তোর বাবাকে আইজি সাহেব দেখা করতে বলছেন। এবার আর কী বলে কে জানে!

কী আর বলবে। হয়তো বাবাকে চাকরি ছাড়তে বলবে। এর বেশি তো কিছু না! তুমি চিন্তা কোরো না।

চিন্তা তো তোরে নিয়া করি।

মা, এখন রাখি। দেখি একটু খোঁজখবর নেই।

আচ্ছা। সাবধানে থাকিস মা।

আচ্ছা থাকব।

ফোন ছেড়ে মতিয়া ড্রয়িংরুমে গিয়ে পত্রিকা দেখলেন। পত্রিকার প্রথম পাতায় বড় করে ছবি দিয়ে শেখ মুজিবের গ্রেপ্তারের খবর ছাপা হয়েছে। খবরটি তিনি পড়ছেন আর মনে মনে ভাবছেন, আইয়ুব সরকার কী ভাবছে? শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করলেই সব কিছু শান্ত হয়ে যাবে! কেউ আর রাস্তায় নামার সাহস পাবে না! আমি রাস্তায় নামব! প্রতিবাদ করব। মিছিল করব। সমাবেশ করব। দেখি, আইয়ুব খান কী করতে পারে! গ্রেপ্তার করবে তো! করুক। দরকার হলে জেলে যাব। তবু প্রতিবাদ করতে হবে।

শেখ মুজিবের গ্রেপ্তারের খবর দ্রুত সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল। তাঁর গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে রাজপথে নেমে এলো আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ছাড়াও অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠন। ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকে তাত্ক্ষণিকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদ সভা ডাকা হলো। সেই সভার প্রধান অতিথি মতিয়া।

মতিয়া মঞ্চে উঠেই জ্বালাময়ী বক্তৃতা শুরু করলেন। সভায় তিনি বললেন, প্রিয় ভাই-বোনেরা, আপনারা জানেন, স্বৈরাচারী সরকার ছয় দফা ঘোষণার পর থেকে উন্মাদের মতো আচরণ করছে। আন্দোলন দমানোর জন্য তারা মুজিব ভাইকে গ্রেপ্তার করেছে। পত্রিকার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এরপর অন্য নেতাদেরও আটক করবে। কিন্তু এসব করে স্বৈরাচারী সরকার ছয় দফার আন্দোলন দমন করতে পারবে না। আমরা রাজপথে আছি এবং থাকব। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন?

সভাস্থলে উপস্থিত সবাই হাত উঁচিয়ে চিৎকার দিয়ে বলল, আছি আছি!

মতিয়া নিজেই স্লোগান ধরলেন, ‘মুজিব ভাইয়ের কিছু হলে, জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে’,  ‘মুজিব তোমার ভয় নাই, আমরা আছি লাখো ভাই। ’

মতিয়া বেশ কয়েকজন ছাত্রনেতা ও কর্মীকে নিয়ে আওয়ামী লীগ আয়োজিত প্রতিবাদসভায় যোগ দেন। প্রতিবাদসভায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ, সিনিয়র নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ অনেকেই বক্তৃতা করলেন। তাঁরা আইয়ুব সরকারের জুলুম-নিপীড়নের প্রতিবাদে ৭ জুন পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল পালনের ঘোষণা দেন। এর আগে অবশ্য তাদের খাদ্য সংকটের প্রতিবাদে প্রদেশব্যাপী খাদ্য দাবি দিবস পালন করেন।

এ ঘটনার পরপরই তাজউদ্দীন আহমদ, আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ নুরুল ইসলাম চৌধুরী, সহসভাপতি রাজশাহীর মুজিবর রহমান, শ্রমিক সম্পাদক জহুর আহমেদ চৌধুরী, চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ আজিজ, আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার মোশতাক আহমদকে গ্রেপ্তার করা হয়।  

আওয়ামী লীগ নেতাদের গ্রেপ্তারের ঘটনায় জনমতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়। বিভিন্ন জেলায় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ছাড়াও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীরা প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে। দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার লাগানো হয়। শহর ও শহরতলিতে মিছিল বের করা হয়। মিছিলে ধ্বনি ওঠে, ‘পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন চাই’, ‘আইয়ুব শাহী নিপাত যাক’, ‘খাদ্যের দাম কমাতে হবে’, ‘দমননীতির অবসান চাই’।

প্রদেশব্যাপী খাদ্য সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। খাদ্য সংকটের তীব্রতার খবর উঠে আসে ঢাকার সাপ্তাহিক জনতার একটি প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনটি এ রকম, ‘দেশময় আজ হা অন্ন হা অন্ন রব উঠিয়াছে। আজ হাহাকার উঠিয়াছে পূর্ব বাংলার সাড়ে পাঁচ কোটি মানুষের ঘরে। ’

খাদ্য দাবি দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ পল্টন ময়দানে এক সমাবেশ আহ্বান করে। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা আতাউর রহমান খান। সমাবেশে গৃহীত এক প্রস্তাবে বলা হয়, অবিলম্বে খাদ্য সমস্যার সমাধান ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি নিরোধ করা না হলে শোষিত, নির্যাতিত ও নিরন্ন দেশবাসীর রুটি-রুজির দাবিতে দেশব্যাপী এক প্রচণ্ড গণ-আন্দোলন গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। প্রস্তাবে আরো বলা হয়, ‘দেশবাসীর অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের দায়িত্ব এড়াইয়া শুধুমাত্র শূন্যগর্ভ আশ্বাসের মাধ্যমে ক্ষুধার্ত জনগণের ক্ষুন্নিবৃত্তি করা যায় না। সে যতই শক্তিশালী হউক না কেন, অধিক দিন ক্ষমতায় টিকিয়া থাকিতে পারে না। ’

মতিয়া আওয়ামী লীগের পল্টন ময়দানের খবরটি পত্রিকায় পড়লেন। পড়ার পর তাঁর মনের মধ্যে কিছু আশা সঞ্চারিত হলো। তিনি মনে মনে ভাবেন, আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের গ্রেপ্তার করলেও দলটি যে শেষ হয়ে যায়নি তার প্রমাণ পাওয়া গেল। রাজনৈতিক দলের সংগঠিত আন্দোলন ছাড়া সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা কঠিন। রাজনৈতিক দলগুলো সম্মিলিতভাবে আন্দোলনে নামলে গ্রেপ্তার, নিপীড়ন, নির্যাতন চালিয়েও পার পাবে না।

মতিয়া নিজেও আন্দোলন সংগঠিত করার কৌশল নিয়ে ভাবেন। এ সময় কলিং বেলের শব্দ পেয়ে মতিয়া দরজা খোলার জন্য এগিয়ে যান। দরজা খুলেই তিনি বজলুর রহমানকে দেখে বললেন, বজলু, কী ব্যাপার! বাজারে গেলে না?

না।

কেন? কোনো সমস্যা?

হুম। বাসার সামনে পুলিশ।  

বাসার সামনে পুলিশ মানে!

সম্ভবত তোমাকে গ্রেপ্তার করতে এসেছে। পুলিশ পুরো বাড়ি ঘিরে রেখেছে।

তাই নাকি!

হুম।

আমাকে গ্রেপ্তার করতে এসেছে!

মতিয়া কথাটা শেষ করতে না করতেই আবার কলিং বেলের শব্দ। বজলুর রহমান এগিয়ে যেতে যেতে বললেন, দাঁড়াও, আমি দেখছি।

বজলুর রহমান দরজা খুললেন। দরজার সামনে তখন একজন পুলিশ অফিসার অপেক্ষা করছিলেন। তিনি বজলুর রহমানকে দেখেই বললেন, আপনি বজলুর রহমান?

বজলুর রহমান নরম গলায় বললেন, জি।

মতিয়া আপা আছেন তো?

জি।

তাঁকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ আছে। আমরা তাঁকে নিতে এসেছি।

আপনি অপেক্ষা করেন। আমি মতিয়াকে ডেকে দিচ্ছি।

বজলুর রহমান দরজায় সিটকিনি লাগিয়ে ঘরের ভেতরে গেলেন। মতিয়া তখন বজলুর রহমানের জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। তিনি যখন মতিয়াকে জানালেন পুলিশ এসেছে তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য তখন বেশ বিমর্ষই দেখাচ্ছিল।

সকালে নাশতাও করা হয়নি। শুধু পরনের কাপড় বদল করে আর    দু-তিনটি কাপড় ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ব্যাগে ঢুকিয়ে বাসা থেকে বের হলেন। বের হওয়ার সময় বজলুর রহমানকে শুধু বললেন, সাবধানে থেকো।

বজলুর রহমান কোনো কথা বললেন না। তিনি উদাস দৃষ্টিতে মতিয়ার চলে যাওয়া দেখলেন।


মন্তব্য