kalerkantho


গো য়ে ন্দা উ প ন্যা স

মধুবালা কাঠফাটা এবং একজন উদ্যম

শেখ আবদুল হাকিম

২৫ জুন, ২০১৭ ০০:০০



মধুবালা কাঠফাটা এবং একজন উদ্যম

অঙ্কন : মানব

আমার ধারণা, আমার মতো একজন করে লোক দেশের সব জেলার কয়েদখানায়ই পাওয়া যাবে—আমি হলাম সেই লোক, যে আপনাকে জিনিসটা এনে দেয়। হাতে বানানো এক প্যাকেট সিগারেট (গাঁজা ভরা বা না ভরা), যদি আপনার নেশা থাকে; চৌদ্দ শিকের ভেতর বসে খবর পেলেন ছেলে বা মেয়ে অনার্স পাস করেছে, শুনে ইচ্ছে হলো একটু উৎসব করবেন, হাজীর বিরিয়ানি থেকে শুরু করে সাধন বাবাজির চোলাই মদ—সবই এই বান্দা জোগাড় করে দেবে।

যৌক্তিকতার ভেতরে থেকে আপনি যা চাইবেন, সবই পাবেন এখানে। তবে সব সময় পরিবেশটা এ রকম ছিল না।

চট্টগ্রাম বিভাগের এই জেলখানায় আমি যখন এসেছি, ধরুন এটার নাম কাঠফাটা জেলখানা, তখন আমার বয়স ছিল বিশ। কিভাবে কেন এখানে আমাকে আসতে হলো, সেটা গোপন করে কোনো লাভ নেই। না, বিনা অপরাধে এখানে আমাকে নিয়ে আসা হয়েছে, ব্যাপারটা সে রকম নয়। অপরাধ একটা করেছি, সেটা ভুলে করে ফেলিনি বা দুর্ঘটনাও ছিল না। আমি আমার স্ত্রীর নামে বেশ মোটা অঙ্কের একটা বীমা করেছিলাম—সে আমার চেয়ে বছর তিনেকের বড় ছিল—তারপর আমাদের বিয়েতে তার বাবার দেওয়া উপহার টয়োটা স্প্রিন্টারের ব্রেকে একটু কারিগরি ফলিয়েছি। যে রকম প্ল্যান করেছি, সব কিছু ঠিক সেভাবে ঘটেছে, শুধু আমার প্ল্যানে ছিল না মাঝপথ থেমে আমাদের এক প্রতিবেশী তরুণী আর তার দুধের বাচ্চাকে গাড়িতে তুলে নেবে সে। প্রায় ফাঁকা পাহাড়ি এলাকা, ঢালু রাস্তা, গাড়ির গতি যখন বেড়ে গেছে, আর ঠিক তখন যদি ব্রেক ফেল করে, বুঝে দেখুন কী অবস্থা হতে পারে আমার স্ত্রীর আর যেচে পড়ে লিফট দেওয়া শিশুসহ প্রতিবেশীর।

কজন পথিক পুলিশকে জানিয়েছিল, গাড়ির গতি তখন চল্লিশ কি পঁয়তাল্লিশের কম ছিল না। ছুটে গিয়ে বারো চাকার একটা কাভার্ড ভ্যানে ধাক্কা খায় সেটা, সঙ্গে সঙ্গে পেট্রল ট্যাংক বিস্ফোরিত হয় এবং গাড়িতে আগুন ধরে যায়।

ধরা পড়ে যাব, এটাও আমার প্ল্যানে ছিল না, কিন্তু ধরা আমাকে পড়তে হলো। তিনটি প্রাণহানি ঘটায় বিচারক মহোদয় আমাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন, আমার উকিল আরো উঁচু আদালতে আপিল করে সেটাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে কমিয়ে আনেন।

আমার বয়স কম, দেখতে সুদর্শন। কী? তাহলে আমি নিজেকে এভাবে বরবাদ করলাম কেন? সংক্ষেপে এর উত্তর হলো, আমাকে ঘরজামাই থাকতে বাধ্য করা হয়েছিল, এবং আমার সঙ্গে একটা নেড়ি কুত্তার চেয়েও খারাপ ব্যবহার করা হতো। ধীরে ধীরে ক্ষোভ জমছিল, সেটা একসময় আমাকে দিয়ে ওই কাজটা করিয়ে নিয়েছে। সুযোগ পেলে ওই কাজ আবার আমি করব না—হয়তো।

যা হোক, এখানে আমি আমার নিজের গল্প বলতে বসিনি। আমি যার কথা বলব, তার নাম উদ্যম হাসান। তবে উদ্যমের কথা শুরু করার আগে নিজের সম্পর্কে দু-একটা কথা আপনাকে জানাতে চাই। বেশি সময় নেব না।

আগেই বলেছি, এই কাঠফাটা জেলখানায় আমি হলাম সেই লোক, যে আপনার সব জিনিস এনে দিতে এক পায়ে খাড়া হয়ে আছে প্রায় ত্রিশ বছর ধরে। শুধু মাদক আর নিষিদ্ধ জিনিস নয়, এখানে সাজা খাটতে আসা দুর্ভাগাদের জন্য আরো হাজারটা আইটেম নিয়ে আসতে পারি আমি। এখানে এক লোক আছে, ছোট এক মেয়েকে ধর্ষণ করার দায়ে এবং আরো ডজনখানেক মেয়ের গায়ে হাত দেওয়ার অপরাধে শাস্তি ভোগ করছে; আমি তাকে বেগুনি রঙের বড় বড় তিন টুকরো বিদেশি মার্বেল জোগাড় করে দিই, এবং ওগুলো খোদাই করে ভারি সুন্দর তিনটি মূর্তি বানিয়ে দিয়েছে সে, ওগুলোর নাম দিয়েছে ‘তিন বয়সে যিশু’। ওই ভাস্কর্য এখন এমন এক ব্যক্তির বৈঠকখানার শোকেসে শোভা পাচ্ছে, যিনি একসময় এই শহরের মেয়র ছিলেন।

আপনারা হয়তো গলাকাটা ফাপড়ের নাম শুনেছেন। ওই যে বছর দশেক আগে মানি ব্যাংকে ডাকাতির চেষ্টা করেছিল। পিস্তলের মুখে সবাইকে জিম্মি করতে পারলেও ওখানে রক্তগঙ্গা বয়ে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ছয়জন মারা যায়। তাদের মধ্যে দুজন ছিল গ্যাঙের সদস্য, তিনজন জিম্মি, একজন তরুণ পুলিশ কর্মকর্তা, যিনি ভুল একটা সময়ে ব্যাংকের মধ্যে মাথা ঢুকিয়েছিলেন এবং চোখে একটা বুলেট খান। গলাকাটা ফাপড়ের অনেক কাল আগের ফুটো পয়সা সংগ্রহ করার শখ বা বাতিক আছে। স্বভাবতই জেল কর্তৃপক্ষ তাকে ওগুলো নিয়ে আসতে দেবে না, তবে তার মা এবং এক মাধ্যমের সাহায্য নিয়ে—মাধ্যম লোকটা লন্ড্রি কম্পানির ট্রাক ড্রাইভার—আমি তাকে তার কালেকশন নিয়ে এসে দিয়েছি। আমি তাকে বলেছি—ফাপড়, তুমি নিশ্চয়ই বদ্ধ উন্মাদ, তা না হলে চোরভর্তি একটা পাথুরে সরাইখানায় কেউ তার শখের কালেকশন রাখতে চায় নাকি। আমার দিকে তাকাল সে, মিটিমিটি হাসল, তারপর বলল, কোথায় রাখতে হবে তার জানা আছে। ‘যথেষ্ট নিরাপদ জায়গায় রাখতে পারব জেনেই ওগুলো এখানে আনিয়েছি। এ নিয়ে তুমি দুশ্চিন্তা কোরো না। ’ এবং সে সত্যি কথাই বলেছে। এ ঘটনার তিন বছর পর ব্রেন ক্যান্সারে মারা গেছে ফাপড়, কিন্তু তার সেই ফুটো পয়সার কালেকশন আজ পর্যন্ত কোথাও পাওয়া যায়নি।

লোকজনকে ইদানীং আমি পহেলা বৈশাখে ইলিশ আর পান্তা খাওয়াই, বিজয় দিবসে সব ওয়ার্ডের কয়েদিদের জন্য বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণের ভিডিও সংস্করণ জোগাড় করি। আমাদের এখানে অনেক ছাত্রও আছে, তাদের আমার আইনের বই, ডাক্তারি বই আনিয়ে দিতে হয়। কৌতুকের বইয়ের খুব চাহিদা এখানে, তবে সবচেয়ে বেশি চাহিদা কামসূত্র বা ও ধরনের বইয়ের। কিছু জিনিসের জন্য আকাশছোঁয়া দাম হাঁকি আমি। তবে সব যে আমার পকেটে যায় তা নয়। তা ছাড়া এই কাজটা আমি শুধু টাকার জন্য করি না। টাকা আমার কী কাজে লাগবে? আমি একটা মার্সিডিজ কিনতে পারব? কিংবা প্লেনের টিকিট কেটে ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপে আমার যাওয়া হবে, ছুটি কাটাতে? একজন ভালো কসাই যে কারণে শুধু তাজা মাংস বিক্রি করে, আমিও সেই একই কারণে এই কাজটা করি; আমার একটা সুনাম আছে, আর আমি সেটা ধরে রাখতে চাই। আমি শুধু দুটো জিনিস এনে দিতে রাজি হই না—একটা কড়া মাদক, আরেকটা আগ্নেয়াস্ত্র। কেউ যদি নিজেকে বা আর কাউকে খুন করতে চায়, আমি তাকে সাহায্য করতে রাজি নই। খুনবিষয়ক প্রচুর জটিলতা এমনিতেই আমার মাথার মধ্যে ঘুণপোকার জন্ম দিচ্ছে।

তারপর একদিন উদ্যম হাসান আমার কাছে এলো, এসে বলল চোরাচালানের মাধ্যমে আমি তার জন্য জেলখানায় মধুবালাকে এনে দিতে পারব কি না। আমি বললাম, এটা কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা হয়ওনি।

উদ্যম যে বছর এই জেলে এসেছে, তার পরের বছর আমার কাছে মধুবালার অর্ডার দিতে এলো, যখন তার বয়স একত্রিশ। ছোটখাটো, পরিচ্ছন্ন একজন মানুষ, মাথায় খুব মিহি চুল, হাতগুলো দেখতে খুব ছোট আর চতুর লাগে আমার। সোনালি ফ্রেমের চশমা পরে। তার নখ নিয়মিত কাটা হয়, নখের মধ্যে কখনো কোনো ময়লা দেখা যায় না। বড় কোনো ব্যাংকের ট্রাস্ট ডিপার্টমেন্টে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করত। উদ্যমের জেলখানায় আসার কারণ হলো, স্ত্রী আর তার প্রেমিককে খুন করেছে সে।

বিচারে দোষী সাব্যস্ত হয়ে এখানে যারা জেল খাটতে এসেছে, তাদের প্রায় প্রত্যেকে নিজেকে নিরীহ বলে মনে করে। তারা নামাজ পড়ে, রোজা রাখে, বিনয়ে সারাক্ষণ নুয়ে থাকে। সবার মুখে এক কথা, বিচারক তাদের ভুল বুঝেছেন, তাদের উকিল ছিল অযোগ্য, কিংবা পুলিশ ষড়যন্ত্র করে তাদের ফাঁসিয়েছে।

কাঠফাটায় কয়েক যুগ কাটানোর পর আমি দশজনেরও কম লোকের দেখা পেয়েছি, যারা সত্যি সত্যি নিরীহ ছিল। তাদের একজন হলো উদ্যম হাসান, যদিও তার নির্দোষিতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে কয়েক বছর সময় লেগেছে আমার। সুপ্রিম কোর্টে আমি যদি তার বিচারক হতাম, সন্দেহ নেই, আমিও তার বিরুদ্ধে রায় দিতাম।

সত্যি খুব বিস্ময়কর কেস। সব উপকরণসহ রসালো না বলে উপায় নেই। ব্রিটিশ সমাজের উঁচু স্তরের সঙ্গে যোগাযোগ আছে এ রকম সুন্দর এক মেয়ে (মৃত), খেলাধুলার জগতে নাম করেছে এমন বিদেশি এক ব্যক্তি (সেও মৃত) এবং তরুণ এক বড় ব্যবসায়ীকে কাঠগড়ায় তোলা হয়েছিল। যত রকমের নোংরা কেলেঙ্কারি হতে পারে, খবরের কাগজগুলো উদ্যম হাসানের বিরুদ্ধে দিনের পর দিন অকাতরে ছেপে গেছে। প্রসিকিউশনের সামনে ওটা ছিল ওপেন অ্যান্ড শাট কেস।

ঘটনা এভাবে ঘটেছে বলে সাজানো হয়েছিল : উদ্যমের বিদেশি স্ত্রী শার্লট প্রফেশনাল গলফ ইনস্ট্রাক্টর শ্রীলঙ্কার নাগরিক উত্তম সিংহরাজের কাছে চার মাস মেয়াদের চুক্তিতে গলফ খেলা শিখতে যাচ্ছিল। দুই মাস যেতে না যেতে উদ্যম জানতে পারল, উত্তম আর শার্লট পরস্পরের সঙ্গে চুটিয়ে প্রেম করছে। হত্যাকাণ্ডের আগের দিন বিকেলে এ বিষয় নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তুমুল ঝগড়া হয়েছে।

কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে উদ্যম জানিয়েছে, তার কাছে ধরা পড়ে যাওয়ায় শার্লট খুশি হয়েছে বলে স্বীকার করেছিল, বলেছিল লুকোচুরি খেলতে তার আর ভালো লাগছিল না, বরং খুব অশান্তি লাগছিল। শার্লট তাকে আরো বলেছে, সে ডিভোর্স চাওয়ার প্ল্যান করছে। উত্তরে উদ্যম বলেছে, ডিভোর্স দেওয়ার আগে শার্লটকে নরকে পাঠাবে সে। স্বামীর মুখে এ কথা শোনার পর বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যায় শার্লট, বলে যায় উত্তমের সঙ্গে রাত কাটাবে। গলফ কোর্স থেকে বেশি দূরে নয়, একটা ভাড়া করা বাংলোয় থাকত উত্তম। পরদিন সকালে উত্তমের চাকরানি বিছানার ওপর দুজনকে মৃত অবস্থায় দেখতে পায়। তাদের প্রত্যেককে চারটি গুলি করা হয়েছে।

শহরের অনুমোদিত আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রেতা সাক্ষ্য দিতে কাঠগড়ায় উঠে জানালেন, জোড়া খুনের মাত্র দুই দিন আগে উদ্যম হাসানকে তিনি একটা সিক্স-শট পয়েন্ট থার্টিএইট পুলিশ স্পেশাল বিক্রি করেছেন এবং তাঁর সঙ্গে আগ্নেয়াস্ত্র রাখার লাইসেন্স ছিল। ধনী লোকদের ক্লাব ডিফারেন্টের বারম্যান জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের দিন সন্ধে সাতটার দিকে বারে ঢোকে উদ্যম, বিশ মিনিট সময়সীমার মধ্যে তিনটি নির্জলা হুইস্কি পান করে, তারপর চলে যাওয়ার জন্য টুল ছেড়ে দাঁড়ায় এবং বারম্যানকে এই কথাগুলো বলে : ‘উত্তম সিংহরাজের বাড়িতে যাচ্ছি আমি; তুমি মিয়া, বারম্যান, বাকিটা পত্রিকা পড়ে জেনে নিয়ো। ’

আরেক লোক, উত্তমের বাড়ি থেকে মাইলখানেক দূরে একটা ডিপার্টমেন্ট স্টোরের সেলসম্যান, সাক্ষ্য দিতে কাঠগড়ায় উঠে আদালতকে জানিয়েছে, ঘটনার দিন রাত পৌনে নয়টার দিকে উদ্যম হাসান তাদের দোকানে এসেছিল, সেখান থেকে কটা বিয়ারের ক্যান, সিগারেট আর ছোট কয়েকটা তোয়ালে কিনেছিল। সরকারি ডাক্তার সাক্ষ্য দিয়েছেন, শার্লট আর উত্তম রাত এগারোটা থেকে দুটোর মধ্যে খুন হয়েছে। পুলিশের একজন ডিটেকটিভ, যিনি এই কেস তদন্ত করার দায়িত্বে ছিলেন, সাক্ষ্য দিতে উঠে আদালতকে বলেছেন, ওই বাংলো থেকে সত্তর গজেরও কম দূরত্বে একটা অস্থায়ী পার্কিং লট আছে এবং ঘটনার পরদিন বিকেলে ওখান থেকে তিন প্রস্ত এভিডেন্স সংগ্রহ করেছে পুলিশ; সেগুলো হলো : এক, বিয়ারের দুটো খালি বোতল (তাতে আসামির আঙুলের ছাপ পাওয়া গেছে); দুই, সিগারেটের বারোটা অবশিষ্টাংশ (আসামি এই ব্র্যান্ডের সিগারেটই খায়); তিন, গাড়ির চাকার দাগ (এই দাগ আসামির গাড়ির চাকার সঙ্গে হুবহু মেলে)।

উত্তমের বাংলোর বসার ঘরে, সোফার ওপর তিনটি ছোট তোয়ালে পাওয়া গেছে, ওগুলোতে বুলেটের তৈরি ফুটো আর গানপাউডার ছিল। এসব দেখে ডিটেকটিভ ভদ্রলোক এই থিওরি দেন (উদ্যম হাসানের উকিলের প্রবল প্রতিবাদ কানে না তুলে) যে গুলির শব্দ চাপা দেওয়ার জন্য খুনি মার্ডার ওয়েপনের মাজলে ওই তোয়ালে পেঁচিয়ে রেখেছিল।

নিজেই নিজের পক্ষে বক্তব্য দেওয়ার জন্য কাঠগড়ায় উঠেছিল উদ্যম হাসান। সম্পূর্ণ শান্ত আর ঠাণ্ডা দেখা গেছে তাকে, আবেগহীন নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলে গেছে নিজের গল্প। বলল, সে তার স্ত্রী সম্পর্কে মনে অশান্তি সৃষ্টি করে এমন সব গুজব শুনতে পাচ্ছিল জুলাই মাসের শেষ দিক থেকে। আগস্ট মাসে পরিস্থিতি সহ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে খোঁজ নিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নেয়। এক বিকেলে টেনিস ট্রেনিং শেষ করে শপিং করতে যাওয়ার কথা ছিল শার্লটের। উদ্যম চুপি চুপি তার পিছু নেয়। ট্রেনিং শেষ করে বাইরে বেরিয়ে আসে শার্লট, ওখান থেকে তাকে নিজের গাড়িতে তুলে নেন উত্তম সিংহরাজ, শার্লটকে নিয়ে নিজের বাংলোয় পৌঁছেন। ওই বাংলোয় ওঁরা দুজন প্রায় আড়াই ঘণ্টা ছিলেন, তারপর শার্লটকে আবার টেনিস কোর্টের কাছে পৌঁছে দেন উত্তম, যেখানে পার্ক করা ছিল শার্লটের গাড়ি।

প্রতিপক্ষের উকিল প্রশ্ন করেছেন, ‘আপনার ঝকঝকে নতুন গাড়ি পিছু নিল, অথচ আপনার স্ত্রী শার্লট সেটা চিনতে পারলেন না?’

‘সেদিন আমি আমার এক বন্ধুর গাড়ির সঙ্গে নিজের গাড়ি বদল করেছিলাম,’ উত্তর দিয়েছে উদ্যম। তার এই ঠাণ্ডা স্বীকারোক্তি থেকে বেরিয়ে আসে স্ত্রীর বিরুদ্ধে তার তদন্ত কতটা সুপরিকল্পিত ছিল, বিচারকের দৃষ্টিতে পুরো ব্যাপারটা তার অনুকূলে যায়নি।

বন্ধুর সঙ্গে আবার গাড়ি বদল করার পর বাড়ি ফেরে উদ্যম। বিছানায় শুয়ে বই পড়ছিল শার্লট। স্ত্রীকে সে জিজ্ঞেস করল, শপিং কেমন হলো? উত্তরে শার্লট বলল, বেড়ানো হয়েছে, শপিং হয়নি—এমন কিছু পছন্দ হয়নি, যেটা কেনা যায়। ‘তখনই আমি নিশ্চিত হই,’ রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষায় থাকা আদালত ভর্তি লোকজনকে বলেছে উদ্যম, সেই আগের মতোই শান্ত আর ঠাণ্ডা সুরে।

‘সেদিন থেকে ধরলে সতেরো দিন পর আপনার স্ত্রী খুন হন, এই সতেরো দিন আপনার মনের অবস্থা কী ছিল, একটু যদি ব্যাখ্যা করেন,’ উদ্যমের উকিল অনুরোধ করেছেন।

‘আমি খুব মানসিক কষ্টে ছিলাম,’ উত্তর দিয়েছে উদ্যম, আগের মতোই নির্লিপ্ত আর ঠাণ্ডা গলায়, সে যেন একটা ফর্দ পড়ছে, এমনকি সেপ্টেম্বর মাসের চার তারিখে আগ্নেয়াস্ত্র কেনার প্রসঙ্গটাও বাদ দিল না।

এরপর তার উকিল অনুরোধ করল, সেদিন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হওয়ার পর শার্লট যখন উত্তমের বাড়িতে রাত কাটাবে বলে চলে গেল, তারপর কী ঘটেছে দয়া করে জানান। জানাল উদ্যম, কিন্তু তাতে পরিস্থিতি তার অনুকূলে গেল না।

আমি তাকে প্রায় ত্রিশ বছর ধরে চিনি এবং আপনাকে খুব জোর দিয়ে বলতে পারি, উদ্যমের মতো আত্মবিশ্বাসী মানুষ আমি খুব কমই দেখেছি। কোনো ব্যাপার তার জন্য যদি ঠিক থাকে, প্রতিবার আপনাকে মাত্র একটু করে দেবে সে। আর তার জন্য যেটা ঠিক নয়, নিজেকে বোতলের মধ্যে ভরে ছিপি লাগিয়ে রাখবে। তার আত্মা যদি কখনো অন্ধকার রাত দেখে থাকে, আপনি তা জানতে পারবেন না। সে ওই জাতের একজন মানুষ, যদি আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে কোনো চিরকুট না রেখে মারা যাবে, তবে নিজের যেসব কাজ তখন করার কথা ছিল, সেগুলো সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন না করে মরবে না।

কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সে যদি কাঁদত কিংবা কথা বলার সময় আবেগে যদি তার গলা ধরে আসত, আদালত তাকে ও রকম চরম সাজা দিত বলে আমি মনে করি না। কিন্তু সে তার গল্প একটা রেকর্ডিং মেশিনের মতো করে বলে গেছে, ভাবটা যেন অনেকটা এ রকম—এই হলো ঘটনা, তোমরা মানলে মানো, না মানলে না মানো, আমার তাতে কিচ্ছু আসে-যায় না। বিচারক মানেননি।

উদ্যম বলেছে, ওই রাতে নেশা করেছিল সে। আপনারাই বলুন, আমাদের দেশের আদালতে দাঁড়িয়ে এ কথা কেউ বলে? বলেছে, চব্বিশ আগস্ট থেকেই নেশা করছিল। বলেছে, সে এমন একজন মানুষ, যার পক্ষে অ্যালকোহল ঠিকমতো সামলানো সম্ভব নয়।

অথচ উদ্যম হাসানকে আমি যত দিন ধরে চিনি, বছরে স্রেফ তিনবার হুইস্কি খেতে দেখেছি তাকে। প্রতিবছর তার জন্মদিনের পাঁচ-সাত দিন আগে খোলা উঠানে, যেখানে আমরা শরীরচর্চা করি, আমার সঙ্গে দেখা করবে সে, আর দেখা করবে পহেলা বৈশাখ আর বড়দিনের কদিন আগে। প্রতিটি ক্ষেত্রে দেশি হোক বিদেশি হোক একটা করে বোতল ম্যানেজ করা চাই তার। ওগুলো কয়েদিরা যে শর্তে বিক্রি করে, তাকে তাতেই রাজি হয়ে কিনতে হয়। জেলখানার মধ্যে এসব জিনিস পাওয়া যায়, তবে দাম পড়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশ-পঁচিশ গুণ বা তারও বেশি। হুইস্কি বাবদ উদ্যম হাসানকে যে অবিশ্বাস্য অঙ্কের টাকা খরচ করতে হয়, সেটা আসে কোত্থেকে? আসে জেলখানার লন্ড্রিতে ঘাম ঝরিয়ে।

জন্মদিনের সকালে, বিশ সেপ্টেম্বর, বেশ খানিকটা খাবে সে, দ্বিতীয়বার খাবে রাতে আলো নেভার আগে, পরদিন সকালে বোতলটা আমার হাতে ধরিয়ে দেবে, আমি সেটা আশপাশে যারা থাকে তাদের সঙ্গে শেয়ার করব। বাকি দুই বোতলও শেষ পর্যন্ত চলে আসে আমার হাতে, আশপাশে যারা থাকে তাদের সঙ্গে শেয়ার করার নির্দেশসহ। বছরে তিনটি বোতল লাগে তার, অথচ পুলিশ তাদের রিপোর্টে এই লোক সম্পর্কে লিখেছিল—বোতলের মার খাওয়া লোক।

এত জোরে, যাতে রক্ত বেরিয়ে আসে।

আদালতকে উদ্যম বলেছিল, দশ তারিখে, শার্লটের সঙ্গে দেখা করার আগে, এত বেশি মদ খেয়েছিল যে কী ঘটেছে না ঘটেছে তার শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু টুকরো মনে করতে পারে সে।

ইনস্ট্রাক্টর উত্তমের কাছে যাওয়ার জন্য শার্লট যখন বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেল, উদ্যমের মনে আছে, ওঁদের মুখোমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সে। উত্তমের বাংলোর দিকে যাওয়ার পথে গাড়ি ঘুরিয়ে ডিফারেন্ট ক্লাবে যায় খানিকটা হুইস্কি খেয়ে গা গরম করার জন্য। ‘উত্তম সিংহরাজের বাড়িতে যাচ্ছি আমি; তুমি মিয়া, বাকিটা পত্রিকা পড়ে জেনে নিয়ো’ ওখানকার বারম্যানকে এ কথা বলেছে কি না মনে নেই তার। একটা ডিপার্টমেন্ট স্টোর থেকে বিয়ার কেনার কথা মনে আছে, তবে ছোট তোয়ালে কেনার কথা মনে নেই। ‘ছোট তোয়ালে আমার কী কাজে লাগবে?’ প্রশ্ন করেছে সে।

পরে উদ্যম আমাকে বলেছে, ‘দোকানের ওই সেলসম্যানকে পুলিশ কিভাবে প্রশ্ন করেছে কে জানে। ঘটনার পর তিন দিন পার হয়ে গিয়েছিল, পুলিশ আমাকে ছাড়া সন্দেহ করার মতো আর কাউকে পাচ্ছিল না। তাদের বিশ্বাস, আমিই খুন দুটো করেছি, আর তাই তাদের প্রশ্নও ছিল বেশ ঘোরানো। যেমন ধরো, পাঁচ-সাতজন পুলিশ দোকানে ঢুকে সেলসম্যানকে ঘিরে ফেলল, জিজ্ঞেস করল, ‘এটা কি সম্ভব নয় যে এখান থেকে খুনি লোকটা বেশ কটা তোয়ালেও কিনেছে?’ ঘাবড়ে গিয়ে সেলসম্যান মাথা ঝাঁকাতে পারে। ওখান থেকে বাকিটা তারা তৈরি করে নিয়েছে। যথেষ্ট লোকজন যদি তোমাকে দিয়ে কিছু স্মরণ করাতে চায়, সেটা এড়িয়ে যাওয়া খুব কঠিন। ’

আমি তার সঙ্গে একমত।

‘এর মধ্যে আরো জোরালো কারণ আছে। ওই লোক নিজেকে বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করে থাকতে পারে যে সে আমার কাছে কয়েকটা তোয়ালে বিক্রি করেছে। কারণটা হলো লাইমলাইট। দিন নেই রাত নেই সারাক্ষণ রিপোর্টাররা তার সঙ্গে কথা বলতে আসছে, পত্রিকায় তার ফটো ছাপা হচ্ছে।

‘কি জানো, সদয়, আমার নিজের উকিলই আমার সব কথা বিশ্বাস করেননি। তাঁর ধারণা ছিল, আমার গল্পের অর্ধেকটা মিথ্যে। ওই তোয়ালে প্রসঙ্গ আদালতে তিনি তোলেনইনি। এটা স্রেফ তাঁর পাগলামি না? আমি মাতাল হয়ে পড়েছিলাম, এতটাই মাতাল যে গুলির আওয়াজ ভোঁতা করার জন্য তোয়ালে ব্যবহারের কথা আমার মনেই পড়বে না। কাজটা যদি সত্যি আমি করতাম, স্রেফ ছিঁড়ে ফেলতাম ওদের। ’

পার্কিং লটে গিয়ে গাড়ি রাখল সে। ওখানে বসে বিয়ার আর সিগারেট খেলো। ট্রেনার উত্তমের বাড়ির আলো নিভে যেতে দেখল, শুধু দোতলার একটা আলো জ্বলছিল। পনেরো মিনিট পর সেটাও নিভে গেল। উদ্যম বলছে, বাকিটা সে আন্দাজ করতে পারে।

‘জনাব হাসান, আপনি কি তারপর ট্রেনার সিংহরাজের বাড়িতে গিয়ে তাঁদের দুজনকে খুন করেছেন?’ চড়া গলায় জানতে চেয়েছেন তার নিজের উকিল।

‘না, আমি কাউকে খুন করিনি,’ জবাব দিয়েছে উদ্যম। মাঝরাতের দিকে, বলল সে, তার নেশা কেটে যায়। তবে খুব বাজে ধরনের একটা হ্যাংওভার ঝামেলা পাকাতে আসছে, বুঝতে পারে সে। সিদ্ধান্ত নিল বাড়ি ফিরে ঘুমাবে, পরদিন একজন পরিণত মানুষের মতো চিন্তা করে বের করবে সমস্যাটা নিয়ে কী করা যায়। ‘গাড়ি নিয়ে বাড়ি ফেরার সময় আমার মনে হলো, এর সহজ এবং সুষ্ঠু সমাধান সম্ভবত শার্লটকে ডিভোর্স দেওয়া। ’

‘ধন্যবাদ, জনাব হাসান। ’

‘দ্রুততম পদ্ধতিতে ডিভোর্স দিয়ে ফেললেন, তাই না?’ প্রতিপক্ষের উকিল গর্জে উঠলেন। আপনি তাঁকে তোয়ালে জড়ানো পয়েন্ট থার্টিএইট রিভলবার দিয়ে ডিভোর্স দিলেন, তাইতো?’

‘না স্যার, তা আমি দিইনি,’ শান্ত সুরে উত্তর দিল উদ্যম।

‘এবং তারপর আপনি তাঁর প্রেমিককে গুলি করলেন। ’

‘না, স্যার। ’

‘তার মানে বলতে চাইছেন, প্রথমে আপনি মিস্টার সিংহরাজকে গুলি করেছেন?’

‘বলতে চাইছি, আমি ওদের কাউকে গুলি করিনি। ’

‘আপনি এই আদালতকে বলেছেন, চব্বিশ আগস্ট থেকে দশ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আপনার মধ্যে আত্মহত্যা করার প্রবণতা ছিল। ’

‘জি, স্যার। ’

‘আত্মহত্যার প্রবণতা এত বেশি হয়ে উঠল যে একটা পিস্তল কিনে ফেললেন?’

‘হ্যাঁ। ’

‘আপনাকে আমার সুইসাইডাল বলে মনে হয় না, আমি এ কথা বললে আপনি কি খুব বেশি অস্বস্তি বোধ করবেন?’

‘না, তবে অন্যের অনুভূতি বা ভালো থাকা নিয়ে আপনি খুব বেশি সচেতন, এটা আমাকে বিশ্বাস করাতে পারছেন না। ভবিষ্যতে আমার মধ্যে যদি আবার সুইসাইড করার প্রবণতা দেখা দেয়, সমস্যাটা নিয়ে আমি আপনার কাছে যাব কি না সন্দেহ আছে আমার। ’

আদালতে সামান্য উত্তেজনা ছড়াল। অন্তত কিছু লোককে মনে হলো তারা উদ্যমের জবাব পছন্দ করেছে।

‘দশ সেপ্টেম্বর রাতে আপনি কি ওই রিভলবার সঙ্গে নিয়ে বেরিয়েছিলেন?’

‘না, এটা আমি আগেই জানিয়েছি। ’

‘ও, হ্যাঁ!’ প্রতিপক্ষের উকিল বিদ্রূপাত্মক হাসি হাসছেন। ‘ওটা আপনি ছুড়ে নদীতে ফেলে দিয়েছেন, তাই না? নয় সেপ্টেম্বর বিকেলে। ’

‘জি, স্যার। ’

‘খুন হওয়ার এক দিন আগে। ’

‘জি, স্যার। ’

‘তাতে খুব সুবিধে হয়, তাই না?’

‘এতে সুবিধে হওয়ার কিছু নেই, আবার অসুবিধে হওয়ারও কিছু নেই। এটা একটা ফ্যাক্ট, অর্থাৎ শুধু সত্য। ’

‘নদীতে তল্লাশি চালানো হয়েছে। কিছু পাওয়া যায়নি। কিছু মানে আপনার রিভলবার। ’

‘হ্যাঁ, আমি শুনেছি রিভলবারটা পাওয়া যায়নি। ’

‘আপনার জন্য এটাও বেশ সুবিধেজনক, তাই না?’

‘সুবিধে কি না, সে প্রসঙ্গ একপাশে সরিয়ে রাখুন, এটা একটা ফ্যাক্ট যে অস্ত্রটা পাওয়া যায়নি। ওই নদীতে প্রচণ্ড স্রোত, আর সাগর ওখান থেকে বেশি দূরে নয়। কাজেই নদী থেকে ভেসে ওটা সাগরে গিয়ে পড়তে পারে। ’

‘কাজেই যে বুলেটগুলো আপনার স্ত্রী আর তাঁর প্রেমিকের শরীর থেকে পাওয়া গেছে, পরীক্ষা করে বোঝার উপায় নেই যে ওগুলো আপনার রিভলবার থেকে বেরিয়েছে কি না?’

‘না। ’

‘এটাও আপনার জন্য বেশ সুবিধে বয়ে আনছে, তাই না?’

ছয় সপ্তাহ ধরে চলা শুনানিতে এই প্রথম উদ্যমের মধ্যে খানিকটা ভাবাবেগের প্রকাশ ঘটতে দেখা গেল, একচিলতে তিক্ত হাসি ফুটল তার মুখে। ‘আমি যেহেতু এই জোড়া খুন করিনি, স্যার এবং আমি যেহেতু অস্ত্রটা নদীতে ছুড়ে ফেলার ব্যাপারে সত্যি কথা বলছি, কাজেই অস্ত্রটা না পাওয়াটা আমার কাছে অসুবিধেজনক বলে  মনে হচ্ছে। ’

সরকারি উকিল টানা দুই দিন জেরা করার নামে হাতুড়ির বাড়ি মারতে থাকলেন। আপনি তোয়ালে কিনলেন কী মনে করে? কই, কিনেছি বলে আমার মনে পড়ে না। বছর দুয়েক আগে আপনি এবং আপনার স্ত্রী একটা যৌথ বীমা করেন, সত্যি? হ্যাঁ, সত্যি। এই মামলা থেকে আপনি যদি বেকসুর খালাস পান, এটা কি সত্যি আপনি তাহলে ওই বীমা বাবদ বিশ লাখ টাকা পাবেন? সত্যি। এটাও কি সত্যি নয় যে আপনি বুকে খুন করার ইচ্ছে নিয়ে ট্রেনার সিংহরাজের বাড়িতে গিয়েছিলেন এবং এও কি সত্যি নয় যে তাঁকে এবং নিজের স্ত্রীকে গুলি করে হত্যা করতে সফল হন আপনি? না, সত্যি নয়। তাহলে আপনিই ব্যাখ্যা করুন, এই ঘটনা কিভাবে ঘটল, কে ঘটাল, যেখানে ডাকাতির কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না?

‘সেটা জানার আমার তো কোনো উপায় নেই, স্যার,’ বলল উদ্যম।

এক সপ্তাহ পর রায় হয়ে গেল—যাও, সারা জীবন জেলখানায় পচো।

 

 

 

দুই.

 

সরকারি উকিল জানতে চেয়েছিলেন, তাহলে এই জোড়া খুন করল কে? সেটা এড়িয়ে গেছে উদ্যম, উত্তর দেয়নি। তবে তার একটা আইডিয়া আছে কাজটা কে করতে পারে। সে জেলখানায় আসার সাত বছর পর এক রাতে সেটা আমি তার ভেতর থেকে বের করে আনি। এই সাত বছর আমাদের কেটেছে চোখাচুখি হতে মাথা ঝাঁকিয়ে, কখনো বা ক্ষীণ হাসি বিনিময় করে। ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে উঠেছি আমরা। তবে আরো পাঁচ বছর না কাটতে তাকে আমি খুব কাছের একজন মানুষ বলে অনুভব করতাম না। এবং আমার বিশ্বাস, আমি যতটা তার কাছে পৌঁছতে পেরেছি, আর কারো পক্ষে সেটা সম্ভব হয়নি। দুজনেই লম্বা মেয়াদে সাজা খাটছি, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই সেল ব্লকে থাকছিও, যদিও করিডরে তার কাছ থেকে বেশ খানিকটা দূরে থাকি আমি।

‘আমি কী মনে করি?’ হেসে ফেলল উদ্যম, তবে আওয়াজটা একেবারে নীরস লাগল কানে। ‘আমার ধারণা, ওই রাতে চারদিকে প্রচুর দুর্ভাগ্য ভেসে বেড়াচ্ছিল। ওই অল্প সময়ের একটা বিস্তৃতিতে আর কখনো এত বেশি এক জায়গায় জড়ো হতে পারবে না। আমার ধারণা, নিশ্চয়ই কোনো অচেনা লোক হবে, আমরা যাকে আগন্তুক বলি, স্রেফ এদিক দিয়ে যাচ্ছিল। হতে পারে এমন কেউ একজন ওদিকের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল, হঠাৎ যার চাকার বাতাস বেরিয়ে গিয়েছিল, আমি বাড়ি ফিরে যাওয়ার পর। হতে পারে একটা চোর। একজন সাইকোপ্যাথও হতে পারে। সে ওদের খুন করেছে, ব্যস। আর আমি এখানে। ’

কিছু একটা চাওয়ার জন্য প্রথমবার যখন উদ্যম আমার সঙ্গে যোগাযোগ করল, সেই দিনটার কথা আজও আমার মনে আছে, যেন গতকালের ঘটনা। যদিও সেবার মধুবালাকে চায়নি সে, সেটা আরো পরের ঘটনা। প্রথমবার এসেছিল অন্য একটা জিনিস চাইতে।

আমার বেশির ভাগ লেনদেন হতো যেখানে আমরা শরীরচর্চা করতাম সেই খোলা উঠানে। আমাদের ওই উঠান বেশ বড়। নিখুঁত চৌকো আকৃতি, প্রতিটি দিক নব্বই গজ করে। উত্তর দিকে বাইরের পাঁচিল, দুই মাথায় একটা করে গার্ড টাওয়ার। ওখানে যে গার্ডরা ডিউটি দেয় তাদের কাছে বিনোকিউলার আর রায়ট গান থাকে। মেইন গেটটাও ওই উত্তর দিকে। মাল ওঠানামা করানোর জন্য উঠানের দক্ষিণ দিকে পাঁচটা জায়গা আলাদা করা আছে, আমরা ওগুলোকে লোডিং বে বলি। সপ্তাহজুড়ে কাজের দিনগুলোতে খুব ব্যস্ত থাকে কাঠফাটা—হরদম ডেলিভারি দিচ্ছি, হরদম ডেলিভারি নিচ্ছি। আমাদের আছে সরকারি সাইনবোর্ড তৈরির ফ্যাক্টরি আর বিশাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল লন্ড্রি। যেখানে যত জেলখানা আছে, সবগুলোর কাপড়চোপড়ও আমরা ধুই। আমরা একটা হাসপাতালও চালাই, শুধু কয়েদিদের চিকিৎসা করা হয়। এমনকি ছোটখাটো একটা মেন্টাল ক্লিনিকও আছে আমাদের। আমরা যারা এখানে জেল খাটতে আসি, তারা যদি পাগল না হয় তাহলে আর কাকে আপনি পাগল বলবেন বলুন? আমাদের এখানে বড় একটা গাড়ি মেরামতের কারখানা আছে, কয়েদিরাই মেকানিক, বেশির ভাগ সরকারি গাড়ি সারানো হয়।

পুব দিকে খুব পুরু পাথরের পাঁচিল, তার গায়ে সরু অনেক জানালা বসানো। সেল ব্লক পাঁচ ওই পাঁচিলের উল্টো দিকে। পশ্চিমে প্রশাসনিক ভবন আর হাসপাতাল। বাকি সব জেলখানার মতো কাঠফাটায় কখনো উপচে পড়া কয়েদি দেখা যায় না, আমি কখনো দুই-তৃতীয়াংশের বেশি ভরতে দেখিনি। উঠানে সাধারণত আশি কি এক শ বিশজন কয়েদিকে একসঙ্গে দেখা যায়। তারা ফুটবল কিংবা হাডুডু খেলে, মারপিট করে, আবার পুরনো বিবাদ মিটিয়ে কোলাকুলিও করে। ভিড় বেড়ে যায় শুক্রবারে। তবে সেটা জুমার পর।

এ রকম এক শুক্রবারেই আমার কাছে প্রথমবার এসেছিল উদ্যম হাসান। আমি তখন খাপ্পা মুস্তাকের সঙ্গে একটা রেডিও নিয়ে আলাপ করছিলাম, লোকটা আমার অনেক কাজে লাগে, এই সময় উদ্যম হাসানকে আমার দিকে হেঁটে আসতে দেখলাম। অবশ্যই আমার জানা ছিল কে সে; নাক উঁচু, দেমাগে মাটিতে পা পড়ে না, ঠাণ্ডা বরফ—তত দিনে এ রকম সব সুখ্যাতি অর্জন করে ফেলেছে। লোকজন বলাবলি করছিল, ইতিমধ্যেই তাকে বিপদে ফেলার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এ রকম কথা যারা বলছে, তাদের একজন বোগাস হীরা, আপনার কেসে নাক গলালে খুব খারাপ লোক। উদ্যমের কোনো সেলমেট নেই এবং আমি শুনেছি কেউ না থাকাটাই তার পছন্দ, যদিও মাত্র একজনের থাকার উপযোগী সেল খাটের চেয়ে একটু হয়তো বড় হতে পারে, যে খাটে শুইয়ে আমাদের কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে আমি একজন মানুষ সম্পর্কে কোনো গুজবে কেন কান দিতে যাব, যেখানে আমি নিজেই তার ব্যাপারটা যাচাই করতে পারি।

‘হ্যালো,’ বলল সে। ‘আমি উদ্যম হাসান। ’ হাত বাড়াল, ধরে একটু ঝাঁকি দিলাম। সামাজিকতা রক্ষা করতে গিয়ে সময় নষ্ট করবে এমন লোক নয় সে।

‘যতটুকু বুঝেছি, তুমি জানো কিভাবে জিনিসপত্র জোগাড় করতে হয়। ’

স্বীকার করলাম মাঝেমধ্যে এটা-সেটা জোগাড় করতে পারি আর কি।

‘কাজটা কিভাবে তুমি করো?’ উদ্যম জিজ্ঞেস করল।

‘কখনো দেখা যায় জিনিসপত্র স্রেফ আমার দিকে চলে আসছে, বললাম আমি। এটা আমার পক্ষে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়—আমি রয়াল ডিস্ট্রিক্টের লোক, এটা যদি কিছু না বোঝায় আর কি। ’

আমার কথা শুনে একটু হাসল সে। ‘ভাবছি তুমি আমাকে একটা পাথুরে হাতুড়ি এনে দিতে পারবে কি না। ’

‘পাথুরে হাতুড়ি কী জিনিস? আর সেটা তোমার দরকারই বা হলো কেন?’

উদ্যমকে বিস্মিত দেখাল। ‘একটা জিনিস কেন দরকার হবে, সেটা জানাও তোমার ব্যবসার একটা বৈশিষ্ট্য নাকি?’

তার প্রশ্নের ধরন দেখেই বুঝতে পারলাম কেন মানুষ তাকে দেমাগি মনে করছে। ‘শোনো তাহলে,’ বললাম তাকে, ‘তুমি যদি একটা টুথব্রাশ চাও আমি কিছু জিজ্ঞেস করব না। আমি শুধু দামটা জানাব তোমাকে। কারণ তুমি জানো, টুথব্রাশ মারাত্মক অস্ত্রের মধ্যে পড়ে না। ’

‘মারাত্মক অস্ত্র সম্পর্কে তোমার মনোভাব খুব কঠোর মনে হচ্ছে?’

‘হ্যাঁ, খুব। ’

 আমাদের দিকে একটা ফুটবল ছুটে এলো, ঘুরল উদ্যম, বিড়ালের ক্ষিপ্রতা নিয়ে চার কি পাঁচ পা এগোল, তারপর শূন্যে থাকতেই লাথি মারল বলে। বলটা যেন তার লাথি খেতেই অনেকটা আকাশপথ পার হয়ে ছুটে এসেছে। খুব যে জোরে মারল উদ্যম তা নয়, অথচ বল অনেক ওপরে উঠে গেল, যতটা উঁচু পথ ধরে এসেছিল ঠিক তত উঁচুতে, তারপর ফিরে গেল ঠিক যেখান থেকে এসেছিল। উদ্যমের ছুটে যাওয়া, অনায়াস ভঙ্গিতে বলে কিক করা, উপস্থিত সবাই চাক্ষুষ করল এবং আমার মতো উঠানে উপস্থিত বাকি সবাইও তাজ্জব না হয়ে পারল না। তার প্রমাণ, লক্ষ করলাম, যারা ওখানে ফুটবল খেলছিল তারা সবাই একটা চোখ রেখেছে উদ্যমের ওপর। এমনকি টাওয়ারের গার্ডরাও বারবার আমাদের দিকে তাকাচ্ছে।

সব জেলেই কিছু পুরনো কয়েদি থাকে, যারা পুলিশকে ভয় পায় না, বরং পুলিশই তাদের ভয় পায়; তাদের গুণ্ডামি-মাস্তানির কারণে সাধারণ কয়েদিরা কেঁচোর জীবন নিয়ে বেঁচে থাকে। আবার কিছু কয়েদি আছে, যারা গুণ্ডামি-মাস্তানি না করা সত্ত্বেও যথেষ্ট ওজনদার। আমি সে রকম একজন। কাজেই উদ্যম হাসান সম্পর্কে আমি কী ভাবি তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করবে এখানে তার সময়টা কিভাবে কাটবে। কথাটা সম্ভবত তারও জানা আছে। অথচ তার পরও তার মধ্যে আমি দৃঢ়তার কোনো অভাব দেখলাম না, দেখলাম না হাত কচলাতে; এর জন্য তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা এসে গেল।

‘ঠিক আছে, বুঝেছি। জিনিসটা কী বলছি, কেন দরকার তা-ও বলছি। রক হ্যামার দেখতে পিকএক্সের মতো, যেটা দিয়ে পাথর ভাঙা হয়—এ রকম লম্বা। ’ হাত দিয়ে মাপ দেখাল, এক ফুট হবে। তখনই আমি খেয়াল করলাম তার নখ কী রকম পরিষ্কার। ‘ওটার এক ধার ধারালো; আরেক দিক ভোঁতা, হাতুড়ির মাথা। আমার ওটা দরকার, কারণ আমি পাথর ভালোবাসি। ’

‘পাথর,’ বললাম আমি।

‘হাঁটু ভাঁজ করে এখানে একটু বসো,’ বলল সে।

আমি তার সম্মান রাখলাম। হাঁটু ভাঁজ করে, পায়ের ওপর ভর দিয়ে বসলাম আমরা। উঠান থেকে একমুঠো ধুলো তুলল উদ্যম, এক হাত থেকে আরেক হাতে চালান করার সময় মিহি মেঘ তৈরি হতে দেখছি, উড়ে যাচ্ছে বাতাসে, তার হাতে রয়ে যাচ্ছে শুধু কিছু খুদে নুড়ি, তার মধ্যে দু-একটা একটু বেশি উজ্জ্বল, আলো লাগলে চকচক করছে, বাকিগুলো ম্লান আর সাধারণ। ভোঁতাগুলোর একটা কোয়ার্টজ বা সিলিকন ডাই-অক্সাইড, তবে আপনি ঘষে পরিষ্কার না করা পর্যন্ত ওটা ম্লানই থাকবে। ঘষলে ভারি সুন্দর দুধের মতো সাদা আভা ছড়ায়। পরিষ্কার করে আমার দিকে ছুড়ে দিল উদ্যম। ধরে আমি ওটার নাম বললাম।

 

‘হ্যাঁ, কোয়ার্টজ,’ বলল সে। ‘কিন্তু দেখো। মাইকা, শেল, সিলটেড গ্র্যানিট। এখানে একটুকরো গ্রেডেড লাইমস্টোন—এটা এসেছে কিভাবে? আসেনি, ছিল, পাহাড়ের গা কেটে এই জায়গাটা যখন বের করা হয়। ’ সব ফেলে দিয়ে হাত ঝাড়ল সে। ‘আমাকে তুমি পাথরপাগল বলতে পারো। অন্তত...পাথরপাগল ছিলাম আমি। আমার পুরনো জীবনে। আবার ও রকম হতে চাই আমি, সীমিত পরিসরে। ’

‘শরীরচর্চার মাঠে জুমাবাদ বিজ্ঞানবিষয়ক অভিযান?’ দাঁড়ানোর সময় জিজ্ঞেস করলাম।

‘নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো,’ সংক্ষেপে জবাব দিল সে।

‘ওই রক হ্যামার দিয়ে তুমি খুব সহজেই কারো মাথা ফাটাতে পারো,’ মন্তব্য করলাম আমি।

‘এখানে আমার কোনো শত্রু নেই,’ বলল সে।

‘নেই?’ আমি হাসলাম। ‘একটু অপেক্ষা করো। ’

‘যদি কোনো সংকট তৈরি হয়, রক হ্যামার ছাড়াই সেটা আমি সামলাতে পারব। ’

‘কী করে বুঝব তুমি এখান থেকে পালানোর ফন্দি আঁটছ না? পাঁচিলের তলা দিয়ে নাকি? তা যদি পালাও...’

ভব্যতা দেখিয়ে সামান্য একটু হাসল সে। তিন সপ্তাহ পর আমি যখন ওর হ্যামারটা দেখলাম, তার ওই হাসির অর্থ বুঝতে পারলাম।

‘কি জানো,’ তাকে আমি বললাম, ‘ওটা তোমার কাছে কেউ দেখলে ঠিক নিয়ে যাবে। কেউ যদি তোমার কাছে একটা চামচ দেখে, ওরা নিয়ে যাবে সেটা। তুমি ঠিক কী করতে চাইছ বলো তো? উঠানে বসে কুচি করবে পাথর?’

‘কুচি কেন, তার চেয়ে অনেক ভালো কিছু করতে পারি আমি। ’

মাথা ঝাঁকালাম। ওই অংশটা আমার কোনো বিষয় নয়।

‘এ রকম একটা জিনিসের কী রকম দাম হতে পারে?’ জানতে চাইলাম আমি।

‘হার্ডওয়্যারের দোকানে যদি পাওয়া যায়, হাজার টাকা দাম চাইবে। পাথর আর টাইলস বিক্রি হয় যেখানে, সেখানে সাত শ টাকায় কেনা যেতে পারে। তবে এখানে তুমি আরো বেশি চাইবে, জানা কথা...’

‘দামের ওপর দশ পার্সেন্ট ধরি আমি। তবে বিপজ্জনক জিনিস হলে দাম বেড়ে যায়। এই ধরো বারো শ টাকা। ’

‘বারো শই তাহলে। ’

তার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলাম। ‘তোমার কাছে বারো শ টাকা আছে?’

‘আছে,’ শান্ত সুরে বলল সে।

দীর্ঘ একটা সময় পর আমি জানতে পেরেছি, তার কাছে পঁচিশ হাজারেরও বেশি ছিল। টাকাটা বাইরে থেকে সঙ্গে করে জেলখানায় নিয়ে এসেছিল সে। এখানে যখন কাউকে ঢোকানো হয়, কুঁজো করে এমনকি তার মলদ্বারও পরীক্ষা করা হয়, লুকিয়ে কিছু আনা হয়েছে কি না দেখার জন্য। যে লোকটা তল্লাশি চালায় তার মনে যদি সন্দেহ জাগে তাহলে সে রবারের গ্লাভস পরে আপনার ভেতরটাও যত দূর পারা যায় নেড়েচেড়ে দেখার চেষ্টা করবে। কাজেই কেউ যদি এই তল্লাশিকে ফাঁকি দিয়ে কিছু আনতে পারে, তাকে সম্মান না করে উপায় নেই।

‘বেশ। তোমার নিশ্চয় জানা আছে এটা নিয়ে ধরা পড়লে ওদের কী বলতে হবে?’

মাথা ঝাঁকাল উদ্যম। ‘জানি। বলব এটা আমি কুড়িয়ে পেয়েছি। ’

‘তার পরও তোমাকে ওরা তিন কি চার সপ্তাহের জন্য সলিটারিতে পাঠাবে। খেলনাটা তো হারাবেই, আর তোমার রেকর্ডে কালো একটা দাগ পড়বে। ওদের তুমি যদি আমার নাম বলো, তোমার সঙ্গে আমার আর কোনো ব্যবসা হবে না এবং তোমাকে খানিকটা পেটানোর জন্য দুজন হোঁতকা চেহারার লোককে পাঠাব। আমি ভায়োলেন্স পছন্দ করি না, কিন্তু তোমাকে আমার পজিশনটা বুঝতে হবে। পরিস্থিতি আমার নিয়ন্ত্রণে নেই, লোকজনকে এটা ভাবতে দিতে পারি না। তা ভাবলে আমি শেষ হয়ে যাব। ’

‘হ্যাঁ, সেটা বুঝতে পারি। তুমি কোনো দুশ্চিন্তা কোরো না। ’

‘আমি কখনো দুশ্চিন্তা করি না, কারণ ওটায় কোনো পার্সেন্টেজ নেই। ’

মাথা ঝাঁকিয়ে চলে গেল। তিন দিন পর শরীরচর্চার উঠানে, লন্ড্রিতে সকালের বিরতি শুরু হতে, দেখা গেল আমার পাশে হাঁটছে সে। কথা বলল না, এমনকি আমার দিকে তাকালও না এবং একজন জাদুকর যেমন তাস নিয়ে চালাকি করে, সে রকম দক্ষতার সঙ্গে আমার হাতে একটা কিছু গুঁজে দিল। এই লোক দ্রুত সব শিখে নিতে পারে। সে তার রক হ্যামার পেয়ে গেছে। এক রাত ওটাকে আমি নিজের সেলে রেখেছিলাম, জিনিসটা তার বর্ণনার সঙ্গে পুরো মিলে গেছে। না, ওটা পালানোর কোনো কাজে লাগবে না। ওই রক হ্যামারের সাহায্যে পাঁচিলের তলা দিয়ে সুড়ঙ্গ তৈরি করতে যেকোনো লোকের কমপক্ষে এক শ বছর লাগবে। তার পরও মন একটু খুঁতখুঁত করতে লাগল। ওই হ্যামারের চোখা দিকটা উদ্যম যদি কারো মাথায় ঢোকাতে চায় তাহলে তার পরিণতি অবশ্যই ভালো হবে না এবং উদ্যম ইতিমধ্যেই সখিদের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ছে বলে শুনতে পাচ্ছি।

জিনিসটা লোক মারফত ডেলিভারি দিয়েছিলাম তাকে, খুব পুরনো দুজন কয়েদি তারা। এরপর ওই রক হ্যামার এগারো বছর আমি আর দেখিনি।

পরের শুক্রবার আবার আমার সঙ্গে উঠানে দেখা করল উদ্যম। সেদিন তার দিকে তাকানো যাচ্ছিল না, শুধু এটাই আপনাকে বলতে পারি আমি। তার নিচের ঠোঁট ফুলে পটোল হয়ে গেছে। ফুলে আধবোজা হয়ে আছে ডান চোখও। এক দিকের গালে কুিসত একটা আঁচড়ের দাগ, বেশ গভীর। বুঝলাম সখিদের সঙ্গে তার ঝামেলা শুরু হয়েছে। যদিও তার মুখ থেকে কিছুই আমি শুনতে পাচ্ছি না।

‘যন্ত্রটার জন্য ধন্যবাদ জানাতে এসেছিলাম,’ বলে হেঁটে চলে গেল।

চোখে কৌতূহল নিয়ে তাকে আমি দেখছি। কয়েক পা হেঁটে গেল, তারপর থেমে ঝুঁকল, কী যেন তুলল। ছোট একটা পাথর ওটা। প্রিজন ফেটিগে পকেট থাকে না, তার পরও ব্যবস্থা করা যায়। পাথরটা উদ্যমের আস্তিনে ঢুকে গেল, কিভাবে সম্ভব বলা মুশকিল, খসে পড়ছে না। কাজটা এমন নৈপুণ্যের সঙ্গে করল, ভালো লাগল আমার; ভালো লাগল মানুষটাকেও। সমস্যার ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছে ওকে, তার পরও নিজের জীবনটাকে চালিয়ে নিতে চেষ্টা করছে। হাজার হাজার মানুষ আছে যারা করে না, করবে না, পারবে না এবং তাদের মধ্যে অনেকে জেলখানায় নেই। আমি আরো লক্ষ করলাম, বেদম মার খেয়ে তার মুখ যতই রক্তাক্ত আর ক্ষতবিক্ষত দেখাক, আজও তার নখের ভেতর কোনো ময়লা জমে থাকতে দেখলাম না।

পরবর্তী ছয় মাস তার সঙ্গে খুব একটা দেখা হয়নি আমার। উদ্যমকে ওই সময়ের বেশির ভাগটাই সলিটারি—নির্জন সেলে কাটাতে হয়েছে।

 

 

 

তিন.

 

অনেক জেলে ওদের অন্য অনেক নামে ডাকা হয়, তবে কাঠফাটায় বলা হয় সখি। কিছু লোক থাকে, যারা সেক্স ছাড়া থাকতে পারে না, কোনো না কোনো ফর্মে এটা তাদের পেতেই হবে—পুরুষ হওয়া সত্ত্বেও পার্টনার হিসেবে আরেকজন পুরুষ মানুষে তাদের আপত্তি নেই।

জেলে এসে অনেকে ‘বদলে’ যায়; ছিল ‘স্বাভাবিক’, এখানে আসার পর সঙ্গিনীর অভাবে আর উপস্থিত সখিদের প্ররোচনায় হয়ে উঠল ‘হোমো’।

পাঁচিলের বাইরে সমাজ ধর্ষকদের যে চোখে দেখে, পাঁচিলের ভেতরকার সমাজ সখিদেরও সেই একই চোখে দেখে। ওরা বেশির ভাগই দীর্ঘ মেয়াদে সাজা ভোগ করছে, বাইরে থাকতে লোমহর্ষক সব অপরাধে হাত পাকিয়েছে, এখানে ঠাঁই হওয়ার পরও—কথায়ই তো আছে, স্বভাব যায় না ম’লে।

ওদের শিকার কম বয়সী, দুর্বল আর অনভিজ্ঞরা...কিংবা, উদ্যম হাসানের বেলায় যেমন, যাদের দেখে দুর্বল বলে মনে হয়। ওরা শিকার ধরে গোসলখানায়। সুড়ঙ্গের মতো দেখতে, প্রায় ফাঁকা একটা জায়গা, লন্ড্রির পেছন দিকটায়। কখনো বা হাসপাতালে। অডিটরিয়ামের পেছন দিকে খুপরি টাইপের কিছু বুথ আছে, ওদিকেও একাধিক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। প্রায়ই দেখা যায়, সখিরা যেটা জোর করে আদায় করল, সেটা তারা এমনিতেই পেতে পারত, যদি চাইত। জেলে এসে যারা বদলে যায়, মানে হোমো হয়ে যায়, তারা সখিদের প্রেমে পড়ে, তবে হয়তো নতুন বলে মুখ ফুটে বলতে পারে না। বললেও লাভ নেই, কারণ সখিরা অনায়াসে পাওয়া জিনিস পছন্দ করে না। তাদের ধর্ষণ করাতেই আনন্দ।

ছোটখাটো দেখতে বলে এবং আত্মবিশ্বাসী মনে হওয়ায়ও, যেদিন উদ্যম জেলখানায় পা দিয়েছে, সেদিন থেকেই সখিদের চোখে পড়ে গেছে। এটা যদি কোনো রূপকথা হতো, আমি তাহলে আপনাকে বলতাম উদ্যম খুব ভালো একটা ফাইট দিয়েছে, সখিরা যত দিন না হার মেনে রেহাই দিয়েছে তাকে। এ রকম কিছু বলতে পারলে সত্যি খুুশি হতাম আমি, কিন্তু তা বলতে পারছি না। জেলখানায় রূপকথার কোনো জায়গা নেই।

উদ্যমকে প্রথমবার ধরেছিল গোসলখানায়, জেলে ঢোকার তিন দিনের মাথায়। সেবার প্রচুর চড়-থাপ্পড় মেরেছে আর সুড়সুড়ি দিয়েছে, যতটুকু বুঝি আর কি আমি। এটা তাদের সাইজ করার ধরন, আসল কাজ করার আগে শিকার কতটুকু দুর্বল বা শক্তিশালী জেনে নেওয়া।

বোগাস হীরা নামে এক প্রকাণ্ডদেহী সখিকে পাল্টা মার দিয়েছে উদ্যম, তার চোখ আর ঠোঁট প্রায় ফাটিয়ে দিয়ে এসেছে—সেই থেকে এতগুলো বছর কোথায় হারিয়ে গেছে কে জানে। সেদিন একজন গার্ড ছাড়িয়ে দিয়েছিল, তা না হলে পরিণতি আরো অনেক খারাপ হতে পারত। তবে বোগাস হীরা কসম খেয়ে বলেছে, উদ্যমকে দেখে নেবে সে। তা সে নিয়েওছিল।

দ্বিতীয়বার লন্ড্রির পেছনে। বহু বছর ধরে ওখানে হামলা হচ্ছে, গার্ডরা জানে, কিন্তু তারা কোনো ব্যবস্থা নেয় না। জায়গাটা প্রায় অন্ধকার, সাবানগোলা পানিতে চারদিক সয়লাব হয়ে থাকে, বাতাসে ব্লিচিং পাউডারের গন্ধ। চারদিকে পাহাড়ের মতো উঁচু হয়ে আছে খালি বস্তা, কাঠের বাক্স, ড্রাম। গার্ডরা ওদিকে যেতে পছন্দ করে না। এই জায়গার সবচেয়ে খারাপ দিক হলো, নড়াচড়া করার যথেষ্ট সুযোগ নেই, আপনি পিছু হটতে পারবেন না। আর এখানেই আপনাকে ধরবে ওরা।

সেদিন বোগাস হীরা ওখানে ছিল না। তবে ওয়াশরুম ফোরম্যান চোদরি ছানা আমাকে বলেছে, হীরার চারজন বন্ধু ছিল। উদ্যম ওদের চোখে হেক্সলাইট ছুড়ে মারার ভয় দেখিয়ে কিছুক্ষণ ওদের দূরে সরিয়ে রাখতে পেরেছিল। কিন্তু পিছু হটার জায়গা পায়নি সে, চেষ্টা করতে গিয়ে হোঁচট খেতে থাকে, আর তাতেই তারা সুযোগ পেয়ে যায় ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার।

আমার ধারণা, গ্যাং রেপ বা পালা করে ধর্ষণ বলতে যা বোঝানো হয়, সেটা প্রজন্মভেদে বদলায় না, একই রকম থাকে। তাকে নিয়ে তা-ই করেছে ওই চার সখি। একটা গিয়ারবক্সের ওপর ঝুঁকতে বাধ্য করেছে তাকে, একজন একটা স্ক্রু ড্রাইভার ধরেছে তার কপালে, তারপর তারা এক এক করে কাজ সেরেছে। একটু ছিঁড়বে, ক্ষত তৈরি হবে, তবে মারাত্মক কিছু না—আমি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি—তার পরও আপনি প্রশ্ন তুলছেন? কিছুক্ষণ রক্তক্ষরণ বন্ধ হবে না। যদি চান আপনাকে কেউ জিজ্ঞেস না করুক যে আপনার পিরিয়ড শুরু হয়েছে কি না, তাহলে কিছু টয়লেট পেপার গুঁজে রাখুন নিজের আন্ডারওয়্যারের পেছনে, যতক্ষণ না রক্ত পড়া বন্ধ হয়।

উদ্যম একা এসবের ভেতর দিয়ে গেছে, সেসব দিনে প্রতিটি বিষয়ে যেভাবে একা তাকে যেতে হয়েছে। সে নিশ্চয়ই সেই উপসংহারে পৌঁছেছে, তার আগে যারা ওই একই উপসংহারে পৌঁছেছিল : সখিদের সঙ্গে মাত্র দুইভাবে চলা যায়, লড়াই করে ধরা দাও, তা না হলে স্রেফ ধরা দাও।

উদ্যম সিদ্ধান্ত নিল লড়বে। লন্ড্রির পেছনের ওই ঘটনার এক সপ্তাহ পর হীরা আর তার দুজন বন্ধু আবার ধরতে এলো তাকে (‘শুনলাম তোমার ফুটো নাকি বড় করা হয়েছে?’ বাঁকা হেসে জিজ্ঞেস করেছে বোগাস হীরা, লোটা বাবুর মুখে শুনেছি আমি)। তিনজনের বিরুদ্ধে একাই নেমে পড়ল সে। বেমক্কা একটা ঘুষি মেরে চান মিয়া নামের একজনের নাক ফাটিয়ে দিল। চান মিয়া দৈত্যের মতো দেখতে এক চাষা, সেময়েকে মারতে মারতে মেরেই ফেলেছে। চান মিয়া এই জেলখানায়ই মারা গেছে, বলতে ভালো লাগছে আমার।

ওদের সঙ্গে পারেনি উদ্যম, এক এক করে তিনজনই যা করার করেছে। ধর্ষণের কাজ শেষ হতে তাকে জোর করে মাটিতে হাঁটু গাড়তে বাধ্য করা হলো। এই কাজটা বোধ হয় খাটো ছিদ্দিক করল, তবে আমি পুরোপুরি নিশ্চিত নই। হেঁটে উদ্যমের সামনে চলে এলো হীরা। তার হাতে মুক্তো বসানো হাতলসহ একটা ক্ষুর। সেটা খুলল সে, তারপর বলল, ‘আমি এখন প্যান্টের চেইন খুলছি, মিস্টার ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং তোমাকে আমি যেটা গিলতে দেব, তুমি সেটা আদর করে গিলবে। আমারটা গেলার পর তুমি চান মিয়ারটাও গিলবে, ঠিক আছে? আমার ধারণা, তুমি ওর নাক ভেঙে দিয়েছ, তার দাম চুকাতে হবে তোমাকে। ’

 

উদ্যম বলল, ‘আমার মুখে তুমি যে জিনিসই ঢোকাও না কেন, ওটা তোমাকে খোয়াতে হবে। ’

উদ্যমের দিকে এমনভাবে তাকাল হীরা, সে যেন একটা পাগল, লোটা বাবুর ভাষ্য।

‘না,’ উদ্যমকে বলল হীরা, কথা বলছে ধীরে ধীরে, উদ্যম যেন বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী শিশু। ‘আমি কী বলেছি তুমি বুঝতে পারোনি। তুমি যদি ও রকম কিছু করো, আমি তাহলে এই আট ইঞ্চি ইস্পাত তোমার কানের ভেতর ঢুকিয়ে দেব। বুঝতে পারছ?’

‘তুমি কী বলেছ, আমি বুঝতে পেরেছি। আমার মনে হয় না আমার কথা তুমি বুঝতে পারছ। আমার মুখে তুমি যা-ই ঢোকাও, আমি সেটা কামড়ে ছিঁড়ে ফেলব। ওই ক্ষুর তুমি আমার মগজেও ঢোকাতে পারো, আন্দাজ করি, কিন্তু তোমার জানা উচিত, আকস্মিক ব্রেইন ইনজুরির শিকার, মানে ভিকটিম, পেশাব-পায়খানা করে ফেলে এবং কামড়ও দিয়ে ফেলে...’

মুখ তুলে হীরার দিকে তাকিয়ে আছে উদ্যম, নিজস্ব প্রতীকচিহ্নের মতো অল্প হাসি মুখে (লোটা বাবুর মনে হয়েছে উদ্যম বিপজ্জনক বা অশ্লীল কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলছিল না, সে যেন শেয়ার কেনাবেচা নিয়ে আলাপ করছিল ওদের সঙ্গে)। সে ঝুঁকে আছে, কোমরের প্যান্ট হাঁটুর কাছে নামানো, ঊরু বেয়ে ক্ষীণ ধারায় রক্ত গড়াচ্ছে, এসব যেন তার মনেই নেই।

‘আসলে,’ আবার বলল সে, ‘ওই রিফ্লেক্স, মানে কামড়ানোটা, মাঝেমধ্যে এত জোরালো হয় যে ভিকটিমের চোয়াল রেঞ্চের সাহায্যে চাড় দিয়ে খুলতে হয়। ’

বহু বছর আগের সেই রাতে উদ্যমের মুখে কিছু ঢোকায়নি হীরা। চান মিয়াও সাহস করেনি কিছু ঢোকাতে। এবং আমি যত দূর জানি, সে চেষ্টা কখনো আর কেউ করেওনি। ওরা তিনজন উদ্যমকে এমন মার মেরেছিল, আর বোধ হয় এক ইঞ্চি দূরে ছিল তার মৃত্যু। ওদের চারজনকেই বেশ কিছুদিন সলিটারিতে কাটাতে হয়েছে। তবে তার আগে উদ্যম আর চান মিয়াকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল।

ওই গ্রুপটা আর কতবার ধরেছে তাকে, সেটা আমার জানা নেই। আমার ধারণা, সবার আগে চান মিয়া আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। ভাঙা নাক খুব অস্বস্তির মধ্যে রাখে মানুষকে, বিশেষ করে এক মাস হাসপাতালে থেকেও পুরোপুরি জোড়া না লাগায়। আর বোগাস হীরা অচল হয়ে পড়েছিল, একেবারে হঠাৎ করেই বলতে হবে।

তার এই ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত। হীরাকে তার সেলে পাওয়া গেছে, প্রচণ্ড মার খেয়ে গোঙাচ্ছে, নড়াচড়া করার শক্তি পর্যন্ত পাচ্ছে না। অথচ আশ্চর্য, কে বা কারা তাকে মেরেছে বলতে পারছে না সে। তার মার খাওয়ার খবরটা জানাজানি হলো নাশতা খাওয়ার সময় তাকে দেখতে না পাওয়ায়। শুধু কয়েদিরা নয়, গার্ডরাও তাকে জেরা করতে লাগল, কিন্তু হীরা কিছুক্ষণ বোবা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল, সে কিছু জানে না, অন্ধকারে দেখতে পায়নি কে বা কারা তাকে মারছে।

আমি আমার একটা ধারণার কথা বলতে পারি। জেলখানায় পয়সা কথা বলে। বেতন খুব বেশি নয়, কাজেই একমুঠো টাকা পেলে একজন গার্ড করতে পারে না এমন কোনো কাজ নেই, শুধু বোমা আর রিভলবার এনে দেওয়া ছাড়া। আর পুরনো কয়েদিরাও পারে, তবে তারা পারে গার্ড তথা পুলিশদের সাহায্য নিয়েই। এখানে আরেকটা কথা মনে রাখা দরকার, আমি যখনকার কথা বলছি তখন ইলেকট্রনিক লকিং সিস্টেম ছিল না, ছিল না ক্লোজড সার্কিট টিভিও। ওই সময় প্রতিটি সেলব্লকের নিজস্ব চাবি ছিল, একজন গার্ড খুব সহজেই ঘুষ খেয়ে ভেতরে ঢুকতে দিতে পারত কাউকে। হয়তো একজনকে নয়, দু-তিনজনকে ঢোকানো হয়েছিল, তা না হলে হীরার শরীর ও রকম ক্ষতবিক্ষত হলো কী করে। হীরাকে সবাই ভয় করে তা ঠিক, কিন্তু ঘুষ খেয়ে গার্ড যদি সব আলো কিছুক্ষণ নিভিয়ে রাখে, তাহলে হীরা দেখতে পাবে না কে বা কারা তাকে মেরে গেল। এটাই তো ঘটেছে। কাজেই যারা মেরেছে তারা জানত তাদের ধরা পড়ার ভয় নেই।

জানা কথা, এ ধরনের একটা কাজ করাতে হলে প্রচুর টাকা লাগবে। চাবির জন্য আলাদা টাকা, আলোর জন্য আলাদা টাকা, হীরা চিৎকার করলেও কেউ তাকে সাহায্য করতে আসবে না, সে জন্য আলাদা টাকা, কাজ সেরে নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য...না, আমি কিন্তু একবারও বলছি না যে কাজটা উদ্যম করিয়েছে। তবে আমি শুধু জানি, এই জেলে পঁচিশ হাজার টাকা নিয়ে ঢুকেছে সে। জানি, সরল দুনিয়ায় সে একজন ব্যাংকার ছিল। টাকার যে কত ক্ষমতা তা আমাদের সবার চেয়ে বেশি জানার কথা তার।

এবং আমি জানি, মার খাওয়ার পর—পাঁজরের তিনটি হাড় ভেঙেছে, একটা চোখ থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে, জায়গা থেকে সরে গেছে নিতম্বের হাড়—উদ্যমকে আর বিরক্ত করে না বোগাস হীরা, শান্তিতে থাকতে দিচ্ছে তাকে। শুধু তা-ই নয়, হীরার মধ্যে একটা পালিয়ে বেড়ানোর ভাবও লক্ষ করলাম আমি। সবাই দেখতে পেল, মার খাওয়ার পর হীরা আর আগের মতো তর্জন-গর্জন করছে না, তারা এখন তাকে ‘দুর্বল সখি’ বলছে।

 

 

 

চার.

 

তারপর একদিন আবার আমার কাছে এসে উদ্যম জিজ্ঞেস করল, আমি তাকে আধডজন রক ব্লাংকেট এনে দিতে পারব কি না।

‘সেটা আবার কী জিনিস?’ জানতে চাইলাম আমি।

উত্তরে উদ্যম বলল, সে একজন রকবাউন্ড এবং রকবাউন্ডরা জিনিসটাকে ওই নামেই ডাকে—ডিশ টাওয়েল সাইজের কাপড়, যে কাপড় দিয়ে পলিশের কাজ করা যায়। খুব মোটা প্যাড লাগানো থাকে, একটা দিক মসৃণ, একটা দিক স্যান্ডপেপারের মতো কর্কশ। মসৃণ দিকটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্টিল উলের মতো (উদ্যমের সেলে এক বাক্স আছে, যদিও সেটা আমার কাছ থেকে সংগ্রহ করেনি সে, সম্ভবত জেলখানার লন্ড্রি থেকে পেয়েছে)।

তাকে বললাম, ব্যবসা হবে বলে মনে করি। যেখান থেকে রক হ্যামার আনিয়েছিলাম, রক ব্লাংকেটও সেখানে পাওয়া গেল। প্যাড লাগানো কাপড়, মোটেও বিপজ্জনক কিছু নয়, কাজেই এবার আমার দশ পার্সেন্ট কমিশন ছাড়া এক পয়সাও বেশি নিইনি তার কাছ থেকে।

 

এর প্রায় পাঁচ মাস পর উদ্যম আমাকে জিজ্ঞেস করল, আমি তার জন্য মধুবালাকে এনে দিতে পারব কি না। তার সঙ্গে আমার এই আলাপটা হচ্ছিল অডিটরিয়ামে, সিনেমা দেখার সময়। হাতে গোনা কয়েকটা ছবি প্রতি মাসে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বারবার দেখানো হয়। আমি ‘কিং কং’ দেখেছি আট কি নয়বার। সেদিন আমরা দিলীপ কুমারের অভিনয় দেখছিলাম, ছবির নামটা এখন আর মনে পড়ছে না। ছবি শুরু হওয়ার বেশ কিছুক্ষণ পর আমার পাশে এসে বসল উদ্যম। ছবি শেষ হতে চলেছে, এই সময় আমার দিকে ঝুঁকে জানতে চাইল, আমি তাকে মধুবালা জোগাড় করে দিতে পারব কি না। আমি আপনাকে সত্যি কথা বলি, ব্যাপারটা আমার বেশ মজা লাগছিল। উদ্যম সাধারণত শান্ত, ঠাণ্ডা, আর চুপচাপ; কিন্তু সেই রাতে তাকে অস্থির লাগছিল আমার এবং খুব বিব্রত মনে হচ্ছিল।

‘হ্যাঁ, পারব, মধুবালা জোগাড় করা যাবে,’ আশ্বস্ত করলাম তাকে। ‘এটা কঠিন কিছু নয়, কাজেই তোমার ঘাবড়ানোর কিছু নেই। কেমন চাও, ছোট না বড় সাইজে?’ ওই সময় মধুবালা আমারও প্রিয় অভিনেত্রী। ফুটপাতে তাঁর দুই রকমের পোস্টার বিক্রি হয়, একটা ছোট, একটা বড়। ছোট পোস্টারের দাম বিশ টাকা, বড় পোস্টারের দাম পঞ্চাশ টাকা। পঞ্চাশ টাকা দিয়ে আপনি বড়সড় মধুবালা পাবেন, চার ফুট লম্বা, পুরোটা নারী।

‘আমার বড় সাইজ চাই,’ বলল সে, আমার দিকে তাকাচ্ছে না। বিশ্বাস করুন, ঘামছিল উদ্যম। ‘পারবে তো?’

‘তুমি শান্ত হও, অবশ্যই পারব, কেন পারব না। ’

‘কত দিনে?’

‘এক সপ্তাহ ধরে রাখো। তার আগেও পেয়ে যেতে পারো। ’

‘ঠিক আছে। ’ কিন্তু তার গলার সুর বলছে সে হতাশ হয়েছে, সে যেন ভেবেছিল চাওয়ামাত্র পোস্টারটা আমি তার হাতে ধরিয়ে দেব। ‘কত?’

‘পঞ্চান্ন টাকা। ’

লোটা বাবুর সঙ্গে কথা বলতে হলো আমাকে। কদিন পর লন্ড্রির এক ড্রাইভার আমার জন্য ষাটটা পোস্টার নিয়ে এলো, বেশির ভাগই মধুবালার।

জেল কর্তৃপক্ষ এই চোরাচালান সম্পর্কে জানে। আমার ব্যবসা সম্পর্কে আমি যতটুকু জানি, তারাও সম্ভবত ততটুকু জানে। এতে তাদের নাক না গলানোর কারণ হলো, তারা জানে জেলখানা আসলে বড়সড় একটা প্রেসার কুকার, কাজেই গরম বাষ্প বেরোনোর জন্য কিছু ফাঁকফোকর থাকতে দিতে হবে। মাঝেমধ্যে তল্লাশি চালায় তারা, ধরপাকড় শুরু হয়, আমাকে তখন দিন কয়েক সলিটারিতে কাটাতে হয়। এটা বছরে দুই কি তিনবার ঘটে, তার বেশি না। তবে জিনিসটা যদি পোস্টার হয়, তারা চোখ মটকায়। বাঁচো আর বাঁচতে দাও।

মধুবালার পোস্টার আমার সেল নম্বর ছয় থেকে রওনা হলো, বয়ে নিয়ে যাচ্ছে লোটা বাবু, সে ডেলিভারি দিল চৌদ্দ নম্বর সেলে ঢুকে সরাসরি উদ্যমের হাতে। লোটা বাবু ফিরে এলো উদ্যমের একটা চিরকুট নিয়ে, তাতে মাত্র একটা শব্দ লেখা হয়েছে : ‘ধন্যবাদ’।

এর খানিক পর, সকালের নাশতা খেতে লাইন দিয়ে বেরোচ্ছি সবাই, উদ্যমের সেলে উঁকি দিতে মধুবালাকে দেখতে পেলাম, মাথার পেছনে হাত দিয়ে শুয়ে আছেন বিছানায়, মুখে মিষ্টি মায়াবী হাসি। ছবিটা এমন জায়গায় রাখা হয়েছে, ইচ্ছে করলে রাতে তাঁকে দেখতে পাবে উদ্যম, শুয়েও, সেল বা করিডরের আলো নিভিয়ে দিলেও; কারণ উঠানের আলো কিছুটা হলেও তার সেলে সরাসরি ঢোকে।

 

 

 

পাঁচ.

 

সেই যে লন্ড্রির পেছনে সখিদের সঙ্গে উদ্যমের নোংরা ঝামেলা শুরু হয়েছিল, তিন বছর পর একটা ঘটনার মধ্য দিয়ে অবশেষে মিটল সেটা। এই ঘটনা তার লন্ড্রি থেকে বেরিয়ে আসারও সুযোগ তৈরি করল, যেখানে হাড়ভাঙা শ্রম দিতে হচ্ছিল তাকে।

আপনারা হয়তো লক্ষ করেছেন, এখন পর্যন্ত আমি যা বলেছি সবই কারো না কারো কাছ থেকে শোনা—কেউ একজন কিছু দেখে আমাকে বলেছে, আমি সেটা আপনাকে জানিয়েছি। বলতে গিয়ে অনেক কিছুই আমি বেশি সহজ করে ফেলেছি, আবার কোনো ঘটনা হয়তো পাঁচ-সাত হাত ঘুরে আসায় পুনরাবৃত্তি করা হয়ে গেছে, এবং পরেও হয়তো হবে। এখানের এটাই ধরন। একগাদা মিথ্যে আর গুজবের মধ্য থেকে একটুকরো সত্য বের করে আনা সহজ কাজ নয়।

আপনি সম্ভবত এটাও আইডিয়া করতে পেরেছেন যে আমি যে ব্যক্তির বর্ণনা দিতে বসেছি সে যতটা না একজন পুরুষ, তার চেয়ে বেশি একটা কিংবদন্তি। আমি আপনার সঙ্গে একমত হয়ে বলতে চাই, এর মধ্যে কিছু সত্যতা আছে। আমরা যারা দীর্ঘ মেয়াদে সাজা ভোগ করছি, যারা উদ্যমকে বহু বছর ধরে চিনি, সবাই টের পাই ফ্যান্টাসির কিছু উপাদান ঘিরে রাখে তাকে, যেন মিথ আর ম্যাজিকে মোড়া একজন রহস্যময় মানুষ—যদি ধরতে পেরে থাকেন ঠিক কী বলতে চাইছি আমি। যে গল্পটা এখন আমি বলতে যাচ্ছি তাতে দেখা যাবে, বোগাস হীরাকে বড় পদে কাজ পেতে দেয়নি উদ্যম, সেটা ওই মিথের অংশ এবং টানা তিনটি বছর কিভাবে সে সখিদের সঙ্গে একা লড়ে গেছে, তা-ও ওই মিথ তৈরি হতে কাজে লেগেছে, সেই মিথেরই অংশ লাইব্রেরিতে তার কাজ পাওয়া। তবে এসব ঘটনার সঙ্গে এর আগে বলা গল্পের পার্থক্য আছে; কারণ আগের গল্পগুলো ছিল লোকমুখে শোনা, আর পরের ঘটনা যা কিছু যখন ঘটেছে আমার উপস্থিতিতে ঘটেছে এবং আমি আমার জন্মদাত্রী মায়ের কসম খেয়ে বলছি, এগুলো সবই সত্যি ঘটনা। আপনারা হয়তো ভাবছেন, খুনের অপরাধে সাজা পাওয়া একজন কয়েদির কসমের কী আর দাম। তবু এটা বিশ্বাস করতে বলি, আমি মিথ্যে বলি না।

তত দিনে উদ্যমের সঙ্গে বেশ ভালোই সম্পর্ক তৈরি হয়েছে আমার, প্রায়ই দেখা হয়, আর দেখা হলে আমরা কথা বলি। এই লোক আমাকে অবাক করে। পেছনের দিকে ফিরে গেলে সেই পোস্টার প্রসঙ্গে একটা কথা মনে পড়ে, অবহেলার কারণে আপনাকে জানানো হয়নি। এখন মনে হচ্ছে জানানো দরকার। মধুবালাকে সেলের দেয়ালে লটকানোর পাঁচ সপ্তাহ পর (তত দিনে ওটার কথা ভুলে গেছি আমি, নতুন আরো অনেক ব্যবসার কাজে ব্যস্ত হয়ে ওঠার কারণে), লোটা বাবু ছোট সাদা একটা বাক্স গ্রিলের ফাঁক দিয়ে আমার সেলে ঢুকিয়ে দিল।

‘উদ্যম পাঠিয়েছেন,’ নিচু গলায় বলল সে, মেঝে মোছার কাজে একপলক বিরতি না দিয়ে।

‘ধন্যবাদ লোটা,’ বলে আমি তার হাতে এক প্যাকেট বগা ধরিয়ে দিলাম।

ভাবছি কী জিনিস হতে পারে ওটা। বাক্স খুলে আবরণ সরালাম। প্রচুর তুলো দেখতে পাচ্ছি, তার নিচে...

অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম সেদিকে। কয়েক মিনিট পার হয়ে গেল, ওগুলো আমার ছুঁয়ে দেখার সাহস হলো না, এতই সুন্দর। জেলে সুন্দর জিনিসের প্রচণ্ড অভাব এবং এটা সত্যি করুণা জাগার মতো একটা বাস্তবতা যে এখানে সুন্দর জিনিস যে নেই সেটা কেউ খেয়ালও করে না, সৌন্দর্যের অনুপস্থিতি ওদের সৌন্দর্যের অস্তিত্বের কথাই ভুলিয়ে দিয়েছে।

বাক্সে দুই টুকরো কোয়ার্টজ রয়েছে, দুটোই খুব সতর্কতার সঙ্গে পলিশ করা। পানিতে ভেসে আসা কাঠের আকৃতি ওগুলোর, লোহা থাকায় সোনার কণার মতো চকচক করছে। এত বেশি ভারী না হলে পুরুষের    কাফলিংক হিসেবে ব্যবহার করা যেত, আকৃতির দিক থেকে দুটোর মধ্যে এত মিল।

এগুলো তৈরি করতে কতটা খাটতে হয়েছে তাকে? আলো নিভে যাওয়ার আগে নয়, পরে, এটা আমার জানা আছে এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় দিতে হয়েছে। প্রথমে কেটে সাইজ করা, তারপর ওই রক ব্লাংকেট দিয়ে পলিশের পর পলিশ, তা যেন আর শেষ হতে চায় না। এত কষ্ট করে বানানো এ রকম সুন্দর একটা জিনিস কাউকে উপহার দেওয়া, এর অনেক মূল্য। মানুষ এটা পারে বলেই পশুদের সঙ্গে সে আলাদা। আমি আরো একটা কারণে বিহ্বল হয়ে পড়লাম, ওই লোকের নিষ্ঠা বা লেগে থাকার ধরন অনুধাবন করে, সেটা নিজের ওপর প্রায় অত্যাচারের মতো। তবে উদ্যম হাসান ঠিক কতটা লেগে থাকতে পারে সে সম্পর্কে আমার পরিষ্কার ধারণা হলো আরো অনেক পরে।

সিদ্ধান্ত হলো, সাইনবোর্ড তৈরির কারখানার ছাদে আলকাতরা লাগাতে হবে। রোদ তেতে ওঠার আগেই কাজটা শেষ করার কথা বলা হলো। ধারণা করা হয়েছে, সব মিলিয়ে সাত দিন লাগবে এবং সবাইকে ডেকে বলা হলো, যারা স্বেচ্ছাসেবক হতে চাও তারা হাত তোলো।

সত্তরজন লোক শুধু হাত তুলল না, রীতিমতো হৈচৈ বাধিয়ে দিল। এর কারণ হলো কাজটা চার দেয়ালের বাইরে, আর মে মাসটা বাইরে কাজ করার জন্য খুব ভালো। কাগজের টুকরোতে সবার নাম লিখে নয় কি দশজনকে নেওয়ার জন্য লটারি করা হলো, ভাগ্যক্রমে উদ্যম আর আমার নাম উঠে এলো।

পরের সপ্তাহ থেকে শুরু হলো কাজ। সকালের নাশতা শেষ হলে মার্চ করে উঠানে জড়ো হই আমরা। আমাদের সামনে-পেছনে দুজন করে গার্ড থাকে, আর টাওয়ারের গার্ডরা তো চোখে ফিল্ডগ্লাস সেঁটে সারাক্ষণই নজর রাখছে। সকালের মার্চে আমরা চারজন একটা এক্সটেনশন মই বয়ে নিয়ে যাই। ওটা একটা নিচু দালানের গায়ে খাড়া করা হয়। তারপর আমরা বালতি করে গরম আগুন আলকাতরা ছাদে তুলি। ওটা আপনার গায়ে একটু লাগলে হয় শুধু, সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে।

এই প্রজেক্টে ছয়জন গার্ড ডিউটি দিচ্ছে, বাছাই করে শুধু যারা সিনিয়র কয়েদি তাদের নেওয়া হয়েছে। তাদের কাছে গোটা ব্যাপারটা প্রায় এক সপ্তাহ ছুটি কাটানোর মতো। লন্ড্রিতে পাহারায় দাঁড়িয়ে ঘাম ঝরানো বা কারখানায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোহা পেটানোর শব্দ সহ্য করার চেয়ে হাজার গুণ ভালো এটা।

এখানে ওরা অলস সময় কাটাচ্ছে, কখনো বল খেলছে, কখনো গাছের গায়ে হেলান দিয়ে ঝিমাচ্ছে। আমাদের ওপর খুব একটা নজর রাখার দরকার পড়ে না তাদের, কারণ দক্ষিণ পাঁচিলে বসানো সেন্ট্রি পোস্ট এত কাছে, চাইলে মুখের চিবানো ছিবড়ে আমাদের গায়ে ছুড়ে দিতে পারে ওরা। যারা ছাদ সিল করছে তাদের কাউকে যদি উদ্ভট ধরনের নড়াচড়া করতে দেখা যায়, তাকে এক জোড়া পয়েন্ট ফর্টিফাইভ ক্যালিবারের মেশিনগানের ঝাঁক ঝাঁক বুলেট দিয়ে ছিন্নভিন্ন করতে সময় লাগবে মাত্র চার সেকেন্ড। কাজেই গার্ড যারা ডিউটি দিচ্ছে, দিব্যি খোশমেজাজে আছে তারা, ছুটির আমেজ উপভোগ করছে। এখন ওদের দরকার শুধু বরফে ঢুকিয়ে রাখা গোটা ছয়েক সোডা ওয়াটারের বোতল, তাহলেই সৃষ্টিজগতের সবচেয়ে সুখী প্রাণী বলে মনে করবে নিজেদের।

ওদের একজনের নাম দবির খান। এই জেলে আমার চেয়ে আগে থেকে আছে। আর আছে খুঁতখুঁতে স্বভাবের মুক্তার আলী। কিছুদিন আগেও ওয়ার্ডেনের দায়িত্ব পালন করার সুবাদে এই মুক্তার আলীই কাঠফাটায় সবার ওপর ছড়ি ঘোরাচ্ছিল। পেনাল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ওপর তার একটা ডিগ্রি আছে। কেউ তাকে পছন্দ করে না, আমি যতটুকু বুঝতে পারি, শুধু যারা তাকে এই পদে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছে তারা বাদে। এই জেলখানার কোনো বিষয়ে তার কোনো আগ্রহ নেই, সে শুধু কিছু তথ্য জড়ো করতে চায়, যেগুলোর সাহায্যে একটা বই লিখবে এবং সেটা ছাপবে আমেরিকার না ইংল্যান্ডের কোনো প্রকাশক, তবে ছাপা বাবদ সব খরচ মুক্তার আলীকেই বহন করতে হবে। ভালো ফুটবল খেলে সে। জেলের প্রশাসনিক শাখায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করত, সেটা হারায় গাড়ি মেরামত বাবদ যে বিল তৈরি করা হয়েছে তাতে ডিসকাউন্টের মাত্রা অনেক বেশি হওয়ায়। তদন্তে বেরিয়ে আসে, ওখান থেকে চুরি করা টাকা ধীমান চট্টো আর দবির খানের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিয়েছে সে। দবির আর ধীমান নিজেদের গা বাঁচাতে পেরেছে—তারা পুরনো পাপী, আগে থেকে সতর্ক ছিল—ছেঁকাটা একা মুক্তারকে খেতে হয়। তাকে সরে যেতে দেখে কেউ দুঃখ পায়নি, তবে তার জায়গায় ধীমান চট্টোকে উঠে আসতে দেখেও খুশি হয়নি কেউ।

ধীমান ছোটখাটো লোক, পেট শক্ত লোহা বললেই হয়, আর তার মতো ঠাণ্ডা চোখ দেশে আর কারো আছে কি না সন্দেহ। তার মুখে সব সময় কষ্টের একটু হাসি লেগে থাকে, যেন এই মুহূর্তে তার একবার বাথরুমে যাওয়া দরকার, কিন্তু তা সে যেতে পারছে না। ওয়ার্ডেন হিসেবে ধীমান দায়িত্ব নেওয়ার পর কাঠফাটায় অনেক নিষ্ঠুর ঘটনা ঘটেছে, যদিও আমার কাছে কোনো প্রমাণ নেই, তার পরও বিশ্বাস করি, জোছনা রাতে জেলখানার পুব পাশের বনভূমিতে অন্তত আধডজন কবর দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। মুক্তার আলী খারাপ ওয়ার্ডেন ছিল, কিন্তু ধীমান ছিল নির্দয় একটা বর্বর।

ধীমান আর দবির ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ওয়ার্ডেন হিসেবে মুক্তার আলী শুধু পদের অধিকারী ছিল, তার সব কাজ করে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছিল ধীমান, ধীমানের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে বেশির ভাগ কাজ করে দিত দবির। বলতে গেলে এই দবিরই জেলখানা চালাত।

দবির বেশ লম্বা, নড়াচড়ায় আড়ষ্ট ভাব, মাথার চুল কমে এসেছে। লোকটা চড়া গলায় কথা বলে, তার নির্দেশে আপনি যদি দ্রুত সাড়া না দেন, হাতের ছড়ি দিয়ে আপনাকে আঘাত করবে। সেদিন, ছাদে আমাদের তৃতীয় দিন চলছে, দবির আরেক গার্ড আবুল কাদেরের সঙ্গে কথা বলছিল।

দবির খানের কাছে অবাক করার মতো একটা ভালো খবর আছে, কাজেই সেটা সে শক্ত পাহারা দিয়ে রেখেছে। এটাই তার স্টাইল। এই লোক কাউকে ধন্যবাদ দিতে জানে না, জীবনে বোধ হয় কাউকে কখনো একটা ভালো কথা বলেনি, এমন একজন লোক, যে নিজেকে বিশ্বাস করিয়েছে, গোটা দুনিয়ার লোকজন তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।

ওখানে বসে চড়া গলায় একটু একটু করে গল্পটা আবুল কাদেরকে শোনাচ্ছে দবির, আমরাও সেটা শুনছি; তার চওড়া সাদা কপাল ইতিমধ্যেই রোদ লেগে লালচে হয়ে উঠেছে। তার একটা হাত নিচু পাঁচিলের ওপর পড়ে আছে, ছাদের কিনারা বরাবর তৈরি করা হয়েছে ওই পাঁচিল। তার আরেক হাত পয়েন্ট থার্টিএইট রিভলবারের বাঁটে।

দবির খানের গল্পটা হলো, তার বড় ভাই কমবেশি চৌদ্দ বছর আগে লাপাত্তা হয়ে গিয়েছিল, সেই থেকে পরিবারের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ ছিল না। সবাই ধরে নিয়েছিল মারা গেছে সে এবং সবাই খুশি মনে ব্যাপারটা মেনেও নিয়েছিল। তারপর, এই দিন দশেক আগে, রাজশাহী থেকে এক উকিল ফোন করেছেন। এখন জানা যাচ্ছে, দবির খানের ভাই মারা গেছে মাত্র চার মাস আগে এবং সে মারা গেছে প্রচুর ধন-সম্পত্তি রেখে। লোকটা নদীতে ডোবা লঞ্চ-স্টিমার তোলার ব্যবসা করত, তার রেখে যাওয়া সম্পত্তির মূল্য আন্দাজ করা হয়েছে তিন কোটি টাকা।

না, দবির খান কোটিপতি হয়ে যায়নি; তাহলে এমনকি তার মতো মানুষও খুশি হতো, কিছু সময়ের জন্য হলেও, কিন্তু তার ভাই সব টাকা তাদের দিয়ে যায়নি, দিয়েছে মাথাপিছু বিশ লাখ করে, বাদবাকি সব এতিমখানা আর মসজিদে দান করে গেছে। মন্দ কি। বিশ লাখই কে কাকে দেয় বা কোত্থেকে আসে।

কিন্তু দবির খানের কাছে গ্লাস সব সময় অর্ধেক খালি। তার খুব ইচ্ছে একটা গাড়ি কিনবে। ‘কিন্তু কিভাবে কিনব, ট্যাক্স দিতেই তো ফকির হয়ে যেতে হবে আমাকে। তারপর আছে মেরামত আর রক্ষণাবেক্ষণের খরচ। বাচ্চারা আবদার ধরবে, টপ খোলা অবস্থায় আমাদের বেড়াতে নিয়ে চলো...’

‘একটু বড় হলে ওরা নিজেরা চালাতে চাইবে,’ বলল কাদের, সে জানে কিভাবে তেল মারতে হয়।

‘শুধু চালাতে চাইবে?’ মাথা নাড়তে লাগল দবির। ‘বলবে টাকা দাও, গাড়ি চালানো শিখে আসি। ’ শিউরে উঠল সে। ‘বছর শেষে কী দাঁড়াবে? দেখা যাবে জমা টাকা সব শেষ, ট্যাক্সের টাকা পকেট থেকে দিতে হচ্ছে। তারপর আসবে ইনকাম ট্যাক্সওয়ালারা। মাথায় একেবারে বাজ ফেলে দেবে না!’

মুখ বেজার করে বসে থাকল দবির, ভাবছে বিশ লাখ টাকা পাওয়ায় কপালটা তার কিভাবে ফেটেছে। পনেরো ফুট দূরেও নয়, বড়সড় একটা ব্রাশ দিয়ে ছাদে আলকাতরা লাগাচ্ছে উদ্যম হাসান। সেটা ছুড়ে বালতিতে ফেলল সে, তারপর হেঁটে এলো যেখানে দবির আর কাদের বসে রয়েছে।

আমরা সবাই শক্ত হয়ে গেলাম। দেখলাম গার্ডদের একজন, তার নাম গিয়াস দীন, হাতটা টেনে হোলস্টারে ভরা পিস্তলের কাছে নিয়ে গেল। সেন্ট্রি টাওয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডদের মধ্যে একজন তার সঙ্গীর হাতে খোঁচা মারল, তারপর দুজনেই ঘুরে এদিকে তাকাল। মুহূর্তের জন্য আমার মনে হলো উদ্যম গুলি খেতে যাচ্ছে, কিংবা ওর মাথায় লাঠি (ব্যাটন) ভাঙা হবে।

তারপর তাকে বলতে শুনলাম, খুবই নরম সুরে, দবির খানের দিকে তাকিয়ে, ‘তুমি তোমার স্ত্রীকে বিশ্বাস করো?’

দবির স্রেফ তার দিকে তাকিয়ে থাকল। সবাই দেখতে পাচ্ছে তার মুখ ধীরে ধীরে লাল হয়ে উঠছে এবং আমি জানি এটা খুব খারাপ লক্ষণ। খুব বেশি হলে আর তিন সেকেন্ডের মধ্যে সে তার ব্যাটন টেনে নিয়ে সরাসরি উদ্যমের সোলার প্লেক্সাসে আঘাত করবে, যেখানে স্নায়ুর বড় থোকাটা আছে। ওখানে খুব জোরে লাগলে মানুষ মারা যাবে, অথচ সব সময় ওখানেই মারে তারা। ওই আঘাতে আপনি যদি মারা না যান, এত লম্বা সময়ের জন্য পঙ্গু হবেন যে মনে থাকবে না কী চমকপ্রদ চাল দেওয়ার কথা আপনি ভেবেছিলেন।

‘বাপ,’ দবির খান বলল, ‘তোমাকে আমি স্রেফ একটা সুযোগ দিচ্ছি, হাড়-মাংস যা-ই থাক নিয়ে কেটে পড়ো। তারপর কিন্তু এই ছাদ থেকে মাথা নিয়ে নামতে হবে তোমাকে। ’

উদ্যম তার দিকে তাকিয়ে থাকল, একেবারে শান্ত আর স্থির। তার চোখ দেখলাম বরফ। ভাব দেখে মনে হলো, দবিরের কথা শুনতে পায়নি। আমার দেখলাম তাকে বলতে ইচ্ছে করছে এই পরিস্থিতির কী অর্থ, তার আসলে কী করা উচিত ছিল। উচিত ছিল গার্ডদের জানতে না দেওয়া তারা কী বলছে তুমি তা শুনছ এবং তাদের আলাপের মাঝখানে কখনো ঢুকে পড়তে নেই, যদি না তারা তোমাকে ঢুকতে বলে (এবং তখনো তুমি তাদের এমন সব কথা বলবে, যেগুলো তারা শুনতে চায় এবং তারপর আবার বোবা হয়ে যেতে হবে)। আমি উদ্যমকে বলতে চাইলাম, এখানে এদের হাতে খুন হওয়া ডালভাত। বলতে চাইলাম, এর চেয়ে অনেক কম বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে লোকজনকে আমি নুনু হারাতে দেখেছি, হারাতে দেখেছি আঙুল বা কান, এমনকি জানও। আমার তাকে বলতে ইচ্ছে হলো, তোমার বেলায় অনেক দেরি হয়ে গেছে হে। এখন সে ফিরে গিয়ে ব্রাশটা তুলে নিতে পারে, বলা যায় না তাতে হয়তো এ যাত্রায় তার প্রাণটা রক্ষা পেলেও পেতে পারে, তবে আজ হোক কাল হোক গোসলখানায় সখিরা তোমার জন্য অপেক্ষায় থাকবে, পালা করে তোমার ওপর চড়বে তারা, সব শেষে পাকা চত্বরে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে রেখে যাবে। তাকে আমার বলতে ইচ্ছে করল, যতটুকু খারাপ হওয়ার হয়েছে, এর চেয়ে খারাপের দিকে যেন না নিয়ে যায়।

আমি যা করলাম তা হলো ছাদে যেমন আলকাতরা লাগাচ্ছিলাম তেমনি লাগাতে থাকলাম, যেন কোথাও কিছু ঘটেনি বা ঘটছে না। বাকি সবার মতো আমিও প্রথমে নিজের স্বার্থ দেখছি। সেটাই আমাকে দেখতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই।

উদ্যমকে বলতে শুনলাম, ‘হতে পারে আমার বলার মধ্যে ভুল আছে। স্ত্রীকে তুমি বিশ্বাস করো বা না করো, সেটা কোনো ব্যাপার নয়। ব্যাপার হলো তোমাকে সে পেছন থেকে ল্যাং মারার চেষ্টা করবে বলে সন্দেহ করো কি না। ’

দবির দাঁড়াল। কাদের দাঁড়াল। গিয়াস দাঁড়াল। দবিরের চেহারা এখন কালচে লাল। ‘তোমার একমাত্র সমস্যা,’ বলল সে, ‘এটা জানা যে কটা হাড় ভাঙেনি। সেটা তুমি গুনবে হাসপাতালে শুয়ে। এসো, কাদের। এই গুখেকোকে আমরা নিচে ফেলে দিই। ’

গিয়াস দীন তার পিস্তল বের করল। বাকি আমরা সবাই চোখে পাগলা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছি। গায়ে কামড় দিচ্ছে রোদ। সন্দেহ নেই কাজটা করতে যাচ্ছে ওরা। দবির আর কাদের স্রেফ ছাদ থেকে ফেলে দেবে উদ্যমকে। মারাত্মক দুর্ঘটনা। উদ্যম, ৩৩৪১৮—কাঠফাটা, দুটো খালি বালতি নিয়ে মই বেয়ে নিচে নামার সময় পা পিছলে পড়ে মারা গেছে। দুঃখজনক।

তাকে ধরল ওরা, কাদের খামচে ধরল তার ডান হাত, দবির বাঁ হাত কবজা করল। উদ্যম বাধা দিল না। তার চোখ ঘোড়ামুখো দবিরের ওপর থেকে একবারও সরছে না।

‘তাকে যদি তুমি নিজের আঙুল দিয়ে দাবিয়ে রাখতে পারো, দবির মিয়া, তাহলে,’ আবার মুখ খুলল সে, একই শান্ত ও সংযত গলায় বলল, ‘ওই টাকার প্রতিটি পয়সা তাকে না দেওয়ার আমি তো কোনো কারণ দেখি না। চূড়ান্ত ফলাফল, দবির খানের বিশ লাখ বিশ লাখই থাকবে, সরকার শুধু চেয়ে চেয়ে দেখবে আর ঢেকুর তুলবে। ’

কাদের তাকে টানতে টানতে ছাদের কিনারায় নিয়ে যাচ্ছে। দবির স্রেফ অটল দাঁড়িয়ে। একসময় মনে হলো উদ্যম একটা রশি, তাকে দুদিক থেকে টানাটানি করছে ওরা। তারপর দবির বলল, ‘এক সেকেন্ড থামো, আবুল। কী বলতে চাও তুমি, বাপ?’

‘আমি বলতে চাইছি, তোমার যদি স্ত্রীর ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে, ওই টাকাটা সব তুমি তাকে দিয়ে ফেলতে পারো,’ বলল উদ্যম।

‘তোমার কথার অর্থ থাকতে হবে, বাপ, তা না হলে তোমাকে আমরা নিচে ফেলে দেব। ’

‘সরকার নতুন আইন করেছে, স্বামী তার স্ত্রীকে একবার এককালীন উপহার হিসেবে টাকা দিতে পারবে,’ বলল উদ্যম। ‘যেকোনো স্বামী তার স্ত্রীকে চল্লিশ লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে পারবে। ’

দবির খান প্রায় হাঁ করে তাকিয়ে আছে উদ্যমের দিকে। ‘না, এটা ঠিক নয়,’ বলল সে। ‘ট্যাক্স ফ্রি?’

‘ট্যাক্স ফ্রি,’ বলল উদ্যম। ‘ইনকাম ট্যাক্স ওই টাকার একটা পয়সাও নিতে পারবে না। ’

‘এ রকম একটা বিষয় তুমি জানলে কিভাবে?’

গিয়াস বলল, ‘ব্যাংকার আছিল, দবির। আমার মনে হইতাছে হালার পুত...’

‘অ্যাই পুঁটির বাচ্চা, তুই তর ফুটা বন্ধ কর,’ তার দিকে না তাকিয়ে ধমক দিল দবির খান। ধমক খেয়ে মুখ হাঁড়ি করল গিয়াস, তবে আর কিছু বলল না। দবির একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে উদ্যমের দিকে। ‘তুমি বাপ সেই স্মার্ট ব্যাংকার, নিজের বউকে খুন করেছ। তোমার মতো একজন স্মার্ট ব্যাংকারকে আমি বিশ্বাস করব কেন? শেষ পর্যন্ত আমিও তোমার মতো এখানে বসে পাথর ভাঙব নাকি? কাজটা তুমি খুব ভালোবাসো, তাই না?’

‘ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ায় এ দেশে কারো জেল হয়েছে বলে আমার জানা নেই,’ বলল উদ্যম। ‘আর ট্যাক্স তোমরা ফাঁকি দিচ্ছও না। সরকার বলেছে স্ত্রীকে গিফট দিলে ট্যাক্স দেওয়া লাগবে না। ’

‘আমার ধারণা তুমি মিথ্যে কথা বলছ,’ বলল দবির, তবে নিজেও কথাটা এখন বিশ্বাস করছে না।

‘না, আমি মিথ্যে কিছু বলছি না। আমার মুখের কথা তোমাকে বিশ্বাস করতে হবেও না। ইনকাম ট্যাক্সের একজন উকিলকে ধরো, তিনি সব বুঝিয়ে দেবেন। ’

‘ওরা তো শুনেছি ডাকাতের চেয়েও খারাপ,’ মাথা নাড়ছে দবির।

উদ্যম কাঁধ ঝাঁকাল। ‘তাহলে কর অফিসে যাও, ওরা সব বুঝিয়ে দেবে। নিজে বোঝো, কারো কথা বিশ্বাস করার দরকার নেই। ’

‘কর অফিসে যেতে ভয় করে...’

‘কাজটা আমিও করে দিতে পারি, ফি প্রায় না দিলেও চলবে,’ বলল উদ্যম। ‘আমার সহকর্মীদের একটা করে সোডা ওয়াটার খাওয়ালে...’

‘হি হি হি, সহক্রিমি,’ বলল গিয়াস, সশব্দে চাপড় মারল নিজের হাঁটুতে।

‘তুই ব্যাটা পুঁটিকা বাচ্চা, চুপ যা কইলাম,’ দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বলল দবির খান। গিয়াস চুপ মেরে গেল। দবির আবার উদ্যমের দিকে তাকাল। ‘তুমি বাপ বলছ আমার এই সমস্যার সুন্দর একটা সমাধান করে দেবে? তা তুমি সত্যি সত্যি পারবে?’

‘এটা আমার জন্য কোনো সমস্যা না,’ বলল উদ্যম।

সেদিন ওখানে আর যারা উপস্থিত ছিল তাদের সবার সঙ্গে কথা বলেছি আমি—রনো টিপরা, কাজী লিয়াকত, ধীরেন পাল—আমি যা ভেবেছি, তারাও তা-ই ভেবেছে। এবং আমরা দেখলাম উদ্যমের কথাই শুনছে সবাই, তাকে গুরু মেনে নিয়েছে এই জেলখানার কঠিনতম সব পাত্ররা।

‘সোডা ওয়াটার না, আমার যদি ইচ্ছা হয় আমি তোমাকে দুই বোতল বিয়ার খাওয়াব,’ ভারী গলায় বলল দবির খান।

‘আর আমি তোমাকে একটুকরো দামি পরামর্শ দেব—টাকাটা বউকে গিফট দাও, সত্যি যদি তার ওপর তোমার আস্থা থাকে, যদি জানো যে সে তোমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। ’

‘বিশ্বাসঘাতকতা?’ কর্কশ গলায় বলল দবির খান। ‘আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে? তাকে যদি একটা বটগাছ চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে হয়, তার পরও আমার অনুমতি ছাড়া দূষিত বাতাস ছাড়তে সাহস হবে না তার। ’

দবিরের দুই সঙ্গী মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে হাসছে।

কিন্তু উদ্যমের মুখে হাসি নেই। ‘ব্যাংকে লোক পাঠিয়ে ফরমটা আনিয়ে দাও, আমি সেটা পূরণ করে দেব,’ বলল সে। ‘তারপর তোমার সই লাগিয়ে ওই ব্যাংকেই জমা দিয়ে আসতে হবে। ’

কথাটা শুনতে খুব গুরুত্বপূর্ণ লাগল, দবির খানের বুক ফুলে উঠতে দেখলাম আমরা। তারপর পালা করে সবার দিকে তাকাল সে, হুংকার ছেড়ে বলল, ‘তুমরা ইদিক তাকায়া কী দেখতাছ? পাছা ঘুরাও, হালারা!’ ব্যক্তিভেদে তার ভাষা বদলে যাচ্ছে। আবার উদ্যমের দিকে তাকাল। ‘তুমি বাপ আমার কাছে সরে এসো, তারপর ভালো করে শোনো আমি কী বলি। তুমি যদি কোনোভাবে আমাকে বোকা বানিয়ে থাকো, এক সপ্তাহও পার হবে না, তোমার মাথাটা গোসলখানার পাকা চত্বরে গড়াগড়ি খাবে—বুঝেছ তো?’

‘হ্যাঁ, বুঝেছি,’ বলল উদ্যম।

হ্যাঁ, তা সে বুঝেছিল। জিনিসটা যেভাবে পরিণতি পেল, উপলব্ধি করলাম আমার চেয়ে অনেক বেশি বুঝেছে উদ্যম—আমাদের যে কারো চেয়ে বেশি।

এভাবেই ফ্যাক্টরির ছাদে, আলকাতরা লাগানোর কাজ শেষ হওয়ার দুই দিন আগে, সাজা পাওয়া কয়েদিরা সকাল দশটার রোদে লাইন দিয়ে বসে বিয়ার খেয়েছিল। তবে উদ্যম খায়নি। আমি আগেই তার মদ খাওয়ার অভ্যাস সম্পর্কে জানিয়েছি আপনাকে। শেডের ছায়ায় বসেছিল সে, দুই হাঁটুর মাঝখানে ঝুলে আছে হাত, আমাদের দেখছে আর একটু একটু হাসছে। ভাবতে আশ্চর্য লাগে, কত লোক ওই ভঙ্গিতে মনে রেখেছে তাকে।

সেই থেকে উদ্যমকে আর বিরক্ত করেনি সখিরা। দবির আর ধীমান নির্দেশটা জায়গামতো পৌঁছে দিয়েছিল। এর পর থেকে উদ্যমের আন্ডারওয়্যারে যদি এক ফোঁটা রক্তও দেখা যায়, কাঠফাটার প্রত্যেক সখিকে প্রচণ্ড মাথাব্যথা নিয়ে শুতে যেতে হবে। এই নির্দেশ আর হুমকি নিয়ে কেউ তর্ক করতে যায়নি। আগেই বলেছি, ওদের শিকারের কোনো অভাব হয় না, প্রায় প্রতিদিনই নতুন কয়েদি ঢুকছে কাঠফাটায়। যা হোক, এর পর থেকে উদ্যম নিজের পথে থাকল, সখিরা থাকল তাদের   আলাদা পথে।

উদ্যম তখন লাইব্রেরিতে নতুন কাজ নিয়েছে, পুরনো কয়েদি কঠিন পাত্র সমিরুল হকের অধীনে। কলেজে পড়াশোনা করেছে হক, তাই লাইব্রেরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তাকে। হক এই দায়িত্ব ত্রিশ বছর ধরে পালন করে আসছিল। তার ডিগ্রি ছিল পশুপালন বিষয়ে এবং যতই হাস্যকর শোনাক কাঠফাটায় তখন সেই ছিল সবচেয়ে শিক্ষিত কয়েদি, তাই তাকেই লাইব্রেরিয়ান বানানো হয়েছিল। জুয়া খেলায় হেরে যাওয়ার পর স্ত্রী আর কন্যা তাকে যাচ্ছেতাই বলে গালাগাল করায় রাগের মাথায় তাদের খুন করে ফেলেছিল হক।

আটষট্টি বছর বয়সে ঢোলা প্যান্ট আর কালো কোট পরা সমিরুল হক যখন বাতে আক্রান্ত পা নিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে কাঠফাটার গেট দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল, এক হাতে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক দণ্ড মওকুফের কাগজ, আরেক হাতে বাসের টিকিট, ঝরঝর করে চোখের পানি ফেলছিল সে। একুশ বছর বয়স থেকে কাঠফাটা ছিল তার জীবন এবং জগৎ। জেলখানায় হকের একটা গুরুত্ব ছিল। সে ছিল হেড লাইব্রেরিয়ান। জেলের বাইরে? ওখানে তার কিছুই নেই—না কাজ, না মাথা গোঁজার ঠাঁই, না খাবার, না কোথাও যাওয়ার ঠিকানা। তাকে আসলে তার জেলায় ফেরার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তারপর তার কী হবে তা নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। এই অবস্থায় হক ছয় মাসও বাঁচে কি না সন্দেহ।

তারপর একদিন ওই কাছাকাছি সময়েই খবর পেলাম, ট্রেনে কাটা পড়েছে সে। সেই থেকে কাঠফাটায় আমরা কজন সুর করে গাইতাম—যার কেউ নেই তার ট্রেন আছে। কী নির্মম সত্য, তাই না?

 

হকের জায়গায় উদ্যম হেড লাইব্রেরিয়ান হলো, ওই পদে তেইশ বছর ছিল সে। তার আমলে পুঁথি, লোকগীতি, কবিতা আর উপন্যাস সংগ্রহ করা হয়েছে লাইব্রেরির জন্য। আমাদের আমলে বেশ অনেক শিক্ষিত লোকজনকে কয়েদি হিসেবে পেয়েছি আমরা। তাদের বেশির ভাগই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাদের জন্য রিডার ডাইজেস্ট আর ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকস সংগ্রহ করেছে উদ্যম।

লাইব্রেরিতে বসে ব্যাংক সম্পর্কে নিজের বিদ্যা আর জ্ঞান কাজে লাগাতে চেষ্টা করল উদ্যম। ঘন ঘন চিঠি লিখতে লিখতে দেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয় আর সরকারি-বেসরকারি প্রায় সব বড় ব্যাংকের কাছে পরিচিত একজন মানুষ হয়ে উঠল সে। একটা ট্রাস্ট গঠন করল, যারা জেলে আছে তাদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া চালানোর জন্য বিভিন্ন ব্যাংক ওই ট্রাস্টের মাধ্যমে টাকা ধার দেবে, লেখাপড়া শেষ হওয়ার পর ওই ধারের টাকা অল্প সুদসহ ফেরত দিতে হবে সহনীয় কিস্তির মাধ্যমে। কাঠফাটায় তার এই স্কিম দারুণ সফল হলো।

 

 

 

ছয়.

 

জেলখানার সময় খুব ধীরে বয়। মাঝেমধ্যে আপনি কসম খেয়ে বলবেন ওটা থেমে গেছে, যদিও আসলে থামে না, চলতে থাকে। গাড়ি মেরামত থেকে পাওয়া টাকা ছয়নয় করার অপবাদ নিয়ে ওয়ার্ডেনের অফিস ত্যাগ করতে হলো মুক্তার আলীকে। তার জায়গায় এলো ধীমান চট্টো। পরবর্তী ছয় মাস কাঠফাটা হয়ে উঠল জ্যান্ত নরক। দেখা গেল, হাসপাতালের প্রতিটি বেড আর সলিটারি শাখার প্রতিটি সেল সব সময় ভর্তি হয়ে আছে।

একদিন দাড়ি কামানোর ছোট্ট আয়নায় নিজেকে দেখছি—চল্লিশ বছরের এক লোক আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এসেছিল এক ছেলে, মাথাভর্তি ঝাঁকড়া চুল, অনুশোচনায় দগ্ধ এবং আধপাগল, আত্মহত্যার কথা চিন্তা করছে। সেই ছেলেটা চলে গেছে। চুলও প্রায় নেই। চোখের চারদিকে এখন প্রচুর কাকের ঠ্যাং। সেদিন নিজেকে আমার একটা বুড়ো মনে হলো, নিজের বেরোনোর সময় হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। ব্যাপারটা আমাকে ভয় পাইয়ে দিল। জেলখানায় কেউ বুড়ো হতে চায় না।

কয়েক বছর পর তহবিল তছরূপের অপরাধে ধীমানের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হলো। তারপর দেখা গেল, তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পালিয়ে গিয়ে নিজের মস্ত উপকার করেছে ধীমান চট্টো, কারণ দোষী সাব্যস্ত হলে এখানেই ওই দণ্ড ভোগ করতে থাকে, কিন্তু এখানে সে পাঁচ ঘণ্টা আয়ুও পেত কি না সন্দেহ আছে, মানুষের ওপর এত অত্যাচার করেছে সে। দবির খান গেছে দুই বছর আগে। তার হার্ট অ্যাটাক করেছিল।

নতুন ওয়ার্ডেন নিয়োগ দেওয়া হলো। পাওয়া গেল তার অ্যাসিস্ট্যান্টও। নির্বাচন করা হলো গার্ডদের নতুন চিফ। উদ্যমকে আবার আগের দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে—একজন খুনি এবং স্রেফ একজন কয়েদি। ওই সময় উদ্যমের সঙ্গে সেলটা শেয়ার করছিল একজন আদিবাসী, সুবাস চাকমা। কী কারণে বলা মুশকিল, দুজনের মধ্যে বনিবনা হয়নি—সুবাস ওই সেল ছেড়ে চলে গেল, আর উদ্যমকে পাঠানো হলো সলিটারিতে। ওপর মহল বা কর্তৃপক্ষের নামবদল হলে কী হবে, অন্যায়-অবিচার আসলে চলতেই থাকে।

উদ্যমকে নিয়ে আমি একবার সুবাসের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। জন্মগত একটা ত্রুটির কারণে তার কথা জড়িয়ে যায়, শ্রোতার বুঝতে অসুবিধে হয় ঠিক কী বলতে চাইছে সে। ‘খুব ভালো লোক সে। তার সঙ্গে ওই সেল আমার ভালোই লেগেছে। সে হাসিঠাট্টা কাকে বলে জানে না। আমি তাকে কখনো মজা করতে দেখিনি। তবে আমাকে ওখানে চায়নি সে। আমি বুঝতে পারতাম। ’ বিদেশিদের মতো কাঁধ ঝাঁকাল, সম্ভবত চার্চে যেসব খ্রিস্টান আসা-যাওয়া করে তাদের দেখে শিখেছে। ‘ওখান থেকে সরে আসায় নিজের ওপর আমি খুশি। ওই সেলে খারাপ ধরনের খরা আছে। সারাক্ষণ ঠাণ্ডা। সে কাউকে নিজের জিনিস ছুঁতে দিত না। সেটা ঠিক আছে। চমৎকার মানুষ, কক্ষনো মজা করতে দেখিনি। তবে খুব বড় খরা। ’

ওই সেল থেকে মধুবালা কবে গায়েব হয়ে গিয়েছিলেন বলতে পারব না, তবে মনে আছে একসময় উদ্যমকে আমি একটা মেরিলিন মনরোর পোস্টার আনিয়ে দিয়েছিলাম। তারপর একে একে শামিম আরা আর জেবা এবং কবরী।

আমি একবার তাকে প্রশ্ন করেছিলাম, ‘এই পোস্টারগুলো তোমার কাছে কী অর্থ বহন করে?’

আমার দিকে কিছুক্ষণ অবাক তাকিয়ে থাকল, তারপর বলল, ‘স্বাধীনতা, মুক্তি। সুন্দর ওই নারীদের দিকে একটু সময় তাকিয়ে থাকো, একসময় বুঝতে পারবে তুমি ওদের পাশে দাঁড়িয়ে আছ। ’

তারপর আবার আমরা নতুন একজন ওয়ার্ডেন পেলাম, নাম মৌলানা আলফাজুর রহমান। একটা মসজিদের ইমাম ছিলেন, সেখান থেকে পাঠানো হয়েছে। এসেই ধর্ম প্রচারে লেগে গেলেন ভদ্রলোক। কয়েদিরা তাঁকে দেখলে পালাতে দিশে পায় না, এখনই মসজিদে ধরে নিয়ে যাবে এই ভয়ে। তবে এটা মানতে হবে যে মৌলানা সাহেব অনেক ভালো ভালো কাজে হাত দিলেন। প্রথমেই একটা ফান্ড তৈরি করা হলো, কয়েদিরা যা রোজগার করবে তার শতকরা দশ ভাগ ওই ফান্ডে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হলো। মেয়াদ শেষে কয়েদিরা যখন চলে যাবে, এই ফান্ড থেকে নগদ সাহায্য করা হবে তাদের, হঠাৎ বাইরে বেরিয়ে সে যাতে বিপদে পড়ে না যায়। বলা হলো ক্ষেত্রবিশেষে ব্যবসা করার জন্য তাকে কিছু পুঁজিও দেওয়া যেতে পারে। এ রকম আরো অনেক নতুন প্রগ্রামে হাত দিলেন তিনি এবং দেখা গেল পাশে দাঁড়িয়ে তাঁকে সাহায্য করছে উদ্যম; ডান হাত হিসেবে, নীরব থাকার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে। জেলখানার লাইব্রেরি ছিল উদ্যমের নিয়তির মতো, মৌলানা রহমান সেটা জানতেন এবং সেটাকে তিনি নিজের কাজে ব্যবহার  করতে লাগলেন।

উদ্যম আমাকে একদিন বলেছে, ‘রহমান সাহেবের প্রিয় একটা ফ্রেইজ কি জানো? এক হাত আরেক হাতকে ধোয়। ’ কাজেই উদ্যম তাঁকে ভালো ভালো উপদেশ আর পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে।

তারপর কিছু একটা ঘটাল। কী ঘটল এককথায় বলা সম্ভব নয়। ব্যাপারটা ঘটেছে এক দিনে নয়, সাত বছর সময়সীমার ভেতর। ঘটনাটা ঘটেছিল মৌলানা সাহেব তাঁর ডান হাতকে হাতছাড়া করতে চাননি বলে। আমি আরো একটু বলি : ব্যাপারটা ঘটেছিল, কারণ তিনি ভয় পাচ্ছিলেন উদ্যম তাঁর বিরুদ্ধে কতটুকু কী বলবে ভেবে—উদ্যম যখন বা যদি কাঠফাটা ছেড়ে বেরিয়ে যায়।

গল্পটা আমি শুনেছি এর মুখে একটু ওর মুখে একটু, এভাবে। উদ্যমের কাছ থেকেও শুনেছি, তবে সবটুকু নয়। তার জীবনের ওই অংশটা নিয়ে সে কখনো কথা বলতে রাজি হয়নি এবং সে জন্য আমি তাকে দোষও দিতে পারি না। গল্পটা আমি পাঁচ কি সাতজন লোকের কাছ থেকে যতটা সম্ভব জোগাড় করেছি।

এই লেখার কোথাও বোধ হয় আমি বলেছি যে কয়েদিরা আসলে ক্রীতদাস ছাড়া কিছু নয়, তবে তাদের আছে হাবাগোবা সেজে থাকার আর কান খোলা রাখার ক্রীতদাসসুলভ অভ্যাস। আমি মাঝখানের গল্প পেয়েছি, পেছন দিক পেয়েছি, সামনের দিক পেয়েছি—তবে আপনাকে জানাচ্ছি পয়েন্ট অ থেকে পয়েন্ট ত পর্যন্ত। কাহিনিটা জানলে আপনি হয়তো বুঝতে পারবেন কী কারণে লোকটা প্রায় দশ মাস ও রকম আচ্ছন্ন এবং অবদমিত অবস্থায় কাটিয়েছে। আমার মনে হয় না একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সত্যটা কী জানত সে, এই নরকতুল্য জেলখানায় আসার পর পনেরো বছর কাটিয়ে ফেলার পরও। যত দিন না তার সঙ্গে মাখনা নেহালের দেখা হলো। খারাপ কতটা খারাপ হতে পারে তা সে জানত বলে মনে হয় না আমার।

দেশে তখনো স্বাধীনতার জন্য সম্মুখযুদ্ধ শুরু হয়নি, মাখনা নেহাল আমাদের ছোট্ট মিষ্টি পরিবারে যোগ দিতে এলো। তখন তার মাত্র সাতাশ বছর বয়স, অথচ এর মধ্যেই দেশের প্রায় সব জেলখানা থেকে এক-আধবার করে ঘুরে আসা হয়ে গেছে তার। সে একজন পেশাদার চোর এবং আপনি সম্ভবত আন্দাজ করে নিয়েছেন, আমার নিজের অনুভূতিও তা-ই আর কি, চুরি করতে করতে আরেকটা পেশায় জড়িয়ে পড়েছিল নেহাল।

সে বিবাহিত এবং তার স্ত্রী প্রতি সপ্তাহে দেখা করতে আসত। ওই মেয়ের মনে কোথাও একটা আশা জেগে ছিল যে তার স্বামী নিজেকে কোনো একসময় শুধরে নেবে, আর পরিণতিতে তার এবং তাদের তিন বছর বয়সী ছেলের ভাগ্য ফিরবে—নেহাল যদি হাই স্কুলের বাকি লেখাপড়া শেষ করতে পারে। বউয়ের ধারণা, এসএসসি পাস করাতে পারলে ভালো-মন্দ যা হোক তবু একটা চাকরি জোগাড় হতে পারে। স্বামীকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে রাজি করল সে, নেহাল জেলখানার লাইব্রেরিতে প্রায় নিয়মিত আসা-যাওয়া শুরু করল।

উদ্যমের জন্য তত দিনে এই ব্যাপারটা রুটিনে দাঁড়িয়ে গেছে। ছাত্র হিসেবে নেহাল মোটেও ভালো নয়, দু-এক বছর কঠোর পরিশ্রম করলে এসএসসি পরীক্ষায় বসার যোগ্যতা অর্জন করবে, ব্যাপারটা সে রকম নয়। উদ্যমের ধারণা হলো, অন্তত চার বছর খাটতে হবে তাকে। তবে এটা আমার গল্পের অংশ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো কিছুদিনের মধ্যেই আর সব মানুষের মতো নেহালও উদ্যম হাসানের ভারি ভক্ত হয়ে উঠল।

দুই কি তিনবার কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে উদ্যমকে জিজ্ঞেস করেছে নেহাল, ‘আপনের মতো ইস্মার্ট একজন মানুষ এহানে কী করতাছে কন দেহি!’

উদ্যম ওই টাইপের মানুষ নয় যে তাকে বলবে। উত্তরে একটু শুধু হেসেছে, তারপর প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে অন্যদিকে সরে গেছে। নেহালের জন্যও এটা খুব স্বাভাবিক যে প্রশ্নটা সে অন্য কাউকে করেছে। অবশেষে উত্তরটা যখন পেয়েছে, আমার ধারণা তখন তাকে তার তরুণ জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটাও খেতে হয়েছে।

নেহাল যাকে প্রশ্ন করেছিল আমাদের লন্ড্রিতে কাপড় ইস্ত্রি আর ভাঁজ করে যে লোক, সেই হিরু শেখকে। খুন করার অভিযোগে তাকে এখানে প্রায় বারো বছর সাজা ভোগ করতে হচ্ছে। উদ্যমের মার্ডার কেসের বিশদ বর্ণনা মাখনা নেহালকে নতুন করে শোনাতে ভালোই লাগছিল তার। বিচারে কী রায় হলো বলতে যাবে হিরু শেখ, এই সময় ব্যাপারটা ঘটতে শুরু করল। দশটা ইস্ত্রি নিয়ে দশজন লোক কাজ করছিল ওখানে, তারা শুধু ইস্ত্রি করছিল না, কাপড় ভাঁজও করছিল। ভাঁজ করা কাপড় প্যাকেটে ভরে বাক্সে তুলছিল দুজন লোক, তার মধ্যে একজন মাখনা নেহাল। কিন্তু হঠাৎ কখন কে জানে স্থির হয়ে গেছে সে, তার মুখ এত বড় একটা হাঁ তৈরি করেছে, উঁকি দিলে বোধ হয় বুকের ভেতর পর্যন্ত দেখা যাবে। যন্ত্রের মাধ্যমে তার দিকে এগিয়ে আসছে ভাঁজ করা কাপড়ের স্তূপ, কিন্তু সেগুলো কেউ না ধরায়, সচল টেবিল থেকে তুলে না নেওয়ায় নিচের কাদাপানিতে পড়ে যাচ্ছে।

সেদিন ওদের ওস্তাদ ছিল যিশু মিয়া, দৃশ্যটা দেখতে পেয়ে চেঁচাতে চেঁচাতে ছুটে এলো সে। তার দিকে কোনো খেয়ালই নেই নেহালের। সে হিরুকে জিজ্ঞেস করল, ওখানে যেন যিশু মিয়া বলে কেউ নেই, যে যিশু মিয়া এত বেশি লোকের মাথা ফাটিয়েছে যে জিজ্ঞেস করলে সংখ্যাটা বলতে পারবে না, ‘গলফ শেকাইতো যে ব্যাডা, কী জানি নাম কইলা তার?’

‘উত্তম,’ উত্তর দিল হিরু শেখ, ইতিমধ্যে পুরোপুরি হতবিহ্বল আর বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে। পরে সে বলেছে, ছোকরাকে সাদা পতাকার মতো দেখাচ্ছিল। ‘উত্তম সিংরাজ বা এরহম কিছু একডা হইবে। ’

‘এদিকে তাকা, এদিকে তাকা, হালার পুত...’ তখনো গর্জন করছে যিশু মিয়া। ‘অহনও খাড়ায়া আছস! শিটগুলা লয়া ঠাণ্ডা পানিতে চুবা...’

‘উত্তর সিংরাজ...উ আমার খুদা, উ আমার পরম খুদা,’ নেহাল বলল এবং এর বেশি কিছু বলতে পারল না সে, কারণ যিশু মিয়া তার কানের পেছনে বেমক্কা একটা ঘুষি মেরে বসেছে।

ঘুষি খেয়ে শক্ত মেঝের ওপর মুখ দিয়ে এত জোরে ছিটকে পড়ল নেহাল, সামনের তিনটে দাঁত ভেঙে গেল। তার যখন জ্ঞান ফিরল, দেখল সলিটারিতে রয়েছে। ওখানে এক সপ্তাহ আটক থাকতে হলো তাকে, রেকর্ড বুকে কালো দাগ তো পড়লই।

সেটা ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিক ছিল। সলিটারি কনফাইনমেন্ট থেকে বেরিয়ে আসার পর আরো ছয় কি সাতজন দীর্ঘ মেয়াদে থাকা কয়েদিকে ওই একই প্রশ্ন করেছে মাখনা নেহাল, সবাই তাকে ওই একই গল্প শুনিয়েছে। আমি জানি, কারণ আমিও তাদের মধ্যে একজন। কিন্তু আমি যখন জিজ্ঞেস করলাম কেন সে জানতে চাইছে, অমনি মুখে তালা মেরে দিল।

তারপর একদিন লাইব্রেরিতে গেল সে এবং উদ্যম হাসানের সামনে বসে হড়হড় করে একগাদা তথ্য উগরে দিল। তার কথা শুনে জীবনে এই প্রথমবার এবং সম্ভবত শেষবারও নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাল উদ্যম।

সেদিন আরো পরে তাকে আমি দেখলাম, দেখে মনে হলো লোহার হুক দিয়ে কেউ যেন তার মুখটাকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। তার হাত দুটো কাঁপছিল। আমার কথার কোনো জবাবই দিল না সে। আরো খানিক পর গার্ডদের প্রধান লতিফ জোয়ারদারকে ধরে ওয়ার্ডেন মৌলানা রহমানের সঙ্গে পরদিনের একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাকা করল।

পরে আমাকে উদ্যম বলেছে, সেদিন সারা রাত এক মিনিটও ঘুমাতে পারেনি সে, ঠাণ্ডা রাতে সারাক্ষণ বাতাসের হাহাকার শুনেছে, সার্চলাইটের আলোটাকে বারবার চক্কর দিয়ে ঘুরতে দেখেছে, আর পুরো ব্যাপারটার চিন্তা করে দেখার চেষ্টা করেছে। সে বলল, নেহাল যেন একটা চাবি হাজির করেছে তার সামনে, যেটা দিয়ে তার মগজের পেছন দিকের একটা খাঁচা খোলা যায়, যে খাঁচাটা তার সেলের মতো, যে খাঁচায় বন্দি করে রাখা হয়েছে একটা বাঘকে, আর সেই রয়াল বেঙ্গল টাইগারের নাম হলো আশা। নেহাল যে চাবি হাজির করেছে সেটা দিয়ে ওই খাঁচা খোলা যায়, ফলে বাঘটা এখন বেরিয়ে পড়েছে এবং সে চাক বা না চাক, তার মগজে টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে।

চার বছর আগে খুলনায় অ্যারেস্ট হয়েছিল নেহাল। একটা চোরাই গাড়ি চালাচ্ছিল সে, চুরি করা অনেক জিনিসে ঠাসা ছিল গাড়িটা। পুলিশের সঙ্গে একটা সমঝোতায় এসে নেহাল তার সহকারীকে ধরিয়ে দেয়, বিনিময়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ হালকা করে লেখা হয়, ফলে খুব অল্প মেয়াদের জেল হয় তার। সাজা শুরু হওয়ার এগারো মাস পর তার সেলের পুরনো বাসিন্দা ছাড়া পেয়ে জেলখানা থেকে বেরিয়ে যায়, তার জায়গায় আসে মীর শাফকাত নামের নতুন একজন। শাফকাতের সাজা হয়েছে সশস্ত্র অবস্থায় সিঁধ কাটতে গিয়ে।

‘এমুন উস্থির টাইপের মানুষ জীবনে আমি দেহি নাই,’ বলল নেহাল। ‘যার বুক খালি তড়পায় হের সিঁদেল চুর হওয়ন উচিত না, আরো উচিত না হাতে যদি পিস্তল থাহে। খুট কইরা একটু আওয়াজ অইতে যা দেরি, হালার পুত লাফ দা তিন ফুট উপরে উইডা যাইব...তারপর নাইমা আইব গুলি করতে করতে। এক রাইতে আমার গলা এত জোরে টিইপা ধরছিল, আমি মারা যাইতে লইছিলাম, কারণ হলের ওই দিক দিয়া এক হালার পুত তার সেলের রডে টিনের কাপ ঠুকতে আছিল। ’

‘ওই সেলে আমি তার লগে সাত মাস আছিলাম, তারপর সাজা কমায়া আমারে ছাইড়া দিল। এই সাত মাস বহুত গল্প হইছে তার লগে আমার। সবই তার গল্প, কারণ শাফকাতের স্বভাব আছিল একা কথা কইবে, তুমারে কিছু কইতে দিবে না, কইতে গেলে চোক গরম করবে। বিষম মোটা ওই ব্যাডা, মাথায় টাক...দেখলে ডরই লাগে। আল্লারে কই, হের লগে আমার জানি আর দেখা ন অয়। ’

‘পেরতেক রাইতে তার বকবকানি শুনতে হইছে আমারে। তার বড় হওয়ন, এতিমখানাত্থে ভাগন, কী কী কাজে আছিল, কী ধরনের মাইয়াদের লগে হুইছে, জুয়া খেলায় তার কপাল ফাটছে। বাধ্য হয়ে তার বেবাক কতা হুনতে হইছে আমারে। নিজের মুখডা আমার আহামরি কিছু না, কিন্তু তাই বইলা আমি চাইও না যে কেউ এইডারে বদলায়া দিক। ’

‘তার কথা যদি হাচা অয়, দুই শত বাড়ির সিঁদ কাটছে হালার পুতে। এইডা আমি বিশ্বাস করি নাই। তবে যে গল্পটা কমু, সদয় বাই, হেইডা এক শ ভাগই হাচা বইলা কসম খাইছে। তার আগে আমারে কইল সে মানুষও মারছে। হে ওই সব মানুষরে মারছে যারা তারে ঠকাইছে, তার লগে অন্যায় করছে। সত্য-মিথ্যা আল্লা মালুম, তবে হের কতা অবিশ্বাস করি না। ’

‘তো এক রাইতে, কিছু কইতে লাগে তাই কওয়া, তারে জিগাইলাম, কারে আপনে খুন করছেন?’ মসকরা করলাম, বুঝলেন না। হি হি কইরা হাসল দৈত্য, তারপর কইল, ‘খুঁজ লয়া দেখো গা, চট্টগ্রামের কাঠফাটায় এক ব্যাডায় জেল খাটতাছে আমি ওই দুইডারে খুন করায়। এক বিদেশি ব্যাডা, গলফ খেলা শিকায়। হের লগে ওই মাইয়ালোক শুইয়া আছিল, যে ব্যাডায় জেলে পচতাছে তার বউ। আমি হালায় চুপচাপ হেগো ঘরে ঢুকতে লইছি, বিদেশি ব্যাডা চিল্লাচিল্লি শুরু কইরা দিল। ’

‘আমি হালায় মনে করতে পারি না শাফকাত ওই মাইয়াডার নাম আমারে কইছিল না কি কয় নাই,’ বলে চলেছে নেহাল। ‘হয়তো কইছে, আমি মনে রাখতে পারি নাই। তয় লোকটার নাম আমি ভুলি নাই। সিংরাজ, উত্তম। শাফকাতে ভাবছিল ওই বাড়িতে নগদ দুই তিন হাজার টেহা থাকবার পারে। কিন্তু ভেতরে মাত্র ঢুকছে, ওই ব্যাডার ঘুম ভাইঙ্গা গেছিল। কে কইব কী ঘটনা, অইতে পারে লোকটা হুদা নাক ডাকছে, আর হেইডা হুইনাই ঠাস ঠাস গুলি কইরা দুইজনেরে মাইরা ফালাইছে কুত্তার বাচ্চাডা। ’

 

 

 

সাত.

 

নেহালের গল্প পুরোটাই বিশ্বাস করল উদ্যম। শাফকাতের অবাছাই শিকার ছিল না সিংহরাজ, তার জানা ছিল বিদেশি এই গলফ ইনস্ট্রাক্টর প্রচুর টাকা কামায়, তার বাড়িতে অন্তত পাঁচ হাজার টাকা পাওয়া যেতে পারে।

আরেকটা তথ্য উদ্যমের মনে আশা জাগাচ্ছে। গলফ ক্লাবের লাগোয়া একটা জেটি আছে, সেই জেটির দেখাশোনার কাজ করত এক লোক, শাফকাতের যে বর্ণনা নেহাল দিচ্ছে তার সঙ্গে ওই লোকের অনেক কিছু মিলে যায়—হতে পারে ওই লোক শাফকাতই ছিল। লোকটার কথা পরিষ্কার মনে করতে পারছে উদ্যম—তার তাকানোর ভঙ্গিটা ছিল ভারি অস্বস্তিকর, যেন তোমার মাপ নিচ্ছে। তবে বেশি দিন ওই চাকরি করেনি সে। হয় সে নিজে থেকে চলে গিয়েছিল, নয়তো জেটির দায়িত্বে থাকা মুন্না ভাই তাকে বিদায় করে দিয়েছিল।

তো ঝমঝম বৃষ্টির মধ্যে মৌলানা রহমানের সঙ্গে দেখা করতে গেল উদ্যম হাসান। প্রশাসনিক শাখায় বেশ বড় একটা দালানে বসেন তিনি। তাঁর ডেস্কের পেছনে একটা দরজা আছে, ওটা দিয়ে সহকারী ওয়ার্ডেনের অফিসে যাওয়া যায়। সহকারী বাইরে কোনো কাজে গেছেন, তবে বাদল মিয়া আছে—একাধারে কেরানির, পিয়নের, আবার মালির দায়িত্বও পালন করতে হয় তাকে।

‘আসসালামু আলায়কুম, উদ্যম সাহেব। আপনার কি উপকারে লাগতে পারি আমি?’

‘স্যার,’ উদ্যম বলল, এবং আধবুড়ো বাদল মিয়া আমাদের বলেছে যে তার গলা মৌলানা রহমান চিনতেই পারছিলেন না, এতই বদলে গেছে সেটা। ‘স্যার...এখানে একটা ব্যাপার ঘটেছে...আমার জীবনে এমন একটা কিছু ঘটে গেছে...সেটা এমনই, এমনই যে...আমি ঠিক বুঝতে পারছি না কোত্থেকে শুরু করব। ’

‘ঠিক আছে, আগে আপনি শান্ত হয়ে সামনের ওই চেয়ারে বসুন,’ উদ্যমকে বললেন মৌলানা সাহেব। ‘তারপর শুরু করুন একদম শুরু থেকে। তাতেই ভালো ফল পাওয়া যায়। ’

সেটাই করল উদ্যম। শুরু করল কেন তাকে জেলে আসতে হয়েছে তার ব্যাখ্যা দিয়ে। তারপর তাকে মাখনা নেহাল যা বলেছে হুবহু সেটা মুখস্থ বলে গেল। তার কথা শেষ হতে একেবারে বোবা হয়ে বসে থাকলেন মৌলানা রহমান। বেশ খানিক পর মুখ খুললেন তিনি, বললেন, ‘হ্যাঁ, এ রকম জঘন্য গল্প জীবনে এই প্রথম শুনছি আমি। তবে আমাকে বিস্মিত করেছে অন্য একটা ব্যাপার, উদ্যম। ’

‘অন্য একটা...কী, স্যার?’

‘গল্পটা আপনাকে একেবারে পেয়ে বসেছে দেখে। ’

‘স্যার? আ-আপনার কথা আমি বুঝতে পারছি না। ’ পরে বাদল মিয়া আমাদের বলেছে, তেরো বছর আগে যে উদ্যম হাসান কারখানার ছাদে আলকাতরা লাগানোর সময় দবির খানকে মাথা নত করতে বাধ্য করেছিল, সেই একই ব্যক্তি শব্দ খুঁজে না পেয়ে তোতলাচ্ছিল।

‘শুনুন, সাহেব,’ মৌলানা বললেন, ‘এটা আমার কাছে পরিষ্কার যে এই লোকটা, মাখনা নেহাল, আপনাকে খুব প্রভাবিত করতে পেরেছে। তার কথায় আপনি যাকে বলে একেবারে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়েছেন। আপনার জীবনের করুণ কাহিনি শুনে খারাপ লেগেছে তার, এবং আপনাকে হাসি-খুশি দেখতে চাওয়াটা তার জন্য খুব স্বাভাবিক। তার বয়স কম, খুব একটা বুদ্ধিমানও নয়। সে ধারণা করতে পারেনি এ রকম একটা বানোয়াট গল্প আপনার কী অবস্থা করবে। এখন আমি বলি কি...’

‘আপনি কি মনে করেন, আমিও এসব ভাবিনি?’ প্রশ্ন করল উদ্যম। ‘কিন্তু গলফ ক্লাবে যে লোক ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে চাকরি করছিল তার নাম বা চেহারার বর্ণনা আমি কাউকে দিইনি—না নেহালকে, না অন্য কাউকে। কিন্তু নেহালের সেলমেট শাফকাত ওই লোকের যে বর্ণনা দিয়েছে তা হুবহু সঠিক হতে পারে কিভাবে, যদি সত্যি সে তাকে খুন না করে থাকে?’

‘আপনি হয়তো বাছাই করা একটা পয়েন্টের ওপর ভর করতে চাইছেন,’ মৃদু শব্দে হেসে উঠে বললেন মৌলানা সাহেব।

‘ব্যাপারটা সে রকম নয়, স্যার...’

‘আপনি ওদিকটায় জোর দিচ্ছেন,’ বাধা দিয়ে বললেন মৌলানা। ‘আমি তা দিতে পারছি না। আর তা ছাড়া, আসুন স্মরণ করি যে ওই গলফ ক্লাবে ওই নামে কোনো লোক অত দিন আগে সত্যি ছিল কি না তা শুধু আপনার কাছ থেকে জানছি আমরা। ’

‘না, স্যার,’ আবার বাধা দিল উদ্যম। ‘না, তা সত্যি নয়। কারণ...’

‘যাই হোক,’ আবার উদ্যমকে থামিয়ে দিলেন মৌলানা সাহেব, গলা খুব ভারী। ‘আসুন, টেলিস্কোপের আরেক দিক দিয়ে দেখা যাক. কেমন? ধরুন, কথার কথা বলছি আর কি, স্রেফ ধরুন, মীর শওকত নামে সত্যি একজন লোক ছিল। ’

‘শাফকাত,’ আঁটসাঁট গলায় বলল উদ্যম।

‘শাফকাতই, ঠিক আছে। এবং এও ধরা যাক সে খুলনায় মাখনা নেহালের সেলমেট ছিল। খুব বেশি সম্ভাবনা এত দিনে রিলিজ অর্ডার হয়ে গেছে তার। নেহালের সঙ্গে তার পরিচয় হওয়ার আগে কত দিন সে জেল খাটে তা-ও তো ছাই জানি না আমরা। জানি?’

‘না। তবে নেহাল বলছে সে লোক ভালো না, তার মেয়াদ কমার কোনো সম্ভাবনা নেই, বরং বাড়ার কথা। সে হয়তো এখনো ওখানে আছে। আর যদি ছাড়া পেয়ে থাকে, নিশ্চয়ই তার ঠিকানা রাখা হয়েছে, স্বজনদের সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যাবে। ’

‘এসব লোক সাধারণত মিথ্যে তথ্য দিয়ে যায়, ঠিকানা ধরে গিয়ে দেখা যাবে দুটোই কানাগলি। ’

একমুহূর্ত চুপ করে থাকল উদ্যম, তারপর বিস্ফোরিত হলো সে, ‘তবু এটা একটা সুযোগ তো?’

“হ্যাঁ, তা বটে। তো, উদ্যম সাহেব, আসুন ধরে নিই শাফকাতের অস্তিত্ব আছে, এবং সে এই মুহূর্তে খুলনার জেলে পচছে। এখন, কেটলির এই মাছ আমরা যদি বালতি করে নিয়ে যাই তার কাছে, কী বলবে সে? সে কি মেঝেতে হাঁটু নামিয়ে, কোটরের ভেতর চোখ ঘোরাতে ঘোরাতে বলবে, ‘আমি করেছি! আমি করেছি! আমার সিঁধ কাটার অভিযোগে যাবজ্জীবন দণ্ডের কথা যোগ করুন। ’?”

‘আপনি এতটা অবুঝ হওয়ার চেষ্টা করছেন কেন?’ বলল উদ্যম, এত নিচু গলায় যে বাদল মিয়া কোনো রকমে শুনতে পেল। তবে মৌলানা সাহেবের চড়া গলা শুনতে তার কোনো সমস্যা হয়নি।

‘কী? আপনি আমাকে কী বললেন?’

‘অবুঝ!’ চেঁচিয়ে উঠল উদ্যম। ‘এটা কি ইচ্ছাকৃত?’

‘উদ্যম, আপনি আমার পাঁচ মিনিট সময় নষ্ট করেছেন—না, সাত মিনিট—এবং আজ আমার শেডিউল এত টাইট যে...’

‘ওই ক্লাবে সব তথ্য সংরক্ষিত আছে, এটা আপনি বুঝতে পারছেন না?’ রীতিমতো চেঁচাচ্ছে উদ্যম। ‘সে বায়োডাটা জমা না দিয়ে ওই ক্লাবে চাকরি পেয়েছিল?

ওখান থেকে বেতন নেয়নি? ছুটির দরখাস্ত করেনি? তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছিল না? পনেরো বছর পুরো একটা জীবন নয়, অনেক কর্মচারীকে এখনো ওখানে পাওয়া যাবে, আমি জানি। তারা তার কথা মনে করতে পারবে। হয়তো মুন্না ভাইকেও পাওয়া যাবে। তিনি নিশ্চয়ই শাফকাতকে মনে করতে পারবেন। নেহালকে আমি যদি সাক্ষী দিতে রাজি করতে পারি যে শাফকাত যা বলেছে সব সে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বলুক, আর মুন্না ভাই যদি সাক্ষ্য দেন যে শাফকাত ওখানে কাজ করেছে, আবার নতুন করে আমার বিচার হবে। আমি...’

‘গার্ড! গার্ড! এই লোককে বাইরে নিয়ে যাও!’

‘আপনার আসলে হয়েছেটা কী?’ জিজ্ঞেস করল উদ্যম, বাদল মিয়া আমাকে বলেছে, ততক্ষণে গলার সব জোর দিয়ে চিৎকার শুরু করেছে সে। ‘এটা আমার জীবন, মিথ্যে অভিযোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার আমার একটা সুযোগ—এটা আপনি বুঝতে পারছেন না? নেহালের গল্প সত্যি না মিথ্যে একটা ফোন করে জেনে নিতে ইচ্ছে করছে না আপনার? শুনুন, ফোনের বিল আমি দেব...’

ততক্ষণে গার্ডরা দুদিক থেকে ধরে তাকে টানতে শুরু করেছে।

‘সলিটারি,’ শুকনো গলায় বললেন মৌলানা সাহেব। ‘রুটি আর পানি। ’

গার্ডরা উদ্যমকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে, নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে সে, তখনো ওয়ার্ডেনকে লক্ষ্য করে চিৎকার করছে। বাদল মিয়া বলেছে, দরজা বন্ধ হওয়ার পরও তার গলা শোনা যাচ্ছিল, ‘এটা আমার জীবন! এটা যে আমার জীবন, এই সহজ ব্যাপারটা আপনি বুঝতে পারছেন না? এ রকম একটা হাবা লোককে কী কারণে এখানে কেউ পাঠাতে পারল!’

বিশ দিন শুধু রুটি আর পানি খেয়ে সলিটারিতে কাটাল উদ্যম। এটা তার দ্বিতীয়বার সলিটারিতে যাওয়া। এবং মৌলানা রহমানের সঙ্গে লাগার ‘অপরাধে’ তার রেকর্ডে এই প্রথম কালো একটা দাগ পড়ল। আর কষ্টের কথা কী বলব। ওখানে আপনি—খাওয়ার সময়, প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার সময়, ঘুমানোর সময়, সব সময়—শুধু বসতে পারবেন। ওখানে যদি কেউ বিশ দিন থাকে, তার মনে হবে এক বছর থেকেছে। ত্রিশ দিনকে মনে হবে দুই বছর, চল্লিশ দিনকে মনে হবে দশ বছর। বাতাস ঢোকার যে সরু নল আছে, ওটার ভেতর মাঝেমধ্যে ইঁদুর মরে পড়ে থাকে। পচা মাংসের গন্ধে আপনি মারা যেতে বসলেও আপনার কিছু করার নেই। যতই চিৎকার করুন, সেটা কেউ শুনতে পাবে না।

সলিটারি সম্পর্কে ভালো কিছু যদি বলার থাকে তা হলো, ওখানে বসে আপনি চিন্তা করতে পারবেন। বিশ দিন চিন্তা করার সময় পেয়েছে উদ্যম, তারপর বাইরে বেরিয়ে এসে ওয়ার্ডেন মৌলানা রহমানের সঙ্গে বসার জন্য আবার একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট চাইল। কিন্তু তার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা হলো।

ধৈর্য না হারিয়ে অনুরোধটা নবায়ন করল উদ্যম। আবার নবায়ন করল। তারপর আবার। তার মধ্যে একটা পরিবর্তন এসেছে। বলা যায় হঠাৎ করেই আমাদের চোখে পড়ল তার মুখে সরু সরু অনেক রেখা, মাথার দুপাশের চুলে একটু সাদা ভাব। মুখের কোণে সব সময় মিটিমিটি যে হাসিটা লেগে থাকত, সেটা আর নেই। তার চোখ মাঝেমধ্যে শূন্যে তাকিয়ে থাকত, এবং ওভাবে কেউ তাকিয়ে থাকলে বোঝা যায় সে আসলে বছরগুলো গুনছে, কত বছর সাজা ভোগ করা হলো...কত মাস, কত সপ্তাহ আর কটা দিন।

সে তার অনুরোধ বারবার নবায়ন করতে থাকল। তার ধৈর্য দেখা গেল অসীম। সময় ছাড়া আর কিছু নেই তার।

অবশেষে মৌলানা রহমান তার সঙ্গে বসতে রাজি হলেন জুন মাসের শেষ দিকে। তাদের মধ্যে যে আলাপটা হয়েছিল, সেটা আমি আরো সাত বছর পর উদ্যমের মুখেই শুনেছি।

‘ব্যাপারটা যদি টাকা-পয়সার হয়, আপনার দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই,’ নিচু গলায় ওয়ার্ডেনকে বলেছিল উদ্যম। ‘এটা এমন একটা প্রসঙ্গ, আমি উচ্চারণ করতে পারি না, ঠিক? এসব চোখ ইশারায় সম্পন্ন হয়। আমি আপনাকে ইশারা দিচ্ছি...’

‘যথেষ্ট হয়েছে,’ উদ্যমকে থামিয়ে দিলেন ওয়ার্ডেন রহমান, পাথরের মতো ঠাণ্ডা লাগছে তাঁর চেহারা। চেয়ারসহ হেলান দিলেন তিনি, তাঁর মাথার ঠিক ওপরে লেখা রয়েছে : ‘তাঁর বিচার খুব নির্মম, এবং সেটা তাড়াতাড়ি চলে আসে। ’

‘কিন্তু,’ শুরু করতে গেল উদ্যম।

‘আমার সামনে আর কখনো টাকা শব্দটা উচ্চারণ করবেন না,’ বললেন মৌলানা সাহেব। ‘এই অফিসে নয়, অন্য কোথাও-ও নয়। তবে আপনি যদি চান লাইব্রেরি তুলে দিয়ে আমরা আবার ওটাকে রং রাখার গুদাম বানাই, তাহলে আলাদা কথা। বুঝতে পেরেছেন?’

‘আমি আপনার মনটাকে শান্ত করার চেষ্টা করছিলাম, তার বেশি কিছু না। ’

‘মন শান্ত করার জন্য দুঃখের সাগরে ভেসে থাকা আপনার মতো বেজন্ম কাউকে যখন দরকার হবে আমার, আমি তখন অবসর নেব। আমি বিরক্ত হয়ে এই সাক্ষাতে রাজি হয়েছি, উদ্যম। আমি চাইছি এটা এখানেই থামুক। আপনার যদি ইচ্ছে হয়ে থাকে হিমালয় পাহাড় কিনবেন, সেটা আপনার ব্যাপার। সেটাকে আমারও ব্যাপার করতে যাবেন না। যদি দরজা খোলা রাখতাম, আপনার মতো এ রকম পাগলামি প্রতি সপ্তাহে দু-চারটে করে শুনতে হতো আমাকে। আপনার প্রতি খানিক সম্মানবোধ ছিল। তবে এর সমাপ্তি এখানেই। পরিষ্কার কি না?’

‘হ্যাঁ,’ বলল উদ্যম। ‘কিন্তু আমি একজন উকিলকে নিয়ে আসছি, জানেন তো?’

‘আল্লাহ! কেন?’

‘আমার ধারণা, ব্যাপারটা আমরা গুছিয়ে ফেলতে পারব,’ বলল উদ্যম। আমার জবানবন্দি, মাখনা নেহালের জবানবন্দি, গলফ ক্লাবের কর্মচারীদের জবানবন্দিসহ রেকর্ডস যেখানে যা আছে সব জড়ো করে জায়গামতো পুনরায় বিচারের আবেদন করা হবে। আমার ধারণা, সব আমরা সাজিয়ে ফেলতে পারব। ’

‘এই জেলখানায় এখন আর আপনি মাখনা নেহালকে পাচ্ছেন না। ’

‘হোয়াট?’

‘তাকে ট্রান্সফার করা হয়েছে। ’

‘ট্রান্সফার করা হয়েছে কোথায়?’

‘জাফলংয়ে। ’

এবার চুপ হয়ে গেল উদ্যম। ইন্টেলিজেন্ট মানুষ সে, তবে গোটা ব্যাপারটা থেকে চুক্তি চুক্তি যে গন্ধটা ছড়াচ্ছিল সেটা অসাধারণ একটা হাবা লোকের ইন্দ্রিয়কেও ফাঁকি দিতে পারত না। জাফলংয়ে যে নতুন জেলখানা হয়েছে, ওখানকার নিরাপত্তাব্যবস্থা নামকাওয়াস্তে।

‘কিন্তু কেন?’ জিজ্ঞেস করল উদ্যম। ‘কেন আপনি—?’

‘আপনার ভালোর জন্য,’ শান্ত গলায় বললেন আলফাজুর রহমান। ‘খুলনার ওই জেলখানার সঙ্গে যোগাযোগ করেছি আমি। মীর শাফকাত নামের এক কয়েদি সত্যি ওদের ওখানে ছিল একসময়। সাজার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে তাকে। ঠিকানা একটা রেখে গেলে কী হবে, আমি খোঁজ নিতে বলার পর দেখা গেছে সেটা ভুয়া। ’

উদ্যম জানতে চাইল, ‘ওখানকার ওয়ার্ডেন...তিনি কি আপনার বন্ধু?’

রহমান সাহেবের মুখে সতর্ক প্রহরীর টান টান হাসি। ‘আমাদের মধ্যে সদ্ভাব আছে আর কি। ’

‘কেন?’ প্রশ্নটা আবার করল উদ্যম। ‘আপনি আমাকে বলতে পারছেন না এই কাজ আপনি কেন করতে গেলেন? আপনি জানেন আমি ওই বিষয়ে আলাপ করতে পারি না...যে বিষয়ে আপনি জড়িয়ে পড়তে চাইতে পারেন। আপনি সেটা জানতেন। তাহলে কেন?’

‘আপনার মতো লোক আমাকে অসুস্থ করে তোলে,’ চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন মৌলানা সাহেব। ‘আপনি যেখানে আছেন ওখানেই আপনাকে আমার ভালো লাগছে, জনাব উদ্যম। এবং আমি যত দিন কাঠফাটায় আছি, আপনাকেও এখানে থাকতে হবে। শুনুন, আমি জানি নিজেকে আপনি সবার চেয়ে উত্তম জ্ঞান করেন। একজন মানুষের মুখ দেখে আমি তার সবটুকু পড়ে নিতে পারি। প্রথম যেদিন আমি লাইব্রেরিতে পা রাখলাম সেদিনই ব্যাপারটা জেনেছি, বলা যায় আপনার কপালে বড় হরফে সেটা লেখা আছে। তবে সেসব এখন নেই, মুছে গেছে। আর এখনকার ম্রিয়মাণ ধরনটাই আমার পছন্দ। আগে দেখতাম উঠানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন যেন একজন রাজা, ওটা যেন আপনার দরবার। চোখ খোলা রাখব, আবার ওভাবে হাঁটতে দেখলে সলিটারিতে পাঠাব। এবার যান, বেরিয়ে যান এখান থেকে। ’

‘ঠিক আছে। কিন্তু সরকারি অনুমতি না নিয়ে যেসব কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছে এখানে, যেসব খাত থেকে প্রচুর টাকা সংগ্রহ করা হচ্ছে, সব বন্ধ হয়ে যাবে এখন থেকে। আপনার কাছে যে টাকা জমা হচ্ছে, ওগুলো সত্ভাবে রোজগার করা, আমার তৈরি করা কাগজপত্র তা-ই বলবে বলে জানিয়েছিলাম—কিন্তু এখন আর তা বলবে না। ’

আলফাজুর রহমানের চেহারা প্রথমে লালচে, তারপর কালচে হয়ে গেল। ‘দুঃসাহস দেখিয়ে এই কথাটা বলার অপরাধে ত্রিশ দিন সলিটারি পেলেন, রুটি আর পানি। আরো একটা কালো দাগ। আপনার জীবন আমি স্রেফ নরক বানিয়ে ছাড়ব। সখিরা আপনাকে তাদের তালিকার বাইরে রেখেছে, তাই না? আমাকে অসন্তুষ্ট করলে ওদের আবার লেলিয়ে দেব। আপনি সব কিছু হারাবেন। পরিষ্কার কি না?’

আমার ধারণা, খুবই পরিষ্কার।

সময় বইতে থাকে। পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো চাতুর্য, এবং সম্ভবত এটাই একমাত্র সত্যিকার জাদু। তবে উদ্যম হাসান বদলে গেছে। বদলে শক্ত আর কঠিন হয়ে গেছে। একমাত্র এভাবেই তার অবস্থার বর্ণনা দিতে পারি আমি। লাইব্রেরির অস্তিত্ব ধরে রাখার জন্য মৌলানা রহমানের নোংরা কাজ করে যাচ্ছে সে, ফলে বাইরে থেকে দেখে সব কিছু সেই আগের মতোই লাগছে—সব।

উনিশ বছর পর আমার কাছে আবার একটা রক হ্যামার চাইল উদ্যম। ভাবতে পারেন, উনিশ বছর! প্রথমটার ধার কমে গেছে। রক হ্যামারের দাম বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে শুনে দুজন খুব হাহাহাসি করলাম আমরা।

শরীরচর্চার উঠান থেকে সংগ্রহ করা পাথর আগের মতোই ঘষছে সে, পলিশ করছে, নিজের সেলে সাজিয়ে রাখছে, আবার মন চাইলে একে-তাকে উপহার দিচ্ছে। তার সেলের পুব দিকের জানালায় বেশ কয়েকটা ভাস্কর্য রেখেছে সে, সকালের প্রথম রোদ লাগে ওগুলোতে। তখন নাকি খুব ভালো লাগে তার। একসময় সবই বিলি করে দিতে হয় তাকে, কারণ জায়গার অভাবে নতুন বানানো ভাস্কর্য মেঝেতে ফেলে রাখতে হয়। আমাকেই নিজের তৈরি বিশটা ভাস্কর্য দিয়েছে সে। আকারে ছোট হলেও প্রতিটির নিজস্ব আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। মাঝেমধ্যে ভাবি উদ্যমের যদি মন আর সুযোগ থাকত, খুব নামকরা একজন শিল্পী হতে পারত সে।

 

মৌলানা রহমানের কাছে উদ্যমের হার হওয়ার পর কিভাবে যেন এক-দুই করে চার বছর পার হয়ে গেছে। বদলে গিয়ে আর সব কয়েদির মতো হয়নি সে, হয়েছে নীরব, আত্মকেন্দ্রিক, বিষণ্ন আর চিন্তিত। কে তাকে দোষ দেবে বলুন? কাজেই ধরে নেওয়া চলে যে মৌলানা রহমান তার ওপর সন্তুষ্টই আছেন, অন্তত আপাতত।

সে বছর অক্টোবরের দিকে, কত সাল সঠিক মনে করতে পারি না, উদ্যমকে আমি বিষণ্নতা কাটিয়ে উঠতে দেখলাম। একদিনের কথা মনে পড়ছে। দেয়ালে গায়ে হেলান দিয়ে, হাঁটু ভাঁজ করা, উঠানের মাটিতে বসে আছে সে, দুহাতে ছোট ছোট পাথর, মুখটা সূর্যের দিকে তোলা।

‘হ্যালো, সদয়,’ গলা চড়িয়ে ডাকল সে। ‘এসো, এখানে বসে একটু ধ্যান করি আর প্রার্থনা করি—যা কিছু অশুভ সব দূর হয়ে যাক। ’

ওর পাশে গিয়ে বসলাম।

‘এটা তুমি নেবে?’ জিজ্ঞেস করল সে, দুটো পলিশ করা মূর্তির একটা দেখাল আমাকে।

‘হ্যাঁ, নেব। সত্যি ভারি সুন্দর। ধন্যবাদ। ’

কাঁধ ঝাঁকিয়ে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেল। ‘আগামী বছর তোমার জন্য বিরাট একটা বার্ষিকী আসছে। ’

মাথা ঝাঁকালাম। আগামী বছর এখানে আমার ত্রিশ বছর পুরো হবে। আমার জীবনের ষাট ভাগ কাঠফাটায় কেটেছে।

‘কী মনে হয়, তুমি কখনো এখান থেকে বেরোতে পারবে?’

‘শিওর। আমার তখন লম্বা সাদা দাড়ি থাকবে, আর অবশিষ্ট থাকবে মাত্র তিনটে মার্বেল, দোতলার কোথাও গড়াগড়ি খাচ্ছে। ’

মৃদু হেসে সূর্যের দিকে আবার মুখ তুলল, চোখ বন্ধ। ‘ভালো লাগছে। ’

‘শীত চলে আসতে আর বেশি দেরি নেই তো, ভালো লাগার সেটাই হয়তো কারণ। ’

মাথা ঝাঁকাল উদ্যম। তারপর দুজনেই বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে আছি।

‘যদি কোনো দিন বেরোতে পারি, তাহলে সব সময় গরম আবহাওয়া থাকে সে রকম জায়গায় যাব। সেটা আমার বাছাইও করা আছে। কোথায় জানো?’

‘কোথায়?’

‘দক্ষিণ ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপে,’ বলল সে, সুর করে উচ্চারণ করল, কোমল স্বর। ‘ভারত মহাসাগরের কোলে তেরো হাজার দ্বীপের একটা। প্রচুর পাহাড়, তবে মাটি খুব উর্বর। জাভার পুবে, বুঝলে, দ্বীপটাকে মাঝেমধ্যে পুবের রত্ন বলা হয়। নাচ, ধর্মীয় আচার আর হস্তশিল্পের জন্য বিখ্যাত। বালি পরিবারগুলো অসম্ভব অতিথিপরায়ণ। আর ওখানেই আমি আমার জীবনটা শেষ করতে চাই, সদয়। একটা উষ্ণ জায়গা, যার একটা সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আছে। ’

কথা বলার সময় মুঠোভর্তি করে কাঁকর নিল, একটা একটা করে ছুড়ছে, ওগুলোকে লাফাতে দেখছে, গড়াতে দেখছে।

‘বালি। ওখানে আমি ছোট একটা হোটেল শুরু করব। সৈকত বরাবর ছয়টা কটেজ, আরো ছয়টা বেশ খানিক পেছন দিকে। আমার জানাশোনা লোক আছে, আমার গেস্টদের মাছ ধরতে নিয়ে যাবে সে। মৌসুমের সবচেয়ে বড় মাছ যে ধরবে তাকে ট্রফি দেওয়া হবে, তার ছবি ঝুলিয়ে রাখব লবিতে। যারা হানিমুনে আসতে চায়, শুধু তাদের জন্য খোলা থাকবে আমার হোটেল। ’

‘টাকা লাগবে না? কোথায় পাবে?’

‘এমন একটা বাড়ির কথা কল্পনা করো, সদয় জাহান, যে বাড়ির ভেতর দেশি-বিদেশি নামকরা শিল্পীদের আঁকা ছবি, ভাস্কর্য, প্রাচীন যুগের অ্যান্টিক, পুরনো কয়েনের কালেকশন থেকে শুরু করে সিন্দুক ভর্তি সোনার গয়না, কিছু মূল্যবান রত্ন ইত্যাদি আরো বহু কিছু তালা দিয়ে রাখা আছে। ’

‘ওই বাড়িটা তোমার বলতে চাইছ?’

‘ওটা দেখাশোনা করছিল আমার এক বন্ধু, বছর ছয়েক আগে মারা গেছে সে। পুরনো আমলের বিশ্বস্ত লোকজন দেখেশুনে রাখছে আর কি। তবে আনোয়ারায়, কবরস্থানসংলগ্ন মসজিদের পেছনে একটা বটগাছ আছে। ওই গাছের গোড়ায়—পুব দিকে—পুঁতে রাখা আছে একগোছা চাবি, কিছু কাগজপত্র, যেগুলো আমাকে নতুন একটা পরিচিতি দেবে—কারো সাহায্য ছাড়াই ঢুকতে পারব বাবার বাড়িতে, ব্যাংক থেকে টাকা নিতে পারব। এর সবই আমার ওই বন্ধু আমার জন্য করে রেখে গেছে। আমার কিছু শুভাকাঙ্ক্ষী অবশ্য সাহায্য করেছে তাকে। ’

‘জিনিসপত্র যা আছে, কত দামে বেচতে পারবে?’

‘দুকোটি টাকার কম নয়। ’

‘আর বাড়িটার দাম কত পাবে?’

‘আরো তিন কোটি ধরো, পুরো এক বিঘা জায়গার ওপর। ’

‘জোড়া খুনের অভিযোগে তোমার আমৃত্যু জেল হলো, কিন্তু তোমার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হলো না কেন?’

‘আমার সম্পত্তি? আরে না, তখনো এসব আমার সম্পত্তি হয়নি। সব আমার বাপের নামে ছিল, এবং বাবা বহাল তবিয়তে বেঁচেও ছিলেন তখন, কাজেই আদালত ওদিকে হাত বাড়াতে পারেননি। ’

‘তার মানে তুমি যখন উকিল ডাকবে বলেছিলে, সেটা তোমার ছেলেমানুষি ছিল না? এত যার টাকা, দেশের সবচেয়ে বড় লইয়ারকে ভাড়া করতে পারো তুমি। কেন করোনি, উদ্যম? ও আল্লাহ! এখান থেকে তুমি রকেটের মতো বেরিয়ে যেতে পারতে!’

মৃদু হাসল উদ্যম, তারপর বলল, ‘না। ’

‘না? কেন না?’

‘বাবা মারা গেছেন। আইনত এখন আমি ওই সম্পত্তির মালিক। কিন্তু যখনই আমি ওখান থেকে টাকা নেওয়ার জন্য হাত বাড়াব, অমনি ওটার ওপর ওদের নজর পড়বে, এবং সেটা বাজেয়াপ্ত করার চেষ্টা চালানো হবে। সমস্যাটা বুঝতে পারছ এবার?’

‘হ্যাঁ, পারছি। ’

‘তবে আমার বালি যাওয়া কেউ ঠেকাতে পারবে না। শুধু ওই বাড়ি আর জিনিসপত্র নয়, এদিক-সেদিক আরো অনেক কিছু আছে আমার। সব যে নিয়ে যাব, তা হয়তো নয়। তবে ওই হোটেলটা আমি করতে চাই। আমি আমার স্ত্রীকে খুন করিনি, আমি তার প্রেমিককেও খুন করিনি। যে অপরাধ করিনি তার জন্য এত ভুগতে হলো, এবার সাগরে একটু সাঁতরাতে চাই, রোদে পোড়াতে চাই গায়ের চামড়া। এত কিছুর পর আমি কি খুব বেশি কিছু চাইছি, সদয়?’

আমি মাথা নাড়লাম।

‘কী জানো, সদয়, ও রকম একটা জায়গায় বন্ধুর সঙ্গ পেলে ভালো লাগে। আমার এমন একজন লোক দরকারও, যে সব কিছু ম্যানেজ করতে জানে। ’

তার প্রস্তাব নিয়ে অনেকক্ষণ চিন্তা করলাম আমি। তারপর বললাম, ‘না, তা উচিত হবে না, উদ্যম। এখানে আমি ম্যানেজ করতে পারি, ঠিক, কিন্তু তার মানে এই নয় যে বাইরেও আমি তা পারব। আমি আসলে জানি না কিভাবে আমাকে শুরু করতে হবে, বা কোত্থেকে শুরু করতে হবে। ’

‘তুমি নিজেকে ছোট করে দেখো,’ বলল সে। ‘তুমি একজন স্বশিক্ষিত মানুষ, নিজেই নিজেকে তৈরি করে নিয়েছ। একজন মানুষ সম্পর্কে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কী হতে পারে। ’

‘কিন্তু আমার ভেতর মারাত্মক ধরনের অপরাধপ্রবণতা ছিল, আর...’

‘হ্যাঁ, ছিল তো, তা না হলে কেউ নিজের স্ত্রীকে খুন করতে যায়? কিন্তু তারপর? আর কোনো অপরাধ নিজেকে দিয়ে করাতে পেরেছ? সেদিকে তোমার ঝোঁক টের পেয়েছ কখনো? একটা অপরাধ করে সেটা হজম করতে পারোনি, সারাটা জীবন ধরে অনুশোচনায় ভুগছ। ’

নিজের সম্পর্কে আমার কিছু বলার নেই—নিজের কথা আমি যতটুকু জানি, উদ্যম দেখছি তার চেয়ে কম কিছু জানে না। বললাম, ‘বাইরে আমি ভালো করব না, এটা আমি জানি, উদ্যম। ’

দাঁড়াল সে। ‘এটা নিয়ে আরো চিন্তা করো,’ সাবধানে বলল, ‘সিদ্ধান্ত যদি কোনো দিন বদলাও ভেবে তোমার ব্যবস্থা আমার করা থাকবে। ’ তারপর শান্ত পায়ে চলে গেল, সে যেন একজন মুক্ত মানুষ, আরেকজন মুক্ত মানুষকে এই মাত্র একটা প্রস্তাব দিয়ে গেল। কিন্তু সেলের ভেতর রাতে আবার নিজেকে আমার কয়েদি মনে হতে লাগল।

দিন কাটছে, কিন্তু আমার মন শান্ত হতে পারছে না। মেক্সিকো যাওয়ার কথা নিয়ে যেদিন আলাপ করল উদ্যম, সেদিন থেকেই আমার মনে একটা সন্দেহ দানা বেঁধেছে, সে সম্ভবত গায়েব হয়ে যাওয়ার প্ল্যান করছে।

কিন্তু কাঠফাটা থেকে পালানোর চেষ্টা শতকরা নিরানব্বই ভাগ ব্যর্থ হওয়ার রেকর্ড আছে। তবে গার্ডরা সহায়তা করলে অন্য হিসাব। এসব মৌলানা রহমান জানেন, এবং উদ্যমের ওপর কড়া নজর আছে তাঁর।

আমি এখনো মনে করি তার মুক্তি পাওয়ার সবচেয়ে ভালো সুযোগ তৈরি হবে দক্ষ একজন লইয়ারের ওপর সব যদি ছেড়ে দেওয়া হয়, বিচারটা যদি আবার নতুন করে অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা যায়।

এসব প্রসঙ্গ নিয়ে উদ্যমের সঙ্গে প্রায়ই আমি কথা বলি। সে শুধু একটু একটু হাসে, তার চোখ থাকে বহু দূরে, আমাকে আশ্বস্ত করার সুরে বলে বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করছে সে।

পরে দেখা গেল আরো অনেক কিছু নিয়ে চিন্তা করছিল উদ্যম হাসান।

ছয় মাস পর কাঠফাটা থেকে পালিয়ে গেল উদ্যম। অনেক চেষ্টা করেও পরে আর তাকে ধরা সম্ভব হয়নি, তাকে আর কোনো দিন ধরা যাবে বলেও আমি মনে করি না। সত্যি কথা বলতে কি, উদ্যম হাসান নামে আর কারো কোনো অস্তিত্বই নেই। কেন এ কথা বলছি? সে আমাকে একবার বলেছিল, তার এক বন্ধু এবং কিছু শুভাকাঙ্ক্ষী তার নতুন পরিচয়, নতুন পাসপোর্টসহ যা যা লাগতে পারে সব কিছুর ব্যবস্থা করে রেখেছে—একবার শুধু বাইরে বেরোতে পারলে হয়, উদ্যম হাসান চিরকালের জন্য হারিয়ে যাবে। তারা এমনকি ইঞ্জিন লাগানো নৌকা করে আন্দামান কি মালয়েশিয়ায়ও পৌঁছে দিতে পারবে তাকে। তারপর একটা প্লেন ধরে পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় পৌঁছে যাওয়া সম্ভব।

উদ্যম হাসান দেশে নেই, তবে ইন্দোনেশিয়ার বালিতে একজন লোক আছে, তার নাম আমি জানি না, তবে যদি কোনো দিন দেখি চিনতে পারব ঠিকই। সে সম্ভবত ছোট একটা হোটেল চালাচ্ছে।

যতটুকু জানি এবং আমার মনের কী ভাবনা, এখন আমি শুধু সেটুকুই বলতে পারি, তাই না?

 

 

 

আট.

 

ধাক্কাটা এমন জোরে লাগল, চেয়ারে বসা মৌলানা রহমান এত জোরে লাফ দিলেন যে মনে শঙ্কা জাগল ছাদ ফুঁড়ে না বেরিয়ে যান।

আমি খুব বিশ্বস্ত সূত্র থেকে এসব জানতে পেরেছি। বলাই বাহুল্য যে আমার সূত্রের নাম বাদল মিয়া; জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ—সবই যাকে করতে হয়। সেদিন প্রশাসনিক ভবনের মেঝেতে তরল জীবাণুনাশক ছিটাচ্ছিল সে। তার ভাষ্য অনুসারে কারো কথা শোনার জন্য সেদিন তাকে কান দিয়ে কি হোলের চারপাশ পলিশ করতে হয়নি, রেকর্ড অ্যান্ড ফাইলস সেকশন থেকে ওয়ার্ডেনের চিৎকার পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছিল সে, তিনি যখন গার্ডদের নতুন চিফ পল্টন চাকলার মুণ্ডু চিবিয়ে খাচ্ছিলেন।

‘এ কথা বলে কি বোঝাতে চান, আপনি সন্তুষ্ট যে জেলখানার ভেতর নেই সে? কী বলছেন আসলে আপনি? বলছেন তাকে আপনি পাননি! ভালো চান তো পান তাকে! নিজের ভালো আপনাকেই চাইতে হবে! কারণ আমার তাকে দরকার! আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন? তাকে আমার দরকার!’

কী যেন বলল পল্টন।

‘আপনার শিফটে ঘটেনি? এটা আপনি বলছেন। আমি যতটুকু বুঝতে পারছি, কেউ জানে না ব্যাপারটা কখন ঘটেছে। কিংবা কিভাবে ঘটেছে। কিংবা আদৌ তা ঘটেছে কি না। এখন কান খুলে শুনুন আমি কী বলি। আজ বিকেল তিনটের মধ্যে আমার অফিসে তাকে আমি দেখতে চাই। তা যদি দেখতে না পাই, কিছু মাথা অবশ্যই গড়াগড়ি খাবে। এটা আমার প্রতিশ্রুতি, এবং আমি সব সময় প্রতিশ্রুতি রক্ষা করি। ’

পল্টনের মুখ থেকে আবার কিছু বেরোল, তাতে নিশ্চয়ই আরো খোঁচা লাগার উপাদান ছিল, কারণ ওয়ার্ডেন এবার তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন।

‘না? তাহলে এটা দেখুন! এটা দেখুন! চিনতে পারছেন জিনিসটা? সেলব্লক পাঁচের টালি খাতা। প্রত্যেক কয়েদিকে উপস্থিত দেখানো হয়েছে এখানে! উদ্যমকে কাল রাত নটায় তালা দেওয়া হয়েছে, আর তাই তার পক্ষে কোথাও বেরিয়ে যাওয়া অসম্ভব! একেবারেই অসম্ভব! এবার আপনি তাকে খুঁজে বের করুন!’

 

কিন্তু সেদিন সন্ধে ছয়টায়ও নিখোঁজ থাকল উদ্যম। মৌলানা রহমান নিজে ঝড় তুলে ছুটে এলেন সেলব্লক পাঁচে, ওখানে সারাটা দিন সবাইকে আটকে রাখা হয়েছিল। আমাদের জেরা করা হয়েছিল কি না? আমাদের প্রত্যেককে কম করেও আট-দশবার করে জেরা করা হয়েছে, এবং যারা জেরা করেছে সেই গার্ডদের ঘাড়ে সারাক্ষণ গরম নিঃশ্বাস ফেলছিল ড্রাগন। উত্তরে সবাই একই কথা বলেছি : আমরা কিছু দেখিনি, কিছু শুনিনি। এবং আমার যত দূর জানা আছে, সবাই আমরা সত্যি কথাই বলছিলাম। আমার অন্তত জানা আছে যে আমি সত্যি কথা বলেছি। আমরা শুধু বলতে পারলাম যে তালা দেওয়ার সময় উদ্যম তার সেলেই ছিল, সেলে ছিল এক ঘণ্টা পর আলো নেভানোর সময়ও।

চতুর একজন ধারণা দিল, উদ্যম নিজেকে তালার ফুটোর ভেতর পিচ্ছিল তরলের মতো ঢেলে দিয়েছিল। তাকে সঙ্গে সঙ্গে চার দিনের জন্য সলিটারিতে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। ওদের মেজাজ একেবারে সপ্তমে চড়ে আছে।

কাজেই মৌলানা রহমান নিচে নেমে এলেন। আমাদের দিকে এমন কটমট করে তাকালেন, চোখ থেকে যেন আগুনের ফুলকি বেরোতে লাগল, তিনি যেন জানেন আমরা সবাই এটার সঙ্গে জড়িত।

উদ্যমের সেলে ঢুকলেন তিনি, চারদিকে তাকাচ্ছেন। উদ্যম যেভাবে রেখে গেছে সেভাবেই পড়ে আছে সেলটা, বিছানার চাদরে ভাঁজ পড়েনি দেখে বোঝা যায় ওখানে শোয়নি সে। জানালার গোবরাটে কয়েক সারি পলিশ করা পাথর রয়েছে, তবে সবগুলো নয়। যেগুলো তার বেশি ভালো লাগত, বেছে বেছে শুধু সেগুলো সঙ্গে করে নিয়ে গেছে।

‘পাথর,’ হিসহিস করে উঠলেন আফজালুর রহমান, হাত ঝামটা দিয়ে গোবরাট থেকে ফেলে দিলেন সব। পল্টন, যার ওভারটাইম চার ঘণ্টা ছাড়িয়ে গেছে, চোখ-মুখ কুঁচকে শিউরে উঠল, তবে কিছু বলল না।

এবার রহমান সাহেবের চোখ পড়ল প্রিন্সেস ডায়ানার ওপর, উদ্যমকে সাপ্লাই দেওয়া আমার সর্বশেষ পোস্টার ওটা। প্রিন্সেস সাফারি স্যুট পরে আছেন, মুখে লাজুক হাসি, চোখে বিষাদের ছায়া। রহমান সাহেব এমন আগুনঝরা দৃষ্টিতে পোস্টারের দিকে তাকিয়ে আছেন, আমার মনে পড়ে গেল ওটা সম্পর্কে উদ্যম একবার কী মন্তব্য করেছিল—তার ইচ্ছে হয় পা বাড়িয়ে পোস্টারের ভেতর ঢুকে পড়ে, ডায়ানার সঙ্গে থাকে ওখানে।

একেবারে বাস্তব অর্থে ঠিক তা-ই করেছে উদ্যম, এবং একজন মৌলানা রহমান আর মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সেটা আবিষ্কার করতে যাচ্ছেন।

‘নোংরা জিনিস!’ ঘোঁতঘোঁত করে বললেন তিনি, তারপর দেয়ালের গায়ে সাঁটা পোস্টারটা একটানে ছিঁড়ে ফেললেন।

আরে, কী আশ্চর্য! ওখানে আরেকটা পোস্টার দেখা যাচ্ছে। ওটা মধুবালার পোস্টার, উদ্যমকে দেওয়া আমার প্রথম পোস্টার। ‘নোংরা মানুষ!’ হিসহিস করে বললেন রহমান সাহেব, তারপর টান দিয়ে মধুবালাকেও ফড়ফড় করে ছিঁড়ে ফেললেন।

আর তাতেই পেছনের নিরেট কংক্রিটের দেয়ালে বিরাট হাঁ করে থাকা গর্তটা বেরিয়ে পড়ল।

সবুজ পল্টন ভেতরে ঢুকবে না।

মৌলানা রহমান তাকে হুকুম করলেন—আল্লাহ, জেলখানার প্রতিটি কোণ থেকে শোনা গেল তার কান ফাটানো চিৎকার। এবং পল্টন কোনো সময় নিল না, সঙ্গে সঙ্গে বলে দিল এটা তার পক্ষে সম্ভব নয়।

‘এই বেআদবির জন্য আমি আপনার চাকরি খাব!’ গর্জে উঠলেন ওয়ার্ডেন। তাঁর মাথাটা মনে হলো পুরোটা গেছে। কপালের চামড়ায় ফুলে ওঠা দুটো শিরা দপদপ করতে দেখছি আমরা। ‘ভাববেন না এটা আমার মিথ্যে হুমকি...এটা আমি করেই ছাড়ব! শুধু তা-ই নয়, আমি এও দেখব, কোনো জেলখানায় আপনার যাতে চাকরি না হয়!’

নিজের পিস্তলটা নীরবে মৌলানার দিকে ধরল পল্টন, মুঠোর ভেতর মাজল। সে আসলে শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে, আর কোনো ধকল সহ্য করার মতো অবস্থায় নেই।

আকাশ থেকে আলোর রেশ তখন হারিয়ে যেতে বসেছে, ওখানে দাঁড়িয়ে আটাশজন গার্ড মৌলানা রহমানের তর্জন-গর্জন আর লাফঝাঁপ অপলক চোখে দেখছে আর গম্ভীর মুখে শুনছে। এবং খোদার কসম বলছি, আমার পরিষ্কার মনে হলো কোত্থেকে যেন উদ্যমের হাসির শব্দ ভেসে আসতে শুনছি আমি।

অবশেষে পাটখড়ির মতো রোগা এক লোককে ওই গর্তের ভেতর ঢুকতে রাজি করলেন মৌলানা রহমান, তার নাম মোজু মুন্সি। কাঠফাটায় বুদ্ধিমান বলে তার কোনো পরিচিতি নেই। তার হয়তো ধারণা ছিল কাজটা করলে ভালো কিছু পুরস্কার পাওয়া যাবে। তবে মৌলানার ভাগ্য ভালো বলতে হবে যে এই কাজের জন্য শেষ পর্যন্ত তিনি উদ্যমের মতো একই রকম লম্বা আর রোগা একজনকে খুঁজে পেয়েছেন। গার্ডদের কাউকে পাঠালে নির্ঘাত ভেতরে আটকে যেত সে, এবং তারপর হয়তো তাকে ওখানেই থেকে যেতে হতো।

একপ্রস্ত নাইলন ফিলামেন্ট রশি নিয়ে ভেতরে ঢুকল মোজু মুন্সি। ওই রশি তার কোমরে পেঁচানো হয়েছে। এক হাতে টর্চ। ইতিমধ্যে পল্টন, যে দায়িত্ব ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত আপাতত বাতিল করেছে, এবং সে-ই একমাত্র ব্যক্তি যার কিনা চিন্তা-ভাবনার মধ্যে যুক্তি আর স্বচ্ছতা দেখা যাচ্ছে, কোত্থেকে কে জানে কিছু ব্লুপ্রিন্ট জোগাড় করে এনেছে। আমি ভালো করে জানি ওগুলোতে কী দেখতে পাবে সে—একটা পাঁচিল, তারপর আরেকটা পাঁচিল, পাঁচিলের পর পাঁচিল, এবং শুধু পাঁচিল আর পাঁচিল—মস্ত একটা স্যান্ডউইচের মতো। এক জোড়া পাঁচিলের মাঝখানে হয়তো আধহাত ফাঁক। সব মিলিয়ে পাঁচিলের ওই সমষ্টি দশ ফুট পুরু।

গর্তের ভেতর থেকে মোজু মুন্সির গলা ভেসে এলো। ‘স্যার, এখানে খুব খারাপ একটা গন্ধ পাচ্ছি,’ অভিযোগ করল সে।

‘গ্রাহ্য কোরো না! এগোতে থাকো। ’

মুন্সির পায়ের নিচের অংশ আমাদের চোখের আড়ালে চলে গেল।

তারপর আবার অভিযোগ করল সে, এবার প্রায় কেঁদে ফেলার অবস্থা। ‘স্যার, এই দুর্গন্ধ সহ্য করার মতো নয়!’

‘বললাম না, গ্রাহ্য কোরো না!’ চেঁচিয়ে উঠলেন ওয়ার্ডেন।

মুন্সি বলল, ‘একদম গু, স্যার। আমাকে গ্রাহ্য না করতে বলছেন, আপনি কি গ্রাহ্য না করে পারবেন? ও আমার আল্লারে, এখান থেকে বের করো আমাকে! ও আমার আল্লারে...’ তারপর আমরা পরিষ্কার শুনতে পেলাম মোজু মুন্সি তার শেষ দুপ্রস্ত ভরপেট আহার হারিয়ে ফেলছে।

ব্যস, আমার ওটাই দরকার ছিল। বিশ্বাস করুন, আমি নিজের কোনো সাহায্যে এলাম না। সারাটা দিন—ধ্যাত্তারিকা, গত ত্রিশটা বছর—সব একসঙ্গে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, আর আমি হাসতে শুরু করলাম, সে এমন বেদম এক হাসি যে আমাকে পাকা বাঙ্গির মতো ফাটিয়ে দিতে পারে, সে এমন আশ্চর্য এক হাসি যে যখন মুক্ত মানুষ ছিলাম তখন থেকে একবারও আমি শুনতে পাইনি, এমন এক ধরনের প্রাণসমৃদ্ধ হাসি যে ধূসর পাঁচিলের ভেতর কখনো হাসতে পারব বলে আমি আশা করিনি। আর, কিভাবে ব্যাখ্যা করব কী ভীষণ মজাই না লাগল আমার!

‘ওই লোককে ওখান থেকে বের করো!’ চেঁচাচ্ছেন ওয়ার্ডেন। আর আমি এত জোরে হাসছি যে বুঝতে   পারলাম না তাঁর চিৎকার আমাকে লক্ষ্য করে, নাকি মোজু মুন্সিকে লক্ষ্য করে। আমি যেমন হাসছিলাম তেমনি হাসছি, চাপড় মারছি ঊরুতে, হাত দিয়ে পেট চেপে ধরেছি। খোদার কসম বলছি, জীবনেও আমি থামতে পারতাম না, মৌলানা সাহেব গুলি করে আমার খুলি উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি যদি না দিতেন।

‘ওকে বের করো!’

কপাল। যেতে হলো আমাকে।

 

 

 

নয়.

 

যেতে হলো সোজা সলিটারিতে, এবং ওখানে আমাকে একটানা পনেরো দিন থাকতে হলো। অনেক লম্বা শাস্তি। তবে মন চাইলেই আমি অনুজ্জ্বল মোজু মুন্সির করুণ বিলাপ স্মরণ করি, বলছে দুনিয়ার সবচেয়ে নোংরা বস্তু তার শরীরে মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে, গর্ত থেকে বেরোতে পারলে ওয়ার্ডেন স্যারকে জড়িয়ে ধরবে সে; তারপর কল্পনা করি উদ্যম হাসান ইঞ্জিন লাগানো নৌকায় চড়ে আনোয়ারা থেকে রওনা হচ্ছে, পরে আছে ভারি সুন্দর সেলাই করা কালো স্যুট, এবং এই দৃশ্য আমাকে একা একা হাসতে বাধ্য করে। বলতে পারেন প্রায় নিজের মাথার ওপর দাঁড়িয়ে ওই পনেরো দিন সলিটারিতে এটাই করেছি আমি। এর কারণ সম্ভবত আমার অর্ধেক উদ্যম হাসানের সঙ্গে রয়েছে; উদ্যম হাসান, যাকে দুর্গন্ধময় বর্জের ভেতর হাঁটতে হয়েছে, অথচ তা থেকে অপর প্রান্তে উঠে এসেছে পরিচ্ছন্ন হয়ে; উদ্যম হাসান, যাচ্ছে মালয়েশিয়া হয়ে বালি দ্বীপের দিকে।

বাকিটুকু আমি সেদিন রাতে অন্তত বারোটা আলাদা আলাদা উৎস থেকে শুনেছিলাম। যদিও খুব বেশি কিছু না কিন্তু। মোজু মুন্সি সম্ভবত তার লাঞ্চ আর ডিনার খোয়ানোর পর, মৌলানা পুরস্কার দেবেন ঘোষণা করায়, নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে, কারণ সে বুঝতে পারে তার আসলে আর খুব বেশি কিছু হারানোর নেই, কাজেই আবার এগোতে শুরু করল সে। সেলব্লক পাঁচিলের ভেতর আর বাইরের অংশের মাঝখানে যে পাইপ-শ্যাফট আছে সেটা ভেঙে পড়ার কোনো আশঙ্কা ছিল না, ওই শ্যাফটের ভেতরটা এত সরু যে মুন্সি নিজেকে ওখানে গুঁজে দিয়ে এগোতে চেষ্টা করল। পরে তার বন্ধুদের বলেছে মুন্সি, মাত্র অর্ধেক শ্বাস নিতে পারছিল সে, এবং বুঝতে পারছিল এখানে তার জ্যান্ত কবর হয়ে যেতে পারে। শ্যাফটের তলায় পাওয়া গেল মাস্টার স্যুয়ার পাইপ, যে পাইপের ভেতর দিয়ে সেলব্লক পাঁচের চৌদ্দটা টয়লেটের মল নামে। ওটা চীনামাটির পাইপ, ত্রিশ বছর আগে বসানো হয়েছে। ওখানে ভাঙা পাওয়া গেল পাইপ, ভেতর দিকে পাইপের টুকরো স্তূপ হয়ে আছে, আর তাতে বাধা সৃষ্টি হয়েছে তরল প্রবাহে। আর ওই ভাঙা পাইপের পাশেই উদ্যম হাসানের রক হ্যামারটা পড়ে থাকতে দেখল মোজু মুন্সি।

উদ্যম মুক্তি পেয়েছে, তবে সেটা অর্জন করা সহজ ছিল না। যে শ্যাফটের ভেতর দিয়ে নিচে নেমেছে মুন্সি, পাইপটা এমনকি তার চেয়েও সরু। এত সরু, রোগা কাঠ মুন্সিকে ভেতরে নিচ্ছে না। সে যখন ভেতরে ঢুকতে পারল না, জানা কথা আর কেউও পারবে না। ওখানকার পরিস্থিতিকে আমার বিবেচনায় প্রায় অকথ্যই বলতে হবে। গর্ত আর রক হ্যামারটা পরীক্ষা করছে মুন্সি, পাইপ থেকে লাফ দিয়ে বেরিয়ে এলো একটা ইঁদুর। সে কসম খেয়ে বলেছে, ইঁদুরটা কুকুরছানার চেয়ে ছোট ছিল না। লাঠি গাঁথা একটা বাঁদরের মতো উদ্যমের সেলে ফেরত চলে আসে সে।

মোজু মুন্সি যা পারেনি, উদ্যম হাসান তা পেরেছে, ওই পাইপের ভেতর ঢুকেছে সে। তার হয়তো জানা ছিল পাইপের তরল বর্জ্য জেলখানা থেকে পাঁচ শ গজ পশ্চিমে জলার মধ্যে গিয়ে পড়ে। আমার ধারণা এটা সে অবশ্যই জানত। জেলখানার ব্লুপ্রিন্ট মোটেও সোনার হরিণ নয়, উদ্যম নিশ্চয়ই চোখ বুলিয়েছিল, আর তখনই পালানোর একটা পথ তার চোখে পড়ে গেছে। নিষ্ঠা আছে তার, কষ্টসহিষ্ণু, ধৈর্যশীল, গোছানো স্বভাব। তার জানা ছিল, ওই পাইপ বসানোর পর কখনো মেরামত বা বদলানো হয়নি।

পাঁচ শ গজ। প্রায় পাঁচটা ফুটবল মাঠের সমান দূরত্ব। এক মাইলের কিছু কম। সাপের মতো ক্রল করে এই দূরত্ব পার হয়েছে সে, হাতে হয়তো একটা পেনসিল টর্চ ছিল, কিংবা হয়তো দু-একটা দিয়াশলাই ছাড়া আর কিছু ছিল না। আমি কল্পনা করতে চাই না, কল্পনা করতে পারি না কী রকম দুর্গন্ধের ভেতর দিয়ে, কী রকম কাদাটে নোংরার ভেতর দিয়ে এগোতে হয়েছে তাকে। হতে পারে ইঁদুরের দল তার সামনে পড়িমরি করে ছড়িয়ে পড়েছে, আবার এমনও হতে পারে যে অন্ধকারে ওগুলো ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। পাইপ যেখানে বাঁক নিয়েছে, জোড়া লেগেছে, ওপরে উঠেছে বা নিচে নেমেছে, নিশ্চয়ই ওই সব জায়গা পার হতে কালঘাম ছুটে গেছে তার।

পাইপের শেষ মাথায়, কাদার ওপর, এক সেট পায়ের ছাপ দেখতে পেল ওরা, দূষিত পানিতে ডোবা জলার কিনারায়। ওখান থেকে দুই মাইল দূরে সার্চ পার্টি তার প্রিজন ইউনিফর্ম পেল—এক দিন পর।

খবরের কাগজে খুব বড় করে ছাপা হলো এই জেল ভেঙে পালানোর ঘটনা। তবে জেলখানার চতুর্দিকে পনেরো মাইল পর্যন্ত কেউ গাড়ি বা কাপড় চুরির ঘটনা রিপোর্ট করেনি, কিংবা চাঁদের আলোয় উলঙ্গ কাউকে দেখা গেছে বলে কিছু রটেওনি। ওদিকে অনেক খামার আছে, কিন্তু কোনো কুকুর সেভাবে ডাকেনি। পাইপ থেকে বেরিয়ে খানিকটা ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে গেছে সে।

তবে আমি বাজি ধরে বলতে পারি, সে গায়েব হয়েছে আনোয়ারার দিকে।

ওই স্মরণীয় ঘটনার তিন মাস পর মৌলানা রহমান রিজাইন করলেন। কথাটা বলতে অপার আনন্দ পাচ্ছি আমি যে উদ্যম এই ব্যক্তিকে একেবারে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে গেছে। তাঁর হাঁটার মধ্যে যে ঝাঁকি ছিল, সেটা আর কখনো দেখা যায়নি। মাথাটা এমন নিচু করে বিদায় নিলেন তিনি, যেন বেধড়ক মার খাওয়া একজন কয়েদি প্যারাসিটামল ট্যাবলেট আনার জন্য হাসপাতালে যাচ্ছে। তার জায়গায় দায়িত্ব পেল সবুজ পল্টন, সেটা নিশ্চয়ই মৌলানা রহমানের দৃষ্টিতে অত্যন্ত নির্দয় একটা ব্যাপার বলে মনে হলো। আমার জানা মতে একটা মাদরাসায় চাকরি নিয়ে ছাত্র পেটাচ্ছেন তিনি, এবং নিশ্চয়ই চিন্তা করছেন উদ্যম হাসান কিভাবে তাঁকে ল্যাং মারতে সফল হলো।

তিনি জিজ্ঞেস করলে উত্তরটা দিতে পারতাম আমি : ‘ব্যাপারটা হলো সহজ-সরল ধরন। কারো ভেতর জিনিসটা আছে, মৌলানা সাহেব। কারো ভেতর নেই, এবং কখনো থাকবেও না। ’

 এটুকুই আমি জানি। এবার বলব আমি কী মনে করি। খুঁটিনাটি অনেক বিষয়ে আমার কিছু ভুলভাল হতে পারে, তবে আমি আমার চেইন আর ঘড়ি বাজি রেখে বলতে পারি, যে সাধারণ ছক আমি তৈরি করেছি সেটা নিখুঁত হওয়ারই কথা। কারণ উদ্যম যে প্রকৃতির মানুষ, আমি তাকে যেভাবে চিনি, তার পক্ষে এক কি দুইভাবে এই কাজ করা সম্ভব ছিল। ব্যাপারটা নিয়ে আমি যখন চিন্তা করি, প্রতিবার সুবাস চাকমার কথা মনে পড়ে যায়, সেই আধপাগলা আদিবাসী। ‘খুব ভালো লোক সে,’ উদ্যমের সঙ্গে ছয় কি আট মাস একই সেলে থাকার পর চলে যাওয়ার সময় বলেছিল সে, ‘ওখান থেকে সরে আসায় নিজের ওপর আমি খুশি। ওই সেলে খারাপ ধরনের খরা আছে। সারাক্ষণ ঠাণ্ডা। সে কাউকে নিজের জিনিস ছুঁতে দেয় না। সেটা ঠিক আছে। চমৎকার মানুষ, কক্ষনো মজা করতে দেখিনি। তবে খুব বড় খরা। ’

পাগলা সুবাস। আমাদের সবার চেয়ে বেশি জানত সে, এবং জেনেছে সবার আগেও। তাকে ভাগিয়ে দিয়ে সেল পুরোটা একার দখলে ফিরে পেতে দীর্ঘ আট মাস সময় লেগেছে উদ্যমের। মৌলানা রহমান আসার পর ওই আট মাস সুবাস যদি তার সঙ্গে বসবাস না করত, আমার হিসাব বলে, আরো অনেক আগে নিজেকে মুক্ত করতে পারত আমাদের উদ্যমী উদ্যম।

এখন আমার বিশ্বাস ব্যাপারটা রক হ্যামার দিয়ে শুরু হয়নি, শুরু হয়েছিল মধুবালার ছবি দিয়ে। আমি আপনাকে বলেছি ছবিটা চাওয়ার সময় কেমন নার্ভাস দেখাচ্ছিল তাকে। নার্ভাস এবং উত্তেজিত। ওই সময় তাকে আমার শুধু বিব্রত বলে মনে হয়েছিল। উদ্যম সে রকম একজন মানুষ ছিলও বটে, তার যদি কোনো ফ্যান্টাসি নারী দরকার হয়, সেটা কাউকে জানতে দিতে চাইবে না সে। তবে এখন আমি মনে করি তাকে তখন বুঝতে ভুল হয়েছিল আমার। এখন বুঝি তার তখনকার উত্তেজনার কারণটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। তবে শুধু পোস্টার নয়, আরো দুটো জিনিস সাহায্য করেছিল উদ্যমকে। একটা হলো তার ভাগ্য, আরেকটা হলো ব্রিটিশ সরকার তরুণ বেকারদের কর্মসংস্থান কর্মসূচির অধীনে জাহাজে করে যে সিমেন্ট পাঠিয়েছিল সেটা।

কাঠফাটা তৈরি করা হয়েছিল ১৯৩৪-৩৭ সালে। এখন ব্যাপার হলো, অনেকেরই জানা নেই যে পাউরুটি বানানো যেমন সূক্ষ্ম একটা কাজ, কংক্রিট মিক্স করাও সে রকম সূক্ষ্ম একটা কাজ। এখানে এটা পরিষ্কার হওয়া দরকার যে ১৮৭০ সালের আগে আধুনিক সিমেন্ট তৈরি করা সম্ভব হয়নি, আর তাই আধুনিক কংক্রিটও পাওয়া যায়নি নতুন শতাব্দী শুরু না হওয়া পর্যন্ত। আপনি বেশি বালি মিশিয়ে ফেলতে পারেন, কিংবা কম মিশিয়ে ফেলতে পারেন; পানি বেশি হয়ে যেতে পারে, কিংবা কম হয়ে যেতে পারে। ১৯৩৪ সালে পদ্ধতিটা এখনকার মতো সফিসটিকেটেড ছিল না।

সেলব্লক পাঁচের পাঁচিল যথেষ্ট নিরেট ছিল, তবে ওগুলো কখনো শুকনো ছিল না, ছিল না উষ্ণ। বরং সব সময় স্যাঁতসেঁতে থাকত। দীর্ঘ একটা মেয়াদে ভেজা ভেজা ভাব ঘামে রূপান্তরিত হতো, এমনকি ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরতও। জায়গামতো উদয় হওয়ার নিজস্ব একটা ধরন আছে ফাটলের, কোনোটা এক ইঞ্চি গভীর, এবং নিয়মিত কংক্রিট খেতে থাকে।

তারপর একসময় সেলব্লক পাঁচে এলো উদ্যম হাসান। ভার্সিটি থেকে বিজনেস ম্যানেজমেন্টে অনার্স করেছে সে। তবে দুই কি তিনটে জিওলজির কোর্সও করা ছিল তার। জিওলজি তার প্রধান হবি হয়ে ওঠে। জিওলজি তার নিষ্ঠাবান আর অধ্যবসায়ী প্রকৃতির ওপর আবেদন তৈরি করেছিল বলে মনে হয়। এখানে এটা দশ হাজার বছর আগেকার বরফ যুগের অবশিষ্ট। ওখানে ওই পাহাড়ি এলাকা দশ লাখ বছর ধরে তৈরি হচ্ছে। পৃথিবীর ত্বকের গভীর প্রদেশে টেকটনিক প্লেট পরস্পরের সঙ্গে ঘষা খাচ্ছে হাজার হাজার বছর ধরে। প্রেসার। উদ্যম আমাকে একবার বলেছিল জিওলজির সবটাই প্রেসার নিয়ে পড়াশোনা।

এবং অবশ্যই সময়।

ওই পাঁচিলগুলো পাঠ করার সময় পেয়েছিল উদ্যম। প্রচুর সময়। সেলের দরজা যখন দড়াম করে বন্ধ হলো আর নিভে গেল সব আলো, তারপর আর কোনো দিকে তাকানোর দরকার নেই। শুরু করো খোঁড়া। যত ধীরেই খুঁড়ুন, প্রতিদিন খুঁড়ছেন না? তাহলে? একদিন ওটা আপনাকে নেবে। প্রথমে হয়তো একটু, কিন্তু তারপর সবটুকু।

প্রথমবার যারা সাজার মেয়াদ খাটতে আসে জেলখানার বন্দিজীবনের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে তাদের খুব কষ্ট হয়। তাদের মনে জন্ম নেয় গার্ড-জ্বর। মাঝেমধ্যে তাদের বয়ে নিয়ে যেতে হয় হাসপাতালে, বার কয়েক ঘুমের ওষুধ খাওয়ালে আস্তেধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসে। এটা কোনো অস্বাভাবিক দৃশ্য নয় যে আমাদের ছোট্ট সুখী পরিবারের নতুন একজন সদস্য লোহার শিকে ঘুষি মারতে থাকে আর গলা ফাটায় : ‘এখান থেকে বের করো আমাকে!’ খুব বেশিক্ষণ চেঁচাতে হয় না, সেলব্লক জুড়ে কোরাস শুরু হয়ে যায় : ‘তাজা মাছ আইছে রে বাই, তাজা মাছ আইছে, পানিরে ঘুলা বানায়া ডাঙ্গায় উইঠ্ঠা কানছে! হালার পুত ঘুঘু দেখছে, অহন ফাঁদও দেখতাছে!’

তিন যুগেরও বেশি দিন আগে উদ্যম যখন প্রথমবার এসেছিল, কেউ তাকে ভয়ে সিটকে থাকতে দেখেনি, তবে তার মানে এই নয় যে নতুনরা যেসব সমস্যার মুখোমুখি হয় তাকে তা হতে হয়নি। সে হয়তো পাগল হওয়ার কাছাকাছি পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল, অনেকেই যায়, আবার কেউ হয়তো হাসতে হাসতে বদ্ধ উন্মাদে পরিণত হয়। চোখের পলকে পুরনো জীবন হারিয়ে যায়, সামনে বিস্তৃত হয়ে আছে দুঃস্বপ্ন, দীর্ঘ নরকবাস।

কাজেই আপনাকে আমি জিজ্ঞেস করছি, কী করল সে? সে তার অস্থির মনটাকে কিছু একটা ধরিয়ে দিয়ে ব্যস্ত রাখার জন্য মরিয়া হয়ে তল্লাশি চালাতে শুরু করল। হ্যাঁ, জানা কথা, নিজেকে আপনি অনেকভাবে আরেক দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারেন, এমনকি জেলখানায়ও। মন সরানোর প্রশ্ন যখন আসে, মানুষের মাথা অসংখ্য টার্গেট নিয়ে হাজির হয় আপনার সামনে। আমি আপনাকে একজন ভাস্কর এবং তাঁর খোদাই করা তিন বয়সে যিশুর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছি। এমন অনেক মুদ্রা সংগ্রাহক আছে, যারা সব সময় চোরদের কাছে মুদ্রা খোয়াচ্ছে।

উদ্যমকে আগ্রহী করে তুলেছিল পাথর। আর তার সেলের দেয়াল। ওই দেয়াল যে স্যাঁতসেঁতে, সেটা নিশ্চয় শুরু থেকেই খেয়াল করে থাকবে উদ্যম। জাহাজ ভর্তি যতই তোমার দুর্ভাগ্য থাকুক, সব ভুলে গিয়ে অসাধ্যসাধনে লেগে পড়ো বাপধন, এই কংক্রিটে চোখ দাও।

এত পুরু দেয়ালে অত বড় গর্ত তৈরি করল, পাথর আর ধুলো গেল কই? ইউনিফর্মে পকেট না থাকলে কী হবে, উদ্যমকে আমি আস্তিনের ভাঁজে পাথর রাখতে দেখেছি। ওই আস্তিনে করেই ধুলো আর পাথরের টুকরোগুলো প্রতিদিন উঠানে নিয়ে আসত সে, তারপর সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে উঠানের নুড়ি আর ধুলোর সঙ্গে মিশিয়ে ফেলত।

আমার ধারণা প্রথমে পালানোর কথা চিন্তা করেনি সে। এটাকে সম্ভবত একটা খেলা হিসেবে নিয়েছিল। তারপর ধীরে ধীরে তার চোখ খুলতে শুরু করে। দেয়ালের অবস্থা আর ব্লুপ্রিন্ট দেখে দৃঢ় একটা প্রত্যয় জন্মায় মনে, এটা অসম্ভব নয়, এটা পারা যাবে।

তবে যেটাকে আমরা ভাগ্য বলি, বায়বীয় একটা ব্যাপার, সব কৃতিত্ব ওটাকে দেওয়া চলে না। তার টাকা ছিল, এবং সবাই জানে টাকার অঙ্ক ভালো হলে যেকোনো গার্ড ওর পরিশ্রম কমানোর জন্য খাটতে রাজি হবে। রোজ তার সেলে সময় দিতে হবে এমন কোনো কথা নেই, সপ্তাহে দু-চার রাতও যথেষ্ট।

উদ্যম যে আদর্শ কয়েদি ছিল তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তার অনেক প্রমাণের একটা হলো, সবার সেলে নির্দিষ্ট সময় পর পর তল্লাশি চালানো হয়েছে, শুধু তারটা বাদে।

কি, আপনি প্রশ্ন তুলছেন, সে কি পালাতে পেরেছে? বলছেন জেল থেকে বেরোল, ঠিক আছে, কিন্তু তারপর কী হলো? কী ঘটল, জলায় বেরোনোর পর, সারা গায়ে আর কাপড়ে মল মাখামাখি অবস্থায়?

এই দৃশ্যের বর্ণনা দেওয়ার ক্ষমতা সত্যি আমার নেই, কারণ প্রায় সমস্ত অর্থে উদ্যম হাসান কিন্তু একটা প্রতিষ্ঠান। জেল থেকে বেরোনোর আগেও তা-ই ছিল, বেরোনোর পরও তা-ই থাকার কথা, ধারণা করি আরো বহু বছর তা-ই থাকবে।

তবে এই একটা কথা আপনাকে আমি জানাব। উদ্যম জেল ভেঙে পালানোর তিন মাস পর, পনেরো সেপ্টেম্বর, আমি একটা পোস্টকার্ড পেয়েছি। সেটা পাঠানো হয়েছে মালয়েশিয়ার ছোট একটা শহর কুয়ালা থেকে। কার্ডের যেখানে মেসেজ লেখা হয়, সেটা একেবারে ফাঁকা। তবে আমি ধরতে পেরেছি। আমি জানি। আমি যেমন জানি যে আমরা সবাই একদিন মারা যাব, এও তেমনি পরিষ্কার জানি যে ওই কার্ড আমাকে উদ্যম পাঠিয়েছে। আমাকে বলতে চেয়েছে, নিরাপদে আছে সে, আছে বহাল তবিয়তে।

তো এই হলো আমার কাহিনি। সবটা লিখে ফেলতে কী রকম সময় লাগবে আমার কোনো ধারণা ছিল না, ধারণা ছিল না এটা আসলে কত বড় হতে যাচ্ছে। ওই পোস্টকার্ড পাওয়ার পর থেকে লিখতে শুরু করি আমি। এটা লিখতে তিনটে পেনসিল লেগেছে আমার, লেগেছে একগাদা কাগজ। আমি আমার পাণ্ডুলিপি খুব সাবধানে লুকিয়ে রেখেছি, কেউ খুঁজে পাবে না।

লিখতে গিয়ে আমি আমার স্মৃতিকে খোঁচা মেরে বসেছিলাম, আমার ধারণাই ছিল না যে এত কিছু হুড়মুড় করে সব আবার মনে পড়ে যাবে। নিজের সম্পর্কে লিখতে যাওয়া আসলে অনেকটা এ রকম : নদীর স্বচ্ছ পানিতে একটা ডাল ডুবিয়ে কাদাময় তলাটাকে এলোমেলো করা।

‘না, কই, তুমি তো বাপু নিজের কথা লিখছিলে না, লিখছিলে উদ্যম হাসানের কথা,’ আপনাকে আমি বলতে শুনলাম। ‘নিজের গল্পে তুমি একটা ছোট চরিত্র। ’

 কি জানেন, আপনার এই কথাটা একদমই সত্যি নয়। এই গল্প আমার গল্প, এবং আমাকে নিয়েই লেখা, এর প্রতিটি অক্ষর আমার প্রতিনিধিত্ব করছে। উদ্যম ছিল আমার একটা অংশ, যে অংশটাকে ওরা কখনোই তালা দিয়ে রাখতে পারেনি; আমার একটা অংশ, এবং সেটা আবার আমার সঙ্গে এক হবে অবশেষে কাঠফাটার গেট খুলে গেলে আমি যখন মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে পারব। আমার পরনে থাকবে ছেঁড়া প্যান্ট-শার্ট, পলিশ না করা জুতো, পকেটে থাকবে বিশ কি পঞ্চাশটা টাকা। আমার অস্তিত্বের এই অংশটা যতই মলিন আর নিঃস্ব হোক, যতই বৃদ্ধ আর অক্ষম হোক, আরেক অংশের সঙ্গে অবশ্যই এক হতে যাচ্ছে।

এই গল্প বলে আমি সন্তুষ্ট, যদিও এর যেন কোনো উপসংহার দেওয়া গেল না। পড়ে শেষ করেছেন বলে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই। লেখা শেষ হওয়ার পর নিজেকে আরো বুড়ো এবং খানিকটা বিষণ্ন মনে হচ্ছে। এবং, উদ্যমকে বলছি, তুমি যদি সত্যি ওখানে থাকো, আমি জানি তাই আছ তুমি, সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে যে তারাটা আকাশে জ্বলজ্বল করে, আমার হয়ে ওটার দিকে তাকাও একবার তুমি, স্পর্শ করো বালি, পানি কেটে এগোও, এবং অনুভব করো মুক্তি আর স্বাধীনতা অবশেষ ভাবিনি আবার আমাকে লিখতে বসতে হবে। বেশি না, আর মাত্র ক’পাতা নেব। আগের মতো এখন আর আমি কাগজে পেনসিল ঘষছি না। একটা ট্যাবলেট কিনেছি, নিজের ঘরে চেয়ারে বসে কম্পোজ করছি।

আমার জীবনের কী পরিণতি হলো? কেন, আপনি আন্দাজ করতে পারছেন না? না, আমারই ভুল হচ্ছে, আপনার আসলে আন্দাজ করতে পারার কথা নয়। আমি বিশেষ বিবেচনায় রাষ্ট্রপতির ক্ষমা পেয়ে জেলখানা থেকে বেরিয়ে এসেছি। আমি নিজের স্ত্রীকে খুন করতে চেয়েছিলাম, গাড়ির ব্রেক ফেল করানোর মাধ্যমে। কিন্তু নিজের শিশুসহ আমাদের এক প্রতিবেশিনীও মারা যান ওই বানোয়াট কার অ্যাক্সিডেন্টে। কাজেই মহামান্য বিচারক আমাকে শুধু যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেননি। তিনি তাঁর রায়ে বলেছিলেন একটা সাজার মেয়াদ শেষ হলে আরেকটা সাজা শুরু হবে। তার মানে যত দিনই আয়ু থাকুক, শেষ দিন পর্যন্ত আমার জেলে থাকার কথা—মহামান্য রাষ্ট্রপতি ক্ষমা না করলে তা-ই থাকতে হতো আমাকে, উদ্যমের মতো পালাতে না পারলে আর কি।

প্রথমে আমি ভাবিনি কত কালের অচেনা বাইরের জগতের সঙ্গে নিজেকে আমি মানিয়ে নিতে পারব। কিন্তু বাইরে প্রথমে যেটা আবিষ্কার করলাম, আমাকে নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। তারপর খেয়াল করলাম আমি যে বাইরের জগৎ চিনতাম তার প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই। মানুষের গতি অসম্ভব বেড়ে গেছে। তারা এমনকি কথাও বলে দ্রুত। এবং জোরে।

সত্যি কথা স্বীকার করতে আমি কুণ্ঠিত নই, নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, অন্তত কিছু জিনিসের সঙ্গে। এই যেমন ধরুন, মহিলাদের সঙ্গে। মানবজাতির অর্ধেকই তারা, প্রায় চল্লিশ বছর হতে চলল সেটা আমার প্রায় জানাই ছিল না। হঠাৎ করে আমি এমন একটা দোকানে কাজ করছি, যেখানে প্রায় সবাই মেয়ে। বৃদ্ধারা আছেন, আছেন টি-শার্ট পরা গর্ভবতী, ছাপা তীরচিহ্ন নিচের দিকে চিহ্নিত করছে, লেখা রয়েছে : ‘এখানে শিশু আছে। ’ আছে রোগা কাঠ মেয়ে, তাদের জোড়া বোঁটা শার্টের গায়ে ফুটে থাকে। বুড়ো শয়তান, নোংরা মিনসে বলে গাল দিচ্ছি নিজেকেই, কারণ নিজেকে দেখতে পাচ্ছি সব সময় আধা শক্ত অবস্থায় চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে চাকরি করলে কি হবে, বেতন খুব কম। না খেয়ে, কম খেয়ে টাকা জমাতে হবে আমাকে। মনটা প্রায়ই বিদ্রোহ করতে চায়। কত দিনে প্রয়োজনীয় টাকা জমবে শুনি? কোথাও থেকে কিছু চুরি করতে পারলে হতো। তারপর ভেবেছি চুরি যদি করতে হয় নিজের চাকরির জায়গা থেকেই করা ভালো। সব কিছু আমার চেনা, গা বাঁচানো সহজ হবে।

উদ্যম হাসানকে যদি না চিনতাম, আমি হয়তো সত্যি এই কাজটা করতাম। তা না করে আমি শুধু তার কথা ভাবতে থাকি, কী করে ওই অতগুলো বছর ঠুকঠুক রক হ্যামার ঠুকে একটু একটু করে কংক্রিট ভেঙেছে অসীম ধৈর্যের সঙ্গে, যাতে সে নিজেকে মুক্ত করতে পারে। চুরি করার চিন্তা যখনই আসে, লজ্জিত বোধ করি আমি, এবং আইডিয়াটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিই। ও, আপনি বলতে পারেন, মুক্ত হতে চাওয়ার ব্যাপারে আপনার চেয়ে তার অনেক বেশি কারণ বা যুক্তি ছিল—বাইরের দুনিয়ায় তার একটা নতুন পরিচয় এবং প্রচুর টাকা রাখা ছিল। সেটা কিন্তু আসলে সত্যি নয়, জানেন আপনি। কারণ তার জানা ছিল না নতুন পরিচিতি তখনো সেখানে আছে কি না, আর ওই নতুন পরিচয় ছাড়া টাকা বলুন সম্পত্তি বলুন সব তার নাগালের বাইরে থেকে যাবে। না, তার যেটা দরকার ছিল, শুধুই মুক্ত হওয়া। কাজেই আমার যা কিছু আছে, তা যত সামান্যই হোক, আমি যদি তা লাথি মেরে ফেলে দিই তাহলে যুদ্ধ করে মুক্তি পাওয়ার জন্য সে যে অমানুষিক পরিশ্রম করেছে তার মুখে স্রেফ থুতু ছিটানো হবে।

কাজেই আমি আমার ছুটির সময়টা টাকা বাঁচিয়ে গাড়ি ভাড়া জোগাড় করে মাঝেমধ্যে আনোয়ারায় আসা-যাওয়া করছি, খুঁজছি সেই মসজিদ আর বটগাছ—বলা উচিত এমন একটা মসজিদ, যেটার পেছনে একটা বটগাছ আছে। আপনি হয়তো ভাবছেন, এই লোক পাগল নাকি! কিসের আশায় আনোয়ারায় আসা-যাওয়া করবে সে! সেখানে কী আছে?

সত্যি, কিসের আশায় আসা-যাওয়া করছি সেটা পরিষ্কার আমিও জানি না। তবে একটা কথা। উদ্যম আমাকে একদিন বলেনি যে ‘সিদ্ধান্ত যদি কোনো দিন বদলাও ভেবে তোমার ব্যবস্থা আমার করা থাকবে—?’ কথাটা বলে ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছিল সে?

এটা নিয়ে অনেক ভেবেছি আমি। উদ্যম আমাকে এ রকম কোনো জিনিস দিয়ে যায়নি, যেটা সার্চ করলে কিছু বেরোবে, যা পেলে আমি আমার ব্যবস্থা করতে পারব, অর্থাৎ তার কাছে যাওয়ার একটা উপায় আমি পেয়ে যাব। তাহলে? আমি তার বাড়ির ঠিকানা জানি না। কেন জানি না? সে আমাকে বলেনি, তাই। তাহলে তার সম্পর্কে এমন কিছু কি জানি আমি, সেটার সাহায্যে জানতে পারব আমার জন্য কী ব্যবস্থা করে রেখে গেছে সে? কিছু একটা নিশ্চয় আমাকে দিয়ে গেছে, তাই না?

তারপর মনে পড়ল। আনোয়ারায় কবরস্থানসংলগ্ন মসজিদের পেছনে একটা বটগাছের কথা বলেছিল উদ্যম। এটাকে যদি একটা ঠিকানা মনে করি, তাহলে মাত্র এই একটা ঠিকানাই আমাকে দিয়ে গেছে সে। সিদ্ধান্ত নিয়েছি ওই বটগাছের গোড়া, পুব দিকটা, খুঁড়ব আমি। জানি কাজটা রাতের অন্ধকারে করতে হবে। আমার জন্য যদি কিছু রেখে গিয়ে থাকে, তাহলে শুধু ওই ঠিকানাতেই সেটা পাওয়া যাবে বলে আমার বিশ্বাস। দেখা যাক। আগে তো জায়গাটা খুঁজে বের করি।

কি? বোকামি করছি আমি? হতে পারে। ভেবে দেখুন সেটাও কিন্তু বোকামি ছিল, নিরেট কংক্রিটের গা থেকে বালির কণা খসানো একটানা আটাশ বছর ধরে।

মাত্র তিনবার খুঁজতে গিয়েই ও রকম একটা কবরস্থান পেয়ে গেলাম আমি। পাহাড়ি এবং একদম নির্জন একটা এলাকা, আমার গা ছমছম করতে লাগল। বাস থেকে নেমে মাইল দেড়েক হেঁটে পৌঁছেছি ওখানে, কাজেই বিশ্রাম নেওয়ার জন্য উদ্যমের বটগাছতলায় খানিক বিশ্রাম নিতে বসেছি। দেখলাম আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে উদ্যম। হকচকিয়ে গেলাম আমি। তারপর বুঝতে পারলাম, তন্দ্রা মতো এসেছিল, তার মধ্যে স্বপ্ন দেখছিলাম।

পরের সপ্তাহে প্রস্তুতি নিয়ে গেলাম। চারদিক অন্ধকার হয়ে আসতে বটতলার মাটি খুঁড়ছি। খুব বেশি খুঁড়তে হলো না, পেনসিল টর্চের আলোয় একটা পাথর দেখতে পেলাম। ভাবলাম উদ্যম আমার জন্য কিছু যদি রেখে গিয়ে থাকে, তাহলে নিশ্চয় ওই পাথরের তলায় চাপা দিয়ে রেখে গেছে। এটা চিন্তা করার পর পাথরের দিকে আর আমি হাত বাড়াতে পারছি না। ভয় লাগছে, পাথরের তলায় কিছু যদি না পাই? তাহলে কী হবে? তখন কী করব আমি!

ভয় আর দ্বিধা কাটাতে তিন মিনিট বেরিয়ে গেল। যতই নির্জন এলাকা হোক, মানুষজন এখানকার মসজিদে নামাজ পড়তে আসে, তাদের কেউ যদি আমাকে দেখতে পায়, আমার অভিযান তো ভণ্ডুল হবেই, লোকজনের হাতে মারও খেতে হতে পারে। আর যদি ধরে পুলিশে দেয়, সাবেক একজন কয়েদির সঙ্গে তারা কী ব্যবহার করবে নিশ্চয়ই আন্দাজ করতে পারেন আপনি।

তিন মিনিট পর পাথর সরালাম। ছ্যাঁত করে উঠল বুক। দেখলাম পলিথিনে মোড়া একটা স্বাস্থ্যবান এনভেলপ রয়েছে ওখানে। ধরা পড়ার ভয় আছে জানি, অথচ এনভেলপটা দেখার পর আমি পঙ্গু হয়ে গেছি, একচুল নড়ার শক্তি পাচ্ছি না শরীরে।

আরো সময় লাগল, তবে শেষ পর্যন্ত এনভেলপটা আমি বের করলাম গর্ত থেকে, পাথরটা যেখানে ছিল সেখানে রেখে দিলাম। ওই পাথর ওখানে এভাবে রেখেছিল উদ্যমও, তারপর রেখেছিল তার বন্ধুও।

এনভেলপে একটা চিঠি পেলাম। তাতে উদ্যম কী লিখেছে হুবহু তুলে দিচ্ছি এখানে :

 

প্রিয় সদয় জাহান,

এই চিঠি তুমি যদি পড়ো, তাহলে তুমি বেরিয়ে এসেছ। এভাবে বা ওভাবে, যেভাবেই হোক বেরিয়েছ। আর সূত্র ধরে তুমি যদি এত দূর এসে থাকো, তোমার তাহলে আরেকটু আসারও ইচ্ছে হবে বলে মনে করি। তুমি তো ওই জায়গার নাম জানো, যেখানে আমার যাওয়ার কথা, তাই না? আমার প্রজেক্টের চাকা ঘোরানোর জন্য তোমার মতো দক্ষ একজন লোক সত্যি খুব দরকার আমার।

বিষয়টা একটু চিন্তা করে দেখো। তোমার জন্য একটা চোখ খোলা রাখব আমি। মনে রেখো আশা নিয়েই মানুষ বাঁচে, তাই আশাবাদী হওয়াটা খুব জরুরি। আশা ভালো একটা জিনিস, সদয়, হয়তো সব কিছুর চেয়ে ভালো, আর কোনো ভালো জিনিস কখনোই মরে না। আমি খুব আশা করি এই চিঠি যেন তোমাকে খুঁজে পায়, খুঁজে পায় বহাল তবিয়তে।

তোমার বন্ধু

নীল আকাশ

চিঠিটা আমি ওখানে বসে পড়িনি। আমাকে একটা আতঙ্ক পেয়ে বসেছিল, কারো চোখে ধরা পড়ার আগে ওখান থেকে সরে আসার দরকার ছিল আমার। চিঠিটা আমি আমার মেসে ফিরে পড়েছি। ভাগ্যিস সবাই ঘুমিয়ে পড়েছিল, তা না হলে আমাকে ওভাবে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে দেখলে কী ভাবত কে জানে। চিঠির সঙ্গে ওই এনভেলপে হাজার টাকার পঞ্চাশটা নোট ছিল। আর ছিল বালিতে পৌঁছাতে হলে আমাকে কিভাবে কী করতে হবে তার লিখিত বিবরণ। কী করব সে সিদ্ধান্ত আগেই নিয়ে রেখেছি। উদ্যমের কাছ থেকে এখন জানলাম কিভাবে তা করতে হবে।

দেখলাম আমি খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েছি। উপলব্ধি করলাম এ ধরনের উত্তেজনা শুধু একজন মুক্ত মানুষই অনুভব করতে পারে, শুধু একজন মুক্ত মানুষই দীর্ঘ একটা যাত্রায় বেরিয়ে পড়তে পারে, যে যাত্রার উপসংহার অনিশ্চিত।

আমি আশা করি উদ্যম ওখানে আছে।

আমি আশা করি আমার পক্ষে ওই দ্বীপে পৌঁছানো সম্ভব।

আমি আশা করি বন্ধুর সঙ্গে আমার সত্যি দেখা হবে, এবং আমি তার সঙ্গে হাত মেলাব।

আমি আশা করি ভারত মহাসাগর ততটাই নীল যতটা নীল আমি স্বপ্নে দেখেছি।

বিদেশি কাহিনি অবলম্বনে


মন্তব্য