kalerkantho


অ নু স্মৃ তি

জোনাকির ঝিকিমিকি

বিপ্রদাশ বড়ুয়া

২৫ জুন, ২০১৭ ০০:০০



জোনাকির ঝিকিমিকি

ছবি : কাকলী প্রধান

উত্তর-দক্ষিণ বিস্তৃত তিন তলার দেড় শ ফুট দীর্ঘ ভবন। দুই প্রান্তে দুটি সিঁড়ি।

উত্তরের সিঁড়ির মুখেই আমার কক্ষ, সঙ্গে শৌচাগার। সিঁড়ির ওপর চন্দ্রাতপের মতো ঝামরে আছে শতাব্দীর মহুয়া বৃক্ষ। গাছ বললে ওকে অবমাননা করা হয়। ঋতুতে ঋতুতে তার বেশ পরিবর্তন হয়। কচি পল্লব, মুকুল, ফুল ও ফল হয় নজরকাড়া। মৌচাক ও পাখিদের আনাগোনা তার নিজস্ব বৈভব। বৃষ্টি, কুয়াশা ও হাওয়ার দাপাদাপি তার একান্ত দেমাগ। আমি তার একান্ত বশীভূত সাগরেদ।

ঘরে থাকলে প্রতি সন্ধেয় উত্তরের চার কপাটের সাত ফুটের কাঠের জানালার দুটি কপাট খুলে তিনটি কোমল অনুভূতিপ্রবণ বালিশে মাথা রেখে উত্তরের খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি।

তীর্থের কাকের মতো খুঁজি কখন দিনের শেষে শালিক-চড়ুই তাদের রাতের আস্তানায় ফিরতে শুরু করবে। কখন বাদুড়রা মহুয়া ফুল বা ফল খেতে আসবে পক্ষ-বিধুননের সংগীত নিয়ে। সব পাখি রাতে নীড়ে থাকে না, ওদের নীড় বাঁধা বাচ্চা ফোটানোর জন্য, নয়তো নীড়ের দরকারই পড়ত না। যারা মাটি বা গাছের কোটরে থাকে, তাদের অন্য স্বভাব। মানুষও নীড় রচনা শুরু করেছে বিবর্তনের ধারায়। নীড়-বিলাসী যদি না হতো, পৃথিবীর দৃশ্যপট বদলে যেত নগর, ঘরবাড়ি, গ্রীষ্মাবাস, শৈলাবাস ও আনুষঙ্গিক অনেক কিছুর এবং সভ্যতাও পাল্টে যেত। আমার পুব, উত্তর ও পশ্চিমের জানালা, এই স্কুল ভবন, ছাত্রাবাস, বিহার ও ভিক্ষু-শ্রামণদের আবাস, বোধিবৃক্ষ ও যাবতীয় স্থাপনার ভোল-চাল বদলে যেত। তবু বদলে যাচ্ছে জলবায়ুর কারণে।

আমার উত্তর ও পুবের জানালার চারটি কপাট। পশ্চিমে দুটি। দুটি দরজার মধ্যে একটি শৌচাগারের। উত্তরের জানালার সব কপাট খুলে দিলে আলোর সমুদ্র নামে। শীতকালে কঠোর হতে হয় উত্তুরে হিম হাওয়া রুখতে। শীত আমার আরেক প্রিয় ঋতু, কিন্তু ও যে আমার বুকের পোষা পাখি তরল সর্দিকে উস্কানি জোগায়। তবু ওকে ছাড়া কুয়াশা কুহকিনীর মায়া-সৌন্দর্য কোথায় পাব!

অহো! এই গ্রীষ্মের শেষে আজ ২০১৬ সালের ২৩ মে, ৯ আষাঢ়ের ১৪২৩ বঙ্গাব্দ। এখনো মৌসুমি বায়ুর কোনো খবর নেই প্রধান বাংলা দৈনিকগুলোতে। কালের কণ্ঠে ফোন করলাম অগত্যা। মৌসুমি বায়ু নিয়ে কোন সাংবাদিক কথা খরচ করে, জানতে চাইলাম। তার কাছে সুলুকসন্ধান নেব।

এ বছর সারা জষ্টি গেল মেঘ-মেঘ আর বৃষ্টি-বৃষ্টি লুকোচুরিতে, তার চেয়ে বেশি বজ্র-গর্জনে মানুষের প্রাণ শিকার করে। আমার হিসাব মতে, এ রকম বজ্রপাতে বহু বছর এত মনুষ্য-প্রাণহানি হয়নি। এ রকম... এ রকম জলহাওয়া বা বজ্রগর্ভ বৃষ্টি আমি বহু বছর দেখিনি বা শুনিনি। আপনি শুনেছেন এত মানুষ নিহত হতে? কখনো? শতাধিক! ভারতেও একই অবস্থা বলে খবরে প্রকাশ।

প্রসন্ন অলস ২৭ মে ২০১৬। মনোভূমিতে আমার কোনো এক গল্পের ভাবী জন্মদিন আজ। সূর্য ডোবার আগে থেকে উত্তরের অপ্রতিহত আকাশ দেখার মুক্ত জানালার ধারের পুব-পশ্চিম বিস্তৃত বিছানায় তিনটি সুনরম বালিশে মাথা মহাশয়কে রাখলাম প্রবল আয়েশে। এই শেষ বিকেলে পাখিদের পুব থেকে পশ্চিমে প্রাত্যহিক আস্তানায় ফেরার সংগীতমুখর ভালোবাসা উপভোগের সময় এখন। এ অভ্যাস এখন আমার প্রায় ব্যাধির তুঙ্গ পর্যায়ে যেতে বসেছে। সারা দিন কোনো বই পড়িনি। কালের কণ্ঠ ও বণিক বার্তা দৈনিক দুটি ছাড়া। লেখার কলম ধরিনি। এ রকম বেশ দিন যাচ্ছে। বেরিয়ে কোথাও জমপেশ আড্ডায় ঢুকে পড়তে পারি। কত দিন ছোট বোন আভার বাসায় যাই না। রমনা পার্কেও না, বলধায়ও। সারা দিন কিছুই করিনি, দুপুরে ঘুমও এমনকি না—সারাক্ষণ শুয়ে থেকেও। উড়ে যেতে যেতে পাখিদের ফেলে যাওয়া গানগুলো যদি ধরে রেখে শোনার ব্যবস্থা করা যেত! উত্তরের জানালা দিয়ে সকাল-সন্ধ্যা ওই রেখে যাওয়া ওদের সংগীত। ভোরের ওই যাওয়ার গানের কলি ঘুম ও জাগরণে আবছা শোনা হয় শুধু। কোনো ভোরে ভুলবশত দৈবাৎ যদি জেগে যাই, অমনি উঠে পড়ি। ছুটে যাই পশ্চিমের প্রায় ১৫০ ফুট টানা খোলা বারান্দায়। লম্বা ভবনের ছাদের ওপর দিয়ে পুবের পানে যাওয়া শালিক ও চড়ুইদের তখন দেখি। পাঁড় উৎসাহী হয়ে ছাদে উঠে যাই মায়া-বিভ্রান্ত হয়ে। সূর্য তখনো জাগেনি পুব আকাশে। কয়েক বছর আগে কোনো কোনো ভোরে বঙ্গভবনের পুকুরে আশ্রয় নেওয়া পরিযায়ী পাখিদের চরতে যাওয়ার পক্ষ বিধুনন শুনতাম। তখন দেখতাম, এখন শয্যাবিলাসী হয়ে উঠেছি। ঘুম ভেঙে গেলে শালিকদের শুনি শুধু আর ভাবনা ওদের সঙ্গী হয়ে যায়—কোন সরোবর বা সিন্ধুপারের পাখি ওরা! সেই জলচর পাখিরা! জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে কি উচ্চতর গবেষণা বা অভিধা নিতে আসে?

কাপ্তাই বাঁধের উজানে আগে প্রচুর জলচর পাখি আসত। দেশীয় কালো বড় ভোঁদড় ছিল প্রচুর। বড় ও ছোট পানকৌড়ি ছিল অঢেল। এখন মাছ চাষ প্রচুর ও জেলেদের জালের জন্য ওরা উধাও শেষ পর্যন্ত। আমি পানকৌড়ির ও পাখিদের ডাকটিকিট জমাতাম।

পাখিদের ডিম দেওয়া, বাচ্চা ফোটানোর সময়টার জন্যই ওদের নীড় রচনা। বাচ্চা উড়তে শেখা পর্যন্তই। বছরের বাকি সময়ে ওরা গাছের ডালে দুই পায়ের আঙুল দিয়ে ধরে ঘুমোনোই করে। তাও স্ত্রী বা পুরুষ পাখির একটি ডিমে তা দিলে অন্যটি খাবার খুঁজতে যাবে। এভাবে পালা করে ওদের খাওয়া। দুজনের কাজ ওদের মতো কঠিনভাবে নির্ধারিত। পুবের জানালায় দেখা বেড়াল বাচ্চাদের থেকে শিখেছি একা মায়ের কী কঠিন দায়িত্ব। আর উড়তে শেখা পর্যন্ত পাখি মা-বাবার স্থান ও দায়িত্ব বাসার কাছাকাছিই। পুবের জানালা দিয়ে বিড়াল বাচ্চাদের দেখা লিখেছি ‘আমার পুব দিকের রোদ ঝলমল জানালা’ অধ্যায়ে। বিড়াল পরিবারের সদস্য সিংহ, বাঘ, চিতাদের সন্তান নিয়ে বাবাদের কোনো দায়দায়িত্ব নেই। মানুষ ও অনেক জীবজন্তুর বাবার দায় নির্ধারিত ভিন্ন ভিন্নভাবে।

পুবের জানালা দিয়ে একবার দেখি কী, বিড়ালির একটি বাচ্চা কোথায় কিভাবে কী হয়ে গেল আমি দেখতে পাইনি, জানিই না। এখন একা বাকি বাচ্চাটির স্বভাব হয়ে গেছে অদ্ভুত। মা চলে যায় খাবার খুঁজতে, বাচ্চাকে একা রেখে। তখন বাচ্চাটিকে নিজের বুদ্ধিতে টিকে থাকতে হবে। সে তখন ছাদের ওপর টিনের আড়ালে লুকিয়ে থাকবে, মাকে একবারের জন্যও ডাকবে না, শত্রু বাবা শুনে ফেলবে বলে। পাকা একতলা ঘরের ছাদের সীমানা দেয়ালের উচ্চতা এক-দেড় হাত। তার সঙ্গে এক টুকরো টিন দিয়ে ছোট্ট কুঠরি বা নীড় রচিত হয়ে আছে। মা চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চাটি ওখানে ঢুকে পড়বে। বিড়ালি রাজকীয় ভঙ্গিতে ধর্মরাজিক বৌদ্ধ বিহার ও টিনের চালের ঘরের সীমানা পাঁচিলের ওপর দিয়ে রাজকীয় ভঙ্গিতে চলতে চলতে প্রয়োজন অনুযায়ী আশপাশ দেখবে। পাশের বাড়ির টিনের চালের ওপর দিয়ে যেতে যেতে ডাকবে দু-একবার। ওটা আদরের সন্তানকে সাবধান করে দেওয়া, তখন দেখি বিড়ালছানাটি হয়তো তার নিরাপদ আশ্রয়ের মুখের বাইরে। ওই সংকেত-শব্দ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চা ঢুকে পড়বে নিভৃত গুহায়। অদূরে কোথাও হুলো হয়তো পাঁচিলের আড়ালে। সে এসব দেখতে পেল না বলে হয়তো শীতল। বিড়াল পরিবারের প্রজননধর্ম অন্য রকম। হুলো যদি তপ্ত হয়, বিড়ালির মিলন চায়, তখন বিড়ালির যদি বাচ্চা থাকে, তাহলে বিড়ালি কিছুতেই মিলন চাইবে না। স্বভাব অনুযায়ী পুরুষটি ওই নারীর বাচ্চাকে মেরে ফেলবে—এটি বিড়াল পুরুষের জৈবধর্ম। পুবের জানালা দিয়ে দেখে দেখে ওই বাচ্চার প্রতি আমার ভালোবাসা বেড়ে উঠছে দিনে দিনে। মা যখন খাবার খেয়ে ফিরে আসবে, তখনকার দৃশ্যাবলি দেখার জন্য হাপিত্যেশ হয়ে থাকি আমি। সন্তানের তখন কী আনন্দ! মা তো জগতের ঘাত-প্রতিঘাত খেয়ে খেয়ে এখন বড়। সন্তানের মতো আবেগ সে দেখাচ্ছে না। দেখাচ্ছে না তা-ও বা বলি কী করে! বাচ্চার সারা গা চেটে সোহাগ জানাচ্ছে, পরিচর্যা করে দিচ্ছে। আর স্বস্তি এ জন্য যে সন্তান ঠিক আছে, বেঁচে আছে, হুলোর খপ্পরে পড়েনি, বালাই ষাট। তার সন্তানের বাবাও যদি ওই হুলোটা হয় বিড়ালি অনড়, অটল। ফেরার সময় উত্তরের জানালা দিয়ে দেখা গেছে মাকে। আমি ওদের দেখার জন্য পুবের জানালায় ফিরে যাই কখনো কখনো। কী উল্লাস তখন বাচ্চার। মা বিশেষ উল্লাস দেখাচ্ছে না, কিন্তু ব্যবহারে তার শতরূপ প্রকাশিত। এই দৃশ্য দেখার জন্য আমি সকালের দিকে পুবের জানালায় আটকে পড়ি, বিড়ালির আসার প্রতীক্ষায় থাকি। মা যতক্ষণ আসবে না, ততক্ষণ বাচ্চা কিছুতেই নিভৃত স্থান থেকে বের হবে না। আমি কত শিস দিয়ে দেখেছি, মিউ মিউ ডাক পেড়েছি—না, ও বের হয়নি। মা যে যাওয়ার সময় সাবধান করে দিয়েছে, তা ছাড়া জীবজগতের স্বভাব সতর্কতা বা আত্মরক্ষার জন্মগত বৈশিষ্ট্য তো তার রক্তে রয়েছেই।

উত্তরের জানালা দিয়েও বিড়ালির চলাফেরা খানিকটা দেখতে পাই। কী ঐশ্বর্য সে দৃশ্যের। আমি মার্জারির ভালোবাসায় লটকে পড়েছি। উত্তরের জানালা ছেড়ে চলে এসেছি পুবের জানালায়। পুব দিক থেকে আকাশ পাড়ি দিয়ে শালিকরা দল বেঁধে আস্তানায় ফিরছে। পাঁচ-ছয় তলা ভবনের ওপর দিয়ে, গাছপালার দশ-কুড়ি ফুট ওপর দিয়ে। চড়ুইদের পথ তাদের একটু ওপর দিয়ে, ওরা প্রায় চোখের পলকে ফেলে যাচ্ছে গাছপালা। দূরে অনেক ওপরে একটি ভুবন চিল বিশ্রাম নিচ্ছে আকাশে পাখা মেলে। শেষ বিকেলে ওই ওড়াটা নিশ্চয়ই খাবার খোঁজা নয়, তা যদি হতো নিচে খাবারের খোঁজ পেলে বা দেখলে নেমে পড়ত। আলবাট্রস পাখিরা তাদের বিশাল পাখা মেলে আকাশে বিশ্রাম-সুখ উপভোগ করে। ধর্মরাজিক বিহারের পাতিকাকেরা তখন আম, অশ্বত্থ ও নারিকেলগাছ থেকে একসঙ্গে শব্দ তুলে পুব দিকের সাত-আট তলা ভবনের ছাদের সীমানা দেয়ালে গিয়ে বসছে, দু-চার মিনিট না যেতেই আবার ফিরে যাচ্ছে আগের জায়গায়। সূর্য ডোবার সময় থেকে এই তাদের প্রাত্যহিক খেলা, নাকি ডন-বৈঠক বলব! অথবা পেটের ভাত হজম করা ধরে নেব! নারিকেলগাছের পাতার ঝালর তাদের সঙ্গে অনবরত তাল দিয়ে যাচ্ছে পুরনো দিনের হাত-টানা বিশাল পাখার মতো। হ্যাঁ, এবার চা বানাতে হবে। আস্ত ইটের টুকরো করে জমানো চীনা চা লোহার মজবুত ছোরা দিয়ে খুঁচিয়ে প্রয়োজন মতো চা বের করে, সুসিদ্ধ গরম পানির ফ্লাস্কে পাঁচ-ছয় মিনিট ভিজিয়ে রেখে তবেই কাপে নিয়ে পান। তার অসচরাচর জমাট সুগন্ধ মন-প্রাণ ভরে দেবে। বৌদ্ধ বিহারে ভ্রমণে আসা চীনা ভ্রমণকারী ও অতিথিদের থেকে পাওয়া এই মহার্ঘ ঘ্রাণসম্রাজ্ঞী চা। পৃথিবীর যেকোনো প্রাকৃতিক সুগন্ধের মধ্যে চা শ্রেষ্ঠ।

চায়ের কথা যখন এলো, তখন তার বংশপরিচয়ের কথাও এসে যায়। গোলাপ বংশে (রোজ-অর্ডার রোজালিস) তিনটি পরিবার আছে, এর সদস্যসংখ্যা তিন হাজারের বেশি। প্রথম পরিবারে আছে চেরি ফল, হর্থন ও গোলাপ। দ্বিতীয় পরিবারের সদস্যরা হলো পিচ, পিযার্স ও আপেল। তৃতীয় পরিবারের প্রধান সদস্য ঘ্রাণসম্রাজ্ঞী চা। একই গোত্রের এই তিন পরিবারের কৃতী সন্তান এরা সবাই। প্রকৃতির অবাধ রাজ্য থেকে এদের একে একে তুলে এনেছে মানুষ। আর লক্ষ করুন, চায়ের আগে ব্যবহার করা হয় ঘ্রাণসম্রাজ্ঞী বিশেষণ।

আসুন, এক কাপ মানবতা পান করা যাক—অর্থাৎ এক কাপ চা। চা তৈরির পদ্ধতিও কম উপভোগ্য নয়। প্রকৌশলী সুনীল বড়ুয়া চীন থেকে ইস্পাতের তৈরি একটি ফ্লাস্ক এনে উপহার দিয়েছেন। বইপত্র পড়ে জেনেছি আদর্শ চা তৈরির কলাকৌশল। সুসিদ্ধ গরম জল দিয়ে ফ্লাস্কটি মিনিট তিন-চারেক ভিজিয়ে রাখতে হবে কাপটিসহ। ফ্লাস্ক থেকে গরম জল ফেলে দিয়ে তাতে সুসিদ্ধ জল ভরতে হবে। ওই ফ্লাস্কের মুখে একটি ছাঁকনি আছে। সেই ছাঁকনিতে অথবা ছাঁকনির নিচে পরিমাণ মতো উত্তম পাতা দিয়ে ফ্লাস্কটি ছয়-সাত মিনিট মুখ বন্ধ করে রাখি আমি।

ওদিকে কাপটি গরম জলে ঢাকনির নিচে তপ্ত হচ্ছে। সাত মিনিট পর এবার কাপের গরম জল ফেলে দিয়ে পরিষ্কার কাপড় দিয়ে মুছে ফ্লাস্ক থেকে চা বা মানবতা আধা কাপের মতো ঢেলে নিন। তারপর আয়েশ করে পান করুন। ফুরিয়ে গেলে আবার অল্প ঢেলে নিন, শেষ হয়ে গেলে পুনরায় ঢেলে নিন। সবুজ চা বা উত্কৃষ্ট সুগন্ধ চা এভাবে খেতে দেখেছি জাপানে। অথবা কাপ বা পেয়ালায় চাপাতার ওপর গরম জল ঢেলে কিছুক্ষণ ঢেকে রেখেও খেতে দেখেছি। শেষ হয়ে গেলে ওই পাতার ওপর গরম জল আবার ঢেলে পান করা যায়, ওদের কাছে দেখেছি।

আবার কচি চা পাতা গরম জলে ভাপিয়ে নিয়ে শাকের মতো চা পাতা খায় দেখেছি মিয়ানমারে। ওর নাম লাপ্পে। ভাতের শেষে তা পরিবেশন করা হয়। চট্টগ্রামে যেমন পাটশাক না কুটে আস্ত ভাজা ভাজা করা হয়।

চায়ের প্যাকেটে পরিমাণ মতো চাল ভাজাসহ বাজারজাত করা হয় কোরিয়ায়। ওই চা একবার আমার হাতে এসে পৌঁছোয়। চা ও চাল ভাজার গন্ধ উপভোগ্য হয়ে উঠেছিল।

চায়ের ফুল দেখেছি চন্দ্রঘোনার কাছে ওয়াগগা চা বাগানে। নাগকেশর ফুলের মতোই সাদা পাপড়ি ও  সোনালি গর্ভকেশরের। চায়ের বৈজ্ঞানিক নাম ক্যামেলিয়া চাইনেনসিস। আর ক্যামেলিয়া ফুলের নাম ক্যামেলিয়া জাপোনিকা। ওষুধ হিসেবে ব্যবহার শুরু হলেও চায়ের বিস্তার পানীয় হিসেবে। আধুনিক জাপান গড়ার অসাধারণ ব্যক্তিদের অন্যতম ওকাকুরা কাকুজোর ১৯০৬ সালে রচিত বিখ্যাত বই ‘দ্য বুক অব টি’ বইটি আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে ২০১২ সালে। অসাধারণ এই বইটি চা ও সৌন্দর্যবাদ নিয়ে রচিত এবং পার্ল পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হয়।

১ জুন ২০১৬, শুক্রবার থেকে বাচ্চা ও বিড়ালিকে আর দেখতে পাচ্ছি না। এই বেদনা অপূরণীয়। বিড়ালি কি তার ছানাকে নিয়ে জায়গা বদল করেছে? মা বিড়ালির এই এক স্বভাব। হুলোর হাত থেকে রক্ষার জন্য এই স্থান পরিবর্তন? সুখে থাকুক মা ও আদরের ধন—সন্তানের জন্য বাপের চেয়ে মায়ের কী আকুলতা ও সাবধানতা। আর বাপ চায় সন্তানকে হত্যা করে নিজের স্বাদ-আহ্লাদ মেটাতে। আমার পুব ও উত্তরের জানালা আলাদা হলেও ওরা একরকম এক সূত্রে বাঁধা। বাচ্চা ফোটানোর সময় মা ও বাবা ছাড়া ঢাকার নাগরিক শালিকরা প্রায় সারা বছর শহরের রাতের আস্তানা থেকে প্রতিদিন ভোরে খাবার খোঁজার জন্য আমার মাথার ওপর দিয়ে শহর ও শহরতলির ময়লা-আবর্জনা ফেলার বিচরণভূমিতে যায়।

ঢাকা শহরে সবচেয়ে বেশি পাতিকাক, তারপর শালিক ও চড়ুই। উত্তরের জানালার সঙ্গে শোবার খাট। তিনটি সুনরম উপাধান মাথায় দিয়ে শেষ বিকেলটা আমি আহার করি। এ আমার দীর্ঘদিনের আয়েশি অভ্যাস মহাশয়। ভোরে পুব দিকে যায়, শেষ বিকেলে পশ্চিমের আস্তানায় ফেরে, আমি তীর্থের কাকের মতো জানালা খুলে চেয়ে থাকি কখন ওরা ফিরছে, ফেরার পথে ওরা উড়তে উড়তে আমার জন্য গানের কলি রেখে যায়, উড়ে যাওয়ার চিত্রভঙ্গি এঁকে যায়, দু-একটি পালকও ফেলে যায়, যা দেখতে পেলেও সংগ্রহে রাখতে পারিনি। এক বিকেলের শেষ স্বর্ণ সময়ে দেখেছিলাম এক শালিক (মেয়ে না পুরুষ?) তার অপ্রধান একটি ছোট পালক ফেলে দিয়ে গেল। সেটিও উড়তে উড়তে পড়তে পড়তে সীমানা দেয়ালের ঘোপঘাপে হারিয়েই গেল। চেয়ে থাকলাম। আমি জানি না কোনো উদাসিনীর জন্য রেখে গেল কিনা, আর আমি খাগ ও বাঁশের কলমের শেষ যুগে জন্ম নিলেও তার ব্যবহার সুরপ্ত করতে পারিনি বলে দুঃখটা এখনো আমার রয়েছে। এখন আমার অনেক রকম শোফার, শেফার্স, পার্কার, ওয়াটারম্যান, পাইলট ইত্যাদি ইত্যাদি সংগ্রহে আছে। ওগুলো জাদুঘরে দিয়ে দেব কি না স্বপ্ন বুনি।

ওই ঝরা পালক পড়তে দেখতে দেখতে শুনতে পাই, ‘প্রিয়ার চিঠি লেখনী তরে, হে বলাকা’ গানটির অমোঘ সুরলহরি, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মনকাড়া বিখ্যাত গান। আমি জানি আপনি পাঠিকা বা পাঠক হোন, গান ভালোবাসেন। এমনকি সন্ত্রাসী খুনিও গান ভালোবাসে বলে শোনা যায়—এমন সুখাদ্য গান যমদূতের ক্ষুধাও উপশম করতে পিছপা হবে না আশা করি।

কলকাকলি করে ওরা যায়। শালিক, ঝুঁটি শালিক ও গোশালিকই বেশি। ভোরে যায় শেষ বিকেলে ফেরে। মেঘলা দিন হলে বোধ করি সময় ঠিক করে উঠতে পারে না বলে বা বুঝেশুনেই একটু আগে-ভাগে ফেরা শুরু করে। ওদের দুটি-তিনটি থেকে দশ-পনেরো-কুড়িতে দলবদ্ধ হয়ে যায়। পথের থেকে আবার দল ভারী হয় দেখতে পাই, কেউ কেউ পিছে পড়ে যায়, আবার হয়তো ধরে ফেলে পেছন থেকে গিয়ে, দেখতেও পাই। পরিযায়ী পাখিদের মতো এক-দেড় শ ফুট ওপর দিয়ে নয়, গাছপালার দশ-পনেরো ফুট ওপর দিয়ে এবং সুউচ্চ ভবন পাশে এড়িয়ে। কী গতি, উল্লাস, রভস, গান ও জীবনধর্ম। প্রতিদিন একই পক্ষীস্বভাব। শালিকের মধ্যে প্রধান ভাত শালিক, ঝুঁটি শালিক, তারপর গোশালিক।

চড়ুইদের গতি সবার বেশি! ওরাও দলবদ্ধ। শহরের বিভিন্ন এলাকায় একটি-দুটি গাছে যূথবদ্ধ হয়ে রাত কাটায়। আহমদবাগে দাঁড়কাক আছে, আগে আমার এখানে ছিল, পাতিকাকের হামলা ও অত্যাচারে চলে গেছে। মাঝে পুবের গাছপালায় এসে ডেকে যায় বিষণ্ন গলায়, এই বিষাদই দাঁড়কাকের কণ্ঠের সম্পদ। কী    মধুরিমা! ওরা আর আস্তানা গাড়তে পারে না বছর   তিন-চারেক ধরে। আগে পুরান ঢাকা থেকে বানর চলে আসত, এখন আসে না দু-পাঁচ বছর তো হবেই। পুরান ঢাকার আদি বাসিন্দা বানর এখন বিপন্ন। বছর       বিশ-পনেরো আগে বুড়িগঙ্গার ওপারে একবার একা বেড়াতে গিয়ে বানরের পাল্লায় পড়েছিলাম। সে অন্য মন, অন্য অতীত, অন্য আশা।

ঢাকার মেয়র হানিফ মহোদয় ধর্মরাজিকের পুকুরের পাড় বাঁধিয়ে দিয়েছেন। অশেষ কল্যাণ করেছেন। কিন্তু কল্যাণকর হয়নি, পাড় বাঁধানোর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি মানা হয়নি। মন্দের ভালো হয়ে আছে। পাড়ের দেয়ালে জল নিষ্কাশনের জন্য ছোট ছোট গর্ত আছে। সেখানে দিব্যি এখন মাছরাঙা বাসা করে, বাচ্চা ফোটায় ডিম থেকে। মাছরাঙার গলা কী বিষণ্ন সুন্দর! কি-লি-লি-লি তানটি হৃদয়হরা। সঙ্গে সঙ্গে নিজের অস্তিত্ব অনুভবে আসে। খুব ভোরে ওরা থাকে, তারপর খেয়েদেয়ে কোথায় যে চলে যায়। আমি অত ভোরে উঠে প্রাতর্ভ্রমণ করতে পারলাম না এক জীবনে। বন্ধু রঞ্জিত বড়ুয়া নিত্যই প্রাতর্ভ্রমণ সেবন করেন। মাঝে দু-একবার চেষ্টা করেছিলাম ওর সঙ্গে। কলেজের পরীক্ষার মতো ফেল মেরেছি এবং বাণিজ্য বিভাগ ছেড়ে মানবিক বিভাগে ভর্তি হয়ে হাঁফ ছেড়েছি। গল্প লেখার স্বপ্ন তখন থেকে জমাট হয়ে উঠেছে। দিনপঞ্জি লেখা দিয়েই সেই বাতিক-ব্যাধির ভিত্তি স্থাপন হয়েছিল। প্রসাধনের সুগন্ধসামগ্রীর একটি ডায়েরি কিনে নিয়েছিলাম মানবিক বিভাগের এক সহপাঠীর কাছ থেকে। চট্টগ্রাম শহরে ওদের সুগন্ধির ব্যবসা।

বিষাদের মোড়কে ঢাকা মুখ নিয়ে বড় একটি লক্ষ্মীপ্যাঁচা মহাশয় এসে ধরা পড়েছিল। ওর পায়ে ছিল বুড়ো আঙুলের সমান মোটা দড়ি। ওকে নিয়ে লিখেছি, কালের কণ্ঠ’র ফটোশিল্পী শেখ হাসান এসে ছবি তুলে দিয়েছিল ওই দৈনিকের জন্য। আমার প্রকৃতিবিষয়ক অনেক ছবির শিল্পী সে। আমার সঙ্গে ছবির কাজে খাগড়াছড়িতে গিয়েছিল। প্রকৃতিবিষয়ক লেখার সঙ্গে ছবির সম্পর্ক অচ্ছেদ্য ভালোবাসার।

আগে নীলকণ্ঠ ছিল বাংলাদেশ শিশু একাডেমি প্রাঙ্গণে। ফিঙে, ঘুঘু, কাঠ শালিক ও সোনা শালিক চলে আসত। এখন আর আসে না। পাড়া ও মহল্লার ছোট ছেলেরা কচ্ছপ, অচেনা জাতের পাখি, প্যাঁচা পেলে ধর্মরাজিকে নিয়ে আসত। ওরা এর বদলে টাকা পেত এবং ধর্মরাজিকের ভিক্ষু-শ্রামণরা ওদের মুক্তি দিত। সব স্বপ্ন একে একে ছিনতাই হয়ে যাচ্ছে। টিকে যেতে বসেছে, পড়ে থাকছে দুঃস্বপ্ন ও নিষ্ঠুরতার চর্চা বেড়ে চলেছে।

তবু স্বপ্ন দেখে মন। চিল ঘুড়ি ওড়াচ্ছি আমি ছেলেবেলার ধান কাটা দোফসলা বিলে। সেই বিলে এখন তিনটি ফসল। গরু মরা খেতে আসা শকুন তাড়াতাম খেলা হিসেবে, পাহাড়ি ঢলে নামা কর্ণফুলীর তীব্র স্রোতে ভেসে আসা বাঁশের চালি ও কাঠ ধরতে সাঁতার কাটছি আর মাঝিহীন নৌকো দিশাহারা ঘুরপাক খাচ্ছে তীব্র স্রোতে। সবই এখন স্মৃতিকাতরতা। এখনো উত্তর ও পুবের জানালা দিয়ে শুনি ঘূর্ণিস্রোতের কল কল শব্দসম্পদ, বৃষ্টি ভাঙা-গড়া, গাভি হামলাচ্ছে শুনতে পাই, বজ্র তেমনি গজরাচ্ছে, পাখিরা চুপচাপ বসে আছে গাছের পাতার নিচে অঝোর বৃষ্টিতে—আমার জানালা কালো বৃষ্টিতে ঢেকে গেল। বন্ধ করে দিতে হলো বিছানা রক্ষা করার জন্য। দৃশ্যপট আবার বদলে যায় প্রাকৃতিক স্বচ্ছন্দতায়, আকাশের অনেক ওপরে ভেসে বেড়ায় চিল ডানা না ঝাপটে, বৃষ্টিহীন পাংশুল মেঘের ওপরে প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়, অত উঁচুতে শকুন ছাড়া কাক-শালিক ওঠে না, পারে পরিযায়ী পাখিরা। পারে হংস বলাকা। মানুষের মন সব ছাড়িয়ে আকাশের ওপারে আকাশে চলে যায়।

উত্তরের জানালা আমাকে বঞ্চনা করে না। ওই ওপর আকাশে মেঘ ঘনায়, আরো নিচে নামে, রোদের খেলায় রং বদলায়, হাওয়া পেলে সচল হয়ে পড়ে, বিমান ভ্রমণের সময় ওই মেঘের ওপরে উঠে গেলে নিচের দৃশ্যপট বদলে যায়, এমনও ভাবনা হতে পারে—বিমান বুঝি উল্টে গেল, নয়তো পায়ের নিচে কেন মেঘ! এদিকে তখন উত্তর থেকে ছুটে আসে বাদুড়ের সাঁই সাঁই ধাতব ধ্বনি, ওদের পাখার শব্দসংগীত। সন্ধে সমাগত। আমি দেখতে দেখতে শেষ বিকেল কোতল করি, তা-ও অত সহজে সম্ভব হয় না। এতই কি সহজ সব কিছু! সন্ধে নামছে, মনোভূমে চলে জোনাকির ঝিকিমিকি।

একটু আগেই আকাশের নিচে পুকুরপাড়ের ঘন গাছপালার সবুজ ছাদে চলছিল পাতিকাকদের শেষ বিকেলের নিত্য খেলা। এ সময় শুধু শুধু তারা ওড়াউড়ি করবে ধর্মরাজিকের আম-বেল-নিম-নারিকেল-বোধিগাছ থেকে উড়ে উড়ে পুবের সীমানা অতিক্রম করে সংলগ্ন ছয়তলা ভবনের ও আশপাশের ছাদে গিয়ে বসা। বসার পরপর দু-এক মিনিটও বিশ্রাম বা কিছু একটা না করে ফের ধর্মরাজিকের গাছপালার মাথায় ফিরে এসে ঝাঁপিয়ে পড়া। মাঝখানে দূরত্ব দেড়-দুই শ ফুট মাত্র। কে তাদের তাড়াচ্ছে, কে তাদের বলছে, কেই বা ভয় দেখাচ্ছে, তেমন কোনো যুক্তি নেই। একদঙ্গল বা শতাধিক পাতিকাক যদি ভাঙা গলায় কা-কা-কা ডেকে এই ঘটনায় মেতে উঠতে পারে, আমিও বা না-উপভোগ করে থাকি কেন! আমার বুঝতে বাকি থাকল না এ শুধু খেলা, দিনের শেষের শরীরচর্চা, ঘুমোবার আগে প্রাত্যহিক শেষ কাজ।     শরৎ-হেমন্ত পর্যন্ত এই খেলা চলবে, গ্রীষ্ম-বর্ষা থেকে এর শুরু। শীত থেকে গ্রীষ্ম পর্যন্ত চলবে ওদের ডিম পাড়া ও বাচ্চা ফোটানোর কাজ, সঙ্গে বাচ্চাদের বড় করে তোলার দায় তো রইলই। তখন এই ম্যারাথন শরীর-মন চর্চাজাতীয় খেলা নেই।

পশ্চিম শিয়র দিয়ে যথাসম্ভব আয়েশ করে দেখার মাঝেও ঘাড় তার ব্যথার সংকেত জানায়। সন্ধে সমাগত। পুবের বিচরণভূমি থেকে শালিক-চড়ুই ফিরছে আস্তানায়। সারা দিনের লেনদেন শেষ করে। নীড়ে নয়। প্রায় সব পাখি নীড় রচনা করে ডিম থেকে বাচ্চা ফোটাবার জন্য। তখন বাসার দরকার হয়। বাচ্চা উড়তে শেখার পর বাসার আর দরকার পড়ে না। ডালে বসে বসে ঘুমিয়ে রাত্রি পাত করে। পাখিদের পায়ের নখ এমন যে ইচ্ছে করেই ডাল থেকে স্বাভাবিক বাঁধন খুলতে হয়, ঘুমের মধ্যে অমনি অমনি খুলে যায় না। মনে হয়, নেহাৎ দুর্বিপাকবশত ঘুমের মধ্যে ক্বচিৎ পায়ের আঙুলের স্বাভাবিক বন্ধন খুলতেও পারে। অথবা পাখি কি স্বপ্নে পড়ে? পায়ের বাঁধন তখন কি তেমন স্বপ্নের কারণে খুলতে যায়? নয়তো তেমন হয় কেন! আমি দুবার কাককে বানের সময় রাতে ডাল থেকে জলে পড়ে যেতে দেখেছি। আরেকবার পুকুরের উত্তরের ঘাটের চাতালে গাছ থেকে পড়ে কয়েক সেকেন্ড বসে থেকে আবার উড়ে গাছে উঠে যেতেও দেখেছি। তা-ও রাতে।

২১ আষাঢ় ১৪২৩ বঙ্গাব্দ। ৫ জুলাই ২০১৬।

কোথা থেকে ছাড়া পেয়ে আষাঢ় তার স্বমূর্তিতে এসে উপস্থিত হলো সবুজবাগের ধর্মরাজিকে, দুদণ্ড ভালোবাসার অবসর খুঁজে। আজ প্রথম মৌসুমি বৃষ্টির দুর্দান্ত পরশ পেলাম। এত দিন বৃষ্টি ছিল বজ্রগর্ভ মেঘের সচ্চরিত্রের। সারা দেশে শতাধিক মানুষের প্রাণ লুট করে নিল বজ্রপাত। সেই জ্যৈষ্ঠ থেকে ঢাকা শহর ধুয়ে যাচ্ছে বজ্র ও বৃষ্টিপাতে। আষাঢ়ের বজ্র নয়, নয় সংগীতের কোমল-মধুরিমাও, কেবল একতরফা ত্রাস সৃষ্টিকারী, সুষমা তার নেই। কী আকুল হয়ে আছি আমি বার্ষিক মৌসুমি বৃষ্টিপাতের জন্য, পুরবৈয়াঁ হাওয়ার গল্পগাথার জন্য!

কোথা থেকে ছাড়া পেয়ে গেলে আজ, সারা দেশে শুরু হয়ে গেছে মৌসুম, কোথাও বা ডাকাতিয়া মেজাজে। নিয়মিত পড়া দৈনিক কালের কণ্ঠেও এ বছর মৌসুমি বায়ু আসার আগাম সন্দেশ দেয়নি। সাধারণত আষাঢ়ের ৬-৭ তারিখে বঙ্গোপসাগর দখল করে নেয় পরিত্রাত মৌসুমি বায়ু, বৃষ্টি নামে ব্যাকুলতা নিয়ে। ওই শ্যামলী মেয়ে নীল আকাশ ছেয়ে ওড়না ওড়ায়, জয় বাংলা শোনায়। অনুভব করলাম সুফলা দুপুর শেষে আড়াটার দিকে। আমি তখন উত্তরের জানালার দুটি কপাট বন্ধ রেখে তার পুব পাশের দুটি খুলে মেঘের হর্ষ-রভস গিলছি। অনেক আগে রোদ ছুটির হাওয়া পেয়ে গেছে, নীল আকাশ ধূসর পয়োধরে নিশ্ছিদ্র ঢাকা। আতুর চোখে দেখে রইলাম। শত শত পাতিকাক আর ওড়াউড়ি করছে না ঘন বৃষ্টির আগাম সুবাস পেয়ে। পাখিরা আগে থেকে সব খবর পায়। জানালার বাকি দুটি কপাট খোলার দরকার নেই, এতেই উত্তরের আকাশ সম্পূর্ণ মুক্তকণ্ঠ।

কী ধূসর, কী সূক্ষ্ম বৃষ্টিবিন্দু ঝরে পড়ছে জানালার প্রতিবেশী দুই যুবক নারিকেলগাছের স্তরে স্তরে সজ্জিত নিবিড় সবুজ পত্রগুচ্ছের ওপর! কী মায়া! শীতের দুর্দান্ত কুয়াশার চেয়ে হালকা বৃষ্টিবিন্দু ঝরে পড়ছে। আগে কখনো এখানে এভাবে বৃষ্টির কুয়াশা অনুভব করিনি। সাজেক পাহাড়ের কুয়াশার চেয়েও কোমল, ক্ষুদ্র ও সূক্ষ্ম! কিন্তু উড়নচণ্ডী তরুণী নয়। হাওয়া একটুও বইছে না বলে এই দুর্লভ সঙ্গম। তা-ও চোখে পড়ত না যদি-না নারিকেল ছুঁয়ে ওরা ঝরে না পড়ত। আমি অবাক হয়ে দেখছি বৃষ্টি নেই অথচ পাতার আগায় বৃষ্টিবিন্দু কেন, ফোঁটা ফোঁটা ঝরবে কেন! আমার ঘরে কেউ নেই। পাশের কক্ষে তুষার থাকে, সে তার বইয়ের দোকানে। তার পাশের কক্ষে নিব্বুতি থেরো থাকেন। তাঁর পাশে সাউ তোয়াই ও দুই ছাত্রসঙ্গী থাকে। ওদের কাউকে ডেকে দেখাতে পারতাম। এমন সূক্ষ্ম অনুভব ভাগাভাগি করতে গিয়ে যদি রসভঙ্গ হয়ে যায়—ভাবলাম সঙ্গে সঙ্গে। একা ও ভাগাভাগি দুই-ই করা যায় এই দুর্লভ দৃশ্যের।

বিন্দুগুলো উড়ছে, তন্বী হলো, তখন আরেক রূপ, অন্য মন, অন্য আশা। আরো বেড়ে সোমত্ত হলো, জানি এর পর কী রূপ নেবে। কোথা থেকে এসে ঝামরে পড়ল হাওয়া, আষাঢ়ের প্রকৃতি নিয়ে নামল ঋতুর সচ্চরিত্র বর্ষাসুন্দর। উরে লাগাতার মৃদুল-কঠিন বারিধারা, আমার প্রিয়তম সদবংশজাত আষাঢ়—বছরের প্রথম সম্মিলন, আমার বর্ষাসুন্দর। বৃষ্টিসুহৃদ। বাদলসখা। প্রাবৃটসুন্দরী। মেঘমেদুরতন্বী।

 

‘আষাঢ়, কোথা হতে আজ পেলি ছাড়া।

মাঠের শেষে শ্যামল বেশে ক্ষণিক দাঁড়া

জয়ধ্বজা ওই-যে তোমার গগন জুড়ে।

পুব হতে কোন্ পশ্চিমেতে যায় যে উড়ে,

গুরু গুরু ভেরী করে দেয় যে সাড়া’

আজ মেঘের কোলে সর্বনাশা বজ্রপাত নেই। আজ সে সোহাগী শ্যামল শোভারঞ্জন। নাচের নেশা লাগল উত্তরের জানালার প্রহরী দুটি নারিকেলগাছের পাতায়। ওরা আমার জানালার ডান দিকে অতন্দ্র প্রহরী। সামনে একতলা ভবন, টিনের ছাউনির চৌকো একটি বড় ঘর, আগে যা ছাত্রদের খাবার ঘর ছিল, এখন শ্রামণদের আবাস। তারপর দোতলা ভবন, নিচের তলা ভিক্ষুদের খাবার ঘর, ওপরে হবে পাঠাগার। তারপর মূল বুদ্ধমন্দির, অফিস, ভিক্ষুদের আবাস দোতলায়। তার পাশে পুব অংশে টিনের চালের রসুইঘর। তার উত্তর পাশে সবুজবাগ-বাসাবো সড়ক, দুই পাশে আবাসিক ঘরবাড়ি। ওপরে আকাশ, কিন্তু শহুরে রাতের আকাশ তারাহীন। এমনকি ধ্রুবতারাও নেই হয়ে আছে। দুপুর দুটো থেকে সূর্যও নেই। আকাশের অনেক ওপরে নিঃসঙ্গ চিল বৃষ্টি নেই বলে পাখা মেলে আয়েশ করে ভেসে চলেছে—এও আকাশের বিরল সৌন্দর্যশিল্প। ওখানে শকুন ছাড়া আর কোনো পাখি ওড়ে না? না না, ওড়ে। শীতের আগে পরিযায়ী পাখি। বঙ্গভবনে মহামান্য রাষ্ট্রপতির পুকুরে প্রতিবছর পরিযায়ী পাখি আসত। আমি মতিঝিলের অফিস ভবনের চারতলা থেকে চুরি করে দেখেছি। এবং জেনেছি, মহামান্য রাষ্ট্রপতি ওদের খাবার জোগাতেন। ওরা সন্ধের পরপর বেরিয়ে পড়ত উত্তর-পুব দিকে, কোথাও রাতের খাবারের খোঁজে। ধর্মরাজিকের ওপর দিয়ে ক্রেঙ্কার তুলে চলে যেত, ফিরত ভোর-ভোর সুসময়ে। আমি ওদের গান শুনতাম লোভী আগ্রহে। সে অনেক দিন আগের কথা, তখন অন্য মন ছিল।

পাঁচটা পর্যন্ত চলল কুয়াশার বৃষ্টি ও হালকা-ভারি বৃষ্টির খেলা। নামল আরো ভারি বারি, বজ্রবিদ্যুতের শাসানি নেই। আবার কমল বৃষ্টি। মাঝে মাঝে এই হালকা বৃষ্টি অবহেলা করে পাতিকাকদের ওড়াউড়ি। একবার পুব দিকে যাবে, ফেরে পশ্চিমে ধর্মরাজিকের গাছপালায় বসবে, ফের পুব দিকে সুউচ্চ ভবনের ছাদে-কার্নিশে বসে পাখা মেলে এদিক-ওদিকে ভিজিয়ে নেবে, ফের ওড়াউড়ি। কোকিল ও ঘুঘু কিভাবে স্নান সেরে নেয়, দেখার সুযোগ হয়নি। শুকনো মরশুমে চড়ুই ধুলোস্নান সেরে নেয়। চাতক বৃষ্টি আবাহন করে তার গান শুনেছি ওদের কণ্ঠে। ওর স্নান করা চুরি করেও দেখার সুযোগ পাইনি এ বছর জষ্টির বজ্রগর্ভ মেঘ ১৮ আষাঢ় পর্যন্ত রাজত্ব, শাসন, শোষণ চালিয়ে গেল বাংলাদেশের ওপর। এখন আর নেই তার বজ্রগর্ভ উৎপাত ও পরাক্রম। এলো আষাঢ়ের মৃদুল নিজস্ব রূপ! ঘন বর্ষণ নয়, ধীরে-সুস্থে প্রস্তুতি, কিন্তু স্বভাবটা ডাকাতিয়া, আবার তার মৃদুল রূপ। সে আরো উন্মাদনা জাগানিয়া হয়ে গেল পরদিন ১৯ আষাঢ়ের ভোরে উদয় হয়ে। ভোরবেলাকে সে ভরে দিল মধুরিমায়, আচ্ছন্নতায়। জানালা খোলার অবকাশ না দিয়ে আমাকে ভালোবাসাপন্থী করে তুলল জ্বলন্ত অদৃশ্যে থেকে, উত্তরের বন্ধ জানালার পাশের দুটি নারিকেলগাছের পাতার শব্দতরঙ্গ বিভঙ্গে। নাচের নেশায় যে তাদের পেয়েছে, আমি ঘ্রাণে অনুভব করতে পারছি। সকাল পেরিয়ে গেছে। ঘড়িতে নির্ঘাত ৮টা বেজে গেছে। কদিন থেকে এ যাত্রায় বড়ি না খেয়েও আমার ঘুমের ছন্দ ফিরে পেয়েছি। রাতের একটানা ঘুম ভোর ৬টায় একবার থেমে অমনি শুরু করে ৭টা পর্যন্ত, সেখানে বাধা না পেলে ৮টার ঘরে সে দৌড়ুবে। আমি মানা করি না, ঘুমের বড়ি ছাড়া এই ঘুম আমার বহুদিনের আরাধ্য ধন। ওমর খৈয়াম চলে আসে বেপরোয়া বেগে,

‘আঙুরের রসে আমার শুষ্ক জীবনটা দাও ভরে,

সুরায় ভিজিয়ে দিও দেহখানি যখন যাব যে মরে।

আমার এ দেহ আঙুর পাতায় সযতনে ঢেকে নিও,

পুষ্পিত কোনো বাগানের ধারে আমাকে কবর দিও। ’

 

গীতবিতানের একটি গানের সুর ভেসে আসে নারিকেলের পাতার নৃত্যে,

‘নাচের নেশা লাগল তালের পাতায়,

হাওয়ার দোলায় দোলায় শালের বনকে মাতায়।

আকাশ হতে আকাশে কার ছুটোছুটি,...’

 

উত্তরের জানালা না খুলেও নারিকেলের পাতার লুটোপুটি ও কুয়াশা-বৃষ্টির শব্দশিল্প শুনতে পাই, তার ঝুমঝুম সংগীত শরাব পান করি। প্রথম আষাঢ় এলো উন্মাতাল করতে। আমার জীর্ণ কক্ষের ছাদ চুয়ে টুপটাপ বাদল ঝরে বইয়ের স্তূপের ওপর—আমার কক্ষ যে বইয়ে বইয়ে অতিষ্ঠ, এমনকি আমাকেও পারলে তাড়িয়ে দেয় অবস্থা।

উত্তরাকাশে সন্ধের পাখিরা রোজকার মতো উড়ছে আর বসছে, আবার উড়ছে, আবার বসছে দুদণ্ডের জন্য। এত কাক, এত তাদের ফুল্ল বাহানা ও দাপট, এত দেমাগ যে তল পাই না আমি। ওদের ওড়াউড়ি, রঙ্গরসিকতা বাড়াবাড়ি রকম ফুলে-ফেঁপে ওঠে। ঢাকা রেল স্টেশনের রচিত মেহগনি-শিরীষের বনখণ্ড থেকে ধর্মরাজিকের গাছপালা পেরিয়ে ওরা যাবে পাশের ছয়তলা-পাঁচতলা বাড়ির ছাদে। এতে তাদের কী প্রয়োজন মেটে আজও তার তল পেলাম না। শুধু খেলা? এটা একটা ভ্রমণ হলো নাকি সাধ মিটল। ওরা স্বপ্ন চয়নের নেশায় মাতে!

সন্ধের প্রাক্কালে ঝাঁকে ঝাঁকে ডেরায় ফেরার আলেখ্য না দেখে কি থাকা যায়! কাকও ফেরে। কাকদের চেয়ে শালিকের গতি বেশি! শালিকের চেয়ে চড়ুইয়ের। প্রায় সাঁই করে চড়ুইরা দ্রুত বেরিয়ে যায় জানালা পেরিয়ে। ঘাঁটিতে ফিরে চড়ুইরা কী মধু কলকাকলিই না তুলবে! টানা চলতে থাকবে ওদের শিঞ্জন। শহরের বিভিন্ন মহল্লায় ওদের ঘাঁটি আছে, সমবেত ক্রেঙ্কার শোনা যায়। কদমের ঝোপও তেমনি চক্ষু বিনোদনকারী। মতিঝিলের শাপলা চত্বরের উত্তর-পুব কোণের কদমগাছটি ওর ফুল নিয়ে আমাকে জোর টান দেয়, বাস থেকে আমি সম্ভাষণ জানাই। নটর ডেম কলেজের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একটি গাছের দুর্লভ সোনালি পাকুড় ফল ও কৃষ্ণচূড়া মান্যি আদায় করে নেয়।

রমনা পার্কের বড়-ছোট তিনটি বাওবাবগাছ বিভোল বার্তা জানায়। বিখ্যাত বুড়ো অগ্নিশিখা বা রুদ্র পলাশ বৃক্ষটি বয়োবৃদ্ধ হয়ে অযত্নে নিবু নিবু। শতাব্দীর বিখ্যাত মহুয়া বৃক্ষ মহাশয় শেষ হয়ে যেতে আর দেরি নেই। ওর কোটরে খুড়ুলে প্যাঁচার আবাস আছে, ডোরাকাটা কাঠবিড়ালীও থাকে। আছে বিখ্যাত মাইল্লা আমগাছের প্রাচীন সারি, সেই উত্তরাংশে। এক শ বছর আগে রমনা পার্ক সৃষ্টির সময় রোয়া হয়েছিল নিশ্চয়ই। আমি ভুলতে পারি না অচরাচর ঘন কুয়াশার ভোরে ওদের দেখতে যাওয়ার স্মৃতি। সবুজবাগ থেকে অপরিপক্ব ভোরে রিকশায় করে অরুণোদয় তোরণে নেমে ঢুকে পড়লাম কুসুম্ভ বীথিতে। বসন্তে গাছ ভরা তার উজ্জ্বল ঘন লাল নব পত্রালির সম্মিলিত উচ্ছ্বাস দেখবেন। তারপর অজস্র ফুল ফুটে পাপড়িরা যখন পথের ওপর মখমলের মতো বিছিয়ে থাকবে, তার ওপর দিয়ে খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার মহার্ঘ অভিজ্ঞতা কি আপনি সঞ্চয় করে রেখেছেন। না হয়ে থাকলে আগামী বসন্তের জন্য তা সঞ্চয় করে রাখুন। পাশেই পার্কের বাইরে হেয়ার রোডে আছে দুই সারি শতাব্দীর পদাউক। ঢাকা নগরীর সেরা সুন্দর পথের রাজা তারা। ওদের সোনা রং ফুল ফোটে মাত্র এক দিনের জন্য। ভিন্ন ভিন্ন ডালে ভিন্ন ভিন্ন দিনেও ফুটতে পারে। সকাল থেকে সন্ধে, ব্যস প্রেমিকা-শ্রেষ্ঠ ফুল উধাও। পড়ে থাকল রোদনভরা গ্রীষ্ম-বর্ষার দুর্লভ সময়ে। ভোরের কাগজের যৌবন সময়ে। ওর নিজস্ব ক্যামেরাশিল্পী টেঙ্কুর তোলা ছবিসহ লিখেছিলাম। তরুপল্লব সংগঠনের গাছ চেনার নানা অনুষ্ঠান নিয়ে রমনা পার্কের স্মৃতি বেড়েই চলেছে।

ফিরে যাই আকাশের টানে। একটি নিঃসঙ্গ চিলের আকাশ বিহারের নৈঃসঙ্গ্যতার দিকে চেয়ে থাকি, কান পেতে থাকি তার পক্ষ-বিধুননের শব্দের আকাঙ্ক্ষায়। বেশ বড় তার ওড়ার চক্র, নীল আকাশে একটি মাত্র পাখি আপন মনে বিশ্রাম নিচ্ছে পাখা বিস্তৃত করে, চক্রাকারে ঘোরে বলেই পুব বা পশ্চিম দিকে বা মাথার ওপর ঘরের ছাদের জন্য অদৃশ্য হয়ে গেলে আবার দেখতে পাব। একটি মাত্র পাখি বিশ্রাম নিচ্ছে উড়ে উড়ে। মানুষ কি সকাল-সন্ধের হাঁটার ব্যায়ামকে বিশ্রাম বলবে কখনো! ওই চিল নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলে, ভাবনা নিয়ে অথবা কাল্পনিক প্রণয়পাশ খেলছে। বালিশ মাথার নিচে ও উরুর সন্নিধানে রেখে আয়েশ ভরে দেখছি। ও আকাশে, আমি বিছানায়। ভেসে বেড়াচ্ছে পক্ষ সঞ্চালন না করে, শুধু লেজ দিয়ে হাল ধরে থেকে—অসীম সাগরে যেন এক নিরাপদ তরণী। মাথার বালিশ ঠিক করে নিয়ে তাকাই, চোখ রগড়ে নিই, দুঃখ-সুখের দীর্ঘশ্বাস বদল করি। আজ ২৬ আষাঢ়—কোথায় গেল নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে—এ যে ভাদ্রের অম্বর। তার ওপর সাদা ধূসর মেঘ। দৃশ্যপটে আবির্ভাব হলো আরেকটি চিল। ব্যস, চক্রাকারে ওপরের নিঃসঙ্গ চিল নেমে এলো দক্ষিণ প্রান্ত থেকে। দৃশ্যপটে দুজনই ঘুরছে, চক্র ছোট হয়ে আসছে ওদের, মিলে গেল চক্র। চক্র শেষ করার সময় চলে গেল পশ্চিম-উত্তর কোণের বাইশতলা ভবনের আড়ালে। এক...দুই...তিন...চার—ওদের মধ্যে ভাব জমে গেল? তাই তো বোধ করি! পঞ্চম চক্র পূর্ণ করে ওরা চলে গেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে! ততক্ষণে পুব দিক থেকে শালিক-চড়ুই তাদের রাতের আবাসের দিকে ফিরতে শুরু করেছে। কুড়ি-পঁচিশ বছর ধরে দেখে যাচ্ছি আর উপভোগ করছি। মহুয়ার ফুল ও ফল খেতে আসবে কালা বাদুড় ও চামচিকে। ফুল রাধার গালের টেবোর মতো, ফল জলপাইয়ের মতো, তবে একটু বাঁকানো। আকারেও প্রায় কাছাকাছি। শরীরের পেছনে দু-আঙটায় গাছের ডাল ধরে ঝুলে থেকে ফলের ওপরের চামড়াসহ শাঁসটা খেয়ে বীজটা ফেলে দেবে। লিচুর বীজের মতো ওর বীজ। সকালে গাছতলায় পড়ে থাকবে ওই চকচকে বীজ অন্যদের সঙ্গী হয়ে। রমনা পার্কে এক সকালে ওই বীজ সংগ্রহ করতে দেখেছি এক বুড়ো-প্রায় লোককে। তিনি বলেছেন, এগুলো গরুর ভালো খাদ্য।

তরুপল্লব গাছ চেনা ও প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শেখার সংগঠন। বর্তমানে সভাপতি দ্বিজেন শর্মা, সহসভাপতি শাজাহান মৃধা বেণু, সাধারণ সম্পাদক মোকারম হোসেন। উপদেষ্টারা—ইনাম আল হক, সাহাদাত সেলিম, প্রণব সাহা এবং আমিও একজন। রমনা পার্ক, বোটানিক্যাল গার্ডেন, চিড়িয়াখানা, গাজীপুর ও আশপাশের এলাকায় সবার সঙ্গে আমিও যাই। আগে ছেলেবেলায় প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শিখেছি গ্রামের ভিটেমাটি ও মা-বাবা-ঠাকুমার কাছে। এখন শিখছি দেশের আনাচকানাচ ঢুঁড়ে, বই পড়ে। না, এক জীবনে এত কিছু জানা ও চেনা সম্ভব নয়। এ জন্য জন্মান্তর দরকার। জন্মজন্মান্তরের স্মৃতি মস্তিষ্কে সংরক্ষিত থাকুক না কেন! জীবনটা তাহলে আরো জটিল, একঘেয়ে ও ভারবাহী হয়ে যাবে! কেন? মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতা তো এখনো এত কম নয়। তাহলে কি মানুষের জন্য পৃথিবীর আয়ু আরো কমে আসবে বা আসত। মানুষের গড় আয়ু তো বেড়েই চলছে। পশু-পাখিদের, বাঘের, তিমির!

কাক সম্পর্কে এই উপমহাদেশে প্রাচীনকাল থেকে যত লেখালেখি ও গবেষণা হয়েছে, তেমনটি আর কোনো পাখির ললাটে জোটেনি। এখানে ২০-৩০টি কুকুরের দঙ্গলে এখনো বেজি আছে। ওদের চলাফেরা দক্ষিণ-পুব দিকে সীমানা দেয়ালের মধ্যে সীমিত চলাফেরার সময়। বিড়ালরাও সীমানা দেয়াল ও টিনের চালের বাসিন্দা চলাচলের সময়। জীবনানন্দ দাশ সোনালি ডানার শঙ্খচিলের কথা লিখেছেন তাঁর কবিতায়। প্রেমেন্দ্র মিত্রের গাঙচিল নিয়ে লেখা ‘সবুজের ছোঁয়া কি না তা বুঝি না’ কবিতার গানটি গেয়েছেন; তাঁর ওই ‘সাগর থেকে ফেরা’ বইয়ের বিখ্যাত কবিতা। বঙ্গোপসাগর নিয়ে উপন্যাস, কবিতা বা স্মৃতিকথা দুর্ভিক্ষের মতো নগণ্য। কেন? বাঙালির সাহিত্যচর্চা বঙ্গোপসাগরবিমুখ কেন?

আমার উত্তরের জানালায় বর্ষার জলভারনত মেঘ ও বৃষ্টি দেখে দেখে আমি দেখতে পাই বঙ্গোপসাগরের স্মৃতি, আমার অনেক গল্পের পটভূমি। বর্ষার বৃষ্টি মৌসুমি বায়ুর অবদান। আটলান্টিক থেকে ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে বহু যুগের ওপার থেকে তার আগমন বাংলাদেশকে শ্যামল-শোভায় পুরে দিতে।

আমার পুবের লোহার কাঠামোর জানালায় মাথার পেছনের নাগালে এক জোড়া কাক দম্পতির সখ্য আদায় করে নিয়েছি। জানালার গোরবাটে ওদের ভাত দিয়ে অভ্যর্থনা জানিয়েছি। দু-এক ঠোকর নিয়ে না-করে দিল। মুড়ি দিয়ে মন ভরাতে পারিনি। শেষে কাঁচা চিঁড়ে দিলাম। পছন্দ করল? ওতে হয়ে গেল বন্ধুত্ব। জানালায় ঝামরে পড়া নাতিতরুণ নারিকেলের ডালে বসে ওরা দুটিতে ডাক পাড়ে আমাকে। আমি বুঝতে পারলাম একদিন। হুড়ুম দিলাম, দুই ঠোকর খেয়ে আর নিল না। চিঁড়ে দিলাম। এখন ওরা এসে চিঁড়ে চায়, আমি ওদের সঙ্গে একতরফা আলাপ করতে করতে বয়াম খুলে এক মুঠো দিই। কথা বলতে বলতে বয়াম বন্ধ করি, জানালা থেকে সরে এসে নির্দিষ্ট স্থানে ওটা রাখি। প্রথম দিন খুব সতর্ক, ডাল থেকে এসে জানালার গ্রিলের কাঠে দুই পা রেখে বসা যায় না বলে এক পা রেখে অন্য পায়ে লোহার গ্রিল আঁকড়ে ধরে বসল। এক ঠোকর নিল। দ্বিতীয়বার নিল। তাকায় আমার দিকে, খুব সতর্ক। এত দিন ওদের সঙ্গে একতরফা কথা বলে মন মজাতে পেরেছি বুঝতে     পারলাম। ওদের প্রেম, ভালোবাসা, সন্তান ও পারিবারিক নানা খুঁটিনাটি। আমি বলে যাচ্ছি, ও শুনে যাচ্ছে আর খাচ্ছে। খাওয়া মানে গেলা, মানুষের মতো চিবোয় না ওরা। বড় কিছুর টুকরো হলে পায়ে চেপে ধরে ঠোঁট দিয়ে ছিঁড়ে খায়। সঙ্গীটি বসে আছে ডালে, তাকিয়ে আছে সতর্ক দৃষ্টিতে এবং ওর পালার জন্য অপেক্ষা করছে। মেয়েটির পালা এলো। জায়গা বদল করল দুজনে। পুরুষ কাক আকারে একটু বড়, মেয়েটি একটু ছোট। ওই দেখেই আমি ওদের শনাক্ত করি।

শেষ ছোট্ট দানাটিও তরিবত করে খেয়ে নিল। তার পর থেকে প্রায় প্রতিদিন এসে নারিকেলগাছের পরিপাটি ডালে বসে ডাকে। আমি ধৈর্য ধরে ডাকি হাত থেকে নিয়ে খাওয়ার অপেক্ষায়। অঞ্জলি ভরে দিয়ে ডেকেছি। ওদের প্রেম-ভালোবাসার খবর জানতে চেয়ে আমাকে বিশ্বাসভাজন করে তুলতে চেয়েছি। দিব্যি দিয়েছি ওদের কোনো অনিষ্ট করব না বলে, হাত জোড় করে। আমার গল্প লেখার কথাও বলেছি, ওদের নিয়ে আরো লিখব বলে ওয়াদা করেছি। কাক নিয়ে কুড়ি বছর আগে যে পাণ্ডুলিপি সাহিত্য প্রকাশে দিয়েছিলাম, সেটা ফেরত আনার খবরও বলেছি। ‘আমার চেনা পাখিওয়ালা’ গল্পটির প্রায় পুরোটা সংক্ষেপে শুনিয়েছি। শিল্পী সুলতানের সঙ্গে কাকের বন্ধুত্বের কথা বলেছি। পাখি নিয়ে লেখা ৯টি গল্পের সারসংক্ষেপ শুনিয়ে দিয়েছি। ‘অভয়ারণ্যের খোঁজে’, ‘একা’, ‘ভয়ঙ্কর মুখোশ’, ‘পলাতক’ ও গাঙচিল নিয়ে গল্পগুলোর কথা তখন মনেই পড়ল না।

১৪ জুলাই ২০১৬। আষাঢ় শেষ হতে চলেছে, কোথায় গেল বৃষ্টির ঘনঘোর আঁধিয়ার। শেষ বিকেলের ৫.৩০টায় উত্তর আকাশে উদয় হলো নিঃসঙ্গ চিল। সঙ্গীকে পাতি পাতি করে ঢুঁড়েও দেখা পেলাম না। আষাঢ়ের বৃষ্টিহীন বিশাল আকাশের সঙ্গীহীন চিল। এ জন্য সে দুঃখী নাকি সুখী জানার কোনো উপায় নেই।

 

বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ গেল বজ্রগর্ভ বৃষ্টি ও বজ্রপাতে। আষাঢ় গড়িয়ে চলে গেল, বৃষ্টির নিজস্ব বাহাদুরি নেই। প্রকৃতির আচরণ বদলে গেল। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের মানুষ পর পর বছর ধরে দেখছে বোশেখ মাসে পাহাড়ি ঢল বা বান নেমে আসছে। এমনকি মার্চের শেষেও এই আপদ জুটছে, বোরো ধান তলিয়ে যাচ্ছে। অতীতে এ রকম ফসলহানির বান দেখা যেত না। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এমন আগাম বৃষ্টি হচ্ছে, আষাঢ় চলেছে চরিত্র বদল করে। ওদিকে বঙ্গোপসাগরের নোনা জল সুন্দরবন বেয়ে সাতক্ষীরার নদ-নদী পর্যন্ত উঠে আসত। এখনই সেই লবণাক্ততা গোপালগঞ্জের মধুমতী নদীতে হানা দিচ্ছে। পুরো দক্ষিণাঞ্চল এখন সুপেয় জলের সংকটে ডুবে আছে। সুন্দরবনের বাঘ-হরিণদের জন্য এটি নতুন সংকট। চৈত্র মাসে যেখানে মাঠ-ঘাট এমনকি খালও ফেটে চৌচির হওয়ার কথা, সেখানে এমন ঘটনা এখন আর নেই। প্রকৃতির আচরণ বদলে যাচ্ছে। মানবসৃষ্ট অনেক দুর্যোগ এর সঙ্গে এসে মিশছে। নদীর স্বাভাবিক গতিপথ রুদ্ধ করছে মানুষ। আবহাওয়ার নিয়মতান্ত্রিকতা বিশ্বের মানুষের কারণে ভেঙে পড়ছে। কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছেই। প্রতিনিয়ত বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ছে। উত্তর ও দক্ষিণ মেরুতে জমাট বরফ গলতে থাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। আবহাওয়ার মতিগতি বদলে যাচ্ছে, ভেঙে পড়ছে দীর্ঘকালের চাষবাসের অভিজ্ঞতার শৃঙ্খলা। জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে এ রকম আগাম বন্যা। আগামী বছরও তা-ই হবে এই বোশেখ মাসে ধান ওঠার দিনে।

বাংলাদেশে উন্নয়নের নামে প্রতিনিয়ত বন ধ্বংস করা হচ্ছে সরকারি উদ্যোগে ও অবহেলায়। একটি দেশে ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা দরকার। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এই হার বজায় ছিল। এখন আছে ১০ শতাংশের মতো। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে বাঘ, হাতি প্রভৃতি বড় জীবজন্তু থেকে বানর-নকুল পর্যন্ত মাঝারি এবং ছোট প্রাণীরা।

বোশেখ-জষ্টি মাসে প্রচণ্ড রোদ ও গরম থাকার কথা, তখন বৃষ্টিও ছিল। এই আষাঢ়ে বৃষ্টির ঘনঘটা থাকাই ছিল স্বাভাবিক। বদলে গেছে ‘বহু যুগের ওপার হতে আষাঢ় এল আমার মনে,/কোন সে কবির ছন্দ বাজে ঝরো ঝরো বরিষণে। ’ এখন রবীন্দ্রনাথের কালের বরিষণ নেই। বদলে যাচ্ছে বৃষ্টির প্রকৃতি, ভালোবাসার সুষমা, চুম্বনের আহ্লাদ, সাহিত্য-শিল্প-সৌন্দর্য প্রকরণ।


বেগনা ছড়া ঝরনায় লেখক


এমন সময় একটি কুকুর হৌ-হৌ ভাঙা টানা-গলায় জুড়ে দিল কান্না। কান্না নাকি বিষাদ সংগীত! সারা দিনে বেশ কয়েকবার এবং রাতে কয়েকবার চলবে নিয়মমাফিক। একটাতে এক প্রান্তে শুরু করলে অন্য সব প্রান্ত থেকে অন্য দলের সবাইও এই গণকান্না (!) শুরু করে দেবে। গ্রামের কথায় প্রচলন আছে, এর নাম কুকুরের কান্না—এতে অমঙ্গল ডেকে আনে। গেরস্ত মানুষ তখন কুকুরদের ধমক দিয়ে বিরত করে। সারা ধর্মরাজিক কুকুরদের চারটি সামরিক অঞ্চলে বিভক্ত। এক অঞ্চলের কেউ অন্য অঞ্চলে গেলে হানাহানি অনিবার্য। তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ কুকুরটি এক অঞ্চল থেকে অন্য সব অঞ্চলে দাপটের সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়। মাঝে মাঝে সবখানে ঘুরে সে তার শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করে আসে।

ধর্মরাজিক উচ্চ বিদ্যালয়ের দপ্তরি নিধু স্কুল অঞ্চলের কুকুর ও বিড়ালছানা, গাছপালা ও ফুলের বাগানের নিবেদিতপ্রাণ পরিচর্যাকারী। আগে হরিণ ও রাজহাঁস ছিল। এখন তিনটিতে ঠেকেছে রাজহাঁস। কুকুরের জন্য রাজহাঁসরা ডিম পেড়ে বাচ্চা তুলতে পারে না বলে তিনটি মদ্দাতে ঠেকেছে। শরৎকালে ওরা উচ্চগ্রামে ডেকে বিষণ্ন মুখরতায় চারদিক ভরে তোলে। এ সময় পরিযায়ী পাখিরা আকাশ বেয়ে চরতে যায়। নিচের পুকুরবন্দি ওরা সংবেদন জানায়। নিধু কুকুর ও বিড়ালছানাদের যত্ন করে ফুলের টবের সঙ্গে। আবার গাছতলার ঝরে পড়া মহুয়া ফুলগুলো ঝাড় দিয়ে কুড়িয়ে রাখে বিক্রির জন্য। মৌচাক গড়ে তোলে মৌমাছিরা মহুয়াগাছের একই ডালে, একই জায়গায়। গুলতি মেরে বাদুড় শিকার করা উপজাতি ছাত্রদের বিরুদ্ধে নিব্বুতি থেরো ও নিধু খড়্গহস্ত। আমি স্বস্তি পাই ওরা আপন দলের বলে।


লেখকের বাসার পুব জানালায় কাক বন্ধু


একদিন নিধুকে বললাম, কয়কটা কুকুর ও বাচ্চা আছে শুমার করে আমাকে সাহায্য করতে। দুই দিন পর ভগ্নহৃদয়ে বলল, পারলাম না। কুকুরগুলো কখন কোথায় থাকে, মারামারি ও বন্ধুত্ব নিয়ে থাকে, খেলা ও ছোটাছুটি করে যে গোনাগুনতি করা কঠিন। এক পাহারাদার পুলিশ  জনৈক কুকুর তেড়ে আসাতে হাতের ফ্লাস্কের চা ছুড়ে মারে। ব্যস, সেই থেকে কুকুররা পুলিশ দেখলেই ঘেউ-ঘেউ হা-হা করে। পাহারাদাররা বুঝতে পেরে দীর্ঘ দু-তিন বছর চেষ্টা করে ওদের সঙ্গে মিত্রতা গড়ে তোলে। এখন দুবছর ধরে দেখি জ্যৈষ্ঠ থেকে রোদ-বৃষ্টির মরশুমে ওরা সন্তান কামনায় মেতে ওঠে। শিশু ছানাদের কী আদুরে কাণ্ডকারখানা ও তেজ—দেখি আর ছবি তুলি।

উত্তরের জানালা দিয়ে ছবি হয়ে থাকা কুল ও বেলগাছ দেখি। আগে ওখানে নিয়মিত বাসা করত শালিক। এখন পাতিকাকের শক্তি এত বেড়ে গেছে যে শালিকরা পুকুরের দক্ষিণ সীমানায় চলে গেছে, এখন ওদের বাসা ও ছানা তোলা দেখতে পাই না। দাঁড়কাকও আত্মসমর্পণ করে চলে গেছে আহমদবাগে। ওখান থেকে ওদের আয়া আয়া ও বিচিত্র ডাক শুনতে পাই। সংগীতের নিচু পর্দায় ওদের গলা বেশি মধুর। আশপাশের পোষা পায়রারা আসে। পাশের দালানের কার্নিশে বসে বসে ঝিমোয় পাখা পরিচর্যা করে, গুটুরমুটুর করে গায় ‘গুড গার্ল, গুড গার্ল’ সংগীত। পুব দিকের জানালার নিচের কার্নিশে ওদের ভাত, মুড়ি ও চিঁড়ে দিই আর ওদের গানের রাগ-তাল চেনার ব্যর্থ চেষ্টা করি। জালালী কবুতরও আসে মাঝে মাঝে। পুব দিকে তিনটি ভবনের পরে ওদের মালিকের দেওয়া খুপরি। পুবের জানালার কাছের জামগাছে চড়ুইদের আড্ডা, গান, শত্রু এলে চেঁচামেচি, পালিয়ে যাওয়া এবং প্রেম-ভালোবাসা তো আছেই। উত্তরের জানালা থেকে ওদের শুনি, ধন্যবাদ পাঠাই—দেখতে পাই না বলে। রবীন্দ্রনাথের পূজা পর্যায়ের গানের দুটি পঙক্তি ছুঁয়ে যায়, ‘গোপন রহি গভীর প্রাণে আমার দুঃখ সুখের গানে/সুর দিয়েছ তুমি, আমি তোমার গান তো গাই নি। ’

গত বছর কয়েক থেকে আবহাওয়ার যে ভোগান্তি শুরু হয়েছে, তা সূচনা মাত্র। আগামী বছরগুলোতে অবিরাম বাড়তে থাকবে। নদী অভিমানী হয়ে উঠছে বাঁধ দেওয়াতে। গঙ্গায় বাঁধ পড়েছে, তিস্তায় হয়েছে। ব্রহ্মপুত্রের উজানে চীন বাঁধের পরিকল্পনার স্বপ্ন দেখছে। বাঁধ দিলে নদী অভিমানী হয়ে ওঠে, স্বপ্নহারা হয়ে যায়। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর ও সুন্দরবন দিশেহারা হয়ে উঠছে, সময় মতো মৌসুমি বায়ু পাঠাচ্ছে না আটলান্টিক। কুসুমাস্তীর্ণ কথাটি ভবিষ্যতে আর মনে মনেও ভাবতে পারবে না। তাহলে কি ‘ভবিষ্যৎ বদ্ধ অন্ধকার, কাম্য শুধু স্থবির মরণ’? ভবিষ্যত্দ্রষ্টা স্টিফেন হকিংয়ের পৃথিবীতে মানুষের আয়ু আর এক শ বছর মাত্র প্রবলভাবে সত্য হয়ে উঠবে!

১৬ জুলাই ২০১৬। ১ শ্রাবণ। মেঘলা আকাশময় দিবস। আষাঢ় থেকে এই-ই হয়ে চলছে। বৃষ্টি অল্প হচ্ছে। তা আষাঢ়েরও নয়, শ্রাবণেরও না। লায়লা আহমদের বনসাই প্রদর্শনীর অনুষ্ঠানে গেলাম চারুকলা ইনস্টিটিউটে। ওর বাড়ির ছাদে বড় বনসাই বাগান। নাম মায়াবী বনসাই। আমার দেওয়া নাম। দ্বিজেন শর্মা প্রধান অতিথি। ফেরার পথে সিদ্ধেশ্বরীতে যানজট ও বৃষ্টিতে পড়লাম। আষাঢ়-শ্রাবণের বা ভাদুরে বৃষ্টিও নয়। ঢাকার আকাশেই এ বছর বর্ষা লটকে পড়েছে। মেঘের ঘাটতি নেই একটুও, কিন্তু রাজপুত্র বৃষ্টি কোন দেশে রাজকন্যের খোঁজে গেছেন? না, আছে বাংলাদেশে। সারা দেশে বৃষ্টি আছে, বৃষ্টিছাড়া হয়ে আছে শুধু ঢাকা। যেটুকু হচ্ছে তাকে বৃষ্টিহীনই বলা চলে, সৃষ্টিছাড়া বৃষ্টি।

গতকালও সন্ধের প্রাক্কাল থেকে দেখেছি পুব থেকে পশ্চিমে বাদুড় চলেছে খাবারের খোঁজে, যেখানে তাদের খাবার আছে সেখানে। ঠিক সন্ধের প্রাক্কালে যে সময় ওরা রোজ আসত সে সময়।

সাদা বকদের আজ আস্তানায় ফেরার সময়টায় ওদের দেখতে পাইনি। নিশ্চয়ই ওরা কোন ফাঁকে আগেভাগে ফিরে চলে গেছে। ওরা আস্তানায় ফেরার সময় আকাশ পাড়ি দেয় কাক-শালিকদের ওড়ার দুতিন গুণ ওপর দিয়ে। গতকাল দেখেছি, সাতটি ছিল ওরা। আজ দেখতে  পেলাম না। আমার অসাবধানতাই হবেও বা। অথচ শুধু একনজর দেখার জন্যই সারা সন্ধে উত্তরের জানালায় বন্দি হয়ে থাকি আমি। বালিশ মাথায় দিয়ে তৃষ্ণার্ত হয়ে থাকি বৃষ্টির ধুলোর চালচিত্র দেখে দেখে। এ বৃষ্টিও আষাঢ়-শ্রাবণের নয়। ওই সাতটি বকের ফিরে যাওয়া বেশ ধীরস্থির ও সংহত। পুরো মনোযোগ ওরা কেড়ে নেয়। যে সময় উত্তর আকাশ পাড়ি দিয়ে বাদুড়রা খাবারের গন্তব্যে যায়, আজ গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি ও মাতাল হাওয়ায় ওরা বুঝি সময়ের একটু হেরফের করেছে। আমার এই অপেক্ষার কথা ওরা কি জানে? পাখিদেরও তো মন থাকতে পারে, আছে! কিন্তু তাদের মন নিয়ে মানুষ চর্চা করে না, আমিও সে জন্য অবসর করে নিইনি।

সেই জুটি বাঁধা পড়েছে বলে যে চিল দুটির কথা বলেছি, তাদের কেউ কি একা বা যুগলবন্দি হয়ে এসেছিল। দুদিন আগেও ওদের একাকিত্বকে এত আমল দিইনি। মনে করেছিলাম, ওরা আলাদা আলাদা জুটির হয়তো বা। নাকি সেই চিলটিই অনেক ওপর থেকে চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে ধর্মরাজিকের ওপর একেবারে নিম্ন আকাশে চলে এসেছে—কাকদের ওড়াউড়ির সীমানায়! এ রকম নিচে চলে আসত, ধর্মরাজিকের পুকুরে যখন মাছ শিকার করতে আসত। হায়, ও একা, জোট বেঁধেছে বলে যাকে শনাক্ত করেছিলাম, সে-ই আজ নিঃসঙ্গ অথবা সবই আমার অনুমান। হ্যাঁ, তুইও একা। আমিও একাকী উত্তরের জানালা থেকে পর্যবেক্ষণ করছি—প্রতিটি বিকেল-সন্ধে এই আমার রাজকীয় অবসর। ওই সাতটি বকের পশ্চিম থেকে পুবে ফেরার মাহেন্দ্রক্ষণটি জেনেশুনে উপভোগ করতে পারলাম না, তা কি হওয়া উচিত! ওরা আজকের বাদল হাওয়ার আগাম অনুমান করে আগেভাগে আস্তানায় ফিরে গেছে! ওদের নাড়িনক্ষত্র তো আমি আর এত রপ্ত করতে পারিনি, পক্ষীবিদও নই যে সমাধান বলে দেব। এত খুঁটিনাটি ও রহস্য তো আমি জানি না—প্রতিদিনের দেখা ও বইপত্র পড়েই আমার বিদ্যা। আসলে ওরা আমার প্রতিদিন দেখার আনন্দসঙ্গী।

দুটি ঝুঁটি শালিক এসেছিল প্রথম বিকেলে নারিকেলের ফুল থেকে পোকা ধরে খেতে। ও সময় কালো কাঠঠোকরা নারিকেলগাছের ডালের গোড়া থেকে পোকা খেয়ে ক্যাঁ ক্যাঁ ডাক পেড়ে চলে গেছে পুব দিকে কোন চুলোয়।

বৃষ্টিতে গাছের ডালে বসে বসে প্রকাশ্য স্নান, শরীর ও পাখার অন্দরমহল পরিচর্যাও দেখার বিষয়। ওরা বৃষ্টিতে উড়ে উড়েও ভিজবে, আবার বসে পাখার গোড়া     মেজে-ঘষে নেবে। রোদ থাকলে বা সময় পেলে পাখা মেলে শুকিয়ে নেবে। বৃষ্টিও এই এলো তো এই গেল। কে তাদের মানা করবে, কে দিব্যি দিয়েছে! হেমন্তে বাংলাদেশ শিশু একাডেমির বিশাল দৈত্য শিরীষগাছে বাগানের দেখভাল করতে গিয়ে ওদের বাসা বাঁধা ও ছানা পরিচর্যার জমা রাখা স্মৃতি ভাঁজছি। ওরা সোনালি ডানার শঙ্খচিল নয়, ভুবন চিল। চিলরাও শকুনের মতো উঁচু গাছে ছোট মরা ডাল ও কাঠিকুঠি দিয়ে বাসা বাঁধে। ঝড়ে উড়ে    না-যাওয়ার জন্য বাসাটি ভারী রাখতে মাটির ঢেলা জমা করে রাখে চিল। শিশু একাডেমির ফুলের বাগান থেকে চিলদের এই স্বভাব দেখেছি।

১৭ জুলাই ২০১৬। সন্ধে ৬.৪৩টা। বনসাই প্রসঙ্গ এলেই জাপানে প্রথমবার যাওয়া টোকিওর ওফুকাই মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাঁকালো প্রদর্শনীর স্মৃতিরা ঝিকিমিকি দিয়ে ওঠে। বনসাই বিষয়ে তখন কিছুটি জানি না, পুস্তকবিদ্যাও নেই। যা দেখি সবই নতুন। সবাই জাপানি ঐতিহ্যবাহী কিমানো পরিহিতা যুবতী। বিশাল বটবৃক্ষকে বিন্দুবৎ দেখা, থালায় সিন্ধু বটগাছকে বিন্দু পরিমাণে দেখা। পরে ঢাকায় জাপান দূতাবাসে দেখি জাপানি বনসাইবিদের টব পরিচর্যা। সেই স্মৃতি নিয়ে লায়লা আহমদের প্রদর্শনীতে অতিথি হিসেবে গিয়ে দেখা। অসচরাচর ঝিরিঝিরি শ্রাবণের বৃষ্টিতে ফিরে এলাম।

সারা দিনের অপেক্ষা নিয়ে থাকি দিন শেষের অভ্র সময়ের জন্য উত্তরের জানালায়। অলসের অতুল বৈভবে। ঝিরিঝিরি মৃদু মাঝারি বৃষ্টি। আষাঢ়ের এই প্রথম। দুই ভুবন চিলকে দেখি আবার ওরা একা। একঝলক দেখা দিয়ে বিশাল চক্র পূরণ করতে চলে গেল ওরা। আর ফিরে এলো না। বাদুড়রা উড়ে গেল পশ্চিমের কোন্ চুলোয়। দমকা হাওয়াসহ ছুটে চলে গেল বৃষ্টিসুন্দর। বিমানবন্দর থেকে উঠে একটি বিমান উড়ে গেল গর্জন প্রসব করে। দিনের শেষ ডাকাডাকি, ওড়াউড়ি গুটিয়ে নিল পাতিকাক। রোজকার দৃশ্যাবলি ছাড়া কিছুই ঘটল না।

সোমবার, ১৮ জুলাই ২০১৬। মেঘলা আকাশ     বাড়বাড়ন্ত। শালিক-চড়ুইদের ফেরার সময়। খাগড়াছড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ইনস্টিটিউট থেকে পরিচালক সুসময় চাকমা ফোনে জানালেন, তিনি আমার ছয়টি উপন্যাস নিয়ে প্রকাশিতব্য ‘পাহাড়ের কথা’ গ্রন্থের প্রুফ দেখছেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও বঙ্গোপসাগর কেন অবহেলিত বাংলা সাহিত্যে!

আমি উত্তরের ভালোবাসায় হিমগ্ন। উত্তরে আছেন মহামহিম হিমালয় পর্বতমালা। বাংলাদেশের প্রথম নারী পর্বতারোহীর পর আরো তিন নারীর বলদর্পী ঘোষণা—তাঁরা এভারেস্ট চূড়ায় লাল-সবুজ পতাকা ওড়াবেন। নিশাত মজুমদার প্রথম। পরপরই ওয়াসফিয়া নাজরীন বিজয়ী। উত্তর দিকে শেষবার দেখা দিয়ে চলে গেল একা ভুবন চিল। সে কি নারী? ওর উত্তর-দক্ষিণ মাত্রাজ্ঞান আছে। নয়তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈশ ক্লাসে যোগ দেয় কী করে।

উত্তরের মেঘলা আকাশে আজ মেঘ উড়ে যাচ্ছে পশ্চিম থেকে পুবে। গতকালও ছিল দক্ষিণ থেকে উত্তরে ভ্রমণকাতর। ওদের এমন কী ভালোবাসা উৎপন্ন হলো যে এমন আচরণ? আমাকে কাঁচকলা দেখিয়ে ভুবন চিল একা চলে গেল। আমি জানি না, ওর প্রেমিক বা প্রেমিকা আগে থেকে ওখানে অপেক্ষা করছে কি না। এও জানি না, আসলে ওরা নিঃসঙ্গ কি না, এও জানি না, কয় সন্তানের জনক বা জননী হয়েছে, আরো জানি না, তাদের কুমারীত্ব বা কৌমার্য হরণ হয়েছে কি না। ঢাকার আকাশের আষাঢ়-শ্রাবণের বৃষ্টির হাহাকারের পাত্তা দিচ্ছে কি না। তবু তো আজ দ্বিতীয় দিনের মতো একটানা বৃষ্টি নেমেছিল, যদিও মুষল ধারায় নয়। এতেই আমার পুবের জানালার ভেতরের গোবরাটে টপটপ বৃষ্টি ঝরে পড়ছে, কপাট বেয়েও। আর যেখানে ঘরের মধ্যে ছাদ চুয়ে বৃষ্টি পড়ে, সেখানে শুরু হয়েছে। এর চেয়ে বৈশাখ-জষ্টিতে বরং বেশি ঝরেছিল। আমার কক্ষের ছাদ প্রায় শতছিন্ন, যেকোনো বিপন্নতা নেমে আসতে পারে কি! ভূমিকম্প হলে! আমাকে হত্যা করতে আসায় চিন্তাভাবনা নেই তো!

উড়ে ঝিরিঝিরি বৃষ্টির উন্মাদনা, দেমাগ। অথবা ধুলোঝড়ের মতো উড়ে যাওয়া বৃষ্টিসুন্দর! আহা! আমার উত্তরের সোমত্ত জানালা ভাঙা ছিটকিনি। এমন বৃষ্টিতেও কাকরা বৃষ্টি স্নান করে দিনদুপুরে। বিলাসী ও শৌখিন তরুণীরা ছাদে উঠে বৃষ্টিস্নাত হয়। দেখি আমি। কালিদাস তাদের ভেবে লিখে গেছেন ‘মেঘদূত’ কাব্যে,

‘তোমার দিকে তারা হানবে চাহনীর দীর্ঘ মধুকর-পংক্তি

কেননা নখক্ষতে পরশে আনে সুখ প্রথম বৃষ্টির বিন্দু। ’

বর্ষার আমেজ প্রায় ফিরে এলো। সূর্য ডোবার আগে থেকেই ঢাকা নগরী মেঘের চাদরে আবৃত। বৃষ্টি নামল শ্রাবণের ধারাপাতের ঐশ্বর্য নিয়ে। আমার আবাস দুলে উঠছে। তবু আমি ভীরু বর্ষা ও বর্ষণ চাই না। নিঃসঙ্গ চিলকে প্রতিদিন চাই না। বৃষ্টিহীন আষাঢ়-শ্রাবণের একই আকাশে স্বপ্ন দেখা কি সম্ভব! উড়ে এসো শ্রাবণঘন গহন দিনরাত্রি।


নিজ কক্ষে লেখকের ধূম্রসেবন


শ্রাবণের চতুর্থ দিন আজ, আষাঢ়ী পূর্ণিমা। পূর্ণ চাঁদ মেঘে মেঘে বিভোর বিভোল। আকাশে তারা নেই। শ্রাবণের প্রধান তারা শ্রবণা, ঈগল মণ্ডলের প্রধান তারা। উত্তর-পুব আকাশের অভিজিৎ, বুটিক্স শিকারী মণ্ডলের বিখ্যাত স্বাতী আর উত্তরের জানালা দিয়ে সপ্তর্ষিমণ্ডল ধ্রুবতারা। দক্ষিণ আকাশে বৃশ্চিক মণ্ডলের জ্যেষ্ঠা, সূর্যপথে কন্যা রাশির চিত্রা। মেঘহীন ভাদ্র-আশ্বিন মাসে চলে যেতাম ছাদে। এখন উত্তরের জানালাবন্দি। আকাশে এখন আছে শ্রবণা বা আলতায়ের। অর্থ পাখি। আকাশ নিয়ে বিজ্ঞানীরা কত কল্পনাপ্রবণ—পৃথিবীর সেরা আচ্ছাদন নক্ষত্রখচিত আকাশমণ্ডল—যার কূলকিনারা করার আগেই বুঝি এই প্রিয় ধরিত্রী মানুষের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে যাবে।

বৃষ্টি-বৃষ্টি-বৃষ্টি নেই। আজও। বন্ধ্যা শ্রাবণ। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ বৃষ্টি কাড়াকাড়ি করে নিয়ে নিচ্ছে। প্রদোষ ঘনিয়ে এলো, শ্রাবণ আসে না মাতাল করা বৃষ্টি নিয়ে।

২৪  এপ্রিল ২০১৭। ১১ বৈশাখ ১৪২৪, সোমবার। রাত পোহাল বজ্রগর্ভ মেঘের গর্জনে, সঙ্গী আষাঢ়ের মতো বৃষ্টির সন্ত্রাস নিয়ে। গত বছরও এ সময় বৃষ্টির এমন অনাচার ছিল, তার আগের বছরও। সকাল ৭.৪৯টায় ঘুম ভাঙল প্রতিদিনের মতো। হকার সাজু জানালার ভাঙা কাচের ফোকর দিয়ে কালের কণ্ঠ ও বণিক বার্তা দৈনিক দুটি দিয়ে গেল। কালের কণ্ঠ’র প্রধান খবর ‘হাওর ডুবে একাকার’। টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর ও জামালগঞ্জ উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত হাওরের বাঁধগুলো ভেঙে গভীর রাতে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। গত মার্চের শেষ দিকে টানা বর্ষণ ও উজান থেকে আসা ঢলে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের হাওর প্লাবিত হয়েছিল। এই বোশেখে হাওরের ধান কাটার সুসময়। হাওরের বাঁধের সুরক্ষা ছিল না। পত্রিকার খবর অনুযায়ী ১৩ হাজার ৩০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এ নিয়ে পর পর তিন বছর বৃষ্টি ও আবহাওয়ার পরিবর্তন চোখ ঢেকে দিল। ফসলসহ মাছ ধ্বংস হওয়ায়, পানিতে অক্সিজেন কমে যাওয়ায় দূষিত হয়ে যাবে জলাবদ্ধ হাওর।

বৈশাখ হচ্ছে হাওরের ধান তোলার উৎসবের দিন। ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত আমার ছোটগল্প ‘হাওরের যুবরাজ’ গল্পে ধান কাটার উৎসব ও তুকতাকের বৈদ্য হিলারীর বৃষ্টি বন্ধের সঙ্গে এক যুবক ও মোড়লের কাহিনি। বঙ্গবন্ধু হত্যার পটভূমিতে রচিত। তখন হাওরের ফসলের শত্রু ছিল বজ্রমেঘ বৃষ্টি। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ১৯৭৫ সালের বিপর্যস্ত বাংলাদেশ। এখন বৈশাখ থেকে বর্ষা শুরুর সূচনা দেখা দিয়েছে। ঢাকা শহরে প্রতি সকাল-সন্ধেয় বজ্রসহ বৃষ্টি, প্রায় সারা দিনমান মেঘ-রোদ ও হাওয়ার খেলা। বোশেখের কড়া রোদ্দুর ও তপ্ত হাওয়া উধাও। আম পাকার ও দাঁড়কাকের মন্দ্র-গম্ভীর সংগীত-দুপুর পথহারা। রমনা বটমূলে এই বৈশাখকে তো আবাহন করিনি।

কয়েক দিন আগে তুমুল বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম শহর বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। গত বছর থেকে বজ্রপাতের ভয়ে ছাদে উঠে প্রথম বৃষ্টির বিন্দু অনুভব করা হয়নি এই শরীর নিয়ে। অনেক দিন ধরে সন্ধের প্রাক্কালে উত্তরের জানালা দিয়ে আকাশ-সঙ্গম হয় না। এখন ধর্মরাজিকের মহুয়ার ভরা যৌবন। ফুলের সঙ্গে লালচে কচি পল্লবের মহান উৎসব চলছে। পশ্চিমের বারান্দা থেকে হাত বাড়িয়ে মহুয়া তুলে স্বাদ ভক্ষণ করেছি। এ বছর মৌমাছির চাক হয়নি। নেতা বড় কুকুরটি মরে গেছে। ওকে যখন প্রথম আনা হয় তখন সে ছিল ভীতুর ডিম। আশপাশে শালিকের বাসা নেই। দোয়েলের বাচ্চা তোলার বাসা একটিও দেখিনি। শুধু মাছরাঙার বিষণ্ন কি-লি-লি-লি সংগীত শুনি প্রায় সারা দিন। বৃষ্টি এখন বেদনা আমার। উত্তর দিকে আহমদবাগের অদূরে একটি কোকিল ডাকছে।


মন্তব্য