kalerkantho


ভ্র ম ণ

রঙ্গিলা রেঙ্গুনে

ফারুক মঈনউদ্দীন

২৫ জুন, ২০১৭ ০০:০০



রঙ্গিলা রেঙ্গুনে

শোয়েডাগনের একাংশ

প্রথম দিন ইয়াঙ্গুন এয়ারপোর্টে আমাদের রিসিভ করেছিল সাই পিয়ে নামের যে যুবক, বাগান থেকে ফিরে আসার পর সে-ই আমাদের দ্বিতীয়বারের মতো রিসিভ করে। এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলের প্রায় ১৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে গিয়ে ওর সঙ্গে নানা আলাপচারিতায় বরাবরের মতো দেশটির অর্থনীতি, রাজনীতি, সামরিক শাসকদের সাঙ্গাত ক্রোনিদের (শাসকদলের মদদপুষ্ট ধনকুবেরদের—এই গোষ্ঠীটাকে এখানে সবাই ‘ক্রোনি’ বলে ডাকে।

ইংরেজি এই শব্দটির বাংলা হতে পারে ‘সাঙ্গাত। যেমন—ক্রোনি ক্যাপিটালিজম বলতে বোঝায়, সরকারের সঙ্গে কোনো শিল্পগোষ্ঠীর অশুভ আঁতাতের পুঁজিবাদ) কথা উঠে আসে। সে কারণে একটি নগরীর প্রথম দর্শনে মনঃসংযোগ করা হয় না। সাই জানায় ব্যাংক, বিমান পরিবহন, রিয়াল এস্টেট, নির্মাণ—সবই ক্রোনিদের কবজায়, অথচ সাধারণ মানুষের অবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। দেশটির দীর্ঘদিনের সেনাশাসন এখন গণতন্ত্রের লেবাস ধারণ করেছে বলেই হয়তো সাই কিংবা জিনের মতো ট্যুর গাইডরা অবলীলায় বিদেশিদের সঙ্গে এমন খোলামেলা আলোচনায় ভীত নয়। তাই প্রথম দিন জিন যা বলছিল, সাই প্রায় সেসব কথারই পুনরুক্তি করে। এসব কারণেই বোধ করি প্রথম দিন ছেলেটিকে যতটা অপদার্থ মনে হয়েছিল, এবারের দেখায় এবং আলাপে সেই ধারণা দূর হয়।

আমরা মূল শহরে ঢুকে পড়ার পর বুঝতে পারি শহরটির ট্রাফিক ব্যবস্থা অন্যান্য উন্নত শহরের মতো যথেষ্ট সুশৃঙ্খল ও পরিচ্ছন্ন। যে দেশের নৈরাজ্যকর অবস্থা বোঝানোর জন্য মগের মুল্লুক বলে একটি নতুন বাগ্ধারা আমাদের অভিধানে যুক্ত হয়েছে, সেই দেশের রাজধানী দেখে উল্টো আমাদের দেশের জন্য অভিধাটি বেশি প্রযোজ্য বলে মনে হয়।

অপ্রাসঙ্গিক হলেও সাই নানা আলাপচারিতায় আমাদের জেনারেল নে উইনের কথা বলে। জ্যোতিষশাস্ত্রে অন্ধবিশ্বাসী নে উইনকে এক সংখ্যাশাস্ত্রবিদ নাকি বলেছিল যে ৯ হচ্ছে জেনারেল সাহেবের শুভ সংখ্যা। সে কারণে এক ফরমানবলে স্বৈরশাসক নে উইন ১০০ কিয়াতের নোট বাতিল করে তার জায়গায় ৯০ কিয়াতের নোট চালুর হুকুম দেন। একইভাবে ১০ কিয়াতের জায়গায় ৯ কিয়াত, ৫০ কিয়াতের জায়গায় ৪৫ কিয়াতের নোটও চালু করা হয়। ১০০ কিয়াতের নোট যারা সময়মতো বদলে নিতে পারেনি, তাদের অনেকেই সমূহ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল। বার্মার অর্থনীতির ওপর এটা ছিল চরম আঘাত। এটা ১৯৮৭ সালের ঘটনা, তবে দেশটি লৌহ যবনিকার আড়ালে ছিল বলে বিষয়টা খুব প্রচার পায়নি।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনমুক্ত হওয়ার পর বার্মার প্রথম প্রধানমন্ত্রী উ নু মোট তিনবার (১৮৪৮—১৯৫৬, ১৯৫৭—১৯৫৮ এবং ১৯৬০—১৯৬২) সরকারপ্রধান নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁর সর্বশেষ মেয়াদ শুরু হওয়ার পর ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেছিলেন। এখানে উল্লেখ করা দরকার, ১৯৫৮ সালে দেশব্যাপী জাতিগত দাঙ্গায় সরকারের অবস্থান নড়বড়ে হয়ে পড়লে উ নু তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করে নে উইনকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন। সে সময় নে উইন দেশে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন এবং নির্বাচনের আয়োজন করে দেন। সেই নির্বাচনে উ নু তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু স্বল্প সময়ের জন্য ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া নে উইনের মধ্যে হয়তো অতৃপ্তি রয়ে গিয়েছিল। বার্মার জন্য সংসদীয় গণতন্ত্র উপযুক্ত নয়—এই অজুহাতে ১৯৬২ সালে তাঁর ক্ষমতা দখল। ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে তিনি সেনা কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠন করেন রেভল্যুশনারি কাউন্সিল অব দ্য ইউনিয়ন অব বার্মা। এই কাউন্সিলের লক্ষ্য ছিল বার্মাকে একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করা, এই উদ্দেশ্যে তাঁরা ‘সমাজতন্ত্রে বার্মা পন্থা’ (বার্মিজ ওয়ে টু সোশ্যালিজম) নীতি ঘোষণা করেন। ক্ষমতা দখল করার মাত্র চার মাসের মাথায় নে উইন গঠন করেন বার্মিজ সোশ্যালিস্ট প্রগ্রাম পার্টি (বিএসএসপি)। একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে তিনি বার্মাকে বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত করেন সব শিল্প ও বাণিজ্য, বহিষ্কার করেন বিদেশি উদ্যোক্তাদের। বিএসএসপির অধীনে চালু করেন একদলীয় শাসন, পার্লামেন্টের বিকল্প হিসেবে খাড়া করেন সেনা স্বৈরতন্ত্র, কারাবন্দি করেন বিরুদ্ধবাদীদের। ১৯৭৪ সালে তিনি স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিজের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য বিপ্লবী কাউন্সিল বিলুপ্ত করে বার্মাকে সরকারিভাবে সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ঘোষণা করেন। নে উইনের বিভিন্ন স্বৈরাচারী আচরণ, দুর্নীতি, নারী কেলেঙ্কারি—এসব নানা কাণ্ডকারখানার কারণে একসময়ের সমৃদ্ধ এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশটি বিশ্ববিচ্ছিন্ন হয়ে পরিণত হয় দরিদ্রতম দেশগুলোর একটিতে। স্কুল-কলেজ থেকে ইংরেজি শিক্ষাকে নির্বাসিত করে বর্মি জনগণকে অনেকখানি পিছিয়ে দিয়েছিল নে উইনের খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত। একদা দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার অন্যতম সমৃদ্ধ একটি দেশ ক্রমে পরিণত হয় মাদক বাণিজ্যের স্বর্গরাজ্যে। এটি আমরা এখনো হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশ অভিমুখী ইয়াবার অপ্রতিরোধ্য স্রোত থেকে।

সব দেশে সব সময়ের মতোই দাবি আদায়ের আন্দোলনে বার্মার ছাত্ররা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে, ঠিক যেমনটি ঘটেছিল বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতাসংগ্রাম পর্যন্ত। ১৯৬২ সালে রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে দাঙ্গা পরিস্থিতি শুরু হলে সেনা মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। প্রতিবাদকারী ছাত্র-জনতার ওপর চালানো হয় নির্বিচার সেনা হামলা, গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় ছাত্র সংসদ ভবন। এক সংক্ষিপ্ত বেতার ভাষণে নে উইন বলেন যে যদি প্রতিবাদকারীরা তাঁদের মুখোমুখি হতে বলে, তাহলে তারা তলোয়ারের বদলে তলোয়ার দিয়ে মোকাবেলা করতে প্রস্তুত। সে সময় দীর্ঘ দুই বছরের জন্য বার্মার সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এখানে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন পরিস্থিতির সঙ্গে বার্মার সামরিক জান্তার কৌশলের একটা তুলনা মনে পড়ে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সামরিক চক্র প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে আক্রমণ চালিয়ে হত্যা করে নিরীহ ছাত্রদের। তারপর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সব বিশ্ববিদ্যালয় খোলা রেখে বিশ্বকে দেখাতে চেষ্টা করে যে পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। আরো সাদৃশ্য রয়েছে, বাংলাদেশের সামরিক শাসকরা অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখল করার পর সেটাকে পাকাপোক্ত করে তাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য রাজনৈতিক দল গঠন করেন, নে উইনও ঠিক সেটাই করেছিলেন, তবে তাঁর পদক্ষেপটা ছিল র‌্যাডিক্যাল। বাংলাদেশের অভ্যুত্থানকারী শাসকরা যেখানে যুক্তরাষ্ট্র বা ভারতের মতো প্রভাবশালী দেশের সমর্থন পাওয়ার জন্য বিভিন্ন উপায়ে ঝোলাঝুলি করেছে, নে উইন সেখানে কোনো রাখঢাক ছাড়াই বিশ্ব সমর্থনের তোয়াক্কা না করে দেশকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার দুঃসাহস দেখিয়েছেন। ১৯৭৯ সালে হাভানায় জোট নিরপেক্ষ দেশের সম্মেলনে বার্মা ৮৮ জাতির এই জোট থেকে বের হয়ে আসে। বার্মার অজুহাত ছিল যে এই জোট বড় বেশি রুশঘেঁষা। নে উইনের কাছে জার্মানি, জাপান কিংবা কোরিয়া যতখানি গ্রহণযোগ্য ছিল, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা সোভিয়েত ইউনিয়ন ততখানি নয়।

নে উইন সম্পর্কে বেশ কিছু মজার তথ্য পাওয়া যায় ব্রিটিশ লেখক ও সাংবাদিক জাস্টিন উইনটলের ‘পারফেক্ট হোস্টেজ : আ লাইফ অব অং সান সু চি, বার্মা’স প্রিজনার অব কনশেন্স’ গ্রন্থে। তাঁর মতে, নে উইন রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন মূলত সংখ্যাশাস্ত্রবিদ ও জ্যোতিষীদের কথায়। তিনি তাঁর বইতে বলেছেন, এক ভবিষ্যৎ উদ্যোক্তা জ্যোতিষী একবার বলেছিলেন যে নে উইন গুপ্ত ঘাতকের হাতে মারা যেতে পারেন, তার নিদান হিসেবে তিনি যাতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজ প্রতিবিম্বকে গুলি করেন। নে উইন ঠিক সেটাই করেছিলেন। আরেকবার জ্যোতিষী তাঁকে দেশময় রক্তগঙ্গা বয়ে যাওয়ার প্রতিষেধক হিসেবে বলেছিলেন, যাতে তিনি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কুকুরের নাড়িভুঁড়ি কিংবা শূকরের রক্তভর্তি গামলার মধ্যে পা ডুবিয়ে রাখেন। তিনি সে কথাও মান্য করেছিলেন।

বাঁকানো লেজের কুকুরদের কাছ থেকে দূরে থাকার পরামর্শের কারণে নে উইন যখনই দেশের কোথাও যেতেন, হেলিকপ্টারে বা গাড়িতে, তাঁর গন্তব্য এবং যাত্রাপথের সব বেওয়ারিশ কুকুর মেরে ফেলতে হতো, যাতে কোনো কুকুর তাঁর সামনে না পড়ে। তাঁর সম্পর্কে সবচেয়ে পৈশাচিক যে গল্পটা শোনা যায় যে তিনি নিজের যৌবন ধরে রাখার জন্য ডলফিনের রক্তে গোসল করতেন। এখানেও বাংলাদেশের একজন স্বৈরশাসকের যৌবনরক্ষার প্রয়াসের সঙ্গে নে উইনের কাণ্ডকারখানা মিলে যায়। একজনের ছিল জিন সেং, আরেকজনের ডলফিনের রক্তে গোসল।

মার্কিন সাংবাদিক রেনা পেডারসনের ‘দ্য বার্মা স্প্রিং : অং সান সু চি অ্যান্ড দ্য নিউ স্ট্রাগল ফর দ্য সৌল অব আ নেশন’ বইতে নে উইনের কাণ্ডকারখানার আরো কিছু বিবরণ পাওয়া যায়। যেমন—এক জ্যোতিষী যখন ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে তাঁর আমলে দেশটি অতি বামে চলে যাবে, নে উইন তাত্ক্ষণিক হুকুম জারি করেন যে বার্মার সব গাড়ি চলবে ডান পাশ দিয়ে, অথচ ব্রিটিশ উপনিবেশ হিসেবে দেশটির গাড়ি চলার কথা বাঁ পাশ দিয়ে। অন্য ভাষ্য মতে তাঁকে বলা হয়েছিল তাঁর বিপদ আসবে ডান পাশ থেকে, সে কারণেই এ নির্দেশ। তবে দ্রুততম সময়ে এই বাম থেকে ডানে যাওয়ার চেষ্টায় সড়কে কী পরিমাণ দুর্ঘটনা ঘটেছিল, তার কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি।

অবশেষে দীর্ঘ ২৬ বছরের একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটে ১৯৮৮ সালে। স্মর্তব্য, ঠিক তার দুই বছর পর বাংলাদেশেও দশ বছরের স্বৈরশাসনের পতন ঘটেছিল। ১৯৮৭ সাল থেকে গণতন্ত্রকামী ছাত্র-জনতার মধ্যে নে উইনবিরোধী আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে। তাদের সঙ্গে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা যোগ দিলে আন্দোলন নতুন মাত্রা লাভ করে। এর মধ্যে রেঙ্গুন ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি ক্যাম্পাসের এক চায়ের দোকানে ছাত্র ও এক খদ্দেরের মধ্যে বচসার মতো সামান্য একটা ঘটনা ঘটে ১৯৮৮ সালের মার্চ মাসে। এই ঘটনায় পুলিশ যেভাবে ছাত্রদের ওপর চড়াও হয় তা ছিল রীতিমতো ভয়াবহ। পুলিশের অতিরিক্ত অপ্রয়োজনীয় বল প্রয়োগের প্রতিবাদে ক্যাম্পাসের মধ্যে আন্দোলন শুরু করে ছাত্ররা। এই প্রতিবাদ থামাতে গিয়ে দাঙ্গা পুলিশের গুলিতে তিনজন ছাত্র মারা গেলে ছাত্র বিক্ষোভ চরমে ওঠে। পরদিন দশ হাজার ছাত্র-ছাত্রীর ঐক্যবদ্ধ বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ অবর্ণনীয় সহিংসতার পরিচয় দিয়েছিল। গুলি চালানোর পর পলায়নরত ছাত্রদের ধরে এনে পাশের ইনিয়া লেকে ডুবিয়ে হত্যা করা হয়, ধর্ষণ করা হয় ছাত্রীদের। প্রিজন ভ্যানে ঠাসাঠাসি করে চালান দেওয়ার সময় ৪১ জন ছাত্র শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যায়।

এ রকম পরিস্থিতিতে বিপদ আঁচ করতে পেরে জুলাই মাসের ২৩ তারিখে বশংবদ জেনারেল সেইন লুইনের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে নে উইন পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ১৯৬২ সালে রেঙ্গুন ইউনিভার্সিটির ১৩০ জন আন্দোলনকারী ছাত্রকে হত্যা করার কারণে এই সেইন লুইনকে ‘রেঙ্গুনের কসাই’ বলে ডাকা হতো, ঠিক যেমনিভাবে জেনারেল টিক্কা খানের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘বাংলার কসাই’।


প্যাগোডা প্রদক্ষিণরত পূজারিনীরা


নে উইন সরে দাঁড়ালেও পর্দার আড়াল থেকে তিনিই সেইন লুইনকে পরিচালনা করছিলেন। তাই নে উইনের পদত্যাগে জনতার আন্দোলনে ভাটা পড়েনি। একের পর এক ধর্মঘটে সারা দেশ জেগে ওঠে, যা পূর্ণতা পায় সে বছরের আগস্টের ৮ তারিখের দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘটের মাধ্যমে, বার্মার ইতিহাসে দিনটি ৮৮৮৮ নামে পরিচিত। এই ধর্মঘটের আগের সপ্তাহ ছিল অগ্নিগর্ভ, জনতা তাদের নেতাদের মানববন্ধন করে ঘিরে রাখছিল সেনা পুলিশের আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য, খোলামেলাভাবে সরকারের বিরুদ্ধে লিখে যাচ্ছিল পত্রিকাগুলো। সেনা টহল ঠেকানোর জন্য জনগণ পাড়ায় পাড়ায়, মূল সড়কে স্থাপন করছিল ব্যারিকেড। এ যেন অবিকল বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আগের দিনগুলোতে বঙ্গবন্ধুর ডাকা অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের মতো। কিন্তু নে উইনের পরামর্শে চালিত সেইন লুইন আর ধৈর্য রাখতে পারেন না, তিনি সেনাবাহিনীকে শহরের ভেতরের আন্দোলনরত জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য ফাঁকা গুলির পরিবর্তে সরাসরি গুলি চালাতে নির্দেশ দেন। ৮৮৮৮-এর দুই দিন পর সেনাবাহিনী গুলি চালাতে চালাতে এমনকি হাসপাতালের ভেতর ঢুকে পড়ে আহতদের চিকৎসারত ডাক্তার ও নার্সদের গুলি করে হত্যা করে। ফলে আন্দোলন আর অহিংস থাকে না, পাথর, মলোটভ ককটেল ইত্যাদি নিয়ে জনতাও সুযোগমতো আক্রমণ করে পুলিশ ও সেনা সদস্যদের।

পরিস্থিতির গুরুত্ব ও ভয়াবহতা বুঝতে পেরে ক্ষমতায় বসার মাত্র ১৭ দিনের মাথায় সেইন লুইন রাষ্ট্রপতির পদ থেকে ইস্তফা দেন। জনতার দাবির মুখে নে উইনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কার প্রধান বিচারপতি এবং লেখক ড. মং মং রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার এই পরিবর্তনেও বার্মায় শান্তি স্থাপিত হয় না। মান্দালয়ে এক লাখ মানুষের সমাবেশ সংঘটিত হয়। এর পরপরই রেঙ্গুনের বৃহত্তম উপাসনালয় শোয়েডাগন প্যাগোডায় দশ লাখ মানুষের সমাবেশ ঘটে। এখানে বক্তাদের মধ্যে ছিলেন অং সান সু চি।

ড. মং মংয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করার ঠিক এক মাস পর জেনারেল সও মং অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে দেশময় সামরিক শাসন জারি করেন। ফলে সেনাবাহিনী চরম সহিংসতার মাধ্যমে আন্দোলন দমন করার প্রক্রিয়া শুরু করে। সামরিক শাসনের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই ভিক্ষু, শিশুসহ দেড় হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। ৮৮৮৮ আন্দোলনকে পিষে ফেলতে সামরিক সরকারকে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি। ধারণা করা হয়, এই আন্দোলনের ফলে ১৯৮৮ সালের শেষ ছয় মাসে প্রায় দশ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। দীর্ঘ দুই বছর বন্ধ রাখা হয় সব বিশ্ববিদ্যালয়। দেশটি পতিত হয় গভীর সংকটে। অনেকেরই স্মরণে থাকার কথা, বার্মার এই আন্দোলনের এক বছরের মধ্যে পেইচিংয়ের তিয়েনআনমেন স্কয়ারে প্রতিবাদকারী ছাত্রদের ওপর সরকারি সশস্ত্র বাহিনীর হামলার আগে ও পরে প্রায় সাত হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল।

এয়ারপোর্ট থেকে আসার পথে সাইয়ের নে উইন সম্পর্কিত তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা দূর অতীতে ফিরে গিয়েছিলাম। ও আমাদের নিয়ে যখন রেঙ্গুনের ছেত্রিয়াম হোটেলে পৌঁছে, তখন ভরদুপুর। আমাদের ওখানে হাওলা করে দিয়ে সেদিনের মতো বিদায় নেয় ও। বিকেলে আমাদের নির্দিষ্ট কোনো কর্মসূচি নেই, তবু দুপুরের খাওয়ার পর আমরা কয়েকজন রেঙ্গুন শহর দেখার জন্য বেরিয়ে পড়ি। সঙ্গে তিন মহিলা থাকায় প্রথম গন্তব্য ছিল নিশ্চিতভাবে রেঙ্গুনের জেম মার্কেট। হীরা, চুনি, পান্নার বিখ্যাত এই বাজারের হদিস তাঁরা আসার আগেই নিয়ে এসেছিলেন। আমাদের রেঙ্গুন ভ্রমণের ৯০ বছর আগে (১৯২৬) সালে স্থাপিত এই বাজারে পেইন্টিং, হস্তশিল্প সামগ্রী, স্যুভেনিরসহ অনেক কিছু পাওয়া গেলেও তাঁদের গন্তব্য ছিল শুধু জহরত বাজারটি। সেই ঝটিকা সফর ছিল পরদিন সময় হাতে করে এসে প্রায় এক বেলা কেনাকাটা করার মহড়া মাত্র। সৌভাগ্যক্রমে সেই বিকেলে তাঁরা খুব বেশি সময় ব্যয় করেননি এখানে।

তবে দ্বিতীয় দিনের আধাবেলা কেনাকাটায় আমাদের ক্রেডিট কার্ডের সমুদয় ব্যালান্স প্রায় নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। সেখানে পরিচয় ঘটে আকিয়াবের মুসলমান ব্যবসায়ী আবদুল আজিজের সঙ্গে। জেম মার্কেটের এক মাথার জুয়েলারি শপে তাঁদের রমরমা চালু দোকান। আজিজের বাবা আবদুল মাহমুদ ৫০ বছর ধরে জুয়েলারি ব্যবসা চালিয়ে মারা যাওয়ার পর ছেলেরা ব্যবসার হাল ধরেছেন। ওঁরা তিন ভাই, দশ বোন। আবদুল আজিজ ও আবদুল বাসিত তাঁদের স্ত্রীদের নিয়ে বাবার ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। ওদের দুই ভাইয়ের দুই স্ত্রী দোকান সামলাচ্ছেন, তাঁদের মাথায় খুব সহি কায়দায় হিজাব বাঁধা। আবদুল আজিজকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করি, বার্মায় মুসলমানদের কী অবস্থা? তিনি বলেন, ‘আমাদের রেঙ্গুনে কোনোই সমস্যা নেই। ’ আমি বলি, আরে রোহিঙ্গাদের ওপর নাকি খুব অত্যাচার চলছে? আজিজ কোনোভাবেই ধরা দেন না; বলেন, ‘আরাকানে মুসলিমপ্রধান অঞ্চলে সমস্যা যে নেই তা নয়, কিন্তু দোষ উভয় পক্ষের। কিন্তু রেঙ্গুনে আমরা খুব নিরাপদ আছি। ’ এরপর আর কী কথা চলে?

আমি যখন আজিজের সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলাম, তখন আমাদের সঙ্গের তিন মহিলা এটা চেয়ে, ওটা দেখে দুই জাকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখে। ওদের বাড়তি সুবিধা ছিল, ওদের সঙ্গে চট্টগ্রামের ভাষায় কথা বলা। সব খদ্দের তো আর এ ভাষায় কথা বলে না। কিন্তু ওরা প্রায় আধাঘণ্টা ধরে যেটাই চোখে ধরেছে সব কিছু তছনছ করে একটি জিনিসও না কিনে বেরিয়ে আসে। আমি মিনমিন করে এই কথাটা উল্লেখ করে একটা শক্ত ঝাড়ি খেয়ে চুপ করে যাই।

ওরা সে যাত্রায় সহজেই আমাদের রেহাই দেয় বলে সেখান থেকে আমরা পড়ন্ত বিকেলে চট্টল বৌদ্ধ ধর্মদূত বিহারে যাওয়ার সুযোগ পাই। রেঙ্গুনের সঙ্গে চট্টগ্রামের একটা নিবিড় সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবেই ছিল, কিন্তু বিদেশি শহরটির কেন্দ্রে যে একখণ্ড চট্টগ্রাম পেয়ে যাব, এমনটি আশা করিনি। বাড়িটিতে ঢোকার মুখে গেটের ওপর সাইনবোর্ডে ইংরেজি ও বর্মি ভাষার সঙ্গে বাংলায় লেখা ‘চট্টল বৌদ্ধ ধর্মদূত বিহার’। শিকলের মতো দেখতে এক সারি বর্মি হরফের নিচে বাংলা হরফগুলো দেখে খুব আপন মনে হয়। বাড়িটির ছায়াশীতল আঙিনার সামনে মাঝ বরাবর সুন্দর দোতলা এক ভবন। দোতলার চাঁদওয়ারিতে সোনালি হরফে বাংলায় লেখা নাম ‘গন্ধ কুটির’, তার পাশে লেখা ‘চট্টল বৌদ্ধ সমিতি’। আঙিনার হাতের বাঁয়ে আরেকটি একতলা বাংলো, তার চাঁদওয়ারিতে লেখা দেখে বোঝা যায় ঘরটি তৈরি হয়েছে ১৯৫২ সালে দেওয়া চট্টগ্রামের গহিরার জনৈক এন আর বড়ুয়ার দানে। এটি সম্ভবত ধর্ম মিত্র থেরো নামের প্রধান ভান্তের আবাস। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ১৯০২ সালে রেঙ্গুনে প্রতিষ্ঠিত হয় চট্টগ্রাম বৌদ্ধ সমিতি। বাড়িটির এক কোণে খাড়া করে উত্কীর্ণ দুটি অতি প্রাচীন মার্বেল পাথরের লম্বা ফলক। সেই ফলক দুটির একটিতে বাংলায়, আরেকটিতে ইংরেজিতে খোদাই করা জনা বিশেক ব্যক্তির নাম, যাঁরা চট্টগ্রাম বৌদ্ধ সমিতির একটি নিজস্ব ভবনের জমি কেনা এবং তার সীমানাপ্রাচীর তৈরি করার জন্য ১০০ টাকা এবং তদূর্ধ্ব অঙ্কের অনুদান দিয়েছিলেন। তালিকার প্রথম নামটি বরদা চরণ চৌধুরীর, যাঁর অনুদানের পরিমাণ ৫০০ টাকা। বরদা চরণ রূপালী চৌধুরীর পিতামহ। তাঁর বার্মা প্রবাসের বিস্তারিত বয়ান মান্দালয় পর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরদিন সকালে আমাদের শোয়েডাগন প্যাগোডায় নিয়ে যায় সাই। এটিকেই পৃথিবীর প্রাচীনতম বৌদ্ধ স্তূপ হিসেবে ধরা হয়। এখানে অবৌদ্ধদের অবগতির জন্য স্তূপ বিষয়ে কিছু জ্ঞানদান করা যায়।


মুখরিত শোয়েডাগন


স্তূপ একটি পালি শব্দ, যা সংস্কৃতবাহিত হয়ে বাংলায় একীভূত হয়েছে, এমনকি ইংরেজিতেও হয়েছে স্টুপা, যার অর্থ গাদা বা ঢিবি। বৈদিক যুগে মৃত্যুর পর দেহাবশেষ চাপা দেওয়ার জন্য শ্মশানের ওপর মাটির স্তূপ তৈরি করা হতো। তবে বৌদ্ধ ধর্মে এই স্তূপ ধর্মীয় স্থাপত্য হিসেবে স্বীকৃত, কারণ এটি গৌতম বুদ্ধের দেহ, তাঁর বাণী এবং আত্মার মূর্ত রূপ। মৃত্যুর সময় গৌতম বুদ্ধ তাঁর শিষ্য আনন্দকে তাঁর দেহভস্মের ওপর স্তূপ নির্মাণের কথা বলেছিলেন। কালক্রমে স্তূপ শুধু দেহভস্মের ওপর নির্মিত স্থাপনায় সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি পরিণত হয় ভক্তি প্রদর্শনের স্থানে।

লোককাহিনি অনুসারে খ্রিস্টপূর্ব ৫৮৮ সালে বোধিপ্রাপ্ত হওয়ার পর গৌতম বুদ্ধ যখন সপ্ত মহাস্থান ভ্রমণে, তখন দুই ভাই তপস্সু ও ভল্লিকা তাঁকে খাদ্য-ভিক্ষা দিয়েছিলেন। তাঁদের আশীর্বাদ করতে গিয়ে বুদ্ধ নিজের মাথার আটগাছি চুল তাঁদের দেন। সেই চুল নিয়ে তাঁরা দেশে ফিরে এলে রাজা ওক্কালাপা তাঁদের সাদরে বরণ করেন। তাঁর সাহায্যেই ভ্রাতৃদ্বয় সিঙ্গুতারা পাহাড়ের সন্ধান পেয়েছিলেন। এখানে রক্ষিত ছিল গৌতম বুদ্ধের পূর্ববর্তী তিনজন—কোনাগমন বুদ্ধের জলের সোরাই, কাশ্যপ বুদ্ধের জোব্বা এবং কুকুসন্ধ বুদ্ধের ব্যবহার্য জিনিসপত্র। চৈত্যগৃহ তৈরি করে রাজা ওক্কালাপা পূর্ববর্তী তিন বুদ্ধের স্মারকসমূহের সঙ্গে বুদ্ধের কেশগুচ্ছও সংরক্ষণ করেন। খ্রিস্টপূর্ব ৫৮৮ থেকে শুরু করে ১৪ শতাব্দী পর্যন্ত ৩২ জন রাজা শোয়েডাগন প্যাগোডার রক্ষক ছিলেন। এঁদের বিভিন্নজনের শাসনামলে স্তূপটির উচ্চতা বৃদ্ধি করা হয়। ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে রানি শিন স পুর আমলে এটি ৩০২ ফুট পর্যন্ত উঁচু করা হয়। তৈরির পর থেকে প্যাগোডাটি বহুবার ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছিল ১৭৬৮ সালের ভূমিকম্পে, সেবার মূল চূড়াটি ভেঙে পড়েছিল। রাজা সিনবিউশিন এটিকে সংস্কার করে ৩২৬ ফুট অর্থাৎ ৯৯ মিটার পর্যন্ত উঁচু করেন। এই উচ্চতাই এখনো বহাল আছে।

স্তূপটি ৮৬৮৮ সোনার পাতে মোড়া, তার ওপরের ৪৩ ফুট উঁচু ছত্রীটিতে ব্যবহৃত সোনার ওজন আধটন। এটির শীর্ষে যে গোলাকৃতি মুকুট, এতে মোট ১৮০০ ক্যারেটের চার হাজার হীরা। এ ছাড়া রয়েছে চুনি, পান্না, নীলকান্তমণি, পোখরাজসহ হাজার তিনেক মূল্যবান পাথর। সোনার ঘণ্টা রয়েছে চার হাজারটি। ব্রিটিশ আমলে বলা হতো, ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের রিজার্ভে যত সোনা আছে, তার চেয়ে বেশি আছে শোয়েডাগন প্যাগোডায়। এটিতে মোট সোনার পরিমাণ যদি ৬০ টনও হয় তাহলে মিয়ানমারের সরকারি সোনার রিজার্ভের চেয়ে নিশ্চিত কয়েক গুণ বেশি। মূল্যবান মণি-মাণিক্য, সোনা ও অন্যান্য ধাতু, নির্মাণব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ এবং এটি ঘিরে যাবতীয় কর্মকাণ্ড, আমাদের মতো বিদেশি পর্যটকদের ব্যয়িত বিদেশি মুদ্রা—সব কিছু যদি ধরা হয় তাহলে তা দেশটির জিডিপির কত ভাগ হবে সেটি অর্থনীতিবিদদের বিবেচ্য বিষয়। শুধু শোয়েডাগনই নয়, মিয়ানমারের সর্বত্র যে হাজার হাজার প্যাগোডা আর স্তূপ ছড়িয়ে আছে, সেগুলো না থাকলে দেশটির সেনাবাহিনীর চেয়ে বড় বিশাল ভিক্ষুবাহিনীর কী গতি হতো কে জানে।

ছত্রীটি বাদ দিলেও প্যাগোডার বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে নানা সাইজের প্রায় দেড় হাজার ঘণ্টা। এগুলো একসঙ্গে বাজালে কেমন অনুরণন হয় তা শোনার সৌভাগ্য হয়নি। এখানে একদা ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘণ্টাটি। এটি তৈরির ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়, ১৪৮০ সালে রাজা ধম্মজেদি তাঁর রাজ্যে একটি গৃহশুমারি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাঁর অত্যুৎসাহী মন্ত্রীরা শুমারির সঙ্গে সঙ্গে প্রজাদের কাছ থেকে কর আদায় করে, এই করের মোট পরিমাণ ছিল প্রায় ৩০০ টন তামা। বলা বাহুল্য, রাজা এই বাড়াবাড়িতে খুশি হননি, তাই তাঁর রাগ প্রশমন করতে এই তামা দিয়ে একটি ঘণ্টা তৈরি করে শোয়েডাগন প্যাগোডায় লাগানোর পরামর্শ দেন মন্ত্রীরা। তবে ঘণ্টাটি তৈরি শুরুর তারিখটা নাকি জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী ভালো দিন ছিল না, ফলে এটির ধ্বনি ছিল বেসুরো।

এই ঘণ্টাটি এখন আর প্যাগোডায় নেই। বার্মার একাংশ যখন পর্তুগিজ দখলে, তখন (১৬০৮) ফিলিপ ডি ব্রিতো নামের এক পর্তুগিজ সেনাপতি তাঁর অনুগত   বাহিনীর মাধ্যমে ঘণ্টাটি খুলে নিয়ে বহু কসরত করে ভেলায় ওঠান। তাঁর উদ্দেশ্য এটিকে গলিয়ে জাহাজের কামান তৈরি করা। ভেলাটি জাহাজের সঙ্গে বেঁধে রওনা হওয়ার পর বাগো ও ইয়াঙ্গুন নদীর মোহনায় পৌঁছলে ভেলাটি ঘণ্টাসহ ডুবে যায়, তার সঙ্গে তলিয়ে যায় ব্রিতোর জাহাজটিও। সাঙ্গোপাঙ্গসহ ধরা পড়ার পর একাধিক অপরাধে ব্রিতোকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

বিখ্যাত এই প্যাগোডায় ঢোকার আগে এটির যাবতীয় ইতিহাস জেনে নেওয়া গেল, কিছুটা সাইয়ের মুখে, বাকিটা ব্রোশিওর এবং অন্তর্জাল থেকে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে এসেও রেঙ্গুনে গরম কমেনি। প্রচণ্ড রোদ থেকে বাঁচার জন্য সাই আমাদের জন্য কয়েকটা ছাতা নিয়েছিল সঙ্গে। তখন ছাতার মাহাত্ম্য বুঝতে পারিনি বলে এই ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকার জন্য সেই ছাতাগুলো কেউই গ্রহণ করে না, তাই বেচারা সাই গোটা চারেক ছাতা একাই বহন করে নিয়ে যায়। প্যাগোডায় ঢোকার প্রস্তুতি হিসেবে সিদ্ধার্থ হক একটা লুঙ্গি পরে নিয়েছে। প্যাগোডার পশ্চিম গেটের মুখে প্রহরারত দুটো বিশাল সিংহমূর্তি পেরিয়ে লবিতে অপেক্ষা আমাদের বসিয়ে রেখে সাই টিকিট কিনতে যায়। চোখে গাঢ় সানগ্লাসসহ লুঙ্গি পরিহিত সিদ্ধার্থ হক সুবোধ বালকের মতো চেয়ারে বসে অপেক্ষা করে, ওকে চক্ষু হাসপাতালের লবিতে বসা ক্যাটার‌্যাক্ট অপারেশনের রোগী বলে মনে হয়।

মূল স্তূপ এবং প্যাগোডাসহ সব কিছু পাহাড়ের ওপর, তাই অভ্যর্থনা হল থেকে লিফটে ওঠারও ব্যবস্থা আছে। লিফট থেকে একটা সেতুর করিডর দিয়ে যাওয়া যায় মূল প্যাগোডা কমপ্লেক্সে। এই করিডর ধরে সোজা এগিয়ে গেলে কশ্যপ বুদ্ধের মূর্তি। এখানে দাঁড়িয়ে সাই আমাদের এই বিশাল কমপ্লেক্সটি নিয়ে একটা ছোট ভাষণ দেয়। মূল স্তূপ ঘিরে দর্শনার্থী ও উপাসনার্থীদের চলাচল হয় ঘড়ির কাঁটা ঘোরার নিয়মে, অর্থাৎ বাঁ থেকে ডানে। আমরা বাঁয়ে রওনা হওয়ার পর একে একে প্রদক্ষিণ করি কুকুসন্ধ ও কোনাগমন বুদ্ধের মূর্তি। কোনাগমন বুদ্ধের পর গৌতম বুদ্ধের মূর্তি।


ধর্ম মিত্র থেরো নামের প্রধান ভান্তের আবাস


সামনের প্রশস্ত চাতালের উল্টো দিকে উপাসনার্থীদের জন্য আছে চারপাশ খোলা শেড। সেখানে নানা বয়সী উপাসনার্থীর মধ্যে একটা থামের গায়ে হেলান দিয়ে বসে সিদ্ধার্থ গভীর ধ্যানে মগ্ন হয়। রূপালীও নিবিষ্ট উপাসনায় রত হলে ওর সঙ্গে যোগ দেয় আমার মেয়ে সামিয়া এবং তুষার-পত্নী ঊর্মি। আমি এই ফাঁকে উজ্জ্বল মধ্যদুপুরের ঝকঝকে রোদের মধ্যে শার্প ছবি ওঠে বলে কিছু ভালো ছবি তোলার চেষ্টা করতে গিয়ে ওদের সঙ্গে যোগ দিতে পারি না। ছবি তোলার এই চেষ্টার একপর্যায়ে ওখানকার কিছু পেশাদার ক্যামেরাম্যানের সঙ্গে সমঝোতা হয়ে যায় আমার। তাদের একজন শোয়েডাগনের মূল স্তূপকে পেছনে রেখে কয়েকটা ছবি তুলে দেয় একা ও যুগলে। তবে সূর্য মধ্য গগনে থাকলে খোলা আকাশের নিচে ভালো ছবি তোলার যে কায়দা, সেটি ওরা প্রয়োগ করে না। তাই রোদ ঝলসানো ওভার এক্সপোজড ছবি হলেও তার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ওদের কিছু দক্ষিণা দেওয়ার চেষ্টা করলে ওরা সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করে।

টিকিট কেটে ঢোকার সময় আমাদের সবার জুতো-স্যান্ডেল রেখে আসতে হয়েছিল, তাই সবাই ছিলাম নগ্নপদ। মধ্যদিনের খররোদে আমরা যখন টাইলস বিছানো রৌদ্রালোকিত পথে প্রদক্ষিণ করছিলাম, সবার চলনে ছিল চপল নৃত্যভঙ্গিমা, কারণ গরমে তেতে ওঠা টাইলসের ওপর নগ্নপদে হাঁটার যে কী কষ্ট, সেটি পদে পদে টের পাচ্ছিল সবাই। তাই গৌতম বুদ্ধের মূর্তির সামনে এসে ওরা যখন প্রার্থনায় বসে, তখন আমাদের কিছুক্ষণ আরামের সুযোগ ঘটে। এখান থেকে ওঠার পর এমন রোদের মধ্যে লিভার ব্রাদার্সের বিজ্ঞাপনের ভাষায় ত্বকের উজ্জ্বলতা নষ্ট হতে বাধ্য বলে মহিলারা নিরুপায় হয়ে সাইয়ের কাছ থেকে ছাতা চেয়ে নেয়। পথিমধ্যে নঙদজি প্যাগোডার শায়িত বুদ্ধমূর্তি না দেখেই আমাদের এগিয়ে যেতে হয়, সাইয়ের তথ্য মতে ওখানে মহিলাদের যাওয়া নিষেধ, কারণ ওখানেই সংরক্ষিত আছে বুদ্ধের কেশগুচ্ছ। প্রদক্ষিণ করার পথে আরো একবার কোনাগমন বুদ্ধের মূর্তির সামনে এসে রূপালী থমকে যায়। সেই খররোদের মধ্যে পুনর্বার প্রার্থনায় রত হয় ও।

এর মধ্যে এক জায়গায় তপ্ত রোদের মধ্যে সামনে বেসিনসহ একটা বুদ্ধমূর্তির গায়ে জল ঢালার ব্যবস্থা। সেটা দেখে আমার মেয়ে সামিয়া এবং তুষার-পত্নী ঊর্মি বুদ্ধকে শীতল জলে স্নান করাতে লেগে পড়ে। পূর্ববর্তী কোনো একসময়ে মিয়ানমার ভ্রমণে এসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকেও ঠিক একইভাবে এই বুদ্ধমূর্তিকে স্নান করাতে দেখেছিলাম বলে সামিয়া ও ঊর্মির প্রয়াসের যৌক্তিকতা খুঁজে পাই। আমি উপাসনার্থীদের জন্য তৈরি শেডের নিচে দাঁড়িয়ে দেখি কিভাবে খুব দীনহীন চেহারা ও বেশভূষার মানুষ রৌদ্রতপ্ত শানের ওপর বসে আভূমি নত হয়ে ভগবান বুদ্ধের কৃপা ভিক্ষা করছে। ঠিক একই রকম পুণ্যার্থী মানুষের দেখা পেয়েছিলাম মান্দালয়ের সুন উপন্যাশিন প্যাগোডায়। লোকটি শ্রেণিসচেতন হয়ে মূল প্রার্থনা মঞ্চের সামনের গালিচার বাইরে বসে প্রার্থনায় রত হয়েছিল। এ সময় এক নগ্নবাহু সুন্দরী তরুণীকে দেখি রোদতপ্ত পথের ওপর লুটিয়ে পড়ে ভগবান বুদ্ধের প্রার্থনা করছে, কিছুক্ষণ আগে আমার ক্যামেরায় ধরা পড়া এই তরুণীই আরেক তরুণীর সঙ্গে রোদে ভাজা হয়ে সেলফি তুলছিল। পুরো পথ প্রদক্ষিণ করে আবার পশ্চিম গেটের কাছে পৌঁছলে দুপুরের তীব্র রোদের কারণে বোধ করি শৃঙ্খলা কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়। উপাসনার্থী লোকজন, এমনকি গাঢ় গেরুয়া বসন পরা ভিক্ষুরাও তাঁদের ভিক্ষুসুলভ গাম্ভীর্য বিস্মৃত হয়ে উল্টাপাল্টা হেঁটে বেড়ায়।

বের হয়ে যাওয়ার পথে এক বিশাল অশ্বত্থগাছের গোড়ায় বাঁধানো বেদির নিচের চাতালের ঘন ছায়ায় কয়েকটা পরিবার পিকনিকের মতো বাচ্চাকাচ্চাসহ শুয়ে-বসে আছে। জানি না এটাই এখানকার দেড় শ বছরের পুরনো বোধিবৃক্ষ কি না, তবে গাছের চাতালে ফিট করা সাইনবোর্ডে লেখা আছে ‘বোধিবৃক্ষ’। বলা হয়ে থাকে, দেড় শ বছর আগে বিহারের বোধগয়া থেকে মূল বোধিবৃক্ষের চারা এনে এখানে লাগানো হয়েছিল, যে বৃক্ষের নিচে বসে ধ্যানমগ্ন গৌতম বুদ্ধ বোধিপ্রাপ্ত হয়েছিলেন।

শোয়েডাগন প্যাগোডা থেকে যখন আসি, তখন সূর্য মধ্যগগন প্রায় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এত কাছে এসে সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের সমাধি না দেখলে রেঙ্গুন আসাটাই ব্যর্থ যেন। সেদিন ছিল শুক্রবার, তাই সমাধির সামনের প্রায় ফাঁকা জি ওয়াকাওয়া স্ট্রিটে যখন পৌঁছি, তখন দরগার মসজিদে জুমার নামাজের বয়ান চলছিল। দীনহীন দরগাটিতে ঢুকলে হাতের ডানে অভ্যর্থনা কক্ষ এবং অফিস। মূল ফটক পেরিয়ে হাতের বাঁয়ে শ্বেতপাথরের কয়েকটা সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলেই মাজার। পাশাপাশি দুটো কবর—একটি সম্রাটের, আরেকটি তাঁর স্ত্রী জিনাত মহলের। ঢোকার মুখে এক খাদেম আমাদের পাকড়াও করে নিখুঁত হিন্দিতে জানায়, এ দুটি কবর রেপ্লিকামাত্র, মূল কবর বেইসমেন্টে, কিন্তু আজ জুমার দিন বলে নিচে নামার সুযোগ নেই, কারণ সেখানে মহিলা মুসল্লিরা আছেন। মসজিদের মাইকে তখনো চলছিল বর্মি ভাষায় খুতবা বা বয়ান। মূল কবর দেখতে পাব না বলে আমরা সেই রেপ্লিকা সমাধিগৃহের দেয়ালে ঝোলানো সাদাকালো ছবি দেখি। একটি ছবির নিচে সুফি সম্রাটের শায়েরির দুটো পঙিক্ত এপিটাফের মতো—‘কিতনা হ্যায় বদনসিব জাফর/দফনকে লিয়ে দো গজ জমিনভি মিল নহি সকি’, অর্থাৎ জাফর, তুমি এতটাই দুর্ভাগা, তোমার কবরের জন্য দু গজ মাটিও জুটল না।

খাদেমটিকে সবিনয়ে জিজ্ঞেস করি, আমাদের সঙ্গে কী কারণে ও হিন্দিতে বাতচিত করছে, কারণ আমরা হিন্দি বা উর্দু কোনোটাই বুঝি না। তখন লোকটি লজ্জিত মুখে ইংরেজিতে কথা বলা শুরু করে। তাই আমরা ওর দরগাহর খাদেমোচিত উমেদারিকে প্রশ্রয় না দিয়ে ওকে উপেক্ষা করে এগিয়ে যাই। ফলে প্রথমে আমাদের সঙ্গে সেঁটে থাকলেও লোকটি একসময় কেটে পড়ে নতুন কোনো খদ্দেরের তালাশে।

ভারতবর্ষের সর্বশেষ এই মোগল সম্রাটের সমাধিটি পাওয়া গিয়েছিল মাত্র সেদিন, ১৯৯১ সালে, শ্রমিকরা যখন সমাধিচত্বরের নালা খোঁড়াখুঁড়ি করছিল, তখন মাটির নিচে ইটের একটা কবরখানা দেখতে পায় ওরা। কবরখানার কফিনের ভেতর পাওয়া যায় কঙ্কাল। ইতিহাসবিদদের ধারণা, ওপরে ও নিচে দুটো কবর দেখানোর কারণ, ইংরেজরা কাউকে জানতে দিতে চায়নি কোথায় মোগল সম্রাটকে সমাহিত করা হয়। বিদ্রোহী সিপাহিদের মূল অনুপ্রেরণা বৃদ্ধ বাহাদুর শাহ তখনো ইংরেজদের কাছে ভীতির বিষয়, কারণ জীবিত বাহাদুর শাহর চেয়ে মৃত বাহাদুর শাহ হতে পারেন অনেক শক্তিশালী। বাহাদুর শাহ মারা যান ১৮৬২ সালের ৭ নভেম্বর। পাঠক, লক্ষ করবেন, ঠিক এই ৭ নভেম্বরই আমাদের ইতিহাসে আরেকটা ঘটনা ঘটে যায়। মোগল সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাটের এমন মর্যাদাহীন মৃত্যুর পরপরই বিকেলবেলা প্রহরীদের ডেরার পেছনে গর্ত খুঁড়ে তড়িঘড়ি করে তাঁকে কবর দেওয়া হয়েছিল। কবর ঘিরে দেওয়া হয় বেতের বেড়া। জেলার নেলসন ডেভিস লন্ডনে খবর পাঠান, একজন কয়েদির মৃত্যুতে এখানে কেউ বিচলিত নয়। রেসকোর্সে বাজি ধরতে যাওয়া লোকদের মধ্য থেকে সর্বসাকল্যে শখানেক লোক জড়ো হয়েছিল। স্বামীর মৃত্যুর ২০ বছর পর সম্রাজ্ঞী জিনাত মহল যখন আফিমের নেশা করতে করতে হতদরিদ্র অবস্থায় মারা যান রেঙ্গুনে, তাঁকে স্বামীর পাশে কবর দেওয়া হয়নি। বাহাদুর শাহর কবর কোথায় কেউ জানত না তখন।

বাহাদুর শাহ জাফরকে সিপাহি বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেওয়ার অপরাধে বিচার করে নির্বাসন দেওয়া হলেও তিনি প্রকৃতপক্ষে বিদ্রোহী সিপাহিদের প্রশ্রয় দিতে চাননি। বিভিন্ন রাজ্য থেকে আসা সিপাহিরা যখন দিল্লি পৌঁছে সম্রাটের কাছ থেকে অস্ত্র সাহায্য চায়, জাফর তাতে সাড়া দেননি, তাঁর বক্তব্য ছিল যে তারা তাদের ওপরওয়ালা অফিসারদের খুন করে পালিয়ে এসেছে। উপরন্তু তিনি বলেন, তাঁর অর্থবল, সেনাবল কিছুই নাই, তবে তাদের সঙ্গে সর্বান্তঃকরণে আছেন তিনি। বিদ্রোহীরা জানায়, তারা ধন-সম্পদ, সৈন্য-সামন্ত কিছুই চায় না, সম্রাট শুধু তাদের সঙ্গে থাকলেই চলবে। সম্রাট তাদের দাবি মেনে নিয়েছিলেন। এ কারণেই ইংরেজরা তাঁকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করায়।

দিল্লি যখন বিদ্রোহী সিপাহিদের তাণ্ডব আর ডাকাতদের লুটপাটে লণ্ডভণ্ড, ইংরেজরা কঠোর হাতে দমন করে সব। ইংরেজ বাহিনীর অভিযানের মুখোমুখি না হওয়ার জন্য জাফর আশ্রয় নেন হজরত নিজামুদ্দীনের দরগায়। সেখান থেকে তিনি চলে যান পূর্বপুরুষ হুমায়ুনের সমাধিতে। এখান থেকেই সপরিবারে তাঁকে বন্দি করে ইংরেজ সেনাপতি হাডসন। তাঁর দুই ছেলেকে গুলি করে হত্যা করার পর সম্রাটকে তাঁরই পূর্বপুরুষের তৈরি করা কেল্লার এক খুপরিতে বন্দি করে রাখা হয়। তারপর শুরু হয় রাজদ্রোহের অভিযোগে তাঁর বিচার। অথচ এই ইংরেজ বণিকদের এ দেশে ব্যবসা করার অনুমতি দিয়েছিলেন তাঁরই পূর্বপুরুষ সম্রাট জাহাঙ্গীর।

কেল্লার দিওয়ান-ই-খাসে সম্রাটের বিচার শুরু হয় ১৮৫৮ সালের জানুয়ারিতে, মাত্র আড়াই মাসে শেষ হয় প্রহসনের এই বিচারকাজ। বিচার চলাকালে মাঝেমধ্যে আদালতেই ঘুমিয়ে পড়তেন অশক্ত বৃদ্ধ। তাঁর সাজা হয় নির্বাসন। প্রজাবিদ্রোহের ভয়ে কঠোর গোপনীয়তায় দিনের আলো ফোটার আগেই দিল্লি থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয় বেগম এবং দুই ছেলেসহ সম্রাটকে। সেখান থেকে এলাহাবাদ, কলকাতার ডায়মন্ড হারবার হয়ে রেঙ্গুন। পতন ঘটে ৩৩২ বছরের মোগল শাসনের। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ভারত সম্রাটকে বার্মায় নির্বাসনে পাঠানোর ২৭ বছর পর ১৮৮৫ সালে ব্রিটিশদের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত বার্মার রাজা থিবো এবং রানি সুপেলাৎকে সপরিবারে নির্বাসন দেওয়া হয় ভারতের মহারাষ্ট্রের পাণ্ডববর্জিত জায়গা রত্নগিরিতে।

বাহাদুর শাহ জাফরের সমাধিতে ঢোকার মুখে তাঁর বড় একটা ছবি, দীনহীন চেহারার সেই ছবি দেখে বুঝতে কষ্ট হয় না, শেষ দিনগুলো সম্রাটের কী ক্লেশে কেটেছে। ভেতরে দেয়ালে ঝোলানো বৃদ্ধ সম্রাটের কয়েকটা ছবি, তাঁর জীবনের সর্বশেষ ছবিটিতে দেখা যায়, গড়গড়ার নল হাতে শায়িত সম্রাট, তাঁর বিবর্ণ চোখে অসুস্থতার লক্ষণ। ছবিটি তাঁর লোক-দেখানো বিচারের কোনো একদিন রেঙ্গুন নির্বাসনের আগের সময়কার। ইংরেজ সেনা অফিসারের সঙ্গে দুই পুত্রসহ ছবিটিতে সম্রাটকে বিপর্যস্ত দেখায়, এটি তাঁকে আদালতে নিয়ে যাওয়ার আগের কোনো একদিনের মুহূর্ত। নিচের মূল সমাধিতে নামার সুযোগ নেই বলে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করে মনের ভেতর। গাড়িতে পুরো বহর রেখে নেমে এসেছিলাম আমি আর তুষার দাশ, ওদের বিরক্তি উৎপাদন না করে আমাদের ফিরতে হবে বলেই আমরা জুমার নামাজ শেষ হওয়ার পর বেইসমেন্টে নেমে বাহাদুর শাহর মূল সমাধি দেখার জন্য অপেক্ষা করতে পারি না। আমরা যখন বাড়িটা থেকে বের হয়ে আসি, তখনো চলছিল বর্মি ভাষায় খুতবা। নামাজের পর স্থানীয় মুসলমানরা এখানে আসেন, যোগ দেন কিয়ামে, তারপর কাওয়ালিতে।

দিল্লির শেষ বাদশাহর কবর হিসেবে দরিদ্র হালের বাড়িটা তাঁর পূর্বপুরুষ হুমায়ুনের প্রাসাদোপম সমাধির তুলনায় এতটাই অকিঞ্চিত্কর যে বাহাদুর শাহ জাফরের সমাধির দেয়ালে উত্কীর্ণ একটি শায়েরি উদ্ধৃত না করলে সেটি বোঝানো সম্ভব নয়—‘এই বাগানে শীত যায়, বসন্ত আসে/তবু প্রতিটি সকাল একই রকম/খাঁচার ভেতর কে-ই বা বোঝে শীত বসন্ত আসে?’

দুপুরের খাওয়া শেষে আমরা যখন ইনিয়া লেকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, লেকের অন্য পাড়ে একটা বাংলো বাড়ির দিকে দেখিয়ে সাই বলে, ওটা অং সান সু চির বাড়ি। আমার তত্ক্ষণাৎ মনে পড়ে, এই লেক সাঁতরে এক আমেরিকান নাগরিক সু চির বাড়িতে অনুপ্রবেশ করেছিলেন। ধরা পড়ার পর কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে কোনো বর্মি নাগরিকের বাড়িতে রাত কাটানোর ফৌজদারি অপরাধসহ মোট তিনটি অভিযোগে তাঁর সাত বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল। এই দণ্ডাদেশের তিন দিনের মাথায় এক মার্কিন সিনেটর মিয়ানমার এসে দেশটির সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে দেন-দরবার করে তাদের নাগরিককে ছাড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। সু চিকেও এই ঘটনায় কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়েছিল। লোকটি কী কারণে বাড়িটিতে ঢুকেছিল, সেটি কখনোই জানা যায়নি। তবে জানা যায়, আগের বছরও সে বাড়িটিতে ঢুকেছিল। এই ঘটনার দশ বছর আগে ছাত্রদের আন্দোলন দমন করার নামে কিছু ছাত্রকে এই লেকেই ডুবিয়ে মেরেছিল পুলিশ।

ইউনিভার্সিটি এভিনিউতে একটা বন্ধ গেটের সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে আমাদের সু চির বাড়ি দর্শন করায় সাই। বেশ উঁচু দেয়াল থাকায় ভেতরের কিছুই দেখা যায় না। গেটের মাথার ওপর একটা হলুদ ব্যানারে বর্মি ভাষায় লেখা সু চির বাবা জেনারেল অং সানের একটা বাণী, যার অর্থ, দেশ ও জনগণের ভাবমূর্তির জন্য একনিষ্ঠভাবে সাহসিকতার সঙ্গে কাজ করুন। ব্যানারের ওপর তাঁর একটা সাদাকালো ছবি লাগানো। গেটের দুই পাশে সু চির দল এনএলডির লোগো ও নামসহ দুটো ব্যানার। বাড়ির সামনে কোনো প্রহরী নেই, এমনকি কোনো সেন্ট্রি পোস্টও দেখা যায় না গেটের পাশে। দেখা যায় না কোনো দর্শনার্থীও। অথচ একসময়, সু চির দীর্ঘ অন্তরিন থাকার মেয়াদে এই গেটের কাছে ছিল পুলিশ ব্যারিকেড, তখন সাধারণ মানুষ চেষ্টা করলেও তাদের প্রিয় নেত্রীর বাড়ির কাছেধারেও ঘেঁষতে পারত না।

সু চির বাড়ির গেট দর্শন শেষে আমাদের রেঙ্গুন ইউনিভার্সিটি দেখাতে নিয়ে যায় সাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার এক বছর আগে স্থাপিত হয়েছিল বার্মার প্রাচীনতম এই ইউনিভার্সিটি। তবে এটির যাত্রা শুরু হয় ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রেঙ্গুন কলেজ হিসেবে। রংহীন কালো হয়ে যাওয়া দেয়ালের তিনটি ধনুকাকৃতি জানালা ফোটানো দুর্গসদৃশ কনভোকেশন হলের সামনে গাড়ি থেকে নেমে আমরা জনবিরল ক্যাম্পাসের একাংশ দেখতে পাই। ওখানে কোনো ছুটির কারণে কিংবা একাডেমিক ভবন থেকে দূরে বলে দু-চারজন ছাত্র-ছাত্রীর ইতস্তত চলাচল ছাড়া ক্যাম্পাসের পরিচিত কোনো চাঞ্চল্য চোখে পড়ে না।

খুব শান্ত পরিবেশের মাঝে ছিমছাম রাস্তাটিতে দাঁড়িয়ে কল্পনা করা যায় না, এটিই অতীতে বহুবার অন্যায় শাসনের বিরুদ্ধে হয়ে উঠেছে প্রতিবাদ ও আন্দোলনের মূল কেন্দ্রভূমি। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে এই ইউনিভার্সিটির ছাত্ররা প্রথম থেকেই ছিল সোচ্চার। ১৯২০, ১৯৩৬ ও ১৯৩৮ সালের প্রতিটি আন্দোলনে শক্তিশালী বিরোধী দলের শূন্যতা পূরণ করে এখানকার ছাত্ররাই নেতৃত্ব দিয়েছে। ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করার অপরাধে এর ছাত্ররাই হয়েছিল জঘন্যতম নৃশংসতার শিকার। অথচ রেঙ্গুন ইউনিভার্সিটির ছাত্রদের এই সংগ্রামী অতীত থাকলেও বর্মি জনগণের রাজনৈতিক চেতনা তত প্রখর নয়—এমন অজুহাতে ১৯১৯ সালে মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কারের অধীনে ‘গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া অ্যাক্ট’ পাস করার সময় বার্মাকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছিল। রবার্ট এইচ টেলর তাঁর ‘দ্য স্টেট অব মিয়ানমার’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে ব্রিটিশ রাজের এই আচরণের বিষয়ে বার্মার কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা তদানীন্তন ভারত সচিব এডউইন মন্টেগুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য ভারত সফর করেন। মন্টেগু পরে নাকি মন্তব্য করেছিলেন, তাঁরা ছিলেন ‘ভদ্র, সরলমনা, সুবেশধারী মানুষ। সম্পূর্ণ অনুগত। রাজনৈতিক অস্থিরতার কোনো লক্ষণ নেই। ’ তাই তাঁদের ধারণা যে বার্মায় রাজনৈতিক সংস্কারের কোনো দাবি বা দরকার নেই। এখানে দাঁড়িয়ে প্রায় একই বয়সী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রামী ইতিহাসের কথা স্মরণে আসে। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনে কিংবা স্বাধীনতাসংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সঙ্গে দাবি আদায়ে বর্মি ছাত্রদের সমিল ভূমিকায় এক ধরনের একাত্মতা বোধ করি। কিন্তু বেশি সময় ওখানে থাকার সুযোগ ঘটে না। সাই আমাদের রেঙ্গুনের লোকাল ট্রেনে চড়ার অভিজ্ঞতা দিতে চায় বলে আমাদের ও নিয়ে যায় কি মাইয়েন্ট দাইং স্টেশনে।

ঔপনিবেশিক ধাঁচের স্টেশন ভবনটার সামনের একচিলতে যাত্রীবিরল প্ল্যাটফর্ম থেকে ট্রেনে ওঠার পর দেখি সব কিছুই আমাদের ট্রেনের মতো, তবে ভেতরের ব্যবস্থা উন্নত দেশের সাবওয়ে বা মেট্রো রেলের মতো স্বল্প দূরত্বের যাত্রার উপযোগী। প্রতিটি স্টেশনে ট্রেন থামছে, যাত্রীরা উঠছে-নামছে, উঠছে ফেরিওয়ালারাও। আমাদের ফেনী-চট্টগ্রাম শাটল ট্রেনের চানাচুরওয়ালার মতো ট্রেনের এমাথা-ওমাথা ঘুরে বেড়াচ্ছে ফেরিওয়ালারা, সিদ্ধ ডিম নিয়ে ডিমওয়ালিরা যে শব্দটি হেঁকে যাচ্ছে সেটাও শোনাচ্ছে ‘ডিম, এই ডিম’-এর মতো। মাঝের স্টেশনে ট্রেন থামলে চোখে পড়ে, প্ল্যাটফর্মের ওপর অস্থায়ী খাবারের দোকানে নানা খাবার সামনে নিয়ে গিন্নির মতো বসে আছে মহিলারা, তাকে ঘিরে নিচু প্লাস্টিকের টুলে বসে নিম্ন আয়ের লোকজন তৃপ্তিভরে খাচ্ছে। তেলেভাজা নিয়ে বসা খদ্দেরহীন অন্য দোকানির চোখে-মুখে হতাশা। এসব অতি পরিচিত দৃশ্য দেখতে দেখতে আমরা পৌঁছে যাই সেন্ট্রাল স্টেশনে। ইয়াঙ্গুনের সার্কুলার ট্রেন দেখে আমার ভেতর এক ধরনের হতাশামিশ্রিত দুঃখ ভর করে, এ ধরনের একটি সাশ্রয়ী গণপরিবহনব্যবস্থা আমরা আজ পর্যন্ত চালু করতে পারিনি। ব্যাংককের মতো ওয়াটার বাস, রেঙ্গুনের মতো সার্কুলার ট্রেন—কোনোটাই নয়। এসব নাগরিক সুবিধা ইহজনমে দেখে যেতে পারব কি না ভাবতে ভাবতে আমাদের নিয়ে ট্রেনটা রেঙ্গুন সেন্ট্রাল স্টেশনে পৌঁছে যায়।


মন্তব্য