kalerkantho


অ নু বা দ উ প ন্যা স

গড হেল্প দ্য চাইল্ড

টনি মরিসন
অনুবাদ : দুলাল আল মনসুর

২৫ জুন, ২০১৭ ০০:০০



গড হেল্প দ্য চাইল্ড

অঙ্কন : দেওয়ান আতিকুর রহমান

প্রথম ভাগ

সুইটনেস

 

দোষ আমার নয়। তাহলে আমাকে দোষ দিতে পারো না তোমরা।

এতে আমার হাত ছিল না। কী করে এমনটি হলো আমি জানিও না। আমার দুই পায়ের সংযোগস্থল থেকে অন্যরা ওকে টেনে বের করে। তার এক ঘণ্টার মধ্যেই আমি বুঝতে পারি, কোথাও একটা গোলমাল হয়ে গেছে। সত্যিই গোলমাল হয়ে গেছে। ওর গায়ের রং এতটাই কালো, আমি দেখার সঙ্গে সঙ্গে ভয়ে সিটিয়ে যাই। মাঝরাতের মতো কালো। সুদানের মানুষের মতো কালো। আমার ত্বক মোটামুটি ফর্সা; মাথার চুলের রংও ভালো; আমরা এ রকম রংকে বলি উজ্জ্বল হলুদ। লুলা অ্যানের বাবার রংও এ রকমই। আমার পরিবারের লোকেরা যে যেখানে আছে তাদের কারো গায়ের রং ওর গায়ের রঙের ধারেকাছে নয়। ওর গায়ের রঙের সবচেয়ে কাছের তুলনা চলে আলকাতরার সঙ্গে। তবে ওর চুলের রং গায়ের সঙ্গে খাপ খায় না। হালকা কোঁকড়ানো হলেও বেশ সোজা। অস্ট্রেলিয়ার ন্যাংটো প্রজাতির লোকদের চুলের মতো। তোমাদের মনে হতে পারে, আমাদের সুদূর কোনো পূর্বপুরুষের বৈশিষ্ট্য ওর মধ্য দিয়ে ফিরে এসেছে। কিন্তু কার কাছ থেকে কার কাছে ওর আবির্ভাব হয়েছে? আমার নানিকে তোমরা দেখেছ নিশ্চয়ই। তাঁকে শ্বেতাঙ্গ বলেই তো মনে করা হতো; তাঁর বিয়েও হয়েছিল শ্বেতাঙ্গের সঙ্গে। তাঁর সন্তানদের সম্পর্কে একটা কথাও তিনি বলেননি কাউকে। আমার মায়ের কিংবা খালাদের কাছ থেকে কোনো চিঠি পেলে না খুলে, না পড়েই ফেরত পাঠিয়ে দিতেন। শেষে তাঁরা আর কোনো খবর পেলেন না। তাঁকে তাঁর মতো থাকতে দিলেন। তখনকার দিনে প্রায় সব বর্ণসংকর ও সংকরদের সংকর যাঁরা তাঁদের সন্তানদের প্রায় সবাই এ রকমই করতেন, বিশেষ করে তাঁদের চুল মনের মতো হয়ে থাকলে। কল্পনা করতে পারো, কতজন শ্বেতাঙ্গের শরীরের অভ্যন্তরে গোপনে কৃষ্ণাঙ্গের রক্ত বয়ে চলেছে? অনুমান করে দ্যাখো। আমি শুনেছি, এ রকম শ্বেতাঙ্গের সংখ্যা শতকরা বিশজন। আমার নিজের মা লুলা মে নিজেকে শ্বেতাঙ্গের বংশধর বলে চালিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু কৃষ্ণাঙ্গ থাকার পক্ষেই সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এর জন্য অবশ্য তাঁকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। নিজেদের বিয়ের সময় বাবা আর মা গিয়েছিলেন আদালত ভবনে। সেখানে দুটো বাইবেল রাখা ছিল। একটার ওপরে হাত রেখে কৃষ্ণাঙ্গরা শপথ নিতেন। আরেকটা রাখা ছিল শ্বেতাঙ্গদের জন্য। তাঁদের কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য রাখা বাইবেলে হাত রাখতে দেওয়া হয়েছিল। বাইবেল বলে কথা! বাইবেল নিয়ে কি প্রতারণা করা যায়? এক শ্বেতাঙ্গ দম্পতির বাড়িতে তত্ত্বাবধায়কের কাজ করতেন আমার মা। আমার মায়ের হাতের রান্নাই তাঁরা প্রতি বেলা খেতেন। গোসলের সময় বাথটাবে বসে আমার মাকে পিঠ কচলে দিতে বলতেন তাঁরা। তাঁকে আরো কত গোপন কাজকর্ম করতে বলতেন, খোদা মালুম। কিন্তু কখনোই তাঁদের বাইবেল ছুঁতে দিতেন না।

 তোমরা কেউ কেউ হয়তো মনে করতে পারো, গায়ের রং নিয়ে আমাদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করা খারাপ কাজ; ত্বক যত হালকা ততই ভালো। সামাজিক ক্লাবে, পাড়া প্রতিবেশে, গির্জায়, মহিলা সমিতিতে এমনকি কৃষ্ণাঙ্গদের স্কুলে পর্যন্ত এ রকম বিভাজন দেখা যায়। না হলে সামান্য একটু মর্যাদাই বা রাখা যায় কী করে? ওষুধের দোকানে গিয়ে অন্যের থুথু থেকে বাঁচার আর অন্য কী উপায় থাকতে পারে? বাসস্টপে কোণঠাসা হয়ে ছিটকে পড়া থেকে নিজেকে বাঁচাতে, শ্বেতাঙ্গদের জন্য পুরো ফুটপাতটা ছেড়ে দিয়ে নালার ওপর দিয়ে হাঁটতে গিয়ে কিংবা মুদির দোকানে শ্বেতাঙ্গ ক্রেতাদের জন্য বিনা মূল্যের একটা কাগজের ব্যাগের জন্য যখন আমাদের পাঁচ সেন্ট ধরা হয় তখন আর কী-ই বা করার থাকে? নামের সঙ্গে আরো কত কিছু জুড়ে দেওয়ার কথা তো বাদ দিলেও আরো অনেক অনেক কিছু শুনেছি। গায়ের রং একটু উজ্জ্বল হওয়ায় বিভাগীয় বিপণিতে হ্যাট কেনার আগে মাথায় দিয়ে পরখ করে দেখতে কিংবা লেডিস রুম ব্যবহার করতে আমার মাকে বাধা পেতে হয়নি। আর আমার বাবা জুতা পায়ে লাগে কি না দেখার জন্য দোকানের সামনের অংশে জুতা পরতেন, পেছনের রুমে নয়। তাঁদের দুজনের কেউই ‘শুধু কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য’ লেখা ফাউন্টেন থেকে পানি খেতে পারতেন না, তৃষ্ণায় ছাতি ফেটে মারা গেলেও না।

বলতে খারাপ লাগলেও বলতেই হচ্ছে, শুরু থেকেই মেটারনিটি ওয়ার্ডে লুলা অ্যান শিশুটি আমাকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেই যাচ্ছিল। জন্মের সময় ওর ত্বক অন্যান্য বাচ্চার মতোই ফ্যাকাসে ছিল। এমনকি আফ্রিকার বাচ্চাদেরও এ রকমই থাকে। কিন্তু দ্রুতই ওর ত্বকের রং বদলে যেতে থাকে। আমার চোখের সামনে ওর ত্বক নীলাভ কালো হয়ে যাওয়া দেখলাম; মনে হলো পাগল হয়ে যাব। জানি, মিনিটখানেকের জন্য আমি মাথা খারাপই হয়ে গিয়েছিলাম। ওর মুখের ওপরে এক সেকেন্ডের জন্য একটা কম্বল চেপে ধরেছিলাম। কিন্তু এর বেশি আর কিছু করতে পারিনি। মনে-প্রাণে যতই চাই না কেন, এই ত্বক নিয়ে ওর জন্মানো ঠিক হয়নি, তবু আমার পক্ষে আর নিষ্ঠুর হওয়া সম্ভব হয়নি। আমার এমনও মনে হয়েছিল, ওকে কোনো এতিমখানায় দিয়ে দেব। কিন্তু যে মায়েরা গির্জার সিঁড়ির ওপরে গোপনে বাচ্চা রেখে চলে যায় তাদের মতো হতে সাহস পাইনি। সম্প্রতি জার্মানির এ রকম এক দম্পতির কথা শুনেছি। তাদের দুজনেরই ত্বক তুষারের মতো সাদা। তাদের কালো ত্বকের একটা বাচ্চা হয়েছে। কেউ কোনো সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। মনে হয় যমজ বাচ্চার কথা শুনেছিলাম : একটা সাদা ত্বকের, আরেকটার ত্বক কালো। অবশ্য ঠিক জানতে পারিনি, খবরটা সত্যি কি না। তবে আমার ক্ষেত্রে জানি, লুলা অ্যানকে পরিচর্যা করা মানে কোনো নিগ্রো শিশুকে পরিচর্যা করা, নিগ্রো শিশুকে আমার বুকের দুধ খাওয়ানো। বাড়ি ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে ওকে বোতলে দুধ খাওয়ানো শুরু করি।

আমার স্বামী লুই ট্রেনে যাত্রীদের ঘুমানোর জায়গার পরিচারক। কাজ থেকে ফিরে এসে আমার দিকে এমনভাবে তাকাল যেন আমি সত্যি পাগল হয়ে গেছি। আর শিশু মেয়েটার দিকে ওর তাকানোর ভাব দেখে মনে হলো, লুই ভাবছে, ও এসেছে বৃহস্পতি গ্রহ থেকে, যা তা নিয়ে বেশি মাথা ঘামানোর মতো মানুষ নয় লুই। লুই যখন ‘ধুস্ শালার! এটা কী নরকের কীট রে!’ বলল, তখনই বুঝে গেলাম, আমাদের মধ্যে ঝামেলার শুরু হলো বলে। সত্যি সত্যি সে রকমই হতে লাগল। আমাদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি চলতে লাগল। আমাদের দাম্পত্য জীবন খান খান হয়ে গেল। আমরা একসঙ্গে তিনটি বছর খুব ভালোই ছিলাম। কিন্তু শিশুটার জন্মের পর থেকে লুই আমাকে দোষ দিতে লাগল। লুলা অ্যানের সঙ্গে তার আচরণ দেখে মনে হলো, সে ওকে চেনেই না। আরো বেশি খারাপ হতে লাগল ওর প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি—ও যেন লুইয়ের শত্রু।

লুই ওকে কোনো দিন ছুঁয়ে পর্যন্ত দেখল না। আমি অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে মজা লুটিনি—সে কথাটা আর লুইকে বোঝানোর চেষ্টা করিনি। কারণ চেষ্টা করে লাভ হতো না। সে জোর মনে নিশ্চিত থাকত, আমি মিথ্যা বলছি। আমাদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের যুক্তিতর্ক চলল বেশ। শেষে আমি লুইকে বললাম, লুলা অ্যানের ত্বকের রং এসেছে তার পরিবারের কোনো পূর্বপুরুষের কাছ থেকে। আমার পরিবারের কারো কাছ থেকে আসেনি। এরপর জটিলতা সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। আমার কথা শুনে আর কোনো রকম প্রতিক্রিয়া না জানিয়ে লুই বের হয়ে যায়। সুতরাং মাথা গোঁজার জন্য আমাকে আরো সস্তা একটা জায়গার খোঁজ করতে হয়। থাকার ঠাঁই খোঁজার ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করি। বাড়ির মালিকদের কাছে আবেদন করার সময় লুলা অ্যানকে সঙ্গে নিইনি। ওর দেখাশোনার জন্য এক কিশোরী কাজিনের কাছে রেখে যেতাম। পরেও অবশ্য ওকে নিয়ে খুব বেশি বাইরে বের হইনি। কারণ দু-একবার যখনই বের হয়েছি, ওর হাত-গাড়ির দিকে উত্সুক লোকজন এগিয়ে এসেছে, উঁকি দিয়ে আদরের কোনো কথা বলবে ভেবেছে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে চমকে গিয়ে কয়েক কদম পিছিয়েছে। তাদের মুখে অবজ্ঞার ভাব ফুটে উঠতে দেখেছি। সেটা আমার জন্য দুঃখের ছিল। যদি আমার গায়ের রং কালো হতো আর ওর গায়ের রং সাদা হতো তাহলে আমাকে বেবিসিটার মনে করাটা স্বাভাবিক ছিল। গায়ের রং কালো হলে, এমনকি ত্বকের ওপরে হলুদ রংটা খানিক বেশি থাকলেও শহরের ভদ্র পাড়ায় বাসা ভাড়া পাওয়া বেশ কঠিন ছিল। নব্বইয়ের দশকে, লুলা অ্যানের জন্মের সময় আইন জারি হয়েছিল—বাসা ভাড়া দেওয়ার সময় বৈষম্য দেখানো যাবে না। কিন্তু খুব কম বাড়িঅলাই সে আইনের পরোয়া করেছে। কৃষ্ণাঙ্গ ভাড়াটিয়াকে বাসা ভাড়া না দেওয়ার নানা অজুহাত বের করেছে তারা। অবশ্য মি. লেইফের বাড়ি ভাড়া পেয়ে নিজেকে সৌভাগ্যের অধিকারী মনে করলাম। তবে বিজ্ঞাপনে যা উল্লেখ করেছিলেন ভাড়া তার চেয়ে সাত ডলার বেশি নিলেন আমার কাছ থেকে। টাকা দেওয়া এক মিনিট দেরি হলে আর কথা ছিল না; তার বাহ্যজ্ঞান লোপ পাওয়ার অবস্থা।

আমাকে ‘মাদার’ কিংবা ‘মামা’ বলার বদলে ‘সুইটনেস’ ডাকতে শিখিয়ে দিলাম লুলা অ্যানকে। সেটাই নিরাপদ মনে হলো আমার। ওর গায়ের রং আর মোটা ঠোঁটে আমাকে মামা ডাকলে লোকজন গুলিয়ে ফেলতে পারে। এ ছাড়া ওর চোখের রংটাও আরেক বিদঘুটে বিষয়—কাকের মতো কালো, কিন্তু তার ওপরে আবার নীলের ছোঁয়া। দেখলে কেউ ডাইনি মনে করতে পারে।

সুতরাং আমাদের অনেক দিন কাটাতে হয়েছে শুধু আমাদের দুজনের পরস্পরের সান্নিধ্যে। আর পরিত্যক্ত স্ত্রী হওয়া কী যে কঠিন অভিজ্ঞতা তা আর মুখে বলা যায় না। আমার মনে হয়, আমাদের এভাবে ফেলে যাওয়ার জন্য লুই অনুতপ্তবোধ করেছে। কারণ কয়েক মাস পরে আমার ঠিকানা খুঁজে বের করে মাসে মাসে টাকা পাঠাতে শুরু করে সে। আমি অবশ্য তার কাছ থেকে কখনো টাকা চাইনি, কিংবা টাকার জন্য আদালতের দ্বারস্থও হইনি। তার পাঠানো মাসে ৫০ ডলার এবং আমার হাসপাতালের রাত্রিকালীন চাকরি থেকে পাওয়া বেতন দিয়ে আমার আর লুলা অ্যানের মোটামুটি চলে যেতে থাকে; আমরা ওয়েলফেয়ারের দান থেকে নিজেদের মুক্ত করতে সক্ষম হই। ওয়েলফেয়ারের সুবিধা নেওয়া যে রকম লজ্জার তাতে আমার মনে হয়, ‘ওয়েলফেয়ার’ কথাটার আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়াই ভালো : আমার মায়ের বালিকা বয়সে এটার নাম ছিল ‘রিলিফ’। যা-ই হোক, এ রিলিফ অনেকটা হাঁপিয়ে যাওয়ার পরে বিশ্রামের নিঃশ্বাসের মতো। এটা স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা হতে পারে না। ওয়েলফেয়ারের ইতর কেরানিগুলোর স্বভাব-চরিত্র মুখ থেকে ফেলে দেওয়া থুথুর মতো। হাসপাতালে চাকরিটা পাওয়ার পর আমি যা উপার্জন করতে শুরু করলাম ওরা কোনো দিন সে পরিমাণও আয় করতে পারেনি। আমার মনে হয়, ওদের দেওয়া চেকের মধ্যেও হীনতার উপস্থিতি ছিল। সে কারণেই ওরা আমাদের ভিক্ষুকের মতো দেখত। বিশেষ করে যখন ওরা লুলা অ্যানের দিকে তাকিয়ে আবার আমার দিকে তাকাত, ওদের চাহনি দেখে মনে হতো, আমি যেন প্রতারণা করছি। হাসপাতালের কাজটা পাওয়ার পর অবস্থার অনেক উন্নতি হলেও আমাকে সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়েছে। লুলা অ্যানকে খুব সতর্কতার সঙ্গে মানুষ করেছি। আমাকে কঠোর হতে হয়েছে, খুব কঠোর। ওকে ভালো করে শিখিয়ে দিয়েছি, অন্যদের সঙ্গে কিভাবে আচরণ করতে হবে, কারো সঙ্গে বিবাদে না জড়ানোর জন্য কিভাবে মাথা নিচু করে থাকতে হবে। লুলা অ্যান ওর নাম কতবার বদল করল না করল তা নিয়ে আমার মাথা ঘামানোর কিছু নেই। কিন্তু ওর গায়ের রঙের বোঝা ওকে সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হবে। তবে এটা আমার কোনো দোষ থেকে হয়নি; আমি দোষী নই, মোটেও না।

 

ব্রাইড

সোফিয়া হাক্সলি আসলেই একটা উদ্ভট-মাথা মহিলা। জেলখানার প্রাক্তন নমনীয় আসামি থেকে দ্রুত হয়ে গেল নরখাদক কুমির। তার ঢিলা জিহ্বা পরিণত হলো তীক্ষ দাঁতে। অলস গতিতে হাঁটা হয়ে গেল হাতুড়ির প্রচণ্ড গতির আঘাত। তার চালচলনে আক্রমণের কোনো লক্ষণই টের পাইনি। চোখ ত্যারচা করে তীক্ষ দৃষ্টিতে তাকায়নি, ঘাড়ের শিরা ফুলিয়ে তোলেনি, কাঁধ ফুলিয়ে দাঁড়ায়নি কিংবা ঠোঁট উল্টিয়ে দাঁত বের করে ফেলেনি। কিছুতেই প্রকাশ পায়নি সে আমাকে আক্রমণ করবে। তার এ রকম আক্রমণের কথা জীবনে কোনো দিন ভুলব না। ভুলতে চাইলেও মন তো ভুলতে দেবে না। মনের ভেতরে লজ্জা ধিকিধিকি জেগে থাকবে। তার চেয়েও স্পষ্ট কথা হলো, আঘাতের দাগগুলো তো মুছবে না।

 যেকোনো ক্ষত সারানোর বিপক্ষে সবচেয়ে খারাপ জিনিস হলো স্মৃতি। সারা দিন শুয়ে আছি; জরুরি কোনো কাজই করার নেই। অফিসের লোকজনকে ব্যাখ্যা করে বলার দায়িত্ব নিয়েছে ব্রুকলিন : অফিসে ব্রুকলিন বলেছে, আমি ব্যর্থ ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছি ইত্যাদি ইত্যাদি। ব্রুকলিন আমার সত্যিকার বন্ধু। অন্যদের মতো নয় ও। অন্যদের আসায় আমার বিরক্তই লাগে। ওরা আসে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে করুণা দেখানোর জন্য। নকল বন্ধু সব। আমি টেলিভিশন দেখতে পারি না; প্রচণ্ড বিরক্তিকর লাগে। বেশির ভাগ অনুষ্ঠানে দেখায় রক্ত, লিপস্টিক আর উপস্থাপক মেয়েদের পাছা। খবর নামে যেগুলো প্রচার করা হয় সেগুলো হয় পরচর্চা, নয়তো মিথ্যার প্যাচাল। অপরাধ নিয়ে তৈরি অনুষ্ঠানগুলোই বা কী করে গুরুত্ব নিয়ে দেখব? মহিলা গোয়েন্দারা লুবুটিন হিল পরে খুনির পেছন পেছন এগোতে থাকে। পড়ার সমস্যার কথা আর কী বলব—ছাপার অক্ষর দেখলেই মাথা ঘোরায়। কোনো কারণে যেন গানও আর আমার ভালো লাগে না। গায়ক-গায়িকারা যারা দেখতে সুন্দর, আর যারা মাঝারি চেহারার, সবার পারফরম্যান্স হতাশা ছাড়া আর কিছু দিতে পারে না। বাজনদাররা তো আরো খারাপ। তা ছাড়া আমার জিহ্বার স্বাদও কী কারণে যেন শেষ হয়ে গেছে। শুধু লেবু ছাড়া আর সব কিছুতে লেবুর স্বাদ পাই; লেবুতে পাই লবণের স্বাদ। ভাইকোডিন খাওয়ার পর অসাড় আরামদায়ক একটা ভাব চলে আসে, এর পর থেকে আর মদের কোনো স্বাদ পাই না। শুধুই অপচয় মনে হয়।

 কুত্তি মহিলা আমার কথা ভালো করে শুনলও না। তাকে যে কয়েদখানার ০০৭১১৪০ নম্বরের কয়েদি বানানো হয়েছে তার পেছনে তো আমিই একমাত্র শিশু ছিলাম, তা নয়। তার বিপক্ষে শিশুদের বলাৎকারের প্রমাণ তো আরো ছিল। কমপক্ষে আরো চারটি শিশু সাক্ষী ছিল। ওরা সবাই কে কী বলেছিল আমি শুনিনি। কিন্তু ওদের সবাইকে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে আদালতের রুম থেকে বের হওয়ার সময় কাঁদতে দেখেছি। সমাজকর্মী আর মনোবিদরা যাঁরা এসেছিলেন, তাঁরা সবাই আমাদের সাহস দিয়েছিলেন। অন্য শিশুদের প্রত্যেককে জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলছিলেন, ভালো থাকবে তুমি। খুব দারুণ কাজ করেছ। আমাকে কেউ জড়িয়ে ধরেননি। তবে আমার দিকে তাকিয়ে হেসেছিলেন। মনে হয়, সোফিয়া হাক্সলির পরিবার-পরিজন কেউ নেই। ও হ্যাঁ, তার তো একজন স্বামী আছে, অন্য আরেক জেলখানায়। এখনো প্যারল হয়নি তার। জেলখানা থেকে বের হওয়ার সময় সোফিয়া হাক্সলিকে স্বাগত জানানোর কেউ ছিল না। কেউ না। তাহলে? চেক-আউট কাউন্টার থেকে কোনো সাহায্য কিংবা পরিচ্ছন্নতার নারী কর্মী হিসেবে যা পাওয়া যেতে পারে তার বাইরে কেন সে সাহায্য নিল না? প্যারলে মুক্তি পাওয়া ধনী যারা তারা নিশ্চয় ওয়েন্ডির ওখানে টয়লেট পরিষ্কারের কাজ নেবে না।

 আদালতে যেদিন আমি সোফিয়ার দিকে হাত উঁচু করে আঙুল তুলেছিলাম, সেদিন আমার বয়স মাত্র আট বছর।

 আইনজীবী মহিলা আমার সঙ্গে কথা বলার সময় তার মুখে সিগারেটের গন্ধ পেয়েছিলাম, মনে আছে। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তুমি যাকে দেখেছ সে মহিলা কি এই রুমে আছে?

 আমি মাথা ঝাঁকালাম।

 তোমাকে কথা বলতে হবে, লুলা। ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ বলো।

 হ্যাঁ।

 সে কোথায় বসে আছে, তুমি আমাদের দেখিয়ে দিতে পারো?

 আইনজীবী মহিলা আমাকে কাগজের কাপে পানি খেতে দিয়েছিলেন। মনে হচ্ছিল, ভয়ে আমি কাপটার ওপরে পড়ে যাচ্ছি।

 তিনি বললেন, তাড়াহুড়োর কিছু নেই। সময় নিয়ে বলো।

 আমি সময় ঠিকই নিলাম। উঁচু না করা পর্যন্ত আমার হাত মুষ্টিবদ্ধ করে রইলাম। আমার তর্জনী সোজা করে ক্যাপ পিস্তলের মতো ছেড়ে দিলাম পৌ। মিসেস হাক্সলি আমার দিকে তাকিয়ে রইল। কী যেন বলার জন্য হাঁ করল। তাকে খুব কাতর মনে হলো; মনে হয়, আমি যা বললাম তার বিশ্বাস হলো না। তখনো আমার আঙুল তার দিকে তোলা। আঙুল তুলে রাখাটা এতটাই দীর্ঘ হলো যে আইনজীবী মহিলা আমার আঙুল নামিয়ে দেওয়ার জন্য আমার হাত ছুঁয়ে ফেললেন। আমার হাত নামানোর জন্য তিনি বললেন, ধন্যবাদ, লুলা। তখন আমি সুইটনেসের দিকে তাকালাম। সুইটনেস হাসছে। তার এমন হাসি আগে কখনো দেখিনি। সারা মুখ দিয়ে হাসছে। তার চোখও হাসছে। সেটাই শেষ নয়। আদালত রুমের বাইরে সব মা আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। এমনকি দুজন আমাকে ছুঁয়ে বুকে টানলেন পর্যন্ত। বাবারা আমাকে বৃদ্ধাঙ্গুল তুলে শাবাশ দিলেন। সবচেয়ে ভালো লাগল সুইটনেসের আচরণ : আদালত ভবন থেকে নেমে আসার সময় আমার হাত ধরল। এ রকম আচরণ আগে কখনো করেনি। বিস্মিত হলাম, খুব খুশি হলাম। কারণ আমি জানতাম, সে আমাকে ছোঁয়া পছন্দ করে না। আমি জোর দিয়েই বলতে পারি, যখন ছোট ছিলাম আমাকে গোসল করানোর সময় তার সারা মুখে প্রচণ্ড বিরক্তির ছাপ পড়ত। একটা কাপড় নিয়ে আমাকে মুছিয়ে দেওয়ার সময় তার মনটা কিছুতেই সায় দিত না। শুধু তার হাতের ছোঁয়া পাওয়ার জন্য কত দিন প্রার্থনা করতাম, সে যেন আমাকে চড় মারে, চপেটাঘাত করে। মাঝেমধ্যে ইচ্ছা করে ভুলত্রুটি করতাম। কিন্তু সে আমার গা ছুঁয়ে মারার মতো কোনো শাস্তি দিত না। যে ত্বক সে ঘৃণা করে সে ত্বক না ছুঁয়েই আমাকে শাস্তি দেওয়ার আরো পথ জানা ছিল তার। রাতে শোয়ার আগে আমাকে খেতে দিত না, আমার রুমে আটকে রাখত। কিন্তু সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল তার চিৎকার-চেঁচামেচি। ভয় যখন প্রাধান্য বিস্তার করে আনুগত্য তখন বেঁচে থাকার একমাত্র পথ। আমি বেশ ভালো আনুগত্য দেখাতে পারতাম। একান্ত অনুগত থাকার আচরণ করেই যেতাম। আদালত রুমে আমার যেহেতু খুব ভয় করছিল মনোবিদ শিক্ষক আমার কাছ থেকে যেমন আচরণ আশা করেছিলেন আমি ঠিক তেমনটাই করেছি।

 ঠিক জানি না। তবে হতে পারে, আমি মিসেস হাক্সলির প্রতি যতটা উন্মাদ ছিলাম তার চেয়ে বেশি ছিলাম আমার নিজের প্রতি। লুলা অ্যান কখনো কারো মার ফিরে দেওয়ার চেষ্টা করত না। আমিও আমার আগের অবস্থা অর্থাৎ লুলা অ্যানের অবস্থায় ফিরে গেলাম। হাক্সলি যখন প্রচণ্ড ক্রোধে আমাকে পিটিয়ে যাচ্ছে, আমি চুপচাপ পড়ে রইলাম। তার মুখ যদি ক্লান্তিতে আপেলের মতো লাল হয়ে না যেত তাহলে আমি ওই মোটেল রুমের মেঝেয় পড়ে থেকে মরে যেতেও পারতাম। আমি একটা শব্দও করিনি। হাত তুলে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টাও করিনি। আমার মুখে চাপড় মারল, আমার পাঁজরে ঘুষি মারল, মুষ্টিবদ্ধ হাত দিয়ে আমার চোয়াল গুঁড়ো গুঁড়ো করে ফেলল, তার মাথা দিয়ে আমার মাথায় প্রচণ্ড জোরে গুঁতো মারল; আমি চুপ করে পড়েই রইলাম। আমাকে টেনেহিঁচড়ে দরজার বাইরে ফেলে দেওয়ার সময় সে হাঁপাচ্ছিল। আমি এখনো অনুভবে বুঝতে পারি তার আঙুলে শক্ত করে ধরা আমার ঘাড়ের পেছনের চুলের গোছা, আমার পিঠে তার পা। কংক্রিটের ওপরে পড়ে যাওয়ার সময় আমার হাড় ভেঙে যাওয়ার শব্দ এখনো আমার কানে বাজে। পড়ে যাওয়ার সময় কনুই আর চোয়ালের ব্যথাটাও মনে আছে। ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টায় আমার বাহু দিয়ে নিজেকে ঠেকানোর সময় আমার হাত পিছলে সরে যায়। সে অনুভূতিও মনে আছে। তারপর আমার জিহ্বা দিয়ে মুখের রক্তের ভেতর দাঁত খুঁজে দেখি। দরজা দড়াম করে বন্ধ হলো, আবার খুলে গেল যাতে সে আমার জুতোটা ছুড়ে ফেলতে পারে। মার খাওয়া কুকুরের বাচ্চার মতো আমি শুধু কনুইয়ে ভর দিয়ে এগিয়ে যাই। হাউমাউ করে কাঁদতেও ভয় পাচ্ছিলাম।

 হয়তো ওর কথাই ঠিক; আমি সে নারী নই। ও চলে যাওয়ার পরে আমি এসব ভাবনা ঝেড়ে ফেলে দিলাম। ভাব দেখাতে লাগলাম যেন ও চলে যাওয়াতে আমার কিছু যায় আসে না।

 একটা অ্যারোসল কেনেস্তারা থেকে সবেগে ফেনা বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ও খুশিতে মুখ টিপে হাসত। শেভ করার বিশেষ সাবান আর ব্রাশ দিয়ে ফেনা তুলে দাড়ি কামাত ও। হাতির দাঁত থেকে তৈরি একটা হাতল থেকে বের হয়ে আসা শুয়োরের লোম দিয়ে তৈরি ছিল ব্রাশটা। মনে হয়, ওর সোজা দাঁতমাজা ব্রাশ, খুর ধার দেওয়ার চামড়াটি এবং রেজরসহ আরো জিনিসপত্রের সঙ্গে ব্রাশটাও ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দিয়েছি। ওর ফেলে যাওয়া জিনিসগুলো বড় বেশি প্রাণবন্ত মনে হচ্ছে। সব কিছু এখনই ছুড়ে ফেলে দিতে হবে। টয়লেটের জিনিসপত্র, কাপড়চোপড়, কাপড় রাখার ব্যাগ, ব্যাগের মধ্যে দুটো বই—একটা বিদেশি ভাষায় লেখা, আরেকটা কবিতার বই—সব রেখে গেছে। আমি সবই ফেলে দিই। পরে ভেতর থেকে খুঁজে খুঁজে শেভ করার ব্রাশ আর হাড়ের তৈরি রেজর তুলে আনি। দুটো জিনিসই ওষুধ রাখার আলমারিতে তুলে রাখি। দরজা বন্ধ করেই আয়নায় আমার মুখের দিকে তাকাই।

 জেরি নিজেকে বলে ‘টোটাল পারসন ডিজাইনার’। সে আমাকে পরামর্শ দিয়ে বলল, তোমার সব সময় সাদা পোশাক পরা উচিত, ব্রাইড। শুধুই সাদা পোশাক। সব সময় সাদা। সিলভিয়া ইনকে আমার দ্বিতীয় ইন্টারভিউয়ের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার সময় জেরির কাছে পরামর্শ চেয়েছিলাম আমি।

 জেরি বলল, শুধু তোমার নামের জন্য নয়, বরং তোমার যষ্টিমধুর মতো ত্বকের জন্য সাদা পোশাক কতটা ইতিবাচক হতে পারে সে কথাটাই তোমার মাথায় রাখা উচিত। আর কালো রং হলো নতুন কালো। বুঝতে পারছ কী বলতে চাইছি? দাঁড়াও, আরেকটু পরিষ্কার করে বলি : যষ্টিমধুর চেয়ে বরং হার্সের সিরাপের সঙ্গেই তোমার ত্বকের মিল বেশি। লোকে তোমাকে প্রতিবার দেখবে আর ঘোলানো মাখন ও চকোলেট সুফ্লের কথা ভাববে।

 তার কথা শুনে আমার হাসি পায়, আমি বলি, কিংবা ওরিয়সের কথা?

 না, তা কখনো না। তবে কখনো কখনো চমৎকার চিনির মিঠাই, হাত ডুবানো চিনির মিঠাইয়ের কথা বলতে পারো।

 প্রথম দিকে শুধু সাদা কাপড়ের পোশাক কেনা বিরক্তিকর মনে হলো। পরে জানলাম সাদারও আবার কত রকমফের : আইভরি, ঝিনুক-রঙা সাদা, পাথরের মতো সাদা, কাগজের মতো সাদা, তুষারের মতো, দুধের সরের মতো, শ্যাম্পেনের মতো, ভৌতিক, হাড়ের মতো, ধূসর হলুদাভ সাদা ইত্যাদি। আনুষঙ্গিক জিনিসের রং বাছাই করা শুরু করার পর কেনাকাটার কাজও আনন্দের হয়ে উঠতে লাগল।

 জেরি আমাকে উপদেশ দিয়ে বলল, ব্রাইড বেইবি, শোনো। তোমার কাছে যদি তোমার রঙের দরকার হয়েই থাকে তবে জুতো ও পার্সে কম ব্যবহার করবে। আর সাদা রং যদি কাজে না-ই লাগে তাহলে ওই দুটো জিনিসে আমি বরং কালো রংই ব্যবহার করব। আর শোনো, ভুলেও মেকআপ ব্যবহার করবে না। লিপস্টিক কিংবা আইলাইনারও না। কোনোটাই না।

আমি তাকে অলংকারের কথাও জিজ্ঞেস করলাম, সোনা? হীরের কোনো গহনা? পান্নার কোনো পিন?

হাত ওপরের দিকে তুলে জেরি বলল, না, না। মোটেও কোনো গহনা পরা যাবে না। মুক্তোর ফোঁটাঅলা কানের দুল পরা যেতে পারে বড়জোর। না, সেটাও ঠিক হবে না। শুধু ইউ, গার্ল। সাদার ওপরে পুরোটা লোমশ স্যাবলের মতো কিংবা তুষারের ওপরে চিতার মতো দেখাবে। সাদা পোশাকের সঙ্গে তোমার কালো ত্বকের শরীরও তো কম আবেদন তৈরি করবে না। তারপর তোমার নেকড়ের মতো চোখের কথা ভাব! প্লিজ!

 আমি তার পরামর্শমতোই কাজ করলাম এবং হাতে হাতে ফল পেলাম। যেখানে গিয়েছি সেখানেই আগের চেয়ে দ্বিগুণ মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছি। ছোট বয়সে আমার চেহারার প্রতি মানুষের দৃষ্টি থেকে যে অবজ্ঞা আর ঘৃণার প্রকাশ বের হতে দেখেছি তেমন নয় মোটেও। তাদের চোখে দেখছি প্রশংসার দৃষ্টি; বিস্মিত তবে ক্ষুধার্তও। তা ছাড়া জেরি আমার নামই দিয়েছে ইউ, গার্ল। সে জন্যও সব কৃতিত্ব তার।

আয়নার ভেতর আমার মুখটা প্রায় একেবারেই নতুন দেখাচ্ছে। আমার ঠোঁট দুটো প্রায় আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে। আমার নাক-চোখও একই অবস্থায় চলে এসেছে। শুধু আমার পাঁজরের এলাকাটা এখনো অশক্তই আছে। বিস্ময়ের কথা হলো, আমার মুখের ছিলে যাওয়া ত্বক সবচেয়ে দ্রুত ভালো হয়ে গেছে। আবারও প্রায় সুন্দর হয়ে উঠেছি আমি। তাহলে মন খারাপ কেন আর?

আবেগের বশে ওষুধের আলমারিটা খুলে ওর শেভিং ব্রাশটা বের করি। ব্রাশের মাথায় আঙুল চালিয়ে অনুভব করি, রেশমি পশমগুলো সুড়সুড়ি জাগায় আবার আরামও লাগে। আমার থুতনির কাছে নিয়ে আসি ব্রাশটা। ও যেভাবে ঘষে সেভাবে ঘষতে থাকি, আমার চোয়ালের নিচের দিকেও ঘষতে থাকি, তারপর আমার কানের লতি পর্যন্ত। কী কারণে যেন নিজেকে খুব পলকা মনে হয় আমার। সাবান। আমার ফেনা দরকার। একটা প্যাকেট ছিঁড়ে বডি ফোমের একটা টিউব বের করি, এটা ‘তার প্রিয় ত্বকের জন্য’। এরপর সাবানের ডিশে টিউবটা ঘষে ব্রাশ ভিজিয়ে নিই। আমার সারা মুখে ফেনা ছড়িয়ে পড়ার সময় উত্তেজনায় দম বন্ধ করে ফেলি। আমার কপোলে, আমার নাকের নিচে ফেনা ছড়াতে থাকি। আমি জানি, কাজটা পাগলের মতো হচ্ছে। তবু আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। আমার চোখ আগের চেয়ে বড় বড় মনে হয়, তারার মতো ফুটে আছে। আমার নাক শুধু সেরে গেছে তা-ই নয়, বরং দারুণ অবস্থায় চলে এসেছে। সাদা ফেনার মাঝখানে আমার ঠোঁট খুব আবেদনময়ী মনে হচ্ছে, চুমু পাওয়ার জন্য উদগ্রীব যেন। আমার কনিষ্ঠ আঙুলের ডগা দিয়ে ঠোঁট ছুঁয়ে দিই। থামতে ইচ্ছা হয় না আমার; তবু থামতেই হবে। রেজরটা চেপে ধরি। কিভাবে ও রেজর ধরত? কোন আঙুল কিভাবে কোথায় রাখত আমার মনে নেই। বারবার চেষ্টা করতে হবে। ইতিমধ্যে সাদা ফেনার ঘূর্ণন পোঁচে আবছা প্রান্তরেখা আর বাঁকা কালো কালো চকোলেট লেনগুলো টেনে দিই। মুখে পানির ছিটা দিয়ে এবার মুছে ফেলি। পরের সন্তোষজনক অনুভূতিটা দারুণ মনে হয়।

 বাসা থেকে এভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়া যতটা খারাপ হবে ভেবেছিলাম ততটা হয়নি। এখনো আমার কর্তৃত্বই আছে। অবশ্য ব্রুকলিন কাজের ক্ষেত্রে আমাকেই দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি মনে করছে এবং আমার কোনো কোনো সিদ্ধান্তের ওপর দিয়ে কাজ করছে। আমি কিছু মনে করছি না। আমি বরং নিজেকে ভাগ্যবতীই মনে করছি; ওর পেছনে আমার সমর্থন আছে। তা ছাড়া আমাকে যখন হতাশা আক্রমণ করে, জানি তখন একটা নিদান আছে শেভিং সরঞ্জামের ছোট ব্যাগের মধ্যে। মুখের ওপর ফেনাতোলা উষ্ণ পানি ছড়িয়ে দিয়ে ব্রাশ আর রেজরের জন্য আর দেরি করতেই পারি না। এসবের সম্মিলনে আমার ভেতরে যে অনুভূতি তৈরি হয় সেটাকে উত্তেজনা ও প্রশমন উভয়ই বলা যায়। যখন আমাকে নিয়ে মজা করা হতো, আমাকে আঘাত করা হতো—সেসব সময়ের কথা কল্পনায় চলে আসে। তবে দুঃখের অনুভূতি থাকে না।

প্রতিবেশীরা আর তাদের মেয়েরা একমত, এত কালো হলেও সব মিলিয়ে সে বেশ সুন্দর। সুইটনেস কখনো প্যারেন্টস মিটিং কিংবা ভলিবল খেলার আসরে আসেনি। কলেজের খেলাধুলার দিকে মনোযোগ দেওয়ার চেয়ে আমাকে ব্যবসায় শাখার কোর্স নিতে উৎসাহিত করা হয়েছিল। চার বছর মেয়াদি কোর্স করতে কোনো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে যেতে দেওয়া হয়নি; আমাকে যেতে হয়েছে কমিউনিটি কলেজে। ইচ্ছা থাকলেও আমি ওগুলোর কোনোটাই করতে পারিনি। চাকরির ইন্টারভিউ দিয়ে কতবার যে ব্যর্থ হয়েছি মনে নেই। শেষে কাজ একটা পেয়েছি; তবে স্টক শাখায় কাজ করতে দেওয়া হয় আমাকে, বিক্রির কোনো কাজে আমাকে সুুযোগ দেওয়া হয়নি। কারণ সে কাজে কাস্টমারদের সামনে যেতে হয়; তাঁরা আমাকে দেখে নিরাশ হতে পারেন। ইচ্ছা ছিল কসমেটিকস কাউন্টারে কাজ করব। কিন্তু বলার সাহস পাইনি। জড়বুদ্ধি শ্বেতাঙ্গ মেয়েদের কেউ কেউ পদোন্নতি পেয়ে গেলে এবং কয়েকজন স্টকের কাজে থিতু হলে আমাকে ক্রয় শাখায় কাজ দেওয়া হয়। এমনকি সিলভিয়া ইনকের ইন্টারভিউটাও শুরুতে ভালো ছিল না। ইন্টারভিউ বোর্ডের প্রশ্নকর্তারা আমার স্টাইল, আমার পোশাক ইত্যাদি সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন। তাঁরা আমাকে পরে আসতে বলেছিলেন। তখনই আমি পরামর্শের জন্য জেরির দ্বারস্থ হই। হেঁটে হলরুম পার হয়ে ইন্টারভিউয়ের কর্তাদের রুমের দিকে যাওয়ার সময়ই বুঝতে পারি, ফল পাওয়া যাচ্ছে। প্রশংসায় চোখ বড় বড় করে, দাঁত বের করা হাসি ছড়িয়ে কেউ কেউ ফিসফিস করে বলে ওঠে, ও-ও, ওহ বেইবি! শিগগিরই আমি রিজিওনাল ম্যানেজারের পদে উন্নীত হই। তখন জেরি বলে, দেখেছ? কালো রংও কিন্তু বিকোয়, কালোরও কদর আছে। সভ্য জগতে কালোই হলো সবচেয়ে আকর্ষণীয় পণ্য। শ্বেতাঙ্গ মেয়েরা এমনকি বাদামি মেয়েরাও যদি তোমার সমান মনোযোগ আকর্ষণ করতে চায়, তাহলে তাদের কাপড় খুলে ন্যাংটো হতে হবে।

 সত্যি হোক আর না-ই হোক, জেরির পরামর্শই আমার জীবন তৈরি করে দেয়, পুনরায় আমাকে প্রস্তুত করে দেয়। আমার চলা আগের চেয়ে অন্য রকম হয়ে যায়; খুব সদর্পে পা ফেলছি তেমন নয়, জানপ্রাণ বের করে ফেলা গতিতে চলছি তাও নয়। তবে আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপে, ধীরে হলেও পূর্ণ মনোযোগে চলছি। পুরুষরা লাফিয়ে ওঠে। আমিও ধরা দিতেই পছন্দ করি। এ রকমই চলতে থাকে কিছুদিন। তারপর দেখতে পাই আমার যৌনজীবন ডায়েট কোকের মতো হয়ে গেছে—প্রবঞ্চনামূলকভাবে মিষ্টি তবে পুষ্টিহীন। আরো স্পষ্ট তুলনা করে বলা যায় প্লেস্টেশন গেমের মতো হয়েছে, ভার্চুয়াল ভায়োলেন্সের সেফ গ্লি বজায় রেখে চলছি, আবার বেশ সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য খেলছি। আমার সব ছেলেবন্ধু একই ছাঁচে তৈরি : হবু অভিনেতা, র‌্যাপার, পেশাজীবী অ্যাথলেট। তবে সবারই অপেক্ষা আমার ঊরুসন্ধির জন্য, আমার চেকের জন্য। চেকটা যেন তাদের জন্য একটা ভাতা আর কী। আর যারা নিজেরা চেক কামাই করা শুরু করেছে তারা আমাকে একটা মেডেলের মতো ব্যবহার করত, আমি তাদের পৌরুষ জাহির করার ক্ষেত্রে একটা চকচকে এবং নীরব প্রমাণ। তবে আমার চিন্তাচেতনার জন্য তাদের কেউই সহায়ক হতে পারেনি। এদিকটায় তাদের কোনো আগ্রহই দেখিনি। আমি কী ভাবছি না ভাবছি সেদিকে না তাকিয়ে শুধু দেখত আমাকে কেমন দেখায়। আমার বিশ্বাস অবিশ্বাসের বিষয়গুলো তাদের কাছে অতি সিরিয়াস মনে হতো বলেই সেসব নিয়ে তারা পারতপক্ষে কৌতুক কিংবা পুতুপুতু আলাপ চালানোর মাধ্যমে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করত। শেষমেশ অন্যখানে তাদের অহংয়ের আশ্রয় খুঁজে নিত। এদের একজনের কথা মনে আছে; সে মেডিক্যালের ছাত্র ছিল। সে আমাকে বলেকয়ে রাজি করিয়েছিল তার মা-বাবার সঙ্গে দেখা করতে, তাদের উত্তরাঞ্চলের বাড়িতে যেতে। তাঁদের সঙ্গে আমার আলাপ-পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি বুঝে যাই, তার পরিবারের সবাইকে আমি ভয় দেখাতে গেছি; সুন্দর বয়স্ক শ্বেতাঙ্গ দম্পতির সামনে আমি একটা আস্ত হুমকি।

 সে বারবার জোর করে বলতে লাগল, ও খুব সুন্দর না? ওর দিকে ভালো করে তাকিয়ে দ্যাখো, মা! বাবা দ্যাখো! ছেলেটার চোখে আসলে ঈর্ষার আগুন দেখতে পেলাম আমি।

 তার মা-বাবা তার প্রতি মেকি স্নেহের প্রকাশ দেখিয়ে বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেন, সে আমার চেয়ে উঁচু শ্রেণির প্রতিনিধি। তার হতাশা ছিল অবশ্যম্ভাবী; তার ক্ষোভ হালকাভাবে দমিত। তার মা-বাবা গাড়িতে করে আমাকে ট্রেনস্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে দিলেন যাতে আমাকে আর তার ব্যর্থ বর্ণবাদী কৌতুক সহ্য করতে না হয়। এমনকি আমার ব্যবহার করা চায়ের কাপটা তার মা কী করেছিলেন জানার পরও আমি স্বস্তিই পেয়েছিলাম।

 এ রকমই ছিল পুরুষদের এলাকা।

 তারপর অভিজ্ঞতা হলো বুকারের সঙ্গে। বুকার স্টারবার্ন।

 এখন আর ওর কথা ভাবতে ইচ্ছা করে না। এখন সব কিছু কেমন শূন্য, কেমন তুচ্ছ, অর্থহীন মনে হয়। ও যে দেখতে কতটা নিখুঁত সুদর্শন সেটা আর মনে করতে চাই না। শুধু কাঁধের ওপরে কুিসত ওই পোড়া দাগটা ছাড়া আর কোনো খুঁত নেই ওর শরীরে। আমি ওর  সোনালি ত্বকের প্রতি ইঞ্চি আদরের ছোঁয়া দিয়ে নাড়া দিয়েছি, ওর কানের লতিতে জিহ্বা দিয়ে আদর করেছি; ওর বগলের লোমের গুণাগুণ সম্পর্কেও আমি ওয়াকিবহাল। ওর ওপরের ঠোঁটের টোলপড়া জায়গাটা কতবার ছুঁয়েছি। আমি ওর নাভিতে লাল মদ ঢেলে দিয়ে ছলকে পড়া সবটুকু পান করেছি। আমার শরীরের এমন একটু জায়গাও নেই যেখানে ওর ঠোঁট বজ্রবিদ্যুৎ তোলেনি। হা ঈশ্বর, আমাকে যে করেই হোক আমাদের মিলনের মুহূর্তগুলো রোমন্থন করা থেকে বিরত থাকতে হবে! আমি ভুলে যেতে চাই, প্রতিবারই কেমন নতুন মনে হতো, সতেজ মনে হতো, আবার অশেষও মনে হতো। আমি সুরের ওঠানামার তারতম্য সম্পর্কে কিছুটা বধির; কিন্তু ওর সঙ্গে রতিক্রিয়ার সময় আমার ভেতর থেকে গান চলে আসত। এরপর ঠিক এই মুহূর্তে ওর সেই কথাটা কোথা থেকে যেন কানে ভেসে আসছে, তুমি সে নারী নও...। সঙ্গে সঙ্গে ওর স্মৃতি ভূতের মতো কোথায় যেন বিলীন হয়ে গেল।

 পুরোপুরি বাতিল হয়ে গেল।

 একেবারে মুছে গেল।

 এমনকি সবার মধ্যে সোফিয়া হাক্সলিও আমাকে মুছে ফেলল। একজন আসামি। আসামি মাত্র। সে বলতে পারত, ধন্যবাদ, লাগবে না। কিংবা বলতে পারত, বের হও। না। তেমন কিছু বলল না। সে সরাসরি উন্মাদের মতো আঘাত করতে লাগল। কী জানি, মারামারিই হয়তো জেলখানার আলাপ। মুখের কথার চেয়ে মনে হয় হাড্ডি ভেঙে দেওয়া কিংবা রক্ত ঝরানো বেশি আন্তরিক আলাপ। ময়লা-আবর্জনার মতো নিক্ষিপ্ত হওয়া, নাকি কৃতদাসের মতো চাবুক খাওয়া, কোনটা যে শ্রেয় আমি জানি না।

 বুকার যেদিন চলে গেল তার আগের দিন আমরা দুজন একসঙ্গে আমার অফিসে দুপুরের খাবার খেয়েছিলাম। স্মার্টওয়াটার ছিল; ব্র্যান্ডির ভেতর পিচফলের টুকরো ছেড়ে দেওয়া ছিল। আহ, আর পারছি না। এখন থামা দরকার। ওর কথা আর ভাবতে পারছি না। এই রুমগুলোর ভেতর পায়চারি করতে করতে আমি বাইরে বেরিয়ে পড়ার জন্য মুখিয়ে উঠেছি। এত আলো, এত বেশি ফাঁকা জায়গা, এতটা একাকী আমি! কাপড়চোপড় পরে এখান থেকে আমার বের হয়ে পড়া উচিত। ব্রুকলিন যেমন যেমন করার জন্য আমার কাছে ঘ্যানঘ্যান করছে তেমনটিই করা উচিত আমার : সানগ্লাস আর ফ্লপি হ্যাটের কথা ভুলে যেতে হবে, নিজেকে আসল চেহারায় বের করতে হবে, জীবনকে জীবনের মতো যাপন করতে হবে। ব্রুকলিনেরও জানা উচিত, সিলভিয়া ইনককে ওর নিজের করে ফেলছে।

 আমি সতর্কতার সঙ্গে পোশাক বাছাই করি : ধূসর সাদা শর্টস, হল্টার, গোঁজ মেরে শক্ত আর উঁচু করা স্যান্ডেল, বাদামি রঙের মোটা কাপড়ের টোট ব্যাগ। ব্যাগটার মধ্যে শেভিং ব্রাশটা। কে জানে, দরকার হতেও তো পারে। একটা এলি ম্যাগাজিন আর সানগ্লাসও। এই দুই ব্লক পরেই একটা পার্ক, ওখানে যাচ্ছি। ব্রুকলিন কিছু বলবে না। দিনের এই সময়টায় বয়স্ক মানুষ আর কুকুর হাঁটানোর লোকেরা পার্কটায় আসে। আরো কিছুক্ষণ পরে আসবে জগিং করার লোকেরা, স্কেটিং করার লোকেরা। শনিবারের এই বেলায় মায়েরা কিংবা বাচ্চারা আসবে না। ওদের উইকএন্ডগুলো কাটাতে হয় প্লেডেট, প্লেরুম, প্লেগ্রাউন্ড, প্লেরেস্টুরেন্ট করে করে, সঙ্গে থাকে সুস্বাদু উচ্চারণের বুয়ারা।

 একটা কৃত্রিম পুকুরের কাছে একটা বেঞ্চ বেছে নিই আমি। পুকুরটাতে সত্যিকারের পাতিহাঁসেরা সাঁতার কাটছে। বুনো পুরুষ পাতিহাঁস আর বাড়ির হাঁস-মুরগির মধ্যে পার্থক্য সম্পর্কে ওর মুখে বর্ণনা শুনেছিলাম একবার। ওই রকম একটা স্মৃতির পথ আটকে দিই আমি। আমার পেশিতে ওর আঙুলের মালিশ করার ছোঁয়া টের পাই। এলি ম্যাগাজিনের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে ছোট হাঁসের ছবি দেখতে চেষ্টা করি, কোনগুলো খাওয়ার মতো বয়সী হয়েছে। ঠিক সে মুহূর্তে সুরকির ওপরে ধীর পদক্ষেপের শব্দ শুনতে পাই। আমি মুখ তুলে তাকাই। সাদা চুলের এক দম্পতি। একজন আরেকজনের হাত ধরে নীরবে ধীরে ধীরে হাঁটছে। তাদের দুজনেরই পেটের মেদ প্রায় সমান। অবশ্য পুরুষটার মেদ একটু নিচের দিকে। রংহীন স্ন্যাকস আর ঢিলা টি-শার্ট পরেছে তারা। শার্টের গায়ে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া চিহ্ন। কুকুর হাঁটাতে আসা অল্প বয়সীরা কারণ ছাড়াই মুখ টিপে হাসছে আর কুকুরের দড়ি ধরে টান দিচ্ছে। কারণ একটাই হতে পারে, তারা মনে হয় বয়স্ক মানুষদের এত আন্তরিকতায় একসঙ্গে দীর্ঘ জীবন পার করার সাফল্যে ঈর্ষান্বিত। বয়স্ক দম্পতি খুব ধীরে ধীরে সতর্কতার সঙ্গে হাঁটে, যেন স্বপ্নের ভেতর হাঁটছে তারা। দুজনের পা এক তালে এগোচ্ছে। স্পেসশিপে যাদের স্বাগত জানানো হয় তাদের মতো একই রকম দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে এগোচ্ছে, তাদের সামনে যেন একটা দরজা খুলে যাবে, একটা লাল গালিচা ছড়িয়ে পড়বে। হাত ধরাধরি করে মাঙ্গলিক উপস্থিতির ভেতর ঢুকে যাবে তারা। চোখে জল আনার মতো সুন্দর সংগীত শুনবে।

 সত্যিই তাই মনে হয়। হাত ধরাধরি করে হাঁটা নীরব দম্পতিকে আমি থামাতে পারি না। আমি ভিড়ে ঠাসা স্টেডিয়ামে চলে এসেছি। বুনো যৌনাবেদনময়ী সংগীতের কাছে দর্শকদের চিৎকার কিছুই না। দুই পাশের মানুষের মাঝখানের ফাঁকা জায়গায়ও ভিড়ের লোকেরা নাচছে। দর্শকরা তাদের বসার বেঞ্চের ওপরে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছে। আমার হাতও শূন্যে উঠে গেছে। আমিও সংগীতের তালে তালে হাত নাড়াচ্ছি। আমার পাছা আর মাথা যেন একাই দোল খাচ্ছে। তারপর তার হাত আমার পেট পেঁচিয়ে ধরে। আমিও আমার হাত নামিয়ে এনে তার হাতের ওপরে চাপ রাখি, আঁকড়ে ধরি। আমরা পেছন-সামন নাচতে থাকি। সংগীত থেমে যেতেই আমি ফিরে তাকাই। সে আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে। আমি কেমন আর্দ্র হয়ে উঠেছি। কেমন কাঁপন কাঁপন লাগছে।

পার্ক থেকে চলে আসার আগে আমি শেভিং ব্রাশটার লোমের ওপরে আঙুল বোলাই। কী রকম নরম আর উষ্ণ!

 

সুইটনেস

ওহ, হ্যাঁ, লুলা অ্যান খুব ছোট থাকা অবস্থায় ওর সঙ্গে যে রকম আচরণ করেছি আমি, তার জন্য খুব অনুতাপ হয় আমার। কিন্তু তোমাদের বুঝতে হবে : ওকে রক্ষা করার দরকার ছিল তো আমারই। জগৎ সংসার কেমন তা তো ওর জানা ছিল না। ও রকম ত্বকের কারণে কেতাদুরস্ত হওয়া, কিংবা সঠিক পথে থেকেও অন্যের অন্যায় আচরণের বিপক্ষে কঠিন হওয়ার চেষ্টা করার তো কোনো মানে হয় না। সঠিক কথাটি মুখের ওপর বলতে গেলেই কিশোর অপরাধের নাম করে জেলখানায় ঢুকিয়ে দেবে। এ জগতে চাকরি দেওয়ার ক্ষেত্রে কৃষ্ণাঙ্গকে সবার শেষে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু চাকরি থেকে ছাঁটাই করার সময় তাকেই প্রথমে ছাঁটাই করা হয়। জন্মের পর ও তো এসবের কিছু জানত না। জানত না ওর কালো ত্বক শ্বেতাঙ্গদের কী রকম ভয় পাইয়ে দিতে পারে, কিংবা ওকে নিয়ে তারা কিভাবে হাসাহাসি করবে, তামাশা করবে। একবার একটা মেয়েকে দেখেছিলাম। লুলা অ্যানের মতো এতটা কালো নয়। বয়স দশ বছরের ওপরে হবে না মোটেই। একদল শ্বেতাঙ্গ ছেলে ল্যাং মেরে ওকে বারবার ফেলে দিচ্ছে। উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই দলের আরেক ছেলে ওর পিঠের ওপরে লাথি দিয়ে আবার ফেলে দিচ্ছে। মজা দেখে হাসতে হাসতে ছেলেগুলোর পেটে খিল ধরে যাওয়ার উপক্রম। অনেক কষ্টে মেয়েটা উঠে চলে গেল। তবু ওদের হাসি আর যেন থামে না। নিজেদের নিয়ে ওদের গর্বের শেষ নেই মনে হলো। বাসের জানালা দিয়ে দেখেছিলাম তাদের উল্লাস। নইলে আমি মেয়েটাকে সহায়তা করতে পারতাম, তাকে শ্বেতাবর্জনার স্তূপ থেকে উদ্ধার করতাম। এবার বুঝতে পারছ, লুলা অ্যানকে আমি না শেখালে ও সব সময় রাস্তা পার হতে পারত না, শ্বেতাঙ্গ ছেলেদের থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারত না। ওকে এত সব শেখানোর ফল পাওয়া গেছে। শেষ পর্যন্ত ওর জন্য আমি খুব গর্বিত। ওই কেসটা ছিল তিনজন বিকৃত রুচির শিক্ষকের বিরুদ্ধে। তাদের তিনজনের দলে ছিল একজন পুরুষ আর দুজন নারী। আর ওই মহিলার কারণে তাদের গোপন অনাচারের বিষয়টা রাখঢাক ভেঙে একেবারে জনসমক্ষে চলে আসে। ব্রাইড তখন খুব ছোট ছিল। কিন্তু সাক্ষ্য দিতে দাঁড়িয়ে বড়দের মতো কাজ করেছে : খুব ধীরস্থির, শান্ত আর আত্মবিশ্বাসী। এমনিতে ওর চুল বাঁধাটা ছিল বিরাট ঝক্কির কাজ। ওকে আদালতে যেতে হবে বলে নিচের দিকে টেনে বেণি করে দিয়েছিলাম। ওকে একটা নীল-সাদা নেইলার ড্রেস কিনে দিয়েছিলাম। আমার ভয় হচ্ছিল, কাঠগড়ায় উঠতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে যায় কি না। কথা বলতে গিয়ে তোতলাতে থাকে কিংবা মনোবিদ যা বলে দিয়েছেন ভুলে যেতে পারে। শেষে আমাকে লজ্জায় ফেলতে পারে। কিন্তু না। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। সে আপাতত একজনকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে পেরেছে। বিকৃত রুচির ওরা কয়েকজন যা করেছে শুনলে যে কেউ বমি করে ফেলবে। কী করে ছোট বাচ্চাদের সঙ্গে এমন নোংরা কাজ করতে পারল! খবরের কাগজে, টেলিভিশনে ওদের কুকীর্তির কথা প্রকাশ করা হয়েছিল। বিচার চলাকালে কয়েক সপ্তাহ লোকজন আদালতের বাইরে ওদের নামে চিৎকার করে ঘৃণা প্রকাশ করেছে। স্কুলে যাদের ছেলেমেয়ে আছে তারা ছিল, যাদের নেই তারাও ওদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশে শামিল হয়েছিল। কেউ কেউ বাড়ি থেকে প্ল্যাকার্ড লিখে এনেছিল : উন্মাদদের হত্যা করো। শয়তানদের ক্ষমা নেই।

শুনানির প্রায় প্রতিদিনই আমি আদালতে হাজির থেকেছি। সব দিন না হলেও বিশেষ করে লুলা অ্যানের হাজির থাকার কথা যেসব দিনে সেসব দিনে থেকেছি। কারণ অনেক সাক্ষীকে আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। কেউ কেউ পরে আর আদৌ আসেইনি। তারা কেউ কেউ অসুস্থ হয়েছে। কেউ কেউ সিদ্ধান্ত বদল করে ফেলেছে। অন্য বাচ্চারা কেউ কেউ ভয়ে হাত-পা ছোড়াছুড়ি করেছে, কান্নাকাটি করেছে। কিন্তু লুলা অ্যান তেমন কিছু করেনি, চিন্তিত মনে হলেও শান্ত থেকেছে। আদালতে লুলা অ্যানের ভূমিকা দেখে ওর জন্য গর্ববোধ করেছি। আমরা হাত ধরাধরি করে একসঙ্গে রাস্তায় নেমেছি। কোনো কৃষ্ণাঙ্গ ছোট মেয়ে কোনো শয়তান শ্বেতাঙ্গকে কুপোকাত করে ফেলেছে এমনটা খুব একটা দেখা যায় না। আমি চেয়েছিলাম, আমি কত খুশি হয়েছি লুলা জানুক। এ জন্য ওর কান ফুটো করে একজোড়া দুল কিনে দিলাম। সোনার তৈরি ছোট চক্রবলয়। এমনকি বাড়ির মালিকও আমাদের দেখে হেসেছিলেন সেদিন। বাচ্চাদের ব্যক্তিগত স্বার্থরক্ষা আইনের কারণে খবরের কাগজে ছবি ছাপা হয়নি। তবে খবরটা মুখে মুখে ছড়িয়েছিল। ওষুধের দোকানদার অন্য সময়ে লুলাকে আর আমাকে একসঙ্গে দেখলে মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিত। কিন্তু ওর সাহসের কথা শোনার পর সেদিন ওকে একটা ক্লার্ক বার খেতে দিয়েছিল।

তোমাদের জানা দরকার, মা হিসেবে আমি খারাপ ছিলাম না। তবে ভালো করতে গিয়ে আমার একমাত্র মেয়েকে দুঃখ দেওয়ার মতো কোনো কাজ করে ফেলতেও পারি। কারণ ওকে রক্ষা করার দরকার ছিল আমার। অবশ্যই। দরকার ছিল শুধু আমার ত্বকের সুবিধার কারণে। প্রথমত শুধু ওর পরিচয়ের জন্য সাধারণভাবে ওকে ভালোবাসতে পারিনি, ওর কৃষ্ণাঙ্গ পরিচয়কে এড়িয়ে সেটা সম্ভব ছিল না। তবে এখন আমি পারি। সত্যিই পারি। আমার মনে হয়, সেটা ও বুঝতে পারে। আমার তো সে রকমই মনে হয়।

গত দুবার ওর সঙ্গে দেখা হওয়ার সময় ওকে আমার কাছে নজরে পড়ার মতোই মনে হয়েছে। বেশ সাহসী, আত্মবিশ্বাসী। প্রতিবার ও যখন আমাকে দেখতে এসেছে আমি ভুলেই গিয়েছি আগে ও কতটা কালো ছিল। কারণ নিজের সৌন্দর্যকে ও ফুটিয়ে তুলেছে সুন্দর সাদা পোশাকে।

 ওর কাছ থেকে একটা শিক্ষা পেয়েছি, সেটা আগেই পাওয়া উচিত ছিল : বাচ্চাদের সঙ্গে বড়রা যে আচরণ করে থাকে তার গুরুত্ব অনেক। বড় হতে হতে ওরা কখনোই ভোলে না সেসব। ওর সক্ষমতা আসার সঙ্গে সঙ্গে লুলা অ্যান আমাকে সেই অসহনীয় অ্যাপার্টমেন্টে রেখে চলে যায়। আমার থেকে যতটা সম্ভব দূরে চলে যায় ও। নিজেকে ভালো পোশাকে সজ্জিত করে, ক্যালিফোর্নিয়ায় ব্যস্ততার বড় চাকরি শুরু করে। তারপর ফোন করে না, কিংবা আর দেখা করতে আসে না। মাঝেমধ্যেই টাকা-পয়সা, এটা-ওটা পাঠায়। কিন্তু কত দিন যে ওকে দেখি না! শেষ কবে দেখেছি মনে করতে পারি না।

 

ব্রাইড

ব্রুকলিনই রেস্টুরেন্টটা খুঁজে বের করে। নাম পাইরেট। সেমিচিকের মতো, একসময় খুব আঁটো, আকর্ষণীয় ছিল এখন ঝুলে পড়ার মতো হয়েছে, যাদের মধ্যে উত্তেজনার কিছু নেই এমন মানুষজন আর পর্যটকরা আসে। আমি পরেছি একটা হাতাকাটা শিফ্ট। আজকের সন্ধ্যাটা এ রকম পোশাকের জন্য বেশি ঠাণ্ডা। তবে আমার অগ্রগতি আর প্রায় চোখে পড়ে না এমন দাগঅলা মুখের উন্নতি দেখিয়ে ব্রুকলিনকে মুগ্ধ করে দিতে চাই। ওর ভাষায় আমি ধর্ষণ-পরবর্তী হতাশায় ভুগছি। ও আমাকে সেই ধ্রুপদী হতাশা থেকে টেনে বের করে নিয়ে আসছে। আমার হতাশার প্রতিষেধক হিসেবে যে জায়গাটায় নিয়ে এসেছে ব্রুকলিন সেটা একটা অতি কারসাজির নকশা করা পানশালা। এখানে লাল সাসপেন্ডার পরিহিত পুরুষ ওয়েটাররা খোলা বুক দেখিয়ে আমার হতাশার সমাধান করে দেবে। ব্রুকলিন খুব ভালো বন্ধু। ও বলে, কোনো রকম চাপ নেওয়ার কিছু নেই। প্রায় ফাঁকা একটা রেস্টুরেন্টে নিরিবিলি ডিনার হবে; সামনে থাকবে দেখতে সুন্দর তবে নির্দোষ গরুর মাংস। এই জায়গাটা ব্রুকলিন কেন পছন্দ করে আমি জানি : পুরুষদের সামনে ও নিজেকে জাহির করতে পছন্দ করে। অনেক আগে, আমার সঙ্গে ওর দেখা হওয়ারও আগে, ব্রুকলিন নাকি ওর সোনালি চুল এমনভাবে লক করেছিল, ওর সুন্দর চেহারায় এক ধরনের প্রলুব্ধকর টান চলে এসেছিল। আগের অন্য কোনো স্টাইলে নাকি সে রকম লোভনীয় চেহারা ফোটেনি। বিশেষ করে যেসব কৃষ্ণাঙ্গ ছেলের সঙ্গে ব্রুকলিন অভিসার করেছে তাদের ধারণা এ রকমই।

 অ্যাপেটাইজার খেতে খেতে আমরা অফিসের নানা গুজবগল্প নিয়ে কথা বলি। তবে আমাদের খিলখিল হাসি থেমে যায় মাহিমাহি আসার সঙ্গে সঙ্গে। এটা রেসিপির একদম ওপরের দিকের আইটেম, নারকেলের দুধের ওপরে সামুদ্রিক মাছটা যেন সাঁতার কাটছে। ওপরে আদাকুচি, সিসেম সিড, রসুন আর কাঁচা পেঁয়াজের ছোট ছোট টুকরো ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মাছের এ রকম একটা আইটেমকে গতানুগতিক চমৎকারিত্ব দিতে শেফ অতিরিক্ত চেষ্টা করেছে বুঝতে পেরে আমার বিরক্তই লাগে। মাছটার ওপর থেকে সব কিছু সরিয়ে ফেলতে ফেলতে বোকার মতো ফস করে বলে ফেলি, আমি একটা ছুটি চাই। কোথাও থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। নৌবিহারের কোনো জাহাজে করে।

ব্রুকলিন দাঁত বের করে হাসে, ওহ, তাই নাকি? কোথায়? শেষে এত ভালো একটা খবর!

আমি বলি, তবে ছোট বাচ্চাকাচ্চা নেওয়া যাবে না।

তা তো সহজেই হতে পারে। ফিজিতে যাওয়া যেতে পারে।

কোনো রকম পার্টি হবে না। আমি সময় কাটাতে চাই স্থানীয় বয়স্ক লোকজনের সঙ্গে। তাদের কারো কারো মেদভুঁড়ি থাকলেও চলবে। ডেকে বসে শাফলবোর্ড খেলব, হাউজিও খেলব।

ন্যাপকিন দিয়ে মুখের কোণা মুছতে মুছতে চোখ বড় বড় করে ব্রুকলিন বলে, ব্রাইড, তুমি তো আমাকে চমকে দিয়েছ।

কাঁটা চামচ নামিয়ে রেখে আমি বলি, না, সত্যি বলছি। একদম নিরিবিলি পরিবেশ চাই। ঢেউয়ের আছড়ে পড়ার চেয়ে কিংবা স্বচ্ছ গ্লাসে বরফ গলে যাওয়ার চেয়ে বেশি আর কোনো শব্দ থাকবে না।

নিজের কনুই টেবিলে নামিয়ে রেখে ওর হাত আমার হাতের ওপরে রাখে, আহ মেয়ে, তুমি তো এখনো আতঙ্কের ভেতরই আছো। ধর্ষণের এই আবর্জনা তোমার মন থেকে মুছে না যাওয়া পর্যন্ত তোমাকে পরিকল্পনাই করতে দিচ্ছি না আমি। সে পর্যন্ত তুমি কী চাও না চাও নিজেও জানবে না। ঠিক আছে?

ওহ, এই ব্যাপারটা নিয়ে আমি একেবারে হাঁপিয়ে উঠেছি। ব্রুকলিন কখন যেন বলে বসে, আমাকে রেপ থেরাপিস্টের কাছে যেতে হবে কিংবা ভিকটিম ফেস্টে উপস্থিত হতে হবে। এই ব্যাপারটা আমাকে অসুস্থ করে ফেলেছে। কারণ আমি তো ওকে আসল কথা খুলে বলিইনি। আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ব্রুকলিন। তাকে আসল কথাটা খুলে বলা দরকার, জরুরি। আমি একটা অ্যাসপারাগাসের কাণ্ডে কামড় দিয়ে আমার কাঁটা চামচ আর ছুরি আড়াআড়ি করে রেখে দিই।

 শোনো, আমি তোমার কাছে মিথ্যা বলেছি, বলে আমার প্লেটটা একটু জোরেই সরিয়ে রাখি। প্লেটটা আমার খেয়ে রাখা আপেল মার্টিনির বাকিটাতে গিয়ে গুঁতো মারে। খানিকটা ছলকে পড়ে যায়। ন্যাপকিন দিয়ে সতর্কতার সঙ্গে মুছে ফেলি। নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকি, যা বলব তা যেন আবার বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। আমি তোমার কাছে মিথ্যা বলেছি, বান্ধবী, মিথ্যা বলেছি। কেউ আমাকে ধর্ষণের চেষ্টা করেনি। আর আমাকে মেরে তক্তা বানিয়েছে যে সে এক মহিলা। যিশুর কসম খেয়ে বলছি, তাকে আমি সাহায্যই করতে চেয়েছিলাম। আমি তাকে সাহায্য করতে চেয়েছিলাম। অথচ পারলে সে আমাকে মেরেই ফেলত।

 ব্রুকলিন হাঁ করে খানিক তাকিয়ে রইল। তারপর দৃষ্টি তেরসা করে জিজ্ঞেস করল, মহিলা? কোন মহিলা? কে সে?

 তুমি তাকে চিনবে না।

 তুমিও নিশ্চয় তাকে চেন না, তাই না?

 একসময় চিনতাম।

 ব্র্রাইড, এই সামান্য পরিমাণ খাব না। আমাকে পুরো প্লেট খেতে দাও, প্লিজ। কথা বলার সময় ব্রুকলিন চুলের একটা গোছা কানের ওপরে তুলে আনে। আমার দিকে আরো গভীর দৃষ্টিতে তাকায়।

 পুরো ঘটনা বলতে তিন মিনিটের মতো সময় লাগে : যখন আমি সেকেন্ড গ্রেডে পড়া ছোট বালিকা, তখন কিভাবে কিন্ডারগার্টেনের একজন শিক্ষিকা প্রধান ভবনের পাশের ভবনে তার ছাত্রদের সঙ্গে আকাম-কুকাম করত।

 আর শুনতে পারছি না! বলেই ব্রুকলিন চোখ বন্ধ করে ফেলল যেন কোনো নানের চোখের সামনে পড়ে গেছে পর্ন ছবি।

 আমি বলি, তুমি তো পুরো প্লেটের কথা বলেছিলে।

 ঠিক আছে, ঠিক আছে।

 অবশ্য তাকে গ্রেপ্তার করা হয়, বিচার হয়। সাজা দিয়ে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

 এ পর্যন্ত তো বুঝলাম। তাহলে সমস্যা কোথায়?

 আমি তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছিলাম।

 আরো ভালো কথা। তাহলে?

 আমি তাকে দেখিয়ে দিয়েছিলাম। সাক্ষীর আসনে বসে আমি তার দিকে আঙুল তুলে বলেছিলাম, আমি তাকে ওই নোংরা কাজ করতে দেখেছি।

 তারপর?

 তাকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। পঁচিশ বছরের জেল হয় তার।

 ভালো। গল্পের শেষ এখানেই, তাই না?

 উম্, না, আসলে এখানে শেষ হয়নি। আমি কিছুটা ছটফট করে আমার গলার কাছের পোশাকের প্রান্ত ঠিক করি, মুখে হাত বুলিয়ে নিই। তারপর বলি, তার কথা আমার মাঝেমধ্যেই মনে হতো, বুঝলে।

 বাহ, বেশ তো। বলো বলো।

 বলছি, তার বয়স তখন বিশ বছর।

 বড় বাড়ির মেয়েদের বয়সও তেমনই ছিল।

 আমি প্রায়ই ভাবতাম, আর কিছু দিনের মধ্যে তার বয়স হয়ে যাবে চল্লিশ। মনে হয়, তার কোনো বন্ধু নেই।

 আহা বেচারি! জেলখানায় বসে ধর্ষণ করার মতো একটা বাচ্চা পোলাপানও নেই। কী দুঃখের কথা!

 তুমি কিন্তু আমার কথা ঠিকমতো শুনছ না।

 আচ্ছা, ঠিক আছে, শুনিনি। ব্রুকলিন প্লেটের ওপরে একটা চাপড় মারে। পাগল নাকি? এই মাদি কুমির কে? কে এই বালের হেঁজিপেঁজি মহিলা? তার সেঙ্গে তোমার কোনো সম্পর্ক আছে? কী হয়?

 না।

 তাহলে?

 আমার শুধু মনে হতো, এত বছর পর সে একাকী হয়ে যাবে, দুঃখী হয়ে যাবে।

 সে তো বেঁচে আছে। এটাই তার জন্য যথেষ্ট নয়?

 না, এত কথা বলে কোনো লাভ হলো না। ব্রুকলিন আমার এসব কথা বুঝবে তা-ই বা আশা করি কী করে। আমি ওয়েটারকে ইশারা করে ডাক দিয়ে বলি, আবার। মুখে বলার সঙ্গে আমার খালি গ্লাসের দিকে ইঙ্গিত করি।

 ওয়েটার চোখের ভ্রু ওপরের দিকে তুলে ব্রুকলিনের দিকে তাকায়।

 ব্রুকলিন বলে, কুকি; আমার জন্য আর নয়। আমার নিয়ন্ত্রণ দরকার।

 বাঁধানো উজ্জ্বল দাঁত বের করে ওয়েটার ব্রুকলিনের দিকে একটা মারাত্মক হাসি ছড়িয়ে দেয়।

 শোনো, ব্রুকলিন। আমি কেন গিয়েছিলাম জানি না। তবে শুধু জানি, আমি সব সময় তার কথা ভাবতাম, ডেকাগনে এত বছর সে আছে।

 তাকে কি চিঠিপত্র কিছু লিখেছিলে? দেখা করতে গিয়েছিলে?

 না। শুধু দুবার দেখা হয়েছে। একবার বিচারের সময়, আদালতে। আরেকবার যখন এই যে এ রকম হয়েছে, আমি আমার মুখের দিকে ইঙ্গিত করে বলি।

 কী বেকুব কুত্তি তুমি! ব্রুকলিনকে সত্যিই বিরক্ত মনে হয় আমার প্রতি। তুমি তাকে জেলে পাঠিয়েছ। অবশ্যই সেও তোমাকে দেখে ছাড়বে, সেটাই তো স্বাভাবিক।

 সে এ রকম ছিল না আগে। সে শান্ত, মজার স্বভাবের এমনকি নরম মনেরও ছিল।

 আগে? আগে মানে? তুমি তো বললে, তার সঙ্গে দুবার দেখা হয়েছে—একবার বিচারের সময়, আরেকবার যখন সে তোমাকে আধামরা করে ফেলে। কিন্তু তুমি যে বললে, সে বাচ্চাদের ফুঁসলিয়ে কী কী সব করত...?

 আমার পানীয় দিতে এসে ওয়েটার নিচু হয়ে দাঁড়ায়।

 আমারও বিরক্ত লাগে। আমি বিরক্তি প্রকাশ করেই বলি, ঠিক আছে, তিনবার।

 জিহ্বা দিয়ে মুখের কোণা চেটে নেয় ব্রুকলিন, বলো তো ব্রাইড, সে কি তোমাকেও কিছু করেছিল নাকি? আমাকে তো বলতে পার।

 হায় যিশু! কী ভাবছে ব্রুকলিন! আমি এক গুপ্ত লেসবিয়ান? আমি এ রকম একটা কম্পানিতে কাজ করছি যেটা বাস্তবিক অর্থে পরিচালিত হচ্ছে উভ, বহুগামী, স্থানান্তরিত লিঙ্গের অধিকারী, সমকামী কিংবা নিজের চেহারার প্রতি যাদের সতর্ক নজর আছে তাদের দ্বারা। ক্ষুদ্র গোপন কক্ষের দরকারটা কী এখনকার দিনে?

 আমি বেখেয়ালে কুল-এইড খানিকটা ছলকে ঢেলে ফেললে কিংবা কার্পেটের ওপর হোঁচট খেয়ে পড়লে সুইটনেসের চোখে যে দৃষ্টি দেখতাম সে রকম দৃষ্টি হেনে আমি ব্রুকলিনকে বলি, এই মেয়ে, বোকার মতো কথা বলো না তো।

 হাত নেড়ে ব্রুকলিন বলে ওঠে, ঠিক আছে, ঠিক আছে। ওয়েটার সোনা, আমি সিদ্ধান্ত বদলেছি। বেলভেডিয়ার, রকস। ডাবল দিও।

 ওয়েটার বলে, আপনি পেয়ে গেছেন। ‘পেয়ে’ কথাটা সে এমন মিহি অথচ জোরের উচ্চারণে বলে যেন সে সাউথ ডাকোটার একটা সম্ভাবনাময় ফোন নম্বর পেয়ে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে ফেলেছে।

 আমার দিকে তাকাও বন্ধু। ভেবে দ্যাখো তো, ওই মহিলার জন্য তোমার এত করুণা উথলে উঠল কেন? তার জন্য এত দুঃখ হতে লাগল কেন তোমার? ভালো করে ভেবে দেখতে বলছি।

 আমি মাথা ঝাঁকিয়ে বলি, আমি জানি না। আমার মনে হয় নিজের ভেতরে আমি নির্দোষ অনুভব করতে চেয়েছিলাম। তার কথা পুরোপুরি ঝেড়ে ফেলতে পারছিলাম না। তার নাম সোফিয়া হাক্সলি। তার কথাই আমার মনে আসত। মনে হতো, বিনিময় ছাড়া কিছু দিলে সেটার সঠিক মূল্য সে বুঝবে। সন্দেহ করবে না, এমন কিছুর বিনিময়ে আবার কী করতে হয় না হয়।

 মনে হয়, ব্রুকলিন স্বস্তি পেয়েছে। আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলে, এখন বুঝতে পারছি।

 বুঝতে পারছ? সত্যি?

 পুরোপুরি। সে তোমাকে ছেড়ে গেছে; নিজেকে খুব মূল্যহীন মনে হচ্ছে, তাই না? তোমার আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছ। কিন্তু হতাশা ছাড়া আর কিছু দেখতে পাচ্ছ না, তাই না?

 সে রকমই কিছুটা। আমার তাই মনে হয়।

 তাহলে আমরা এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার পথ পাবই।

 কিভাবে? যেকোনো সমস্যার সমাধানের পথ যদি কেউ বের করার ক্ষমতা রাখে সে হলো ব্রুকলিন। মেঝেতে পা ঠুকে সে সব সময় বলে, সিদ্ধান্ত নিতে হলে হয় এখানে পড়ে থাকো, নয়তো লাফিয়ে ওপরের দিকে ওঠো। আমি জিজ্ঞেস করি, কিভাবে সমাধান হবে?

 ওকে উত্তেজিত দেখায়, হ্যাঁ, ঠিক আছে। হাউজি খেলে নয়।

 তাহলে কী দিয়ে?

 ব্লিঙ্গো, ব্রুকলিন চিৎকার দিয়ে বলে।

 ওয়েটার জিজ্ঞেস করে, আপনি আমাকে ডাকলেন?

 ব্রুকলিন যেমন প্রতিজ্ঞা করেছিল তেমনই দুই সপ্তাহ পরে সে একটা সেলিব্রেশনের আয়োজন করে, একটা প্রিলঞ্চ পার্টি। সেখানে আমি হলাম মধ্যমণি—যেহেতু আমিই ইউ, গার্লের আবিষ্কারক এবং এই ব্র্যান্ড সম্পর্কে সব রকমের উত্তেজনা তৈরি করতে ভূমিকা রেখেছি। জায়গাটা আমার মনে হয়, একটা ফ্যান্সি হোটেল। না, এটা একটা স্মার্টি প্যান্টস মিউজিয়াম। একদল লোক অপেক্ষা করছে। একটা লিমুজিনও আছে। আমার চুলের স্টাইল আর পোশাক একদম নিখুঁত। পায়ের পাতা পর্যন্ত লম্বা আমার গাউনের সাদা লেসের ওপরে হীরের অলংকার লাগানো। আমার গাউনটা বেশ টাইটফিটিং। কোথাও কোথাও বিশেষ জায়গায় খুব স্বচ্ছ। তবে অন্যান্য জায়গায় ঢাকা। স্তনাগ্র আর নাভির অনেকখানি নিচের ত্রিভুজ।

 এবার শুধু কানের দুল বাছাই করতে হবে। আমার পার্লডট হারিয়ে ফেলেছি। কাজেই এক ক্যারেট হীরের অলংকারটা বাছাই করে নিই। মোটামুটি মানের, খুব চকচকে নয়। জেরি আমার ব্ল্যাক কফি ঘোল-ক্রিম প্যালেটের রং সম্পর্কে যেমন বলেছে তার থেকে আলাদা তেমন নয়। আমার চেহারা আসলেই বরফের ওপরে চিতার মতো।

 হায় যিশু! এখন কী হবে? আমার কানের দুল তো কানের ফুটোর মধ্যে যাচ্ছে না। প্লাটিনামের তৈরি গোড়ালিটা কানের লতি থেকে বারবার পিছলে যাচ্ছে। আমি দুলজোড়া আরো ভালো করে পরীক্ষা করে দেখি। না, কোনো সমস্যা তো নেই। কানের লতির দিকে আরেকটু ভালো করে তাকিয়ে দেখি; হ্যাঁ, ছোট ফুটো তো মিলিয়ে গেছে। হাস্যকর ব্যাপার তো! আমার বয়স তখন আট বছর। সেই সময় কান ফুটো করেছিলাম। মাদি দৈত্যটার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার পর খুশি হয়ে সুইটনেস আমাকে নকল সোনার ছোট গোলাকার দুলজোড়া উপহার দিয়েছিল। তার পর থেকে ক্লিপ দিয়ে লাগানো কানের দুল আর কখনো পরা হয়নি। কখনো না। আমার ‘টোটাল পারসন’ ডিজাইনার জেরির কথা অমান্য করে মাঝেমধ্যে পার্লডটস পরেছি। আর এই যে আজকের মতো কখনো কখনো ডায়মন্ড পরেছি। সবুর। এটা তো পুরোপুরিই অসম্ভব। এত বছর পর আমার কানের লতি তো আগের মতো কুমারী অবস্থায় চলে গেছে যেন সুচের ছোঁয়াই লাগেনি, শিশুদের আঙুলের মতো দেখতে। প্লাস্টিক সার্জারির কারণে এমন হয়েছে। অথবা অ্যান্টিবায়োটিকের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবেও এমন হতে পারে। কিন্তু সেও তো কয়েক সপ্তাহ হয়ে গেছে। আমি কাঁপছি। আমার শেভিং ব্রাশটা দরকার। ওদিকে আবার ফোন বাজছে। ব্রাশটা বের করে এনে আমার দুই স্তনের মাঝের খাঁজে আলতো করে ঘষতে থাকি। মাথাঘোরা ভাব চলে আসছে। ফোনটা বেজেই চলেছে। ঠিক আছে। কোনো অলংকার নয়। কোনো দুল নয়। আমি ফোনটা তুলি।

 মিস ব্রাইড, আপনার ড্রাইভার।

 আমি যদি ঘুমের ভান করি তাহলে সে তো চলে যাবে। সে যে-ই হোক, আলাপ করতে কিংবা রতিপরবর্তী সোহাগ করতে তার মুখোমুখি হতে পারি না। বিশেষ করে, এ রকম আচরণ করার কথা তো আমার মনেই পড়ে না। সে আলতো করে আমার কাঁধে চুমু খায়। তারপর আমার চুলের ভেতর আঙুল চালিয়ে খেলা করে। আমি বিড়বিড় করতে থাকি, যেন স্বপ্নের ভেতর থেকে কথা বলছি। আমি মৃদু শব্দে হাসি, তবে চোখ বন্ধ করেই রাখি। বেডক্লথ সরিয়ে সে বাথরুমে ঢোকে। গোপনে আমার লতিতে ছোঁয়া দিই। মসৃণ। এখনো মসৃণ আছে। পার্টিতে আমাকে প্রশংসায় ভাসায় সবাই, কী সুন্দর! কী সুন্দর! কী আবেদনময়ী! কী রমণীয়! সবাই এ রকম বলতেই থাকে। কিন্তু কানের দুলের অনুপস্থিতির কথা কেউ বলে না। আমার কাছে অদ্ভুত মনে হয়। কারণ বক্তৃতার গোটা সময়, পুরস্কার উপস্থাপনায়, ডিনারে, নাচের সময় আমার শিশুর আঙুলের মতো লতি দুটো আমাকে এতটাই মগ্ন রাখে যে আমি কোনো কিছুতেই মনোযোগ দিতে পারি না। সে জন্যই আমার ধন্যবাদ-বক্তৃতাটা কেমন যেন খাপছাড়া হয়ে যায়। নোংরা কৌতুক শুনেও অনেকক্ষণ ধরে হাসতে থাকি। সহকর্মীদের কথার মাঝখানে হঠাৎ হোঁচট খাওয়ার মতো খেয়াল ফিরে আসে; নিজেকে ঠিক রাখার জন্য যে পরিমাণ পান করা যেতে পারে তার চেয়ে তিন-চার গুণ বেশি পান করে ফেলি। তারপর প্রম কুইনের জন্য ভোট প্রার্থনাকারী হাই স্কুলের কোনো ছোকরার মতো প্রেমের ভান করতে থাকি। মানে এ রকম করে থাকি যে-ই আমার বিছানায় থাকুক তাকে বিছানায় প্রশ্রয় দেওয়ার একটা পদ্ধতি হিসেবে। আমার জিহ্বার স্বাদ নিয়ে আশা করতে থাকি, ফিল্মটা আমার একারই। ঈশ্বর। তোমাকে ধন্যবাদ। বিছানার পাশের দণ্ড থেকে কোনো হাতকড়া আপাতত ঝুলছে না।

 গোসল শেষ করে সে টাকসিডো পরতে পরতে আমার নাম ধরে ডাকতে থাকে। আমি কোনো সাড়া দিই না। তাকাইও না। আমার মাথার ওপরে বালিশ তুলে দিই। আমার কাণ্ড দেখে তার খুব মজা লাগে; তার মুখ টেপা হাসি শুনতে পাই। সে কফি বানানোর সময় আমি কিচেনে শব্দ শুনতে পাই। না, কফি না। কফি বানালে কফির গন্ধ পেতাম। কী যেন ঢালছে। কমলার জুস, ভিএইট, নাকি ফ্ল্যাট শ্যাম্পেন? ফ্রিজে এগুলো ছাড়া আর তো কিছু নেই। নীরবতা। এবার পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। প্লিজ, প্লিজ, চলে যাও! বিছানার পাশের ছোট টেবিলে টুক করে একটা শব্দ শুনতে পাই। তার পরই বাইরের দরজা খোলার এবং বন্ধ হওয়ার শব্দ শুনি। মাথার ওপর থেকে বালিশ একটু সরিয়ে চোখ বের করে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করি; ঘড়ির পাশেই চারকোণা ভাঁজ করা একটা কাগজ দেখতে পাই। টেলিফোন নম্বর। দারুণ! তারপর তার নাম। স্বস্তির হাঁফ ছেড়ে ধপাস করে পড়ে যাই বিছানায় : সে কোনো চাকরিজীবী নয়।

 আমি দৌড়ে বাথরুমে ঢুকে ময়লা ফেলার ঝুড়িতে কী আছে দেখার চেষ্টা করি। যিশু, তোমাকে ধন্যবাদ। একটা ব্যবহার করা কনডম। ওষুধের আলমারির কাছের শাওয়ার গ্লাসে ফেনার চিহ্ন দেখতে পাই, আয়নাটা পরিষ্কার। চকচক করছে; গত রাতে যা দেখেছি তা-ই দেখতে পাচ্ছি। আমার কানের লতি দুটো একদম নিখুঁত, জন্মের দিন যেমন ছিল ঠিক তেমনই। সুতরাং এটাই হলো পাগলামি। বাজে ব্যবহার নয়। আগে থেকে জানা জগতে পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি। আমার শেভিং ব্রাশ দরকার, সাবান দরকার। আমার বগলে একটা লোম পর্যন্ত নেই। তবু আমি ফেনা তৈরি করতে থাকি। এবার আরেকটাতে। ফেনা তৈরি করা, শেভ করা থেকে আমি এত আনন্দ পাই যে আরো সব জায়গায় শেভ করার চিন্তাটা মাথায় চলে আসে। ওই সব জায়গারও এখানকার মতো একটু আনন্দ দরকার। কমপক্ষে আমার জননেন্দ্রিয়তে তো দরকার। এখানে আগে থেকেই পরিষ্কার করা আছে। সোজা রেজরটা এখানে ব্যবহার করাটা কি খুব দুরূহ হয়ে যাবে? হ্যাঁ, দুরূহ হবেই তো।

 শান্তশিষ্ট হয়ে বিছানায় গিয়ে চাদরের নিচে ঢুকে পড়ি। মিনিটখানেক পরেই আমার মাথা দাপানো ব্যথায় ফেটে যাওয়ার মতো হয়। উঠে দুটো ভাইকোডিন খেয়ে নিই। বড়ি দুটো যতক্ষণ না কাজ করা শুরু করে ততক্ষণ তেমন কিছু করার নেই; শুধু আমার চিন্তাভাবনাগুলোকে নিজ পথে চলাচল করতে দিই, একটার ওপর আরেকটাকে আক্রমণ করতে দিই।

 আমার এসব কী হচ্ছে?

 যেসব মানুষের সঙ্গে বিছানায় যাচ্ছি তাদের নামই জানি না। কারো নাম শুনে থাকলেও পরে আর মনে করার চেষ্টা করি না। কী হচ্ছে তাহলে? আমার বয়স অল্প। আমি সফলতা পেয়েছি। আমি দেখতে সুন্দর। সত্যিই সুন্দর। তাহলে আমার জীবন শোচনীয় হওয়ার কী কারণ। সুইটনেস? নাকি বুকার আমাকে ছেড়ে গেছে বলে? যা যা পাওয়ার জন্য পরিশ্রম করেছি সেসব পেয়েছি। আমার কাজে আমি দক্ষ। নিজেকে নিয়ে আমি গর্বিত, সত্যিই গর্বিত। অতীতের কিছু টুকরো ঘটনা, তেমন গুরুত্বের না হলেও, আজ ভাইকোডিন আর মাথাব্যথার কারণে মনে পড়ে যাচ্ছে। ও রকম অনেক কিছুই পার হয়ে সামনের দিকে এগিয়েছি। এমনকি বুকারও তা-ই ভাবত, তাই না? আমার পেটের সব কথা তার কাছে উগড়ে দিয়েছি। তাকে সব কিছু বলেছি, সব ব্যথা, সব ভয়, সব অর্জনের কথাও বলেছি; যত তুচ্ছই হোক না কেন বলেছি। এমন অনেক কথা যেগুলো আগে হয়তো চাপা দিয়ে রেখেছি, কিন্তু বুকারের কাছে বলার সময় সেগুলো যেন পুনরায় নতুন হয়ে সামনে এসেছে। মনে হয়েছে, ওই সব ঘটনা যেন প্রথমবারের মতো দেখতে পাচ্ছি। সুইটনেসের রুম সব সময় মনে হতো কম আলোকিত। তার ড্রেসারের পাশের জানালা খুলে দিই। বয়স্ক নারীর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রে ঠাসা তার পেটিকা—সন্না, তুলোর বল, লাকি লেডি ফেস পাউডারের গোলাকার বক্স, মিডনাইট ইন প্যারিস কোলনের নীল বোতল, ছোট একটা তশতরিতে রাখা চুলের কাঁটা, টিস্যু, আইভ্রু পেনসিল, মেবিলাইন মাসকারা, টাবু লিপস্টিক ইত্যাদি। লিপস্টিকটা গাঢ় লাল। আমি একটু ঠোঁটে লাগিয়ে দেখি। অবাক হওয়ার কিছু নেই, আমি প্রসাধনীর ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। সুইটনেসের ড্রেসারের ওই সব জিনিসের বর্ণনা দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে আমার মনোযোগ আরেকটা বিষয়ের দিকে চলে যায়। সেটাও বলি বুকারকে। মনে হয়, আমি খোলা জানালা দিয়ে একটা বিড়ালের ডাক শুনতে পাই। ডাকটার মধ্যে ব্যথা আর ভীতির মিশ্রণ শুনতে পাই। জানালা দিয়ে নিচের দিকে দেয়ালঘেরা এলাকাটায় তাকাই। বিল্ডিংয়ের বেইসমেন্টের দিকে যাওয়ার পথ ওই দিকে। নিচে দেখতে পাই, বিড়াল নয়, একটা মানুষ। লোকটা তার পশমঅলা পায়ের মাঝে ধরে রাখা একটা ছোট ছেলের খাটো মোটা পায়ের ওপরে নিচু হয়ে আছে। ছেলেটার ছোট হাত একবার মুষ্টিবদ্ধ হচ্ছে, আরেকবার খুলে যাচ্ছে। ছেলেটার ব্যথাভরা কান্নার ভেতর কিছুটা চিঁহিচিঁহি রব আছে। লোকটার প্যান্ট পায়ের গোড়ালির কাছে পড়ে আছে। জানালার কাছে আরো একটু এগিয়ে গিয়ে ভালো করে দেখার চেষ্টা করি : লোকটার চুল আমাদের বাড়ির মালিক মি. লেইফের চুলের মতো লাল। কিন্তু আমার মনে হলো, মি. লেইফ হতেই পারেন না; তিনি কড়া মানুষ, কিন্তু নোংরা নন। মাসের প্রথম দিন দুপুরের আগেই ভাড়া নগদে তাঁর বাসায় পৌঁছাতে হবে। পাঁচ মিনিট পরে তাঁর দরজায় নক করলেই বিলম্ব ফি দিতে হবে। সুইটনেস তাঁর ব্যাপারে খুব আতঙ্কে থাকত। সে নিশ্চিত হতে চাইত, আমি যেন সকালবেলায়ই ভাড়া তাঁর বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসি। আমি তখন জানিনি, তবে এখন জানি, মি. লেইফের সামনে দাঁড়ানো মানেই অন্য কোথাও বাসা দেখতে হবে। আর বিভিন্ন জাতের মানুষের অন্য এলাকায় নিরাপদ বাসা পাওয়া খুব কঠিন। সুতরাং আমি কী দেখেছি সুইটনেসকে বললাম, সে আমার ওপর রেগে গেল। তার ভয় ছেলেটার কান্নাকাটি নয়, ঘটনা জানাজানি হয়ে যাওয়ার ভয়। ছোট হাতের মুঠি কিংবা পশমঅলা বড় ঊরুতে তার নজর নেই, তার নজর আমাদের বাসা রক্ষা করার দিকে। সুইটনেস বলল, এ সম্পর্কে একটা কথাও বলবে না। কাউকে না। লুলা, শুনতে পাচ্ছ আমার কথা? কী দেখেছ ভুলে যাও। একটা কথাও বলা যাবে না। সুতরাং আমি আর বাকিটা তাকে বলতে পারিনি—আমি শব্দ করিনি, আমি শুধু জানালায় ঝুঁকে নিচের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। কিসের যেন শব্দ শুনে লোকটা ওপরের দিকে তাকায়। তখনই স্পষ্ট দেখতে পাই এ তো মি. লেইফ। লোকটা তখন প্যান্টের জিপ আটকাচ্ছে। ছেলেটা তার জুতোর মাঝখানে পড়ে খনখনে গলায় কান্নাকাটি করছে। মি. লেইফের চাহনি দেখে আমি আতঙ্কিত হয়ে যাই। কিন্তু জানালা থেকে সরতে পারি না। তখনই তার চিৎকার শুনতে পাই, এই বোকাচোদা নিগ্রো ছেমড়ি, জানালা বন্ধ করে ভাগ ওখান থেকে।

 বুকারকে প্রথমবার বলার সময় আমি হাসছিলাম যেন ব্যাপারটা মজার কিছু। তারপর বুঝতে পারি, আমার চোখ জ্বালা করছে। আমার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ার আগে বুকার আমার মাথা ওর বাহুর মধ্যে ধরে রাখে। আমার চুলের ওপরে ওর থুতনি চেপে ধরে রাখে।

 আর কাউকে বলনি? বুকার জিজ্ঞেস করে।

 কখনো না। শুধু তোমাকে বললাম।

 এখন তাহলে মোট পাঁচজন জানল। ওই ছেলেটা, ওই বদমায়েশটা, তোমার মা, তুমি আর আমি। দুজন জানার চেয়ে পাঁচজন জানা ভালো। তবে পাঁচ হাজার লোক জানার দরকার।

 ও আমার মুখটা ওর দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে চুমু খেল, তুমি ওই ছেলেটাকে আর কখনো দ্যাখোনি?

 আমি জানালাম, আমি মনে হয় দেখিনি। আর দেখলেও চেনার উপায় ছিল না। ওই সময় ছেলেটার মুখ নিচের দিকে ছিল। আমার শুধু মনে আছে, ছেলেটা একটা শ্বেতাঙ্গ বালক, তার মাথার চুল বাদামি। ব্যথায় ছেলেটার হাতের মুঠি একবার মুষ্টিবদ্ধ হচ্ছে, আরেকবার খুলে যাচ্ছে—এই দৃশ্য মনে আসতেই আমি আবার কেঁদে ফেলি। কিছুতেই অশ্রু আটকাতে পারি না।

 বুকার বলে, এই কী করছ, বেইবি। অন্য লোকের বদমায়েশির জন্য তুমি তো দায়ী নও।

 আমি জানি। কিন্তু...।

 কোনো কিন্তু নয়। যা পার সংশোধন কর; যা পার না সেটা থেকে শেখার চেষ্টা কর।

 আমি সব সময় বুঝতে পারি না কোনটা সংশোধন করব।

 আরে হ্যাঁ, তুমি পার। আমরা যতই অবহেলা করি না কেন, মন সব সময় সত্যকে চিনতে পারে। আর চিনতে পারে বলেই স্পষ্টতা চায়।

 আমাদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো আলোচনার অন্যতম ছিল সেদিনের আলোচনা। আমি অনেক স্বস্তি পেয়েছিলাম। না। তার চেয়েও বেশি, আমি অনুভব করি, ও আমাকে খুশি করতে চেষ্টা করছে, আমাকে পুরোপুরি পেতে চাইছে, আমাকে নিরাপত্তা দিতে চাইছে।

 এখনকার মতো অবস্থা তখন ছিল না। এখন যেমন পৃথিবীর সবচেয়ে দামি সুতার দুটো চাদরের মাঝে আমি ছটফট করছি, এপাশ ওপাশ করছি, ব্যথায় কাতরাচ্ছি আর অপেক্ষা করছি কখন আরেকটা ভাইকোডিন কাজ করতে শুরু করবে। আমার জাঁকালো শোবার ঘরে শুয়েও তাড়িয়ে বেড়ানো স্মৃতিকে থামাতে পারছি না। তখন এমন ছিল না। সত্য। স্পষ্টতা। সেদিনও আদালত রুমে আমার তর্জনী যদি আমাদের বাড়িঅলার দিকে উঁচিয়ে ধরতাম তাহলে কেমন হতো? মি. লেইফ যে অপরাধে লিপ্ত ছিল ওই শিক্ষিকাও তো একই অপরাধে অপরাধী। আমি কি আসলে লেইফের চিন্তা মাথায় রেখেই তর্জনী তুলেছিলাম? আমি কি তার নোংরামি আর আমার আমাকে দেওয়া তার গালিগালাজের দিকে তর্জনী তুলেছিলাম? আমার বয়স তখন ছয় বছর। তখনো আমি নিগ্রো কিংবা বোকাচোদা শব্দগুলো শুনিনি। কিন্তু ওই শব্দ দুটোর মধ্যে যে ঘৃণা আর তাচ্ছিল্যের মনোভাব প্রকাশ পেয়েছিল সেটা আর ভেঙে বলার দরকার ছিল না। পরে স্কুলেও আমাকে এ রকম অনেক গালিগালাজ শুনতে হয়েছে। সে গালিগুলোও সংজ্ঞাগতভাবে রহস্যঘেরা। কিন্তু অর্থ পরিষ্কার বোঝা গেছে। সে গালিগালাজ আমার দিকে ছুড়ে মারা হতো, চিৎকার করে ছেড়ে দেওয়া হতো। নিগ্রো, ঝামা, অমার্জিত, সাম্বো, উগাবুগা ইত্যাদি। বানরের মতো শরীরের এপাশ ওপাশ চুলকাতে চুলকাতে চিড়িয়াখানার প্রাণীদের মতো আচরণ করা হতো আমার সামনে। একদিন একটা মেয়ে আর তিনটা ছেলে মিলে আমার ডেস্কের ওপরে এক ছড়া কলা রেখে বানরের মতো আচরণ করতে লাগল। তারা আমাকে অস্বাভাবিক খেয়ালির মতো, অচেনা মানুষের মতো দেখত। মনে হতো, আমি তাদের সাদা কাগজের ওপরে ছলকে পড়া নোংরা কালি। সুইটনেস যে কারণে লেইফের কথা বলতে নিষেধ করেছিল ওই একই কারণে আমি স্কুলের শিক্ষকদের কাছে কোনো দিন নালিশ করিনি। আমাকে সাময়িক বরখাস্ত করে রাখা হতে পারে, কিংবা স্কুল থেকে বের করেও দেওয়া হতে পারে। সুতরাং আজেবাজে নামে ডাকা, খ্যাপানো—এগুলো বিষের মতো, ভয়ানক ক্ষতিকর ভাইরাসের মতো আমার শিরা-উপশিরায় বয়ে যেত। হাতের কাছে কোনো অ্যান্টিবায়োটিক ছিল না। এখন আমার মনে হয়, একদিক থেকে ভালোই হয়েছে। আমি প্রচণ্ড প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করতে পেরেছি। আমার অর্জন করার একটাই বিষয় ছিল : আমাকে যেন কেউ নিগ্রো মেয়ে বলে গালি দিতে না পারে, অবহেলা করতে না পারে। আমি হয়ে উঠলাম ঘন কালো সৌন্দর্যের মূর্ত রূপ। চুমু পাওয়ার মতো ঠোঁট তৈরি করতে আমার বোটোক্সের দরকার হতো না; মরা মানুষের ত্বকের মতো ফ্যাকাসে রং ঢাকার জন্য ত্বক তামাটে করার দরকার হতো না। আমার পাছায় সিলিকনের দরকার হতো না। আমার ছোটবেলার ওই ভূতগুলোর কাছে আমার রুচিশীল কালো রং বিক্রি করেছি। তারা এখন আমাকে আমার কালো রঙের জন্যই অর্থ দিয়ে থাকে। বলতেই হবে, আমাকে দেখে ওই নিপীড়নকারীর দল, আসল বদমায়েশ আর ওদের মতো আরো যারা আছে ওদের সবাই যখন ঈর্ষার লালা ফেলে তখন ওই দৃশ্য দেখাটা ওদের কাছ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে টাকা-পয়সা খসানোর চেয়েও বড় পাওয়া। এটা একটা গর্বেরই বিষয়।

 আজ সোমবার। নাকি মঙ্গলবার? যা-ই হোক, দুদিন ধরে শুধু বিছানায় ঢুকে পড়া আর বের হওয়ার মধ্যেই আছি। আমার কানের লতি নিয়ে আর ভাবছি না। যেকোনো সময়ই আবার ফুটো করে নেওয়া যাবে। ব্রুকলিন সব সময় ফোন দিয়ে অফিসের সর্বশেষ খবরাখবর জানাচ্ছে। আমার ছুটি বাড়াতে চেয়েছিলাম, বাড়ানো হয়েছে। ব্রুকলিন এখন রিজিওনাল ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করছে। ওর জন্য ভালো হয়েছে। এটা ওর প্রাপ্য। ও আমার জন্য অনেক করেছে : ডেকাগন বিপর্যয় থেকে আমাকে উদ্ধার করেছে, দিনের পর দিন আমার সেবাযত্ন করেছে, আমার চিতাসুলভ চেহারাটা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছে, পরিচ্ছন্নতার কাজ করার লোক খুঁজে দিয়েছে, প্লাস্টিক সার্জন নির্বাচন করে দিয়েছে। ব্রুকলিন আমার কাজের মেয়ে রোজকেও এনে দিয়েছে—প্রথম দিকে ওর চেহারাটাই চোখের সামনে সহ্য হতো না : মোটা, ফুটির মতো স্তন আর তরমুজের মতো পাছা। ব্রুকলিনের সাহায্য ছাড়া আমি সেরে উঠতেই পারতাম না। তবু ওর টেলিফোন ধীরে ধীরে কমই পাচ্ছি।

 

ব্রুকলিন

আমার মনে হয়েছে, সে একটা শিকারি। নাচের পার্টি কেমন বুনো উদ্দাম হতে পারে সে বিষয়ে আমার মাথা ঘামানোর কিছু নেই। তবে চেনাজানা না থাকলে কাউকে পেছন থেকে ওভাবে জাপটে ধরা যায় না। কিন্তু ব্রাইড কিছু মনে করেনি। ও তাকে পেছন থেকে জাপটে ধরে শরীরে চাপ দিতে দিয়েছে, গায়ে গা লাগিয়ে অন্তরঙ্গ হতে দিয়েছে। অথচ তখন ব্রাইড তার সম্পর্কে কিছুই জানত না। এখন পর্যন্তও কিছু জানে না। তবে আমি তাকে চিনি। একদল গো-হারাদের মাঝে সাবওয়ের প্রবেশপথে তাকে দেখেছি। যিশুর নামে শপথ নিয়ে বলতে পারি, লোকটা পথে পথে ভিখারিদের মতো ঘুরে বেড়ায়। আমি বেশ নিশ্চিত, আরেক দিন তাকে লাইব্রেরির সিঁড়িতে হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে থাকতে দেখেছি। ভান করছিল, সে কী একটা পড়ছে যাতে পুলিশ তাকে ওখান থেকে সরে যেতে না বলে। আরেক দিন তাকে একটা কফিশপের টেবিলে বসে একটা খাতায় কিছু একটা লিখতে দেখেছি। ভাবেসাবে খুব মনোযোগী, খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ করছে এমন ভান। আমি নিশ্চিত, তাকেই আরেক দিন এই পাড়ায়ই তবে ব্রাইডের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে একটু দূরে ভবঘুরের মতো হাঁটতে দেখেছি। ওদিকে কী করছিল সে? অন্য কোনো মহিলার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল? সে কী করত, ব্রাইড বলেনি আমাকে। কোনো কাজ আদৌ যদি করেই থাকে তাহলে কী কাজ সে সম্পর্কে কিছু বলেনি। শুধু বলেছিল, এ রকম রহস্য নাকি ওর ভালো লাগে। মিথ্যুক। আমি জানি, ও আসলে সেক্স করাটাই পছন্দ করে। সত্যি আমি জানি, ব্রাইড সেক্সে আসক্ত। যখন আমরা তিনজন একসঙ্গে হয়েছি, তখন অবশ্য ব্রাইডকে কী কারণে যেন আলাদা মনে হয়েছে। ওকে আত্মবিশ্বাসী মনে হয়েছে। অতটা কাঙালিনী মনে হয়নি, ও নিজের প্রশংসা ভিক্ষা করার জন্য বারবার চেষ্টা করছে তেমন মনে হয়নি। তার সামনে ব্রাইডের চাকচিক্য বেড়েছে মনে হয়েছে, যে রকমই হোক না কেন। কী কারণে বেড়েছে জানি না। তবে হ্যাঁ, সে দেখতে খুব সুন্দর। তাতে কী? বিছানায় শোয়ার কাজে মজা দেওয়া ছাড়া আর কী দেওয়ার ক্ষমতা আছে তার? তার নামে একটা ফুটো পয়সাও নেই।

 আমি ওকে সতর্ক করে দিতে পারতাম। ভোঁদড় যেমন চলে যাওয়ার সময় পেছনে গন্ধ রেখে যায়, সে-ও তেমন করে ছেড়ে গেছে ব্রাইডকে। আমি বিস্মিত হইনি। তার ব্যাপারে যা জানতাম তা যদি ব্রাইডও জানত তাহলে ব্রাইড তাকে কবেই ছুড়ে ফেলে দিত। একদিন শুধু মজা করার জন্য তার সঙ্গে খানিক ছেনালিপনা করলাম। তাকে ফুসলিয়ে আমার দিকে টানার চেষ্টা করলাম। ব্রাইডের নিজের বিছানায়। ভেবে দ্যাখো। আমি ব্রাইডের বাসায় গিয়েছিলাম প্রসাধনী প্যাকেট করার একটা নমুনা আনার জন্য। আমার কাছে ওর বাসার চাবি থাকে। দরজা খুলে আমি ব্রাইডের নাম ধরে ডাক দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে সে উত্তর দিল, ব্রাইড এখানে নেই। আমি শোবার ঘরে ঢুকে দেখি, সে ব্রাইডের বিছানায়ই শুয়ে আছে। কী যেন পড়ছে। কোমর পর্যন্ত টেনে দেওয়া আছে একটা চাদর। মানে উদোম গায়ে শুয়ে আছে। আবেগের খেয়ালে, শুধুই আবেগের খেয়ালে আমি প্যাকেটটা নামিয়ে রেখে আমার জুতো খুললাম, তারপর পর্ন ছবিতে যেমন দেখা যায়, আমার পোশাকগুলোও ধীরে ধীরে খুলে ফেললাম। আমার পোশাক খোলার সময় আমার দিকে নিবিড় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সে; মুখে কিছু বলল না। সুতরাং আমি বুঝলাম, সে চাচ্ছে আমি থাকি। আমি নিচে কিছু পরি না। সুতরাং আমার জিন্সটা খুলে ফেলে নবজাতক শিশুর মতো পুরোপুরি নগ্ন হয়ে গেলাম। সে চুপচাপ তাকিয়ে রইল, আমার মুখের দিকে। আমিও খুব নিবিড় চোখে তাকিয়ে রইলাম। আমার চুলের ভেতর আঙুল চালিয়ে দিলাম। তারপর তার সঙ্গে জুড়ে যাওয়ার জন্য সুড়ুৎ করে চাদরের নিচে ঢুকে গেলাম। দুই হাতে তার বুকের ওপর আদর করতে করতে হালকা চুমু দিলাম। সে হাতের বইটা রেখে দিল।

 চুমু দেওয়ার সময় আমি ফিসফিস করে বললাম, তোমার বাগানে আরেকটা ফুল চাও না?

 তুমি কি নিশ্চিত, বাগান কী করলে বাড়ে তা তোমার জানা আছে?

 অবশ্যই। আদরে, কোমলতায়।

 আর গোবরে।

 কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে আমি উঠে পড়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। হারামজাদা। সে হাসছিল না। আবার আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়েও দিচ্ছিল না। বিছানা থেকে লাফিয়ে নেমে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমার পোশাকগুলো তুললাম। আমার পোশাক পরার দিকেও তাকাল না সে। হারামজাদা পোঁদের ফুটো। সে আবার পড়ায় ফিরে গেল। আমি চাইলে সে আমার সঙ্গে রতি-ভ্রমণে অংশ নিত। সত্যিই তাকে পটিয়ে ফেলতে পারতাম। এভাবে হঠাৎ করে আসা আমার উচিত হয়নি হয়তো। বিছানা থেকে যদি একটু আলস্যে গড়িমসি করে ধীরেসুস্থে উঠতাম। ব্যাপারটা সহজভাবে নিলেই তাকে কাবু করে ফেলা যেত।

যা-ই হোক, ব্রাইড ওর অভ্যস্ত প্রেমিকের স্বভাব সম্পর্কে তেমন কিছু জানে না। কিন্তু আমি জানি।

 

ব্রাইড

আমি কিছুতেই বুঝতে পারি না। কে ও? ওর আরেকটা ব্যাগের মতো মোটা কাপড়ের এই ব্যাগটাও আমি ময়লার ভেতর ফেলে দেব, সত্যিই ফেলে দেব। এটার মধ্যে আরো বেশি বই; একটা জার্মান ভাষায় লেখা। দুটো কবিতার বইও আছে। একটা হেস নামের কার যেন লেখা। আরো কয়েকটা পেপারব্যাক বই আছে। এগুলোর লেখকদের নামও কখনো শুনিনি।

 হায় যিশু! ভাবতাম, আমি ওকে চিনি। শুধু জানি, কোনো একটা ইউনিভার্সিটি থেকে ও ডিগ্রি নিয়েছে, এই পর্যন্তই। ও যেসব টি-শার্ট পরে সেগুলোতে তেমনই লেখা আছে। আমি ওর জীবনের ওই দিকটার কথা কখনো ভালো করে ভেবে দেখিনি। কারণ আমাদের শারীরিক মিলন আর ওর তরফ থেকে আমাকে পুরোপুরি বোঝা ছাড়া আমাদের সম্পর্কের মধ্যে আর ছিল শুধু মজা করা, অন্য কিছু নয়। ক্লাবে আমরা নাচতাম। তখন অন্য জুটিরা আমাদের দিকে ঈর্ষার চোখে তাকাত। বন্ধুদের সঙ্গে নৌকায় বেড়াতাম, সমুদ্রসৈকতে সময় কাটাতাম। এই বইগুলো পাওয়ায় বুঝতে পারছি, আমি ওর ব্যাপারে কতটা অজ্ঞ ছিলাম। ও আসলে অন্য মানুষ। নিজের চিন্তাচেতনার কথাটা আমাকে বলত না। সত্যি, আমাদের কথাবার্তার সবটাই ছিল আমাকে ঘিরে। তবে অন্য পুরুষদের সঙ্গে যেমন কৌতুকপূর্ণ তির্যক কথা বলতাম ওর সঙ্গে তেমনটা বলতাম না। আমার ফষ্টিনষ্টি আর তাদের বড় বড় কথা ছাড়া অন্য কোনো বিষয় উঠলেই তাদের সঙ্গে আমার মতামতের অমিল তৈরি হয়ে যেত, যুক্তিতর্ক চলত, তারপর ছাড়াছাড়ি। আমার ছোটবেলা সম্পর্কে বুকারকে যেমন খোলাখুলি বলেছি অন্য কাউকে বলতে পারিনি। হ্যাঁ, বুকারও শেষে আমার সঙ্গে কখনো কখনো কথা বলত। তবে কোনো কথাই আন্তরিক মনে হতো না, কেমন যেন বক্তৃতার মতো লাগত। একদিন আমরা সৈকতের চেয়ারে হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে ছিলাম। কিছুক্ষণ পর বুকার কথা বলা শুরু করল। কিন্তু বিষয়টা হলো ক্যালিফোর্নিয়ার পানির ইতিহাস। কিছুটা একঘেয়ে। তবু শুনতে আগ্রহীই ছিলাম। কিন্তু শেষে ঘুমিয়ে পড়লাম।

যখন অফিসে থাকতাম তখন ও কী নিয়ে ব্যস্ত থাকত সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই নেই। আমি কোনো দিন জিজ্ঞেসও করিনি। আমার মনে হতো, আমাকে ওর ভালোবাসার কারণ হলো, আমি ওর ব্যাপারে নাক গলানোর চেষ্টা করিনি, ওর অতীত সম্পর্কে কখনো কিছু জিজ্ঞেস করিনি, ওর কোনো ব্যাপারেই খ্যাচখ্যাচ করিনি। ওর ব্যক্তিগত জীবন ওর মতোই থাকতে দিয়েছি। আমি ভাবতাম, এতে প্রমাণ হবে আমি ওর ওপর কতটা বিশ্বাস রাখি। মানে আমি শুধু ওর প্রতিই আকৃষ্ট হয়েছি, ওর অতীতের কাজকর্মের প্রতি নয়। আমার পরিচিত মেয়েরা সব সময়ই তাদের ছেলেবন্ধুদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় তাদের আইনজীবী, শিল্পী, ক্লাবের মালিক, দালাল আরো কত কী হিসেবে উল্লেখ করে। বন্ধুকে নয়, যেন তার পেশাটাকেই ভালোবাসে মেয়েটা। ‘ব্রাইড, শোনো, এ হলো স্টিভ; সে অমুক জায়গায় আইনজীবী হিসেবে কাজ করছে;’ ‘আমি ডেট করছি এই দারুণ চিত্র প্রযোজকের সঙ্গে;’ ‘জয়ী হলো ওই যে অমুক জায়গার সিএফও;’ ‘আমার ছেলেবন্ধু ওই টিভি শোতে অভিনয় করে,’ ইত্যাদি ইত্যাদি।

 আমার ওকে বিশ্বাস করা উচিত হয়নি। আসলেই উচিত হয়নি। আমার হৃদয় ওর কাছে উপুড় করে দিয়েছি; ও আমার নিজের সম্পর্কে কিছুই বলেনি। আমি কথা বলতাম। ও শুনত। তারপর তো ও চলেই গেল। একটা কথাও বলল না। আমার সঙ্গে প্রতারণা করে গেল, প্রহসন করে গেল। সোফিয়া হাক্সলির মতো আমাকে তাচ্ছিল্যে ছুড়ে ফেলে গেল। আমাদের দুজনের কেউই বিয়ের কথা তুলিনি। তবে আমার সত্যিই মনে হতো, আমার আসল মানুষ আমি পেয়ে গেছি। ‘আমি যাকে চাই তুমি সে নারী নও’ কথাটাই শোনা বাদ ছিল।

 আমার দরজার পাশের টেবিলের ওপরকার ঝুড়িটা দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে চিঠিপত্রে ভরে ওঠে। ফ্রিজের মধ্যে খাওয়ার কিছু আছে কি না দেখে আমি মনস্থির করি, কাগজপত্রের স্তূপটা ঘেঁটে দেখি—পৃথিবীর কত দাতব্য প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ সাহায্য চেয়ে অনুরোধ করেছে; ব্যাংক, দোকান আর ব্যর্থ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে উপহারের প্রতিজ্ঞা ইত্যাদি ইত্যাদি। দুটো মাত্র প্রথম শ্রেণির চিঠি। একটা সুইটনেস পাঠিয়েছে—‘ও আমার সোনামণি,’ তারপর তার ডাক্তারের উপদেশজাতীয় প্যাচাল, শেষে টাকা-পয়সার গতানুগতিক ইঙ্গিত। আরেকটা সতেরো নম্বর স্ট্রিট থেকে জনৈক সালভাতোর পোন্তি লিখেছেন বুকার স্টারবার্নকে। খুলে দেখি একটা তাগাদা চালান : আটষট্টি ডলার বাকি। একবার মনে হয়, ছিঁড়ে ফেলে ময়লার ঝুড়িতে নিক্ষেপ করি। আবার মনে হয়, গিয়ে জিজ্ঞেস করে দেখি মি. পোন্তি আটষট্টি ডলারের কী সেবা দিয়েছিলেন বুকারকে। কোনটা করব ঠিক করার আগেই টেলিফোন বেজে ওঠে।

 আরে, খবর কী? কাল রাতের অভিজ্ঞতা কেমন হলো? উহ, কী বলব! তুমি তো দোস ঝাক্কাস দেখালে। আগের মতোই একেবারে টাসকি মেরে দেওয়ার মতো ঝলকে ছিলে গো!

 কথা বলার মাঝখান দিয়ে ব্রুকলিন যৌন আনন্দ পাওয়ার মতো শব্দ করে কী যেন খাচ্ছে—ক্যালরিফ্রি, এনার্জি ফিলড, খাদ্যগুণে ভরা, হালকা স্বাদের মাখনের মতো, রাঙানো কিছু একটা।

 তারপর পার্টির পরের ওই ব্যাপারটা দারুণ ছিল না?

 হু, আমি উত্তর দিই।

 তোমার কথায় নিশ্চয়তা শুনতে পাচ্ছি না। যাকে নিয়ে চলে এলে সে কি শেষমেশ মি. রজার্স কিংবা সুপারম্যান-জাতীয় কেউ? কে লোকটা?

 আমি বিছানার পাশের টেবিলের কাছে এগিয়ে গিয়ে চিরকুটটার দিকে আবার ভালো করে তাকিয়ে দেখি, তারপর বলি, জনৈক ফিল।

 কেমন ছিল সে? বিলিকে নিয়ে আমি রোকোর ওখানে গিয়েছিলাম; আমরা ওখানে...।

 ব্রুকলিন, আমার এখান থেকে বের হওয়া দরকার। দূরে কোথাও।

 কী? এখনই?

 আমরা সেদিন নৌকায় বেড়াতে যাওয়ার কথা বললাম না? বুঝতে পারছি, আমার কণ্ঠ ঘ্যানঘ্যান করে বাজছে।

 হ্যাঁ, বলেছি। কিন্তু ইউ, গার্ল চালু হয়ে যাক, তারপর যাই। স্যাম্পল গিফট ব্যাগগুলো চলে এসেছে। বিজ্ঞাপন বানাবে যারা তাদের মাথায়ও দারুণ কিছু আইডিয়া এসেছে।

 ও কথা বলেই যায়। শেষে আমিই জোর করে থামিয়ে দিয়ে বলি, শোনো, পরে ফোন করব আমি। মাথা ঝিম ধরে আছে।

 ইয়ার্কি হচ্ছে, না? ব্রুকলিন হাসতে হাসতে বলে।

 ফোন রেখে দেওয়ার সময় আমি মনস্থির করেই ফেলি, আমি মি. পোন্তির সঙ্গে দেখা করব।

 

সোফিয়া

বাচ্চাদের ধারেকাছে আমাকে যেতে দেওয়া হয় না। প্যারলে মুক্তি পাওয়ার পর প্রথম কাজ পাই বাসাবাড়িতে। আমার ভালোই হয়, কারণ যে মহিলার দেখাশোনা করি তিনি খুব ভালো। আমার সেবা পেয়ে তিনি কৃতজ্ঞও। গোলমেলে শব্দ আর মানুষজনের ভিড়ভাট্টা থেকে দূরে থাকতে পেরে আমিও খুশি। অত্যাচারিত মেয়ে মানুষ আর হারামি পাহারাদারদের উপস্থিতির কারণে ডেকাগন সব সময় সরব। আমাকে ডেকাগনে পাঠানোর আগে এক সপ্তাহ আমি ব্রুকহেভেনে ছিলাম; দেখলাম খাবারের প্লেট হাত থেকে পড়ে গেছে বলে একজন কয়েদিকে বেল্ট দিয়ে মাথার পেছনে বেদম মার দেওয়া হলো। পাহারাদার তাকে বাধ্য করল চার হাত-পায়ে ভর দিয়ে মেঝেতে পড়ে যাওয়া খাবার খেতে। সে খাবার খেতে চেষ্টাও করল। তবে পারল না। বমি করা শুরু করল। শেষে তারা তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। খাবার খুব একটা খারাপ ছিল না; কর্ন পুডিং আর স্পাম। আমার মনে হয়, সে ইনফ্লুয়েঞ্জা কিংবা অন্য কোনো রোগে আক্রান্ত ছিল। ওখানকার চেয়ে ডেকাগনের অবস্থা ভালো। এখানে  পাহারাদাররা প্রতিবার বের হওয়ার আর ঢোকার সময় আমাদের দেহ তল্লাশি করতে পছন্দ করে, শরীরে কিংবা পোশাকের তলায় কোথাও কোনো ক্ষতিকর দ্রব্য লুকিয়ে রেখেছি কি না। কিছুই পাওয়া যেত না। তবু পাহারাদারদের নাটক চলতই। আর যখন এসব চলত না, আমরা আমাদের কাজকর্মে ব্যস্ত থাকতাম তখনো চলত হৈচৈ, ঝগড়া, মারামারি, হাসিঠাট্টা, চিৎকার। আর আলো নেভানোর পরে তো এসবের উৎপাত আরো বেড়ে যেত; গর্জন থেকে শুরু করে কুকুরের ডাক পর্যন্ত শুরু হয়ে যেত। আমার আপাতত সে রকমই মনে হতো। হোমকেয়ার হেলপার হিসেবে কাজ করার কারণেও আমার নীরবতা পছন্দ ছিল। এক মাস পরে অবশ্য আমাকে আর কাজে রাখেনি। কারণ আমি যে মহিলা রোগীর দেখাশোনা করতাম তার নাতি-নাতনিরা সপ্তাহান্তে এসে দেখা করে যাওয়া শুরু করে। আমার প্যারল অফিসার এ রকম আরেকটা কাজ খুঁজে দেন, তবে সেখানেও শিশুদের উপস্থিতি ছিল না। একটা নার্সিংহোম। এখানকার লোকেরা এটাকে সেবাসদন বলতে চাইত না; তবে আসলে এটা একটা সেবাসদনই। প্রথমে এ রকম অন্য একটা প্রতিষ্ঠানে এসে এত লোকজনের মধ্যে থাকতে ভালো লাগত না, বিশেষ করে যেখানে আমাকে এত জবাবদিহি করতে হতো। তবে অভ্যস্ত হয়ে যাই। কারণ আমার ওপরঅলারা অযথা খবরদারি করতেন না। তাঁরাও অবশ্য ইউনিফর্ম পরতেন ঠিকই। যেকোনো জায়গা কোনো দিক থেকে জেলখানার মতো মনে হলেই আমার ভেতর অস্বস্তি তৈরি হয়ে যেত।

 যেভাবেই হোক, আপাতত পনেরোটা বছর কাটিয়ে এলাম। যদি সপ্তাহান্তে বাস্কেটবল খেলা না থাকত, যদি ওখানে জুলির মতো ভালো বন্ধু না পেতাম তাহলে আমার মনে হয় না, এতটা সময় এভাবে কাটাতে পারতাম। আমরা দুজনই শিশু নির্যাতনের অভিযোগে শাস্তি ভোগ করছি বলে প্রথম দুই বছর অন্যরা ক্যাফেটেরিয়ায় আমাদের দুজনকে এড়িয়ে চলত। আমাদের গালিগালাজ করত, ঘৃণা করত। পাহারাদাররাও যখন-তখন আমাদের সেলে নারকীয় অত্যাচার করত। কিছুদিন পর তারা আমাদের কথা প্রায় ভুলে গেল। খুনি, অগ্নিসংযোগকারী, মাদক পাচারকারী, বোমা নিক্ষেপকারী বিপ্লবী, মানসিক বিকারগ্রস্ত—এদের সবার নিচে ছিল আমাদের অবস্থান। শিশুদের ওপর যারা অত্যাচার করে তারা ইতরদের মধ্যে নিকৃষ্ট। তাদের এ রকম ধারণাটা আসলে প্রচলিত মাত্র। কারণ মাদক পাচারকারীরা বাছবিচার করে কাজ করে না, কাকে তারা বিষের নেশায় ডুবিয়ে দিচ্ছে সে ব্যাপারে পরোয়া করে না, বয়স বাছে না। অগ্নিসংযোগকারীরা যেখানে আগুন দেয় সে পরিবারের শিশুদের আলাদা করে দেখার পরোয়া করে না। বোমা নিক্ষেপকারীরাও ছোট বড় বাছাই করে বোমা মারে না। সবখানে শিশুদের ছবি দেওয়া আছে, যেকোনো সাধারণ শিশুর ছবি দেওয়া আছে সেলগুলোর দেয়ালে দেয়ালে। কেউ যদি এই ছবিগুলো ভালো করে দেখে থাকে তাহলে জুলির আর আমার প্রতি অন্য কয়েদিদের ঘৃণার ব্যাপারটা সন্দেহ নিয়ে দেখতে পারবে। যেকোনো শিশুর ছবি ভালো করে দেখলেই বোঝা যায়।

 জুলির সাজা হয়েছে তার নিজের প্রতিবন্ধী শিশুকে গলা টিপে মারার অপরাধে। ওর বিছানার ওপরে দেয়ালে ছোট মেয়েটার ছবি টাঙানো ছিল। মেয়েটার নাম মলি। বড় মাথা, নিথর মুখ। পৃথিবীর আর কোনো শিশুর এত সুন্দর নীল চোখ নেই। রাতে কিংবা অন্য যেকোনো সময়েই জুলি মেয়েটার ছবির সামনে এসে বিড়বিড় করে কথা বলত। মেয়েটার কাছে ক্ষমা চাইত না; তবে গল্প বলত, রূপকথার গল্প। বেশির ভাগ গল্পে কোনো কোনো রাজকন্যা থাকতই। কখনো জুলিকে বলিনি, তবে ওর গল্পগুলো শুনতে আমার খুব ভালো লাগত। জুলির গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তাম। আমরা কাজ করতাম সেলাই শপে। একটা মেডিক্যাল কম্পানির জন্য ইউনিফর্ম বানাতাম। ঘণ্টায় বারো করে দিত আমাদের। কাজ করতে করতে আঙুল আড়ষ্ট হয়ে গেলে, ঠিকমতো মেশিন চালানো অসম্ভব হয়ে পড়লে আমাকে রান্নাঘরে নিয়ে যাওয়া হতো। ওখানে কোনো খাবার ভালো করে সেদ্ধ করতে না পারলে ফেলে দিতাম। তখন আমাকে আবার সেলাইয়ের কাজে ফিরিয়ে নেওয়া হতো। তবে ফিরে গিয়ে আর জুলিকে পাইনি ওখানে। আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছিল সে। তারপর তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। আত্মহত্যা করার পদ্ধতি তার জানা ছিল না। সবচেয়ে নিষ্ঠুর কয়েকজন কয়েদি তাকে দেখিয়ে দিয়েছিল। সবার মাঝে যখন সে ফিরে এলো তখন সে একেবারে আলাদা—শান্ত, নীরব, দুঃখী; আগের মতো মিশুক নয়। আমার মনে হয়, কয়েকজন মহিলা মিলে ওকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করেছিল বলেই এ রকম হয়ে গেছে জুলি। পরে আরেক বয়স্ক মহিলার ভালোবাসার দাসত্বে আটকে যায় জুলি। ওই মহিলাকে সবাই লাভার বলে ডাকত, একজন স্বামীর মতো। তার সঙ্গে কেউ ঠাট্টা-তামাশা করত না। মাঝেমধ্যে ডাকা ছাড়া পাহারাদার কিংবা কয়েদি—কেউই আমাকে ঘাঁটাত না। আমার স্বভাবটাই ছিল লড়াকু; অন্যদের তুলনায় অনেক লম্বা, ডেকাগনের অন্য সবার তুলনায় দৈত্যাকৃতির। আমার এ রকমই পছন্দ; মাখামাখি যত কম ততই ভালো।

 ডেকাগনে এতগুলো বছর কাটালাম; আমার স্বামী জ্যাকের কাছ থেকে মাত্র দুটো চিঠি পেয়েছি। প্রথমটা ছিল ডিয়ার হানিজাতীয় চিঠি। তবু শেষের দিকে অভিযোগের সুর চলে আসে—আমি এখানে (কালো কালি দিয়ে মুছে দেওয়া হয়েছে) হচ্ছি। মানে কী? মার খাচ্ছে? বলাৎকারের শিকার হচ্ছে? নির্যাতিত হচ্ছে? আর কী এমন শব্দ থাকতে পারে ওখানে যেগুলো জেলখানার সেন্সরে কালো কালি দিয়ে মুছে দিয়েছে? দ্বিতীয় চিঠিটা শুরু হয়েছে এভাবে—হারামজাদি, তুই ভাবছিস কী? এ চিঠিটাতে কালো কালি দিয়ে মুছে দেওয়া হয়নি কোনো শব্দ। আমি তার চিঠির কোনো উত্তর দিইনি। আমার মা-বাবা বড়দিনে আর আমার জন্মদিনে উপহার হিসেবে প্যাকেট পাঠিয়েছেন : পুষ্টিকর ক্যান্ডি বার, ঋতুকালে ব্যবহারের জন্য পট্টি, ধর্মীয় প্রচারপত্র আর মোজা। কিন্তু কখনো তাঁরা চিঠি লেখেননি, ফোন করেননি কিংবা দেখাও করেননি। আমি বিস্মিত হইনি। তাঁদের খুশি করা সব সময়ই কঠিন ছিল। পিয়ানোর পাশেই একটা স্ট্যান্ডের ওপর রাখা থাকত পরিবারের বাইবেলটা। রাতের খাবারের পর আমার মা পিয়ানো বাজাতেন। তাঁরা কখনো না বললেও আমি বুঝে গিয়েছি, আমি তাঁদের কাছ থেকে দূরে চলে এসেছি বলে তাঁরা স্বস্তিই পেয়েছেন। তাঁদের ঈশ্বর আর ডেভিডের জগতে কোনো নিষ্পাপ মানুষের শাস্তি হওয়ার কথা নয়।

 আমাকে যেমন যেমন বলা হতো কাজকর্ম ঠিক সেভাবেই করতাম। অনেক পড়াশোনা করতাম। ডেকাগনের সবচেয়ে ভালো দিকটা হলো এখানকার লাইব্রেরি। বাইরের সব পাবলিক লাইব্রেরির এত সব বইপত্র দরকার নেই বলে জেলখানা আর বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে তারা বই পাঠিয়ে দেয়। আমার পরিবারে বাইবেল আর ধর্মীয় নিবন্ধ ছাড়া আর সব কিছুই ছিল নিষিদ্ধ। শিক্ষক হিসেবে মনে করতাম, আমার অনেক পড়াশোনা আছে। অবশ্য কলেজে আমার মেজর শিক্ষা থাকলেও সাহিত্য তেমন পড়া হয়নি। জেলখানায় আসার আগে কখনো ওডিসি পড়িনি, জেন অস্টিনের লেখাও পড়িনি। এগুলোর কোনোটা থেকেই বিশেষ কিছু শিখতে পারিনি। তবে পলায়ন, প্রতারণা আর কে কাকে বিয়ে করবে—এসব বিষয়ের দিকে মনোযোগ দিতে গিয়ে জেলখানার একঘেয়েমি থেকে রেহাই পাওয়া গেছে।

 আমার প্যারলের প্রথম দিন ট্যাক্সি ক্যাবে উঠে আসতে আসতে নিজেকে ছোট বাচ্চার মতো মনে হয়েছিল—বাইরের জগৎ যেন প্রথম দেখছিলাম। বাড়িঘরের চারপাশের ঘাস এত সবুজ দেখাচ্ছিল যেন চোখ ঝলসে যায়। ফুলগুলো আসল মনে হচ্ছিল না; মনে হচ্ছিল আঁকানো। কারণ গোলাপ, ল্যাভেনডার কিংবা সূর্যফুলের রং চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার মতো হতে পারে, তা আমার মনেই ছিল না। সব কিছু যে নতুন সাজে সেজেছে তা-ই নয়, একেবারে ব্র্যান্ড নিউ মনে হলো। বাইরের সতেজ বাতাস পাওয়ার জন্য গাড়ির জানালার কাচ নামিয়ে দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে বাতাস আমার চুলের পেছন পাশে বাড়ি মারতে লাগল। তখনই আমার মনে হলো, আমি মুক্ত। বাতাস আমার চুলে আদর করছে, চুমু খাচ্ছে।

 যে মেয়েরা আমাকে আদালতে দোষী প্রমাণের সাক্ষ্য দিয়েছিল তারা সবাই নিশ্চয় বড় হয়ে গেছে। তাদের একজন ওই দিনই এসে দরজায় নক করল। আমি একটা নোংরা মোটেলে উঠেছিলাম। রুমের ভেতরে আমার অবস্থা ভয়াবহ ছিল—কোনো রকমে খাওয়া শেষ করে একবার ঘুমানোর দরকার ছিল আমার। নিরুপদ্রব নির্জনের ঘুম দরকার ছিল। এখানে পাশের সেলের কোনো রকম আলাপ-আলোচনা, যৌন গোঙানি, শব্দ করে কান্না কিংবা নাক ডাকার শব্দ—কিছুই নেই বলে আরামে ঘুমানো যাবে। খুব বেশি মানুষ নীরবতার মূল্য বুঝতে পারে কিংবা নীরবতাকে সংগীতের সঙ্গে তুলনা করতে পারে বলে মনে হয় না আমার। একা থাকলে কেউ কেউ ছটফট করতে থাকে, কিংবা বেশি নিঃসঙ্গ মনে হতে পারে। পনেরো বছর হৈচৈয়ের মধ্যে থেকে আসার কারণে আমার খাবারের ক্ষুধার চেয়ে নীরবতার ক্ষুধা বেশি ছিল। সুতরাং খাবারগুলো কোনো রকমে মুখে গুঁজে দিয়ে খাওয়া শেষ করি; পরপরই বমিও হয়ে যায়। রুমে ঢুকে গভীর নির্জনতায় ডুবে যেতে চেয়েছিলাম। ঠিক তখনই দরজায় জোরে জোরে শব্দ শুনতে পাই।

 তার চোখের চেহারায় কী একটা চেনা চেনা ভাব ছিল। তবে তাকে চিনতে পারিনি। অন্য জগতে তার কালো ত্বকের তারতম্য হতে পারে। কালো ত্বক কোনো দিক থেকে লক্ষণীয় হতে পারে। কিন্তু ডেকাগনে থাকার কারণে আমার কাছে চোখে পড়ার মতো মনে হয়নি। পনেরো বছর কুিসত ফ্ল্যাট জুতো পরে কাটানোর পর তার ফ্যাশনেবল জুতোতে আমি কিছুটা মনোযোগ দিয়ে ফেলি। কুমিরের কিংবা সাপের চামড়া দিয়ে তৈরি। সামনে আঙুলের দিকে চোখা, পেছনের পাশটা এত উঁচু যে মনে হচ্ছিল সার্কাসের ক্লাউনের রণপা। তার কথা বলার ভঙ্গিতে মনে হলো, আমরা খুব পরিচিত, বন্ধুর মতো। কিন্তু প্রথমে বুঝতেই পারিনি, সে কী বিষয়ে কথা বলছে। শেষে সে যখন আমার দিকে টাকা ফেলে দিল তখনই বুঝতে পারলাম। আমাকে দোষী প্রমাণ করার জন্য সাক্ষ্য দিয়েছিল যে ছাত্রীরা তাদেরই একজন সে। এরাই আমাকে মেরে ফেলেছে, আমার জীবনটা কেড়ে নিয়েছে। কী করে ভাবল সে, টাকা দিয়ে মৃত্যুর মতো পনেরো বছর পুষিয়ে দেওয়া যাবে? সে যে-ই হোক কিছু যায় আসে না। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলেছি তখন। আমার সামনে শয়তান দাঁড়িয়ে আছে, এ রকম শয়তানের বর্ণনা শুনেছি আমার মায়ের কাছে—মন ভোলানো আচরণ কিন্তু অশুভ। শয়তানের ছদ্মরূপে আসা তাকে বের করে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি বিছানায় কুঁকড়ে শুয়ে পড়লাম। শুয়ে পুলিশ আসার অপেক্ষা করতে লাগলাম। অপেক্ষা করতেই থাকলাম। কিন্তু কেউ এলো না। যদি তারা আমার দরজা ভেঙে ঢুকে পড়ত তাহলে দেখতে পেত, পনেরো বছর যে মহিলা জেলখানায় লড়ে শক্ত থেকেছে সে শেষমেশ পরাজিত হয়ে পড়ে আছে। এত বছর পর প্রথমবার কাঁদলাম আমি। ক্রমাগত কেঁদেই চললাম। কাঁদতে কাঁদতেই ঘুমিয়ে পড়লাম। জেগে উঠে নিজেকেই বোঝাতে লাগলাম, স্বাধীনতা এমনি এমনি পাওয়া যায় না। স্বাধীনতার জন্য লড়তে হয়, কাজ করতে হয় এবং নিশ্চিত হতে হয়, স্বাধীনতাকে আমার মতো চালাতে পারি।

 এখন আমার মনে হয়, কালো মেয়েটা তো আমার একটা উপকার করে গেছে। মনের ভেতর তার যে বোকাটে বোকাটে রূপ সেটা নয়, সে যে টাকাটা দিয়েছিল সেটাও নয়। না সে, না আমি আগে থেকে ভাবতে পেরেছি সেই উপকার সম্পর্কে। সেটা হলো, পনেরো বছর আটকে রাখা আমার অশ্রুর অবাধ প্রবাহ, অবাধ মুক্তি। আমি আর আবেগ আটকে রাখিনি। আবেগ আমার কাছে আর দুর্বলতার বিষয় নয়। আমি এখন পরিচ্ছন্ন, আমি এখন সক্ষম।

 

দ্বিতীয় ভাগ

ট্যাক্সি নিয়ে এলে ভালো হতো। এই এলাকায় একটা জাগুয়ার পার্ক করা কম বুদ্ধির কাজ, ঝুঁকিও আছে বটে। বুকার এই এলাকায় এসেছে, ঘুরে বেড়িয়েছে—ভাবতেই চমকে যায় ব্রাইড। তার মনের ভেতর প্রশ্ন জাগে, এখানে কেন? যে পাড়ায় তেমন কোনো হুমকি নেই সেখানে মিউজিক শপ থাকে। সে রকম এলাকায় উল্কি আঁকা পুরুষরা আর পিশাচদের মতো পোশাক পরা অল্প বয়সী মেয়েরা রাস্তার মোড়ে জড়ো হয়ে বসে থাকে না।

 ড্রাইভারকে ব্রাইড যে ঠিকানা দিয়েছিল সে অনুযায়ীই থেমেছে সে। বলেছে, সরি লেডি, আমি এখানে আপনার জন্য আর অপেক্ষা করতে পারছি না। ব্রাইড তখনই বের হয়ে সালভাতোর পন্তির পন অ্যান্ড রিপেয়ার প্যালেসের দরজার দিকে দ্রুত হাঁটা দেয়। ভেতরে ঢুকে বুঝতে পারে, এখানে যে ‘প্যালেস’ কথাটা ব্যবহার করা হয়েছে সেটা আসলে ভুল করে করা হয়নি, বরং বাহ্যজ্ঞানের অভাবেই করা হয়েছে। ধূলিময় কাচের কাউন্টারের নিচে সারি সারি অলংকার আর ঘড়ি রাখা আছে। বয়স্ক মানুষের যতটা ভালো চেহারা হতে পারে তেমন একজন মানুষ কাউন্টার থেকে নেমে ব্রাইডের দিকে এগিয়ে আসেন। অলংকার ব্যবসায়ীর ঝানু চোখে তিনি তাঁর কাস্টমারের চেহারার যতটুকু ধারণ করা যায় করলেন।

 মি. পোন্তি?

 আমাকে স্যালি বলুন, সুইটহার্ট। কী করতে পারি আপনার জন্য?

 ব্রাইড বাকির নোটিশটা এগিয়ে দিয়ে ব্যাখ্যা করে বোঝাল, সে পাওনাটা পরিশোধ করে কী মেরামত করতে দেওয়া হয়েছে সেটা নিয়ে যেতে এসেছে।

 নোটিশটা পরীক্ষা করে দেখে স্যালি বললেন, ওহ, হ্যাঁ, বুড়ো আঙুলের আংটি। মাউথপিস। এগুলো পেছনের দিকে রয়েছে। আসুন।

 পেছনের দিকের এক রুমে একসঙ্গে গেল তারা। দেয়ালে গিটার আর শিঙা ঝোলানো আছে। টেবিল ক্লথের উপরিভাগটা ঢেকে রেখেছে অনেক মেটাল পিস। ব্রাইডকে দেখার জন্য এবং তারপর নোটিশটা দেখার জন্য ওখানে কর্মরত একজন লোক ম্যাগনিফাইং গ্লাস থেকে চোখ তুলে তাকালেন। একটা কাবার্ডের দিকে এগিয়ে গিয়ে বেগুনি রঙের কাপড়ে মোড়ানো একটা ট্রাম্পেট সরালেন।

 মেরামতকারী বললেন, তিনি তো সেই সুন্দর আংটিটার কথা বলেননি। তবে আমি তাকে একটা দিয়েছিলাম। খুব খুঁতখুঁতে মানুষ, দেখছি।

 ব্রাইড একটা শিঙা হাতে নিতেই মনে হলো, বুকারের এই জিনিস আছে কিংবা সে এটা বাজাতে পারে তা তো জানা নেই! এ বিষয়ে ব্রাইডের কৌতূহল থাকলে সে নিশ্চয় জানত, বুকারের ওপরের ঠোঁটে কালো টোল পড়ার কারণ হলো এই শিঙা। স্যালিকে প্রাপ্য টাকা দিয়ে দিল ব্রাইড।

 মেরামতকারী বলল, গ্রামের ছেলে হিসেবে ভালো অভ্যাস বলা যায়।

 গ্রামের ছেলে? ব্রাইড ঠোঁট উল্টে জিজ্ঞেস করল। সে তো গ্রামের ছেলে নয়। সে এখানেই থাকে।

 স্যালি বললেন, ও তাই? তিনি তো আমাকে বলেছিলেন তিনি উত্তরের কোনো মফস্বল থেকে এসেছেন।

 মেরামতকারী বললেন, হুইস্কি।

 কী বলছেন আপনারা?

 শুনতে মজার মনে হচ্ছে, না? হুইস্কি নামের শহরের কথা কেউ কি ভুলতে পারে? কেউ পারে না।

 তাঁদের দুজনের হাসি নাকের ভেতর থেকে আওয়াজ বের করে ফেলছে। হাসতে হাসতে এ রকম আরো কয়েকটা স্মরণীয় শহরের নাম বললেন তাঁরা, পেনসিলভানিয়ার ইন্টারকোর্স, কলোরাডোর নো নেম, মিশিগানের হেল, নিউ মেক্সিকোর এলিফ্যান্ট, কেনটাকির পিগ, মিসৌরির টাইটওয়াড। ক্লান্ত হয়ে শেষে তাঁরা তাঁদের কাস্টমারের দিকে নজর ফেরালেন।

 স্যালি বললেন, দেখুন, তিনি আমাদের আরেকটা ঠিকানা দিয়েছেন। তিনি রোলেডেক্সের পৃষ্ঠা উল্টাতে লাগলেন। হ্যাঁ, একজনের নাম অলিভ। কিউ অলিভ, হুইস্কি, ক্যালিফোর্নিয়া।

 কোনো রাস্তার নাম নেই?

 কাম অন হানি, যে শহরের নাম হুইস্কি সেখানে রাস্তা আছে কে বলেছে? নিজেকে আমোদের মধ্যে রাখছেন, আর তাঁর কাস্টমার কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েটাকে দোকানের মধ্যেই রাখছেন স্যালি। তিনি বললেন, হরিণের চলার পথ আছে ওই জায়গায়।

 খুব দ্রুতই ব্রাইড ওখান থেকে বের হয়ে এলো। দ্রুতই বুঝতে পারল, বাইরে ট্যাক্সি ক্যাব নেই। দোকানে ফিরে এসে স্যালিকে অনুরোধ করল ফোন করে তার জন্য একটা ট্যাক্সি ডেকে দিতে।

 

সোফিয়া

আমার দুঃখ পাওয়ার কথা। বাবা আমার সুপারভাইজারকে ফোন করে বলেছেন, মা মারা গেছেন। আমার প্যারল অফিসার অনুমতি দেবেন আশা করে আমি বিমানের টিকিটের খরচ হিসেবে অগ্রিম পাওনার কথা বললাম। মায়ের দাফনে অংশ নেওয়ার ইচ্ছা। যে গির্জায় দাফনের কাজ হবে সেটার প্রতি ইঞ্চি আমার চেনা। বেঞ্চের পেছনে বাইবেল রাখার কাঠের হোল্ডার। রেভারেন্ড ওয়াকারের মাথার পেছনের জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়া নীলাভ আলো, তারপর সেখানকার নানা রকম গন্ধ—পারফিউম, তামাকের গন্ধ, আরো কী কী সব গন্ধ, মনে হয় ঈশ্বরের অস্তিত্বের একটা গন্ধ পেতাম। গির্জার পরিবেশ বেশ পরিষ্কার ঝকঝকে। উঁচু সিলিংয়ের গির্জায় ভালোলাগার মতো একটা পরিবেশ পাওয়া যেত। আমার মায়ের ডাইনিং রুমের কোনার মতো। আমার নিজের মুখের চেয়েও ভালো চিনতাম নীল আর সাদা ওয়ালপেপার। তুষারের মতো সাদার বিপরীতে গোলাপ, লাইলাক আর ক্লেমাটিসের নীল ছায়া। মাঝেমধ্যে আমাকে ওখানে দাঁড়িয়ে থেকে শাস্তি পেতে হতো, কখনো কখনো দুই ঘণ্টার মতো দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। কী অপরাধে তা এখন আর মনেটনে নেই, তখনো কোনো কোনো অপরাধের কথা আমি জানতামই না। কী করেছি? অন্তর্বাস ভিজিয়ে ফেলেছি? প্রতিবেশীর ছেলের সঙ্গে রেসলিংয়ের মতো মারামারি করেছি? মায়ের বাড়ি থেকে বের হতে আমার সময় লাগেনি। বাইরে বের হওয়ার পর যে ব্যক্তির কাছ থেকে প্রথম প্রস্তাব পেয়েছি তাকেই বিয়ে করেছি। তার সঙ্গে দুই বছর একই রকম ছিল : আনুগত্য, নীরবতা, আরেকটা বড় নীল-সাদা কোনা। শিক্ষকতার কাজ থেকেই শুধু আনন্দ পেয়েছি।

 স্বীকার করতেই হবে, আমার মায়ের শাসন আর নিয়মানুবর্তিতার শিক্ষা আমার জন্য শুভ হয়েছে। ডেকাগনে আমার টিকে থাকার শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। আমার মুক্তির দিন পর্যন্ত সে শিক্ষা আমার পাথেয় হয়ে ছিল। মুক্তির আনন্দে সেদিন আমি শিস বাজিয়েছি। আমার বিরুদ্ধে যে কৃষ্ণাঙ্গ মেয়ে সাক্ষ্য দিয়েছিল তাকে পিটিয়েছি। পিটিয়ে, লাথি মেরে, ঘুষি মেরে আনন্দ পেয়েছি। জেলখানা থেকে মুক্তি পাওয়ার চেয়েও বেশি আনন্দ। আমার তখন মনে হচ্ছিল, আমি নীল-সাদা ওয়ালপেপার টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেলছি, চড়থাপড় ফিরিয়ে দিচ্ছি, আর আমার মা যে শয়তানকে ভালো করে চিনত সেই শয়তানটাকে আমার জীবন থেকে তাড়িয়ে দিচ্ছি।

 তার কী হলো আমার জানতে ইচ্ছা করে। সে পুলিশ ডাকল না কেন? তখন তার ভয়ে জমে যাওয়া দৃষ্টি দেখতেও ভালো লেগেছিল আমার। কয়েক ঘণ্টা কাঁদার কারণে আমার চোখ-মুখ ফুলে গিয়েছিল। সে অবস্থায়ই পরদিন সকালে দরজা খুললাম। হালকা রক্তের দাগ লেগে আছে পেভমেন্টের ওপরে। পাশেই একটা দুল পড়ে আছে। মনে হয়, ওই মেয়েটার, কিংবা তার না-ও হতে পারে। যা-ই হোক, আমি রেখে দিলাম। এখনো আমার ওয়ালেটে রয়ে গেছে। কিসের জন্য রেখেছি? এক ধরনের স্মৃতি রক্ষা? যখন আমার রোগীদের সেবাযত্ন করি—তাদের দাঁত মুখের ঠিক জায়গায় লাগিয়ে দিই, বিছানায় পড়ে থাকার কষ্ট লাঘবের জন্য তাদের পিঠ মুছে দিই, ঊরু মুছে দিই কিংবা লোশন দেওয়ার আগে তাদের পাতলা ত্বক স্পঞ্জ করে দিই, আমার মনে হয় কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েটাকেই ভালো অবস্থায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি। আমার মানসিক মুক্তির জন্য মনে মনে মেয়েটাকে ধন্যবাদ জানাই।

দুঃখিত মা।

দিগন্তরেখাটাকে দূরবর্তী বন্ধুত্বের শর্তে ভাগাভাগি করে নিয়েছে সূর্য আর চাঁদ। একের ওপরে অপরের প্রভাব পড়েনি। ব্রাইড আলোটা খেয়াল করেনি। কী রকম উৎসবের চেহারা চলে এসেছে আকাশের গায়ে। শেভিং ব্রাশ আর রেজরটা ট্রাম্পেটের খোলে ভরে ট্রাংকের মধ্যে রাখা আছে। জাগুয়ারের রেডিওতে সংগীতের সুর শুনতে পাওয়ার আগ পর্যন্ত ব্রাইডের মনে ওই দুটো জিনিসের কথাই ঘুরপাক খাচ্ছিল। নিনা সিমোনের কণ্ঠ ভেসে আসছে। কী রকম সর্বপ্লাবী সংগীত! ব্রাইডের নিজের কথা ভুলিয়ে মন অন্য কোথাও নিয়ে যাচ্ছে। ব্রাইড আরো কোমল জ্যাজের জন্য সুইচ টিপে দিল যাতে গাড়ির চামড়ার তৈরি ভেতরের অংশের সঙ্গে মানানসই হয় আর তার দুশ্চিন্তা দূর করার জন্য আরামদায়ক মনে হতে পারে। এমন বেপরোয়া কাজ সে আগে কখনো করেনি। সে জানে, এ রকম দুর্গম পথে বেরিয়ে পড়ার কারণ শুধু যে প্রেম তা নয়। ক্ষোভও নয়, বরং আহত অনুভূতিই তাকে তাড়িত করেছে এমন অচেনা এলাকায় গাড়ি হাঁকিয়ে বের হয়ে পড়তে। একদিন যাকে বিশ্বাস করেছিল সে, যে মানুষটা তাকে নিরাপত্তাবোধ দিয়েছিল, তাকে অধিকার করে রেখেছিল কিছুটা, সেই মানুষটাকেই খুঁজতে বের হয়েছে সে। তাকে ছাড়া জগত্টা কেমন হয়ে গেছে। গোলমেলে বললে কম বলা হয়; অগভীর, নিরুত্তাপ, শয়তানসুলভ হিংস্র হয়ে গেছে। জগত্টা আবার তার মায়ের বাড়ির পরিবেশের মতো হয়ে গেছে। মায়ের বাড়িতে কী করতে হবে, কী বলতে হবে কিংবা সেখানে কী আইন আছে না আছে কিছুই বুঝত না। চামচটা নাশতার বাটির ভেতরে রাখবে, নাকি বাটির পাশে বাইরে রাখবে; জুতার ফিতা সোজা করে বাঁধবে নাকি গিঁট দিয়ে বাঁধবে; মোজা ভাঁজ করে রাখবে নাকি পায়ের গুল পর্যন্ত তুলে রাখবে—কোনোটাই তার কাছে পরিষ্কার ছিল না। কোন আইন কখন ছিল আর বদলেই বা গেল কখন? প্রথমবারের মাসিকের রক্তে বিছানার চাদর নষ্ট করেছিল বলে সুইটনেস তাকে চড় মেরে, ধাক্কা দিয়ে ঠাণ্ডা পানির একটা টবের মধ্যে বসিয়ে দিয়েছিল। মার খাওয়ার কষ্ট ভুলে গিয়েছিল ব্রাইড। পারতপক্ষে কখনোই মা তাকে ছুঁতে চাইত না। সেই মা তাকে চড় মেরেছে—এটাই ব্রাইডের সান্ত্বনা।

 সব রকম আরাম, ভালো লাগা আর আবেগের নিরাপত্তা কেড়ে নিয়ে তাকে ফেলে রেখে কিভাবে চলে যেতে পারল বুকার? ঠিক আছে, ওর কথার তাত্ক্ষণিক জবাবে ব্রাইড হয়তো বোকার মতো, বেকুবের মতো কথা বলে ফেলেছে। জীবন সম্পর্কে ধারণা না থাকা থার্ড গ্রেডের কারো উসকানিমূলক কথার মতো হয়েছে। ও আসলে ত্রাতা না হয়ে ব্রাইডের বেদনারই অংশ হয়েছে। ওর কারণেই ব্রাইডের জীবনটা বধ্যভূমির মতো হয়ে গেছে। জীবনের অনেক অংশকে ব্রাইড এত দিন সেলাই করে জোড়া দেওয়ার মতো করে একত্রিত করেছিল : ব্যক্তিগত মোহিনী রূপ, উত্তেজনাকর এমনকি সৃষ্টিশীল পেশায় নিয়ন্ত্রণ, যৌন স্বাধীনতা আর সবচেয়ে বড় হলো তাকে সুরক্ষা দেওয়ার মতো ঢাল যেটা ক্ষোভ বিব্রতকর অবস্থা কিংবা প্রেমজাত যেকোনো অতিরিক্ত প্রবল আবেগানুভূতি থেকে তাকে আড়াল করে রাখত—এসবই সে একত্রিত করেছিল। শারীরিক আক্রমণের প্রতি তার প্রতিক্রিয়াটা ব্যাখ্যাহীন সম্পর্ক-ভাঙনের প্রতি প্রতিক্রিয়ার চেয়ে কোনো অংশেই কম ভীরুতার মনে হয়নি। প্রথমটা অশ্রু ঝরিয়েছে। আর দ্বিতীয়টার প্রতিক্রিয়া হলো—ও, তাই? সোফিয়ার হাতে মার খাওয়া কিছুটা সুইটনেসের হাতে মার খাওয়ার মতো। তবে পার্থক্য হলো, সুইটনেসের হাতে মার খেলেও তার হাতের ছোঁয়ার আনন্দ পাওয়া যেত। দুটো পরিপ্রেক্ষিতই বিমূঢ় করে দেওয়া নিষ্ঠুরতার সামনে তার অসহায়ত্বকেই প্রকট করে তুলেছে।

 অতিশয় দুর্বল আর ভীত হওয়ার কারণে সুইটনেস, বাড়িঅলা কিংবা সোফিয়া হাক্সলি—কাউকেই মোকাবেলা করার শক্তি ছিল না ব্রাইডের। সে জন্যই জীবনে কিছু করার ছিল না তার। শেষে যে মানুষটার কাছে নিজের হৃদয় উজাড় করে দিয়েছে তার সামনে দাঁড়ানোর শক্তি পেয়েছে। অবশ্য আগে সে জানতেই পারেনি, মানুষটা তার সঙ্গে খেলা করেছে। সামনে দাঁড়ানোর জন্য চাই সাহস। আর নিজের পেশাগত জীবনে সফল হওয়ার ফলে ব্রাইড জেনেছে, তার এই জিনিসটা এখন আছে। চমকপ্রদ সৌন্দর্য আর সাহস দুটোই তার আছে।

 স্যালির দোকানের লোকেরা তো বলেছে, হুইস্কি নামক জায়গায় সে থাকে। হতে পারে, সে ওখানেই ফিরে গেছে। আবার তেমন না-ও হতে পারে। হতে পারে, সে কিউ অলিভ নামের মহিলার সঙ্গেই আছে। তাকেও হয়তো সে মন থেকে না চাইতে পারে। আবার তাকে ফেলে অন্য কোথাও চলেও গিয়ে থাকতে পারে এত দিনে। ঘটনা যা-ই হোক, ব্রাইড তাকে খুঁজে বের করবেই; জোর করে হলেও তার কাছ থেকে জানতে চাইবে, কেন সে ব্রাইডের প্রতি ভালো আচরণ করল না। আরেকটা কথা জানতে চাইবে, ‘সে নারী নও’ মানে কী? কে সেই নারী? কে নয়? এই যে এখন যে নারী ঝিনুকের মতো সাদা রঙের পোশাক আর ঘষে চাঁদের রঙের মতো মসৃণ করা খরগোশের লোমের জুতা পরে জাগুয়ার গাড়ি চালাচ্ছে সে কি ওই নারী নয়? যারা তাকে ভালো করে দেখেছে তার সুন্দর চোখের জন্য তারা সবাই তাকে সুন্দর বলেছে। যে নারী বিলিয়ন ডলারের কম্পানির একটা শাখা চালায় সে তার সেই কাঙ্ক্ষিত নারী নয়? এ নারী তো ইতিমধ্যে নতুন পণ্যে ব্যবসার রাস্তা খোলার কথা কল্পনা করেছে, যেমন আইল্যাশের কথা বলা যায়। সব নারীই (তার পছন্দের কি না) আকর্ষণীয় স্তন ছাড়াও দীর্ঘ ঘন আঁখিপল্লবের কথা ভাবে। গোখরার মতো সরু শরীর থাকতে পারে কোনো নারীর, উপোস থেকে শরীর পলকা হয়ে যেতে পারে। কিন্তু তার যদি আঙুরের মতো স্তন থাকে আর রেকুনের মতো চোখ থাকে তাহলেই তো তার খুশিতে আত্মহারা হওয়ার কথা। ঠিক হয়ে যাবে। সেও ঠিক হয়ে যাবে। এই ভ্রমণটা শেষ করার পর তারও সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে।

 প্রথমে সে পূর্ব দিকে তারপর উত্তর দিকে চালাতে লাগল। মহাসড়কটায় মানুষের আনাগোনা ক্রমেই কমে আসছে। মনে হচ্ছে, শিগগিরই রাস্তার খুব কাছ থেকে বনবনানী তার দিকে তাকিয়ে থাকবে। গাছেরা সব সময় এ রকমই করত বলে মনে হয় তার। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সে নর্থভ্যালি এলাকায় চলে যাবে; চোখের সামনে দেখতে পাবে লগিং ক্যাম্পস, তার চেয়েও কম বয়সী ছোট ছোট পাড়াগাঁ, আর উপজাতীয়দের সমান বয়সী কাঁচা রাস্তাঘাট। একটা স্টেট মহাসড়কে থাকতেই কিছু খেয়ে নেওয়ার মতো পাওয়া যায় কি না দেখতে চাইল সে। যে এলাকায় আরাম-আয়েশের কোনো ব্যবস্থা পাওয়া যাবে না সেদিকে ঢোকার আগেই খেয়ে নিয়ে নিজেকে একটু সতেজ করা দরকার। একটা বিলবোর্ডে অনেক চিহ্ন দেখা যাচ্ছে; একটা গ্যাসের, চারটা খাবারের, দুটো থাকার ব্যবস্থার। আরো তিন মাইল পার হওয়ার পর ব্রাইড মহাসড়ক ছেড়ে একটা মনোরম জায়গা দেখে গাড়ি দাঁড় করাল। খাবারের রেস্তোরাঁটা খালি, একেবারে দাগহীন। বিয়ার আর তামাকের যে গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে তাও তো অনেক আগেকার মনে হচ্ছে। আমেরিকার জাতীয় পতাকার সঙ্গে আরেকটা কনফেডারেট পতাকা জড়াজড়ি করে উড়ছে; সেটাও পুরনো।

 জি বলুন? কাউন্টারে যে ওয়েট্রেস মহিলা তার চোখে রাজ্যের বিস্ময়; বড় বড় চোখে সে ব্রাইডের চেহারার এদিক-সেদিক দেখে যাচ্ছে সমানে। এ রকম চাহনির সঙ্গে ব্রাইড অনেক আগে থেকেই পরিচিত। মহিলার মুখটাও হাঁ করা। এ ভঙ্গিটাও ব্রাইডের পরিচিত। তার স্কুলের প্রথম দিনের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। হতাশার, দুঃখের। মনে হচ্ছে, তার চোখ তিনটা।

 পনির ছাড়া সাদা ওমলেট হবে?

 সাদা? মানে ডিম ছাড়া?

 না। কুসুম ছাড়া।

 শ্রমজীবী মানুষের খাবার, তবে তার পক্ষে হজম করার মতো, সেই খাবারই যতটা পারে খেয়ে নিল ব্রাইড। তারপর জিজ্ঞেস করল, লেডিস রুমটা কোন দিকে। ওদিকে যাওয়ার আগেই কাউন্টারে সে পাঁচ ডলারের একটা নোট রেখে গেল যাতে মহিলা ভাবতে না পারে, সে কেটে পড়ছে। বাথরুমে ঢুকে নিশ্চিত হলো, লোমহীন জননেন্দ্রিয় সম্পর্কে এখনো আতঙ্কিত হওয়ার মতো কারণ আছে। তারপর সিংকের ওপরের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখতে পায়, তার ঘাড়ের কাছে কাশ্মীরি পোশাকটা কেমন ঢিলা হয়ে গেছে। একদিকে খানিক ঢলে পড়ার কারণে তার কাঁধের খানিকটা বের হয়ে আছে। কাঁধের ওখানটায় ঠিক করে নিয়ে বুঝতে পারল, ঠিকমতো না দাঁড়ানো কিংবা পোশাকটা ঠিকমতো না বসানোর কারণে ওখানে ঢিলা হয়ে গেছে তা নয়। কাঁধের কাছে পোশাকটায় টোল খেয়ে যাওয়ার কারণ হলো, ২ নম্বর সাইজের বদলে সে হয়তো ৪ নম্বর সাইজ কিনে ফেলেছে। আর এখন আয়নার সামনে সেই পার্থক্যটা চোখে পড়ে গেছে। কিন্তু এই যাত্রা শুরু করার সময় তো পোশাক ঠিকই ফিট ছিল। মনে হচ্ছে, কাপড়ে ত্রুটি আছে, কিংবা বানানোর ডিজাইনে ত্রুটি আছে। আবার হতে পারে, খুব দ্রুত তার ওজন কমে যাচ্ছে। এটা কোনো সমস্যা নয়। তার ব্যবসার কাজের জন্য খুব হালকা হওয়া কোনো সমস্যা নয়। সে শুধু আরো সতর্কতার সঙ্গে পোশাক কিনবে। কানের লতির প্রসঙ্গটা মনে পড়ে যাওয়ায় একটু মন খারাপ হলো; তবে সেটাকে শরীরের আর কোনো পরিবর্তনের সঙ্গে মেলানো ঠিক হবে না, জানে ব্রাইড।

 ভাংতি ফিরিয়ে নিয়ে বকশিশ দেওয়ার সময় ব্রাইড ওয়েটারের কাছে হুইস্কি যাওয়ার রাস্তার কথা জিজ্ঞেস করল।

 বেকুবের হাসি দিয়ে বস্ফািরিত চোখের মহিলা বলল, খুব বেশি দূর হবে না। এক শ মাইলের মতো, কিংবা হতে পারে দেড় শ মাইল। সন্ধ্যা নামার আগেই পৌঁছে যাবেন।

 ব্রাইডের কাছে বিস্ময়ের মনে হলো, তাহলে এই হলো পিছিয়ে থাকাদের কাছে ‘খুব বেশি দূরে নয়’? এক শ পঞ্চাশ মাইল তাহলে বেশি দূরে নয়? গাড়িতে গ্যাস নিয়ে, টায়ার পরীক্ষা করে নিয়ে মনোরম জায়গাটা ছেড়ে বেশ কিছুদূর এসে মহসড়কে উঠে পড়ল। ওয়েট্রেসের নিশ্চয়তার সত্যতা মোটেও পাওয়া গেল না। মহাসড়ক ধরে এগিয়ে যেতে যেতে একটা জায়গায় ‘হুইস্কি রোড’ লেখা দেখতে পেল। কোনো সংখ্যা লেখা নেই, শুধু নামটা। ওখান থেকে নেমে যেতে হবে। ওই জায়গায় পৌঁছতেই সন্ধ্যা নেমে এলো।

 রাস্তাটা বাঁধানো। চাপা, আঁকাবাঁকা, তবে বাঁধানো। সে কারণেই হয়তো ব্রাইড হাই বিম হেডলাইটের ওপর ভরসা রেখে গাড়ির গতি বাড়িয়ে দেয়। আগে থেকে মোটেও খেয়াল করেনি, সামনে একটা আকস্মিক বাঁক রয়েছে। বাঁকটা খুব দ্রুত চলে এসেছে। ব্রাইড চেষ্টা করেছে ঠিকই। কিন্তু গাড়িটা আর রক্ষা করতে পারেনি। পাশেই একটা বিরাট গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছে। গাছটার অবয়ব কোনো রকমে দেখেই বুঝেছে, এটা যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আর পুরনো গাছ। চারপাশ থেকে ঝোপঝাড় আর লতাগুল্ম দিয়ে গাছটার গোড়ার দিকটা ঢাকা। ব্রাইড এয়ার ব্যাগের সঙ্গে বাড়ি খেল; খুব দ্রুত পাক খেয়ে প্রচণ্ড ব্যথা পেলেও প্রথম মুহূর্তে বুঝতে পারেনি, তার পা ব্রেক প্যাডেল আর বাকল্ড ডোরের মাঝে মচকে আটকে গেছে। যখন পা ছাড়াতে চেষ্টা করছে তখন বুঝতে পারে, শুধু ব্যথাই পাচ্ছে, পা আর ছাড়াতে পারছে না। শুধু সিটবেল্টটা খুলতে পারে, তা ছাড়া আর কোনো কিছু থেকে কোনো রকম সুবিধা করতে পারে না। চালকের আসনে পড়ে থেকে বাঁ পা খরগোশের পশম দিয়ে তৈরি বুট থেকে একটু ঢিলা করার চেষ্টা করে। কিন্তু চেষ্টায় শুধু ব্যথাই পায়। বুঝতে পারে, পা ছাড়ানো অসম্ভব। গা খানিকটা এলিয়ে দিয়ে আঁকাবাঁকা হয়ে অনেক কষ্টে সেল ফোনটা বের করতে পারে। কিন্তু ফোনের স্ক্রিন অন্ধকার। শুধু ‘নো সার্ভিস’ লেখা ভাসছে। অন্ধকারে রাস্তা দিয়ে চলে যাওয়া কোনো গাড়ির আশা করা বাতুলতা; তবে একেবারে অসম্ভবও নয়। সুতরাং ব্রাইড বেপরোয়া হয়ে গাড়ির হর্ন বাজাতে চেষ্টা করে। শুধু দু-চারটে পেঁচাকে ভয় দেখানোর বেশি কিছু করতে পারে না হর্ন। অন্য কাউকে ভয় দেখাতে পারে না। কারণ হর্ন থেকে আদৌ কোনো শব্দই বের হয় না। সারা রাত ওখানে চুপ করে শুয়ে থাকা ছাড়া কিছু করার নেই। রাগ, ক্ষোভ, ব্যথা আর কান্নাকে সঙ্গী করে পড়ে থাকতে হবে। চাঁদটাকে দেখে মনে হচ্ছে, ফোকলা মুখে দেঁতো হাসি দিচ্ছে। তারাগুলোও মনে হয় তাকে ভয় দেখাতেই চাচ্ছে। যে গাছের ভেতর দিয়ে আকাশ দেখা যাচ্ছে সেটারও একটা ডাল উইন্ডশিল্ডের ওপরে ভেঙে পড়েছে। মনে হচ্ছে, এটা বিরাট একটা হাত, গাড়িটাকেই গলা টিপে ধরতে চাচ্ছে। আকাশের যে টুকরো অংশ দেখতে পাচ্ছে সেটা চকচকে ছুরির সমাহারে তৈরি একটা কার্পেট মনে হচ্ছে। ছুরিগুলো তার দিকেই তাক করা, এখনই তার দিকে ধেয়ে আসবে। ব্রাইডের মনে এ রকম বোধ চলে আসছে, কোনো অশুভ শক্তি তাকে সাহসী অভিযাত্রী থেকে পলায়নপর ভীরু ব্যক্তিতে রূপান্তর করে দিয়েছে।

 খুবানির টুকরোর মতো সূর্যটা উদিত হওয়ার আভাস দিচ্ছে; নিজের পুরোপুরি আবির্ভাবের বার্তা দিয়ে আকাশকে আগে জ্বালাতন করছে। শরীরের আটক অবস্থা আর ব্যথার আঘাতে জর্জরিত ব্রাইড ভোরের আবির্ভাবে একটু আশার আলো দেখতে পায়। হেলমেটহীন কোনো মোটরসাইকেলচালক, গুঁড়ি বোঝাই ট্রাক, ধারাবাহিক ধর্ষণকারী, বাইকের ওপরের কোনো বালক, কোনো ভালুক শিকারি—কেউ কি নেই তার দিকে হাত বাড়িয়ে দেওয়ার? সে যখন ভাবছে কে বা কিসে তাকে উদ্ধার করবে ঠিক তখনই হাড়ের মতো সাদা একটা মুখ তার গাড়ির প্যাসেঞ্জার পাশের জানালায় চলে এলো। একটা মেয়ে, বয়স খুব অল্প, একটা কালো বিড়ালের বাচ্চা কোলে নিয়ে ব্রাইডের দিকে তাকাল। মেয়েটার চোখ খুব ঘন নীল। এত নীল চোখ আর কারো দেখেনি ব্রাইড।

 হেল্প মি! প্লিজ, হেল্প মি, বলে চিৎকার দিতে পারত ব্রাইড। কিন্তু চিৎকার করার শক্তিই তার নেই।

 মেয়েটা অনেকক্ষণ ধরে দেখল ব্রাইডকে। তারপর অন্যদিকে ফিরে চলে গেল।

 ব্রাইড শুধু ফিসফিস করে বলতে পারল, হায় ঈশ্বর! সে কি ধাঁধা দেখল? যদি ধাঁধা না-ই হয়ে থাকে তাহলে মেয়েটা সাহায্য করতে ফিরে আসবে। মানসিক প্রতিবন্ধী কিংবা বংশগতভাবে উগ্র স্বভাবের কেউও তাকে এ অবস্থায় ফেলে রেখে যাবে না। এমনটা কেউ করতে পারে? সারা রাত তেমন কিছু মনে না হলেও ভোরবেলা হঠাৎ করে মনে হলো, আশপাশের সব গাছপালা বেশি প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে তাকে ভয় দেখানোর জন্য। নীরবতা কেমন আতঙ্কজনক মনে হচ্ছে। বেপরোয়া হয়ে ব্রাইড সিদ্ধান্ত নেয়, সে ইগনিশন চালু করে পেছনের দিকে যেতে যেতে জাগুয়ার গাড়িটাকে ওখানেই বিস্ফোরণ ঘটিয়ে শেষ করে দেবে। তাতে তার নিজের পা থাকুক, আর না-ই থাকুক। ইগনিশনের চাবি ঘোরানোর সময় টের পেল, অকেজো ব্যাটারির শুকিয়ে যাওয়া শব্দ। আর ঠিক তখনই একজন লোক চলে এলো। লোকটার মুখে দাড়ি, মাথার সোনালি চুল লম্বা, সরু চোখ। ধর্ষণ? খুন? লোকটাকে জানালার ভেতর দিয়ে ত্যারচা চোখে তার দিকে তাকাতে দেখে কাঁপা শুরু করল ব্রাইড। তারপর সে লোকটাও চলে গেল। ব্রাইডের মনে হলো, কয়েক ঘণ্টা চলে গেছে। তবে মাত্র কয়েক মিনিটের মাথায় লোকটা একটা করাত আর ক্র্যাবার নিয়ে ফিরে এলো। ভয়ে সিটিয়ে ব্রাইড দেখতে লাগল, লোকটা গাড়ির ওপর পড়ে থাকা বড় ডালখানা করাত দিয়ে কাটছে। তার পেছনের পকেট থেকে একটা ভাইস বের করে জোরে চাপ দিয়ে দরজা খুলে ফেলল। ব্রাইডের ব্যথাকাতর চিৎকার শুনে চমকে উঠল পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নীল চোখের মেয়েটা। সে ওখানে দাঁড়িয়ে মুখ হাঁ করে চলমান দৃশ্য দেখছিল। লোকটা খুব যত্নের সঙ্গে ব্রাইডের পা ব্রেক প্যাডেলের ভেতর থেকে বের করে তাকে গাড়ির ভাঙা দরজার বাইরে নিয়ে এলো। তার লম্বা চুল সামনের দিকে ঝুলে পড়েছে। মুখে কোনো রকম আরাম দেওয়ার মতো কথা না বলে নীরবে ব্রাইডকে তার বাহুতে ঠিকমতো তুলে নিল। পান্না চোখের মেয়েটাকে পাশে নিয়ে ব্রাইডকে কোলে করে প্রায় আধামাইল বালুময় রাস্তা পেরিয়ে গেল। তার গন্তব্য একটা গুদামের মতো ঘর। এ রকম ঘর খুনিরা আখড়া হিসেবে ব্যবহার করে। অবিরাম ব্যথায় লোকটার বাহুর মধ্যে ব্রাইড কয়েকবার শুধু বলতে পারল, আমাকে ব্যথা দেবেন না, আমাকে ব্যথা দেবেন না। তার পরই জ্ঞান হারাল।

 তার ত্বক এত কালো কেন?

 যে কারণে তোমার ত্বক এত সাদা।

 তার মানে আমার বিড়ালের বাচ্চার মতো?

 ঠিক বলেছ। জন্মের সময় থেকেই এ রকম।

 ব্রাইড খুশিতে দাঁতে শব্দ করে ভাবতে থাকে, বাহ্ মা-মেয়ের মধ্যে কী সুন্দর কথোপকথন! একটা নেভাজো কম্বলের নিচে ঘুমের ভান করে তাদের কথা শুনতে থাকে ব্রাইড। একটা বালিশের ওপরে পা রাখা আছে; পশমঅলা জুতোর মধ্যে থাকলেও ব্যথায় টনটন করছে। উদ্ধারকারী লোকটা তাকে বাড়ির মতো এই জায়গাটাতে নিয়ে এসেছে। তাকে ধর্ষণ কিংবা অন্য কোনো অত্যাচার করার বদলে বরং তার স্ত্রীকে ব্রাইডের দেখাশোনা করার দায়িত্ব দিয়েছে। তারপর নিজে আবার ট্রাক নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। যাওয়ার সময় বলেছে, সে নিশ্চিত করে বলতে পারে না; তবে এলাকার একমাত্র ডাক্তারকে ডেকে আনা যেতে পারে; খুব যে বেশি আগে হয়ে যাচ্ছে তা নয়। দাড়িঅলা লোকটা বলেছে, ব্রাইডের শুধু যে পা মচকে গেছে তেমন মনে হয় না। গোড়ালি মনে হয় ভেঙেই গেছে। ফোনের কোনো ব্যবস্থা নেই বলে গ্রামের ভেতরে ডাক্তারকে ডাকতে যাওয়ার জন্য ট্রাক নিয়ে বের হওয়ার আর কোনো বিকল্প নেই।

 আমার নাম ইভলিন, লোকটার স্ত্রী বলল। আমার স্বামীর নাম স্টিভ। তোমার নাম কী?

 ব্রাইড, শুধু ব্রাইড। এবারই প্রথম তার বানানো নামটা বিদঘুটে মনে হলো না। মনে হলো কিছুটা হলিউডি, কিছুটা টিনএজের মতো। নিজের নামের এমন প্রতিক্রিয়া তার মনের ভেতর খানিকটা সময় এমনই রয়ে গেল।

 তারপর ইভলিন বলল, ব্রাইড, এ হলো রেইসিন। আমরা অবশ্য ওর নাম রেখেছিলাম রেইন। কারণ ওকে বৃষ্টির মধ্যেই পেয়েছিলাম। কিন্তু ও নিজেকে রেইসিন বলতেই বেশি পছন্দ করে।

 ধন্যবাদ, রেইসিন। তুমি আমার জীবন বাঁচিয়েছ। সত্যিই।

 অহংকার করার মতো আরেকটা নাম শুনে কৃতজ্ঞতাবোধে এক ফোঁটা অশ্রু ছেড়ে দিল তার কপোল বেয়ে। ইভলিন তার স্বামীর মোটা কাপড়ের একটা লাম্বারজ্যাক শার্ট এগিয়ে দিল ব্রাইডের দিকে যাতে সে পরনের পোশাকটা বদলে নিতে পারে।

 ইভলিন ব্রাইডকে জিজ্ঞেস করল, তোমার জন্য ব্রেকফাস্ট আনতে পারি? ওটমিল? অথবা গরম গরম রুটি আর মাখন? সারা রাত ওখানে নিশ্চয় আটকে পড়ে ছিলে?

 ব্র্রাইড মিষ্টি হেসে না বাচক জবাব দিল। তার শুধু এখন ঘুমের দরকার।

 ইভলিন তার মেহমানের গায়ের চারপাশে কম্বলটা গুঁজে দিল। কাজটা সে করল খুব যত্নের সঙ্গে যাতে বালিশের ওপরে তোলা ভাঙা পায়ে ব্যথা না পায় ব্রাইড। রেইনের সঙ্গে সাদাকালো বিড়ালের বাচ্চা ধরনের গল্প বাদ দিয়ে ইভলিন সিংকের দিকে এগিয়ে গেল। ইভলিন বেশ লম্বা মহিলা; তার নিতম্বের গঠনে তেমন ফ্যাশনের কিছু নেই; পিঠের ওপর ছড়িয়ে আছে বাদাম রঙের  লম্বা  বিনুনি। তার চেহারা দেখে ব্রাইডের চেনা চেনা মনে হচ্ছে; সিনেমার কোনো নায়িকার চেহারা এ রকম ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ের কারো চেহারার সঙ্গে মিলবে না; চল্লিশ কিংবা পঞ্চাশের দশকের কোনো নায়িকার চেহারা এ রকম ছিল। তখনকার দিনের সিনেমার তারকাদের মুখের চেহারায়ও একজনের সঙ্গে আরেকজনের মিল পাওয়া যেত না। এখন তেমনটা দেখা যায় না। শুধু চুলের স্টাইলের কারণেও একজনের থেকে আরেকজনের চেহারা আলাদা হতো। তবে কোন তারকা কিংবা কোন সিনেমায় এ রকম চেহারা দেখেছে ঠিক মনে পড়ছে না ব্রাইডের। অন্যদিকে ছোট্ট রেইসিনের চেহারা ব্রাইডের দেখা কারো চেহারার মতো মনে হচ্ছে না। দুধ-সাদা ত্বক, আবলুস কালো চুল, নিয়নের মতো চোখ, আর বয়সটাও ঠিকমতো ধরা যায় না। ইভলিন কী যেন বলল? ও, ‘যেখানে ওকে আমরা পেয়েছিলাম। ’ মানে বৃষ্টির মধ্যে।

 স্টিভ আর ইভলিনের বাড়িটা দেখে মনে হয়, স্টুডিও কিংবা যন্ত্রপাতির দোকানে পরিণত হয়েছে : সামনে একটা খোলা জায়গা, সেখানে টেবিল-চেয়ার, সিংক, কাঠ পুড়িয়ে রান্না করার চুলা আর একটা অমসৃণ গদিআঁটা শোয়ার বিছানা। সেখানেই শুয়ে আছে ব্রাইড। দেয়ালের সঙ্গে আছে একটা তাঁত; তার পাশেই সুতাবোঝাই কয়েকটা ছোট ঝুড়ি। মাথার ওপরে সিলিংয়ে জানালা সেট করা। রুমের ভেতরে বিদ্যুৎ ছাড়াই পানির মতো আলোর বন্যা বয়ে যাচ্ছে। কোনো কিছুর ছায়া পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে যাবে। একটা তামার পাত্রের ওপরে কিছু দিয়ে জোরে বাড়ি মারলে মিনিটের মধ্যে মিলিয়ে যাবে শব্দ। খোলা দরজা দিয়ে পেছনের দিকে তাকালে দেখা যায় আরেকটা রুম; ওখানে দুটো বিছানা আছে, একটা দড়ির, আরেকটা লোহার। চুলায় মাংসজাতীয় কী যেন রান্না হচ্ছে, মুরগির মাংস হতে পারে। ইভলিন আর মেয়েটা মাশরুম ও কাঁচা মরিচ কাটছে বাড়িতে তৈরি একটা অমসৃণ টেবিলে। আগে থেকে কিছু না বলেই তারা পুরনো দিনের একটা বোবা হিপি গান শুরু করে দিল।

 এই দেশ তোমার, এই দেশ আমার।

 সঙ্গে সঙ্গে ব্রাইডের মনে পড়ে গেল সুইটনেসের গুনগুন করে একটা ব্লুজ গাওয়ার কথা। সিংকে প্যান্টি হোস ধোয়ার সময় সুইটনেস এ রকম গাইতেন। লুলা অ্যান দরজার আড়ালে লুকিয়ে থেকে শুনত। মা-মেয়ে একসঙ্গে গান গাইতে পারলে কত মজা হতো! এই স্বপ্নটাকে বুকে জড়িয়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল ব্রাইড। জেগে উঠল একেবারে দুপুরের সময়। গমগম পুরুষ কণ্ঠ শুনতে পেল ব্রাইড। একজন বুড়ো কোঁচকানো ত্বকের ডাক্তারকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে এসেছে স্টিভ। আস্তে আস্তে পা টেনে টেনে ভেতরের দিকে এসেছে তারা।

 ব্রাইডের বিছানার খুব কাছে দাঁড়িয়ে হাসি হাসি মুখে স্টিভ বলল, ইনি হলেন ওয়াল্ট।

 ডা. মুসকি, ডাক্তার বললেন। ডা. মুসকি, এমডি, পিএইচডি, এলএলডি, ডিডিটি, ওএমবি।

 স্টিভ হেসে বলল, উনি ঠাট্টা করছেন।

 নিজের পা থেকে ডাক্তারের মুখ পর্যন্ত কয়েকবার তাকিয়ে ব্রাইড বলল, হ্যালো। আশা করি, খুব খারাপ কিছু হয়নি।

 আমরা দেখছি, ডাক্তার বললেন।

 ডাক্তার যখন ব্রাইডের রুচিশীল জুতোটা কচকচ করে কেটে ফেলছিলেন, ব্রাইড নিঃশ্বাস নিচ্ছিল দাঁতে দাঁত চেপে। খুব দক্ষতার সঙ্গে তিনি ব্রাইডের পা পরীক্ষা করে দেখে ঘোষণা করলেন, তার পা কমপক্ষে ভেঙেছে তো বটেই, এখানে স্টিভের বাড়িতে এটা ঠিক করার উপায় নেই। তাকে ক্লিনিকে যেতে হবে। ওখানে গেলে এক্স-রে করা হবে, দরকার হলে কাস্ট দিতে হবে। এখানে আপাতত তিনি যা করতে পারেন বা করবেন সেটা হলো আপাতত পরিষ্কার করে বেঁধে দেওয়া। তিনি সেটা অবশ্যই করলেন যাতে ফোলাটা আর বেশি খারাপের দিকে না যায়।

 কিন্তু ব্রাইড যেতে চাচ্ছে না। হঠাৎ তার খুব ক্ষুধা পায়। ক্ষুধায় মেজাজ পর্যন্ত খারাপ হয়ে যাচ্ছে। গ্রামের কোনো কাঁচা ক্লিনিকে যাওয়ার আগে তার গোসল করে কিছু খেতে ইচ্ছা করছে। ইতিমধ্যে সে ডা. মুসকির কাছে ব্যথানাশক ওষুধ চেয়েছে।

 স্টিভ বলল, না। সে রকম কিছু করার উপায় নেই। তা ছাড়া সারা দিন দেরি করাও আমাদের জন্য সম্ভব নয়।

 স্টিভ আবারও কোলে করে ব্রাইডকে ট্রাকে নিয়ে গেল। তার আর ডা. মুসকির মাঝখানে কোনো রকমে ঠেসে বসিয়ে দিল ব্রাইডকে। দুই ঘণ্টা পরে তারা দুজন ব্রাইডকে নিয়ে ক্লিনিক থেকে ফিরে এলো। ব্রাইডকে অবশ্য মানতেই হচ্ছে, স্প্লিন্টের কারণে তার পায়ের ব্যথা অনেকটা কমেছে। বড়ি খাওয়ার কারণেও আরাম বোধ হচ্ছে। পোস্ট অফিস থেকে রাস্তার বিপরীত পাশে সমুদ্রের মতো ঘন নীল রঙের ক্ল্যাপবোর্ডের সুন্দর একটা বাড়ি আছে, সেই বাড়ির দ্বিতীয় তলায় হুইস্কি ক্লিনিক। বাড়িটাতে একটা নাপিতের দোকানও আছে। তৃতীয় তলার জানালায় ব্যবহৃত কাপড়ের বিজ্ঞাপন। খেয়ালি, ব্রাইডের মনে হয়, এ রকম একজন খেয়ালি মানুষের খেয়ালি পরীক্ষার রুমে সে যেন সহায়তা পায়। বিস্ময়ের সঙ্গে ব্রাইড দেখতে পায়, প্লাস্টিক সার্জনের নিজের মতোই তার সাজসরঞ্জামও একদম নতুন।

 ব্রাইডের আরো খানিক বিস্ময় জাগিয়ে মুসকি বলেন, যারা গাছ কাটে তারা সৈনিকদের মতো। তাদের জখমও খুব মারাত্মক রকমের হয়ে থাকে। তাদের দরকার হয়ে থাকে সবচেয়ে দ্রুত সময়ে সবচেয়ে ভালো সেবা।

 একটা সনোগ্রাম থেকে স্ক্রিনশট দেখে ডা. মুসকি ব্রাইডকে বললেন, তার পা সারতে কমপক্ষে এক মাস লাগবে, কিংবা ছয় সপ্তাহও লেগে যেতে পারে। মুসকির রোগী না বুঝলেও তিনি বললেন, সিনডেসমোসিস, ফিবিউলা আর টিবিয়ার মাঝখানে হয়েছে। সার্জারি লাগতে পারে। তবে আমার কথা শুনে চললে না-ও লাগতে পারে।

 তার পা স্প্লিন্টের মধ্যে রেখে তিনি বললেন, ফোলা কমে গেলে তিনি ব্রাইডকে কাস্ট দেবেন। সে জন্য অবশ্য ব্রাইডকে মুসকির অফিসে আবার আসতে হবে।

 ঘণ্টাখানেক পরে আবার ট্রাকে উঠে ফেরার পথে রওনা হলো ব্রাইড। এখনো স্টিভের পাশে বসতে হয়েছে। স্টিভ এখন বেশ চুপচাপ। স্প্লিন্টে যতটা সহ্য হচ্ছে, ড্যাসবোর্ডের নিচে একদম কাঠির মতো সোজা করে রাখতে হয়েছে তার পা। স্টিভের বাড়িতে ফেরার পর ব্রাইডের মনে হলো, তার ক্ষুধার তাড়নাটা আগের চেয়ে একটু কমে গেছে। গোসল করতে হবে, ঘামের টক গন্ধে গা কুটকুট করছে—এই বোধটার কারণেই ক্ষুধার দিক থেকে তার মনোযোগ চলে এসেছে।

 একটু গোসলের ব্যবস্থা করতে পারলে ভালো হতো, প্লিজ! ব্রাইড বলল।

 ইভলিন বলল, আমাদের তো বাথরুম নেই। এখনকার জন্য আপাতত গা মুছিয়ে দিতে পারি। তোমার গোড়ালি আরেকটু ঠিক হয়ে গেলে গোসলের টবের জন্য পানি গরম করে দেব আমি।

 রুমের ভেতরের আবর্জনা সরানোর বাসন, বাইরের টয়লেট, মেটালের গোসলটব, ভাঙা ক্যাচক্যাচ শব্দ করা শোয়ার বিছানা—এক মাস এভাবে কাটবে? ব্রাইড কাঁদতে লাগল। অন্য কেউ কিছু বলল না। তখন অবশ্য রেইন ও ইভলিন খাবার তৈরি করতে ব্যস্ত।

পরিবারের সদস্যদের খাওয়া শেষ হওয়ার পর ব্রাইড তার বিব্রতকর অবস্থা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করে এবং এক বেসিন ঠাণ্ডা পানি দিয়ে মুখমণ্ডল বগল মুছে ফেলে। তারপর আস্তে আস্তে উঠে হাসার চেষ্টা করে আর ইভলিনের এগিয়ে দেওয়া প্লেটটা নেয়। মুরগির মাংস নয়, কোয়েলের মাংস, ঘন মাশরুম দিয়ে রসা বানানো হয়েছে। খাবার শেষ হওয়ার পর ব্রাইড বুঝতে পারে, এখন সে বিব্রতকর অবস্থার চেয়েও খারাপ অবস্থায় এসেছে, লজ্জা লাগছে। কারণ প্রতি মুহূর্তে সে কেঁদেছে, অস্থির হয়েছে, বাচ্চাসুলভ আচরণ করে নিজেকে ঠিক করতে পারেনি এবং অন্যদের সাহায্যও ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। এখানে যাদের কাছে আছে সে, তারা তো নামেমাত্র জীবন যাপন করছে, কোনো রকম দ্বিধা ছাড়াই তারা ব্রাইডের জন্যই নিজেরা বাইরে থাকছে। বিনিময়ে তারা তার কাছ থেকে তো কিছুই চাইছে না। তবু অন্য সব সময়ের মতো তার বিব্রতবোধ আর কৃতজ্ঞতা যেন বেশিক্ষণ টেকে না। মালিকহীন কুকুর কিংবা বিড়ালের পা ভেঙে গেলে মানুষ যেভাবে দেখে তাকেও সেভাবে দেখা হচ্ছে। তার পা ভাঙার জন্য এরা নিজেরাই অনুতপ্ত মনে হচ্ছে। ভারী মুখে ব্রাইড ইভলিনকে জিজ্ঞেস করল তার নেইল ফাইল কিংবা নেইল পলিশ আছে কি না। নীরবে একগাল হেসে কোনো কথা না বলে ইভলিন তার দিকে নিজের হাত বাড়িয়ে দিল। বুঝতে অসুবিধা হলো না, ইভলিনের হাত দিয়ে যতটা মদের গ্লাসের গোড়ালি ধরার কথা তার চেয়ে বেশি চুলা জ্বালানোর কাঠ টুকরো করা, মুরগির ঘাড় মোচড় দিয়ে ধরা—এসব কাজের জন্য। ব্রাইডের মনে প্রশ্ন জাগে, এরা কারা? কোথা থেকে এসেছে এরা? তারা এখন পর্যন্ত তাকে জিজ্ঞেসই করেনি, সে কোথা থেকে এসেছে, কোথায় যাচ্ছে। তারা নীরবে তার সেবা করছে, তাকে খাওয়াচ্ছে, তার গাড়ি মেরামতের ব্যবস্থা করছে। তারা যে রকম সেবা তাকে দিচ্ছে সেটা বুঝতে পারা ব্রাইডের পক্ষে খুব কঠিন; তাদের এমন মনোভাব তার কাছে অতিশয় অচেনা মনে হচ্ছে। তারা যা করছে সব এমনি এমনি। তাকে নিয়ে কোনো রকম প্রশ্ন করা কিংবা ভাবাচিন্তার মধ্যেই নেই তারা। তাদের মনের মধ্যে ক্ষণিকের জন্য কৌতূহলও হচ্ছে না, সে কে, কোথায় যাচ্ছে। কখনো কখনো ব্রাইডের মনে হয়েছে, তারা তো তাকে নিয়ে কোনো পরিকল্পনা করছে না! কোনো খারাপ পরিকল্পনা। তবে দিনগুলো নিরবচ্ছিন্ন একঘেয়েমির মধ্য দিয়েই পার হয়ে যায়। স্টিভ ও ইভলিন রাতের খাবারের পর মাঝেমধ্যে বাইরে বসে গান গেয়ে সময় পার করে, বিটলসের গান, সিমোন ও গারফাংকেলের গান। স্টিভ গিটারে টুংটাং আওয়াজ তোলে; ইভলিন সুরহীন সোপ্রানো নিয়ে তার সঙ্গে যোগ দেয়। তাদের হাসি বেসুরো তাল আর ভুলভাল সুরের ভেতর বেজে ওঠে।

 পরের সপ্তাহে ঘন ঘন ক্লিনিকে যেতে হয়, পায়ের ব্যায়াম নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়, জাগুয়ারের মেরামতের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এসবের মধ্যে ব্রাইড প্রথম বুঝতে পারে, তার আতিথ্যদানকারী দম্পতির বয়স পঞ্চাশের কোঠায়। স্টিভ গ্র্যাজুয়েট করেছে রিড কলেজ থেকে আর ইভলিন ওহাইও স্টেট থেকে। বিরামহীন হাসি-তামাশার মধ্য দিয়ে তাদের দেখা হওয়ার পর্ব বর্ণনা করে। তাদের প্রথম দেখা হয় ভারতে (তাদের দুজনের মধ্যে বিনিময় হওয়া দৃষ্টিতে মধুর স্মৃতির দ্যুতি দেখতে পায় ব্রাইড)। তারপর তাদের দেখা হয় লন্ডনে, এরপর বার্লিনে আবার। শেষে আবার দেখা হয় মেক্সিকোতে। তারা দুজনই একে অপরকে জানায়, এভাবে আর দেখা হওয়া ভালো লাগছে না (স্টিভ আঙুলের উল্টো পাশ দিয়ে ইভলিনের কপোল ছুঁয়ে দেয়)। সুতরাং তারা তিজুয়ানাতে বিয়ে করে এবং ক্যালিফোর্নিয়া চলে আসে সত্যিকারের জীবন যাপন করতে।

 তাদের কথা শুনে ব্রাইডের মনে যে ঈর্ষা জাগে সেটাকে বালযোগ্যই বলা যায় বটে। তবে সে নিজেকে থামাতে পারে না; জিজ্ঞেস করে, ‘সত্যিকারের’ মানে কি গরিব মানুষের জীবন? নিজের নাক উঁচু ভাবটা আড়াল করার জন্য একটু হাসে ব্রাইড।

 স্টিভ ভ্রু তুলে পাল্টা জিজ্ঞেস করে, গরিব মানে কি টেলিভিশন নেই—এ রকম?

 ব্রাইড বলল, মানে টাকা না থাকা।

 স্টিভ বলল, ওই একই কথা। টাকা নেই, টেলিভিশন নেই।

 তার মানে, ওয়াশিং মেশিন নেই, ফ্রিজ নেই, বাথরুম নেই, টাকা নেই।

 টাকা কি তোমাকে জাগুয়ারের ভেতর থেকে বের করে আনতে পারত? টাকা কি তোমার মান-সম্মান বাঁচাতে পারত?

 ব্রাইড চোখ পিটপিট করল শুধু। তবে এ রকম মুহূর্তে কিছু না বলাই ভালো—এ বোধটা তার আছে। অন্য কিছু ছাড়া ভালো থাকা আর নিঃস্ব অবস্থার ভালোবাসা সম্পর্কে সে কী-ই বা জানে?

 হাঁটতে পারা পর্যন্ত এবং তার গাড়িটার মেরামত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে তাদের সঙ্গে ব্রাইডকে কঠিন ছয়টি সপ্তাহ পার করতে হলো। আপাতত এ এলাকায় আর কোনো অটোমোবাইল মেরামতের জায়গা নেই বলে জাগুয়ারের কবজা কিংবা সম্পূর্ণ নতুন দরজা লাগানোর জন্য তাদের ওপরই ভরসা করতে হলো। এ রকম একটা ঘন অন্ধকার রুমে শুয়ে রাতের বেলা ব্রাইডের মনে হতে লাগল সে কফিনের মধ্যে শুয়ে আছে। জীবনে সে আগে কখনো যত তারা দেখেনি তার চেয়েও অনেক বেশিসংখ্যক তারায় হয়তো ভরে গেছে বাইরের আকাশটা। কিন্তু এখানে এই অন্ধকার রুমে বিদ্যুৎ না থাকায় শুধু আকাশের দিকে খোলা একটা নোংরা জানালায় অন্ধকার দূর হয় না। ঘুমে তার সমস্যা হচ্ছে।

অবশেষে ডা. মুসকি এলেন ব্রাইডের কাস্ট খুলে দিতে। প্রয়োজনে খুলে ফেলা যাবে এমন একটা ব্রেস লাগিয়ে দেবেন ওখানে। তখন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে পারবে সে। কাস্ট খুলে দেওয়ার পর ব্রাইড দেখতে পেল, তার ত্বক কাস্টের নিচে থেকে কেমন বিশ্রী হয়ে গেছে। গা ঘিনঘিন করতে লাগল। কাস্ট খোলার চেয়েও আরেকটা আনন্দের ব্যাপার হলো ইভলিনের কারণে : আগে যা বলেছিল ঠিক তাই করল সে। দস্তার টবে বালতির পর বালতি গরম পানি ঢালতে লাগল। তারপর সে ব্রাইডের হাতে স্পঞ্জ, তোয়ালে আর ফেনা তোলা কঠিন একটা সাবান ধরিয়ে দিল। এতগুলো সপ্তাহ পাখির মতো গোসল করেছে বলে এখন কৃতজ্ঞ মনে পানির ভেতরে শরীর ডুবিয়ে দিল, পানি পুরোপুরি ঠাণ্ডা না হওয়া পর্যন্ত সাবান ঘষতেই লাগল। গা মুছে ফেলার জন্য দাঁড়াল যখন তখনই কেবল চোখে পড়ল, আরে, তার বুক তো প্রায় সমতল হয়ে গেছে। পুরোপুরি সমতল। শুধু কালো বোঁটা দেখে বোঝা যাচ্ছে, এ পাশটা তার পিঠ নয়, বুক। হতাশাটা এতটাই প্রবল হলো যে, ব্রাইড ধপাস করে ঘোলা পানির ওপর পড়ে গেল। ঢালের মতো তোয়ালে দিয়ে কোনো রকমে বুক আড়াল করতে পেরেছে।

 ব্রাইডের মনে হলো, আমি অসুস্থ। নিশ্চয় মারাত্মক কোনো অসুখ হয়েছে। আমি মারা যাব। একসময় যেখানে তার দুটো উত্থিত স্তন ছিল, যে স্তন দুটো দোল খেতে খেতে তার গোঙানি তোলা প্রেমিকদের ঠোঁট পর্যন্ত উঠে আসত, সে স্তনের জায়গাটা তোয়ালে দিয়ে যেন প্লাস্টার করে দিয়েছে ব্রাইড। ভয়ে আতঙ্কে ব্রাইড ইভলিনকে ডেকে উঠল।

 আমার পরার মতো কিছু হবে, প্লিজ?

 হ্যাঁ, অবশ্যই, বলল ইভলিন। কয়েক মিনিট পরে একটা টি-শার্ট আর তার নিজের একটা জিন্স নিয়ে এলো ইভলিন। বাইডের বুকের অবস্থা সম্পর্কে কিংবা ভেজা তোয়ালে সম্পর্কে সে কিছুই বলল না। চুপচাপ চলে গেল ওখান থেকে যাতে ব্রাইড নিভৃতে পোশাক বদল করতে পারে। ব্রাইড যখন বলল, জিন্স তার কোমরের চেয়ে অনেক ঢিলা তখন ইভলিন রেইনের জিন্স এনে দিল। রেইনের জিন্স ব্রাইডের কোমরে ঠিকমতো ফিট হলো। ব্রাইড মনে মনে বলল, এত ছোট হয়ে গেলাম কখন?

 মিনিটখানেক চুপ করে শুয়ে থাকতে ইচ্ছা হলো ব্রাইডের; আতঙ্কটা কেটে যাক। শুয়ে চিন্তা করতে লাগল, তার শরীর এত শুকিয়ে যাওয়ার কারণ আসলে কী। কোনো রকম ঝিমুনি ছাড়াই অজান্তে ঘুমিয়ে পড়ল সে। ওখানকার অন্ধকার ফাঁকা জায়গা থেকেই একটা পরিষ্কার, স্পষ্ট অনুভব করার মতো স্বপ্ন চলে এলো। বুকারের হাত তার ঊরুর মাঝখানে চলে এসেছে। আর যখন তার নিজের হাত দুটো ওপরের দিকে উঠেছে বুকারের পিঠ আঁকড়ে ধরার জন্য তখনই বুঝতে পারছে, বুকারের আঙুলগুলো বের হয়ে এসেছে এবং সঙ্গে সঙ্গে সে ব্রাইডের ঊরুসন্ধির মাঝে প্রবেশ করে ফেলল। ব্রাইড ফিসফিস করে চাপা আওয়াজ করতে লাগল। তবে ততক্ষণে বুকারের ঠোঁট তার ঠোঁটের ওপরে চেপে বসেছে। বুকারের উত্থানপতনে রত নিতম্বকে পেঁচিয়ে ধরেছে ব্রাইডের দুই পা। যেন গতি ধীর করতে, কিংবা আরো নিবিড় করতে কিংবা ঠিকমতো সঞ্চালনে সাহায্য করতে চাইছে। হঠাৎ করেই জেগে উঠল ব্রাইড; ঘেমে গেছে। তবে মুখে গুনগুন আওয়াজ আছে। কিন্তু তার স্তন যেখানে ছিল সেখানে হাত দিতেই তার গুনগুন ফোঁপানিতে পরিণত হলো। তখনই সে বুঝতে পারল, শরীরের পরিবর্তন শুরু হয়েছে শুধু বুকার চলে যাওয়ার পর থেকে নয়, বুকার চলে গেছে বলেই পরিবর্তন হচ্ছে।

 মনে মনে নিজেকে উদ্দেশ করেই বলল, শান্ত থাক। মাথার ভেতর সব ওলটপালট করছে, কিন্তু তাকে সব ঠিক করতে হবে। এমনভাবে চলতে হবে যাতে মনে হয়, সব কিছু ঠিক আছে। কেউ যেন জানতে না পারে, কেউ যেন দেখতে না পায় তার কী হয়েছে। তার কথাবার্তা, কাজকর্ম অন্য সময়ের মতোই হতে হবে যেন মনে হয় গোসলের পরে, চুল ধোয়ার পরে যেমন থাকে সবাই সেও তেমনই আছে। লেংচাতে লেংচাতে রান্নাঘরের সিংকে এসে একটা কলসি থেকে একটা বাটিতে পানি ঢালল, সাবান মিশিয়ে চুল ধুয়ে ফেলল। ব্রাইড শুকনো তোয়ালের খোঁজ করতেই ইভলিন এগিয়ে এলো।

 ইভলিন হাসতে হাসতে বলল, ওহ, ব্রাইড, তোমার তো অনেক চুল। এখানে ডিশের তোয়ালে দিয়ে হবে না। চলো, আমরা বাইরে গিয়ে বসি। রোদ আর খোলা হাওয়ায় শুকিয়ে যাবে তোমার চুল।

 ঠিক আছে, ব্রাইড বলল। মনে মনে বলল, স্বাভাবিক আচরণ করা বড় কথা। তাতে শরীরের পরিবর্তিত ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়া যেতে পারে কিংবা এই পরিবর্তন রোধ করা যেতে পারে। উঠানে উজ্জ্বল প্লাটিনামের আলোয় ঝকঝক করা একটা লোহার বেঞ্চের দিকে এগিয়ে গেল ইভলিন। তার পেছনে ব্রাইড। বেঞ্চটার পাশেই একটা সাইড টেবিল। টেবিলের ওপরে এক টিন মারিজুয়ানা আর এক বোতল লেবেল ছাড়া পানীয়। তোয়ালে দিয়ে ব্রাইডের চুল মুছতে মুছতে ইভলিন বিউটি পার্লারের পরিবেশের মতো গল্পগুজব করতে লাগল : এখানে খোলা আকাশের নিচে একজন ভালো মানুষের সঙ্গে বসবাস করাটা তার জন্য কত সুখের, দেশে দেশে ভ্রমণ করে কত কী শিখেছে, আধুনিক সুযোগ-সুবিধাকে সে বলে ফেলে দেওয়ার মতো আবর্জনা, যেহেতু এগুলোর কোনোটাই টেকসই নয়; আর এগুলো ছাড়া ঘরবাড়ি দেখাশোনা করার বিষয়টাও কত আনন্দের; রেইন তাদের জীবন কত সুন্দর করে দিয়েছে ইত্যাদি।

 ব্রাইড জিজ্ঞেস করল, রেইনকে তারা কখন কোথায় পেয়েছে। ইভলিন বেঞ্চে বসে একটা কাপে খানিকটা পানীয় ঢালল।

 পুরো ঘটনা বলতে সময় লাগে, সে বলল। ব্রাইড মনোযোগের সঙ্গে শুনল। তার শরীর যে বদলে যাচ্ছে, সে চিন্তা থেকে মুক্ত থাকতে যে কোনো কিছুই শুনতে রাজি আছে সে যাতে কেউ টের না পায় তার শরীরের পরিবর্তন। গোসলের টব থেকে বাইরে আসার সময় তাকে ইভলিন টি-শার্ট এগিয়ে দিয়েছিল। তখন সে কিছু খেয়াল করেনি কিংবা কিছু বলেনি। ব্রাইডকে যখন তার জাগুয়ার থেকে উদ্ধার করা হয় তখন তার স্তন দেখার মতো ছিল, হুইস্কি ক্লিনিকে যখন ছিল তখনো তেমন সুন্দর ছিল। কিন্তু এখন আর নেই। মনে হচ্ছে, যেনতেনভাবে করা স্তনকর্তনের ফলে তার স্তনাগ্র অটুট রয়েছে। শরীরের কোথাও ব্যথা-বেদনাও হয়নি। সব কিছু ঠিকমতো চলছে, শুধু অদ্ভুত বিলম্ব দেখতে পাচ্ছে মাসিক আসতে। তাহলে সে কী রকম অসুখে পড়েছে? দেখা যাচ্ছে, আবার যাচ্ছে না এমন কোনো অসুখে। বুকারের কথা মনে আসছে। বুকারের অভিশাপ মনে হচ্ছে।

 চলবে একটু? ইভলিন টিনবক্সের দিকে ইঙ্গিত করল।

 হ্যাঁ, চলতে পারে। ব্রাইড ইভলিনের হাতের ওস্তাদি দেখল খেয়াল করে। কৃতজ্ঞবোধ করল ইভলিনের প্রতি। প্রথম টানে একটু কাশি এলো ব্রাইডের। তবে পরে আর এমন হলো না।

 দুজনে চুপচাপ টানতে লাগল বেশ কিছুক্ষণ। শেষে ব্রাইড বলল, আচ্ছা, রেইনকে যে বৃষ্টির মধ্যে পেয়েছ তার মানেটা কী, বল তো আমাকে।

 স্টিভ আর আমি একটা প্রতিবাদ কর্মসূচি থেকে গাড়ি নিয়ে ফিরে আসছিলাম। কিসের যে, ভুলে গিয়েছি। তখনই এই ছোট মেয়েটাকে দেখি; ভেজা জবজবে গায়ে একটা ইটের দরজার চৌকাঠের সামনে দাঁড়িয়ে। তখন আমাদের একটা পুরনো ফক্সওয়াগন ছিল। স্টিভ গাড়ির গতি কমিয়ে একেবারে থামিয়েই দিল। আমরা ভাবলাম, মেয়েটা হারিয়ে গেছে। কিংবা তার দরজার চাবি হারিয়ে গেছে। ব্যাপারটা কী দেখার জন্য গাড়ি থামিয়ে নেমে গেল স্টিভ। প্রথমে স্টিভ ওর নাম জিজ্ঞেস করল।

 কী বলল মেয়েটা?

 কিছুই না। একটা কথাও বলল না। স্টিভ যখন তার সামনে নিচু হয়ে বসল, মেয়েটা ভেজা শরীর নিয়েই তার মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল। কিন্তু কী কাণ্ড জান! স্টিভ ওর কাঁধ ছোঁয়ামাত্র লাফ দিয়ে তার ভেজা টেনিস শুতে থপথপ পানি ছিটিয়ে দৌড়ে চলে গেল। সুতরাং স্টিভও গাড়িতে ফিরে এলো; আমরা বাড়ি ফিরে আসব। ঠিক তখনই বৃষ্টি খুব ঘন হয়ে নামল। উইন্ডশিল্ডের ভেতর দিয়ে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। সুতরাং গাড়ি চালানো বাদ দিয়ে আমরা একটা জায়গায় থামলাম। ব্রুনোর রেস্টুরেন্টের সামনে। গাড়িতে বসে অপেক্ষা করার চেয়ে ভেতরে ঢুকে কফির অর্ডার দিলাম আমরা। অবশ্য আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল আশ্রয়, কফি খাওয়া নয়।

 তাহলে ওকে তোমরা হারিয়ে ফেললে?

 হ্যাঁ, তখনকার মতো আর কি। টানতে টানতে ইভলিন অনেকখানি শেষ করে ফেলেছে। এবার কাপ ভর্তি করে পানীয়তে চুমুক দেওয়া শুরু করল।

 ও কি ফিরে এলো?

 না, তবে বৃষ্টি কমে এলে আমরা রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়েছি; দেখি ওই বিল্ডিংটার পেছনের গলিতে একটা ডাম্পস্টারের পাশে গুটিসুটি মেরে বসে আছে।

 যিশু! ব্রাইড কেঁপে উঠে বলল যেন সে নিজেই ওখানে ওই গলির ভেতর বসে আছে।

 স্টিভের সিদ্ধান্ত হলো, ওকে ওভাবে ফেলে আসা ঠিক হবে না। আমার অবশ্য মনে হয়নি, ওকে নিয়ে আসার কোনো দায়দায়িত্ব আমাদের আছে। সুতরাং স্টিভ সোজা নেমে গিয়ে মেয়েটাকে ধরে কাঁধের ওপরে তুলে ফেলল। মেয়েটা তখন চিৎকার করছে, কিডন্যাপ! কিডন্যাপ! তবে খুব বেশি জোরে চিৎকার করতে পারেনি। তবে আমার মনে হয় না, ও তখন জন্তুদের, মানে পুলিশদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে চায়নি। আমরা ওকে পেছনের সিটে রেখে গাড়ির দরজা বন্ধ করে দিলাম।

 ও কি তখন চুপ হয়ে গেল?

 আরে না! ও তো চিৎকার করেই যাচ্ছে, আমাকে বাইরে যেতে দাও! সঙ্গে আমাদের গাড়ির পেছনের সিটে লাথি দিয়েও চলেছে। যাতে ও আমাদের ভয় না পায় সে জন্য আমি ওর সঙ্গে কোমল গলায় কথা বলা শুরু করলাম, তুমি তো ভিজে যাচ্ছ, সোনা! ও বলল, দেখছ না হারামজাদি, বৃষ্টি নামছে? আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, ও যে বাইরে বসে বৃষ্টিতে ভিজছে তা কি ওর মা জানেন। ও বলল, হ্যাঁ, জানে। এই উত্তরটা পাওয়ার পর আর কী করতে পারি বুঝতে পারলাম না। তারপর তো ও মুখ খুলে গালিগালাজ শুরু করে দিল। কল্পনাও করতে পারবে না অত ছোট বাচ্চার মুখে কী ভয়ানক গালি আসতে পারে।

 সত্যি?

 স্টিভ আর আমি দুজনেই একে অন্যের মুখের দিকে তাকালাম। কোনো রকম আলোচনা ছাড়াই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে ওর গা শুকিয়ে দিতে হবে, খাওয়াতে হবে, তারপর খুঁজে দেখতে হবে ওর ঠিকানা কোথায়।

 তুমি বলেছিলে, যখন ওকে পাও তখন ওর বয়স ছয় বছর? ব্র্রাইড জিজ্ঞেস করল।

 অনুমানে তাই মনে হয়। আমি ঠিক ঠিক জানি না। ও কখনো বলেনি। আমার মনে হয়, ও নিজের বয়স ঠিকমতো জানেও না। আমরা যখন ওকে পাই তখন ওর দুধের দাঁত পড়ে গেছে। আর এ পর্যন্ত ওর মাসিকও হয়নি। ওর বুক তো স্কেটবোর্ডের মতো সমান।

 ব্রাইড চমকে গেল। সমতল বুকের কথা উঠতেই ওর নিজের সমস্যার কথাটা ওকে হ্যাঁচকা টানে টান দিয়ে নিয়ে গেল। যদি গোড়ালির সমস্যা না থাকত, তাহলে দৌড়ে চলে যেত, সে যে আবার সেই ছোট কালো মেয়টিতে ফিরে যাচ্ছে—এমন ভয়াবহ সন্দেহ থেকে বের হয়ে আসার জন্য রকেটের গতিতে ছুটে যেত।

 এক দিন এক রাত পর ব্রাইড কিছুটা শান্ত হয়ে আসে। তার বুকের ওপরে টি-শার্টটা কেমন সমান হয়ে পড়ে থাকে, তার কানের লতি এখনো অক্ষত—এমন প্রসঙ্গ কেউ তোলেনি কিংবা খেয়াল করে দেখেনি তার শরীরের পরিবর্তন। শুধু সে নিজে জানে, বগল আর নাভির নিচের অংশ শেভ করা না হলেও লোমহীন। সুতরাং মনে হয়, এসবই চোখের ভুল, যেমন তন্দ্রার মধ্যে একটা স্বপ্ন দেখেছে তেমন। নাকি সত্যি? এক রাতে দুবার ঘুম থেকে জেগে চোখ মেলে দেখে, রেইন তার দিকে তাকিয়ে তার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আছে কিংবা বসে আছে। রেইনকে দেখে ভয়ের কিছু ছিল না। সে শুধু তাকিয়ে ছিল ব্রাইডের দিকে। কিন্তু যখন সে রেইনের সঙ্গে কথা বলতে গেছে, দেখে রেইন বাতাসে মিলিয়ে গেল।

 অসহায়, অলস হয়ে পড়ে থাকার কারণে ব্রাইডের কাছে এখন পরিষ্কার হয়ে গেছে, বিছানা কেন এত অপ্রিয় লাগে। পরিবর্তন কিংবা নতুনত্ব না থাকায়, শারীরিক কাজকর্ম না করায় মনের ভেতরটা অর্থহীন লাগে, চারপাশে স্মৃতির ছড়াছড়ি। বিচ্ছিন্ন টুকরো টুকরো চিন্তার ওপরে গুরুত্বপ্রাপ্ত দুশ্চিন্তাও শুভ লক্ষণ বলে মনে হতে পারত। স্বপ্নের ঘটনাবলির মধ্যে অতি নগণ্য সম্পর্কও না থাকার কারণে তার মন বিচরণ করে বেড়িয়েছে তার আঙুলের নখের অবস্থা থেকে নিজের ল্যাম্পপোস্টের গায়ে বেখেয়ালে ধাক্কা লাগা পর্যন্ত, কোনো তারকা নারীর গাউন ঠিক আছে কি না বিচার করে দেখা থেকে তার নিজের দাঁতের অবস্থা পর্যন্ত। সে আটকে গেছে একটা আদিম জায়গায়; সেখানে একটা রেডিও পর্যন্ত নেই। এক দম্পতিকে তাদের দৈনন্দিন কাজ করে যেতে দেখা যাচ্ছে—বাগানে কাজ করছে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করছে, রান্নার কাজ করছে, তাঁতের কাজ করছে, ঘাস কেটে সমান করছে, কাঠ কাটছে। কথা বলার মতো কেউ নেই। কমপক্ষে তার আগ্রহ জাগাতে পারে এমন কিছুই নেই। ভেবেছিল বুকারের কথা ভাববেই না। কিন্তু সে প্রতিজ্ঞা যথারীতি নস্যাৎ হয়ে গেছে। যদি ওকে খুঁজে না পাওয়া যায় তাহলে কী করবে সে? যদি বুকার মিসেস না মিস্টার অলিভের সঙ্গে না থাকে? যাকে খুঁজছে তাকে না পেলে কিছুই করার নেই। আর খুঁজে পেলেই বা তাকে কী করবে, কী বলবে? সিলভিয়া ইনক আর ব্রুকলিন ছাড়া জীবনে সে সবার কাছ থেকে অবহেলা আর প্রত্যাখ্যান পেয়েছে। শুধু বুকারেরই মুখোমুখি হতে পারে সে। আর বুকারের মুখোমুখি হওয়া মানে তার নিজের মুখোমুখি হওয়া, নিজের জন্য দাঁড়ানো। তার কি কিছুই মূল্য নেই? সামান্য কিছুর মতোও নয়?

 ব্রুকলিনের কথা খুব মনে পড়ছে। ব্রুকলিন তার সবচেয়ে ভালো বন্ধু, বিশ্বস্ত, মজার, উদার। সস্তা মোটেলের ওই রক্তাক্ত ঘটনার পর ব্রুকলিন ছাড়া এত দূর মাইল মাইল ড্রাইভ করে গিয়ে কে তাকে উদ্ধার করত? সেবাযত্ন করত? ব্রাইডের মনে হচ্ছে, ওকে না জানিয়ে চলে আসা ঠিক হয়নি। কিংবা কোথায় আছে তাও তো জানানো যেত। অবশ্য বন্ধুকে তার পালিয়ে আসার কারণটা বলা যেত না। ব্রুকলিন নিশ্চয় তাকে নিষেধ করত আসতে। কিংবা তার চেয়েও খারাপ হতো—সে হয়তো ব্রাইডকে নিয়ে হাসাহাসি করত, খ্যাপাতো। তাকে বোঝানোর চেষ্টা করত, এভাবে বেপরোয়া হয়ে বেরিয়ে পড়ার মধ্যে যৌক্তিক কারণের কত অভাব আছে। তার পরও ওকে জানানো উচিত।

 যেহেতু ব্রুকলিনকে ফোন করা যাচ্ছে না, ব্রাইড সিদ্ধান্ত নেয়, একটা চিরকুট পাঠাবে। কাগজের কথা জিজ্ঞেস করলে ইভলিন জানায়, তার কাছে কোনো স্টেশনারি দ্রব্য নেই, তবে রেইনকে লেখাপড়া শেখানোর কাজে ব্যবহার করা হয় যে ট্যাবলেট পেপার সেখান থেকে তাকে দিল। ইভলিন ওয়াদাও করল, সে স্টিভকে দিয়ে ব্রাইডের চিরকুট পোস্ট করে দেবে।

 কম্পানির মেমো তৈরিতে পারদর্শী ব্রাইড। কিন্তু ব্যক্তিগত চিঠি লেখায় নয়। কী বলবে সে ব্রুকলিনকে?

 এ পর্যন্ত ভালোই আছি...?

 না বলে আসার জন্য দুঃখিত...?

 নিজে নিজে কাজটা করতে বেরিয়ে পড়লাম, কারণ...?

 লেখার জন্য পেনসিলটা নামানোর সময় নিজের নখ ভালো করে পরীক্ষা করে দেখল ব্রাইড।

 ইভলিনের তাঁতের কাজ করার শব্দ এত দিন তো ভালোই লেগেছে। কিন্তু আজকে ইভলিনের মাকু আর প্যাডেলের ক্লিকক্লক ক্লিকক্লক বড্ড বিরক্তিকর লাগছে। ব্রাইডের চিন্তা যে রাস্তায়ই চলুক শেষমেশ লজ্জা পাওয়ার আশঙ্কার বিন্দুতে এসে ঠেকে। ধরা যাক বুকার হুইস্কি নামক শহরে থাকে না। কিংবা থাকলই বা, কী করা যাবে? যদি সে আরেক নারীর সঙ্গে থাকে? তোমার কীর্তির কারণে আমি তোমাকে ঘৃণা করি—কিংবা প্লিজ, আমার কাছে ফিরে এসো—ছাড়া আর কী বলার থাকবে ব্রাইডের? হতে পারে, বুকারকে আঘাত করার, সত্যি সত্যি আঘাত করার একটা উপায় সে পেয়ে যাবে। এলোমেলো হওয়ার কারণে তার চিন্তাগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা জট পাকিয়ে মিশে যাচ্ছে—বুকারের মুখোমুখি হওয়ার একটা অবিরাম তাড়না ঘুরপাক খাচ্ছে, ফলাফল যা-ই হোক না কেন। মাথার ভেতরকার ‘যদি’ আর বাইরের ইভলিনের তাঁতের শব্দে বিরক্ত হয়ে ব্রাইড মনস্থির করে, লেংচাতে লেংচাতে হলেও বাইরে যাবে। দরজা খুলে সে ডাক দেয়, রেইন, রেইন।

 এক সারি পিঁপড়ে তাদের সভ্য জীবনের কাজে কোথায় যেন চলে যাচ্ছে; রেইন ঘাসের ওপর শুয়ে পিঁপড়েদের সারি ধরে যাওয়া দেখছে।

 রেইন মুখ তুলে তাকাল, কী?

 বেড়াতে যাবে?

 কিসের জন্য? তার কণ্ঠের সুরে বোঝা গেল, ব্রাইডের সঙ্গলাভের চেয়ে তার কাছে পিঁপড়েদের কারবার অনেক বেশি মজার।

 ব্রাইড বলল, জানি না কিসের জন্য।

 ব্রাইডের উত্তরটা রেইনের কাছে মজার মনে হলো এবার। সে লাফিয়ে উঠে পড়ল; পরনের হাফ প্যান্টটা ঝাড়া দিয়ে বলল, ঠিক আছে, তুমি চাইলে চল।

 দুজনের মধ্যে প্রথম কিছুক্ষণ নীরবতা চলল। যে যার চিন্তার ভেতর ডুবে রইল। ব্রাইড খুঁড়িয়ে হাঁটছে আর রেইন লাফিয়ে লাফিয়ে চলছে, আবার খানিক দাঁড়াচ্ছে ঝোপের ধারে, ঘাসের কিনারে এমন। রাস্তা থেকে প্রায় আধামাইল নেমে আসার পর রেইনের ভাঙা ভাঙা কণ্ঠ একটু সরব হলো, ওরা আমাকে চুরি করে এনেছিল।

 কারা? তুমি কি স্টিভ আর ইভলিনের কথা বলছ? ব্রাইড দাঁড়িয়ে পড়ে রেইনের পায়ের গুলের পেছনে চুলকানো দেখছে। ওরা যে বলল, ওরা তোমাকে বৃষ্টির মধ্যে পেয়েছে?

 হু।

 তাহলে কেন বলছ, ওরা তোমাকে চুরি করেছে?

 কারণ আমি ওদের আমাকে নিয়ে আসতে বলিনি। আর ওরা আমাকে জিজ্ঞেসও করেনি, আমি আসতে চাই কি না।

 তাহলে এলে কেন?

 আমি তো ভিজে গিয়েছিলাম। ঠাণ্ডায় জমে গিয়েছিলাম। ইভলিন আমাকে একটা কম্বল দিল আর এক বক্স কিশমিশ দিল খেতে।

 ওরা তোমাকে এনেছে বলে কি তুমি দুঃখ পেয়েছ? জিজ্ঞেস করেই ব্রাইড মনে মনে বলল, মনে হয় না। কারণ তুমি দুঃখ পেয়ে থাকলে পালিয়ে যেতে।

 ওহ্ না। আমি তো সবচেয়ে ভালো জায়গায় আছি। তা ছাড়া আমার তো কোথাও যাওয়ার জায়গাও নেই, হাই তুলে নাকের ওপর হাত দিয়ে মুছে নিল রেইন।

 বলতে চাইছ, তোমার বাড়িঘর নেই?

 ছিল, তবে ওখানে আমার মা থাকে।

 এই জন্য তুমি পালিয়ে এসেছ?

 না, আমি পালিয়ে আসিনি; সে-ই আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে। বলেছে, চুলোয় যা তুই। তাই আমি চলে এসেছি।

 কেন? সে তোমাকে বের করে দিল কেন? ব্রাইড ভাবতে লাগল, একটা বাচ্চার সঙ্গে কেউ এ রকম আচরণ করবে কেন? এমনকি সুইটনেস বছরের পর বছর ধরে তার দিকে তাকিয়ে দেখেনি, তাকে ছুঁতে চায়নি; সে-ও তো কোনো দিন ব্রাইডকে বের করে দেয়নি।

 কারণ আমি একজনকে কামড়ে দিয়েছিলাম।

 কাকে কামড়ে দিয়েছিলে?

 এক ব্যাটাকে। ব্যাটা নিয়মিতই আসত। মা কয়েকজন লোককে আমার ওপরে লেলিয়ে দিত। ওই লোকটা তাদের একজন। ওহ, ওই যে দ্যাখো, ব্লুবেরি। রেইন রাস্তার পাশের ঝোপের ভেতরে অনুসন্ধান করে যাচ্ছে।

 ব্রাইড বলল, দাঁড়াও এক মিনিট। তোমাকে কী করেছিল লোকটা?

 আমার মুখের ভেতর ওর মুতের জিনিসটা ঢুকিয়ে দিয়েছিল। আমি কামড়ে দিয়েছিলাম। মা ওই ব্যাটার কাছে মাফ চেয়ে তার বিশ ডলার ফেরত দেয় আর আমাকে বাইরে বের করে দেয়। রেইন মনে করেছিল বেরিগুলো মিষ্টি হবে; মিষ্টি নয়, টক। তারপর আমাকে আর ভেতরে ঢুকতে দেয়নি। আমি দরজায় কিল দিয়েছি বারবার। সে একবার শুধু দরজাটা খুলে আমার সোয়েটারটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে আবার বন্ধ করে দেয়। রেইন ব্লুবেরির সর্বশেষ অংশটুকু থু করে ধুলোর মধ্যে ফেলে দেয়।

 দৃশ্যটা কল্পনায় আসতেই ব্রাইডের পেটের নাড়িভুঁড়ি গুলিয়ে আসতে লাগল। একটা শিশুর সঙ্গে এ রকম করতে পারে কেউ? কিভাবে পারে? যেকোনো শিশুর সঙ্গেই তো এ রকম করা যায় না। আর এ তো নিজের শিশু!

 তোমার মায়ের সঙ্গে দেখা হলে কী বলবে তাকে?

 রেইন দাঁত বের করে বলল, কিছুই না। এক কোপে কল্লা ফেলে দেব শুধু।

 ওহ্ রেইন! সত্যি সত্যি তো বলছ না, তাই না?

 হ্যাঁ, আমি সত্যিই বলছি। অনেক দিন আমি এ কল্পনাটাই করেছি। দৃশ্যটা কেমন দেখা যাবে—তার চোখ, মুখ, ঘাড় থেকে বের হওয়া রক্ত। দৃশ্যটা কল্পনায় দেখতে ভালো লেগেছে আমার।

 রাস্তার সমান্তরালে শিলাখণ্ডের সারি দেখতে পায় তারা। ব্রাইড রেইনের হাত ধরে শিলাখণ্ডের দিকে এগিয়ে যায়। দুজনই ওখানে বসে। ব্রাইড কিংবা রেইন দেখতে পায়নি, রাস্তার অন্য পাশে একটা হরিণী আর তার বাচ্চা গাছপালার আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে। হরিণীটা মানুষ দুজনকে দেখে পাশের গাছটার মতো স্থির হয়ে থাকে। বাচ্চাটা মায়ের গলা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকে।

 আচ্ছা রেইন, বল তো।

 ব্রাইডের কথা শুনে হরিণী আর বাচ্চাটা পালিয়ে গেল।

 ব্রাইড রেইনের হাঁটুতে হাত রেখে বলে, শোন, রেইন, বল তো।

 তারপর রেইন তার রাস্তার জীবন সম্পর্কে বলা শুরু করল। কখনো তার চোখ বড় হয়ে জ্বলজ্বল করে ওঠে, কখনো বা কালো কালো জলপাইয়ের টুকরোর মতো সংকুচিত হয়ে আসে। এভাবে রেইন বর্ণনা করতে থাকে বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা, রাস্তার জীবনে প্রয়োজনীয় সাহসের কথা। পাবলিক টয়লেট কোথায় আছে নিজে খুঁজে নিতে হতো; কী করে শিশুশ্রম এড়িয়ে যাওয়া যায়, পুলিশকে এড়িয়ে যাওয়া যায়, নেশাখোরদের এড়ানো যায়, মাদক কারবারিদের এড়ানো যায়—সব তাকে শিখতে হয়েছে। তবে নিরাপদে ঘুমানোর জায়গা খুঁজে বের করাটাই ছিল সবচেয়ে বড় কাজ। সব কিছু শিখতে সময় লেগেছিল তার। কোন লোকটা টাকা দেবে, কেন দেবে, কোন ভাঁড়ার ঘর, কোন রেস্তোরাঁর পেছনের দরজা উদার—সব বুঝতে হয়েছে। আরেকটা বড় সমস্যা ছিল খাবার খুঁজে পাওয়া এবং সে খাবার পরে খাওয়ার জন্য সংগ্রহ করে রাখা। ইচ্ছা করেই সে কারো সঙ্গে খাতির করেনি—ছেলে, বুড়ো, স্থায়ী, ভাসমান, কোনো ব্যাটার সঙ্গেই না। সতর্ক না হলে যে কেউ ধরতে পারে, মারতে পারে। রাস্তায় যারা খদ্দের ধরে বেড়ায় তারা সবচেয়ে ভালো। তারা রেইনকে তাদের পেশার বিপদ-আপদ সম্পর্কে সতর্ক করেছে। কতক ব্যাটারা কাজ করে পয়সা দেয় না; কেউ কেউ মজা করার জন্য নির্যাতন করে থাকে; পুলিশ মজা করার পরে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। রেইন বলে, তার আর বিশেষ করে মনে করার দরকার নেই; একবার এক ব্যাটা, বুড়ো হাবড়া ব্যাটা তাকে অনেক ব্যথা দিয়েছিল, রেইনের রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। ওই ব্যাটাকে চড়থাপ্পড় মেরে তার মা ‘বের হও,’ বলে তাড়িয়ে দিয়েছিল। শেষে তার মা ক্ষত জায়গায় হলুদ পাউডার লাগিয়ে দিয়েছিল। রেইন স্বীকার করে, পুরুষগুলোকে দেখলে তার ভয় করত, অস্বস্তি লাগত। স্যালভেশন আর্মি ট্রাকস্ট্যান্ডের কাছে একটা সিঁড়িতে বসে অপেক্ষা করছিল সে; তখনই বৃষ্টি নামে। আশা করেছিল ওই ট্রাক থেকে কোনো মহিলা তাকে একটা কোট কিংবা জুতো দেবে। সেদিন খাবারও হারিয়ে ফেলেছিল। অন্যান্য সময়ে এ রকম পেয়েছে। ওই সময়ই ইভলিন আর স্টিভ আসে। স্টিভ তার কাঁধ ছোঁয়ার সঙ্গেই মনে হয়, তার মায়ের কাছে যেসব পুরুষ আসে তাদের মতোই সেও। মনে হয়, তাকে পালাতে হবে। পালাতে গিয়েই খাবারের সুযোগটাও হাতছাড়া হয়ে যায়।

 নিজের ঘরহারা জীবনের কথা বলার সময় মাঝেমধ্যে খিলখিল করে হেসে ওঠে রেইন। নিজের স্মার্টনেসের কথা, পালানোর কথা সে এভাবেই বলে যায়। ব্রাইড তখন প্রাণপণে অশ্রু সামলাতে থাকে; তার নিজের ছাড়া অন্য কারো এত কষ্ট থাকতে পারে। রেইন নিজেকে করুণা দেখানোর জন্য সময় ব্যয় করেনি। শক্ত মনের এই ছোট মেয়েটার কথা শুনে ব্রাইডের মনে তার সঙ্গে এক রকম সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়; এই সম্পর্কের মধ্যে এক ফোঁটা ঈর্ষা নেই। স্কুলের মেয়েদের মধ্যে যেমন ঘনিষ্ঠতা থাকে তেমন।

 

রেইন

সে চলে গেছে। আমার ব্ল্যাক লেডি। গাড়ির মধ্যে আটকে থাকার সময় তার চোখ দেখে প্রথমে ভয় পেয়েছিলাম। রেশমি রেশমি; আমার বিড়ালের এ রকম চোখ। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে আমার খুব ভালো লেগে যায়। দেখতে সে কী সুন্দর! তার ঘুমের সময় মাঝেমধ্যে তার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। আজকে তার গাড়িটা আনা হয়েছে, অন্য গাড়ির ভাঙা আরেক রঙের দরজা লাগানো হয়েছে গাড়িতে। যাওয়ার আগে আমাকে একটা শেভিং ব্রাশ দিয়ে গেছে। স্টিভের দাড়ি রেখে দেওয়া, শেভ করার দরকার হয় না। আমিই রেখেছি আমার বিড়ালের গা আঁচড়ানোর জন্য। সে চলে গেছে বলে আমার খারাপ লাগছে। কার কাছে আমার মনের কথা বলব জানি না। ইভলিন আমার প্রতি বেশ সদয়; স্টিভও তাই। কিন্তু আমার মায়ের বাড়িতে থাকার সময় আমার কত কষ্ট হয়েছে, কিংবা আমাকে বের করে দেওয়ার পরে আমি কত স্মার্ট ছিলাম—এসব কথা বললে তারা আমার কথায় পাত্তা দেয় না কিংবা অন্যদিকে মনোযোগ দেয়। এখানে আসার পরও তাদের মেরে ফেলার ইচ্ছা হতো আমার। আমাকে একটা বিড়ালের বাচ্চা এনে দেওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের প্রতি আমার এ রকম মনোভাবই ছিল। তখন সবাইকে মেরে ফেলার ইচ্ছা হতো। তাদের প্রতি আমার আর সে রকম অনুভূতি নেই। বিড়ালের বাচ্চাটা এখন বড় হয়ে গেছে; আমি ওকে সব কথা বলি। বিড়ালের বাচ্চাটা কেমন ছিল, বিড়ালের সঙ্গে আমার কথা বলা কেমন আমার ব্ল্যাক লেডি মনোযোগ দিয়ে শুনত। কিন্তু ইভলিন আর স্টিভ—তারা শোনে না। তারা মনে করে, আমি পড়তে পারি। কিন্তু না, আমি ওই চিহ্নটিহ্নগুলো দু-চারটে চিনি আর কি। ইভলিন আমাকে পড়ানোর চেষ্টা করছে। সে এ কাজটাকে বলে হোম-স্কুলিং; আমি বলি হোম-ড্রুলিং আর হোম-ফুলিং। আমাদের পরিবারটা একটা জোড়াতালি পরিবার। সব ঠিক আছে, তবে জোড়াতালি পরিবার। আপাত-মা হিসেবে ইভলিন খুবই ভালো। তবে আমার ব্ল্যাক লেডির মতো আমার একটা বোন থাকলে ভালো হতো। আমার বাবা নেই। মানে, বাবা কে আমি জানিই না। কারণ বাবা কখনো আমার মায়ের ওখানে থাকেনি। তবে স্টিভ এখানে সব সময়ই আছে। শুধু দিনের বেলা কখনো কোথাও কাজ থাকলে বাইরে থাকে। আমার ব্ল্যাক লেডি খুব সুন্দর। তবে তার মনের জোর খুব। ইভলিন আর স্টিভের কাছে আমার অতীত সম্পর্কে যেসব কথা বলিনি সেগুলো আমার ব্ল্যাক লেডিকে বলেছি। সে এসব বলার পর আমরা হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলাম। একটা ট্রাক আমাদের পাশ দিয়ে চলে গেল। ট্রাকে কয়েকটা দামড়া গোছের ছেলেকে দেখলাম। তাদের একজন চিৎকার করে বলল, এই রেইন, তোর মা কিডারে? আমার ব্ল্যাক লেডি ফিরে তাকায়নি। তবে আমি নাকের ওপরে বুড়ো আঙুল এনে আর জিব বের করে ভেংচি কেটে দিলাম। ওদের একজনের নাম রেজিস; আমি ওকে চিনি। ওর বাবার সঙ্গে আমাদের বাড়িতে মাঝেমধ্যে জ্বলানি আর শস্যের ঝুড়ি নিয়ে আসে। ট্রাক চালাচ্ছিল আরেকটা ধাড়ি ছেলে। সে ট্রাকটা ঘুরিয়ে দিল যাতে আমাদের কাছাকাছি আসতে পারে। আমাদের দিকে রেজিস স্টিভের শটগানের মতো একটা শটগান তাক করল। আমার ব্ল্যাক লেডি খেয়াল করার সঙ্গে সঙ্গে আমার মুখ আড়াল করার জন্য তার বাহু এগিয়ে দিল। আমরা দুজনই পড়ে গেলাম, আমার ব্ল্যাক লেডি আমার ওপরে পড়ল। ট্রাকটা ইঞ্জিন চালু করতেই রেজিস মাথা নিচু করে দৌড়ে পালাল। আমার ব্ল্যাক লেডি পা নিয়ে তো বেশি জোরে দৌড়াতে পারছিল না। যতটা তাড়াতাড়ি পারা যায় দ্রুত আমরা বাড়ির দিকে এগোলাম। তার হাত ধরে রাখা ছাড়া আর তো কিছু করতে পারছিলাম না ওই সময়। স্টিভ তাড়াতাড়ি তার বাহু থেকে ছোট গুলি বের করে ফেলল আর বলল, সে এক্ষুনি রেজিসের বাবাকে জানাতে যাচ্ছে। ইভলিন আমার ব্ল্যাক লেডির বাহু থেকে রক্ত ধুয়ে সারা হাতে আয়োডিন লাগিয়ে দিল। আমার ব্ল্যাক লেডির মুখ দেখে বুঝলাম কষ্ট পাচ্ছে; কিন্তু সে কাঁদল না। আমার বুকের ভেতর ধপাসধপাস করছিল। কারণ আগে কখনো কেউ এ রকম করেনি। মানে, ইভলিন ও স্টিভ আমাকে আশ্রয় দিয়েছে; কিন্তু নিজেকে এভাবে বিপদের মধ্যে এগিয়ে দিয়ে আমাকে বাঁচানোর মতো, আমার জীবন বাঁচানোর মতো কাজ করেনি। কিন্তু সে কাজটাই আমার ব্ল্যাক লেডি করেছে আমার জন্য, ফলাফল কী হবে একটুও ভাবেনি।

সে চলে গেছে; কিন্তু কে জানে, হয়তো কখনো তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েও যেতে পারে।

আমার ব্ল্যাক লেডিকে খুব মিস করছি।

 

তৃতীয় ভাগ

আঙুলের উল্টো পিঠে লক্ত লেগে গেছে। আঙুলগুলো ফুলে উঠেছে। যে লোকটাকে সে এতক্ষণ ধরে পেটাচ্ছে এখন আর নড়াচড়া করছে না। চাপা আর্তনাদও করছে না। সে বুঝতে পারছে, এখন তার এখান থেকে সটকে পড়া ভালো; নইলে কোনো ছাত্র কিংবা ক্যাম্পাসের কোনো দারোয়ান ভাবতে পারে, ঘাসের মধ্যে পড়ে থাকা লোকটা বেআইনি কাজ করেনি, করেছে সে। মার খাওয়া লোকটার জিন্স সে খোলা অবস্থায়ই রেখে যাচ্ছে; লোকটার শিশ্ন বের হয়ে আছে, এ রকম অবস্থায়ই সে প্রথমে দেখেছিল লোকটাকে ক্যাম্পাসের খেলার মাঠের কোনায়। অনুষদের বাচ্চাকাচ্চাদের মধ্যে খুব অল্প কয়েকজন স্লাইডের কাছে ছিল তখন; আর একজন মাত্র ছিল দোলনায়। তাদের কেউই মনে হয় লোকটার ঠোঁট চাটাচাটি আর ছোট সাদা মাংসদণ্ড নাড়ানো দেখেনি। লোকটার ঠোঁট চাটাচাটির ব্যাপারটাই বেশি করে চোখে পড়ে তার। জিহ্বা দিয়ে ওপরের ঠোঁট কামড়াচ্ছে, চাটছে আবার ভাব করছে যেন ঘাসের মতো কিছু গলার ভেতর পাঠিয়ে দিচ্ছে। লোকটার কাছে বাচ্চাগুলোকে ওভাবে দেখাটা ওদের শরীর ছুঁয়ে দেওয়ার মতোই মনে হচ্ছিল। লোকটার বিকৃত মনের কাছে ওদের নড়াচড়া মানে ওরা তাকে ডাকছে, আকর্ষণ করছে; ওদের ডাকের জবাবে সে ওই রকম আচরণ করছে। ওরা যখন স্লাইডে উঠছে কিংবা দোলনায় বাতাস পাম্প করছে তখন ওদের নাদুসনুদুস ঊরু, পুঁচকে আঁটো নিতম্ব প্যান্টি কিংবা হাফ প্যান্টের ভেতর থেকে লোকটাকে ডাকছে; লোকটার মনের কাছে এমনই ছিল বিষয়টা।

 এ নিয়ে আর কিছু ভাবার আগেই বুকারের মুষ্টি লোকটার মুখের ভেতর ঢুকে পড়েছে। কয়েক ফোঁটা রক্তের ধারা এসে পড়েছে তার সোয়েট শার্টে। লোকটার জ্ঞান হারানো দেখে বুকার তার বইয়ের ব্যাগ তুলে নিয়ে খুব জোরে না হলেও মোটামুটি দ্রুতপায়ে মাঠ পার হয়ে চলে গেল। ইন করা শার্ট বের করে সোজা ক্লাসরুমের দিকে হাঁটা দিল। ক্লাসের দেরি হয়ে যাচ্ছে। লেকচার হলে পৌঁছে দেখতে পেল, আরো কয়েকজন আছে যারা দেরি করেছে, এখন পেছন দরজা দিয়ে আস্তে করে ঢুকে পড়বে। বিলম্বে আগন্তুকরা পেছনের সারিতে বসল; ব্যাগ, ব্রিফকেস, ল্যাপটপ—সব ডেস্কের ওপরে রাখল। তাদের মধ্যে শুধু একজন একটা খাতা বের করল। বুকার সাদা কাগজের ওপরে শুধু পেনসিল দিয়ে লিখতে চাইছে। কিন্তু তার আঙুলের ব্যথার কারণে লেখা কষ্টকর হয়ে গেছে। সুতরাং সে খানিক লেকচার শোনে, খানিক দিবাস্বপ্নে ডুবে যায় আর হাত দিয়ে মুখ আড়াল করে হাই ওঠা সামলায়।

 প্রফেসর সাহেব অ্যাডাম স্মিথের ভুলত্রুটি খুঁড়ে বের করেই চলেন। অবশ্য প্রতি ক্লাসে তিনি এ রকমই করেন; মনে হয় অর্থনীতির ইতিহাসে শুধু একজন পণ্ডিতই আছেন যাঁকে আস্তাকুঁড়ে ফেলতে হবে। মিলটন ফ্রিডম্যান আর টিকটিকিমার্কা কার্ল মার্ক্সের কী হবে তাহলে? আর ম্যামনের প্রতি বুকারের ঝোঁক এসেছে অতি সম্প্রতি। চার বছর আগে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট হিসেবে বেশ কয়েকটা পাঠ্যসূূচি থেকে ঠোক ঠোক করে বেছে নিয়েছিল কোর্সগুলো; মনোবিদ্যা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, কলা। আফ্রিকান আমেরিকান স্টাডিজ থেকেও অনেক কোর্স নিয়েছিল সে। আফ্রিকান আমেরিকান স্টাডিজের সবচেয়ে ভালো প্রফেসরদের মেধা দেখা গেছে শুধু তাদের নিজস্ব বর্ণনায়; কেন দিয়ে শুরু কোনো প্রশ্ন করে বুকার তাদের কাছ থেকে সন্তোষজনক কোনো উত্তর পায়নি। তার সন্দেহ হয়েছে, বেশির ভাগ সঠিক উত্তরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দাসত্ব, বিনা বিচারে হত্যা, জবরদস্তিমূলক শ্রম, বর্গাচাষ, বর্ণবাদ, পুনঃকাঠামো স্থাপন, জিম ক্রো, কয়েদ শ্রম, দেশান্তর, নাগরিক অধিকার ও কৃষ্ণাঙ্গ বিপ্লব। আর এসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অর্থ। আটকে দেওয়া অর্থ, চুরি করে নেওয়া অর্থ, অর্থের ক্ষমতা, যুদ্ধরূপী অর্থ। মাত্র দুই দশকে শুধু দাসত্ব গোটা দেশকে কিভাবে কৃষি থেকে শিল্পের যুগে নিয়ে গেছে—সে কথাটা প্রফেসরদের লেকচারে কই? মুনাফার চাকা ঘোরানোর জন্য জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছে শ্বেতাঙ্গদের ঘৃণা, তাদের সহিংসতা। সুতরাং গ্র্যাজুয়েট ছাত্র হিসেবে সে অর্থনীতিই পছন্দ করেছে। টাকা কিভাবে পৃথিবীতে প্রতিটা অত্যাচারের জন্ম দিয়েছে, আকার দিয়েছে, সব সাম্রাজ্য সৃষ্টি করেছে, সম্পদ আহরণ আর আড়াল করার জন্য ঈশ্বর আর তার শত্রুদের নিয়ে উপনিবেশ সৃষ্টি করেছে—অর্থনীতির ইতিহাস, অর্থনীতির তত্ত্ব থেকে এসব সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেছে সে। অভ্যাসগতভাবেই সে দলিত, কপর্দকহীন আর ইহুদিদের অর্ধনগ্ন রাজার বিপরীতে। এই ইহুদি অর্ধনগ্ন রাজারা অলংকারবহুল চকচকে পোশাকের পোপের সঙ্গে ক্রুশের ওপর প্রতারণা সম্পর্কে চিল্লাচিল্লি করে। আর পোপ ভ্যাটিকানের খিলানের ওপরে ফিসফিস করে নসিহত করে। বুকারের লেখা বইয়ের নাম হবে ‘দ্য ক্রস অ্যান্ড দ্য ভল্ট’।

 প্রফেসরের লেকচারে মনোযোগ দিতে না পেরে বুকার তার ভাবনা চালিয়ে দেয় খেলার মাঠের কাছে পড়ে থাকা লোকটার দিকে। লোকটার চেহারা সাধারণ, টাক মাথা। এ রকম মানুষের অস্বাভাবিক কিছু না থাকলে ভালো মানুষই হয়ে থাকে এরা। প্রতিবেশীরা হয়তো বলবে, পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মানুষ। সে কোনো দিন একটা মাছিও মারেনি। এ রকম ব্যবহারজীর্ণ কথা এসেছে কোথা থেকে? মাছি মারেনি কেন? তার মানে কি সে এতই নরম কোমল মনের অধিকারী যে একটা রোগবাহী পতঙ্গকেও মারতে পারেনি? কিন্তু হাসিমুখে একটি শিশুর জীবন কোপ দিয়ে কেটে ফেলতে পেরেছে?

 বুকার একটা বড় পরিবারে বড় হয়েছে। সেখানে নিয়মকানুন বেশ সিরিয়াস। বাড়িতে কোনো টেলিভিশন ছিল না। কলেজে প্রথম বর্ষে যেখানে থাকতে হলো সে জগতের চারপাশেই ছিল টেলিভিশন ইন্টারনেট। সেখানে গণযোগাযোগের পদ্ধতি আর বিষয়-আশয় সবই তার কাছে মনে হতো বিনোদনে ভরা। কিন্তু সেগুলোতে গভীর কোনো দর্শন কিংবা জ্ঞানের অনুপস্থিতি ছিল। শুধু আবহাওয়ার চ্যানেলগুলো ছিল তথ্যমূলক। তবে সেগুলো আবার প্রথাবিরোধী ছিল। এগুলোতে স্নায়ুবৈকল্য আছে মনে হতো। আর ভিডিও গেমসগুলো ছিল কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই সম্মোহনকর। বুকার বড় হয়েছে একটা বইপড়ুয়া পরিবারে। সেখানে দৈনন্দিন তথ্যের উৎস ছিল শুধু রেডিও আর খবরের কাগজ। বিনোদনের উৎস ছিল শুধু ভিনাইল রেকর্ড। এ জন্য প্রত্যেক ডর্ম, লাউঞ্জ ও ছাত্র-বন্ধু পানশালা থেকে ভেসে আসা গেমসের স্ক্রিন সাউন্ডের প্রতি তার বন্ধুদের কৌতূহলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আগ্রহ প্রকাশের ভান করতে হতো। বুকার বুঝতে পারত, সে উন্নত চলমান জগতের অনেক বাইরে আছে। সে একজন লাডাইট, প্রযুক্তির জগতের সব উত্তেজনা কারো সঙ্গে শেয়ার করার ক্ষমতা বুকারের ছিল না। কলেজের প্রথম বছরে এসবের কারণে বিব্রতবোধ করত সে। বুকারের মানসিক গঠন তৈরি হয়েছে বাস্তব অভিজ্ঞতা আর বই পড়ে। প্রতি শনিবার সকালে তার মা-বাবা ব্রেকফাস্টের আগে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে কনফারেন্স করতেন। সেখানে তাদের সব ভাই-বোনকে দুটো প্রশ্নের উত্তর দিতে হতো : ১। কোন সত্য জেনেছ? (কিভাবে জেনেছ?) ২। তোমার কী সমস্যা আছে? এত বছর ধরে প্রথম প্রশ্নটার জবাব ‘পোকামাকড়রা উড়তে পারে না’, ‘তুষার জ্বলে’, ‘এই স্টেটে শুধু তিনটা কাউন্টি আছে’ থেকে ‘রানীর চেয়ে সোনাদানার ক্ষমতা বেশি’ পর্যন্ত। আর দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর হতো ‘একটা মেয়ে আমাকে চড় মেরেছে’, ‘আমার বয়োব্রণ ফিরে এসেছে’, ‘বীজগণিত’, ‘ল্যাটিন ভার্বগুলোর কনজুগেশন’ ইত্যাদি। ব্যক্তিগত সমস্যা সম্পর্কিত প্রশ্নের জবাব টেবিলেই যে কারো দ্বারা সমাধান হয়ে যেত। অবশ্য সমস্যার সমাধান হোক আর না-ই হোক বাচ্চাদের সবাইকে গোসল করে ভালো জামাকাপড় পরতে পাঠানো হতো। আর এ দুটো কাজে বড় ছেলে-মেয়েরা ছোটদের সহযোগিতা করত। শনিবারের সকালবেলার ওই কনফারেন্সগুলো বুকারের খুব ভালো লাগত; কনফারেন্সকে হাইলাইট করা হতো তার মায়ের বিশাল ব্রেকফাস্ট ফিস্টের মাধ্যমে। পাতলা আর ছোট ছোট গরম বিস্কুট, খোসা ছড়ানো তুষারের মতো সাদা এবং জিহ্বা পুড়িয়ে দেওয়ার মতো গরম জই, সিজলিং সস প্যাটিস, টুকরো করে কাটা টমেটো, স্ট্রবেরি জ্যাম, ফ্যাকাসে জাফরানের মতো ক্রিম ক্রিম অবস্থায় আনা ফেটানো ডিম, একটু আগে বানানো কমলালেবুর রস, ম্যাসন পাত্রে ঠাণ্ডা দুধ—এসব খাবার থাকত। সপ্তাহ শেষের এই ভোজের জন্য কোনো খাবার তার মা জমা করে রাখতেন। কারণ বাকি দিনগুলোতে তারা মিতব্যয়িতার সঙ্গে খাওয়াদাওয়া করত : জই, মৌসুমি ফল, চাল, শুকনো শিম এবং হাতের কাছে পাওয়া যেকোনো সবুজ শাকপাতা দিয়ে খাবার তৈরি হতো। কেইল, পালংশাক, বাঁধাকপি, কোলার্ড, সরিষা, শালগম ইত্যাদি পাওয়া যেত। সপ্তাহ শেষের ওই ব্রেকফাস্ট মেন্যুর খাবারগুলো অতি স্বাদের হতো। কারণ অন্য দিনগুলোতে খাবারের খুব অভাব থাকত।

দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে তারা অপেক্ষায় ছিল অ্যাডামের ফিরে আসার জন্য। ওই কয়েক মাস তাদের পরিবারে কনফারেন্স হয়নি, ব্রেকফাস্টে এ রকম স্বাদের খাবারও তৈরি হয়নি। ওই কয়েক মাস তাদের বাড়িতে নীরবতা টাইমবোমার মতো টিকটিক করেছে। বোমার মতো হীন, ফালতু ঝগড়া যেকোনো সময় ফেটে পড়ার মতো অবস্থায় ছিল।

 মা, ও আমার দিকে তাকিয়ে আছে!

 ওর দিকে তাকিয়ে থেক না।

 আবার ফিরে তাকাচ্ছে!

 আর ফিরে তাকিও না।

 মা!

 অ্যাডামকে খোঁজার ব্যাপারে পুলিশের কাছে তারা সাহায্য চেয়ে আবেদন করেছিল। তাদের আবেদনে সাড়া দিয়ে পুলিশ যখন খোঁজ করা শুরু করল, তারা প্রথমেই এলো স্টারবার্নদের বাড়িতে যেন শোকাহত চিন্তিত মা-বাবারও দোষ আছে। তারা চেক করে দেখল অ্যাডামের বাবার কোনো পুলিশি রেকর্ড আছে কি না। তারা খুঁজে কিছু পেল না। বলে গেল, আমরা আবার আপনাদের কাছে আসব। তারপর তারা এ ব্যাপারটা ছেড়েই দিল। আরো একটা ছোট কৃষ্ণাঙ্গ ছেলে হারিয়ে গেল। সুতরাং?

 বুকারের বাবা তার অতি প্রিয় পুরনো দিনের জ্যাজি রেকর্ডগুলো বাজানোও ছেড়ে দিলেন। বুকারও এগুলোর কোনো কোনোটা ছাড়াই চলতে পারত। তবে সাচমো পারলেন না। ঘটনাটা হলো ভাইকে হারানো; তার হৃদয়টা ভেঙে গিয়েছিল। তবে লুই আর্মস্ট্রংয়ের ট্রাম্পেট ছাড়া জগত্টাই দুমড়েমুচড়ে গেছে।

তারপর বসন্তের শুরুতে যখন লনের গাছপালা সাজতে শুরু করেছে, একদিন অ্যাডামকে একটা কালভার্টের ভেতর পাওয়া গেল।

অ্যাডামের দেহাবশেষ শনাক্ত করতে তার বাবার সঙ্গে বুকারও গেল। ইঁদুরে খেয়ে গেছে; ময়লা-আবর্জনা লেগে আছে, একটা চোখের কোটর খোলা। কীটপতঙ্গরা মনের আনন্দে বাসায় চলে গেছে; ফেলে গেছে তার কাদা জড়ানো হলুদ টি-শার্টের ডোরা দাগের নিচে পড়ে থাকা মাংসহীন পরিচ্ছন্ন কঙ্কাল। মৃতদেহের পরনে কোনো প্যান্ট নেই; পায়ে জুতোও নেই। বুকারের মা তাদের সঙ্গে যেতে পারলেন না। প্রথম সন্তানের অল্প বয়সের অতুলনীয় সৌন্দর্যের চিত্রকল্পটা তার মাথা থেকে তিনি অন্য কিছু দিয়ে মুছে দিতে চান না।

 বন্ধ কফিনের দাফন প্রক্রিয়াটা কেমন সস্তা আর নিঃসঙ্গ মনে হলো বুকারের কাছে। অবশ্য ধর্মোপদেশক বেশ দরাজ গলায় কথা বলে গেলেন। প্রতিবেশীদের আগমনে জমায়েত বেশ ভালোই হলো। সযত্নে রান্না করা খাবার ডিশের পর ডিশ আনা হলো কিচেনে। তবু বুকারের ভালো লাগল না। বরং মনে হলো, সব কিছুর আতিশয্য পরিবেশের নিঃসঙ্গতা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। তার ভাই তার চেয়ে বয়সে একটু বড় ছিল বটে; তবে তার খুব ঘনিষ্ঠ ছিল। শোকের গীত, পাদ্রির বয়ান, প্রতিবেশীদের জমায়েত, অশ্রু আর ফুলের চাপে অ্যাডামকে যেন দম বন্ধ করে আরেকবার মেরে ফেলা হচ্ছে। শোকের ধারা অন্যদিকে চালানোর ইচ্ছা তার : একদম ব্যক্তিগত, বিশেষ এবং সবচেয়ে বড় কথা হলো, এটা শুধুই তার নিজের শোক। অ্যাডামকে সে পূজা করার মতো ভালোবাসত। বুকারের চেয়ে মাত্র দুই বছরের বড় ছিল অ্যাডাম। দেখতে খুব সুন্দর, ফিটফাট চেহারা। হারানো আরেক ভাইয়ের নিখুঁত প্রতিস্থাপন ছিল অ্যাডাম। জন্মের আগে মায়ের পেটে কুঁকড়ে থাকার সময় আরেকজন ছিল বুকারের সঙ্গে। বুকার পরে শুনেছে, তার একটা যমজ ভাই হয়েছিল। কিন্তু জন্মের পরে আর তার নিঃশ্বাস পতন দেখা যায়নি। বুকারের তিন বছর বয়সের সময় তাকে বলা হয়েছিল এই যমজ ভাইয়ের কথা। জন্মের সময় যে ভাই মারা গেছে তার জন্য বুকারের মনে একটা ফাঁকা বোধ জেগে উঠতে থাকে। যেখানেই থাকে সে পাশে আরেকজনের জায়গা আছে টের পায়—বারান্দায় বসে থাকার সময় কিংবা উঠানে খেলার সময় সে টের পায়, তার পাশে ভাইয়ের জন্য খানিকটা ফাঁকা জায়গা আছে। যে কাঁথার নিচে বুকার ঘুমাত সে কাঁথার নিচেও ভাইয়ের উপস্থিতির জন্য খানিক ভাগ থাকত। বুকারের বড় হওয়ার সঙ্গে আস্তে আস্তে ভাইয়ের ফাঁকা উপস্থিতিটা বিলীন হতে থাকে। তখন যেন ভেতরের দিকে একটা গভীর সঙ্গ হয়ে ওঠে সেটা। তার প্রতিক্রিয়া এবং প্রবৃত্তিও যেন বিশ্বাস করতে পারে বুকার। প্রথম গ্রেড শুরু হলে প্রতিদিন অ্যাডামের সঙ্গে স্কুলে যাওয়ার অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে তার হারানো ভাইয়ের জায়গাটা পূরণ হতে থাকে। সুতরাং অ্যাডামের মৃত্যুর পর বুকারের আর কোনো সঙ্গী রইল না। অ্যাডামের সঙ্গে তারও মৃত্যু হলো।

 অ্যাডামকে বুকার সর্বশেষ যখন দেখে তখন অ্যাডাম স্কেটবোর্ডিং করছিল। গোধূলি বেলায় সাইডওয়াকে গায়ে হলুদ টি-শার্ট, নর্দার্ন ওয়াশিজ গাছের নিচে, গোধূলির আলোয় চকচক করছে তার শার্ট। সেপ্টেম্বরের শুরু তখন; কোনো কিছুতেই মৃত্যুর লক্ষণ নেই। মেপল পাতার নড়নচড়নে মনে হয়, তাদের সবুজ রং অমর। ওয়াশিজ গাছগুলো মেঘহীন আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। অস্ত যাওয়ার সময়ও সূর্যটা তেজ দেখানো শুরু করেছে। সাইডওয়াকের নিচে, ঝোপঝাড় আর বিরাট বিরাট গাছের মাঝখানে এক টুকরো সোনা হয়ে ছায়াময় সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে অ্যাডাম ভাসতে ভাসতে জীবন্ত সূর্যের মাসের দিকে চলে যাচ্ছে।

 বুকারের কাছে শুধু ভাইয়ের চেয়েও বেশি ছিল অ্যাডাম। তাদের মা-বাবা সন্তানদের নাম রেখেছিলেন বর্ণানুক্রমিক ধারায়। ইংরেজি এ অক্ষরে অ্যাডাম, বি অক্ষরে বুকার। সেদিক থেকে বিচার করলেও শুধু এর ধারক হিসেবে নয়, বুকারের কাছে তার চেয়েও বেশি ছিল অ্যাডাম। বুকার কী ভাবছে, কী অনুভব করছে সব বুঝতে পারত শুধু অ্যাডাম। অ্যাডামের মেজাজমর্জি ছিল একটু কর্কশ তবে নির্দেশনামূলক, কখনোই কারো প্রতি নিষ্ঠুর নয়। সবার চেয়ে স্মার্ট, ভাই-বোনদের সবাইকে খুব ভালোবাসত অ্যাডাম, তবে সবচেয়ে বেশি বুকারকে।

 রাস্তা ধরে সুড়ঙ্গের মতো পথে যে সর্বশেষ দেখা হলুদ আভা চলে যাচ্ছে সে চিত্র ভুলতে না পেরে বুকার একটা হলুদ গোলাপ রেখে দিল অ্যাডামের কফিনের ওপরে, পরে আরেকটা রাখল কবরের পাশে। পরিবারের অন্য সদস্যরা দূর-দূরান্ত থেকে দাফনে অংশ নিতে আর স্টারবার্নদের সমবেদনা জানাতে এলো। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মি. ড্রু, বুকারের নানা। আত্মীয়স্বজনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সফল ব্যক্তি। আত্মীয়দের মধ্যে যারা তাঁর মতো ধনী ছিল না তাদের সামনে নিজের ধনসম্পদ নিয়ে অহংকার করতেন। এ জন্য তাঁকে তাঁর মেয়েও ড্যাডি কিংবা পাপা বলত না, বলত মি. ড্রু। লোকটা অন্যদের কাছ থেকে কসাইয়ের মতো ভাড়া আদায় করে টাকা কামিয়েছেন, তবু আচার-আচরণের খানিকটা রীতি তাঁর মধ্যে রয়ে গেছে বলেই এই সংগ্রামী পরিবারের প্রতি মনে ঘৃণা জন্মালেও সেটা প্রকাশ করেননি।

 দাফনের কাজকর্ম শেষ হওয়ার পরে বুকারদের বাড়িটা ধীরে ধীরে আগের অবস্থায় ফিরতে থাকে : লুই, এলো, সিডনি বেশেট, জেলি রোল, কিং অলিভার এবং বাংক জনসনের উৎসাহদায়ী শব্দ রেকর্ড প্লেয়ার থেকে পটভূমি হিসেবে ভেসে আসতে থাকে। কনফারেন্স আর ব্রেকফাস্টের ভোজও ফিরে আসতে থাকে। বুকার এবং তার ভাই-বোনেরা, ক্যারোল, ডনোভান, এলি, ফেভার আর গুডমান নিয়মিত প্রশ্নের মজাদার উত্তর খুঁজতে থাকে মনে মনে। একসময় পুরো পরিবার সিসেম স্ট্রিটের পুতুলের মতো প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। সদস্যরা হয়তো আশা করে, এভাবে সবার ওপরে ইতিবাচক প্রভাব পড়লে জীবিতরা উজ্জীবিত হবে, মৃতরা নীরবতার ভেতর আশ্রয় পাবে। কিন্তু বুকারের মনে হতে থাকে, তাদের হাস্যকৌতুকের চেষ্টা জোর করে করা হচ্ছে; তাদের ইচ্ছা করে তৈরি সমস্যাগুলো ভুলের ভেতর থেকে তৈরি হচ্ছে। এগুলো অবমাননাকরও। দাফনের সময় এবং পরের কয়েক দিন তাদের মধ্যে একজনকে বুকারের ব্যতিক্রম মনে হয়েছে : তাদের এক খালা, তাকে বুকারদের পরিবারের সবাই কুইন বলে। তাকে আলাদা মনে হবে সেটা বুকার জানতই। কারণ তার নামের শেষে আরেকটা অংশ ছিল; সেটা তাদের কারো মনে নেই। এমনটা ঘটতে শুরু করেছে যখন তাদের কানে এসেছে কুইনের অনেক স্বামী হয়েছে তখন থেকে—একজন মেক্সিকান, তারপর দুজন শ্বেতাঙ্গ, চারজন কৃষ্ণাঙ্গ, একজন এশীয়। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে কারো মনে নেই। আগুনের মতো লাল রং তার ঘন ঝাঁকড়া চুলের। অ্যাডামের দাফনে অংশ নেওয়ার জন্য সুদূর ক্যালিফোর্নিয়া থেকে সে একাই এসে শোকার্ত পরিবারকে চমকে দিয়েছে। আর কেউ না বুঝলেও শুধু কুইনই বুঝতে পারে, বুকারের ক্ষোভ মিশ্রিত শোকের কথা। সে বুকারকে একান্তে ডেকে নেয়।

ওকে যেতে দিস না, কুইন বলল। যতক্ষণ না নিজে থেকে যেতে প্রস্তুত হয়। ইতিমধ্যে ওর সঙ্গে প্রাণপণে লেগে থাক। সময় হলে অ্যাডামই তোকে জানিয়ে দেবে।

কুইনের কথায় আরাম পায় বুকার, শক্তি পায়। তার পরিবার থেকে যে নিষেধাজ্ঞা বুকার পাচ্ছিল সেটার অন্যায্যতাকেও দীর্ঘায়িত করে দেয় কুইনের কথা।

 আত্মাকে ছড়িয়ে পড়ায় অনুপ্রাণিত করতে পারে যে সংগীত তার বাবা বাজাচ্ছিলেন সেটাকে দূর করে দিতে পারে এমন একটা সংকটের কথা ভেবে সতর্ক হয়েই বুকার জিজ্ঞেস করল, সে ট্রাম্পেট শেখার পাঠ নিতে পারে কি না। বুকার মনে করেছিল, এটা তার আহত অনুভূতিতে শক্তি জোগাবে। মি. স্টারবার্ন বললেন, অবশ্যই নিতে পারবে। তবে শর্ত দিলেন, শিক্ষকের ফির অর্ধেকটা তার ছেলেকেই জোগাড় করতে হবে। প্রতিবেশীদের বলেকয়ে বুকার কোরাসের জন্য রাজি করায় এবং শনিবারের কনফারেন্স যাতে এড়িয়ে যেতে পারে সে জন্যই ট্রাম্পেট শিক্ষার পাঠ নেবে। কনফারেন্স সম্পর্কে তার আর সব ভাই-বোনের মনোভাবটা তার অধৈর্যের কুঁড়ি আরো ফুটিয়ে তোলে; ওরা কী করে ভান করতে পারে, অ্যাডামের শোক চলে গেছে? ওরা কী করে অ্যাডামকে ভুলে যেতে পারে? খুনি কে, কোথায় থাকে সে?

বুকারের ট্রাম্পেটের শিক্ষক সকালের দিকে একটু নেশায় ঢুলুঢুলু থাকেন; তবে সংগীতের ওপরে তাঁর দারুণ দখল। আর শেখানোর বিষয়ে আরো ভালো।

 তোমার তো ফুসফুস ঠিক আছে; আঙুলও চমৎকার। এবার ঠোঁট ঠিক করা দরকার। যখন এ তিনটেই একসঙ্গে ঠিক করে পাবে, এগুলোর অস্তিত্বের কথাই ভুলে যাও, তারপর সংগীতের প্রবাহ ছেড়ে দাও বাইরে।

তাঁর কথামতো বুকার অনুশীলন করে।

ছয় বছর পরের কথা। বুকারের বয়স তখন চৌদ্দ। তত দিনে সে চমৎকার ট্রাম্পেটবাদক হয়ে গেছে। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মানুষটা সেবার ধরা পড়ে যায়; তার বিচার হয়, দোষী সাব্যস্ত হয় : প্রমাণিত হয় সে এসএসএস, সেক্সুয়ালি স্টিমিউলেটেড স্নুটারার। এ যাবৎ ছয়জন বালককে হত্যা করেছে সে। প্রত্যেকের নামে উল্কি এঁকে রেখেছে তার কাঁধে। অ্যাডামের নামও পৃথিবীর এই সুন্দরতম মানুষটার কাঁধের উল্কিতে আছে। বইস, লেনি, অ্যাডাম, ম্যাথিউ, কেভিন, লোল্যান্ড। পরিষ্কার বোঝা যায়, সে একজন সুযোগসন্ধানী খুনি। তার শিকাররা সবাই ‘উই আর দ্য ওয়ার্ল্ড’ ভিডিওর প্রতিনিধি। ট্যাটু আর্টিস্ট জানায়, সে মনে করেছিল, নামগুলো ওই লোকটার নিজের ছেলেদের, অন্য লোকের ছেলেদের নয়।

পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মানুষটি ছিল একজন সহজ-সরল মানুষ। অবসরপ্রাপ্ত অটো মেকানিক। বাড়িতে এসে কাজ করে দেওয়ার কথা বলে বেড়াত। তার বিশেষ দক্ষতা ছিল পুরনো ফ্রিজ যেমন পঞ্চাশের দশকের ফিলকোস, জিই, তারপর গ্যাসের স্টোভ, ফারনেস—এসব মেরামতের কাজে। পুরনো নষ্ট হয়ে যাওয়া এসব জিনিসকে সে বলত, আবর্জনা, এগুলো হলো আবর্জনা। যন্ত্রপাতিগুলোর বেশির ভাগ মারা যায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন না করার কারণে। যারা তাকে মেরামতের কাজে ডেকেছে তাদের সবারই তার এ রকম উপদেশের কথা মনে আছে। আরেকটা লক্ষণীয় দিক ছিল তার হাসি। সবারই তার আকর্ষণীয়, মন ভোলানো হাসির কথা মনে আছে। অন্য গুণগুলোর মধ্যে বলা যায়, সে ছিল খুঁতখুঁতে, সব কাজে সক্ষম, আচার-আচরণে ভালো। তার সম্পর্কে আরেকটা বিষয় সবার মনে আছে : বাইরে ঘোরাঘুরির সময় তার ভ্যানে করে নিয়ে বের হতো একটা ছোট সুন্দর কুকুর; একটা টেরিয়ার জাতের কুকুর। কুকুরটাকে সে ‘বয়’ বলে ডাকত।

তার সম্পর্কে যেসব খোঁজখবর পাওয়া গিয়েছিল সেসবের অনেকই চাপা রেখেছিল বা হালকা চোখে দেখার চেষ্টা করেছিল পুলিশ। কিন্তু নিহত বালকদের পরিবারগুলোকে থামানো কিংবা দমিয়ে রাখা যায়নি। তাদের সন্তানদের সঙ্গে কী ভয়াবহ আচরণ করা হয়েছে সেসব সম্পর্কিত দুঃস্বপ্ন বাস্তবতার ভয়াবহতাকে কোনোভাবেই হালকা হতে দেয়নি। ছয় বছরের দুঃখ আর নিরুত্তর প্রশ্ন যোগ হয়েছে তাদের মর্গের সামনে কাটানো সময়, দীর্ঘশ্বাস, কান্না, বোধহীন ভারী মুখের অবস্থা কিংবা অলক্ষ দুর্বলতার স্মৃতির সঙ্গে।

অ্যাডামের দেহাবশেষ যখন পাওয়া গেল, তার শরীরের তেমন কিছু আর ছিল না। তবে পরবর্তী অপহরণের যেসব বর্ণনা পাওয়া যায় তাতে বোঝা যায় গোথিক পর্যায়ের লোমহর্ষক অত্যাচার করা হয়েছে বালকদের ওপরে। বর্ণনা শুনে মনে হয়, বাচ্চাদের যখন বলাৎকার করা হয় তখন তাদের হাত-পা বাঁধা ছিল। নির্যাতনের পর তাদের অঙ্গহানিও করা হয়। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মানুষটি প্রলোভনের বস্তু হিসেবে তার টেরিয়ার কুকুরটিকে ব্যবহার করেছে। একজন বয়স্ক মহিলা, তিনি কেন্দ্রীয়ভাবে সাক্ষ্য দেন, তিনি বলেন, তাঁর মনে আছে, ওই লোকটার ভ্যানের প্যাসেঞ্জার পাশে একটা ছেলেকে কুকুর কোলে করে হাসতে দেখেছেন। কুকুরটা ছেলেটার মুখের কাছে ধরা ছিল। পরে দোকানের জানালায়, টেলিফোনের খুঁটিতে বড় গাছের সঙ্গে পোস্টারে নিখোঁজ বাচ্চা হিসেবে ওই ছেলেটার ছবি দেখেন। তাঁর তখন মনে পড়ে যায়, পোস্টারের ওই ছেলেটাকে তিনি দেখেছেন, ভ্যানে কুকুর নিয়ে হাসতে দেখেছেন। তিনি পুলিশকে ফোন করেন। পুলিশ ভ্যানটাকে চিনতে পারে। ওই ভ্যানের ওপরে লাল আর নীল অক্ষরে লেখা অঙ্গীকার : সমস্যা? সমাধান ডাব্লিউএম ভি হ্যামবোল্ডট। হোম রিপেয়ার। হ্যামবোল্ডটের বাড়ি তল্লাশি করার পর দেখা গেল, বেইসমেন্টে একটা নোংরা জাজিমে শুকনো রক্ত লেগে আছে; একটা বিশদ সাজসজ্জা করা ক্যান্ডি টিনের ভেতর শুকনো মাংসের খণ্ড কাপড়ে পেঁচানো আছে। খুব বেশি খেয়াল না করেও বোঝা গেল, এগুলো আসলে ছোট ছোট শিশ্ন।

বিচারপ্রক্রিয়ায় কী হচ্ছে না হচ্ছে কেউ দেখতে পায় না বলে প্রতিশোধের জন্য গণদাবি, গণমানুষের কণ্ঠ ক্রমেই উচ্চ হতে থাকে, বাড়তে থাকে। আদালতের সামনে মানুষজন বিভিন্ন প্রতিবাদী চিহ্ন প্রদর্শন করে, শোভাযাত্রা বের করে, পত্রিকায় সম্পাদকীয় ছাপা হয়। এসব দেখে বোঝা যায়, মৃত্যুদণ্ড ছাড়া আর কোনো শাস্তি হলে কেউ মেনে নেবে না। বুকারও অন্য সবার সঙ্গে কণ্ঠ মেলায়। তবে তার মনে হয়, এ রকম হালকা একটা সমাধান হলে চলবে না। সে লোকটার মৃত্যু চায় না; সে চায় লোকটার যাবজ্জীবন সাজা হোক। লোকটার অশেষ দুর্ভোগ আর হতাশার দৃশ্য কল্পনা করে সময় পার করে বুকার। আফ্রিকায় এ রকম একটা উপজাতি ছিল না, যাদের মধ্যে খুনের শাস্তি হিসেবে খুনির পিঠের ওপরে আছাড় মারা হতো মৃতদেহটি? সেটাই হবে উপযুক্ত বিচার। মৃতদেহটি তাকে পিঠে করে বয়ে বেড়াতে হবে শারীরিক শাস্তি হিসেবে এবং গণধিক্কার আর অভিশাপ হিসেবে। অ্যাডামের মৃত্যুতে যতটা শোক পেয়েছিল বুকার ঠিক ততটাই আবার পেল পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মানুষটির শাস্তির জন্য ক্ষোভ, গণদাবি—এসব দেখেশুনে। মূল বিচারকাজ ততটা বিলম্বিত মনে না হলেও প্রারম্ভিক প্রক্রিয়া যেন শেষই হতে চায় না। যত দিন খবরের কাগজে শিরোনাম ছাপা হলো, রেডিওতে আলোচনা হলো, পাড়ামহল্লায় মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হলো নৃশংস খুনের ঘটনা, তত দিন এসব থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখার উপায় খুঁজতে লাগল বুকার। তার অনুভূতিকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করল। অন্য পরিবারগুলোর উন্মত্ত ক্ষোভ আর দুঃখ থেকে তার নিজের অনুভূতিকে আলাদা করে রাখল। বুকারের মনে হলো, অ্যাডামের দুঃখজনক পরিস্থিতিটা কোনো গণবিষয় নয়, যেটাকে খবরের কাগজের শিরোনামে উল্লেখ করা ছয়জন নিহত বালকের তালিকায় সীমাবদ্ধ করে রাখা যাবে। বিপর্যয়ের বিষয়টা তো ব্যক্তিগত; দুই ভাইয়ের মাঝের একটা বিষয়। দুই বছর পরে একটা স্বস্তিদায়ক ও সন্তোষজনক সমাধান পেল সে। অ্যাডামের দাফনের সময় সে যেভাবে একটা বিশেষ কাজ করেছিল প্রায় তেমনি একটা কাজের কথা তার মাথায় এলো। বাঁ কাঁধের ওপরে ছোট একটা গোলাপের উল্কি এঁকে নিল। শিকারি লোকটাও কি এই একই চেয়ারে বসে ছিল? তার পেস্টের মতো সাদা ত্বকের জন্যও কি একই সুচ ব্যবহার করা হয়েছিল? বুকার অবশ্য জিজ্ঞেস করেনি। উল্কি আঁকার শিল্পীর তো আর বুকারের মতো চোখ-ধাঁধানো হলুদ স্মৃতি নেই। সুতরাং তারা ঠিক করে নিল, তার উল্কি হবে কমলা-লাল রঙের।

 কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়ে বুকার কিছুটা স্বস্তি পেল; মনোযোগ অন্যদিকেও গেল কিছুটা। খুব তাড়াতাড়িই ক্যাম্পাসের জীবন তাকে মুগ্ধ করতে পারল। তবে ক্লাস কিংবা প্রফেসরদের কারণে নয়, বরং তার প্রাণবন্ত আর সবজান্তা সহপাঠীদের কারণে সে মুগ্ধ হলো। পরের দুই বছরে তার এই মুগ্ধতা কাটেনি। প্রথম বছর থেকে শুরু করে দ্বিতীয় বছর পর্যন্ত হামবড়া ভাব দেখানো, জোরে জোরে হাসা, সব কিছু তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া, সহজে দোষ ধরা, সবাইকে ছোট করে দেখা—এক কথায় নবীন ব্যক্তির সমালোচনামূলক চিন্তা বলতে যা বোঝায় সেটাই করতে পারল এই সময়টাতে। বুকার এবং তার ডর্মের বন্ধুরা মেয়েদের মান বিচার করতে শুরু করল পুরুষদের ম্যাগাজিন ও পর্ন ভিডিও অনুসারে। আর নিজেদের অবস্থান নির্ধারণ করতে লাগল তাদের দেখা মারদাঙ্গা চলচ্চিত্রের চরিত্রদের মানদণ্ডে। চালাক যারা তারা ক্লাসের বাধা পার হয়ে চলে গেল। মেধাবীরা ঝরে পড়ে গেল। আর জুনিয়র হিসেবে বুকারের মধ্যম পর্যায়ের মানব বিদ্বেষ হতাশায় পরিণত হলো। তার সহপাঠীদের দৃষ্টিভঙ্গি তার কাছে একঘেয়ে আর অতিরঞ্জিত মনে হতে লাগল। কারণ তাদের চিন্তাচেতনা শুধু যে অগ্রহণযোগ্য তাই নয়, সিরিয়াস কোনো চিন্তারও অন্তরায় সেগুলো। বুকার ওয়াইল্ড ক্যাট ব্লুজকে তার ট্রাম্পেটে চরম উত্কর্ষের দিকে নিতে যে চেষ্টা করে তেমন নতুন কিংবা সৃষ্টিশীল কোনো চিন্তার দরকার ছিল না আন্ডারগ্র্যাজুয়েট সোসাইটিতে। আর অল্প বয়সের মধুর সীমা লঙ্ঘনেও কেউ প্রবেশ করেনি। ইরাকের যুদ্ধ নিয়ে তাদের ক্যাম্পাসে একসময় ছাত্রদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হলেও পরে সব শান্ত হয়ে আসে। আর এখন শ্লেষোক্তি পতাকা ওড়াচ্ছে আর খিলখিল হাসি হয়েছে তার শপথ। এখন প্রফেসরদের শান্তশিষ্ট পরিচালনা নিয়মমাফিক হয়ে গেছে। সুতরাং ডিকেটার স্ট্রিটের শনিবারের সকালের কনফারেন্সে তার মা-বাবার করা সেই প্রশ্ন নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করে বুকার : ১। কোন জিনিসটা তুমি জেনেছ যেটা সত্যি (আর কিভাবে জেনেছ সেটা)? ২। তোমার সামনে এখন সমস্যাটা কী?

 প্রথম প্রশ্নের উত্তর : আপাতত কিছুই না। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর : হতাশা।

 সুতরাং তাৎপর্যপূর্ণ কিছু শেখার জন্য এবং সম্ভবত হতাশাকে ধারণ করার মতো একটা উপযুক্ত জায়গা খুঁজে নিতে সে গ্র্যাজুয়েট স্কুলে দরখাস্ত করে। সেখানে বুকার বিনিময় থেকে বোমা পর্যন্ত সবখানে সম্পদ খুঁজে দেখার ওপরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। মনে হতে থাকে, এটা একটা মোহনীয় বুদ্ধিবৃত্তিক যাত্রা; এই যাত্রা তার রাগ, ক্ষোভকে নিয়ন্ত্রণ করে খাঁচায় আটকে রেখেছে এবং এখান থেকে সে বর্ণবাদ, দারিদ্র্য, যুদ্ধ—এসবের ব্যাখ্যা পাচ্ছে। রাজনৈতিক জগৎ হলো অভিশাপ। এ জগতের কর্মীরা পশ্চাৎপদ এবং প্রগতিশীল উভয়ই; তারা সব মাথা গোলমেলে আর নিদ্রালু স্বপ্নবাজ। শান্তিবাদী হোক আর সশস্ত্রই হোক বিপ্লবীরা কোনো ধারণাই রাখে না, তারা জয়লাভ করার পর কী ঘটা উচিত। কারা শাসন করবে? জনগণ? তার মানেটা কী, প্লিজ? সবচেয়ে ভালো ফলাফলটা হবে জনগণের মধ্যে একটা নতুন ধারণা চালু করে দেওয়া যে সম্ভবত একজন রাজনৈতিক নেতা শাসন করবেন। বাকিটা হলো থিয়েটার; তার জন্য দরকার দর্শক। সম্পদ একাই মানুষের অশুভ শক্তি সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিয়েছে। বুকার স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়, সে সম্পদের প্রতি বশ্যতা স্বীকার করবে না, সমীহ দেখাবে না। তার ভালো করে জানা ছিল, সে কোন বিষয়ে কোন বিষয়বস্তু নিয়ে প্রবন্ধ ও বই লিখবে। তার গবেষণায় সেগুলো টুকে রেখেছে। তার পাণ্ডিত্যের জগতের নির্ধারিত বিষয় ছাড়া খুব অল্প কবিতা আর কিছু জার্নাল পড়েছে। নামকরা কিংবা সাধারণ মানের কোনো উপন্যাসই সে পড়েনি। কিছু কবিতা ভালো লেগেছে; কারণ সেগুলোকে সংগীতের সমান্তরাল মনে হয়েছে; আর জার্নালগুলো পড়ার কারণ হলো, সেখানকার প্রবন্ধগুলো রাজনীতির ভেতর ছুরি চালিয়ে সংস্কৃতি তৈরি করেছে। তার গ্র্যাজুয়েট স্কুলের সময়েই ভবিষ্যতের প্রবন্ধমালা লেখার পরিকল্পনা ব্যতীত অন্য কিছু লিখেছে। বিরামচিহ্নহীন বাক্যগুলোকে সে সংগীতের ভাষার আকার দেওয়ার চেষ্টা শুরু করে; সেগুলোতে তার চিন্তা সম্পর্কিত প্রশ্ন কিংবা চিন্তার ফলাফল প্রকাশ করা হয়।

 তার মাস্টার ডিগ্রি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পরই শুধু বুকার বাড়ি আসে : তার মা খুশি উদ্‌যাপন উপলক্ষে ডিনার আয়োজন করেন। বুকার একবার ভাবে, তার এই-আছে-এই-নেই বান্ধবী ফেলিসিটিকে সঙ্গে নেবে। কিন্তু পরক্ষণেই সিদ্ধান্ত বদলে ফেলে। তার পরিবার সম্পর্কে বাইরের কেউ বিচার-বিশ্লেষণ করুক তা সে চায় না। সেটা শুধু তার নিজেরই কাজ।

 পারিবারিক পুনর্মিলনে সব কিছু সুন্দরভাবে আনন্দের সঙ্গেই চলছিল। তবে বুকার কী যেন খুঁজতে ওপরের তলায় তার পুরনো শোবার ঘরে গেল; এ ঘরেই অ্যাডাম ও বুকার ঘুমাত। গিয়ে দেখে ঘরটা শুধু যে আলাদা চোহারায় চলে গেছে তাই নয়, পুরোপুরি উল্টো চেহারা ধারণ করেছে। আগে এখানে অ্যাডামের এবং তার বিছানা একসঙ্গে জোড়া দেওয়া ছিল; এখন সেখানে ডাবল বিছানা সেট করা আছে্; আগের ছায়া ছায়া ঘন পর্দার জায়গায় সাদা স্বচ্ছ পর্দা লাগানো হয়েছে; ছোট একটা ডেস্কের নিচে ছোট একটা গালিচা রাখা হয়েছে। সবচেয়ে খারাপের খারাপ মনে হলো, তাদের খেলার সরঞ্জামের ছোট ঘরটাতে আগে যেখানে ব্যাট, বাস্কেটবল, বোর্ড গেমস ইত্যাদিতে ঠাসা থাকত সেখানে এখন বোঝাই করে রাখা হয়েছে ক্যারলের মেয়েলি পোশাক-আশাক। বুকারের ও অ্যাডামের একই রকম স্কেটবোর্ড ছিল; তার হারিয়ে যাওয়ার সময় অ্যাডামের বোর্ডটাও হারিয়ে গেছে। বাকি ছিল বুকারেরটা। সেটাও আর কোথাও নেই। জিনিসটা আর নেই বুঝতে পারার সঙ্গে সঙ্গে বুকারের বুকটা হাহাকারে আটকে এলো। দুঃখ ভারাক্রান্ত দুর্বল মনে বুকার নিচতলায় নেমে গেল। কিন্তু চোখের সামনে ক্যারলকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে তার দুঃখের দুর্বলতা প্রচণ্ড ক্রোধে পরিণত হলো। সে ক্যারলের সঙ্গে ঝগড়া বাধিয়ে দিল। ক্যারলও তার কথার জবাব দেওয়া শুরু করল। তাদের ঝগড়া চড়তে চড়তে পরিবারের সবার জন্য বিরক্তিকর হয়ে উঠল; তখন মি. স্টারবার্ন বাধ্য হয়ে ঝগড়া থামানোর চেষ্টা করলেন।

 বুকার থামো! তুমি একাই শুধু শোক পেয়েছ তা নয়। মানুষ একেকজন একেক রকম করে শোক পালন করে। তার বাবার কণ্ঠ ছুরির প্রান্তের ইস্পাতের মতো শোনাল।

 হ্যাঁ, তা তো অবশ্যই, বুকারের কণ্ঠও হিংস্র মনে হলো, সঙ্গে যোগ হয়েছে ঘৃণা।

 তোমার আচরণে মনে হচ্ছে, এ পরিবারে শুধু তুমিই তাকে ভালোবাসতে! অ্যাডাম নিশ্চয় এ রকম চাইত না।

 সে কী চাইত না চাইত তোমরা জানো না, বুকারও পাল্টা জবাব দিয়ে দিল।

 মি. স্টারবার্ন গদিঅলা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন, ঠিক আছে, আমি কী চাই আমি জানি। আমি চাই, তুমি সভ্য হয়ে এখানে থাকো, নইলে বের হয়ে যাও!

 আহ্, কী বলো! মিসেস স্টারবার্ন বললেন। ও কথা বলো না!

 বাবা-ছেলে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল; তাদের চোখে সামরিক আগ্রাসন। মি. স্টারবার্ন যুদ্ধে জয়ী হলেন; বুকার জোরে দরজা বন্ধ করে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল।

 তার অবস্থার সঙ্গে মানানসই ব্যাপারটা হলো, তার চিরচেনা একটি মাত্র বাড়ি ছেড়ে বের হওয়ার পরে তাকে অঝোর বৃষ্টির মধ্যে পড়তে হবে। বৃষ্টির কারণে বাধ্য হয়ে তাকে শার্টের কলার উঁচু করতে হলো; রাতে কোনো আশ্রয়ে প্রবেশ করার সময় অনভিপ্রেত কোনো লোক যেভাবে কৃতজ্ঞ বদনে এগোয় সে রকম মাথা নিচু করে তাকেও এগোতে হলো। উঁচু কাঁধ আর ত্যারচা চোখে পথের দিকে তাকিয়ে ডিকেটার স্ট্রিটে নেমে পড়ল বুকার। ঝড়-বৃষ্টির ভেতর যেমনটা থাকার কথা তেমনই রইল তার মনের ভাবটা। ক্যারলের সঙ্গে ঝগড়া করার আগে সে মা-বাবাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে, অ্যাডামের স্মৃতিতে কিছু একটা তৈরি করা দরকার। যেমন তার নামে ছোটখাটো একটা স্কলারশিপ চালু করা যেতে পারে। বুদ্ধিটা শুনে তার মা খুশি হলেন; কিন্তু তার বাবা তাচ্ছিল্যে উড়িয়ে দিলেন এবং বিরোধিতাও করলেন।

 তিনি বললেন, আমরা এভাবে টাকা-পয়সার অপচয় করতে পারি না। কোনো মেমোরিয়াল তৈরি করে নষ্ট করার মতো সময়ও আমাদের নেই। তা ছাড়া যারা অ্যাডামকে পছন্দ করত, প্রশংসা করত তারা অ্যাডামকে মনে রেখেছে। তাদের অ্যাডামের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার দরকার নেই।

 তারও আগে শুধু ক্যারলের কাছ থেকে নয়, তার অন্য ছোট ভাই-বোনদের কাছ থেকেও বুকার শুধু অননুমোদনই পেয়েছে; তার মনের ভেতর একটা বিষাক্ত হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে ওদের কারণে। ফেভার ও গুডমানের মনে হলো, বুকার যে ভাইয়ের জন্য মূর্তি বানাতে চাইছে সে তো মারা গেছে তারা একদম শিশু থাকতে। বুকার যেটাকে আনুগত্য বলতে চেয়েছে অন্যরা সেটাকে বুঝেছে তার তরফ থেকে অন্যদের নিজের মতো করে পরিচালনা করা বলে। তারা মনে করেছে, বুকার তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে, বাবার ওপর দিয়ে বাবাগিরি দেখাতে চাইছে। যেহেতু তার দুটো কলেজ ডিগ্রি আছে তার মনে হলো, সে সবাইকে বলতে পারবে কী করতে পারে না পারে। অন্যরা তার উগ্র মনোভাব দেখে অবাক হয়ে চোখ চাওয়াচাওয়ি করল।

 অ্যাডামের এবং তার পুরনো শোবার ঘরে ঢুকে টের পেল, অন্যরা যে তার মেমোরিয়াল তৈরির প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে তার যোগসূত্র আছে এখানেও। ওই ঘরে শুধু তার নয়, অ্যাডামেরও আদিম অনুপস্থিতি দেখতে পেল বুকার। সুতরাং যখন সে বাড়ির দরজা বন্ধ করে রাস্তায় বের হয়ে পড়ল সেটাও তার একটা বিলম্বিত কাজই।

বুকার যখন ফেলিসিটিকে জিজ্ঞেস করল, সে ফেলিসিটির বাসায় কয়েক দিন লুকিয়ে থাকতে চায়, ফেলিসিটি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেল। এত তাড়াতাড়ি রাজি হওয়ার জন্য তার প্রতি বুকার কৃতজ্ঞবোধ করল। কারণ সে যেহেতু গ্র্যাজুয়েট ডর্ম ছেড়ে এসেছে, তার আর নিজের কোনো ঠিকানাই নেই যাওয়ার মতো। ক্যাম্পাসে ফেরার বাসে বসে ‘ডেডালাস’-এর পুরনো একটা সংখ্যা পড়তে পড়তে তার পরিবারের সঙ্গে কলহের হতাশা খানিকটা ভুলে গেল। তবে হতাশা আবার বেশ জোরের সঙ্গেই ফিরে এলো যখন সে কলেজের ডর্মে ফিরে গিয়ে ওখানে তার যেসব জিনিস পড়ে ছিল সব বাক্সে ফেলে দেওয়া শুরু করল। টেক্সট বই, রানিং শুজ, দুমড়ানোমোচড়ানো কাপড়, খাতা, জার্নাল—সব কিছু, শুধু তার প্রিয় ট্রাম্পেট ছাড়া। তাকে নিষ্ঠুরভাবে ভুল বোঝা হয়েছে বলে আত্মকরুণায় গড়াগড়ি খেতে থাকে বুকার। একসময় আত্মকরুণা থেকে উঠে বান্ধবী ফেলিসিটিকে ফোন করে। ফেলিসিটি ছিল একজন বদলি শিক্ষক এবং তাদের সম্পর্ক টিকে ছিল দুই বছর; তার প্রধান কারণ হলো, বেশ লম্বা সময় ধরে মাঝেমধ্যে তাদের দেখা-সাক্ষাৎ হতোই না প্রায়। ফেলিসিটিকে ডাকা হতো একজন শিক্ষকের আকস্মিক অসুস্থতার সময়ে। এ জন্য নিয়মিত তার কাজ থাকত না। আর তাদের অবস্থানেরও দূরত্ব ছিল, দূরবর্তী ডিস্ট্রিক্টে। সুতরাং ফেলিসিটির বাসায় আসার কথা জিজ্ঞেস করতে বুকার সংকোচবোধ করেনি। কারণ তারা দুজনই জানত, বিষয়টা সুবিধা-অসুবিধাসংক্রান্ত; এতে দায়িত্ববোধের কিছু নেই। তখন গ্রীষ্ম চলছে; ফেলিসিটিরও বদলি দেওয়ার জন্য ডাক পড়বে না। সময়ের কোনো রকম সীমারেখা না মেনে দুজন দুজনের সঙ্গ উপভোগ করতে পারবে, যা ইচ্ছা করতে পারবে: সিনেমায় যাওয়া, বাইরে খেতে যাওয়া, বনেবাদাড়ে ঘুরে বেড়ানো ইত্যাদি।

 এক সন্ধ্যায় বুকার ফেলিসিটিকে একটা ছোটখাটো ডিনার-অ্যান্ড-ড্যান্সিং ক্লাবে নিয়ে যায়; লাইভ কম্বো হিসেবে ক্লাবটার অনেক গর্ব আছে। অন্য সময়ের মতো চিংড়ি আর রাইস সামনে নিয়ে ভাবতে থাকে সামনের ছোট মঞ্চের প্রায় এক-চতুর্থাংশের জন্য পিতলের বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারকারী দরকার। প্রকৃতপক্ষে সব জনপ্রিয় সংগীতই তারের বাদ্যযন্ত্রে পরিপূর্ণ : গিটার, আঘাত করে বাজানোর মতো বাস ও পিয়ানোর কি ইত্যাদি। ই স্ট্রিট ব্যান্ড এবং ওয়েন্টন মার্শালিসের অর্কেস্ট্রার মতো বড় বড় সংগীতদল ছাড়া অন্যান্য দল খুব কমই ব্যাকআপ কিংবা সোলো, স্যাক্স, ক্লারিনেট, টুম্বোন কিংবা ট্রাম্পেট ব্যবহার করে। আর সংগীত পরিবেশনায় এসব বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার না থাকার যে শূন্যতা সেটা খুব তীব্রভাবে অনুভব করে বুকার। সুতরাং সেদিন সন্ধ্যায় বিরতির সময় বুকার মঞ্চের পেছনে যায়; একটা সরু ড্রেসিং রুম, চুরুটের ধোঁয়া আর সংগীতজ্ঞদের হাসিতে ভরা। বুকার জিজ্ঞেস করতে যায়, তাদের দলে সে কোনো সময় যোগ দিতে পারবে কি না। তারা চায়নি তাদের আয়ের মধ্যে আরেকজন অচেনা বাদক এসে ভাগ বসাক। এ জন্য তারা প্রথমেই তাকে নাকচ করে দেয়।

 আরে, চুলোয় যাও, মিয়া!

 তোমারে কেডা আসতে দিছে?

 আচ্ছা ঠিক আছে। আমার কথাটা একবার শুনতে পারো তো! বুকার অনুনয় করে বলল। আমি ট্রাম্পেট বাজাই আর তোমরা তো শিঙা দিয়ে কাজ চালাতে পারো।

 গিটারবাদকরা পরস্পর চোখ চাওয়াচাওয়ি করল। ড্রামাররা বলল, সামনের শুক্রবারের সেটে তোমার ট্রাম্পেট নিয়ে এসো। যদি ঠিকমতো বাজাতে না পারো তখনই বাতিল হয়ে যাবে।

 সামনের শুক্রবার যে তার অডিশন আছে এ কথা ফেলিসিটিকে জানাল না বুকার। তার ট্রাম্পেট বাজানোতে ফেলিসিটি কম আগ্রহী হওয়ার কথা নয়।

 ড্রামার যেভাবে বলেছিল বুকার ঠিক সেভাবেই বাজাল; তাদের সামনে ড্রেসিং রুমে বাজাল। তার বাজানোর চেষ্টা প্রায় লুই আর্মস্ট্রংয়ের একটা সোলোর কাছাকাছি পৌঁছে গেল। ড্রামার মাথা নেড়ে সায় দিল, পিয়ানোবাদক হাসি দিল আর গিটারবাদক দুজন কোনো আপত্তি করল না। তখন থেকে বুকার দ্য বিগ বয়েস অন ফ্রাইডেস নামের দলে যোগ দিয়ে দিল। জায়গাটা যখন কানায় কানায় ভিড়ে ঠাসা থাকে তখন পানকারীরা কিংবা ডাইনাররা সংগীতের দিকে খুব একটা মনোযোগ দেয় না।

 সেপ্টেম্বর মাসে যখন দ্য বিগ বয়েস ভেঙে যায়, তখন ড্রামার অন্যখানে চলে যায়; পিয়ানোবাদক আরো ভালো এক জায়গায় সুযোগ পায়। বুকার এবং গিটারবাদক দুজন মাইকেল আর ফ্রিম্যান চেজ রাস্তাঘাটে একসঙ্গে বাজিয়ে চলে; তাদের চারপাশে জুটতে থাকে গৃহহীন যুদ্ধপ্রবীণ; তাদের চোখে ঠাণ্ডা ক্রোধ। তারা চারপাশে সংগীতের উদার বন্দনা পেয়েছে দেখেও তাদের রাগের আগুন নেভে না। বুকারের জীবনে এটাই ছিল সবচেয়ে মধুর মৌসুম। কিন্তু এটা বেশি সময় টেকেনি। গ্রীষ্মের শেষের দিকে ফেলিসিটির সঙ্গে তার সম্পর্ক সব রকম জোড়াতালি দেওয়ার বাইরে চলে যায়। রুমমেট প্রেমিক-প্রেমিকা হিসেবে তারা পুরো গ্রীষ্মকাল কাটিয়েছে। তারপর আস্তে আস্তে বুঝতে পারে, আগে চোখে পড়েনি কিংবা ভালো করে দেখা হয়নি এমন কিছু বিষয় তাদের মধ্যে আছে যেগুলো পরস্পরকে বিরক্ত করা শুরু করে। বুকারের সশব্দ ট্রাম্পেট অনুশীলন সম্পর্কে ফেলিসিটির নালিশ; ফেলিসিটির বন্ধুদের সঙ্গে প্রতি রাতে পার্টিতে যেতে রাজি নয় বুকার। এটাও ফেলিসিটির পছন্দ নয়। আবার ফেলিসিটির সিগারেটের ধোঁয়া, বাইরের খাবার, সংগীত, মদ পছন্দ নয় বুকারের। তা ছাড়া ফেলিসিটির পরিবারের লোকদের অবিরত আসা-যাওয়া বুকারের ভালো লাগে না। বুকারের জীবন সম্পর্কে ফেলিসিটি অতিমাত্রায় নাক গলায়। বুকারের কাছে ফেলিসিটির সবচেয়ে খারাপ দিক হলো বেশি বেশি মতামত চাপানো। বাস্তবে তারা দুজনই একে অপরের কাছে বড্ড নিরানন্দ হয়ে দেখা দেয়। ফেলিসিটি মনে করে, সে যদি আরেকবার বুকারের পছন্দের সংগীতজ্ঞ ডোনাল্ড বায়ার্ড কিংবা ফ্রেডি হাবার্ড কিংবা ব্লু মিটশেল কিংবা অন্য কারো সুর তার ট্রাম্পেটে শোনে তাহলে তার মাথা খারাপ হয়ে যাবে। সে বুকারকে পরাজিত মানববিদ্বেষী মনে করতে থাকে। তাদের মধ্যে হিংস্রতা ধিকিধিকি বাড়তে থাকে; তবু তারা একসঙ্গে থাকতে পারত। কিন্তু এর মধ্যে আবার একটা অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটে যায় : বুকার গ্রেপ্তার হয় এবং এক রাত হাজতে থাকে।

 একটা ফাঁকা জায়গায় গাড়ি পার্ক করে এক জোড়া নারী-পুরুষ পালাক্রমে কলকে টানছে। বুকার তাদের পার হয়ে চলেও যায়। দৃশ্যটা তার কাছে দৃষ্টি দেওয়ার মতো মনে হয় না। কিন্তু দেখতে পায় একটা শিশু, বয়স দুই বছরের মতো হবে, তাদের টয়োটার পেছনের সিটে দাঁড়িয়ে আর্তনাদ করছে, চিৎকার করছে। সোজা হেঁটে গিয়ে টান দিয়ে গাড়ির দরজা খুলে ফেলে লোকটাকে টেনে বের করে আনে বুকার, মুখের ওপরে থাবড়া মারে, লাথি দিয়ে লোকটার হাতের কলকেও ফেলে দেয় মাটিতে। তারপর নারীটি লাফ দিয়ে বের হয়ে দৌড়ে আসে তার সঙ্গীকে বাঁচাতে। তিনজনের মারামারি যতটা ক্ষয়ক্ষতি করতে পারে বলে মনে হয় তার চেয়ে বেশি মনে হয় মজার। কিন্তু সহজে থামে না। বেশ জোরে জোরে শব্দ হয় তাদের মারামারিতে। প্রথমে কেনাকাটা করতে আসা লোকজন, পরে পুলিশও টের পেয়ে যায়। তাদের তিনজনকেই গ্রেপ্তার করা হয় এবং শিশুটাকে চাইল্ড কেয়ার সার্ভিসে দিয়ে দেওয়া হয়।

 বুকারের জরিমানার টাকা গুনতে হয় ফেলিসিটিকে। বিচারক অবশ্য বুকারের প্রতি খানিক সদয় মনে হয়; কারণ নেশাখোর মা-বাবা দুজনের আচরণে বুকার যতটা বিরক্ত বিচারকও ততটা বিরক্ত হন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তৈরি হয় এবং বুকারকে ডিসটার্বিং-দ্য-পিস টিকিট ধরিয়ে দেন। গোটা বিষয় ফেলিসিটিকে ক্ষিপ্ত করে তোলে। সে চিৎকার করে জানতে চায়, যে বিষয়টাতে তার সংশ্লিষ্টতা নেই সেখানে কেন নাক গলাতে গেল বুকার।

 নিজেকে তুমি কী মনে করো? ব্যাটম্যান?

 বুকার হাত দিয়ে ডান পাশের মাড়ির দাঁত পরখ করে, ঢিলা হয়ে গেল, নাকি ভেঙে গেল। পুরুষটার চেয়ে মহিলার গায়ে শক্তি বেশি। লোকটা লাফালাফি বেশি করেছে, কিন্তু আঘাত খুব একটা লাগাতে পারেনি।    মহিলার আঙুলের উল্টো পাশ লেগেছে বুকারের চোয়ালে।

 বুকার বলল, একটা ছোট শিশু ছিল গাড়ির মধ্যে।

 ফেলিসিটি চিৎকার করে বলল, শিশুটা তোমার বাচ্চা নয়, তোমার নাক গলানোর কথা নয় তো!

 বুকার বুঝতে পারে, খানিকটা নড়ে গেছে মনে হয়। তবে সে দাঁতের ডাক্তারের কাছে যাবে।

 বাড়ি ফেরার সময় বাসে মুখে কিছু না বললেও দুজনই বুঝতে পারে, তাদের সম্পর্ক শেষ। তার অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছানোর পর ঘণ্টাখানেক বুকারের সিসার মতো নীরবতার বিপরীতে ফেলিসিটি প্যাচাল পাড়তেই থাকে। শেষে রণেভঙ্গ দিয়ে সে গোসলে ঢোকে। দুজনে একসঙ্গে শাওয়ার নেওয়ার অভ্যাস তাদের। কিন্তু শেষমেশ বুকার আর ফেলিসিটির সঙ্গে গোসলে ঢোকে না।

 বুকারের কাজকর্মের ইতিহাস খুব সংক্ষিপ্ত—জুনিয়র হাই স্কুলে সংগীত শেখানোর একটা বিব্রতকর আর বিপর্যয়ে ঘেরা সেমিস্টার। তার যেহেতু সার্টিফিকেট নেই, এই একমাত্র পাবলিক স্কুলের শিক্ষকতা। যেসব সংগীত অডিশনের জন্য সাইন আপ করেছিল সেগুলো থেকে বাদ পড়েছে। তার ট্রাম্পেটের মেধা যথেষ্ট, তবে খুব একটা ব্যতিক্রমী নয়।

 একেবারে ঠিক সময়ে তার ভাগ্য বদলে গেল। ক্যারল তাকে খুঁজে বের করে একটা চিঠি দিল। একটা আইনি প্রতিষ্ঠান থেকে তার নামে চিঠিটা পাঠানো হয়েছে। মি. ড্রু মারা গেছেন। আর সবার বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, তিনি নিজের কোনো সন্তানকে তাঁর উইলের মধ্যে রাখেননি, রেখেছেন তাঁর নাতি-নাতনিদের। তাঁর ভাই-বোনদের সঙ্গে বুকারও বুড়োর বড়াই করার মতো সম্পত্তির ভাগ পেয়েছে। তার নানার সম্পত্তি অর্জনের পথে যে অপরাধপ্রবণতা আর লোভ কাজ করেছে, এ ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামাতে চায় না বুকার। সে নিজেকে বোঝায়, কসাইয়ের মতো করে জমানো বাড়িভাড়ার টাকা মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পরিচ্ছন্ন হয়ে গেছে। মন্দ নয়। এখন সে নিরিবিলি একটা এলাকায় নিজের একটা থাকার জায়গা ভাড়া করতে পারছে; রাস্তায় কিংবা ছোটখাটো কোনো ক্লাবে বাজানো চালিয়ে যায়। তাদের যেহেতু কোনো স্টুডিওতে জায়গা হয়নি তারা রাস্তার মোড়ে বাজাতে থাকে। তাদের কাছে টাকাটা একটা করুণার বিষয়; তারা টাকার জন্য বাজাচ্ছে তা নয়। বরং নিজেদের মধ্যে অনুশীলন চালিয়ে যাওয়ার স্বার্থে, পর্যবেক্ষণ করার স্বার্থে বাজাচ্ছে তারা। তাদের সামনের দর্শকরা টাকা দিচ্ছে না বলেই তাদের কোনো চাহিদাও নেই; তারা কোনো সমালোচনাও করছে না।

 তারপর এমন একটা দিন তার জীবনে এলো যে দিনটা তার জীবন আর সংগীতকে পুরোপুরি বদলে দিল।

 রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে একটা নীলাভ কালো চেহারার মেয়েকে হাসতে দেখে তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে একেবারে বোবা হয়ে হাঁ করে তাকিয়ে রইল বুকার। তার পরনের পোশাক পুরোটা সাদা; চুল দেখে মনে হয়, মাথার ওপরে লাখ লাখ কালো প্রজাপতি ঘুমিয়ে আছে। মেয়েটা কথা বলছে আরেকটা মেয়ের সঙ্গে; তার গায়ের রং চকের মতো সাদা, তার সোনালি চুলে ড্রেডলক করা। একটা লিমুজিন রাস্তার পাশে এসে দাঁড়াল। ড্রাইভারের গাড়ির দরজা খুলে ধরার জন্য অপেক্ষা করে মেয়ে দুটো। লিমুটাকে চলে যেতে দেখে বুকারের মন খারাপ হয়ে যায়; তবে সে মুখে হাসি রেখেই ট্রেনের প্রবেশপথের দিকে হাঁটা দেয়। সেখানে গিটারবাদকদের সঙ্গে ট্রাম্পেট বাজাবে। ওখানে পৌঁছে দেখে, মাইকেল কিংবা চেজ কেউই নেই। ওই মুহূর্তে তার খেয়াল হয়, হালকা একটানা বৃষ্টি পড়ছে। সূর্যের আলো তখনো চকচক করছে। শিশু-নীল আকাশ থেকে পতিত বৃষ্টির ফোঁটাগুলো স্বচ্ছ স্ফটিকের ফোঁটা হয়ে পেভমেন্টের ওপরে পড়ছে। বুকার সিদ্ধান্ত নেয়, সে একাই ট্রাম্পেট বাজাবে; বৃষ্টি থাকে থাকুক। সে জানে, কোনো পথচারীই বৃষ্টির মধ্যে তার বাজনা শোনার জন্য থামবে না। বরং তারা ছাতা বন্ধ করে সবাই যার যার মতো ট্রেনের সিঁড়ির দিকে ছোটে। একটু আগে দেখা মেয়েটার দারুণ সৌন্দর্যের ঘোরের মধ্যে সে ট্রাম্পেট ঠোঁটের কাছে ধরে। যে শব্দ শুনতে পায় সেটা হলো সংগীত; এত মধুর সংগীত আগে কখনো বাজাতে পারেনি। নিচু লয়ের নীরবতার সুর অনেকক্ষণ ধরে রেখে ছেড়ে দেওয়ায় বৃষ্টির ফোঁটার ভেতর যেন ভাসতে থাকে।

নিজের অনুভূতি প্রকাশের কোনো ভাষা থাকে না বুকারের। শুধু জানে, ওই মেয়েটার কথা মনে রেখে বাজালে বৃষ্টিভেজা বাতাস লাইলাক ফুলের সুবাস ছড়ায়। পাশে আবর্জনার পাত্র থাকলেও রাস্তাটা কী সুন্দর মনে হচ্ছে, ময়লা-আবর্জনার প্রসঙ্গ মনেই আসছে না। মদের দোকান, রূপচর্চার জিনিসপত্রের দোকান, রেস্তোরাঁ, পুরনো কাপড়ের দোকান, একটার গায়ের সঙ্গে আরেকটা লেগে আছে; এগুলোকে মনে হচ্ছে খুব চেনা, খুব আপন। তার দিকে মেয়েটার চকচক করা চোখ, আকর্ষণীয় আর বেপরোয়া হাসি ছড়ানো ঠোঁটের চেহারা মনে পড়তেই বুকারের ভেতর কামনার উচ্ছ্বাস জেগে ওঠে। এত বছর ধরে অ্যাডামের মৃত্যু তাকে যে হতাশার মেঘে ঢেকে দিয়েছিল সেই অনুভূতি যেন এখন তাকে মুক্তি দিয়ে চলে গেল দূরে কোথাও। কল্পনায় সেই মেঘের ভেতর পা ফেলে এবং আগের মতো আবেগে আপ্লুত হয়ে বুকার দেখতে পায়, অ্যাডাম সূর্যাস্তের সময় স্কেটিং করছে—সেখানেও ওই মেয়েটা আছে। মধ্যরাতের গ্যালাটিয়া সবখানে আছে, প্রাণবন্ত অবস্থায় আছে।

 লিমুজিনের জন্য তার সেই অপেক্ষার দৃশ্যের কয়েক সপ্তাহ পরে বুকারের আবার দেখা হয় তার সঙ্গে, স্টেডিয়ামের সামনে একটা লাইনে দাঁড়িয়ে আছে সে। নতুন, উদীয়মান, তবে খুব আকর্ষণীয় একটা ব্যান্ড ব্ল্যাক গচোসের সদস্যরা পারফরম করছিল সেদিন। ব্রাজিলীয় আর নিউ অরলিন্সের জ্যাজ পারফরম করছিল, একটাই শো। লাইনটা দীর্ঘ, সরব আর নার্ভাস; তবে ভিড়ের সামনে যখন দরজা খোলা হলো বুকার চারজনকে টপকে এগিয়ে গেল মেয়েটার পেছনে। ভিড়ের দর্শকদের অনেকেই বেঞ্চে সিট পেয়ে গেল। বুকার ঠিক মেয়েটার পেছনে দাঁড়ানোর জায়গা পেল।

 সংগীতের আওয়াজভরা বাতাসে শরীরের সব আইনকানুন গেল ভেঙে। মাখনের মতো ঘন যৌন উদারতা, বুকারের হাতে মেয়েটার কোমর পেঁচিয়ে ধরাটা যেন স্বাভাবিক অঙ্গভঙ্গির চেয়েও বেশি কিছু, এটা একটা অপরিহার্য ঘটনা। দুজন একসঙ্গে অনেকক্ষণ নাচতে থাকল, যেন শেষ হবে না সেই নাচ। সংগীত থামার পর বুকারের এই গ্যালাটিয়া ঘুরে তার মুখোমুখি হলো, এত দিন কল্পনায় সব সময় যে হাসিটা দেখেছে বুকার সেই বেপরোয়া হাসিটাই যেন তার কাছে সমর্পণ করল।

 বুকার তার নাম জিজ্ঞেস করলে মেয়েটা বলল, ব্রাইড।

 মরেছি! বুকার ফিসফিস করে বলল।

 শুরু থেকেই তাদের শারীরিক মিলন ছিল খুব শান্ত, শৈল্পিক, দীর্ঘস্থায়ী। বুকারের জন্য এতটাই প্রয়োজনীয় ছিল যে ইচ্ছা করেই সে একটানা রাতের পর রাত থেকে যেত ব্রাইডের বিছানায় নিজেকে প্রতিবার নতুন রূপে হাজির করার জন্য। তাদের সম্পর্ক নিখুঁত। ব্রাইড তার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে নাক গলায় না—এটাই বুকারের খুব ভালো লাগত। ফেলিসিটির সঙ্গে যেমন হতো, একজন আরেকজনের বিষয়ে অযাচিতভাবেই নাক গলানো, সেটা ব্রাইডের সঙ্গে হয়নি। ব্রাইড একেবারে পাগল করে দেওয়ার মতো সুন্দর; প্রতিদিনই তার কাজ থাকত, প্রতি মুহূর্তে তার বুকারের উপস্থিতি দরকার ছিল না। নিজের প্রতি ভালোবাসা বলতে ছিল তার প্রসাধনী কম্পানির পরিবেশের প্রতি একাগ্রতা। বুকারের আবিষ্টতা প্রতিবিম্বিত হতো ব্রাইডের আবিষ্টতার আয়নায়। সুতরাং যখন ব্রাইড তার সহকর্মী, পণ্য এবং বাজার নিয়ে কথাবার্তা বলত, বুকার ওর সম্মোহনী চোখের দিকে তাকিয়ে থাকত; মুখের ভাষার চেয়ে অনেক বেশি কথা বলে যেত ওর চোখ দুটো। বুকার মনে মনে বলত, ওর কণ্ঠের সংগীতের সঙ্গে মানানসই ওর চোখ দুটো মুখর। ব্রাইডের সব কিছু—তার চোখের নিচের হাড়ের প্রান্ত, আবেদনময়ী মুখ, নাক, ললাট, থুতনি আর ওই দুটো চোখ অনেক অনেক যথাযথ, অনেক অনেক আনন্দদায়ক। এমনটা হয়েছে শুধু তার আগ্নেয় শিলার মতো, মধ্যরাতের মতো কালো ত্বকের কারণে। ব্রাইডের শরীরের নিচে শুয়ে থাকার সময়, তার শরীরের ওপরে চলমান থাকার সময়, কিংবা তাকে বাহুবন্ধনে ধরে রাখার সময় ব্রাইডের কালো রং বুকারকে পরমানন্দে ভরিয়ে দিত। তখন বুকারের নিশ্চিতভাবেই মনে হতো, সে শুধু রাতকে বাহুর মধ্যে ধরে রাখেনি, এ রাত শুধু তারই, তার নিজের। আর রাতকে বাহুতে ধরে রাখাটাই যথেষ্ট ছিল না তার কাছে, সে সব সময় ব্রাইডের চোখের ভেতর তারার আলোও দেখতে পেত। ব্রাইডের নিষ্পাপ, বেভুল রসবোধ পরমানন্দ দিত বুকারকে। ব্রাইড কোনো মেকআপ নিত না মুখে, তার কর্মস্থল একটা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান যেটা পুরোপুরিই প্রসাধনীর কারবার করত। বুকার তো জোরে জোরে হেসেই বাঁচে না যখন ব্রাইড একবার তাকে সবচেয়ে আকর্ষণীয় লিপগ্লসের রং বেছে নিতে হেল্প করতে বলল। ব্রাইডের শুধুই সাদা রঙের পোশাকের ওপর জোর দেওয়া বুকারের কাছে দারুণ আনন্দের মনে হতো। বাইরের লোকদের সঙ্গে ব্রাইডের সঙ্গ ভাগ করে নিতে ভালো লাগত না বুকারের। এ জন্য ক্লাবে যাওয়ার মনোভাবটা তার খুব একটা থাকত না। তবু অল্প আলোকিত পরিচিত ক্লাবরুমে মাইকেল জ্যাকসনের সোপ্রানোর ছন্দ কিংবা জেমস ব্রাউনের চিৎকারের তালে ব্রাইডের সঙ্গে নাচা ছিল একটা অপ্রতিরোধ্য আনন্দের বিষয়। ভিড়ের র‌্যাপ বারে ব্রাইড যখন বুকারের বাহুতে খুব নিবিড় নৈকট্যে তখন দুজনই বিমোহিত হয়ে যেত একে অপরের সান্নিধ্যে। শুধু কেনাকাটায় যাওয়া ছাড়া আর কোনো কিছুতেই না করত না বুকার।

 সফল করপোরেট নারীর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের চেহারা ঝেড়ে ফেলে মাঝেমধ্যে ব্রাইড ছোটবেলার কোনো ভুলত্রুটি কিংবা বেদনাদায়ক স্মৃতির কথা বলত বুকারকে। ছোটবেলার কোনো কোনো বিষয় কিভাবে জীবনকে পচন ধরিয়ে দেয় সে কথা জানার কারণে বুকার ব্রাইডকে সান্ত্বনা দিত। শুধু কেউ ব্রাইডকে আঘাত করছে—এ চিন্তাটা থেকে তার কী রকম ক্ষোভ তৈরি হয় সেটা গোপন রাখত বুকার।

 ব্রাইডের মা আর বিরক্তিকর বাবার সঙ্গে তার সম্পর্ক জটিল হওয়ার কারণে সেও বুকারের মতো পরিবারের বন্ধন থেকে মুক্ত। তাদের সম্পর্কের ভেতর অন্য মানুষজনের আনাগোনা খুবই কম ছিল : শুধু ব্রাইডের বিরক্তিকর আপাত বন্ধু ব্রুকলিন; তার সহকর্মীদের মধ্যে আর কারো আনাগোনা আগের চেয়ে একদমই কমে যায় একসময়। বুকার তখনো কোনো কোনো সপ্তাহান্তের বিকেলে চেজ ও মাইকেলের সঙ্গে ট্রাম্পেট বাজাত। তবে সমুদ্রতটে দারুণ উজ্জ্বল সূর্যালোকের সকাল, ঠাণ্ডা সন্ধ্যা, হাত ধরাধরি করে পার্কে ঘুরে বেড়ানো আর কল্পনায় ছবি এঁকে যাওয়া—ব্রাইডের অ্যাপার্টমেন্টের এ কোনায় সে কোনায় কেমন করে যৌন নৃত্য চালানো যায়। পাদ্রিদের মতো শান্ত, শয়তানের মতো সৃষ্টিশীল উপায়ে তারা যৌন আনন্দ আবিষ্কার করতে থাকে। তাদের বিশ্বাস, তারা নতুন নতুন শৈলী বের করছে।

 ব্রাইড যখন অফিসে থাকত নির্জন সময়টাতে বুকার মনের সুখে ট্রাম্পেট অনুশীলন করত, তার প্রিয় খালা কুইনকে পাঠানোর জন্য চিরকুট লিখত। আর ব্রাইডের বাসায় যেহেতু কয়েকটা ফ্যান ম্যাগাজিন আর গসিপ ম্যাগাজিন ছাড়া বই নেই, সে লাইব্রেরিতে যেত বই পড়তে। কোনো কোনো বই পুনরায় পড়ত যেগুলোতে ইউনিভার্সিটিতে থাকতে গুরুত্বই দেয়নি। যেমন একটার নাম ‘দ্য নেইম অব দ্য রোজ’ কিংবা আরেকটা সংকলনের নাম ‘রিমেম্বারিং স্নেভারি’। দ্বিতীয়টা বুকারকে দারুণ মুগ্ধ করে। এখান থেকে কয়েকটা মধ্যম মানের সুর তৈরি করে এখানকার আখ্যানকে স্মরণ করে। বুকার টোয়েন পড়ে তাঁর রসবোধের নিষ্ঠুরতা উপভোগ করে, ওয়াল্টার বেঞ্জামিন পড়ে অনুবাদের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে, ফ্রেডারিক ডগলাসের আত্মজীবনী আবার পড়ে। প্রথমবারের মতো এখানে তার ঘৃণার প্রাণবন্ত প্রকাশ দেখতে পায়। হারমান মেলভিলও পড়ে। পিপ তার হৃদয় ভেঙে দেয়; তার অবস্থা বুঝতে পেরে পরিত্যক্ত আর অশুভ তরঙ্গের দ্বারা আক্রান্ত অ্যাডামের কথা মনে পড়ে যায়।

 খাওয়ার মতো যৌন আনন্দ, মুক্ত সংগীত, চ্যালেঞ্জিং বইপত্র আর সহজ সরল বুঝতে সক্ষম ব্রাইডের সঙ্গ নিয়ে তৈরি স্বর্গসুখ, রূপকথার প্রাসাদ ছয় মাস পর ভেঙে যায়; ভেঙে পড়ে কাদা আর বালুর মধ্যে; কারণ বালু আর কাদা দিয়েই তৈরি হয়েছিল এই প্রাসাদের অহমিকা। তারপর বুকার পালিয়ে আসে।

 

চতুর্থ ভাগ

ব্রুকলিন

কিছুই না। আরো লম্বা ছুটি চেয়ে আমাদের সিওর কাছে একটা ফোন। পুনর্বাসন। আবেগী পুনর্বাসন। কী কারণে জানি না। কিন্তু ব্রাইড গেল কোথায়, এত দিনই বা লাগছে কেন, কিছুই জানি না। হলুদ রঙের একটা দাগটানা ট্যাবলেট পেপারে হিজিবিজি করে লেখা একটা চিরকুট। যিশু, কী লেখা আছে জানার জন্য আমাকে চিরকুটটা পড়তে হয়নি। ‘সরি, আমি পালিয়ে এসেছি। বাধ্য হয়ে আসতে হয়েছে। তুমি ছাড়া আর সব কিছু আমার কাছ থেকে ছিটকে যাচ্ছিল’ ইত্যাদি ইত্যাদি...।

 কী সুন্দর বেকুব মেয়ে! কোথায় যাচ্ছে, কত দিন থাকবে, কিছু জানায়নি। আমি নিজে থেকে একটা বিষয় বুঝতে পারছি, ও আসলে ওর প্রেমিক ব্যাটাকে ধরতে যাচ্ছে। টিভির পর্দার নিচের অংশের ক্রলিং পড়ার মতো আমি ওর মন বুঝতে পারি। ছোটবেলা থেকে এই গুণটা পেয়েছি। একবার আমাদের বাড়ির মালিক মহিলা আমাদের ডাইনিং টেবিলের ওপরে পড়ে থাকা টাকাগুলো মেরে দিয়ে উল্টো আমাদেরই দোষারোপ করেছিল, আমরা নাকি ভাড়া দিতে দেরি করি। আরেকবার আমার আংকেল আমার দুই পায়ের মাঝে আঙুল দেওয়ার ফন্দি এঁটেছিল। সে আসলে নিজেই বুঝতে পারেনি, কী করতে যাচ্ছে সে। আমি লুকিয়ে থেকেছি, পালিয়ে গিয়েছি, মায়ের কাছে এমনি এমনি বলেছি, আমার পেট ব্যথা করছে। দুপুরের মাতাল ঘুম থেকে উঠে মা আমার সেবাযত্ন করতে লাগল। বিশ্বাস করো, আমি সব সময় বুঝতে পেরেছি, লোকজন কী করতে চায়, তাদের এড়িয়ে গিয়েও খুশি রাখার কৌশল আমার জানা ছিল। কিংবা হতে পারে, আমার কৌশলে তারা খুশি হয়নি। মানুষের উদ্দেশ্য বুঝতে শুধু একবার আমার ভুল হয়েছিল, ব্রাইডের প্রেমিক পুরুষের মন।

 আমিও পালিয়েছি, ব্রাইড। কিন্তু তখন আমার বয়স ছিল চৌদ্দ বছর। আমি নিজে ছাড়া আমার দেখাশোনা করার আর কেউ ছিল না। সুতরাং নিজেকে নতুন করে তৈরি করি, কঠিন বানিয়ে ফেলি। আমার মনে হয়, তুমিও নিজেকে কঠিন বানিয়েছ, শুধু তোমার বয়ফ্রেন্ডদের ব্যাপারে তেমনটি করোনি। আমার ঠিক মনে আছে, শেষের জনের কথা, একজন প্রতারক। আমি আপাতত এই একজনকেই তো দেখেছি মনে হয়। সে তোমাকে সেই ছোট ভীত মেয়েতে পরিণত করেছিল। আরেকবার এক উন্মাদ আসামির হাতে মার খেয়ে তুমি তার কাছে পরাজয় মেনে নিয়েছ। পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো কাজটা ছেড়ে দেওয়ার মতো বোকামিও তুমি করছ।

 আমি প্রথমে হেয়ারড্রেসারের দোকানে পরিচ্ছন্নতার কাজ শুরু করি, তারপর ওয়েট্রেসের কাজ, সেটার পরে ওষুধের দোকানের কাজ। সিলভিয়া ইনকে কাজ পাওয়ার অনেক আগে এসব কাজ করেছি। সব কাজের জন্যই ভয়াবহ লড়াই করেছি। কাজে ছেদ ঘটাতে পারে এমন কোনো কিছুই গ্রাহ্য করিনি।

 আর তুমি কী করলে? ‘হায় হায়, আমাকে পালাতে হলো...’ কোথায় পালাতে হলো? যেখানে কোনো রকম স্টেশনারি দ্রব্যই পাওয়া যায় না, একটা পোস্টকার্ডও না, সেখানে?

 ব্রাইড, প্লিজ!

শহরের কোনো মেয়ে ছোট মফস্বলের কার্ডবোর্ডের তৈরি শোবার ঘরে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে যেতে পারে। লৌহোজ্জ্বল রোদ, গায়ে বিঁধে পড়া বৃষ্টি—আবহাওয়া যেমনই হোক না কেন, জীবনে যারা কোনো দিন কোথাও যায় না এমন মানুষও আছে। সেই মানুষদের আড়াল করার জন্য ব্যবহৃত পুরনো বিবর্ণ বাক্স চোখের সামনে দেখলে একসময় সবচেয়ে মনোযোগী দৃষ্টিও মনে হয় ক্লান্ত হয়ে যায়। লোকজন খুব কম আসে এমন কোনো রাস্তার ধারে একবার মাত্র হিপিদের পুঁজিবাদবিরোধী আদর্শের জীবন যাপন করা এক কথা। ইভলিন ও স্টিভ তাদের অভিযানমূলক অতীত জীবনে ঝুঁকি আর বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে উত্তেজনাকর জীবন যাপন করেছে। কিন্তু যারা এখানে জন্মগ্রহণ করা সাধারণ মানুষ, যারা জীবনে কোনো দিন এসব জায়গার বাইরে যায়নি তাদের জীবনটা কেমন? ছোট ছোট বিষণ্ন বাড়িঘর আর রাস্তার দুই পাশের ভ্রাম্যমাণ বাড়িঘর—এগুলোতে যারা বাস করে তাদের থেকে নিজেকে কোনো দিক থেকে ভালো অবস্থানের মনে করছে না ব্রাইড। সে শুধু বিমূঢ়ই হচ্ছে। এ রকম জায়গা বুকার পছন্দ করেছে কী কারণে? আর কিউ অলিভ, সে কোন চুলোর বাসিন্দা?

 প্রায় এক শ সত্তর মাইল গাড়ি চালিয়েছে ব্রাইড। অনেকটাই কাঁচা রাস্তা। এ রাস্তার কিছুটা তৈরি হয়েছে আদিবাসীদের পায়ের নরম চামড়ার জুতো আর নেকড়ের পায়ের দাগ থেকে। ট্রাকচালকরা এ রকম রাস্তা ধরে এগোতে পারে; কিন্তু অন্য মডেলের গাড়ির দরজা লাগিয়ে মেরামত করা হয়েছে যে জাগুয়ার গাড়ির সেটার পক্ষে এ রকম পথে চলা কঠিন। ব্রাইড খুব সতর্ক হয়ে চালায়, সামনে খেয়াল করে দেখে জ্যান্ত কিংবা অন্য কোনো বাধা-বিপত্তি আছে কি না। সামনে একটা পাইনগাছের কাণ্ডে একটা চিহ্ন দেখতে পেয়ে তার ক্লান্তি কিছুটা দূর হয়। কোনো রকম বাহ্যিক অন্তর্ধান নেই। তবে অন্য আতঙ্ক এসে ভর করে তার ওপরে : দুই মাস কিংবা তিন মাস হলো তার মাসিক হয়নি। বুক মসৃণ হয়ে যাওয়া, বগলে আর নাভির নিচে লোমহীনতা, কানের লতির ছিদ্রের প্রসঙ্গ, স্থির ওজন—এসব বিষয় ভুলে যেতে চেষ্টা করে সে; কিন্তু পারে না। তার বিশ্বাস, আবার সেই ভীতসন্ত্রস্ত ছোট কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েতে ভয়াবহ রূপান্তর ঘটছে তার।

 দেখা গেল হুইস্কি হলো একটা সুরকির রাস্তার পাশে আধাডজনের মতো বাড়ির গুচ্ছ এলাকা। রাস্তাটা সামনের দিকে এগিয়ে গেছে আরো কয়েকটা ভ্রাম্যমাণ ঘর আর গাড়ির ওপরে সেট করা ট্রেলারের দিকে। দুঃখী চেহারার কিছু গাছপালার পরে রাস্তার সমান্তরালে চলে গেছে একটা গভীর তবে সরু স্রোতস্বিনী। বাড়িগুলোতে কোনো ঠিকানা লেখা নেই; তবে ভ্রাম্যমান বাড়িগুলোর নাম আছে, গাট্টাগোট্টা মেইলবক্সগুলোর গায়ে লেখা আছে। অচেনা গাড়িঘোড়া কিংবা আগন্তুকের দেখা পাওয়া যেতে পারে—এমন সন্দেহে সামনের দিকে তাকাতে তাকাতে ধীরে ধীরে এগোয় ব্রাইড; একটা ফ্যাকাসে হলুদ ভ্রাম্যমাণ বাড়ির মেইলবক্সে লেখা দেখতে পায়—কুইন অলিভ। গাড়ি পার্ক করে বের হয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যায় সে। নাকে আসে আগুন আর পেট্রলের গন্ধ; মনে হয়, ওই বাড়ির পেছন থেকেই আসছে। গুটিগুটি পায়ে পেছনের দিকে এগিয়ে গিয়ে দেখতে পায়, লাল মাথাঅলা এক মোটা মহিলা একটা ধাতব বেডস্প্রিংয়ের ওপরে পেট্রল ঢালছে; সতর্ক দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করছে কোথায় আরো বেশি পোড়ানোর জন্য আরো পেট্রল ঢালতে হবে।

 ব্রাইড দ্রুত গাড়িতে ফিরে গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। দুটো বাচ্চা এগিয়ে এলো; সম্ভবত প্রথমত তারা অদ্ভুত গাড়িটা দেখে আকৃষ্ট হয়েছে। কিন্তু এগিয়ে এসে ড্রাইভিং সিটে ব্রাইডকে দেখেছে বলে হয়তো তাদের মনোযোগ তার দিকেই ধাবিত হয়েছে। দুজনই ব্রাইডের দিকে বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল; দুই মিনিটের মতো তাদের চোখের পলক পড়ল না। বিস্ময়ে হতবাক হওয়া বাচ্চা দুটোর দিকে বিশেষ নজর দিল না ব্রাইড। এ রকম দৃশ্য তার চেনা আছে; কোনো রুমে ঢুকলে দেখতে পায়, অচেনা শ্বেতাঙ্গরা একজন আরেকজনের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করছে তাকে দেখে। এ রকম দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়ার মতোই। কারণ তার কালো রং দেখে তাদের যে বিস্ময়বোধের নাভিশ্বাস ওঠে সেটা বেশিক্ষণ থাকে না। পরক্ষণেই তারা ব্রাইডের সৌন্দর্যে ঈর্ষাবোধ করতে থাকে। যদিও জেরির সহায়তায় সে নিজের কালো রংকে পুঁজি বানিয়ে ফেলেছে, অধিক গুরুত্ব দিয়েছে, একটা মোহিনী শক্তিতে রূপান্তর করেছে তবু মনে পড়ছে, একবার এ বিষয়ে বুকারের সঙ্গে মতামত বিনিময় করেছিল সে। তার মায়ের নামে নালিশ করে ব্রাইড বলেছিল, তার কালো ত্বকের কারণে সুইটনেস তাকে ঘৃণা করে।

 বুকার বলেছিল, এটা কোনো রং নয়; এটা বংশগত একটা বৈশিষ্ট্য। কোনো দোষ-ত্রুটি নয়, অভিশাপ নয়, অশীর্বাদ নয়, পাপও নয়।

 অন্য যুক্তি দেখিয়ে ব্রাইড বলেছিল, কিন্তু অন্য লোকেরা এটাকে বর্ণবাদী বৈশিষ্ট্য বলে।

 বুকার তার যুক্তি খণ্ডন করে বলেছিল, বিজ্ঞানের দিক থেকে বর্ণ বলে কিছু নেই, ব্রাইড। সুতরাং বর্ণ ছাড়া বর্ণবাদ ব্যাপারটাই তো একটা বানানো বিষয়। যাদের বর্ণবাদ দরকার তারাই অন্যদের এটা শেখায়। তবে সর্বোপরি এটা বানানো একটা বিষয়। যারা বর্ণবাদের চর্চা করে তারা বর্ণবাদ ছাড়া বাঁচতে পারে না।

 বুকারের কথাগুলো যুক্তিসংগত মনে হয়েছে। আবার স্বস্তিদায়কও লেগেছে। তবে দৈনন্দিন জীবনে এমন যুক্তির বাস্তবতা পাওয়া কঠিন। যেমন গাড়ির ভেতর বসে থেকে শ্বেতাঙ্গ বাচ্চাদের চোখের বিস্মিত দৃষ্টি দেখতে পাওয়া। ডাইনোসরের জাদুঘরে গেলেও এদের চোখে এত বড় বিস্ময় ধরা দেবে না। তা সত্ত্বেও সে মনে মনে কঠিন হয়ে যায়, তার মিশন থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না কিছুতেই। পাকা রাস্তা, টাইট লন, তাকে সাহায্য না করলেও ক্ষতি করবে না এমন নানা বর্ণের মানুষবেষ্টিত নিরাপদ এলাকা ছেড়ে এসেছে বলে আসল কাজে ঢিলা দেওয়া যাবে না। সে কিসের তৈরি—তুলার না ইস্পাতের—সেটা আবিষ্কার করার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়েছে যেহেতু, আর ফিরে যাওয়া যাবে না, পিছপা হওয়া যাবে না।

 আধাঘণ্টা পার হয়ে গেছে। বাচ্চারাও চলে গেছে। আকাশের নিকেল প্লেটের মতো সূর্যটা গাড়ির ভেতরটাও গরম করে ফেলেছে। একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে ব্রাইড হলুদ দরজাটার দিকে হেঁটে গিয়ে নক করল। মহিলা অগ্নিসংযোগকারী বের হয়ে এলে ব্রাইড বলল, হ্যালো, আমি বুকার, স্টারবার্নকে খুঁজছি। এই যে তার ঠিকানা নিয়ে এসেছি আমি।

 মহিলা বলল, হ্যাঁ, ঠিকই, ওর অনেক মেইল আমি পাই এই ঠিকানাতেই—ম্যাগাজিন, ক্যাটালগ, ওর নিজের কাছে লেখা চিরকুট ইত্যাদি।

 ও কি এখানে আছে? মহিলার কানের দুলজোড়া দেখে ব্রাইড মোহিত হয়ে গেছে। ভেনাস-ঝিনুকের খোলসের মতো সোনালি ডিস্ক।

 উ-হ্যাঁ, ব্রাইডের চোখের ভেতর তাকিয়ে মহিলা মাথা ঝাঁকায়, ও পাশেই আছে।

 ও তাই? ভালো, পাশে মানে কত দূরে আছে?    মহিলার বয়স আন্দাজ করে ব্রাইড স্বস্তি পায়, মহিলা তাহলে অল্পবয়সী কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। এরপর ব্রাইড দিক জিজ্ঞেস করে।

 ও যেখানে আছে হেঁটেই যাওয়া যায়। সে পরে দেখা যাবে; ভেতরে এসো। বুকার কোথাও যাচ্ছে না। শুয়ে আছে; হাত ভেঙেছে। ভেতরে এসো। তোমার চেহারা দেখে খুব বিধ্বস্ত মনে হচ্ছে যেন কোনো ভালুক তোমাকে পেয়েও খায়নি তোমার করুণ দশা দেখে।

 তার কথা শুনে ব্রাইড ঢোক গেলে। গত তিন বছর তাকে শুধু বলা হয়েছে, সে দেখতে খুব চমকপ্রদ, খুব দারুণ। সবখানে প্রায় সবাই তাকে বলেছে, মন্ত্রমুগ্ধকর, স্বপ্নিল, প্রচণ্ড আকর্ষণীয়, ওয়াও। বিচারশক্তিসম্পন্ন চোখের আর পশমের মতো লালচুলো এই মহিলা এক তুড়িতে তাকে দেওয়া এত দিনের প্রশংসার সব শব্দভাণ্ডার মুছে ফেলল। ব্রাইড আবার তার মায়ের বাড়ির সেই পুঁচকে কুিসত কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েতে পরিণত হয়ে গেল।

 কুইন আঙুল বাঁকিয়ে আবার বলল, ভেতরে এসো না, মেয়ে! তোমার কিছু খাওয়া দরকার।

 শুনুন, মিস অলিভ...।

 শুধু কুইন, সোনা। আর অ-লি-ভে। এসো, ভেতরের দিকে পা বাড়াও। মানুষের সঙ্গ খুব পাই না। আর আমি দেখলেই বুঝতে পারি, কে ক্ষুধার্ত।

 ব্রাইড মনে মনে বলে, আসলেই ঠিক। দীর্ঘ ভ্রমণের সময় পেটফাড়া ক্ষুধা তার দুশ্চিন্তার নিচে ঢাকা পড়ে ছিল। ব্রাইড খুশি মনে মহিলার কথামতো ভেতরে ঢুকল। রুমটার সাজানোগোছানো, আরামদায়ক আর মুগ্ধকর অবস্থা দেখে খুশি হলো, বিস্মিতও হলো। এক সেকেন্ডের জন্য মনে মনে আশঙ্কাও হয়েছে, সে কোনো ডাইনির আখড়ায় আটকা পড়তে যাচ্ছে না তো! অবশ্যই কুইন সেলাই করত, বুননের কাজ করত, কাপড়ে ফুল তুলত এবং ফিতা তৈরি করত। পর্দা, বালিশের ওয়াড়, কুশন, নকশি করা গামছা দেখেই তার রুচিশীল হাতের দক্ষতা বোঝা যায়। একটা খালি বিছানার হেডবোর্ডের ওপরে একটা কাঁথা, বিছানাটার স্প্রিংগুলো মনে হচ্ছে বাইরে ঠাণ্ডা করা হচ্ছে। কাঁথাটার ওপরে হালকা রঙের ভাগ ভাগ নকশা করা, এটার চেহারাও অন্য সব কিছুর মতো বেমানান হয়েছে। ছবির ফ্রেমের মতো ছোটখাটো অ্যান্টিকস এবং সাইড টেবিলগুলো যেনতেনভাবে রাখা হয়েছে। একটা দেয়ালের পুরোটাই ঢাকা পড়ে আছে বাচ্চাদের ছবিতে। দুটো বার্নারঅলা জ্বলন্ত স্টোভের ওপরে একটা পাত্র বসানো। অন্যের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অভিজ্ঞতা নেই কুইনের। লিনেনের মাদুরের ওপরে মানানসই ন্যাপকিন আর ঝালরঅলা রুপার স্যুপ-চামচের পাশে রাখা হয়েছে দুটো চীনামাটির বাটি।

একটা সরু টেবিলের কুশন দিয়ে সাজানো চেয়ারে বসল ব্রাইড। বসে সে দেখতে থাকল, একটা বড় চামচ দিয়ে কুইন দুজনের বাটিতে ঘন স্যুপ ঢালছে। মটরশুঁটি, গোলআলু, শস্যদানা, টমেটো, সেলারি শাক, কাঁচা মরিচ, পালংশাক টুকরো টুকরো পাসটের খোসার মধ্যে ভাসছে মুরগির মাংসের ছোট ছোট টুকরো। ঘন মিশ্রণের এই খাবারটা বা তরকারিটার স্বাদ বাড়ানো হয়েছে কী দিয়ে যেন—এলাচ? রসুন? মরিচের গুঁড়া? কালো আর লাল মরিচের মিশ্রণ? তবে ফলাফলটা হয়েছে স্বর্গীয়। এই খাবারের সঙ্গে কুইন এক ঝুড়ি বোঝাই করে গরম সমতল রুটি নিয়ে এসে মেহমানের পাশে বসল। খাবারের স্বাদ আরো বেড়ে গেল। খাওয়ার শুরুতে বেশ কয়েক মিনিট দুজনের কেউই কথা বলল না। শেষে ব্রাইড বাটির দিক থেকে চোখ তুলে তাকিয়ে ঠোঁট মুছে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে গৃহকর্ত্রীকে জিজ্ঞেস করল, আপনি বেডস্প্রিং পোড়াচ্ছিলেন কেন? আমি আপনাকে পেছনের দিকে দেখেছি।

 ছারপোকা, কুইন উত্তর দিল। ডিম থেকে বাচ্চা বের হওয়ার আগে আগে প্রতিবছরই পুড়িয়ে থাকি।

 ও আচ্ছা। আমি অবশ্য আগে এ রকম কিছু শুনিনি। তারপর মহিলার সামনে আরেকটু সহজ হতে পেরে ব্রাইড জিজ্ঞেস করল, বুকার আপনার কাছে কী ধরনের লেখা পাঠাত। আপনি বললেন, ও আপনাকে লেখা পাঠাত।

 ওহ, হ্যাঁ। মাঝেমধ্যেই পাঠাত।

 সে লেখাগুলো কী সম্পর্কে?

 ঠিক জানি না। তুমি দেখতে চাইলে কয়েকটা তোমাকে দেখাব। আচ্ছা বলো তো, বুকারকে কেন খুঁজছ? ওর কাছে তোমার টাকা পাওনা আছে? তুমি তো মনে হয় ওর বান্ধবী বা সে রকম কেউ নও, তাই না? মনে হচ্ছে, তুমি ওকে ভালো করে চেন না।

 আমি চিনি না। তবে ভাবতাম, আমি ওকে চিনি, কথাগুলো মনে মনেই রইল। মুখে বলা হলো না। হঠাৎ ব্রাইডের মনে হলো, চমৎকার যৌন সংসর্গ উপভোগ করলেই কাউকে জানা যায় না। এটাকে অবগতি বলা যায় না; বড়জোর তথ্য বলা যায়।

 ব্রাইড আবার ন্যাপকিন দিয়ে ঠোঁট মুছল, আমরা একসঙ্গে থাকতাম। তারপর ও আমাকে ফেলে চলে এসেছে। এই আর কি। ব্রাইড আঙুল ফোটাল, আমাকে কোনো কিছু না বলে চলে এসেছে।

 কুইন মুখ টিপে হাসল, আর বলো না। ও ওই রকমই। ভেবো না। ওর নিজের পরিবারও ছেড়ে এসেছে। আমাকে ছাড়া বাকি সবাইকে ছেড়ে এসেছে।

 তাই নাকি? কেন? বুকারের পরিবারের সঙ্গে নিজেকে এক শ্রেণিতে ফেলতে চায়নি ব্রাইড। তবে তথ্যটা শুনে সে বিস্মিত হয়ে গেল।

 ওর বড় ভাই খুন হয়, বুকার তখন একেবারেই বাচ্চা। ওর পরিবারের অন্যরা ওর ভাইয়ের মৃত্যু নিয়ে যেভাবে প্রতিক্রিয়া করেছে সেটা ওর পছন্দ নয়।

 আহহা, ব্রাইড বিড়বিড় করে বলল। আসলেই দুঃখের কথা। সমবেদনার স্বাভাবিক গ্রহণযোগ্য শব্দ করল সে। তবে সে যে এ বিষয়ে কিছুই শোনেনি বুকারের কাছ থেকে, তাতে আরো আহতবোধ করল।

 শুধু দুঃখজনকই না। ঘটনাটা পুরো পরিবারকেই ধ্বংস করে দিয়েছে।

 পরিবারের লোকেরা কী এমন করেছিল যে বুকার তাদের ছেড়ে চলে আসে?

 তারা আগের মতো চলা শুরু করে। স্বভাবিক জীবনযাপন শুরু করে। বুকার চেয়েছিল, পরিবারের পক্ষ থেকে তার ভাইয়ের নামে একটা মেমোরিয়াল করা হোক—একটা ফাউন্ডেশন বা ওই জাতীয় কিছু আর কি। অন্যরা আগ্রহ দেখায়নি, মোটেও না। পরিবারের সঙ্গে ওর সম্পর্ক ভাঙনে আমারও খানিক হাত আছে : আমি ওকে বলেছিলাম ভাইয়ের সঙ্গে যেন সান্নিধ্য বজায় রেখে চলে, যত দিন পারে শোক বহন করতে থাকে। আমি খেয়াল করিনি, সে আমার কথার কী মানে বের করবে। যাই হোক, অ্যাডামের মৃত্যুকে সে নিজের জীবন হিসেবে গ্রহণ করে। আমি মনে করি, এটা তার একমাত্র জীবন। এই বলে কুইন ব্রাইডের খালি বাটির দিকে তাকাল, আরেকটু দিই?

 না, ধন্যবাদ। তবে খেতে খুব স্বাদ লেগেছে। এত স্বাদের কোনো খাবার কখনো খেয়েছি কি না মনে পড়ে না।

 কুইন মিষ্টি হেসে বলে, এটা হলো আমার জাতিসংঘ রেসিপি, আমার সব স্বামীর নিজ নিজ শহরের খাবার অনুযায়ী তৈরি এটা। তাদের সংখ্যা সাত। দিল্লি থেকে ডাকার, টেক্সাস থেকে অস্ট্রেলিয়া, মাঝে আরো কয়েকজন। কুইন জোরে জোরে হাসতে থাকে। তার কাঁধ দোল খেতে থাকে। সংখ্যায় তারা এত, অথচ একটা জায়গায় সবাই একই রকম।

 কোন জায়গায়?

 মালিকানায়।

 ব্রাইড ভাবতে থাকে, এত স্বামী, অথচ এখন একা। আপনার কোনো ছেলে-মেয়ে নেই?

 অবশ্যই তার ছেলে-মেয়ে আছে। সবখানে তাদের ছবি টাঙানো।

 অনেক ছেলে-মেয়ে আছে। দুজন থাকে তাদের বাবাদের সঙ্গে, নতুন মায়েদের সঙ্গে। দুজন সামরিক বাহিনীতে, একজন নৌ অফিসার, একজন বিমানবাহিনীতে, আমার ছোট সন্তান মেয়ে, সে আছে মেডিক্যাল স্কুলে। মেয়েটা আমার ড্রিম চাইল্ড। শেষের আগেরজন নিউ ইয়র্কের কোথায় যেন থাকে, ভয়ানক ধনী হয়েছে। তাদের বেশির ভাগই আমাকে টাকা-পয়সা পাঠায়। কাজেই আমাকে দেখতে আসার দরকার হয় না তাদের। কিন্তু আমি ওদের দেখি। কুইন হাত তুলে চমৎকার সব ফ্রেমের ভেতর থেকে তাকিয়ে থাকা ছবিগুলোর দিকে দেখায়। ওরা কী ভাবে আমি জানি। শুধু বুকারই আমাকে ছেড়ে চলে যায়নি। বুকার কী নিয়ে কী চিন্তা করে তোমাকে আমি দেখাচ্ছি। কুইন একটা আলমারির দিকে এগিয়ে যায়। আলমারির গায়ে সেলাই মেশিন ঠেস দিয়ে রাখা হয়েছে। আলমারির নিচের অংশ থেকে সে একটা পুরনো রুটির বাক্স বের করে আনে। এর ভেতর ঘেঁটে ঘেঁটে একসঙ্গে ক্লিপ করে লাগানো কয়েকটা কাগজ বের করে। তার মেহমানের হাতে দেয় কাগজের পৃষ্ঠাগুলো।

 ব্র্রাইড মনে মনে বলে, কী সুন্দর হাতের লেখা! হঠাৎ তার মনে পড়ে যায়, সে তো বুকারের লেখা কিছুই দেখেনি। তার নামটা পর্যন্ত লেখা দেখেনি। সাতটা কাগজ দেখতে পায় সে। এক মাসের জন্য একটা করে, সঙ্গে আরো একটা। তর্জনী লেখার লাইনগুলোর ওপর দিয়ে চালাতে চালাতে সে ধীরে ধীরে পড়া শুরু করে; যতিচিহ্নের ব্যবহার প্রায় নেই বললেই চলে।

 ‘এই মেয়ে তোমার কোঁকড়া চুলের মাথার ভেতর কী আছে আবছা রুমে কালো পুরুষরা নিবিড় হয়ে নাচছে একটা মুখকে আরাম দিতে তুমি যে জগৎ দ্যাখোনি সে জগেক গিলে খেতে আর রাতের গায়ে কামড় বসাতে পারে যে দাঁত সে দাঁতগুলোকে টোকা দেওয়ার জন্য অবশ্যই বাইরে কোথাও আছে জিহ্বা আর নিঃশ্বাস তার জন্যই অপেক্ষায় আছে ওই মুখ সুতরাং তুমি ওই ধোঁয়াটে স্বপ্নগুলো থেকে মুক্ত হও তুমি সৈকতে আমার বাহুতে শুয়ে থাকো আমি তোমাকে তোমার অদেখা সৈকতের বালু দিয়ে ঢেকে দিই সে সৈকতে আছড়ে পড়া পানি এতই স্বচ্ছ আর নীল যে তুমি দেখে খুশিতে কেঁদে ফেলো ঠিক একই সময়ে তুমি জানতে পারো যে গ্রহে তোমার জন্ম তুমি সে গ্রহেরই অধীন আর বেহালার গভীর শান্তিতে তুমি বাইরের জগতে যোগ দিতে পারো এখন। ’

 ব্রাইড শব্দগুলো দুবার পড়ে। কিন্তু কোনো অর্থ থাকলেও বুঝতে পারে না। দ্বিতীয় পৃষ্ঠাটা পড়ে অস্বস্তিতে পড়ে যায় ব্রাইড।

‘তার কল্পনা নিষ্পাপ বলেই অস্থি কেটে যায় চাঁছাছোলা গতিতে মজ্জাকে না ছুঁয়েই যেখানে ওই নোংরা অনুভূতিটা দাপাতে থাকে একটানা বেহালার মতো না জানি তার ছিঁড়ে যায় কিচকিচ শব্দ ওঠে সুর হারানোর বেদনায়; কারণ তার স্থায়ী অজ্ঞতা জীবনের দ্রুতগতির চেয়ে অনেক ভালো। ’

থালাবাসন ধোয়া শেষ করে কুইন তার মেহমানকে হুইস্কি পান করতে দেয়। ব্রাইড অবশ্য পান করে না।

 তৃতীয় পৃষ্ঠা পড়ার পর ব্রাইডের মনে পড়ে যায়, বুকারের সঙ্গে একবার কথা হয়েছিল। তখন ব্রাইড তার ছোটবেলার ঘটনার মধ্যে তাদের বাড়ির মালিকের একটা বিষয় বিস্তারিত উল্লেখ করেছিল বুকারের কাছে। সে কথাবার্তার বিষয়টিই হয়তো বুকারের এ লেখার পেছনে কাজ করেছে।

‘বোঝা টানা পশুর মতো তুমি একজন অপরিচিত লোকের অভিশাপের চাবুকের আঘাত সয়ে গেছো আর পরিচিতি হিসেবে সে আঘাত তোমার মনে তৈরি করেছে বেপরোয়া ভীতি আর রেখে গেছে ক্ষত অবশ্য তুমি জীবন যাপন করেছ তোমার মতো করে যুক্তি খণ্ডন করে যে ঘৃণার শব্দ হলো সমুদ্রতটে আঁকা সামান্য একটা রেখামাত্র যেকোনো মুহূর্তে সাগর জলের ছোঁয়ায় মিলিয়ে যেতে পারে যখন ওই একই রকম বেপরোয়া ঢেউ এসে আদর করে যেমন করে আঙুলের আকস্মিক ছোঁয়া থেমে যায় ক্লারিনেটের ওপর আর সংগীতজ্ঞ নিজেই নীরবতার ভেতর ঢুকে পড়েন যাতে আসল সুরটি বেজে ওঠে জোরে। ’

ব্রাইড পর পর আরো তিনটা পৃষ্ঠা দ্রুতই পড়ে যায়।

‘বর্ণবাদের মারাত্মক রোগকে বোঝার চেষ্টা করলেই রোগটা আরো প্রকট হয়ে ওঠে বেলুনের মতো ফুলে ওঠে ওপরের দিকে উড়তে থাকে যেন ভয়ে থাকে পাছে মাটির বুকে পড়ে গেলে একটা ঘাসের ডগা তাকে ফুটো করে দিতে পারে তখন বের হয়ে পড়তে পারে তার ভেতরের তরল বিষ্ঠা জড়িয়ে যেতে পারে বিমুগ্ধ দর্শকদের গায়ে যেমন করে পিয়ানোর সাদা এবং কালো শাণিত এবং সমতল চাবি নিজের ধ্বংসের শোকগীতি সৃষ্টি করার জন্য তৈরি করে বিনাশ।

‘জানো তো আমি নিজের লজ্জা সম্পর্কে লজ্জিত নই মানে যে লজ্জার সঙ্গে আমাকে জড়ানো হয়েছে কথা বলছি এ লজ্জার সমকক্ষ বিষয় হলো তাদের নিম্নমানের অগ্রাধিকার আর ভ্রষ্ট নৈতিকতা যারা হীনতা আর কলঙ্কের মানবীয় অনুভূতিগুলোর সবচেয়ে হালকা পলকাগুলোর ওপরে বেশি জোর দিয়ে থাকে তখন তাদের উদ্দেশ্য শুধুই নিজেদের কাপুরুষতাকে ছদ্মাবরণে ঢাকা আর এ কাজ করতে গিয়ে তারা ভান করে যেন তাদের কাপুরুষতাটা বানজোর পবিত্রতার মতো।

 ‘তোমাকে ধন্যবাদ। ক্ষোভ কী জিনিস ক্ষণিকতা কী জিনিস হিংস্র বেপরোয়া স্বভাব কী জিনিস, উদ্বেগ কী জিনিস তুমি আমাকে শিখিয়েছ আলো আর ভালোবাসার অনমনীয় খোলামকুচি মিশ্রিত উদ্বেগ তোমাকে এত গভীর দুঃখবোধের সঙ্গে না জড়িয়ে তোমাকে ছেড়ে আসতে পারাটাই যেন কোমলতার পরিচয় ছিল নইলে এ দুঃখ শুধু তোমার হৃদয় নয়, তোমার মনটাও ভেঙে দিত তোমার মন তো জানে ওবোর চিৎকার কেমন ওবো তোমার সৌন্দর্যকে প্রকাশ করার জন্য কেমন করে নীরবতার ছেঁড়া টুকরোতে পরিণত হয় কেননা তোমার চোখ-ধাঁধানো সৌন্দর্যকে ধারণ করতে পারে না এই বাদ্যযন্ত্র তাই তার সুরকে যাপন করার মতো পরিসরের সাবলীলতায় পরিণত করে। ’

 বিমূঢ় হয়ে ব্রাইড পৃষ্ঠাগুলো থেকে চোখ তুলে কুইনের দিকে তাকাল। কুইন বলল, মজার না?

 খুবই, উত্তর দিল ব্রাইড। তবে অদ্ভুত কিন্তু। কার সঙ্গে কথা বলেছে ও, আমার জানতে ইচ্ছা হয়।

 ওর নিজের সঙ্গেই, কুইন বলল। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, এগুলো সব ওর নিজের সম্পর্কে লেখা। তোমার সে রকম মনে হয় না?

 না, বিড়বিড় করে বলল ব্রাইড। এগুলো সব আমার সম্পর্কে লেখা, আমাদের দুজনের একসঙ্গে কাটানো সময় সম্পর্কে। তারপর ব্রাইড শেষের পৃষ্ঠাটা পড়ল।

‘জ্বলে উঠতে দেওয়ার জন্য মিটমিট করে জ্বলা তারার মতো পুড়তে দেওয়ার জন্য মর্মান্তিক দুঃখকে সেটা যে বিষয়েরই হোক না কেন যতটা সম্ভব গুরুত্বের সঙ্গে সাহসের সঙ্গে নেওয়া উচিত তোমার কারণ সেটা করুণ আত্মনিন্দায় প্রশমিত হতে পারে না বা চায়ই না কারণ এর বিস্ফোরণোন্মুখ ঝলক যথার্থ উচ্চনাদে বেজে ওঠে টিম্পানির একটানা উচ্চ শব্দের মতো। ’

কাগজগুলো নামিয়ে রেখে ব্রাইড চোখ ঢাকল।

 যাও, ওর সঙ্গে দেখা করতে যাও, কুইন বলল। তার কণ্ঠ বেশ নিচু। রাস্তার পাশেই স্রোতস্বিনীর ধারে শেষ বাড়িটাতে আছে বুকার। এসো, ওঠো। মুখ ধুয়ে যাও।

 আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, আমার এখনই যাওয়া উচিত হবে কি না, ব্রাইড মাথা ঝাঁকিয়ে বলল। এত দিন সে নিজের চেহারার ওপরে নির্ভর করে এসেছে—সৌন্দর্য কেমন কাজে দেয় দেখেছে। সৌন্দর্যের অগভীরতা কিংবা তার নিজের কাপুরুষতা কেমন চিনতে পারেনি। এ প্রসঙ্গে সুইটনেস তাকে সবচেয়ে জরুরি শিক্ষাটা দিয়েছে, সেটাকে তার পিঠে পেরেক মারার মতো আটকে দিয়েছে।

 কুইনের কণ্ঠে একটু বিরক্তিই শোনা গেল, তোমার হয়েছে কী, বলো তো! এত দূর থেকে তুমি এলে। আর এমনিই ফিরে চলে যাবে? তারপর একটা শিশুর কণ্ঠে গেয়ে উঠল কুইন :

 জানি না কেন যে,

 সূর্যটা নেই আকাশে।

 পারি না চলতে, শক্তি নেই লেশ;

 আমার ছিল যা কিছু সবই নিঃশেষ।

 সামনে ঝোড়ো আবহাওয়া...।

ব্রাইড টেবিল চাপড়ে বলে উঠল, নিকুচি করি! আপনার কথাই ঠিক। একদম ঠিক। এসব আমার সম্পর্কে, ওর নিজের সম্পর্কে না। আমার!

তুমি? যাও, চলে যাও! বুকার তার লম্বা সরু বিছানা থেকে উঠে বসে ব্রাইডের দিকে ইঙ্গিত করে বলল। ব্রাইড তার ভ্রাম্যমাণ ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে।

 আমি বলেছি, তুমি চলে যাও। এক্ষুনি। বুকারের চোখ ঘৃণায় মৃত জীবিত দুই রকমই মনে হচ্ছে। তার হাতের ইঙ্গিত দরজার দিকে। ব্রাইড মাত্র নয় কদম হেঁটে এগিয়ে গিয়ে বুকারের মুখে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে চড় মারতে লাগল। বুকার নিজেও আঘাত ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে লাগল। ব্রাইড সঙ্গে সঙ্গে মেঝে থেকে লাফিয়ে উঠে খপ করে একটা মিশেলবের বোতল ধরে ফেলল একটা কাউন্টার থেকে। বোতলটা বুকারের মাথার ওপরেই ভেঙে ফেলল। বুকার বিছানায় পড়ে গিয়ে অনড় হয়ে রইল। ভাঙা বোতলের ঘাড়ের কাছে শক্ত করে ধরে বুকারের বাঁ চোখে গড়িয়ে পড়া রক্তের ধারা দেখতে লাগল। কয়েক সেকেন্ড পরেই বুকার জ্ঞান ফিরে পেল, কনুইয়ের ওপরে ভর করে উঠে বসল, ত্যারচা চোখে কোনো রকমে ব্রাইডের দিকে তাকাল।

 তুমি আমাকে ফেলে রেখে চলে এসেছ। একটা কথা না বলে চলে এসেছ! চিৎকার করে বলল ব্রাইড। কোনো বিষয়ে কিছুই বলোনি। আমি এখন সে কথাটা শুনতে চাই। সেটা যা-ই হোক, আমি শুনতে চাই। এখনই!

 ডান হাত দিয়ে মুখের বাঁ পাশ থেকে রক্ত মুছে বুকার খেঁকিয়ে উঠল, তোমাকে সে বালের কথাটা আমি বলতে চাচ্ছি না!

 ও, তাই, না? বলতে তোমাকে হবেই! ব্রাইড ভাঙা বোতলটা উঁচু করে তুলল।

 খারাপ কিছু হওয়ার আগে তুমি আমার বাড়ি থেকে বের হও!

 চুপ! আমার কথার জবাব দাও!

 রক্ষা করো, যিশু। কী মহিলার পাল্লায় পড়লাম!

 আমাকে জানতে হবে, বুকার। কেন? কেন চলে এসেছ?

 আগে আমাকে বলো, বাচ্চাদের বলাৎকারকারীর জন্য কেন তুমি উপহার কিনলে। শিশু নির্যাতনের জন্য তো সে জেলে গিয়েছিল। যিশুর দোহাই, বলো। বলো কেন তুমি দৈত্য মহিলার কাছে এত মার খেলে।

 আমি মিথ্যা বলেছিলাম, মিথ্যা বলেছিলাম, মিথ্যা! সে নির্দোষ ছিল। আমি তাকে আসামি বানিয়েছিলাম। কিন্তু ওসব কিছু করেনি। আমি তার কাছে সংশোধনের জন্য গিয়েছিলাম। কিন্তু সে আমাকে মেরে তক্তা বানিয়ে দিল। আমার এটাই পাওনা ছিল।

 রুমের তাপমাত্রা বাড়েনি। কিন্তু ব্রাইড ঘামছে। তার কপাল, ওপরের ঠোঁট, এমনকি তার বগলও ঘেমে ভিজে গেছে।

 তুমি মিথ্যা বলেছিলে? কী বালের কারণে তুমি মিথ্যা বলেছিলে?

 যাতে আমার মা আমার হাত ধরে।

 কী?

 যাতে একবারের জন্য হলেও মা আমার দিকে গর্বের চোখে তাকায়।

 তিনি কি গর্বের চোখে তাকিয়েছিলেন?

 হ্যাঁ। আমাকে ভালোও বেসেছিল।

 তার মানে তুমি আমাকে বলতে চেয়েছিলে—

 ওটা বাদ দাও। আসল কথা বলো। কেন আমাকে ছেড়ে এলে?

 ওহ্, ঈশ্বর! বলে বুকার মুখের পাশ থেকে আরো রক্ত মুছল। আচ্ছা, শোনো। আমার ভাই খুন হয়েছিল। একটা উদ্ভট লোকের হাতে। একটা শিকারি লোক। ওই ব্যক্তির মতো তুমি যাকে ক্ষমা করে দিয়েছ, আর...।

 মোটেই না। আমি এ রকম কিছু করিনি। আর আমি তো তোমার ভাইকে খুন করিনি।

ঠিক আছে। আমি বুঝতে পারছি। তবে...।

 তবে কিছুই না। আমি যার জীবন নষ্ট করে দিয়েছি তার কাছে ক্ষতিপূরণের চেষ্টা করছিলাম। আর তুমি দোষ দিয়ে পালিয়ে এলে। হারামজাদা একটা। এই যে এখানে, তোমার হাতের রক্ত মোছো। ব্রাইড বুকারের কাছে একটা ডিশ তোয়ালে এগিয়ে দিয়ে ভাঙা বোতলটার যেটুকু ছিল নামিয়ে রাখল। জিন্সে হাত পরিষ্কার করে নিয়ে, ভেজা ভেজা কপালের ওপর থেকে চুল সরিয়ে দিয়ে বুকারের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ব্রাইড। তুমি আমাকে ভালো না বাসতে পারো, কিন্তু আমার প্রাপ্য সম্মানটুকু দিতে হবে। টেবিলের পাশের একটা চেয়ারে বসে এক পায়ের ওপরে আরেক পা আড়াআড়িভাবে মেলে দিল সে।

 দীর্ঘ নীরবতার মুহূর্ত পার হয়ে গেল। তাদের নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। দৃষ্টি একজন আরেকজনের দিকে ফেলেনি, মেঝের দিকে, হাতের দিকে আর জানালা দিয়ে বাইরে ফেলেছে। কয়েক মিনিট এভাবেই চলে গেল।

 শেষে বুকার বুঝতে পারে, তার চূড়ান্ত ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলার আছে, ব্যাখ্যা করার আছে। কিন্তু মুখ খুলতে গিয়ে বুঝতে পারল, তার জিহ্বা পাথরের মতো জমে গেছে। ওখান থেকে কথা বের হচ্ছে না। তাতে কিছু যায় আসে না। কারণ ব্রাইড ইতিমধ্যে চেয়ারে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছে। থুতনিটা পড়ে আছে বুকের কাছে। লম্বা পা দুটো ঢালু করে ছড়িয়ে দেওয়া আছে।

 কুইন দরজায় টোকা দেয়নি। বুকারের ভ্রাম্যমাণ ঘরের দরজাটা খুলে সোজা ঢুকে পড়েছে ভেতরে। ব্রাইডকে চেয়ারের ওপর হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমিয়ে থাকতে দেখে আর বুকারের চোখের ওপরে কাটা দাগ দেখে বলল, হায় ঈশ্বর! কী হয়েছে?

 বুকার বলল, মারামারি হয়েছে।

 ও কি ঠিক আছে?

 হু। ধপাস করে পড়ে চেয়ারেই ঘুমিয়ে গেছে।

 শুধু মারামারি। ও এত দূর এসেছে শুধু তোকে মারতে? কিসের জন্য? ভালোবাসা নাকি দুঃখ?

 মনে হয়, দুটোই।

 কুইন বলল, ঠিক আছে, চল ওকে চেয়ার থেকে তুলে বিছানায় শুইয়ে দিই।

 ঠিক আছে। বুকার উঠল। কুইনের সহায়তায় বুকারের কর্মক্ষম একটা হাত লাগিয়ে দুজনে মিলে ব্রাইডকে বুকারের সরু লম্বা অগোছালো বিছানাটার ওপরে তুলল। ব্রাইড একটু কঁকিয়ে উঠল, কিন্তু জাগল না।

 কুইন টেবিলের পাশে একটা চেয়ারে বসল, ওকে নিয়ে কী করবি?

 আমি জানি না, বুকার বলল। আমরা দুজনে অল্প সময়ের জন্য হলেও খুব ভালো ছিলাম।

 ছাড়াছাড়ি হলো কেন?

 মিথ্যা আর নীরবতার জন্য। মানে যা সত্য সেটা বলা হয়নি। কেন সত্য তাও বলা হয়নি।

 কী বিষয়ে?

 আমাদের নিজেদের বিষয়ে। যখন আমরা ছোট ছিলাম সে সময়ের ঘটনা সম্পর্কে। কেন আমরা কোন কাজটা করেছি, কোনটা ভেবেছি, সেই অনুযায়ী কাজ করেছি, সেসবের ফলাফল আমাদের ছোটবেলায় কী হয়েছে—এসব।

 মানে তোর ছোটবেলায় অ্যাডামকে নিয়ে।

 হ্যাঁ, অ্যাডামকে নিয়ে।

 আর ওর?

 ওর ছোটবেলায় ও একটা বিরাট মিথ্যা বলেছিল। একজন নিষ্পাপ মহিলাকে ওর মিথ্যার জন্য জেলে যেতে হয়েছিল। শিশু ধর্ষণের জন্য লম্বা শাস্তি, আসলে যে অপরাধটা সে করেনি। ওই মহিলার জন্য ব্রাইডের অদ্ভুত আবেগ দেখানোর কারণে আমরা ঝগড়া করি তারপর চলে আসি। আপাতত ওই সময়টায় আমার কাছে অদ্ভুত মনে হয়েছিল। ওই ঘটনার পরে আর আমি ওর ধারেকাছে থাকতে চাইনি।

 ও মিথ্যা বলেছিল কেন?

 ওর মায়ের ভালোবাসা পাওয়ার জন্য।

 ঈশ্বর! কী আবোলতাবোল কথা রে! আর তুই তো সব সময় অ্যাডামের কথা ভাবতি, সব সময় অ্যাডাম।

 হু।

 কুইন এক হাতের কবজির ওপরে আরেক হাতের কবজি আড়াআড়ি রেখে টেবিলের ওপরে মাথা নুইয়ে ফেলল। অ্যাডাম তোকে কত দিন ধরে চালাচ্ছে?

 ওকে ছাড়া আমি চলতে পারি না, কুইন।

 পারিস না? ব্রাইড ওর সত্য বলেছে। তোরটা কী?

 বুকার কোনো উত্তর দিল না। তারা দুজন অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। একমাত্র শব্দ শুধু ব্রাইডের হালকা নাক ডাকার শব্দ। শেষে কুইন বলল, কোনো কাজে ব্যর্থ হওয়ার জন্য তোর কোনো মহান কারণ দরকার, তাই না? কিংবা অন্যদের থেকে নিজেকে হীন মনে করার জন্যও গভীর কোনো কারণ দরকার।

 উ, না, কুইন। আমি ও রকম নই, মোটেও নই।

 ঠিক আছে, তাহলে কী রকম? তুই অ্যাডামকে তোর ঘাড়ের ওপরে বাড়ি দিস যাতে রাত-দিন তোর মাথার ভেতর ওর প্রতিক্রিয়া চলতে থাকে। তোর কি মনে হয় না, অ্যাডাম ক্লান্ত হয়ে গেছে? অ্যাডাম ক্লান্ত, কারণ ওকে তো মরে যেতে হয়েছে। মরে গিয়েও ওর বিশ্রাম নেই; কারণ ওকে আরেকজনের জীবন চালাতে হচ্ছে।

 অ্যাডাম আমাকে চালাচ্ছে না।

 না। তুই অ্যাডামকে চালাচ্ছিস। তুই কখনো অ্যাডামের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়েছিস বলে মনে হয়েছে তোর? কখনো মনে হয়েছে?

 হ্যাঁ, হয়েছে তো। শোনো। বুকার পেছনের দিকে রোমন্থন করতে থাকে : সে বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে; লিমুজিনের মধ্যে ব্রাইডকে প্রবেশ করতে দেখে তার সংগীত তাকে কিভাবে বদলে দিয়েছে; আমোদ-প্রমোদের মধ্যে কেমন আবছা অন্ধকারের ভেতর বাস করেছে সে। বুকারের মনে পড়ে যায়, তাদের নাচের সময় ব্রাইডের কোমর পেঁচিয়ে ধরেছে তার হাত; মুখ ফিরে তাকানোর সময় ব্রাইডের কী মিষ্টি হাসি! বুকার আবার বলে, শোনো, ব্রাইডের সঙ্গে থাকাকালে কিছুদিন খুব ভালো ছিলাম, সত্যিই খুব ভালো ছিলাম। চোখের আনন্দ আর বুকার আড়াল করতে পারে না।

 আমার ধারণা হচ্ছে, ভালো কোনো কিছুই তোর জন্য ভালো নয়। কাজেই তুই অ্যাডামকে আবার ডেকে নিয়ে এলি; ওর খুনের ঘটনা যাতে তোর মাথাটাকে লাশ বানিয়ে ফেলতে পারে, তোর হৃদয়ের রক্তকে ফরমালডিহাইড বানিয়ে ফেলতে পারে।

বুকার ও কুইন অনেকক্ষণ একে অন্যের দিকে তাকিয়ে রইল। শেষে কুইন উঠে দাঁড়াল। হতাশা না ঢেকেই বলল, বোকা। বুকার তার চেয়ারে গা এলিয়ে ঢলে পড়ল।

 সময় নিয়ে ধীরে ধীরে কুইন তার ঘরের দিকে এগোল। আনন্দ আর দুঃখ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে তার মনোযোগ দখল করার জন্য : তার খুশি লাগার কারণ হলো, কয়েক দশক হয়ে গেছে সে প্রেমিক-প্রেমিকাদের ঝগড়া, মারামারি দেখেনি। ক্লিভল্যান্ডের একটা প্রকল্পের অধীনে থাকার সময় সে দেখেছে, অল্প বয়সী দম্পতিরা তাদের প্রচণ্ড আবেগের অভিনয় করে দেখাচ্ছে। তারা অবশ্য জানত, তাদের দৃশ্যমান কিংবা অদৃশ্য দর্শক আছে। কুইন এ রকম আবেগী প্রকাশের অভিজ্ঞতা লাভ করেছে তার বহুসংখ্যক স্বামীর সঙ্গে। তাদের সবার কোনো সম্মিলিত চেহারাও আর মনে ধরা দিচ্ছে না। অবশ্য প্রথমজনের কথা একটু আলাদা। জন লাভডি। তাকে কুইন তালাক দিয়েছিল কি না মনে পড়ে না। মনে করা কঠিন, কারণ সে পরেরজনকেও তালাক দেয়নি। বার্ধক্য তার স্মৃতির আংশিক বা নির্বাচিত কিছুটা দান করছে, মনে পড়তে হাসি পায় কুইনের। কিন্তু সে হাসির মাঝেও ছেদ ফেলে দুঃখ। ব্রাইড আর বুকারের মাঝে প্রকাশিত রাগ আর হিংস্রতাকে খাটো করে দেখার উপায় নেই। অল্প বয়সের ধরনটাই এমন। তবু ধরাধরি করে ব্রাইডকে তুলে বিছানায় শুইয়ে দেওয়ার সময় খেয়াল করে দেখেছে, বুকার ব্রাইডের এলোমেলো চুলগুলো কপালের ওপর থেকে আদরে সরিয়ে ঠিক করে দিচ্ছে। বুকারের মুখের দিকে দ্রুত একনজর তাকিয়ে তার চোখে মমতার ঝলক দেখে মুগ্ধ হয়েছে কুইন।

 ওরা এ পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পারবে বলেই কুইনের মনে হলো। অনেক দিন আগেকার, তাদের নিষ্পাপ ছেলেবেলার কোনো দুঃখ-বেদনার একেকটা গল্প থাকবে ওদের প্রত্যেকের মনেই। জীবন বা সমাজ ওদের ওপরে এ রকম কোনো সমস্যা কিংবা দুঃখের অভিজ্ঞতা ছুড়ে ফেলেছে। ওরা দুজনেই ওই কাহিনী বারবার লিখবে; অবশ্য কাহিনীর প্লট জানাই থাকবে, বিষয়বস্তু অনুমান করে নেবে। সেখান থেকে নতুন নতুন অর্থ দাঁড় করাবে; কাহিনীর উেসর কথা হয়তো অস্বীকার করেই যাবে। তাহলে অপচয় হবে কিসের। তার নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছে, ভালোবাসা কত কঠিন, কতটা স্বার্থপর, কত সহজে ভেঙে খান খান হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতি আসে যখন ঠিক বোঝা যায় না, যৌন আনন্দ, স্থগিত রাখা হবে, নাকি সেটার ওপরেই নির্ভর করে চলবে জীবন, বাচ্চাদের অবহেলা করা হবে নাকি তাদের আত্মস্থ করে নিতে হবে লোভীর মতো, সত্যিকারের অনুভূতিকে অন্যদিকে চালিত করতে হবে নাকি আটকে রাখতে হবে মনের ভেতর। ও রকম ফরচুন-কুকি প্রেমের জন্য অল্প বয়সটা হলো একটা অজুহাত; তারপর তো খাঁটি প্রাপ্তবয়স্ক বেকুবি একসময় আসেই।

 কুইন ভাবে, আমি তো একসময় সুন্দরী ছিলাম, সত্যিই সুন্দরী ছিলাম। তখন বিশ্বাস করতাম সুন্দরী হওয়াই যথেষ্ট। আমার সত্যিকারের মানুষ, মানে চিন্তাশীল মানুষ হওয়ার আগ পর্যন্ত এমনটাই ছিল। বোঝার বয়সে যথেষ্ট স্মার্ট ছিলাম বলেই বুঝতে পেরেছি, মোটা হওয়াটা একটা অবস্থা, রোগ নয়। আর এখনকার স্মার্টনেস হলো স্বার্থপর মানুষের মনের কথা বুঝতে পারা। তবে তার সন্তানদের জন্য স্মার্টনেস বেশ দেরিতে এসেছে।

 তার স্বামীদের প্রত্যেকেই একজন বা দুজন সন্তানকে তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে গেছে কিংবা ফেরার হয়ে গেছে। কেউ কেউ সন্তানদের নিজের দেশের প্রতি অভ্যস্ত করে ফেলেছে। আরেকজন তার মিসট্রেসকে দিয়ে দুজন সন্তানকে রেখে দিয়েছে। কুইনের শুধু একজন স্বামীই—জনি লাভডির ভালোবাসার ভান দেখানোর যথেষ্ট বাস্তব কারণ আছে। আমেরিকার নাগরিকত্ব, ইউএস পাসপোর্ট, আর্থিক সহযোগিতা, নার্সিং কেয়ার কিংবা অস্থায়ী বাড়ি। বারো বছরের বেশি বয়সী একটা সন্তানকেও লালন-পালন করার সুযোগ হয়নি। তার কিংবা তার স্বামীদের ভালোবাসার ভান দেখানোর উদ্দেশ্য বের করতে তার সময় লেগেছে। তার মনে হয়েছে, আক্ষরিক ও আবেগী অস্তিত্ব হতে পারে এই উদ্দেশ্য। কুইনের এসবের ভেতর দিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে। আর এখন তার বসবাস বনবনানীর ভেতর—সেলাইয়ের কাজ, লেইস তৈরির কাজটাজ করে সময় কাটে। তার কৃতজ্ঞতাবোধ হলো, সদয় যিশু তাকে বেভুলো কম্বল আর প্রজ্ঞার বালিশ দিয়েছেন বার্ধক্যের আরাম হিসেবে।

 ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অস্থির হয়ে, আর বিশেষ করে তার প্রতি কুইনের খোলাখুলি বিরক্তি দেখে গভীরভাবে অসন্তুষ্ট হয়ে পড়ে বুকার। বাইরে গিয়ে দরজার চৌকাঠে বসে। কিছুক্ষণের মধ্যেই গোধূলি নামবে। রাস্তার বাতি না থাকায় এই এলোমেলো গ্রামটা অন্ধকারে ডুবে যাবে। দু-চারটে রেডিও থেকে ভেসে আসা গানের সুর মনে হবে টিভি সেট থেকে মিটমিট করে জ্বলা আলোর মতোই দূরের। টিভি সেটগুলোর মধ্যে আছে পুরনো জেনিথস আর পাইওনিয়ার। বুকার দেখল, দুটো স্থানীয় ট্রাক রাস্তা দিয়ে গর্জন করতে করতে চলে গেল। আরো কয়েকটা মোটরসাইকেল আরোহী ট্রাক দুটোর পিছু পিছু চলে গেল। ট্রাকচালকদের মাথায় ক্যাপ। মোটরসাইকেল আরোহীরা কপাল পেঁচিয়ে স্কার্ফ পরেছে। এখানকার টুকটাক অরাজকতা বুকারের ভালোই লাগে। তার খালার উপস্থিতির কারণে এই ভালো লাগার মধ্যে খানিক ভদ্রতার মিশেল আছে বলেই এখানকার বাসিন্দাদের প্রতি উদাসীনতাটাও টের পায় বুকার। এই একজন মানুষের ওপরই বুকার আস্থা রাখতে পারে। বুকার এখানে কাঠ কাটা লোকদের সঙ্গে অনিয়মিত কাজকর্মের সুযোগও পেয়েছিল। তবে ট্রাক থেকে পড়ে গিয়ে কাঁধে চোট পেয়েছে। তার উদ্দেশ্যহীন চিন্তার এ বাঁকে ও বাঁকে বারবার ঢুকে যাচ্ছে এই মনোমুগ্ধকর কালো মেয়েটার প্রতিচ্ছবি। এই যে এখন চিৎকার-চেঁচামেচি করে, তাকে মারার চেষ্টা করে, নিদেনপক্ষে তাকে বেদম পিটুনি দেওয়ার চেষ্টা করার পরে ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে তার বিছানায় ঘুমিয়ে আছে। বুকার সত্যিই জানে না, মেয়েটা এত দূর গাড়ি চালিয়ে চলে এসেছে কিসের টানে—প্রতিশোধ ও ক্রোধ ছাড়া আর কী হতে পারে? নাকি সে প্রেমের টানে চলে এসেছে?

 কুইনের কথাই ঠিক; অ্যাডাম ছাড়া আমি ভালোবাসা সম্পর্কে কিছুই জানি না। অ্যাডামের মধ্যে কোনো খুঁত ছিল না; অ্যাডাম ছিল নিষ্পাপ, পবিত্র। ভালোবাসা পাওয়ার জন্য সহজ-সরল। অ্যাডাম যদি বেঁচে থাকত, তার মধ্যেও যদি মানবিক ত্রুটিবিচ্যুতি থাকত : প্রতারণা, বোকামি ও অজ্ঞতা থাকত, তবু কি সে ভালোবাসা পাওয়ার ক্ষেত্রে এতটাই সহজ-সরল হতো, সে কি প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য হতো? যে ভালোবাসার লেনদেনের জন্য শুধু ফেরেশতাকে দরকার, সেটা কী ধরনের ভালোবাসা?

 চিন্তার এই ধারা অনুসরণ করে বুকার নিজেকে কঠোরভাবে শাস্তি দিতেই থাকে।

সম্ভবত ভালোবাসা সম্পর্কে আমার চেয়ে ভালো জানে ব্রাইড। ও তো কমপক্ষে এ বিষয়ে গভীর চিন্তা করার শক্তি রাখে, ভালোবাসার জন্য কিছু করতে পারে, ঝুঁকি নিতে পারে, ভালোবাসার পরিমাপ জানে। আমি আমার মতো একটা সিংহাসনে বসে অন্যদের দোষত্রুটি ধরতে পছন্দ করি। আমার নিজের বুদ্ধি আর নৈতিক অবস্থান নিয়ে আমি বেজায় মুগ্ধ। এই দুটো গুণের সঙ্গে আছে আমার নিজের ঔদ্ধত্য। সেটাও আমাকে মুগ্ধ করে। কিন্তু আমার মেধাবী গবেষণা কই? আমি যে আলোকিত পুস্তক প্রণয়ন করতে চেয়েছিলাম, আমি যেসব মাস্টারপিস রচনা করতে চেয়েছিলাম, সেগুলো কই? কোথাও নেই। সেগুলোর বদলে এখন অন্যদের দোষত্রুটি আর ঘাটতি সম্পর্কে চিরকুট লিখছি। এটা সহজ। খুব সহজ। আমার দোষত্রুটির কী হবে? ব্রাইড দেখতে কেমন, রতিক্রিয়ায় কী সুন্দর সাড়া দেয়, ভূমিকা রাখে, কোনো রকম চাওয়া নেই ওর। আমাদের মধ্যে প্রথম মতবিরোধ দেখা দিল; আর আমি চলে এলাম। আমার বিচারের মান শুধুই অ্যাডাম। কুইন তো বলেছে, আমার বোঝা হতে হতে, আমার গৌরবের চিহ্ন হতে হতে অ্যাডাম এখন ক্লান্ত।

 বুকার এক পা দুই পা করে ধীরে ধীরে তার ভ্রাম্যমাণ ঘরের ভেতরে চলে আসে; ব্রাইডের হালকা নাক ডাকার শব্দ শুনতে শুনতে একটা খাতা বের করে। যে কথাগুলো মুখে বলতে পারে না সেগুলো কাগজের ওপরে চিরকুট আকারে লিখবে আরেকবার।

‘আমি আর এখন তোমাকে মিস করি না অ্যাডাম বরং তোমার মৃত্যু যে আবেগ তৈরি করেছিল সেটাই মিস করি সে অনুভূতি এতই প্রভাবশালী যে আমার সামগ্রিক পরিচয়টাই নির্ধারণ করেছে সেটা তোমাকে মুছে ফেলেছে আর আমার জন্য রেখে গেছে তোমার অনুপস্থিতি যাতে আমি জাপানি ঘণ্টাধ্বনি সৃষ্ট নীরবতার মতো বাঁচতে পারি; সেই নীরবতা যেকোনো শব্দের চেয়ে রোমাঞ্চকর।

 ‘আমি নিজেকে ক্ষমতার সস্তা প্রলোভন আর নিয়ন্ত্রণের মায়ার কাছে দাস বানিয়েছিলাম; এ উদ্দেশে আমি তোমাকেও দাসত্বে বেঁধেছিলাম। সে জন্য তোমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। কোনো দাসের মালিক আমার চেয়ে মনে হয় ভালো করে দাসের কারবার করতে পারেনি। ’

বুকার তার খাতাটা সরিয়ে রাখল। গোধূলি তাকে ঢেকে ফেলেছে। ভোরের আশা করতে করতে উষ্ণ হাওয়ায় নিজেকে জুড়িয়ে নিল সে।

 স্বপ্নহীন গভীর ঘুম থেকে সূর্যালোকের ভেতর জেগে উঠল ব্রাইড। মাতাল হয়ে ঘুমালেও এত গভীর ঘুম হয় না; এত গভীর ঘুম কখনো ঘুমিয়েছে বলে মনে পড়ে না তার। এত দীর্ঘ সময় ঘুমানোর পর মনে হচ্ছে, বিশ্রামের চেয়েও বেশি কিছু পেয়ে গেছে; মনে কোনো দুশ্চিন্তা নেই আর। নিজেকে শক্ত মনে হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গেই উঠল না ব্রাইড। বুকারের বিছানায় চোখ বন্ধ করে পড়ে থেকে সতেজ প্রাণশক্তি আর জ্বলজ্বলে পরিচ্ছন্নতা উপভোগ করছে। লুলা অ্যানের পাপের কথা স্বীকার করে মনে হচ্ছে, তার নতুন জন্ম হয়েছে। তার মায়ের ঘৃণা আর বাবার পরিত্যাগের জীবনটাকে আর পুনরায় জোর করে যাপন করার দরকার নেই, সে জীবনকে ভয়ে এড়িয়ে চলারও দরকার নেই। স্বপ্ন কল্পনা থেকে নিজেকে তুলতে তুলতে উঠে বসল ব্রাইড; দেখল বুকার পুলডাউন টেবিলে কফি খাচ্ছে। বুকারকে আর হিংস্র মনে হচ্ছে না, চিন্তামগ্ন মনে হচ্ছে। সুতরাং ব্রাইড ওর সঙ্গে যুক্ত হলো : ওর প্লেট থেকে বেকনের একটা টুকরো তুলে খেয়ে নিল। তারপর বুকারের টোস্ট চিবাতে লাগল।

 বুকার জিজ্ঞেস করল, আরো নেবে?

 না। না, ধন্যবাদ।

 কফি? জুস?

 ঠিক আছে, কফি চলতে পারে।

 নিশ্চয়।

 ঘুমিয়ে পড়ার আগের মুহূর্তগুলো ফিরিয়ে আনার জন্য ব্রাইড চোখের পাতা কচলে নিল। বুকারের বাঁ পাশের ফোলাটা ওই মুহূর্তটা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হলো। তুমি এক হাতে আমাকে তোমার বিছানায় তুলে এনেছিলে?

 বুকার বলল, আনতে সাহায্য পেয়েছিলাম।

 কার কাছ থেকে?

 কুইনের।

 হায়, ঈশ্বর! কী খ্যাপাটে ভাববেন উনি আমাকে!

 সন্দেহ আছে। বুকার তার সামনে কফির কাপ রাখল। কুইন একজন খাঁটি মানুষ। সে খ্যাপাটে চেনে না।

 ব্রাইড কফির বাষ্প ফুঁ দিয়ে সরিয়ে দিল। তুমি যেসব লেখা মেইল করে পাঠিয়েছিলে তিনি আমাকে দেখিয়েছেন। তোমার হাতে লেখা অনেক পৃষ্ঠা। এগুলো তার কাছে পাঠিয়েছিলে কেন?

 জানি না। হতে পারে, ফেলেই দিতে চেয়েছিলাম। পরিমাণে অনেক হওয়ায় ময়লার ঝুড়িতে জায়গা হয়নি। আবার সঙ্গে নিয়ে বয়ে বেড়ানোর মতো বেশিও না। মনে হয়, লেখাগুলো নিরাপদে থাকুক সেটাই চেয়েছিলাম আমি। আর কুইন তো সব কিছু গুছিয়ে রাখে।

 পড়ার সময় আমি বুঝতে পেরেছি, এগুলো সব আমাকে নিয়ে লেখা, ঠিক না?

 ওহ, হু, বুকার চোখ ঘুরিয়ে একটা নাটকীয় দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সব কিছুই তোমার সম্পর্কে, শুধু এই গোটা পৃথিবী আর যে মহাবিশ্বে পৃথিবীটা ভাসছে সেই মহাবিশ্ব ছাড়া।

 আমাকে নিয়ে মজা করা থামাবে? নিশ্চয় বুঝতে পারছ, কী বলছি আমি। লেখাগুলো তুমি লিখেছিলে আমরা দুজন যখন একসঙ্গে ছিলাম তখন, ঠিক না?

 ব্রাইড, এগুলো আমার মনের এলোমেলো ভাবনা ছাড়া আর কিছু নয়। ওই সময়ে আমার কেমন লাগত, কী নিয়ে আশঙ্কা হতো কিংবা কী বিশ্বাস করতাম এসব।

 তুমি কি এখনো বিশ্বাস করো, মানুষের হৃদয় ভেঙে গেলে তারাদের জ্বলে যাওয়ার মতো হয়ে থাকে?

 হ্যাঁ, অবশ্যই। তবে তারারা বিস্ফোরিত হতে পারে, অদৃশ্য হতে পারে। এ ছাড়া তারাদের দিকে তাকিয়ে যা দেখতে পাই সেটা হয়তো বাস্তবের নয়; হাজার হাজার বছর আগে কোনো কোনো তারা মরে গিয়ে থাকতে পারে; আমরা শুধু সেসব তারার আলো দেখতে পাই। পুরনো তথ্য খবরের মতো মনে হয়। আচ্ছা তথ্যের কথা বলতে গিয়ে মনে পড়ে গেল, তুমি আমার ঠিকানা পেলে কিভাবে?

 তোমার নামে একটা চিঠি এসেছিল। একটা বাকি বিলের কাগজ, মানে একটা বাদ্যযন্ত্র মেরামতের দোকান থেকে। দোকানটার নাম দ্য পন প্যালেস। আমি ওখানে গিয়েছিলাম।

 কেন?

 বিলটা পরিশোধ করতে, গাধা! ওদের কাছ থেকেই শুনলাম তুমি কোথায় থাকতে পারো। এই ভাগাড়ের মতো জায়গাটা; ওদের কাছে একটা ঠিকানায় কুইন অলিভ লেখা ছিল।

 তুমি আমার বাকি টাকা ওদের শোধ করে দিয়ে এত দূর গাড়ি চালিয়ে এলে আমাকে চড়-থাপড় মারার জন্য?

 আমার পরিকল্পনায় এ রকম ছিল না। তবে বলতে হচ্ছে, খারাপ লাগেনি। ভালোই লেগেছে। তা ছাড়া তোমার শিঙাটাও নিয়ে এসেছি। কফি আরো আছে?

 নিয়ে এসেছ? আমার ট্রাম্পেট?

 অবশ্যই এনেছি। ওটা মেরামত করাও হয়েছে।

 কোথায় আছে? কুইনের ঘরে?

 আমার গাড়ির ট্রাংকে।

 বুকারের হাসি তার ঠোঁট থেকে চোখে ছড়িয়ে পড়ল। তার মুখের খুশির ভাবটা শিশুদের মতো। আই লাভ ইউ, লাভ ইউ! কথাগুলো চিৎকার করে বলতে বলতে দরজার বাইরে দৌড়ে বের হলো রাস্তায়, জাগুয়ারের দিকে।

শুরুটা ধীরে, শান্তভাবে, যেমনটা সাধারণত হয়ে থাকে। সামনের দিকে এগোনোর কোনো নিশ্চয়তা না পেয়ে মনে হয় আস্তে আস্তে হাত দিয়ে বাধা দূর করার মতো করে পথ করে নিয়েছে। কে জানে, হয়তো চেহারাটা দেখিয়ে ফেলতে পারে যখন-তখন। তারপর বাতাস আর সূর্যালোকের পরমানন্দে আত্মবিশ্বাস পেয়ে গেছে। কারণ যে ঘাসের মধ্যে পড়ে ছিল জিনিসটা সেখানে বাতাস ছিল না, রোদও ছিল না।

 তারপর আস্তে আস্তে চোরের মতো উঠান পর্যন্ত চলে এসেছে। কুইন উঠানে বেডস্প্রিং পুড়িয়েছে ছারপোকাদের বার্ষিক বাসা নষ্ট করার জন্য। আর এইবার ছড়িয়ে পড়া শুরু করল দ্রুত, যখন-তখন লকলকে লাল জিহ্বার ঝিলিক দেখাতে দেখাতে। তারপর আবার হয়তো মুহূর্তের জন্য একটু দমে গেছে পরের মুহূর্তে আরো জোরে লাফিয়ে জ্বলে ওঠার জন্য। এবার আরো ঘন হয়ে জেগে উঠেছে, কেননা সামনের পথটা আর লক্ষ্যটা এখন পরিষ্কার : ভ্রাম্যমাণ ঘরটার সামনের দুটো কালো সিঁড়িতে পচে যাওয়া পাইনের অনেকখানি স্বাদু অবয়ব পড়ে আছে। তারপর দরজা, ওখানে তো আরো পাইন, আরো মধুর, আরো নরম। তারপর আরো স্বাদের ঝালর, রেশম আর মখমলের নকশি করা কাপড়ের স্তূপ।

 বুকার ও ব্রাইড যখন ওখানে পৌঁছে, কুইনের ঘরের সামনে লোকজনের ছোট একটা জটলা দাঁড়িয়ে আছে, কর্মহীন লোকেরা, বাচ্চারা আর বয়স্করা। ভেতরে ঢোকার সময় তারা দেখতে পেল, জানালার কাঠ থেকে, চৌকাঠ থেকে, দরজার সামনে ফেলে রাখা মোটা কাপড়ের ভেতর দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে। প্রথমে বুকার, তারপর ব্রাইড তার পেছনে। মেঝেতে পড়ে গেল দুজনই। ওখানে ধোঁয়া আরো ঘন। এরপর হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গিয়ে দেখল, কুইন অনড় হয়ে পড়ে আছে বিছানার ওপরে। তাপহীন ধোঁয়ার হাসিতে যেন প্ররোচিত হয়ে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে আছে। বুকারের ভালো হাতটা আর ব্রাইডের দুই হাত দিয়ে চোখের অবিরাম জল গড়ানো আর গলার ভেতরে অবিরাম কাশি নিয়েই দুজনে অচেতন কুইনকে প্রথমে মেঝেতে নিয়ে আসে, তারপর টানতে টানতে সামনের ছোট লনটাতে।

 ওখানে দাঁড়িয়ে থাকা লোকদের একজন চিৎকার করে বলে উঠল, আরো একটু, হ্যাঁ, আরো একটু! গোটা জায়গাই তো বিস্ফোরণে উড়ে যেতে পারত।

 বুকার কুইনের মুখের ভেতর বাতাস ঢোকানোর চেষ্টায় মগ্ন থাকে বলে লোকটার কথা ভালো শুনতেই পায় না। শেষে খানিক দূরে ফায়ার ট্রাক আর অ্যাম্বুল্যান্সের সাইরেন শুনতে পাওয়া গেল। আগুনের গর্জনের সৌন্দর্য দেখে যতটা আনন্দ পেয়ে থাকে বাচ্চারা তার চেয়ে বেশি উত্তেজনা পেয়ে যায় এই সাইরেনের শব্দে। হঠাৎ করে কুইনের চুলের মধ্যে লুকিয়ে থাকা একটা শিখা দপ করে জ্বলে ওঠে, চোখের পলকে কুইনের বিরাট চুলের গোছাকে যেন গিলে খেয়ে ফেলে। ব্রাইড খুব দ্রুততায় তার টি-শার্ট খুলে ফেলে কুইনের চুলের আগুনে চেপে ধরে। কালি লেগে যাওয়া ধোঁয়া বের হওয়া শার্টটা যখন তার জ্বলে যাওয়া দাগ লাগা হাতে টান দিয়ে নিয়ে আসে, দেখতে পায়, কুইনের দ্রুত ফোসকা পড়ে যাওয়া খুলির সঙ্গে একাত্ম হয়ে লেগে আছে কয়েক গোছা চুল। এতক্ষণ বুকার শুধু বলে যাচ্ছে, হ্যাঁ, হ্যাঁ, এই তো, ওঠো, সোনা, চেষ্টা করো, সোনা! কুইন নিঃশ্বাস ফেলছে, কাশছে। জীবনের লক্ষণ প্রকাশ পায় এমন কিছু দেখা যাচ্ছে তার ভেতর। অ্যাম্বুল্যান্স পার্ক করার সঙ্গে সঙ্গে ভিড় আরো বেড়ে গেল। দর্শকদের কেউ কেউ মনে হলো অবশ হয়ে গেছে। ব্যথায় গোঙানো রোগীকে গড়িয়ে অ্যাম্বুল্যান্সে তোলার দৃশ্যে তারা এমন অবশ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তা নয়। তারা এভাবে বড় বড় চোখে তাকিয়ে দেখছে ব্রাইডের চমৎকার সুন্দর বড় বড় কোমল স্তনজোড়া। তবে দর্শকরা যত আনন্দিতই হোক না কেন ব্রাইডের আনন্দের তুলনায় তাদের আনন্দ শূন্য। একজন মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট একটা কম্বল এগিয়ে দেয় ব্রাইডের দিকে। তার আনন্দের কারণে ব্রাইড সেটা নিতে খানিক বিলম্ব করে ফেলে। যখন তার দিকে তাকিয়ে থাকা দর্শকদের ওপর তার নজর পড়ে তখন সে বুঝতে পারে এবং কম্বলটা নিয়ে নেয়। কিন্তু তার মনের খুশি ঢেকে রাখা দমিয়ে রাখা খুব কঠিন ছিল। এমনকি খানিকটা লজ্জিতও বোধ করে, কেননা তার মনোযোগ দুদিকে ভাগ হয়ে গেছে : একদিকে কুইনকে ধীরে ধীরে অ্যাম্বুল্যান্সে টেনে তোলা, আরেকদিকে তার নিখুঁত স্তনের জাদুকরী প্রত্যাবর্তন।

 ব্রাইড ও বুকার জাগুয়ারের দিকে দৌড়ে গেল। তারপর অ্যাম্বুল্যান্সটার পিছে পিছে চলল।

 কুইনকে হাসপাতালে ভর্তির পর থেকে দিনের বেলা ব্রাইড এবং রাতের বেলা বুকার তার কাছে থাকতে লাগল। তিন দিন তিন রাত পর কুইন চোখ মেলল। কুইনের মাথা ব্যান্ডেজ করা, ব্যান্ডেজের মধ্যে ওষুধ ভরে দেওয়া হয়েছে। কুইন তার উদ্ধারকারী দুজনের কাউকেই চিনতে পারল না। তাদের আপাতত করার মতো কাজ হলো রোগীর গায়ে লাগানো টিউবগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকা। একটা টিউব কাচের মতো স্বচ্ছ আর রেইনফরেস্টে জন্মানো লতার মতো, বাকিগুলো টেলিফোনের তারের মতো সরু। সাদা কেলমাটিস লতার মতো টিউব ছাড়া বাকিগুলো কুইনের ঠোঁটের হালকা গার্গল থেকে রঙিন হয়ে ফুটেছে।

 হাসপাতালের বেডের ওপরের পর্দা বরাবর প্রধান রংগুলোর রেখা রক্তের মতো বয়ে চলছে। শ্যাম্পেনের মতো তরলভরা স্বচ্ছ ব্যাগ থেকে তরল ফোঁটায় ফোঁটায় গড়িয়ে পড়ছে একটা লতার মতো টিউবে, কুইনের থলথলে বাহুতে খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে এভাবে। বেডপ্যানে পর্যন্ত ওঠার ক্ষমতা নেই কুইনের। তাকে ধরে তুলে বেডপ্যানের কাজ সারার পর আবার ধুয়েমুছে দেওয়া, তেল দিয়ে দেওয়া, আবার ঠিকমতো প্রয়োজনীয় কাপড় পরিয়ে পেঁচিয়ে রাখা—সব ব্রাইড করছে, যতটা কোমল হাতে করা যায় চেষ্টা করছে। নার্সের উদাসীন হাতের ওপর ভরসা করতে পারছে না। কুইনের শরীরের এক অংশ ধুয়ে পরিষ্কার করার সময় নিশ্চিত থাকার চেষ্টা করছে যেন অন্য অংশ অনড় থাকে। ব্রাইড কুইনের পায়ের দিকের সেবাযত্ন বাদ রেখে দিয়েছে। বুকার তাকে সন্ধ্যার সময় তাদের দায়িত্ব বদলের সময়ে বলে দিয়েছে, সে নিজে ইস্টারের নিয়মিত প্রসাদ গ্রহণকারীর মতো নিষ্ঠার সঙ্গে কুইনের সেবা করবে। সে কুইনের পায়ের চিকিৎসা করার মতো সেবা করে, পা সাবান দিয়ে ধুয়েমুছে দেয়, আস্তে আস্তে ছন্দে ছন্দে একটা লোশন দিয়ে ম্যাসাজ করে দেয়। লোশনটার গন্ধ হিদারগুল্মের মতো। পায়ের মতো কুইনের হাতেও একই রকম সেবা করে বুকার। এই কাজ করার গোটা সময় নিজেকে অভিশাপ দিতে থাকে, গালি দিতে থাকে : সর্বশেষ কথোপকথনের সময় কুইনের প্রতি তার রাগ হয়েছিল।

 কুইনকে দেখাশোনা, ধোয়ামোছার সময় বুকার ও ব্রাইড তেমন কথা বলেনি। মাঝেমধ্যে ব্রাইড গুনগুন করেছে মাত্র। তাদের জন্য নীরবতা দরকার ছিল, নীরবতা ওষুধের মতো কাজ করছে। তারা দুজন আসল জুটির মতোই কাজ করছে। নিজেদের কথা ভাবছে না, অন্য আরেকজনের চিন্তা তাদের মাথায়। হাসপাতালের ওয়েটিং রুমে কোনো কাজ ছাড়া অন্য লোকদের মধ্যে বসে থেকে দুশ্চিন্তা করা একটা অগ্নিপরীক্ষা। ওই একই রকম বলা যায় রোগীর দিকে অসহায় হয়ে তাকিয়ে থাকাটাকেও। রোগীর মধ্যে প্রতিটা নড়নচড়ন, তার নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস, তার নাজুক শরীরের এপাশ ওপাশ করা দেখার সময় তেমনই মনে হয়। তিন দিনের অপেক্ষার পর তাদের যে বিষয়টি স্বস্তি দিতে পারে সেটিই ঘটল : কুইন কথা বলল। অক্সিজেন মাস্কের ভেতর দিয়ে ঘড়ঘড়ে গলার দুর্বোধ্য কথা বের হলো। তারপর এক পড়ন্ত সন্ধ্যায় তার অক্সিজেন মাস্ক খুলে ফেলা হলো। কুইন ফিসফিস করে বলল, আমি কি ভালো হয়ে যাচ্ছি?

 বুকার হাসল।

 কোনো প্রশ্ন নয়, মোটেও কোনো প্রশ্ন নয়, বলে বুকার কুইনের নাকে চুমু দিল।

 কুইন শুকনো ঠোঁট চেটে চোখ বন্ধ করল। সঙ্গে সঙ্গে নাক ডাকার মৃদু শব্দ আসতে লাগল।

 ব্র্রাইড বুকারকে ছুটি দেওয়ার জন্য আসার পর বুকার তাকে কুইনের অবস্থার কথা জানাল। খুশি উদ্‌যাপন করার জন্য দুজন হাসপাতালের ক্যাফেটেরিয়ায় ব্রেকফাস্ট করল একসঙ্গে। ব্রাইড সিরিয়াল অর্ডার করল, বুকার কমলার জুস।

 চোখের ভ্রু উঁচু করে বুকার জিজ্ঞেস করল, তোমার চাকরির কী খবর?

 চাকরির খবর দিয়ে কী হবে?

 এমনিই জিজ্ঞেস করলাম, ব্রাইড। ব্রেকফাস্টের কথাবার্তা হিসেবে জিজ্ঞেস করলাম আর কি।

 চাকরির খবর কিছু জানি না। এ বিষয়ে মাথা ঘামাতেই চাচ্ছি না। নতুন আরেকটা খুঁজে নেব।

 ও আচ্ছা। তাই?

 হ্যাঁ, তোমার কী খবর? চিরকাল কাঠ কেটেই যাবে?

 হতে পারে, নাও হতে পারে। বন ধ্বংস করার পরে কাঠ কাটার লোকেরা অন্যখানে চলে যায়।

 ঠিক আছে। আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না।

 কিন্তু আমি তোমাকে নিয়ে চিন্তা না করে পারি না।

 কখন থেকে?

 যখন তুমি আমার মাথায় বিয়ারের বোতল ভেঙেছ, তখন থেকে।

 দুঃখিত।

 সত্যি বলছি, আমিও দুঃখিত।

 দুজনই মুখ টিপে হাসল।

 কুইনের হাসপাতালের বেড থেকে দূরে, তার অবস্থার উন্নতিতে স্বস্তি পেয়ে মোটামুটি আয়েশি ভঙ্গিতে পুরনো দম্পতির মতো ঠাট্টা-পরিহাস করতে করতে মজায় রইল দুজন।

 হঠাৎ করে মনে পড়ে গেছে, এমন ভঙ্গিতে আঙুল মটকে বুকার তার শার্টের পকেটে হাত চালাল। পকেট থেকে বের করে আনল কুইনের কানের দুল। কুইনের মাথায় ব্যান্ডেজ করার জন্য খোলা হয়েছে। এত দিন দুলজোড়া কুইনের বেডসাইড টেবিলের ড্রয়ারে একটা ছোট প্লাস্টিক ব্যাগে রাখা ছিল।

 বুকার বলল, এ দুটো নাও। দুলজোড়া সে তোমাকেই দেবে। সেরে উঠলে সে চাইবে, তুমিই পরো এ দুটো।

 ব্রাইড তার কানের লতি ছুঁয়ে বুঝতে পারল, ছোট ছিদ্র দুটো আবার ফিরে এসেছে। হাসতে হাসতে আবেগে চোখে জল এসে গেছে।

 দেখি, আমি পরিয়ে দিই। বুকার ব্রাইডের কানের লতির ফুটোয় দুলের তার ঢুকিয়ে দিল। বলল, দারুণ হয়েছে। যখন আগুন লাগে তখন কুইন পরেছিল দুলজোড়া। আর কিছুই বাকি নেই। কোনো চিঠি, ঠিকানার খাতা, কিচ্ছু নেই। সব পুড়ে গেছে। আমার মাকে ফোন করে বলেছি কুইনের ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে।

 কুইন কি ওদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারে? বলতে বলতে ব্রাইড আলতো করে মাথা সামনে-পেছনে দোলায় যাতে সোনার ডিস্কটার ছোঁয়া লাগে ভালো করে। তার সব কিছুই ফিরে আসছে। প্রায় সব কিছু।

 কারো কারো সঙ্গে যোগাযোগ আছে। টেক্সাসে তার এক মেয়ে থাকে, মেডিক্যালের ছাত্রী। ওকে সহজে পাওয়া যাবে।

 ব্রাইড ওটমিলে নাড়া দিয়ে এক চামচ খেয়ে দেখল, ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। কুইন তো আমাকে বলেছে, সে ওদের কাউকে দেখে না অনেক দিন। ওরা নাকি শুধু টাকা পাঠায়।

 ওরা সবাই কুইনকে কোনো না কোনো কারণে ঘৃণা করে। আমি জানি, সে ওদের কাউকে কাউকে ছেড়ে গেছে অন্য লোকদের বিয়ে করার জন্য। সংখ্যায় অনেক। সে তখন আগের স্বামীর সন্তানদের নিজের সঙ্গে নেয়নি, কিংবা নিতে পারেনি। ওদের বাবারা নিতে দেয়নি।

 ব্রাইড বলল, আমার মনে হয়, কুইন তবু ওদের ভালোবাসে। তার ঘরের সবখানে ওদের ছবি।

 হু, আমার ভাইকে যে মাদারচোদ মেরেছিল তার বালের ডেরায়ও তার সব শিকারের ছবি ছিল।

 দুজনে এক নয়, বুকার।

 এক নয়? বুকার জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল।

 না, এক নয়। কুইন তার সন্তানদের ভালোবাসে।

 কিন্তু ওরা তা মনে করে না।

 আহ, থামো তো! কে কাকে ভালোবাসল না বাসল ও নিয়ে আর ফালতু যুক্তিতর্ক করে লাভ নেই। সে সিরিয়ালের বাটি টেবিলের মাঝখানের দিকে ঠেলে দিয়ে বুকারের কমলার জুসে চুমুক দিল। হ্যাঁ, চলো, ফিরে যাই। গিয়ে দেখি কুইনের কী অবস্থা।

 কুইনের বেডের দুই পাশে দুজন দাঁড়িয়ে দারুণ খুশি হলো। কুইন জোরে জোরে স্পষ্ট গলায় কথা বলছে।

 হানাহ? হানাহ, না? ব্রাইডের দিকে তাকিয়ে জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলছে, নিচ্ছে। আমার কাছে আয়, সোনা! হানাহ?

 ব্রাইড জিজ্ঞেস করল, হানাহ কে?

 বুকার বলল, ওর মেয়ে। মেডিক্যালের ছাত্রী।

 কুইন ভাবছে, আমি তার মেয়ে। হায় ঈশ্বর! ওষুধের কারণে এ রকম হচ্ছে আমার মনে হয়। তার কাছে সব কিছু এলোমেলো হয়ে গেছে।

 কিংবা তার ভেতরের আবেগ অজান্তে বের করে দিচ্ছে। বুকার নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল, হানাহ সম্পর্কে একটা ঘটনা ছিল। পরিবারে একটা গুজব ছিল : হানাহ তার বাবা সম্পর্কে একটা নালিশ করেছিল কুইনের কাছে। কিন্তু কুইন পাত্তা দেয়নি। হানার বাবা সম্ভবত কুইনের এশিয়ার কিংবা টেক্সাসের স্বামী। আমার ঠিক মনে নেই। যাই হোক, হানাহ বলেছিল, সে ওকে গায়ে হাত দিয়ে আদর করে; কিন্তু কুইন সে কথা বিশ্বাসই করেনি। তাদের মধ্যকার বরফ আর গলেনি।

 এখনো কুইনের মনে রয়ে গেছে ব্যাপারটা।

 মনের চেয়েও গভীরে। কুইনের বিছানার পায়ের দিকের একটা চেয়ারে বসল বুকার। সে কুইনের একটানা বলে যাওয়া কথা শুনছে। এখন একেবারে ফিসফিস করে বলছে হানাহর নামটা। বুকার বলল, এখন আমি বুঝতে পারছি। সে কেন আমাকে অ্যাডামের স্মৃতি ধরে রাখতে বলেছিল, অ্যাডামকে আন্তরিকতার মধ্যে রাখতে বলেছিল, তার ব্যাখ্যা পেয়ে গেছি।

 কিন্তু হানাহ তো মারা যায়নি।

 একদিক থেকে হানাহ মারাই গিয়েছে, বিশেষ করে ওর মায়ের কাছে। কুইনের ঘরের দেয়ালে সব ছবি ঝোলানো দেখেছ। দেয়ালের প্রায় সবটা জুড়ে আছে ছবিতে। ব্যাপারটা রোল কলের মতো। বেশির ভাগ ছবি কিন্তু হানার—শিশু, কিশোরী, হাই স্কুলের গ্র্যাজুয়েট, বিভিন্ন বয়সের ছবি। কোনো পুরস্কার নিচ্ছে, তার ছবি। গ্যালারির চেয়ে বরং মেমোরিয়াল বলা যায় ছবিগুলোর এ রকম প্রদর্শনীকে।

 ব্রাইড বুকারের চেয়ারের পেছনে চলে গিয়ে তার কাঁধের ওপরে ম্যাসাজ করতে লাগল। আমি ভেবেছিলাম, ছবিগুলো তার সব সন্তানের।

 বুকার বলল, হ্যাঁ, কয়েকটা সে রকমই। তবে হানাহর ছবি বেশি আছে। বুকার ব্রাইডের পেটের সঙ্গে মাথা হেলান দিতেই বুঝতে পারল, কী কারণে যেন তার দুশ্চিন্তা সব হালকা হয়ে গেল।

 আরো কয়েক দিন কুইনের উন্নতির ভেতর দিয়ে তাদের ভালোলাগা বাড়তে থাকে। তখনো কুইনের মাথার এলোমেলো অবস্থা আছেই। তবে কথা বলছে, খাচ্ছে। কথাবার্তা বোঝা কঠিন। কারণ কথার মধ্যে জড়িয়ে আছে ভূগোল—যেসব জায়গায় সে থেকে এসেছে। আর আছে হানাহ সম্পর্কিত নানা কাহিনি।

 চিকিৎসকের মূল্যায়নে ব্রাইড ও বুকার সন্তুষ্ট। তিনি বললেন, বেশ ভালো অবস্থার দিকে এগোচ্ছেন তিনি। অনেকটাই ভালো।

 ব্রাইড ও বুকার পরিকল্পনা করতে থাকে, কুইনের রিলিজ পাওয়ার পরে তারা কী করবে না করবে। আপাতত একটা জায়গা খুঁজে নেবে যেখানে তারা তিনজন থাকতে পারে। একটা বড় ভ্রাম্যমাণ বাড়ি? আপাতত কুইন নিজের মতো চলতে পারার আগ পর্যন্ত সে রকমই চলবে। আর গভীরে খোঁজাখুঁজি না করে তারা সিদ্ধান্তে আসে, তারা তিনজন একসঙ্গে থাকবে।

 আস্তে আস্তে তাদের অদূর ভবিষ্যতের উজ্জ্বল পরিকল্পনাটা আবছা হয়ে আসে। কার্নিভাল রঙের রেখাগুলো পর্দার ওপরে নড়াচড়া করতে থাকে, পড়ে যায়। রেখাগুলো ইমার্জেন্সি বেলের মিউজিকের সঙ্গে থেমে যায়। কুইনের স্পন্দনের হার কমে আসে; তাপমাত্রা মারাত্মক বেড়ে যায়; ব্র্রাইড ও বুকারের নিঃশ্বাস আটকে আসতে চায়। একটা গুপ্ত অশুভ আগুন তার বাড়িটা ধ্বংস করে দিয়েছে; হাসপাতালবাহিত তেমনই একটা গুপ্ত ভাইরাস তাকে আক্রমণ করছে। প্রথমে খানিকটা বাড়ি খাওয়ার মতো অবস্থা হলো কুইনের; তারপর তার হাত দুটো উঁচু হয়ে উঠল, আঙুলগুলো আটকে আসতে লাগল। শুধু কুইন নিজে দেখতে পায় এমন একটা মইয়ের ধাপ বেয়ে ওপরের দিকে উঠতেই থাকে সে। তারপর একসময় সব থেমে যায়।

 বারো ঘণ্টা পর কুইন মারা যায়। একটা চোখ তখনো খোলা দেখে ব্রাইডের সন্দেহ হয়। তবে বুকার চোখটা বন্ধ করে দেয়। তারপর তার নিজের চোখও।

কুইনের ভস্ম প্রস্তুত হওয়ার জন্য তিন দিন অপেক্ষা করতে হয়; সে সময়টাতে ব্রাইড ও বুকার ভস্মাধার কেমন হবে সে নিয়ে যুক্তিতর্ক তোলে। ব্রাইড চায় পিতলের তৈরি রুচিশীল ভস্মাধার। বুকার চায় পরিবেশবান্ধব কোনো উপাদানে তৈরি ভস্মাধার যেটা পুঁতে রাখা যাবে এবং পরবর্তী সময়ে সেটা মাটিকে উর্বর করবে। একসময় তারা দেখতে পায়, পঁয়ত্রিশ মাইলের মধ্যে কোনো কবরস্থান নেই। ট্রেইলার পার্কের ভেতরও শব দাফন করার মতো কোনো জায়গা নেই। তখন তারা সিদ্ধান্তে আসে একটা কার্ডবোর্ডের বাক্স তৈরির। সেটাতে ভস্ম রাখা হবে এবং স্রোতস্বিনীতে ছড়িয়ে দেওয়া হবে। বুকার জোর দিতে লাগল, সে একাই আনুষ্ঠানিকতার কাজটা করবে; ব্রাইড গাড়িতে বসে অপেক্ষা করবে। খুব সচেতনে এবং দুশ্চিন্তার সঙ্গেই ব্রাইড বুকারের হেঁটে যাওয়া দেখতে লাগল। বুকার ডান হাতের কনুই দিয়ে পেঁচিয়ে ধরেছে কার্টনটা; বাঁ হাতের আঙুল থেকে ঝুলছে তার ট্রাম্পেটটা। কুইন মারা যাওয়ার আগের কয়েক দিন যখন তারা অদূর ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করছিল সে সময়টা খুব ভালো কেটেছে মনে হয় ব্রাইডের। তখন তাদের চিন্তাভাবনার কেন্দ্রে ছিল এমন একজন তৃতীয় ব্যক্তি যাকে তারা দুজনই ভালোবাসে। এখন কী হবে? এখন তো শুধু তারা দুজন। যদি এভাবেই থাকতে হয় তাহলে কেমন হবে? সে বুকারকে ছেড়ে থাকতে চায় না। কখনোই না। তবে যদি বাধ্য হয়ে থাকতেই হয় তাহলে মেনে নিতে পারবে। ভবিষ্যৎ? ভবিষ্যেক সে চালাতে পারবে।

 যদিও আপ্রাণ চেষ্টা করেছে তবু প্রিয় কুইনকে উৎসর্গ করা বুকারের আচার আয়োজনটা কেমন যেন বিশ্রী হয়ে গেল : ছাই কেমন যেন দলা দলা হয়ে গেল, ছড়িয়ে দেওয়া কঠিন হলো। আর এর সঙ্গে তার সাংগীতিক নিবেদন, কিছুটা ব্লুজের মতো চেষ্টাও হয়ে গেল অফ-কি, অনুপ্রেরণা পাওয়া গেল না সেটা থেকেও। তার এই নিবেদনের আচার সংক্ষিপ্ত করে ফেলল বুকার; অ্যাডামের মৃত্যুর পর আর কোনো দিন এতটা দুঃখ পায়নি। দুঃখ নিয়ে নিজের ট্রাম্পেটটা ধূসর পানির ওপরে ছুড়ে ফেলল যেন সে নিজে ট্রাম্পেট বাজাতে ব্যর্থ হয়নি, ট্রাম্পেটটাই তাকে ব্যর্থ করে দিয়েছে। শিঙাটা খানিক ভাসতে দেখল পানির ওপরে। তারপর দুই হাতের তালুতে কপাল রেখে ঘাসের ওপর বসে পড়ল। তার চিন্তাভাবনা সব এখন কাঠখোট্টা, কঙ্কালের মতো মনে হচ্ছে। আগে তার কোনো দিনও মনে হয়নি, কুইন মারা যাবে, কিংবা মারা যেতে পারে। কুইনের পায়ের সেবাযত্ন করার সময়, তার নিঃশ্বাসের শব্দ শোনার বেশির ভাগ সময় সে নিজের আসন্ন অস্বস্তির কথাই ভেবেছে। তার জীবনটা কেমন ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল! যে খালাকে সে এত ভালোবাসত, সেবাযত্ন করেছে সে তো এখন মরে গেল, তার নিজের ভুলের কারণেই এমনটা হলো। এখনকার দিনে কেউ বেডস্প্রিং পোড়ায়? আরেক মহিলার আগমনে তার জীবনটা আরো শোচনীয় অবস্থায় পড়ে গেল। একদিন সে এই মহিলার সঙ্গ উপভোগ করেছে; সে আজ ব্যক্তিত্বের একটা দিক থেকে তিন দিকে বদলে গেছে : হুকুমদার, উপলব্ধিক্ষম এবং সাহসী। কী কারণে বুকার ভাবল, তার ট্রাম্পেট বাজানোর প্রতিভা আছে, সে দাফনের প্রতি যথাযথ ন্যায্যতা দেখাতে পারবে, স্মৃতি, উদ্‌যাপন কিংবা প্রিয় মানুষকে হারানোর ক্ষত ভরিয়ে দেওয়ার তরে তার ভাষা হবে তার সংগীত? জীবনের চলমান স্রোত আর ঢেউ থেকে তাকে কত দিন ধরে কত দূরে ছুড়ে ফেলেছে তার ছেলেবেলার বিভীষিকা? বুকারের চোখ জ্বালা করে ওঠে। কিন্তু কাঁদতে পারে না।

 মৃদু বাতাসে কুইনের দেহাবশেষ স্রোতের ভাটিতে আরো দূরে চলে গেছে। আকাশটা আগে লক্ষণ দেখিয়েছিল সূর্যালোকের কিন্তু এখন বড্ড গোমড়ামুখো হয়ে গেছে। রোদের বদলে বরং আর্দ্রতা ছড়াচ্ছে। অসহ্য একাকিত্ব আর গভীর আফসোস নিয়ে বুকার উঠে পড়ে, ব্রাইডের কাছে যায়, জাগুয়ারের ভেতর।

 গাড়ির ভেতরে নীরবতা আরো ঘন, নিষ্ঠুর। কারণটা হয়তো তাদের চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে না, কিংবা বলার মতো আর কোনো কথা নেই মুখে। তবে একটা কথা আছে, একটা কথা বলার আছে।

 মৃত্যুর মতো নীরবতা ভাঙার আগে ব্রাইড একটা লম্বা শ্বাস নেয়। সে ভাবে, হয় এখনই বলতে হবে, নইলে আর কখনো নয়।

 আমি গর্ভবতী, পরিষ্কার শান্ত কণ্ঠে ব্রাইড বলে। মানুষের বহু ব্যবহারে ক্ষয়ে যাওয়া কাঁচা মাটি আর সুরকির রাস্তার দিকে সোজা দৃষ্টিতে তাকায় সে।

 কী বললে? বুকারের গলা খনখনে।

 তুমি আমার কথা শুনতে পেয়েছ। আমি গর্ভবতী আর আমার পেটের সন্তানটা তোমার।

 স্রোতস্বিনীর দিকে তাকানোর আগে বুকার দীর্ঘক্ষণ ব্রাইডের দিকে তাকিয়ে থাকে। কুইনের দেহাবশেষ হালকাভাবে খানিকটা এখনো ভাসছে পানির ওপরে। তবে ট্রাম্পেটটা ডুবে গেছে। একজন আগুনে, আরেকটা পানিতে, তার ভালোবাসার দুটো উৎস চলে গেছে, ভাবল বুকার। তৃতীয়জনকে সে হারাতে চায় না। শুধু একটু হাসির ইঙ্গিত দিয়েই আবার ব্রাইডের দিকে তাকাল সে।

 না, শুধু আমার একার নয়, আমাদের দুজনের।

 তারপর বুকার ব্রাইডকে তার হাতখানা এগিয়ে দিল; এই হাতটাই ব্রাইড সারা জীবন প্রাণপণে চেয়ে এসেছে, এ হাত নিজের করে পাওয়ার জন্য মিথ্যা বলতে হবে না; এ হাত আস্থা আর ভালোবাসার হাত। কেউ কেউ যে অনুভূতিকে স্বাভাবিক ভালোবাসা বলে সেটা কয়েকটা গুণের সমন্বয়ে তৈরি। এ হাত সেই স্বাভাবিক ভালোবাসার হাত। বুকারের হাতে আদরে টোকা দিয়ে ব্রাইড তার আঙুলগুলো বুকারের আঙুলের সঙ্গে পেঁচিয়ে নিল। গাড়ির সিটের পেছনের হেডরেস্টের ওপরে মাথা রাখার আগে দুজন দুজনকে হালকা প্রশান্ত চুমু দিল। তাদের পিঠ গবাদি পশুর চামড়ার তৈরি সিটের গায়ে তলিয়ে গেল। উইনশিল্ডের ভেতর দিয়ে তাকিয়ে দুজনই নিশ্চিত ভবিষ্যৎ কেমন হবে কল্পনা করতে লাগল।

 কোনো একাকী বাচ্চা ছেলে কিংবা মেয়ে বড়শির ছিপ হাতে তাদের পাশ দিয়ে যেতে যেতে এই ধূসর রঙের গাড়ির ভেতর প্রাপ্তবয়স্ক এই দুজনের দিকে তাকাল না। তবে এমন কেউ যদি যেতই তাহলে সে ছেলে হোক আর মেয়ে হোক এই দম্পতির উচ্চারিত মিষ্টি হাসি দেখতে পারত : তাদের চোখ কতটা স্বপ্নাতুর। তবে সে বাচ্চাটা হয়তো মাথা ঘামাত না, এদের এই সুখের দীপ্তি কী কারণে।

 একটা সন্তান হবে। নতুন জীবন। সব রকম অশুভ আর সব রকম বালাই থেকে মুক্ত থাকবে, অপহরণ, নির্যাতন, ধর্ষণ, বর্ণবাদ, অপমান, আঘাত, আত্মঘৃণা, পরিত্যাগ—এগুলো থেকে সুরক্ষিত থাকবে। ভুলত্রুটিমুক্ত। সব ভালো গুণ থাকবে। কোনো ক্রোধ থাকবে না।

 তারা এমনই বিশ্বাস করে।

 

সুইটনেস

নগরীর বাইরে আরো সব বড় বড় ব্যয়বহুল নার্সিং হোম আছে। তবে আমি থাকি উইনস্টন হাউস নামের একটাতে। আমার এটাই ভালো লাগে। আয়তনে ছোট, খরচ কম, বাড়ির মতো পরিবেশ। চব্বিশ ঘণ্টা নার্সদের সেবাযত্ন। সপ্তাহে দুদিন ডাক্তার আসেন। আমার বয়স এখন তেষট্টি। এ রকম জায়গায় আসার পক্ষে বেশ অল্প বয়স। কিন্তু হাড়ের একটা রোগের আক্রমণে কাহিল হয়ে গিয়েছিলাম। সেবাযত্ন অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। শারীরিক দুর্বলতা কিংবা ব্যথার চেয়ে একঘেয়েমি আরো বেশি খারাপ। তবে এখানকার নার্সরা খুব ভালো। আমি যখন বললাম, আমি নানি হতে যাচ্ছি একজন নার্স আমার কপোলে চুমু দিয়ে দিল। মেয়েটার হাসি আর প্রশংসা অতি সম্মানের মুকুটের মতো মনে হলো। লুলা অ্যানের পাঠানো নীল কাগজের চিরকুটটা মেয়েটাকে দেখালাম। চিরকুটের নিচের অংশে লুলা অ্যান স্বাক্ষর করেছে ‘ব্রাইড’ বলে। ওই শব্দে মনোযোগ দিইনি। ওর কথাগুলো আমার কাছে কিছুটা ইন্দ্রিয়বিলাসী মনে হলো বলে। ‘এস, অনুমান করতে পারো, এই খবরটা দিতে কত আনন্দিত হয়েছি? শিগগিরই আমার বাচ্চা হতে যাচ্ছে। আমার খুব শিহরণ লাগছে। আশা করি তোমারও। ’ আমার শিহরণ শিশুটাকে নিয়ে, ওর বাবাকে নিয়ে নয়। কারণ লুলা অ্যান শিশুর বাবা সম্পর্কে কিছুই লেখেনি। আমার জানতে ইচ্ছা করে সেও ওর মতোই কালো নাকি! যদি তা-ই হয়, তাহলে আমাকে যতটা চিন্তায় পড়তে হয়েছিল লুলা অ্যানের তত চিন্তার কিছু নেই। আমার অল্প বয়সের সেই অভিজ্ঞতা থেকে এখন দিন খানিকটা বদলে গেছে। নীলচে কালো রঙের মানুষদের এখন টিভিতে, ফ্যাশন ম্যাগাজিনগুলোতে, বিজ্ঞাপনে—সবখানেই দেখা যায়। এমনকি সিনেমায়ও তারা অভিনয় করছে।

 খামের ওপরে ওর নিজের ঠিকানা নেই। সুতরাং বুঝতে পারি, আমি এখনো খারাপ মা-ই রয়ে গেছি। আমার মৃত্যুর দিন পর্যন্ত শাস্তি পেতে হবে আমাকে। কেননা প্রয়োজনের দিকে নজর দিয়ে, বাস্তবতার দিকে খেয়াল করেই আমি ওকে মানুষ করেছি। আমি জানি, ও আমাকে ঘৃণা করে। আমাদের সম্পর্ক কত নিচে নেমে গেছে : ও আমাকে টাকা পাঠায়। বলতেই হচ্ছে, এ জন্যও আমি ওর কাছে কৃতজ্ঞ। নইলে অতিরিক্ত খরচের জন্য ভিক্ষা করতে হতো। অন্য কয়েকজনকে সেটাই করতে দেখেছি। একাকী খেলার জন্য তাসের সেট চাইলেই আমি পেতে পারি। তার জন্য লাউঞ্জের পুরনো রংচটা সেট নিয়ে খেলতে হবে না আমাকে। মুখে ব্যবহারের জন্য বিশেষ ক্রিমও কিনতে পারি। কিন্তু নিজেকে অতটা বোকা বানানোর পক্ষে নই। আমি জানি, যেটুকু বিবেকবোধ ওর অবশিষ্ট আছে তার চেয়েও নিচের একটা কাজ হলো শুধু টাকা পাঠিয়ে দূরে চুপ করে থাকা।

 আমার কথা যদি বিরক্তিকর মনে হয়, অকৃতজ্ঞের মতো শোনায় তাহলে এর আংশিক কারণ হলো আমার অনুশোচনা—যেসব ছোটখাটো কাজকর্ম আমি করিনি, কিংবা ভুল করে করেছি সেগুলোর জন্য অনুশোচনা। প্রথম যখন ওর রজঃস্রাব হয়েছিল তখনকার কথা মনে আছে; ওর প্রতি আমার প্রতিক্রিয়াও মনে আছে। কিংবা হাঁটতে গিয়ে হোঁচট লাগলে, কোনো কিছু ফেলে দিয়ে চিৎকার করে উঠেছি। আরো একটা সত্যি কথা হলো, ওর জন্মের সময় ওর ত্বকের কথা ভেবে আমি হতাশবোধ করেছি, বিরক্তবোধ করেছি। খুব দ্রুত আমাকে সেসব স্মৃতি দূরে ঠেলে দিতে হবে। সে স্মৃতি জিইয়ে রেখে লাভ নেই। আমি জানি, ও রকম পরিস্থিতিতে ওর জন্য যেটা সবচেয়ে ভালো সেটাই করেছি। আমার স্বামী যখন আমাদের ছেড়ে চলে যায়, লুলা অ্যান আমার কাছে একটা বোঝা ছিল তখন। একটা বড় বোঝা। কিন্তু আমি সেই বোঝা ভালো করেই বহন করেছি।

 আমি ওর প্রতি কঠোর ছিলাম ঠিকই, তোমরা জোর গলায় বলতেই পারো। ওর বয়স বারো পেরিয়ে তেরোর দিকে যাওয়ার সময় আমাকে আরো কঠোর হতে হয়েছে। মুখে মুখে কথা বলত, আমার রান্না খেতে দিলে খেতে চাইত না, আমি চুল বেঁধে দিলে স্কুলে গিয়ে খুলে ফেলত। আমি চাইতাম না অন্যদের চোখে ওকে খারাপ দেখা যাক। লোকে কী কী নামে ডেকে ওকে খ্যাপাতে পারে সেসব সম্পর্কেও ওকে সতর্ক করে দিতাম। আমার কোনো কোনো সতর্কতা হয়তো ওর মনে বেশি দাগ কেটেছে। দ্যাখো, কেমন বদলে গেছে। ক্যারিয়ার নিয়ে কত সফল, সচ্ছল! ওকে কি আর ছোট করে দেখার সুযোগ আছে?

 এখন ওর পেটে বাচ্চা। চমৎকার অর্জন লুলা অ্যান। যদি মনে করে থাকো, মাতৃত্ব মানে মধুর স্বরে কথা বলা, মাতৃত্ব মানে প্রাপ্ত কোনো মূল্যবান দ্রব্য, কিংবা ডায়াপার ইত্যাদি, তাহলে তোমার মানসিক ঝাঁকি খাওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। বড় ধরনের ঝাঁকি। কল্পনা করে দ্যাখো তোমার বেনামি ছেলেবন্ধু, কিংবা স্বামীর কথা! আই লাভ ইউ, মাই বেইবি!

আমার কথা শোনো। মা হলে কেমন লাগে এখন বুঝতে যাচ্ছ—জগৎ-সংসার কেমন, কেমন করে চলে এ জগৎ, মা হওয়ার পরে জগত্টা কেমন করে বদলে যায়—সব দেখতে পাবে।

সব সৌভাগ্য তোমার জন্য! ঈশ্বর তোমার সন্তানের মঙ্গল করুন।

টনি মরিসন

আমেরিকার কথাসাহিত্যে কালজয়ী উপন্যাস রচয়িতার নাম উল্লেখ করতে গেলে সবার আগে মনে আসে উইলিয়াম ফকনার ও টনি মরিসনের নাম। টনি মরিসনের জন্ম ১৯৩১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকার ওহাইওতে। প্রথম উপন্যাস ‘দ্য ব্লুয়েস্ট আই’; প্রকাশ করেন ১৯৭০ সালে। তাঁর আরো উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘সুলা’ (১৯৭৩), ‘সং অব সলোমন’ (১৯৭৭), ‘টার বেবি’ (১৯৮১), ‘বিলাভিড’ (১৯৮৭), ‘জ্যাজ’ (১৯৯২), ‘প্যারাডাইস’ (১৯৯৭), ‘লাভ’ (২০০৩), ‘আ মার্সি’ (২০০৮), ‘হোম’ (২০১২) ও ‘গড হেল্প দ্য চাইল্ড’ (২০১৫)। এগুলো ছাড়াও রয়েছে নাটক, প্রবন্ধ ও শিশুতোষ রচনা। ন্যাশনাল বুক ক্রিটিকস সার্কেল অ্যাওয়ার্ড, পুলিত্জার পুরস্কারসহ আরো প্রায় ৪০টি পুরস্কার লাভ করেন তাঁর সাহিত্যের স্বীকৃতি হিসেবে। ১৯৯৩ সালে লাভ করেন নোবেল পুরস্কার।


মন্তব্য