kalerkantho


খে লা

স্মৃতির সিন্দুক

নোমান মোহাম্মদ

২৫ জুন, ২০১৭ ০০:০০



স্মৃতির সিন্দুক

কী আশ্চর্য বৈপরীত্য! কী অবাক উল্টোরথে যাত্রা! ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এক মানচিত্র, লাল-সবুজের একই পতাকা—কিন্তু সেখানে দুটি খেলায় কেমন পালাবদল হয়ে গেল! এখন ক্রিকেটের আনন্দ-ক্যারাভানে চেপে ছোটে ১৬ কোটি খেলাপাগল। ফুটবলের বিষণ্ন-ভেলায় ভেসে যায় সবাই।

অথচ সিকি শতাব্দী আগেই তো ক্যানভাসের জলছবিটা ছিল একেবারে ভিন্ন!

ফুটবল তখন বাঙালির হাসি-আনন্দের উপলক্ষ; বিনোদনের তুফান। আবাহনী-মোহামেডানে তখন দেশ দ্বিখণ্ডিত। নাহ্, ওই সময়ও তো বিশ্বকাপ জেতেনি বাংলাদেশ। সাফ অঞ্চলের শ্রেষ্ঠত্বের নিশান পর্যন্ত পারেনি ওড়াতে। ফুটবলের কাছে ওই দাবিটা জোরালো ছিল সত্যি; তবে তা না হলেও ক্লাব ফুটবলে বুঁদ হয়ে থাকার জোয়ারে ভাটা পড়েনি। আর ক্রিকেট? হালফিলে হকি কিংবা শ্যুটিং অথবা গলফের যে অবস্থা—এর চেয়ে খুব ভালো অবস্থানে ছিল না সেটি।

নিষ্ঠুর সময় বাঙালির সেই ফুটবল বিনোদন কেড়ে নিয়েছে। মোহামেডান-আবাহনীর সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঝাঁজ মিলিয়ে গেছে বাংলার আকাশে। সেখানে এখন ক্রিকেট রংধনু।

আমরা এখন ক্রিকেটে ভাসি, ক্রিকেটে কাঁদি-হাসি। ফুটবলটা রয়ে গেছে শুধু পুরনো দিনের ক্রীড়াপ্রেমীদের নিউরনে; তাদের নস্টালজিক আড্ডায়। আর ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে নামতে নামতে ১৯৩ নম্বরে নেমে যাওয়াটা যেন ফুটবলের কফিনে ঠুকে দিয়েছে শেষ পেরেক।

আমাদের ভরসা তাই ক্রিকেট। আর সেই ভরসার কী অবিশ্বাস্য প্রতিদানই না দিয়ে চলেছেন মাশরাফি-মুশফিক-সাকিব-তামিমরা! ম্যাচের পর ম্যাচ। সিরিজের পর সিরিজ। টুর্নামেন্টের পর টুর্নামেন্ট। ফুটবল-র‌্যাঙ্কিংয়ে ১৯৩ নম্বর দেশটি ক্রিকেট র‌্যাঙ্কিংয়ে উঠে আসে ৬ নম্বরে। ওয়ানডে বিশ্বকাপে উঠে যায় কোয়ার্টার ফাইনালে। চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে সেমিফাইনালে। সবুজ এই গ্রহে বাংলাদেশের ইতিবাচক পরিচিতির বড় এক সিলমোহর তাই হয়ে ওঠে ক্রিকেট।

সময় বদলায়। সেই বদলের হাওয়ায় দর্শকদের রুচির পরিবর্তন হয়। কিন্তু দেশের জনপ্রিয়তম খেলা এমনভাবে বদলে যায়? সিকি শতাব্দীতে বাংলাদেশের ফুটবল-ক্রিকেটের জনপ্রিয়তার যে অদল-বদল, তা রীতিমতো গবেষণার দাবি রাখে। আনন্দ-বেদনার এমন বৈপরীত্যের ছবি পৃথিবীর আর কোনো ভূখণ্ডে রয়েছে কি না সন্দেহ।

ক্রিকেটের উত্থান শুরু ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ভেতর দিয়ে। ১৯৯৯ সালে বিশ্বকাপে খেলার মাধ্যমে। ২০০০ সালে টেস্ট পরিবারের সদস্য হওয়া দিয়ে। তবে সত্যি বলতে কি, সত্যিকার অর্থে বিশ্বক্রিকেটে সমীহ জাগানিয়া শক্তি হয়ে ওঠা গেল দুই বছরে। যার ধারাবাহিকতায় এবার চ্যাম্পিয়নস ট্রফির মতো অভিজাতদের টুর্নামেন্টে সেমিফাইনালে উঠে যায় বাংলাদেশ। এ দেশের ক্রিকেট বাঁকবদলের আরেক স্মারক হয়ে থাকবে তা নিঃসন্দেহে।

ছিটেফোঁটা সাফল্য আগে যে পায়নি লাল-সবুজের ক্রিকেট সেনারা, তা নয়। বিশ্বকাপ আবির্ভাবেই যেমন হারায় পাকিস্তানকে। ২০০৭ আসরে ভারতকে বিদায় করে, দক্ষিণ আফ্রিকা জয় করে প্রবলভাবে জানান দেয় নিজেদের অস্তিত্ব। তবে ওসব আবার হাওয়ায় মিলিয়ে যেতেও সময় লাগেনি। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ঘরের মাঠের ‘বাংলাওয়াশ’ কিংবা এশিয়া কাপের ফাইনালে ওঠার স্মৃতিও বিবর্ণ হয় দ্রুত। উন্নতির গ্রাফটি যে ধারাবাহিক ছিল না মোটেও! সর্বশেষ বছরদুয়েক ধরে রয়েছে যেমনটা। টগবগে আরবি ঘোড়ার মতো ছুটছে তাই বাংলাদেশ ক্রিকেট।

সেই ছোটার শুরু বিশ্বমঞ্চে। ২০১৫ ওয়ানডে বিশ্বকাপে। আফগানিস্তান-আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে প্রত্যাশিত দুটি জয়ের সঙ্গে ইংল্যান্ড-বধ, তাতেই কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে যায় বাংলাদেশ। চার বছর আগে নিজ দেশের বিশ্বকাপেও কিন্তু জয়-পরাজয়ের পরিসংখ্যানটা প্রায় একই। সেবারও ইংল্যান্ডকে হারানোর পাশাপাশি আয়ারল্যান্ড-নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে প্রত্যাশিত জয়। কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজ-দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৫৮ ও ৭৮ রানে অলআউট হওয়ার কুকীর্তিতে ঢাকা পড়ে যায় সে কীর্তি। আর খেলাও নিজ দেশের চেনা মঞ্চে বলে ওই অর্জনকে অত বড় করে দেখেনি বিশ্বমিডিয়া। ২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের কঠিন কন্ডিশনে তিন জয়ে হয়েছে যেটা। এর চেয়েও বড় ব্যাপার হলো, প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উত্তরণ। আলাদা গুরুত্ব তো সেটি বহন করবেই!

এরপর থেকেই বাংলাদেশ ক্রিকেট সাফল্য-ক্যারাভানের যাত্রী। বিচ্ছিন্ন কিছু হোঁচট খাওয়া রয়েছে সত্যি; কিন্তু মোটা দাগে কক্ষপথেই ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট। সিরিজ জেতে পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারতের মতো পরাশক্তিত্রয়ীর বিপক্ষে। দেশের মাটিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ও দেশের বাইরে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট জয় অর্জনের মুকুটে যোগ করে নতুন পালক। তবু যে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমিফাইনালে উঠে যাবে এবার বাংলাদেশ, এতটা কেউ ভাবতে পারেননি।

কারণটা সেই ২০১৫ বিশ্বকাপের মতোই। সেবার যেমন অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের কঠিন কন্ডিশনে খেলা হয়েছে, এবার তা কঠিনতর ইংল্যান্ডে। পৃথিবীর সব ক্রিকেটখেলুড়ে দেশের জন্যই ইংল্যান্ডের কন্ডিশন ভীষণ প্রতিকূল। উপমহাদেশের দলগুলোর জন্য তা সবচেয়ে দুর্বোধ্য। ওখানে খেলা তুলনামূলক সহজ যাদের জন্য সেই অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ছিল বাংলাদেশের গ্রুপসঙ্গী; সঙ্গে স্বাগতিকরা। উপমহাদেশের অন্য তিনটি দল ভারত-পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কা অন্য গ্রুপে। চ্যাম্পিয়নস ট্রফির মঞ্চ ও সেখানে গ্রুপের বাকি তিন দলের নাম জানার পর থেকেই আসলে বাংলাদেশের প্রত্যাশার বেলুনটা যায় চুপসে।

তখন সান্ত্বনা হয়ে ছিল চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে অংশগ্রহণ। এখানে খেলার ছাড়পত্র পাওয়া তো বিশ্বকাপের চেয়েও কঠিন। র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ আটটি দল পাবে সেই সোনার হরিণ। আইসিসি পূর্ণ সদস্য ১০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ের বাদ পড়াই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু সবাইকে চমকে সেরা আটে নিজেদের জায়গা করে নেয় মাশরাফির দল। সেটিও দুবারের ওয়ানডে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হটিয়ে। তাতে বাংলাদেশের দিকে বাঁকা চোখে তাকানোর লোকেরও অভাব ছিল না।

তা হয়তো আরো তাতিয়ে থাকবে চন্দিকা হাতুরাসিংহের দলকে। আর আইসিসির এমন বৈশ্বিক ইভেন্টে ভালো করলে যে আলাদা খাতির পাওয়া যায়, তা-ও জানা ছিল বাংলাদেশের। সব মিলে তাই আবারও ঝলসে ওঠে দল। চোখ ধাঁধিয়ে দেয় বিশ্বের। প্রথমবারের মতো সেমিফাইনালে উঠে নিজেদের সামর্থ্যের জানান দেয় আরো একবার। তাতে বেড়ে যায় ভবিষ্যতের জন্য স্বপ্নের পরিধিটাও।

বাংলাদেশের এই কীর্তি ইতিহাসের পাতায় অক্ষয় কালিতে লেখা হয়ে থাকবে চিরকাল। বিশেষত যেভাবে তারা নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে জয় পেল। ২৬৬ রান তাড়া করতে নেমে ৩৩ রানে চার উইকেট পড়ে যায় বাংলাদেশের। সম্ভাবনার মশালটাও তাতেই আলো হারিয়ে, তেজ হারিয়ে রূপান্তরিত প্রদীপে। ওই অবস্থায় ব্যাট হাতে ২২ গজের মলাটে অনবদ্য কবিতা যেন লিখলেন সাকিব ও মাহমুদ উল্লাহ। অসাধারণ দুটি সেঞ্চুরিতে লিখলেন বাংলাদেশের ক্রিকেট অভিধানের নতুন অধ্যায়। সে অধ্যায় প্রতিরোধের। বীরত্বের। ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়ানো প্রত্যয়ের।

আগেও বাংলাদেশ ম্যাচ জিতেছে। এমনভাবে জেতেনি কখনো। জিততে জিততে হেরেছে কত ম্যাচ! হারতে হারতে জেতেনি তেমন একটা। অন্তত এভাবে তো নয়ই! তাতে যেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের উত্তরণ হয় আরো এক ধাপ। যেন সাবালকত্বে পদার্পণ। এবার তারুণ্যের দর্পে বিশ্বের অন্যসব দেশগুলোর দর্পচূর্ণ করে এগিয়ে যাওয়ার অপেক্ষা শুধু।

হ্যাঁ, ক্রিকেট এই মানচিত্রকে অনেক দিয়েছে। অনেক কিছু দিচ্ছে। সামনে আরো অনেক দেবে হয়তো। কে জানে, র‌্যাঙ্কিংয়ের ছয় নম্বর থেকে এক নম্বরে উঠে যাবে একদিন! হয়তো জিতবে বিশ্বকাপও। স্মৃতির সিন্দুকে জমা হতে থাকবে অনেক অমূল্য রত্ন। তাতে করে জমা দীর্ঘশ্বাসটা জমাট হবে আরো।

ইস্, কী হতো যদি ফুটবলটা আগের মতো রমরমা থাকত! ক্রিকেটের সঙ্গে এর কোনো বিরোধ তো নেই। কেননা ফুটবলের বাংলাদেশের বিশ্বকাপ জিততে হবে, নিদেনপক্ষে বিশ্বকাপ খেলতে হবে—এমন দিব্যি দেয়নি কেউ। শুধু যদি ক্লাব ফুটবলের সেই উন্মাদনা থাকত! তাহলেই ক্রীড়ামনস্ক জাতি হিসেবে আমাদের বিকাশ হতো আরো বেশি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পুরো দেশের সমর্থনে একাট্টা সবাই, আবার ক্লাব ফুটবলে নিজ নিজ দল নিয়ে স্পষ্ট ভাগাভাগি, রেষারেষি। খেলা নামক অপার্থিব যে ব্যাপার রয়েছে পৃথিবীতে—ক্রিকেটে নিজ দেশের সমস্বর সমর্থনে ও ফুটবলে নিজ নিজ ক্লাব নিয়ে তর্ক-বিতর্কে এর পুরো নির্যাসটুকু উপভোগ করতে পারতাম আমরা।

কিন্তু তা তো আর হওয়ার নয়। আমাদের স্মৃতির সিন্দুকে তাই পড়ে থাকে ফুটবলের মণি-মাণিক্য। আর ক্রিকেটের নতুন নতুন হীরা-জহরত যোগ হতে থাকে থরে থরে। কিন্তু দুয়ের সমন্বিত চোখ ধাঁধানো রূপটা আমাদের আর দেখা হলো না। কোনো দিন কি হবে?


মন্তব্য