kalerkantho


গ ল্প

মরু-পাহাড়ের এক বিমূর্ত চাষি

মঞ্জু সরকার

২৫ জুন, ২০১৭ ০০:০০



মরু-পাহাড়ের এক বিমূর্ত চাষি

স্কুল পড়া ছাইড়া দিলে বাপে গরু চরানো আর জমি চাষের কাম দিছিল। গিরস্তের পোলা, লাঙলের মুঠি ধইরা চাষবাসের কাম হিকছিলাম নাবালক বয়সেই।

আর এহন দেহেন, বুড্ডাকালে সৌদি আরবের মরুভূমি আর পাহাড়ের মাটিতেও কী রকম সবজিটা ফলাইতাছি!

আবহা শহরের মাঝখানে রাজা মিয়ার সবজিক্ষেতে, কিংবা মহল্লায় মসজিদের গেটের কাছে ফুটপাতের ছোট্ট দোকানে যারা সবজি কিনতে আসে, বিশেষ করে চেনা-অচেনা বাঙালি খদ্দের, তাদের কাছে নিজের কৃষকজীবনের সাফাই গাইতে টাটকা সবজিগুলোই যথেষ্ট। পাঁচ থেকে আট রিয়ালে একটা ফুলকপি কি বাঁধাকপি। কীটদংশনের তিলমাত্র চিহ্ন নেই। আরো আছে টকটকে গাঁজর, টমেটো ও মরিচ। এমনকি দুই রিয়ালে মেলে লালশাক ও ধনেপাতার আঁটিও। নিজ হাতে ফলানো এসব সবজির সঙ্গে হাড়ভাঙা শ্রম নয় শুধু, অনেক মজার ও মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা জড়িয়ে আছে। দেশি মানুষকে আগ্রহী শ্রোতা পেলে রাজা মিয়া আত্মকথনে মাতে। মন খুলে কথা বলতে পারার মাসুল দিতে শ্রোতাকে কম দামেই সবজি বেচে, মাগনাও দেয় কাউকে, এমনকি পকেটের টাকা খরচ করে চা-সিগারেট খাওয়াতেও দ্বিধা করে না।

বিদেশ খাটতে আসা বাংলাদেশির অভাব নেই আবহা শহরেও।

কিন্তু বেশির ভাগেরই ছোট মনে বড় বেশি হিংসা। রাজা মিয়ার গল্প না শুনে কিংবা আসল পরিচয় না জেনেই তার সম্পর্কে মেলা গল্প বানিয়েছে তারা; যেমন—সৌদিতে সবজি চাষ করেই রাজা বাড়িতে বিল্ডিং তুলেছে। সম্পত্তি কিনেছে মেলা। বড় ছেলেকেও সৌদি এনেছে। মেয়েকে বিয়ে দিতে প্রবাসী জামাই ধরেছে সৌদিতে বসেই। এত কিছুর পরও চুল-দাড়ি যখন সবটাই সাদা, তখনো টাকা কামানোর নেশা বিন্দুমাত্র কমেনি সবজিরাজার। টাকার জন্য মরুভূমি কি পাহাড়ের গর্তে নয় শুধু, গুয়ের মধ্যেও সবজি চাষ করতে আপত্তি করবে না সে।

চাষাড়ির মতো তুচ্ছ কামের সঙ্গে সম্পর্কিত না রাখতেই নিজের নামের সঙ্গে মিয়া যুক্ত করে পাসপোর্টেও হয়েছিল মোহাম্মদ রাজা মিয়া। কিন্তু আবহার দেশি ভাইরা তাকে ডাকে সবজিরাজা। সম্মান দেখাতে নয়, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে বদনামি গাইতেই যে এই নাম, তা নিয়ে সন্দেহ নেই তার। খোদ সৌদি ও অন্যান্য দেশীয় খদ্দের তাকে হিংসা না করুক, খুদে সবজিচাষি কিংবা সবজিহকার ভাবে নিশ্চয়ই। কিন্তু নিজের কাছে রাজা মিয়ার আত্মপরিচয় তো বটেই, গোটা অস্তিত্বই যেন নড়বড়ে। যেকোনো মুহূর্তে ‘নাই’ হয়ে যাওয়ার ভয় জাগে মনে। বয়স বাড়ছে বলেই কি আজকাল বড্ড একা আর অসহায় লাগে নিজেকে?

পাহাড়ি ঢালে ভয়াবহ এক নির্জন খাদের ওপর নিজের সবজিক্ষেতে সারা দিন প্রায় একাই থাকে রাজা মিয়া। রাতে মেসবাড়ির ছোট্ট ঘরেও একা কাটে। দেশি চ্যানেলে বিশিষ্ট শিক্ষিত মানুষের কথাবার্তা শুনে সময় কাটানোর জন্য টিভি নাই, সময়ও পায় না। নির্জন ক্ষেত ও ঘরের তুলনায় মসজিদে এলেই বরং সময়টা ভালো কাটে তার। মেইন রোডের কাছেই মসজিদটা মহল্লার মধ্যে সবচেয়ে বড় মসজিদ। শুক্রবার জুমার জামাতে মসজিদের সামনের প্রশস্ত রাস্তার দুই পাশের পার্কিং গাড়িতে ভরে যায়। রাজা মিয়ার সৌভাগ্য, মসজিদের সৌদি ইমাম তার বর্তমান কফিলের বোনজামাই। ইমাম হুজুরই মসজিদের সৌদি খাদেমকে বলে মাসিক পাঁচ শ রিয়ালে সপ্তাহে দুই দিন মসজিদ ধোয়ামোছার কাজ দিয়েছে। রাজা মিয়ার আরো সৌভাগ্য, ক্ষেতে যেমন, তেমনি এই মসজিদেও হিংসুটে কোনো দেশি সহকর্মী নেই। একটি মিসরি ছেলে মসজিদ ক্লিনারের কাজ করে। সে রাজা মিয়াকে ইবনু তথা চাচা ডাকে, সময় পেলে রাজার সবজি-বাণিজ্যেও সাহায্যের হাত বাড়ায়।

নামাজের সময় এ দেশে সব দোকানপাট বন্ধ রাখাটা বাধ্যতামূলক। শুক্রবার যেহেতু ছুটির দিন এবং জুমার জামাতে সব মসজিদেই উপচে পড়ে ভিড়, নামাজ শেষে মুসল্লিদের কাছে ফলমূল ও প্রয়োজনীয় সওদাপাতি বেচতে মসজিদের গেটে বেশ কিছু হকার তাদের পসরা নিয়ে বসে। এক-আধঘণ্টার কেনাবেচায় শরিক হতে সবজিরাজাও তার ক্ষেতের টাটকা সবজি আনে। মিসরি নাসেরই এদিন তার প্রধান সেলসম্যানের ভূমিকা নেয়। অবশ্য মাগনা নয়, এ জন্য এক ঘণ্টার কাজে নাসেরকে দশ-বিশ রিয়াল দেয় রাজা মিয়া। কিন্তু এভাবে, সপ্তাহে এক-আধঘণ্টার বেচাবিক্রিতে ক্ষেতভরা সবজির সদ্গতি হয় সামান্যই। নাসেরের পরামর্শেই রাজা তাই রোজ আসরের নামাজের পর মসজিদের গেটের কাছে দোকান সাজায়। রাস্তায় দোকান দিয়ে হকারি করা বেআইনি কাজ, জানে সে। কিন্তু যে দেশে দুই যুগ ধরে আছে রাজা মিয়া, হাড়ভাঙা শ্রম দিয়ে যে পাহাড়ি মাটিতেও এমন সবজি ফলাতে পারে, তার চেয়েও বড় যুক্তি, যে মসজিদের সে খেদমতগার এবং নিয়মিত নামাজি, সেই মসজিদের বাউন্ডারি দেয়াল ঘেঁষে, রাস্তার ঘুপচিতে টাটকা সবজি বেচার এইটুকু অধিকার কি তার থাকতে পারে না? ভয়ে অল্প পরিমাণে সবজি নিয়ে আসে সে। সৌদিরা দেখেও কেউ আপত্তি করেনি। আসর, মাগরিব ও এশার জামাতের নামাজিরা মসজিদ থেকে ফেরার সময় কেউ কেউ কপি-টমেটো কিনে নিয়ে যায়। মহল্লার স্থায়ী সৌদি বাসিন্দা ছাড়াও মিসরি, পাকিস্তানি, ইন্ডিয়ান, ইয়েমেনি, আফ্রিকান—অনেকেই এখন তার মুখচেনা নিয়মিত কাস্টমার। ভয় ও ভাষার দেয়াল টপকে ভিনদেশি বিভাষীদের সঙ্গেও সম্পর্কটা ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছে ক্রমে।

শৈশবে গ্রামের মক্তবে আরবিতে কিছু কলেমা-কালাম ও সালাম দেওয়াটা শিখেছিল। কিন্তু দুই যুগ আরবদেশে থেকেও আরবি জবান তেমন হেফজ হয়নি এখনো। এর প্রধান কারণ, আবহা শহরে আসার আগে যেখানে কাজ করেছে, সেখানে বাঙালি সহকর্মীদের সঙ্গে ছিল অনেকটা বাঁধা জীবন। কফিল বা খোদ সৌদিদের সঙ্গে মেলামেশার তেমন সুযোগ ছিল না। কিন্তু কফিল বদলে এই শহরে আসার পর নতুন সম্ভাবনা ও সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে জীবনে। আরবি ভাষাটা শিখতে মিসরি নাসেরটা বেশ কাজে আসে। এখন সবজিরাজা নিজের ফলানো প্রতিটি সবজির আরবি নাম তো জানেই, সৌদিরাজের ছবিযুক্ত ছোট-বড় নোটগুলোকে নির্ভুল আরবি নাম ধরেই হাঁকডাক করে। তার ওপর ভিনদেশিদের সঙ্গে কথাবার্তা চালাতে নিজের মাতৃভাষার সঙ্গে ইশারাভাষাও প্রয়োগ করে অনেক সময়। সেদিন এক কালো সুদানি লালশাক দেখে জানতে চেয়েছিল, জিনিসটা কী? শাকের গুণাগুণ বোঝাতে জেয়াদা ভিটামিন বলে তার সহজপাচ্যতা বোঝাতে কোষ্ঠ পরিষ্কারের সহজ ভঙ্গি করে বলেছিল, এক কোতনেই সব সাফা হইবো হুজুর, লইয়া যান। সুদানিটা কী বুঝেছে কে জানে, আলহামদু লিল্লাহ বলে শাকও কিনেছে। রাজা মিয়ার ভালো লাগে মানুষের সঙ্গে এই সরস ও সহানুভূতিমূলক একাত্মতা।

এক বিকেলে আপাদমস্তক কালো পোশাকে ঢাকা সৌদি খদ্দের দোকানের সামনে এসে দাঁড়ায়। তাকে দেখে চমকে ওঠার বড় কারণ, বোরকাবৃত মানুষটি নিঃসন্দেহে নারী। এ দেশে আসার পর রাজা মিয়া কোনো নারীর মুখোমুখি দাঁড়ায়নি কখনো। রাস্তায় কি গাড়িতে অনেক সময় দেখা হয়, গাড়িতে করে বড় বড় শপিং মলে কেনাকাটা করতে যায় তারা। মহল্লার বড় বাকালাতেও যায় হয়তো, কিন্তু রাজা মিয়ার ফুটপাতের সবজি দোকানেও এসে দাঁড়াবে কেউ, ভাবতে পারেনি সে। হয়তো এ মহল্লারই কোনো সৌদি বাড়ির বাসিন্দা ফুলকপি কি টমেটো কিনতে চায়। হিজাবের আড়াল থেকে কৌতূহলী চোখজোড়া দোকানের সবজি খুঁটিয়ে দেখে। ফরসা হাতের আঙুল কপির দিকে রেখে সে দামও জানতে চায়। রাজা মিয়া দাম বলে। অদূরে পাহাড়ের ঢালে সে নিজেই যে এই সব আবাদ করেছে, বেচার জন্য আজই ক্ষেত থেকে তুলে এনেছে, ভাঙা ভাঙা কথায় খদ্দেরকে বলে এসব। মহিলা ঘাড় ঘুরিয়ে রাস্তার উঁচু বাড়িটার দিকে তাকিয়ে তার ক্ষেতের ঠিকানাই জানতে চায় কি না, ঠিক বুঝতে পারে না রাজা। আঠারো রিয়ালের সবজি কিনে সে এক শ রিয়ালের নোট এগিয়ে দেয়। দাম রেখে চেঞ্জটা তার ঘড়িবাঁধা ফরসা হাতে ফেরত দিলে সত্তর টাকা রেখে দু-এক টাকার নোটগুলো নেওয়ার প্রয়োজন নেই বুঝিয়ে রাজা মিয়াকে যেন বকশিশ দেয়। সবজির প্যাকেট নিয়ে অদূরে দাঁড়ানো গাড়িতে গিয়ে ওঠে। হুকুম দিলে তো গাড়ির পুরুষ চালক এসেও সবজি কিনতে পারত। তার বদলে নিজেই এসে কথাবার্তা বলে সবজি কিনল কেন? রাজা মিয়া অনুমান করে, হয়তো এ মহল্লারই কোনো চারতলা বাড়ির বাসিন্দা। বাড়ির ছোট জানালা দিয়ে রাজা মিয়া তার সবুজ ক্ষেতও দেখতে পায় হয়তো বা। এরপর টাটকা সবজি কিনতে সে একদিন ক্ষেতেও যাওয়ার কথা বলে গেল কি না, রাজা মিয়া ঠিক বুঝতে পারেনি। তবে মহিলা খদ্দেরকে আবারও দেখতে পাওয়ার আশাটা মনকে প্রফুল্ল করে।

এশার নামাজ পড়ে সবজির দোকান গুটিয়ে ঘরে ফেরে রাজা মিয়া। ইচ্ছা করলে সবজির ডালা রাস্তায় কি মসজিদের চত্বরে ফেলে রেখেও যেতে পারে। চুরি হওয়ার ভয় নেই। কিন্তু ভোরবেলা রাস্তা পরিষ্কারের বলদিয়ারা সবজির ডালা ময়লার গাড়িতে তুলে দেবে অবশ্যই। এ কারণে অবিক্রীত সবজির বোঝা কাঁধে নিয়ে ঘরে কি ক্ষেতে যায় সে। থাকার ঘর, কর্মস্থল সবজিক্ষেত এবং মসজিদের দোকান—সব দশ-পনেরো মিনিট হাঁটা দূরত্বে। এই তিনটি বিন্দু ঘিরে পাঁচ বছর ধরে আবর্তিত সবজিরাজার প্রবাসজীবন, প্রতিদিন প্রায় একই রকম। মাঝে মাঝে বোরকাওয়ালির সঙ্গে ব্যতিক্রম কিছু ঘটে বলেই এই গল্প।

 

দুই.

সময় কাটানোর জন্য পাহাড়ের খাদে রাজা মিয়ার সবজিক্ষেতটি ভয়াবহ রকম নির্জন। প্রাকৃতিক চাপে বদ্ধ পায়খানায় যেমন একা হতে হয়, তেমনি রোজ সকালে রাজা মিয়াকে পাহাড়ের ঢালে একা হতে হয়। সবজিক্ষেতটা ছোট হলেও বদ্ধ নয়, বরং অসম্ভব রকম খোলা। একদিকে চোখ ওপরে তুলে তাকালে পাহাড়চূড়ায় কফিলের চারতলা বাড়িসহ মহল্লার বেশ কয়েকটি বিল্ডিং দেখা যায়। ঢালের ওপরে পাকা রাস্তাটি। আরেক দিকে দূরে পাহাড়ের ওপর থেকে ঢালু রাস্তায় নামতে থাকা গাড়ির স্রোতকে মনে হয় পিঁপড়ার সারি। পাহাড়ের গায়ে গড়ে ওঠা নানা রকম স্থাপনার মাঝখানে বিশাল এক শূন্য প্রান্তর। রাজা মিয়ার দেশের প্রান্তর যেমন সবুজ ও সমতল, সে রকম নয় মোটেও। চোখ নিচের দিকে নামালে মনে হয়, পাহাড়ি খাদ দীর্ঘ বিলের মতো চলে গেছে বহুদূর। কিন্তু খাদে পানির বদলে পাথর, মাঝেমধ্যে উটের খাওয়ার উপযোগী কাঁটাযুক্ত কিছু গাছ। একদা বুনো উট ও বানররা চলাফেরা করত এসব নির্জন পাহাড়ি স্থানে। কিন্তু শহর গড়ে ওঠার পর থেকে ওরা নির্জন দুর্গম পাহাড়ে পাড়ি জমিয়েছে। এই রুক্ষ ধূসর প্রান্তরে রাজা মিয়ার ক্ষেতটুকুই ব্যতিক্রমী সবুজ ও সপ্রাণ। এখানে একমাত্র প্রাণীও রাজা মিয়া। জরুরি সবজির দরকার হলে, কম দামে কি টাটকা পাওয়ার লোভেও হতে পারে, মাঝেমধ্যে ঢাল বেয়ে সবজিরাজার ক্ষেতেও নেমে আসে পরিচিত দু-একটি দেশি মুখ। কাছেপিঠে রাস্তায় ডিউটি থাকলে ক্লিনার করিমও ক্ষেতে আসে এবং খুশিতে চেঁচায়—ও সবজিভাই, তোমার ক্ষেতে আইলে মনে হয় দেশে আইলাম। কথাটা সে একেবারে মিথ্যা বলে না বোধ হয়। নইলে ক্ষেতে কাজ করার সময়ও রাজা মিয়ার শরীরে দেশের বাতাস লাগে কেন? কাজের সময়ও দেশের সঙ্গে সংযোগ প্রত্যাশায় মোবাইল ফোনটাও রাখে বুকপকেটে। তারপর ক্লিনার করিমের মতো শ্রোতা পেলে নিজের গল্প শোনায়।

এই ক্ষেতের চাইতেও চাইর গুণ বড় আছিল একখান ক্ষেত। আমাগো বাড়ির লগেই। মাটি মাক্ষনের মতো। ভিটার এই জমিতেই বাগুন আর মরিচের চারা লাগায় চাষাড়িজীবন শুরু করছিলাম আমি। সৌদির পাহাড়ে বইসা কাম করতে গিয়া হেই ক্ষেতের কত হিস্টোরি মনে পড়ে রে! বাবা মরার পর তার সম্পত্তি ছয় ওয়ারিশের মধ্যে ভাগ হইলো। ভাগ হইলো ভিটার সবজিক্ষেতও। অল্প জমিতে চাষাড়ি কইরা সংসার চলে না আমার। কী করি, এক দালালরে পাঁচ হাজার টাকা ঘুষ দিয়া ঢাকার ডেমরায় জুটমিলে চাকরি লইলাম। জুটমিল বন্ধ হইলো, চাকরিটাও গেল গিয়া। হেই সময় আদম ব্যাপারীর রমরমা ব্যবসা শুরু হইছে দেশে। টাকা কামাইতে বানের পানির মতো মানুষ দেশ-বিদেশ ছুইটা যায়। আমিও লাইন পাইলাম একটা। নিজের ভাগের এক পাখি জমি বেইচা আইলাম নবীজির দেশে। দুই পোলা-মাইয়া লইয়া বউ দেশে ঘর-গিরস্তি সামাল দেয়, আর আমি লেবার খাইটা দেশে মাস মাস টাকা পাঠাই। স্বামীরে কাছে পায় নাই বউ, তার পাঠানো টাকারে বড় মহব্বত কইরা ধইরা রাখছে। বন্ধকি জমি খুলছে, ঘর পাকা করছে, পোলাপান তিনটারেও মানুষ করছে। অশান্তি বাধাইল ভিটার সবজিক্ষেতখান। ছোট ভাই তার অংশ বেইচা দেওয়ার কথা কইয়া টাকা চাইলো, দিলাম। আট কিস্তিতে দেড় লাখ দিলাম তারে। বোইনের পোলা ভাইগনাও তার অংশ ছাইড়া দেওয়ার জন্য নিল পঞ্চাশ হাজার। কিন্তু টাকা খাইয়া ছোট ভাই তার অংশ তো লেইখা দিলই না, উল্টা চক্রান্ত কইরা ভাইগনার কাছ থাইকা তার অংশ লেইখা নিল। বিদেশে বইসা ফোন দিয়া ফোনটারে ফাটানো ছাড়া আমি আর কী করতে পারি? পরের বছর দেশে ফিরা মাতবর-উকিলের পিছে ঘুইরা মেলা টাকা খরচ করলাম, কিন্তু জমিখান আর উদ্ধার করতে পারলাম না। ওই জমি লইয়া আমার পরিবার বহুত অপমান হইছে। ভাইয়ের অত্যাচার থাইকা বাঁচাইতে পোলারেও আনলাম সৌদিতে। হেষে নিজের জমির আশা ছাইড়া দিয়া অহন পাহাড়ের জমি লিজ লইয়া সবজি ফলাইতাছি। সবই আমার কপাল, বুঝলি।

স্বজনদের স্বার্থপরতা ও হিংসা-বিদ্বেষের মাঝে দেশে অশান্তির নরকে জ্বলার চেয়ে বিদেশের মরু-পাহাড়ে নিঃসঙ্গ চাষবাসও সুখের, আর্থিক হিসাবে লাভজনক তো বটেই। নিজেকে এ রকম সান্ত্বনা দেয় রাজা মিয়া, প্রবাসী সহকর্মীরাও সমর্থন জোগায়। তার পরও জন্মভূমি গ্রামের নানা স্মৃতি যখন-তখন বর্ষার ব্যাঙের মতো লাফ দেয় আর ঘ্যাঙরঘ্যাং ডাকে কেন? এ বছর আবহায় টানা এক সপ্তাহ বৃষ্টিপাত হয়। রাজা মিয়ার ক্ষেতে পানি জমে না। তার পরও ক্ষেত দেখতে ছাতা মাথায় বৃষ্টির মধ্যেও ক্ষেতে নামে সে। বৃষ্টির পানি গড়িয়ে অনেক নিচের খাদ তখন আঁকাবাঁকা বিলে পরিণত হয়েছিল। এ রকম আগে দেখেনি। যত বৃষ্টিই হোক, পাহাড়ি ঢাল ও খাদ পানি দ্রুত টেনে নিয়ে কোন অতলে যে পাঠিয়ে দেয়! নিজের সবজিবাগানের নিচে বিল আবিষ্কার করে ছাতার ওপরে ঝমঝম বৃষ্টির নাচের সঙ্গে হঠাৎ দেশি ব্যাঙের ডাকটাও যেন কানে আসতে থাকে। ইচ্ছা করে, বৃষ্টির মধ্যে ভিজেই পাহাড়ি খাদে মাছ খুঁজতে যায়, ছোটবেলায় গাঁয়ের বিলে ও জলাক্ষেতে যেমন যেত। বৃষ্টি ছাড়াও গরমকালে পাহাড়ের ওপর ভাসমান মেঘ, চাঁদ-তারাখচিত আকাশ ও শনশন পাহাড়ি বাতাসও ফেলে আসা স্বদেশকে নিজের চারপাশে টেনে আনে যখন-তখন।

ফুটপাতের দোকানে জীবনে প্রথম সৌদি নারীর মুখোমুখি হওয়ার ঘটনাটিও ক্ষেতের নির্জনতায় দেশকে মনে করিয়ে দেয়। সবজিরাজার মৃত স্ত্রীর সঙ্গে কোথায় যেন মিল আছে রহস্যময়ী নারীটির, ঠিক ধরতে পারেনি সে। দূরের বাড়িগুলোর জানালা-বারান্দার দিকে তাকালে কোনো নারীমূর্তি দূরে থাক, তাদের ব্যবহূত পোশাকও চোখে পড়ে না। অথচ ক্ষেত থেকেও সহজে চোখে পড়ে, ভোরবেলা নিজের ঘরের বেড়ায় শুকাতে দেওয়া নতুন বউয়ের হলুদ রঙের ভেজা শাড়ি। আড়ালে রানিকে শুধায় রাজা, শাড়ি দেইখা মানুষ বুঝব না বউ রাইতে কী আকাম করছে? কী যে শরমরাঙা হাসি উছলে উঠেছিল রানির মুখে! চল্লিশ বছর বয়সে তিন সন্তানসহ বউকে রেখে বিদেশে আসার তিন বছর পর দেশে ফিরেছিল রাজা। বউ একটা কথাই ঘুরেফিরে জানতে চেয়েছিল বারবার, বিদেশ থাইকা একেবারে কবে আইবেন? আমি একলা আর পারি না। শেষ দেখা চার বছর আগে। মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে দেশে ফিরেছিল রাজা মিয়া। ছেলের পক্ষের নাতনিকে কোলে তুলে দিয়ে ঠাট্টা করেছিল রানি—আমার দিন তো গেল গিয়া, নাতনির লগে ঘর করতে বিদেশ থাইকা একেবারে কবে আইবেন? গ্রামে মোবাইল ফোন চালু হওয়ার পর বউয়ের জন্য একই রকম মোবাইল সেট কিনে দিয়েছিল রাজা মিয়া। নিজের সেটে মৃত রানির নাম ও নম্বরটি সেভ করা আছে এখনো। মরে যাওয়ার পর অনেক কিছুর সঙ্গে রানির ফোনটিরও উত্তরাধিকারী হয়েছে ছেলের বউ। স্ত্রীর মৃত্যুর পর রাজা মিয়া দেশের কোনো মোবাইলেই আর ফোন করেনি। ছেলে মাঝেমধ্যে নাজরান থেকে কল দিয়ে বাপের ফোনটা সচল রেখেছে।

চার বছর আগে মায়ের মৃত্যুসংবাদটি ফোনে প্রথম জানতে পেয়েও বাবাকে ফোন করেনি ছেলে। ছুটি নিয়ে নাজরান থেকে সরাসরি আবহায় বাবার ক্ষেতে এসে হাজির হয়েছিল। বাচ্চা ছেলের মতো বাবাকে জড়িয়ে ধরে নির্জন প্রান্তর কাঁপিয়ে চিৎকার করে বলেছিল—বাবা গো, মা আর নাই! অসুস্থ স্ত্রীকে সুচিকিৎসা নিতে ছেলের বউয়ের অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়েছিল রাজা মিয়া, বউয়ের বাপ বেয়াইকে দেখশুন করার অনুরোধও করেছিল। অসুস্থ অবস্থায় সর্বশেষ ফোনালাপেও রানির ক্ষীণ কণ্ঠে ছিল সেই পুরনো প্রশ্ন—কবে? মাথায় বাঁধা মাফলার দিয়ে ছেলের চোখ মুছে সান্ত্বনা দিলে ছেলে আবার বলেছিল—জানাজা কুলখানিতে তো যাইতে পারুম না, চল্লিশা করতে চলেন দুইজনেই দেশে যাই। নিজের কান্না লুকাতে দূর পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে জবাব দিয়েছে রাজা মিয়া—কান্দিস না, দেশে ফেরার আগে আমি তোর মায়ের আত্মার শান্তির জন্য তার নামে মক্কা শরিফে গিয়া আরেকবার ওমরাহ করুম, মদিনায় নবীজির রওজা শরিফে গিয়াও দোয়া করুম।

স্ত্রীর চল্লিশা করতে দেশে ফেরা সম্ভব ছিল না। বছরখানেক পর নিজের টাকায় টিকিট কেটে ছেলেকে দেশে পাঠিয়েছে রাজা মিয়া, কিন্তু স্ত্রী নেই বলেই হয়তো নিজে আর দেশে ফেরার উদ্যোগ নেয়নি। ছেলেকে সাক্ষী রেখে রানির আত্মার শান্তির জন্য ওমরাহ পালনের কথা বলেছিল, কিন্তু চার বছরেও মক্কা-মদিনায় যাওয়া হয়নি। সে জন্যই কি বোরকাওয়ালির ওপর ভর করে স্ত্রীর আত্মা আজ দোকানে গিয়েও হাজির হয়? এরপর ক্ষেতে এসেও হাজির হবে নির্ঘাত।

রাজা মিয়া ক্ষেতের পুষ্ট হয়ে ওঠা কপি-টমেটোগুলোকেও ছেলের মতো সাক্ষী মেনে শোনায়—তোগো বিক্রির টাকায় এবার মক্কা শরিফে যাওয়ার জন্য বাসের টিকিট কাটুম। অতঃপর বিকেলে মসজিদ গেটের দোকানে নেওয়ার জন্য আজ ক্ষেত থেকে বেশি বেশি কপি-টমেটো তুলে ঝুড়ি ও বস্তায় ভরে সে।

 

তিন.

পাঁচ বছর ধরে একই পেশায় লেগে আছে এবং ভোক্তা-খদ্দেরদের সঙ্গে খাতির জমানো আলাপি স্বভাবের কারণেও হতে পারে, আবহা শহরের বাঙালি যেমন সবজিরাজাকে জানে, তেমনি রাজা মিয়াও চিনেছে অনেককে। পরিচিতদের মধ্যে কাকে সবজি বেচার কাজে লাগানো যায়, আর চার-পাঁচ দিনের ছুটিতে মক্কা-মদিনায় গেলে ক্ষেত ও দোকানের দায়িত্ব কাকে দেওয়া যায়, বিকেলে দোকানে বসে ভাবতে থাকে। এমন সময় গাড়ি পার্কিংয়ে রেখে যে ভদ্রলোকটি দোকানের দিকে এগিয়ে আসে, সে দেশি না হলেও ইন্ডিয়ান অবশ্যই। বাংলাদেশের বেশ কিছু ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ও ইউনিভার্সিটির টিচার আছে এই শহরে। তারা বেতন পায় মেলা, পরিবার নিয়ে থাকে এবং নিজেরাই গাড়ি চালায়। ভদ্রলোককে তাদের একজন ভেবে সালাম দিয়ে স্বাগত জানায় রাজা মিয়া।

আপনি তাহলে সবজিরাজা? আপনার গল্প অনেকের কাছে শুনি। সবজি বেচে আমাদের চেয়েও বেশি রোজগার করেন আপনি।

আগের মতো গায়ে পুরনো কোট, পরনে ময়লা প্যান্ট আর মাথায় টুপির ওপর মাফলার বেঁধে মসজিদের দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে ছিল রাজা মিয়া। লোকটাকে সম্মান দেখাতে উঠে না দাঁড়ালেও নড়েচড়ে বসে। হেসে জবাব দেয়—রাজা কি প্রজা, একদিন ওই পাহাড়ের ঢালে আমার ছোট্ট ক্ষেত দেখতে গেলেও বুঝতে পাইবেন, স্যার। পঞ্চাশ মাইল দূরে আগে যে কফিলের খামারবাড়িতে কাম করছি, তিন একর জায়গায় ছিল সেই খামার বাগান। মাল সাপ্লাই দেওয়ার জন্য পিকআপ ভ্যান ছিল দুইটা। আমি আধাপাখিরও কম জায়গায় ক্ষেত করছি। এ দেশে বড় বড় সুপারমার্কেট আর সবজিবাজার বড় বড় খামার মালিক আর সাপ্লাই কম্পানি দখল কইরা রাখছে। আমি স্যার ফুটপাতে সামান্য কয়টা সবজি লইয়া আপনাগো মতো কাস্টমারদের আশায় চাতক পাখির মতো বইয়া থাকি।

কেন, বাঙালি মার্কেটে দিতে পারেন তো। ওখানকার সব দোকান তো দেখি বাঙালিরা চালায়। দেশের সব কিছুই পাই সেখানে।

বাঙালি মার্কেটে সবজির বীজ-সার কেনার জন্য সবজিরাজাকেও যেতে হয় প্রায়ই। পরিচিত রেস্টুরেন্টে বসে পেঁয়াজু-মুড়ি খায়, শখ করে পরোটার সঙ্গে গরুর পায়াও খেয়েছে একদিন। কিন্তু বাঙালি ভাইয়ের দোকানে নিজের ফলানো সবজি সাপ্লাই দিয়ে কী রকম ঠকা খেয়েছে, সেই গল্প শোনাতে ইচ্ছা করে। সৌদি সরকারের দেওয়া মোটা বেতন পায় বলে দেশের শিক্ষিতরা রাস্তাঘাটের লেবারদের দুঃখ-দুর্ভোগ বোঝে না। প্রাইভেট পর্যায়ে সৌদি কফিল কি কম্পানির আন্ডারে ছোটখাটো কাজ করে যারা, সৌদি কফিলদের লাভের অঙ্ক জোগান দেওয়া ছাড়াও দেশি-বিদেশি কতজনের কাছে ধরা খেয়ে মাসুল দিতে হয় তাদের।

আপনার পরিচয় তো পাইলাম না, স্যার। আছির হাসপাতালের ডাক্তার বোধ হয় আপনি?

না, না, আমি কিং খালেদ ইউনিভার্সিটির ইংলিশের প্রফেসর। আপনার সবজি কিনতে এলাম আজ। দেখতে তো একদম ফ্রেশ, ফার্স্ট ক্লাস। সাইজেও দেশের চেয়ে বড়, কিন্তু দেশি সবজির মতো স্বাদ পাই না কেন, বলেন তো?

পাইবেন কেমনে? আবহার পাহাড়ি মাটির রস আর দেশের নরম মাটির রস কি এক জিনিস? তয় দেখেন, দেশি শাকসবজিতে পোকায় কাটে, ছাগলে মুখ দেয়, খরায় পোড়ে কি পানিতে ডোবে। তার ওপর স্যার মানুষ-ছাগলে ক্ষেত ও বেড়াও খায়। এই দেশে এই সব বালা-মুসিবত নাই বইলা ফলনটা ভালো হয়, বেচতে পারলে লসের ভয় নাই।

ভালোই তো। চাষাড়ি কাজ করে ফলন বাড়িয়ে বাংলাদেশকেও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছেন, মরুভূমির দেশে এসেও সবজি ফলিয়ে ভালোই কামাচ্ছেন। সেদিন গাড়ি চালিয়ে রিয়াদে গেছিলাম বেড়াতে। রাস্তার দুপাশে দেখলাম কত সবজিবাগান, মরুভূমিতেও সবজিক্ষেত।

কত শিক্ষিত বাংলাদেশিও এ দেশে আইসা চাষাড়ি কাম করতাছে।

তা এ রকম রাস্তার ধারে দোকান দিয়ে বসছেন, পুলিশ কিছু বলে না? নাকি লাইসেন্স পারমিট নিয়েছেন?

পুলিশ কি মসজিদের সৌদি কোনো মুসল্লিরা—আজ পর্যন্ত কেউ আপত্তি দেয় নাই। তবে দেশের আবাদে মানুষ-ছাগলের যে বেড়া-ক্ষেত খাওয়ার কথা কইলাম, সেই ছাগলরা তো অনেকে পয়সা খরচা কইরা এই দেশেও আইছে। তারা সুযোগ পাইলে দেশি ভাইয়ের মাথায় কাঁঠাল ভাইঙ্গা খাইতে চায়, এই রকম কিছু দেশি ছাগলের গল্প হুনলে আমার দুঃখটা বুঝতে পারবেন। চলেন স্যার, আপনারে ওই দোকানে লইয়া একটু চা-কফি খাওয়াই। ওইখানেও দেশি ভাইরে দেখতে পাইবেন।

কিন্তু সবজিরাজার দুঃখের কাহিনি এবং তার সঙ্গে চা-কফি খাওয়ার বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখায় না প্রফেসর। বলে—আমার সময় নাই। আপনি দুটি কপি আর এক কেজি করে টমেটো গাজর দিন। ওসব কী, ধনেপাতা? দেন এক আঁটি।

চাহিদামতো সবজি নিয়ে লোকটা মোট দাম জানতে চায়। দাম শুনে বলে, বাঙালি বাজারের তুলনায় তো দাম কম রাখেন না দেখছি।

দেন স্যার, আপনি খুশিমতো যা দিবেন, তা-ই লমু। আর লাউ-শিম কী তরকারি খাইতে চান, বইলেন, আবাদ কইরা খাওয়ামু নে।

প্রফেসর মানিব্যাগ খুলে বলে—কেনাকাটা তো সব কার্ডে করি, পকেটে ক্যাশ টাকা থাকে কম।

পঁয়ত্রিশ রিয়ালের সওদার মূল্য মাত্র বিশ রিয়াল দিয়ে ব্যস্ত প্রফেসর হাত নেড়ে গাড়িতে গিয়ে ওঠে।

প্রফেসরটি চলে যাওয়ার পর রাজা মিয়ার মন খারাপ হয়। সাধারণত চেনা-অচেনা দেশি ভাইদের সঙ্গে মন খুলে গল্প করা ও চা-সিগারেট আপ্যায়নের আগে তার আঞ্চলিক পরিচয়টাকে গুরুত্ব দেয় সে। কিন্তু প্রফেসর কোন জেলার মানুষ, জিজ্ঞেস করা হয়নি। যে এলাকার মানুষই হোক, বাঙালি বাজারের সবজি দোকানের ম্যানেজার-কর্মচারীরা তাকে চেনে অবশ্যই। তাদের কাছে সবজিরাজার গল্প ও দোকানের হদিস পেয়েছে হয়তো। সবজিরাজা যে আগে একটি বিশাল সবজি ও ফলের খামারে মাসিক মাত্র আট শ রিয়াল বেতনে বুড়ো গরুর মতো বাঁধা ছিল, সেই গল্পও শুনেছে নিশ্চয়ই। সেই খামারের পাঁচজন বাঙালি কর্মীর মধ্যে রাজা মিয়া ছিল বয়োজ্যেষ্ঠ, কফিলের পুরনো আমেল হিসেবে একসময় উটের রাখালিও করেছে। কিন্তু খামারে সবচেয়ে পরে চাকরিতে ঢুকেও বরিশালের রজব হয়ে উঠেছিল কফিলের খাস লোক। মাদরাসা লাইনে লেখাপড়া করেছে বলে আরবি ভাষাটা তাড়াতাড়ি রপ্ত করেছিল সে। প্রথমে ক্ষেতে ট্রাক্টর চালাত, পরে সবজি ও ফল সাপ্লাইয়ের পিকআপে শহরে ঘুরে ঘুরে মহা চালু মাল হয়ে ওঠে। একদিকে টাকা মেরে কফিলকে ঠকায়, অন্যদিকে জমিদারের মতো হুকুম দিয়ে অন্যদের খাটায়। রাজা মিয়ারে বলত বুড়া বলদ। এই রকম বুড়া বলদ কি উট দিয়া মরুভূমির আবাদ হইব না—এমন কথাও কফিলকে শুনিয়েছে। হারামজাদা রজবও পিকআপ নিয়ে বাঙালি বাজারে আসে প্রায়ই। হয়তো প্রফেসরটাকেও রাজা মিয়ার নামে আকথা-কুকথা সে-ই বলেছে।

রাজা মিয়া কোটের পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে বর্তমান কফিলের হোটেলের ম্যানেজার বাসেদকে ফোন করার কথা ভাবে। মেইন রোডের ধারে দ্বিতীয় চারতলা বাড়িটাকে আবাসিক হোটেল বানিয়েছে কফিল। সৌদির মরু অঞ্চলের বহু বাসিন্দা গরমের ছুটিতে শীতপ্রধান পাহাড়ি শহর আবহায় সপরিবার ছুটে আসে। তাদের সার্ভিস দিতে হোটেলের বয়, কেয়ারটেকার থেকে ম্যানেজার—সব কাজ একাই সামলায় চাটগাঁইয়া বাসেদ। কফিলের অত্যন্ত বিশ্বস্ত সে। বরিশালি রজব এমনকি শিক্ষিত প্রফেসরের চেয়েও বাসেদ আরবি ভাষাটা ভালো জানে। গরমকাল ছাড়া হোটেল ফাঁকা থাকে বলে দেশি কয়েকজন ডাক্তার-প্রফেসরকেও বাসা ভাড়া দিয়েছে বাসেদ। সে হয়তো প্রফেসরটিকেও চেনে। নিজের গাড়িতে করে বাসেদকে নিয়ে জিদানে বড় ভাইয়ের সবজি খামার দেখতে গিয়েছিল কফিল। সেখানেই বাসেদের সঙ্গে রাজা মিয়ার আলাপ-পরিচয়। কফিলের মরহুম বাপকেও দেখেছে বলে পুরনো আমেল রাজা মিয়াকে বেশ সম্মান দেখিয়েছে। রজবের অত্যাচারে তার মনঃকষ্টটা বুঝেছিল সে। বাসেদই প্রথম কফিলের ভাইয়ের পাহাড়ি জায়গা দেখিয়ে রাজা মিয়াকে তাই প্রস্তাবটা দিয়েছিল। বাঁধা বেতনের চাকরি ও থাকার জায়গা ছেড়ে রাজা মিয়া ঝুঁকি নিয়েও একা আবহায় আসতে দ্বিধা করেনি। অবশেষে পাঁচ বছরের একনিষ্ঠ শ্রম দিয়ে রাজা মিয়া যখন ষাটোর্ধ্ব বয়সে অনেকটা স্বাধীন আর সচ্ছল হয়ে উঠেছে, তখন প্রফেসরটা এসে তাকে বাঙালি বাজারের কথা বলে পুলিশের ভয় দেখায় কেন?

ফোনে হোটেলে বাসেদকে পেয়েও জিজ্ঞেস করা হয় না। ইলেকট্রিশিয়ান দিয়ে হোটেলের কী কাজ করাচ্ছে বলে ব্যস্ত। পরে ফোন করার কথা বলে রাজা মিয়া দোকান থেকে উঠে দাঁড়ায়। মেইন রোডে গিয়ে ফুটপাতে পরিচিত ময়মনসিংহা ক্লিনার করিমকে দেখে, বুরুশ-ডাস্টবিন হাতে ডিউটি করছে এখনো। রাজা মিয়াকে দেখে জানতে চায়—ও সবজিভাই, কই যান, চা খাইতে? চলেন আমিও যামু, গাড়ি ধরার আগে হারুন ভাইয়ের দোকানের চা খাইয়া যাই একটা।

রাজা মিয়া করিমকেও জিজ্ঞেস করে—খানিক আগে গাড়িতে চইড়া এক বাংলাদেশি প্রফেসর আইছিল দোকানে। চিনস নাকি রে তুই?

গাড়িতে চড়া দেশি প্রফেসর সাহেব-সুবারা কি আমার মতো বলদিয়ার খোঁজ লয়? আজ পর্যন্ত কোনো হালাই তো দেইখা দুইটা টাকা দিল না। আপনি খালি দয়া কইরা মাগনা-আধামাগনা সবজি খিলাইতাছেন। আইজ কয়টা টমেটো দিয়েন, কাঁচাই খামুনে।

সবজিক্ষেতে যাইস একদিন।

 

চার.

প্রফেসরটি পুলিশের কথা বলে ভয় দেখানোর মাত্র দুই দিন পর সত্যই পুলিশের গাড়ি এসে থামে সবজিরাজার দোকানের সামনে। মুখচেনা ইন্ডিয়ান খদ্দেরটিকে ছোট ওজন মেশিনে টমেটো ওজন করে দিচ্ছিল বলে টের পায়নি রাজা মিয়া। কাস্টমারটি বিদায় নেওয়ার পরই সামনে দেখতে পায় পরিচিত ড্রেসে সৌদিরাজের খাস লোক। কোমরে যথারীতি গোঁজা পিস্তল। অদূরে দাঁড়ানো পরিচিত পুলিশ কার। আগে দোকানে বসে রাস্তায় এ রকম পুলিশ কার দেখলেও রাজা মিয়ায় বুক দুরুদুরু করত। আজ দোকান ফেলে চা খেতে যাওয়ারও সময় পায় না। তবু হাসিমুখে সালাম দেয়। পুলিশ অফিসার হাত বাড়িয়ে তার ইকামা দেখতে চায়।

রাজা মিয়ার বুকপকেটে পলিথিন মোড়ানা পুরনো ইকামা বের করে। নতুন কফিলের অধীনে নতুন করে ইকামা করতে হলে খরচ অনেক বেশি লাগে। বাসেদই তাই নগদ দেড় হাজার রিয়াল নিয়ে পুরনো ইকামা নবায়ন করে দিয়েছে। কিন্তু এই ইকামার সঙ্গে আবহা নগরীর মসজিদ, সবজিক্ষেত বা রাস্তার ধারের ঘুপচিতে সাজানো সবজি দোকানের কোনো সম্পর্ক নাই। পুলিশ তাই আরো কিসব পেপার-পাসপোর্ট দেখতে চায়। আর কিছু নেই জেনেও খোঁজার জন্য পকেটে হাত ঢুকিয়ে রিয়ালের নোটগুলো বের করে রাজা মিয়া, ঘুষ দেওয়ার সম্মতি বোঝাতেই যেন। কিন্তু একি আর দেশি পুলিশ? দোকান গোটাতে হুকুম দেয় সে। দোকানের সবজিগুলো পলিথিন ব্যাগ ও বাস্কেটে তোলার সময় ফুটপাতে বসার কারণ হিসেবে নিজের ক্ষুদ্র সবজিচাষির পরিচয়টা বারে বারে তুলে ধরতে চায় রাজা মিয়া। কিন্তু বিপদের সময় তড়বড়িয়ে সত্য গল্প বলার মতো জোর ও ভাষাজ্ঞান কোথায় পাবে সে? এপাশ-ওপাশ তাকিয়ে মিসরি নাসের বা পরিচিত মুখ খোঁজে। বিপদের সময় মসজিদের ইমাম হুজুরের দীর্ঘ খটমটে আরবি নামটা পর্যন্ত ঠিক স্মরণে আসে না। অগত্যা পুলিশকে নিজের ক্ষেত ও কফিলের বাড়ি চেনাতে আঙুল উঁচিয়ে ধরে তাকে সেখানে নিয়ে যেতে চায়। বিরক্ত অফিসারটি সবজির বস্তা ও ঝুড়িসহ গাড়িতে ওঠার হুকুম দেয়। রাজা বুঝতে বিলম্ব ও দ্বিধা করলে ধমক দিয়ে হাত ধরেও হ্যাঁচকা টানে। জিপের পেছনে সবজিসহ উঠে বসে সবজিরাজা। সামনে বসে পুলিশ গাড়িতে স্টার্ট দেয়, গাড়িতে বসেও পুলিশ কারের ওপর ঘূর্ণমান লাল বাতির সাইরেন শুনতে পায় রাজা, চোখ থেকেও যেন লাল আলো বিচ্ছুরিত হয় আজ।

দুই যুগের দীর্ঘ প্রবাসজীবনে সব মিলিয়ে রাস্তাঘাটে দু-তিনবারের বেশি পুলিশের মুখোমুখি হয়নি সে। মক্কায় ওমরাহ করতে যাওয়ার সময় পুলিশ বাস চেক করেছে। ইকামা দেখে ওমরাহর কথা শুনে ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু এবার আসামিকে বমাল গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। দুদিন আগে প্রফেসর পুলিশের কথা বলেছিল। তবে কি বরিশাইলা রজব ও বাঙালি বাজারের দেশি শত্রুরা    হিংসামি করে পুলিশকে জানিয়েছে? অবৈধ চাষাবাদ ও ব্যবসার কথা বলে কেসও দিয়েছে রাজা মিয়ার নামে? শরিয়তের বিধানে চলে এই দেশ। বেআইনি কাজ করে পুলিশের হাতে ধরা পড়লে আর রক্ষা নেই। বিচার করে প্রকাশ্যে দোররা মারা, হাত কাটা, এমনকি গর্দান কাটতেও দ্বিধা করে না। কয়েক বছর আগে এক বিচারে বাংলাদেশির মাথা কাটা নিয়ে খুব হইচই হয়েছিল।   দেশের সরকারও ঠেকাতে পারেনি সেই দণ্ড। বহু দেশের লাখো মুসলমান এ দেশে আসে সত্য, কিন্তু একটু উনিশ-বিশ করলেই ধরে সোজা এয়ারপোর্টে নিয়ে প্লেনে তুলে দেয়। এসব শোনা কথা সবজিরাজার জীবনেও আজ দৃষ্টান্তমূলক সত্য হয়ে উঠবে, স্বপ্নেও ভাবেনি সে। পুলিশ অফিসার তাকে বমাল গাড়িতে তুলে কী করবে, কোথায় যাচ্ছে, বুঝতে পারে না রাজা। অশুভ আশঙ্কায় বুকের ধড়ফড়ানি ক্রমেই বাড়ে। পকেটের মোবাইল ফোনটা বের করে সে। আপনজনদের মধ্যে সৌদিবাসী ছেলেকে ফোন করে খবরটা জানাতে পারে প্রথম। কিন্তু বাবাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে শুনলেই অজ্ঞান হয়ে যাবে সে। মায়ের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে আবহায় ছুটে এসেছিল যেমন, তেমনি হয়তো ছুটে আসবে আবার। বাবাকে না পেয়ে পাহাড়ি খাদে বাবার শূন্য ক্ষেতে দাঁড়িয়ে বাবাগো বলে গলা ছেড়ে কাঁদবে। ছেলের আগাম কান্না শুনে বাসেদকে ফোন করে রাজা মিয়া।

দ্বিতীয়বার ফোন বাজতেই ফোন ধরে বাসেদ। রাজা মিয়ার কাঁপা গলায় খবর শুনে বলে, ফোনটা পুলিশ অফিসারকে দেন তো, জিগায় দেখি। কিন্তু গাড়ি চালাচ্ছে পুলিশ। এ অবস্থায় আরেক দেশি মানুষের সঙ্গে কথা বলার জন্য ফোন এগিয়ে দিয়ে অপরাধ বাড়ানো কি ঠিক হবে? রাজা মিয়ার দ্বিধা দেখে বাসেদ জানায়, ঠিক আছে, আমি আগে কফিলের ফোন দিয়া খবরটা জানাই তারে। কফিলের পোঁয়াও বড় পুলিশ অফিসার হইছে, কফিলকে দিয়া তার পোঁয়ারেও ফোন দিতাম, তারপর পুলিশরে দিয়াই এই পুলিশকে ফোন লাগামু। আপনি ভয় পাইয়েন না, আমার ফোন না পাওয়া পর্যন্ত পুলিশের গাড়িতেই থাকেন।

কফিলের হোটেলের একাই এক শ বাসেদ কী ব্যবস্থা করবে, সেই অপেক্ষায় পুলিশের গাড়ি থেমে থাকে না। দুরন্ত গতিতে পাহাড়ি রাস্তার চড়াই-উতরাই বেয়ে ছুটতে থাকে। শেষ পর্যন্ত যে সরকারি অফিস ভবনের গেটে গাড়ি ঢোকে, সেটা পুলিশের কোনো হেড অফিস, নাকি বিদেশি লেবারদের কাগজপত্রসংক্রান্ত বলদিয়া অফিস, রাজা ঠিক চিনতে পারে না। অফিসের বিশাল প্রাঙ্গণের পার্কিংয়ে আরো কয়েকটি পুলিশের গাড়ি চোখে পড়ে। গাড়ি থামিয়ে পুলিশ দরজা খুলে দিয়ে মালামালসহ আসামিকে নামার হুকুম দেয়। ভবন প্রাঙ্গণের একদিকে নানা ধরনের মালপত্র ডাঁই করে রাখা। নির্দেশমতো সেইখানে সবজির বোঝা রেখে দেয় রাজা। এরপর রাজা মিয়াকে নিয়ে পুলিশ অফিসার সিঁড়ি বেয়ে ভবনের দোতলায় ওঠে। দোতলার একটা বড় রুমে নানা দেশের লেবার শ্রেণির বেশ কয়েকজন লোক আসামির মতো চুপচাপ বসে আছে। মুখ চুন করে কী জন্য অপেক্ষা করছে তারা? একজনকে বাংলাদেশি বলেও সন্দেহ জাগে। পুলিশ অফিসারটি রাজা মিয়াকেও ওদের মাঝে বসতে বলে তার ইকামাটা হাতে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে কোথায় উঠে যায় কে জানে। সন্দেহজনক বাংলাদেশি যুবক এবার গলা বাড়িয়ে কথা বলে—ও চাচা, আপনে বাংলাদেশি না? আপনারে ধরছে ক্যান? রাজা মিয়া জবাব দেয় না। ফোনে বাসেদের আলো চলকানো উপস্থিতির অপেক্ষায় পকেট থেকে ফোন বের করে একাগ্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সে।

বাসেদকে আবার ফোন করার আগেই ফোন আসে তার। সুখবর জানায় সে, কফিল ও তার পুলিশ ছেলের সঙ্গে কথা হয়েছে। আরবিতে লেখা একটা নাম ও ফোন নম্বর রাজা মিয়ার মোবাইলে এখনই এসএমএস করে পাঠাবে সে। সেই নম্বরটি পুলিশ অফিসারটিকে দেখিয়ে ফোন করতে বলতে হবে। পুলিশ ফোন না করলে রাজা মিয়াই যেন নিজের ফোন থেকে কল দিয়ে ফোনটা পুলিশ অফিসারকে ধরিয়ে দেয়। আরবিতে পুলিশকে কী বলতে হবে, তাও দু-তিনবার বলে বাসেদ শিখিয়ে দেয় রাজা মিয়াকে।

জবাই হওয়ার জন্য বাঁধা পশুর মতো অপেক্ষায় থেকে, উদ্বেগ-দুশ্চিন্তার ভারে বাসেদের শেখানো আরবি বুলি রাজা মিয়া ভুলে যায়। পুলিশ অফিসারটি তবু আর আসে না। এদিকে মাগরিবের আজান শুনে অফিসের নামাজের জায়গায় অন্যান্য আসামি-কর্মচারীর সঙ্গে মাগরিবের নামাজ পড়ে রাজা মিয়া। মোনাজাতের সময় আজ মৃত স্ত্রী, সন্তান, মক্কা-মদিনার কথা স্মরণ করে আক্ষরিকভাবেই চোখের জল ফেলে। নামাজ শেষে আবারও অপেক্ষার প্রায় আধাঘণ্টা পর দোতলায় ফিরে আসে পুলিশ অফিসারটি। রাজা মিয়াকে নতুন হুকুম শোনানোর আগেই নিজের ফোন এগিয়ে ধরে আরবি নাম-নম্বর দেখায়, ফোন করার জন্য নিজস্ব ভাষাভঙ্গিতে আকুল আবেদন করে—কফিল স্যার, ফোন স্যার, পুলিশ অফিসার স্যার, এই নম্বরে ফোন দিলেই বুঝতে পারবেন। ...

আরবি নম্বর দেখেই হয়তো নিজের ফোন বের করে ফোন করে পুলিশ অফিসারটি। ফোনে তার আরবি কথাবার্তা এবং কথার মাঝে বাংলাদেশ ও নিজের নামটি শুনে অনেকটা আশ্বস্ত হয় রাজা মিয়া। ফোনের অপর প্রান্তে কফিল হোক আর কফিলের পুত পুলিশ অফিসারই হোক, তাদের কথায় নরম হচ্ছে পুলিশটি। ফোনে কথা শেষ হলে রাজা মিয়াকেও যেন ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখে সে। তাকে নিয়ে তিনতলার একটি অফিসরুমে গিয়ে, সেই অফিসের অফিসারটির সঙ্গে কথাবার্তা বলে রাজা মিয়ার হাতে তার ইকামাটা ফেরত দেয়। এবার তিন শ রিয়াল জরিমানা দাবি করে পুলিশটি। ঘুষ হোক আর জরিমানাই হোক, নির্দ্বিধায় টাকাটা পুলিশের হাতে তুলে দেয় রাজা মিয়া। রাস্তার ফুটপাতে আবারও দোকান না দেওয়ার অঙ্গীকার করলে পিঠ চাপড়ে ডিসমিস বলে অফিসারটি। সালাম শুকরিয়া জানিয়ে বেরিয়ে আসে অফিস থেকে।

অফিসের প্রাঙ্গণে নিজের সবজির ডালা যেভাবে রেখেছিল, সেভাবেই পড়ে আছে। মালিকের সঙ্গে সেগুলোও ছাড়া পেল কি না, জিজ্ঞেস করা হয়নি। কিন্তু ইকামা ফেরত পেয়েছে, জরিমানাও দিয়েছে রাজা মিয়া। নিজ হাতে ফলানো সবজিগুলো তার বড় আইডি-ইকামা। এগুলো ছাড়া তার মুক্তির কোনো মানে আছে? রাজা মিয়া সবজির বস্তাটা এক হাতে পিঠে, অন্য হাতে ঝুড়িটা নিয়ে সরকারি অফিসটা থেকে ঝটপট বেরিয়ে রাস্তায় উঠে মুক্তির নিঃশ্বাস ফেলে।

কোন দিকে গেলে সে তার ঠিকানায় সহজে পৌঁছতে পারবে, বুঝতে পারে না। মুক্তির আনন্দে ফুটপাত ধরে হাঁটতে থাকে। খানিকটা এগোনোর পর নিচে পাহাড়ের ঢালে অসংখ্য আলোকবিন্দুখচিত শহরের বিস্তার দেখে বুঝতে পারে, এ জায়গাটার অবস্থান পাহাড়ের উঁচুতে। চল্লিশ বছর বয়সে প্রথম এই দেশে আসার স্মৃতি মনে পড়ে। প্লেন এয়ারপোর্টে নামার সময় এ রকম অসংখ্য আলোকমালাসজ্জিত দেশটা দেখে সম্পূর্ণ অচেনা ও স্বপ্নময় এক দেশে পৌঁছতে পারার আনন্দ-উত্তেজনা ও অজানা আশঙ্কায় বুকে আলোড়ন জেগেছিল। আজ পুলিশের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার পর সে রকম অনুভূতি হচ্ছে। মুক্তির খবরটা প্রথম দেশি বাসেদকেই জানানো দরকার। অনেক করেছে সে চাঁদপুরি রাজা মিয়ার জন্য। ইকামা নবায়নের জন্য তার হাতে গতবার কষ্টের সঞ্চয় দেড় হাজার রিয়াল তুলে দিয়েছিল। জমির লিজ বাবদ কফিলকে দেওয়ার জন্য টাকাও মাসে মাসে বাসেদের হাতে দিতে হয়। রাজা মিয়ার মেহনতের রোজগারে বাসেদ ভাগ বসায় এবং কফিলের পাওনা মারে বলে সন্দেহ জাগে প্রায়ই। কিন্তু আজ বিপদের সময় সে যা করেছে, তার তুলনা নেই। বাসেদের কথা ভাবতে না ভাবতেই পকেটের ফোন বাজে। হাতের ঝুড়িটা ফুটপাতে নামিয়ে রেখে ফোন ধরে সে। বাসেদই ফোন করেছে আবার। রাস্তার যানস্রোত ও ফুটপাতের পথচারীর তোয়াক্কা না করে, চিৎকার করে কৃতজ্ঞতা জানায় রাজা মিয়া—তুমি আজ যা করছো বাসেদ ভাই, নিজের মায়ের পেটের ভাইও তা করে না। বয়সে ছোট হইলেও আইজ থাইকা তুমি আমার বড় ভাই। তোমার জন্য আজ তিন শ রিয়াল ফাইন দিয়াই মুক্তি পাইলাম। না হইলে গর্দান যাইতো, নাকি দেশে ফেরত পাঠাইতো আল্লাহই জানে।

বাসেদ সান্ত্বনা দেয়—তুমি ওই পুলিশ বেটারে আমারে ফোনে ধরায় দিলে ফাইন দিতে হইতো না। সে তো জানতো না, আমার কফিলের পোঁয়া তার চাইতেও তিন-চার ধাপ ওপরের পুলিশ অফিসার। জেদ্দার এক প্রিন্স তার বুজম ফ্রেন্ড। তুমি আমারে ফোন দিলা না ক্যা? গাড়িতে কইরা তোমারে বাড়িতে নামায় দেওয়ার হুকুম দিতাম।

রাজা মিয়ার কাঁধে সবজির বোঝা ও অবস্থান বুঝে অভিজ্ঞ বাসেদ ঘরে ফেরার পথ এবং উপায়ও বাতলে দেয়। সেই সঙ্গে ফোনেও জরুরি গোপন কথা বলার জন্য গলা নামিয়ে বলে, কফিলের পুলিশ ছেলে তাকে বলেছে, দেশের অবৈধ আমেলদের খুঁজে বের করার জন্য রাজা অর্ডার দিয়েছে। কাজেই আপাতত রাস্তায় সবজি নিয়ে বসাটা মোটেও ঠিক হবে না।

 

পাঁচ.

পুলিশের হাত থেকে উদ্ধার করে অবিক্রীত সবজির বোঝা রাতেই ক্ষেতে নামিয়ে রেখেছে রাজা মিয়া। এখন দিনমান ক্ষেত ছাড়া তার যাওয়ার জায়গা নেই, করারও কিছু নেই। মসজিদ ধোয়ার সাপ্তাহিক পার্টটাইম কাজটা আছে অবশ্য। কিন্তু এই সামান্য কাজের ওপর নির্ভর করে ওমরাহ করতে মক্কা-মদিনা যাওয়ার খরচ মেটানো দূরে থাক, নিজে খেয়ে-পরেও বাঁচতে পারবে না। মহল্লায় বেকার ঘুরে নিজের দুরবস্থা চেনা-অচেনা বাঙালিদের দেখানোর বদলে রাজা মিয়া সকাল থেকে তার নির্জন ক্ষেতে একা বসে থাকে। অবিক্রীত সবজিগুলো ছাড়াও বিক্রির অপেক্ষায় ক্ষেতে দাঁড়িয়ে আছে অন্তত শ দেড়েক ফুলকপি, শখানেক বাঁধাকপি। তোলার জন্য গাছে লাল টমেটো ঝুলে আছে। বাঙালি বাজারের চেনা দোকানের ম্যানেজারকে হাতে-পায়ে ধরে কিছু সাপ্লাই দিয়ে আসতে পারে হয়তো। কিন্তু পাওনা আনতে গেলে দু-চারটার দাম দিয়ে বাকিগুলো পচে যাওয়ায় রাস্তার ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়ার কথা বলবে আবার। সুযোগ পেয়ে রাজা মিয়াকে সর্বহারা করার শেষ চেষ্টা করবে তারা অবশ্যই।

জমি তৈরির পর প্রথম দিকে সবজি আবাদ করে বেশি লাভের কৌশল বুঝতে সময় লেগেছে রাজার। চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে এখন ছোট জমিটাও দশ ভাগ করে কয়েক রকম সবজিবিছানা বানিয়েছে। শীতপ্রধান জায়গা বলে বারো মাসই প্রায় কপি ও টমেটো ফলে এখানে। চাহিদাও বেশি। নতুন করে কপি ও টমেটোর বীজ বুনেছে রাজা। অঙ্কুরোদ্গমের পর সেগুলোকে রোদ-বৃষ্টি ও কুয়াশার হাত থেকে রক্ষার জন্য মাথার ওপরে কালো পলিথিনের ছাউনিও বিছিয়ে দিয়েছে। ছাউনির নিচে থিরথির করে কাঁপছে সবুজ চারাগুলো। পাহাড়ি মাটিতে মাথাচাড়া দিয়ে জেগে ওঠার পর ওদের নড়াচড়া ও বেড়ে ওঠা দেখে একাকিত্ব কাটত রাজা মিয়ার। ফলবতী হয়ে ওঠার পর পরিচিত সবজিক্ষেতটি রাজা মিয়াকে টাকার বিছানায় পড়ে থাকার আনন্দ জাগাত অনেক সময়। ফলে বিকেলে মসজিদ গেটে খদ্দেরদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলত রোজ। অল্প সময়ে দেশি-বিদেশি চেনা-অচেনা খদ্দেরদের সঙ্গে যে ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল, তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নির্জন ক্ষেতের একাকিত্ব সবজিরাজাকে আজ গ্রাস করে নেয়। অসময়ে মনিবকে দুশ্চিন্তাকাতর দেখেই কি সবজিগুলোও বাতাসে মাথা দুলিয়ে কাঁদছে আজ?

সবজিরাজা তার সন্তানতুল্য নানা বয়সী প্রজাদের দিকে তাকিয়ে কথা বলে—কী করুম কও? বড় মার্কেটে তোগো লইয়া যাইতে পারুম না। তুইলা চেনা-অচেনা হিংসুক বাঙালিকে মাগনা বিলাইতে হইবো। রাস্তার ধারে ফেলায় রাখলে বলদিয়ারা মিউনিসিপালটির ডাস্টবিনগাড়িতে তুইলা দিবো। এত পয়সা খরচ কইরা দিনের পর দিন যত্ন-আত্তি কইরা বড় কইরা তুললাম। অহন তোরাও মরবি, সবজিরাজাও এবার ফকির হইবো।

ক্ষেতের সবজির সঙ্গে স্বগত আলাপচারিতার মাঝে পাহাড়ি প্রান্তরে কিসের যেন আওয়াজ ওঠে। রাজা ঘাড় ফিরিয়ে ঢালের ওপরে রাস্তার দিকে তাকায়। মাঝে মাঝে গাড়ি রেখে ঢাল বেয়ে সবজিক্ষেতে নেমে আসে এক সৌদি ক্রেতা। সবজি কিনতে এসে রাস্তা থেকেই সবজিরাজাকে চেঁচিয়ে ডাকে কেউ বা। না, সে রকম কোনো গাড়িওয়ালা ক্রেতা-শুভার্থী আসেনি। আসলে বাতাস জোরালো হওয়ায় সবজিক্ষেতের কান্নাটাই প্রবল হয়ে উঠেছে।

রাজা মিয়া অবিক্রীত সবজির ঝুড়ি থেকে টমেটো-গাজর এক-দুই কেজি মাপে পলিথিনের ব্যাগে ভরে। প্লাস্টিকের সুতায় বাঁধে ফুলকপি ও বাঁধাকপির ডাঁটা। এসব নিয়ে মহল্লার রাস্তায় ও ফুটপাতে ঘুরতে থাকলে মানুষ ঠিকই বুঝবে। এত দিন যারা দোকানে গিয়ে সবজি কিনেছে, তারা দেখামাত্র সবজিরাজাকে চিনবে অবশ্যই। নিজের অসহায় একাকিত্ব কাটানোর আয়োজনে রাজা মিয়া কাজ করতে করতে ক্ষেতের সবজিকেও সান্ত্বনা দেয়—কান্দিস না তোরা, হ্যাষ বয়সে আইসা যাতে পইচা মরতে না হয়, তোগো একটা সদ্গতির পথ ঠিকই বাইর করুম।

পুলিশের গাড়ি ও সতর্কতার কথাও মনে পড়ে রাজা মিয়ার। বাসেদের শেখানো আরবি বুলির তোয়াক্কা না করে পুলিশের উদ্দেশে নিজের ভাষায় জোরালো জবাব মুখে আসে—অত রাজ-আইনের ভয় দেহাইয়ো না মিঞারা। বহু টাকা খরচ কইরা আল্লাহ-রসুলের রহমতে টাকা কামাইতে আইছি তোমাগো দেশে। সবজিরাজার টাকা কামাইয়ের পথ যদি বন্ধ করতে চাও, দেও দেশে পাঠাইয়া। দেশে গিয়া দরকার হয় পরের জমিতে সবজির চাষ করুম। কামের ন্যায্য দাম পাইতাম না ঠিক, কিন্তু মেহনতের আবাদ পইচা ডাস্টবিনে যাওয়ার ভয় থাকবো না।

অতঃপর দুই হাতে ও কাঁধে সবজির দোকান সাজিয়ে সবজিরাজা রাস্তায় ওঠার জন্য পাহাড়ের ঢাল বেয়ে হনহনিয়ে ওপরে উঠতে থাকে।


মন্তব্য