kalerkantho

গ ল্প

পরিযায়ী

ওয়াসি আহমেদ

২৫ জুন, ২০১৭ ০০:০০



পরিযায়ী

অঙ্কন : পূজা দাশগুপ্ত

সকাল সাড়ে সাতটায় ফ্যাক্টরি গেট থেকে গজ পঞ্চাশেক দূরে লাইনে দাঁড়ানো মেয়েদের ঠেলাঠেলির ফাঁকে কুসুম যা দেখার দেখে ফেলেছে। দূর থেকে একনজর দেখলেও ভুল নাই দেখায়।

খানিকটা আড়ালে সরে দাঁড়াতে টের পেল ভূমিকম্প হচ্ছে। হাত-পা থরথরিয়ে কাঁপছে, আর ভূমিকম্প যে ভাবছে তার প্রমাণ পায়ের তলায় ঝাঁকুনি তুলে মাটি কাঁপছে। কেউ জানে না, কুসুম ঠিক টের পাচ্ছে।

ডানে-বাঁয়ে না তাকিয়ে পা চালিয়ে লাইন ছেড়ে সরে পড়তে মনে হয়েছিল কেউ না আবার পেছন থেকে ডেকে বসে। ডাকেনি। সবাই গেট বরাবর ছুটতে ব্যস্ত। মাসের আট তারিখ। বেতনের দিনটা আজ না হয়ে যদি গতকাল হতো! কিছু করার নেই। পুরো মাসের রোজগার, কয়েক দিনের বকেয়া ওভারটাইমও।

ফ্যাক্টরি কম্পাউন্ড ছেড়ে হাঁটার বেগ বাড়াতে মনে হলো, চেনাজানা কেউ যদি দেখেও থাকে ভাববে তাড়াহুড়ায় আসার সময় ঘরে জরুরি কিছু ফেলে এসেছে। তেমন অবশ্য কুসুমের কদাচিৎ হয়। ঘর ছাড়ার আগে তাকে ঠাণ্ডা মাথায় অনেক কিছু ভাবতে হয়, সাবধান হতে হয়। মেয়েটা বড় হচ্ছে, ঘরে একা রেখে যাওয়ার কারণেই সাবধানতা। রোজই ওকে কিছু না কিছু কাজ দিয়ে বেরোয়, যাতে ব্যস্ত থাকে। কাপড় কাচা, হাঁড়িকুড়ি মাজা—এসব তো থাকেই। বাড়তি কিছু না থাকলে চাল থেকে ধান বা চিটা বাছা, আটা চালা। মেয়ে তার চালাকি বোঝে, ঘরে আটকানোর ফন্দি। খুচরা এসব কাজে জবাকে সারা দিন ঘরবন্দি রাখা যাবে না জেনেও কুসুম রোজই বেরোনোর আগে কাজের কথাগুলো মনে করায়। এমন না যে জবা করে না, তার পরও বলে। আর আসল কথাটা যা না বললেও চলে, তা-ও। বাইরে যেন না যায়। যদি এসে শোনে গিয়েছিল, ঠ্যাং ভেঙে ফেলবে।

বস্তিটা বড় না, চার বছরের ওপর জবাকে নিয়ে কুসুম এখানে। লোকজন প্রায় সবাই জানাশোনা। তার পরও বস্তি তো বস্তিই। কাইজা-ফ্যাসাদ ছাড়া এক দিনও যায় না। তা ছাড়া কে কার মেয়েকে ফুসলানোর ধান্দা করছে বা নিয়ে ভেগেই গেছে বা খালি ঘর পেয়ে কার উঠতি কি নাবালিকা মেয়ের সর্বনাশ করে গেছে কোন লুচ্চা—এসব তো আছেই। ঠেকানোর ক্ষমতা নাই, কুসুুম জানে। তবু তার যা করার করে। মেয়েকে সাবধান করে, বাইরে যেতে নিষেধ করে।

মেয়েকে যে ঘরে রেখে যায়, এতে অন্য ভয়ও আছে। প্রতিবছর দুই-চারটা বস্তিতে নিয়মমাফিক আগুন লাগে। কেউ না কেউ লাগায়। বস্তির ভেতরের মানুষ বাইরের মানুষ, যারাই হোক, লাগায়। চুলার আগুনে অত তেজ থাকার কথা না। তুফানের বেগে যে একেকটা বস্তি চোখের পলক না পড়তে আগুনে ছারখার হয়ে যায়, তাতে কে না বোঝে চুলাটুলা না, পেট্রল। কাছাকাছি গুলশান, নিকেতনে বড়লোকরা থাকে। বস্তি উঠে গেলে সাফসুতরা, কী শান্তি! তবে ঠেকায়ও পড়বে বড়লোকরা। বস্তিই যদি না থাকে ছোটা বা বান্দা বুয়া পাবে কই?

আগুন লাগার দুশ্চিন্তাটা কুসুমকে যখন-তখন ভোগায়। জবা গায়ে-গতরেই বাড়ছে, মাথায় আক্কেল-বুদ্ধির ছিটাফোঁটা যদি থাকত! আগুন যদি লাগে, ওর মাথায়ই আসবে না কী করা উচিত, অন্তত নিজের জান বাঁচানোর জন্য কী করা।

কিন্তু এই যে হনহনিয়ে ছুটছে, যাচ্ছে কোথায়? কোথায় আর! ঘর ছাড়া যাওয়ার জায়গা আছে তার! চোরের মতো ঘাপটি মেরে যতক্ষণ ঘরে পার করতে পারে। ঘরই বা কতক্ষণ ঘর থাকবে? আজই কি সরে পড়বে?

পনেরো মিনিটের পথ। জোরে পা ফেলছে, তাতেও পথ ফুরাচ্ছে না। ঘরে ঢুকে মাথা ঠাণ্ডা করে ভাববে কী করা। এ সময় হাতে যদি বেতনের টাকা কয়টা থাকত! ছোট একটা টিনের বাক্সে কিছু টাকা-পয়সা যখন যা পারে জমায়। কতই বা হবে, বড়জোর হাজার দুই হবে কি না। যা করতে হবে তাড়াতাড়ি। মাথা ঠাণ্ডা রাখা চাই। ঘটনা তো নতুন না। এই নিয়ে চারবার। তার পরও প্রতিবারই যখন ঘটে, মাথায় মনে হয় আসমান ভেঙে পড়ছে। পায়ের তলায় মাটি কাঁপছে। ভূমিকম্প।

 

দুই.

দূর থেকে মাকে অসময়ে ফিরে আসতে দেখে জবা তোরাবের টঙের দোকান থেকে ঘরমুখো ছুটবে, না মায়ের দিকে এগোবে—এই দোটানায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাকে কাছে ভিড়তে দিল। সে যে মা বেরিয়ে যেতেই পাড়া বেড়াতে বের হয়নি, তোরাবের দোকানে বাকিতে বাংলা সাবান কিনতে এসেছে, তার প্রমাণ পলিথিন মোড়ানো সাবানের গোল্লাটা হাতে থাকার পরও বুক ধুকপুক করছে।

বাইরে যাওয়া তার একদম মানা। বড়জোর যেতে পারে পাশের ঘরে মর্জিনার মায়ের কাছে। বুড়ি নড়তেচড়তে পারে না, তবে একবার টেনেটুনে বালিশে ঠেস দিয়ে বসিয়ে দিলে দুনিয়ার গালগল্প জুড়বে। বেশির ভাগই নদী ভাঙার আগে যখন তার ভরা সংসার ছিল, ঘরগেরস্তি ছিল, সেসব নিয়ে। শুনতে হয় বলে জবা শুনে যায়, বিশ্বাস করে না। দুই বেলা নাকি আড়াই সের দুধ পেত দুইটা গাই দুইয়ে। ভাতের অভাব কী জিনিস জীবনে দেখে নাই—মানে যত দিন জমাজমি, ঘর-দুয়ার ভাতারখাগি পদ্মার পেটে যায় নাই।

কতক্ষণ বুড়ির ভ্যাজরভ্যাজর শোনা যায়! জবা মাঝে মাঝে ঘরে টিপতালা মেরে এদিকে-ওদিকে যায়। দূরে কোথাও না। এই যেমন তোরাবের টঙের দোকানে বা বেড়িবাঁধের দিকে, যেখান থেকে দূরে ইটভাটার চোঙগুলো নজরে পড়ে, গোল্লা গোল্লা কালো ধোঁয়া মেঘের মতো ওড়ে। মায়ের এসব বরদাশত হয় না। যদি জানতে পারে ঘর ছেড়ে বেরিয়েছিল, এমনকি তোরাবের দোকানেও গেছে, দুমদাম কিলাবে।

গত রাতেও এক দফা হয়ে গেছে। বস্তির শেষ মাথায়, যেখানে এনজিওওয়ালারা নাইট ইসকুল করবে বলে শামিয়ানা খাটিয়ে বক্তৃতা আর গানের ফাঁকে এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম বাজাচ্ছিল, শুনে তার খুব ইচ্ছা করছিল একচক্কর ঘুরে আসতে। গিয়েওছিল। সুন্দর সুন্দর বড় ঘরের মেয়ে-মহিলারা নাকে কালো চশমা, হাতে ভোম্বা মোবাইল নিয়ে কাজের তদারক করেছিল। ওদের একজন দেখতে গোলগাল পাকা পেয়ারার মতো, তাকে নাম জিজ্ঞাসা করেছিল। পড়ে কি না জানতে চাইলে সে লজ্জায় মাথা নেড়ে বলেছিল কেলাস ফাইভ। আসলে পড়া যে বাদ দিয়েছে সে কথা বলে লজ্জাটাকে আর বাড়তে দেয়নি। মহিলাটা ভালো, তাকে কাছে ডেকে বলেছিল নাইট ইসকুলে ছোট-বড় সবার পড়ার বন্দোবস্ত হবে, সে যেন আসে, খরচাপাতি লাগবে না। বলে তাকে অবাক করে, এদিকে এসো তো—মাগো মা, কী মায়া গলায়—বলে তার কাঁধে হাতের বেড় দিয়ে মোবাইলে ছবি তুলেছিল। তাকে দেখিয়েওছিল ছবিটা।

মায়ের কাছে কি খবর চাপা থাকে! ক্যান গেছিলি হারামজাদি—বলে কিল আর কিল।

মাকে আসতে দেখে কিল খাওয়া পিঠের ব্যথাটা যেন টনটন করে উঠল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করল মা কী করে। এখানে তাকে দেখে কি গত রাতের মতো হাত দুটো আবার চালু করবে? আশ্চর্য হলো, মা যেন তাকে দেখেও না দেখার মতো ত্যারচা চোখে একবার তাকিয়ে বলল, চল, কাম আছে।

পেছন পেছন চলতে গিয়ে জবা ভাবল, মা যদি উল্টাপাল্টা কিছু শুরু করে, সে মুখে যা আসবে বলবে। তোরাবের দোকানে বা বেড়িবাঁধের দিকে যে যায়, কোনো কুমতলবে তো যায় না। ঘরের মধ্যে গরমে সিদ্ধ হয়ে সারাটা দিন কিভাবে কাটায়, মা খোঁজ রাখে? তা-ও যদি নড়াচড়ার জায়গা থাকত! মা যদি আজ তেড়িবেড়ি করে, সাফ সাফ মুখের ওপর বলবে, হয় তার জন্য ফ্যাক্টরিতে কাজ দেখতে, নয় তাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি মানে কিলাকিলি বন্ধ করতে। এইটুকু ঘরে সে টিকতে পারে না।

ঘরে ঢুকে মা তেমন কিছুই করল না। সাবান নাই আগে কস নাই ক্যান—বলে তার দিকে একবার তাকাল, তারপর আস্তে আস্তে বলল—এইখানে আর না, কাউয়া আইসা পড়ছে।

থতমত খেয়ে মায়ের মুখে তাকিয়ে জবা যা বোঝার বুঝল। এ নিয়ে কয়বার হলো? কাউয়া আসে আর মা তাকে নিয়ে তল্পিতল্পা গোটায়। এর আগে, তার জন্মের আগে, মায়ের বিয়েরও আগে, মা যখন ছোট, তখনো এভাবে এক জায়গা ছেড়ে অন্য জায়গায় ভেগেছে। সে সময় মায়ের মা, তার নানি থাকত মায়ের সঙ্গে। নানিই ভাগত মাকে নিয়ে, এখন মা ভাগে তাকে নিয়ে।

ছোটবেলার কথা মনে নেই, তবে চার বছর আগে যখন মা তাকে নিয়ে এক রাতে এই বস্তিতে এসে উঠল, সে সময়ের ঘটনা জবার পরিষ্কার মনে আছে। তারা তখন থাকত আগারগাঁও বিএনপি বস্তিতে। মা কাজে যেত মিরপুরে এক গার্মেন্টে। খুব ভোরে বের হতো। বাসে করে অনেক পথ। প্রায় দিনই তাকে ঘুমে ফেলে চলে যেত। রাতে খাওয়ার পর ভাতের ডেকচিতে পানি দিয়ে রাখত। ভোরে মা সেই পান্তা খেয়ে তার জন্য ঢেকে রেখে যেত। বেশি করেই রাখত, পেট ঠেসে খাওয়ার পর দুপুর পর্যন্ত তেমন খিদাটিদা টের পেত না। তবে বিকাল নাগাদ খিঁচ-ধরা খিদায় মাথা ভোঁ ভোঁ করত। মা বুদ্ধি করে ঘরে মুড়ি রাখত, মুড়ি আর পানি খেয়ে খিদা চাপা দেওয়া চলত। ঘরটা ওখানে এত ছোট ছিল না, আর বস্তির ভেতরে এদিকে-ওদিকে কিছু খোলা জায়গা ছিল, যেখানে সারা দিনই কাচ্চাবাচ্চাদের ক্যাঁচম্যাচ, খেলা, মারামারি। জবাও যেত। খেলার টানে যেত। মা না ফেরা পর্যন্ত ইচ্ছা করত না খেলা ফেলে ঘরে যায়। কোনো দিন মা-ই চুল ধরে টেনেহিঁচড়ে ঘরে ঢোকাত। ছোট ছিল, চুলের ওপর দিয়েই যেত, কিলাকিলি তখনো শুরু হয়নি।

বছরখানেকের মতো ছিল ওখানে। এক রাতে মা বলল, আমরা আইজ এইখান ছাইড়া যামু। ঘুমাইবি না খবরদার। কেউ য্যান ঠাওর না পায়। কপাল ভালো, মা তাকে বেশি হাঁটায়নি। কয়েকটা বোঁচকাবুঁচকি মা বস্তির একটা চিপা পথ দিয়ে বের করে রাস্তায় এনে রেখেছিল। একবারে আনেনি, তাকে পাহারায় রেখে কয়েকবারে এনেছিল। তারপর রিকশায় বসে ঘুমে ঢুলে ঢুলে বাতাস খেতে খেতে অনেক রাতে এখানে এসে পৌঁছেছিল। মা আগেই সব বন্দোবস্ত করে রেখেছিল।

গত চার বছরে কাউয়ার কথা একবারও না শুনে আজ যখন হঠাৎ শুনল, সে চমকে মায়ের মুখে তাকিয়ে নিজেকে সামলে নিয়েছিল। কিছু জানতে চাওয়ার দরকার নাই। কাউয়া এসে গেছে এটাই বড় কথা। কিন্তু এবার তো জিনিসপাতি কম না। আগারগাঁও ছাড়ার সময় মাত্র কয়েকটা বোঁচকাবুঁচকিতে হয়ে গিয়েছিল। এখন তো তারা দুজন শুতে পারার মতো একটা চৌকি আছে, পিঁড়ি আছে, এমনকি আলনা পর্যন্ত। এ ছাড়া কম্বল-তোশক-বালিশ, চালের মটকা, হাঁড়িকুড়ি, টিনের ট্রাংক। কাউয়ার কথা মা হয়তো ভুলে গিয়েছিল, না হলে এত কিছুতে ঘর ভরায়! কী করবে, সব ফেলে যাবে? ঘর ভাড়া দিয়ে দিলে অবশ্য মুশকিল আসান। কিন্তু ঘর ভাড়ার টাকা কি আছে মায়ের কাছে? কোথায় যাবে?

 

তিন.

কুসুম পষ্ট মনে করতে পারে, সে যখন জবার চেয়েও অনেক ছোট, মায়ের সঙ্গে এক জায়গা ছেড়ে আরেক জায়গায় পালাত, ভয়-ডরের কারণ বলতে ছিল মা-ই। নতুন জায়গা কেমন, সেখানে মা কী কাজ করবে, থাকবে কোথায়, খাবে কী—এসবের চেয়ে মা যে কখন তার ওপর হামলে পড়বে, খিস্তি করবে, মারবে—এ চিন্তাই তাকে কাবু করে রাখত। দোষটা তার, তার জন্যই মায়ের ভোগান্তি—এ কথা শুনে শুনেই সে বড় হয়েছে। কোন কামে যে বাঁচাইয়া রাখছিলাম, যুদি নুন দিয়া খালাসের বাদেই মাইরা থুইতাম, বাঁইচা যাইতি, আমিও বাঁচতাম। মা যখন রাগে-দুঃখে এসব বলত আর কাঁদত, কুসুম জানতে চাইত না কী তার দোষ। খুব ছোটবেলা থেকে কথাগুলো শুনে শুনে মনে হতো, সব মা এভাবেই বলে। তবে একটা ব্যাপারে সে নিশ্চিত ছিল, সব মা কাউয়ার কথা বলে না।

মনে আছে, প্রথম যেবার মায়ের মুখে কাউয়ার কথা শুনেছিল, সে জানতে চেয়েছিল, কাউয়া ক্যান? মা ঝামটে উঠেছিল, বুজোস না ক্যান কাউয়া—কাউয়ার কাম তো কা কা কইরা ঢোল পিটান। তার পরও বোঝেনি। মা ভেঙে বলেনি। নিজে নিজে বুঝতে তার অনেক সময় লেগেছিল।

সে তো মায়ের আমলের ঘটনা। তার নিজের আমলে সে জবাকে বোঝার জন্য বেশি দিন বসিয়ে রাখেনি। সেই যেবার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের কাছে চেরাগি বস্তি ছেড়ে আগারগাঁও আসার আগে কুসুম তার মায়ের গলা নকল করে জবাকে বলেছিল, কাউয়া আইসা গেছে, জবা কী বুঝে মাকে সাহস দিয়েছিল—কাউয়ারে ডরাও? কুসুম সে সময় আট-নয় বছরের এইটুকু জবাকে কাউয়া-কাহিনি শুনিয়েছিল।

কী বুঝতে কী বুঝবে এ নিয়ে মনে খটকা ছিল। তবে মেয়ে তো, বয়স যত কমই হোক, বুঝবে এ ধারণা থেকেই ভেবেছিল বলে ফেলা দরকার। শোনার পর আচানক গল্পটা হয়তো জবার মন্দ লাগেনি। আর মনের কিছু খটকা যে এতে দূর হয়েছিল তা সে সময় তার কথায়ই ধরা পড়েছিল। জবা বলেছিল, কাউয়া তাইলে কাউয়া না, মানুষ। মজাই পেয়েছিল। তারপর বলেছিল, কাউয়ার ডরে আমার নানি কলকার চরে ভাইগ্যা গ্যাছে। আর বাপজানও আমগোরে ছাইড়া গ্যাছে।

কুসুম জবাব দেয়নি। পুরো ঘটনা আরো খুলে, ভেঙে বলতে জবা কতটা বুঝেছিল কে জানে, দিন কয়েক যেতে সময়-সুযোগ পেলেই কুসুমের কাছে তার নানির কথা জানতে চাইত। কোনো দিন তো দেখেনি। নানি কি খুব সুন্দরী ছিল? মিলিটারিরা যে নানিকে ধরে নিয়ে গেল, আটকে রাখল, আর মা যে বলল আটকে রাখার ফলেই মায়ের জন্ম, সুন্দরী ছিল বলেই? তারপর নিজের বুদ্ধির তারিফ করে বলল, বুজছি, এই জইন্যই নানির বিয়া অয় নাই, আমার নানা নাই, তুমারও বাপজান নাই। যাগো বাপ নাই, বাপের ঠিকঠিকানা নাই, তাগো কী কয় আমি জানি। জাউরা কয়। তুমি জাউরা, না মা? টান টান থাপড়ে মেয়েটার কচি গাল রক্ত জমে নীল হয়ে ছিল কয়েক দিন।

থাপড় খেয়েই কি না, ওই বয়সে যতটা বোঝার কথা না, জবা বুঝে গিয়েছিল। অথচ কুসুমকে তার মা লুকিয়েছিল। বাপের কথা জানতে চাইলে বলত, মইরা গ্যাছে তুই অওনের আগে, কলেরায়। তবে রেগে গেলে জাউরা বলে গাল দিতে ছাড়ত না। কুসুম বোকাই ছিল, মরা বাপ নিয়ে মাকে ঘাঁটাঘাঁটিতে যেত না। মরে গেছে তো মরে গেছে, এ নিয়ে কথা তুলে কী লাভ! মা যখন বলত, কাউয়া এসে গেছে, ভাগতে হবে, তখন এক নাম না-জানা বিপদ ছাড়া তার মাথায় অন্য কিছু খেলত না।

অনেকটা দিন তাকে অপেক্ষায় রেখে মা যখন নিজের কাহিনি বলতে মুখ খুলেছিল, কেন জানি মনে হয়েছিল, মিলিটারির হাতে ধরা পড়ে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের কাছে বাংকারের মধ্যে দিনের পর দিন আটকে থাকার যন্ত্রণা-কষ্ট হয়তো মা ভুলে যেতে চেষ্টা করত, যদি না চেনা-পরিচয়ের মানুষের দেখা মিলত বা অচেনা মানুষও তাকে চিনে ফেলত। মা বলত, এট্টুন দ্যাশ, কই যাই! আমার কী, ভাগি তো তোর লাইগ্যা। চিটাগান ছাড়লাম, মনো করলাম ঢাকা শওর বড় জায়গা, কে কার খোঁজ পাইব! লাভ অইছে কিছু! কাউয়া নাই কুনখানে!

মায়েরও যে দোষ ছিল না কুসুম কী করে বলে! সরকার তো একটা মার্কা দিয়া ভাবছিল কামের কাম করছে—বীরাঙ্গনা। যুদ্ধে যারা গেছে—ঠেকায় পইড়া যাউক বা নিজে সাইধা যাউক—তারা বীর। কিন্তু মায়ের মতো যারা তারা বীর অয় ক্যামনে! মিলিটারি অত্যাচার করছে, দিনের পর দিন বাংকারে ন্যাংটা কইরা রাখছে, সেই জইন্য? কিন্তু সারা দেশ ঢুঁইড়া যারা তাগো বাইর করল, নিজেগো নাম কামানের লাইগ্যা মাইনসের সামনে আনল, ঘরবাড়ি, টেকা-পয়সার লোভ দেখাইয়া খবরের কাগজে নামধাম, ফটো ছাপল, এই জাউরাগুলানের বিচার করব কে! আইজ তারা একেকজন কত নামি-দামি! বীরাঙ্গনার খেতা পুড়ি। মায়ের দোষ, ওগো বদমাইশি ধরতে পারে নাই। বেকুবের লাহান ক্যামেরার সামনে নিজের অত বড় শরমের কতা কইছে, কইতে কইতে কানছে। এর পরে আর কিছু থাকে! ছবি দিয়া কাগজে নাম ছাপা অইব মায় কি কুনো দিন চিন্তা করছে! করে নাই বইলাই কাউয়া পিছে লাগছে। যারা চিনত না জানত না, তারাও চিনল-জানল। বীরাঙ্গনারে দেখল।

মায়ের এমনই কপাল, বাসাবাড়িতে কাজ নিয়েও টিকতে পারে নাই। ঘর ভাড়া লাগবে না ভেবে ছোটা কাজের চেয়ে বাঁধা কাজ পছন্দ করত। খাওয়া-থাকার চিন্তা করতে হবে না, আর তার দেখাদেখি কুসুমও কাজকর্ম শিখতে পারবে—এই ভরসায় মা হয়তো ভেবেছিল নিজেকে আড়ালে-আবডালে রাখতে পারবে, আর নিজেকে যদি আড়াল করতে পারে, কুসুমকে নিয়ে কিসের চিন্তা! কুসুমের জীবন তো তার মতো হতে পারে না। তার বিয়েশাদি হবে, স্বামী-সংসার হবে। কে আর তখন খোঁজ পাবে কে তার মা! হিসাবটা মায়ের মন্দ ছিল না। সে সময় চিটাগাংয়ে এক বড় ব্যবসায়ীর বাড়িতে—জায়গাটা যত দূর মনে পড়ে নাসিরাবাদ—ঠাঁই মিলতে মা হয়তো ভেবেছিল, যে ভুলটা করেছে সাংবাদিকদের সামনে মুখ খুলে, ছবি তুলতে দিয়ে, তার খেসারত যদি বান্দিগিরি দিয়ে করতে পারে, তা-ও ভালো।

পারল কই? মাস ছয়েক কোনো বিপদের আলামত পায়নি। কুসুমের বাপ মারা গেছে কুসুমের জন্মের পর পর, কলেরায় এক রাতের মধ্যে সব শেষ—এ নিয়ে যেমন সন্দেহের কারণ ছিল না, তেমনি ওর বাপের চেহারার নকশা কি ও পেয়েছে, গায়ের রং, বিড়ালের মতো কটা চোখ, মায়ের চেহারার সঙ্গে তো মিল নাই—এ ধরনের কথাবার্তায়ও রাতের ঘুম হারাম করার কারণ ছিল না। কিন্তু মায়ের কপালের ফের। সেই যে টিভি ক্যামেরার সামনে তাকে দাঁড় করানো হয়েছিল, মাথায় ঘোমটা থাকলেও কড়া আলোর ঝলকানিতে মুখটা যে তার কান্নাকাটি সত্ত্বেও পরিষ্কার, না চেনার উপায় নাই মা জানবে কী করে! বাড়িওয়ালি মহিলা যাকে তার মা আম্মা ডাকত আর যিনি তাদের বেশ পছন্দও করতেন—না করার কারণ ছিল না, মন পাওয়ার জন্য তার মা জান-প্রাণ দিয়ে খাটত, তাকেও খাটাত—সেই মহিলার হঠাৎ একদিন সে কী চেহারা!

ঘটনা সোজা। বিজয় দিবস ছিল সেদিন। একসাগর রক্ত আর কত মা-বোনের ইজ্জতের দামে দেশ স্বাধীন হয়েছে, এ কথা তো মুখে খালি খালি বললে হবে না। প্রমাণ হাজির করতে হবে। তো যারা মারা গেছে মানে শহীদ হয়েছে, তাদের তো আর পাওয়া যাবে না; পাওয়া যাদের যাবে, তারা এ জাতির প্রাণের ধন—বীরাঙ্গনা, অনেক কষ্টে আর মেহনতে যাদের বুকভাঙা দুঃখের কথা ধরে রাখা হয়েছে—যা না দেখলে, না শুনলে নয়।

বাড়িওয়ালি মহিলা তেড়েফুঁড়ে চেঁচালেন। কত বড় সাহস, আমার ঘরে মিছা পরিচয়ে এমন বদ মেয়ে মানুষ! বলে কিনা জামাই মরে গেছে মেয়ের জন্মের পরেই! আরে তোর যদি জামাই-ই, শ্বশুরবাড়ি পাকিস্তান গেলি না কেন! টিভি ক্যামেরার সামনে নিজের কাহন গাইতে শরম লাগল না তোর! বেরো হারামজাদি।

মা ছিল হদ্দবোকা। যদি ক্যামেরার সামনে না যেত, খবরের কাগজে বড় করে ছবি না উঠত, কাছের আত্মীয়স্বজনের বাইরে মায়ের কাহিনিটা চাউর হতো না। আর কী কপাল! মায়ের নাম ছিল শেফালী, ফুলের নামে নাম, সে জন্যই হয়তো নামটা ফাটল। বীরাঙ্গনার নাম বলতে শেফালী বেগম নামটাই আগে আসে। লোকে নিশ্চয় নামটা পছন্দ করে। জহর বিবি, তহুরা খাতুনের তুলনায় নামটা মানুষকে বেশি বেশি টানে।

চিটাগাং থাকার সময় থেকেই শুরু। কিছুদিন পর পর জায়গাবদল। দিন-রাতের বাঁধা কাজের মানুষ কে না চায়, বিশেষ করে অবস্থাপন্নরা। মা ওরফে শেফালীর কাজ জুটে যেত। সঙ্গে আট-দশ বছরের কুসুমের কারণে আপত্তির বদলে কেউ কেউ বাড়তি আগ্রহও দেখাত। ফুট-ফরমাশ খাটবে, কাজকর্ম শেখানোর জন্য মা তো আছেই, টিকে গেলে মায়ের পরে মেয়েকে রেখে দেওয়া যাবে। কিন্তু কয়েক মাস যেতে একটা না একটা ঝামেলা যেন উড়ে আসত। প্রথমে ফিসফিসানি, মা টের পেত। একবার তো, তারা তখন আগ্রাবাদে, এক জাহাজ কম্পানির বড়লোক মালিকের বাড়িতে, তাকেসহ মাকে পুলিশে দেয় আর কি!

সে বাড়িতে আরো কাজের মানুষ ছিল—মালি, দারোয়ান, ড্রাইভার ছাড়াও একজন মাঝবয়সী নার্স থাকত মালিকের বুড়ি মায়ের দেখাশোনার জন্য। তো সেই নার্স মহিলা কী কারণে কে জানে তাকে বেশ পছন্দ করত। কাজকর্মের ফাঁকে ডেকে নিয়ে গল্প করত। বাড়িঘরের কথা উঠলে মায়ের শেখানো মতো বলত নারায়ণগঞ্জ, আবার এও বলত ছোটবেলা থেকে মায়ের সঙ্গে ঢাকায়, নারায়ণগঞ্জের কথা তার মনে নাই। নার্স হয়তো এসব এমনিই জানতে চাইত। সমস্যা বাধিয়েছিল মা নিজে। সারাক্ষণ মাথা-কপাল এমনকি গালের আধাআধি ঢাকা আঁটসাঁট ঘোমটায় ঢেকে রাখত। এই ঘোমটাই কাল হলো। বাড়িতে এত কাজ—ঝাড়পোঁছ, কোটা-বাছা, রান্নাবাড়া—ঘোমটা যে কী করে সব সময় এত টাইটফিট থাকে এ নিশ্চয়ই কারো না কারো মাথায় ঢুকে গিয়েছিল। বাইরে তো যেতে হচ্ছে না, ঘরের ভেতরেই কামকাজ, এতে ঘোমটার এত জবরদস্তি কেন! কী হলো হঠাৎ, সেই নার্স মহিলাই মায়ের পেছনে লাগল। কবে থেকে লেগেছিল মা নিশ্চয়ই টের পায়নি, পেলে সাবধান হতো—তাকে নিয়ে ভেগে পড়ত। সেই সুযোগ মা পেলে তো! আর তাই একদিন কায়দা করে পেছন থেকে জোরে টেনে মায়ের টাইটফিট ঘোমটাটা খুলে নার্স শায়লা যখন আঁতকে উঠে চেঁচাল, তুমি শেফালী বেগম না?—সারা বাড়িতে তখন হুলুস্থুল, চোর ধরা পড়েছে।

কলকার চরে এখন শেফালী বেগমের কেমন কাটছে এ নিয়ে ইদানীং কুসুম বড় একটা ভাবে না। ফরিদপুর জেলা সদর থেকে বাস বা টেম্পোতে করে সিএমবি ঘাট, তারপর ট্রলারে তিন সাড়ে তিন ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে পদ্মার সেই চরে মা যে গেল তা তার নিজের ইচ্ছায়। সেও হয়ে গেছে অনেক বছর। মা যে সেই গেল, আর দেখা হয়নি, তবে বেঁচে আছে এটুকু কুসুম জানে। মা-ই মাঝেমধ্যে খবর পাঠায়। কুসুমের পক্ষে টাকা-পয়সা পাঠানোর উপায় নাই। ওখানে মোবাইলের নেটওয়ার্ক নাই, বিকাশে যে টাকা পাঠাবে সে পথ বন্ধ।

 মা ভেবেচিন্তে কাজটা করেছিল। ভেবেছিল সে সরে গেলে তার দুর্গতি কুসুমকে পাবে না। বলত, এট্টুন দ্যাশ, ভাইগা কই যাই! কিন্তুক তোরে আমার ছাড়ন লাগব, আমি থাকলে তোর রেহাই নাই। মরতে যুদি পারতাম কামের কাম অইত। চাইলেই কি মরা যায়! এমুন এক চরে যামু, কেউ বিচরাইয়া পাইব না। তুইও পাইবি না। মনো করবি দুইন্যায় একলা আইছস, মা বইল্যা কেউ তোর আছিল না, তু্ইও কেউর মাইয়া না। পারবি না?

কী পারবে? তার মায়ের ভাবনাচিন্তায় যে দুনিয়া চলে না এ যেমন শেফালী বেগম চোখের পানি মুছে যাওয়ার সময় বোঝেনি, কুসুমও কি আন্দাজ করতে পেরেছিল?

আজ সকালে এত বছর বাদে ফ্যাক্টরি গেটে যাকে দেখল—একনজর দেখেও চিনতে অসুবিধা হয়নি—সে তার দশ বছর আগে ছেড়ে যাওয়া স্বামীর পিঠাপিঠি বোন। খুব সম্ভব নতুন কাজে লেগেছে, বা হতে পারে আজই প্রথম। পালাতে তাকে হতোই। সে যে বীরাঙ্গনা শেফালী বেগমের মেয়ে, এ কথা দুই দিনেই চাউর হয়ে যেত। তখন সবার সামনে নাকে-মুখে কালি লেপ্টে সরতে হতো। আগেভাগে চোরের মতো ভেগে পড়ায় আর যা-ই হোক সেই ভোগান্তি থেকে তো বাঁচল। মনটা তার পরও খচখচ করছে, পুরো মাসের বেতন, আবার কয়েক দিনের ওভারটাইম। ভাগতে হবে এখান থেকেও। ঘরভাড়া বাকি, জিনিসপত্র ফেলে তবে কি আজ রাতেই? কোথায়?

ঘরে ঢোকার পর থেকে জবা একটা কথাও বলেনি। বড় তো হচ্ছে, বারো বছর বয়সে যতটা বড় হওয়ার কথা তার চেয়ে ঢের বেশি। বসে বসে হয়তো ভাবছে, কী আজব জীবন তার আর তার মায়ের! কুসুম নিজে একসময় যেমন ভাবত। তার ভাবনা এখন তার মেয়েকে পেয়েছে। আর কুসুম? মা শেফালী বেগমের ভাবনা মাথায় নিয়ে তার কি মনে হচ্ছে না সেও মায়ের মতো, তবে বীরাঙ্গনা না, পাকিস্তানি মিলিটারি তাকে পাবে কোথায়? তাকে যারা পেয়েছে তারা...


মন্তব্য