kalerkantho

গ ল্প

ভয়

হাবিব আনিসুর রহমান

২৫ জুন, ২০১৭ ০০:০০



ভয়

অঙ্কন : বিপ্লব চক্রবর্ত্তী

তারা দুজন একটা ভালো বাসা খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। আলো-বাতাস খেলে যায় এমন একটা নিরিবিলি খোলামেলা বাসা পাচ্ছিল না কোথাও।

কোথাও বলতে এই শহরে। রঞ্জুর অফিস আগারগাঁওয়ে। শ্যামলী-আদাবর থেকে পীরেরবাগ কাছেপিঠে ভালো একটা বাসার জন্য হন্যে হয়ে ঘুরেছে সে আর নন্দিতা। কোথাও পায়নি। তারা দুজনই গাছ ভালোবাসে খুব। কিন্তু দুর্ভাগ্য তাদের যে এই শহরে আশপাশে গাছপালা আছে এমন একটা বাসা খুঁজে পেল না কোথাও।

অনেক ঘোরাঘুরির পর একদিন হঠাৎ কল্যাণপুরে তারা পেয়ে গেল তেমন একটা বাসা! যেমন বাসা খুঁজছিল তারা।

 

এখানে দাঁড়ালে সুন্দর সময় কেটে যাবে আমাদের, তাই না? প্রথম দিন বাসা দেখতে এসে বারান্দায় দাঁড়িয়ে নন্দিতা বলেছিল, বারান্দাটা খুব ভালো লেগেছে আমার, সামনের গাছটাও, কোনো বাসার কাছে এমন খোলামেলা স্পেস, বাতাস আবার গাছ—এসব পাবে না, বাসাটা নিয়ে নাও রঞ্জু। দক্ষিণ দিকে খোলা মাঠের মাঝখানে আকাশছোঁয়া বিশাল গাছটা দাঁড়িয়ে।

চারপাশটা উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। ভেতরে ঢোকার কোনো সুযোগ নেই। হয়তো ভবিষ্যতে এখানেও উঁচু ভবন উঠে যাবে। তিন দিকে বড় বড় ভবন থাকলেও দক্ষিণের এই জায়গাটা খালি। এই খোলা জায়গা দিয়েই আলো-বাতাস আসবে, স্বস্তি দেবে। প্রথমে রাজি হয়নি রঞ্জু আহমেদ, কারণ বাসাটা তাদের দুজনের ছোট পরিবারের জন্য অনেক বড়, আবার ভাড়াও বেশি। তার পরও রঞ্জু নন্দিতার কথার পেছনের যুক্তি মেনে নিয়ে তিন রুমের এই বাসাটা ভাড়া নিয়েছিল।

বর্ষায় ডালপালা গাঢ় সবুজ হয়ে উঠল গাছটার। ভোরবেলা পাখি এসে বসে ডালে, কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত হয় সকাল, পাখিময় হয়ে ওঠে। তার সঙ্গে দখিনা বাতাস! সারা দিন রোদ আর বাতাসের মধ্যে বারান্দায় দাঁড়িয়ে এসব দেখে নন্দিতা।

সকালে অফিসে যায় রঞ্জু। দুজন ঘুম থেকে ওঠে খুব ভোরে। নন্দিতা নাশতা করে টেবিলে দেয়, তারপর কিচেনে ঢুকে যায় দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করতে। নাশতা খেয়ে তারা দুজন চা হাতে নেয়। টিফিন বক্সে দুপুরের খাবার দিয়ে দেয় নন্দিতা। তারপর রঞ্জু অফিসে আর নন্দিতা তার সংসারে মনোযোগ দেয়। তারপর বারান্দায় দাঁড়িয়ে বিশাল গাছটার দিকে তাকিয়ে থাকে। এ সব কিছু নিয়েই তাদের দুজনের সময় কাটে প্রতিদিন।

নন্দিতা সব সময় কিছু না কিছু একটা করেই। টবের ফুলগাছের যত্ন, তাতে পানি দেওয়া, ক্যাকটাসগুলোর জন্য নার্সারি থেকে আলাদা বালু আনা। সার-মাটিও আনে অন্য ফুলগাছগুলোর জন্য। ফুল ফুটলে ড্রয়িংরুমের ফুলদানিতে তা সাজিয়ে রাখা। আবার কখনো কখনো সে চুলোর ওপর তাওয়া বসিয়ে চাল ভাজে। সরিষার তেল আর পেঁয়াজ দিয়ে মাখিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে খায় আর টিভি দেখে। দেশের আনাচকানাচে কী হচ্ছে জানার জন্য খবর দেখে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক আর এনিম্যাল প্ল্যানেট তার খুব প্রিয় চ্যানেল। তবে সে কখনো হিংস্র চিতার হরিণশাবক হত্যা বা খাওয়ার দৃশ্য দেখে না। সে দেখে—আমাজনের গহিন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে খরস্রোতা নদীগুলো এঁকেবেঁকে সামনে যাচ্ছে। ওই নদীর ধারের বিচিত্র পশু-পাখি, পানিতে মাছ আর জলজ প্রাণীদের জীবন আর বিশাল আকাশস্পর্শী বৃক্ষগুলোর শাখায় শাখায় অসংখ্য পাখির নাচানাচি। গাছে গাছে সাপ, বাঁদর আর নানা জাতের লতাপাতা। এসব দেখে আনন্দ পায়, সময় কেটে যায় তার। চা খায় নন্দিতা, ওখানেই বই নিয়ে বসে। বই পড়ে আর গুনগুন করে গান গায়। নন্দিতা যা কিছু করে, তার পেছনে লক্ষ্য থাকে একটাই—তা হলো মনটাকে সতেজ রাখা। সে জানে, তার মন ভালো থাকলে সে নিজে ভালো থাকবে, তার সঙ্গে রঞ্জুও। রঞ্জু ঘরে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে তাকে নিয়ে সোফার ওপর বসে নানা গল্প শুরু করে দেয়, কিন্তু ওটা মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য। তারপর চলে যায় চা করতে। রঞ্জু ফ্রেশ হয়ে এসে নন্দিতার মুখোমুখি বসে চা খায় আর গল্প করে। নন্দিতা জানে, কবিতা লেখা, কবিতা পড়া আর চা খাওয়া রঞ্জুর খুব প্রিয়।

আজ ছুটির দিন। তারা দুজন দাঁড়িয়ে আছে বারান্দায়। আকাশজুড়ে মেঘ করেছে। নন্দিতা চিৎকার করে বলে ওঠে—রঞ্জু, বৃষ্টি হবে, দুজন মিলে দেখব! হ্যাঁ, দেখব, রঞ্জু বলল। নন্দিতা সব সময় কিশোরী মেয়ের মতো আচরণ করে। কথাবার্তাও বলে তেমন। কিভাবে সময় কাটায় নন্দিতা? তা বুঝতে পারে, যখন রঞ্জু ছুটির দিনে বাসায় থাকে। তাদের তিনটি ঘর, একটা বড় বারান্দা, তার সঙ্গে কিচেন আর বাথরুম, বারান্দায় তার নানা গাছের টব। এই সব ঘর-বারান্দার কাজ করে করে ক্লান্ত হয়ে পড়ে নন্দিতা। সে বলে, শোনো, আমি যদি সংসারটাকে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে রাখি, তাহলে কিন্তু কাজ ফুরাবে না। একটা শেষ করলে আরেকটা। কাজ শেষ হতে চায় না।

বৃষ্টি শুরু হলো। তার সঙ্গে বাতাস। বাতাস উড়ে এসে তাদের শরীর জড়িয়ে ধরল। বারান্দা থেকে নন্দিতা হাত বড়িয়ে দিল শূন্যে। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি এসে স্পর্শ করল ওর হাত। রঞ্জুও বৃষ্টি ধরতে হাত বাড়ায় বারান্দার বাইরে। এই ছেলেমানুষি খেলায় ওরা দুজন ভীষণ আনন্দ উপভোগ করে। নন্দিতা বলেছিল, ওই বড় গাছটার নাম রেইনট্রি।

বৃষ্টি থেমে গিয়ে রোদ উঠল। পাখি উড়ে এসে বসা শুরু করল গাছটায়। কেমন একটা মাটি মাটি গন্ধ ভেসে আসতে লাগল বাতাসে। গাছের সবুজ পাতার ওপর রোদ পড়ে ঝিকমিক করছিল। সেদিকে তাকিয়ে নন্দিতা বলল, একটা গান গাই রঞ্জু? রঞ্জু বলে, অবশ্যই গাইবে, গাও। একটু দম নিয়ে নন্দিতা গাইতে শুরু করল—ওই গাছের পাতায়, রোদের ঝিকিমিকি, আমায় চমকে দাও, চমকে দাও, দাও দাও দাও, আমার মন মানে না...। লতা মুঙ্গেশকরের গান, গানটা খুব ভালো লাগল রঞ্জুর, এত চমৎকার গায় নন্দিতা, অবাক হলো রঞ্জু। —আচ্ছা, একটা হারমোনিয়াম কিনে দেব, নেবে?—এখন না, পরে। পরে মানে বেশ পরে, একটা একটা করে শখগুলো পূরণ করব, সময় হলেই তোমাকে বলব রঞ্জু, কেমন?

গভীর রাতে ঘুমন্ত রঞ্জুর একটা হাত এসে পড়ে নন্দিতার বুকের ওপর, হাতটা বুকের সঙ্গে চেপে ধরে থাকে নন্দিতা। রঞ্জুকে মৃদু ধাক্কা দেয় সে, বলে—শুনছ?—বলো, আধো ঘুম আধো জাগরণে রঞ্জু বলে, বলো শুনছি। —আমার সবচেয়ে বড় শখটার কথা তোমাকে বলব এখন, শুনছ?—হ্যাঁ, বলো। —আমার না একটা ছেলের খুব শখ, ও স্কুলের ব্যাগ ঘাড়ে নিয়ে স্কুলে যাবে, ওর নাম হবে রনি, রঞ্জুর র আর নন্দিতার ন—দুটি মিলিয়ে রনি, তোমার মতো ঝাঁকড়া চুল থাকবে মাথায়, কেউ কথা বললে সেটি শুনে একটু মৃদু হাসবে তোমার মতো। নন্দিতার কথা শুনে হো হো করে হেসে ওঠে রঞ্জু, উঠে বসে। —একি, তুমি জেগে আছ!—হ্যাঁ, আমি জেগে জেগে তোমার কথা শুনছিলাম। নন্দিতাকে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে গভীরভাবে চুমু খায় রঞ্জু। দুজন দুজনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ে বিছানায়, কথা বলে তাদের অনাগত সন্তান নিয়ে।

নতুন বাসায় কিছুদিন যেতেই নন্দিতার মধ্যে পরিবর্তন দেখতে পেল রঞ্জু। এখন সে খুব মনোযোগ দিয়ে টিভির খবর দেখে নিয়মিত। অফিস থেকে বাসায় ফিরলেই সে রঞ্জুকে নানা প্রশ্ন করে। মন্দিরগুলোতে নিরীহ পুরোহিত খুনের খবর দেয় রঞ্জুকে—তুমি তো অফিসে ছিলে, শুনেছ এসব? একদিন বলল—আজ এক নিরীহ জাপানিকে খুন করেছে, রাস্তাঘাটে বিদেশিরা চলাফেরা করতে ভয় পাচ্ছে! তারপর এক রাতে ওরা দুজন পাশাপাশি বসে দেখল, গুলশানের রেস্তোরাঁয় কিভাবে মানুষগুলোকে খুন করল জঙ্গিরা! 

অফিসে বসেও একাকী এসব ভাবছিল রঞ্জু। চারপাশে জঙ্গিদের ভয়! খিলগাঁওয়ে খুন করা হয়েছে আরো একজনকে। তারপর বইমেলায় একজন লেখককে খুন করে চলে গেল। দিনদুপুরে প্রকাশক খুন হলো বইপাড়ায়। রঞ্জু কবিতা লেখে, যারা খুন হচ্ছে তারা সব রঞ্জুর কাছের মানুষ, খুব প্রিয়জন!

ওয়াজিউল্লাহ সাহেব রঞ্জুর কলিগ, অফিসে হঠাৎ একদিন বললেন,

নতুন বাসাটা কেমন রঞ্জু সাহেব, কয়টা রুম?

ভালো, আগেরটার চেয়ে তো অনেক ভালো, রুম তিনটা।

বারান্দা, আলো-বাতাস—এসব?

হ্যাঁ, বারান্দা একটা আছে বেশ বড়, দক্ষিণ দিকে একটা বিশাল গাছও আছে, ওদিকটায় ঘরবাড়ি ওঠেনি, আলো-বাতাস আছে বেশ, সব মিলিয়ে ভালো।

বাড়িতে কে কে আছেন?

আমার স্ত্রী আর আমি—এই দুজন।

মুরব্বি কেউ নেই, আপনার মা, শাশুড়ি বা এমন কেউ?

না, তেমন কেউ নেই।

তাহলে আপনি অফিসে চলে এলে আপনার স্ত্রী একা থাকেন?

হ্যাঁ, একাই তো থাকে, কী করব বলুন?

আপনার মাকে আনতে পারেন না?

আগের বাসায় মা ছিলেন মাস ছয়েক। মা থাকেন খুলনায়। আমার এখানে এসে কিছুদিন থাকলে বলেন, আমাকে খুলনায় রেখে আয়, এই বন্দিজীবন ভালো লাগে না আমার।

একা একা ভাবি কী করেন বাসায়?

মানে?

মানে ভাবি একা একা থাকেন কিভাবে, বোর লাগে না?

কী করবে বলেন, রান্না করে, টিভি দেখে আর বারান্দায় দাঁড়িয়ে গাছ দেখে, সময় কেটে যায়।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে, বলেন কী! এক কাজ করেন, আপনার মা থাকতে না চাইলে আপনার শাশুড়িকে এনে রাখেন, তাহলে ভালো হবে। সারা দিন আপনি থাকেন না, ভাবি একা থাকে, বিষয়টা কেমন অ্যাবনরমাল নয় কি?

আচ্ছা, ভেবে দেখব।

রঞ্জু এখানেই কথা শেষ করে দেয়। ভাবালুতা পেয়ে বসে তাকে—এসব লোকের কি কখনো বুদ্ধিসুদ্ধি হবে না! কার বউ কোথায় কিভাবে সময় কাটাবে, সেটা একান্ত তাদের নিজেদের বিষয়! ওয়াজিউল্লাহর বউকে একবার দেখেছিল রঞ্জু অফিসের পিকনিকে, পা থেকে মাথা পর্যন্ত কালো বোরকায় ঢাকা, চোখের সামনে আলাদা কালো জালের অতিরিক্ত কাপড় আবৃত! ওয়াজিউল্লাহর বউ কোথায় কী করছে না করছে তা তো কখনো জিজ্ঞাসা করেনি রঞ্জু। তাহলে সে কেন তার বউ নিয়ে এত চিন্তা করছে! মানুষের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কথা বলা কি যুক্তিসংগত? সব পরিবারেই প্রাইভেসি বলে একটা বিষয় থাকে, সেসব নিয়ে কথা বলার দরকার কী!

একদিন অফিস শেষে পিয়ন কালাম এসে বলল—স্যার, আপনারে একটা কথা বলতে চাই। রঞ্জু অবাক হয়ে তাকায় কালামের দিকে—কী কথা কালাম?—স্যার, কথাটা শুইনা আপনে আমারে বকা দিয়েন না কইলাম। —না, না, বকব কেন, তুমি বল। —কথাটা যে আপনারে কেমনে বলি, ভয় করতাছে। —বলো, ভয়ের কিছু নেই। —গতকাইল অফিস শ্যাষে ওয়াজিউল্লা স্যার আর বেল্লাল স্যারে আপনারে নিয়া কথা বলতাছিলেন। —আমাকে নিয়ে? অবাক হয় রঞ্জু!—হ স্যার, আপনারে নিয়া, মানে আপনার ফ্যামিলি নিয়া। —কী কথা, বলো আমাকে, তোমার কোনো ভয় নেই। —কাউরে কইয়েন না স্যার। —না, না, কাউকে বলব না, তুমি নির্ভয়ে বলো। —স্যারেরা বলতাছিলেন, আপনের ওয়াইফ নাকি হিন্দু, তিনার নাম নাকি নন্দিতা রায়, বিয়ার সময় কাজি অফিসে গিয়া নাম পাল্টাইয়া নন্দিতা আহমেদ হইছে। কথাটা শুনে ভীষণ রেগে যায় রঞ্জু, ভেতরে ভেতরে সে কাঁপতে থাকে, খুব খারাপ লাগে তার। রঞ্জু বলে—কালাম, তুমি নিজে কানে শুনেছ?—হ স্যার, আমি নিজে কানে শুনছি, তারা বলছেন এই সব কথা। ভীষণ খারাপ লাগে রঞ্জুর, মনে হলো কেউ হয়তো ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে চাইছে তাকে।    

হঠাৎ একদিন দুপুরে দরজায় শব্দ হলো থপ থপ। খুব জোরে। কেউ খুব জোরে থাবা দিয়ে চলেছে। ডোরবেল না বাজিয়ে এভাবে থাবা দিচ্ছে কেন! নন্দিতা ছুটে গিয়ে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বলে—কে? বাইরের লোকটা তখন চিৎকার করে বলে চলেছে—আগে দরজা খোলেন ভাবি, আমি ওবায়দুল্লাহ আনসারী, জলদি দরজাটা খোলেন আগে, না খুললে বুঝবেন কী করে? দরজার সিটকিনি খুললেও সেটি পুরোটা খোলে না। দরজার সঙ্গে একটা চেইন দিয়ে লক করা থাকে, বিঘতখানেক খোলার পর আর খোলে না। নিরাপত্তার জন্য বাড়ির মালিক এই ব্যবস্থাটা করেছেন। দরজা খোলে নন্দিতা, দেখে একজন লোক দাঁড়িয়ে তার সামনে। তার মুখে দাড়ি, মাথায় টুপি, পরনে পাজামা-পাঞ্জাবি, কাঁধে ঝুলছে একটা কালো ব্যাগ। তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে একজন, যার পুরো শরীর কালো বোরকায় ঢাকা! লোকটা ছটফট করছে, নন্দিতা বলল—কাকে চাচ্ছেন আপনি?—এটা হাফেজ সিফায়েতউল্লাহর বাসা না?—না। —এটা কত নম্বর ফ্ল্যাট?—এটা থ্রি-এ, এটা সিফায়েত সাহেবের বাসা না, ভুল বাসায় নক করেছেন। —ও এটা থ্রি-এ। লোকটা পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে দেখল, তারপর বলল, আমি ফোর-এ নম্বরে যাব। লোকটা বোরকা পরা মহিলাকে নিয়ে সিঁড়ির দিকে হেঁটে গেল।

গভীর রাতে ঘুমের মধ্যে রঞ্জুকে ধাক্কা দিয়ে কিছু বলতে চায় নন্দিতা। ঘুমের ভেতর ধাক্কা খেয়ে রঞ্জু চিৎকার করে ওঠে—কে, কে?—রঞ্জু ওঠো, শুনতে পাচ্ছ?  বিছানার ওপর মুখোমুখি বসে রঞ্জু আর নন্দিতা। রঞ্জু ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হলেও নন্দিতা হতে পারল না। সে রঞ্জুর কানের কাছে মুখ এনে বলল—রঞ্জু, নতুন একটা বাসা দেখো, প্লিজ! রঞ্জু নন্দিতার কথা শুনে বিস্মিত হয়! বলে—কেন, ছয় মাসও হয়নি আমরা এই বাসায় উঠেছি!

এই বাসায় আমি থাকতে পারব না, তুমি থাকতে পারবা না, এখান থেকে রনি একা স্কুলে যেতে পারবে না।

এসব কী বলছ তুমি, আচ্ছা তুমি এমন করলে হবে?

রঞ্জু, ধরো আমাদের ওপরতলায় প্রচণ্ড শব্দে একটা বোমা ফাটল অথবা কেউ এসে আমাদের দুজনকে ছুরি দিয়ে জবাই করে রেখে গেল! তাহলে কী হবে একবার ভেবে দেখ।

কেন, কিসের জন্য তুমি এসব বলছ নন্দিতা? বাসা পাল্টানো কত কষ্টের, তা তো তুমি জানো! আর বোমাই বা ফাটবে কেন, জবাই বা করবে কেন?

রঞ্জু, প্লিজ! তুমি ‘না’ বোলো না।

গভীর রাতে হঠাৎ নন্দিতার এসব কথা শুনে রঞ্জু বোকা বনে যায়, ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে! নন্দিতা এমন অস্বাভাবিক আচরণ করছে কেন! আর কোনো কথা না বাড়িয়ে রঞ্জু বলে, বেশ তা-ই হবে, তুমি এখন ঘুমোও। রঞ্জু বুঝতে পারে কিছু একটা ঘটেছে, যেটা এখন বলবে না নন্দিতা, হয়তো পরে বলবে।

সেই রাতেই একটা শব্দে ঘুম ভেঙে গেল রঞ্জুর। বিছানায় উঠে বসল সে। নন্দিতা নেই বিছানায়! কোথায় গেল! বুক কেঁপে উঠল রঞ্জুর! কোথায় গেল? বাথরুমে? ডিম লাইটের অস্পষ্ট সবুজ আলোয় বাথরুমের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় রঞ্জু। না, বাথরুমে নেই নন্দিতা, কোথায় গেল! ড্রয়িংরুমে গিয়ে দেখে, নন্দিতা দরজার সঙ্গে কান লাগিয়ে কিছু শোনার চেষ্টা করছে। অস্পষ্ট আলোয় তাদের দুজনকে দুটি অশরীরীর মতো মনে হলো। পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে রঞ্জু বলে—কী হলো নন্দিতা, এখানে দাঁড়িয়ে কেন?—খুব ভালো করে শোনো তো, দরজার ওপারে কোনো পায়ের শব্দ পাচ্ছ? রঞ্জুও কান লাগায় দরজার পাল্লার সঙ্গে, শোনার চেষ্টা করে সত্যিই কোনো পায়ের শব্দ হচ্ছে কি না দরজার ওপারে!—না, কোনো শব্দ তো পাচ্ছি না, তুমি এমন কোরো না, প্লিজ! আমার খারাপ লাগছে, কারো পায়ের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি না আমি।

রঞ্জু নন্দিতার হাত ধরে বেডরুমে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দেয় বিছানায়। নন্দিতা বিছানায় শুয়ে খুব জোরে জাপটে ধরল রঞ্জুকে, তারপর বলল—ভীষণ ভয় করছে রঞ্জু!

সে রাতে দুজনের ঘুম এলো না কিছুতেই।


মন্তব্য