kalerkantho


উ প ন্যা স

ক্যাম্পাস ১৯৯৫

মোস্তফা মামুন

২৫ জুন, ২০১৭ ০০:০০



ক্যাম্পাস ১৯৯৫

‘এই প্যান্টে চলবে না। জিন্সের প্যান্ট নেই?’

‘আছে।

‘এই চুলেও চলবে না। ’

‘চুলে কোনো সমস্যা, ভাই? চুল তো আছে। ’

‘না, চুলের স্টাইল। এই তেলমাখা চিরুনি দেওয়া চুলে চলবে না। ড্যাশিং-ডিয়ারিং স্টাইল চাই। দু্ইটা স্টাইল আছে। হয় সাইড পাতলা, আর্মি ছাঁট। নইলে লম্বা চুল, পাংকু স্টাইল। ’

‘পাংকুটা পারব না ভাই, আর্মিটাই ভালো।

‘এই লেতুফেতু দাঁড়ানোতেও হবে না। বুক থাকতে হবে ফোলা। ’

‘বুক ফুলাব?’

‘আর বসলে পা থাকতে হবে পায়ের ওপর তোলা। মনে থাকবে তো?’

‘জি, মনে থাকবে। বুক থাকবে ফোলা আর পা পায়ের ওপর তোলা। ’

‘গেস্টরুমে কিংবা গেটে বসতে হবে। পাহারা দিতে হবে, যাতে অপজিশন হলের দিকে চোখ ফেলতে না পারে। ’

‘বসব। পাহারা দেব। অপজিশন পজিশন না নিতে পারে। ’

‘নেতাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। সালাম দিতে হবে। হাসিমুখে কথা বলতে হবে। ’

‘নেতাদের সম্মান করব। তাঁরা তো সম্মানিত মানুষ। ’

‘ঠিক আছে, তাহলে রুম নাম্বার ৫৩০-এ চলে যাও। ’

মিতুল ঠিক বিশ্বাস করতে পারছিল না। হলে সিট পাওয়া এত সোজা!

নেতার কাছে ওকে নিয়ে এসেছে ওর বন্ধু ফখরু। ও হলে থাকতে চায় শুনে ফখরু বলেছিল, ‘ব্যাপার না। বিকালেই চইলা আসো। ব্যবস্থা কইরা দিমু নে। ’

মিতুল মনে করেছিল কথার কথা। কতজনই তো এই দুই মাসে এসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

কিন্তু ক্লাস শেষে বেরোনোর সময় পেছন থেকে আবার ডাকে ফখরু, ‘দোস্ত, তাইলে তুমি কয়টায় আসতেছ?’

‘সত্যিই আসব?’

‘তাইলে কি মিথ্যা আসবা নাকি?’ ফখরু খুব উঁচুদরের রসিকতা হয়ে গেছে মনে করে হাসে। মিতুলও খুব হাসে। এখন ফখরুকে খুশি রাখতে হবে।

‘আসবা। একটা ছোট্ট ইন্টারভিউ। হ্যাঁ-হুঁ করবা, ব্যস বাকি ব্যবস্থা আমার। ’

‘তাহলে চলে আসব। ’

‘পাঁচটায় আইসা মামার চায়ের দোকানে খুঁজবা। না হইলে গেস্টরুমে গিয়া নাম বলবা। ওরা খুঁইজা বাইর কইরা দিব। ’

‘ব্যাগট্যাগ নিয়া আসব?’

‘তাইলে আবার কী? কাঁথা-বালিশ ছাড়া থাকবা কেমনে?’ ফখরু আবার হাসে। ওর বিশ্বাস, এটাও ভালো রসিকতা হয়েছে।

বিকেল পাঁচটার অনেক আগেই জিয়া হলের গেটে এসে নেমেছিল। ব্যাগও সঙ্গে ছিল তার, তবু ঠিক ভরসা হয়নি। হওয়ার কথাও নয়। এই দুই মাস হলে জায়গা পেতে ধরাধরি কিছু কম করেনি। প্রথমে গিয়েছিল মামার বন্ধু সাব্বির মামার কাছে। জিয়া হলে ওর সিট পড়েছে শুনে মামা বললেন, ‘কোনো সমস্যাই না। সাব্বির আছে। জিয়া হল তো ওর বেডরুম। ’

মামার সঙ্গে একদিন যাওয়া হলো সাব্বির মামার বাসায়। গিয়ে অবশ্য জিয়া হলে এই লোকের মালিকানা আছে এমন কিছু মনে হলো না। মহাখালী তিতুমীর কলেজের উল্টাদিকের গলিতে ঢুকে অনেক খানাখন্দ পেরিয়ে একটা দোতলা বাসা। তার নিচতলায় মেসমতো জায়গায় সাব্বির মামা থাকেন। সাব্বির মামাকে পাওয়া গেল না। পাওয়া গেল সঙ্গী আরেকজনকে। সে একটা নতুন প্যান্ট বানিয়ে এনেছে। সেই প্যান্ট বানানো যে খুব সুন্দর হয়েছে, দারুণ ফিটিং—এমন আলোচনায় অংশ নিতে হলো। স্বীকার করতে হলো যে নীলক্ষেতের চেয়ে মহাখালী এলাকায় অনেক ভালো প্যান্ট বানানো হয়।

দ্বিতীয় দিনে সাব্বির মামাকে পাওয়া গেল। মন দিয়ে শুনে বললেন, ‘একসময় তো হলটা আমাদেরই ছিল। এখন পোলাপাইন বেয়াদব হয়ে গেছে। দেখি কী করা যায়। ’

গেল আরো দুই দিন। প্রতিদিনই সাব্বির মামা বললেন, ‘তোমার হলে ওঠা নিয়ে আমি কিছু আলোচনা করেছি। আরো কিছু আলোচনা করতে হবে। ’

সেই কিছু আলোচনা আর শেষ হলো না। সাব্বির মামাই নিখোঁজ হয়ে গেলেন। তৃতীয় দিন গিয়ে দেখা গেল বাসায় তালা। সে একটু ধাক্কাধাক্কি করছিল, ওপরের তলা থেকে এক মহিলা বের হয়ে এসে কঠিন গলায় বললেন, ‘সাব্বিরকে চেনো?’

‘জি। ’

‘লিপাকে চেনো?’

‘জি না। ’

মহিলা মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, ‘সাব্বিরকে যারা চেনে তাদের কেউ লিপাকে চেনে না। কী আশ্চর্য...অথচ...’

মহিলা কথা না বাড়িয়ে ভেতরে চলে গেলেন।

এবার বেরিয়ে এলেন একজন মাঝবয়সী পুরুষ। এমনিতেই চোয়ালভাঙা চেহারায় একটুও মাধুর্য নেই, মাত্রই ঘুম থেকে উঠে আসার কারণে মেজাজটাও বিগড়ানো।

তাঁরও প্রশ্ন, ‘সাব্বিরকে চেনো?’

‘জি। ’

‘লিপাকে চেনো?’

‘জি না। ’

‘সাব্বিরের বন্ধু-পরিচিতদের কেউ লিপাকে চেনে না। তাহলে ঘটনাটা ঘটল কিভাবে?’ ভদ্রলোকের গলায় রাগের বদলে এখন দ্বিধা।

চলে যাচ্ছিলেন। মিতুল জিজ্ঞেস করল, ‘লিপা কি আপনার মেয়ে?’

‘হ্যাঁ। ’

‘সাব্বির মামা, মানে সাব্বির ভাই কি ওনাকে নিয়ে পালিয়েছে নাকি?’

‘হ্যাঁ। পালিয়েছে। দোষটা আমারই। আমার স্ত্রী ব্যাচেলর ভাড়া দিতে না করেছিল। আমি বললাম, আরে এরা তো আর সেই রকম ব্যাচেলর না। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়েছে। কিছুদিন পর বিসিএস অফিসার হবে বা বড় কিছু। অথচ করলটা কী? আচ্ছা তুমি পড়ো কোথায়?’

‘তিতুমীর কলেজে। ’

‘খুব ভালো। খুব ভালো। পড়া চালিয়ে যাও। ’

‘দোয়া করবেন। ’

‘অবশ্যই দোয়া রইল। ’

দোয়া মিলল। হলের সিট মিলল না।

এরপর গিয়েছিল এলাকার পরিচিত এক বড় ভাইয়ের কাছে। ওদের শহরে ডাক্তারি করেন আব্দুল্লাহ সাহেব, তাঁরই শ্যালক। তিনি একটা চিঠি লিখে দিয়েছিলেন। শ্যালক চিঠি পড়ে গম্ভীর হয়ে বলল, ‘সিট তো কোনো সমস্যা না। কিন্তু...’

‘কিন্তু কী ভাই?’

‘সিট পেতে হলে কিছু খরচা লাগবে। ’

‘কত খরচা?’

‘বেশি না। বেশি না। ধরো তোমার কাছে যা আছে। ’

‘আমার কাছে তো খুব বেশি নাই। পঞ্চাশ-ষাট টাকা আছে। ’

‘তাই দাও। তাই দাও। ওটা দিয়েই কাজ শুরু করি। ’

একে ডাক্তার সাহেবের শালা, তার ওপর সিট পাইয়ে দেবে বলছে—মিতুল পঞ্চাশ টাকার একটা নোট দিয়ে দিল। আর বাড়ি থেকে আনা মাসের খরচ অ্যাডজাস্ট করতে সেই রাতে ভাতের বদলে বনরুটি আর কলা খেয়ে আগেভাগে শুয়ে পড়ল।

থাকছিল এক বন্ধুর সঙ্গে মেসে। শুরুতে খুব খাতির ছিল। বন্ধু জনি পড়ে জগন্নাথে, সেই মেসের সবাই জগন্নাথ-তেজগাঁও কলেজ লেভেলের, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া একজনকে বন্ধু হিসেবে দেখাতে পেরে জনি খুব গর্বিত ছিল। সমাদর ছিল সেই কারণে। দ্বিতীয় মাসে কমতে শুরু করল। এখন জনি ওর কথার ঠিকঠাক জবাব দেয় না। অস্বাভাবিক গম্ভীর হয়ে থাকে। খাবারের সময় আগে ডাকত, এখন নিজে নিজেই খেয়ে শুয়ে পড়ে। আর বলে, ‘তোর হলের সিটের কদ্দুর? এই মাসে না পেলে প্রবলেম হয়ে যাবে। বিগ প্রবলেম। ’

সেই বিগ প্রবলেম সমাধানের উপায় ডাক্তার সাহেবের শালা। আরেক দিন গেল। এবার সে দেখেই চিৎকার করে বলল, ‘এই কয়দিন ছিলে কোথায়? তোমার সিট তো প্রায় হয়ে গেছে। ’

‘তাই নাকি?’

‘হ্যাঁ। তবে আরো কিছু খরচা লাগবে। দাও। ’

বলেই হাত পেতে দিল।

মিতুল বলল, ‘ভাই, আজ আছে মাত্র ২০ টাকা। তা দিয়ে রাতের খাবার খেতে হবে। ’

‘তাই দাও। এক রাত না খেলে এমন কিছু হয় না। আমরা কত রাত না খেয়ে থেকেছি। দাও, দাও। ’

শেষ ‘দাও, দাও’ শব্দটির মধ্যে একটা হুমকিও ছিল যেন। দিয়ে ফেরার বাসে উঠে প্রতিজ্ঞা করল, আর কোনো দিন এই পথে আসবে না।

সে আসেনি। তবে শালা তাকে ছাড়ল না। একদিন ডিপার্টমেন্টে হাজির। অ্যানেক্স বিল্ডিংয়ের সামনের খোলা চত্বরটাতে বসে চা খাচ্ছিল মিতুল। দেখতে পেল সে খুব ব্যস্ত ভঙ্গিতে একে-ওকে মিতুলের কথা জিজ্ঞেস করছে। মিতুল প্রথমে ভাবল ধরা দেবে না। পরে মনে হলো, এত দূর যখন এসেছে তখন কোনো খবর থাকতে পারে। হয়তো সিটটিট!

এই সময়ই শালা ওকে দেখে চিৎকার করে বলে, ‘আরে হিরো, কোথায় ডুব দিয়ে আছ?’

মিতুল ঠিক করে, কোনো ফাঁদে আর পা দেবে না। তা ছাড়া ভার্সিটিতে নিজের ডিপার্টমেন্টে একটা বাড়তি শক্তিও থাকে। সে গম্ভীর গলায় বলল, ‘বলেন। কী দরকার?’

‘খরচা দাও। ’

‘আবার খরচা? ফাজলামি। ’

‘আরে রাগ করো কেন? এই শেষবার। ’

‘দেব না। ’

সে যেন বিস্মিত। বলে, ‘হলে সিট পেলে, তবু সামান্য খরচা দেবে না?’

‘হলে সিট! হয়ে গেছে?’

‘হ্যাঁ। হয়ে গেছে। এবার খরচা দাও। ’

‘কত খরচা?’

শালা একটু অভিমান করা গলায় বলে, ‘কোনো দিন তোমাকে চাপ দিয়েছি? বলেছি অত টাকা দিতে হবে?’

মিতুলকে মানতেই হলো, কখনো সে নির্দিষ্ট কোনো অঙ্ক দাবি করেনি। শুধু খরচা চেয়েছে।

আজ সিট পাওয়ার খুশির দিনে মিতুল তাই ওকে সর্বোচ্চ খরচাটা দিল। একটা এক শ টাকার ঝকঝকে নোট।

সঙ্গে চা খাবার প্রস্তাব। চা খেতে খেতে মিতুল জানতে চায়, ‘হলে উঠব কখন?’

‘টাইমটা কালকে কনফার্ম করি। ’

‘কালকে?’

‘শেষ আলোচনাটা বাকি আছে তো। এখন ভাইয়ের কাছে যাব। ভাই যখন বলবে...’

‘কিন্তু আবার খরচা লাগবে না তো?’

‘না, না, আর না। ’

মিতুলকে দ্বিধায় ফেলে সে চলে গেল। আর চলে যেতেই সুজন এগিয়ে এসে বলল, ‘এই গাঞ্জুট্টির সঙ্গে তোর কী কারবার?’

‘গাঞ্জুট্টি মানে?’

‘গাঞ্জুট্টি মানে জানো না? গাঁজা খায় আর সবার কাছ থেকে টাকা ধার নেয়। হলের কেউ তো ওর ধারেকাছে যায় না। তুই টাকা দিচ্ছিস দেখলাম, তাই আসলাম সতর্ক করতে। ’

মিতুল তার পরও দুই দিন ওর কাছে গিয়েছে। রাগ দেখিয়েছে। কিন্তু ওর এক কথা, ‘খরচা দাও। সামান্য খরচার জন্য আটকে আছে। ওই খরচাটা পেলে আগেরগুলো উসুল। নইলে পুরোটা লস। ’

মিতুল ঠিক করল, হলে উঠে পা শক্ত করে তারপর এই লসটা উসুল করবে।

এমন দুটো ধাক্কা খাওয়া মানুষ সামান্য চুল আর জিন্সের প্যান্টের শর্তে হলে ওঠার সুযোগ পেলে বর্তে যাবে, স্বাভাবিক।

সিঁড়ি ভেঙে ওঠার সময় ফখরু বলল, ‘কী দোস্ত, কইসিলাম না হ্যাঁ-হুঁতেই হইয়া যাইব। ফখরু নবাব যা কয় তাই হয়। ’ ফখরু দাঁত বের করে হাসে। বিশ্রী দৃশ্য, তবু বড় সুন্দর লাগে। সৌন্দর্য বোধ হয় এ রকম, মন ভালো থাকলে জগতের সবচেয়ে কুশ্রী ছবিও সুন্দরের রূপ নিয়ে ধরা দেয়।

৫৩০ নম্বর রুমে ওদের সঙ্গে সঙ্গে নীরবে উঠল আরেকজন। নেতার পাঠানো সৈনিক। সে রুমে ঢুকতেই একটা চাঞ্চল্য খেয়াল করে মিতুল। বুঝতে পারে, এরও একটা ওজন আছে। কতটা সেটা পরে ফখরুর কাছ থেকে জেনে নেওয়া যাবে।

রুমে চারটা বিছানা, একেকটা প্রস্থে সাড়ে তিন থেকে চার ফুট। হলে ফার্স্ট ইয়ারে সিট পাওয়া মানে এর একটিতেই আরেকজনের সঙ্গে ভাগাভাগি করে শোয়া, মিতুল জানে। ভর্তি পরীক্ষা দিতে এসে বিস্মিত হয়ে ভেবেছিল, এখানে দুজন শোয়া কিভাবে সম্ভব? রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করে থাকল কিভাবে সম্ভব সেটা দেখার জন্য। দেখল। অদ্ভুত সরলরেখার মতো শরীর করে আর ভারসাম্য বজায় রেখে ওর সামনে দুজন একটা খাটে শুয়ে পড়ল। সমস্যা হচ্ছে না কোনো। দুজনই তো নাক ডাকছে।

কাজেই এখন এই নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা আসলে কিছুই না। সবদিকে সুবিধা। ভাড়া নেই, কারেন্ট-গ্যাস বিলের ব্যাপার নেই, লোডশেডিং নেই, পানির সমস্যা নেই। মেসে এই কিছুদিন থেকে সে আরো বুঝেছে, হলের সিট কত মহার্ঘ।

ওদের নিয়ে আসা ছেলেটি ভাব আর নেতৃত্ব দেখাতেই কি না ওর সঙ্গে সরাসরি কথা বলে না। যা বলার বলে ফখরুকে। ‘এই যে এই বিছানায় ও ডাবলিং করবে। আর কোনো সমস্যা হইলে তোরে জানাইতে বলবি। তুই জানাবি আমারে। ’ ফখরু হাত মিলিয়ে ইশারায় ওকেও হাত মেলাতে বলে। মিতুল বিগলিত হয়ে নুয়ে পড়ে হাত বাড়ায়। সে হালকা করে হাত ছোঁয়ায় শুধু। তাকায়ও না ওর দিকে।

মিতুল খাটে বসে। চেয়ার-টেবিল-দেয়াল সবই দখলে। শরীর রাখার জায়গা মিললেও জিনিসপত্র রাখার সুযোগ আপাতত হচ্ছে না। অসুবিধা নেই। যা পাওয়া গেছে এই ব্যস। আজ থেকে তো ঢাকায় ওর একটা ঠিকানা হলো।

এই সময়ই তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে একজন রুমে ঢোকে। ওর দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকায়। তারপর চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলে, ‘আপনি?’

মিতুল কোমল গলায় বলে, ‘আমি ফার্স্ট ইয়ার। আজই উঠলাম। ’

‘সিট কোনটা?’

‘এটা। ’

চমকে গিয়ে ছেলেটি বলে, ‘এটা তো আমার সিট। ’

মিতুল তবু ভয় পায় না। ‘জি, আপনার সঙ্গে আমি ডাবলিং করব। ’

‘আমার সঙ্গে তুমি কী করে ডাবলিং করবে? আমিই তো আরেকজনের সঙ্গে ডাবলিং করব। এইটা তো আরেকজনের সিট। আমারে আজকে দুপুরে তুলে দিয়েছে। তোমারে আবার কোন গ্রুপ তুলল?’

মিতুলের টেনশন হওয়ার কথা। হয় না।

হলে একবার যখন উঠে গেছে তখন আর কোনো কিছুতেই পরোয়া নেই।

 

দুই.

নামটা বদলে ফেলার পর নিজেকে চিনতে মাঝেমধ্যে এক-আধটু অসুবিধা হয় আকাশের। কেউ আকাশ বলে ডাকলে সাড়া দিতে দেরি হয়। ইউনুস শুনলে অভ্যাসবশত ওদিকে তাকিয়ে ফেলে। তারপর নিজেকে কড়া করে শাসন করে। এখন তুমি আকাশ। তুমি আর নান্দাইলের শুকুর বেপারীর ছেলে ইউনুস বেপারী নও। বাবার ওপর মাঝেমধ্যে এই একটা কারণে ওর রাগ হয়। নাম রাখাতে তো পয়সা-কড়ির ব্যাপার ছিল না। তাহলে এই বিশ্রী নামটা রাখল কেন? আকাশ-নদী-বৃষ্টি ইত্যাদি যে নাম হতে পারে সেটা সে জেনেছে ঢাকা কলেজে ভর্তির পর, ২০ বছর আগে গ্রাম্য বাবা জানবেন কী করে? তা আকাশ না হোক, আফজাল-শামীম-শাহীন এসব তো রাখা যেত। নামগত কারণে ক্ষোভ থাকলেও সেটা দূর হয়ে যায় অন্য কারণে। ওর চেহারাটা সুন্দর। শরীরটাও আকর্ষণীয়। নামের কারণে দোষ দিলে এই বাবদ মা-বাবাকে কৃতিত্বও দিতে হয়। সুন্দর চেহারা আর শরীরের যে এত মূল্য এটাও সে ঢাকায় এসেই বুঝেছে। এখানকার মেয়েদের কাছে এর দারুণ ডিমান্ড। কিন্তু আটকে যাচ্ছিল শুধু নামের কারণে। তখনই সিদ্ধান্ত হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেই নামবদল। মেয়েরা আর নিশ্চয়ই হাসবে না।

ক্লাস শুরুর বেশ আগেই ডিপার্টমেন্টে চলে আসে আকাশ। এসে লুকিয়ে লুকিয়ে মেয়েদের রেকি করে। কার সঙ্গে জমানো যায়। এই সময়ে ওর টার্গেট থাকে ঢাকায় থাকা মেয়েরা। হলের মেয়েদের সন্ধ্যায় টিএসসিতে পাওয়া যায় বলে ক্লাসের সময় ওদের দিকে মনোযোগ দিয়ে সময় নষ্ট করে না। বাস সকালেই চলে আসে বলে এই মেয়েরা আগেভাগে এসে ক্যাফেটেরিয়ায় বসে আড্ডা মারে। ছেলেদের মধ্যে বেশির ভাগ সময় সে একা থাকে বলে বিশেষ মনোযোগ পায়। আজও সব হচ্ছিল ঠিকঠাক। ক্যাফেটেরিয়ার এই চায়ের চেয়ে মুহসীন হলের গেটের চা যে কত ভালো—এই আলোচনা করে নিম্মিকে যখন হলের সামনে যেতে প্রায় রাজি করিয়ে ফেলেছিল তখনই দেখতে পায় ‘উড়াস-দুড়াস’ গ্রুপকে। এই গ্রুপটাকে তার খুব অপছন্দ। নামটাও সে দিয়েছে। কোনো কাজ নেই, সারা দিন ঘুরে বেড়ায়, ফাজলামি করে, একে-তাকে খ্যাপায় আর প্রায় সারা দিন পাঁচ-ছয়টা ছেলে একসঙ্গে থাকে। এই মাস-দেড় মাসে এদের মধ্যে কী করে এমন বন্ধুত্ব হলো সেটা একটা বিস্ময়ের ব্যাপার। এখন আছে তিনজন—মিতুল, ফখরু আর সৌরভ। এর মধ্যে মিতুল ছোকরাটাই বেশি ঝামেলার।

ওর নাম শুনে প্রথম দিন বলল, ‘তোমার নাম আকাশ! স্ট্রেঞ্জ!’

আকাশ তাড়াতাড়ি ‘কাজ আছে’ বলে পালিয়ে বেঁচেছে।

আজ এই সময় আবার এখানে কেন? মেজাজটা ভীষণ খারাপ হয়। কিন্তু এরা এমন দলবদ্ধ যে কিছু করা যাবে না।

আকাশ ঠিক করে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকবে। ওদের না দেখার ভান করবে। ওরা হয়তো ওদের গ্রুপের বাকিদের খুঁজতে এসেছে। না পেলে চলে যাবে। মেয়েমহলের প্রতি ওদের বাড়তি কোনো মনোযোগ সে দেখেনি। অন্য কোনো ধান্দায় এসেছে। এদের ধান্দা অন্য রকম। কোনো মাথামুণ্ড টের পাওয়া যায় না। হয়তো চ্যালেঞ্জ করে এসেছে, এখানে ফ্রিতে চা খেয়ে যাবে। অথবা চায়ের মধ্যে পোকা আবিষ্কার করে ক্যাফেটেরিয়ার বয়-বেয়ারাদের ধমকাবে।

কিন্তু পারা গেল না। মিতুল সোজা ওর টেবিলে এসে গলা ছেড়ে বলল, ‘কী হে, ইউনুস বেপারী ওরফে আকাশ?’

আকাশ চমকে ওঠে। মেয়েদের দলটার দিকে তাকায়। শান্তি পায় এটা দেখে যে ওদের সেদিকে বিশেষ মনোযোগ নেই।

আকাশ বলল, ‘এমনি বসে আছি। ক্লাস শুরু হতে তো অনেক দেরি। ’

ফখরু, যার নাম সে দিয়েছে হাবলু ফখরু, সে হাসতে হাসতে বলে, ‘মাইয়াগো কাছ থাইকা তুমি জানলা আজকা ক্লাস দেরিতে। হা হা হা। ’ ফখরু হাসে। অকারণের হাসি। তবু বাকিরা তাল মেলায়।

মিতুল বলল, ‘আমরা ঠিক করছি আজকে একজনকে আবুল বানাব আর তার কাছ থেকে চা-সিগারেট খাব। খাওয়াইয়া ফালাও। ’

আকাশ শক্ত হয়ে বলে, ‘আমি আবুল হলাম কী করে?’

মিতুল চোখ নাচিয়ে বলে, ‘এতগুলো মেয়ের সঙ্গে একা বসে আছ, এটাই আবুল হওয়ার জন্য যথেষ্ট। নাকি আরো লাগবে?’

আকাশ মীমাংসার পথে গিয়ে বলল, ‘শুধু চা। ’

‘হ্যাঁ। ’

‘ঠিক আছে। অর্ডার দে। ’

এরই মধ্যে সৌরভ অর্ডার দিয়ে ফেলেছে। সে অবাক হয়ে দেখে, মেয়েদের দলটাকে ধরে ১৫ কাপ চায়ের অর্ডার দেওয়া হয়েছে।

আকাশ কিছু বলল না। শুধু চায়ের ওপর দিয়ে চলে গেলে মন্দ হয় না। কিন্তু এরা এত সহজে কোনো কিছু ছেড়ে দেওয়ার দল না। মিতুল গ্লাসে চামচের বাড়ি দিয়ে একটা শব্দ তুলে বলল, ‘অ্যাটেনশন। আচ্ছা, আমাদের প্রিয় মেয়েবন্ধুরা, তোমরা কি জানো যে আকাশ প্রতিদিন আগে আগে এসে একা এখানে বসে থাকে কেন?’

ইলোরা নামের মেয়েটি বলল, ‘জানব না কেন, ফিল্ডিং মারতে!’

আকাশ লজ্জায় লাল হয়ে গেল।

মিতুল বলল, ‘তা কি শুধু ফিল্ডিং করছে, না ব্যাটিং-বোলিংয়ের চেষ্টাও হচ্ছে?’

সুবর্ণলতা বলল, ‘ও মনে হয় পারে না। ’

সঙ্গে সঙ্গেই মেয়েদের দলে এমন হাসির রোল উঠল যে আকাশের মনে হলো দৌড়ে পালিয়ে যায়। কিন্তু দৌড়ানো যাবে না। থাকতে হবে। লড়াই করতে হবে। নইলে সব শেষ।

সে হাসির স্রোতের মধ্যে কিছু একটা বলার চেষ্টা করল কিন্তু ওর কথা হারিয়ে গেল। মেয়েদের মিলিত হাসির যে এত শক্তি, এটা ওর জানা ছিল না। তবে জেনে ভালো লাগল। মেয়েদের সম্পর্কে সব জানতে হবে। ওর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের লক্ষ্যই হলো মেয়ে। মেয়েবন্ধু। ওদের নিয়ে ঘুরে বেড়াবে। সমুদ্রে যাবে। নদীর পাড়ে। গান শোনাবে। কবিতা পড়বে। উফ!

চা চলে এসেছে। চলে এসেছে ওদের দলের আরো তিনজন। অনন্য, ইকবাল, সুজন। দেখে একটু শান্তি পায় আকাশ। ইকবাল ছেলেটা এদের মধ্যে সবচেয়ে ভদ্র। সুন্দর পোশাক পরে, হাসিমুখে কথা বলে। কাউকে জ্বালানোর দলে নেই। আর খুব ভালো সব কিছু ম্যানেজ করতে জানে। এখন এমন সুন্দর করে সবার হাতে হাতে চায়ের কাপ ধরিয়ে দিল যেন সে-ই সব কিছুর আয়োজক।

সবার হাতে চা চলে যাওয়ার পর মিতুল ঘোষণার স্বরে বলল, ‘বন্ধুরা, আজকে আমাদের চা খাইয়েছে আকাশ। ’

নিম্মি বলল, ‘আকাশ, তুমি আকাশের মতো বিশাল!’

ফাজলামি কি না ঠিক বুঝতে পারে না আকাশ।

অর্পিতা বলে, ‘শুধু চা! সঙ্গে শিঙাড়া হলে কাজ হতো। ’

মিতুল হাত তুলে বলে, ‘আকাশের বহুদিনের ইচ্ছা ছিল তোমাদের সবাইকে চা খাওয়ানোর কিন্তু বেচারার ভয়, তোমরা যদি এতে অন্য কিছু মনে করে বসো...’

‘না, না, আমরা কিছু মনে করিনি। সত্যি বললে, আমাদের যত বেশি খাওয়াবে আমরা তত কম মনে করব। না খাওয়ালে বরং অন্য কিছু মনে করব। ’ আবার হাসে মেয়েদের দল।

ইকবাল বলে, ‘না নিম্মি। তোমার এই কথাটা উইথড্র করে নাও। ও খাইয়েছে চা। এখন অন্য কিছু খাওয়ানোর দায়িত্ব অন্যদের। ’

মিতুল বলে, ‘এক কাজ করো। ও তোমাদের সবাইকে চা খাইয়েছে। এখন তোমরা সবাই মিলে ওকে একটা শিঙাড়া খাইয়ে দাও। কী আকাশ, রাজি?’

আকাশ কিছু বলার আগেই কণ্ঠভোটে সিদ্ধান্ত হয়ে গেল। মেয়েরা ওকে দুটো শিঙাড়া খাইয়ে দিল।

চা খাইয়ে আর শিঙাড়া খেয়ে আকাশ যখন বাইরে বেরিয়ে এসে আজকের লাভ-ক্ষতির হিসাব-নিকাশ করছে তখন আবার দেখে ওই দলটা এসে দাঁড়িয়েছে পাশে।

মেয়েদের সামনে থাকলে অনেক হিসাব-নিকাশ মাথায় থাকে বলে কথা বলার সময় অঙ্ক করতে হয়। এখন আর সেই ঝামেলা নেই। আর এই সময় সে অন্য কিছুতে পারুক না পারুক মুখের শক্তিতে এই পুরো দলের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে।

চিৎকার করে বলল, ‘...বাচ্চারা খুব মজা নিলি, না!’

ওদের রাগ করা উচিত। কিন্তু ওরা হাসে।

আকাশ তার অশ্লীল ভাষাশক্তির আরো কিছুটা প্রয়োগ করে বলে, ‘...রা আমাকে মফিজ পেয়েছিস। আমি কিন্তু জায়গামতো...’

ওরা তবু রাগ করে না। আরো হাসে। ফখরু বলে, ‘দোস্তের মুখ তো পুরা পালিশ করা। তোমার তো ক্লাসে যাওয়ার আগে কুলি কইরা যাওয়া উচিত। ’

মিতুল হঠাৎ হাত তুলে বলে, ‘আচ্ছা দোস্ত, তোমার নামটা যেন কী?’

গালাগালি শুরু করলে ওর ভেতর একটা শক্তি চলে আসে। তখন কোনো কিছুতেই পরোয়া করে না ও। কিন্তু এই নামের ব্যাপারটাই যা একটু ঝামেলার।

মিতুল আবার বলে, ‘দোস্ত, তুই তো শালা সব কিছুতেই দুই নাম্বার। ’

‘দুই নাম্বারির কী করলাম?’

‘মেয়েদের পিছে ঘোরো, ওদের কাছে দাম পেতে নাম বদলাও। ’

‘নাম বদলাইছি কে বলল?’

‘আমি বলি। ’

‘না, আমার নাম আকাশ। ’

‘শোনো, যার নাম ইউনুস বেপারী তার ডাকনাম কোনো দিন আকাশ হতে পারে না। ’

ওরা সবাই হাসে। ফখরু বলে, ‘আকাশ-বাতাস হইতে পারে না। হইতে পারে না। ’

আকাশ বলে, ‘আমার নাম নিয়া তোদের এত সমস্যা কেন? আমি তো কারো নাম নিয়া ঝামেলা করছি না। ’

সৌরভ বলল, ‘কারণ আমাদের নামে কোনো ঝামেলা নেই। ’

‘আমার নামেও কোনো ঝামেলা নেই। ’

মিতুল বলল, ‘শোন, তোর নাম নিয়া আমাদেরও কোনো ঝামেলা নেই। কে জানে তোর মতো ইউনুস বেপারী হলে আমিও হয়তো নাম বদলে ফেলতাম। ’

‘তাহলে ঝামেলাটা কী?’

‘ঝামেলাটা হলো তোকে আমাদের খুব পছন্দ হয়েছে। ’

‘এর মানে কী?’

‘মানে তুই-ও আজ থেকে উড়াস-দুড়াস গ্রুপের মেম্বার। ’

‘উড়াস-দুড়াস গ্রুপ কী?’

‘এই যে আমরা। ’

অনন্য বলে, ‘তুই-ই তো নামটা দিয়েছিস। জানি। ’

আকাশ একটু ধাক্কা খায়। কোনো এক দুর্বল মুহূর্তে কথাটা সে নিম্মিকে বলেছিল। সেটা এরা জেনে গেছে। এ ছেলেগুলোকে যা ভেবেছিল তা নয়। উড়ে আর ঘুরে বেড়ায় বটে তবে চোখ-কান খোলাও রাখে।

মিতুল বলল, ‘শোন, আমাদের সঙ্গে চলে আয়। তোর নাম নিয়েও ঝামেলা শেষ। আর তোকেও আমাদের দরকার। ’

আকাশ একটু ভরসা পেতে শুরু করেছে। বলল, ‘আমাকে দরকার কি মেয়েদের সঙ্গে খাতির করার জন্য?’

‘আরে দুর। তোর গালাগালির জন্য। এ রকম গালি দেয়ার একটা মানুষ দলে থাকলে সুবিধা। ’

ওরা সবাই হাসে। হাততালি দেয়।

আকাশ দলে যোগ দেয়। ওদের হিসাব গালাগালি আর ওর হিসাব অন্য। এলিট গ্রুপের সঙ্গে ওদের একটা খাতির আছে। উফ! সেই গ্রুপের মেয়েগুলো যে কী সুন্দর! কী যে স্বর্গীয় সুবাস ওদের শরীরে!

সেই সোনালি মেয়েদের কাছে পৌঁছানোতে গালাগালিটাই হলো সেতু। ইউনিভার্সিটিতে দেখা যাচ্ছে গুণের মতো দোষেরও দাম আছে।

 

তিন.

সুজন তার বাবার কাছে শুনেছে বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে পুরো পৃথিবী। বলেন, এর চারদিকে জানালা আর খোলা বাতাস। গায়ে মাখবি। দেখবি এরপর দুনিয়ার কিছু আর গায়ে লাগছে না।

ওর মা সাধারণ গৃহিণী। অতশত বোঝেন না। বললেন, ‘অত জানালা আর খোলা বাতাস হলে একটু সাবধানে থাকিস বাবা। ঠাণ্ডা লেগে যেতে পারে। ’

বাবা বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘হায়রে মূর্খ রমণী। আমি কোন জানালার কথা বলি আর সে কোন জানালা বোঝে! এই জানালা তোমার রান্নাঘরের জানালা নয় যে চাইলা আর বন্ধ করে দিলা। ’

‘এটা আবার তাহলে কেমন জানালা? গ্লাসের জানালা নাকি ঠেলেঠুলে সরিয়ে রাখতে হয়। ’

বাবা এই পর্যায়ে মায়ের সঙ্গে আর কথা বলার আগ্রহ দেখান না। তাঁর ধারণা, মায়ের সঙ্গে কথা বলে বলে নিজের বুদ্ধিবৃত্তির স্তর নিচে নেমে গেছে। তাই কোনো একটা পর্যায়ে থেমে যান। এই থেমে যাওয়ার লক্ষণটা খুব ভালো না অবশ্য। নিজের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের গল্প চলে আসে। গল্পগুলো আকর্ষণীয়। তবে শোনা গল্প শুনতে আর কত ভালো লাগে।

সুজন সুযোগ পেয়েছিল বেশ কয়েক জায়গায়। এর মধ্যে চিটাগাং বিআইটিও আছে। পরিবারের সবাই ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পক্ষে, বড় ভাই তো এর বদলে সে আইন পড়তে যাচ্ছে শুনে রেগে গিয়ে ওর সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। এরপর কথা বলে শুধু ভাবির সঙ্গে। সেই কথাগুলোতে উকিলদের বদমাইশির নানা কাহিনি থাকে। খুব উঁচু স্বরে গল্পগুলো করা হয় যাতে সুজন শুনতে পায়। সুজন শুনত আর হাসত। তার কেউ জানেও না আইন পড়ার জন্য সুজন কত দূর পর্যন্ত যেতে তৈরি।

সায়েন্সের ছাত্র ছিল। এলাকায় বেশ সুনাম। সেই রকম ভালো ছাত্রদের ঘিরে মধ্যবিত্ত পরিবারের একটা স্বপ্ন তৈরি হয়। সেই স্বপ্নের সীমানাটা বড় গণ্ডিবদ্ধ। প্রথমে সায়েন্স পড়তে হবে। নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সায়েন্স পড়ল সে। তারপর হয় ডাক্তার, নয় ইঞ্জিনিয়ার। পীড়াপীড়িতে সুজন দুই জায়গায়ই ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছে। মেডিক্যালে ওয়েটিংয়ে, আর ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে চিটাগাং বিআইটি। তা বিআইটিতে হয়ে যাওয়াটা ওদের ছোট্ট শহরে মোটামুটি বড় ঘটনা। বড় ভাই মিষ্টিমুখও করালেন বন্ধুদের। বড় মামা রাতের ট্রেনে বাড়ি থেকে এসে ওকে একটা হাতঘড়ি দিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলতে শুরু করলেন, ‘আব্বা, তুমি কি দেখতে পাচ্ছ! তুমি দেখছ?’ বড় মামা একটু টাউট গোছের লোক। বাবা উসখুস শুরু করলেন। বললেন, ‘আপনার আব্বা কী দেখবেন? উনি তো মারা গেছেন ৭৭ সালে। ’

বড় মামার গলায় কান্না আরো সুরেলা রূপ নিয়েছে। ‘আব্বা, তোমার নাতি... তোমার নাতি এখন ইঞ্জিনিয়ার। তুমি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলে না...তোমার নাতি ইঞ্জিনিয়ার হবে...কেউ বিশ্বাস করেনি। শুধু আমি জানতাম, দুনিয়া ওল্টাতে পারে কিন্তু আমার আব্বার কথা মিথ্যা হবে না। দেখো আব্বা দেখো...’

মামারা যে পক্ষে থাকেন বাবা সাধারণত এর বিপক্ষে চলে যান। সেই কারণেই বাবা আর খুব জোরালোভাবে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পক্ষে থাকলেন না। তাঁর বোধ হয় ভয় হলো ইঞ্জিনিয়ার হলে মামা তাঁর বাবার স্বপ্ন জাতীয় কোনো বাহানা দিয়ে সুজনকেই কেড়ে নেবেন। আর এ জন্যই সুজনের পক্ষে সম্ভব হলো শেষ পর্যন্ত আইনে ভর্তি হওয়া। তা-ও পরীক্ষা দিয়েছিল লুকিয়ে। এবং সুযোগ পাওয়ার কাজটা খুব সহজ হবে না সে জানত। ‘ঘ’ ইউনিটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০টার মতো সিট। মেধা আছে বলে এই ২০ জনেও হয়তো ঢুকে যাবে কিন্তু ওখানে আবার ভর্তি পরীক্ষায় বাংলা-ইংরেজিতে একটা নির্দিষ্ট নাম্বার পাওয়ার নিয়ম আছে। রেজাল্টটা অবশ্য খুব সুবিধার হলো না। নিচের দিকে সিরিয়াল। অত দূর পর্যন্ত আইন থাকার কথা না। ভাইভা বোর্ডে স্যাররা তাকে পালি-সংস্কৃত-ভাষাতত্ত্ব এসব বিষয় নেওয়ার প্রস্তাব দিতে থাকলেন। সুজন মিনমিন করে বলল, ‘স্যার, আমার আইন পড়ার খুব ইচ্ছা। ’

স্যার খেঁকিয়ে উঠলেন, ‘ইচ্ছা তো রে বাবা সবার থাকে। কিন্তু ইচ্ছা থাকলে তো আর উপায় হয় না। ’

‘ল শেষ হয়ে গেছে স্যার?’

‘শেষ তো হয়ে যাওয়ার কথা। এত দূর পর্যন্ত থাকে নাকি? আর তা ছাড়া তোমার নাম্বারেও তো বোধ হয় হবে না। ইংরেজিতে কত পেয়েছ?’

‘স্যার, ভালোই তো পাওয়ার কথা। ’

‘দেখি, কত ভালো পেয়েছ। ’ বলে স্যার নম্বর শিটটা উল্টিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, ইংরেজি তো ঠিক আছে। কিন্তু বাংলা বোধ হয় হবে না। ’

তার পরই ‘এই, তুমি বাংলা পড়ো’ বলে হৈচৈ শুরু করলেন।

কারণ জানা গেল, ভর্তি পরীক্ষায় বাংলায় সে অবিশ্বাস্য রকম ভালো নম্বর পেয়েছে। স্যার বলেন, ‘বাংলা’, সুজন বলে, ‘ল। ’

শেষ পর্যন্ত স্যার মন খারাপ করে বললেন, ‘যাও, ল নিয়ে স্বর্গে যাও। ’

সত্যিই সুজনের মনে হলো সে স্বর্গে চলে যাবে। যখন ভাইভা বোর্ড থেকে বের হয় তখন বৃষ্টি হচ্ছিল। সেই বৃষ্টিতে ইচ্ছামতো ভিজল। রিকশাওয়ালা যা চাইল এর চেয়ে বেশি ভাড়া দিয়ে ওকে চমকে দিল। তার পরও মনে হলো, যথেষ্ট আনন্দ প্রকাশ করা হচ্ছে না। পথ চলতি মানুষদের দেখে ইচ্ছা হলো, চিৎকার করে ঘোষণা করে, দেখো, দেখো, আমি ল পেয়েছি।

রিকশাওয়ালাকে সেটা বলেও ফেলল। রিকশাওয়ালা বলল, ‘কী পাইসেন কইলেন?’

‘ল। আইন। আমি আইনজীবী হব। ’

‘অ। আমি ভাবসিলাম আপনে ডিভি পাইসেন। ’

সুজন খুব বিরক্ত হয়। কোথায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ আর কোথায় ডিভি লটারি। রাগটা অবশ্য থাকল না। মাফ করে দিল। আজ সবাইকে মাফ করতে ইচ্ছে করছে। সবাইকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করছে। পৃথিবীতে বেঁচে থাকার মানে বোধ করছে সে নতুন করে।

আইনের প্রতি তার এই ভালোবাসার জন্ম সেই ছোটবেলায়, যখন এরশাদ সরকারের আমলে উপজেলা পদ্ধতি তৈরি হলো। ওদের বাসার ঠিক পাশে বসল কোর্ট, জানালা দিয়েই দেখা যায় সব। ক্লাস ফাইভের ছাত্র সুজন দেখল, কালো গাউন পরা সব মানুষ ভিড় করছেন সেখানে। কী সুন্দর যুক্তি-তর্ক তাঁদের! সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য বানিয়ে দিচ্ছেন কথার কারুকাজে। আর রোজগারও কী! ওর বাবারা মাস শেষে একবার বেতন পান। এঁরা প্রতিদিন। একদিন শুনল, একটা মামলার জন্য জেলা শহর থেকে একজন উকিলকে হায়ার করে আনা হয়েছে। সে ভেবেছিল, খুব বয়স্ক কেউ হবেন। গিয়ে দেখল, ওদের কলেজের ছাত্রদের মতো একজন তরুণ। ধবধবে ফরসা চেহারা। চায়ের বদলে খেলেন কফি। আর কোর্টে বাংলা-ইংরেজি মিলিয়ে কী অপূর্ব বক্তৃতা। জানা গেল, ইনি উকিল নন, তাঁদের চেয়েও বড়, ব্যারিস্টার। ‘জজ-ব্যারিস্টার’ কথাটা শুনে এসেছে ছোট থেকে, এই প্রথম একজন ব্যারিস্টারকে দেখল চোখের সামনে। আর ব্যারিস্টার হতে গেলে দেখা যাচ্ছে খুব বয়সও লাগে না। সেই থেকে সিদ্ধান্ত, যাই ঘটুক জীবনে ওকালতি পড়বে সে। তারপর ইংল্যান্ডে গিয়ে ব্যারিস্টার হবে।

মামা এসে ওকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুই কী হতে চাস?’

‘অ্যাডভোকেট। ’

‘কিন্তু হবি তো গুণ্ডা। ’

‘গুণ্ডা?’

‘অবশ্য যদি বেঁচে থাকিস! বেঁচে থাকাটাও এখন আর অত সহজ না!’

বাবা বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘এসব কী ফালতু কথা বলেন? ভার্সিটিতে ঢুকলে মরবে কেন?’

মামা বাবার কথাকে কানেই তুললেন না, ‘ইউনিভার্সিটিতে এখন আর ছাত্ররা পড়ে না। এখন পড়ে গুণ্ডারা। দেখিস না, পত্রিকায় প্রতিদিন গোলাগুলির খবর। প্রতিদিন খুন। তুই-ও একদিন এ রকম খুন হয়ে পড়ে থাকবি। ’

হুমকি-ভীতি কিছুতেই কাজ না হওয়ায় মামা অন্য রাস্তাও দেখলেন। মত বদলের জন্য মসজিদের পেশ ইমাম সাহেবের কথামতো বালিশের নিচে একটা তাবিজও রাখা হলো।

তবু কাজ না হওয়ায় মামা ওকে অভিশাপ দিয়ে-অনিশ্চিত ভবিষ্যতের অন্ধকার আশঙ্কা দেখিয়ে বিদায় নিলেন।

বড় ভাই ঘোষণা করল, ‘এক টাকাও দেওয়া হবে না। খরচপাতি নিজেকে জোগাড় করতে হবে। ’

দেওয়া হয়ওনি। মায়ের দেওয়া দুই শ আর বাবার কাছ থেকে পাওয়া এক হাজার টাকাই ছিল সম্বল। তবে খুব কাজে লেগেছে বাবার সেই কথাটা। বিশ্ববিদ্যালয় হলো খোলা জানালা। সত্যিই খোলা জানালা। এলাকার এক বড় ভাই জহুরুল হক হলের মাঝারি স্তরের নেতা। হলে উঠে গেছে তার সূত্রে। আর একটা টিউশনিও জোগাড় করে ফেলায় আপাতত চলে যাচ্ছে।

আর মিলে গেছে দারুণ কিছু বন্ধু। তারা কত রকম! ফখরুর জীবনের লক্ষ্য শুধু মানুষকে হাসানো, সৌরভ আলাদা করে কিছু করতে চায় না, সব সময় সবার সঙ্গে থাকতে চায় শুধু। ইবরার আবার এখনই কিছু একটা হয়ে উঠতে চায়। আজকে এই ব্যবসার আইডিয়া নিয়ে আসে তো, কালকে ওই উদ্যোগ। ওরা সব হেসে উড়িয়ে দেয় কিন্তু সে থামে না। বলে, ‘যারা হাসছিস তারা একদিন কাঁদবি আর আমি হো হো করে হাসব। ’ সেই হাসির দিনের কথা মনে করে ওরা আরো হাসে। ইকবালের আবার সব কিছু গুছিয়ে করার একটা অদ্ভুত ক্ষমতা। যেকোনো জায়গায় সব এমনভাবে ম্যানেজ করে যে মনে হয় কোনো কিছুই কোনো ব্যাপার না। অনন্য পড়াশোনায় ভীষণ মনোযোগী, এখনই সে সিনিয়র ভাইদের পেছন পেছন ঘুরছে ভালো নোট জোগাড়ের জন্য। আকাশের জীবনের লক্ষ্য বান্ধবী, যেন মেয়েদের সঙ্গে সম্পর্ক করা যায় বলেই সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। মোটাসোটা মাসুদের আবার শিশুর মতো মন। যেকোনো কিছুতেই মুগ্ধ হয়ে যায়। আবার ভেঙেও পড়ে। ওদের মধ্যে এই দুই মাসে একমাত্র তাকেই ওরা প্রকাশ্যে কাঁদতে দেখেছে। কারণ, একদিন সবাই ওকে ফেলে আহসান মঞ্জিলে চলে গিয়েছিল। দ্বিতীয় দিনের কারণটা আরো ছেলেমানুষি। খাওয়ার সময় ওকে বাদ দিয়েই সবাই গরুর মাংসের বাটিটা শেষ করে ফেলেছে। আর আছে মিতুল। সে রাজনীতির লাইনে আছে। হল পেতে গিয়ে এমন ফাঁপরে পড়েছে যে বিরাট কাহিনি। সুজনের পরিচিত বড় ভাই ছিল বলে কত সহজে জায়গা পেয়ে গেছে। ওদিকে বেচারার জীবন পানি। অনেক ধরাধরি করে হলে উঠে দেখে, ওর সিটে আগে থেকেই দুজন আছে। তারপর কিভাবে ম্যানেজ হলো সে এক দারুণ গল্প।

 

চার.

মিতুল যখন দেখল আগে থেকে দুজন ওর সিটে আছে তখন নিজে থেকেই একটা হিসাব করে নেয় ও। এর মধ্যে একজন সিটের মালিক, ওকে ঘাঁটানো ঠিক হবে না। দ্বিতীয়জনও ওর আগে উঠেছে, কাজেই তারও অধিকার বেশি। ঝামেলায় গেলে প্রমাণিত হবে সে-ই উটকো। সে ধীরে চলো নীতি নিল। ভাবগতিক বুঝতে হবে প্রথমে, তারপর যা করার করা যাবে।

ফখরু গল্পের এই পর্যায়ে বাধা দিয়ে বলল, ‘তুমি দোস্ত আমারে কইতা। ব্যবস্থা কইরা দিতাম!’

মিতুল হাসল। বলল, ‘ফখরু, বেশি কথা বলিস না। ধরা খাইয়া যাবি। ’

ফখরু একটু অবাক, ‘ধরা খামু কিসে?’

‘তুই ওই পাতি নেতা আরিফকে যেমন সালাম-আদাব দিচ্ছিলি সেটা দেখেই আমি বুঝে গেছি তোর পজিশন...’

সুজন জানতে চায়, ‘সালাম দিচ্ছিল! মানে কী, আসসালামু আলাইকুম। ’

ফখরু প্রতিবাদ করে, ‘মিছা কথা কইবা না দোস্ত। ওই রকম সালাম আমি দেই না। ’

মিতুল বলে, ‘ঠিক ওই রকম সালাম দেয় না। ওর সালামটা অন্য রকম। বলে, সেলামালিকুম ভাই। ’

ভঙ্গির মধ্যে একটা ব্যঙ্গের ভাব ছিল বোধ হয়, সবাই অভিনয়টা দেখে খুব হাসল। ফখরু হাসল সবচেয়ে বেশি। বলল, ‘আমার ভিতরে তোগো মতোন ভাবসাব নাইক্কা। তোরা কেমন স্টাইল কইরা কথা কওনের চেষ্টা করস, এক-আধটু চাইলে তো আমিও পারি। আমি করি না। দাউদকান্দির পোলা, দাউদকান্দির মতোই থাকুম। ’

তা ফখরু থাকে বটে। হলে তার পরনের ছাপার লুঙ্গিটা বেশ বিখ্যাত। সঙ্গে যে স্যান্ডেল তাতেও কারুকাজ আছে। সবাই হাসে। ফখরু এটাকেই কৃতিত্ব মনে করে।

ইকবাল বলে, ‘তারপর কী হলো বল...’

‘এরপর তো কত কাণ্ড। রুমমেট ভাইদের সঙ্গে আলাপ করতে গিয়ে ওদের নাম শুনেই তো আমি পাগল। সবচেয়ে সিনিয়র ভাইয়ের নাম পল্টু। ’

‘পল্টুতে অসুবিধা কী?’

‘এরপর একজনের নাম বুলবুল। ’

এতেও কেউ কোনো সমস্যা খুঁজে পায় না। এই ১৯৯৫ সালে বুলবুল তো একটা স্বাভাবিক নামই।

মিতুল বলে, ‘আরেকজনের নাম রাজ্জাক। এখন পরের দুজনের নাম কী কী হতে পারে ধারণা কর তো। ’

সবাই ওর এই রহস্যের চেষ্টায় বিরক্ত। পল্টু, বুলবুল এর মধ্যে এমন কী সূত্র আছে যে বাকিদের নাম বের করা যাবে।

আকাশ বিরক্ত গলায় বলে, ‘শালার ব্যাটা, কায়দা বাদ দিয়ে কাহিনি বলো। এখনো ঠিক জমতেছে না। ’

‘তোদের অবস্থা তো আমি যা ভেবেছিলাম তার চেয়েও খারাপ। আরেকজনের নাম বলি, তারপর দেখি কে কে পরেরটা পারে। আরেকজনের নাম হচ্ছে জসিম। ’

সবাই মেলানোর চেষ্টা করে বুলবুল, রাজ্জাক, জসিম...

হঠাৎ সুজন আবিষ্কারের গলায় বলে, ‘আরে এগুলা তো সব সিনেমার নায়কের নাম। পরেরটা কি ওয়াসিম?’

‘কাছাকাছি গেছিস। তবে হয়নি। ’

‘তাইলে কী?’

‘আরেকজন হইল ফারুক। চিন্তা কর অবস্থা, যারে নাম জিজ্ঞেস করি তার নামই সিনেমার নায়কের নামে। আমি তো ভাবলাম এফডিসিতে এসে পড়েছি নাকি?’

ফখরু বলল, ‘আরে দোস্ত, তো তুমি তো হেভি জিনিস। হেগোরে তো আমি আগে থাইকাই চিনি। কিন্তু এই বিষয়টা তো মাথায় আসে নাই। ’

‘আসে নাই কারণ তোর মাথা মাথা না। গোবরের কারখানা। ’

ফখরুর অপমান বোধ করার কথা। কিন্তু হাসে। হো হো করে হাসে যেন মাথাটা গোবরের কারখানা হওয়ায় বিরাট সুবিধা হচ্ছে।

মিতুল এবার রহস্যের হাসি হেসে বলে, ‘তবে এর পরও ঘটনা আছে। সেটা এখন বলব না। বিরাট রহস্য। ’

ইকবাল বলে, ‘ঠিক আছে, রহস্যটা পরে জানব। তুই রাতে ম্যানেজ করলি কিভাবে? ঘুমালি কোথায়?’

‘সবার সঙ্গে পরিচয়ের পর্ব শেষে সিটের যে আসল মালিক সে এলো। ভূগোল থার্ড ইয়ারের রঞ্জু ভাই। আমি তো ভাবলাম সে এসে খুব বিরক্ত হবে কিন্তু রঞ্জু ভাই এমন ভাব করতে থাকল যেন আমার অপেক্ষাতেই ছিল। আমার বইপত্র নিচে রাখা ছিল, সে তার টেবিলে জায়গা করে দিয়ে বলল, এখানে রাখো। ’

‘তুই তখন কী করলি?’

‘আমি খাতাপত্র রেখে ওর সঙ্গে একটু খাতির করলাম। আর করতে গিয়ে জানলাম আরেক মর্মান্তিক কাহিনি। ’

‘কী কাহিনি?’

‘বেচারা রাজনীতি করত। কিন্তু থার্ড ইয়ারে ওঠার পর ঠিক করেছিল রাজনীতিটা ছেড়ে দিয়ে পড়াশোনায় একটু মন দেবে, অনার্স ফাইনাল পরীক্ষাটা ভালো করে দেবে। এই নিয়ে নেতাদের সঙ্গে ওর একটু কথা-কাটাকাটি হয়। তার শাস্তি হলো ওর সিটে দুজন তুলে দেওয়া। ’

ফখরু বলে, ‘তা ঠিক, রঞ্জু ভাই হঠাৎ কইরা রাজনীতি ছাইড়া দিতে চায়। ’

সুজন জানতে চায়, ‘হলের সিটটা কার নামে?’

‘রঞ্জু ভাইয়ের নামে। ’

‘তারপর রঞ্জু ভাই কী বলল?’

‘বেচারা তো রাজনীতি করা মানুষ। ওদের চালটা বুঝেছে। ওরা চায় ও হার মেনে ওদের কাছে সারেন্ডার করুক, নইলে প্রতিবাদ করুক। প্রথমটা করলে তো খুব ভালো। আর দ্বিতীয়টা করলে মার দেবে। ’

‘বলিস কী?’

‘তবে রঞ্জু ভাইও চালাক মানুষ। সে কোনো ঝামেলা করেনি। আমি প্রস্তাব দিয়েছিলাম নিচে ফ্লোরিং করে ঘুমাব। আরো দুজনও ওভাবে ঘুমায়। কিন্তু সে বলল, আমি ফ্লোরিং করলেও নাকি ওরা এসে ঝামেলা করবে। বলবে, তুমি নিচে ঘুমালে কেন? তোমাকে তো সিট দেওয়া হয়েছিল। সে তাই রাতে রুম ছেড়ে চলে গেল। অন্য রুমে ঘুমিয়েছে। ’

‘তাহলে বলা যায়, তুই সিট পেয়ে গেছিস?’

‘পেয়ে গেছি কিন্তু কতক্ষণ আছে বলা মুশকিল। আজকে মিছিলে যাই নাই, কে জানে এই কারণে আমার সিটে না অন্য কাউকে তুলে দিয়েছে। ’

ইকবাল বলল, ‘তুই মুহসীন হলে অ্যাটাচড হলে সমস্যা ছিল না। আমরা কয়েকজন আছি, একটা ব্যবস্থা করে ফেলতাম। চলে আসবি নাকি?’

সুজন বলল, ‘আমাদের জহুরুল হক হলেও অত সমস্যা নেই। মামুন ভাইয়ের এমনি অনেক বদনাম হলেও তার গ্রুপটা ভালো। মামুন ভাই বলে দিয়েছে সাধারণ ছেলেদের যেন কেউ কোনো ডিস্টার্ব না করে। ’

ইকবাল জানতে চায়, ‘আচ্ছা, মামুন ভাই তো ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কৃত, তাহলে ওই হলটা দখলে রেখেছে কিভাবে?’

সুজন বলে, ‘বহিষ্কৃত হওয়াতেই তো ভালো। আওয়ামী লীগের একটা গ্রুপের সাপোর্ট তো তার পক্ষে আছেই কিন্তু তার চেয়েও বেশি আছে ছাত্রদলের সাপোর্ট। যে হলটা সারা জীবন ছাত্রলীগের, সেখানে ছাত্রলীগ সরাসরি নেই, এটা তো ওদের জন্য প্লাস না!’

অনন্য হলে থাকে না। হলের অতশত নিয়ম-কানুন সে জানে না। বলল, ‘দখলে থাকা মানে কী? এখানে প্রভোস্ট-হাউস টিউটর ওনারা কী করে?’

সুজনই উত্তর দেয়, ‘কী আর করবে? আসে মাঝেমধ্যে। নিজের রুমে বসে। খাতাপত্র সাইন করে। ’

‘কিন্তু যাদের নামে সিট বরাদ্দ ওরা থাকতে পারে না!’

‘থাকে তো। কিন্তু থাকতে হলে যাদের দখলে আছে তাদের লাইনে কথা বলতে হয়। ওদের ডাকে মিছিলে যেতে হয়। ’

‘তাই নাকি?

‘এই যে মনে কর মিতুলের হল, জিয়া হলের সবাই কি ছাত্রদল করে? নিশ্চয়ই না, কিন্তু যারা অন্য দল করে তাদের থাকতে হয় চুপ করে। মানে প্রকাশ্যে সবাই ছাত্রদল। এ রকম যে হল যাদের দখলে সেই হলে সেই দল মেনে থাকতে হবে। ’

‘ছাত্রদলের দখলে কয়টা হল?’

‘সবই। জহুরুল, জগন্নাথ আর এসএম হল ছাড়া। জহুরুল হক হল ছাত্রলীগের বিদ্রোহীদের হাতে আর বাকি দুটো ছাত্রলীগের। এর বাইরে বাকি সব ছাত্রদলের। ’

‘সরকারে বিএনপি, তবু কী করে ছাত্রলীগ হল দখল করে রেখেছে?’

মিতুল এর জবাবটা দিল, ‘ছাত্ররাজনীতির মজা এইটাই। বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল না তখনো কিন্তু এই বঙ্গবন্ধু, জিয়া, মুজিব, সূর্যসেন, জসীমউদ্দীন, ফজলুল হক, শহীদুল্লাহ হল ছাত্রদলের দখলেই ছিল। এরশাদ সরকার অনেক চেষ্টা করেছিল। কিন্তু পারেনি। ’

অনন্য বুঝতে চায়, ‘তার মানে ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের একাধিপত্য? সমর্থনও কি ওদের বেশি?’

মিতুল একটু ভেবে বলে, ‘হ্যাঁ। বেশি। এই বিএনপিকে তো এবার ক্ষমতাতেই নিয়ে গেল ছাত্রদল। নির্বাচনের আগে কি বিএনপি ভেবেছিল ওরা ক্ষমতায় যেতে পারবে? প্রার্থীই তো দিতে পারছিল না। তার পরও কিভাবে ক্ষমতায় গেল?’

ইকবাল বলে, ‘সাইলেন্ট সাপোর্ট বিএনপির পক্ষে ছিল। সাংগঠনিক শক্তি নেই বলে আওয়াজটা ছিল না। ’

মিতুল বলল, ‘সেখানেই তো ব্যাপারটা। বেশির ভাগ সুবিধাবাদী নেতাকে নিয়ে বিএনপি তৈরি হয়েছিল বলে এরশাদ আসাতেই ক্ষমতালোভীরা জনদল-জাতীয় পার্টি ইত্যাদিতে চলে গেল। দলের সাংগঠনিক অবস্থা যা-তা। কিন্তু দেখ, ছাত্রদল এই সময়ে আরো এগিয়েছে। এরশাদ যখন ক্ষমতায় আসে তখন এই ডাকসু ছিল বাসদ ছাত্রলীগের দখলে। মাহমুদুর রহমান মান্না, জিয়াউদ্দিন বাবলু, আখতারুজ্জামানরা তখন কিংবদন্তি ছাত্রনেতা। কিন্তু ওদের কাছ থেকে আস্তে আস্তে ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দখল করে নেয়। ’

সুজন ছাত্রলীগ করে। হিসাবটা সে ঠিক মানতে চায় না। বলে, ‘কিন্তু ডাকসুতে তো ওরা একবারই জিতেছে। ১৯৯০ সালে। এর আগের বছর তো ছাত্রলীগের ভিপি ছিল, সুলতান মোহাম্মদ মনসুর। ’

‘কিন্তু উনি তো জিতেছিলেন ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে। আওয়ামী ছাত্রলীগ, জাসদ ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়নসহ সবাই মিলে একদিকে, অন্যদিকে ছাত্রদল একা। নইলে পারত না। পরের বার ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ ভেঙে যাওয়াতে একেকটা পদে দ্বিগুণেরও বেশি ভোট পেয়ে জিতেছে ছাত্রদল। ’

সঠিক তথ্য। সুজন আর কথা বাড়ায় না। তবে তার মনে হয়, সেটা পাঁচ বছর আগের ঘটনা। এখন জল অনেক গড়িয়েছে। সরকার ডাকসু নির্বাচন দিচ্ছে না। দিলে এবার হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে।

আকাশ রাজনীতির এসব আলোচনা পছন্দ করে না। এই প্যাঁচপ্যাঁচানি তার ভালো লাগছিল না। কথা ঘোরাতে বলল, ‘মিতুল আরেকটা কী রহস্যের কথা বলছিলি? শুনি না তোর সেই রহস্য। ’

‘সেটা শোনার জিনিস নয়, দেখার। ’

‘মানে কী?’

‘দেখতে হলে রাতে আসতে হবে। ’

‘কী হবে?’

‘বলব না। যা হওয়ার রাতে হবে। ’

‘আজ রাতেই?’

‘তোরা চাইলে আজ রাতেই। ’

আকাশ বলে, ‘দেরি কী?’

ফখরু অবাক হয়ে বলল, ‘কেইস কিরে মিতুল? আমারে আগে ক। পরে ঝামেলা হইতে পারে। আমি আগেই সব ব্যবস্থা কইরা রাখুম নে। ’

মিতুল হাসে। ‘আমারও হলে এক মাস হইয়া গেছে দোস্ত। এখন আমিও কিছু কিছু ব্যবস্থা করতে পারি। ’

 

পাঁচ.

জিয়া হলের ৫৩০ নম্বর রুমে রাতের খাবারের পরই সবাই অপেক্ষা করে থাকে, গল্প শুনবে বলে। সেই গল্প শুনতে আজ অনেক অতিথি। আয়োজন করে সবাইকে নিয়ে এলেও মিতুলের একটু সন্দেহ ছিল। বাকিরা কেমনভাবে বিষয়টা নেয়! দেখা গেল, সবাই দারুণ খুশি। আনন্দের ব্যাপার আসলে সব মানুষই ভাগাভাগি করতে চায়।

যিনি গল্পটা শোনাবেন তিনি এলেন সাড়ে ৯টার দিকে। ঘর্মাক্ত চেহারা। ক্রুদ্ধ ভঙ্গি। এত মানুষকে দেখেও কোনো বিস্ময়বোধ নেই।

কিছুক্ষণ সবাই চুপচাপ। পল্টু ভাই কথা শুরু করে, ‘কী অপূর্ব দা, মেজাজটা খারাপ মনে হয় আজকে। ’

অপূর্ব দা নামের মানুষটি খ্যাকখ্যাক করে উঠল, ‘বলেছি না, আমাকে অপূর্ব দা বলবেন না। আমি কি হিন্দু নাকি?’

রাজ্জাক ভাই বলল, ‘অপূর্বর সঙ্গে দাদা না লাগালে ঠিক জমে না। ’

অপূর্ব দা কী যেন ভাবে। তারপর বলে, ‘কিছু মনে কইরেন না ভাইয়েরা। মেজাজটা খুব খারাপ। বাসে পকেটমার হয়েছে। ’

বুলবুল ভাই হেসে দিয়ে বলে, ‘আপনে বাসে চড়েন? সিনেমার নায়ক বাসে চড়ে? কন কী?’

অপূর্ব দা সিনেমার নায়কের স্বীকৃতি পেয়ে একটু যেন খুশি, ‘নায়ক এখনো তো পুরো হইনি। সেকেন্ড হিরো। ফিল্মটা রিলিজ হোক। যদি হিট হয়ে যায় তাহলে এক ছবিতেই...। ডিরেক্টর স্যার অবশ্য বলছেন, বাম্পার না হলেও সুপারহিট হবেই। ’

সবাই বুঝতে পারে, ইনি সিনেমার নায়ক। এ-ওর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে। মিতুল ইঙ্গিতে চুপ থাকতে বলে গল্পে মনোযোগের নির্দেশ দেয়।

পল্টু ভাই বলে, ‘আজ কী কী হলো, বলেন। ’

অপূর্ব দা বলেন, ‘আজকে সিন কম ছিল। হিরোইন থাইল্যান্ড যাবে বলে ওর সিনই আজকে শুটিং হলো বেশি। ’

‘হিরোইনের সঙ্গে আপনার সিন নাই?’ মিতুল জানতে চায়।

‘দুইটা সিন আছে। আমি তো হিরোইনের বোনের লাভার। ’

‘তাইলে তো হিরোইন, মানে চম্পা আপার সঙ্গে আপনার কিছু নাই। ’ রাজ্জাক ভাই হতাশ।

অপূর্ব দা বলে, ‘না, ওনার বোনের সঙ্গেই সব। ’

‘তা আজকে কোনো সেই রকম সিন ছিল না?’

‘ছিল একটা। ’

‘কী সিন?’

‘বৃষ্টির। ’

সবাই নড়েচড়ে বসে। জসিম ভাই উল্টাদিকে ঘুরে পত্রিকা পড়ছিল। সে-ও ঘুরে তাকায়।

রাজ্জাক ভাই বলে, ‘ডিটেইল বর্ণনা দেন। সেইদিনকার মতো। ’

অপূর্ব দা বলে, ‘আমি রাস্তায় হাঁটছি, বাসে সিট পাচ্ছি না। এই সময় এলো বৃষ্টি। ’

সবার মধ্যে হতাশা। একা একা ও বৃষ্টিতে ভিজলে আর কী করে হয়!

অপূর্ব দা নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে, ‘তারপর এক দৌড়ে গিয়ে ঢুকলাম পাশের পার্কে। ’

‘সেখানে হিরোইন?’

‘অ্যাকজেক্টলি। ’

‘তারপর?’

‘গান শুরু হয়ে গেল। ’

ফখরু হেসে দিয়ে বলে, ‘গাঁজাখুরি! বৃষ্টির মধ্যে ছাতাটাতা খুঁজবে, তা না। গান! এইভাবেই আমাগো সিনেমা গেল। ’

কেউ ফখরুর সঙ্গে তাল মেলায় না। পরের অংশটুকু শুনবে। বৃষ্টিভেজা নায়িকা, গান...আহ!

অপূর্ব দা বলল, ‘তারপর গানের টেক। ’

‘নায়িকার পরনে কী ছিল ভাই?’

‘মিনি স্কার্ট। ’

‘আহ হারে,’ রাজ্জাক ভাই বলে। ‘আপনে কোলে নিয়া নাচলেন?’

অপূর্ব দা দুঃখের গলায় বলে, ‘কাজটা কঠিন ছিল। মেয়েটার ওজন ৭০ কেজির মতো হবে। তারপর একটা শট টেক দিতে হলো ৯ বার। ওর এক্সপ্রেশন ঠিক হচ্ছিল না। আমার অবশ্য দারুণ হচ্ছিল। সেটের সবাই হাততালি দিচ্ছিল। ’

আকাশ বলে, ‘ভাই, ভুল করবেন। যত ভুল করবেন ততবারই তো আবার টেক। বৃষ্টি-মিনি স্কার্ট...’

অপূর্ব দা বলে, ‘ঘণ্টা দুয়েক চলল। ’

‘দুই ঘণ্টা!’

আকাশ জানতে চায়, ‘ভাই, এই দুই ঘণ্টা যে এই রকম করেন তারপর কিছু হয় না। মানে, কিভাবে সামলান?’

‘কী সামলাই?’

‘না মানে, একটা ভেজা মেয়েকে নিয়ে জাপটাজাপটি...আমরা তো শুকনা মেয়ে হলেই...’

অপূর্ব দা হাসতে হাসতে বলে, ‘শোনো, আমিও শুরুতে তোমার মতো ভেবেছিলাম। কিন্তু ঘটনা কি জানো, এটা করা শুরু করলে তখন আর ওসব মনে থাকে না। তখন নিজের কাজটা ভালোমতো করা। ’

আকাশ জানতে চায়, ‘ভাই, আপনি চান্সটা পেলেন কিভাবে?’

এবার অপূর্ব দার গলা বদলে যায়। শোনা যায় কঠিন জীবনসংগ্রামের গল্প। বাড়ি সিরাজগঞ্জের তাড়াশে। ছোটবেলা থেকেই থিয়েটার-নাটকে অভিনয় করত। এলাকার সবাই উৎসাহ দিয়ে বলত, ‘ঢাকায় যেতে পারলে একেবারে হিট। ’ সেই উৎসাহ পেয়ে পেয়েই তার মনে হলো, যমুনা পার হলেই স্বপ্নের জীবন। তা পার হলো। উঠল এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়র বাসায়। প্রথমে সিনেমায় কাজ করতে এসেছে শুনে খাতির ছিল। কয়েক মাস ঘুরেও যখন কিছু হলো না তখন সেখানে দাম গেল, আস্তে আস্তে থাকার জায়গাও গেল। তারপর কঠিন জীবন, কয়েক রাত সোবহানবাগ মসজিদেও ঘুমিয়েছে। শেষে বাদামতলীতে চালের আড়তে একটা কাজ পেল। সেখানে ক্যাশ দেখার সঙ্গে রাতে ঘুমানোর ব্যবস্থা।

সুজন বলে, ‘নায়ক হতে এসে চালের আড়তের ক্যাশিয়ার। ভাই, আপনার জীবনটাই তো একটা ভালো সিনেমা। বানালে দারুণ জমত। ’

অপূর্ব দা বলে, ‘হুঁ। তোমার মতো আমারও মনে হতো, আমার জীবনটাই দারুণ সিনেমা। কিন্তু এখন আর সেটা মনে হয় না। আসলে কি জানো, আমাদের দেশে প্রায় সবার জীবনই এ রকম আর তাই এগুলো সিনেমার গল্প হয় না। মানুষ নিজের জীবনে যা ঘটে সেটা দেখতে চায় না। দেখতে চায়, যেটা সে স্বপ্নে দেখে কিন্তু শেষ পর্যন্ত পায় না। ’

ভারী আলোচনায় চলে যাচ্ছে দেখে আকাশ থামিয়ে দিয়ে বলে, ‘তারপর চান্সটা পেলেন কিভাবে?’

‘আমি হাল ছাড়ি নাই। সপ্তাহে একদিন ছুটি ছিল। এফডিসির সামনে গিয়ে ঘোরাঘুরি করতাম। সিরাজগঞ্জে থিয়েটার করার কারণে কিছু পরিচিতি ছিল, এক সহকারী পরিচালককে ধরলাম। তাঁর পেছনে লেগে থাকলাম এক বছর। ওর ফাই-ফরমাশ খেটে তারপর এই চান্স। এর মাঝখানে আরো বহু কিছু আছে। শুনলে রাত পার হয়ে যাবে। ’

পল্টু ভাই বললেন, ‘সেই সহকারী পরিচালক আমার দূরসম্পর্কের চেনা। সেই সূত্রে অপূর্ব দা এখানে। ’

অপূর্ব দা বলল, ‘চালের আড়তের চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর থাকার জায়গা নেই। তখন কিসলু ভাই বললেন, হলে থাক। আমি প্রথমে অবাক হয়েছিলাম। ইউনিভার্সিটি হলে আমি থাকব কী করে? উনি বললেন, ঢাকা শহরের সবচেয়ে সুবিধাজনক থাকার জায়গা হলো হল। কোনোভাবে উঠে যেতে পারলেই...’

সুজন জানতে চাইল, ‘আপনার নামটা অপূর্ব...এটা কি বানানো নাম?’

‘হ্যাঁ। এটা ডিরেক্টর স্যারের দেওয়া নাম। অপূর্ব চৌধুরী, আমার আসল নাম মতিনুর রহমান। ’

‘সবার কি নাম বদলাতে হয়?’

‘সবার। এই যেমন ধরো এখনকার হিট সালমান শাহ, তার নাম হচ্ছে শাহরিয়ার ইমন। নায়িকা ববিতার নাম হলো পপি, শাবানা ম্যাডামের নাম হলো রত্না। ’

‘ও। ’

‘এটা শুধু আমাদের দেশে না। উত্তম কুমারের আসল নাম জানো? অরুণ চট্টোপাধ্যায়। সুচিত্রা সেনের নাম হলো রমা। ’

‘হলিউডেও কি নাম বদলায়? টম ক্রুজ, শ্যারন স্টোন এগুলোও কি নকল নাম?’

অপূর্ব দা একটু ভাবনায় পড়ে গিয়ে বলে, ‘এটা তো ঠিক জানি না। কালকে ডিরেক্টর স্যারকে জিজ্ঞেস করতে হবে। ’

আসর ভাঙল ঘণ্টাখানেক পর। আগেই ঠিক ছিল মিতুল সবাইকে খাওয়াবে। এখন বিতর্ক দেখা দিল খাওয়ার ভেন্যু নিয়ে। মিতুল ঠিক করেছিল নিচে মামার দোকানে বন আর লাড্ডু দিয়ে মেরে দেবে। কিন্তু এখন সবাই চায় চানখাঁরপুলে সম্রাট হোটেলে যেতে। ওখানে রাতভর পরোটা আর গরুর মাংস চলে। কিছুক্ষণ বাদানুবাদের পর পরোটার টাকা মিতুল আর গরুর মাংস সবাই ভাগাভাগি করে দেবে এই সাব্যস্তে চানখাঁরপুলের দিকে রওনা দিল পুরো দল।

অপূর্ব দাকেও সঙ্গে আনার একটা প্রস্তাব দিয়েছিল আকাশ। সে রাজি হয়নি। কাল নাকি ক্যামেরা ওপেনিং সকাল ৮টায়। পুকুরের পানিতে ঝাঁপ দেওয়ার একটা কঠিন সিন আছে। রাতে ঘুমানো দরকার।

হাঁটতে হাঁটতে আর গান গাইতে গাইতে টিএসসি হয়ে দোয়েল চত্বরের রাস্তাটা ধরে ওরা। রাত প্রায় ১২টা। কিন্তু ক্যাম্পাস ভীষণ জীবন্ত। মিতুলের এই সময়টার বিশ্ববিদ্যালয়কে এত ভালো লাগে যে মনে হয় যারা ঢাকা ভার্সিটিতে চান্স পায় না তারা কী দুর্ভাগা!

গান নিয়েও একটু বিতর্ক দেখা দেয়। সৌরভ দলের গায়ক, সেই নেতৃত্ব দেবে স্বাভাবিক, কিন্তু ফখরুর বক্তব্য হলো, ও কঠিন কঠিন গান গায়। সহজ গান গাওয়া উচিত, যেটা সবাই পারে।

সৌরভ বলে, ‘কঠিন গান কী? হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান কঠিন গান?’

‘বিদেশি গান না, দেশি গান চাই। ’

‘তাহলে তুই আমার সোনার বাংলা গা। ’

‘না, ডিফারেন্ট টাচ, অবসকিওর গা। শ্রাবণের মেঘগুলো, না হলে মাঝরাতে চাঁদ যদি আলো না বিলায়...’

মিতুল এই গোলমাল থামাতে সবার কাছে জানতে চায়, ‘তোদের চমকটা পছন্দ হয়েছে?’

আকাশ বলে, ‘দারুণ!’ তারপর গলা নামিয়ে অনুরোধের গলায় বলে, ‘শোন, আমি ওনাকে বলেছি আমাকে একদিন শুটিং দেখাতে নিয়ে যেতে। তুই একটু বলিস। ’

সবাই হো হো করে হাসে। সুজন বলে, ‘তুই ক্লাসের মেয়েদের বাদ দিয়ে এখন সিনেমার মেয়েদের দিকে যাবি?’

আকাশ বলে, ‘ক্লাসের মেয়েরা তো আছেই। সব সময়ের জন্য। আরেকটা জানালা যদি খোলা যায়, মন্দ কী!’

ইকবাল বলল, ‘একটা সিনেমার নায়ক হলে থাকে। অদ্ভুত না! আচ্ছা উনি থাকে কিভাবে? হলের ক্যাডাররা কিছু বলে না!’

‘আরে না, খাতির করে। মাস হিসেবে টাকা দেয় তো। ’

‘তাই নাকি?’

সুজন বলে, ‘আরে হলে যে কত কিসিমের লোক থাকে। আমাদের হলে তো দুইটা রুম ছিনতাইকারীদের ভাড়া দিয়েছিল। ’

‘দুর। চাপা!’

‘আরে না ব্যাটা, সত্যি। হলের নিচের সারির ক্যাডাররা দুইটা রুম কয়েকজন ছিনতাইকারীকে থাকতে দিয়েছিল, এরা রাতে আশপাশে ছিনতাই করত, যা পেত ফিফটি-ফিফটি ভাগ হতো ক্যাডারদের সঙ্গে। ’

‘এখনো আছে নাকি?’

‘না। হলেরই এক ছেলেকে ছিনতাই করেছিল ওরা। সে এদের হলে দেখে চিনে ফেলে, তাই নিয়ে হৈচৈ। পরে ওপরের লিডাররা এদের বের করে দিয়েছেন। ’

‘বাপরে! তোদের হল তো দেখি সবচেয়ে সরেস। ’

‘না। ঘুরেফিরে সব হলেই এমন আছে। একটু খোঁজ নিয়ে দেখ। সিটের পুরো মালিকানা পলিটিক্যাল ছেলেদের হাতে থাকলে আর কী হবে?’

ফখরু হাসতে হাসতে বলে, ‘আমাদের হলে একজন হোমিওপ্যাথি ডাক্তার আছেন। আমরা দরকার পড়লে হের কাছে যাই। তবে তার থাইকাও মজার ব্যাপার, একবার একজন ঘটকরে পাওয়া গেছিল হলে। পরে মারধর কইরা বাইর কইরা দিছে। ’

‘মারধর করল কেন?’

‘আরে হলে মারধরের কোনো কারণ লাগে নাকি? কোনো ক্যাডারের হয়তো মনে হইছে...’

মিতুলের পুরো বিষয়টা দারুণ লাগে। হলে নায়ক আছে, ছিনতাইকারী আছে, ঘটক, ডাক্তার। হলটা একটা দারুণ জায়গা বটে।

আকাশ বলে, ‘মিতুল, তুই শুটিং দেখার ব্যাপারটা ভুলিস না কিন্তু। ’

সুজন ব্যঙ্গের গলায় বলে, ‘আকাশ, তুই ক্লাসের মেয়েদের বাদ দিয়ে এখন সিনেমার মেয়েদের পেছনে নামবি?’

‘খেলাম না হয় ঘোল। ক্লাসের মেয়েরা তো পাঁচ বছর ইনট্যাক্ট আছেই। আরেকটা উইন্ডো খুললে অসুবিধা কী?’

‘লাভ নেই বন্ধু। ঘোল খাইয়ে ছেড়ে দেবে। শুটিং-সিনেমা-নায়িকা এইগুলা ভুলে যা। ’

আকাশ রাগের গলায় বলে, ‘হুঁ, তাইলে তোমার মতো সবাই শুধু আবাহনী-মোহামেডান দেখবে। কী যে আছে এই লাথালাথিতে। আমি শালা ভেবেছিলাম, এই আবাহনী-মোহামেডান খালি আমাদের গ্রামের মানুষের ব্যাপার, এখন এখানে এসে দেখি তোর মতো পাগলও আছে। ’

সৌরভ হাসে। বলে, ‘দোস্ত, আবাহনী-মোহামেডান আর ফুটবলের দিন শেষ। সামনে শুধু ক্রিকেটের দিন। ’

সুজন ঠিক একমত হয় না, ‘তোমরা কেনিয়া-আরব আমিরাতের সঙ্গে পারো না আর দিন আসবে ক্রিকেটের। ’

ইকবাল আলোচনায় যোগ দিয়ে বলে, ‘এবার তো পারলাম না মহিন্দর অমরনাথ আর ফারুকের জন্য। নেক্সট ইয়ার মিস হবে না। এই পরেরবার আইসিসি ট্রফিটা কোথায় যেন?’

‘মালয়েশিয়ায়। ’ সৌরভ বলে।

সিনেমার নায়কের হলে ডাবলিং, চানখাঁরপুলের পরোটা-মাংস, ডিফারেন্ট টাচ-অবসকিওর, ফুটবল-ক্রিকেট শেষ করে যখন হলে ফিরেছে তখন রাত প্রায় দুইটা। গেটে নেমেই চমকে উঠল মিতুল।

নেতারা দাঁড়িয়ে। রণসজ্জা মোটামুটি।

ওকে দেখেই আরিফ ভাই বলল, ‘মিতুল, দাঁড়াও। অ্যাকশন আছে। ’

 

ছয়.

হলের সব নেতা আছেন। নিচের বা মাঝারি স্তরের কর্মীরাও সব হাজির। কিন্তু মিতুল জানে এরা কেউ কিছু নয়, এই হলের চাবি যার কাছে তার নাম জুয়েল ভাই। তিনিই হলের মালিক, তাঁর কথাই আইন। তিনি অবশ্য এখন অনুপস্থিত, তবে পুরো আয়োজনটা যে তাঁর নির্দেশে, সেটা সে জানে।

জুয়েল ভাইয়ের হয়ে হল সামাল দেওয়ার দায়িত্ব মাসুদ ভাইয়ের, যাঁর কাছে ইন্টারভিউতে পাস করে সে হলে উঠেছিল। তিনি প্রশ্ন রাখলেন, ‘জুয়েল ভাইয়ের সঙ্গে বেয়াদবির শাস্তি কী হওয়া উচিত?’

মিতুল স্তম্ভিত। এই হলে জুয়েল ভাইয়ের সঙ্গে বেয়াদবির সাহস দেখানো মোটামুটি কারফিউ ভঙ্গ করার মতো অপরাধ। কে করল?

আরিফ ভাই বলল, ‘একেবারে বুকে গুলি করা উচিত। একটা না, পুরো বেল্ট। ’

 সে কোমরে লুকানো অস্ত্রটাতে হাত দেয়। দেরি করতে যেন খুব ইচ্ছা হচ্ছে না।

হলের সাধারণ সম্পাদক জহির ভাই এই পর্যায়ে ফ্লোর নেওয়ার চেষ্টা করেন, ‘শোনো, ঘটনা তোমরা কেউ কেউ জানো বোধ হয়। জুয়েল ভাইয়ের কয়েকজন গেস্ট এসেছিল কাল। ক্যান্টিনে খেতে গিয়েছিল। ওদের ক্যান্টিনের ছেলেরা সম্মান করেনি। কাজেই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি ক্যান্টিনটা এখন থেকে বন্ধ হয়ে যাবে। ’

মাসুদ বলল, ‘আর ক্যান্টিন মালিককে ন্যাংটা করে কাল সকালে হলে ঘোরানো হবে। ’

আরিফ খুব একটা খুশি হয় না। বলে, ‘শাস্তিটা হালকা হয়ে যাচ্ছে মাসুদ ভাই। ’

মাসুদ ভাই পাত্তা না দিয়ে বলল, ‘ক্যান্টিন ম্যানেজার কই?’

‘বাইরে আছে। ডাকলেই আসবে। ’

ক্যান্টিন ম্যানেজার এসেই অসহায় গলায় বলল, ‘ভাই, আমার ভুলটা কী, যদি একটু বলতেন। আমি তো বুঝতাছি না। ’

‘জুয়েল ভাইয়ের দুইজন লোক কালকে খাইতে গেছিল। তুমি তাদের খাবার দিতে দেরি করছ। ’

‘ভাই, আমি তো ছিলাম না। ওরা বোধ হয় চিনতে পারেনি। ’

‘না, আমাদের লোক সঙ্গে ছিল। ’

ক্যান্টিন ম্যানেজার এই পর্যায়ে বুঝতে পারে যে কথা বাড়িয়ে নেই। ক্ষমা চাওয়ার লাইনে যেতে হবে। দেরি করে না। মাসুদ ভাইয়ের পা জড়িয়ে ধরে বলে, ‘ভাই, ভুল হইয়া গেছে। মাফ কইরা দেন। ’

‘আমাগো লগে কিছু করলে মাফ ছিল। কিন্তু তোমারে মাফ করলে আমরা মাফ পামু না। জুয়েল ভাইরে অনেক বুঝাইয়া অল্পতে ব্যবস্থা করছি। ক্যান্টিন বন্ধ। এইটাই তোমার শাস্তি। ’

‘কন কী? এত টাকা দিয়া নিছি...এখন বন্ধ করলে পেটে লাত্থি। ’

আরিফ ভাই বলে, ‘আর কথা বাড়াইয়ো না। এই রনি-ফখরু-মিতুল, তোমরা যাও। জিনিসপত্র যা আছে সব বাহির করো। চাল-ডাল যা আছে সব কালকা নিউ মার্কেটে নিয়া বেইচা দিবা। যাও। ’

দেরি করার সুযোগ নেই। সদলবলে সবচেয়ে জুনিয়র ক্যাডাররা ছুটল ক্যান্টিনে। মিতুল অবাক হয়ে দেখল উৎসাহটা। দরকার ছিল না তবু লাথি মেরে দরজা ভাঙা হলো। জিনিসপত্র যা ছিল সব টেনে বের করা হলো।

ফিরে এসে দেখে, ক্যান্টিন ম্যানেজার মাসুদ ভাইয়ের পা জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। মাসুদ ভাই এমন ভাব করে দাঁড়িয়ে যেন এই পা-টা তাঁর নয়।

ক্যান্টিন ম্যানেজার চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গরম চা আর শিঙাড়া হাজির। একটু পরে সবার হাতে এলো একটা করে পাঁচ শ টাকার নোট। মাসুদ ভাই বললেন, ‘কালকে এলিফ্যান্ট রোডে গিয়ে একটা করে জিন্স প্যান্ট কিনে নিবা। ঠিক আছে?’

চা-শিঙাড়া আর পাঁচ শ টাকা পেয়ে অনেকেই চলে গেল। ফখরু আর মিতুল রয়ে গেল। আরিফ ভাই ওদের থাকতে বলেছিল তাই।

হলের দ্বিতীয় স্তরে আরিফ হচ্ছে সবচেয়ে ক্ষমতাশালী নেতা। ফখরু ছিল ওর শিষ্য, সেই সূত্রে মিতুলও। আরিফ ঘোরার সময় ওদের সঙ্গে রাখে, আলাদা করে ওদের নিয়ে বসে। এই সূত্রে দ্বিপক্ষীয় লাভ হচ্ছে। আরিফের সার্বক্ষণিক দুজন ক্যাডার আছে, নেতাদের কাছে ওর দাম বাড়ছে। ওদিকে আরিফের কাছের লোক বলে মিতুল-ফখরুও এখন বেশ ক্ষমতাবান। মিতুলের একটু আপত্তি ছিল, ফখরু ওকে বুঝিয়েছে, ‘দোস্ত, পলিটিক্যাল লাইনে হলে উঠছ, এখন পাওয়ারের সঙ্গে না থাকলে কেউ দাম দিব না। ’

‘তোর কি পলিটিকস করার ইচ্ছা?’

‘ইচ্ছা আছে। তয় আমি পারুম না। আমার বুদ্ধি কম। ’

‘আমি পারব?’

‘এক শ ভাগ পারবি। ’

‘কিন্তু আমি তো এই দল করি না। ’

‘তোর আবার দল আছে নাকি? কোন দলের সাপোর্ট?’

‘অত কিছু না। তবে কলেজে ছাত্র ইউনিয়ন করতাম। আমাদের ফ্যামিলি কমিউনিস্ট পার্টি। ’

‘এইগুলার দিন শেষ এখন। গর্বাচেভই শেষ। আর কমিউনিস্ট পার্টি! পার্টি বদলায়া ফালাও। ’

মিতুল চুপ করে থেকে একটু ভাবে। সত্যি বললে, রাজনীতি করার ইচ্ছা তার কিছু ছিল। তার মনে হচ্ছিল স্বৈরাচারের পতন হয়েছে, দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৫ বছর পর। মাঝখানে ছাত্ররাজনীতিতে অস্ত্র আর পেশির যে দুষ্টক্ষত ঢুকেছিল এটা সেরে যাবে গণতন্ত্রের ছোঁয়ায়। কোথায় কী! অবস্থা আরো ভয়ংকর। আগে তবু ডাকসু নির্বাচন হতো, এখন গণতন্ত্রের আমলের চার বছরে এটাও বন্ধ। আমানউল্লাহ আমান এখন সংসদ সদস্য, কিন্তু তিনি এখনো ডাকসু ভিপি। তাঁর দোষ কী! নির্বাচনই যে হচ্ছে না। আর এই নিয়ে কারো বিশেষ মাথাব্যথাও নেই। সরকারি দল চায় না, কারণ সব যখন তাদের নিয়ন্ত্রণে তখন আর দরকার কী! ছাত্রলীগ চায় না কারণ তারা জানে, তাদের জয়ের সুযোগ নেই। আর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও খুব আগ্রহী না। উপাচার্য সাদা দলের একসময়ের নেতা। সরকারি দল যা চায় তিনিও তাই চান। আর তাই ছাত্ররাজনীতি মানে দলে নাম লিখিয়ে হল  পাহারা দেওয়া, ক্যান্টিনে ফ্রি খাওয়া, হল থেকে দলবেঁধে মিছিলে যাওয়া আর মাঝেমধ্যে এ রকম অ্যাকশনে গিয়ে জিন্স প্যান্টের টাকা পাওয়া। আর অদ্ভুত আঞ্চলিকতা। এই যেমন, তাদের হলটার মালিক হলো ময়মনসিংহ গ্রুপ, কারণ জুয়েল ভাইয়ের বাড়ি হলো কিশোরগঞ্জে। ওদিকে মুহসীন-সূর্যসেন দখলে রেখেছে টাঙ্গাইল গ্রুপ। ছাত্রলীগে আছে ফরিদপুর আর বরিশাল গ্রুপ। ওই সব এলাকায় বাড়ি হলে উন্নতি খুব সহজ, নইলে প্রায় অসম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় এই ক্ষুদ্র আঞ্চলিকতাবোধ তাকে বিস্মিত করে। কিন্তু এই নিয়মটা সবার কাছে স্বাভাবিক।

ফখরু আবার জিজ্ঞেস করে, ‘কী দোস্ত, পলিটিকস করবা?’

‘না। ’

‘প্রেমট্রেম করবা সিরিয়াসলি?’

‘না। সে রকম কোনো টার্গেট নাই। ’

‘তাইলে চাকরিবাকরি শুরু করবি?’

‘না। অত দরকার নেই। দরকার হইলে টিউশনি করব। ’

‘আবৃত্তি-বিতর্ক-সমাজসেবা এইগুলোর ইচ্ছা আছে?’

‘আছে। তবে খুব বেশি না। ’

‘তাইলে তোমার জন্য পলিটিকসটা ছিল। যাদের এইগুলা কিছুর টার্গেট নাই তারাই পলিটিকস করে। ’

‘তাই নাকি?’

‘হুঁ। ’

‘কারণ কি জানছ?’

‘কী?’

ফখরু অট্টহাসি দিয়ে বলে, ‘কারণ পলিটিকস করলে একলগে এইগুলা সব পাওয়া যায়। শক্তি দিয়া প্রেম কইরা নিবা কাজেই আর মেয়েদের পেছনে ঘোরার দরকার কী? আবার টেন্ডারফেন্ডার থাইকা টাকা কামাবা, চাকরিবাকরির দরকার নাই। সব হয় পলিটিকসে। ’

‘আমার সব লাগব না। ’

‘তাইলে পলিটিকস করবা না, না?’

‘না। ’

‘তোর চান্স আছিল। যাই হোক, তাল দিয়া যাও। হলে দাপট নিয়া থাকতে হইলে পলিটিকসের লগে তাল দিতে হইব। ’

দাপটে থাকার একটা ব্যাপার আছে, কিন্তু সে জন্য ঠিক নয়, মিতুল বিষয়টার সঙ্গে থেকে একটু দেখতে চায়। বুঝতে চায়। ইন্টারেস্টিং আছে।

আজকের ব্যাপারটাও বেশ ইন্টারেস্টিং। জানা গেল আরিফ ভাইয়ের কাছ থেকে।

সবাই চলে গেলে আরিফ জিজ্ঞেস করল, ‘কেসটা তোমরা কিছু বুঝতে পারলা?’

ফখরু বলল, ‘জুয়েল ভাইয়ের গেস্ট যে, ব্যাটা বোধ হয় বুঝতে পারে নাই। ’

আরিফ ভাই বিরক্ত ভঙ্গিতে বলে, ‘আরে দুর কিসের জুয়েল ভাইয়ের গেস্ট। সব ভুয়া গল্প। ’

‘তাইলে?’

‘ডাইনিং আর ক্যান্টিনে ফাটাফাটি চলতেছে। দাম এক টাকা বেশি হলেও ক্যান্টিনের খাবার ভালো বলে সবাই ক্যান্টিনে খেতে যায়। ডাইনিং কুলাতে পারছে না। তাই আমাদের সাহায্য চাইল। ’

‘কী সাহায্য?’

‘৫০ হাজার টাকা দিছে ক্যান্টিন বন্ধ করার জন্য। ’

‘কিন্তু পোলাপাইন খেইপা যাইব না...ডায়নিংয়ের খাবার তো মুখে দেওয়া যায় না। ’

‘১০ টাকায় আর কী মুখে দেওয়ার খাবার দিবে?’

‘কিন্তু ক্যান্টিন তো ১১ টাকাতেই কত ভালো খাবার দেয়। ’

‘হুঁ। ’ আরিফ ভাই একটু ভাবে। ‘না, স্থায়ীভাবে বন্ধ না। এক-দেড় মাস। তত দিনে ডাইনিং একটু ব্যবসা করে পুষিয়ে নেবে। ’

‘ভাই, আমার মনে হয়, ডাইনিংয়ের একটা সমস্যার কারণ আমাদের ফ্রি খাওয়া। আমরা প্রায় পঞ্চাশজন প্রতি বেলা ফ্রি খাই। এটা পোষাতে গিয়েই খাবারের এই অবস্থা। ’

‘এটা তো কিছু করার নাই। আমরা কি তাইলে পয়সা দিয়া খামু? পার্টিরে এত সার্ভিস দেই, দিন-রাত এক করি, আমাদের খাওয়া দিতে হবে না!’

‘তা-ও ঠিক। ’ মিতুল মেনে নেয়।

এক-দেড় মাস অবশ্য ক্যান্টিন বন্ধ থাকল না। এক সপ্তাহ পরই খুলে গেল। জানা গেল, ৭৫ হাজার টাকায় রফা হয়েছে।

 

সাত.

আকাশ নিজের ভাগ্যকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না। ওর পাশে রিকশায় বসে নিম্মি। নিম্মি নিঃশ্বাস নিচ্ছে, সেই বাতাসের ছোঁয়া তার শরীরে। দারুণ একটা পারফিউম মেখেছে। মাতাল করা গন্ধ। মাঝেমধ্যে হেসে গড়িয়ে পড়ছে ওর ওপর। সেই স্পর্শ বিদ্যুতের শকের মতো জাগিয়ে তুলছে ওর শরীরকে। না, জীবনটা কখনো কখনো সত্যিই স্বপ্নের মতো।

আকাশ কাল ক্লাস শেষে নিম্মির কাছে জানতে চেয়েছিল, ‘তোমার কোনো কাজ আছে আগামীকাল?’

‘কেন বলো তো?’

‘না। তোমাকে নিয়ে এক জায়গায় যেতাম। ’

‘আমাকে নিয়ে...কোথায়? কেন?’

আকাশ গলা নামিয়ে বলে, ‘আমার আসলে একটা অ্যাফেয়ার আছে। গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে একটু ভুল-বোঝাবুঝি হয়েছে। তুমি গিয়ে একটু কথা বললে হয়তো...আমার মনে হচ্ছে, তুমি অনেক ম্যাচিউর। ম্যানেজ করতে পারবে। ’

মিথ্যা কথার অভিনয়টা এত কাঁচা হলো যে ধরে ফেলতে ভার্সিটির কোনো মেয়েরই সমস্যা হওয়ার কথা না।

নিম্মি কিন্তু সন্দেহ করল না। বলল, ‘তুমি তো মামা কাবিল লোক। কলেজেই কাজ সেরে ফেলেছ। ’

আকাশ হাসে। হাসির অভিনয়টা হলো আরো কাঁচা।

নিম্মি তাতেও কোনো সন্দেহ করে না। বলে, ‘যাই হোক, তুমি কোন মেয়েটার সর্বনাশ করলে সেটা দেখতে তো যেতে হয়। ’

সুবর্ণলতা পাশ থেকে বলল, ‘একা নিম্মিতে হবে? নাকি আমরাও যাব। সদলবলে গেলে ভালো। ’

আকাশ বলে, ‘তাতে সমস্যা আছে। ভাববে, আমি ভার্সিটিতে এসে মেয়েদের পেছনে লাইন দিয়ে বসে আছি। ’

‘কথা তো মিথ্যা না। ’

‘তা না। কিন্তু তোমরা তো জাস্ট ফ্রেন্ড। ’

যাই হোক, তার পরও আকাশ বিশ্বাস করেনি যে নিম্মি সত্যি সত্যিই ওর সঙ্গে এক রিকশায় উঠে পড়বে। নিজেই ক্লাস শেষে বলল, ‘চল। রিকশায় নিতে হবে কিন্তু। বাসটাসে ওঠানোর চেষ্টা করবে না। ’

‘না, না, রিকশাতেই যাব। তুমি চাইলে বেবিট্যাক্সিও হতে পারে। ’

‘তোমাকে অত বড় ছিল দেব না। তবে দুপুরের খাওয়াটা যেন ঠিক হয়। ’

বলেছে, মোহাম্মদপুর তাজমহল রোডে গার্লফ্রেন্ডের বাসা। সেভাবেই রিকশা নেওয়া হয়েছে। অ্যানেক্স বিল্ডিং থেকে এফ রহমান হলের মোড় ঘুরে কাঁটাবন দিয়ে যাচ্ছে। এই রাস্তায় দুপুরে অনেক জ্যাম থাকে কিন্তু আজ ফাঁকা। আকাশের মেজাজ খারাপ হয়। ও ভেবেছিল, রিকশায় অন্তত ঘণ্টাখানেক পাশে বসা যাবে কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে ১৫ মিনিটেই পৌঁছে যাবে। এটা কোনো কথা হলো নাকি? আজ জ্যাম নেই কেন? ট্রাফিক পুলিশরা করছে কী?

ইস্টার্ন প্লাজায় বিগ বাইট রেস্টুরেন্টের সামনে এসে প্রথম জ্যামের দেখা পাওয়া গেল। আকাশ খুশি হয়েছিল। খুশিটা থাকল না বেশিক্ষণ।

নিম্মি বলল, ‘এই, তোমার ক্ষুধা পায়নি?’

‘না। এখনো পায়নি। ’

‘আমার পেয়েছে। চলো বিগ বাইটে একটু বসি। ’

ভার্সিটির মেয়েদের কাছে বিগ বাইট খুব প্রিয় জায়গা। আকাশের মতো প্রেমার্ত ছেলেদের এখানেই এনে পকেট খসানো হয়। আকাশ একটু বিচলিত বোধ করে। নিম্মি সঙ্গে থাকায় রিকশাভাড়া নিয়েও প্রয়োজনীয় দরাদরি করা যায়নি। বদমাশ ড্রাইভারটা সেটা বুঝে মোহাম্মদপুরের ভাড়া নিচ্ছে ২০ টাকা। এমনিতে ওরা ১৫ টাকায় যায়।

যাই হোক, প্রেম হই-হই সময়ে মেয়েরা যা চায় তাই মানতে হয়। আকাশ রিকশাটা ছেড়ে দিল।

বিগ বাইটে ভিড়। ওদের মতো আরো অনেকে ভিড় করেছে বলে একটা টেবিলও খালি নেই। আকাশ একটু স্বস্তিবোধ করছিল, জায়গা না পেলে তো ওর প্রেস্টিজও থাকল, টাকাও পকেটে রইল। কিন্তু নিম্মি একটা বেয়ারার সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলে ঠিক জায়গা ম্যানেজ করে ফেলল।

বসেই বলল, ‘আকাশ, তোমার ১৫ টাকা বাঁচিয়ে দিলাম। ’

‘কিভাবে?’

‘মোহাম্মদপুর যেতে হলো না যে...’

‘মানে?’

‘আচ্ছা, আমাকে কি তোমার কচি খুকি মনে হয়?’

‘এই কথা কেন?’

‘তোমার কি ধারণা, ওই প্রেমের গল্প আমি বিশ্বাস করেছি?’

‘বিশ্বাস করোনি?’

‘আরে দুর। তোমার মতলব আমাকে নিয়ে একটু ঘোরা। ’

‘তুমি যে কী বলো না!’ আকাশ বুঝতে পারে, ওর অভিনয়টা খুব খারাপ হচ্ছে।

‘যাই হোক, সমস্যা নেই। ঘোরাঘুরি হবে। ঘোরাঘুরির জন্য এনার্জি লাগবে তো। তাই আগেই খাওয়াদাওয়া। তা ছাড়া ছেলেদের আজকাল বিশ্বাস নেই, দেখা গেল দুই ঘণ্টা রিকশায় ঘুরে পরে এক কাপ কফি খাইয়ে ছেড়ে দিল। ’

আকাশের আর বলার কিছু থাকে না।

নিম্মি অর্ডার দেয়। অনেক কিছু। তারপর সমবেদনা দেখানোর মতো করে বলে, ‘টাকা আছে তো? অবশ্য না থাকলে অসুবিধা নেই। আমি সহজ শর্তে ধার দেব। ’

সহজ শর্তে ধার দেওয়া লাগল না। আকাশের পকেটে টাকা ছিল।

এর মধ্যেই হঠাৎ চমকে গিয়ে দেখে, ফখরু এসে ঢুকেছে। আকাশ ওকে দেখেই মাথা লুকাচ্ছিল কিন্তু দরকার থাকল না। ফখরুর সঙ্গেও একটা মেয়ে। সুন্দরী মেয়েদের সংক্ষিপ্ত তালিকায় ওপরের দিকে আছে বলে মেয়েটাকে ওরা চেনে, ওদের বিল্ডিংয়েরই জিওগ্রাফি ডিপার্টমেন্টের কবিতা। এই মেয়েকে ফখরুর মতো একটা ছেলে এর মধ্যে ম্যানেজ করে ফেলেছে দেখে ওর মন খারাপ হয়। ফখরুকে ধরতে ইচ্ছে হয় কিন্তু আবার তাহলে নিজেও ধরা পড়ে যাবে! যাক, এখন লুকিয়ে থেকে পরে ফখরুকে সুবিধাজনক সময়ে ধাতানি দেওয়া যাবে।

কিন্তু ফখরু ওকে দেখে ফেলল বাথরুমে যাওয়ার সময়। দেখেই চিৎকার করে বলল, ‘দোস্ত, তুমি এইখানে? আগে বললে একসঙ্গে আসতাম। ’

নিম্মিকে আকাশের সঙ্গে দেখাও যেন স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। বলল, ‘একসঙ্গে আসলে ভালো হইত। খাওয়াদাওয়ার সুবিধা। এদের খাবারগুলার সাইজ বড় বড়। ভাগজোগ কইরা খাইলে লাভ হইত। ’

‘তুই কি সব সময় আসিস নাকি?’

‘সব সময় না। ’

‘এই মেয়েটি তোর সঙ্গে?’

‘ও কবিতা? খুব দুঃখী মেয়ে। ভেরি স্যাড স্টোরি। শুনলে চোখে পানি চলে আসবে। তোরে পরে হিস্ট্রি কমুনে। ’

বাস্তবে অবশ্য চোখে পানি আসার মতো কিছু দেখা গেল না। ওরা হাসি-তামাশাই করে গেল সারাক্ষণ। সম্পর্কটা কী ঠিক বুঝতে পারল না আকাশ। মন খারাপ হয় ওর। কবিতাকেও সে তার তালিকায় রেখেছিল। হাতছাড়া হয়ে গেল!

বেরোনোর সময় ফখরুকে হাত দেখিয়ে বিদায় নিয়ে নিতে চাচ্ছিল কিন্তু সে তাড়াহুড়া করে উঠে এসে ওকে এক কোনায় নিয়ে গিয়ে বলল, ‘দোস্ত, তুমি-আমি দুজনই ধরা খাইছি। তুমিও কাউরে কিছু কইও না, আমিও কমু না। ঠিক আছে?’

‘কিন্তু তুই না বললি স্যাড স্টোরি শুনতে আসছিস?’

ফখরু হাসে। বলে, ‘সত্যিই স্যাড স্টোরি। করুণ কাহিনি। তোমারে শুনামুনে একদিন। ’

আকাশ বিস্ময় বোধ করে। যে ফখরু ঠিকমতো কথাই বলতে পারে না, অকারণে হাসে বলে ওরা গুরুত্ব দেয় না, এই জায়গায় সে-ও কী স্মার্ট! এই কাজে তাহলে তলে তলে সবাই একেকজন গ্র্যান্ডমাস্টার।

ও ফিরে এলে নিম্মি বলে, ‘কী, দুইজন দুইজনের কাছে ধরা!’

আকাশের মন খারাপটা এই কথায় দূর হয়ে যায়। এর মানে তো ওদের সম্পর্কটাকে বিশেষ কিছু মনে করছে নিম্মি। আকাশও চায়। কিন্তু আবার একজনে পুরো ডুবে গেলেও তো হবে না।

নিম্মি বলল, ‘চলো। রিকশা ডাকো। ’

‘কোথায় যাব? মোহাম্মদপুর তো আর যাওয়া লাগছে না। ’

‘চলো, আমার একটু কমফোর্ট হাসপাতালে যেতে হবে। একজন ডাক্তারের সিরিয়াল নেওয়া দরকার। মায়ের জন্য। এত দূর যখন আসলাম তখন কাজটা করেই যাই। তোমারও ঘোরা হলো। ’

সত্যিই ঘোরা হলো। অনেক। প্রথমে হাসপাতালে। সেখানে সিরিয়াল নিতে ওকে লাইনে দাঁড়াতে হলো ঘণ্টাখানেক। তারপর যেতে হলো নিউ মার্কেটে। নিম্মি একট টেবিল ল্যাম্প কিনতে চায়। সেটা কিনে দিতে হলো। যেতে হলো কারওয়ান বাজারে। ওর বাবার ঈশ্বরদীর লিচু খাওয়ার শখ। একটা দোকানে সদ্য আসা ঈশ্বরদীর দুই শ লিচু কেনা হলো। সেখানে আবার বাছাবাছির অনেক ঝামেলা।

এক হাতে ঈশ্বরদীর দুই শ লিচু আরেক হাতে টেবিল ল্যাম্প নিয়ে রিকশা পাওয়ার জন্য এমন দৌড়াদৌড়ি করতে হলো যে নিজেকে একেবারে কলুর বলদ লাগছিল আকাশের। সন্ধ্যার ঠিক আগে নিম্মিকে যখন ওর বাসার সামনে নামিয়ে ভারমুক্ত হলো তখন তার মাথা চক্কর দিচ্ছে।

ডাস থেকে এক গ্লাস ফালুদা খেয়ে নিজেকে ঠাণ্ডা করতে হবে।

ফালুদাটা মুখে দেওয়ার সময় দেখে অনন্য। সঙ্গে ওদের ডিপার্টমেন্টেরই আরেকটা ছেলে, নামটা ঠিক মনে করতে পারছে না, তবে খুব পড়াশোনামুখী, স্যাররা যেকোনো প্রশ্ন করলে পারুক না পারুক সবার আগে হাত তুলবে।

আকাশ হাত উঁচিয়ে ডাকল, ‘এই অনন্য। অনন্য, যাচ্ছিস কোথায়?’

অনন্যর ওকে দেখে লাফ দিয়ে নামার কথা কিন্তু সে ওর দিকে তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নিল।

আকাশ দৌড়ে গিয়ে ওর সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘এই, শুনতে পাচ্ছিস না, আমি ডাকছি তোকে?’

অনন্য বলল, ‘হ্যাঁ। একটা কাজে যাচ্ছি তো। ’

‘কী কাজ? চল আমিও যাই। ’

অনন্য একটু বিব্রত ভঙ্গিতে বলল, ‘না, থাক। তোকে খুব বিধ্বস্ত লাগছে। ’

‘তা অবশ্য আমি একটু বিধ্বস্ত। যাই হোক, যাচ্ছিস কোথায়?’

অনন্যর সঙ্গের ছেলেটা তাড়া দিয়ে বলল, ‘এই চল। আর দেরি হলে স্যার রাগ করবেন। ’

‘স্যার! এই সময়...’ আকাশ অবাক।

ছেলেটি বলল, ‘আমরা রাশেদ স্যারের বাসায় যাচ্ছি। স্যারের বাসায় আজকে একটা অনুষ্ঠান আছে। আমাদের একটু কাজটাজ করতে হবে। ’

‘স্যারের বাসায় অনুষ্ঠানে তোরা কী করবি?’

‘লোকজন আসবে। একটু দেখাশোনা, এটা-ওটা এগিয়ে দেওয়া। ’

‘এগুলো তো চাকরবাকরের কাজ। ’

ছেলেটি হাসে। ‘ফার্স্ট ক্লাস পেতে হলে স্যারদের চাকরবাকর হতে হয়। ’

‘বলিস কী?’

‘জি। অনন্য চল। ’

‘কিরে অনন্য, তুইও কি এভাবে ফার্স্ট ক্লাস পেতে চাস?’

অনন্য বলে, ‘যাই রে। স্যার রাগ করবেন। তুই টিএসসিতে থাকলে রাতে ফেরার সময় দেখা হবে। ’

ওরা ফার্স্ট ক্লাস পেতে দ্রুত পা চালায়। আকাশের মাথা আরেক দফা চক্কর দেয়। আবার একটা ফালুদার জন্য লাইনে দাঁড়ায়।

 

আট.

ক্লাস ছিল হক স্যারের। স্যার পড়ান রোমান আইন। রোমান আমলের আইনের ইতিহাস। হাস্যকর বিষয়, সেই আমলে মানুষ অন্যায় করলে জরিমানা হিসেবে গাধাটাধা ইত্যাদি ক্ষতিপূরণ দিতে হতো। বিষয়টা যেমন অদ্ভুত, স্যার তার চেয়েও অদ্ভুত। ক্লাসে ঢোকেন খুব বিরক্ত ভঙ্গিতে, সবার দিকে তাকান বিরক্ত হয়ে। তারপর আরো কিছুক্ষণ নানা ভঙ্গিতে বিরক্তি প্রকাশ করে একসময় রোল কল করা শুরু করেন। সেই রোল কল করাটাও একটা দেখার ব্যাপার। ক্লাসে ওরা মোট ১২০ জন, তিনটা পাতায় ৪০ জনের করে নাম্বার দেওয়া। স্যার কোনো কোনো দিন প্রথম দুই পাতার ৮০ জনের নাম ডেকে রওনা হয়ে যান। ‘স্যার আরো ৪০ জন বাকি’ কেউ মনে করিয়ে দিলে বিরক্ত হয়ে বলেন, ‘বাকি থাকলে থাক। আরেক দিন ডাবল-ডাবল প্রেজেন্ট দিয়ে দেব। আজকে বিরক্ত করিস না। ’ স্যার বেরিয়ে যান।

আজ হঠাৎ কী কারণে স্যারের পড়াতে ইচ্ছা হলো। শুরু করলেন। একটুখানি পড়িয়েই বললেন, ‘এটা একটু জটিল আছে। নিজেরা পড়বে। তারপর না পারলে আমাকে বলবে। ’

অনন্য বিনয়ী ভঙ্গিতে বলল, ‘স্যার, আপনি যা বলবেন। যেভাবে বলবেন। ’

আকাশের কালকের কথাটা মনে পড়ে। বেচারা! ফার্স্ট ক্লাস পাওয়ার লাইনটা ভালোই শিখেছে।

মিতুল বলল, ‘স্যার, একটা টিউটরিয়াল পরীক্ষা নেওয়া দরকার না! টার্ম তো শেষ হয়ে যাচ্ছে। ’

স্যার প্রচণ্ড বিরক্ত হন। ‘খালি পরীক্ষা আর নম্বরের লোভ। পড়, পড়, শিখ। তারপর পরীক্ষা দিতে আসিস। ’

এরপর সরকার ও রাজনীতির আইনুল স্যারের ক্লাস। এই ক্লাসটা অত মজার না। স্যার জটিল বিষয়ে জটিল সব বক্তব্য দেন আর ক্লাস শেষে দিয়ে দেন হোম টাস্ক। এই জিনিস যে বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে পারে সেটা ওদের ধারণায়ই ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণার অনেক কিছুর সঙ্গেই অবশ্য আইন বিভাগ ব্যতিক্রম। সুজনরা জানত, এটা মানবিক বিভাগের বিষয় যেহেতু কাজেই ক্লাস হবে কলা ভবনে। দেখা গেল, ক্লাস সায়েন্স অ্যানেক্স বিল্ডিংয়ে। অন্যান্য বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো ক্লাসরুম নেই, রুটিন অনুযায়ী একেক সময় একেকটা রুমে ক্লাস হয়, কিন্তু আইন বিভাগে স্কুল-কলেজের মতো ক্লাস নির্দিষ্ট। সেই কারণে ওদের বন্ধুত্ব বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হয় বিভাগকেন্দ্রিক, সবাই ক্লাসের সময় একসঙ্গে থাকে, একসঙ্গে আড্ডা মারে। আরেকটা কারণও বোধ হয় আছে। আইনটা পেশাগত শিক্ষা বলে বেশির ভাগই এক পেশায় যায়, কোর্টে প্র্যাকটিস, ফলে যোগাযোগ আর বন্ধনটা থাকে। অন্য দশটা বিভাগের চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে এটা তাই আলাদা।

আইনুল স্যার আজ ক্লাসের শুরুতে সাবজেক্ট বাদ দিয়ে দেশের বর্তমান রাজনীতি নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন। বিষয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন। স্যার রাশিয়ায় পিএইচডি করেছেন, ফলে পড়াশোনায় একটা বাম প্রভাব থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু বাম প্রভাবের সঙ্গে আবার ইসলামী একটা ভাব আছে। দুটো মিলিয়ে তাঁর চিন্তাটা একটু প্যাঁচালো। যাই হোক, বইয়ের কচকচানির তুলনায় আজকের বিষয়টা ইন্টারেস্টিং। স্যার জানতে চাইলেন, কার কী মতামত?

অনন্য প্রথমেই দাঁড়িয়ে গিয়ে বলল, ‘স্যার, আমার মনে হয়, আপনি যেটা বলেছেন মানে সংবিধান অনুযায়ীই সবার চলা উচিত; আমি মনে করি সেটাই ঠিক। আপনার কথাই সবার মেনে নেওয়া উচিত। ’

ক্লাসে সুবর্ণ আছে, ছাত্রলীগ করে। সে প্রতিবাদ করে বলল, ‘স্যার, মাগুরা নির্বাচনের পর আমরা নিশ্চিত হয়েছি খালেদা জিয়া সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। কাজেই বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন যৌক্তিক। ’

‘কিন্তু তোমার কি মনে হয় না, এই আন্দোলন আমাদের জতীয় জীবনের জন্য ক্ষতিকর। এই ২৪-৪৮-৯৬ ঘণ্টা হরতালে দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে। ক্লাস হচ্ছে না ঠিকমতো। সেশনজট লেগে যাবে আবার। ’

ইকবাল বলল, ‘স্যার, আন্দোলন তো খুব জোরালো। বিএনপির সঙ্গী জামায়াতে ইসলামী পর্যন্ত এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের সঙ্গে। আওয়ামী লীগ, জামায়াত, জাতীয় পার্টি এমনকি জাসদ সিরাজ, ওয়ার্কার্স পার্টি, এলডিপিসহ সংসদে যাদের সিট আছে এরা সবাই তত্ত্বাবধায়কের পক্ষে। সরকার মনে হয় পারবে না। ’

এসব ক্ষেত্রে সুজনের সব সময় একটা বক্তব্য থাকে। এবং সেটা সাধারণত একটু অন্য রকম হয়। আর ওর বলার ভঙ্গির কারণে সবার কাছে বেশ আকর্ষণীয়।

আজ এখনো সে কোনো মতামত না দেওয়ায় স্যারও একটু অবাক। নিজে থেকেই বললেন, ‘কী সুজন, তুমি কিছু বলবে না? সরকার এখান থেকে রক্ষা পেতে পারে কিভাবে?’

সুজন বলল, ‘স্যার আমার মনে হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার মেনে নিলেই রক্ষা হয়ে যাবে। ’

‘তাই নাকি?’

‘জি স্যার। খালেদা জিয়া বলবেন, আমি তত্ত্বাবধায়ক সরকার মানলাম কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে। ’

‘শর্তটা কী?’

‘প্রথমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার মেনে নিলে বিরোধী দল খুশি হয়ে যাবে। ওদের আন্দোলন শেষ। তারপর তিনি বলবেন, শর্তটা হলো, আওয়ামী লীগ, জামায়াত অথবা জাতীয় পার্টি এই তিন দলের কোনো এক দলের কেউ একজনকে সেই সরকারের প্রধান হতে হবে। ’

‘ওদের দাবি তো প্রধান বিচারপতি বা এই রকম গ্রহণযোগ্য কেউ। ’

‘ওদের সব দাবি সরকার মানবে কেন? সরকার শর্ত দেবে ওদের তিন দলের মধ্য থেকে কেউ একজনের নাম প্রস্তাব করার। তারপর, দেখবেন লেগে যাবে তিন দলের মধ্যে। এমনিতে আওয়ামী লীগের পজিশনটা পাওয়ার কথা কিন্তু সুযোগ পেয়ে জাতীয় পার্টি-জামায়াত কেউ ছাড়বে না। ব্যস তিন দলের তুমুল লাগালাগি-মারামারি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার শেষ। ’

অদ্ভুত প্রস্তাব, কিন্তু ওর ভঙ্গি আর প্রস্তাবের বৈচিত্র্যে পুরো ক্লাস হেসে ওঠে। এবং স্যারও। বললেন, ‘যেমনই হোক প্রস্তাবটা আইন বিভাগের ছাত্রদের মধ্যে আমি এই ক্রিয়েটিভিটা পছন্দ করি। ভালো হয়েছে। দারুণ। ’

ক্লাস শেষে ক্যান্টিনেও সুজন হিট। আইনুল স্যারের রসকসহীন ক্লাসকেও ভাসিয়ে দিতে পারায় নারীমহলেও চাঞ্চল্য। আকাশ বলল, ‘দোস্ত, আজকে তোর দিন। ফাটিয়ে দিলি। আইনুল স্যারকে ক্লাসে হাসিয়ে দিয়েছিস। আর আমি খেয়াল করলাম, এই সময় মেয়েরাও যে কী হাসছে! সবচেয়ে বেশি হাসছিল ইলোরা। তোর ভাগ্য শালা। ’

অনন্য বলল, ‘সব ঠিক আছে, কিন্তু স্যাররা এসব মনে রাখেন। পরীক্ষায় নাম্বার দেওয়ার সময় ঠিকই ঝামেলা করবে। ’

ফখরু বলল, ‘খেতা পুড়ি তোর নাম্বারের। এত নাম্বার দিয়া হে কী ভাইজা খাইব?’

সত্যিই নাম্বার দিয়ে আসলে কী হবে? আসল বিষয় তো আনন্দ। আর সে আইন বিভাগে ভর্তিই হয়েছিল বিষয়টা খুব আনন্দের বলে। কিন্তু পড়তে গিয়ে সেই আনন্দটা ঠিক পাচ্ছে না। কারিকুলাম-বই সব কেমন যেন পুরনো। স্যারদের পড়ানোও সেই গত্বাঁধা স্টাইলের। নোট-পড়া-পরীক্ষা-নাম্বার। তারচেয়ে বরং খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের যে ব্যারিস্টার চুক্তি আইনটা পড়ান সেটা অনেক আকর্ষণীয়। ছোট মাথায় বড় চিন্তা হয়ে যায় হয়তো কিন্তু ওর মনে হচ্ছে, প্রথাগত শিক্ষকদের চেয়ে প্র্যাকটিসিং আইনজীবীরাই বরং এই বিষয়ের ভালো শিক্ষক হবেন।

ব্যতিক্রম অবশ্য আছেন। যেমন, নিজাম স্যার। তাঁর পরীক্ষার আগের দিন তিনি সবাইকে বলে দেন, তোমরা নোট-বই সব নিয়ে আসবে। খুলে দেখে দেখে পরীক্ষা দেবে। কিন্তু পরীক্ষার প্রশ্ন দেওয়ার পর কেউ আর বই-নোটে সেই উত্তর খুঁজে পায় না। এতটাই সৃজনশীল তাঁর প্রশ্নের ধরন! কিন্তু উনি ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাস নেন না, পড়ান ফোর্থ ইয়ার-মাস্টার্সে। দারুণ। একদিন এমনি একটা ডেমনসট্রেশন ক্লাস নিতে এসেছিলেন। ঘোরের মতো ৪০ মিনিট কেটে গেছে।

শুনেছে, তরুণ আতিফ স্যারও খুব ভালো ক্লাস নেন। কিন্তু সাহিত্যিক হিসেবে নাম করা এই মানুষটি পিএইচডি করতে এখন দেশের বাইরে। কেউ কেউ বলে আর ফিরবেন না। তাঁর যা মেধা তাতে বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সুযোগ পাওয়া নিশ্চিত। তাহলে আর কে ফেরে!

অনেকেই অবশ্য ফেরে না। বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের টানে নয়। টাকার টানে। তুলনায় অনেক অপমানজনক চাকরি নিয়ে ছেড়ে দেয় এই সর্বোচ্চ সম্মানের চাকরি। এটাও ওর কাছে বিস্ময়কর লাগে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা সর্বোচ্চ মর্যাদা, এটাকে কেউ তুচ্ছ করতে পারে! বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনই বা কী করে? সেদিন কাগজে দেখল শখানেক শিক্ষক নাকি এভাবে পিএইচডি করতে গিয়ে নিখোঁজ। অথচ তাঁদের চাকরি এখনো অক্ষুণ্ন।

আর এসবের জন্যই কি না ওর মোহটা একটু একটু করে কমে যাচ্ছে। সেই জায়গাটা নিয়ে নিচ্ছে ওর আরেকটা আনন্দের বিষয়। খেলা।

আবাহনীর খেলা দেখার সময় জীবনের সবচেয়ে বেশি আনন্দ সে পায়। এখনো খেলা থাকলে স্টেডিয়াম, না থাকলে আবাহনী মাঠে প্র্যাকটিস দেখা তার রুটিন। কিন্তু বাড়ি থেকে টাকা আসে না বলে খেলা দেখার খরচটা ঠিক কুলানো যাচ্ছিল না। ওর এক পরিচিত মামা ক্রীড়া সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত, তার কাছে গিয়েছিল ফ্রিতে খেলা দেখার বন্দোবস্ত করা যায় কি না জানতে। উনি জানিয়েছেন, এটা অসম্ভব।

কিন্তু সেখানে উপস্থিত বাকি সাংবাদিকদের দেখে ওর মনে হয়েছে, ওর পক্ষেও এই নিয়ে লেখা সম্ভব। লিখে পার্ট টাইম সাংবাদিক হয়ে গেলে তো সব খেলা দেখা যাবে নিশ্চিন্তে।

কিছু লেখা সে লিখেছে। একটা লেখা ছোট একটা পত্রিকায় ছাপাও হয়ে গেছে।

আজ আবাহনী মাঠে যেতে যেতে এই ক্ষেত্রে ওর সার্বক্ষণিক সঙ্গী সৌরভকে সে লেখাটা পড়তে দেয়।

সৌরভ ওর নাম দেখে বিস্মিত হয়ে বলে, ‘তুই লিখেছিস? তুই...’

‘হ্যাঁ। কেমন হয়েছে?’

‘দারুণ। এই লেখা আমার ধারণা উৎপল শুভ্র ছাড়া বাংলাদেশে কেউ লিখতে পারবে না। ’

বাড়াবাড়ি কথা। এই সামান্য লেখা উৎপল শুভ্রর তুলনায় কিচ্ছু না। কিন্তু সে উৎপল শুভ্রর কাছে যাবে। লেখাটা দেখাবে। বইমেলার সময় পরিচয় হয়েছিল, খেলার প্রতি তার আগ্রহ আর জানাশোনা দেখে ভদ্রলোক মুগ্ধ হয়েছিলেন বলেই মনে হয়েছিল। এখন এই লেখাটা দিয়ে যদি তাঁকে মুগ্ধ করে ভোরের কাগজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়!

বছর চারেক আগে বের হওয়া আজকের কাগজ দেশের তারুণ্যকে দিয়েছে নতুন চিন্তার সন্ধান। সেটা ভেঙে হওয়া ভোরের কাগজ তারুণ্য আর খেলাপাগলদের জন্য স্বপ্নের জায়গা।

 

নয়.

গভীর রাতে হলে একজন মোটামতো মানুষ এসে অপূর্বদাকে খুঁজতে শুরু করল। ওর চেহারা সন্দেহজনক, হাতে বিস্তর সোনার আংটি, মুখে বাংলা মদের ঝাঁজালো গন্ধ। রুমে ঢুকতে দিতে চাচ্ছিল না জসিম ভাই কিন্তু অপূর্ব দা গলার স্বর শুনেই ব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে বললেন, ‘আরে, বিপ্লব বাবু। ’

বিপ্লব বাবু বললেন, ‘চলেন আমার সঙ্গে। ’

‘কোথায়?’

‘ম্যাডাম ডেকেছেন। ’

গাড়িও রেডি দেখা গেল। আর অপূর্বদাকে দেখা গেল খুবই গর্বিত। মিতুলকে বললেন, ‘ম্যাডাম মানে বুঝেছ? হিরোইন। ’

জসিম ভাই বলল, ‘গভীর রাতে হিরোইনের ডাক। যান ভাই, অপেক্ষায় থাকলাম। গল্প না শুনে ঘুম হবে না। ’

বুলবুল ভাই বলল, ‘রাতে ছাড়া পেলে হয়। ’

অপূর্ব দা ফিরল দুইটার দিকে। সেই আংটিওয়ালা মানুষই তাকে নামিয়ে দিয়ে গেল।

অপূর্ব দা বলল, ‘বিরাট ঝামেলা হয়ে গেল। ’ ঝামেলার কথা কিন্তু মুখে হাসি।

‘কী ঝামেলা?’

ম্যাডাম বলল, ‘রাত্রি, মানে আমার সঙ্গে যে নায়িকা তার সঙ্গে হিরো শুয়েছে কি না?’

‘ওস্তাগফিরুল্লা’ পল্টু ভাই বলে।

মিতুল বলল, ‘সেটা আপনি জানবেন কী করে?’

‘আমিও তাই বললাম। এখন ম্যাডাম কাজ দিয়েছে রাত্রির কাছ থেকে বিষয়টা জেনে তাকে জানাতে। ’

‘এটা আপনি কী করে জানবেন?’

‘সেটাই তো ঝামেলা। বিরাট ঝামেলা। ’

বিরাট ঝামেলা হলেও চেহারায় খুশি খুশি ভাব।

এই ঝামেলা দূর করতে কী কী করা যায় সে রকম বেশ কিছু পরামর্শ দিয়ে সবাই ঘুমিয়ে পড়ল। আর সেই সময় মিতুল গিয়ে দাঁড়াল একাকী অপূর্ব দার পাশে।

বলল, ‘দাদা, এর একটা সুবিধাও আছে। ’

দাদা হাসে, ‘এর মধ্যে কী সুবিধা দেখছ?’

‘আপনার দাম বেড়ে গেল না নায়িকার কাছে!’

‘তুমি বুদ্ধিমান ছেলে।

‘হুঁ। আপনি খবর রাখছেন, চেষ্টা করছেন—এই বলে চালিয়ে যেতে পারেন। ’

‘তাই করতে হবে। ’

‘আচ্ছা দাদা, আরেকটা কথা জিজ্ঞেস করি?’

‘কী কথা?’

 ‘এই যে আপনি প্রতিদিন বৃষ্টিভেজা সিনের বর্ণনা দেন, এটা কি ঠিক?’

‘তোমার প্রশ্ন ঠিক বুঝলাম না। ’

‘আমার মনে হয় আপনি বানিয়ে বলেন। রুমের সবাইকে আনন্দ দিতে। আপনি সেকেন্ড নায়ক, এদের সিনেমায় বড়জোর একটা গান থাকে কিন্তু আপনার গল্প বিশ্বাস করলে দশ থেকে বারোটা গান হয়। ’

অপূর্ব দা সব সময় হাসে। হাসিটার মধ্যে হালকা অভিনয় মেশানো আছে বলে মনে হয়। কিন্তু এখন যে হাসিটা দিল সেটা অন্য রকম। মনে হলো খাদ নেই এর মধ্যে।

বলল, ‘এরা সারা দিন আমার গল্প শোনার অপেক্ষায় থাকে। বেচারাদের একটু আনন্দ না দিলে হয়? তা ছাড়া এখানে থাকি আশ্রিত হিসেবে। এদের খুশি রাখাও দরকার। ’

এই পর্যায়ে আকাশের শুটিং দেখতে যাওয়ার কথাটা তুলতে যাচ্ছিল মিতুল, ফখরু দৌড়ে এসে বলল, ‘মিতুল, জলদি আয়। ’

কেন? কোথায়? প্রশ্ন করতে না দিয়ে হাত ধরে টেনে নিয়ে চলল। নিচের গেস্টরুমে ভিড়। মাঝারি স্তরের নেতাদের সবাই উপস্থিত। মাসুদ ভাই-আরিফ ভাই পুরো যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে দাঁড়িয়ে।

মিতুলকে দেখেই মাসুদ ভাই বলল, ‘থাকো কোথায়? বলেছি না রাত ১১টার পর থেকে গেস্টরুমে থাকবে। ’

মিতুল অপরাধীর মতো মাথা নাড়ে।

‘চলো। ’

ওরা গিয়ে থামল চারতলার একটা রুমে। দরজা ধাক্কা দিতেই ভেতর থেকে খুলে গেল।

ওদের একজন ঠাণ্ডা গলায় বলল, ‘মাহফুজ ছাড়া বাকি সবাই বেরিয়ে যাও। নিচে গেস্টরুমে যাও। ’

ঘুমাচ্ছিল সবাই। কী কারণে বেরিয়ে যেতে বলা বুঝতেও পারল না। কিন্তু জানে, কথা বাড়ানোর মানে নেই।

ওরা বেরিয়ে যেতেই হাতে থাকা লাঠিটা দিয়ে মাহফুজের মাথায় অসুরের শক্তিতে আঘাত করে আরিফ ভাই। ছিটকে পড়ে যায় সে।

উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করার কথা কিন্তু উঠে না দাঁড়িয়ে সেখান থেকে কাতর গলায় বলে, ‘আমাকে মাইরো না। আমি হল ছাইড়া দেব। ’

‘বাঁচলে না হল ছাড়বা! তোমারে হল না, দুনিয়াছাড়া করুম। জুয়েল ভাইয়ের হলে থেকে তুমি শিবির করো?’

বলেই প্রচণ্ড জোরে আরেকটা আঘাত। আরিফ ভাইয়ের সঙ্গে বাকি ক্যাডাররাও ঝাঁপিয়ে পড়ে। এমন নৃশংস মার যে মিতুলের মনে হলো চোখে হাত দেয়। কিন্তু দেওয়া যায় না। বরং অংশ নিতে হয়। নিষ্ঠুরের মতো সে-ও এগিয়ে গিয়ে ‘শিবির করা ছোটাচ্ছি তোমার’ বলে একটা ঘুষি মারে। ফখরু মারে দুটো লাথি।

মিনিট পনেরো বেদম প্রহারের পর আরিফ ভাইয়ের ঘোষণা, ‘কাল ভোর ৬টার মধ্যে হল থেকে বেরিয়ে যাবে। তোমার পুরো দলসহ। মিটিংয়ে যারা ছিল তাদের কাউকে যেন আর না দেখি। ’

গেস্টরুমে বিজয়ী ভঙ্গিতে ফেরার পর পেল গরম চা আর লাড্ডু। খেতে খেতে মিতুল জানতে পারল পুরো বিষয়টা। এরা কয়েকজন হলে ছাত্রশিবিরের কার্যক্রম চালুর চেষ্টা করছে। মাহফুজ হচ্ছে হল শাখার শিবিরের সভাপতি, পরশু দিন সে নিজের রুমে শিবিরের একটা মিটিং করেছে।

আর কে কে শিবির আছে, ছাত্রলীগ বা অন্য সংগঠন থাকার প্রশ্ন নেই, তবু সবাইকে কড়া নজরে রাখতে হবে, হলের গেটে পাহারা আরো উন্নত করতে হবে এসব নির্দেশনা দিয়ে মাসুদ ভাই বিদায় নিলেন। চলে গেল বাকিরাও। রয়ে গেলেন শুধু হল শাখার সাধারণ সম্পাদক জহির ভাই। পুরো দলটার মধ্যে এই মানুষটির মধ্যেই পরিষ্কার রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণা আছে বলে মনে হয় মিতুলের, কিন্তু পদটা ছাড়া বেচারার আর কিছু নেই। সব অনুষ্ঠানে তাঁকে উপস্থিত রাখা হয়, কিন্তু কিছু বলার সুযোগ নেই। পুরো সময় তাঁকে বাকিদের কথা শুনতে হয়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর বলা হয়, ‘জহির ভাই, ভুল কিছু করলে বইলেন। ’ তাঁকে মাথা নেড়ে জানাতে হয় ভুল কিছু হচ্ছে না।

মিতুলের মায়া হয়েছিল, একদিন তার সঙ্গে আলাদা করে কথা বলতে গিয়ে দেখল, মানুষটা রাজনীতি বোঝে। কিছু কল্যাণকর চিন্তাও আছে। আর তাঁর কথা আলাদা করে শুনে বলে মিতুলদেরও উনি বেশ পছন্দ করেন।

আজ সবাই চলে গেলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘শোনো, মেরেটেরে ফেলেনি তো?’

ফখরু বলে, ‘না ভাই, মরবে না। হবে হাসপাতালে থাকতে হইব কয়েক দিন। ’

‘তাহলে রক্ষা। এদের তো বুক-পিঠ নেই। যেভাবে মারে...এই আরিফ ছেলেটা এত বেড়েছে...’

মিতুল বলে, ‘আচ্ছা ভাই, একটা কথা বলেন তো, শিবির নিয়ে এত সমস্যা কেন? বিএনপি-জামায়াতের এখন সম্পর্ক ভালো না কিন্তু গত নির্বাচনও তো এক রকম ঐক্য করে হয়েছে। জামায়াতের সমর্থনেই বিএনপি সরকার গড়েছে। ’

জহির ভাই একটু ভেবে বলেন, ‘শোনো, সব জায়গায় বিএনপি আর ছাত্রদল এক না। ছাত্রদল এত জনপ্রিয় হলো কিভাবে? ছাত্রদলের মধ্যে আশির দশকের তারুণ্য নিজেদের খুঁজে পেয়েছিল। ’

‘সেটা কি জিয়াউর রহমান সাহেব ভালো ছাত্রদের দলে নিয়েছিলেন বলে...’

‘ভালো ছাত্ররা একটা কারণ কিন্তু একমাত্র কারণ না। এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যদি ধরি, আশির দশকে এখানে ছিল বাম, বিশেষ করে বাসদ ছাত্রলীগের দাপট। মান্না ভাই, আখতার ভাই, জিয়াউদ্দিন বাবলু ভাই এঁরা ডাকসুতে জিতেছেন টানা। কিন্তু তাঁদের মূল দল রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছে, পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাম রাজনীতি আর কার্যকর মনে হচ্ছে না তরুণদের। তা ছাড়া সময়ের হাওয়ায় ওদের ওই পাঞ্জাবি পরা-তাত্ত্বিক ধরনটাও পছন্দ হচ্ছিল না এখনকার ছেলের। আওয়ামী ছাত্রলীগের মধ্যে মফস্বলী ভাব। সেই সময় জিন্স প্যান্ট পরা ড্যাশিং তারুণ্য নিয়ে এলো ছাত্রদল। আর শুরু থেকেই শিবির বা ইসলামী রাজনীতির বিরোধিতা করায় আমাদের আধুনিকতা আরো গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। ’

‘কিন্তু শেষ পর্যন্ত তো অস্ত্র আর শক্তিই আমাদের উত্থানের কারণ। ’

‘তা হয়তো ঠিক, কিন্তু অস্ত্রশক্তি থাকলেও ওপরের নেতারা, মানে তুমি যদি সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক দেখো তাহলে দেখবে আমাদের নেতারা অনেক বেশি প্রেজেন্টেবল। একদিকে ওদের স্মার্টনেস, অন্যদিকে অস্ত্রের শক্তি দুটো মিলিয়েই ছাত্রদল শক্তি হয়ে উঠেছে। এই এখনো যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন হয় তুমি দেখবে বিপুল ভোটে আমরা জিতব। ’

মিতুল একটু ভেবে বলে, ‘এভাবে তো কখনো ভাবিনি। তবে আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আপনিই ঠিক। ’

‘তবে ছাত্রলীগ এখন উঠে আসছে। মঈনউদ্দিন হাসান চৌধুরীকে সভাপতি করার মধ্য দিয়ে ওরাও বদল আনার চেষ্টা করছে। নিয়মিত ছাত্ররা এখন সভাপতি-সম্পাদক হচ্ছে, ওরাও বুঝতে পেরেছে সামনে সেই রকম ফেস দরকার। ’

মিতুল বলে, ‘তা সভাপতি-সম্পাদক যা-ই হোক আসল সমস্যা তো অন্য জায়গায়। এই অস্ত্রবাজি, এই দখলের রাজনীতি...। ’

‘ভাইরে, এটা তো আর এখন আমাদের একার সমস্যা না। সব দলের। তুমি দেখ, ছাত্রলীগ একদিকে যেমন ওপরে ভালো নেতাদের পদ দিচ্ছে, নিচে কিন্তু অবস্থা আমাদের মতোই। ওরাও ছাত্রদলের অনুকরণে অস্ত্রের শক্তিতে বলীয়ান হতে চাচ্ছে। মিলন হত্যাকারী হিসেবে অভি গ্রুপের ছেলেরাও ছাত্রলীগে গিয়েছে। ওরাও ক্যাম্পাস দখল করতে চায়। মূল সমস্যাটা হলো অন্য জায়গায়, আগেও দলে ক্যাডার থাকত কিন্তু ওরা থাকত সংগঠনের মূল নেতৃত্বের নিচে। অভি ভাই-ইলিয়াস ভাইয়ের শক্তি আমাদের দলকে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করেছে কিন্তু তাঁরা ঠিক মূল নেতৃত্বে ছিলেন না। এখন দেখ, সব ওদের হাতে চলে যাচ্ছে। যারাই ক্যাডার তারাই লিডার। ’

মিতুল বলে, ‘তাহলে ভাই, ছাত্ররাজনীতির ভবিষ্যৎ কী? গণতন্ত্র ফেরায় তো ভেবেছিলাম এই জায়গায়ও নতুন দিন আসবে। ’

জহির ভাই একটু ভেবে বলে, ‘আমি ভুলও হতে পারি, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে ছাত্ররাজনীতি শেষ। ছাত্ররাই সমাজের সবচেয়ে সংগঠিত শক্তি, আন্দোলন-সংগ্রাম এরাই করে। এখন ক্ষমতাসীনরা চায় এদের হাতে রাখতে। হাতে রাখার উপায়, টাকা-পয়সা ধরিয়ে দিয়ে লোভী বানিয়ে ফেলা। তাই হচ্ছে। আবার বিরোধী যারা আছে, তারা এটা দেখে অপেক্ষায় আছে কখন তাদের দল সরকারে আসবে। তখন তারাও টাকা-পয়সা বানাবে। ছাত্ররাজনীতির কফিন বোধ হয় তৈরি হয়ে গেল। ’

‘তাহলে ভাই, আপনার মতো যারা সত্যিকার ছাত্র রাজনীতি করতে চায় তাদের ভবিষ্যৎ?’

‘কোনো ভবিষ্যৎ নেই। অন্ধকার। ’

সত্যিই বোধ হয় অন্ধকার। কারণ এই সময় হঠাৎ কারেন্ট চলে গেল। আকাশে শোনা গেল মেঘের ডাক।

 

দশ.

নিম্মির বাসায় আজ সবার দাওয়াত। কারণটা কেউ বুঝতে পারছে না। নিম্মিও রহস্য ভাঙতে চাইছে না। জিজ্ঞেস করলেই বলে, ‘যাবা, কোর্মা-পোলাও খাবা—আর কিছু জানার কী দরকার?’

ফখরু বলল, ‘সেইটা তো কথা না। গেলে তো খাইতে দিবাই কিন্তু গিফটটিফট লইয়া যাইতে হইব কি না?’

নিম্মি বলল, ‘গিফট! তা নিতে পারো। তবে নিলে দুই টাকা-চার টাকার জিনিস নিও না। হয় ভালো জিনিস, নইলে না। ’

অনন্য জানতে চায়, ‘দাওয়াত কি শুধু আমাদের?’

সুবর্ণলতা বলে, ‘তোমরা খালি কথা বাড়াও। দাওয়াতে অন্যরা থাকবে কি না সেটা তো তোমাদের জানার দরকার নাই। তোমাদের দাওয়াত তোমরা পেয়েছ, আর কেউ দাওয়াত পেলে তারাও যাবে। ’

অনন্য বলে, ‘না, আমি জানতে চাইছিলাম স্যারদের কাউকে বলেছ কি না? ধরো আমাদের ক্লাস যে কয়েকজন স্যার নেন তাঁদের বলতে পারো। ’

নিম্মি হেসে দিয়ে বলে, ‘হায়রে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট, এখানেও স্যারদের তেল দিতে হবে!’

সবাই এমন হাসে যে বেচারা অনন্যর ইজ্জতের যায় যায় অবস্থা।

মিতুল পরিস্থিতি সামাল দিতে বলে, ‘অনন্য পরে যখন তোর বাসায় দাওয়াত হবে তখন আমরা স্যারদের নিয়ে যাব। আজ বাদ দে। ’

অনন্য খুশি হলো কি না বোঝা গেল না। ছোট করে বলল, ‘আচ্ছা। ’

ইকবাল এর মধ্যেই গিফটের বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে। ওর বক্তব্য হলো, আমরা ছাত্র হতে পারি তবু একজন বান্ধবীর বাসায় দাওয়াতে যাওয়ার সময় একটা প্রেস্টিজের ব্যাপার আছে।

ফখরু বলে, ‘সবই তো বুঝলাম, কিন্তু পয়সা পামু কই? একটা গিফট কিনতে তো অন্তত দুই শ টাকা লাগব। ’

ইকবাল বলল, ‘না। অত দরকার নেই। সবাই পঞ্চাশ টাকা করে দে। সব মিলিয়ে তিন-চার শ টাকা হয়ে যাবে। আমি নিউ মার্কেটে গিয়ে সুন্দর একটা গিফট আইটেম কিনে ফেলব। ’

সুজন বলে, ‘পাঁচ শ টাকা করে ফেল। ’

‘অত তো হবে না। সবাই পঞ্চাশ করে দিলে তিন শ-সাড়ে তিন শ হবে। এর মধ্যে আবার কেউ কেউ দিতে চাইবে না। ’

সুজন বলে, ‘তোরা টাকা ওঠা, পাঁচ শর চেয়ে যা কম হবে সেটা আমি দেব। ’

‘তুই!’ ফখরু বলে, ‘তুই কি পলিটিকস করছিস নাকি?’

সৌরভ বলে, ‘খালি পলিটিকস না রে, আরো বহুভাবে টাকা আসে। ’

‘লটারি পাইছে নাকি?’

মিতুল বলল, ‘সুজন, তুই লেখালেখি করে টাকা পাচ্ছিস নাকি?’

সুজন বলে, ‘এই এক-আধটু। ’

সৌরভ বলল, ‘ও এখন লেখার টাকা পাচ্ছে। কিছুদিনের মধ্যেই পুরোদস্তুর চাকরি হয়ে যাবে। ভোরের কাগজ পত্রিকায় সুজন জয়েন করবে ১ তারিখ থেকে। ’

‘তাই নাকি?’

সৌরভ বলে, ‘হ্যাঁ। ওর লেখা নিয়ে উৎপল শুভ্রকে দেখিয়েছিল। উনি পছন্দ করেছেন। ওকে নিয়মিত যেতে বলেছেন। ’

মিতুল বলে, ‘বলিস কী! বিরাট ঘটনা তো...এটাই তো সেলিব্রেট করা উচিত। আমাদের বন্ধু সাংবাদিক! তা-ও ভোরের কাগজের মতো পত্রিকায়। তোরা বুঝতে পারছিস, বিষয়টা কত বড়!’

ঘটনাটা সত্যিই বড়। সুজনও অতটা আশা করেনি। ছোট কাগজে দু-একটা লেখা লিখে ফ্রি খেলা দেখার সুযোগ পেয়েছিল। সেটা দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল উৎপল শুভ্রর কাছে। এ রকম তরুণ অনেকেই অনেক কিছু দেখাতে ওদের কাছে আসে। খুব একটা পাত্তা দেওয়ার কথা না। তবে ভদ্রলোক দিলেন। হয়তো আগে থেকে ওর সম্পর্কে এক-আধটু ধারণা ছিল বলে।

পড়ে বললেন, ‘ক্রীড়া সাংবাদিকতা করতে চান?’

‘জি। ’

‘তাহলে পড়াশোনার কী হবে? একটা ভালো সাবজেক্টে পড়ছেন। ভবিষ্যৎ আছে। ’

‘এখানেও তো ভবিষ্যৎ আছে। আপনি করছেন, আপনি তো যত দূর আমি জানি ইঞ্জিনিয়ার। ’

খুশি হওয়ার কথা। ভদ্রলোক অবশ্য সেটা প্রকাশ করেন না।

জানতে চাইলেন, ‘আপনার ইংরেজি কেমন?’

‘ভালোই। ’

‘ঠিক আছে। আমি আপনাকে একটা কাজ দিচ্ছি। অনুবাদ। করে নিয়ে আসবেন। ’

পিয়নকে ডেকে একটা ইংরেজি লেখা ধরিয়ে দিলেন। পত্রিকা অফিসে নিয়মিত ঘোরাঘুরি করে বলে সুজন জানে এটাকে বলে স্ল্যাগ, টেলিপ্রিন্টারে আসা আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার কপি। এএফপি, রয়টার্সে পাওয়া এসব কপির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক খবরাদি পায় আমাদের দেশের পত্রিকাগুলো। আর দশটা পত্রিকার চেয়ে ভোরের কাগজ এখানেই আলাদা যে ওরা হুবহু অনুবাদ না করে এই লেখাগুলোতেও সাহিত্যের একটা ছাপ রাখে।

সেই অনুযায়ী রাতে হলে ফিরেই অনুবাদটা করে ফেলল। ওর মনে হয়েছিল মোটামুটি হয়েছে। উৎপল শুভ্রের মনে হলো, বেশ ভালো হয়েছে।

ওকে অফিসে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। শর্ত অবশ্য আছে। এটা ১৫ দিনের পরীক্ষামূলক নিয়োগ। যদি এর মধ্যে সে যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারে তাহলেই সে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্রীড়া সাংবাদিক। দেশের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পত্রিকার একজন অংশীদার।

এখনো সেই ১৫ দিন চলছে তবে তার কাজকর্মে মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেছে ১ তারিখ থেকে সে পত্রিকায় যোগ দিচ্ছে। আবাহনীর খেলা দেখতে টিকিটের জন্য হা-পিত্যেশ করা সুজনকে এখন আবাহনীর খেলোয়াড়রাই দাম দেবে। ওকে খুশি করতে চেষ্টা করবে যেন ওদের কথা বেশি করে লিখে!

ওদিকে ক্রিকেটও আস্তে আস্তে জনপ্রিয় হচ্ছে। বিশ্বকাপে যেতে পারলে তো খুলে যাবে নতুন দরজা। দেশ-বিদেশ সফরের সুযোগ। দারুণ অ্যাডভেঞ্চার।

খুব আনন্দ হয় সুজনের। কিন্তু আবার আফসোসও হয়। একটা প্রিয় বিষয় খেলার জন্য আরেকটা প্রিয় আইন পড়াটাকে বোধ হয় স্যাক্রিফাইস করতে হবে।

না, মানুষের একটির বেশি ভালোবাসা থাকতে নেই। থাকলে সমস্যা হয়।

অবশ্য সে ঠিক করেছে যাই করুক, পড়াটা চালিয়ে যাবে। বিষয়ের প্রতি ভালোবাসা আছে কিন্তু এখন এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো এই বন্ধুদের সঙ্গে থাকা। মাত্র তিন মাসের মধ্যেই এক অদ্ভুত বন্ধনে জড়িয়ে গেছে ওরা।

ক্লাসের সময় আট-দশজন একসঙ্গে ঘোরে। হল আলাদা হলেও বেশির ভাগই মুহসীন হলে বলে আড্ডাটা হয় এখানেই। আবার সন্ধ্যায় একসঙ্গে টিএসসি। ওরা অবশ্য টিএসসির এই ভিড়ে না বসে বিএনসিসির সামনে একটা আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। এই আড্ডা ওদের স্থায়ী সান্ধ্য ঠিকানা।

বিকেল তিনটায় মুহসীন হল থেকে রওনা হওয়ার কথা আজ। ঠিক হলো, মাঝখানে আর যে যার হলে না গিয়ে এখনই ওখানে চলে যাওয়া যাক। মুহসীন হলের খাবার খুব একটা ভালো না, কিন্তু সবাই মিলে খেলে এখন বিষকেও হজমযোগ্য মনে হয়।

মুহসীন হলে এলে মিতুলের একটু মন খারাপ হয়। পুরনো আমলের বিল্ডিং, বিশাল জায়গা নিয়ে তৈরি বলে প্রচুর ফাঁকা জায়গা আছে। ওর আরো খারাপ লাগে এখানে সিঙ্গেল ও ডাবল রুম আছে বলে। ওর হলে সব ফোর সিটেড রুম, থাকে কমপক্ষে আটজন, রুমে নিঃশ্বাস ফেলা যায় না। কিন্তু এখানে ছোট ছোট রুম বলে ঝামেলা অনেক কম। জিয়া-বঙ্গবন্ধুর মতো এই নতুন হলগুলোকে তাই ওর ঠিক বিশ্ববিদ্যালয় হল মনে হয় না। তা ছাড়া পাঁচতলা বিল্ডিংয়ে একটা লিফটও থাকা উচিত। নতুন হলগুলোতে সুযোগ-সুবিধা বেশি হওয়ার কথা কিন্তু এখানে উল্টা নিয়ম। কেন যেন মনে হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে যা কিছু পুরনো তাই ভালো, যা নতুন তা কেমন যেন অসম্পূর্ণ।

মিতুল ইকবালের রুমে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে   মুহসীন হলের প্রশংসা করল আর সঙ্গে সঙ্গেই সুজনের তীব্র প্রতিবাদ। ওর মতে, সেরা হল হচ্ছে জহুরুল হক হল।

‘কেন?’

‘আমাদের হল দেখলে মনে হবে এটা হল না। একটা যুদ্ধক্যাম্প। চারদিকে খোলা। মাঝখানে পুকুর। ফাঁকা জায়গা। ’

মিতুল বলে, ‘এ জন্যই বোধ হয় মুক্তিযুদ্ধের সময় এই হলটাই ছাত্ররাজনীতির প্রাণকেন্দ্র। পুলিশ-আর্মি এলে যেকোনো দিকে পালানো যেত। ’

ফখরু বলল, ‘যাই বলিস, সবচেয়ে সুন্দর হইতাছে এসএম হল। বাগিচা-বাগিচা মনে হয়। ’

ফখরুর ভাষার সঙ্গে বাগিচা শব্দটা এমন বেমানান যে হাসির হুল্লোড় উঠল আর এতেই ভেসে গেল হল নিয়ে গবেষণা।

ইকবাল এর মধ্যে গিফট কিনে এনেছে। ইকবাল কাজ গুছিয়ে করতে পারে বটে। খুব সুন্দর করে র‌্যাপিং পেপারে মোড়ানো একটা বাক্স। কম্পিউটারে টাইপ করে লেখা, ‘প্রিয় নিম্মিকে প্রিয় বন্ধুরা। ’

আকাশ বলল, ‘সবই ঠিক আছে, কিন্তু কী গিফট দিচ্ছি একটু দেখব না আমরা। ’

ইকবাল বলে, ‘কিন্তু খুললে আবার র‌্যাপিং করব কী?’

মিতুল বলল, ‘ঠিক কথা। কী গ্যারান্টি যে ভেতরে গিফট আছে?’

ফখরু বলে, ‘এমনও তো হইতে পারে ভেতরে তুই প্রেমপত্র লিখে দিয়েছিস!’ ফখরু বিরাট রসিকতা মনে করে একা একাই হাসে।

নিম্মির বাসায় গিয়ে সেই হাসি ভেসে গেল চমকে। আজ নিম্মির বিয়ে। একটা মোটামতো মানুষের সঙ্গে নিম্মির আংটি বদল হয়ে গেল একটু আগে। নিম্মি খুব হাসছে। দেখলে কে বলবে, এই নিম্মি গত তিন মাস কতজনকে আশার আলো দেখিয়েছে।

ওদের খুব সম্মান করা হলো। খেতে বসানো হলো বরের সঙ্গে। নিম্মি আলাদা করে খাতির করল সবাইকে।

খাওয়া শেষে সামনের বারান্দায় ওরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে, এই সময় এক ভদ্রলোক এসে বললেন, ‘তোমাদের মধ্যে কে কে সিগারেট খাও?’

চমকে গিয়ে খেয়াল করে নিম্মির জামাই। মাত্রই বিয়ে করেছেন কিন্তু বিয়েজনিত কোনো অপ্রতিভতা নেই ভঙ্গিতে।

বললেন, ‘যারা সিগারেট খাও নিতে পারো। বিদেশি বেনসন, বিয়ে উপলক্ষেই এক কার্টন বিদেশি কিনেছি। ’

একটু কিন্তু কিন্তু করে শেষে আকাশ আর মিতুল হাত বাড়িয়ে সিগারেট নিল।

ভদ্রলোক বললেন, ‘আচ্ছা বলো তো, তোমাদের মধ্যে কে কে নিম্মির সঙ্গে প্রেম করার চেষ্টা করেছ?

আকাশ এমন চমকে যায় যে হাত থেকে সিগারেট পড়ে যাওয়ার দশা।

ভদ্রলোক সেটা খেয়াল করলেন বলে মনে হয় না।

বললেন, ‘বুঝলে, ক্লাসমেটের সঙ্গে প্রেম করা বিরাট ঝামেলা। ওদের বিয়ের জন্য চাপাচাপি শুরু হয় সেকেন্ড ইয়ার থেকে। ইউনিভার্সিটি লাইফটা, ইনফ্যাক্ট লাইফটাই শেষ। ’

মিতুল হেসে বলে, ‘আপনার মনে হয় সে রকম অভিজ্ঞতা আছে। ’

‘ঠিক ধরেছ। ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। প্রেমিকার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে, আমি তখন থার্ড ইয়ারে পড়ি। এদিকে ও চাপ দিচ্ছে পালিয়ে যাওয়ার, আমি তো শালা পালিয়ে যাওয়ার জায়গাই খুঁজে পাই না। ’

‘তারপর কী হলো? ছেড়ে দিলেন?’

‘চাপাচাপিতে ঠিক করলাম ওকে নিয়ে পালিয়েই যাব। একটা গোলমালে রক্ষা হয়েছে। বিয়ে হওয়ার কথা ছিল সন্ধ্যার পর, কিন্তু ওর পরিবার বুঝে ফেলেই কি না দুপুরেই ঘটনাটা ঘটিয়ে দেয়। আমি যাওয়ার আগেই কাজ শেষ। ওর জামাই ছিল আর্মি অফিসার, কাজেই পরে আবার খুব কিছু করারও সুযোগ ছিল না। তখন খুব মন খারাপ হয়েছিল কিন্তু এখন মনে হয় রক্ষা হয়েছে। এমনকি সে-ও ভালো আছে। আমিও তখন বিয়ে করে ফেললে আজ আর বিসিএস পাস করে ম্যাজিস্ট্রেট হতে পারতাম না। ’

সবাই চুপ। হিসাব মেলায় যেন প্রেম-বিয়ে এই বিষয়ে এখন কত দূর যাওয়া উচিত।

ভদ্রলোক বলেন, ‘তোমাদের এই গল্প বললাম কেন জানো? শিক্ষার জন্য। যেন ভুল না করো। এক-আধটু এদিক-সেদিক করো, ঘোরো—ঠিক আছে কিন্তু এর বেশি কিছু না। ’

চলে যাওয়ার আগে আবার দাঁড়ান। হাসতে হাসতে বলেন, ‘একটা জিনিস খেয়াল করেছ, বিসিএস ক্যাডার, আর্মি অফিসার, মাল্টিন্যাশনালের চাকুরে এদের বউ দেখবে খুব সুন্দর। ঠিক না?’

কেউ কেউ মাথা নাড়ে। দেখেছে।

‘কিন্তু আবার এর মধ্যে দেখবে কেউ কেউ একেবারে বেমানান। মানে সুশ্রী না। ’

‘অত খেয়াল করিনি কিন্তু কেন এ রকম হয়?’ সুজন জানতে চায়।

‘এ রকম দেখলেই বুঝবে প্রেমের কেস ছিল। ছোটবেলার প্রেম ছিল, তাই বিয়ের বাজারে দর ওঠাতে পারেনি। আগেই ফেঁসে গেছে। তোমরা কেউ ফাঁসবে না। নিজেকে রক্ষা করে চলবে। ’

বাকিরা বিভ্রান্ত। কিন্তু আকাশ অদ্ভুত রকম স্বস্তি বোধ করে। সে ফাঁসেনি। ফাঁসবেও না।

 

এগারো.

মিতুলদের আজকের অপারেশন অনেক বড়। এত বড় যে জুয়েল ভাই সন্ধ্যার সময় একটা মোটরসাইকেলে চেপে হলে চলে এসেছেন। আগে-পরে এসেছে আরো দুটো গাড়ি। সেগুলোতে হিংস্র চেহারার কিছু যুবক, যাদের মুখে বন্যতা, কোমরে অস্ত্র, শরীরে উত্তেজনা।

আরিফ ভাই বিকেলে ডেকে ওদের পরিকল্পনাটা জানিয়েছেন।

‘আজকে আমরা জসীমউদ্দীন হল অ্যাটাক করব। ’

‘তাই নাকি?’

‘হ্যাঁ। জুয়েল ভাই চলে আসবে রাতের মধ্যে। রাত ১২টায় অ্যাটাক। কারণটা কি জানো, আমাদের কাছে খবর আছে, ওখানে যে গ্রুপটা আছে ওরা জিয়া আর বঙ্গবন্ধুও দখল করতে চায়। আমাদের দলের লিজেন্ড ক্যাডার গিয়াস ভাইয়ের গ্রুপ নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করে ওই হলে উঠেছে। এখন ওদের টার্গেট জিয়া আর বঙ্গবন্ধু হল দখল করে এই অঞ্চলটায় নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। তাই আমরা ঠিক করেছি আক্রান্ত হওয়ার আগে নিজেরাই আক্রমণ করে ওদের তাড়িয়ে দেব। ’

‘গোলাগুলি হইব বহুত। তাই না ভাই?’ ফখরু বলে।

‘হ্যাঁ। তা তো হবেই। আর এ ক্ষেত্রে আমাদের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। জুয়েল ভাইয়ের দলটা থাকবে সামনে। গুলি করতে করতে ওরা এগোবে। ঠিক পেছনেই আমরা। ওদের কাভারিং দিতে হবে। ’

মিতুল বলল, ‘ভাই, আমরা তো গুলি করতে জানি না। ’

আরিফ বিরক্ত হয়ে বলে, ‘কেন, তোমাদের শেখানো হয়েছে না!’

মিতুলদের এক-আধটু শেখানো হয়েছিল, কিন্তু সেই সামান্য শিক্ষা দিয়ে একেবারে যুদ্ধে নেমে যাওয়া যায় না।

আরিফ ভাই বলে, ‘শোনো, আজ হচ্ছে সুযোগ, যদি জসীমউদ্দীন হলটা দখল করতে পারি তাহলে বঙ্গবন্ধু হলও আমাদের আধিপত্য মেনে নেবে। ক্যাম্পাসের এই অঞ্চলের নিয়ম হলো যাদের হাতে জসীমউদ্দীন হল তাদের হাতে অটোমেটিক পেছনের দুই হল। আজকে যারা ভালো করবে তারা অনেক এগিয়ে যাবে। আরো দুইটা হল আমাদের দখলে এলে দলের মধ্যে আমরাই হব সবচেয়ে শক্তিশালী গ্রুপ। আমরা পারব?’

ফয়েজ বলে একটা ছেলে চিৎকার করে বলে, ‘পারব না মানে? আমরা কি ব্যাটাছেলে না!’

‘গুড। জুয়েল ভাইয়ের সামনে এই সাহসটাই দেখাবে। ’

নাদির বলে, ‘অবশ্যই। ভাইকে পুরো ভরসা দেব। ’

ওরা সরে গেলে মিতুল বলল, ‘ফখরু, আমার ভয় লাগছে। চল আমরা কাট মারি। ’

ফখরু হাসতে হাসতে বলে, ‘দুর দোস্ত। ডরাইলেই ডর। আর আমরা তো থাকুম পেছনে। একটু চোখ-কান খোলা রাখলেই চলব। ’

‘তবু আমার কেমন যেন লাগছে। আমি যামু না। ’

‘উপায় নাইরে দোস্ত। পলিটিক্যাল কানেকশনে হলে উঠছি। না গেলে কালকেই লাথি মাইরা বাইর কইরা দিব। থাকুম কই? এত চিন্তা করিস না। আমি আছি না!’

মিতুলও বোঝে, উপায় নেই। যেতেই হবে।

জুয়েল ভাইকে আগে দু-একবার দেখেছে দূর থেকে, আজকে কাছ থেকে দেখল মিতুল। কুচকুচে কালো চেহারা, চোয়ালটা ভাঙা বলে বিদঘুটে দেখায়। কথা বলেন কিশোরগঞ্জের আঞ্চলিক উচ্চারণে। তবে হ্যাঁ, চোখের চাহনিতে একটা আগুন আছে।

রংচটা জিন্স আর ভারী বুট পরা জুয়েল ভাই বেশি কথায় গেলেন না। ওদের ভালো করে দেখে মাসুদ ভাইকে বললেন, ‘পোলাপাইন তো বেশি সুবিধার মনে হইতেছে না! ব্যাকআপ দিতে পারব তো?’

মাসুদ ভাই বলল, ‘তোমরা বলো, পারবে না?’

আরিফ ভাই বলে, ‘ভাই, আপনি খালি দেখেন। ’

জুয়েল ভাই আবার সবার দিকে তাকায়। তারপর বলেন, ‘কামটা হইলে কিন্তু বহুত বড় বকশিশ পাইবা। ’

এই সময়ই গেস্টরুমের ফোনটা বেজে ওঠে। জহির ভাই ফোনটা ধরে বলেন, ‘জুয়েল, লিডার কথা বলবেন। ’

পরের কয়েক মিনিট লিডারের সঙ্গে জুয়েল ভাইয়ের কথা হয়। লিডার ঠিক কী বলছেন শোনা গেল না তবে জুয়েল ভাই তাঁকে গ্যারান্টি দেয়, ‘ভাই, আমার পোলাপানের ওপর আপনার ভরসা আছে না! ১৫ মিনিটের মামলা। দুই-চারটা গুলি হইতে পারে। এর বেশি কিছু না। ’

ওদিকের কথা শোনে একটু। তারপর বলে, ‘আপনি খালি শিওর করেন পুলিশ যেন ১টার আগে না আসে। আমরা ওই হলে ঢুকব। তারপর পুলিশ আসুক। ওগো সবগুলারে পুলিশের কাছে দিয়া দিমু। মামলা খালাস। ’

আবার শোনে। তারপর বলে, ‘আপনি হাইকমান্ডরে বুঝাইয়েন এরা সব ছাত্রলীগের ঘাপটি মারা পোলাপাইন। এদের এইখানে থাকতে দিলে সামনে আন্দোলন-ইলেকশনে ঝামেলা হইব। ক্যাম্পাস দখলে থাকব না। ’

ফোনটা রেখে আরেকটা গাল দিয়ে জুয়েল ভাই বলে, ‘শালা হারামির দল। ক্রিম খাওনের বেলায় আছে, এখন কয় গোলাগুলি হইলে হাইকমান্ড রাগ করব। ওগো মতন আমরা চুরি পইরা বইসা থাকলে আর ক্ষমতায় যাওয়া হইত না। ’

নেতা বা নেতৃত্ব সম্পর্কে আমাদের সাধারণ বিশ্বাস হলো, এরা অনেক কথা বলে আর জায়গামতো পেছনে থাকে। কিন্তু ক্যাডার নেতাদের দেখা গেল অভিধান অন্য রকম।

জুয়েল ভাই থাকল সবার আগে। আর গুলি করতে থাকল এমন সাহসিকতায় যে বিপক্ষ তো বটেই, ওরা নিজেরাই চমকে গেল। ওর সঙ্গী-সাথিরাও ভীষণ রকম সক্রিয়।

জসীমউদ্দীন হলের সামনের ছোট রাস্তা পর্যন্ত তিন গ্রুপে ভাগ হয়ে এগোল ওরা। তারপর টানা গুলি করতে করতে এগিয়ে যাওয়া। ওদিকে থেকে একটুও প্রতিরোধ নেই।

ফখরু বলল, ‘এই হালারা তো দেখি একেবারে আকাইম্যা। হেগো লাইগা এত আয়োজন। ’

মিতুল বলে, ‘বেশি কথা বলিস না। খেয়াল রাখ সব দিক। ’

ফখরু হাতের অস্ত্রটা দেখিয়ে বলে, ‘খেয়াল আছে। দরকার মতো একদম ঠাটাইয়া দিমু। ’

এখানকার সোডিয়াম লাইটগুলো আগেই ওরা বন্ধ করে রেখেছিল।

ঘোর অন্ধকার চারদিকে। এর মধ্যেই ওরা এগোচ্ছে।

ঠিক যখন গেটের কাছে তখনই জসীমউদ্দীন হলের ভেতর থেকে প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরণ। বোঝা গেল, শুরুর ধাক্কা সামলে ওরা গুছিয়ে পাল্টা আক্রমণ করছে।

সঙ্গে সঙ্গেই জুয়েল ভাই বলল, ‘শুয়ে পড়ো সবাই। মালটা যেন হাতে থাকে। ’

জুয়েল ভাই ক্রলিং করে আগাচ্ছে। কিন্তু এখন আগানো সহজ হচ্ছে না।

কলাপসিবল গেট বন্ধ। ওপর থেকে কিছু গুলি হচ্ছে কিন্তু মূল দলটা অবস্থান নিয়েছে গেটে। ঢুকতে দেবে না কোনোভাবেই।

জুয়েল ভাই বলল, ‘মাসুদ পেছন থেকে চালা। আমি আগাচ্ছি। ’

 পেছন থেকে মাসুদ ভাইয়ের দল গর্জে উঠল। মিনিট বিশেকের টানা লড়াই। একেক সময় মিতুলের মনে হচ্ছিল কানটা ফেটে যাচ্ছে। এর মধ্যে দলের দু-একজনকে ছিটকেও যেতে দেখেছে সে। একজন পড়েছে ওর খুব কাছে। কিন্তু এমন অবস্থা যে সেদিকে মনোযোগ দেওয়ার সময়ও নেই।

ধীরে ধীরে ভেতরের তেজ হালকা হতে থাকে। বোঝা যায়, অপ্রস্তুত থাকায় ওদের হাতে যথেষ্ট পরিমাণ অস্ত্র ছিল না।

জুয়েল ভাই আরেকটু আগায়। তারপর প্রচণ্ড শব্দে কয়েকটা গুলি করে। ওদিকে উত্তর নেই।

জুয়েল ভাই আরেকটু এগিয়ে গিয়ে গেটে একটা গুলি করে। গেটের তালাটা উড়ে যায়।

সাবধানে উঠে দাঁড়ায় এবার। সঙ্গীদের উঠে আসার ইঙ্গিত দেয়।

তিনজন খুব সাবধানে গেট খুলে ভেতরে ঢোকে। তার পরই চিৎকার, ‘এই, আয় সবাই। হয়ে গেছে। পালিয়েছে সব। ’

মিতুল বুঝতে পারে গুলির ঝাঁজে টিকতে না পেরে ওরা হার স্বীকার করে চলে গেছে।

সবাই পালায়নি। জুয়েল ভাই হলে ঢুকতেই কয়েকজন এসে বলে, ‘ভাই, আমরা আজ থেকে আপনার দলে। ’

জুয়েল ভাই ভালো করে দেখে বলে, ‘মাসুদের সঙ্গে কথা বলো। ’

মাসুদ ভাই এগিয়ে গিয়ে বলে, ‘আগে মাল দাও। তারপর কথা বলি। ’

দুজন কোমরে থাকা দুটো পিস্তল বের করে দেয়। আর স্লোগান দেয়, ‘আমার ভাই তোমার ভাই, জুয়েল ভাই...’

হলের গেস্টরুমটা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর ওদের নেতারা যেসব রুমে থাকত সেগুলো তালা মারার সিদ্ধান্ত হয়। সোৎসাহে কয়েকজন ছুটে যায়।

এর মধ্যে আরিফ ভাই উঠে আসে একটু চিন্তিত চেহারায়। মাসুদ ভাইকে ফিসফিস করে কী যেন বলে। শুনেই মাসুদ ভাইয়ের মুখটা কালো হয়ে যায়। ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলে, ‘কোথায় চলো...’

জুয়েল ভাই বলে, ‘কী সমস্যা? কেউ গুলিটুলি খাইছে নাকি?’

মাসুদ ভাই বলে, ‘হ্যাঁ আমাদের খুব কাজের ছেলে। ফখরু। প্রচুর ব্লাড যাচ্ছে। ’

মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠে মিতুলের। এমন চেতনাশূন্য হয়ে পড়ে যে দৌড় দেওয়ার কথাও মনে থাকে না।

যখন ওর কাছে পৌঁছল তখন আরেক দফা ধাক্কা খায়। ওর কয়েক গজ দূরেই ছিল ফখরু। সে বুঝতে পারেনি।

রক্ত যাচ্ছে স্রোতের মতো। ফখরু তবু ওকে চিনতে পারল। বলল, ‘দোস্ত, যাইতাছিগা মনে হয়। মনে হয় যাইতাছিগা। ’

মিতুল চিৎকার করে, ‘কিচ্ছু হবে না দোস্ত। কিচ্ছু হবে না। আমি আছি না!’

মিতুল বলে, ‘ডাক্তার, অ্যাম্বুল্যান্স। ’

ফখরু বলে, ‘বাঁচতে খুব ইচ্ছা করতাছে রে দোস্ত। মা-টা খুব কষ্ট পাইব। ’

অসুরের শক্তিতে ওকে টেনে গেটের কাছে নিয়ে আসে মিতুল।

দৌড়ে যায় জুয়েল ভাইয়ের কাছে। জুয়েল ভাই তখন ব্যস্ত কোন রুমে কে থাকবে সেটা নিয়ে।

বললেন, ‘অবস্থা কী? মরে যাচ্ছে নাকি?’

মিতুল বলে, ‘ডাক্তার-অ্যাম্বুল্যান্স ডাকেন। ’

আরিফ ভাই বলে, ‘আমি মেডিক্যালে ফোন করেছিলাম। বলেছে পুলিশ না আসা পর্যন্ত ওরা কিছু করতে পারবে না। ’

‘পুলিশ কখন আসবে?’

মাসুদ ভাই বলে, ‘একটার আগে তো আসতে মানা আছে। ’

মিতুল জুয়েল ভাইয়ের পায়ের কাছে ঝাঁপিয়ে পড়ে, ‘ভাই, একটা ব্যবস্থা করেন। ভাই...’

জুয়েল ভাই বলে, ‘শোনো, পাগল হইয়ো না। আর্মস পলিটিকস করি আমরা, যে কেউ যেকোনো দিন যাইতেগা পারি। ’

‘ওরে বাঁচান!’

‘শোনো, এইটা তোমার সুযোগ। তোমার বন্ধু মরলে তুমি পুরস্কার পাইবা। এই হলে তোমারে আমি বড় পজিশন দিয়া দিমু। ’

হঠাৎ একজন চিৎকার করে বলে, ‘গুষ্টি কিলাই আপনার পুরস্কারের। আগে ওরে বাঁচান। ’

মিতুল বিস্মিত হয়ে খেয়াল করে, মানুষটা মাসুদ ভাই।

মাসুদ ভাই বলেন, ‘আরিফ, চলো, আমরাই ওরে ধরে নিয়া যাই। চলো। ’

না, আরিফ আসে না। জুয়েল ভাইয়ের দিকে তাকায়। বাকিরাও জুয়েল ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে। সে যা বলবে তাই হবে।

জুয়েল ভাই আরিফ ভাইকে জিজ্ঞেস করে, ‘চান্স কেমন?’

‘খুব বেশি নাই ভাই। ’

‘তাইলে আর টানাটানি কইরা লাভ কী? এইখানে মরলে ওরা মারছে এইটা এস্টাবলিশ হইব। হের বন্ধুরে বোঝাও। ওরে আমি এই হলের সেকেন্ড লিডার বানায়া দিতাসি। ’

মাসুদ ভাই বলে, ‘মিতুল, ফালতু কথা শোনার সময় নাই। চলো। ’

মাসুদ ভাই প্রায় নিঃসাড় ফখরুকে ধরেন। মিতুল ওকে টানতে থাকে।

জুয়েল ভাই বলে, ‘মাসুদ, তুই কিন্তু ভুল করতাছস। তোর সব শেষ হইয়া যাইব। ’

মাসুদ ভাই কী ভেবে উঠে দাঁড়ায়। তারপর এগিয়ে গিয়ে বলে, ‘ভাই, আপনার লাইগাই আমার আজকের এই অবস্থান। কিন্তু এখন আমার কী ইচ্ছা হইতাছে জানেন? এই পিস্তলটার সব গুলি আপনার বুকে ঢুকাইয়া দেই। ’

জুয়েল ভাই বলে, ‘এই ধর শালারে। ’

সঙ্গে সঙ্গেই আরিফের নেতৃত্বে কয়েকজন ঝাঁপিয়ে পড়ে মাসুদ ভাইয়ের ওপর।

মাসুদ ভাই এর মধ্যেও চিৎকার করে, ‘মিতুল, তুমি যাও। যাও। ’

মিতুল রওনা হয়। ফখরুর ভারী শরীরটা টানতে থাকে।

কাজ শেষ। তাই সোডিয়াম লাইটগুলো আবার জ্বেলে দেওয়া হয়েছে। সেই আলোতে ফখরুর রক্তের রং হয় কালো।

ওপরে বিশাল আকাশ। গাছের পাতায় বাতাস। রাতের ক্যাম্পাস আজও অন্য দিনের মতোই সুন্দর। আজও হয়তো গান গেয়ে ছুটে চলছে রাতজাগা কোনো এক দল।

সেখানেই মিতুল নামের এক তরুণের বুকে রক্তমাখা বন্ধু। সামনে অনিশ্চিত অন্ধকার। পেছনে পড়ে আছে ওপরে ওঠার সিঁড়ি।

রক্তের দাগ জমছে রাস্তায়। সেই দাগ অবশ্য সকাল হলেই মুছে যাবে।

তারপর এখানে নিত্যদিনের মতোই চলবে নতুন রাজনৈতিক অঙ্ক। উজ্জ্বল ভবিষ্যতের নেশায় ছুটে চলাদের পদক্ষেপ। প্রেমিক-প্রেমিকার উদ্দাম পথচলা। সান্ধ্য আড্ডা জমবে প্রাণবন্ত কোলাহলে। অস্থির উল্লাসের

বাহারি আয়োজনে মগ্ন থাকবে সুন্দর এবং নিষ্ঠুর এই ক্যাম্পাস।


মন্তব্য