kalerkantho


সা য়ে ন্স ফি ক শ ন

দ্বিতীয় অবিনাশ

ধ্রুব এষ

২৫ জুন, ২০১৭ ০০:০০



দ্বিতীয় অবিনাশ

অঙ্কন : বিপ্লব চক্রবর্ত্তী

‘হবিনাশ! ও হবিনাশ!

‘হু?’

‘তুমি কি আমারে দেখো, হবিনাশ?’

‘দেখি। ’

‘ সত্য সত্য দেখো?’

‘হুঁ।

‘কী দেখো, হবিনাশ?’

‘তুমি ল্যাংটা। ’

ছিঃ। এটা একটা কথা হলো নাকি? তুমি ল্যাংটা! নগ্ন, বিবসনা, উলঙ্গ বা নিসুতা বলা যেত না? বলা যেত না, তুমি কিছু পরো নাই?

ছিঃ! এই বয়সে এ রকম একটা স্বপ্ন কি দেখা উচিত হলো?

অন্যায় হয়েছে। ঘোরতর অন্যায়।

অবিনাশ চক্রবর্তী ঘুম থেকে উঠে মুখ বেজার করে থাকলেন। তার বয়স এখন ৫১। রত্নেশ্বরীর বয়স কত হবে এখন? ৪০-এর কম না। কিন্তু তিনি স্বপ্ন দেখেছেন ২০-২১ বছরের রত্নেশ্বরীকে। অতি অশালীন একটা কথাও বলেছেন।

অবশ্য অবশ্যই এটা অন্যায়। রত্নেশ্বরী যদি শোনে! রত্নেশ্বরী এখন থাকে কোন এক শাল্লা উপজেলায়। ঠিকাদারের বউ হয়েছে। ছয় বছর আগে একবার কথা হয়েছিল অবিনাশ চক্রবর্তীর সঙ্গে। ফোন করেছিলেন অবিনাশ চক্রবর্তীই। দুঃখী এক আষাঢ় শেষের বিকেলে।

‘রত্নেশ্বরী। ’

‘হবিনাশ? বলো। ’

এখনো তাকে সেই হবিনাশই ডাকে রত্নেশ্বরী। অবিনাশ থেকে হবিনাশ। শিবরাম চক্রবর্তীর পি ইউ এন, পান নকল করে একদিন রত্নেশ্বরীকে শুনিয়েছিলেন অবিনাশ চক্রবর্তী, ‘হবি নাশ? চণ্ড করব-রতি। ’ রত্নেশ্বরী ‘পান’ বুঝতেই পারেনি। যাক।

‘তুমি কী করো রত্বেশ্বরী?’

রত্নেশ্বরী বলল, ‘হাঁস গোছাই। ’

‘কী?’

‘আমি কি তোমারে বলি নাই হবিনাশ, আমার হাঁস আছে একুশটা। তারারে গোছাই। আ চৈ চৈ চৈ। আ চৈ চৈ। হি! হি! হি!’

‘গোছাও। ’

অবিনাশ চক্রবর্তী আর কিছু বলেননি। যৌবনে এই রত্নেশ্বরীর জন্য কিছু হৃদয় দৌর্বল্য হয়েছিল তার। কিছু না, মারাত্মক হৃদয় দৌর্বল্য। রত্নেশ্বরীকে ছাড়া বাঁচবেন না টাইপ। মায়াকাটরার ফকির বাবার সঙ্গে কয়েক দফা দেখা করেছিলেন। এই ফকির বাবা তিনকাল জানেন। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। ‘সুলাইমানি টুপি’ হাসিলের গুপ্ত কথা যদি বলে দেন। হাজার-বারো শ টাকা খরচ হয়েছিল। ফকির বাবা বলে দিয়েছিলেন। সেই মতো পোস্তগোলা শ্মশানে কিছুদিন ওত পেতে ছিলেন অবিনাশ চক্রবর্তী। হাঁড়ির কানা জোগাড় করেছিলেন। লক্ষ্মীপ্যাঁচা ধরে এনেছিলেন টাঙ্গাইলের জলছত্রের জঙ্গলে গিয়ে। সুলাইমানি টুপি হাসিলের জন্য এসব অনুষঙ্গ লাগে। মাঠ পাননি বলে শেষতক ঘটনা ঘটেনি। তাও আবার গরু চরানোর মাঠ। গরু বা মোষ। এমন মাঠ আছে আর দেশে? সব মাঠ বিল্ডিং হয়ে গেছে। আফসোস। সুলাইমানি টুপি হাসিল করতে পারলে রত্নেশ্বরী কি আর শাল্লা না বাল্লার কোনো ঠিকাদারের বউ হয়? হাঁস গোছায়?

আফসোস!

অবিনাশ চক্রবর্তী এখনো অবিবাহিত।

বিয়ে করার মতো বয়স আর আছে?

তা আছে।

প্রকাশক মনিরুল হুদার বয়স ৫৮। শুক্রবারে দ্বিতীয় বিবাহ করেছেন।

গল্পকার হোসেনুর রহমানের বয়স ৬২। কিছুদিন আগে দুই নম্বর না, তিন নম্বর দার পরিগ্রহ করেছেন।

বই বাইন্ডার জবান মৃধা। বলে ‘মিরধা। ’ বয়স অবিনাশ চক্রবর্তীর সমান। একসঙ্গে দুই বউ নিয়ে থাকে। নেলী-শেলী। শেলীর আপন ছোট বোন নেলী। ছিল জবান মিরধার একমাত্র শ্যালিকা। দুই বছর ধরে দ্বিতীয় পত্নী।

অতএব, বয়স যায়নি।

কিন্তু বিয়ে আর করবেন না বলে স্থির করে রেখেছেন অবিনাশ চক্রবর্তী। ইংরেজিতে যাকে বলে ডিটারমাইন্ড। দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

 

অবিনাশ চক্রবর্তী থাকেন ‘জুলেখা বোর্ডিংয়ে’। ১১-১২ বছর ধরে আছেন। আগে থাকতেন বোর্ডিংয়ের ১৩ নম্বর রুমে। এখন থাকেন ২১ নম্বর রুমে। বোর্ডিংয়ের দোতলায়। ঠ্যাটা ফকরুর বদান্যতায় এই প্রমোশনের ঘটনা ঘটেছে।

ঠ্যাটা ফকরু কে?

বলতে হয় আবার! ঠ্যাটা ফকরু এলাকার ভাই। এলাকার মায়ের পেট থেকে জন্মেনি, তাতে কী? এই ঠ্যাটা ফকরু একদিন বলল, ‘কাকা, আপনের রুমে তো সমস্যা। ’

অবিনাশ চক্রবর্তী বললেন, ‘সমস্যা, বাবা?’

ঠ্যাটা ফকরু বলল, ‘জি কাকা। কী সমস্যা, আপনে কি জানেন?’

‘না, বাবা। ’

‘তাইলেই কন? সমস্যা, কাকা। গ্রেইট প্রোবলেম। আপনের এই রুমে ভূত আছে। ’

‘ভূত! বাবা?’

‘জি কাকা, ভূত। ভূত চিনেন তো?’

‘চিনি, বাবা। পরিচয় আছে দুই-একজনের লগে। ’

‘পরিচয় আছে?’

‘বইপত্রে পড়ছি, বাবা। ’

‘তাইলেই বোঝেন। এই মামুইন্যা, তুই ক না। ’

মামুইন্যা বলল, ‘জি, কাকা। আপনের রুমে তো বুঝছেন, ইন্ডিয়ান ভূত থাকে। ’

‘ইন্ডিয়ান ভূত! কোন প্রদেশের ভূত বাবা? উড়িয়া ভূত? না মাউড়া?’

ঠ্যাটা ফকরু বলল, ‘উড়িয়া! মাউড়া!

কাকা।

আপনে তো দেখি বিরাট ঘাউড়া!’

অবিনাশ চক্রবর্তী মুগ্ধ হয়ে গেলেন। বললেন, ‘বাবা, আপনে তো একজন কবি। ’

ঠ্যাটা ফকরু বলল, ‘কথা সেইটা না।

আপনের এই রুম

ভূতের আস্তানা। ’

‘অবশ্যই ভূতের আস্তানা, বাবা। ইন্ডিয়ান ভূতের আস্তানা। কিন্তু সে কি উড়িয়া না মাউড়া? নাকি তেলেগু?’

‘কাকা, উড়িয়া না

এই মামুইন্যা, পুরি আনা

কলিকাতার এই ভূত

কোদাল মার্কা টুথ। ’

মুগ্ধবোধ ব্যাকরণ বইয়ের নামপত্র হয়ে গেলেন অবিনাশ চক্রবর্তী, ‘বাবা, আপনি একটা কাব্যগ্রন্থ লেখেন। প্রুফ আমি দেখে দেব। টাকা-পয়সার কথা মাথায় এনে আমারে লজ্জিত করবেন না, বাবা। ফর্মা পঞ্চাশ টাকা করে দেখি। আপনের বই ছাব্বিশ টাকা করে দেখব। ’

‘আগে এই রুম ছাড়েন,

যত তাড়াতাড়ি পারেন। ’

‘অবশ্যই বাবা। অবশ্যই। অবশ্যই। ’

কাব্য প্রতিভাধর ঠ্যাটা ফকরুই যাবতীয় ব্যবস্থা করে দিয়েছে। ভড়কে দিয়েছে ‘জুলেখা বোর্ডিংয়ের’ প্রাচীন ম্যানেজার আবু আক্কাসকে।

‘আক্কাস

ঝাক্কাস

বোঝা যায়?

এই কাকা থাকবেন

দোতালায়। ’

বোঝা যায় মানে? যায় না আবার! ঠ্যাটা ফকরুর কাছে দুনিয়া আকেলমন্দ। আর জুলেখা বোর্ডিংয়ের ম্যানেজার আবু আক্কাস। আকেলমন্দকে লিয়ে ইশারাই কাফি।

অতএব, সেই থেকে অবিনাশ চক্রবর্তী ২১ নম্বর রুমের বাসিন্দা। ৮-৯ বছর ধরে আছেন। বয়োজ্যেষ্ঠ আবু আক্কাস একদিন গোপনে তাকে ১৩ নম্বরের ভূতের কাহিনি বলেছেন। কলকাতার গড়পাড়ের ভূত। বই আমদানি-রপ্তানির বিজনেস করত বাংলাবাজারের কয়েকজন প্রকাশকের সঙ্গে। সুইসাইড নোট-ফোট কিছু না লিখে রেখে গলায় নাইলনের দড়ি দিয়েছিল। হিন্দু ভূত, আবার কলকাতার। হালুম-হুলুম করে কথা বলে। আবু আক্কাসকে কয়েকবার বলেছে, ‘কলিকাতায় গিয়েছিলুম। আগের কলিকাতা দেখতে পেলুন না। কলিকাতায় আর কলিকাতা নেইকো। ’

আবু আক্কাস এই হালুম-হুলুম ভূতের কথা আগে কখনো বলেননি কেন অবিনাশ চক্রবর্তীকে?

স্মরণে ছিল না।

বিশ্বাসযোগ্য কথা?

ভূত, আবার কলকাতার ভূত, তার কথা একটা মানুষের স্মরণে থাকবে না? ঠ্যাটা ফকরু স্মরণ করিয়ে দিয়েছে?

ঠ্যাটা ফকরু, মামুইন্যা, পাভেল— এরা এখন মজমা করে ১৩ নম্বরে। কলকাতার ভূত তাদের উপদ্রব করে না। ভূত হলেও ভাইজ্ঞান আছে। সেই জ্ঞান দিয়ে ভূত বেচারি বোঝাপড়া করে নিতে পেরেছে, ভূতের বাবার বাবা ঠ্যাটা ফকরু। একে উত্পাত করলে ভূতগিরির লাইসেন্স বাতিল হয়ে যেতে পারে।

ভালো। কিন্তু এত দিন ধরে ১৩ নম্বরে থাকলেন, অবিনাশ চক্রবর্তী এক দিনও কেন সেই ভূত মহাশয়কে দেখতে পেলেন না? ভুতুড়ে কোনো কথাও শুনলেন না? ভুতুড়ে ব্যাপার।

তা ২১ নম্বর রুমে কিছু খারাপ আছেন না অবিনাশ চক্রবর্তী। আলো-হাওয়া যথেষ্ট খেলে এই রুমে। জানালা আছে, সবুজ রং করা। রুমে থাকলে সন্ধ্যার আগে এই জানালা কখনো খোলেন না অবিনাশ চক্রবর্তী। ঘুণ ধরে ফুটো হয়ে গেছে জানালায়। এ ছাড়া সমস্যা আছে। বোর্ডিংয়ের লাগোয়া শত্রুসম্পত্তি। লিজ নিয়ে আছে কয়েকটা পরিবার। কলপাড়ে গোসল করে তাদের মেয়েরা। জানালার ফুটো দিয়ে দেখা যায়। দুপুরে রুমে থাকলে কখনো কখনো খুবই সতর্কতার সঙ্গে দেখেন অবিনাশ চক্রবর্তী। রোমাঞ্চকরভাবে কিছু সময় কেটে যায়।

রত্নেশ্বরীর পর নিরূপমা। জাতে সাহা। নিরূপমা সাহা। একপাত না, সম্বন্ধ হয় না। কিন্তু অবিনাশ চক্রবর্তী জাতপাত ধুয়ে জল খাবেন নাকি? মায়াকাটরার ফকির বাবার কাছে আবার ধরনা দিয়েছিলেন।

‘বাবা, তারে ছাড়া আমি বাঁচব না। ’

 ‘কে কারে ছাড়া বাঁচে না, পাগলা?’

‘সেইটা আমি জানি না, বাবা। আমি তারে ছাড়া বাঁচব না। ’

‘তোরে নিয়া আমি কী করি ক? সুলাইমানি টুপি হাসিলের উপায় আমি তোরে কয়ে দেই নাই? সেই টুপিও হাসিল করতে পারলি না। ’

‘আর কোনো উপায় নাই, বাবা?’

‘তা আছে। খরচাপাতিও আছে। খরচাপাতি করতে পারবি তো?’

‘পারব, বাবা। ’

‘রবিবারে আয়, দেখি। ’

রবিবারে মায়াকাটরায় গিয়েছিলেন এবং খরচাপাতি যা করার করেছিলেন অনিবাশ চক্রবর্তী।

নিরূপমা এখন আছে ইন্ডিয়ায়। ত্রিপুরার ধর্মনগরে। তার জামাই ফল ব্যবসায়ী। দোকান আছে ধর্মনগর বাজারে। নিরূপমা ফ্রুটস।

নিরূপমার পর অঙ্কি। এটা একটা হৃদয়বিদারক ঘটনা। বর্ণমালা প্রিন্টার্সের মেশিনম্যান নীলমণি শুক্লবৈদ্যর শ্যালিকা অঙ্কি। অনিমা থেকে অঙ্কি। রূপে-গুণে অনন্যা মেয়ে। চিত্রনায়িকা সুচরিতা কাটিংয়ের মুখ। এর জন্য আর মায়াকাটরায় ফকির বাবার কাছে যেতে হয়নি। খোদ নীলমনি শুক্লবৈদ্যর উসকানি ছিল। তার বউ উজ্জ্বলা বউদিরও!। লেটার প্রেসের যুগ সেটা। তখন থেকেই প্রুফ রিডার অবিনাশ চক্রবর্তী। ‘জুলেখা বোর্ডিং’য়ে থাকেন না তবে বাংলাবাজারে নিয়মিত আনাগোনা করেন। অঙ্কির মুখ মনে করে হাঁটেন, অঙ্কির মুখ মনে করে প্রুফ দেখেন। অঙ্কিময় দিন, অঙ্কিময় রাত। আজব একটা ঘ্রাণ অঙ্কির শরীরের। ঝিমঝিম করে। অঙ্কির চিবুকে জোড়া তিল আছে। কোমরের ডান দিকে জড়ুল আছে। বিয়ের দিন-তারিখ নীলমণি শুক্লবৈদ্য এবং উজ্জ্বলা বউদিই ঠিক করেছিলেন।

বিয়ের জন্য কিছু টাকা গোপনে জমিয়ে রেখেছিলেন অবিনাশ চক্রবর্তী। অঙ্কিকে নিয়ে কেনাকাটা করেই সবটা ফুরিয়ে গিয়েছিল। অঙ্কি লোভী না। কিন্তু একটা মেয়ে তার বিয়েতে স্বর্ণের একটা টিকলি আশা করতেই পারে। স্বর্ণের কানের দুল ও চুড়ি আশা করতেই পারে। সব তো আসলে এক অর্থে অবিনাশ চক্রবর্তীর কাছেই থাকবে। বিয়ে করবেন, বিয়ের কার্ড ছাপলেন। এই একটা গোপন শখ ছিল তার। বেশি না, ২৫টা কার্ড ছাপবেন। প্রকাশক কয়েকজন এবং দুই-একজন লেখককে দেবেন। দুই-একজন বলতে তিনজন লেখক। হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন এবং কবি নির্মলেন্দু গুণ। এঁদের বইয়ের প্রুফ তিনি দেখেছেন। এঁরা বিয়েতে আসুন না আসুন, মুখে মুখেই যদি শুধু আশীর্বাদ করে দেন।

কার্ড ছাপানোর ব্যবস্থা হয়েছিল বর্ণমালা প্রিন্টার্সেই। কার্ডের প্রুফ দেখতে গেছেন সন্ধ্যায়, প্রেসের কম্পোজিটর মুসা মিয়া বলল, ‘পঙ্খি তো উড়াল দিছে উস্তাদ। ’ শুনে প্রথম বিশ্বাস করেননি। বর্ণমালা প্রিন্টার্সের ম্যানেজার গোলাম রসুলের শালা এনায়েতের সঙ্গে দুপুরে বিয়ে হয়ে গেছে অঙ্কির। নীলমণি শুক্লবৈদ্য, উজ্জ্বলা বউদি এবং গোলাম রসুল বিয়ের তদারকি করেছেন। অঙ্কির উকিল বাবা হয়েছেন গোলাম রসুলের সম্বন্ধী তবারক উদ্দিন। অঙ্কি এখন মুসলমান এবং তার নাম নওশেবা।

কী মনে হয়েছিল তখন অবিনাশ চক্রবর্তীর? তার শরীরের সব রক্ত নিমেষে শুষে নিল কোন মরুভূমির বালু? খাঁ খাঁ একটা শূন্যতা। দাগার পর দাগা, সেই যে থতমত খেয়ে গিয়েছিলেন, থতমত ভাবটা আর কাটাতে পারেননি। গত ২০-২১ বছরেও না।

 

হেমেন্দ্র দাশ রোডে বজলুর রহমানের কম্পিউটার কম্পোজের ঘর আছে। আশা কম্পিউটার্স। বজলুর রহমানের দ্বিতীয় বউটার নাম আশা। আশা কম্পিউটার্সে তিনটা মেয়ে কম্পোজের কাজ করে—জবা, সালমা আর মণি। জবা হিন্দুঘরের বিবাহিত মেয়ে। সালমা আর মণিও বিবাহিত। রাজধানী মার্কেটে সালমার জামাইয়ের মোবাইল ফোনের দোকান আছে। মণির জামাই থাকে সৌদি আরবে। আর দুই বছর পর ফিরবে। তিনটা মেয়েই লক্ষ্মীমন্ত। যত্ন করে অবিনাশ চক্রবর্তীকে। জবা আর সালমা তাঁকে ডাকে কাকা। মণি ডাকে দাদু। টুকটাক  রং-তামাশাও করে।

‘আপনে বিয়া করবেন না, দাদু?’

‘নারে, দাদু। ’

‘আহারে! ক্যান? ছ্যাঁক খাইছেন?’

‘হ রে, দাদু। ’

‘কন কি দাদু? আপনের মতো মাইনষেরে ছ্যাঁক দিছে কে? এই রকম মেয়েও আছে নাকি দুনিয়ায়? ইস রে,  বিশ-একুশ বছর আগে দেখা হইলে তো আমি আপনেরে বিয়া করতাম, দাদু। ’

বিশ-একুশ বছর আগে হলে?

মণির বয়স এখন কত?

তেইশ-চব্বিশ।

নির্দোষ রংঢং।

শরীর কামনা করে না, তা নয়। মাঝেমধ্যে করে। ব্যবস্থা আছে। খরচাপাতি হয় কিছু। পোস্তগোলার সান্ত্বনা ভাবি, নর্দ্দাবাজারের মোমেনা ভাবির ফোন নম্বর আছে অবিনাশ চক্রবর্তীর ফোনবুকে এবং নোটবুকে। ফোন চুরি গিয়ে একবার খুব বিপাকে পড়েছিলেন। আনরেজিস্টার্ড নম্বর। সেটা আর ওঠাননি। আরেকটা সিমকার্ড উঠিয়েছেন। এক কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি এবং মেশিনে আঙুলের ছাপ উঠিয়ে রেজিস্ট্রেশন করিয়ে নিয়েছেন। তবে এই ফোনও চুরি বা ছিনতাই হয়ে যাবে। অতএব বিকল্প ব্যবস্থা করে রেখেছেন। ফোনবুকে যে ১০৮টা নম্বর, লিখে রেখেছেন নোটবুকেও।

কথা এসব না। কথা হলো বেমক্কা স্বপ্নটা। এত দিন পর রত্নেশ্বরীকে কেন স্বপ্নে দেখলেন অবিনাশ চক্রবর্তী? তাও এ রকম একটা স্বপ্ন। আবার একটা অশালীন কথাও বলেছেন। উচিত হলো এটা? রত্নেশ্বরী যদি শোনে, কী মনে করবে?

‘বেক্কল!’

কে বলল?

চিন্তিত অবিনাশ চক্রবর্তী বললেন, ‘কী?’

‘বেয়াক্কল। বে-আক্কেল। চলতি ভাষায় বললাম বেক্কল। ’

‘কথ্য চলতি না মৌখিক চলতি?’

বলে টনক নড়ল সদ্যোজাগ্রত অবিনাশ চক্রবর্তীর। কার সঙ্গে কথা বলছেন তিনি? দুইবার কথা বলে ফেলেছেন। দেখলেন এবার। আরে! কে এটা?

রুমের দরজা বন্ধ, ছিটকিনি আটকানো। তাহলে রুমে ঢুকলেন কী করে মানুষটা?

পা উঠিয়ে বসে আছেন চেয়ারে। একা একা যখন রুমে থাকেন, তখন মাঝে মাঝে এ রকম করে বসে থাকেন অবিনাশ চক্রবর্তী।

সাদা ফুলশার্ট, শিয়াল রঙের প্যান্ট। শার্টের হাতা গুটিয়ে পরেছেন। চোখে ভারী কাচের চশমা। ক্লিন শেভেন। চুল লম্বা এবং চুলের রং সোনালি। কে ইনি? আয়না দেখছেন অবিনাশ চক্রবর্তী? কিন্তু এমনি খাটে বসে আছেন আর আয়নায় বসে আছেন চেয়ারে, এটা কি সম্ভব? এ ছাড়া আয়না কোত্থেকে আসবে? আয়না একটা আছে বাথরুমে। বেসিনের ওপর। ছোট সাইজের আয়না। পারা ক্ষয়ে গেছে। কোনো রকমে মুখ দেখা যায় এবং শেভ করে নেওয়া যায়। তাহলে মানুষটা? আরেকজন অবিনাশ চক্রবর্তী?

‘ইয়েস স্যার, ইউ আর রাইট। ’ বলে চেয়ারে উপবিষ্ট মানুষটা হাসলেন।

অবিনাশ চক্রবর্তী বিস্মিত হলেন না। কেন? বললেন, ‘অ। ’

মানুষটা ভেঙালেন, ‘অ! রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই তুই মনে হয় আমারে দেখিস?’

 অবিনাশ চক্রবর্তী বললেন, ‘না। কী করে দেখব? এই প্রথম দেখলাম। ’

‘দেখে যে খুব একটা বিস্মিত হলি না?’

‘আপনি কি আমারে দেখে হইছেন?’

‘বাহ্! বুদ্ধি আছে তোর! ব্রাভো! ব্রাভো!’

অবিনাশ চক্রবর্তী বললেন, ‘বুঝলাম ব্রাভো। কিন্তু ভাই আপনি আমারে তুই করে বলতেছেন কেন? এইটা কী ধরনের আচরণ?’

‘ওরে আমার আচরণঅলারে! আচরণ! হ্যাহ্! আরে গাধা মার্কা পানির ট্যাংকি, আমি হলাম আরেকটা তুই, মানে বুঝিস? মানে হলো আমি আরেকটা তুই-ই। তুই যেমন অবিনাশ চক্রবর্তী, মুই তেমন অবিনাশ চক্রবর্তী। তুই যেমন রত্নেশ্বরীরে স্বপ্ন দেখছিস, আমিও তেমন রত্নেশ্বরীরে স্বপ্ন দেখছি। ল্যাংটা দেখছি। হেঁ! হেঁ! হেঁ!’

‘চুপ করেন। ’

‘এহ্! স্বপ্ন দেখার সময় মনে থাকে না?’

অবিনাশ চক্রবর্তী বললেন, ‘আপ-তুম-তু-তুইও তো দেখছিস। ’

‘দেখব না? হেঁ হেঁ হেঁ। তোর কাছে রত্নেশ্বরীর ফোন নম্বর আছে?’

‘আছে। কেন?’

‘রত্নেশ্বরীর কাছে তোর ফোন নম্বর আছে?’

‘আছে। কেন?’

‘তুই ফোন করলে ধরবে? না তোর নম্বর ব্লক করে রাখছে? হেঁ হেঁ হেঁ। ’

‘আশ্চর্য! হাসির কী হইল?’

‘কিছু হয় নাই। ফোন কর একটা রত্নেশ্বরীরে। ’

‘কেন?’

‘কী স্বপ্ন দেখছিস তারে শোনা! হেঁ হেঁ হেঁ। হইছে, বেলা কিন্তু কম হয় নাই মোটেও। জলখাবার করবি না তুই?’

‘জলখাবার?’

‘নাশতা। সকালের নাশতা। সকালের নাশতার বাংলা জলখাবার। ’

‘আমি জানি। ’

‘ঢেঁড়স! হেঁ! হেঁ! হেঁ!

তুই ঢেঁড়স। মনে মনে বললেন এবং খাট থেকে নেমে বাথরুমে ঢুকলেন অবিনাশ চক্রবর্তী।

 

বাথরুমের দরজার ছিটকিনি নষ্ট। টেনে ভেজালেও ফাঁক হয়ে থাকে। ২৫ ওয়াটের একটা বাতি আছে। সুইচ টিপে সামান্য পরিমাণ বিরক্ত হলেন অবিনাশ চক্রবর্তী। বাতি জ্বলল না। ফিউজ হয়ে গেছে। কী বাল্ব বানায় এখন! এক বছরের গ্যারান্টি দেয়, যায় বড়জোর আড়াই-তিন মাস। একটা বাল্বের দাম পঁচিশ টাকা। নিজে কিনতে হয়। বছরে চারটা লাগলে পাক্কা এক শ টাকা তাহলে। কম খরচ? বইয়ের ষোলো পৃষ্ঠায় এক ফর্মা। এক ফর্মা প্রুফ দুইবার দেখে দিলে পাওয়া যায় এক শ টাকা।

 ভেন্টিলেটর আছে, আলো ঢোকে বাথরুমে। কিন্তু মেঘলা আকাশের আলো, কতটুকু আর? মনে হলো সন্ধ্যা নেমেছে বাথরুমে। সন্ধ্যার আলোয় অবিনাশ চক্রবর্তী হাত-মুখ ধুলেন, শেভ হলেন এবং আয়নায় নিজেকে দেখলেন। যতটা দেখা যায়। অবিনাশ চক্রবর্তীই। অবিনাশ চক্রবর্তীই তিনি।

 

বাথরুম থেকে বের হয়ে তার অনুরূপকে দেখলেন না অবিনাশ চক্রবর্তী। চিন্তিত হলেন না। বরং চিন্তামুক্ত হলেন বলা যায়। আপদ গেছে। নাশতাপানি করে ভাবলেন ‘দুই বাংলার ছোটগল্প’ নিয়ে বসবেন। দুই খণ্ড বই। ষাট ফর্মা ষাট ফর্মা এক শ বিশ ফর্মা হবে। তেতাল্লিশ ফর্মা দেখা হয়ে গেছে। কাল রাতে হাসান আজিজুল হকের ‘মন তাঁর শঙ্খিনী’ কেটেছেন। আশা কম্পিউটার্সের সালমা কম্পোজ করেছে। ভুল অত্যন্ত কম। প্রুফ দেখতে গিয়ে আগেও অবিনাশ চক্রবর্তী দুই-একবার পড়েছেন গল্পটা। এবার পড়েও মুগ্ধ থেকেছেন। এমন গল্প এখন আর লেখা হয় না। কীসব হচ্ছে। বছর দুই আগে বইমেলার সময় একটা কবিতার বইয়ের প্রুফ দেখেছিলেন। হাসপাতালের নার্সকে নিয়ে প্রেমের কবিতা লিখেছেন কবি। সেই বইয়ে নামও আবার দিয়েছেন, ‘নার্স, আমি ঘুমোইনি। ’ কাণ্ড!

বৃষ্টি নামল সকাল ১১টা ১০-এ। আলস্য ধরল অবিনাশ চক্রবর্তীকে। পাতলা একটা কাঁথা তার আছে। অঙ্কি...নওশেবার স্মৃতিবিজড়িত। শুয়ে পড়লেন সেই কাঁথা মুড়ি দিয়ে। রুমের জানালা খুলে দিয়েছেন। স্নানের সময় না এখন শত্রুসম্পত্তির মেয়ে-মহিলাদের। ভালো বৃষ্টি। ছাঁট আসছে রুমে। আসুক। এমন বৃষ্টি কাল রাতেও হয়েছে। আষাঢ় মাস, এটা বেশ বোঝা যাচ্ছে এবার। আজ কত তারিখ আষাঢ়ের? ১৮? ১৯?...১৮?...১৯?...১৮...১৯...১৮...? আবার ঘুম ধরে গেল অবিনাশ চক্রবর্তীর। রত্নেশ্বরীকে আবার স্বপ্ন দেখবেন ভাবেননি। দেখলেনও না। এবার স্বপ্ন দেখলেন পরিমল রাহাকে। এই পরিমল রাহা বিশিষ্ট ব্যক্তি। সিনেমা, প্যাকেজ নাটক এবং অফিসপাড়ার নাটকের মেকআপম্যান। বিস্তর অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ মানুষ। স্বপ্নে তার মুণ্ডুটা একটা ধামার মতো বড় দেখাল। চোখ বড় বড়, দাঁত বড় বড়। বললেন, ‘মাউড়াগো কথা হুনছেন, দাদা? আমার এক ফ্রেন্ডের ফ্রেন্ড আছে মাউড়া। একদিন গেছি ওগো বাড়িতে। মাউড়ার পো মাউড়া খায় কি কাঁকড়া! এই এত্তা বড় সাইজের কাঁকড়া। পিচ্চি মাউড়ার পো কয় কি, হুনবেন? হামভি খায়েঙ্গা। আমারেও দিছে তো পিলেটে, দেখছে। কয় কি, হামভি খায়েঙ্গা। ’

এটা একটা বাস্তব ঘটনা।

রিপিট হলো স্বপ্নে।

টানা আধঘণ্টা হয়ে বৃষ্টি ধরল। অবিনাশ চক্রবর্তী গাঢ় গভীর ঘুমে তলিয়ে থাকলেন।

 

কিছুদিন আগে পত্রিকায় এক সাংসদের কীর্তি ছাপা হয়েছে। সাংসদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললেই তাকে ধরে ন্যাড়া করে দেওয়া হচ্ছে। বিবস্ত্র করে ফেলার ঘটনাও ঘটছে। সাংসদের সেবামূলক প্রতিষ্ঠান ‘এলনর’ থেকে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।

কোথাও নেমে যাচ্ছে মানুষজন!

নম্বর রুম ১৩ কি এলনর?

জুলেখা বোর্ডিংয়ের ১৩ নম্বর রুম?

অতটা বললে সত্য বলা হবে না। তেমন নয় আসলে ব্যাপারটা। ঠ্যাটা ফকরুর কার্যালয় ১৩। কেউ না কেউ থাকে দিনমান। ঠ্যাটা ফকরু সব সময় থাকে না। এখন আছে। মামুইন্যা ও পাভেলও আছে। মামুইন্যা তার স্মার্টফোনে কয়েকটা নতুন ভিডিওক্লিপ ডাউনলোড করেছে। দেখাচ্ছে ঠ্যাটা ফকরু ও পাভেলকে। তিনজনই খ্যা খ্যা করে হাসছে। বোর্ডিংয়ের ম্যানেজার আবু আক্কাস এই ঘটনায় খুবই বিরক্ত হচ্ছেন। আজ আষাঢ়ের ১৯ তারিখ। অতি বাজে একটা খোয়াব দেখে আজ ঘুম থেকে উঠেছেন মানুষটা। এতক্ষণ ফুরসত পাননি। এইমাত্র আদি ও আসল সোলেমানি খাবনামা ও ফালনামা খুলেছেন। এই বইটা সব সময় মজুদ থাকে তার ড্রয়ারে।

‘চাঁদের ৬, ৮, ৯, ১৬, ১৮, ১৯, ২৬, ২৭ এবং ৩০ তারিখের স্বপ্ন প্রায় সবই সত্য হয়ে থাকে। ’ ‘খাবনামা’য় লিখেছে। তার মানে সত্যি হবে আবু আক্কাসের দেখা স্বপ্নটা? তাবির কী এই স্বপ্নের? খাবনামায় পাচ্ছেন না আবু আক্কাস। ঠ্যাটা ফকরুদের খ্যা খ্যার যন্ত্রণায় মনোযোগ দিয়ে খুঁজতেও পারছেন না। ঠ্যাটার পো ঠ্যাটা। জুলেখা বোর্ডিং বাপের জমিদারি তোর। বাপ তো সিটি করপোরেশনের ৩০০ টাকা বেতনের ঝাড়ুদার ছিল। তার ছেলে হয়েছে ‘ভাই!’ মরবে একদিন। এরা বাঁচে না। গুল্লি খায়ে একদিন পড়ে থাকে গল্লিতে।

 

সব ক্লিপ দুইবার করে দেখা হয়ে গেছে। এখন ঠ্যাটা ফকরু একা দেখছে এবং কথা বলছে পাভেল, মামুইন্যার সঙ্গে।

‘পাভেল রে?’

‘ভাই। ’

 ‘সেভেন স্টার গাইডের বদরুল আলম ভাইয়ের বিষয়টা কী ক তো? গাইড বইয়ের ব্যবসা করব, কোটি কোটি টাকা ইনকাম করব, আমগোরে কিছু দিব না?’

‘দিব ভাই। বদরুল আলম ভাই তো আপনেরে নিয়া সামান্য খানাপিনা করতে চান একদিন। ’

‘চায় যদি ব্যবস্থা করতে বল। ’

‘আপনের পারমিশন ছাড়া তো ভাই আমি কিছু বলতে পারি না। ’

‘পারমিশন দিলাম। দাওয়াত দিতে বল। ’

‘ওয়েস্টিনে, ভাই?’

‘না, সল্টে। ’

‘আমি কথা বলতেছি, ভাই। ’

‘মামুইন্যা?’

‘ভাই!

‘তোর কেইস কী? রুমারে কি বিয়া করবি তুই?’

‘জি, ভাই। ’

‘তোর মাথা খারাপ আছে, বুঝছস। এই মেয়ে হইল পলান্তি স্বভাবের। আবার পলাব। কসাই লিটনের লগে পলাইছিল না? নয় দিন থাকছিল। তুই বিয়া করলেই দেখবি কুত্তা লিটনের লগে পলাব। তার লগে উনিশ দিন থাকব। ’

‘আমি থাকতে দিমু না, ভাই। ’

‘এই ব্যাটা! ধান্দা কী তোর? যদি পলায় তুই কী করবি? মার্ডার করবিনি রুমানা খাতুনরে?’

দরজার দিকে মুখ করে বসেছে, অবিনাশ চক্রবর্তীকে দেখল ঠ্যাটা ফকরু। বগলে ছাতা আর কাগজপত্রের বান্ডেল নিয়ে বের হয়ে যাচ্ছেন। এই মানুষটাকে অজ্ঞাত কারণে পছন্দ করে ঠ্যাটা ফকরু। আলাভোলা নিরীহ কিসিমের মানুষ।

ঠ্যাটা ফকরু ডাক দিল, ‘কাকা। ’

অবিনাশ চক্রবর্তী ঘুরলেন, তাকালেন।

ঠ্যাটা ফকরু বলল, ‘আদাব কাকা। ’

 ‘আদাব, বাবা। ’

বলে অবিনাশ চক্রবর্তী দাঁড়িয়ে থাকলেন। মনে হলো ঠ্যাটা ফকরুকে দেখতে পাচ্ছেন না। আট-দশ হাত দূরত্ব থেকে দেখতে পাচ্ছেন না। চোখে সমস্যা আছে মানুষটার। ঠ্যাটা ফকরু ভাবল ভড়কে দেবে নাকি? ক্লিপগুলো দেখাবে কাকাকে? কাকা কি এইসব জিনিস কখনো দেখেছেন?

‘কাকা, কিছু কইবেন?’

‘বলব, বাবা।

‘কী কথা কইবেন, কাকা? কন। ’

১৩ নম্বর কার্যালয় থেকে বের হয়ে এলো ঠ্যাটা ফকরু।

‘কন তো কাকা, কী কইবেন?’

‘স্ট্রাইকার কী বাবা?’

‘স্ট্রাইকার? ক্যারাম বোর্ডের স্ট্রাইকার?’

‘না, বাবা। ’

‘ফুটবলের স্ট্রাইকার?’

‘না, বাবা। স্ট্রাইকার মুন্না। ’

‘স্ট্রাইকার মুন্না? তারেও আপনি চিনেন নাকি কাকা?’

‘চিনি না, বাবা। সে ঘোরাঘুরি করতেছে এদিকে। ’

‘কে? স্ট্রাইকার মুন্না? আপনেরে কে কইল, কাকা? স্ট্রাইকার মুন্না তো এখন ইন্ডিয়ায়। সাদ্দার ইস্ট্রিটের গ্রিন ইনে আছে। গ্রিন ইন হোটেল। বারো শ তিন নম্বর রুমে আছে। ’

‘না বাবা, দেশে ফিরছে সে। ভোররাতে ঢাকা শহরে নামছে। লোডেড একটা মেশিন নিয়া ঘুরতেছে। উজি। ’

স্ট্রাইকার। লোডেড। মেশিন। উজি। মানুষটার মুখে এত বেমানান, কিন্তু কিছু বলল না ঠ্যাটা ফকরু। অবিনাশ চক্রবর্তী নিচু গলায় বললেন, ‘রক্তপাত দেখতেছি, বাবা। ’

‘জি, কাকা?’

‘সাবধানে থাকা ভালো, বাবা। সাবধানের মার নাই বলে। ’

‘জি, কাকা। সাবধানে থাকব। ’

অবিনাশ চক্রবর্তী বোর্ডিং থেকে বের হয়ে গেলেন।

কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে কী চিন্তা করে ঠ্যাটা ফকরু কল দিল একটা নাম্বারে, ‘হ্যালো?’

‘স্লামালিকুম, ভাই। ’

‘ওয়ালিকুম সালাম। নান্নামুন্না ঢাকায় ল্যান্ড করছে শুনলাম?’

‘কইত্থে, ভাই? বর্ডার ক্রস করলেই তো বিজিবি তারে ধরব। আজকেও নিউজ করছে, দেখছেন পত্রিকায়?’

‘দেখছি। ’

‘সাংবাদিকের মেয়ে মার্ডার করছে, ভাই। জিন্দেগিতে আর কুনুদিন দেশে ফিরতে পারব না হালায়। ’

‘তবুও বুঝছস, তুই একটা খবর নিয়া দেখ। ’

‘জি, ভাই। ’

‘খবর নিয়া কল দিবি না আমারে, এসএমএস করবি। ’

‘জি, ভাই। ’

কিছুটা অন্যমনস্ক চেহারা নিয়ে আবার ১৩ নম্বরে ঢুকল ঠ্যাটা ফকরু।

মামুইন্যা বলল, ‘ভাই, কিছু হইছে?’

‘না। ’

‘আপনেরে টেনশনড দেখতেছি, ভাই?’

পাভেল বলল।

টেনশনড। হেসে ফেলল ঠ্যাটা ফকরু। হালকা হয়ে গেল পরিবেশ। এসএমএস এলো।

Fireni, BHAI

নিশ্চিন্ত। ছোট একটা খটকা অবশ্য থাকল। প্রুফ রিডার অবিনাশ চক্রবর্তী মানুষটা কোত্থেকে এত ইনফরমেশন পেলেন? এ নিয়ে পরে একবার কথা বলতে হবে মানুষটার সঙ্গে। তারপর মামুইন্যা, পাভেলের সঙ্গে ডিসকাস করা যাবে কিছু। এখন বললে ভয় পেয়ে যাবে তারা। স্ট্রাইকার মুন্না সহজ জিনিস না।

আবু আক্কাস অবশেষে তার স্বপ্নের তাবির খুঁজে পেয়েছেন। বলেছিলেন না, হতেই পারে না। খাবনামায় তাবির লেখা নেই এমন স্বপ্ন দেখতে পারে নাকি মানুষ? তার দেখা স্বপ্নের তাবির হলো, পুত্রলাভ হবে।

এই বয়সে পুত্রলাভ হবে! সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা তো আর এক ফোঁটাও নাই জাহান আরা বেগমের। শরীর, বয়স সব গেছে। তাহলে কী হবে তাবিরের? আদি ও আসল খাবনামা ও ফালনামা বানোয়াট জিনিস না। তবে?

১১টা ৪০-এ জুলেখা বোর্ডিংয়ে ফায়ারিংয়ের ঘটনা ঘটল। গুলিবিদ্ধ হলো মামুইন্যা। কানের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া গুলি অল্পের জন্য লাগল না ঠ্যাটা ফকরুর। পালাতে গিয়ে মাটিতে পিছলা খেয়ে পড়ে গেল স্ট্রাইকার মুন্না। র‌্যাব তাকে ধরল উজি পিস্তলসহ।

ন্যাশনাল মেডিক্যাল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে মামুইন্যার জ্ঞান ফিরল চল্লিশ মিনিট পর। আতঙ্কে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল সে। না হলে বিশেষ কিছু হয়নি। তার পায়ে গুলি লেগেছে। লেগেছে মানে পিছলে বের হয়ে গেছে। ব্যান্ডেজ করে দিয়েছেন ডাক্তার। র‌্যাব প্রহরায় সে আছে কেবিনে।

জুলেখা বোর্ডিংয়ের ১৩ নম্বর রুম সিলগালা করে রেখে গেছে র‌্যাব।

ঘটনার পরই ঠ্যাটা ফকরু ও পাভেল উধাও হয়ে গিয়েছিল। এখন তারা আছে গেণ্ডারিয়ায়। গেণ্ডারিয়া রেললাইনের ধারের বস্তিতে। মারফিয়ার ঘরে। মারফিয়া মাদকসম্রাজ্ঞী। কিছুদিন আগে জেল খেটে ফিরেছে। তৃতীয়বারের মতো জেলে গিয়েছিল।

কাঠের পাটাতনের ওপর ঘরদোর। নিচে জলা। কালো রঙের খাল। ঠ্যাটা ফকরু শুয়ে আছে পাটাতনে, পাভেল বসে মাছির ওড়াউড়ি দেখছে। নীল রঙের মাছি। মারফিয়া সরঞ্জাম নিয়ে বসেছে। মামাদের জন্য ‘ইস্পেশাল’ বানাবে।

ঠ্যাটা ফকরু বলল, ‘পাভেল। ’

ঘটনার পর ঠ্যাটা ফকরু এই প্রথম কথা বলল।

পাভেল বলল, ‘ভাই?’

‘কাকার নম্বর আছে তোর ফোনে?’

‘কাকা, ভাই?’

‘আরে, ২১ নম্বর রুমের প্রুফ রিডার কাকা। ’

‘না ভাই। তার নম্বর দিয়া কী করবেন? জোগাড় করব?’

‘কর। ’

আশা কম্পিউটার্সের মণিকে কল দিল পাভেল। অবিনাশ চক্রবর্তীর ফোন নম্বর নিল। মণির এক খালা পাভেলের ভাবি।

নাম্বার পেয়ে ঠ্যাটা ফকরু নিজে কল দিল অবিনাশ চক্রবর্তীকে।

অবিনাশ চক্রবর্তীর ফোন বন্ধ।

‘মিনজুরে একটা কল দে তো। ’

‘কী কমু, ভাই?’

‘কাকারে পায় কি না দেখ। পাইলে য্যান তোরে বা আমারে কল দেয়। ’

মিনজুকে নির্দেশ দিয়ে দিল মামুইন্যা। মিনজু বাংলাবাজার এলাকার গ্যাজেট। ঠিক বের করে ফেলবে অবিনাশ চক্রবর্তীকে। মানুষটা তো এমন না যে লুকিয়ে আছেন গোপন কোনো জায়গায়। বাংলাবাজারের কোনো দোকানেই আছেন।

অনুমান সঠিক।

বাংলাবাজারের নীহার মার্কেটের দোতলায় বসে আছেন অবিনাশ চক্রবর্তী। ২০০৮ নম্বর দোকানে। ‘কথাকলি’ প্রকাশনা সংস্থার প্রোপ্রাইটার কবিরুল বাশার সাহেবের চেম্বার এটা। কাঁচুমাচু হয়ে মানুষটার সামনে বসে আছেন অবিনাশ চক্রবর্তী। ইনি কোনজন? জুলেখা বোর্ডিংয়ের ২১ নম্বর রুমে এখন ঘুমিয়ে আছেন কোন অবিনাশ চক্রবর্তী?

কথাকলি প্রকাশনা সংস্থায় বসে আছেন যে অবিনাশ চক্রবর্তী, বোর্ডিং থেকে বেরিয়েই ইনি রিকশা পেয়ে গিয়েছিলেন।

‘যাবারে ভাই?’

‘কই যাইবেন, কাকা?’

‘বাংলাবাজার। পোস্টাফিসের কাছে। ’

‘যাব। উঠেন। ’

‘কত নিবারে ভাই?’

‘বিষ্টি-বাদলার দিন, বিশ ট্যাকা দিয়েন কাকা। ’

‘বিশ টাকা! কও কি রে ভাই? দশ টাকা দিয়া যাই রোজবেলা। ’

‘পনরো ট্যাকা দিয়েন। ’

‘নারে ভাই। বারো টাকা দিমু। যাইবা? গেলে লও। ’

‘উঠেন। ’

রিকশায় উঠে বিপদ। পানি জমে গেছে রাস্তায়। জ্যাম বাংলাবাজার থেকে বের হয়ে কোর্ট-কাছারি পার হয়ে গেছে। ভিক্টোরিয়া পার্কের উল্টোদিকে, পেট্রল পাম্পের কাছে নেমে যেতে হলো। অবিনাশ চক্রবর্তী পনেরো টাকাই দিয়ে দিলেন রিকশাঅলাকে। হেঁটে বাংলাবাজার যেতে গিয়ে প্যান্টের বারোটা বাজল। রাস্তার পানি অত্যন্ত নোংরা। এটা-ওটা ভাসছে। লাল রঙের এক পাটি লেডিস স্যান্ডেল চোখে পড়ল অবিনাশ চক্রবর্তীর। ভেসে যাচ্ছে।

বাংলাবাজার বইয়ের দোকানের বাজার। বই, বই আর বইয়ের রাজত্ব। চিরন্তনী প্রকাশনার অফিসে যাবেন বলে নীহার মার্কেটে উঠেছিলেন অবিনাশ চক্রবর্তী। চিরন্তনীর অফিস মার্কেটের চারতলায়। ধরা খেলেন সিঁড়িতে। তিনতলায় উঠে যাচ্ছিলেন। কবিরুল বাশার সাহেবের পিয়ন সুলেমান ধরল, ‘সায়েবে আপনেরে বুলায়। ’

কবিরুল বাশার সাহেব মানুষটা ভালো। কানে খাটো একটু। কথা বলেন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে। বললেন, ‘কী বাবু, আপনার কী খবর?’

অবিনাশ চক্রবর্তী বললেন, ‘ভালো, বাশার ভাই। ভালো ভালো। ’

‘কী? ভালো?’

‘হ্যাঁ, ভালো। ’

‘ভালো? অ। সুলেমান, চা নিয়া আয়। ক্যাফে কর্নারে যা। চা আর কিছু আনাব?’

‘না, না, বাশার ভাই, কিছু না, কিছু না। ’

‘কী বলেন? ক্রাম চপ আনাই। ক্রাম চপ খান। নাকি কাটলেট, কাটলেট আনাব?

‘না, বাশার ভাই, কিছু লাগব না, চা আনান খালি। এক কাপ চা হইলেই চলব। ’

‘কী বলেন বিড়বিড় করে? জোরে বলেন। ’

‘বলছি শুধু চা হইলেই চলব। চা, বাশার ভাই। এক কাপ চা। ’

 ‘কেন, আপনার সমস্যা কী?’

‘সমস্যা কিছু না। কিছু না। কিছু না। ’

‘তাইলে চুপ করে বসে থাকেন। ক্রাম চপ খাবেন, কাটলেটও খাবেন। সুলেমান, দুইটা ক্রাম চপ, দুইটা কাটলেট আর বিশ টাকার চা নিয়া আয়। ’

টাকা নিয়ে নিচে নেমে গেল সুলেমান।

কবিরুল বাশার বইয়ের র‌্যাক থেকে একটা বান্ডেল নিলেন কাগজের। কোনো বইয়ের প্রুফ। বললেন, ‘এই দেখেন। বারো পয়েন্টে দশ ফর্মা। চোখ ঠিক আছে তো আপনার? পাওয়ার কি বাড়ছে?’

‘না, বাশার ভাই। পাওয়ার বাড়ে নাই, কমেও নাই। ’

‘চিন্তার কথা। চোখ দেখান। এখন বলেন, এই প্রুফটা কি আমারে একটু তাড়াতাড়ি দেখে দিতে পারবেন?’

‘পারব, বাশার ভাই। পারব। পারব। ’

‘হ্যাঁ। সামনের মাসের ১১ তারিখ লেখকের জন্মদিন তো, সেইদিন প্রকাশ করব আর কি বইটা। আজ কী বার? বিষ্যুদবার। শুক্র, শনি, রবি, সোম... সোমবারে দিয়া দিতে পারবেন না?’

‘পারব, বাশার ভাই। পারব। পারব। ’

‘হ্যাঁ। আমি তো জানি আপনি দিগদারি করবেন না। টাকা যদি লাগে নিয়া যান। কত দিব?’

‘টাকা? পরে। পরে, বাশার ভাই! সোমবারে নেব। সোমবারে। ’

‘কেন? এখন নিতে কী সমস্যা আপনার? কাজটা তো আপনি করবেন? নাকি করবেন না? টাকাটা আমার দিতে হবে? নাকি হবে না? সুলেমান, একটা এনভেলাপ দে। ’

পাঁচ শ টাকার দুটো নোট একটা এনভেলাপে ভরে দিয়ে দিলেন কবিরুল বাশার সাহেব। বনেদি প্রকাশক। এদের কাজ করে শান্তি।

চারতলায় উঠে অবিনাশ চক্রবর্তী দেখলেন ‘চিরন্তনী’ বন্ধ হয়ে আছে। অথচ কাল রাতেই ফোনে ‘চিরন্তনী’র মীর বকুলের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। অল্প কটা টাকা পাওনা। দুই বছর ধরে ঘোরাচ্ছে। চাইলে দুই শ তিন শ করে টাকা দেয়। একবার এক শ টাকাও দিয়েছে। কিচক! আজ শেষ আট শ টাকা দিয়ে দেওয়ার কথা।

কল দিলেন অবিনাশ চক্রবর্তী।

কল যাচ্ছে।

মীর বকুল ধরল, ‘আদাব, দাদা। ’

অবিনাশ চক্রবর্তী বললেন, ‘আদাব। বকুল সাহেব?’

‘জি দাদা, বলেন!’

‘এইটা কী ধরনের সভ্যতা বলেন তো, ভাই? কাল রাতে আপনি এভাবে বললেন... !’

‘বলছিলাম দাদা, কী করব বলেন? অ্যাক্সিডেন্ট করছি সকালে। হাসপাতালে আছি। বিশ্বাস করেন দাদা, পঙ্গু হাসপাতালের সাতশ আট নম্বর বেডে আছি। আপনি কি আমারে দেখতে আসবেন, দাদা?’

অবিনাশ চক্রবর্তী শান্ত গলায় বললেন, ‘আপনি এখনো অ্যাক্সিডেন্ট করেন নাই, ভাই। অ্যাক্সিডেন্ট করবেন। পঙ্গু হাসপাতালে দুই মাস থাকবেন। আমি অবশ্যই দেখতে যাব আপনারে। আড়াইশ গ্রাম আঙুর নিয়া যাব। ’

‘কী বললেন! কী বললেন আপনি?’

লাইন কেটে দিলেন অবিনাশ চক্রবর্তী। সামান্য হাসলেন। নীহার মার্কেট থেকে নামলেন এবং সাইফুল্লাহ মার্কেটে উঠলেন। মতি বাবুর সঙ্গে দেখা করে যাবেন। মতি বাবু বসেন দোতলায়। বিপত্তি ঘটল এই মার্কেটেও। রাব্বানী বুক হাউসের গোলাম রাব্বানী আটকালেন অবিনাশ চক্রবর্তীকে। সব প্রকাশক ‘কথাকলি’র কবিরুল বাশার সাহেব না। গোলাম রাব্বানী মানুষটাকে একদম পছন্দ করেন না অবিনাশ চক্রবর্তী। বয়স বায়ান্ন-চুয়ান্ন হবে। অতি ফাজিল প্রকৃতির মানুষ। সব সময় মুখে আকথা-কুকথা। সারা দিন দোকানে বসে মাছি তাড়ান না। ফোনে কথা বলেন মেয়েদের সঙ্গে। সেও আকথা-কুকথা। শুনলে কান গরম হয়ে যায়।

‘কেমন আছেন বলেন, অবিনাশ বাবু? দিনকাল কেমন কাটতেছে?’

দুর্মুখ শব্দ আছে। কুমুখ কি আছে?

কুমুখ গোলাম রাব্বানী বললেন, ‘কী-ই-ই?’

অবিনাশ চক্রবর্তী বললেন, ‘এই তো, রাব্বানী সাহেব। ’

‘এই তো রাব্বানী সাহেব আবার কেমন কথা মিয়া? এই তো দিয়া কী বোঝা যায়? আপনে ভালো আছেন, না মন্দ?’

‘ভালো আছি, ভাই। ভালো আছি। ’

‘চা খাইবেন?’

‘নারে ভাই। চা না। চা না। আমি উঠি। কাজ আছে ভাই, আমি উঠি। ’

‘আরে, এত তাড়া কিসের মিয়া? জানি তো মতি বাবুর দোকানে যাইবেন। বসেন দুই মিনিট। ঘটনা কী খুইল্লা বলেন তো?’

তাকালেন অবিনাশ চক্রবর্তী।

গোলাম রাব্বানী ফিসফিস করে বললেন, ‘কী কথা শুনি মার্কেটে?’

‘কিসের কথা, রাব্বানী সাহেব?’

‘আরে মিয়া! আমগোরে তো কিছু বলেন না। আমরা কি খবর রাখি না বলেন?’

‘রাব্বানী সাহেব, আমি ঠিক বুঝতে পারতেছি না, মানে...। ’

‘ক্যান মিয়া? আপনে কি বিয়া করতেছেন না?’

‘বিয়া! কে বলল?’

‘বিবিসিতে বলল। হেঁ! হেঁ! হেঁ! আপনের মতো একটা ওউল্ডম্যান বিয়া করব, বিবিসিতে সেই নিউজ বলব না? আমি নিজের কানে শুনছি মিয়া। কচি একটা মেয়ে নাকি পাইছেন। তাঁতীবাজারের কোন স্বর্ণকারের মেয়ে। খুইল্লা বলেন না। আমি কি আর এরে-তারে বলব?’

‘এইসবের কোনো সত্যতা নাই, ভাই। আমি বিয়া করতেছি না। করব না। ’

‘বিয়া করবেন না ক্যান? সমস্যা কী? প্রাইভেট সমস্যা? হেঁ! হেঁ! হেঁ! প্রাইভেট সমস্যা থাকলে আমারে বলেন। কত রকম হারবাল ওষুধ আছে, মিয়া! শক্তিপ্রাস, হর্স পাওয়ার ট্যাবলেট, ডাইনোসর মার্কা ম্যাসাজের তেল, মনে করেন যেইটা আপনের দরকার। ’

‘সেই রকম কিছু নারে, ভাই!’

‘তাইলে আবার কী রকম, মিয়া? আইচ্ছা, একটা কথা বলেন তো। আপনে তো বোর্ডিংয়ে থাকেন। বোর্ডিংয়ে ডাবল রুম আছে?

‘দেখেন রাব্বানী সাহেব, আপনেরে কিন্তু আমি বলছি, বিয়া করব না। ’

‘করবেন না ক্যান, এইটা তো বলেন। শেষ বয়সে কে দেখব আপনেরে? কেউ আছে? এক পা তো এইদিকে গিয়া ঠেকছে কব্বরে। কব্বরে তো না, কী বলে না, আপনেগো চিতায়। হরিবোল হরিবোল দিয়া নিয়া যাব কোনদিন। বরং আমি কী বলি শুনেন, সময় থাকতে বিয়াটা করেন। পরে পস্তাইবেন। তখন কিন্তু আর বলতে পারবেন না, গোলাম রাব্বানী আগে আপনেরে বিয়া করার কথা বলে নাই। ’

‘বলব না, রাব্বানী সাহেব। আমি উঠি। ’

‘আরে! আরে! চেতেন ক্যান, মিয়া? বসেন, একটা জিনিস দেখাই। আকবররে তো চিনেন, নাকি?’

‘আকবর?’

‘আরে, বাহারিস্তান প্রকাশনীর সেলসম্যান আকবর। ’

‘চিনি না। ’

‘না চিনলেও অসুবিধা নাই। সে কী ঘটাইছে দেখেন?’

অস্বস্তি বোধ করলেন অবিনাশ চক্রবর্তী। বুঝতে পারছেন ঘটনা কোন দিকে যাচ্ছে। অত্যন্ত দামি তার মোবাইল ফোন সেটটা হাতে নিয়েছেন গোলাম রাব্বানী। এক চোখ টিপে বললেন, ‘ইশকুলের মেয়ে, বুঝছেন? এই দেখেন। ’

এর আগেও এ রকম হয়েছে। অবিনাশ চক্রবর্তীকে জোরজার করে এসব অশ্লীল ভিডিও ক্লিপ দেখানোর সর্বতো চেষ্টা করেছেন গোলাম রাব্বানী। অবিনাশ চক্রবর্তী কখনো দেখেননি। এখন দেখলেন। গোলাম রাব্বানী সাহেবের দামি মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে দেখলেন। গোলাম রাব্বানীর গোল গোল দুই চোখ আরো গোল গোল হয়ে উঠল এবং খুবই চকচক করতে থাকল। কতক্ষণ দেখলেন অবিনাশ চক্রবর্তী? চার-ছয় সেকেন্ড। দেখে বললেন, ‘আকবর কই, রাব্বানী সাহেব। এইটা তো দেখি আপনে মিয়া। কার লগে ভিডিও করছেন?’

‘কী? কী?’

মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে দেখলেন গোলাম রাব্বানী। বেগুনি হয়ে গেল তার কালো মুখটা। চোয়াল ঝুলে পড়ল। ভিডিও ক্লিপটা তার এবং তার স্ত্রী নাজমার। কে ভিডিও করল? কখন করল? তার ফোনে এলো কী করে ক্লিপটা?

অবিনাশ চক্রবর্তী বললেন, ‘রাব্বানী সাহেব, আমি উঠি। ’

আজব কাণ্ড করলেন গোলাম রাব্বানী। চেয়ার ছেড়ে উঠে আচমকা পা জড়িয়ে ধরলেন অবিনাশ চক্রবর্তীর। অবিনাশ চক্রবর্তী বললেন, ‘এ কী! এ কী!’

‘বিশ্বাস করেন অবিনাশ বাবু, এইটা অ্যাক্সিডেন্ট! একটা অ্যাক্সিডেন্ট! বিশ্বাস করেন। আপনি কাউরে বললে বুঝছেন তো, আমার মান-ইজ্জত কিছু থাকব না। আপনের লগে আমি কোনোদিন আর ঠাট্টা-মশকরা করব না, কসম। ’

‘ঠাট্টা-মশকরা করবেন না কেন? অবশ্যই করবেন। নিশ্চিন্ত থাকেন রাব্বানী সাহেব, আমি কাউরে কিছু বলব না। এ ছাড়া আমি যা দেখছি ভুলও তো হইতে পারে। আরেকবার প্লে দিয়া দেখেন তো। ’

‘না না, দরকার নাই। দরকার নাই, অবিনাশ বাবু। আপনি মতি বাবুর দোকানে যাইবেন তো? ঠিক আছে, আপনারে আর আটকাই না, বুঝছেন? ঠিক আছে, অবিনাশ বাবু?’

‘ঠিক আছে, রাব্বানী সাহেব। ’

অবিনাশ চক্রবর্তী উঠলেন।

গোলাম রাব্বানী দোকান বন্ধ করে দিলেন। দ্রুত নিচে নেমে রিকশা নিয়ে বাসার উদ্দেশে রওনা হলেন। এ সময় আবার বৃষ্টি শুরু হলো। ঝুপ ঝুপ বৃষ্টি।

গোলাম রাব্বানী থাকেন মানিকনগরে। বাংলাবাজার থেকে দূর আছে। যানজটে পড়লেন কোর্ট-কাছারির আগেই। এক মিনিট দুই মিনিট... দশ মিনিট... বিশ মিনিট...। ফোন বাজল।

ঘঅতগঅ

ঈধষষরহম

‘হ্যাঁ, বলো। ’

‘কই তুমি?’

‘বাসায় ফিরতেছি। ’

আহ্লাদি হলো নাজমার কণ্ঠস্বর, ‘আসো জলদি। টুইংকলরে বড় আপার ঘরে দিয়া আসছি। ’

দারোগা বাপের বানানো চারতলা বিল্ডিং। দুটো করে ফ্ল্যাট পেয়েছেন নাইমা, নাসিমা ও নাজমা। তিন বোন। একতলায় একটা এনজিওর অফিস। দুইতলা নাজমার বড় আপা নাইমার, তিনতলা মেজো আপা নাসিমা, চারতলা নাজমা ও গোলাম রাব্বানীর। টুইংকল নাজমা ও গোলাম রাব্বানীর একমাত্র মেয়ে। তিনে পড়বে সামনের ১৯ আগস্টে। টরটর করে দুনিয়ার কথা বলে এখন।

নাজমা বলল, ‘কী হইল? অ্যাই?’

গোলাম রাব্বানী শুকনা গলায় বললেন, ‘আসতেছি। ’

‘হ, আসো!’

নাজমার সঙ্গে কথা বলা কি উচিত হবে বিষয়টা নিয়ে? যেভাবে হোক ঘটনা ঘটে গেছে। কী করা যাবে? আর কেউ দেখেছে?

যানজটে আটকে বারো-তেরোবার সার্চ দিয়ে দেখলেন গোলাম রাব্বানী। মোবাইল ফোন তন্নতন্ন করে দেখলেন। নেই ক্লিপটা। তার ও নাজমার আজব ক্লিপটা।

সাইফুল্লাহ মার্কেটের চারতলায় এদিকে মতিবাবুর ঘরে বসে আছেন অবিনাশ চক্রবর্তী। মতিবাবু—শ্রী মতিলাল দাস। মানুষটা আর্টিস্ট। বইয়ের মলাট আঁকেন। চল্লিশ-বেয়াল্লিশ বছর ধরে আঁকছেন। এককালে খুব রমরমা ছিল। নর্থব্রুক হল রোডে বসতেন। বাংলাবাজারের প্রকাশকদের লাইন থাকত ঘরে। এখন আর সেই রমরমা নেই। যুগ পাল্টেছে। বইয়ের মলাট এখন কম্পিউটারে হয়। প্রকৃত শিল্পীদের কদর কমে যাচ্ছে দিন দিন। তাও টুকটাক কাজ দেয় কেউ কেউ, পুরনো প্রকাশক যাঁরা আছেন। চলে যায় মতি বাবুর। মানুষটা স্নেহ করেন অবিনাশ চক্রবর্তীকে। বাংলাবাজারে অবিনাশ চক্রবর্তীর বর্তমান অবস্থানের পেছনে তার সবিশেষ অবদান আছে। কথা বলে আরাম মানুষটার সঙ্গে। নানা কিছু জানেন। নানা কিছু দেখেছেন। তবিয়ত ঠিক থাকলে মন খোলেন। অবিনাশ চক্রবর্তী একমাত্র এই মানুষটাকে তার ব্যক্তিগত কিছু ঘটনা বলেছেন। রত্নেশ্বরী, নিরূপমার কথা বলেছেন। অঙ্কির ঘটনা দাদা নিজে থেকেই জানেন। দুবেলা প্রচ্ছদের প্রিন্ট দেখতে যেতেন বর্ণমালা প্রিন্টার্সে। আজকের স্বপ্নটার কথা কি তাকে বলা যায়? না। ছিঃ! ছিঃ! কী মনে করবেন মানুষটা?

তিনটা দশ মিনিটে বর্ণবাংলা প্রকাশনার লিয়াকত হোসেন খবর দিলেন মতিবাবুকে। নীহার মার্কেটের ‘চিরন্তনী’ প্রকাশনীর মীর বকুল অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। বাইকে ছিল। দোতলা বাসের সঙ্গে বাড়ি খেয়ে বাইক থেকে ছিটকে ডিভাইডারে পড়েছে। পা দুটো গুঁড়ো হয়ে গেছে মনে হয়। পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

ঠ্যাটা ফকরু ও পাভেল এখনো মারফিয়ার ঘরে অবস্থান করছে। চোখ লাল এখন দুজনেরই। মারফিয়ারও। একটা ছিলিম শেষ করেছে তিনজন। নেশার লাটিম ছিম ধরে গেছে। এমন ঝিমের মধ্যে মিনজু কল দিল।

‘ভাই। ’

‘বল। ’

‘উনি তো বাংলাবাজারে আসেন নাই আইজকা। নীহার মার্কেট, সাইফুল্লাহ মার্কেটে দেখছি। কোনোখানে নাই। ’

‘অ। ঠিক আছে। ’

‘প্রোবলেম, ভাই?’

‘প্রোবলেম? না, ঠিক আছে। ’

ফোনের লাইন কেটে দিয়ে ঠ্যাটা ফকরু হাসল।

পাভেল বলল, ‘ভাই! ভাই! ভাই!’

ঠ্যাঁটা ফকরু হাসল, ‘হেঁ! হেঁ! হেঁ!’

পাভেলও হাসল, ‘হেঁ! হেঁ! হেঁ!’

মারফিয়া বলল, ‘হাসেন ক্যান, মামারা?’

ঠ্যাটা ফকরু বলল, ‘তুইও হাস। ’

মারফিয়া হাসবে?

ঠিক আছে, হাসল। হি! হি! হি!

সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি,

সারা দিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি।

সকাল না, সন্ধ্যায় ঘুম থেকে ‘উঠিয়া’ এই কবিতাটা মনে পড়ল অবিনাশ চক্রবর্তীর। লোডশেডিং বলে বোর্ডিং অন্ধকার। বৃষ্টি কি ধরেনি আর? এখনো হচ্ছে।

জানালা খোলা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন।

বৃষ্টির ছাঁটে রুম মেঘলা হয়ে আছে।

মেঝেতে বৃষ্টি, চেয়ারে বৃষ্টি।

জানালা কি বন্ধ করে দেবেন?

উঠে জানালা দিয়ে যা দেখলেন, সেটা খানিকটা হতাশ হওয়ার মতো। এই ঘটনা কখন ঘটল? শত্রুসম্পত্তি ঘোষিত ঘরদোরে তো মেরামতের জন্য হাত দেওয়া যায় না। পারমিশন লাগে। এরা কি পারমিশন নিয়েছে? কলপাড় ঘিরে দিয়েছে। এটা কখন করল? দুপুরে তো দেখেননি। নাকি তখন খেয়াল করেননি? এমনিও ব্যস্ততার কারণে কিছুদিন ধরে দুপুরে বোর্ডিংয়ে থাকা হচ্ছে না। এর মধ্যে এই কাণ্ড হয়ে গেল। আর কিছু দেখা যাবে না!

লোডশেডিং কখন হয়েছে? কতক্ষণ থাকবে?

মোম আছে রুমে।

জ্বালাবেন?

না।

অবিনাশ চক্রবর্তী শুয়ে থাকলেন আবার। জানালা আর বন্ধ করলেন না। কী হবে আর। বৃষ্টি অল্প ধরেছে মনে হয়।

যন্ত্রণা! রত্নেশ্বরীর কথা মনে পড়ল এবং স্বপ্নটা মনে পড়ল আবার।

‘তুমি ল্যাংটা। ’

কল দেবেন নাকি রত্নেশ্বরীকে?

দিলেন।

রত্নেশ্বরী না, ঠিকাদার ধরল।

‘নমস্কার, দাদা। ’

‘নমস্কার, প্রদ্যুৎ বাবু। কেমন আছেন আপনি?’

‘আছি, দাদা। ভগবান রাখছেন। আপনের বইনের তো পেট খারাপ। ’

রত্নেশ্বরী! বোন! তার পেট খারাপ!

দুর!

 অত্যন্ত হতাশ অবিনাশ চক্রবর্তী কল দিলেন সান্ত্বনা ভাবিকে।

‘কেউ আছে, ভাবি?’

‘কারে আপনের দরকার, দাদা? হি! হি! হি! সোনিয়া আছে, প্রিয়াংকা আছে, সুমাইয়া আছে। ’

‘মম নাই?’

‘মমরে দরকার? হি! হি! হি! আছে, আছে, মমও আছে। ’

‘আসতেছি, ভাবি। ’

‘আসেন। শোনেন—। ’

‘হ্যাঁ, ভাবি?’

‘মমরে যদি না পাই?’

‘ভাবি, এই না বললেন সে আছে। ’

‘আছে তো বাসায়। বৃষ্টি-বাদলার দিন। না আসে যদি। ’

‘ফোন দিয়া দেখেন, ভাবি। ’

‘ক্যান? মম ছাড়া কাউরে পছন্দ হয় না? আমারে পছন্দ হয় না? হি! হি! হি! আসেন। মমরে খবর দিতেছি। ’

বেরোবেন এই সময় ফোন বাজল।

আননোন নাম্বার।

ধরলেন, ‘হ্যালো?’

‘কাকা, আমি ফকরু। ’

‘কে?’

‘আমি ফকরু, কাকা। ঠ্যাটা ফকরু। ’

‘বলেন, বাবা। ’

‘আপনে কাকা মানুষ না, সাধু। ’ বলে তাজ্জব, হাউমাউ করে কেঁদে উঠল ঠ্যাটা ফকরু, ‘আপনে আমার লাইফ সেইভ করছেন...কাকা...লাইফ সেইভ করছেন...। ’

লাইফ সেভ করেছেন ঠ্যাটা ফকরুর? কে? তিনি? কখন?

‘দুপুরে। ’

কে বলল?

সেই অবিনাশ চক্রবর্তী।

বসে আছেন চেয়ারে।

দুই পা উঠিয়ে।

স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

লোডশেডিংজনিত অন্ধকারেও।

অবিনাশ চক্রবর্তীকে ঘটনাসমূহ বললেন মানুষটা। স্ট্রাইকার মুন্না এবং গোলাম রাব্বানীর ঘটনা বললেন।   মীর বকুলের ঘটনা বলে হাসলেন। খিক! খিক! খিক!

জটিল চিন্তার দিকে আর গেলেন না, হাসলেন অরিজিন্যাল অবিনাশ চক্রবর্তীও। খিক! খিক! খিক! তাতে জটিল চিন্তা কি থাকল না? থাকল। তার মতো এই মানুষটা কে?

‘কাহিনি বলব, না সংক্ষেপে বলব?’

মানুষটা বললেন।

অবিনাশ চক্রবর্তী বললেন, ‘সংক্ষেপে শুনি। ’

‘এক লাইনে বলি। হুবহু এই পৃথিবীর মতো আরো পৃথিবী আছে, জানিস?’

‘শুনছিলাম মনে হয়। বিজ্ঞান লেখক সুব্রত বড়ুয়া, সুব্রত দাদা একদিন বলছিলেন। আমাদের এই পৃথিবীর মতো হুবহু অসংখ্য পৃথিবী নাকি আছে। হুবহু অসংখ্য মানুষ। ’

‘শুধু মানুষ? জীব জড় সব হুবহু। আমি সেই হুবহু একটা পৃথিবীর একজন। ’

বলে মানুষটা সামান্য হাসলেন।

অবিনাশ চক্রবর্তী ভাবলেন, আজব কথা তো! বললেন, ‘অ। ’

ইলেকট্রিসিটি ফিরল এ সময়। বোঝা গেল পাশের রুমে গান বেজে উঠতে। বাতি জ্বালালেন অবিনাশ চক্রবর্তী। কোথায় কী? রুমে নেই তার হুবহু মানুষটা। আজব!

সত্যি কি ছিলেন মানুষটা?

বোঝা যাবে আবু আক্কাসের সঙ্গে কথা বললেই। ঠ্যাটা ফকরু খুন হয়ে যাচ্ছিল, সত্যি। স্ট্রাইকার মুন্না ধরা পড়েছে, সত্যি বাংলাবাজার গেলে গোলাম রাব্বানীর ঘটনা হয়তো জানা যাবে না, মীর বকুলের ঘটনা জানা যাবে। কাল সকালে কী ঘটবে?

বৃষ্টি আবার ধরল এর মধ্যে।

মম মেয়েটার নাম দুটো। মম আর তাজী। আসলে মমতাজ। বুদ্ধিমতী আছে। রংপুরের হারাগাছের মেয়ে। বলে হলি ক্রস কলেজে পড়ে। এটা অবশ্য তার মতো সব মেয়েই বলে। তারা সবাই বদরুন্নেসা, ইডেন কি হলি ক্রসে পড়ে। মোমেনা ভাবির মেয়েরাও। বদরুন্নেসা, ক্যামব্রিয়ান, লালমাটিয়ায় পড়ে। এদের দুঃখের গল্পও কমন। কিন্তু সব কমনের মধ্যেও কেউ কেউ আনকমন হয়ে যায় একটু। মম সে রকম।

দুঃখের বিষয় হলো, আনকমন মমকে পাওয়া গেল না। এক পার্টি কক্সবাজার নিয়ে গেছে তাকে। সোনিয়ার জ্বর। প্রিয়াংকা আসবে তবে দেরি হবে। সুমাইয়ার বিয়ে হয়ে গেছে। আরেকটা সুমাইয়া অবশ্য আছে। এ একটু ব্যাটা মানুষ গোছের। ভালো লাগে না। আরেক ঘরে নিয়ে আরেকটা মেয়েকে দেখালেন সান্ত্বনা ভাবি। ওড়নার ঘোমটা পরে আছে। হালকা বেগুনি রঙের ওড়না। কালো সালোয়ার-কামিজ পরেছে। অবিনাশ চক্রবর্তী বললেন, ‘নাম কি গো, মেয়ে?’

‘অনন্যা। ’

সান্ত্বনা ভাবি বললেন, ‘সব দিক দিয়াই অনন্যা অয়। দেখবেন? হি! হি! হি!’

সান্ত্বনা ভাবি অভিজ্ঞ মহিলা।

দেখলেন অবিনাশ চক্রবর্তী। অনন্যা অনন্যা-ই। মমকে ভুলিয়ে দিতে পারার মতো অনন্যা। দেখতে সুন্দর, কথা সুন্দর, শরীরের ঘ্রাণ সুন্দর। গানও করল,

কী করে তোকে বলব

তুই যে আমার...।

মুগ্ধ হয়ে গেলেন অবিনাশ চক্রবর্তী। জুলেখা বোর্ডিংয়ে যখন ফিরলেন রাত দশটার বেশি হয়ে গেছে। সুখপ্রদ এক শান্তি শরীরে। সান্ত্বনা ভাবির বাসায় খেয়ে এসেছেন। এর মধ্যে প্রকাশক মনিরুল হুদা একবার ফোন করেছিলেন কাজে। কথার ফাঁকে বললেন, চিরন্তনী প্রকাশনীর মীর বকুল অ্যাক্সিডেন্ট করেছে দুপুরে। এখন পঙ্গু হাসপাতালে আছেন। গোলাম রাব্বানী কি ঘুমিয়ে পড়েছেন? তার ফোন নম্বর আছে ফোনে। কল দিলেন অবিনাশ চক্রবর্তী। একবারেই ধরলেন গোলাম রাব্বানী, ‘আদাব, বাবু। ’

অবিনাশ চক্রবর্তী বললেন, ‘আদাব, রাব্বানী সাহেব। কী করেন?’

‘কিছু না, বাবু, কিছু করি না। ’

ভয়ার্ত গলা অশালীন দশাসই মানুষটার। অবিনাশ চক্রবর্তী আর কিছু বললেন না। ফোনের লাইন কেটে দিলেন এবং ফোন অফ করে রাখলেন। এখন? কী করবেন? প্রুফ দেখতে বসবেন? ‘দুই বাংলার ছোটগল্প’ না কবিরুল বাশার সাহেবের প্রুফটা? আট-দশ পৃষ্ঠা দেখে ঘুমিয়ে পড়বেন।

প্রুফ নিয়ে বসলেন।

আট-দশ পৃষ্ঠা!

দুই পৃষ্ঠা দেখার আগেই ঘুম।

ঘুমিয়ে স্বপ্ন।

রত্নেশ্বরী না, পরিমল রাহা না, মম না, অনন্যা না, অবিনাশ চক্রবর্তী স্বপ্ন দেখলেন মণিকে। মণি তার কোলে বসে আছে। খিলখিল করে হাসছে। এ কী কাণ্ড!

অবিনাশ চক্রবর্তী ঘুম থেকে উঠে মুখ বেজার করে ভাবলেন, এই স্বপ্নটা কি দেখা উচিত হলো? মণি শুনলে!

কেউ কি বলল, বেক্কল?

না। কেন বলবে? সব দিনের সকাল এক রকম হয় না। শত্রুসম্পত্তির কোথাও থেকে একটা দাঁড়কাক ডেকে উঠল, ‘আই! আই! আই!’ 


মন্তব্য