kalerkantho


ফ্যা শ ন

ঈদ পোশাকের ধারা ও বৈচিত্র্য

এস এম মাঈন উদ্দিন ফুয়াদ

২৫ জুন, ২০১৭ ০০:০০



ঈদ পোশাকের ধারা ও বৈচিত্র্য

‘উৎসবের মেজাজ আর আরাম’—এ দুটোই একমাত্র ঈদ ফ্যাশনের নিয়ামক হওয়ার দরকার ছিল সবখানে। কিন্তু সব ক্ষেত্রে এ বিষয়গুলো দেখা যায়নি।

তবু ফ্যাশনের আবেদন থেমে থাকেনি, আগের তুলনায় ঈদ ফ্যাশন এখন অনেক বেশি পরিপাটি। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ক্রেতারা যেভাবে ভিজ্যুয়ালি ঈদ ফ্যাশনকে গ্রহণ করেছে তা এককথায় বেশ চমত্কার। উপস্থাপনার ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা প্রতিটি স্টাইল এমন সুন্দর করে বিন্যস্ত করেছে যে ক্রেতাদের বুঝতে অসুবিধা হয়নি আসন্ন ঈদে কোন পোশাকটিতে তার ভালোলাগা আটকে গেছে বা আটকে যেতে পারে। পোশাকের বৈচিত্র্য, অলংকরণ, শেপ, লাইন, কাটিং নিরবচ্ছিন্নভাবে ক্রেতার হাতের মুঠোয় এখন। কোনো একটি নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডে বন্দি না থেকে পছন্দের জিনিসটিই মুখ্য এখন ক্রেতার কাছে, সে যে ব্র্যান্ডেরই হোক। প্রতি ঈদেই সাধারণ পোশাকের পাশাপাশি থাকে কিছু জমকালো পোশাক। এই অদ্ভুত আবহাওয়ায় জমকালো পোশাকগুলো কোথাও ঝলমলে উদ্ভাসিত অথবা মনে হবে যমের মতো কালো। তবে এটা নির্ভর করবে স্থান, কাল, পাত্রভেদে পরিধানের ওপর। দেশীয় পোশাকে সর্বদা বিস্তৃত ভারত, পাকিস্তানি লোনের প্রভাব এবার কিছুটা হলেও কমেছে। কারণ শেপ ও প্যাটার্নে ওয়েস্টার্ন লুক একটা বিরাট প্রভাব বিস্তার করেছে।

 

ঈদে জনপ্রিয় পোশাকের

শেপ ও প্যাটার্ন

আমরা দূর থেকে যখন একজন মানুষকে দেখি তখন সবার আগে আমাদের চোখে আসে তার শেপ বা আকৃতি। তেমনি পোশাকের ক্ষেত্রেও প্রথম চোখে পড়ে শেপ বা ফ্যাশনের ভাষায় যাকে বলা হয় সিলুয়্যাট। এখন লং ড্রেস প্যাটার্নই সর্বাধিক জনপ্রিয় ফ্যাশনে। এই লং ড্রেসে আছে আনারকলি প্যাটার্ন, যা আদিকাল থেকে জনপ্রিয়। আবার আছে সার্কুলার এবং এ সিমেট্রিক হেম লাইন শেপ। ওয়েস্টার্ন প্যাটার্নের সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে ইসলামিক প্যাটার্ন, যেমন—আবায়া শেপ। অনেক নামিদামি ব্র্যান্ডে দেখা গেছে, আবায়া বা ইসলামিক ড্রেসকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছে। আবায়া পুরোপুরি ব্যবহার না হলেও এর সংস্করণ যোগ হয়েছে লং কামিজের ক্ষেত্রে। লং কামিজ বা মেক্সি ড্রেসের সঙ্গে কটি যুক্ত হয়েছে আবহাওয়ার কথা চিন্তা না করেই। কিছু ক্ষেত্রে কে-ইপের ব্যবহারও চোখে পড়ার মতো। লং কামিজের প্যাটার্নে একটু পরিবর্তন আসছে লেয়ার্ড প্যাটার্ন। ওভারল্যাপিং প্যাটার্নের ড্রেসগুলোও বেশ উৎসবধর্মী। উৎসব মানেই ঝকমারি কাপড়ের ব্যবহার। তা অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়েছে। তবে সিনথেটিক কাপড়ের ব্যবহার অনেকাংশেই গায়ে জ্বালা ধরাবে; যদিও উৎসবের মেজাজ ধরে রাখার জন্য দামের সঙ্গে সমন্বয় করতে অনেক সময় সিনথেটিক কাপড় ব্যবহার করা হয়েছে।

প্রিন্টিং প্যাটার্নের বহুবিধ ব্যবহার এবার ঈদে অনেকগুলো বড় ব্র্যান্ডে দেখা গেছে। এ ক্ষেত্রে প্রিন্টিং কতটুকু হ্যান্ডফিল বা আরামদায়ক তা বোঝার একটু ব্যাপার আছে। প্রিন্টিংয়ে গাম ও পিগমেন্টের ব্যবহার অতিরিক্ত হলে সেটা তার পরিধেয় পোশাকের উপযুক্ততা হারায়। মনে হবে পোস্টার বা ক্যানভাস। গেল বৈশাখে প্রিন্টিংয়ের ব্যবহার এবং প্যাটার্ন ও কালারে অনেক পরিবর্তন এসেছিল অনেক বড় ব্র্যান্ডের পোশাকে। ঈদেও এর ব্যতিক্রম দেখা যায়নি। ডট প্রিন্ট, ছোট ছোট অ্যাবস্ট্রাক্ট প্যাটার্নের মোটিফ ডিজিটাল প্রিন্ট ব্যাপক হারে ব্যবহার হয়েছে এবার ঈদের পোশাকে। লং ড্রেস, মেক্সি ড্রেস বা আবায়া কুর্তার সঙ্গে পালাজ্জো যথারীতি আগের অবস্থায়ই জনপ্রিয়তা বজায় রেখেছে। চওড়া লম্বা হাতা, নরমাল থ্রি কোয়ার্টার হাতা অথবা কে-ইপ হাতা, হাই নেক কলার, বোট নেক অথবা স্লিভলেস—এসব নিয়ে যখন দর্জিবাড়ি গেছে অনেকে, এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরো অনেক অনুষঙ্গ—লেস-ফিতা, ফ্রিল, বোতাম, জিপার, আরো কত কী! তা দেখে হয়তো দর্জিবাবুর মাথা নষ্ট হয়েছে বহুবার। তখন হয়তো মনে হতো, এবার আমিও স্বাবলম্বী হব, নিজের ড্রেস নিজেই সেলাই করে দেখিয়ে দেবক্ষণ। কিন্তু উৎসবের ব্যস্ততা চলে গেলে সেই আমেজ আর থাকে না।

ঈদে শহুরে ফ্যাশন মানে থ্রিপিস বা সিঙ্গল পিসের ব্যবহার গ্রামে বা মফস্বলে ফ্যাশনের সঙ্গে মেলে না। মফস্বলের মার্কেট পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত হয় চকবাজার, ইসলামপুর আর গাউছিয়া থেকে। এই কয়েকটি স্থানে ফ্যাশন ও ট্রেন্ড নিয়ন্ত্রিত হয় ভারতীয় টিভি চ্যানেলের জনপ্রিয় সিরিয়ালের জনপ্রিয় নারী চরিত্রটির পোশাকের প্যাটার্নের সঙ্গে। এই জনপ্রিয় প্যাটার্নগুলো পাইকারি বাজারে সয়লাব হয়ে যায়—সেখান থেকে প্রতিটি গ্রামে বা মফস্বলে, মহল্লায়।

এখানে দেশীয় ডিজাইনারের হোমওয়ার্ক কোনো কাজে আসে না। যারা পাইকারি বাজারের মহাজন তারাই পোশাক হুবহু কপি করে বাজারে ছাড়ে। সে ক্ষেত্রে প্রিন্টিং প্যাটার্ন, এমব্রয়ডারি প্যাটার্ন, সর্বোপরি পোশাকটির প্যাটার্ন সেই কপি ডিজাইনের মতোই হয়। শুধু ঈদ নয়, বিয়েশাদি, পানচিনি, বৈশাখ—প্রতিটি পর্বেই চকবাজার, ইসলামপুর অথবা গাউছিয়ার পোশাকেরই জয়জয়কার। আমাদের লেখা, ফ্যাশন ট্রেন্ড নিয়ে গবেষণা শহুরে মার্কেটেই সীমাবদ্ধ। মফস্বল বা গ্রামের ঈদ মার্কেটে এসব হিসাব-নিকাশ একেবারেই বেমানান। সে ক্ষেত্রে জেন্টস কালেকশন দেশীয় ধ্যান-ধারণায় ফ্যাশন বা ট্রেন্ডের সঙ্গে অনেকটাই যায়, শহুরে ফ্যাশনে তো অবধারিতভাবে যায়। গ্রামে বা মফস্বলে এর বিরাট প্রভাব পড়ে। সর্বোপরি ঈদে লেডিস ফ্যাশনে কয়েকটি নতুন শেপের পোশাকের আবির্ভাব হয়েছে; যেমন—ফ্লোর লেন্থ গাউন সঙ্গে ওয়েস্ট নটেড হালকা জ্যাকেট, স্টাইলিশ গাউন, এম্পায়ার ওয়েস্ট বেল্টেড অফ শোল্ডার গাউন, অফ শোল্ডার এমবেলিশড গাউন, শিমারি গোল্ডেন স্লিভলেস ফ্লোর লেন্থ গাউন, ফ্রক স্টাইল অফ শোল্ডার ড্রেস, স্লিটেড লং ড্রেস, এম্পায়ার ওয়েস্টেড স্লিট গাউন, এম্পায়ার ওয়েস্টের টেইল কার্ড লং কুর্তি নতুন ভিন্ন ধরনের বৈচিত্র্যায়ণ। কোল্ড শোল্ডার লং কুর্তি, গার্লস কুর্তি ও লাইন টেইল কাট, লং কুর্তি, স্লিটেড কুর্তির নানা প্যাটার্ন, প্যানেল ড্রেসের নানা ধরনের শেপ, ডাবল লেয়ার্ডে সিমেট্রিক কুর্তি, কাপ্তানে সিমেট্রিক জ্যাকেট ইত্যাদি। এর সঙ্গে রেগুলার শেপ ও প্যাটার্ন তো রয়েছেই।

 

মেনজ ফ্যাশনে শেপ ও প্যাটার্ন

গত বছরগুলোতে স্লিম ফিট পাঞ্জাবির একটা হুড়াহুড়ি ছিল, এবার সেটা কমে এসেছে। কারণ একদিকে গরম, অন্যদিকে আন-ব্যালান্সড বডি শেপের জন্য। শখ করে স্লিম ফিট কিনে বেমানান ভুঁড়ি গলিয়ে পাঞ্জাবি তো পরা যায় না; এর চেয়ে ইজি ফিটিংসই ভালো। সব সময় জনপ্রিয়, সবার জনপ্রিয়। তবে স্লিম ফিট যে একেবারেই বাদ পড়ে গেছে, তা বলা যাবে না। পাঞ্জাবি ও শার্টই মূলত ঈদ ফ্যাশনের মূল নিয়ামক। প্রিন্ট প্যাটার্নে আগের গতানুগতিক ধারার বাইরে এসে ছোট ছোট মোটিফ, ডট প্রিন্ট, জালি প্রিন্ট, জাফরি প্রিন্টের পাঞ্জাবি বা শার্ট ঈদ ফ্যাশনে প্রভাব ফেলেছে অনেক। আগে যে রকম বড় বড় মোটিফ আর শক্ত পিগমেন্টে স্ক্রিন প্রিন্ট পাঞ্জাবিতে মার্কেট সয়লাব থাকত, এখন সেটা কমেছে। কারণ প্রিন্টিং সেক্টরে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসছে, রোটারি ও ডিজিটাল মেশিনে প্রিন্টিং হচ্ছে। আরএসজি সেক্টরের অনেক নামিদামি কম্পানি লোকাল মার্কেট ও তাদের ব্র্যান্ডিং ওপেন করছে। ইমেজ বলুন আর মোটিফ প্রিন্টই বলুন, কাপড়ের সঙ্গে এর মিক্সিং অনেকটা আরামদায়ক। তাই ক্রেতারা ওদিকেই ঝুঁকছে। ঈদ মেনজ ফ্যাশনে এখন প্লেন পাঞ্জাবির সঙ্গে প্রিন্টিং ইমেজ পাঞ্জাবির বড় একটা কালেকশন রয়েছে মার্কেটে।

শুধু প্রিন্টিং নয়, বাটিক, শিবরী প্যাটার্নেও আসছে নতুনত্ব। উষ্ণ আবহাওয়ায় টাইডাই, বাটিক ও শিবরী কাপড়ের রয়েছে আলাদা গ্রহণযোগ্যতা। ঈদ ফ্যাশনেও যোগ হয়েছে এর উৎসবের ধারা। বিদেশে যেমন সিজনভিত্তিক পোশাক; যেমন—সামার, উইন্টার, অটাম, স্প্রিং—এই চার জাতের বাইরে কোনো পোশাক হয় না। আমাদের দেশে অনেক ব্র্যান্ডিং পোশাকেই ঈদটাই মুখ্য, সিজন বা আবহাওয়ার বিষয়টা পরোক্ষ। এ তো গেল ব্র্যান্ডিং পোশাকের কথা। হোলসেল মার্কেটের অবস্থা তো আরো ভয়াবহ। জরি, চুমকি, মশারি, নাইলন, পলেস্টার আর ভেলভেট, সাটিন, যা খুশি ব্যবহার্য, ঈদ বলে কথা। এবার সেই পোশাক পরে গরমে নাভিশ্বাস হোন আর দৌড়াতে থাকুন, সেটার জন্য কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই দায়ী নহে।


মন্তব্য