kalerkantho


বি নো দ ন

বন্যার জন্য অপেক্ষা

ফরিদুর রেজা সাগর

২৫ জুন, ২০১৭ ০০:০০



বন্যার জন্য অপেক্ষা

বাংলাদেশের বিখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা।

বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

বহু সম্মানে সম্মানিত হয়েছেন। কুড়িয়ে যাচ্ছেন শ্রোতা-দর্শকের অকুণ্ঠ ভালোবাসা। দেশে-বিদেশে অসংখ্য খ্যাত বিদগ্ধজনের প্রশংসা পেয়েছে তাঁর সংগীত পরিবেশনা।

ইউরোপ-আমেরিকায় প্রচুর অনুষ্ঠান করার পরও সেবার ফোনে জানালেন, ‘আমেরিকায় গাইতে যাচ্ছি এ সপ্তাহে, তবে এবার খানিকটা টেনশনে আছি। ’

প্রশ্ন করলাম অবাক হয়ে, ‘কেন?’

‘একটু টেনশন হচ্ছে এবার। ’

‘বুঝলাম না, হাজার হাজার অনুষ্ঠান করেন আপনি! শ্রোতাদের সামনে অনায়াসে গান গেয়ে যিনি অভ্যস্ত, এবার তাহলে উত্কণ্ঠা কিসের?’

বন্যা বললেন, ‘এবারের অনুষ্ঠানে একজন বিশেষ শ্রোতা থাকবেন। ’

‘তাই?’

‘হুম্। সে জন্য ভাবছি, চিন্তাভাবনা করছি কী গান করব। কী কী গান করলে ভালো হয়।

কতটা সময় গাওয়া উচিত ইত্যাদি ইত্যাদি। ’

হেসে প্রশ্ন করলাম, ‘বিশেষ শ্রোতাটি কে? উপমহাদেশের এক নম্বর ফিল্ম স্টার?’

বন্যা হাসলেন, ‘না। ’

কিছুদিন আগে ঢাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বন্যা ও শাহরুখ খানের নাম পাশাপাশি ছিল। বন্যা বুঝলেন, আমি সেটা নিয়েই মজা করছি।

‘আমার রবীন্দ্রসংগীত শুনতে ওই ফিল্ম স্টার কেন আসবেন?’

‘তাহলে বিশেষ অতিথিটা কে? কী কারণে এত সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছেন?’

বন্যা উত্তর দিলেন, ‘সিরিয়াস হচ্ছি এ জন্য যে অনুষ্ঠানে এমন একজন আসবেন, যিনি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধার একজন ব্যক্তিত্ব?’

‘তিনি কে, জানতে পারি?’

‘অমর্ত্য সেন। ’

এই সময়টা কাজের উপলক্ষে তিনি নিউ ইয়র্ক থাকবেন। যখন শুনেছেন বন্যাও যাচ্ছেন, নিজ মুখে জানিয়েছেন, তিনি বন্যার গান শুনবেন। সেটা জেনেই বন্যার বাড়তি টেনশন।

একেই বা এত বড় ব্যাপার হিসেবে দেখা হবে কেন? বুঝলাম না। কিছুদিন আগে এক অনুষ্ঠানে কলকাতা যাওয়া হয়েছিল। চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেনের বয়স তখন নব্বই। তিনি অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে গিয়ে বললেন, ‘আমার বয়স আমাকে সহায়তা করে না এখন, ছবি করতে পারি না। বাড়িতে বসে সময় কাটাই শুধু। কিন্তু আমার মনে হয় এই অবসর সময়টা আমার চমত্কার কেটে যায়, বেঁচে আছি শুধু রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার গান শুনে। এই নব্বই বছর বয়সেও বেঁচে থাকার আগ্রহ একটুও কমেনি, আনন্দ লাগছে ভাবতে এ জন্যই যে সরাসরি বন্যার গান শোনার ঘটনা জীবনে এখনো ঘটছে। ’

তাই বলে অমর্ত্য সেনের মুখোমুখি সংগীত পরিবেশনাকে এতটা গুরুত্ববহ মনে হচ্ছে কেন? নোবেল পুরস্কার পাওয়া মেধাবী বাঙালি বলে? বন্যার গান বিশেষভাবে শুনতে চেয়েছেন সে জন্য?

বন্যা উত্তর দিলেন না। কিন্তু বিষয়টি তাঁর মনে যে গেঁথে থাকল বিশেষভাবে, সেটা টেলিফোনের এপাশ থেকে অনুধাবন করতে অসুবিধা হলো না।

গানের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলেন বন্যা সঠিক সময়ে।

কোন গানটা দিয়ে পরিবেশনা শুরু হবে, কোন গানগুলো গাইলে অমর্ত্য সেনের  ভালো লাগবে, কোন গানটা হবে সমাপ্তি সংগীত—এসব তখন মাথায় খেলা করছে। ক্ষণে ক্ষণে সে জন্য হয়ে যাচ্ছিলেন অন্যমনস্ক।

সরাসরি মঞ্চে উঠলেন না বন্যা।

স্থানীয় শিল্পীদের গান হচ্ছে। হল ভর্তি অসংখ্য শ্রোতা-দর্শক সেই পরিবেশনা দেখছে। সব শেষে উঠবেন বন্যা। সে জন্য দর্শকদের সামনের সারিতে আবছা অন্ধকারে একটা শূন্য চেয়ার দেখিয়ে একজন বয়স্ক ভদ্রলোক বন্যাকে বললেন, ‘এইখানে বসুন। আপনার জন্যই এ চেয়ারটা রেখে দিয়েছিলাম। আয়োজকদের বলেছিলাম স্টেজে ওঠার আগে আমার পাশেই আপনাকে যেন বসানো হয়। ’

শেষ কথাটায় অন্ধকারে বন্যার ভ্রু কুঁচকে গেল। চেয়ারে বসে বন্যা বয়স্ক ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে দেখলেন।

দেখেই চমকে গেলেন।

ভদ্রলোক বললেন, ‘বসে ছিলাম, আপনি আসবেন, আপনার জন্যই চেয়ারটা খালি রাখা হয়েছে। ’

বিস্মিত বন্যা আবছায়া অন্ধকারে চিনতে পারলেন তিনি অমর্ত্য সেন। যাঁকে বন্যা এত ভাবছিলেন, তিনি চেয়ার খালি রেখে অপেক্ষা করছেন। তিনি যতখানি সিরিয়াস, তার চেয়েও বেশি সিরিয়াস একজন শ্রোতা অপেক্ষমাণ তাঁর জন্য!

চলচ্চিত্রকার খালিদ মাহমুদ মিঠুর মৃত্যু হলো সেদিন।

খালিদ মাহমুদ মিঠু আমাদের সবার ঘনিষ্ঠ মানুষ। আমি শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যাকে ফোন করে খবরটা জানালাম।

মিঠু তাঁর ছবিতে বন্যার গান ব্যবহার করেছে।

বন্যা মিঠুর আকস্মিক মৃত্যুর খবরটা পেয়ে মর্মাহত হলেন খুব।

আমি গাড়িতে তখন মিঠুর ধানমণ্ডির বাড়িতে যাচ্ছি। ঠিক সেই সময়ই একজন শুভাকাঙ্ক্ষী আমাকে ফোন করে একটা সুসংবাদ দিলেন। বন্যা স্বাধীনতা পদক পেয়েছেন।

জীবন সম্ভবত এমনই। একটি মৃত্যুসংবাদের মধ্যে চলে এসেছে এক আনন্দের খবর। বন্যা এতক্ষণে মিঠুর বাড়িতে চলে এসেছেন। উপস্থিত সবাই বন্যাকে স্মিত কণ্ঠে অভিনন্দন জানালেন। স্মিত হেসেই বন্যা প্রত্যুত্তর দিয়ে গেলেন।

মিঠুর বাড়ি থেকে আমরা সবাই বের হয়ে এলাম একসময়।

আমার সঙ্গী তখন আমীরুল, সাচ্চু আর ব্রাউনিয়া। বন্যাকে বললাম, ‘চলুন, আপনাকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে যাই। এত বড় আনন্দের খবর। মাঝপথে চলুন সবাই একটু কফি খাই। এই, তোমরা সবাই গাড়িতে ওঠো। ’

বন্যা বললেন, ‘হ্যাঁ, চলুন। এত বড় আনন্দের সংবাদ। সবাই বসে একটু কফি খাওয়া যেতেই পারে। তা ছাড়া আমি আর কার সঙ্গে শেয়ার করব। ’

কেন?

বন্যা বললেন, ‘আমার দুই বোনই এখন যার যার অফিসে। একজন বিলেতে, একজন ঢাকায়। আর আমার মা বেশ অসুস্থ। মাকে বাড়িতে গিয়ে যখন খবরটা দেব, মা কতটা অনুধাবন করবেন জানি না। বাবা থাকলে হয়তো বুঝতেন। খুব খুশি হতেন। ’

‘কেন, হেলাল ভাই? উনি কোথায়?’

হেলাল ভাই বন্যার স্বামী।

‘সে আমেরিকায়। ’

‘ছেলে?’

‘সে-ও আমেরিকায়। ’

তখন আমেরিকায় ভোর হচ্ছে।

বন্যা বললেন, ‘দাঁড়ান, তবু হেলালকে একটা কল করে জানাই। ’

খবরটা ফোনে ঘুমের ঘোরে পেয়ে খুব যে একটা সাড়া দিতে পারলেন হেলাল সাহেব তা নয়। শুধু অল্পবিস্তর শব্দ করে হু-হ্যাঁ-আচ্ছা বলে গেলেন।

এরপর দিন দুই চলে গেল।

হঠাৎ বন্যার মোবাইলে আমেরিকা থেকে ফোন এলো।

হেলাল সাহেবের গলায় উষ্ণতা, নানা জায়গা থেকে তাঁর কাছে ফোন এসেছে।

‘শুনলাম, তুমি বড় একটা অ্যাওয়ার্ড পেয়েছ। মানুষজন তোমাকে কাছে না পেয়ে আমাকেই অভিনন্দন জানিয়ে যাচ্ছে। ’

উত্তরে বন্যা বললেন, ‘তোমাকে তো আমি সঙ্গে সঙ্গে জানিয়েছি। ’

‘তখন তো ঘুমের ঘোরে ছিলাম, ঠিক বুঝতে পারিনি। বিরাট পুরস্কারটা তো শুনলাম দেশের সর্বোচ্চ পুরস্কার! তোমাকে কংগ্র্যাচুলেশন। অসংখ্য মানুষ আমাকে খবরটা দিচ্ছে উচ্ছ্বাস নিয়ে। ’

ফোনের এপাশ থেকে বন্যা হেসে ফেললেন, বললেন, ‘হুম্। সবাইকে আমার হয়ে ধন্যবাদ পৌঁছে দিয়ো। ’

‘স্বাধীনতা পুরস্কার। খুবই বড় সংবাদ। তোমাকে আবারও শুভেচ্ছা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে তো পুরস্কার নেবে, তাই না?’

বন্যা উত্তর দিলেন, ‘হুম্, অমুক তারিখ সেই পুরস্কার অনুষ্ঠান। পুরস্কারটা উনিই দেবেন শত ব্যস্ততার মধ্যেও। ’

হেলাল বললেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তো তোমার জন্মদিনেও শুভেচ্ছা জানান। ’

‘সেদিনের পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে তুমি কি আসতে পারবে?’

হেলাল সাহেব বললেন, ‘না, আমার তো এখনো অনেকগুলো ডাক্তারি চেকআপ বাকি। তুমি তো জানোই। ’

সেদিন পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে বন্যার সঙ্গে কলকাতা থেকে আসা কয়েকজন বিদগ্ধজন গিয়েছিলেন। সেদিন সকালেই তাঁর অ্যাপার্টমেন্টের দরজায় ঠকঠক শব্দ। দরজা খুলতেই দেখলেন অ্যাপার্টমেন্টের সবচেয়ে পুরনো দারোয়ানকে।

‘কী ব্যাপার, কিছু বলবেন?’

‘জি। কথাটা বলতে একটু ভয় লাগছে। ’

‘বলে ফেলুন। ভয় কিসের?’

‘আপনি স্বাধীনতা পদক নিতে যাবেন!’

‘হ্যাঁ। ’

‘আমাকে সঙ্গে নেবেন?’

‘আপনি?’

‘জি, আমার বহুদিনের শখ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সামনে থেকে দেখি। এই জনমে সেই ইচ্ছাটা তো আর পূরণ হবে না। আপনার সঙ্গে যদি যেতে পারি ওনাকে দেখার কপাল হবে আমার। আমাকে সঙ্গে নেবেন?’


মন্তব্য