kalerkantho


বি নো দ ন

যৌথ প্রযোজনার আদ্যোপান্ত

মাহফুজুর রহমান

২৫ জুন, ২০১৭ ০০:০০



যৌথ প্রযোজনার আদ্যোপান্ত

‘অবিচার’ ছবিতে বাংলাদেশের রোজিনা ও ভারতের মিঠুন চক্রবর্তী

সারা বিশ্বেই দুই বা ততোধিক দেশের মধ্যে যৌথ প্রযোজনায় চলচ্চিত্র নির্মাণের দৃষ্টান্ত রয়েছে। কিন্তু যৌথ প্রযোজনাকে ঘিরে একটি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির দ্বিধাবিভক্ত হওয়ার ঘটনা বাংলাদেশ ছাড়া আর কোথাও হয়েছে বলে জানা নেই।

ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনায় ছবি নির্মাণ এখন চলচ্চিত্রাঙ্গনের সবচেয়ে আলোচিত ইস্যু। যৌথ প্রযোজনার পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্কে ডুবে আছে ঢালিউড। গুটিকয় মুখচেনা প্রযোজকের কাছে যৌথ প্রযোজনাই এখন মুমূর্ষু চলচ্চিত্রশিল্পকে বাঁচানোর শেষ দাওয়াই। টালিগঞ্জে নব্বইয়ের দশকে ঢাকাই ছবি রিমেকের যে জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল, তেমনই এক প্লাবনে ভাসছে ঢাকাই সিনেমা।

যৌথ প্রযোজনা আজ যে বিশাল শরীর নিয়ে মূর্তিমান, সূচনায় এর চেহারা মোটেও এমন ছিল না। তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে যৌথ উদ্যোগে ছবি নির্মাণের অভিজ্ঞতা ছিল এ অঞ্চলের নির্মাতাদের। স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সালে আলমগীর কবির ‘সূর্যকন্যা’ দিয়ে চলচ্চিত্রে প্রথম যৌথ প্রযোজনার শুভ সূচনা করেন। কারো কারো মতে, একই পরিচালকের ‘ধীরে বহে মেঘনা’ও যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত। তবে তার সপক্ষে কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

এই ছবিতে পশ্চিম বাংলার হাসু ব্যানার্জি ও শমিতা বিশ্বাস অভিনয় করায় যৌথ প্রযোজনার কথা বলা হচ্ছে বেশি। তবে আলমগীর কবিরের হাতেই যৌথ প্রযোজনার গোড়াপত্তন, এতে কোনো ভুল নেই। আলমগীর পিকচার্সের প্রযোজনায় বাংলাদেশের বুলবুল আহমেদ ও ভারতের জয়শ্রী রায়কে নিয়ে আলমগীর কবির ‘সূর্যকন্যা’ নির্মাণ করে দারুণ প্রশংসিত হন। এরপর ১৯৭৬ সালে রাজেন তরফদার ‘পালঙ্ক’ নির্মাণ করেন ভারতের সঙ্গে। ভারতীয় ঋত্বিক ঘটক পরিচালিত বাংলাদেশি ছবি ‘তিতাস একটি নদীর নাম’কেও অনেকে যৌথ প্রযোজনা মনে করেন; যদিও এটি সঠিক নয়।

১৯৮৩ সালে এহতেশাম ‘দূরদেশ’ বানিয়ে যৌথ প্রযোজনাকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যান যে বিশাল ক্যানভাসে ছবি নির্মাণের স্বপ্ন দেখতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন ঢাকাই নির্মাতারা। বোম্বে, লাহোর ও ঢাকার তারকাদের সমাবেশ ঘটান এহতেশাম। শশী কাপুর, শর্মিলা ঠাকুর, পারভিন ববি, রাজ বাব্বর, ববিতা ও নাদিম অভিনীত ‘দূরদেশ’ বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও কানাডার যৌথ উদ্যোগ। এটি ‘গেহরি চোট’ নামে মুক্তি পায় ভারতে। পরিচালক হিসেবে নাম যায় অমরিশ সাংগলের। ১৯৮৪ সালে এহতেশাম পরিচালনা করেন ‘শক্তি’। তিনি এই ছবির প্রযোজকও। বাংলাদেশ-পাকিস্তান যৌথ প্রযোজিত ছবি এটি। এতে অভিনয় করেন এ দেশের শাবানা ও পাকিস্তানি   তারকা নাদিম।

১৯৮৫ সালে দুই দেশের তারকাদের নিয়ে নির্মিত হয় ‘অবিচার’। বোম্বের বাঙালি অভিনেতা, বাঙালি মিউজিশিয়ান আর বাঙালি টেকনিশিয়ানদের নিয়ে নির্মিত ছবিটি দুই বাংলায়ই গ্রহণযোগ্যতা পায়। সৈয়দ হাসান ইমাম এবং বোম্বের শক্তি সামন্ত ছবিটি যৌথভাবে পরিচালনা করেন। মিঠুন, রোজিনা, উত্পল দত্ত, নূতন, আহমেদ শরীফ, গোলাম মুস্তাফা অভিনীত ‘অবিচার’-এর মতো বড় ক্যানভাসে, হিন্দি ভাষায় পুরো ভারতে প্রদর্শিত ছবি যৌথ প্রযোজনায় ব্যতিক্রমী সংযোজন। হিন্দিতে ‘আরপার’ নামে মুক্তি পায় ছবিটি। আর পশ্চিমবঙ্গে মুক্তি পায় ‘অন্যায় অবিচার’ নামে। ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তানের যৌথ বিনিয়োগে ‘মিস লংকা’ নির্মিত হয়। মধুমিতা মুভিজ প্রযোজিত ছবিটিতে অভিনয় করেন ঢাকার ববিতা ও লাহোরের ফয়সাল। ১৯৮৬ সালে ইকরাম বিজু বাংলাদেশ-পাকিস্তান-নেপালের যৌথ প্রয়াসে নির্মাণ করেন ‘হিমালয়ের বুকে’। অভিনয়ে রোজিনা ও গোলাম মুস্তাফা। পরের বছর মুক্তি পায় নুরুল হক বাচ্চু ও আকবর রুমীর ‘আপোষ’। ববিতা, সুচন্দার সঙ্গে অভিনয়ে ছিলেন পাকিস্তানের মোহাম্মদ আলী ও ফয়সাল। ১৯৮৭ সালে মুক্তি পায় বাংলাদেশের নূতন ও পাকিস্তানের নাদিম অভিনীত ‘ব্যবধান’। ই আর খান ও পাকিস্তানের নজরুল ইসলাম ছবির পরিচালক।

১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ-পাকিস্তান যৌথ উদ্যোগের জোয়ার ওঠে। আফতাব খান টুলু পরিচালিত ও রোজিনা প্রযোজিত ‘দুনিয়া’। অভিনয়ে রোজিনা ও নাদিম। মুক্তি পায় বাংলাদেশ-পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কা প্রযোজিত আব্দুল লতিফ বাচ্চুর ‘বলবান’। অভিনয়ে নূতন ও শেরী। টিভি অভিনেতা জাহিদ হাসানেরও প্রথম ছবি এটি। আজিজুর রহমান বুলির প্রযোজনা ও পরিচালনায় ‘বাপের বেটা’ও (অঞ্জনা ও মাহমুদ কলি) মুক্তি পায়। ভারতের প্রমোদ চক্রবর্তী নির্মাণ করেন ‘বিরোধ’। হিন্দিতে ছবিটি মুক্তি পায় ‘শত্রু’ নামে। সুপারস্টার রাজেশ খান্না ও বাংলাদেশের শাবানা এই ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রে।

১৯৮৯ সালে মুক্তি পায় তিনটি যৌথ প্রযোজনার ছবি—জিয়াউদ্দিন আসলামের ‘গুনাহ’ (শাবানা ও পাকিস্তানের জাভেদ শেখ), এফ কবীরের ‘এক দুই তিন’ ও ‘আব্দুল লতিফ বাচ্চুর ‘প্রতারক’ (ইলিয়াস কাঞ্চন ও নূতন)।

১৯৯০ সালে চাষী নজরুল ইসলাম ও দেওয়ান নজরুল নির্মাণ করেন ‘লেডি স্মাগলার’ (ববিতা ও সোহেল চৌধুরী) ও ‘প্রতীক্ষা’। আফতাব হোসেন টুলু বানান ‘ভালোবাসা ভালোবাসা’। নুরদ্দিন জাহাঙ্গির নেপাল ও পাকিস্তানের সঙ্গে যৌথ প্রযোজনায় বানান ‘জীবন পরীক্ষা’ (ববিতা ও নেপালি নায়ক শিবশ্রেষ্ঠ)। এফ কবীরের সর্বশেষ ছবি ‘নীল দরিয়াও’ মুক্তি পায় এ বছর।

১৯৯১ সালে বাংলাদেশ-পাকিস্তান-নেপালের প্রযোজনায় শফি বিক্রমপুরী নির্মাণ করেন ‘লেডি কমান্ডো’। অভিনয়ে শবনম ও দিতি। ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ প্রযোজনা বলে প্রচারিত হয় মহসিনের ‘লাভ ইন আমেরিকা’। ছবির পাত্র-পাত্রী পাকিস্তানের ফয়সাল ও পিংকি। বাংলাদেশের শবনম-বুলবুলও আছেন। ১৯৯৩ সালে যৌথ প্রযোজনায় ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ নির্মাণ করে প্রশংসিত হন ভারতের গৌতম ঘোষ। যৌথ উদ্যোগে নির্মিত সর্বাধিক প্রশংসিত ছবি এটি। রাইসুল ইসলাম আসাদ ও চম্পা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান এই ছবিতে।

১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ-পাকিস্তানের যৌথ প্রযোজনায় অভিনেত্রী-প্রযোজক শাবানা নির্মাণ করেন ‘ঝড় তুফান’। নুরুল হক বাচ্চুর এ ছবিটি আমেরিকায় চিত্রায়িত। নাদিম-শাবানা জুটির শেষ ছবি। ১৯৯৫ সালে আজিজুর রহমান বুলি পরিচালনা করেন ‘রঙিন প্রাণসজনী’। অভিনয়ে কলকাতার তাপস পাল, ইন্দ্রাণী হালদার ও ঢাকার অঞ্জু ঘোষ।

১৯৯৭ সালে শাবানার এসএস প্রডাকশন্স থেকে মনোয়ার খোকন পরিচালনা করেন ‘স্বামী কেন আসামী’। জসীম, শাবানা, চাঙ্কি পাণ্ডে ও ঋতুপর্ণা অভিনয় করেন এতে। ১৯৯৮ সালে ঢাকার প্রযোজক রুহুল আমিন বাবুল ও কলকাতার অভিনেতা প্রসেনজিৎ যৌথভাবে পরিচালনা করেন ‘আমি সেই মেয়ে’। মুম্বাইয়ের জয়াপ্রদা, কলকাতার ঋতুপর্ণা ও ঢাকার আলমগীর অভিনয় করেন ছবিতে। একই বছর কলকাতার শতাব্দী রায় ও ঢাকার শাকিল খানকে নিয়ে আজিজুর রহমান বুলি পরিচালনা করেন ‘রাজা রানী বাদশা’। ঢাকার আমিন খান এবং কলকাতার মোহিনীকে নিয়ে মনতাজুর রহমান আকবর নির্মাণ করেন ‘মনের মতো মন’। এতে অভিনয় করেন ওপার থেকে ঋতুপর্ণা ও এপার থেকে হুমায়ূন ফরীদি। আমিন খান ও ঋতুপর্ণাকে নিয়ে এম এম সরকার নির্মাণ করেন ‘তোমার আমার প্রেম’।

১৯৯৯ সালে এহতেশাম তাঁর শেষ যৌথ প্রযোজনার ছবিটি পরিচালনা করেন—‘পরদেশি বাবু’। অভিনয়ে ঢাকার ফেরদৌস ও কলকাতার রচনা ব্যানার্জি। ঢাকার এসডি প্রডাকশন এবং কলকাতার শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস যৌথভাবে নির্মাণ করে ‘গরীবের রাজা রবিনহুড’। অভিনয়ে ড্যানি সিডাক ও শতাব্দী রায়। যৌথ প্রযোজনার ইতিহাসে সবচেয়ে দর্শকনন্দিত ছবি বাসু চ্যাটার্জির ‘হঠাৎ বৃষ্টি’ মুক্তি পায় এ বছর। অভিনয়ে ফেরদৌস, রচনা ব্যানার্জি ও প্রিয়াঙ্কা ত্রিবেদী। ছবির জন্য সেরা অভিনেতার জাতীয় পুরস্কারও পান ফেরদৌস। ২০০০ সালে বাসু চ্যাটার্জি ফেরদৌস ও প্রিয়াঙ্কা ত্রিবেদীকে নিয়ে নির্মাণ করেন ‘চুপি চুপি’।

২০০১ সালে ফেরদৌসের সঙ্গে ভারতের মধুমিতাকে নিয়ে শাহ আলম কিরণ নির্মাণ করেন ‘চুড়িওয়ালা’।

২০০২ সালে ঢাকার মান্না, কলকাতার ঋতুপর্ণা ও মুম্বাইয়ের মমতা কুলকার্নিকে নিয়ে শাহ আলম কিরণ পরিচালনা করেন ‘শেষ বংশধর’। মান্না, অমিত হাসান, মিশা সওদাগর, রাজীব ও টালিগঞ্জের ঋতুপর্ণাকে নিয়ে ছটকু আহমেদ বানান ‘শেষ যুদ্ধ’। তারেক মাসুদের প্রশংসিত ছবি ‘মাটির ময়না’য় ফ্রান্সের অর্থায়ন ছিল বলে এটিকেও যৌথ প্রযোজনার ছবি বলতে হয়। ২০০৩ সালে আলী আজাদ নির্মাণ করেন ‘নসীমন’। ঢাকার রিয়াজ-শাবনূর অভিনীত ছবিটি দেশে ভালো ব্যবসা করে। পশ্চিমবঙ্গে এটি মুক্তি পায় ‘বউমার বনবাস’ নামে। এ বছরই মতিউর রহমান পানু পরিচালনা করেন যৌথ প্রযোজনার ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যবসাসফল ছবি ‘মনের মাঝে তুমি’।

২০০৪ সালে কলকাতার ঋতুপর্ণা ও ঢাকার আমিন খানকে নিয়ে শাহ আলম কিরণ পরিচালনা করেন ‘আগুন জ্বলবেই’। বাদল খন্দকার পরিচালনা করেন ‘প্রেম করেছি বেশ করেছি’। ভারতের ঋতুপর্ণা ও চাঙ্কি পাণ্ডে এবং বাংলাদেশের রিয়াজ ও পপি অভিনয় করেন ছবিতে। এ বছর মুম্বাইয়ের ছবি ‘ফুল আর পাথরে’র প্রযোজনায় শরিক হন বাংলাদেশের কামাল জামান। অভিনয়ে বলিউডের নাসিরউদ্দিন শাহ, সানি দেওল, চাঙ্কি পাণ্ডে ও নিলম। পরের চার বছর যৌথ প্রযোজনার কোনো ছবি হয়নি।

২০০৮ সালে এফ আই মানিক দুটি যৌথ প্রযোজনার ছবি পরিচালনা করেন—‘মায়ের মতো ভাবী’ (ফেরদৌস, রাজ্জাক ও কলকাতার শতাব্দী রায়) ও ‘সবার উপরে তুমি’ (শাকিব খান ও স্বস্তিকা মুখার্জি, ভিক্টর ব্যানার্জি)। ‘সবার উপরে তুমি’ কলকাতায় মুক্তি পায় ‘আমার ভাই আমার বোন’ নামে। এটিই বর্তমানে ঢালিউডের শীর্ষ নায়ক শাকিব খানের প্রথম যৌথ প্রযোজনার ছবি।

২০১০ সালে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে গৌতম ঘোষ পরিচালনা করেন লালনের জীবনী ‘মনের মানুষ’। অভিনয়ে পশ্চিমবঙ্গের প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জি, পাওলি দাম এবং ঢাকার চঞ্চল চৌধুরী। ২০১২ সালে মালয়েশিয়ার সঙ্গে যৌথ প্রযোজনায় মুক্তি পায় সোহানুর রহমান সোহানের ‘দ্য স্পিড’। অভিনয়ে অনন্ত ও মালয়েশিয়ার পারভিন।

আবারও চার বছরের বিরতি।

২০১৪ সালে কলকাতার অশোক পতি পরিচালনা করেন ‘আমি শুধু চেয়েছি তোমায়’। বাংলাদেশি পরিচালক হিসেবে অনন্য মামুনের নাম গেলেও বিতর্ক শুরু হয় ছবিটি নিয়ে। ঢাকার প্রযোজক হিসেবে অ্যাকশন কাটের নাম গেলেও ছবিটি এসকে মুভিজের একক প্রযোজনা বলে প্রচারিত হয়। ফলে প্রতারণার অভিযোগ ওঠে। ঢাকার মিশা সওদাগর ছাড়া আর কোনো ঢাকাই শিল্পী ছিলেন না। মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘টেলিভিশন’ (মোশররফ, তিশা ও চঞ্চল অভিনীত) ছবিতে বিনয়োগ রয়েছে জার্মানির। সেই বিবেচনায় এটিও যৌথ প্রযোজনার ছবি।


গত বছর মুক্তি পাওয়া ‘শিকারী’ ছবিতে শাকিব খান ও শ্রাবন্তী চ্যাটার্জি


২০১৫ সালে মুক্তি পায় অশোক পতি ও আব্দুল আজিজের ‘রোমিও জুলিয়েট’। ছবিতে অঙ্কুশের সঙ্গে জুটি বাঁধেন মাহিয়া মাহি। ‘অগ্নি টু’ ছবিটিও নির্মিত হয় এ বছর। ইফতেখার চৌধুরীর এই ছবিতে মাহিয়া মাহির নায়ক কলকাতার ওম। অশোক পতির ‘আশিকি’ও মুক্তি পায় এ বছর। ছবিটিতে অভিনয় করেন কলকাতার অঙ্কুশ ও ঢাকার নুসরাত ফারিয়া। রাজা চন্দ পরিচালিত ‘ব্ল্যাক’-এ অভিনয় করেন কলকাতার সোহম ও ঢাকার মিম।

২০১৬ সালে গৌতম ঘোষ পরিচালনা করেন ‘শঙ্খচিল’। ভারতের জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবিটিতে অভিনয় করেন কলকাতার প্রসেনজিৎ ও ঢাকার কুসুম সিকদার, সাঝবাতি। এ বছর জাজ মাল্টিমিডিয়ার অর্থায়নে সর্বাধিক যৌথ প্রযোজনার ছবি নির্মিত হয়—‘অঙ্গার’ (পরিচালক ওয়াজেদ আলী সুমন, অভিনয়ে জলি ও ওম), ‘হিরো ৪২০’ (পরিচালক সুজিত মণ্ডল, অভিনয়ে ওম, ফারিয়া, রিয়া সেন), ‘রক্ত’ (পরিচালক ওয়াজেদ আলী সুমন, অভিনয়ে পরীমণি ও রোশান), ‘শিকারী’ (পরিচালক জয়দীপ মুখার্জি, অভিনয়ে শাকিব খান ও শ্রাবন্তী), ‘বাদশা দ্য ডন’ (পরিচালক বাবা যাদব, অভিনয়ে জিৎ ও ফারিয়া), ‘প্রেম কি বুঝিনি’ (পরিচালক সুদীপ্ত সরকার, অভিনয়ে ওম ও শুভশ্রী), ‘নিয়তি’ (পরিচালক জাকির হোসেন রাজু, অভিনয়ে আরিফিন শুভ ও জলি)।

২০১৭। এ বছর জাজ মাল্টিমিডিয়া থেকে মুক্তি পেয়েছে জাকির হোসেন রাজু পরিচালিত আরিফিন শুভ ও নুসরাত ফারিয়া অভিনীত ‘প্রেমী ও প্রেমী’। এবারের ঈদুল ফিতরে মুক্তি পাবে ‘বস টু‘ ও ‘নবাব’।

সংস্কৃতি বিনিময় ও পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নই ছিল যৌথ প্রযোজনার লক্ষ্য। ব্যবসায়িক মুনাফা হাসিলই এখন যৌথ প্রযোজনার প্রধান উদ্দেশ্য। অতীতে যৌথ প্রযোজনার নীতিমালায় ছিল কঠিন নিয়ম। যে কারণে অনেকেই উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছিলেন। ২০১২ সালে যৌথ প্রযোজনার সংশোধিত নীতিমালায় শৈথিল্য এলে আবার জোয়ার আসে বিনিয়োগের। তবে ভারতীয় একক প্রযোজনাকে যৌথ প্রযোজনার মোড়কে প্রদর্শনের অভিযোগ ওঠে এবার। মধ্যিখানে যৌথ প্রযোজনার ছবি নির্মাণ হালে পানি পায়নি। ২০০৫ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত যৌথ প্রযোজনার কোনো ছবি নির্মিত হয়নি। তার পরের বছরগুলোতে একটি-দুটি প্রযোজনা বিচ্ছিন্ন বলেই মনে হয়েছে। ২০১৪ সালের পর এখনকার প্রেক্ষাপট ব্যাপক বিতর্কিত। গত ৪০ বছরে দুই দেশের যৌথ প্রযোজনায় প্রায় ৪০টি ছবি নির্মিত হয়েছে। এখনকার উৎসাহ-উদ্দীপনা বজায় থাকলে আগামী চার বছরে আরো ৪০টি ছবি যৌথ প্রযোজনায় হয়ে গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। আশির দশকে যৌথ প্রযোজনাকে বাজার সম্প্রসারণের হাতিয়ার ভেবেছিলেন এ তল্লাটের নির্মাতারা। নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত যৌথ উদ্যোগে ভারত ছাড়াও বিনিয়োগ এসেছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, তুরস্ক এবং সার্কভুক্ত শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও পাকিস্তান থেকে। পরে যৌথ প্রযোজনার উদ্যোগগুলো ঝিমিয়ে পড়ে। ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া আর কাউকে দৃশ্যপটে দেখা যায় না। যৌথ প্রযোজনায় বাংলাদেশের লাভ বুঝে নিতে মরিয়া ইন্ডাস্ট্রিকে কতটা লোকসান গুনতে হচ্ছে, স্থানীয় প্রযোজনায় আত্মবিশ্বাস হারিয়ে কতখানি পিছিয়ে পড়ছে চলচ্চিত্রশিল্প—এই প্রশ্নগুলো উঠছে। চলমান এই বিতর্কের ভেতরেই উপসংহার টানতে পারি এভাবে, যৌথ প্রযোজনার নীতিমালা শতভাগ মেনে ছবি নির্মিত হলে ভারত-বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সম্পর্ক এক নতুন মাত্রায় উপনীত হবে।


মন্তব্য